#নওরিন_ইথিকা
বাতাসে ফাল্গুনের সুবাস। চারিদিকে ফাল্গুনের সুর, যেন অদৃশ্য কোনো বাঁশি বসন্তের গানে ভাসিয়ে দিচ্ছে শহরের প্রতিটি অলিগলি। বিকেলের নরম আলোয় মানুষ পরিবার, সন্তান, স্বামী-স্ত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকা, সবাই উপভোগ করছে ফাল্গুনের আগমন। ছোট ছোট শিশুদের দৌড়ঝাঁপ, উচ্ছ্বসিত হাসির কলরব, সব মিলিয়ে চারপাশ যেন একটি মিষ্টি, সুরেলা গানের মতো প্রতিধ্বনিত হচ্ছে কানে। পথের ধারে পার্কে প্রেমিক যুগলের খুনসুটি, চোখাচোখিতে লুকিয়ে থাকা লাজুক ভালোবাসা। স্বামী–স্ত্রীর মধুর সম্পর্ক, একসঙ্গে হাঁটা, একসঙ্গে হাসা, সব মিলিয়ে বাতাস যেন বারবার বলে উঠছে, বসন্ত এসে গেছে।
শহরের চারপাশে বসন্তের গান ছড়িয়ে পড়ছে। বাতাসে সুবাস, রঙে রঙে জীবন। অথচ এই বসন্তের গান থেমে গেছে দেওয়ান বাড়ির দরজায় এসে। শুধু দেওয়ান বাড়িতে নেই কোনো বসন্ত, কোনো আনন্দ। পুরো বাড়িটা নিস্তব্ধ, মনমরা। সময় যেন থমকে দাঁড়িয়ে আছে। আফরিনকে এখনো হাসপাতাল থেকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়নি। আজ বারো দিন সে আর নুহা হাসপাতালে। তানভীরকে দুদিন পরেই রিলিজ দেওয়া হয়েছিল। আজ ৩০ মাঘ ১৪৩০ বঙ্গাব্দ (১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪) । বাইরে বসন্ত উল্লাস করছে, আর এই বাড়ির ভেতরে নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে জমে আছে অপেক্ষা। দাদা–দাদীকে সম্পূর্ণ বিষয় ইলহান বুঝিয়ে বলেছে, তবে অনেক সত্য ইচ্ছে করেই গোপন রেখেছে। বিশেষ করে আফরিনের সঙ্গে হওয়া সেই অমানবিকতার কথা। বলা হয়েছে এক্সিডেন্টের কথা। আফরিন ও তানভীর ভার্সিটি থেকে বাসায় ফেরার পথে দুজনের এক্সিডেন্ট হয়েছে, এইটুকুই সত্য হিসেবে তুলে ধরেছে ইলহান।তবে নুহার ব্যাপারে কোনো মিথ্যে বলা হয়নি। সম্পূর্ণ সত্যই বলা হয়েছে। না হলে বিহান ও নুহার বিয়ে নিয়ে প্রশ্ন থেকে যেতো, অপ্রয়োজনীয় সন্দেহ, অশান্তি ঘিরে ধরত পরিবারকে। বাইরে বসন্ত, ভেতরে শীতল নিস্তব্ধতা। ফাল্গুনের বাতাস দেওয়ান বাড়ির জানালায় এসে দাঁড়িয়ে ফিরে যায়, ভেতরে ঢোকার অনুমতি পায় না। এ যেন এমন এক বসন্ত, যে সবার ঘরে এসেছে, কিন্তু দেওয়ান বাড়িকে ছুঁয়ে দেখেনি।
বিহানের পরিবারকে সবটা বুঝিয়ে বলা হয়েছে। বিহানের মা তো আনন্দে আত্মহারা, দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর তার ইচ্ছে পূরণ হয়েছে। ছেলেকে বিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি কতদিন ধরেই না পিছনে পড়ে ছিলেন বিহানের। অথচ বিহান, বিয়ের নাম শুনলেই মুখ ঘুরিয়ে নিত। ইলহানকে বহুবার বলা হয়েছে তাকে বোঝানোর জন্য। কিন্তু বিহান বুঝল তো! নিজের সিদ্ধান্তে অনড়, নিজের জগতে স্থির। বিহানের মায়ের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বিয়ে হয়েছে বিহানের। তাও নুহার সাথে। যে মেয়েটিকে তারা জন্ম থেকেই দেখে এসেছে। এই বিয়ের সত্যিটা যেন একসাথে বিস্ময় আর স্বস্তি হয়ে এসেছে সবার জীবনে।নুহাকে বিহানের মা বরাবরই পছন্দ করতেন। কিন্তু নুহার বয়স কম, এই বিষয়টাই ছিল সবচেয়ে বড় বাধা।
