৭২ ঘণ্টা পূর্ণ হতে আর মাত্র তিন ঘণ্টা বাকি। অথচ নূরাইসার চেতনা এখনো অনাগত ভোরের মতো অদৃশ্য, নিঃশব্দ, নিস্তব্ধ, অনুত্তর। সময় যেন শিরায় শিরায় জমাট বেঁধে আছে। প্রতিটি সেকেন্ড দীর্ঘশ্বাস হয়ে ঝরে পড়ছে হাসপাতালের প্রাচীন প্রাচীরে। হাসপাতাল শোকাভিভূত এক প্রাসাদ, ভারী বাতাসে উৎকণ্ঠার গন্ধ, করিডোর জুড়ে অস্থির পদধ্বনির প্রতিধ্বনি। কান্নাকাটির রোল উঠেছে বারবার, কখনো তা ফিসফিস আর্তনাদ, কখনো বা বুকচেরা হাহাকার।মনে হয়, দেয়ালগুলোও যেন এই বেদনায় আর্দ্র হয়ে উঠেছে। ইকবাল দেওয়ান নাহিদ দেওয়ান পাথরের মূর্তির মতো স্থবির হয়ে বসে আছেন। দৃষ্টি শূন্য, অথচ সেই শূন্যতার গভীরে অগণিত অনুচ্চারিত প্রার্থনা।পিতৃহৃদয়ের বিপর্যস্ত আর্তি তাঁর কঠোর অবয়ব ভেদ করে বাইরে আসতে পারছে না, শুধু চোয়ালের রেখা শক্ত হয়ে আছে, অসহায় আত্মসমর্পণের নীরব স্বাক্ষর হয়ে।
ইলহান মেঝের দিকে তাকিয়ে স্থির চোখে দাঁড়িয়ে আছে। তার দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত জড়তা, যেন বাস্তবতাকে স্বীকার করতে অস্বীকৃত মন এক নিষ্ঠুর সত্যের সামনে স্তব্ধ। অন্তর্গত অপরাধবোধ, অজানা আশঙ্কা আর অদম্য ভালোবাসা মিলেমিশে তার শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী করে তুলেছে। মনে হয়, সে নিজেই নিজের ভিতরে এক অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।পাশেই বিহান,।নিঃশব্দ, তবু অন্তর্লীন ঝড়ে বিপর্যস্ত। তার মুষ্টিবদ্ধ হাত আর কাঁপা আঙুলে জমাট বেদনার ভাষা স্পষ্ট। সে কিছু বলতে চায়, অথচ শব্দেরা তার কণ্ঠনালীতে এসে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ইলহানকে সান্ত্বনা দেয়ার শব্দ নেই তার কাছে। নুহা, আফরিন, উপমা, রুহান, তানভীর, প্রত্যেকে আলাদা কোণে দাঁড়িয়ে থাকলেও তাঁদের অনুভূতির স্রোত একসূত্রে বাঁধা। নুহার চোখের জলে ভেসে উঠছে অশ্রুসিক্ত প্রার্থনা। আফরিনের ঠোঁট নীরবে কাঁপছে, দোয়ার শব্দগুলো উচ্চারণহীনই রয়ে যাচ্ছে। উপমা আকাশের দিকে চেয়ে আছে, যেন নিয়তির কাছে শেষ মিনতি জানাচ্ছে। রুহানের দৃষ্টি জানালার ফাঁক গলে দূরের আকাশে স্থির, যেনো আশার কোনো অণুচিহ্ন খুঁজছে সেখানে। তানভীর বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে, প্রতিটি টিকটিক শব্দ তার হৃদস্পন্দনের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত। এই তিন ঘণ্টা যেন অনন্তকালের সমার্থক হয়ে উঠেছে। হাসপাতালের সাদা চাদর, যন্ত্রের ক্ষীণ শব্দ, নিস্তব্ধতার চাপা ভার, সব মিলিয়ে সময়ের এক ভয়াবহ প্রহর গুনছে দেওয়ান পরিবার। প্রত্যেকেই অনুভব করছে, এই প্রহর শেষে হয়তো সবকিছু বদলে যাবে, অথবা সবকিছু একই রকম থেকে যাবে, শুধু তাদের ভেতরের মানুষগুলো আর আগের মতো থাকবে না।
