সূর্যস্নাত ভালোবাসা

পর্ব - ৪৭

🟢

দীর্ঘ জার্নির ক্লান্তি সবার শরীরে জমে ছিল। তাই সকাল গড়িয়ে দুপুর ছুঁয়েই সবাই ঘুম থেকে উঠেছে।ফ্রেশ হয়ে, একদম প্রস্তুত হয়ে দল বেঁধে বেরিয়ে পড়ল।একটি রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ সেরে সবাই মিলে বেরিয়ে পরলো নীলগিরির উদ্দেশ্যে। একটি জিপ নিয়েছে তারা। জিপের চালকের আসনে ইলহান। স্টিয়ারিংয়ে হাত শক্ত করে ধরা, চোখ সামনে, কিন্তু মন বারবার সরে যাচ্ছে পাশে বসে থাকা নূরাইসার দিকে। নূরাইসা চুপচাপ বসে আছে। অতিরিক্ত নীরব, অস্বাভাবিক রকম শান্ত। তার মুখে একরাশ বিষণ্নতা, যেন আকাশটা মেঘে ঢেকে গেছে। ইলহান আড়চোখে বারবার তাকাচ্ছে সেই মুখটার দিকে। গত রাতে ঘরে টেনে নিয়ে এসেছিল সে, তবু নূরাইসা একটি কথাও বলেনি। চুপচাপ শুয়ে পড়েছিল। ইলহান তার বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়েছিল, সেখানেও সে কোনো বাধা দেয়নি। না কোনো প্রতিবাদ, না কোনো অভিযোগ, শুধু নিঃশব্দ আত্মসমর্পণ। এই নীরবতাই ইলহানকে ভিতর থেকে ক্ষতবিক্ষত করছে। সে চায় নূরাইসা রাগ করুক। ঝগড়া করুক। কাঁদুক। চিৎকার করুক। কিন্তু সে কিছুই করছে না। একেবারে জীবন্ত পুতুল হয়ে রয়েছে। ইলহান গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাড়ি চালানোতে মন দিলো। পাহাড়ি রাস্তা সামনে, অথচ তার ভেতরটা যেন আরও বেশি ভঙ্গুর হয়ে উঠছে।

পেছনের সিটে বিহান ল্যাপটপে কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত। পাশে বসে থাকা নুহা বিরক্তি মুখে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তার দিকে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎই কটাক্ষ ছুড়ে দেয়—

-"হানিমুন কেমন যাচ্ছে আপনার, বিহান ভাই? বউ নিয়ে তো বেশ মগ্ন হয়ে আছেন। আমরা এতগুলো মানুষ আপনার পাশে বসে আছি, চোখ তুলে তাকানোর সময় পর্যন্ত নেই!"

বিহান ভ্রু কুঁচকে তাকায় নুহার দিকে। নুহা সঙ্গে সঙ্গে মুখ ভেংচিয়ে অন্য দিকে তাকায়। বিহান খানিকটা থতমত খেয়ে যায়। এর আবার কী হলো? আর বউ নিয়ে মগ্ন মানে? সে অবুঝ কণ্ঠে বলে ওঠে—

-"বউ তো তুমি...আর তুমি পাশেই বসে আছো। আমি আবার কোন বউকে নিয়ে মগ্ন হয়ে আছি?"

নুহা এবার ধীরে ঘুরে তাকায় তার দিকে। চোখে জমে থাকা অভিমান আর তাচ্ছিল্যের মিশ্রণ নিয়ে বলে—

-"তাহলে মানছেন আমি আপনার বউ? মনে আছে আপনার সেই কথাটা?"

জিপটা তখন পাহাড়ি বাঁকে উঠছে। বাইরে সবুজ পাহাড়, কুয়াশার হালকা পর্দা, আর ভেতরে নীরবতা, অপ্রকাশিত অভিযোগ, আর না বলা কথার চাপ। যেন এই যাত্রা শুধু নীলগিরির দিকে নয়, প্রত্যেকের ভেতরের জটিল সম্পর্কের দিকেও এগিয়ে চলেছে। বিহান অবাক হয়ে বলল—

-"কি আশ্চর্য, মনে থাকবে না কেনো?"

নুহার কণ্ঠে চাপা অভিমান ছিল, কিন্তু পরক্ষণেই সেই অভিমান বিস্ফোরণের মতো ফেটে পড়ল। সে চেঁচিয়ে উঠল—

-"তাহলে বউ পাশে থাকতে কোন আহাম্মক ল্যাপটপ নিয়ে এত মগ্ন থাকে? আর বেড়াতে এসে আপনি আমার সতিনকেও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন, কেনো?"

বিহান বুঝে গেল,এ আর নিছক রাগ নয়, এটা অবহেলার ক্ষোভ। সে ধীরে ল্যাপটপটা বন্ধ করে ব্যাগে ভরে ফেলল। গলার স্বর নরম করে বলল—

-"আচ্ছা সরি। আর হবে না। এসো, তোমার ছবি তুলে দেই!"

কিন্তু নুহা সহজে গলল না। সে মুখ ভার করে পাশ ফিরে বসল। সামনে তার পরীক্ষা, সে জানে না বিহান ঠিক কী বুঝে তাকে হঠাৎ ঘুরতে এনেছে। এনেছে ঠিকই, কিন্তু সময়? মনোযোগ? সবটাই যেন ওই ল্যাপটপের ভেতরে বন্দি। সে পাশে বসে থেকেও একা।নুহার এই নীরব অভিমান বিহানের চোখ এড়াল না। সে পকেট থেকে একটা চকলেট বের করে শিশুসুলভ ভঙ্গিতে নুহার মুখের সামনে ধরল। নুহা প্রথমে মুখ ঘুরিয়ে নিল, তারপর আর থাকতে পারল না। দুষ্টুমির কাছে অভিমান হার মানল। ঠোঁটের কোণে অনিচ্ছুক হাসি ফুটে উঠল, অভিমান ভাঙল নিঃশব্দেই।

অন্যদিকে এমরিন চোখমুখ কুঁচকে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল। তার চোখে বিরক্তির ছাপ, যেন এই আদিখ্যেতা তার সহ্য হচ্ছে না। বিপরীতে আফরিন উচ্ছ্বসিত, চোখে কৌতূহল আর মুখে চাপা হাসি।আফরিনের এই উচ্ছ্বাস এমরিনের নজর এড়াল না। সে তাকিয়ে বলল—

-"কিভাবে হাজবেন্ডের মনোযোগ পেতে হয়, তোমার বোনকে দেখে শিখো। সে কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকা মানুষটার কাছ থেকে ঠিকই নিজের অধিকারের সময় আদায় করে নিলো। আর তুমি? হাজবেন্ড সময় দিতে চাচ্ছে, রোমান্সের জন্য মুখিয়ে আছে, তুমি ফিরেও তাকাও না!"

