বিহান ইলহানকে দীর্ঘ সময় ধরে বুঝিয়েছে, রাগ নয়, ঠান্ডা মাথায় কথা বলাই একমাত্র পথ। নূরাইসার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আবেগের বিস্ফোরণ নয়, সংযমই সমাধান। কয়েক ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন বোঝানোর পর অবশেষে ইলহানকে বাড়ি পাঠিয়ে দেয় বিহান। তারপর নিজে বেরিয়ে পড়ে, কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজে।
একটি অভিজাত রেস্টুরেন্টে বসে আছে বিহান। কয়েক ঘণ্টার মিটিং করতে হয়েছে তাকে। বাবার ব্যবসার বড় একটি অংশই তার কাঁধে। ঢাকায় থাকলে যতটা সম্ভব কাজ এগিয়ে রাখে সে; চট্টগ্রামে গেলে ব্যবসায় ততটা সময় দেওয়া হয়ে ওঠে না। এইমাত্র ক্লায়েন্ট চলে গেছে। বিহান উঠে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই হঠাৎ একটি পরিচিত, মেয়েলি কণ্ঠ তার কানে এসে ধাক্কা দিল। কণ্ঠস্বরটা শুনেই সে থমকে গেল। মেয়েটি তার সামনে রাখা চেয়ারে বসে, মিষ্টি অথচ আত্মবিশ্বাসী স্বরে বলল—
-"কেমন আছো, বিহান?"
বিহান ধীরে চোখ তুলল। মুহূর্তের মধ্যেই তার চক্ষুদ্বয় রক্তিম হয়ে উঠল, চেনা রাগ, জমে থাকা ক্ষোভ একসাথে জেগে উঠেছে। রুক্ষ কণ্ঠে সে বলে উঠল—
-"তুমি এখানে কী করছ?"
-"কেন? আমাকে দেখে খুশি হওনি?"
-"তোমাকে দেখে খুশি হব আমি? ভাবলে কী করে, আরবী?"
আরবী মুচকি হেসে তাকিয়ে রইল বিহানের চোখের দিকে। সেই হাসিতে অনুশোচনা নেই, আছে অদ্ভুত এক নির্লজ্জ নিশ্চিন্ততা। সুরেলা কণ্ঠে সে বলল—
-"অতীত ভুলে যাও, বিহান। আমার কিছু করার ছিল না। সত্যি বলছি।"
বিহান আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। কোনো উত্তর না দিয়েই চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল। ঘুরে হাঁটা শুরু করল রেস্টুরেন্টের দরজার দিকে। একবারও পিছু ফিরে তাকাল না। আরবী তার পিঠের দিকে তাকিয়ে রইল। ধীরে ধীরে অদৃশ্য হলো বিহান। আরবীর ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক রহস্যময় হাসি। প্রায় ফিসফিস করে, নিজের মনেই বলে উঠল—
-"নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতিই আমাদের আকর্ষণ বরাবরই বেশি...!"
রেস্টুরেন্টের আলো, শব্দ, মানুষের কোলাহলের মাঝেও মুহূর্তটা যেন হঠাৎ থমকে গেল, একটি অপূর্ণ অধ্যায়ের মতো, যা এখনো শেষ হয়নি।
.
নূরাইসা বিষণ্ন মুখে বারান্দার রেলিং আঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি দূরের আকাশে, যেন সেখানে কোথাও তার না বলা কথাগুলো ভাসছে। ফেব্রুয়ারি মাস প্রায় শেষ।শীত ধীরে ধীরে বিদায় নিচ্ছে, রেখে যাচ্ছে হালকা এক শীতলতা। মৃদু ছোঁয়ায় বাতাস ঘুরে বেড়াচ্ছে বারান্দা জুড়ে। নূরাইসার খোলা চুল বাতাসে উড়ছে, এলোমেলো হয়ে এসে গালে লেগে আবার সরে যাচ্ছে।তার নয়নদ্বয় অশ্রুতে টইটুম্বুর। কোনো শব্দ নেই, নীরবেই গাল বেয়ে নামছে জল। অপরাধবোধ আর অভিমান একসাথে বাসা বেঁধেছে তার মনকোঠায়।কাউকে দোষ দেওয়ার শক্তিও নেই, নিজেকেও ক্ষমা করতে পারছে না সে।
হঠাৎ করেই পেছন থেকে দুটি বলিষ্ঠ হাত এসে নূরাইসার কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। মুহূর্তের মধ্যেই পুরুষালি, দৃঢ় শরীরের উষ্ণতায় সে ঘিরে গেল।কোনো সুযোগ না দিয়েই সেই শরীর নূরাইসাকে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিল। কানের লতিতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চুমু পড়ল, তারপর ধীরে ধীরে ঘাড় বেয়ে গলায় নেমে এল রুক্ষ, পাতলা পুরুষালি অধর। চেনা স্পর্শ, পরিচিত সুগন্ধ... এক মুহূর্তেই নূরাইসা বুঝে গেল, ইলহান। সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই, কোনো প্রতিরোধও নয়। যেন শরীরটা এখানে আছে, মনটা অনেক দূরে।
ইলহান আরও শক্ত করে তাকে নিজের সঙ্গে জড়িয়ে নিল। নূরাইসার উন্মুক্ত চুলের ভেতর মুখ গুঁজে, গভীর ভাবে নিঃশ্বাস নিল, ধীর নরম কণ্ঠে বলে উঠল—
-"এভাবে চুপ করে থাকিস না নূরেজান। আমাকে শাস্তি দিতে চাইলে কথা না বলাটাই সবচেয়ে বড় শাস্তি। আমি ম রে যাবো জান। এত বড় শাস্তি আমায় দিস না!"