তানিয়া বেগমের নিজের সন্তানের চেয়ে কোনো অংশে কম নয় নূরাইসা। রক্তের সেই সূক্ষ্ম অথচ অটুট বন্ধন আজ শোকের অসহনীয় ভারে আরও গাঢ়, আরও নিবিড় হয়ে উঠেছে। নাজনীন বেগমের দেবরের মেয়ে সে, তবু সম্পর্কের আনুষ্ঠানিক পরিচয়কে বহু আগেই ছাপিয়ে গেছে স্নেহের গভীরতা। পরম আদর-যত্নে, বুকের উষ্ণতা মেখে মানুষ করেছেন তাঁরা। সম্পর্ক ভিন্ন, কিন্তু পরিবার এক, আর পরিবারের সব সম্পর্কের স্নেহ, ভালোবাসা, অশ্রু আর নিঃশব্দ দুয়া এসে আজ এক বিন্দুতে জমাট বেঁধেছে, নূরাইসার নিথর শরীরের পাশে। হাসপাতালের করিডোরে এক অদ্ভুত স্তব্ধতা। সাদা দেয়ালগুলো যেন শোকের রঙে বিবর্ণ, বাতাসে স্যালাইনের কাঁচা গন্ধ, দূরে কোথাও যন্ত্রের মৃদু শব্দ, সব মিলিয়ে এক ভারী, দমবন্ধ করা পরিবেশ। মানুষের ফিসফাসও এখানে এসে থেমে যায়, যেন শব্দ করাও অপরাধ। সেই নীরবতার মাঝেই বুকের ভেতর ঢেউ তুলতে থাকা আর্তনাদ শক্ত হাতে চেপে ধরে নাজনীন বেগম আর তানিয়া বেগম ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বসলেন ইলিনা বেগমের পাশে।ইলিনা বেগম, যার সমগ্র অস্তিত্ব যেন আজ ভেঙে চুরমার হয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে আছে। মেয়ের কেবিনের সামনে তিনি নির্বাক পাথরের মতো বসে আছেন। তাঁর চোখদুটি অশ্রুর অতিব্যবহারে শুকিয়ে অনুর্বর, তবু দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে কেবিনের দরজায়, যেন দরজাটা হঠাৎ খুলে যাবে আর ভেতর থেকে ডাক আসবে "আম্মু..."। ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না, শব্দ যেন বুকের ভেতরেই জমে পাথর হয়ে গেছে।নাজনীন বেগম আলতো করে তাঁর কাঁধে হাত রাখলেন। সেই স্পর্শে ছিল ভাষাহীন এক অভিধান, সমবেদনার, সহমর্মিতার, ভাগাভাগি করে নেওয়া শোকের। তানিয়া বেগম ধীর কণ্ঠে ধৈর্যের কথা বলছিলেন, আল্লাহর উপর ভরসার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলেন, কিন্তু তাঁর নিজের কণ্ঠও বারবার ভেঙে যাচ্ছিল। প্রতিটি বাক্যের শেষে লুকিয়ে ছিল আটকে রাখা কান্নার কম্পন। কারণ নূরাইসা শুধু ইলিনার মেয়ে নয়, সে তাঁদেরও আপন। তাঁদের রক্তেরই এক কোমল অংশ, তাঁদের জীবনের উঠোনে বেড়ে ওঠা এক টুকরো আলো। আজ সেই আলো নিভে যাওয়ার আশঙ্কায় চারদিক যেন আরও অন্ধকার। শোক এখানে ব্যক্তিগত নয়, সমষ্টিগত, কষ্ট এখানে একার নয়, সবার।কেবিনের বন্ধ দরজার ওপারে নিথর নূরাইসা, আর এপারে তিনটি মাতৃহৃদয়, ভাঙা, রক্তাক্ত, তবু একে অন্যকে ধরে রাখার শেষ চেষ্টা করে যাচ্ছে।
অন্যদিকে ইকবাল দেওয়ান দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর ভাই নাহিদ দেওয়ানের পাশে, দাঁড়িয়ে, অথচ যেন ভিতরে ভিতরে ভেঙে পড়া এক মানুষ। হাসপাতালের সেই দীর্ঘ করিডোরের আলো তাঁর লালচে চোখদুটোকে আরও উন্মোচিত করে দিচ্ছে, গলায় জমাট বেদনার কাঁটা, তবু ঠোঁট শক্ত করে তিনি নিজেকে দৃঢ় রাখার ব্যর্থ প্রয়াসে বলছেন "ধৈর্য ধরো..."শব্দ দুটি উচ্চারিত হয়, কিন্তু তার ভেতরে যে কাঁপন, তা লুকোনো যায় না।