সূর্যস্নাত ভালোবাসা

পর্ব - ৩৫

🟢

নুহাদের বাসটি অবশেষে বান্দরবনের পাথুরে আঁকাবাঁকা রাস্তায় অনেকটা দুলে-দুলে এসে থামল। পাহাড়ি নীরবতার ভেতর সেই থামার শব্দটুকু যেন অতিরিক্ত স্পষ্ট শোনাল, যেন একটি দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি মিলিয়ে যাওয়ার নিঃশ্বাস। ইকোসেন্স রিসোর্টে তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে, আর সেই খবর জানার মুহূর্তেই সবার চোখে একরাশ উত্তেজনার ঝিলিক নেমে এলো। বাস থেকে নামতেই পাহাড়ি হাওয়ার শীতল স্পর্শ গায়ে এসে লাগল নুহার, মেখে দিলো কুয়াশার নরম আদর। দূরে পাহাড়চূড়োর পেছনে দুপুরের আলো মিশে আছে শিশিরে ভেজা ছায়ার সাথে। চারদিকে যেন এক ধরনের মধুর নীরবতা, তবু তার মধ্যে লুকিয়ে আছে উৎসবের অগোচর ব্যস্ততা।

সেখান থেকেই কয়েকটি জিপ ঠিক করা হলো। প্রায় ত্রিশজন স্টুডেন্ট আর দু’জন শিক্ষক, সবাই মিলে ছোট ছোট দলে ভাগ হলো। পুরো কলেজকে আনা হয়নি এবার, বলা হয়েছে ফেব্রুয়ারিতে বাকিরা আসবে। তাই এই ব্যাচটা যেন এক ধরনের বিশেষ দায়িত্ব আর গোপন আনন্দ নিজের ভেতর ধারণ করে রেখেছে।দুপুরে বাস এসে থেমেছে। দ্রুত হালকা হাত-মুখ ধুয়ে সবাই তিনটার দিকে লাঞ্চ সারল। তারপর ক্লান্তি আর উত্তেজনার জটিল মিশ্রণ নিয়ে তারা জিপে চেপে রওনা দিল রিসোর্টের উদ্দেশে।

জিপের চাকা যখন কাঁপতে কাঁপতে পাহাড়ি পথে এগোতে লাগল, চারপাশের বনানী, শ্যাওলা-ঢাকা পাথর, আর কুয়াশার পাতলা শাল বনের মাঝে ছড়ানো আলো-ছায়ার খেলা দেখে মনে হচ্ছিল, এই যাত্রা যেন শুধু রিসোর্টে পৌঁছানোর নয়, বরং অজানা কোনো গল্পের প্রথম পাতায় প্রবেশ করা। প্রত্যেকের মুখে বাতাসের ঝাপটা, চোখে আগ্রহের দীপ্তি, আর বান্দরবনের সেই চিরচেনা অথচ নতুন লাগা নীরবতা।

জানুয়ারির শেষ প্রহরে শীত যেন হঠাৎ করেই নিজের দাপট বাড়িয়ে দিয়েছে। ভরদুপুরেও সূর্যের দেখা মেলে না তেমন, আলোটা আছে, কিন্তু উষ্ণতার ছোঁয়া নেই। খোলা জিপে চেপে পাহাড়ি পথ পেরোতে গিয়ে সেই ঠান্ডা বাতাস গায়ে এসে এমনভাবে লাগে, যেন বরফ-ঢাকা কোনো নদীর ধার দিয়ে ছুটছে তারা। শীতের কামড়ে সবার গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠছে, আঙুলে-কানে হালকা ঝিনঝিনি ধরছে, তবুও কারও মুখে বিরক্তির মাত্রা নেই বিন্দুমাত্র। বরং সবাই উপভোগ করছে সেই হিমেল ছোঁয়া, যেন এই শীতই তাদের যাত্রার আসল রোমাঞ্চ।

সরু, পিচঢালা আঁকাবাঁকা উঁচুনিচু পাহাড়ি রাস্তা। দুই পাশে পাহাড়ের ঢালে সারি সারি গাছ, কোনোটা ঘন, কোনোটা রোদ-কুয়াশার মিশ্র আলোয় যেন আধা-স্বপ্নের মতো ধূসর। কোথাও পাহাড়ের গা ধরে নেমে এসেছে শিশিরে ভেজা সবুজ, আবার কোথাও কুয়াশার তুলোর মতো আস্তর। প্রকৃতির এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য যেন ক্লান্তিকে বিলীন করে দেয়।

