সূর্যস্নাত ভালোবাসা

পর্ব - ৩৮

🟢

এমরিন পুরো ঢাকা শহর তন্নতন্ন করে খুঁজেছে আফরিনকে। অলিগলি, হাসপাতালের করিডোর, নির্জন রাস্তা, একটাও জায়গা বাদ রাখেনি সে। শহর যেন তার সামনে এক বিশাল গোলকধাঁধায় পরিণত হয়েছিল। আফরিনের ওপর নজর রাখার জন্য আগেই সে একজন বডিগার্ড রেখেছিল। সেই লোকটাই জানিয়েছিল, ভার্সিটির সামনে থেকে কয়েকজন মুখোশধারী মানুষ হঠাৎ করেই আফরিনকে তুলে নিয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে সব শেষ। চিৎকার করার সুযোগটুকুও পায়নি সে। এরপর আরও ভয়ংকর খবর আসে। হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার সময় আফরিনের ভাইয়ের ওপর হামলা হয়েছে। কিন্তু সে খবর এসেছে অনেক দেরিতে। ততক্ষণে শহরের প্রতিটা কোণ ছেঁচে ফেলেও এমরিন আফরিনের কোনো সন্ধান পায়নি। ঢাকার আলো, শব্দ, কোলাহল, সবকিছু তখন তার কাছে অর্থহীন। বুকের ভেতর জমে থাকা অস্থিরতা ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছিল এক ভয়ংকর সিদ্ধান্তে।

ঠিক তখনই তার মাথায় বিদ্যুতের মতো ঝলকে উঠল একটাই নাম, একটাই জায়গা। মুহূর্তেই সব টুকরো জোড়া লেগে গেল। সে বুঝে গেল, আফরিনকে কারা নিয়েছে, আর কোথায় নিয়ে গেছে। এক মুহূর্ত দেরি না করে নিজের সমস্ত লোক নিয়ে এমরিন রওনা দিল গাজীপুরের উদ্দেশ্যে। শহরের আলো ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে রইল। গাড়িগুলোর হেডলাইট কেটে চলল অন্ধকারের বুক চিরে। কংক্রিটের রাস্তা ফুরিয়ে গিয়ে শুরু হলো ঘন জঙ্গল। চারপাশে গাছের ছায়া, নিস্তব্ধতা এমন গভীর যে ইঞ্জিনের শব্দটাও যেন কানে বাজছিল অস্বাভাবিকভাবে জোরে।

জঙ্গলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল একটি বিশাল বাগানবাড়ি, পুরনো, নির্জন, অস্বস্তিকর। চারপাশে নিস্তব্ধতা এমন, যেন প্রকৃতিও শ্বাস ধরে রেখেছে।বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল এক অশুভ গন্ধ, ভেজা মাটি, পুরনো দেয়াল আর অজানা কোনো অপরাধের গন্ধ।সেই অন্ধকারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এমরিন বুঝে গেল, এই জায়গাটাই আজ সবকিছুর শেষ কিংবা শুরু।

অন্যদিকে—

আফরিনের ওপর নি র্যা ত নের এক পর্যায়ে সে অচেতন হয়ে পড়ে। শত চেষ্টা করেও তার জ্ঞান ফেরানো যাচ্ছিল না। নিথর শরীরটা খাটের ওপর পড়ে ছিল, যেন প্রাণহীন কোনো পুতুল। কেবল ক্ষীণ শ্বাস-প্রশ্বাসই জানান দিচ্ছিল, সে এখনো বেঁচে আছে। বুক ওঠানামা করছে, কিন্তু চোখ বন্ধ, মুখ নিস্তেজ। জীবন আর মৃ ত্যুর মাঝখানে ঝুলে থাকা এক ভয়ংকর অবস্থান।

পুরুষটি আর তার তিনজন লোক অবশেষে হতাশ হয়ে রুমেই অপেক্ষা করছিল। ঘরের ভেতর থমথমে নীরবতা। বাতাস ভারী, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। দেয়াল যেন অপরাধের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক সেই সময় হঠাৎ বাইরে হট্টগোল শুরু হয়। প্রথমে অস্পষ্ট শব্দ। তারপর গুলির শব্দ। একের পর এক। সঙ্গে চিৎকার, দৌড়াদৌড়ি, বিশৃঙ্খলার ভয়ংকর আওয়াজ। মুহূর্তেই ঘরের ভেতরের নীরবতা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।

পুরুষটি এক ঝটকায় বুঝে গেল, হামলা হয়েছে। সে চটজলদি উঠে দাঁড়িয়ে ছেলেগুলোর দিকে তাকাল।চোখে শীতল ক্রোধ, কণ্ঠ কঠিন—

-"ওর ভাইকে মা রিস নি?"

ছেলেগুলো মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। গলা শুকিয়ে এলো। আমতা আমতা করে একজন বলল—

-"স্যার... মনে হয় হাসপাতালে কেউ বাঁচিয়ে নিয়েছে!"

এই কথা শুনেই পুরুষটির চোখে আগুন জ্বলে উঠল। দাঁত চেপে গর্জে উঠল সে—

-"আহাম্মকের দল! হাসপাতালের সামনে কেউ কাউকে মা রে? নিজেদের তৈরি করা সমস্যা এখন নিজেরাই সমাধান কর!"

