#সুর্যস্নাত_ভালোবাসা
রাতের তৃতীয় প্রহর চলমান। ক্যান্টনমেন্টের দু’তলার কোণের রুমটিতে খোলা জানালা দিয়ে নিঃশব্দ হিমেল বাতাস ঢুকে পড়ছে শিরশিরে স্পর্শ নিয়ে। কুয়াশায় ঢাকা চারিদিক যেনো ধূসর কোনও স্বপ্নরাজ্য, সবই ম্লান, শুধু পাহারাদারদের ছন্দময় পদধ্বনি নিস্তব্ধতাকে ভেদ করে ভিতরে প্রবেশ করছে। এই কনকনে ঠান্ডায় ইলহান সদ্য স্নান সেরে বেরিয়েছে। এক হাতে তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুল মুছছে, উন্মুক্ত বলিষ্ঠ শরীর বেয়ে বিন্দুবিন্দু পানি গড়িয়ে পড়ছে। কোমর অব্দি জড়ানো সাদা তোয়ালে তার গোটা অবয়বকে আরও তীক্ষ্ণ, আরও কঠোর করে তুলেছে। চুল মোছার ভঙ্গিতে তোয়ালেটি মুখের অর্ধেক ঢেকে রেখেছে, যেনো তার দৃষ্টিও এই শীতের রাতের মতো ধোঁয়াটে। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সে সাদা তোয়ালেটা টেবিলের পাশে রাখা চেয়ারের ওপর রেখে ঘুরে দাঁড়াতেই চোখ গিয়ে আটকে গেল জানালায়।
অন্ধকার ভেদ করে ভেসে উঠেছে একজোড়া হরিণী চোখ। ঘন চোখের পাপড়ি বারবার কাঁপছে, ফর্সা কপাল কুয়াশামাখা আলোয় যেনো আরও উজ্জ্বল।বাতাসে খোলা চুলগুলো উড়ছে এলোমেলো, অথচ হরিণী চোখের অধিকারিণীর মনে কোনও হেলদোল নেই, যেনো রাতের ঠান্ডাও তাকে স্পর্শ করতে সাহস পাচ্ছে না।
চোখ দুটি যখন ধীরে ঘুরে নিচের দিকে নেমে গেলো, ইলহানও তখন তেমনি ধীর গতিতে অগ্রসর হলো তার দিকে। দুই হাত উন্মুক্ত বুকের ওপর ভাজ করে নিচে তাকাতেই দেখলো, নিচে দাঁড়ানো ছয়জন হঠাৎ করে উল্টো ঘুরে দৌড়ে পালালো, যেনো ভূত দেখেছে। আর জানালায় ঝুলে থাকা সেই রমণী, তার হরিণী চোখ তুলে তাকালো ইলহানের দিকে। মুহূর্তেই আতঙ্ক নেমে এলো সেই চোখে। ভীতু শিশুর মতো বোকা বোকা হাসার চেষ্টা করলো সে। ইলহান এক ঝটকায় তার হাত ধরে টেনে নিল রুমের ভেতরে, চোখের পলকে। যেনো এই নীরব, কুয়াশায় মোড়া রাতটি মাত্রই নিঃশ্বাস ফেলল।
নূরাইসা কাচুমাচু করে দাঁড়িয়ে আছে ইলহানের সামনে। ইলহানের দৃষ্টি যেন তীক্ষ্ণ আগুন, রাগে জ্বলজ্বল করছে, যেন মুহূর্তেই নূরাইসাকে ভস্ম করে দেবে। নূরাইসা মাথা নিচু করে, চোরাচোখে বারবার তাকাচ্ছে তার দিকে। এই শীতের রাতে সদ্য স্নান নেওয়া ইলহান উন্মুক্ত শরীরে দাঁড়িয়ে আছে, তার দেহে জমাট হাওয়া কোনো ছাপ ফেলতে পারছে না। বরং সেই ঠান্ডা বাতাসই যেন তাঁর কঠোরতার সামনে লজ্জায় মুখ ঢেকে নিচ্ছে।
অন্যদিকে নূরাইসা সম্পূর্ণ মোড়া গরম পোশাকে। তবু ঠান্ডা বাতাস তার শরীরে কাঁপুনি ধরাচ্ছে। কিন্তু সত্যিই কি ঠান্ডা তাকে কাঁপাচ্ছে? নাকি ইলহানের দহনময় দৃষ্টি... কে জানে। নীরবতার বুক চিরে ইলহানের কণ্ঠ বজ্রপাতের মতো নেমে এলো—
-"এখানে কি করছিস? দরজা দিয়ে আসতে পারলি না? যদি পড়ে যেতি তখন কি হতো?"