তার কণ্ঠে রাগ নেই, আছে ক্লান্তি, আর সেই ক্লান্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকা গভীর এক ভয়, যদি এই নীরবতাই দূরত্ব হয়ে যায়।
ইলহানের অপরাধী কন্ঠে আবারও বলে উঠলো—
-"সরি জান! বিশ্বাস কর, আমি একটি কথাও সত্যি বলিনি। রাগে, টেনশনে আমার মাথা কাজ করছিল না।তুই ফোনও ধরছিলি না। আমি কী করতাম বল?পাগলের মতো তোকে খুঁজেছি, কোথাও পাইনি। কেউ একজন তোর আর আর্সলানের ছবি দিয়েছিল। সেটা দেখে আমি আরও নিজেকে ঠিক রাখতে পারিনি। তুই তো জানিস, আমার রাগ কতটা ভয়ঙ্কর। রেগে গেলে আমি নিজের ওপর কন্ট্রোল রাখতে পারি না। সরি নূরেজান। কথা বল। কিছু তো বল। রাগ দেখা, মার আমাকে, তাও প্লিজ, এইভাবে নিশ্চুপ হয়ে থাকিস না।"
কথাগুলো বলতে বলতে তার শ্বাস ভারী হয়ে উঠছে।কণ্ঠে অনুতাপ, ভয় আর অসহায়ত্ব একসাথে জড়িয়ে গেছে। যেন সে ক্ষমা চাইছে না, বাঁচতে চাইছে। কিন্তু নূরাইসা... একটিও শব্দ করল না। নীরবে, ধীরে ধীরে সে ইলহানের শক্ত বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল। কোনো নাটক নেই, কোনো চিৎকার নেই, শুধু ক্লান্ত এক প্রত্যাখ্যান। তার শরীরের এই নীরব প্রতিবাদটাই যেন সবকিছুর চেয়ে বেশি বলছে।
ইলহান সেটা টের পেল। আর সেই মুহূর্তেই নূরাইসার সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে সে তাকে আরও শক্ত করে নিজের বুকে চেপে ধরল। যেন ছেড়ে দিলে এই নীরবতাই তাকে চিরদিনের জন্য দূরে নিয়ে যাবে।বারান্দার হালকা বাতাসে নূরাইসার অশ্রু শুকিয়ে গেলেও, দু’জনের মাঝখানের ভারী নীরবতা আরও ঘন হয়ে উঠল। কেউ কাউকে ছাড়ছে না, আবার কেউ কাউকে পুরোপুরি ধরে রাখতেও পারছে না।
নূরাইসা হঠাৎ থমকে গেল। ইলহানের বুকে চেপে ধরা শরীরটা এক মুহূর্তে শক্ত হয়ে উঠল। এতক্ষণ যে নীরবতা ছিল, সেটা আর দুর্বল নয়, এবার তা ভারী, বিপজ্জনক। ধীরে ধীরে সে ইলহানের হাতের ভেতর থেকে মুখটা ঘুরিয়ে নিল তার দিকে। চোখ তুলল না।তবু কণ্ঠস্বরটা উঠে এলো, নিচু, শান্ত, ভাঙা কাচের মতো ধারালো—
-"ছাড়ুন আমাকে!"