এক মুহূর্ত থেমে সে চারপাশে তাকাল। যেন দেয়ালগুলোও বিশ্বাসঘাতক। তারপর নিচু স্বরে, কিন্তু আরও ভয়ংকর কণ্ঠে যোগ করল—

-"আমি এখন এখান থেকে যাচ্ছি। এইদিকটা সামলে নিবি। আমার আসল পরিচয় কোনোভাবেই প্রকাশ করা যাবে না।"

তার কণ্ঠে ছিল তাড়া, ভয় আর নিষ্ঠুর হিসাব,.সব মিলিয়ে এক ভয়ংকর অশনি সংকেত। বাগানবাড়ির ভেতরের বাতাস আরও ভারী হয়ে উঠল, যেন অন্ধকার নিজেই অপেক্ষা করছে পরবর্তী র ক্ত ক্ষরণের জন্য।পুরুষটি তড়িঘড়ি করে পালিয়ে গেল। রুমে তখন কেবল তিনজন ছেলে, ভীত, দিশেহারা, অপরাধবোধে ভাঙা। তারা বাইরে পালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। দরজার দিকে পা বাড়াতেই, বিকট শব্দে দরজাটা খুলে গেল।এমরিন ভেতরে প্রবেশ করল।

এক মুহূর্তে পুরো ঘরের বাতাস জমে গেল। সময় থমকে দাঁড়াল। প্রথমেই তার চোখ পড়ল তিনটে ছেলের ওপর, কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়িয়ে আছে, অপরাধীর মতো মাথা নিচু। তাদের চোখে আতঙ্ক, মৃ ত্যু ভয় স্পষ্ট। তারপরই, খাটের ওপর পড়ে থাকা আফরিন।

বস্ত্রহীন, নিথর দেহ। সার্কাসের পশুর মতো লোহার শিকলে খাটের সঙ্গে বাঁধা। শরীরজুড়ে আঘাতের চিহ্ন, এলোমেলো চুল, নিস্তেজ মুখ। আলো-ছায়ার মাঝে সেই দৃশ্য যেন এক বিভীষিকাময় নরকচিত্র। এমরিনের চোখে সেই মুহূর্তে আর কিছু রইল না। শুধু আফরিন।এমরিনের নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলো।বুকের ভেতর যেন কিছু একটা বিকট শব্দে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। চোখ দুটো র ক্তবর্ণ হয়ে উঠল, কোনো অনুভূতি নেই, কেবল একরাশ উন্মত্ত আগুন।সে ধীরে ধীরে ছেলেগুলোর দিকে তাকাল। ওরা তখন কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জানে, মৃ ত্যু এখন আর দূরে নয়, একদম সামনে দাঁড়িয়ে।

পরের মুহূর্তেই এমরিন হিংস্র বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। এলোপাতাড়ি আঘাত। ঘু ষি, লা থি, যা হাতের কাছে পেয়েছে, তাই দিয়েই মা রছে। কোনো হিসাব নেই, কোনো থামা নেই। ছেলেগুলো একে একে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। আর্তনাদে ঘর ভরে উঠল, দেয়াল কাঁপতে লাগল। র ক্ত আর চিৎকারে বাতাস ভারী হয়ে উঠল। এমরিন গর্জে উঠল—

-"কু ত্তা র বাচ্চারা! কার কলিজায় হাত দিয়েছিস তোরা জানিস? তোদের সব কোটাকে আমি, এমরিন রাহাফ, জীবন্ত ক ব র দেবো!"

আরও বিশ্রী ভাষায় গালাগালি করতে করতে সে মা রতেই থাকল। ভাঙা নিঃশ্বাস, র ক্তাক্ত শরীর, আতঙ্কিত চিৎকার, সব মিলিয়ে ঘরটা যেন নরকে পরিণত হলো।ঠিক তখনই এমরিনের পিএ দৌড়ে এসে তাকে থামাল।এমরিন হুংকার দিয়ে উঠল—

-"ওদের গোডাউনে নিয়ে যা। বাঁচিয়ে রাখবি। ওদের সঙ্গে যা করার, আমিই করব।"

বলেই সে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল, এগিয়ে গেলো আফরিনের দিকে। তার লোকেরা সবাই বুঝে গেছে, আফরিন তাদের বসের কলিজা। ঘরে তখন নিস্তব্ধতা নেমে এলো। সবাই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ একবারের জন্যও খাটের দিকে তাকায়নি। তারা জানে, এমরিন রাহাফ কাউকে ছাড়ে না। ভয়টাই তাদের চোখ নামিয়ে রেখেছে, আবার সেই ভয়ই শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করেছে।

ঘরের ভেতর তখন শুধু একটাই অনুভূতি, ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা। আর সেই ঝড়ের নাম, এমরিন রাহাফ।

এমরিন এক মুহূর্তও দেরি করল না। নিজের শরীরের শার্ট আর কোট খুলে খুব সাবধানে আফরিনের নিথর শরীরটা ঢেকে দিল। যেন সেই কাপড় দিয়েই সে আফরিনকে পৃথিবীর সব অশুভ দৃষ্টি থেকে আড়াল করতে চাইছে। পরের মুহূর্তেই সে বন্দুক তুলল। পরপর চারটে গুলির শব্দ কেঁপে উঠল নিস্তব্ধ ঘর। লোহার শিকল ছিঁড়ে গেল। খাটের সঙ্গে বাঁধা বন্ধন মুক্ত হলো।