প্রায় চল্লিশ মিনিটের সেই রোমাঞ্চভরা যাত্রা শেষে অবশেষে তারা রিসোর্টের গেটে এসে থামল। ইকোসেন্স রিসোর্টের সেই নিস্তব্ধ পরিবেশ, কাঠ-পাথরের নির্মাণ আর চারপাশের ঘেরা পাহাড়ি নীরবতা দেখে মনে হলো, যেন তারা ভ্রমণের মধ্যেই এক টুকরো নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে গেছে। শিক্ষকরা দ্রুত সবার নাম ধরে ডাক দিলেন, বাগ্‌ভরা নির্দেশ দিয়ে দিলেন—"যার যার বরাদ্দকৃত কক্ষে চলে যাও।" আজ আর কোথাও বেরোনো হবে না। দিনের ক্লান্ত পথচলা শেষ। সবাইকে বলা হলো, ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করতে, তারপর বিশ্রাম নিতে। রাতের ভিন্ন আয়োজন আছে, রিসোর্টের উঠোনে পোড়াবে bonfire। সেই আগুনের চারপাশে বসে আজকের রাতটাই হবে তাদের প্রথম রাতের স্মরণীয় দৃশ্য, ঠান্ডা, পাহাড়ের নীরবতা আর আগুনের উষ্ণতায় মোড়া।

সন্ধ্যা সাতটা। কেউ একটু ঘুমিয়ে ক্লান্তি ঝরাচ্ছিল, কেউ বা রিসোর্টের চারপাশ ঘুরে দেখছিল, পাহাড়ি হাওয়ার স্পর্শে সবার মনই যেন অন্যরকম হালকা।কিন্তু এখন সবাই তৈরি। ধীরে ধীরে তারা রিসোর্টের সেই bonfire-এর স্থানে জমা হতে লাগল। ঠান্ডা বাতাসের মাঝে আগুনের লাল আভা যেন চারপাশকে নতুন করে জীবন্ত করে তুলেছে। চারদিকে গুঞ্জরিত হাসাহাসি, নানা রকম খাবারের সুগন্ধ, আর দূরে থেকে ভেসে আসা পাহাড়ি নিশির ডাক, সব মিলিয়ে পরিবেশটা যেন জাদুকরী।

কোথাও কেউ খাচ্ছে, কোথাও কেউ গিটারের তার টানছে, আবার কোথাও ছোট ছোট দলে বসে গল্প জুড়ছে, সবার আনন্দ যেন আলাদা আলাদা আলো হয়ে আগুনের চারপাশে ভেসে বেড়াচ্ছে। সেই ভিড়ের একটু পাশে, তুলনামূলক নীরবতার একটি কোণে বসেছে রিজভী ও নুহা। রিজভীর হাতে গিটার। আজ সে গান গাইবে। হঠাৎই রিজভী নুহার দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বলে উঠল—

-"ভাইয়া এখানে আছে জানো?"

নুহা যেন হঠাৎ চমকে উঠল। চারদিকে তাকিয়ে দ্রুত বলল—

-"সত্যি? তুমি কিভাবে জানলে?"

রিজভী গিটারটাকে হাতের তালুতে আলতো চাপ দিয়ে উত্তর দিল—

-"ভাইয়া ফোন করেছিল অনেকদিন আগে। তখন বলেছিল এখানে আসবে, কিছু তদন্ত আছে তার।"

-"আমরা যে এখানে এসেছি বা আসব... এটা জানে তোমার ভাই?"

-"না। আমাদের এখানে আসার ঘোষণা করার আগেই তো ভাইয়া ফোন করেছিল। এরপর আর ফোন করেনি।"

নুহার গলায় হালকা হতাশা—

-"ওহ..."

-"ইলহান ভাই জানে আমাদের এখানে আসার কথা?জানলে তো নিশ্চয় ভাইয়াকে বলত।"

-"না ভাইয়াও জানে না। বউ তো নেই বাড়িতে, তার কাছেই আছে এখন। তাই আর বাড়িতে তেমন ফোন করে না।"

রিজভী হেসে উঠল—

-"আরে না না, তেমন কিছু না! ওনারা বেস্ত থাকে তাই তো ফোন করা বারণ।"

-"হুম..."

রিজভী উঠে দাঁড়াল।

-"আচ্ছা, তুমি বসো। কোথাও যাবে না। এখন আমার গানের পালা। গান শেষ করেই চলে আসব... এখানেই থাকবে কিন্তু!"

-"ঠিক আছে!"

রিজভী আগুনের সামনে রাখা একটি চেয়ার টেনে বসল। চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল একটু একটু করে।গিটার হাতে নিলে আগুনের আলো তার মুখে পড়ে এক ধরনের নরম উষ্ণতা তৈরি করল। তারপরই সে গাইল—

-" সারা রাত ভোর

চোখের ভেতর

স্বপ্নে তোমার আনাগোনা

নেমে আসে ভোর

থাকে তবু ঘোর

হাওয়ায় হাওয়ায় জানা শোনা

তুমি দেখা দিলে তাই

মনে জাগে প্রেম প্রেম কল্পনা

আমি তোমার হতে চাই

এটা মিথ্যে কোন গল্প না

আমি তোমার হতে চাই

এটা মিথ্যে কোন গল্প না"

গানের সুর আগুনের আলোর মতোই ধীরে ধীরে চারপাশে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। নুহা মনোযোগ দিয়ে শুনলেও তার চোখ জুড়ে ভেসে উঠছে অন্য এক মুখ, বিহান। আগুনের নরম ছোট ছোট ঝলকের আলোতে তার ভাবনায় যেন আরও প্রাণ পেল বিহানের সেই রহস্যময় উপস্থিতি। গান চলতে চলতেই নুহার ঠোঁট নড়ে উঠল, যেন নিজেকেই শোনাচ্ছে—

-"আপনাকে দেখি না কতগুলো দিন হয়ে গেলো, বিহান ভাই... এসে যখন গেছি, আপনাকে খুঁজে বের করব। তৃষ্ণার্থ চোখের তৃষ্ণা মেটাবো!"