এক মুহূর্তের জন্য ইলহান যেন নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল। এই স্বরে রাগ নেই, কান্না নেই, আছে এমন এক দূরত্ব, যা রাগের চেয়েও ভয়ংকর।
-"প্লিজ, নূরেজান..."
-"ছাড়ুন!"
ইলহানের হাতের বন্ধন ধীরে ধীরে নরম হয়ে এলো। যেন সে বুঝে গেছে, এই মুহূর্তে জোর মানেই হার।নূরাইসা এবার ধীরে ধীরে তার বুক থেকে সরে দাঁড়াল।মুখ তুলে তাকাল ইলহানের দিকে। চোখে অশ্রুজমা আছে, কিন্তু পড়ছে না। সেই আটকে থাকা অশ্রুই সবচেয়ে বেশি পোড়ায়। এক নিঃশ্বাসে সে বলল—
-"রাগে বলা কথাই তো মানুষের আসল মুখটা দেখায়। আপনি জানেন না, আপনি আজ আমাকে কতটা ছোট করে দিয়েছেন।"
ইলহানের ঠোঁট কেঁপে উঠল। কোনো শব্দ বেরোল না।
নূরাইসা থামল না। ভাঙা গলায় বলতেই থাকল—
-"আমি ফোন ধরতে পারিনি, কারণ ফোন সাইলেন্ট ছিল। আমি আর্সলানের সঙ্গে কোনো কথাই বলিনি। সে এসেছিল, কিন্তু আমি তাকে অপমান করে দিয়েছি।যেখানে আমি নিজেই ক্লান্ত, নিজের অস্তিত্ব নিয়ে, নিজের বিশ্বাস নিয়ে। আর আপনি... আপনি এক মুহূর্তও ভাবেননি আমার কথা। শুধু নিজের রাগ, নিজের ভয়, নিজের সন্দেহ।"
বাতাসে তার চুল নড়ে উঠল। এতক্ষণ আটকে থাকা জল অবশেষে গাল বেয়ে নেমে এলো।
-"আপনার সেদিনের বলা কথাগুলো আমাকে কতটা আঘাত করেছে, আপনি জানেন? অপরাধবোধ আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। আফরিন আর নুহার সঙ্গে হওয়া সব কিছুর জন্য আমি নিজেকেই দোষী মনে করছি। নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছে করছে।"
এক মুহূর্ত থেমে, প্রায় ফিসফিস করে বলল—
-"আর আপনি আজ কী করলেন? আমাকে শেষ করে দেওয়ার জন্য শেষ তীরটা ছুঁড়ে দিলেন।"
বারান্দার বাতাস হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠল।নূরাইসার কথাগুলো বাতাসে ভাসল না, সোজা গিয়ে আঘাত করল ইলহানের বুকে। বারান্দায় নিস্তব্ধতা আবার নেমে এলো। কিন্তু এটা আগের নীরবতা নয়, এটা কথা শেষ হয়ে যাওয়ার পরের শূন্যতা। যেখানে আর চিৎকার নেই, অভিযোগ নেই, শুধু ভাঙা কথাগুলোর প্রতিধ্বনি রয়ে গেছে।
ইলহান ধীরে মাথা নিচু করল। যেন চোখ তুলে তাকানোর সাহসটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। তার কণ্ঠ বেরোল, ভাঙা, অনিশ্চিত—
-"আমি ভয় পাই, নূরেজান... তোকে হারানোর ভয়। বিশ্বাস কর, আমি তোকে অপরাধী করিনি। আমি রাগ সামলাতে না পেরে ভুল কথা বলেছি, যেটা সত্যি না।"
কথাগুলো বলার পরও সে নিশ্চিন্ত হতে পারল না।কারণ নূরাইসার মুখে কোনো পরিবর্তন নেই।নূরাইসা শান্ত গলায় উত্তর দিল—
-"মানুষ যেটা ভাবে, রাগের বশে সেটাই বলে। আর সেটা সত্যি কথাই হয়।"
এই কথাটুকুই যেন শেষ আঘাত। ইলহানের বুকের ভেতর কিছু একটা ভেঙে পড়ল নিঃশব্দে। কোনো শব্দ হলো না, কোনো প্রতিবাদও নয়। শুধু চোখ নামিয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। দু’জনেই দাঁড়িয়ে রইল, খুব কাছাকাছি, অথচ মাঝখানে জমে উঠল এমন এক দূরত্ব, যা ছোঁয়া যায় না, ডাকা যায় না। এই দূরত্ব কি একদিন কমবে? ইলহান কি নূরাইসার কাছ থেকে ক্ষমা পাবে, নাকি কিছু ক্ষত এমনই হয়, যেগুলো ভালোবাসা দিয়েও সারানো যায় না? বারান্দার হালকা বাতাস কোনো উত্তর দিল না।
.