এমরিন আফরিনকে নিজের বুকে টেনে নিল। বুকের ভেতর তার হৃদস্পন্দন যেন থেমে থেমে আসছে, ভয় আর অসহায়তায় দম আটকে আসে। কাঁপা কণ্ঠে সে বলে উঠল—

-"দুষ্টুরাণী... কথা বলো। Cariño, চোখ মেলে তাকাও।প্লিজ... আমাকে এইভাবে ভয় দেখিও না।"

নিথর আফরিনের কানে সেই আকুল ডাক পৌঁছাল না।কোনো সাড়া নেই। এমরিন আরও শক্ত করে তাকে বুকে চেপে ধরল। কণ্ঠ ভেঙে ভেঙে আসছে, তবু থামল না—

-"শোনো... আমি আছি। কেউ আর তোমার দিকে হাত বাড়াতে পারবে না, কথা দিচ্ছি। দুষ্টুরাণী, তুমি তো আমার সাহসী, শক্ত আফরিন... এভাবে হার মেনো না।"

সে কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল—

-"ওরা তোমাকে ভাঙতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি থাকতে ভাঙা শব্দটা তোমার অভিধানে নেই। চোখ মেলো, আফরিন... একবার তাকাও। তোমার নিঃশ্বাসটা আমাকে ধরতে দাও। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, ওদের সবাইকে এমন শাস্তি দেবো, যে ওরা মৃ ত্যু ভিক্ষা চাইবে।"

হাতের তালু দিয়ে আলতো করে তার গাল ছুঁয়ে আবার বলল—

-"ভয় পেয়ো না। সব শেষ। আজ থেকে প্রতিটা রাত, প্রতিটা শ্বাস, আমার পাহারায়। যে কষ্টটা তোমার ভেতরে জমে আছে, সেটুকু আমার বুকে তুলে দাও।যারা তোমার দিকে তাকিয়েছে, যারা তোমার এই অবস্থার জন্য দায়ী... তাদের হিসাব আমি রাখছি।একটাও ঋণ বাকি থাকবে না। কিন্তু এখন শুধু তুমি জেগে ওঠো। Carino... আমার দিকে তাকাও। আমি এখানেই আছি। চলে যাইনি, যাবোও না।"

কোনো উত্তর এলো না। শুধু নিঃশ্বাসের ক্ষীণ স্পন্দন, ভাঙা, দুর্বল, তবু জীবনের ইঙ্গিত। পেছন থেকে একজন তাড়াহুড়ো করে বলল—

-"স্যার, ম্যামকে এখনই হাসপাতালে নিতে হবে!"

এমরিন চোখ না সরিয়েই গর্জে উঠল—

-"জলদি গাড়ি বের কর!"

আফরিনকে কোলে তুলে এমরিন বাগানবাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। বাইরে রাত আরও গাঢ় হয়েছে।একসময় যে বাগানবাড়ি বডিগার্ডে ঠাসা ছিল, এখন সেখানে নেমে এসেছে মৃ ত্যুর নীরবতা। চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে আছে প্রাণ হীন, নির্জীব দেহ। মাটিতে পড়ে থাকা লা শ গুলোর ওপর দিয়ে পা ফেলতে ফেলতে এমরিন সামনে এগিয়ে চলল। তার চোখে একফোঁটা দ্বিধা নেই, একচিলতে করুণা নেই। সব অনুভূতি তখন এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত, আফরিন।

বুকের সঙ্গে তাকে চেপে ধরে, মৃ ত্যুর স্তূপ পেরিয়ে সে হেঁটে চলল। চারপাশে শুধু অন্ধকার আর র ক্তের গন্ধ।তবু তার কাছে তখন একটাই সত্য, আফরিনকে বাঁচাতে হবে। যে করেই হোক। রাতের অন্ধকার ভেদ করে বাগানবাড়ির দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে গেল এমরিন রাহাফ, মৃ ত্যুর ওপর দিয়ে হেঁটে, জীবনকে বাঁচাতে।

.

ভোরের নিস্তব্ধতা তখনও পুরোপুরি ভাঙেনি।পাহাড়ঘেরা বান্দরবনের আদিবাসী বসতির দিকে ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাঠানো জিপের শব্দে ঘুম জড়ানো প্রকৃতি কেঁপে উঠেছিল। জিপ থামতেই বিহান এক মুহূর্তও দেরি করেনি। নুহার হাত শক্ত করে ধরে সে দ্রুত চট্টগ্রামের পথে রওনা দেয়। ভোরের কুয়াশা চিরে এগিয়ে যাওয়া রাস্তায় বিহানের চোখ দুটো ছিল স্থির, অথচ ভেতরে ভেতরে অস্থিরতার ঢেউ আছড়ে পড়ছিল। শহরে পৌঁছেই কোনো বিলম্ব না করে নুহাকে একটি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। কর্তব্যরত জুনিয়র সৈনিককে কঠোর কণ্ঠে পাহারার নির্দেশ দিয়ে বিহান আবার ফিরে যায় ক্যান্টনমেন্টে। সিনিয়রদের সামনে তদন্তের সমস্ত রিপোর্ট জমা দিতেই তার ভেতরের দায়িত্ব শেষ হয়নি, বরং তখনই শুরু হয়েছে আসল যুদ্ধ। ইলহানকে খুঁজে বের করাই এখন তার একমাত্র লক্ষ্য, একমাত্র প্রয়োজন।