গান ঠিক তখনই চূড়ান্ত পঙ্ক্তিতে গেয়ে ওঠে— "আমি তোমার হতে চাই... এটা মিথ্যে কোন গল্প না..."

নুহার বুকটা ধুক্ ধুক্ করে ওঠে। হাওয়ায় হাওয়ায় যেন বিহানের নামই ঘুরে বেড়ায়।

.

ক্যান্টনমেন্টের প্রশস্ত খোলা মাঠে ইলহান ও নূরাইসা ছুটে চলেছে। চারদিক জুড়ে গভীর নিস্তব্ধতা।সারাদিনের কঠোর ট্রেনিংয়ে ক্লান্ত সৈনিকরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, কিন্তু এই প্রেমিক যুগলের চোখে যেন ঘুম নেই। নূরাইসা ক্লান্ত, বড্ড ক্লান্ত। তবুও ইলহান তাকে যেতে দেয়নি। সারাদিন সে শুধু দূর থেকে তাকিয়েছে, এখন কাছে পেয়েছে, এত সহজে ছেড়ে দেবে নাকি।

দুজনের মাঝে ধীরে ধীরে কথা হচ্ছিল। নূরাইসা মাথা ঠেকিয়ে বসেছিল ইলহানের ঘাড়ে। হঠাৎ ইলহান কি যেন বলতেই নূরাইসা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে তাকে তাড়া করে দৌড়াতে শুরু করল। এই নিস্তব্ধ রজনীতে ইলহানের প্রাণখোলা হাসি আর নূরাইসার হাঁপাতে হাঁপাতে তাকে থামতে বলা ছাড়া আর কোনো শব্দ যেনো নেই। এমনকি বাহিরের ঝিঁঝিঁপোকাগুলোও যেন তাদের এই খুনশুটি মুহূর্ত দেখতেই নিঃশব্দ হয়ে আছে।

ক্যান্টনমেন্টের বিল্ডিংয়ের তিনতলার অন্ধকার করিডোরে দাঁড়িয়ে একজোড়া বাদামি চোখে দপদপ করছে দহন। আর্সলান আগুনদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মাঠে ছুটন্ত দুই মানব-মানবীর দিকে। রাগে তার গলার রগ ফুলে উঠেছে, দুই হাত শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ করার ফলে হাতে রগগুলোও ফুলে উঠেছে, যেনো চামড়া ভেদ করে বেরিয়ে আসবে এখুনি।

নূরাইসা দৌড়াতে দৌড়াতে শেষে হাঁপিয়ে গেল। হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে ঝুঁকে শ্বাস নিচ্ছে দ্রুত, গরম, কাঁপা, ক্লান্ত। ইলহান পেছনে তাকিয়ে বউকে এমন অবস্থায় দেখে থমকে দাঁড়াল। চিন্তিত মুখে দ্রুত এগিয়ে এসে উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে বলল—

-"ঠিক আছিস, নূরেজান?"

নূরাইসা তড়াক করে মাথা তুলে সোজা হয়ে দাঁড়াল।চোখে চকচকে দুষ্টুমি। মুহূর্তেই ইলহানকে খপ করে ধরে ফেলল, তারপর উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে ঘোষণা—

-"ধরে ফেলেছি! এবার পালবেন কোথায়?"

ইলহান বুঝল, বউ তাকে কৌশলে একেবারে বোকা বানিয়ে দিয়েছে। সে হেসে ফেলে, তারপর তৎক্ষণাৎ নূরাইসাকে কলে তুলে নিল। শক্ত বাহুবন্ধনে ধরে বলতে লাগল—

-"আমার শেষ গন্তব্য তুই। তোর কাছেই আমি বার বার ধরা পড়তে চাই। তোর থেকে পালানোর বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আমার নেই। যদি চাস তোর হৃদয়ের সিন্দুকে আমাকে বন্দী করে রাখতে পারিস, আমি সেই শাস্তি সানন্দে গ্রহণ করব!"

নূরাইসার শক্ত করে জড়িয়ে ধরল ইলহানের গলা। টুপ করে তার গালে চুমু খেয়ে মুখ লুকিয়ে ফেলল সেই পরিচিত নিরাপদ আশ্রয়ে। ইলহান হো হো করে হেসে উঠল। বউকে কোলে নিয়েই তাকে বুকে চেপে ধরে গোলগোল ঘুরে চেঁচিয়ে বলতে লাগল—

-"ভালোবাসি তোকে, আমার ব্লাডমুন!"