আফরিন নিজের ঘরে বসে বই পড়ছিল। ভার্সিটিতে যাওয়া আপাতত বন্ধ, তবু পড়াশোনা থেমে নেই।বন্ধুদের কাছ থেকে নিয়মিত নোটস নিচ্ছে, না হলে পরীক্ষা দিতে পারবে না। আগের তুলনায় সে এখন অনেকটাই সুস্থ। শুধু শরীর নয়, মনটাও ধীরে ধীরে ফিরে আসছে নিজের জায়গায়। এমরিন ওর খুব কাছে আসে না। অনুমতি ছাড়া ছোঁয়ার চেষ্টাও করে না। এত বড় ঘর, এত বড় বিছানা, তবু আফরিন একাই ঘুমায়। রাতে এমরিন কখন আসে, সে টের পায় না। কিন্তু প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙলে একই দৃশ্য, এমরিন তার পায়ের কাছে মাথা রেখে মেঝেতে ঘুমিয়ে আছে।
রাতে এসে এমরিন নিঃশব্দে আফরিনের পায়ে হাত ছুঁইয়ে মেঝেতে বসে পড়ে।নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ঘুমন্ত আফরিনের দিকে। তারপর সেখানেই ঘুমিয়ে যায়। ঘুম ভাঙার পর আফরিন অনেক সময় ওকে দেখে মুচকি হাসে। লোকটা সত্যিই তাকে ভীষণ ভালোবাসে। নইলে কেউ ধ র্ষি তা কে বিয়ে করে? কেউ এতটা যত্ন নেয়? প্রতিটা কাউন্সেলিংয়ে এমন সাবধানে নিয়ে যায়?
এখন আফরিন নিজ থেকেই এমরিনকে স্পর্শ করে।ডাক্তার বলেছে, স্বামীর সংস্পর্শে যেতে। পরিবারের পুরুষদের স্পর্শ যদি সে নিতে পারে, তাহলে এখন দেখা দরকার স্বামীর স্পর্শ নিতে পারছে কি না।আশ্চর্যের বিষয়, এমরিনের স্পর্শে এখন আর আফরিনের প্যানিক অ্যাটাক হয় না। ধীরে ধীরে, অল্প অল্প ছোঁয়ায় সে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। ভাবনার মাঝেই কখন যে রাত বারোটা বেজে গেছে, আফরিন টেরই পায়নি। এমরিন এখনো ফেরেনি। বইপত্র গুছিয়ে সে উঠে দাঁড়াল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজা খুলে এমরিন ঢুকল। র ক্তা ক্ত। ক্লান্ত শরীর নিয়ে এসে বিছানায় বসে পড়ল সে।আফরিন মুহূর্তে স্থির হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। এগিয়ে এসে উৎকণ্ঠায় জিজ্ঞেস করল—
-"কি হয়েছে? এত র ক্ত কিসের?"
এমরিন মাথা তুলে তাকাল। ঠোঁটের কোণে হালকা মুচকি হাসি, শান্ত, অব্যাখ্যাত। সে বলল—
-"চিন্তা করছিলে আমার জন্য?"
আফরিন সোজা হয়ে দাঁড়াল। মুহূর্তের জন্য চোখের ভেতরের অস্থিরতা ঢেকে রেখে মুখভঙ্গি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। কণ্ঠটা ঠান্ডা রাখতে গিয়ে অযথা শক্ত হয়ে গেল—
-"আপনার জন্য আমি কেন চিন্তা করব? আপনি আমাকে জোর করে বিয়ে করেছেন। আপনি আমার জীবন থেকে গেলেই তো আমি বাঁচি!"
কথাগুলো ছুড়ে দেওয়ার পর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। কিন্তু সে চোখ নামাল না। এমরিন উঠে দাঁড়াল।ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো আফরিনের দিকে। খুব কাছে এসে থামল। আফরিনের খোলা চুলের কিছু অংশ হাতের তালুতে আলতো করে তুলে নিলো, মাথা ঝুঁকিয়ে চুলে মুখ ডুবিয়ে গভীরভাবে সেই চুলের সুবাস নিল। নিঃশ্বাসটা যেন একটু বেশি সময় ধরে আটকে রইল তার ভেতরে। তারপর মোহনীয়, মসৃণ কণ্ঠে বলল—
-"You've fallen for me, cariño!"