কারণ তিনি জানেন, তাঁর নিজের অন্তরই তো চুরমার হয়ে আছে। নূরাইসা তাঁর ভাইজি, কেবল সম্পর্কের খাতায় লেখা এক নাম নয়, শৈশব থেকে কোলে তুলে মানুষ করা এক টুকরো আদর, এক মায়াভরা স্মৃতি, এক উজ্জ্বল হাসির প্রতিচ্ছবি। তাঁর আঙুল ধরে হাঁটা শিখেছিল যে মেয়েটি, আজ সেই হাতই নিথর হয়ে আছে কেবিনের ভেতরে, এই সত্য মেনে নেওয়া কত কঠিন! নাহিদ দেওয়ান পাথরের মতো বসে আছেন।তাঁর মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, চোখে শূন্যতা, ঠোঁট বন্ধ, কিন্তু ইকবাল জানেন, সেই পাথরের ভেতরে এক আগ্নেয়গিরি জেগে আছে। লাভা উথাল-পাথাল করছে, শুধু বিস্ফোরণের শব্দটি বাইরে আসছে না। একজন পিতা যখন ভেঙে পড়ে, তখন সে চিৎকার করে না,সে স্তব্ধ হয়ে যায়। সেই স্তব্ধতার ভেতরেই সবচেয়ে বড় আর্তনাদ লুকিয়ে থাকে। দুই ভাইয়ের মাঝখানে আজ কোনো ভাষা নেই। নেই দীর্ঘ আলাপ, নেই যুক্তি, নেই সান্ত্বনার দীর্ঘ বাণী। আছে শুধু নীরব সহমর্মিতা, একই বেদনার দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা দুই অবলম্বনহীন মানুষ। একজন অন্যজনের দিকে তাকায়, আবার দৃষ্টি সরিয়ে নেয়, কারণ চোখে চোখ রাখলেই হয়তো অশ্রু বাঁধ ভেঙে যাবে। করিডোরের বাতাস ভারী হয়ে আছে। দূরে কোথাও নার্সের পায়ের শব্দ, কাঁচের দরজায় আলো প্রতিফলিত হয়ে কাঁপছে। এই নির্জন মুহূর্তে সময় যেন থেমে গেছে। পরিবারটির প্রত্যেকে অন্যকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে, কেউ কাঁধে হাত রাখছে, কেউ ধৈর্যের কথা বলছে, কেউ আল্লাহর উপর ভরসার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। অথচ সত্য এটাই, প্রত্যেকের হৃদয়ই সমানভাবে ক্ষতবিক্ষত, রক্তাক্ত, অবসন্ন। রক্তের বন্ধন আজ শোকের স্রোতে একাকার হয়ে গেছে। কে কাকে সান্ত্বনা দেবে, আর কে কার কাঁধে মাথা রাখবে, সব সীমারেখা যেন মুছে গেছে।পিতা, চাচা, মা, ফুফু, সব পরিচয়ের ওপরে আজ একটাই পরিচয়, শোকাহত আপনজন।
নূরাইসা সবার জীবনের প্রাণকেন্দ্র। তাঁর হাসি ছিল বাড়ির উঠোনের রোদ, তাঁর কণ্ঠ ছিল সকালের আজান-ভেজা বাতাসের মতো নির্মল। আজ সেই প্রাণকেন্দ্র নিস্তব্ধ। আর সেই নীরবতাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে একটি পরিবার, ভাঙা, তবু একসাথে, নীরব, তবু অন্তর্গত আর্তনাদে পূর্ণ। একটি পরিবারের হৃদয় একসাথে কাঁদছে।
এই তুমুল উৎকণ্ঠার ঘন অন্ধকারের ভেতরেই হঠাৎ কেবিনের দরজার কাঁচে নরম শব্দ উঠল। শব্দটি ক্ষীণ, তবু যেন বজ্রপাতের মতো সবার হৃদয়ে আঘাত করল। ডাক্তার পা বাড়িয়ে বাইরে এলেন। মুহূর্তেই করিডোরের বাতাস থমকে গেল, কারও নিশ্বাস চলছিল কি না, সেটাও যেন বোঝা যাচ্ছিল না। প্রত্যেকের চোখ একসাথে তাঁর মুখে স্থির হয়ে রইল, যেন সেই মুখ থেকেই ভাগ্যলিপি উচ্চারিত হবে। শান্ত, সংযত কণ্ঠে তিনি জানালেন—
-"অবস্থা স্থিতিশীল, তবে এখনো চেতনা ফেরেনি। তবু আশার আলো নিভে যায়নি। আপনরা এক এক করে দেখা করে আসুন, হয়তো আপনাদের ডাকে সে সাড়া দেবে!"