এই দৃশ্য দেখা মাত্র আর্সলানের ভেতরে ঝড় বয়ে গেল।তার বুকের গভীরে জমে থাকা কালো আগুন মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ল সারা শরীরে। রাগের বশে সে সজোরে দেয়ালে এক আঘাত হানল, করিডোর কেঁপে উঠল সেই শব্দে। ইলহানের চোখের সেই উচ্ছ্বাস, মুখে লেগে থাকা হাসি, কিছুই তার সহ্য হলো না। নূরাইসাকে পাওয়ার বাসনার থেকেও ইলহানের থেকে তাকে ছিনিয়ে নেওয়ার জেদটাই যেন আর্সলানের ভিতরের দানবটাকে জাগিয়ে দিচ্ছে।। যেকোনো মূল্যে... যেভাবেই হোক... সে ইলহানকে হারাতে চায়। তাকে ভাঙা দেখতে চায়। তার চোখে পরাজয়ের নীরব কান্না দেখতে চায়।

চোখ-মুখ শক্ত করে, টানটান চোয়ালে দগদগে আগুন নিয়ে আর্সলান করিডোর থেকে এগিয়ে যেতে লাগল।অন্ধকারের ভেতর তার পায়ের শব্দ যেন প্রতিশোধের ছন্দ। হাঁটতে হাঁটতে নিজের মনে গাঢ় স্বরে ফিসফিস করে বলল—

-"ভালোবাসা আমার অভ্যাস নয়... অধিকার। আর যেদিকে আমার নজর পড়ে, সেটাকে পৃথিবীর কেউ ছুঁতে পারে না। নূরাইসা আমার হবে... আর তুই, ইলহান, আমার জেতার আনন্দটা নিজ হাতে উপহার দিবি।"

আরেক পা বাড়িয়ে থেমে গেল সে, তার চোখের ভেতর সাপের মতো সরু, ধারালো হাসি ফুটে উঠল—

-"যে আগুনে আমি পুড়ি... তুই সেই আগুনে বাঁচবি না।আমি দখল করি... নষ্ট করি... আর শেষে ভস্ম করে দেই।"

অন্ধকার তাকে গিলে নিল। মাঠে তখনো ইলহান-নূরাইসার হাসির প্রতিধ্বনি, আর করিডোরে রয়ে গেল

এক দহনে মোড়া প্রতিজ্ঞার ছায়া।

.

দেওয়ান বাড়িতে আজ দু’টো ফুলের তোরা এসেছে আফরিনের নামে। রাতের খাবার খেয়ে সে যে রুমে ঢুকেছিল, এখনও সেই মেঝেতেই বসে আছে ফুল দু’টোকে নিয়ে। একটি ক্যামেলিয়া, রক্তিম পাপড়িতে যেন অভিমান লুকিয়ে থাকা কোনো নীরব স্বীকারোক্তি। অন্যটি, একটি গাছ Lily of the Valley, ঝর্ণার জলের মতো ঝুলে থাকা সাদা ঘণ্টার মতো ফুল, যার প্রতিটি পাপড়ি আলো ছুঁয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে যেন নরম শিহরণ তোলে। এই দু’ফুলের নিজস্ব ভিন্ন ভিন্ন অর্থ আছে, আর সে অর্থই আজ তার রুমে রহস্য, কোমলতা আর অপরিচিত উত্তাপ তৈরি করে রেখেছে।

রাতের তৃতীয় প্রহর। বাইরে বাতাসের হালকা শব্দ, দূরে কোনো কুকুরের ডাক, সব মিলিয়ে পুরো বাড়িটাই যেন অদৃশ্য উত্তেজনায় নিঃশব্দ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর আফরিন... সে ফুল দু’টির সামনে বসে আছে এমনভাবে, যেন কেউ তার নাম ধরে ডেকেছে। ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে সময়ের হিসেব ভুলে গেছে। অবশেষে হাত বাড়িয়ে ফুলের সাথে থাকা প্রথম চিরকুটটি তুলে নিল, Lily of the Valley–র তোড়াতে গুঁজে রাখা ছোট্ট ভাঁজ করা কাগজ। চিরকুট খুলেই চোখে পড়ল—

-"তোমার জীবনে যে নীরব সৌন্দর্য আছে, তা যেন অদ্ভুত এক জাদুর মতো আমাকে টেনে আনে বারবার। Lily of the Valley যেমন সরল, তেমনই দুর্লভ তার গভীরতা... এবং বিষাক্ত। সাবধানে থাকো, আফরিন... কারণ তোমার চারপাশের প্রতিটি নীরবতা আমি শব্দ হয়ে অনুভব করি। তোমার প্রতিটি পদক্ষেপে, প্রতিটি শ্বাসে, আমি আছি, অদৃশ্য উপস্থিতির মতো, শুধু তোমার জন্যই। তুমি বুঝতে না পারলেও, তোমার দিকে তাকানোই আমার নিঃশব্দ ভালোবাসার একমাত্র স্বীকারোক্তি।"