শব্দগুলো যেন ছুরি হয়ে আফরিনের শরীর ছুঁয়ে গেল।সে শিউরে উঠল। অজান্তেই দু’পা পিছিয়ে গেল। বুকের ভেতর ঢেউ উঠল, ভয়, বিভ্রান্তি আর এক অদ্ভুত কাঁপুনি একসাথে। এমরিন মুচকি হাসল। হাসির ভেতর কোনো দম্ভ নেই, আছে অদ্ভুত এক নিশ্চয়তা।
-"চিন্তা করো না, আমার র ক্ত না এগুলো। আচ্ছা, আমি শোওয়ার নিয়ে আসছি। তুমি একটু মেইডদের বলবে, আমার জন্য কিছু খাবার বানিয়ে দিতে?"
আফরিন তৎক্ষণাৎ বলল—
-"এত রাতে সবাই ঘুমিয়েছে। আপনি আসুন, আমি খাবার বানিয়ে দিচ্ছি!"
এমরিন মাথা নাড়ল।
-"প্রয়োজন নেই। তুমি বসো, আমি আসছি। আমি আমাদের জন্য কিছু বানিয়ে নেবো!"
আফরিনের কণ্ঠে জেদ ঢুকে পড়ল—
-"আমি রান্না করতে পারি!"
এমরিন শান্তভাবে তাকাল তার দিকে। সেই দৃষ্টিতে কোনো চাপ নেই, তবু অবাধ্য হওয়ার সাহস জাগে না।
-"রান্না করতে পারো বলেই যে এখন রান্না করতে হবে, এটার কোনো মানে নেই। অপেক্ষা করো আমার জন্য!"
বলেই সে ওয়াশরুমে চলে গেল। আফরিন নিঃশ্বাস ছাড়ল। বিড়বিড় করতে করতে বিছানার পাশে গিয়ে বসল। মাথার ভেতর চিন্তারা এলোমেলো হয়ে ছুটোছুটি করতে লাগল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রায় দশ মিনিট কেটে গেল। দরজা খুলে এমরিন বেরিয়ে এলো।পরনে শুধু একটি ধূসর ট্রাউজার। ভেজা চুল তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে এগিয়ে এলো। পানির ফোঁটা বুক বেয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ছে। ঘরের আলোয় দৃশ্যটা মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। এমরিন তোয়ালে নামিয়ে স্বাভাবিক স্বরে বলল—
-"চলো।"
শব্দটা ছোট, কিন্তু তার ভেতর ছিল অনিবার্যতার ডাক।আফরিন তাকিয়ে রইল, না যাওয়ার কোনো অজুহাত খুঁজে পেল না। আফরিন নিঃশব্দে তার পিছু নিল।কোনো প্রশ্ন নেই, কোনো প্রতিবাদ নেই, শুধু নীরব অনুসরণ। কয়েক মিনিটের মধ্যেই দু’জন রান্নাঘরে পৌঁছে গেল। এমরিন তোয়ালেটা সোফার ওপর ছুঁড়ে মেরে সোজা রান্নাঘরে ঢুকে পড়ল। এমরিন একটি রাশিয়ান খাবার রান্না করবে, যার নাম বোর্শ্চ। ফ্রিজ খুলে একে একে বের করতে লাগল— বিটরুট, মুরগির মাংস, আলু, বাঁধাকপি, পেঁয়াজ, গাজর, টমেটো পেস্ট, টমেটো, রসুন—আরও প্রয়োজনীয় কিছু। রান্নাঘরের আলোয় সবকিছু যেন নতুন করে জেগে উঠল।আফরিন এগিয়ে এসে শান্ত কণ্ঠে বলল—
-"আমাকে বলুন, কী করতে হবে। আমি করছি।"
এমরিন প্রথমে দিতে চায়নি। কিন্তু বিয়ের পর, আফরিন এক প্রথম, তার সাথে স্বাভাবিক আচরণ করছে। সে কোনো কথা না বলে পেঁয়াজ কেটে এগিয়ে দিল আফরিনের দিকে। আফরিন সেই পেঁয়াজ ভাজতে লাগল, ধীরে, যত্ন নিয়ে, বাদামি রং হওয়া পর্যন্ত।এমরিন তখন বাকি সবজি কাটতে লাগল। ছুরি পড়ার শব্দ, তেলের হালকা ফোঁসফোঁস, রান্নাঘর ধীরে ধীরে জীবন্ত হয়ে উঠল।
কাজ করতে করতেই এমরিনের মাথায় দুষ্টু একটা বুদ্ধি বাসা বাঁধল। হঠাৎই আফরিনের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে নরম গলায় গেয়ে উঠল—
-"দিল কা জো হাল হ্যায় ওহ তুঝে কাইসে বেয়ান কারেং কেহ দেং তুঝে ইয়া দিল মেঁ রাখেং বলো না ক্যা কারেং!"