ক্যান্টনমেন্টের মেডিক্যাল রুমের কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ করিডোর জুড়ে তীক্ষ্ণ কণ্ঠের সংঘর্ষ কানে এসে লাগে। বিহানের পা আপনা-আপনি থেমে যায়। সামনে তাকাতেই দৃশ্যটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ইলহান আর আর্সলান। রুহান ইলহানকে শক্ত করে ধরে রেখেছে, না হলে পরিস্থিতি যে কোনো মুহূর্তে র ক্তাক্ত মোড় নিতে পারত। ইলহানের চোখে তখন আগুন জ্বলছে। চোয়াল শক্ত, শিরা ফুলে উঠেছে, বুকের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ যেন আর ধারণের সীমা মানছে না। বাতাস ভারী হয়ে আছে, করিডোরের দেয়ালগুলো পর্যন্ত যেন আসন্ন বিস্ফোরণের অপেক্ষায়। বিহান সামনে এগিয়ে আসে। ঠিক তখনই ইলহানের কণ্ঠ করিডোর কাঁপিয়ে ওঠে—

-"তোকে বারণ করেছি আমার বউয়ের আশেপাশে আসতে। কেনো এসেছিস?"

এক মুহূর্তের জন্য চারপাশ নিথর হয়ে যায়। আর্সলান ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি টেনে নেয়। সেই হাসিতে কোনো অনুশোচনা নেই, নেই ভয়, বরং আছে ঠান্ডা, হিসেবি নিষ্ঠুরতা। চোখ দুটো বরফের মতো শান্ত, যেন এই উত্তাল পরিস্থিতিও তার কাছে নিছক এক খেলনা। নির্লিপ্ত কণ্ঠে সে বলে ওঠে—

-"বারণ করলেই সব থেমে যায় নাকি, ইলহান? কিছু মানুষ আছে, যাদের ছায়া চাইলেও এড়ানো যায় না।"

তার কথায় যেন ইন্ধন পড়ে আগুনে। রুহানের ধরন শক্ত হয়, বিহানের চোখ সজাগ হয়ে ওঠে। করিডোরের বাতাস আরও ভারী হয়ে নামে। এই মুহূর্তে সবাই বুঝতে পারছিল, এটা কেবল কথার লড়াই নয়, অতীতের অন্ধকার আর বর্তমানের প্রতিশোধ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। আর সামান্য এক চুল এদিক-ওদিক হলেই এই নিস্তব্ধ ক্যান্টনমেন্ট সাক্ষী হবে এক ভয়ংকর বিস্ফোরণের। রুহান ছুটে আসে, দু’জনের মাঝখানে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করে—

-"ভাই, থামো!"

কিন্তু তার কথা শেষ হওয়ার আগেই পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যায়। করিডোরের নীরবতা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় ভারী শ্বাস আর সংঘর্ষের শব্দে। সাদা দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনি ফিরে আসে, যেন পুরো ভবনটাই এই হিংস্র মুহূর্তের সাক্ষী হতে বাধ্য। ইলহানের চোখে তখন আর কোনো যুক্তি নেই, শুধু আগুন। আর্সলানের বুকে পড়া ঘু ষিটা ছিল জমে থাকা সব ক্ষোভের বিস্ফোরণ। আর্সলান খানিকটা পিছিয়ে গেলেও পড়ে যায় না। সে বরং ঠোঁটের কোণে র ক্ত জমতে দিয়েই হেসে ওঠে। সেই হাসি আরও ভয়ংকর, আরও উসকানিময়।সে ফিসফিস করে বলে—

-"দেখছিস? ভালোবাসা মানুষকে কত সহজে পশু বানিয়ে দেয়।

ইলহান আর শোনে না। সে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ে। এইবার রুহান দু’হাত বাড়িয়ে বুক দিয়ে ঠেকায়, তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে—

-"ভাই! নিজের দিকে তাকাও! ও ঠিক এটাই চায়!"

ঠিক তখনই বিহান সামনে এগিয়ে আসে। এতক্ষণ সে নীরব ছিল, কিন্তু এই নীরবতায় ছিল প্রশিক্ষিত সৈনিকের সতর্কতা। এক ঝটকায় সে ইলহানের কাঁধ চেপে ধরে, ভারী কণ্ঠে আদেশ ছুড়ে দেয়—

-"ব্যাক অফ, ইলহান। এখনই।"

ইলহান থমকে যায়। বুক হাঁপাচ্ছে, হাত কাঁপছে, চোখে এখনও আগুন নেভেনি। কয়েক সেকেন্ডের জন্য সে যেন নিজের সঙ্গে লড়াই করে। তারপর ধীরে ধীরে হাত নামায়। আর্সলান জামার কলার ঠিক করে নেয়। চোখে একফোঁটা ভয় নেই, বরং বিজয়ের আভাস। সে চারপাশে একবার তাকায়, সাদা অ্যাপ্রন, মেডিক্যাল রুমের গন্ধ, আহত মানুষের নিঃশব্দ আর্তনাদ, সবকিছুর মাঝেই সে দাঁড়িয়ে আছে অস্বস্তিকর স্বচ্ছন্দে।সে বিহানের দিকে তাকিয়ে বলে—

-"দেখলি? আমি কিছুই করিনি। ও নিজেই ফেটে পড়ল।"

বিহানের চোখ সরু হয়ে আসে। রুহানের কণ্ঠ করিডোরের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে।