—রায়হান তন্ময়

চিরকুটে অদ্ভুত এক ছায়ার ইঙ্গিত, কোনো ভয় নয়, কিন্তু একটি অচেনা বিপদ অনুভব করল আফরিন।যেন ভালোবাসার ভিতরে লুকিয়ে রাখা কোনো শ্বাসরুদ্ধ করা রহস্য। আফরিনের ঠোঁটে কাঁপুনি লাগে, ফুলটি বিষাক্ত? এই ফুল দেওয়ার মানে কি?

ভাবনা এক পাশে রেখে সে ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে দ্বিতীয় ফুলটি তুলে নিল, ক্যামেলিয়া। ফুলটি লাল নয়, যেন আগুনের গভীর শান্ত রূপ। পাপড়িগুলো এমন মসৃণ, যেন প্রেমের নিঃশব্দ প্রতিজ্ঞা নিজ হাতে ছুঁয়ে দিয়েছে। এই তোড়ায় থাকা চিরকুটটি খুলল সে—

-"Hello my love, my carino, my camellia . তোমার জন্য বিশেষ উপহার, ক্যামেলিয়া। এর অর্থ জানো? আচ্ছা আমি তোমায় বলছি শোনো... ও হ্যাঁ এর সাথে আমার অনুভূতিও মিশে রয়েছে দুষ্টুরাণী। বুঝবে তুমি? না বুঝলেও সমস্যা নেই আমি বুঝিয়ে দিচ্ছি—

ক্যামেলিয়া, স্বপ্ন আর ভেলভেটের স্রোত, নিখাদ ভক্তির পাপড়ি। শীতের কোমল শিল্প। ক্যামেলিয়ার মতোই তোমার প্রতি আমার হৃদয় প্রতিনিয়ত ফুল ফোটায়।লাল পাপড়িতে লেখা প্রকৃতির কোনো কবিতা যেনো।ফুলে ভরা পৃথিবীতে ক্যামেলিয়াই যেন সবার নজর কেড়ে নেয়। প্রতিটি পাপড়ি যেন ফিসফিসিয়ে ভালোবাসার সৌন্দর্যের নীরব প্রতিশ্রুতি দেয়। তীব্র শীতেও যে ফুটে ওঠে, উষ্ণতা আর আশার স্মরণে।ক্যামেলিয়ার প্রতিটি ফুলে লুকিয়ে থাকে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর নিবেদনের অর্থ। ঠিক যেমন অনুভূতি আমার হৃদয়ে তোমার জন্য। এই ফুল দিয়েই আমি তোমাকে বলছি I adore you আফরিন You are worthy of my deepest care. চীনে বলে, ক্যামেলিয়ার পাপড়ি আর বৃতি দু’জন প্রেমিক-প্রেমিকা, এক ফুলে রচিত এক অনুপম প্রেমকাব্য। শীত যতই কঠিন হোক, সৌন্দর্য ঠিকই নিজের পথ খুঁজে ফোটে। তুমি আমার ক্যামেলিয়া, আমার আকুলতা, আমার প্রেম। You are worth all my camellias and peonies. আফরিন, যেমন ক্যামেলিয়া অপেক্ষা করে বসন্তের মোলায়েম চুম্বনের, তেমনি আমি প্রতীক্ষায় আমার ব্যক্তিগত ক্যামেলিয়ার। তুমি আসবে, নয়তো আমি নিয়ে আসবো। ছিনিয়ে নিতে আমি জানি! Because you are everything I long for, cariño. And you are mine, mine to cherish, mine to break if I choose, mine to rebuild with my own hands."

— এমরিন রাহাফ

এই চিরকুটের লাইনে ভরপুর একরাশ তীব্রতা, মালিকানা, গভীর ভালোবাসা। নরম নয়, ভয়ঙ্কর নয়, কিন্তু এমন এক অস্বীকারাতীত শক্তি, যা আফরিনের ভেতর পর্যন্ত কাঁপিয়ে দেয়। চোখ বন্ধ করল সে, শ্বাস যেন আটকে যাচ্ছে। একদিকে নীরব রহস্য, অদৃশ্য বিপদের ছায়া... অন্যদিকে প্রলয়ঙ্কর ভালোবাসার দাবি, যে ভালোবাসা তাকে পুরোটা নিজের করে নিতে চায়।

দু’ফুলের গন্ধ, দুই পুরুষের দুই রকম দৃষ্টি, দুই রকম ভালোবাসা, সব মিলিয়ে রাতের তৃতীয় প্রহর যেন ঠিক তার চারপাশে মায়াজাল ফেলে বসে আছে। ফুলের আলো-ছায়া, চিরকুটের কালি, আর আফরিনের হৃদকম্পন।

.