আফরিন থমকালো না। যেন আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। বাকা হেসে সেও ঘুরে দাঁড়িয়ে এমরিনের শার্টের কলার ধরে নিজেও গাওয়া শুরু করল—
-"দিল জো তুমহারা হ্যায় কাইসা বেচারা হ্যায় মানে না বেশরম বিলকুল খাতারা হ্যায়!"
এমরিন বিষ্ময়ে তাকালো, সে ভাবতেই পারে নি আফরিন তার সাথে তাল মেলাবে। সে আফরিনের দিকে একটু ঝুঁকে নেশাল চোখে তাকিয়ে হেসে বলে উঠল—
-"তু কারে দিল বেকারার!"
আফরিন চোখ উল্টে ঘুরে দাড়ালো। মুচকি হেসে আবার প্যানে পেঁয়াজ নাড়তে নাড়তে গেয়ে উঠল—
-"কিয়োঁ কারুঁ মেঁ তুঝসে পেয়ার!"
রান্নাঘরের বাতাসে তখন শুধু মসলার গন্ধ নয়, ছিল চাপা হাসি, অদ্ভুত এক টান, আর অস্বীকার করতে না পারা ঘনিষ্ঠতা।
.
রাত প্রায় একটা বেজে গেছে। অথচ বিহান এখনো বাড়ি ফেরেনি। এমনটা কখনো হয় না। বিহান কখনোই এত দেরি করে না। বাড়ির বাতাস ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠছিল, উদ্বেগে, অজানা আশঙ্কায়। নুহা বুঝতে পারছিল, এই টানটান পরিস্থিতি বেশি সময় চললে সর্বনাশ হবে। শ্বশুর-শাশুড়ি দুজনেই উচ্চ রক্তচাপের রোগী। একটু বেশি উত্তেজনা, একটু বেশি দুশ্চিন্তা, শরীর খারাপ করাতে সময় লাগবে না। তাই নুহা মিথ্যের আশ্রয় নিল। নরম গলায়, শান্ত মুখে সে সবাইকে জানিয়েছে, বিহান ফোন করে জানিয়েছে, আজ একটু দেরি হবে। মিথ্যেটা কাজে দিল। চিন্তিত মুখগুলো ধীরে ধীরে নিভে গেল। ঘরের আলোও একে একে নিভল। সবাই ঘুমোতে চলে গেল।
কিন্তু নুহার ঘুম এল না। ড্রয়িং রুমে সে পায়চারি করতে লাগল। ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে শব্দ করছে, প্রতিটা শব্দ যেন বুকের ভেতর আঘাত করছে। মিথ্যে তো বলেছে... কিন্তু বিহান এখন কোথায়? হাত কাঁপতে কাঁপতে সে ফোন বের করল। ইলহানকে কল করবে ঠিক তখনই— টিং টং। কলিং বেলের শব্দে নুহা চমকে উঠল। এক মুহূর্ত দেরি না করে সে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেল দরজার দিকে। দরজা খুলতেই, সায়মন দাঁড়িয়ে।তার কাঁধে হেলে আছে বিহান। বিহানের চোখ বন্ধ।শরীর ঢিলে। হুঁশ নেই।
এক মুহূর্তের জন্য নুহা যেন পাথর হয়ে গেল।চারপাশের শব্দ মিলিয়ে গেল। শ্বাস আটকে এলো। ভাগ্যিস সবাই ঘুমোতে গেছে। নইলে কেলেঙ্কারি হয়ে যেতো। সায়মনের কণ্ঠে সে বাস্তবতায় ফিরল—
-"নুহা, ওকে ভেতরে নিতে হবে!"