কিন্তু ইলহান তখন আর শোনার অবস্থায় নেই। তার ভেতরের আগুন আবার ফেটে বেরোতে চায়। এই মানুষটাকে সে চেনে, এই শান্ত মুখোশের আড়ালে কী ভয়ংকর হিসাব লুকিয়ে থাকে। দুজন পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে এক নারীর নামকে কেন্দ্র করে, যেখানে ভালোবাসা, দখল আর নিষ্ঠুরতা এক সুতোয় জড়িয়ে গেছে।

ইলহান আবারও ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর্সলানও এবার আর পিছু হটে না। দুই প্রান্তের দুই মেরু, একজন ভালোবাসার আগুনে জ্বলছে, আরেকজন ধ্বংসের নেশায় ঠান্ডা, নিষ্ঠুর। ঠিক তখনই রুহান প্রায় চিৎকার করে ওঠে। কণ্ঠে স্পষ্ট আতঙ্ক—

-"ভাই! থামো! ইসা ভেতরে ঘুমোচ্ছে!"

বিজ্ঞাপন

এই একটিমাত্র বাক্য যেন সময়কে হঠাৎ টেনে ধরে।ইলহানের হাত মাঝপথে থেমে যায়। শ্বাস ভারী হয়ে ওঠে, বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। চোখের আগুনে এবার ঢুকে পড়ে অন্য এক অনুভূতি, ভয়, অনুশোচনা, বাস্তবতার হঠাৎ ধাক্কা। আর্সলান তখনও ঠান্ডা। ঠোঁটের কোণে জমে থাকা র ক্ত মুছতেও সে তাড়া বোধ করে না। হাসিটা অটুট থাকে। ধীরে, প্রায় উপভোগের সুরে বলে—

-"দেখলি? শেষ পর্যন্ত তোর দুর্বলতাই তোর হাত বেঁধে দিল।"

বাতাস আরও ভারী হয়ে নামে। ইলহান ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। চোখের আগুন নিভে যায় না, বরং রূপ বদলায়। সেই আগুন এবার শান্ত, গভীর, ভয়ংকর। কণ্ঠ ঠান্ডা, অথচ সেই ঠান্ডার ভেতর লুকিয়ে আছে মৃ ত্যুর প্রতিশ্রুতি। এক মুহূর্ত থেমে সে স্পষ্ট করে বলে—

-"ও আমার দুর্বলতা না। ও আমার শক্তি। আমাকে মানুষ হয়ে থাকতে সাহায্য করে। ওর জন্যই আজ প্রাণে বেঁচে গেলি। নইলে এখনই তোকে কবর দিতাম।"

শব্দগুলো করিডোরে ঝুলে থাকে। কেউ নড়ে না।

আর্সলান হেসে ওঠে। সেই হাসিতে বিদ্রূপ, অবজ্ঞা, অহংকার, সব একসাথে মিশে আছে। চোখে চোখ রেখে সে বলে—

-"হাহ! এইসব ডায়লগ অন্য কোথাও দিবি। তোর থেকে ওকে আমি কেড়ে নেবো। এটা আমার ওয়াদা!"

এই কথার সাথেই যেন বাতাস ছিঁড়ে যায়। ইলহান আবার তেড়ে আসে। রুহান এগোতে গিয়েও পেরে ওঠে না। ঠিক তখনই বিহান সামনে এসে দাঁড়ায়, দু’জনের মাঝখানে শক্ত দেয়াল হয়ে। তার কণ্ঠ ঠান্ডা, প্রশিক্ষিত, কর্তৃত্বপূর্ণ। চোখ না সরিয়েই ইলহানের দিকে তাকিয়ে বলে—

-"থাম। এটা লড়াই করার সঠিক সময়ও না, জায়গাও না। ওকে পরে দেখিস। এখন ইসার কাছে যা।"

ইলহান দাঁতে দাঁত চেপে ধরে। বুকের ভেতর ঝড় তাণ্ডব চালালেও সে আর এক পা এগোয় না। চোখ একবার বন্ধ করে, যেন নিজেকে সামলে নিচ্ছে। আর্সলান চোখ কুঁচকে বিহানের দিকে তাকায়। ঠোঁট বাঁকিয়ে ব্যঙ্গ ঝরে পড়ে কণ্ঠে—

-"দেখ কে কাকে উপদেশ দিচ্ছে! সালা মেরুদণ্ডহীন। একটা মেয়ে মানুষ সামলাতে পারিস না, আর বড় বড় কথা বলিস! এত ভয় পাস আমাকে তোরা?"

এই কথাটা ছিল সীমা ছাড়ানো। ঠিক সেই মুহূর্তেই বিহানের র ক্ত গরম হয়ে ওঠে। চোখের দৃষ্টি এক নিমিষে বদলে যায়, সেখানে আর কৌশল নেই, নেই ধৈর্য, নেই সৈনিকসুলভ হিসেব। আছে শুধু অপমানের জ্বালা আর ভেতরে জমে থাকা বিস্ফোরক ক্ষোভ।কোনো সতর্কবার্তা না দিয়েই সে হামলে পড়ে আর্সলানের ওপর।

ঘুষির শব্দ করিডোরে বিস্ফোরণের মতো ফেটে পড়ে।

সাদা দেয়াল কেঁপে ওঠে, আলোটা যেন এক মুহূর্তের জন্য টলে যায়। আর্সলান প্রস্তুত ছিল না। বিহানের ঘুষি সোজা এসে লাগে তার মুখে। শরীরটা ছিটকে যায় পাশের দেয়ালে, ধাতব ট্রলির সাথে ধাক্কা লেগে বিকট শব্দ হয়। এইবার আর শুধু ভালোবাসা আর বিকৃত লালসার লড়াই নয়। এটা হয়ে ওঠে সম্মান, কর্তৃত্ব আর পুরুষত্বের যুদ্ধ। বিহান এক পা এগিয়ে যায়। কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু সেই শান্তির ভেতর জমে আছে আগ্নেয়গিরির গর্জন—

-"আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমার মানুষদের অপমান করবি? তুই কে?"