রজনীর তৃতীয় প্রহর ফুরোতে চলেছে। চারপাশে নিস্তব্ধতার কুয়াশা নেমে এসেছে, যেন পৃথিবী ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে অনেক আগেই। সেই নিস্তব্ধতা ভেদ করে রুহান নিঃশব্দে নিজের ঘর থেকে বের হলো, বিড়ালের মতো পা ফেলছে, নিঃশ্বাস পর্যন্ত থমথমে।তার চোখে উত্তেজনা, বুকের মধ্যে উন্মাদ কাঁপন।উপমার রুমের সামনে এসে কয়েকবার ঠকঠক করে দরজায় নক করল। প্রথমে আস্তে, তারপর একটু জোরে, যেন তাড়াহুড়ো নয়, বরং শ্বাস-নেওয়া-বর্ণহীন এক আকাঙ্ক্ষা।

বিজ্ঞাপন

কিছুক্ষণ পর দরজা খুলল। ঘুম-ভাঙা চোখে দুলতে দুলতে দাঁড়াল উপমা, চুলগুলো এলোমেলো, মুখে রাতের কুসুমফোঁটা ক্লান্তি, আর চোখে অবাক বিস্ময়।রুহান অপেক্ষা করল না। দ্রুত ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। দু’জনের নিঃশ্বাস এক মুহূর্তে একই ঘেরাটোপে আটকা পড়ল। উপমা চোখ বড় বড় করে বলল—

-"তুমি এখানে?"

রুহানের গলা নিচু, কিন্তু তার ভেতরে জ্বলছে অদ্ভুত উত্তেজনা—

-""হ্যাঁ! চলো বাইক রাইডে যাবো!"

উপমা হতবুদ্ধি—

-"মানে? এত রাতে কিভাবে? আর বাইক পাবে কোথায়?"

রুহান একরাশ দুষ্টু হাসি দিলো, সে যেন অনেক আগেই পরিকল্পনা করে রেখেছে এই রাত-চুরি করা পাগলামিটার।

-"বিকেলে আমি ভাইয়াকে বলে বাইকের ব্যবস্থা করেছি।"

উপমার গলা কেঁপে উঠল—

-"কিন্তু এত পাহারার মধ্যে বের হব কিভাবে?"

রুহান এগিয়ে এলো আরও এক পা। তার চোখে এমন এক দৃঢ়তা, নিচু স্বরে বলল—

-"চলো আমার সাথে, তারপর বলছি!"

উপমা নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ... তারপর অবশেষে, বিনা দ্বিধায় বললো—

-"ঠিক আছে!"

উপমা তড়িঘড়ি করে একটি জিন্স শার্ট আর গরম জামা পরে নিল। রুহানের পাগলামি সে বহুদিন ধরেই চেনে, তার মাথায় যখন যা ভোর করে, যেভাবেই করুক না কেন, সেটা সে করেই ছাড়ে। কোনো বাধা, কোনো ভয়, কোনো নিষেধই তাকে থামাতে পারবে না।রাতের নিস্তব্ধতা পায়ের নিচে চাপা দিয়ে দুজন চুপিচুপি বেরিয়ে এলো। শীতল বাতাস কাঁপিয়ে তারা পৌঁছে গেল বিল্ডিংয়ের পেছনের বিশাল অন্ধকার প্রাচীরের সামনে। চাঁদের আলো দেয়ালের খসখসে গায়ে পড়ছে, এ যেন তাদের নিশিদ্ধ প্রেমেরই কোনো ছায়া। রুহান সময় নিলো না। দৌড়ে উঠে গেল প্রাচীরের ওপর, তার চলাফেরায় এক ধরনের দুঃসাহসী, উন্মাদ আত্মবিশ্বাস। ওপরে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো। নিচু, আশ্বস্ত গলায় বলল—

-"ভয় পেয়ো না... আমি আছি!"

উপমা নিচ থেকে তাকিয়ে হাসলো। তার চোখে কেমন এক উষ্ণ মায়া আর অদ্ভুত সাহস জ্বলে উঠল। মুচকি হেসে সে বলল—

-"তোমার সাথে জমের দুয়ারেও আমি নির্ভয়ে যেতে পারব... এটা তো সামান্য প্রাচীর টপকানো!"