ইকবাল দেওয়ান নুহাকে ভীষণ ভালোবাসেন। নিজের সন্তানের মতো। নাহিদ দেওয়ান বিয়েতে রাজি হলেও, ইকবাল দেওয়ান কখনোই রাজি হতেন না। নুহাকে এত তাড়াতাড়ি বিয়ে দিতে তিনি চাননি। সেই কারণেই কখনো নুহার হাত চাননি বিহানের জন্য। তার মনে অন্য এক পরিকল্পনা ছিল। ভেবেছিলেন, আর কয়েক মাস গেলে, যদি ছেলেকে রাজি করানো যায়, তাহলে আফরিনের জন্যই বিয়ের প্রস্তাব দেবেন। কিন্তু মানুষ যা ভাবে, সব কি আর তেমন হয়? আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন। যেভাবেই হোক, বিয়ে তো হয়েছে। এই সত্যটুকুতেই তিনি খুশি। কিন্তু আফরিনের সঙ্গে যা ঘটেছে, তার পর নিজের সেই খুশিটুকু প্রকাশ করার মানসিকতা তার নেই। বুকের গভীরে কোথাও এক ধরনের অপরাধবোধ, এক ধরনের চাপা কষ্ট কাজ করে যায়। দেওয়ান বাড়ির প্রতিটা সন্তান তার কাছে নিজের সন্তানের মতোই। তালুকদার আর দেওয়ান পরিবার বহুদিনের পারিবারিক বন্ধু, সাথে ব্যবসায়িক পার্টনার। তাদের বিপদ মানেই নিজের বিপদ। তাই এই অবস্থাকে এভাবে ফেলে রাখা যায় না। আফরিনকে স্বাভাবিক করতে হবে। তাকে আবার জীবনের আলোয় ফিরিয়ে আনতে হবে। তার পরেই বিহান আর নুহার বিয়ের একটি সামাজিক আয়োজন করে নুহাকে বাড়িতে তুলতে হবে। না হলে সমাজ কথা বলবে।বদনাম রোটাবে। যদিও এমন কঠিন পরিস্থিতিতেও দক্ষ ইলহান সব কিছু সামলে নিয়েছে। দুই বোনের সম্মান সে আগলে রেখেছে দৃঢ় হাতে। আফরিনের খবর দেওয়ান আর তালুকদার পরিবার ছাড়া আর কেউ জানে না। সমাজের চোখে সবকিছুই স্বাভাবিক।বিহানের বাবা-মা সামাজিকভাবেই এসে নুহার হাত চেয়ে গেছেন। এখন শুধু একটাই অপেক্ষা, আফরিনের সুস্থ হওয়ার। ঘরের ভেতর আপাত শান্তি। কিন্তু সেই শান্তির নিচে চাপা উত্তেজনা, অদেখা অশান্তি আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা নিঃশব্দে শ্বাস নিচ্ছে।
.
বিকেলের নরম রোদ এসে পড়ছে আফরিনের মুখের ওপর। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সে নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে ঢাকার ব্যস্ত নগরীর দিকে। নিচে ছুটে চলা গাড়ি, মানুষের ভিড়, শব্দ, সবকিছুই যেন আলাদা এক পৃথিবী। আগামীকাল ভালোবাসা দিবস। পহেলা ফাল্গুন। দেখতে দেখতে জানুয়ারি মাসও শেষ হয়ে গেছে। অথচ এত ঝামেলা, এত অশান্তির ভেতর নতুন বছরটাকে উপভোগ করাই হয়ে ওঠেনি দেওয়ান বাড়ির কারও। আফরিন জানালার কাঁচ ছুঁয়ে নিচে তাকিয়ে থাকে। রাস্তায় রাস্তায় ফুলের সমারোহ। লাল, হলুদ, কমলা, ভালোবাসার রঙে রঙিন শহর। সবাই ব্যস্ত আগামীকালের জন্য, ভালোবাসা প্রকাশের প্রস্তুতিতে। অথচ জানালার এপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার বুকজুড়ে শুধু বিষণ্নতা। চোখে জমে থাকা একরাশ না–বলা কথা। হঠাৎ পেছন থেকে নূরাইসার মিষ্টি, মধুর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। আফরিন ফিরে তাকায় না।সেনাবাহিনী থেকে ফিরেই নূরাইসা সোজা হাসপাতালে। একা হাতে আফরিন আর নুহার সেবা–যত্নে সে ক্লান্তিহীন। নাজনীন বেগম, তানিয়া বেগম, ইলিনা বেগম, কেউ একদিনের জন্যও তাকে এখান থেকে সরাতে পারেনি। উপমাও নূরাইসার সঙ্গে আছে। মাত্র কয়েকদিনেই দেওয়ান পরিবারকে আপন করে নিয়েছে মেয়েটা। সারাদিন এখানে থাকে উপমা। রাতে রুহান তাকে বাসায় দিয়ে আসে। রুহান, তানভীর, বিহান, সবাই রাতে এসে আড্ডা দেয়। ইলহান প্রতি রাত হাসপাতালেই থাকে। বাকিরা ফিরে যায়। নুহার শরীর ভীষণ দুর্বল। এত অল্প বয়সে এত মা র তার শরীর নিতে পারেনি। হাতে ফ্র্যাকচার, সেরে উঠতে সময় লেগেছে। প্রতিদিন তালুকদার বাড়ি আর দেওয়ান বাড়ির সবাই আসে, সকালের ও দুপুরের খাবার নিয়ে। রাতে ইকবাল দেওয়ান আর নাহিদ দেওয়ান খাবার নিয়ে এসে কিছুক্ষণ থেকে ফিরে যান। হাসপাতালের এই ঘরটা ধীরে ধীরে একটা অস্থায়ী সংসারের রূপ নিয়েছে। আফরিনের ভাবনার মাঝেই নূরাইসা এসে তার সামনে এক গুচ্ছ লাল গোলাপ তুলে ধরে।আফরিন মাথা নিচু করে তাকায়। ঠোঁটের কোণে একফোঁটা মৃদু হাসি জন্ম নেয়, যেন বহুদিন পর ভুল করে এসে পড়া কোনো অনুভূতি। নূরাইসা পেছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলে ওঠে—
-"ভালোবাসা দিবসের অগ্রিম শুভেচ্ছা, মেরি জান!"