আর্সলান ঠোঁটের র ক্ত মুছতে মুছতে সোজা হয়। চোখে এবারও ভয় নেই, কেবল উন্মত্ত উত্তেজনা। সে হেসে ওঠে, দাঁতে রক্ত লেগে থাকে—

-"ওহ! অবশেষে আসল চেহারা বের হলো মেজর সাহেবের!"

সে পাল্টা আঘাত হানতে যায়। কিন্তু বিহান এবার প্রস্তুত। প্রশিক্ষিত হাতে সে আঘাতটা এড়িয়ে যায়, মুহূর্তেই আর্সলানের কলার চেপে ধরে আবার দেয়ালে ঠেসে ধরে। দেয়ালে ঝোলানো মেডিক্যাল চার্ট কেঁপে কেঁপে পড়ে যায় মেঝেতে। রুহান হতভম্ব। ইলহান স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। এই সংঘর্ষ সে আশা করেনি। করিডোরে যেন হঠাৎ করে বাতাসের অক্সিজেন কমে গেছে। শ্বাস নেওয়াই কষ্টকর। মেডিক্যাল রুমের ভেতর তখন নূরাইসা শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে, জানে না বাইরে কী দানবীয় ঝড় বয়ে যাচ্ছে। নিঃশব্দ দেয়ালগুলো সাক্ষী হয়ে থাকে, আরেকটি অনিবার্য ধ্বংসের শুরুতে।

আর এই মুহূর্তে সবাই বুঝে যায়, এই লড়াই এখানেই শেষ হবে না। আজ শুধু আগুন জ্বলে উঠেছে। পোড়া শুরু হবে পরে।

.

নূরাইসার শরীর এখন আগের চেয়ে অনেকটাই ভালো। একদিনের বিশ্রামেই শরীর যেন নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করেছে। আজ তাকে ঢাকা ফিরতেই হবে। এক মাস পূর্ণ হয়েছে। ইলহান, বিহান, আর্সলান, তিনজনকেই এক বছরের জন্য সাসপেন্ড করা হয়েছে। ব্যক্তিগত রাগ, সম্মান আর প্রতিশোধ, এই তিনের মিশ্রণ সেনাবাহিনীর আইনের কাছে কোনো মূল্য রাখে না।আদেশ চূড়ান্ত, অচল। আজ নূরাইসার সাথেই তারাও ঢাকা ফিরবে। গোটা ক্যাম্প জুড়ে এক অদ্ভুত ব্যস্ততা। ট্রাংক খুলে আবার বন্ধ হচ্ছে, ইউনিফর্ম যত্ন করে ভাঁজ করা হচ্ছে, বুটের ফিতা টানটান করে বাঁধা হচ্ছে।প্রতিটি শব্দেই বিদায়ের ভার। বাতাস পর্যন্ত যেন চাপা এক দীর্ঘশ্বাস বইছে, নিঃশব্দ, অথচ ভারী।

এই দমবন্ধ করা অনুভূতি থেকে পালাতেই বিহান আর ইলহান মাঠে নেমেছে। খোলা মাঠ, কড়া রোদ, শুকনো ঘাস, পায়ের তলায় মচমচ শব্দ তুলে তারা দৌড়াতে শুরু করে। নিঃশ্বাসের তালে তালে জমে থাকা ক্ষোভ বেরিয়ে আসে শব্দ হয়ে। হঠাৎ বিহান জোরে চিৎকার করে উঠল—

-"সালা স্নাইপার এত দুর্বল হলে চলে! সালা এক ঘুষিতেই কুপোকাত। আবার আমরা নাকি ওকে ভয় পাই!"

তার কণ্ঠে ঘামের গন্ধ, রাগের তাপ আর অপমানের তিক্ততা। ইলহান দৌড়ের ছন্দ না ভেঙেই তাল মিলিয়ে বলল—

-"সালা ফিজিক্যাল ফাইটে পারে না, কিন্তু ম্যানিপুলেশন ঠিকই জানে। আমার বউয়ের দিকে চোখ দিয়েছে। ওর চোখ তুলে না ফেলা পর্যন্ত আমার শান্তি নেই!"