আফরিন ধীরে এমরিনের দিকে তাকাল। চোখে কৌতুক, কণ্ঠে খুনসুটি—

-"ওলে বাবা! মাফিয়া কিং গুসা করেছে?"

এমরিন ঠোঁট উল্টে অন্যদিকে তাকাল। তার নীরবতায় জমে থাকা রাগটা স্পষ্ট। আফরিন একটু কাছে এগিয়ে এসে নিচু স্বরে বলল—

-"আপনি তো জানেন আমার সমস্যার ব্যাপারে!"

এবার এমরিন ঘুরে তাকাল। চোখে হুমকি, কণ্ঠে দমিয়ে রাখা আগুন—

-"বিশ্বাস করো, কারিনো, একবার শুধু সুস্থ হও।তারপর দেখবে এই মাফিয়া কিং কী করতে পারে।এতদিন উপোস করে রাখার জন্য টানা তিন মাস রুমের দরজা খুলবো না!"

আফরিন শুষ্ক ঢোক গিলে চোখ নামিয়ে নিল। মুহূর্তের নীরবতায় এমরিনের ঠোঁটে খেলে গেল এক বাঁকা, আত্মবিশ্বাসী হাসি। সে আফরিনের পেছন দিয়ে এক হাত বাড়িয়ে তার কোমরে রাখল, তারপর হঠাৎই শক্ত করে নিজের দিকে টেনে নিল। আফরিনের সমস্ত শরীর জুড়ে শিহরণ বয়ে গেল, এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি, লজ্জা আর টানের মাঝখানে আটকে থাকা।

ওই দৃশ্যটা দূর থেকে দেখছিল রুহান ও উপমা। তারা দু’জন পিছনে বাইকে করে আসছে। বিবাহিত কাপলদের মাঝে হাড্ডি হতে চায়নি রুহান।ভাইবোনদের এই মধুর সম্পর্ক দেখে হেসে উঠল সে।গলার স্বরে খুনসুটি—

-"আমার দুই বোনের মুখে সুখ দেখতে পাচ্ছো, রুচি ঝাল চানাচুর?"

উপমা হেসে বলল—

-"হ্যাঁ! দেখছি। আচ্ছা, ইসার কিছু হয়েছে?”

রুহান সামনের দিকে তাকিয়েই উত্তর দিল—

-"ভাইয়া ছাড়া ওর মন ভালো কেউ করতে পারবে না।ধৈর্য ধরো, ওর মুখেও হাসি ফুটবে।"

উপমা কথাটা শুনে রুহানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।কণ্ঠে হালকা আবেগ—

-"সামনে মাসে আব্বু-আম্মু আসছে!"

রুহান দুষ্টু হেসে চোখে চ্যালেঞ্জের ঝিলিক নিয়ে বলল—

-"নিজেকে প্রস্তুত করে নাও, এই রুহান ইয়াসির দেওয়ানের বউ হওয়ার জন্য!"

উপমা মুচকি হেসে রুহানের পিঠে মাথা রেখে ফিসফিস করে বলল—

-"অবশেষে আমার অবসেশন পূর্ণতা পাবে!"

হাওয়ার ভেতর যেন হাসি আর স্বপ্ন একসাথে ভেসে থাকল। অবশেষে সবাই নীলগিরিতে এসে পৌঁছাল।পাহাড়ের নীরবতা, দূরের ঝর্নার শব্দ আর বিকেলের নরম আলো, সব মিলিয়ে সময় যেন ধীরে ধীরে গড়িয়ে যাচ্ছিল। ভালোবাসা মানে যে শুধু রোমান্স নয়, মাঝে মাঝে অভিমান, খুনসুটি আর অল্প একটু রাগ, মিলিয়েই যে সম্পর্ক পূর্ণতা পায়, সেটা তারা বুঝেছে।

সবাই মিলে ঝর্না দেখল, ছবি তুলল। হাসি, ডাকাডাকি আর ক্যামেরার ক্লিকে ভরে উঠল চারপাশ। বিকেলটা কেটে গেল অদ্ভুত সুন্দরভাবে, যেন এই মুহূর্তগুলোই তাদের স্মৃতির সবচেয়ে উজ্জ্বল পাতায় লেখা হয়ে রইল।

.

রাত নেমে আসছে ধীরে ধীরে। পাহাড়ি পথের আলো–আঁধারিতে সবাই আবার রওনা দিল একটি রেস্টুরেন্টের উদ্দেশে। রাতের খাবার সেরেই আজকের মতো বাড়ি ফেরা। নীলগিরি থেকে ফেরার পথে একটি পরিচ্ছন্ন, আলো ঝলমলে রেস্টুরেন্টে তারা বসেছে।খাবার অর্ডার করা শেষ। টেবিলজুড়ে হালকা কোলাহল, হাসি, গল্প, দিনের স্মৃতিচারণ। ঠিক তখনই বিহান ও ইলহান বাইরে থেকে ভেতরে আসছিল। কোনো ফোন আশায় দুজনেই বাহিরে গিয়েছিল। কথা শেষ করে দু’জনেই যখন রেস্টুরেন্টের ভেতরে ঢুকল, ঠিক সেই মুহূর্তে বিহানের পা থমকে গেল। একটি পরিচিত অথচ অপ্রত্যাশিত মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে এলো—

-"আরে বিহান, তুমি এখানে?"

বিহানসহ টেবিলে বসা বাকি সবাই একসাথে ঘুরে তাকাল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে আরিবার মতো দেখতে একটি মেয়ে। প্রথম দৃষ্টিতে সবাই ভেবেছিল, আরিবা।কিন্তু না, আরিবা কখনো বিহানকে নাম ধরে ডাকে না।

ভালো করে তাকাতেই বোঝা গেল, হুবহু আরিবার মতো, অথচ আলাদা। আরিবার চেয়েও দ্বিগুণ সুন্দর।তার সাজগোজে একধরনের নিখুঁত পরিমিতি, দেখলেই বোঝা যায়, নিজের রূপচর্চা নিয়ে সে কতটা সচেতন।মুখে বয়সের কোনো রেখা নেই। আত্মবিশ্বাস ঝরে পড়ছে প্রতিটি ভঙ্গিতে। টেবিলের সবাই কৌতূহলী হয়ে উঠে দাঁড়াল। ইলহানের পাশে এসে থামল তারা, চোখে প্রশ্ন, মনে অজানা শঙ্কা।

আরাবী বিহানকে এমন নির্লিপ্ত দেখে নিজেই কয়েক কদম এগিয়ে এলো। হঠাৎ করেই বিহানের হাত ধরে ফেলল। কণ্ঠে মধুর মিষ্টতা—

-"কেমন আছো বিহান? তোমাকে এখানে পাবো, আমি ভাবতেও পারিনি!"

