বান্দরবনের হাসপাতাল আজ অস্বাভাবিক রকমের শান্ত। গভীর রাতের ভারে ক্লান্ত ভবনের প্রতিটি করিডোর যেন নিঃশ্বাস আটকে আছে। ভর্তি হওয়া সমস্ত রোগী ঘুমের অতলে তলিয়ে গেছে, কেউ যন্ত্রণার ওষুধে, কেউ নিস্তব্ধ ভাগ্যের কাছে আত্মসমর্পণে।হাসপাতালের ভেতরে এখন কেবল হাতে গোনা কয়েকজন নার্স আর ইমার্জেন্সি ডাক্তার, যাদের চোখে ক্লান্তি, তবু দায়িত্বের অদৃশ্য আগুন জ্বলছে। নাইট ডিউটির আরও কিছু ডাক্তার রোগীদের পর্যবেক্ষণ সেরে, ওষুধ দিয়ে ঘুমোতে বলে, একে একে নিজ নিজ কেবিনে বিশ্রামে গেছেন। সেই কারণেই হাসপাতালজুড়ে এখন এক গভীর নীরবতা, যেন শব্দও কথা বলতে ভয় পাচ্ছে। বাহিরে শীতল পাহাড়ি বাতাস বইছে। অন্ধকার এত ঘন যে মনে হয় রাত নিজেই নেমে এসে চারপাশ জড়িয়ে ধরেছে। দূরে কোথাও কুকুরের ঘেউ ঘেউ শোনা যাচ্ছে, তারা যেন নিঃসঙ্গতার সাক্ষ্য দিচ্ছে। গেটের পাশের উঁচু চৌকিতে বসে দারোয়ান ঝিমোচ্ছে, চোখ আধো বুজে এলেও দায়িত্ব তাকে পুরোপুরি ঘুমোতে দিচ্ছে না। ঠিক তখনই, নীরবতাকে চিরে, শাঁ করে একটি গাড়ি হাসপাতাল চত্বরে প্রবেশ করে। হঠাৎ শব্দে দারোয়ানের স্নায়ু কেঁপে ওঠে। মুহূর্তের মধ্যেই আতঙ্ক তার শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়ে, সে অস্ফুট ভয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। গাড়িটি সোজা হাসপাতালের মূল ফটকের সামনে এসে থেমে যায়। দরজা খুলতেই একে একে নেমে আসে বিহান, নুহা, রুহান, উপমা, আফরিন, এমরিন, সবার পদক্ষেপ তাড়াহুড়োয় ছিন্নভিন্ন, চোখজোড়া উৎকণ্ঠায় জ্বলজ্বল করছে, নিঃশ্বাসে জমে আছে দমবন্ধ করা অস্থিরতা।বিহান এক মুহূর্তও নষ্ট না করে গাড়ির পেছনের দরজাটি খুলে দেয়। ঠিক সেই ক্ষণেই কাঁপতে থাকা ইলহান নিস্তেজ নূরাইসাকে বুকে আঁকড়ে ধরে গাড়ি থেকে নেমে পড়ে, তার চোখে অসহায়তার ছায়া, হাতে অনিয়ন্ত্রিত কম্পন। হাসপাতালের নীরবতা তখন আর নিছক নীরবতা নয়, সে নীরবতার গভীরে ঘনীভূত হয়ে উঠছে এক আসন্ন ঝড়ের অশুভ পূর্বাভাস।
সবাই দ্রুত পায়ে ভেতরের দিকে এগিয়ে যায়। একে হাঁটা বলা ভুল হবে, এ ছিল দমবন্ধ করা এক উন্মত্ত দৌড়, যেখানে শ্বাস নেওয়ারও ফুরসত নেই। নূরাইসার সাদা শাড়ি র ক্তে ভিজে গাঢ় হয়ে উঠেছে। পা বেয়ে অনবরত রক্ত গড়িয়ে পড়ছে, অথচ সেই মুহূর্তে কারও দৃষ্টি আলাদা করে সেখানে পরেনি। শাড়ির সাদা রঙ র ক্তকে এমনভাবে নিজের মধ্যে টেনে নিয়েছে, যেন সেটিই তার অনিবার্য নিয়তি। নূরাইসার শরীর থেকে অতিমাত্রায় র ক্ত ক্ষরণ হয়েছে। সেই ছাপ লেগেছে ইলহানের সাদা স্যুটেও, নির্দোষ সাদা কাপড়ে জমে আছে মৃ ত্যুর নিঃশব্দ রঙ। ইলহান নূরাইসাকে কোলের মধ্যে শক্ত করে ধরে ছুটে চলছে। শাড়ির আঁচল মাটিতে ছুঁয়ে যাচ্ছে, নিস্তেজ দুই বাহু দুলে নামছে।ইলহানের চোখে তখন কোনো দিকনির্দেশ নেই, আছে শুধু একটিমাত্র ভয়, একটিমাত্র প্রার্থনা। উন্মাদের মতো চিৎকার ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে তার বুক থেকে—
-"ডাক্তার! ডাক্তার!"