শব্দগুলো মাঠে ছিটকে পড়ে, রোদের ভেতর ঝলসে ওঠে। কিছুক্ষণ পর বিহান দৌড়ের গতি কমিয়ে ইলহানের দিকে তাকায়। চোখে কৌতূহল, ঠোঁটে হালকা বিদ্রুপ—

-"ওকেও সাসপেন্ড করেছে, আমাদের সাথেই যাবে।আচ্ছা বল তো... তুই ইসাকে কবে থেকে এত ভালোবাসলি? যে সব সীমা পেরোতে তোর একটুও দ্বিধা হয় না।"

প্রশ্নটা যেন দৌড়ের চেয়েও ভারী। ইলহান হঠাৎ থেমে যায়। শরীরের সমস্ত শক্তি ফুরিয়ে এসেছে, এমন ভঙ্গিতে সে ঘাসের ওপর বসে পড়ে। বুক দ্রুত ওঠানামা করছে, কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ঘাম। সে মাথা তুলে তাকায় দুপুরের আকাশের দিকে, নির্মম নীল, কোনো মেঘ নেই, কোনো আড়াল নেই। সেই খোলা আকাশের দিকেই তাকিয়ে সে ধীরে বলে ওঠে—

-"সেদিন নূরাইসার জন্মদিন ছিল। আমি কথা দিয়েছিলাম, যাবো। অথচ যেতে পারিনি। তারপর হঠাৎ খবর এলো, আর্সলান নূরাইসাকে খু ন করতে যাচ্ছে।এক মুহূর্তে দিকবিদেক শূন্য হয়ে পরলাম আমি। মাথার ভেতর সব শব্দ থেমে গেল, সময় যেন স্থির হয়ে গেলো।ভালো-মন্দ, যুক্তি-অযুক্তি, কিছুই তখন আর ভাবিনি। শুধু একটাই নাম বুকের ভেতর ধ্বনিত হচ্ছিল, নূরাইসা। আর কিছু না ভেবেই আমি হেলিকপ্টার নিয়ে রওনা দিলাম।

বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছাতেই কানে এলো ছাদের দিক থেকে এক অদ্ভুত শব্দ, হালকা, ছন্দময়। স্বভাবতই চোখ তুলে তাকালাম। দেখলাম, নূরাইসা ছাদে নাচছে। বিকেলের সূর্য তখন পশ্চিমে ঢলে পড়ছে। সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। সেই আলোয় নূরাইসা যেন বাস্তবের কেউ নয়, একটি দৃশ্য, একটি অনুভব। আমার প্রিয় কবুতরগুলো ছাদের কার্নিশে উড়াউড়ি করছিল, তার নৃত্যের তালে তালে ডানা ঝাপটাচ্ছিল, সব মিলিয়ে তৈরি হচ্ছিল এক স্বপ্নময় দৃশ্য। সূর্যস্নাত বিকেলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা নূরাইসাকে দেখে মনে হচ্ছিল, আলো নিজেই যেন তার চারপাশে নাচছে। আমি থমকে গিয়েছিলাম ওকে দেখে।"

বিহান ইলহানের পাশে বসে বললো—

-"প্রেমে পরলি সেই সময়ে?"

ইলহান আকাশের দিকে তাকিয়েই বলল—

-"আমি চোখ সরাতে পারিনি নূরাইসার দিক থেকে। মনে হলো... আমি তাকে আগে কখনো দেখিনি। অথচ সে আমারই, আমার সহধর্মিণী। তার নৃত্যের কোমল ভঙ্গিতে আমার সমগ্র অস্তিত্ব সেদিন থমকে গিয়েছিল।সূর্যের সোনালি আলো যখন তার গালে ছুঁয়ে নাচছিল, তখনই বুঝেছি, আমি তাকে ভালোবেসে ফেলেছি।আমি তার প্রেমে পড়েছি। নুহান ইলহান দেওয়ান, জীবনে প্রথম কোনো মেয়ের প্রেমে পড়ছিল। নৃত্যরত রমণীর লাবণ্যবান দোলায় নিজ সহধর্মিণীকেই সেদিন নতুন করে আবিষ্কার করলাম আমি। তার প্রতিটি ঘূর্ণন, প্রতিটি হাসি আমার হৃদয়ে জাগিয়ে তুললো প্রেমের প্রথম অনুভূতি। সেই নাচের তরঙ্গেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম, ভালোবাসা বুঝি এমনি হয়, আলোয় জন্ম নেয়।

নূরাইসা, আমার #সূর্যস্নাত_ভালোবাসা।

সূর্যের নরম আলোয় দাঁড়িয়ে ছিল সে, হাওয়ায় দুলছিল তার চুল, চোখে ছিল উষ্ণ এক দীপ্তি। ঠিক সেই মুহূর্তেই বুঝলাম, প্রেম কখনও পূর্বঘোষিত হয়ে আসে না। সে আসে ঠিক এভাবেই, আলো-ছায়ার ফাঁকে, অচেনা এক হৃদস্পন্দন নিয়ে। সূর্যের সোনালি রোদে তার হাসি যেন আলো ভেঙে জন্ম নিয়েছিল। আর আমি,।বিস্ময়ে থেমে থাকা এক হৃদয়, সেই হাসির মধ্যেই খুঁজে পেলাম নিজের প্রথম ও শেষ প্রেমের ঠিকানা।"

বিহান হালকা হেসে বলল—

-"তুই ই প্রথম পুরুষ যে কিনা বিয়ের এত মাস পর নিজের বউয়ের প্রেমে পড়েছিস। এতটা প্রভাব ইসার বাহ্!"

ইলহান ধীরে মাথা নাড়লাম—

-"হ্যাঁ। নূরাইসা, আমার ব্লাডমুন, আমার #সূর্যস্নাত_ভালোবাসা। আমার নূরেজান!"

.