বিহান মুহূর্তের মধ্যেই সতর্ক হয়ে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল। সেই ছোঁয়ার ভেতর কোনো উষ্ণতা খুঁজে পেল না সে। আরাবী আড়চোখে তাকাল, এক দৃষ্টিতে যেন হাজার কথা বলছে। বিহান তখন নিষ্প্রাণ, নিরাবেগ কণ্ঠে বলল—

-"পিছু পিছু চলে এসে বলছো, ভাবতেই পারোনি?"

আরাবী সামান্য অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। তবু মুখের কৃত্রিম হাসিটা অটুট রাখল। চোখ ঘুরিয়ে ইলহানের দিকে তাকিয়ে বলল—

-"কেমন আছিস, ইলহান?"

ইলহান রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে রইল। শুধু এইটুকু ভেবে নিজেকে সংযত করল যে, সে মেয়ে মানুষ। কোনো উত্তর না পেয়ে আরাবী সামনের দিকে এগিয়ে এল।এবার একে একে সবার দিকে আঙুল তুলে বলতে লাগল—

-"তুমি নূরাইসা, ইলহানের বউ, রাইট? আর তুমি রুহান, ইলহানের ভাই। আর তুমি নুহা, নূরাইসার বোন, তাই না? আর তুমি আফরিন, রাইট?"

হালকা অহংকার মিশ্রিত হাসি ঠোঁটে খেলিয়ে সে যোগ করল—

-"দেখছো, আমি তোমাদের সবাইকেই চিনি। আসলে আমরা সবাই ইউনিভার্সিটিতে একসাথে পড়তাম। কিন্তু বাকি দুইজনকে তো চিনতে পারলাম না?"

আফরিন এক পা এগিয়ে এসে শান্ত কণ্ঠে বলল—

-"এমরিন রাহাফ, আমার হাজব্যান্ড। আর উনি রুহান ভাইয়ার হবু বউ, উপমা।"

-"আচ্ছা...। তাহলে তোমরা সপরিবারে ঘুরতে এসেছ!"

এমরিন শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইলহান আর বিহান, দুজনেই ওর উপস্থিতিতে স্পষ্ট বিরক্ত। তবু আরাবী থামল না। সে সোজা বিহানের সামনে এগিয়ে এসে বলল—

-"দেখো বিহান, অতীতে কী হয়েছে সব ভুলে যাও। হ্যাঁ, আমি ভুল করেছিলাম। কিন্তু তুমি তো আমাকে এখনো ভালোবাসো, বলো? এই জন্যই তো এখনো বিয়ে করোনি। দেখো, আমি ফিরে এসেছি। এবার সব ভুলে আমাকে মাফ করে দাও। চলো, আমরা আবার এক হয়ে যাই!"

মুহূর্তের মধ্যেই যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত হলো। নুহা হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়ল। পড়ে যেত নিলে উপমা, আফরিন আর নূরাইসা একসাথে তাকে ধরে ফেললো।বিহানের রাগে শরীর জ্বলে উঠছে। কতটা নির্লজ্জ হলে কেউ এভাবে এসে এসব কথা বলতে পারে! বিহান ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলে উঠল—

-"আমি বিবাহিত, আরাবী!"

আরাবী ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে বলল—

-"মিথ্যে কেন বলছ, বিহান?"

বিহান হাত তুলে স্তব্ধ নুহার দিকে ইশারা করল—

-"আমার বউ!"

আরাবী একবার নুহার দিকে তাকাল। তারপর অস্থির কণ্ঠে বলে উঠল—

-"এটা অসম্ভব, বিহান! তুমি আমাকে ভালোবাসো।তুমি অন্য কাউকে বিয়ে করতেই পারো না। নিশ্চয়ই তোমার পরিবার তোমাকে জোর করে বিয়ে দিয়েছে, তাই না?তুমি নিশ্চয়ই ওকে ভালোবাসো না, তাই না?”

বিহানের কণ্ঠ এবার ঠাণ্ডা, কিন্তু ভেতরে আগুন—

-"আমি যদি বিয়ে নাও করতাম, তবুও তোমার মতো মেয়েকে আমি বিয়ে করতাম না। আমি তোমাকে ভালোবাসতাম, ভালোবাসি না। তফাৎটা বোঝো। নাও, গেট আউট!"

-"না, বিহান! এটা হতে পারে না। তুমি নিশ্চয়ই আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য এসব বলছ, তাই না?"

বিহানের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। ইলহান এই পর্যায়ে একদম শান্ত। এটা বিহানের যুদ্ধ, সে নিজেই সামাল দেবে। তার বোনের সম্মানের প্রশ্ন। সেও দেখতে চায় বিহান কি করে। তার মনে এখনো আরাবী আছে কি না।

বিহান চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর নুহার দিকে এগিয়ে গেল। নূরাইসা, আফরিন আর উপমার হাত থেকে নুহাকে আলতো করে ছাড়িয়ে এনে নিজের সামনে দাঁড় করাল। নুহার চোখ ছলছল করছে। ঠোঁট কাঁপছে তিরতির করে। বিহান এক মুহূর্ত তাকাল সেই নরম, গোলাপি পাতলা অধরের দিকে। শুষ্ক এক ঢোক গিলে নিল। তারপর কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই, নুহার ওষ্ঠ আঁকড়ে ধরল নিজের ওষ্ঠে দ্বারা।

এইবার যেন আরেকটি বজ্রপাত নেমে এলো। আফরিন, উপমা আর নূরাইসা, তিনজনই মুখে হাত দিয়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। ইলহান বিদ্রূপ হাসি নিয়ে একবার আরাবীর দিকে তাকিয়ে নিলো। পরমুহুর্তেই নূরাইসার চোখের ওপর হাত চেপে ধরল, নিজেও চোখ বন্ধ করে নিল। একই কাজ করল রুহান আর এমরিনও।

আরাবী বেশ কিছুক্ষণ রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে রইল।অপমান, রাগ আর অসহ্যতার আগুনে ফুঁসতে ফুঁসতে সে অবশেষে স্থান ত্যাগ করল। রেস্টুরেন্টের বাতাস ভারী হয়ে রইল, ভালোবাসার ঘোষণা, অপমানের নীরবতা আর এক নারীর ভেঙে পড়া অহংকার নিয়ে।

.