চিৎকারে তার কণ্ঠ কেঁপে উঠছে, প্রতিটি শব্দ ভেঙে ভেঙে বেরিয়ে আসছে বুকের গভীর থেকে। তার সঙ্গে সঙ্গে বাকিরাও ছুটে চলেছে, চিৎকারে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে রাতের জমাট স্তব্ধতা। মুহূর্তের মধ্যেই নিস্তব্ধ হাসপাতাল জুড়ে হইচই ছড়িয়ে পড়ে। ইমার্জেন্সির ডাক্তার আর নার্সরা দৌড়ে বেরিয়ে আসে, ঘুম, ক্লান্তি, অবসাদ এক লহমায় ঝরে পড়ে তাদের চোখ থেকে, জেগে ওঠে শুধু পেশার তাগিদ। ইলহান তাদের দেখেও থমকে দাঁড়ায় না। কাঁপতে থাকা শরীর, ভেঙে পড়া বুক আর দমবন্ধ করা নিঃশ্বাস সামলে সে তাদের দিকে তাকিয়ে আর্তচিৎকার করে ওঠে, কণ্ঠে তখন ভাষার শৃঙ্খলাও আর অটুট নেই—
-"প্লিজ... সেইভ মাই ওয়াইফ! শি হ্যাজ বিন শট... প্লিজ... সেইভ হার!" (She has been shot)
কথাগুলো আর বাক্যের কাঠামো মানছিল না, ওগুলো ছিল তার বুক ছিঁড়ে বেরিয়ে আসা আর্তনাদ। প্রতিটি শব্দের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে ছিল একটাই আতঙ্ক, এই বুঝি সে তাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। চোখের সামনে ভাসছিল স্ত্রীর নিস্তেজ মুখ, ক্রমে শীতল হয়ে আসা শরীর। সেই মুহূর্তে ইলহান শুধু একজন স্বামী নয়, সে একজন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া মানুষ, যার পৃথিবী ধসে পড়ছে চোখের সামনেই। গুলির ঘটনায় সাধারণত পুলিশি প্রক্রিয়া ছাড়া চিকিৎসা শুরু করা হয় না, আইনি জটিলতার আশঙ্কা ডাক্তারদের হাত টেনে ধরে।সেই দ্বিধা তাদের চোখেমুখে স্পষ্ট। অথচ নূরাইসার অবস্থা মুহূর্তে মুহূর্তে অবনতির দিকে। এখনই চিকিৎসা শুরু না হলে যে কোনো ভয়াবহ পরিণতি ঘটতে পারে।ডাক্তারদের দৃষ্টিতে জমে থাকা সেই দ্বিধা বিহান বুঝে ফেলে। এক সেকেন্ডও দেরি না করে সে সামনে এগিয়ে আসে। তার পকেট থেকে আর্মি ব্যাজটি বের করে ডাক্তারের সামনে ধরে। আর্মি ব্যাজটি নজরে পড়তেই ডাক্তারের মুখের ভাব মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায়। সমস্ত দ্বিধা গলে গিয়ে জায়গা নেয় কর্তব্যবোধ। তিনি তৎক্ষণাৎ নির্দেশের সুরে বলে ওঠেন—
-"ওনাকে ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যাও। আর এখুনি সিনিয়র সার্জেনকে খবর দাও। মুভ ফাস্ট!"
কণ্ঠে কোনো দ্বিধা নেই। নির্দেশ উচ্চারিত হতেই হাসপাতালের ভেতরের স্থিরতা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।নার্সরা দৌড়ে স্ট্রেচার নিয়ে আসে। চাকার ঘর্ষণে মেঝের উপর ছড়িয়ে পড়ে তীক্ষ্ণ শব্দ, নীরবতার বুক চিরে দেওয়া এক অস্থির ঘোষণা। কিন্তু ইলহান নূরাইসাকে স্ট্রেচারে শুইয়ে দেয় না। উল্টো সে নিজেই তাকে বুকে আগলে ধরে বেডের দিকে এগিয়ে যায়।যেন তাকে কারও হাতে তুলে দিলেই সব শেষ হয়ে যাবে। নিজের বুকের কাছেই রেখে, নিজের হাতেই নূরাইসাকে শুইয়ে দেয় সে। তার আঙুলগুলো শক্ত করে আঁকড়ে আছে, এক মুহূর্তের জন্যও ছাড়তে রাজি নয়, যেন ছেড়ে দিলেই জীবনটা ফসকে যাবে। নার্সদের অনুনয়, ডাক্তারের তাগিদ, সব পেরিয়ে অবশেষে চিকিৎসার প্রয়োজনে তাকে বেরিয়ে আসতেই হয়।ইলহান পেছন ফিরে তাকায়। নূরাইসার নিস্তেজ মুখ, বন্ধ চোখ, এই এক দৃশ্যেই তার বুকের ভেতর কিছু একটা নিঃশব্দে ভেঙে পড়ে। দরজাটা বন্ধ হয়ে যায় তার সামনে, একটি ধাতব শব্দে, যা তার হৃদয়ে তালা লাগিয়ে দেয়।
ইমার্জেন্সির দরজা বন্ধ হতেই ভেতরে শুরু হয় যুদ্ধ। মনিটরের পর্দায় হৃৎস্পন্দনের রেখা কাঁপছে। নার্সরা দ্রুত IV লাইন সেট করছে, রক্তচাপ মাপা হচ্ছে, অক্সিজেন মাস্ক বসানো হচ্ছে। কারও কণ্ঠে অপ্রয়োজনীয় শব্দ নেই, শুধু ছোট ছোট, নিখুঁত নির্দেশ, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উচ্চারিত বাক্য—
-"BP স্টেবল রাখুন।"
-"অক্সিজেন বাড়ান।"
-"অপারেশন থিয়েটার রেডি করুন।"
-"BP ড্রপ করছে।"
-"ক্রস-ম্যাচড ব্লাড রেডি?"