তিনজন ব্যাগ গুছিয়ে মেডিকেল রুমের সামনে এসে দাঁড়াল, রুহানের সঙ্গে শেষবারের মতো দেখা করার জন্য। করিডোর জুড়ে তখনও উত্তেজনার রেশ লেগে আছে। সাদা দেয়ালের গায়ে গায়ে ভেসে বেড়াচ্ছে অদ্ভুত এক ভারী নীরবতা, যেন বাতাস নিজেও শ্বাস নিতে ভুলে গেছে। দূরে কোথাও মনিটরের টিকটিক শব্দ, মাঝে মাঝে নার্সদের চাপা পায়ের আওয়াজ, সব মিলিয়ে পরিবেশটা অস্বস্তিকরভাবে থমথমে।

এইসব ঝামেলার ভেতরেই বিহান বেমালুম ভুলে গিয়েছিল নুহার কথা। যে কথাটা বলার জন্য সে এতক্ষণ ইলহানকে খুঁজছিল। কিন্তু এখন, মেডিকেল রুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই, আশা আর উৎকণ্ঠার মাঝখানে হঠাৎ করেই নুহার মুখটা স্পষ্ট হয়ে উঠল তার চোখের সামনে। বুকের ভেতরটা হালকা করে কেঁপে উঠল। বিহান ধীরে সবার দিকে তাকাল। কণ্ঠ গম্ভীর, সিদ্ধান্তে কঠিন—

-"তোমাদের একটা কথা বলার আছে। মনোযোগ দিয়ে শোন।"

রুহান ভ্রু কুঁচকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের ক্ষীণ ছোঁয়া—

-"সাসপেন্ড হয়েছ, কোনো আফসোস হচ্ছে না?"

বিহান বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে জবাব দিল—

-"না। ফালতু কথা রাখ। আমার কথা শোন।"

-"আচ্ছা, বলো।"

ইলহান নির্লিপ্ত চোখে তাকিয়ে রইল। বাইরে থেকে শান্ত দেখালেও ভেতরে ভেতরে যেন অজানা কোনো হিসাব কষছে। নূরাইসা, রুহান আর উপমা, তিনজনই উচ্ছ্বসিত অথচ কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে বিহানের দিকে। সবার নিঃশ্বাস অজান্তেই আটকে গেছে। ধীরে ধীরে বিহান সব খুলে বলতে শুরু করল।প্রতিটা শব্দ পড়ে যাচ্ছিল ভারী পাথরের মতো। কথার সাথে সাথে ঘরের বাতাস আরও ভারী হয়ে উঠল।মুহূর্তে মুহূর্তে বদলে যেতে লাগল সবার মুখের রং, কৌতূহল থেকে বিস্ময়, বিস্ময় থেকে অবিশ্বাস। হঠাৎ রুহান, নূরাইসা আর উপমা একসাথে চিৎকার করে উঠল—

-"কি?! তোমরা বিয়ে করে ফেলেছ?!"

বিহান কোনো কথা বলল না। শুধু নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। সেই নীরবতাটুকুই যেন হাজারটা শব্দের চেয়েও বেশি কিছু বলে দিল। তারপর সে ইলহানের দিকে তাকাল। কিন্তু অবাক হয়ে দেখল, ইলহানের মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। না বিস্ময়, না রাগ, না আনন্দ। কেবল গভীর এক স্থিরতা। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে, চিন্তার অতল গহ্বর থেকে উঠে আসা কণ্ঠে ইলহান বলল—

-"নুহার ওপর আবারও আক্রমণ হতে যাচ্ছিল। তুই চলে আসায় সেটা ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু ওরা আবার নুহার ওপর হামলা করার বোকামি করবে না, এটা আমি বিশ্বাস করি না। আর... সাথে ওরা আরও কিছু করেছে, আমি সিউর।"

তার কথায় ঘরটা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সবার চোখে-মুখে উদ্বেগ জমে উঠল। কেউ আর কিছু বলল না।ইলহান আর দেরি করল না। পকেট থেকে ফোন বের করল। তানভীরকে কল দিল। রিং বাজল, কিন্তু ধরল না। আবার চেষ্টা করল। একই নীরবতা। এবার বাড়ির নম্বরে কল করল। এইবার কল ধরতেই মুহূর্তের মধ্যে তার দুনিয়া যেন দুলে উঠল। হাত থেকে ফোন ফসকে পড়ে গেল মেঝেতে। ধাতব শব্দে সবার বুক কেঁপে উঠল। সবাই আঁতকে উঠে একসাথে বলে উঠল—

-"কি হয়েছে? বাড়িতে সব ঠিক আছে তো?"

ইলহানের গলা ভারী হয়ে এলো। চোখে ফুটে উঠল অচেনা এক শঙ্কা—

-"তানভীর আর আফরিন হাসপাতালে। বাড়ির সবাই ওখানেই আছে। আমাদের... আমাদের এখনই যেতে হবে!"

মেডিকেল রুমের ভেতরে তখন নিঃশ্বাসের শব্দগুলোও যেন অস্বাভাবিকভাবে জোরে শোনা যাচ্ছিল। দেয়ালের ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে মনে হচ্ছিল। আর বাইরে, নীরবে অপেক্ষা করছিল আরেকটা অজানা ঝড়।

বিজ্ঞাপন
সূর্যস্নাত ভালোবাসা গল্পটি নওরিন ইথিকা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ভালোবাসাময় গল্প