রাত তখন ঠিক এগারোটা। পাহাড়ি রিসোর্ট নিস্তব্ধ হয়ে এসেছে। দূরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, জানালার বাইরে অল্প অল্প ঠান্ডা হাওয়া, সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত ভারী পরিবেশ। সবাই এখন নিজ নিজ কক্ষে। বিহান, ইলহান, রুহান আর এমরিন কোথাও একটা গিয়েছে। মেয়েরা বুঝতেই পারছে না, এমরিনের সঙ্গে ছেলেদের এত ঘনিষ্ঠতা কবে, কীভাবে তৈরি হলো। রেস্টুরেন্টে যা ঘটেছে, তার পর আর কারোর মনেই আনন্দ করার ইচ্ছে নেই। হাসি থেমে গেছে, কথাও কমে এসেছে।সবাই নিজের রুমে বসে, নিজের নিজের জীবন নিয়ে ভাবছে। কিছু স্মৃতি কাঁটার মতো বিঁধছে, কিছু প্রশ্ন উত্তরহীন রয়ে যাচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর ছেলেরা ফিরে আসে। রুহান কাউকে কিছু না বলে সোজা নিজের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ে। এমরিন, ইলহান আর বিহান নিজেদের রুমে চলে যায়। বিহান রুমে ঢুকতেই নুহা নড়েচড়ে বসে। মুহূর্তেই তার নাকে একটা পরিচিত গন্ধ এসে লাগে, সেদিনের মতোই। বুকের ভেতর অজানা একটা শঙ্কা দানা বাঁধে। নুহা তড়াক করে তাকিয়ে বলল—

-"আপনি আবার ড্রিংক করেছেন?"

বিহান অপ্রস্তুত হেসে উত্তর দিল—

-"আসলে আমরা একটু ঘুরতে বের হয়েছিলাম। ফেরার পথে একটা বারে গিয়েছিলাম। তখনই এমরিন ড্রিংক করার চ্যালেঞ্জ দেয়। তাই আর কি...!"

নুহার চোখ সরু হয়ে এলো—

-"তো জিতেছেন না হেরেছেন?"

-"ইলহান জিতেছে!"

-"ভাইয়া ও এইসব ছাইপাশ খায়?"

এই পর্যায়ে বিহান চুপ করে গেল। বেশি বললে গোপন কথা ফাঁস হয়ে যাবে। তারা এখানে এসেছে একটি গোপন কাজের উদ্দেশ্যে। নেশার পুরো ব্যাপারটাই নাটক। গায়ে হালকা মদের গন্ধ লেপে রেখেছে সবাই ইচ্ছে করেই। গভীর রাতে বেরোনোর প্ল্যান আছে। এই নাটক না করলে পুরো পরিকল্পনাই ভেস্তে যাবে। ভাবতে ভাবতেই বিহান খাটের ওপর বসে পড়ল।তারপর হাতের ইশারায় নুহাকে কাছে ডাকল। নুহা ধীরে গিয়ে তার পাশে বসে পড়ল। বিহান দুই হাত খাটের ওপর রেখে পেছনের দিকে হেলে পড়ল। চোখের দৃষ্টি স্থির, কণ্ঠটা হঠাৎই নিস্প্রাণ হয়ে এলো।সে বলতে শুরু করল—

-"আর্সলান, আরাবী, আমি, ইলহান, আর আমাদের বাকি বন্ধুরা... আমরা সবাই একসাথে পড়াশোনা করতাম।"

বিহানের কণ্ঠটা ভারী হয়ে এলো। যেন প্রতিটা শব্দের সঙ্গে পুরোনো সময়ের ধুলো ঝরে পড়ছে।

-"আর্সলানের মা বিদেশি। বাবা–মায়ের আলাদা হয়ে যাওয়ায় সে বাবার সঙ্গে দেশে ফিরে আসে। আরিবা, আরাবীর ছোট বোন। আরাবী ইলহানকে পছন্দ করত।কিন্তু ইলহান কোনোদিন কোনো মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকাতো না।"

নুহা নিঃশ্বাস চেপে শুনছে। বিহানের কণ্ঠে কোনো নাটক নেই, শুধু সত্য।

-"দাদু ছোটবেলা থেকেই ইলহানকে বলে এসেছে, নূরাইসাই তার বউ। তাই ইলহান অন্য কোনো মেয়ের দিকে তাকাতে পারবে না। যদিও বিয়ের আগে পর্যন্ত ইলহান নূরাইসাকে ভালোবাসত না, তবুও সে জানত, তার ভাগ্যে ইসাই লেখা আছে। তাই অকারণে অন্য কোনো মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে লাভ নেই।"

একটু থেমে বিহান আবার বলল—

-"কিন্তু আরাবী এটা সহ্য করতে পারত না। সে চাইত ইলহানকে। তার জন্য সে অনেক পন্থা অবলম্বন করেছিল। শেষ পন্থা হিসেবে সে আমায় বেছে নেয়।"

নুহার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল।

-"আমাকে ব্যবহার করে ইলহানের ভেতরে জেলাসি জাগানোর জন্য। সে আমাকে নানা ভাবে ইমপ্রেস করার চেষ্টা করত। আমি তার উদ্দেশ্য জানতাম না। আমরা কেউই জানতাম না, সে ইলহানকে পছন্দ করে।আরাবীর সম্মানের কথা ভেবে ইলহান আমাদের কিছুই বলেনি। একটা মেয়ে প্রেম ভিক্ষা চাইছে—আর একটা ছেলে বার বার অপমান করছে, এই কথাগুলো সে কাউকে জানাতে চায়নি। আরাবী এই সুযোগটাই কাজে লাগায়।"

বিহান থামল। লম্বা একটা নিশ্বাস নিল। যেন ফুসফুস থেকে নয়, হৃদয়ের গভীর থেকে। তারপর আবার বলতে শুরু করল—

-"একদম স্নিগ্ধ, পবিত্র রূপে সে আমার কাছে আসে।আমি তখনও তার উদ্দেশ্য ধরতে পারিনি। তার পাগলামি, তার মায়া, সব মিলিয়ে আমি ধীরে ধীরে তাকে ভালোবেসে ফেলি।"

হঠাৎই বিহান উচ্চ শব্দে হেসে উঠল। সেই হাসিতে আনন্দ নেই, আছে ভাঙন। সে নুহার দিকে তাকিয়ে বলল—

-"বিশ্বাস করো, নীলপদ্ম... আমি এমনভাবে তাকে ভালোবেসেছি যে আমার ভেতরে ভালোবাসার শেষ বিন্দুটুকুও অবশিষ্ট নেই। সব উজাড় করে তাকে ভালোবেসেছি। হায়... আমার প্রথম ভালোবাসা। আমার স্বপ্নের রানী। যাকে বউ করার এক আকাশসম বাসনা ছিল আমার। যাকে ঘিরে আমার দিনের শুরু আর রাতের শেষ হতো। আমি এক জীবনে তাকে ছাড়া অন্য কাউকে ভালোবাসিনি। তাকে ভালোবাসতে ভালোবাসতে আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি।"