এই কয়েকটি বাক্য যেন ভারী আকাশে একফালি আলো হয়ে ঝলসে উঠল। নিভু নিভু প্রদীপে কেউ যেন আলতো করে সলতে ছুঁয়ে দিল। তিনি আরও বললেন, একে একে সবাই যেন ভেতরে গিয়ে কথা বলে, পরিচিত কণ্ঠ, আপনজনের স্পর্শ অনেক সময় অলৌকিক কাজ করে। মানুষের ভালোবাসার শক্তিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাইরে গিয়েও কখনো কখনো অনুভব করা যায়। ডাক্তারের বলতে দেড়ি, কেবিনে প্রবেশ করতে দেড়ি করল না কেউ। যেন প্রত্যেকে নিজের ভেতরের জমে থাকা ভালোবাসা নিয়ে ছুটে যেতে চাইল সেই নিথর দেহটির কাছে। একে একে সবাই ভেতরে ঢুকল। কেউ শৈশবের মধুর কোনো স্মৃতি বলল, কীভাবে ছোট্ট নূরাইসা দৌড়ে এসে কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ত। কেউ হাত ছুঁয়ে ফিসফিস করে প্রতিশ্রুতি দিল—"সব ঠিক হয়ে যাবে, তুমি ফিরে এসো।" কথাগুলো ছিল স্বাভাবিক, হালকা, যেন কিছুই ঘটেনি, অথচ প্রতিটি শব্দের গভীরে ছিল প্রার্থনার সবচেয়ে তীব্র আর্তি। হয়তো এই স্নেহময় স্পর্শ, এই চেনা স্বর তার নিদ্রিত চেতনাকে ছুঁয়ে দেবে, এই আশাতেই সবাই কথা বলে গেল। একজন একজন করে বেরিয়ে এল সবাই। কারও চোখ ভেজা, কারও ঠোঁটে কাঁপা দোয়া। সবশেষে কেবিনের দরজার সামনে এসে থামল ইলহান। এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল সে, যেন বুকের ভেতর জমে থাকা পাহাড়টাকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা। তারপর ধীরে ধীরে ভেতরে প্রবেশ করল।কেবিনের চার দেয়াল ধবধবে সাদা রঙে রঞ্জিত, নির্বিকার, অনুভূতিহীন, যেন শোকের কোনো ভাষাই তারা বোঝে না। মাঝখানে হাসপাতালের বেডে নিথর দেহে শুয়ে আছে নূরাইসা। স্যালাইন ঝুলছে, সূচ গেঁথে আছে কচি হাতে। মুখে অক্সিজেন মাস্ক, বুকে যন্ত্রের নিয়ন্ত্রিত ওঠানামা। চারপাশে শুধু মনিটরের মৃদু "বিপ্... বিপ্..." সময়ের শুষ্ক, নির্মম গণনা। ইলহান ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। একটি টুল টেনে নিয়ে বেডের পাশে বসে পড়ল। কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়ে রইল, সেই নিস্তব্ধ মুখের দিকে। সেখানে নেই কোনো অভিমান, নেই চেনা হাসির রেখা, নেই দুষ্টুমি-ভরা দৃষ্টি, আছে শুধু গভীর, অনামা এক নিদ্রা। তার দৃষ্টি যেন প্রতিটি রেখা, প্রতিটি শ্বাস, প্রতিটি ক্ষীণ নড়াচড়া মুখস্থ করে নিতে চাইছে, যেন সময়ের হাত থেকে ছিনিয়ে রাখবে এই মুহূর্তটুকু। ধীরে হাত বাড়িয়ে নূরাইসার শীতল হাতটি নিজের মুঠোয় নিল সে। সেই স্পর্শে তার আঙুল কেঁপে উঠল। ঠান্ডা ত্বকের ভেতর সে খুঁজে ফিরল পরিচিত উষ্ণতা। বুকের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো গলায় এসে আটকে গেল। চোখের পাতা ভারী হয়ে উঠল, তবু অশ্রু গড়াতে দিল না, হয়তো ভেবেছে, কান্না শুনে সে আরও দূরে সরে যাবে। অনেক কষ্টে, ভাঙা কণ্ঠে সে বলে উঠল—