আফরিন ধীরে হেসে বলে—
-"আমার জীবনে আর কোনোদিন ভালোবাসা আসবে না, ইসা। তাই ভালোবাসা দিবসের শুভেচ্ছা বৃথা!"
নূরাইসা সঙ্গে সঙ্গে আফরিনকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেয়। মুখের সামনে উড়ে আসা কয়েক গোছা চুল কানের পেছনে গুঁজে দেয়। চোখে গভীর মমতা, ঠোঁটে নরম হাসি। তারপর মিষ্টি স্বরে বলে—
-"এই কথাটা তুই বলছিস ঠিকই, কিন্তু বিশ্বাস করিস না। মানুষ যত ভাঙে, ভালোবাসা তত কাছ থেকে তাকে খুঁজে পায়। এখন নয়... কিন্তু একদিন ঠিকই আসবে, আফরিন। এমন ভালোবাসা, যেটা আর কষ্ট দেয় না, শুধু আগলে রাখে। তাছাড়া, আমাদের ভালোবাসা তোর জন্য যথেষ্ট না?"
ঘরের বাইরে সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে ঘনিয়ে আসে। জানালার ওপাশে ফুলে শহর প্রস্তুত হচ্ছে ভালোবাসা উদ্যাপনে। আর এই ঘরের ভেতরে, দু’টো মেয়ের নিঃশব্দ কথোপকথনে, ভাঙা মনটাও অজান্তেই একটু একটু করে জোড়া লাগতে শুরু করে। আফরিন ধীরে চোখ তুলে তাকায়। চোখে ক্লান্তি, কণ্ঠে ভাঙা শান্তি—
-"তোদের জন্যই তো বেঁচে আছি!"
নূরাইসা হালকা করে হাসে। সেই হাসিতে মায়া আছে, শক্তিও আছে। সে আফরিনকে আলতো করে ধরে বিছানায় বসিয়ে দেয়। আফরিনের পেছনে দাড়িয়ে তার এলোমেলো চুলগুলো যত্ন করে সোজা করে বেণি গেঁথে দেয়। তারপর মুখোমুখি বসে, আফরিনের দুই হাত নিজের হাতে নিয়ে বলে—
-"মানুষের জীবনে আল্লাহ বিপদ দেন, তাকে পরীক্ষা করার জন্য। তার ঈমান কতটা শক্ত সেটা জানার জন্য। ভালো মানুষের জীবনে সব সময় বিপদ আর পরীক্ষা থাকবেই। পৃথিবীতে আমাদের চেয়েও বহু কষ্ট নিয়ে মানুষ হাসিমুখে জীবন পার করছে। আমাদের জীবনে আল্লাহর রহমত আছে বলেই এমন একটি পরিবারের অংশ আমরা, যারা প্রতিনিয়ত আমাদের পাশে থাকে, বিপদ থেকে রক্ষা করে। তবে কিছু বিপদ আছে যা শত্রুদের থেকে আসে। সব বিপদ থেকে তো আর রক্ষা পাওয়া যায় না, সোনা। তোর সাথে যা হয়েছে সেটা ভোলার মতো না। তোকে ভুলতেও বলবো না। তুই আমার সাহসী বোন। তোকে বোঝানোর প্রয়োজন নেই। তুই আমার চেয়েও যথেষ্ট বেশি বুঝদার। আমি জানি, তুই এই খারাপ সময়ও হাসিমুখে পার করে দিতে পারবি।"
নূরাইসার কথাগুলো আফরিনের বুকের ভেতরে গিয়ে জমে। সে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। সেদিনের পর থেকে আফরিন আর কাঁদেনি। কেন জানি, কান্না আর আসে না তার। চোখ শুকিয়ে গেছে,অনুভূতিগুলো যেন ভেতরে জমে পাথর হয়ে আছে। ভাঙা কণ্ঠে সে বলে ওঠে—
-"আমার এই মুখ তো আমি কাউকে দেখাতে পারবো না, ইসা। আমার সম্মান ধুলিস্যাৎ হয়ে গেছে। আমি বাইরে বেরোলেই সবাই বলবে, ‘ওই দেখ, ধ র্ষি তা যাচ্ছে।’ আমি তো আর আগের মতো বাঁচতে পারব না!"