নূরাইসা ভয়ে কাঁপা কণ্ঠে বলল—
-"ডেয়ার... ছিল... তাই..."
ইলহান তাকে বাক্যটি শেষ করতেই দিলো না। চোখের পলকে নূরাইসার দুই বাহু দৃঢ়ভাবে চেপে ধরে নিজের দিকে টেনে নিল সে। দৃষ্টি আরও গভীর, কণ্ঠ আরও কঠিন। কণ্ঠ আগুনের মতো জ্বলে উঠল—
-"এত সাহস কবে থেকে হলো তোর? তিনজন ছেলের ঘাড় বেয়ে আমার ঘরের জানালা দিয়ে ঝুলে পড়লি? ট্রেইন হতে এসেছিস, কিছু বলিনি। প্রতিনিয়ত আঘাত পাচ্ছিস, কিছু বলিনি। ছেলেদের সাথে মাঠে লড়ছিস, কিছু বলিনি। কিন্তু তুই কোন সাহসে আজ অন্য পুরুষকে স্পর্শ করলি? যেখানে তোকে ওরা দেখতে পাচ্ছে, তোরা এক মাঠে একসাথে আছিস, ওটাই আমার রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছে। তারওপর তুই নিজ ইচ্ছায়, কোনো কারণ ছাড়াই, ওদের স্পর্শ করছিস... তোকে স্পর্শ করতে দিচ্ছিস, কোন সাহসে?"
শেষের কথাগুলো উচ্চস্বরে বলে উঠল সে পুরো ঘরের নীরবতা কেঁপে উঠল।ঠিক তেমনই ভয়ে কেঁপে উঠল নূরাইসা। ইলহানের হাতের মুঠো এত শক্ত, যে মনে হচ্ছে তার রাগ দেহ হয়ে নেমে এসেছে নূরাইসার ত্বকে।ব্যথায় চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে বেচারীর। হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে ভাঙা কণ্ঠে বলে উঠল—
-"লাগছে আমার!"
ইলহান প্রচণ্ড ঝড়ের মতো চেঁচিয়ে উঠল—
-"লাগুক! লাগার জন্যই ধরেছি!"
নূরাইসার কণ্ঠ কেঁপে উঠল দুঃখে, ব্যথায়, ভয়ে—
-"প্লিজ... ব্যথা পাচ্ছি... আর হবে না... সরি..."
ইলহান চোখ রাঙিয়ে আবার বলল—
-"এখন ব্যথা পাচ্ছিস? আর যদি পড়ে যেতিস তখন ব্যথা পেতি না? তখন কোথায় ছিল এই ভয়?"
কথা শেষ করেই সে হঠাৎ হাত ছেড়ে দিলো তার।আকস্মিক মুক্তিতে ভারসাম্য রাখতে না পেরে নূরাইসা টেবিলের দিকে ছিটকে গিয়ে পড়ে। দুই হাত দিয়ে টেবিল আঁকড়ে ধরে নিজেকে কষ্টে সোজা করল। মাথা এখনো নিচু। চোখ থেকে টুপটাপ করে পানি মেঝেতে পড়ছে, নীরব রাতের ভেতর সেই শব্দটুকুই যেন সবচেয়ে ভারী।
ইলহানের রাগে মাথা যেন ফেটে যাচ্ছে। দুইতলা পর্যন্ত উঠে গেছে এই মেয়ে, ভাবা যায়? যদি সত্যিই কিছু হয়ে যেতো? ইলহান কিভাবে নিজেকে ঠিক রাখতো? মাঠের সামান্য আঘাত পেলেও যেখানে তার কলিজা ছিঁড়ে যায়, সেখানে নূরাইসা এইরকম মৃ ত্যু ঝুঁকির কাজ করে ফেলেছে, এটা ভাবতেই তার বুকের ভেতর আবার আগুন জ্বলে উঠল। ঝুলন্ত অবস্থায় নূরাইসাকে দেখেই ইলহানের আত্মা যেন ধক করে উঠেছিল আতঙ্কে, এখনও সেই শক তার ভেতরে ছটফট করছে। সে উল্টো ঘুরে রাগ সামলানোর চেষ্টা করছে। পেছনে নূরাইসা নীরবে কেঁদে চলেছে, সেই সোবসোব শব্দও ইলহানের বুকের রাগ আরও ছড়িয়ে দিচ্ছে, আবার একইসাথে তীব্র ব্যথাও উঠাচ্ছে। এই হিমেল ঠান্ডার মধ্যেও ইলহানের উন্মুক্ত শরীর ভিজে গেছে ঘামে, রাগ, ভয়, অসহায়তা সব মিলিয়ে তার দম বন্ধ হয়ে আসছে।