-"নূরেজান... শুনতে পাচ্ছিস তো? আমি এসেছি... তুই তো জানিস, আমি কখনো তোকে একা ছেড়ে যাইনি। এবারও যাব না। চোখ খোল... শুধু একবার তাকা আমার দিকে... দেখ, সবাই অপেক্ষা করছে...তোর জন্য।"
কাঁপা হাতে সে তার আঙুল ছুঁয়ে থাকে, যেন স্পর্শের ভেতর দিয়ে প্রাণের উষ্ণতা ফিরিয়ে আনতে চায়। ঠাণ্ডা আঙুলের নিস্তব্ধতা তার বুকের ভেতর আরও বড় শূন্যতা তৈরি করে। সে অনুনয় করে বলে উঠলো—
-"নূরেজান? শুনতে পাচ্ছিস? আমি এসেছি, বেবি... তুই ভয় পাচ্ছিস? আমার দিকে তাকা একবার। আমি তোকে নিতে এসেছি। ওরা আমাকে তোর কাছে আসতে দেয়নি, জান। কত অনুরোধ করেছি, তবুও না... রাগ করিস না আমার ওপর। দেখ, আমি এসেছি। তোর হাতটা ধরতে এসেছি। চোখ খোল জান... একবার শুধু চোখ খোল। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে তোকে ছাড়া। তিনদিন ধরে আমি একফোঁটা ঘুমাইনি। আমার বুক ফাঁকা হয়ে গেছে... তোকে ছাড়া নিশ্বাস নিয়েও কষ্ট হচ্ছে। আমাদের সন্তান আমায় ছেড়ে চলে গেছে... তুইও কি চলে যাওয়ার ফন্দি আঁটছিস? একবারও আমার কথা ভাবলি না? আমি কিভাবে একা থাকব বল?"
শব্দগুলো যেন দেয়ালে গিয়ে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে। কোনো উত্তর নেই। শুধু যন্ত্রের নিরাসক্ত শব্দ, আর সাদা চাদরে মোড়া নিথর শরীর। তার গলাটা ভেঙে আসে—
-"তুই তো জানিস, তোকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না।তোর হাসিটা না শুনলে আমার সকাল হয় না। তোর রাগ, তোর অভিমান, সব আমার ভালো লাগে। তুই যদি এভাবে চুপ করে থাকিস, আমি কার সাথে ঝগড়া করব? কার কাছে হার মানব?"
এই প্রশ্নগুলো আর কেবল প্রশ্ন নয়, একজন অসহায় মানুষের আত্মস্বীকারোক্তি। ইলহান ধীরে উঠে আসে। মুখটা ঝুঁকিয়ে নূরাইসার কপালে ধীরে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়। স্পর্শে কোনো সাড়া নেই, তবু সে থামে না—
-"তুই কেন এমন চুপ হয়ে আছিস জান? আমার সাথে কথা বল। দেখ আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। তোরা মা সন্তান মিলে আমাকে খুব কষ্ট দিচ্ছিস। একজন তো পালিয়ে গেলো, তুইও তার সাথে চলে যেতে চাইছিস? আমি কি অপরাধ করেছি বলে আমায়, কেনো এতো নিষ্ঠুর শাস্তি দিচ্ছিস আমায়?"