নুহা দ্রুত নিজেকে সামলে বলল—
-"বাড়ির সবাই ঘুমিয়েছে ভাইয়া। আপনি ওনাকে একটু রুমে দিয়ে যাবেন? আমি একা পারবো না।"
-"হ্যাঁ। চলো।"
নিঃশব্দে, যেন কোনো অপরাধ লুকোচ্ছে, সায়মন আর নুহা দুজনে মিলে বিহানকে ধরে ঘরের ভেতর নিয়ে গেল। বিছানায় শুইয়ে দিতেই বিহানের নিঃশ্বাসটা একটু ভারী হয়ে উঠল। নুহার চোখ ছাড়ছে না তার মুখ থেকে। কাঁপা গলায় সে প্রশ্ন করল—
-"ভাইয়া... ওনার এই অবস্থা হলো কী করে?"
সায়মন মাথার চুল চুলকাল। এক ধরনের অস্বস্তি, অনিশ্চয়তা তার চোখে।
-"ও হঠাৎ আমাকে ফোন দিয়ে আসতে বলল। তখন ও অর্ধেক মাতাল ছিল। কী হয়েছে, পুরোটা আমাকে বলতে পারেনি। সকালে হুঁশে এলে জিজ্ঞেস করো।আর... এক গ্লাস লেবু পানি দিও ওকে।"
নুহা ধীরে মাথা নাড়ল।
-"ঠিক আছে।"
নুহা সায়মনকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিল। দরজাটা বন্ধ হতেই ঘরের ভেতর আবার নিস্তব্ধতা নেমে এলো, একটা চাপা, ভারী নিস্তব্ধতা। সে নিজের রুমে ফিরে এলো। বিহান এলোমেলো হয়ে শুয়ে আছে। নুহা ধীরে ধীরে তাকে ঠিক করে শুইয়ে দিল। জুতো খুলে রাখল, মোজাগুলো সরিয়ে দিল। বাথরুম থেকে তোয়ালে ভিজিয়ে এনে খুব যত্ন করে বিহানের হাত, পা, মুখ, বুক মুছিয়ে দিল। তারপর ওপর দিয়ে কমফোর্টার টেনে দিল। বিহান তখন বেঘোর ঘুমোচ্ছে। নুহা পাশে এসে শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করল। ঘুমানোর চেষ্টা করল।
ঠিক তখনই, কানে এলো কিছু অস্পষ্ট শব্দ। নুহা চোখ মেলে তাকাল। দেখল, ঘুমন্ত বিহান ভ্রু কুঁচকে বিড়বিড় করছে। স্বপ্ন দেখছে। নুহা ধীরে তার মুখের কাছে কান এগিয়ে নিল। অস্পষ্ট হলেও কথাগুলো কানে এলো—
-"কেনো এসেছো এত বছর পর? আবার আমাকে শেষ করতে এসেছো? একবার শেষ করে শান্তি পাওনি?"
নুহার বুকটা কেঁপে উঠল। সে বুঝল, আজ বিহানের সঙ্গে কারো দেখা হয়েছে। কেউ, যার স্মৃতি এখনো তাকে তাড়া করে। ‘সকাল হলে জিজ্ঞাসা করব,’ নিজেকে বোঝাল সে। বালিশে মাথা রেখে আবার শুয়ে পড়ল। হঠাৎ বিহান চিৎকার করে উঠে বসলো—
-"চলে যাও! আর কখনও আসবে না আমার সামনে!"
নুহা তড়িৎ বেগে উঠে বসে পড়ল।
-"কি হয়েছে বিহান ভাই? কেউ নেই তো এখানে!"
বিহানের চোখ রক্তিম। সে চারপাশে তাকিয়ে বুঝল, নিজের রুমে আছে। স্বপ্ন দেখেছে। নেশা অনেকটাই কেটে গেছে। মাথাটা ভীষণ ভারী লাগছে। এক হাত কপালে ঠেকিয়ে বলল—
-"আমাকে একটু পানি দেবে?"
-"আপনি বসুন, আমি এখনই লেবু পানি নিয়ে আসছি!"
নুহা প্রায় পাঁচ মিনিটের মধ্যেই লেবু পানি নিয়ে ফিরে এলো। বিহান ধীরে ধীরে গ্লাসটা খালি করে বেডসাইড টেবিলে রেখে দিল। নুহা খুব নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—
-"কিছু হয়েছে আজ, বিহান ভাই?"
বিহান মাথা তুলে তার দিকে তাকাল।
-"আমি তোমার স্বামী। স্বামীকে ভাই বলতে ভালো লাগে তোমার?"
নুহা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করে নিল। খাটের ওপর এসে চুপচাপ বসে পড়ল। ঠিক তখনই, বিহান হঠাৎ নুহার কোলের ওপর মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করেই বলে উঠল—
-"মাথা ব্যথা করছে!"