সে আর থাকতে না পেরে ঘুরে এগিয়ে এলো নূরাইসার দিকে। ধীরে, কিন্তু ভিতরে দম বন্ধ করা দহন নিয়ে।নূরাইসার মুখ দুই হাতের আঁজলায় ধরে আলতো করে উঁচু করল। তারপর নিজের কপাল ঠেকিয়ে দিল নূরাইসার কপালে, দুজনের নিঃশ্বাস মিশে গেল ঠান্ডা বাতাসে, উষ্ণ হয়ে। ইলহান নরম, কিন্তু কাঁপানো গোলায় তীব্র ভাবে বলে উঠল—
-"জানিস আমি কতটা ভয় পেয়েছিলাম তোকে ঐভাবে দেখে? যেখানে তোর ওপর আমার দেওয়া আঘাত ছাড়া একটা ফুলের আঘাতও আমি সহ্য করতে পারি না... সেখানে দিনের পর দিন তোকে আহত হতে দেখে আমার কেমন লেগেছে, বুঝিস তুই?"
তার কণ্ঠ আরও নিচে নেমে গেল, যেন ভাঙা স্বীকারোক্তি—
-"তারওপর আজ এত ভয়ংকর কাজ করেছিস। শুধু তাই না... অন্য পুরুষকে স্পর্শ করেছিস। যেখানে কেউ তোকে চোখ তুলে দেখলেই আমার সহ্য হয় না, সেখানে স্পর্শ!"
ইলহান চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলল—
-'তুই কেন বুঝিস না, আমায় নূরেজান... কেন আমায় এমন যন্ত্রণায় রাখিস..."
নূরাইসা হঠাৎ ফুপিয়ে উঠলো। ভাঙা, নিরেট কণ্ঠে কাঁপতে কাঁপতে বলল—
-"আমি সরি... আর কখনও এমন করবো না। আর যন্ত্রণা দেব না আপনাকে। প্লিজ আর রাগ করবেন না, আমার খুব ভয় লাগে। আমি তো আর সাত দিন পর চলেই যাবো... তারপর তো আর আঘাত পাবো না।প্লিজ যাওয়ার আগে রাগ করবেন না... আমার কষ্ট হয় তো..."
নূরাইসার কণ্ঠের অসহায় ভাঙন ইলহানের রাগ পুরো ভেঙে দিলো। সে মুহূর্তেই নূরাইসাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নিলো। নূরাইসার ঘাড়ে মুখ গুঁজে গভীর, অনুতপ্ত স্বরে বলল—
-"সরি জান! তুই তো জানিস আমি অল্পতেই রেগে যাই।আর রেগে গেলে মাথা কাজ করে না আমার। সরি বেবি... ভয় পাস না!"
ইলহানের বুকে বেশ কিছুক্ষণ নিঃশব্দে মিশে থাকার পর নূরাইসা ধীরে ধীরে শান্ত হলো। তারপর আলতো করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো। চোখের ভেজা পানিটা হাতের পিঠে মুছে ফিসফিস করে বলল—
-"এখন আমি যাই। সবাই চিন্তা করবে নয়তো..."
ইলহানের ভ্রু কুঁচকে গেল। কণ্ঠ গাঢ় হয়ে উঠল—
-"যাবি মানে? কোথাও যাবি না। তুই এখানেই থাকবি।"
নূরাইসার চোখ আতঙ্কে বড় হয়ে উঠল।
-"কি বলছেন? এখানে কিভাবে থাকবো? জানাজানি হলে খারাপ হবে... সবাই কি ভাববে?"