বিজ্ঞাপন

বিহান থেমে গেল। নুহার চোখ বেয়ে নোনাজল গড়িয়ে পড়ছে নিঃশব্দে। যে মানুষটাকে সে এতদিন অনুভূতিহীন ভেবেছিল, সে মানুষটা এমন করে ও ভালোবাসতে জানত? এমনভাবে ভেঙে পড়তে জানত?বিহান চোখ বন্ধ করল। বিহানের কণ্ঠ যেন ভাঙা কাঁচের ওপর দিয়ে হাঁটছে। সে আবারও বলতে শুরু করল—

-"তার জন্য সব করতাম। সব রকম পাগলামি আমি করেছি। এরপর আমরা আর্মিতে চলে গেলাম। তার অভিনয় এত নিখুঁত ছিল যে আমি—শেহজাদ তালুকদার বিহান, ধরতেই পারিনি।"

নুহা নিঃশব্দে কেঁপে উঠল। বিহান ঠোঁট কামড়ে ধরল। বলো—

-"ইলহান ভেবেছিল আরাবী তাকে ভুলে গেছে। মুভ অন করেছে। আমার সঙ্গে সুখে আছে। তাই অতীতের কিছুই সে আমাকে বলেনি। যদি এই সুখে আগুন ধরে যায়, এই ভয়ে সে চুপ ছিল। কিন্তু পাঁচ বছর আগে... আমাদের সামনে একটা ভিডিও আসে। সেখানে আর্সলান আর আরাবী, অপ্রতিরোধ্য ঘনিষ্ঠতায় একে অন্যের গায়ে লেপ্টে ছিল। আর দু’জনেই হেসে হেসে কথা বলছিল, কিভাবে আমাকে বোকা বানিয়েছে।কিভাবে আমাকে ব্যবহার করে ইলহানকে পাওয়ার চেষ্টা করেছে।"

বিহানের কণ্ঠ বদলে গেল। যেন স্মৃতির ভেতর ঢুকে সেই কথাগুলো আবার শুনছে—

-"‘একটা মানুষ এতটা বলদ কীভাবে হয়, আর্সলান?’

‘কেন, কী হয়েছে আরাবী?’

‘বিহানকে দেখো, একটু মিষ্টি মধুর কথাতেই সে গলে গেছে। অথচ সে বুঝতেই পারছে না, আমার দাবার গুটি সে।’

‘হাহাহাহা!’

‘বেচারা ভালোই মোঘা আছে। আমাকে পাগলের মতো ভালোবাসে। অথচ আমি যাকে চাই, সে ফিরেও তাকায় না। আবার সাধু পুরুষও। বিয়ের আগে আমাকে ছোঁবে না পর্যন্ত বলেছে। এখনো এমন বেক্কেল ছেলে আছে নাকি!’

‘দুর্বল সালা!’"

বিহানের কণ্ঠ ফেটে গেল।

-"শরীরের খুদা মেটাতে সে আর্সলানের কাছে গিয়েছিল। আর আর্সলান সুযোগ নিয়েছে। ভিডিও করে সেটা আমাকে পাঠিয়েছে, আমাকে ভাঙার জন্য।সে চেয়েছিল ইলহানকে সম্পূর্ণ একা করতে। একদিকে বন্ধুর প্রতারণা, অন্যদিকে প্রেমিকার বিশ্বাসঘাতকতা।আবার নির্দোষ বন্ধুটাকেই দোষী বানানোর চেষ্টা। কিন্তু আমি বোকা নই যে ইলহানকে ভুল বুঝব। আমার সঙ্গে যা করেছে, আরাবী নিজের ইচ্ছায় করেছে। এর দায় শুধু তার। আমার বন্ধুর না।"

একটু থেমে সে বলল—

-"ওই ভিডিও দেখে আমার চেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ সেদিন ইলহান হয়েছিল। আর্মি ক্যাম্পের মধ্যেই সে আর্সলানকে মারতে মারতে প্রায় মেরেই ফেলেছিল। এই কারণেই আমরা সাসপেন্ড হয়েছিলাম। ঢাকা ফেরার পর আরাবীকে খুঁজে বের করে ইলহান। এরপর আমাদের আরেক মেয়ে বান্ধবীকে দিয়ে ওকেও ইচ্ছেমতো পিটিয়েছিল।"

বিহান কষ্টের হাসি হাসল—

-"আমি ওকে এসব করতে বারণ করেছিলাম। কিন্তু আমার কলিজা... আমার প্রাণের বন্ধু... আমার জন্য নিজের প্রিন্সিপালের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। বেচারা আমার বন্ধু আমার এই দুঃখের জন্য নিজেকেই এখনো অপরাধী ভাবে। সেদিন বুঝেছিলাম, আমি একা নই।এতেই আমার সব কষ্ট দূর হয়েছিল। কিন্তু..."

বিহানের কণ্ঠ একেবারে নিস্তেজ—

-"ভালোবাসার প্রতি আমার বিশ্বাস... চিরদিনের জন্য উঠে গিয়েছে।

ঘরে শুধু নুহার নিঃশব্দ কান্নার শব্দ। বিহান ছলছল চোখে তাকাল তার দিকে। ধীরে সোজা হয়ে বসে নুহার মুখটা নিজের হাতের আজলায় তুলে নিল। ভাঙা কণ্ঠে বলল—

-"আমি তোমাকে ভালোবাসতে চাই।"

বিহানের কণ্ঠ ভাঙা, কিন্তু সত্যে ভরা।

-"বিশ্বাস করো, নীলপদ্ম। কিন্তু আমি সাহস করতে পারছি না। আমার ভয় হয়... যদি তুমিও আমায় ছেড়ে চলে যাও? আমি তো বাঁচতেই পারবো না। দ্বিতীয়বার একই আঘাত আমি সহ্য করতে পারবো না।"

তার হাত দু’টো অনিশ্চিতভাবে কাঁপছিল।

-"আমি তোমাকে উজাড় করে ভালোবাসতে চাই। এমন না যে তোমার ভালোবাসা আমি বুঝি না, আমি বুঝি।অনুভব করি। তোমার জন্য আমার মনেও অনুভূতি আছে। কিন্তু... তাকে যদি আমি ভালোবাসার নাম দেই… আর যদি আবার সেই আঘাত ফিরে আসে, তখন?"

তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো।

-"ভালোবাসা আমার জীবনে অভিশপ্ত, নীলপদ্ম। আমি ভীষণ ভীতু। আমি তোমাকে হারাতে পারবো না!"

নুহা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। শব্দ করে কেঁদে উঠল সে। হেঁচকি উঠে গেছে। এই মানুষটার বুকে এত পাহাড়সম কষ্ট জমে ছিল, সে তা জানতই না। কত ভুল ভেবেছে, কত অভিমান জমিয়েছে, সবকিছু মুহূর্তেই তুচ্ছ হয়ে গেল। নুহা বিহানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। যেন তাকে ছেড়ে দিলে সে ভেঙে পড়বে। ফুপিয়ে ফুপিয়ে বলল—

-"সে আপনার প্রথম ভালোবাসার ভোর, আর আমি হতে চাই আপনার শেষ ভালোবাসার অনন্ত সন্ধ্যা!যেখানে সব পথ এসে থামে আমারই কাছে!"