নুহা বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কথা হারিয়ে ফেলল। স্থির হয়ে বসে রইল। বিহান চোখ মেলে তাকাল তার দিকে। নুহার অবাক হয়ে যাওয়া মুখটা দেখে নিজেই তার ছোট দুই হাত ধরে নিজের মাথার ওপর রেখে দিল। নুহা তখন বুঝল, সে মাথা টিপে দিতে বলছে।আর সে এতক্ষণ কত কিছুই না ভেবে ফেলেছে। নুহা ক্ষুদ্র, নরম হাতে ধীরে ধীরে বিহানের চুলে আঙুল চালাতে লাগল। কপাল টিপে দিতে লাগল। বিহান শান্তিতে চোখ বন্ধ করে আছে। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ বলে উঠল—
-"আমাকে ভালোবেসে তুমি অনেক পুড়েছো, তাই না নীলপদ্ম?"
নুহা শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিল—
-"ভালোবাসা তো সুখের, শান্তির!"
বিহান হালকা তাচ্ছিল্যে বলল—
-"তুমি ছোট মানুষ। তুমি কি বুঝবে ভালোবাসা পড়া কেমন!"
নুহা থেমে গেল না।
-"তাহলে আপনিই বলুন!"
বিহান গভীর নিঃশ্বাস নিল। ঘরের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। সে বলল—
-"ভালোবাসায় পড়া মানে, যেন হাতে মোমবাতি ধরা, শুরুর আলোয় চারপাশ ঝলমল করে ওঠে, সবকিছুই লাগে নতুন, সুন্দর, জাদুময়। তারপর ধীরে ধীরে মোমবাতি গলতে থাকে, তার উষ্ণতা রূপ নেয় যন্ত্রণায়।তুমি বুঝতেও পারো না, কখন সেই আলোই আগুন হয়ে ওঠে ভালোবাসার। শেষে আলো নিভে গেলে চারপাশ আগের চেয়েও অন্ধকার হয়ে যায়, আর তোমার হাতে বাকি থাকে শুধু একটাই স্মারক, জ্বালার দাগ, পোড়ার স্মৃতি, সেই অবশ্যম্ভাবী দহন।"
বিহানের কণ্ঠে কোনো নাটকীয়তা ছিল না। ছিল অভিজ্ঞতার ভার। একজন পোড়া মানুষের স্বীকারোক্তি। নুহা মনোযোগ দিয়ে শুনল। একবারও তার হাত থামাল না। আঙুলের ডগায় যেন সে বিহানের প্রতিটি শব্দকে শান্ত করতে চাইছে। কিছুক্ষণ নীরবতার পর, সে শান্ত কণ্ঠে বলে উঠল—
-"ভালোবাসা পবিত্র। আপনাকে ভালোবেসে আমি অনেক সুখ অনুভব করেছি। যখন আপনাকে পাওয়ার বাসনায় আমি জায়নামাজে বসে কান্না করতাম, তখন খুব শান্তি অনুভব করতাম। যখন রাত জেগে তাহাজ্জুদ পড়ে শুধু আপনাকেই ভিক্ষে চাইতাম, তখন আমি সুখ অনুভব করতাম। আমি আপনাকে ভালোবেসেছি আপনাকে ভালোবাসার জন্য। ভালোবাসার নামে আপনার সাথে ছলনা করার জন্য নয়। তাই আমার ভালোবাসা পবিত্র, সদ্য ফোঁটা স্নিগ্ধ ফুলের মতো।আমার ভালোবাসা আমায় পোড়ায়নি, আপনাকেও পোড়াবে না!"
ঘরটা নিঃশব্দ হয়ে গেল। শুধু বিহানের নিঃশ্বাস আর নুহার হাতের কোমল স্পর্শ। বিহান ধীরে চোখ মেলে তাকাল। সোজা নুহার চোখের দিকে। সেই চোখে কোনো অভিযোগ নেই। কোনো দাবি নেই। শুধু তার জন্য, অসীম, নিঃশর্ত, নীরব ভালোবাসা জ্বলজ্বল করছে। এক মুহূর্তের জন্য বিহান বুঝতে পারল, কিছু আলো পোড়ায় না। কিছু ভালোবাসা আগুন নয়।
নুহা আর কিছু বলল না, শুধু তার আঙুলে বিহানের কপালে একটু বেশি মমতা ঢেলে দিল। আর সেই নীরব স্পর্শেই, একটা ভাঙা মানুষ প্রথমবারের মতো নিশ্বাস নিতে শিখল।