ইলহান সাথে সাথে প্রতিউত্তর করল—
-"কি ভাববে মানে? তুই আমার বউ, সবাই জানে।এখানে ভাবাভাবির কিছু নেই!"
নূরাইসা দু’পা পিছিয়ে গেল, দ্রুত মাথা নাড়ল—
-"না না, এটা হয় না। আমি রুমে যাচ্ছি!"
বলেই ঘুরে যেতে নিলে ইলহান বিদ্যুৎগতিতে তার হাত ধরে টেনে টেবিলের সাথে দাঁড় করিয়ে দিলো। তার দুই হাত নূরাইসার দুই পাশে টেবিলের গায়ে রাখা, যেন তাকে ঘিরে একটি অবিচ্ছেদ্য প্রাচীর তৈরি করে।ইলহান একটু ঝুঁকে নেমে এসে গভীর, নেশাধরা কণ্ঠে বলল—
-"কোথাও যাবি না তুই। এত বড় ভুল করেছিস, শাস্তি পাবি না? তোকে এখানেই থাকতে হবে... আমার সাথে।"
টেবিলের দিকে হেলে থাকা নূরাইসার গলা শুকিয়ে গেল। কাঁপা সুরে বলল—
-"কি শাস্তি?"
ইলহানের ঠোঁটে ধীর, আত্মবিশ্বাসী, দুষ্টুমি মাখা হাসি ফুটে উঠল—
-"এই যে... আজ আমার সাথে থাকবি।"
নূরাইসা তড়াক করে চোখ বড় বড় করে তাকালো তার দিকে। ইলহানের চোখে খেলা করছে নিশ্চিত, নিয়ন্ত্রণী এক ঝিলিক। নূরাইসা এক ঢোক গিললো, আজ নিঃসন্দেহ সে এই রুম ছাড়তে পারবে না । আজ তাকে এই রুমেই থাকতে হবে। ইলহান ছাড়বে না তাকে বেশ বুঝতে পারছে সে। নিচের দিকে চোখ নামিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল—
-"ঠিক আছে... তবে জামাকাপড় পরে আসুন। এইভাবে উন্মুক্ত শরীরে আমার এত কাছে দাঁড়িয়ে আছেন... অস্বস্তি হচ্ছে আমার।"
ইলহান আরও ঘনিষ্ঠ হলো। তার কণ্ঠে মাদকীয় টান—
-"অস্বস্তি হচ্ছে... নাকি মুগ্ধ হচ্ছিস?"
নূরাইসা সাথে সাথে প্রতিবাদ করল—
-"মুগ্ধ হবো কেনো? এই শীতের মধ্যে আপনি জামাকাপড় পরেননি কেনো? আমার সামনে শুধু একটি তোয়ালে পরে আছেন... লজ্জা করছে না আপনার?"
ইলহান হাসল চোখ সরু করে বলল—
-"তোর লজ্জা করছে?"
-"লজ্জা করছে, অস্বস্তিও হচ্ছে। যান না... জামাকাপড় পরুন গিয়ে!"
ইলহান মৃদু হেসে আরও ঝুঁকে এলো নূরাইসার কাছে।নূরাইসার পেছানোর কোনো পথ নেই, টেবিলের ধার তাকে টেনে রেখেছে। ইলহান তার কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে নিঃশ্বাস ফেলে ফিসফিসে বলল—
-"এর চেয়েও বেশি উন্মুক্ত আমায় দেখেছিস তুই।এর চেয়েও গভীরভাবে আমায় স্পর্শ করেছিস তুই। এর চেয়েও বেশি গভীরভাবে আমায় অনুভব করেছিস তুই।"
এক মুহূর্তেই নূরাইসার কান রক্তিম হয়ে উঠল, লজ্জার উত্তাপে পুরো মুখমণ্ডল রক্তাভ লালিমা ছড়িয়ে গেল।চোখ শক্ত করে বন্ধ করে ফেলেছে সে, অসহায়, বিব্রত, তবু অদ্ভুতভাবে মুগ্ধও। তিরতির করে কাঁপছে তার পাতলা গোলাপি অধর, অস্বীকারহীন এক প্রত্যুত্তরের মতো। ইলহান ধীরে তার কান থেকে মুখ সরিয়ে নিল।চোখ রাখল সেই লজ্জায় রাঙা মুখে, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে দামী দৃশ্যটি সে দেখছে। ফিসফিসে, গভীর, ডুবে যাওয়া স্বরে বলল—
-"সূর্য যখন চন্দ্রকে সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করে... পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ যখন হয়... তখন চাঁদও এই রং ধারণ করে।এক অদ্ভুত, অপরূপ, নিশ্বাসবন্ধ করা সৌন্দর্য ছড়ায় পৃথিবীতে। সেই রূপ দেখার জন্য পৃথিবীর মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে, কিন্তু সবাই সে সৌভাগ্য পায় না।