নূরাইসার কপাল কুঁচকে যায়। চোখে ঝলসে ওঠে প্রতিবাদ—
-"তুই কি নিজের ইচ্ছায় ধ র্ষি তা হয়েছিস?"
আফরিন নীরবে মাথা নাড়ে, না। নূরাইসা আবার বলে—
-"তুই কি ছেলেগুলোর সাথে নিজের ইচ্ছায় গিয়েছিলি? তাদের বলেছিলি তোর সম্মান নিয়ে নেক?"
-"না!"
এবার নূরাইসার কণ্ঠ শক্ত হয়ে ওঠে। কাঁপে না, ভাঙে না। স্পষ্ট, দৃঢ়, নির্ভীক—
-"তাহলে লজ্জা তোর না, আফরিন। লজ্জা ওদের।তোর সম্মান কেউ নিতে পারেনি। তোর সম্মান তোর আত্মায়, তোর চরিত্রে, তোর বেঁচে থাকার লড়াইয়ে।সমাজ যদি চোখ তুলে কথা বলে, মনে রাখবি, ওদের চোখ নোংরা, তুই না। তাহলে তোর দোষ কোথায়? তুই তো নিজে গিয়ে নিজের সম্মান বিকিয়ে আসিস নি। সম্মান এত ঠুনকো না, রিন! ওই অসভ্য জা নোয়ার গুলোর জন্য তোর সম্মানে এক চুল পরিমাণ আঘাতও আসেনি। আর কোনোদিন আসবেও না। তুই কোনো অন্যায় করিস নি যে তোকে মাথা নিচু করে হাঁটতে হবে। যে ধ র্ষ ণ করে অপরাধ তার, তোর নয়। মাথা নিচু করে হাঁটলে সে হাঁটবে, তুই না। হ্যাঁ, আমাদের সমাজে ধ র্ষি তা কেই মানুষ অপমান করে, নিচু চোখে দেখে। এটা মানুষ হিসেবে তাদের ব্যর্থতা, তোর না। তুই সঠিক। তোর সম্মান এখনো অক্ষুণ্ণ রয়েছে। কিছু জা নো য়া রের জন্য তোর সম্মানে কোনো আঘাত আসেনি। তুই কেন নিজেকে দোষী ভাবছিস? তুই দোষী না। আমাদের ধর্মেও কিন্তু এই অধিকার দেওয়া আছে, ধ র্ষি তা তার ধ র্ষ ককে খু ন পর্যন্ত করতে পারবে।যেখানে আমাদের ধর্ম কোনো ধ র্ষি তা কে অপমান বা অসম্মান করে না, সেখানে এই মানুষগুলোর কথায় তোর সম্মান নষ্ট হবে? কোনোদিনও না। তুই বাঁচবি আগের মতোই, মাথা উঁচু করে বাঁচবি!"
কথাগুলো নূরাইসার কণ্ঠে আগুন হয়ে ঝরে পড়ছিল। প্রতিবাদ, বিশ্বাস আর ভালোবাসা, সব একসাথে। ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে আসে। জানালার বাইরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাতের দিকে এগোচ্ছে। হাসপাতালের সাদা আলোয় দুই বোন মুখোমুখি বসে, একজন ভাঙা, আরেকজন ভাঙা মন জোড়ার অদম্য শক্তি নিয়ে। এই মুহূর্তে, এই ঘরেই, আফরিন বুঝতে পারে, সে একা নয়।ভাঙলেও সে হারেনি। ঠিক তখনই—
-"আর আমরা তোমার পাশে আছি। নিজেকে কখনো ছোট করে দেখবে না, আফরিন। তুমি কোনো অন্যায় করো নি। তাই তুমি মাথা উঁচু করে বাঁচবে!"