-"ভাইটালস স্টেবল রাখতে হবে।"
ঠিক তখনই দ্রুত পদক্ষেপে সিনিয়র সার্জেন প্রবেশ করেন। চোখে তীক্ষ্ণ মনোযোগ, মুখে পেশাগত কঠোর সংযম। এক ঝলকেই নূরাইসার অবস্থা বুঝে নিয়ে তিনি সময় নষ্ট না করে নির্দেশ ছুড়ে দেন—
-"অপারেশন থিয়েটার রেডি করো। বুলেট ট্রাজেক্টরি জটিল। এক সেকেন্ডও দেরি করা যাবে না।"
নূরাইসাকে দ্রুত অপারেশন থিয়েটারের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। দরজা বন্ধ হয়ে যায়। লাল আলো জ্বলে ওঠে, বাইরের পৃথিবী থেকে ভেতরের যুদ্ধকে আলাদা করে দেয় একটিমাত্র সংকেত। ভেতরে শুরু হয় প্রস্তুতির নিঃশব্দ ব্যস্ততা, হাত ধোয়া, গ্লাভস পরা, যন্ত্রপাতির ধাতব স্পর্শে ক্ষণিক শব্দ। আলো এত তীব্র যে অন্ধকারের কোনো অস্তিত্ব সেখানে টিকে থাকে না। সার্জেনের কণ্ঠ স্থির, অবিচল—
-"সবাই ফোকাসড থাকবেন। ব্লিডিং কন্ট্রোলই প্রথম টার্গেট।"
সময় যেন হঠাৎ থমকে গেছে। প্রতিটি মিনিট গুনে গুনে ভারী হয়ে ঝরে পড়ছে। বাইরে, অপারেশন থিয়েটারের দরজার সামনে, ইলহান পায়চারি করছে। দেয়ালে ভর দিয়ে দাঁড়িয়েও থাকতে পারছে না সে। চোখ বারবার আটকে যাচ্ছে বন্ধ দরজাটার দিকে। প্রতিটি সেকেন্ড তার কাছে একেকটা যুগের মতো দীর্ঘ। বিহান নীরবে দাঁড়িয়ে আছে, মুখ কঠিন, অথচ ভেতরে ভেতরে সেও প্রার্থনায় ভেঙে পড়ছে। নুহা, আফরিন, উপমা অনবরত কাঁদছে, কান্না চাপতে পারছে না। রুহান বারবার চোখ মুছছে। এমরিন নিশ্চুপ, তার নীরবতাই সবচেয়ে ভারী। হাসপাতালের করিডোরে শুধু ঘড়ির টিকটিক শব্দ, আর অপেক্ষার দমবন্ধ করা শ্বাস। ভেতরে জীবন আর মৃ ত্যুর লড়াই। বাইরে নিঃশ্বাস আটকে রাখা প্রতীক্ষা।
রাত যত গভীর হচ্ছে, উৎকণ্ঠাও তত ঘনীভূত হচ্ছে।
.
তানভীর ও ফারাহ্ পাশাপাশি হেঁটে চলছে। রাত অনেক গভীর হয়ে এসেছে, এমন গভীর যে চারপাশের নীরবতা যেন শব্দ হয়ে কানে বাজে। রাস্তার বাতিগুলো একে একে ফিকে আলো ছড়াচ্ছে, আর সেই আলোয় দু’জনের ছায়া লম্বা হয়ে মিশে যাচ্ছে অচেনা অন্ধকারে। এতটা দেরি হয়ে যাবে, এ কথা দু’জনের কেউই ভাবতে পারেনি। তবু আজ বহুদিন পর যেন বুকের ভেতর জমে থাকা ভারটা কিছুটা হালকা হয়েছে। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছে দু’জনেই, যদিও সেই স্বস্তি নিঃশব্দ, অনুচ্চারিত। ফারাহ্ জানে না, আফরিনের সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছে। তানভীর তাকে কিছুই জানায়নি। ইলহানের কড়া নিষেধ, এই অধ্যায়ে করো প্রবেশ নেই। তবু আজ ফারাহর মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। ঠোঁটের কোণে জ্বলজ্বল করছে অনাবিল হাসি, যেন দীর্ঘ অন্ধকারের পর হঠাৎ সূর্যের আভাস।সে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠল—
-"আপনাকে অনেক ধন্যবাদ ভাইয়া। আপনি আমার অনেক বড় উপকার করেছেন।"
তানভীর নীরবে হাঁটতে হাঁটতেই জবাব দিল। তার কণ্ঠ শান্ত, প্রায় উদাস—
-"ব্যাপার না। এত ভেবো না। তবে এই বিষয়টা গোপন কোরো না। বাড়িতে সবাইকে জানিয়ে দিও!"
কথাটা শুনেই ফারাহ্ আঁতকে উঠল। কণ্ঠে হঠাৎ ভয় জমে উঠল—
-"না না, এইসব বাড়িতে জানানো যাবে না ভাইয়া।আমাকে মেরে ফেলবে।"
তানভীর থেমে গেল। তার ভ্রু কুঞ্চিত হলো। সরু চোখে তাকিয়ে ফারাহর দিকে চেয়ে কণ্ঠে কঠোরতা এনে বলল—
-"গোপন করতে চাইছ? ভবিষ্যতে যার সঙ্গে তোমার বিয়ে হবে তাকেও বলবে না? এটা তো ধোঁকা হবে, ফারাহ্!"