ওই মুহূর্তে, হিমশীতল রাতের মধ্যে দাঁড়িয়ে

দু’জনের মধ্যে যে দৃঢ়তা, যে পাগলামী, যে অবসেশন, তা যেন বাতাসেও স্পষ্ট শোনা যায়। প্রাচীরের ওপাশে কি আছে তারা জানে না, কিন্তু একে অপরের হাত ধরা আছে, এইটুকুই যথেষ্ট।

উপমা হাত বাড়িয়ে দিয়ে সেও উঠে পড়ল দেয়ালের ওপরে। দুজন একসাথে এক ঝটকায় লাফ দিলো নিচে, মুহূর্তটা যেন দুঃসাহসী প্রেমের মধ্যরাতের অঙ্গীকার। নিচে আগেই দাঁড়িয়ে ছিল সেই কালো বাইক, যেন অন্ধকারকে ছিঁড়ে বের হওয়া তাদের গোপন সঙ্গী। রুহান প্রথমে উপমাকে হেলমেট পরিয়ে দিল, আঙুল ছুঁয়ে গেল উপমার গাল, সেই স্পর্শ শরীরের ভেতর কেমন অদ্ভুত শিহরণ জাগিয়ে দিলো। কিছুপোল মোহনীয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে দুজন, তারপর রুহান চোখ সরিয়ে হেলমেট পরে নিলো। দুজনেই বাইকে উঠে বসল। উপমা বসতেই রুহানের কোমর জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে, এ যেন ভয় নয়, বরং এক ধরনের গোপন দাবি, যা শুধু প্রেমিকেরাই বুঝে।

রুহান ইঞ্জিন স্টার্ট করতেই রাতের নীরবতা কেঁপে উঠল। বাইক ছুটে চলল অজানার উদ্দেশে, শীতের রাতের ঠান্ডা বাতাস ছিঁড়ে, আকাশের উপর থেকে যেন কেউ বরফের পর্দা নামিয়ে দিচ্ছে। উপমা দুই হাত মেলে উপভোগ করছে এই রাত, এই অন্ধকার, এই শীতল হাওয়া, আর সবচেয়ে বেশি, রুহানের পিঠে ভর করে থাকা এই মুহূর্ত। হঠাৎ রুহান বলে উঠল—

-"জড়িয়ে ধরো রুচি ঝাল চানাচুর!"

উপমার হাসির শব্দ হেলমেটের ভেতরেও ছড়িয়ে পড়ল। সে শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরল, মাথা রাখল রুহানের পিঠে, যেন সেই পিঠটাই তার নিরাপদ পৃথিবী।রুহান ঠোঁট বাকা করে হাসল, অন্ধকারে কেউ দেখতে পেল না সেই হাসি, কিন্তু তার নিজের বুকের মধ্যেই তা ঝলসে উঠল। এরপর হঠাৎই সে গলা ছেড়ে গেয়ে উঠলো—

" সারা রাত ভোর

চোখের ভেতর

স্বপ্নে তোমার আনাগোনা

নেমে আসে ভোর

থাকে তবু ঘোর

হাওয়ায় হাওয়ায় জানা শোনা"

রাতের শীতল বাতাস সেই সুরকে বহন করে নিয়ে গেল দূরে, বনের ভেতর, আকাশের নিচে, আর তাদের দু’জনের বুকের গভীরে।

" তুমি দেখা দিলে তাই

মনে জাগে প্রেম প্রেম কল্পনা

আমি তোমার হতে চাই

এটা মিথ্যে কোন গল্প না

আমি তোমার হতে চাই

এটা মিথ্যে কোন গল্প না

বাইকের আলো অন্ধকার চিরে এগিয়ে চলছে,

পেছনে দুজন পাগল প্রেমিক, যারা আজ রাত চুরি করেছে পৃথিবীর কাছ থেকে, শুধু নিজেদের জন্য।

.

চট্টগ্রামের গভীর জঙ্গল সারা রাত জেগে থাকা কোনো অদৃশ্য প্রহরীর মতো স্থির। ঘন কুয়াশার ভেতর দূর থেকে দেখা যায়, একটি কাঠের বাড়ির জানালায় টিমটিম করে জ্বলছে হলুদ আলো। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে কালো রঙের মার্সিডিজ, যেন রাতের অন্ধকারেও নিজস্ব দম্ভে দীপ্ত। চারপাশে কালোপোশাকধারী কয়েকজন পাহারাদার বন্দুক হাতে সতর্ক দৃষ্টিতে টহল দিচ্ছে, তাদের চোখে মৃ ত্যুর ঠাণ্ডা প্রতিশ্রুতি।

আর্সলান কুয়াশা চিরে এগিয়ে আসে। তার পদচারণা নিস্তব্ধ রাতকে আরও ভারী করে তোলে। চারদিক একবার চোখ বুলায় যেন প্রতিটি ছায়ার ভেতরও হুমকির গন্ধ খুঁজে দেখে, সে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে। ঘরের ভিতর লালচে আলোয় রাজকীয় এক দৃশ্য ফুটে ওঠে। মাঝখানে একটি লাল, গাঢ় টকটকে রাজকীয় চেয়ার, সেই চেয়ারে ঢলে বসে আছে এক পুরুষ। টেবিলে উন্মুক্ত উইস্কির বোতল, তার পাশে আধভরা গ্লাস। কাছেই আশট্রে, সিগারেটের ধোঁয়া পাক খেয়ে উড়ছে, তারপর ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে ভারী বাতাসে। পিছনে দাঁড়িয়ে আছে কালোপোশাক পরা দুইজন অ স্ত্রধারী, আর পাশে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে তার স্যুট-পরা পিএ।

আর্সলান এগিয়ে এসে ঠিক তার সম্মুখে থাকা চেয়ারে বাদশাহের মতন পা তুলে বসল। টেবিল থেকে একটি সিগারেট তুলে নিয়ে আগুন ধরাল। প্রথম ধোঁয়াটুকু বাতাসে ছড়িয়ে দিয়ে তীক্ষ্ণ, শীতল দৃষ্টিতে চেয়ারে বসা পুরুষটির চোখে তাকিয়ে বলল—

-"সব প্রস্তুত তো?"