আফরিন আর নূরাইসা একসাথে দরজার দিকে তাকায়। নুহা আর উপমা দাঁড়িয়ে আছে সেখানে।দু’জনেই এগিয়ে আসে। মুহূর্তেই ঘরটা যেন ভরে যায় নিঃশর্ত ভালোবাসায়। আফরিনের চোখ ভরে ওঠে। এত ভালোবাসা সে আর ধরে রাখতে পারে না। হুহু করে কেঁদে ওঠে। কেউ আর তার কান্না থামায় না। কান্না করা ভালো, ভেতরে জমে থাকা সব কষ্ট যখন কান্না হয়ে বেরিয়ে আসে, তখনই মানুষ একটু হালকা হয়। সেদিনের পর থেকেই আফরিন আর কাঁদেনি। এই অস্বাভাবিক নীরবতাই সবাইকে চিন্তায় ফেলেছিল। তাই প্রতিদিন কাউন্সেলিং চলছিল। ডাক্তাররাও বলেছিলেন, তার কান্না করা প্রয়োজন। উপমা, নূরাইসা আর নুহা, তিনজন একসাথে আফরিনকে জড়িয়ে ধরে। ওরাও কেঁদে ফেলে। চারটি মেয়ে, পরস্পরের শক্তি হয়ে দাঁড়ায়।
আফরিন মানসিকভাবে যথেষ্ট স্ট্রং। কিন্তু তার ভেতরে একটা ট্রমা তৈরি হয়েছে। পুরুষের স্পর্শ। নিজের পরিবারের পুরুষ ছাড়া কারো স্পর্শ গায়ে লাগলেই সে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। পুরুষ ডাক্তাররা চেকআপ করতে এলেই সে গুটিয়ে যায়, নিজেকে ছোট করে ফেলে। এই ট্রমাটাই এখন কাউন্সেলিংয়ের মূল বিষয়। বাকিটা সে সামলাতে পারছে। ধীরে ধীরে ডাক্তারদের স্পর্শ নিতে পারছে সে। তবে হঠাৎ করে কেউ ছুঁয়ে ফেললেই শরীর কেঁপে ওঠে, শ্বাস আটকে আসে। সবাই অসম্ভব ধৈর্যের সঙ্গে আফরিনের চিকিৎসা করাচ্ছে। তাড়া নেই। জোর নেই। শুধু অপেক্ষা আর ভালোবাসা। আগামীকাল নুহা আর আফরিনকে বাসায় নিয়ে যাওয়া হবে।হাসপাতালের ঘর ছেড়ে, আবার জীবনের দিকে, ধীরে, খুব ধীরে।
প্রতিদিন রাত নামলেই রুহান, তানভীর, ইলহান, বিহান, সবাই এসে হাজির হয় আফরিনের পাশে। যেন রাতটাই ঠিক করা আছে তার জন্য। কেউ কথা বলে, কেউ পাশে বসে থাকে, কেউ খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করে। রুহান আর তানভীরের খুনসুটিতে আফরিনের মুখে মাঝেমধ্যে অজান্তেই হাসি ফুটে ওঠে। সেই হাসির ভেতর লুকিয়ে থাকে দীর্ঘদিনের জমে থাকা চাপ থেকে পাওয়া সামান্য স্বস্তি। ভাইবোনের এই নিঃশর্ত ভালোবাসা, যত্ন আর উপস্থিতি ধীরে ধীরে আফরিনকে স্বাভাবিকতার পথে ফিরিয়ে আনছে। দিনের আলোয় সে অনেকটাই স্থির থাকে। কিন্তু সন্ধ্যা নামলেই বুকের ভেতর অজানা আতঙ্ক বাসা বাঁধে। অন্ধকারের সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিরাও যেন নীরবে জেগে ওঠার চেষ্টা করে। তাই ঠিক সন্ধ্যার দিকেই সবাই ছুটে আসে, আফরিনের মনটা অন্যদিকে ফেরাতে। রুহান তখন ইচ্ছা করেই অতিরিক্ত রসিকতা করে, হাস্যকর গল্প বলে, এমন কিছু বলে যাতে আফরিন অন্য কিছু ভাবার সুযোগই না পায়। তার মস্তিষ্কের ভেতর যেনো কোনো ফাঁকা জায়গা না থাকে, যেখানে সেই ভয়াবহ রাত ঢুকে পড়তে পারে। প্রতিদিন রাতের আড্ডা, খাওয়া-দাওয়া, হাসি-ঠাট্টা, সবকিছুই চলে পুরোনো দিনের মতো।বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, কিছুই বদলায়নি। অথচ ভেতরে ভেতরে সবাই জানে, এই স্বাভাবিকতার আড়ালেই লুকিয়ে আছে অদৃশ্য যুদ্ধ। সারাদিন আর সারারাত সবাই শুধু একটাই কাজ করে চলেছে, আফরিনকে ভালো রাখার চেষ্টা। কেউ গল্প শোনায়, কেউ পাশে বসে থাকে, কেউ অকারণে কথা বলে যায়।এর ফলে আফরিনের মনটাও কিছুটা হালকা থাকে। সে সেই রাতের কথা ভাবার সুযোগই পায় না। কিন্তু গভীর রাতে, যখন চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে আসে, তখন স্বপ্নে ঠিকই ধরা দেয় সব। অন্ধকারের ভেতর স্মৃতিরা শব্দ করে ওঠে। সেই মুহূর্তগুলোতে ভাগ্যক্রমে তার পাশে থাকে নূরাইসা আর ইলহান। ওরা যেন প্রহরী।সারারাত জেগে থাকে, এক মুহূর্তের জন্যও চোখ সরায় না। দিনের বেলায় দুজনেই ক্লান্ত শরীরে কাজ করে, আর রাত নামলেই আবার জেগে ওঠে আফরিনের জন্য। ঘুম যেন তাদের কাছে বিলাসিতা। এইসব দেখে আফরিনের ভীষণ খারাপ লাগে। অপরাধবোধে বুক ভারী হয়ে ওঠে। কিছু বলতে গেলে নূরাইসা আর ইলহান দুজনেই ধমকে দেয়, আদর আর কড়াকড়ির মিশ্রণে তাকে চুপ করিয়ে রাখে। তাই আফরিন আর কিছু বলার সাহস পায় না। এইসব কিছুর মাঝেই তার একমাত্র স্বস্তি, কাল এসব থেকে ছুটি। বাড়িতে ফিরে গেলে নূরাইসা আর ইলহান অন্তত একটু বিশ্রাম নিতে পারবে। এই ভাবনাটুকুই তার বুকের ভেতর শান্তির একফোঁটা আলো হয়ে থাকে।
.