ঠিক তেমনই... ইলহান নামক সূর্য যখন তোকে শোষণ করে, পুরোপুরি নিজের করে, যখন নূরাইসা নামক চন্দ্রকে সম্পূর্ণ গ্রহণ করে, তখন সেই সূর্যের ছোঁয়ায় নূরাইসা নামক চাঁদও সেই অলৌকিক রূপ ধারণ করে।আর সেই রূপ দেখার সৌভাগ্য শুধু ইলহান নামক সূর্যেরই হয়।
এই অধিকারও শুধু তার, তার ব্যক্তিগত চাঁদের চন্দ্রগ্রহণের রূপ দেখার একমাত্র স্বত্বাধিকারী সে-ই। এই লজ্জার লাল রং... এই কাঁপা শ্বাস... এই গরম হয়ে ওঠা গাল... এগুলো শুধুই আমার জন্য, ব্লাডমুন।
তোর এই রূপ... আমায় নিজের মধ্যে থাকতে দেয় না, ব্লাডমুন। তোকে এইভাবে সামনে পেলে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা কতটা মুশকিল, তুই কি বুঝিস ব্লাডমুন?"
নূরাইসার নিঃশ্বাস আটকে আসছে। তার শরীর যেন ভয়ে-লজ্জায় নিজের মধ্যে গুটিয়ে আসছিল, অথচ ইলহানের একটুখানি ছোঁয়াতেই আবার খুলে যাচ্ছে, কাঁপছে, ভেঙে পড়ছে তার নিয়ন্ত্রণ। নূরাইসা লজ্জায় আরও কুঁকড়ে গেল। চোখ খোলার সাহস হলো না তার, কথা বলার তো প্রশ্নই আসে না। বুকের ভেতর ধুকপুকানি মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গেছে, এমন জোরে যে মনে হচ্ছিল বুকফুঁড়ে বেরিয়ে আসবে। ইলহানও সেই শব্দ শুনতে পাচ্ছে, তার নেশা ধরা কন্ঠে বলা প্রতিটি শব্দ নূরাইসার নারীসত্তায় কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছিল। হাত-পা অবশ হয়ে আসছে তার, বন্ধ চোখের পাপড়িগুলো তীব্রভাবে কাঁপছে, গোলাপের পাপড়ির নেয় পাতলা অধর তিরতির করে কাঁপছে, যেন লজ্জায় ডুবে থাকা ফুল হঠাৎ ঝড়ের বাতাসে দুলছে।
ইলহান তার বউয়ের অবস্থা দেখে মৃদু হাসলো। এরপর আচমকা তাকে পাঁজা কলে তুলে নিলো। নূরাইসা হকচকিয়ে উঠলো, দুই হাতে ইলহানের গলদেশ শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরলো। বন্ধ চোখ অনিচ্ছায় খুলে গেল।ইলহান সেই চোখের দিকে তাকিয়ে হাসলো, এমন হাসি, যা নূরাইসার শিরায় শিরায় আগুন ধরিয়ে দেয়।ধীর পায়ে বিছানার দিকে নিয়ে গিয়ে তাকে আস্তে শুইয়ে দিলো। নিজে উঠে গিয়ে একটি ট্রাউজার পরে ফিরে এলো। তারপর নূরাইসাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে তার বক্ষপিঞ্জরে মুখ ডুবিয়ে শুয়ে পড়ল।
সিঙ্গেল বেড, যেখানে একজনের ঘুমাতেও কষ্ট হয়, সেখানে বলিষ্ঠ দেহের এক পুরুষ আর শীর্ণদেহী এক রমণী পাশাপাশি শুয়ে আছে। নূরাইসার শরীর স্তব্ধ, লজ্জায় স্থির, শ্বাসের শব্দও মেপে আসছে। ইলহান তার বক্ষপিঞ্জরে মুখ ডুবিয়েই, গভীর কণ্ঠে বলল—
-"রিল্যাক্স জান। আজ অনেক দিন পর তোর বুকে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছি। ডিস্টার্ব করিস না, বডি রিল্যাক্স কর। নইলে আমি কিন্তু আর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবো না।"