ফারাহ্ মুখটা নিচু করে নিল। চোখের দৃষ্টি মাটিতে আটকে গেল, যেন সে নিজেকেই লুকাতে চাইছে।নিস্তেজ, প্রায় ভেঙে পড়া কণ্ঠে বলল—
-"সত্য জানাজানি হলে কেউ আমায় গ্রহণও করবে না, ভাইয়া!"
তানভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। রাতের বাতাসে সেই দীর্ঘশ্বাস মিশে গেল। দৃঢ় অথচ স্নিগ্ধ স্বরে সে বলল—
-"মিথ্যের আশ্রয়ে বেশিদিন টেকা যায় না, ফারাহ্।তাছাড়া... তোমার তো কোনো দোষ নেই!"
ফারাহ্ ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল। চোখদুটো জলে ভিজে এসেছে, কণ্ঠ ভাঙা—
-"আছে ভাইয়া। ভালোবাসায় এতটাও অন্ধ হতে নেই যে নিজের সম্মান বিকিয়ে দিতে হবে। আমি আর্সলানকে ভালোবেসে ছিলাম মন থেকে। কিন্তু সে আমাকে ব্যবহার করেছে। আমার মাধ্যমে ইসার সমস্ত খবর সে নিত। আমি এতটাই অন্ধ ছিলাম যে তার চালাকি কখনোই বুঝতে পারিনি। আমি তো ভেবেছিলাম, সে আমার সব বন্ধুদের খবর নিচ্ছে সাধারণভাবে, যেমন আমি তার বন্ধুদের নিতাম। কিন্তু সে তো সবকিছু মিথ্যে বলেছে আমায়।"
ফারাহর কণ্ঠে তখন আর উচ্ছ্বাস নেই। প্রতিটি শব্দ যেন বুকের গভীর থেকে উঠে আসছে, ক্ষতবিক্ষত, ভারী, র ক্তা ক্ত। রাতের নীরবতা সেই কথাগুলো গিলে নিচ্ছে, অথচ আরও স্পষ্ট করে ফিরিয়ে দিচ্ছে। বাতাস থমকে গেছে, যেন সে-ও এই স্বীকারোক্তির ভার বহন করতে পারছে না। তানভীর থমকে দাঁড়াল। তার দৃষ্টিতে মুহূর্তের জন্য কঠোরতা, তারপর গভীর সহমর্মিতা।আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে সে বলল—
-"আর্সলান তোমার সাথে যা করেছে, তার শাস্তি সে পাবে!"
ফারাহ্ মাথা নাড়ল, কিন্তু সে নাড়ায় বিশ্বাস নেই, আছে কেবল ক্লান্তি আর পরাজয়ের স্বীকারোক্তি। কান্নামিশ্রিত কণ্ঠে সে বলল—
-"আমার সম্মান তো আর ফিরে পাবো না ভাইয়া।জানেন, দু’দিন আগে ওকে আমি বলছিলাম আমি প্রেগনেট। কিন্তু ও... ও কী করলো? ও আমাকে উল্টো অপমান করল। বলল, আমার পেটের সন্তান নাকি তার নয়। আমি তার সাথে শুতে পেরেছি বলেই নাকি অন্য কারো সাথেও শুতে পারবো। আর তারই অংশকে আমি আর্সলানের বলে চালিয়ে দিচ্ছি।"
কথাগুলো উচ্চারণ করতে গিয়ে ফারাহর কণ্ঠ ভেঙে গেল। প্রতিটি শব্দ যেন ছু রি হয়ে নিজের বুকেই আঘাত করছে। রাতের আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে সে যেন ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে, নারী হিসেবে, মানুষ হিসেবে। তানভীরের হাতের মুষ্টি অজান্তেই শক্ত হয়ে এলো। আঙুলের শিরাগুলো ফুলে উঠল। চোখে জমে উঠল একরাশ ঘৃণা আর ক্রোধ, একজন পুরুষ কীভাবে নিজের স্বার্থে একটি মেয়ের সম্মান নিয়ে এমন নিষ্ঠুর খেলায় মেতে উঠতে পারে! আর্সলানের প্রতি তার রাগ আর ঘৃণা নিঃশব্দে আগুন হয়ে জ্বলতে লাগল। ফারাহ্ ধীরে ধীরে আকাশের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন তারা নেই, চাঁদ নেই, আছে শুধু অসীম শূন্যতা। ভাঙা, ক্ষীণ কণ্ঠে সে আবারও বলে উঠল—
-"সেদিন অনেক বাকবিতণ্ডার পর সে স্বীকার করেছে, আমার সাথে সে প্রতারণা করেছিল। সে আমাকে কোনোদিনই ভালোবাসেনি। দেওয়ান বাড়ির সব খবর নেওয়ার জন্যই সে আমার সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছিল।আর ইসার জন্মদিনে করা আমাদের প্ল্যান ছিল, সেদিনই সে বেছে নিয়েছিল ওকে মে রে ফেলার জন্য। কিন্তু এখন নাকি সে ইসাকে ভালোবাসে। মা রতে পারে নি সেদিন ইসাকে। তাই সে বান্দরবনের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছে। যেকোনোভাবে সে ইসাকে নিজের করবে।"
ফারাহর কণ্ঠে তখন আর কান্না নেই, আছে শূন্যতা। যেন সব অনুভূতি নিঃশেষ হয়ে গেছে, বাকিটুকু শুধু নিঃশ্বাসের মতো টিকে আছে। রাতের অন্ধকার ঘন হয়ে উঠছে, চারপাশের গাছপালাও যেন এই ভয়ংকর স্বীকারোক্তি শুনে নিশ্চুপ হয়ে গেছে। তানভীর স্থির দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে রইল। কণ্ঠে অদ্ভুত এক শান্ত দৃঢ়তা নিয়ে সে বলে উঠল—
-"আমার ভাই যতদিন বেঁচে আছে, ইসাকে আর্সলান কোনোদিন পাবে না। যদি আমার ভাই মা রাও যায়, তবুও ইসাকে ও কোনোদিন পাবে না। ইসা আমার ভাইকে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। তুমি ওদের নিয়ে এত ভেবো না। আর্সলান নিজের কৃতকর্মের শাস্তি পাবে। তুমি নিজের জীবন গুছিয়ে নাও!"