আজ আফরিন আর নুহার রিলিজ ডেট। হাসপাতালের করিডোরে এক অদ্ভুত ব্যস্ততা, কিন্তু সেই ব্যস্ততার ভেতর চাপা উত্তেজনা আর অনুচ্চারিত আশঙ্কা লুকিয়ে আছে। রুহান, তানভীর আর বিহান ব্যাগের পর ব্যাগ গুছিয়ে গাড়ির ভেতরে তুলে রাখছে। কারও মুখে তাড়াহুড়ো নেই, কিন্তু চোখে আছে দীর্ঘ অপেক্ষার ক্লান্তি। এদিকে নুহার কেবিনের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। চার মেয়ে সকাল থেকে কী করছে, তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। মাঝেমধ্যে ভেতর থেকে হাসির শব্দ ভেসে আসে, আবার কখনো নিস্তব্ধতা। সেই দরজার আড়ালে যেন অন্য এক জগৎ, যেখানে বিদায়ের আবেগ, স্বস্তি আর চাপা ভয় একসঙ্গে জমে আছে।
ইলহান ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলছে। কণ্ঠ শান্ত, চোখ সতর্ক। নুহা পুরোপুরি সুস্থ, এই কথাটা ডাক্তার স্পষ্ট করেই বলেছে। কিন্তু আফরিনের ব্যাপারটা আলাদা।সপ্তাহে তিন দিন কাউন্সিলিং করাতে হবে। না হলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে না সে। পরিবারকে ভীষণ সতর্ক থাকতে হবে। এইসব নিয়ে কোনো আলোচনা করা যাবে না। তাকে সবসময় হাসি-খুশি রাখতে হবে। বিভিন্ন এক্টিভিটিসে ব্যস্ত রাখতে হবে, যাতে সেইসব স্মৃতি মাথা তুলতে না পারে। ধীরে ধীরে, আল্লাহর রহমতে, সে স্বাভাবিক হয়ে যাবে, এই আশ্বাসই এখন একমাত্র ভরসা। ডাক্তারের সঙ্গে কথা শেষ করে ইলহান ফার্মেসি থেকে নুহা আর আফরিনের প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র কিনে গাড়ির ভেতরে রেখে দিল। গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে রুহান, তানভীর আর বিহান। ইলহান এসে তাদের সামনে দাঁড়াল। একবার হাসপাতালের মেইন গেটের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল—
-"এখনো নামে নি ওরা?"
রুহান বিরক্তির সঙ্গে উত্তর দিল—
-"না। কী করছে কে জানে?"
রুহান আর তানভীর নিজেদের মধ্যে কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বিহান ইলহানের দিকেই তাকিয়ে ছিল।একটু থেমে চিন্তিত কণ্ঠে বলল—
-"তুই এত শান্ত যে?"
ইলহানের কণ্ঠ নির্লিপ্ত—
-"কি করতে বলছিস?"
বিহান ভ্রু কুঁচকে বলল—
-"তোর এই শান্ত থাকা আমার সুবিধার লাগছে না, ইলহান!"
ইলহান ধীরে নিশ্বাস ছেড়ে বলল—
-"শান্ত আছি শুধু বোনদের মুখের দিকে তাকিয়ে। ইঁদুরও গর্তে লুকিয়েছে। বোনটাকে সুস্থ করি। এরপর তাণ্ডব শুরু করবো!"