এই এক বাক্যই যথেষ্ট ছিল নূরাইসার জন্য। অল্প হাসি আর একটি তীব্র কণ্ঠমিশ্র অনুভূতি তাকে পুরোপুরি বন্দি করে দিল। দুই হাত নিজে থেকেই বাড়িয়ে ইলহানের উন্মুক্ত পিঠের ওপর রাখলো। ইলহান মৃদু হাসলো। তার হাসি, ভঙ্গি, ঘ্রাণ, সবই নূরাইসার হৃদয় স্পর্শ করল। টুপ করে চুমু খেলো সে, নরম, গভীর, যেন নূরাইসার বক্ষপিঞ্জরকে নিজের আবেশে ডুবিয়ে দিচ্ছে। এরপর আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, এমনভাবে যেন দুটি আত্মা এক হয়ে গেল। ঘুমের রাজ্যে, শীতের হিমেল বাতাসের মধ্যে, ঘরের নিঃশব্দতায়, দুজনই নিঃসন্দেহে হারিয়ে গেলো এক অন্য জগতে।
নূরাইসার হৃদয় স্পন্দিত, শরীর শান্ত, আর ইলহানের উষ্ণতা পুরো শরীর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। বুকের ওপর মাথা রাখার এই মুহূর্ত, উভয়ের নিঃশ্বাস, স্পর্শ, এবং নীরব আবেশ, সব মিলিয়ে পুরো দৃশ্যকে করে তুলেছে স্বপ্নের মতো, নিঃশব্দ, কিন্তু অদম্য। প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি নরম স্পর্শ, প্রতিটি দমবন্ধ করা মুহূর্ত, শীতল রাতের মধ্যেও উষ্ণতার ভেতর বেঁচে থাকা প্রেমের তীব্রতা।
.
সকাল সকাল দেওয়ান বাড়িতে হুলুস্থুল পড়ে গেছে। রান্নাঘরে হৈচৈ, বারান্দা জুড়ে ছুটোছুটি, সবাই ব্যস্ত নাস্তা সেরে ফেলতে। আজ নুহাকে বেরোতে হবে বান্দরবনের পথে। তার প্রস্তুতি ঘিরে পুরো বাড়িতেই এক অদ্ভুত উত্তেজনা ছড়িয়ে রয়েছে। সাত দিনের ট্যুর, শুনতে যতই স্বাভাবিক লাগুক, বাড়ির সবার মনে তবু এক টুকরো সন্দেহের ছায়া চাপা পড়ে আছে। কিন্তু সেই সন্দেহকে ধরে বাড়তি শব্দ তোলার মতো কেউ নেই। কলেজ জীবন প্রায় শেষের দিকে, প্রিয় বন্ধু-বান্ধব, প্রিয় শিক্ষকদের সঙ্গে স্মৃতি গড়ে তোলার এটিই শেষ উপলক্ষ, এই ভাবনাটাই যেন সব উত্তরকে গিলে ফেলেছে। তাই কেউ বাড়তি পাত্তা দেয়নি।
নাস্তা শেষ করে সকলে মিলে নুহাকে নিয়ে বেরিয়ে এলো কলেজের উদ্দেশে। ভোর ৬টার বাস, সেই সময়ের আগেই সবাই ক্যাম্পাসে পৌঁছে গেছে। কুয়াশার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে শিক্ষকদের দল, নাজনীন বেগম, তানিয়া বেগম, ইলিনা বেগম, তানভীর, আফরিন, সবার মুখে ভ্রমণের উত্তেজনা আর দায়িত্ববোধের মিশ্র ছাপ।
ইকবাল দেওয়ান আর নাহিদ দেওয়ানকে অবশ্য তাড়াতাড়ি অফিসে চলে যেতে হয়েছে, জরুরি কাজ, তারওপরে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং নাকি অপেক্ষা করছে তাদের জন্য। তাই মেয়েকে কেবল দূর থেকে বিদায়ের হাসি দিয়েই যেতে হয়েছে। এদিকে গ্রাউন্ডে এখনো অনেক স্টুডেন্ট আসার বাকি। বাসের সামনে এক ধরনের গুঞ্জন, হাসি, ব্যস্ততা, ট্রলির শব্দ, আর দূরের হর্নে ভরা এক ভোরবেলার প্রাণচাঞ্চল্য। এই বিশৃঙ্খলার মাঝেই নুহা হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ালো। নাজনীন বেগম, ইলিনা বেগম আর তানিয়া বেগমের দিকে তাকিয়ে, ভোরের ম্লান আলোয় তার চোখে যেন এক অচেনা দীপ্তি জমে উঠল। সে বলল—
-"তোমরা চলে যাও। ভাইয়া আর আফরিন আপু তো আছে। বাড়িতে দাদু-দাদী একা!"