এই কথাগুলো যেন অন্ধকারের বুকে দাঁড়িয়ে দেওয়া এক নিঃশব্দ প্রতিশ্রুতি। ফারাহ প্রথমবারের মতো একটু ভরসা পেল, যেন কারো কণ্ঠে সত্যিই শক্ত মাটি আছে। হাঁটতে হাঁটতে দু’জন এসে দাঁড়াল ফারাহদের বাড়ির সামনে। পরিচিত গেট, পরিচিত দেয়াল, তবু আজ যেন সবকিছু অচেনা। তানভীর হাসি মুখে বলল—
-"তোমার বাড়ি চলে এসেছি। যাও, ভেতরে যাও!"
ফারাহ্ হাসিমুখে বিদায় নিল। কিন্তু বাড়ির ভেতরে পা দেওয়ার ঠিক আগে সে একবার পেছনে ফিরে তাকাল। তানভীর হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছিল। সেই দৃশ্যটা ফারাহর বুকের ভেতর হঠাৎ কিছু একটা হলো। কী হলো কে জানে, সে এক দৌড়ে গিয়ে তানভীরকে জড়িয়ে ধরল। তানভীর হতবিহ্বল। বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মুহূর্তটুকু যেন সময়ের বাইরে আটকে গেল। তারপর ঠিক যেভাবে এসেছিল, সেভাবেই ফারাহ ছুটে চলে গেল, কোনো শব্দ না বলে, কোনো ব্যাখ্যা না দিয়েই। তানভীর তখনও স্তব্ধ। হঠাৎ সেই স্তব্ধতা ভেঙে দিল ফোনের রিংটোন। পকেট থেকে ফোন বের করেই দেখতে পেল, রুহান কল করেছে। ফোন কানে তুলতেই মুহূর্তের মধ্যে তানভীরের মাথার উপর আকাশ ভেঙে পড়ল। সহসাই ফোনটা হাত থেকে মাটিতে পড়ে গেল।
নিশ্ছিদ্র রাতের মধ্যে সেই শব্দটা যেন বজ্রপাতের মতো প্রতিধ্বনিত হলো।
.
নুহা, আফরিন ও উপমা অপারেশন থিয়েটারের সামনে পাশাপাশি বসে আছে। কারও চোখের পাতা শুকনো নেই, নীরবতার বুক চিরে অনবরত ঝরে পড়ছে অশ্রু। কান্নার শব্দ নেই, আছে শুধু নিঃশ্বাসের ভাঙন, বুকের ভেতর জমে থাকা আর্তনাদ। পাশে রুহান নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে, দৃষ্টি স্থির, অথচ ভেতরে ভেতরে ভাঙনের শব্দ ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছে। অপারেশন রুমের দেয়াল ঘেঁষে হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছে ইলহান। একসময়ের দীপ্ত বাদামি চোখ দুটো আজ শূন্যতার অতল গহ্বরে হারিয়ে গেছে। দু’হাত র ক্তে রঞ্জিত। সাদা স্যুট, যা কোনোদিন কলঙ্ক ছোঁয়নি, আজ লালচে দাগে কলুষিত। ইলহান স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে নিজের হাতের দিকে, এই রক্ত কোনো দুঃস্বপ্নের অবশিষ্ট চিহ্ন।তার পাশেই হাঁটু গেড়ে বসে আছে বিহান। বন্ধুর এই ভগ্নরূপ তার বুকের ভেতর ছু রি চালাচ্ছে। কাঁধে হাত রেখে কাঁপা কণ্ঠে বলল—
-"ইসা সুস্থ হয়ে যাবে ভাই!"
ইলহান ধীরে মুখ তোলে। কণ্ঠে কোনো প্রাণ নেই, আছে শুধু হাড়-কাঁপানো হাহাকার—
-"যার শরীরে ফুলের টোকা কেউ কোনোদিন দিতে দেয়নি... আজ তার শরীরে গু লি বিধেছে। দেখ, এই যে দেখ... ওর র ক্তে রঞ্জিত আমার সমস্ত শরীর!"