তার কপাল বিহানের বুকে ঠেকানো।

-"আমি শেষ নিশ্বাস অব্দি আপনাকেই ভালোবাসব।মৃত্যু ছাড়া কেউ আমাকে আপনার থেকে আলাদা করতে পারবে না।"

ঘরজুড়ে নেমে এলো এক গভীর নীরবতা, যেখানে আর ভয় নেই, শুধু বিশ্বাসের স্পর্শ। ভাঙা একজন মানুষ আর ভালোবাসায় অটল একজন নারী, এই মুহূর্তেই যেন দু’জনের ভাগ্য নতুন করে লিখতে শুরু করল।

.

ইলহান রুমে ঢুকেই নূরাইসার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছিল। কিন্তু শরীর থেকে আসা তীব্র গন্ধের জন্য নূরাইসা একটুও কাছে আসছিল না। ইলহান এই সুযোগটা ভালোভাবেই লুফে নিল। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। মনে মনে ঠিক করল, আজ একটু দুষ্টুমি করা যাক। সে মাতাল হওয়ার অভিনয় শুরু করে দিল। পা টলমল করে নূরাইসার দিকে এগোতে লাগল। হঠাৎ করেই তার ওপর পড়ে যেতে চাইলে নূরাইসা চমকে উঠল। ভেতরের সমস্ত বিরক্তি আর অস্বস্তি একসঙ্গে জমে গিয়ে সে পুরো শক্তি দিয়ে ইলহানকে ধাক্কা মেরে দিল। ইলহান সোজা খাটের ওপর গিয়ে পড়ল। এক মুহূর্তও দেরি করল না নূরাইসা। দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে এল। বুকের ভেতর জমে থাকা চাপটা যেন আর সহ্য হচ্ছিল না। সিঁড়ির এক পাশে মেঝেতে বসে পড়তেই তার চোখের কোণে জমে থাকা কান্না আর বাঁধ মানল না। ফুপিয়ে কেঁদে উঠল সে। গভীর রাতের নিস্তব্ধতার ভেতর তার দমবন্ধ করা কান্না যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। আর ঠিক তখনই নুহা আর আফরিন নিজেদের রুম থেকে বেরিয়ে এল। সিঁড়ির পাশে বসে কাঁদতে থাকা নূরাইসাকে দেখে দুজনেই আঁতকে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে ছুটে এসে প্রশ্ন করল—

-"কি হয়েছে?"

নূরাইসা এই সময় তাদের এখানে দেখে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। নিজের দুর্বলতা ধরা পড়ে গেছে, এই ভেবে তাড়াতাড়ি চোখ মুছে নিল। কণ্ঠটাকে স্বাভাবিক রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করে বলল—

-"কিছু না। তোরা এত রাতে এখানে কি করছিস?"

আফরিন বিরক্তি চেপে রাখতে না পেরে বলল—

-"ছাইপাশ গিলে এসেছে এখন পড়ে পরে ঘুমাচ্ছে। গন্ধে টিকতে পারি নি। তাই বেরিয়ে এসেছি!"

নুহা তখন বিষন্ন মুখে ধীরে ধীরে সবটা খুলে বলল, আজ বিহান তাকে যা যা বলেছে, প্রতিটা কথা। কথা বলতে বলতে তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছিল। শেষে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—

-"দমবন্ধ লাগছিল তাই একটু বাহিরে এসেছি!"

আফরিন নূরাইসার হাতটা নিজের হাতের ভেতর নিয়ে শক্ত করে ধরে। চোখে গভীর উদ্বেগ, কণ্ঠে নরম আদর—

-"কি হয়েছে ইসা? যেদিন থেকে এসেছি তোর মুখে হাসি নেই। কথা বলছিস না কারো সাথে। কিছু হয়েছে ভাইয়ার সাথে?"

নূরাইসা নিষ্প্রাণ স্বরে বলল—

-"আমার নিজেকে বোঝা মনে হয়। মনে হয় আমি তোদের ওপর এক বোঝা। আমি তোদের সবার জন্য কত বড় একটা মুসিবত। আমি কত দুর্বল। ভীতু। সব সময় মানুষ লাগে আমাকে দেখে রাখার জন্য।"

কথা বলতে বলতে তার চোখের পানি আর বাঁধ মানছিল না। অন্ধকার সিঁড়িঘরে আলো-ছায়ার ভেতর তার মুখটা আরও ফ্যাকাশে লাগছিল। একটা তিক্ত হাসি ঠোঁটের কোণে এসে মিলিয়ে গেল। ভাঙ্গা কন্ঠে আবারও বলল—

-"উনি তো এই বিয়ে করতে চাননি। দাদুর কথা ফেলতে না পেরে আমায় বিয়ে করেছেন। আর এখন পস্তাচ্ছে।আমার জন্য তার জীবনে কত অশান্তি। দেখিস না আমাকে সব সময় নজরে নজরে রাখতে হয়। তাই আমি সবার থেকে দুরত্ব বজায় রাখছি। আমি একা থাকবো। বাসা থেকে বের হব না। তাহলেই তো আর কোনো ঝামেলা হবে না।"

নূরাইসা একটু থামল। বুকের ভেতরটা যেন হু হু করে উঠছে।

-"সব সময় সব ঝামেলা আমাকে দিয়েই শুরু হয় রে। তোদের সাথে কত কিছু হয়ে গেলো। যদি আমি না থাকতাম তাহলে এত কিছু হতো না। উনি তোদের ওপর নজর রাখতে পারত। কিন্তু আমি এতটাই দুর্বল যে আমাকে সামলাতে গিয়ে উনি তোদের খেয়াল রাখতে পারে নি। তোর ভুলে ছিল!"

নুহা আর আফরিন নিঃশব্দে শুনছিল। বাতাস ভারী হয়ে উঠছিল প্রতিটা শব্দের সাথে।

-"এই যে আমাকে আর্মিতে নিয়ে যাওয়া, এটা সম্পূর্ণ ওনার পরিকল্পনা ছিল। উনি ভাবে আমি অবুঝ, কিছু বুঝি না। কিন্তু আমি অবুঝ নই। আমি সব বুঝি।"

সে চোখ নামিয়ে নিল। অশ্রুসিক্ত নয়নে হেসে বলল—

-"আরিবা আপু কোনোদিন ওনাকে পছন্দ করত না। সব ওনার কথায় করেছে। আমি তো এমনি এমনি যেতাম না আর্মিতে। আর আমাকে ওনার আসে পাশে রাখলে উনি বেশি ভালোভাবে নজর রাখতে পারবে,এই জন্যই এই নাটক সাজানো। আমি আর্মিতে গিয়েই বুঝেছিলাম। কারণ যেখানে সামান্য তেলের ছিটা আমার গায়ে এলেও উনি রেগে যেতো, সেখানে আমি এমন একটা জায়গায় যাবো, যেখানে কত আঘাত আমার জন্য অপেক্ষা করছে, আর উনি কিছুই বলল না আমায়। সেদিনই আমি বুঝেছিলাম... কিছু একটা ঘাপলা আছে।"

নুহা বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে বলল—

-"কি বলছিস আপু?"