তার কথা শেষ হতেই নাজনীন বেগমের মুখে ছায়া নামল। কুয়াশায় ঢাকা ভোরের আলোয় তাঁর চোখ দুটো যেন আরও চিন্তিত, আরও অস্থির লাগল। তিনি থমকে দাঁড়িয়ে বললেন—
-"না গেলে হয় না? আমার মনটা কেমন কু ডাকছে... চল বাড়ি ফিরে যাই!"
ইলিনা বেগমও মাথা নাড়লেন, যেন তাঁর বুকেও একই অজানা আশঙ্কা পুড়ে-পুড়ে উঠছে।
-"হ্যাঁ, চল যাই। তিনটে ছেলে–মেয়ে বাড়িতে নেই... আমারও কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে। মনে হচ্ছে কিছু একটা হবে!"
চারপাশের গুঞ্জন থেমে নেই, স্টুডেন্টরা আসছে, লাগেজ টেনে নিয়ে যাচ্ছে, বাসের ইঞ্জিন গরম হচ্ছে। তবুও ওই তিনজনের কথাগুলো যেন আলাদা একটা শীতলতা নিয়ে বাতাসে ঝুলে থাকল। নুহা এগিয়ে এলো। ভোরের হালকা আলোয় তার মুখে দৃঢ়তার রেখা—
-"তোমরা শুধু-শুধু চিন্তা করছো। কিছুই হবে না।আমিও যেতে চাইনি... কিন্তু কিছু করার নেই, মা। এত দূর এসেছি, এখন ফিরে যাব?"
তানিয়া বেগম দু’হাত তুলে অন্যদের ধৈর্য ধরতে বললেন। তার কণ্ঠে সান্ত্বনা, আবার চাপা দুশ্চিন্তার ছাপও লুকোনো নয়—
-"সমস্যা নেই, যাচ্ছে যাক। তোমরা শুধু-শুধু চিন্তা করছো... কিছুই হবে না। আল্লাহ ভরসা!"
শেষমেশ অদ্ভুত এক অজ্ঞতা আর অস্বস্তি নিয়ে তিনজনই ফিরে গেলেন দেওয়ান বাড়ির পথে। যেন তাদের প্রতিটা পা-ফেলা অনিশ্চয়তার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। ক্যাম্পাসে এখন রয়ে গেল শুধু তানভীর আর আফরিন। তারা দু’জন সামনের বাসটার দিকে তাকিয়ে আছে, নুহাদের বাস ছাড়লেই তারা ফিরে যাবে।
এই সময় বিহানের ভাই রিজভী এগিয়ে এলো। আফরিন আর তানভীর তাকে বারবার বলে দিল, নুহাকে একা না রাখতে, নজর রাখতে, কাছে থাকতে।রিজভী প্রথমে হাসল, তারপর নিঃশব্দে সেই দায়িত্ব মাথায় নিল, একটা হালকা মাথা নাড়ায় বুঝিয়ে দিল, "চিন্তা কোরো না।"
অবশেষে ভোর ৬টার দিকে বাসের ইঞ্জিন গর্জে উঠল। চারদিকে কুয়াশার আবরণে আলো ছড়িয়ে পড়ল, আর বাস ধীরে ধীরে ছেড়ে দিল স্ট্যান্ড। চাকা যখন ঘুরে দূরত্ব বাড়াতে শুরু করল, তখন তানভীর আর আফরিনও নীরবে দেওয়ান বাড়ির দিকে রওনা দিল, পেছনে রেখে গেল এক অদ্ভুত ভারী সকাল। সামনে কি অপেক্ষা করছে, সেটা কেউ জানে না।