উন্মাদের মতো নিজের হাত, জামাকাপড়, র ক্তে ভেজা মুখ এগিয়ে ধরে দেখাতে থাকে বিহানকে। চোখ দিয়ে অনবরত পানি ঝরছে, সেটা যেন কান্না নয়, আত্মার র ক্ত ক্ষরণ। বিহান ছলছল চোখে তাকিয়ে দেখে তার প্রাণপ্রিয় বন্ধুর এই উন্মত্ত প্রলাপ। আর সহ্য হয় না।হঠাৎ এক ঝটকায় ইলহানকে বুকে টেনে নেয়। সে মুহূর্তেই ইলহান হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। কেঁদে ওঠে নুহা। কেঁদে ওঠে উপমা। কেঁদে ওঠে আফরিন।রুহানের চোখও আর বাঁধ মানে না। এক এক করে সবাই এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরে বিহান আর ইলহানকে।অপারেশন থিয়েটারের নিঃশব্দ করিডোর ভরে ওঠে নিঃশ্বাস, কান্না আর অসহায়তার ভারে। দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছে এমরিন। সে নিজেও বুঝতে পারছে না, বুকের ভেতর এই অচেনা কষ্ট কোথা থেকে আসছে।দেওয়ান বাড়ির কারো কিছু হলে তার কিছু যায় আসে না, সে তো জানে। তবু... তাহলে নূরাইসার র ক্তের কথা মনে পড়লেই কেন তার বুকের ভেতর চিনচিনে ব্যথা জেগে ওঠে? এই কান্না কেন তাকে অদ্ভুতভাবে ক্ষতবিক্ষত করছে? এমরিন নিজেই উত্তর খুঁজে পায় না। ইলহান বিহানকে আঁকড়ে ধরে প্রলাপ করে চলেছে, কণ্ঠ ফেটে যাচ্ছে, নিঃশ্বাস থেমে আসছে—
-"আমার নূরেজানকে এনে দে ভাই... আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। বুকের ভেতরটা চেপে ধরছে। আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না। ওকে ছাড়া আমি থাকতে পারি না। আমার ওকে লাগবেই... এনে দে শাহ!"
কথাগুলো বলতে বলতে ইলহানের কণ্ঠ ফুরিয়ে আসে।সে বুকের ওপর হাত চেপে ধরে, চোখে পানি জমে ঝাপসা হয়ে যায় চারপাশ।
-"আমি ওকে কথা দিয়েছিলাম... ওকে একা হতে দেব না। আজ আমি কী করে এখানে দাঁড়িয়ে আছি? ও ভেতরে, আর আমি বাইরে, এই দেয়ালটা কেন এত শক্ত, শাহ? ও যদি আমাকে ডাকে? ও যদি ভয় পায়?"
সে থেমে থেমে নিঃশ্বাস নেয়, যেন প্রতিটা শ্বাস ধার করা।
-"ওর হাতটা ধরতে দে একবার... শুধু একবার। বলব, আমি আছি। আমি এখানেই আছি। ওকে বলিস, আমি অপেক্ষা করছি। বলিস, ও যেন লড়ে যায়। ও তো শক্ত, আমার নূরেজান কখনো হারে না..."
কণ্ঠ ভেঙে আসে, বাকিটুকু ফিসফিসে হয়ে যায়—
-"ও যদি ফিরে আসে, শাহ, আমি আর কিছুই চাইব না। সত্যি বলছি, আর কিছু না। পৃথিবীর কাছে আমার আর কোনো দাবি থাকবে না। শুধু ওকেই চাই। ও থাকলেই সবকিছু আবার ঠিক হয়ে যাবে। আমার নূরেজান, আমার জীবনের আলো, অন্ধকারে জ্বলে থাকা একমাত্র প্রদীপ। আমার স্ত্রী, আমার প্রাণের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমি ওকে ভীষণ ভালোবাসি, শাহ।এখনো ওকে দেওয়ার মতো অনেক ভালোবাসা আমার ভেতরে জমে আছে। ওকে ফিরে আসতে বল, প্লিজ।আমি কার বুকে মাথা রেখে ঘুমাবো? বল তো, কাকে আঁকড়ে ধরে আমি বাঁচব? এভাবে আমাকে শূন্য করে দিয়ে ও পালিয়ে যেতে পারে না। ওকে ফিরতেই হবে।"
তার কথা শেষ হয় না, নীরবতায় ডুবে যায়। করিডোরে শুধু ঘড়ির টিকটিক, আর এক স্বামীর বুকের ভেতর জমে থাকা অসহায় প্রার্থনা। বিহান জানে না কোন শব্দে ইলহানকে সান্ত্বনা দেবে। যে ইসাকে নিজের জীবন দিয়ে আগলে রেখেছে, আজ সেই ইসা অপারেশন টেবিলে জীবন-মৃ ত্যুর সঙ্গে ম র ণ পণ যুদ্ধ করছে। করিডোর জুড়ে শুধু একটাই প্রশ্ন ভাসছে, এই যুদ্ধের শেষে কে বেঁচে ফিরবে, আর কে স্মৃতিতে র ক্ত হয়ে জমে থাকবে?
.