সামনের পুরুষটি আস্তে মাথা তোলে, চোখে রহস্যের অন্ধকার খেলা করে—

-"হ্যাঁ, সব প্রস্তুত।"

আর্সলান আবার ধোঁয়ার রিং ভাসিয়ে ঠাণ্ডা স্বরে বলল—

-"এবার কিন্তু কোনো ভুল করা চলবে না!"

পুরুষটি দৃঢ় গলায় উত্তর দিল—

-"হ্যাঁ, অবশ্যই। সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কাকপক্ষীও জানতে পারে নি। তুমি শুধু ইলহানকে দেখে রেখো!"

সামনের পুরুষটির কথা শেষ হতেই আর্সলান হালকা কৌতুকমিশ্রিত গম্ভীর স্বরে বলল—

-"সেটাই তো করছি। ও এখন ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হবে না। ওর প্রাণভোমরা সেখানে!"

পুরুষটি গ্লাসে থাকা বাকি উইস্কিটা ঘুরিয়ে বলল—

-"হ্যাঁ। সব অ্যাকশন শুরু হবে যেদিন আরিবা ও নূরাইসা মুখোমুখি হবে। কারণ সেদিন ইলহানের মনোযোগ অন্য কোথাও কেউ নিতে পারবে না!"

বাতাস হঠাৎ আরও ঘন হয়ে ওঠে। আর্সলান সামনে ঝুঁকে, আগুনের মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে—

-"তাকে বোকা ভেবো না। শত্রুকে দুর্বল করার চাল দিচ্ছ, ঠিক আছে... কিন্তু সে দুর্বল হয়নি এখনো।ইলহানের নজর বাজপাখির মতো, দৃষ্টি সব দিকেই রয়েছে। সে যেখানে থাকুক, শরীর নয়, তার বুদ্ধিই সব জায়গায় হাজির!"

কথাগুলো ঘরের কাঠের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে যেন কম্পন তুলল। পুরুষটি গভীর, দীর্ঘ একটা নিশ্বাস ছেড়ে বলল—

-"সেই জন্যই তো তোমাকে ক্যান্টনমেন্টে পাঠানো হয়েছে!"

আর্সলান ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার চেয়ারটা সামান্য কঁকিয়ে উঠল। উল্টো ঘুরে দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল—

-"সব দিকে সতর্ক থেকো। এবার ভুল করার সুযোগ নেই। তোমার লোকদের ভালোভাবে বুঝিয়ে দিও সব।"

পুরুষটি এবার একটু দ্বিধা নিয়ে বলল—

-"পান্থর কিন্তু এই পরিকল্পনা সম্পর্কে জানে না!"

আর্সলান থেমে, ঘাড় ঘুরিয়ে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকায়—

-"কেনো জানে না?"

-"প্রথম পরিকল্পনা জানে। দ্বিতীয় পরিকল্পনা শেষ মুহূর্তে করা হয়েছে। এটা সম্পর্কে তাকে বলতে পারিনি। আর সে এখানে আসেও নি, তাই জানানো সম্ভব হয় নি।"

আর্সলান মাথা নাড়ল। দরজার হাতলে হাত রেখে বলল—

-"সমস্যা হবে না। আমি ওকে বুঝিয়ে বলব।"

পুরুষটি গ্লাস নামিয়ে জানাল—

-"আমি আজ ঢাকা ফিরব!"

-"ওকে!"

শীতল সুরেই উত্তর দিল আর্সলান। বলে সে দরজা খুলে রাতের কুয়াশা ভেদ করে বাইরে বেরিয়ে গেল। ভারী পরিবেশ ধীরে ধীরে থিতিয়ে আসে, কিন্তু ঘরের মধ্যে রেখে যায় এক অদৃশ্য উত্তেজনার গন্ধ। বাইরে পাহারা দিচ্ছে কালোপোশাকের লোকেরা, আর জঙ্গলের দমবন্ধ করা নীরবতা যেন ঘোষণা দিচ্ছে—

কোন গোপন ষড়যন্ত্র ধেয়ে আসছে ইলহানের দিকে। সে কি বুঝতে পারবে অদৃশ্য ছায়ারা তাকে ঘিরে আসছে?

বিজ্ঞাপন
সূর্যস্নাত ভালোবাসা গল্পটি নওরিন ইথিকা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ভালোবাসাময় গল্প