নূরাইসার চোখ দিয়ে অনবরত অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল।সে নাক টেনে আবার বলতে শুরু করল—

-"হুম! আমার জন্য উনি কত ঝামেলাতেই তো পড়ল।বিয়ের পর থেকে শুরু করে আজ অব্দি উনি শান্তি পায় নি। সেদিন তো বলেই ফেললো। আমায় রক্ষা করা নিয়ে উনি এতটাই মেতে ছিল যে তোদের সাথে এত কিছু হয়ে গেলো। তোদের উনি রক্ষা করতে পারলো না।"

নূরাইসা নিজের বুকের ওপর হাত চেপে ধরল। বোনদের দিকে তাকিয়ে ভাঙ্গা নিরেট কন্ঠে বলল—

-"আমার সত্যি মনে হয় আমি না থাকলে এত কিছু হতো না তোদের সাথে। আমার জীবনটা বিতৃষ্ণায় ভরে উঠেছে রে। আমার এখন আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় সব শেষ করে চলে যাই আমি!"

এই কথাটা শুনে আফরিন হঠাৎ করেই ধমক দিয়ে উঠল। কণ্ঠে রাগ, চোখে আগুন—

-"কি বলছিস তুই ইসা! চুপ কর। একদম চুপ!"

সে নূরাইসার সামনে বসে পড়ল। একটু থেমে আরও দৃঢ় স্বরে বলল—

-"আমাদের সাথে যা হয়েছে সেটা হওয়ার ছিলই। কেউ ঠেকাতে পারত না। এইসব করেছে ওই অমানুষের দল। এখানে তোর দোষ কোথায়? আর নিজের বউকে রক্ষা করে ভাইয়া কোনো অন্যায় করে নি!"

নূরাইসা শব্দ করে কেঁদে বলে উঠল। কাঁপা হাতে দুই বোনের মুখে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল সে। চোখের পানিতে তার দৃষ্টিও ঝাপসা। অসহায় কন্ঠে বলে উঠলো—

-"আমি না থাকলে এইসব হতো না আফরিন! আমার নিষ্পাপ ফুলের মতো বোনদের গায়ে আজ কত আঘাতের চিহ্ন! অথচো আমি অক্ষত। সব আমার জন্যই। ওদের টার্গেট শুরু থেকেই আমি ছিলাম। সেদিন জন্মদিনের দিন যদি আর্সলান আমায় মেরে ফেলত, তবে তোদের এই দিন দেখতে হতো না। আজ তোদের সুস্থ, স্বাভাবিক একটা জীবন থাকতো। আমি না হয় নাই-ই থাকতাম, এতে কিছু যেত আসত না। কিন্তু এই অপরাধবোধ ওনাকে বাঁচতে দিচ্ছে না।নিজের বোনদের রক্ষা করতে না পারা ওনাকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে। আমি বুঝি।"

চোখ নামিয়ে নরম স্বরে বলল—

-"উনি আমাকে অবুঝ ভাবে, তাই কিছু বলে না। কিন্তু ওনার ভেতরের ঝড় আমি বুঝতে পারি।"

ঠিক তখনই পেছন থেকে পায়ের শব্দ ভেসে এল।নূরাইসা চমকে উঠে তড়িঘড়ি চোখের পানি মুছে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। ইলহান এসে তার পেছনে দাঁড়াল। কঠিন কণ্ঠে আফরিন আর নুহার দিকে তাকিয়ে বলল—

-"ঘরে যা।"

দুই বোন নিঃশব্দে উঠে ঘরে চলে গেল। বাতাসটা যেন আরও ভারী হয়ে পড়ল। ইলহান নূরাইসার বাহু ধরে টেনে তুলে তাকে ঘরে নিয়ে এল। দরজা বন্ধ হতেই রক্তিম চোখে তাকায় নূরাইসার দিকে, চোখে স্পষ্ট রাগের ঝিলিক। ধীরে ধীরে নূরাইসার সামনে এসে দাঁড়াল। হিসিসিয়ে বললো—

-"খুব বুঝিস আমায়?"

নূরাইসা কোনো উত্তর দিল না। ইলহাবের কণ্ঠে আগুন জ্বলে উঠল—

-"তোর গায়ে সামান্য তেল ছিটে এলেও আমার কলিজায় আঘাত করত। সেই তোকে কেউ মেরে ফেলতে চাইবে আর আমি চুপ করে থাকবো? তুই আমার প্রাণভোমরা। সেই তুই নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথা বলছিস? একবারও ভেবেছিস এইসব শুনে আমার কতটা কষ্ট হবে?"

নূরাইসা নিশ্চুপ। ইলহান শক্ত করে তার দুই বাহু চেপে ধরে নিজের কাছে টেনে নিল। গর্জে উঠে বলল—

-"এই কলিজা কাঁপল না তোর? এইসব কথা মুখ দিয়ে বের করার আগে একবারও আমার মুখ ভেসে ওঠে নি তোর চোখের সামনে? তুই জানিস না তুই আমার কাছে কি? আমার ভেতরের ঝড় বুঝিস, অথচ তোর স্থান কোথায় সেটা বুঝিস না?"

সে আরও কাছে ঝুঁকে প্রায় চিৎকার করে উঠল—

-"এই তোর কি মনে হয়, যেই পৃথিবীতে নূরাইসা নেই, সেই পৃথিবীতে ইলহান বেঁচে থাকতে পারবে? হ্যাঁ? বল। এই কথা বল!!"

ইলহানের চিৎকারে নূরাইসা কেঁপে উঠল। এই রাগ শুধু ক্রোধ নয়, এ এক উন্মত্ত ভয়। যাকে সে জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে, সেই মানুষটাই যদি নিজেকে সবার থেকে দূরে সরিয়ে নিতে চায়? নিজেকে শেষ করে দিতে চায়? এই কথা শুনে ইলহান কীভাবে স্থির থাকবে? হ্যাঁ, সে ভুল করেছে। সেদিন ওইভাবে কথা বলা উচিত হয় নি। কিন্তু সে কখনোই নূরাইসাকে দোষী ভাবে নি, কখনোই না। দোষী ভাবলে সে শুধু নিজেকেই ভাবে। ইলহান রাগে, যন্ত্রণায় নিজের চুল দু’হাতে মুঠো করে শক্ত করে ধরে চিৎকার করে উঠল—

-"কোনো পুরুষ তোর দিকে তাকালে আমি সহ্য করতে পারি না! কেউ কেন আমি ছাড়া আমার নূরেজানকে দেখবে? এই অধিকার কারো নেই।তুই আমার, জীবিত, মৃত, সব ভাবেই তুই আমার। শুধুই আমার!"