অপারেশন থিয়েটারের ভেতর নিঃশব্দ এক দমবন্ধ করা স্তব্ধতা। ফ্লুরোসেন্ট লাইটের তীব্র, নির্মম আলো সেই নীরবতাকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়, আলো যেন দয়া জানে না, কেবল সত্য উন্মোচন করে। চারপাশে ধাতব যন্ত্রপাতির ঠান্ডা ঝিলিক, জীবাণুনাশকের কটু গন্ধ আর জীবনের সঙ্গে মৃ ত্যুর দড়ি টানাটানির অদৃশ্য উত্তাপ। অ্যানেস্থেসিয়ার মেশিন থেকে ওঠা হু-হু শব্দ একটানা কানে ঢুকে পড়ছে। মনিটরের বিট, টিক... টিক... টিক, কখনো দ্রুত, কখনো ছিটকে পড়া ছন্দে বেজে উঠছে। প্রতিটি বিট যেন ঘোষণা করছে, সময় ফুরিয়ে আসছে। ডাক্তাররা একটানা কাজ করে যাচ্ছে।কারও চোখে ক্লান্তি নেই, আছে শুধু তীক্ষ্ণ মনোযোগ।গ্লাভস পরা হাতগুলোতে লাল র ক্ত জমে উঠছে, সে র ক্ত উষ্ণ, জীবন্ত, অথচ দ্রুত হারিয়ে যেতে থাকা জীবনের চিহ্ন। নূরাইসার শরীর অপারেশন টেবিলে নিথর পড়ে আছে। পিঠের দিকে গু লির আঘাত, সর্বনিম্ন কোমর থেকে বাম পাশে ঢুকে গু লিটি শরীর চিরে এসে নাভির ঠিক পাশে থেমে গেছে। ভেতরে ঢুকেই সে যেনো অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।টিস্যু ছিঁড়ে, র ক্ত নালীর ওপর দিয়ে বিধ্বংসী পথে এগিয়ে গেছে। স্নাইপার শট ছিল। দূরত্ব অনেক বেশি হওয়ায় গু লিটি শরীর ভেদ করে বেরিয়ে যেতে পারেনি। বরং আটকে গিয়ে ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে করেছে আরও ক্ষতবিক্ষত। নূরাইসার মুখ ফ্যাকাশে, বুকের ওঠানামার সঙ্গে সঙ্গে মনিটরের রেখাগুলোও কাঁপছে, জীবন যেন খুব সূক্ষ্ম এক সুতোয় ঝুলে আছে।ডাক্তার রাজীব ব্যস্ত হাতে অপারেশন চালাতে চালাতে চিৎকার করে উঠল—
-"বিপি ড্রপ (BP drop) করছে! র্যাপিড ইনফিউশন (Rapid infusion) লাগবে!"
তার কণ্ঠে চাপা আতঙ্ক, কিন্তু হাতে নেই কোনো দ্বিধা।পাশ থেকেই ডাক্তার সামার কণ্ঠ ভেসে এলো, তীক্ষ্ণ, দ্রুত, নিখুঁত—
-"আই নিড সাকশন, ফাস্ট! হেমোরেজ কন্ট্রোল ইমিডিয়েটলি!" (I need suction, fast! Hemorrhage control immediately!)
র ক্ত জমে থাকা জায়গায় সাকশনের শব্দ আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে, শোঁ... শোঁ... , যেন শরীরের ভেতর থেকে জীবন টেনে বের করে নেওয়া হচ্ছে। ডাক্তার রাজীব আবার গর্জে উঠল—
-"প্রিপেয়ার ব্লাড প্রোডাক্টস, ও নেগেটিভ, এএসএপি!" (Prepare blood products, O negative, ASAP)
নার্সরা মুহূর্তের মধ্যেই ছুটে আসে। ট্রলি ঠোকর খায় মেঝেতে। ব্যাগে ঝুলে থাকা র ক্তের প্যাকগুলো দুলে ওঠে, লাল রঙ যেন আরও গাঢ় হয়ে ওঠে আলোয়।ডাক্তারের কমান্ডে অ স্ত্রো প চা র আরও গভীরে প্রবেশ করে। পেছন দিক থেকে লাগা গু লির কারণে নাভির পাশের ভেতরে, প্লেসেন্টার কাছাকাছি জায়গায় ব্যাপক র ক্ত পাত শুরু হয়েছে। ক্ষতস্থান খুলতেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ঠিক তখনই এক ভয়ংকর সত্য সামনে আসে। নূরাইসা তিন সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা ছিল। ডাক্তার সামা ও রাজীব বিস্ময়ে একে অপরের দিকে তাকালো, কয়েক সেকেন্ডের জন্য যেন সময় থমকে যায়। এই তথ্য কেউ জানত না। জানলে অবশ্যই তাদের জানানো হতো। অথচ এখন আর সেই প্রশ্নের সময় নেই। প্লেসেন্টা আংশিক ছিঁড়ে গেছে। ভ্রূণের সঙ্গে র ক্ত সঞ্চালনের পথ ভেঙে পড়েছে। শিশুর হৃদস্পন্দনের কোনো সাড়া নেই। মনিটরের একটানা শব্দ যেন আরও ভারী হয়ে ওঠে। ডাক্তার রাজীবের কণ্ঠ এবার আর দৃঢ় থাকে না। ভাঙা স্বরে, চাপা যন্ত্রণায় সে বলে ওঠে—
-"উই লস্ট দ্য ফিটাস!" (We lost the fetus)
ডাক্তার সামার কণ্ঠ অপারেশন থিয়েটারের ভেতর ভারী হয়ে নেমে এলো। শব্দগুলো যেন বাতাসে আটকে গেল, আরেকটু এগোলেই ভেঙে পড়বে, এমন এক ভঙ্গুর উচ্চারণ। সে ব্যস্ত কণ্ঠে আবার বলল—
-"আমরা সব চেষ্টা করেছি। প্লাসেন্টাল রাপচার... বেবি কুড নট সারভাইভ!" (Placental rupture baby could not survive)
নূরাইসার বুকের ওপর বসানো মনিটর তখন অস্থির হয়ে উঠেছে। রেখাগুলো এলোমেলো নাচছে, কখনো দ্রুত, কখনো হঠাৎ থমকে যাচ্ছে। প্যানিক অ্যালার্মের তীক্ষ্ণ শব্দ অপারেশন থিয়েটারের নিঃশব্দতাকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। র ক্তের লাল স্রোত থামার নামই নিচ্ছে না। নাভির পাশের ক্ষতস্থানে একাধিক হাত জোর করে চাপ দিচ্ছে, গজ, প্যাক, ক্ল্যাম্প , সবকিছু একসাথে কাজ করছে, তবুও র ক্ত যেন নিজের পথ খুঁজে নিচ্ছে। ডাক্তাররা সময়ের বিরুদ্ধে লড়ছে, শরীরের ভেতরে চলা এই নিরব যুদ্ধকে থামানোর প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছে। এক পর্যায়ে ডাক্তার রাজীব হঠাৎ থেমে দাঁড়াল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার হাত থমকে গেল, এই থামা ক্লান্তির নয়, বাস্তবতা মেনে নেওয়ার। সে পুরো শরীর ঘুরিয়ে নূরাইসার ক্ষত দেখিয়ে বলল—
-"শি লস্ট অলমোস্ট ওয়ান পয়েন্ট ফাইভ লিটার্স অব ব্লাড! পেলভিস ইনজুরি, প্লাসেন্টাল রাপচার, ফিটাস ডিসিসড। ম্যাসিভ ট্রান্সফিউশন অনগোয়িং। আইসিইউ সাপোর্ট ম্যান্ডেটরি!" (She lost almost 1.5 liters of blood! Pelvis injury, placental rupture, fetus deceased. Massive transfusion ongoing. ICU support mandatory.)