বিহান এক পা এগিয়ে এসে ইলহানের কাঁধে হাত রাখল। কণ্ঠে আশ্বাস, চোখে দৃঢ়তা—
-"প্রতিটা পদক্ষেপে আমাকে পাশে পাবি।"
ইলহান চোখ সরিয়ে বলল—
-"আদিবাসীরা কাউকে আঘাত করে না যতক্ষণ পর্যন্ত নিজেদের ওপর আঘাত না আসে। ওদের নুহাকে মারাটা আমার বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না!"
বিহান শান্ত অথচ ভয়ংকর দৃঢ় কণ্ঠে বলল—
-"ওদের ব্যবস্থা আমি করছি। ওটা আমার ওপর ছেড়ে দে। কেউ রেহাই পাবে না। একজনকেও ছাড়বো না আমি, কথা দিলাম!"
ইলহান বন্ধুর কঠিন মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। সেই হাসিতে কোনো হালকাপনা নেই, আছে বোঝাপড়ার নীরব সম্মতি। ঠিক তখনই তানভীরের একটি ফোন এলো। কথা বলতে বলতে সে কয়েক পা দূরে সরে দাঁড়াল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই, মেয়েরা এসে হাজির হলো। তিন জোড়া চোখ একসঙ্গে সেদিকে স্থির হয়ে রইল। চারজোড়া চোখের দৃষ্টি আটকে গেল চারজন অপরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী রমণীর ওপর।যেন সময় থমকে গেছে, শব্দ থেমে আছে, কেবল চোখই কথা বলছে। দুজোড়া বাদামি চোখের মনিতে একসঙ্গে প্রতিফলিত হলো দুজন রমণী, চেনা, আপন, বুকের গভীরে লুকিয়ে থাকা সমস্ত আশঙ্কা আর ভালোবাসা একাকার হয়ে গেল সেই দৃষ্টিতে। একজোড়া কালো চোখের মনিতে ঝলসে উঠল এক অষ্টাদশীর রূপ, তারুণ্যের দীপ্তি, জীবনের প্রতি অব্যক্ত আকাঙ্ক্ষা আর নিষ্পাপ দৃঢ়তা মিশে এক অনির্বচনীয় আলো হয়ে। আর দূরের একজোড়া নীল চোখের মনিতে ভেসে উঠল এক ক্ষতবিক্ষত রমণীর অপরূপ রূপ, যেন ভাঙনের ভেতর দিয়েও সৌন্দর্য হারায় না, বরং আরও গভীর হয়ে ওঠে।
চার রমণী বাসন্তী রঙের শাড়িতে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। সেই রঙে মিশে আছে বসন্তের প্রতিশ্রুতি, নতুন শুরুর ইঙ্গিত, আর দীর্ঘ অন্ধকার পেরিয়ে আলোয় ফেরার নীরব ঘোষণা। হাসপাতালের সাদা দেয়াল, সবকিছু হঠাৎই ফিকে হয়ে গেল। মুহূর্তটুকু জুড়ে রইল শুধু তারা, আর তাকিয়ে থাকা চোখগুলোর নিঃশব্দ স্পন্দন।
উপমা বাসন্তী রঙের শাড়ি পরেছে। চুলগুলো খোপা করে বেঁধেছে। সেই খোপায় গুঁজে দিয়েছে হলুদ গোলাপ, টাটকা, সদ্য ফোঁটা। মুখের সামনে কিছু চুল অবহেলায় নেমে এসেছে, যেন সাজ নয়, স্বভাব। ঠোঁটে হালকা গোলাপি ছোঁয়া, চোখে নরম কাজল, কপালে ছোট্ট কালো টিপ। তাকে দেখলে মনে হয়, সে নিজেই যেন সদ্য ফোঁটা একখানা হলুদ গোলাপ। রুহানের এক হাত অজান্তেই বুকের বাম পাশে চলে যায়। নিঃশ্বাস নিতে ভুলে যায় সে।
উপমার পাশেই নুহা। ছোট্ট শরীর, তবু উপস্থিতি স্পষ্ট।কাঁচা হলুদ রঙের শাড়ি, তার ভেতর নীলের ছোঁয়া। নীল ব্লাউজের সঙ্গে মিলিয়ে কানের পাশে রাখা নীল গোলাপ। চুলগুলো বেণি করে বাঁধা। ঠোঁটে লালের ছোঁয়া, যেন লাল গোলাপের পাপড়ি। চোখে কাজল, কপালে ছোট্ট নীল টিপ। লাজুক হাসি মুখে। বারবার বিহানের দিকে তাকাচ্ছে, আবার লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিচ্ছে। আর বিহান? সে হা হয়ে তাকিয়ে আছে। একদৃষ্টে। এই মেয়েটা তাকে মারার জন্যই এমন করে সেজেছে।