কণ্ঠে হিংস্র অধিকারবোধ আর আতঙ্ক একসাথে বিস্ফোরিত হলো।

-"ওই আর্সলানকে আমি খুন করে ফেলবো তোর দিকে স্নাইপার তাক করার জন্য। তোকে কি করবো বল? তুই নিজেই তো আমার থেকে তোকে সরিয়ে নিতে চাইছিস। তোর কি শাস্তি হতে পারে বলে!!"

নূরাইসার চাপা কান্না হেঁচকিতে রূপ নিল। দম নিতে কষ্ট হচ্ছিল তার। ইলহান এগিয়ে এসে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। এতক্ষণ যে মানুষটা আগুন হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, সে হঠাৎই ভেঙে পড়ল। দু’হাত তুলে কান ধরে বলল—

-"ক্ষমা করে দে জান... বিশ্বাস কর, তোকে আমি এক ফোঁটা দোষ সেদিন দেই নি।"

কণ্ঠটা তখন অসহায়। চোখ দিয়ে অস্রুকনা গড়িয়ে পড়ছে।

-"তোর ফুলের মতো চরিত্রে আমি কোনোদিন প্রশ্ন তুলি নি। মুখ ফসকে যেই কথা বলেছি, সেই কথা ফিরিয়ে নিলেও তোর আঘাত কমবে না, আমি জানি। ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব ও না। তার জন্য তুই আমায় শাস্তি দে। যা ইচ্ছে করিস। কিন্তু নিজেকে আমার থেকে সরিয়ে নিস না।"

ইলহান সামনে ঝুঁকে পড়ল। গাল বেয়ে অশ্রু মেঝেতে পড়ছে।

-"আমি তোকে ছাড়া, সত্যি বলছি, এক মুহূর্তও বাঁচতে পারবো না। সেদিন রাগের বসে আমি আমার ভুলের কথা বলেছি। আমি আমার অপারগতার কথা বলেছি। তোর দোষ দেই নি।"

সে চোখ তুলে তাকালো সামনে দাড়িয়ে থাকা নারীর পানে। ইলহানের রক্তচক্ষু বিয়ে পরা অশ্রু দেখে অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল নূরাইসার। সে নূরাইসার দিকে তাকিয়ে বলল—

-"আমি শুধু তোকে নিয়েই এত মেতে ছিলাম যে অন্য কারো সুরক্ষার কথা ভাবতে পারি নি। তাহলে ভাব, তুই কতটা আমার মন-মস্তিষ্ক জুড়ে আছিস। আমি তোকে এক বিন্দুও দোষারোপ করি নি জান। আমায় বিশ্বাস কর। তুই সেদিন বুঝতে ভুল করেছিস নূরেজান।"

সে ধীরে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল—

-"তোর এই নিশ্চুপ থাকা... তোর আর আমার মাঝের এই দূরত্ব, আমাকে বাঁচতে দিচ্ছে না। আমি তোকে তুলে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছি। তুই বুঝতে পারছিস না আমার কষ্ট? তোকে ছাড়া ভালো নেই তোর মোল্টেন হার্ট। কেনো এতো পোড়াচ্ছিস? মুক্তি দে এই শাস্তি থেকে! তোকে ছাড়া ভালো নেই তোর স্বামী। আর কত যন্ত্রণা সইবো আমি? এবার তো ক্ষমা কর!"

ইলহান কান্নায় ভেঙে পড়েছে। আজ দ্বিতীয়বার নূরাইসা ইলহানকে কাঁদতে দেখল, আর এই দ্বিতীয়বারটাই যেন তার বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে নিয়ে গেল। ঘরজুড়ে নেমে এলো এক অদ্ভুত নীরবতা, যেখানে শুধু শোনা যাচ্ছিল ইলহানের দমবন্ধ করা শ্বাস আর ভাঙা হৃদয়ের শব্দ। এই পুরুষটির চোখে নূরাইসা বরাবরই দেখেছে আগুন, রাগের আগুন, ভালোবাসার আগুন। কিন্তু এই চোখে কান্না মানায় না। একেবারেই না।

নূরাইসা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। ধীরে ধীরে ঝুঁকে পড়ে মেঝেতে বসে পড়ল সে। দুই হাত বাড়িয়ে বুকে জড়িয়ে নিল ইলহানকে, ঠিক যেন ভেঙে যাওয়া মানুষটাকে নিজের শরীর দিয়ে আগলে রাখতে চায়। ইলহান তখন আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ছোট্ট বাচ্চার মতো তাকে জাপটে ধরে ফুপিয়ে উঠল—

-"আই এম সরি নূরেজান... মাফ করে দে আমায়। তোকে বড্ড ভালোবাসি আমি। তোকে ছাড়া আমি বাঁচব না। আর কোনোদিন... প্লিজ আর কোনোদিন আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা বলিস না। যেই পৃথিবীতে তুই নেই, সেই পৃথিবীতে আমি থাকতে পারব না। আমি থাকবও না। তোর কিছু হলে আমি নিজেকে শেষ করে দেব।"

এই কথাগুলো যেন ছুরির মতো নূরাইসার বুকে গেঁথে গেল। সে আঁতকে উঠে ইলহানের মুখের দিকে তাকাল। চোখ ভিজে উঠল, কণ্ঠ কেঁপে উঠল আতঙ্কে—

-"এইভাবে বলবেন না... প্লিজ এইভাবে বলবেন না। আমি কোথাও যাব না। আপনাকে ছেড়ে কোথাও যাব না আমি। আমি আপনারই থাকব... শুধু আপনারই। কোথাও যাব না, কোনোদিন না।"

দু’জন মানুষের কান্না তখন একাকার হয়ে গেল। চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠল না বলা হাজারো ভয়ের ও ভালোবাসার ভারে। সেই মুহূর্তে সময় থমকে গেল, শুধু থেকে গেল দু’টো জড়িয়ে থাকা শরীর, আর দু’টো হৃদয়, যারা একে অপরকে হারানোর আতঙ্কে কাঁপছে, তবু ভালোবাসায় আঁকড়ে ধরছে প্রাণপণে।

বিজ্ঞাপন
সূর্যস্নাত ভালোবাসা গল্পটি নওরিন ইথিকা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ভালোবাসাময় গল্প