তার কণ্ঠ নিখুঁতভাবে পেশাদার, অথচ তার চোখের গভীরে জমে আছে অব্যক্ত ভার। কিছু নির্দেশ দিয়ে সে অপারেশন থিয়েটার ছেড়ে বেরিয়ে আসে। বাইরে করিডোরে ভাঙা মানুষদের সারি। কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ দেয়ালে হেলান দিয়ে, সবাই অপেক্ষার এক নির্মম সময়ে আটকে আছে। ডাক্তার রাজীব একবার সবার দিকে তাকায়। তার অভিজ্ঞতায় সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত বোধহয় এটাই, যখন অস্ত্রোপচারের চেয়েও ভারী এক সত্য কাউকে জানাতে হয়। তবুও বলতে তো হবে। তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে শান্ত, নিয়ন্ত্রিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন—
-"রোগীর স্বামী কে?"
ইলহান এলোমেলোভাবে সামনে এগিয়ে এলো। চোখ দুটো অস্থির, মুখে বিভ্রান্তি আর ভয়ের ছাপ। ডাক্তার রাজীব বুঝে নিলেন, এই মানুষটাই স্বামী। তিনি ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন—
-"শরীরে গু লি লেগেছে পিছন দিক থেকে। কিছু না করলে সারা শরীর র ক্তে ভেসে যেত। হাড়ের ক্ষতি নেই, কিন্তু সফট টিস্যু এক্সটেনসিভলি ড্যামেজড।" (soft tissue extensively damaged)
একটু থেমে, যেন পরের কথাগুলো সাজিয়ে নিতে সময় নিচ্ছেন, তারপর ইলহানের চোখে চোখ রেখে বললেন—
-"শি ওয়াজ থ্রি উইকস প্রেগন্যান্ট... বাট উই লস্ট দ্য চাইল্ড। ম্যাসিভ ব্লাড লস হয়েছে। শি নিডস আইসিইউ, ভেন্টিলেশন, হেমোডাইনামিক সাপোর্ট।" (She was three weeks pregnant but we lost the child. Massive blood loss happend, She needs ICU, ventilation, hemodynamic support)
শব্দগুলো করিডোরে পড়তেই যেন বজ্রপাত হলো। মুহূর্তের মধ্যে চারপাশ এমন নিঃশব্দ হয়ে গেল, যেন বাতাসও শ্বাস নেওয়া ভুলে গেছে। ইলহান বিস্ময়ে দু’পা পিছিয়ে গেল। শরীর আর নিজের ভার নিতে পারছে না; পা দুটো কাঁপতে কাঁপতে ভেঙে পড়ার ঠিক আগমুহূর্তে বিহান দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে আগলে নিলো। ইলহানের কণ্ঠ ভেঙে গেল। যে শব্দটা বেরিয়ে আসার কথা ছিল, তা বুকের ভেতরেই আটকে রইল, চাপা আর্তনাদের মতো, শ্বাসের সঙ্গে লড়াই করতে থাকা এক ব্যথা। চোখ দুটো ফাঁকা হয়ে গেল, ঠোঁট কাঁপল, গলা দিয়ে শব্দ বেরোতে চাইলো, কিন্তু পারলো না। তবুও কোনোভাবে সে বলল, ভাঙা, অসম্পূর্ণ, বিশ্বাস করতে না-পারা এক কণ্ঠে—
-"আমার... আমার সন্তান?"
শেষ শব্দটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই তার কণ্ঠস্বর ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। প্রশ্নটি আর প্রশ্ন রইল না, তা রূপ নিল এক টুকরো কান্নায়, এক টুকরো শূন্যতায়। সেই শূন্যতার মধ্যেই দাঁড়িয়ে ইলহান প্রথমবার উপলব্ধি করলো, কিছু ক্ষতি এমন হয়, যার কোনো প্রত্যাবর্তন নেই, কোনো প্রতিকার নেই।