নুহার পাশেই আফরিন। টকটকে হলুদ শাড়ি। খোলা চুলে সাদা গোলাপ ফুল। ঠোঁটে গোলাপি ছোঁয়া, চোখে হালকা কাজল, কপালে ছোট্ট টিপ। এতদিনের অসুস্থতার কোনো চিহ্ন নেই তার মুখে। কেউ দেখলে বিশ্বাসই করবে না, এই মেয়েটাই কয়েকদিন আগেও ভেঙে পড়া একখানা জীবন ছিল। দূরে একজোড়া নীল চোখ মুগ্ধ হয়ে তাকে দেখছে। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম। চোখ সরানোর শক্তিটুকুও নেই।
আফরিনের পাশেই নূরাইসা। লাল-হলুদের মিশ্র রংয়ের শাড়ি, যেন একটুকরো সূর্য। ঠোঁট রক্তজবার নেয় লাল। খোলা লম্বা চুল বাতাসে উড়ছে। সামনের কিছু চুল নিয়ে পিছনে বাঁধা, সেখানে গুঁজে রাখা লাল গোলাপ ও সাদা বেলি ফুলের গাজরা। ইলহানের চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসছে সে। ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসে। হঠাৎ করেই, এক চোখ মারে। বিস্ময়ে ইলহানের চোখ বড় বড় হয়ে যায়।
চারজন মেয়েই এসে তাদের সামনে দাঁড়ায়। মুহূর্তের জন্য সবাই বাকরুদ্ধ। শব্দ থেমে যায়, সময় জমে থাকে। ইলহান হঠাৎ করে নূরাইসার এক হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে তাকে নিজের বুকের ওপর ফেলে বলে ওঠে—
-"নির্লজ্জ হয়ে যাচ্ছেন, নূরেজান। স্বামীকে রাস্তা ঘাটে টিজ করছেন? চোখ মারছেন?"
চারপাশের বাতাসে মুহূর্তেই হাসির রেশ জমে ওঠে।নূরাইসা একটুও অপ্রস্তুত হয় না। বরং ইলহানের বুকের উষ্ণতায় গা এলিয়ে দিয়ে, চোখের কোণে দুষ্টু হাসি নিয়ে মৃদু কণ্ঠে বলে—
-"নির্লজ্জ স্বামীর সাথে থাকতে থাকতে নির্লজ্জ হয়ে যাচ্ছি!"
উচ্চ শব্দে হেসে ওঠে সবাই। হাসির ভেতরে জমে থাকা ক্লান্তি, হাসপাতালের গন্ধ, টানা উৎকণ্ঠা, সব যেন কিছুক্ষণের জন্য হালকা হয়ে যায়। ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়ায় তানভীর। ভ্রু কুঁচকে, ঠাট্টার সুরে বলে—
-"কিরে ভাই এতো সেজেছিস কেনো তোরা? মনে হচ্ছে ফুলের দোকান বসেছে এখানে!"
নূরাইসা তখনও ইলহানের বুকেই পড়ে আছে। ইলহান একচুলও ছাড়ছে না। সে সেভাবেই থেকে বলল—
-"অনেকদিন হাসপাতালে ছিলাম তো ভালো লাগছিল না। তাই উপমা আপুকে এইসব কিছু আনতে বলেছিলাম। আজকে আমরা সবাই ঘুরতে যাব।আফরিনের ভালো লাগবে।"
এই নামটা উচ্চারিত হতেই সবার চোখে একসাথে নরম ছায়া নামে আসে। কারও আলাদা করে কিছু বলার দরকার পড়ল না। সবাই বুঝে গেলো, এটা শুধুই ঘোরার পরিকল্পনা নয়, এটা আফরিনের মন ভালো রাখার আরেকটা নীরব যুদ্ধ। নিঃশব্দ সম্মতিতে মাথা নাড়ে সবাই। গাড়িতে উঠতে যাবে, এমন সময় হঠাৎ করে বাতাস চিরে ভেসে আসে এক পুরুষের কণ্ঠস্বর।ভারী, অধিকারী, ঠান্ডা—
-"আমার বউকে নিয়ে কোথায় যাওয়া হচ্ছে?"
একসাথে সবাই পেছনে ফিরে তাকায়। দূরে দাঁড়িয়ে আছে এমরিন রাহাফ। স্যুট–বুটে মোড়া, মুখে জমাট নির্লিপ্ততা। তার পেছনে সারিবদ্ধ অসংখ্য গার্ড, যেন এই জায়গাটা কোনো অঘোষিত যুদ্ধক্ষেত্র। হাসি মিলিয়ে যায়। কপাল কুঁচকে যায় সবার। ইলহানের কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু সেই শান্তির নিচে চাপা আগুন—
-"কি চাই তোর এখানে?"
এমরিন দু’পা এগিয়ে আসে। চারপাশের বাতাস আরও ভারী হয়ে ওঠে। সে আফরিনের এক হাত ধরে এক ঝটকায় টেনে নিজের বুকে ফেলে বলে—
-"বউকে চাই। অনেকদিন তো থাকলো ভাইবোনদের সাথে। এবার শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার সময় হয়েছে।"