কেবিনের জানালার বাইরে সন্ধ্যার আলো ক্রমে গাঢ় হচ্ছে। শহর তার নিজস্ব ব্যস্ততায় ছুটে চলেছে, অথচ এই ঘরে সময় যেন স্থবির। ঘড়ির কাঁটা চলছে, কিন্তু তাদের জীবনের ঘড়ি থেমে আছে সেই অনন্ত অপেক্ষায়। তার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে, ভেতরে জমে থাকা অপরাধবোধ উথলে ওঠে—
-" আমি কি এতটাই খারাপ ছিলাম? আমি তোকে আগলে রাখতে পারিনি, আমাদের ছোট্ট সন্তানকেও পারলাম না... সব দোষ কি আমার না, বল? আল্লাহর কাছে প্রতিদিন বলছি, আমার সব সুখ নিয়ে নিক, শুধু তোকে ফিরিয়ে দিক।"
নূরাইসার নিথর হাতটা সে নিজের বুকে চেপে ধরে। যেন তার হৃদস্পন্দন ভাগ করে দিতে চায়।
-"এই হাতটা দিয়ে তুই আমার মুখে মাস্ক লাগিয়ে দিতি, মনে আছে? বলতিস, ‘এভাবে বাইরে যাবেন না, মেয়েরা আপনার দিকে তাকিয়ে থাকে!’ এখন দেখ, আমি এলোমেলো হয়ে গেছি... কেউ ঠিক করে দেয় না। আমাকে কত মেয়েরা দেখছে, তোর হিংসা হচ্ছে না?"
চোখের জল গড়িয়ে পড়ে তার হাতের উপর। সেই জল যেন জমে থাকা অনুতাপের স্রোত।
-"তিনদিন ধরে হাসপাতালের এই গন্ধ, এই সাদা দেয়াল... সবকিছু আমার দম বন্ধ করে দিচ্ছে। সবাই বলে সময় সব ঠিক করে দেয়। কিন্তু সময় তো আমাদের সন্তানের কান্নাটা ফিরিয়ে দিল না। তোর হাসিটাও না..."
কেবিনের বাতাস আরও ভারী হয়ে ওঠে। বাইরে করিডোরে ক্ষীণ পায়ের শব্দ মিলিয়ে যায়, ভেতরে রয়ে যায় শুধু দুইটি মানুষ, একজন নিস্তব্ধ, অন্যজন ভেঙে পড়ার প্রান্তে দাঁড়ানো। ইলহান নূরাইসার হাত শক্ত করে ধরে, যেন এভাবেই তাকে এই পৃথিবীতে বেঁধে রাখা যায়। সে ধীরে এগিয়ে এসে নূরাইসার কপালে নিজের কপালটা ঠেকিয়ে রাখলো। সাদা দেয়ালঘেরা কেবিনে নিঃশব্দে ঝুলে আছে এক অসহনীয় শোক। স্যালাইনের ফোঁটা টুপটাপ পড়ছে, মনিটরের আলোয় তার মুখটা আরও ফ্যাকাশে, আরও দূরের মনে হচ্ছে।জীবাণুনাশকের তীব্র গন্ধে ভারী হয়ে আছে বাতাস, তবু তার কণ্ঠের কাঁপন সবকিছুকে ছাপিয়ে উঠছে।সে কপালে কপাল ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল—
-"তুই চলে গেলে আমি কার ওপর রাগ দেখাব? কার সাথে ভবিষ্যতের স্বপ্ন আঁকব? যে ঘর আমরা দু’জনে মিলে সাজিয়েছিলাম, সেখানে একা ঢুকতে আমার ভয় লাগে জান। তোর শাড়িগুলো এখনও আলমারিতে ঝুলছে... কে পড়বে সেই শাড়ি?"
তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই ঘর, দু’জনের হাসিতে ভরা সন্ধ্যা, দেয়ালে টাঙানো নতুন পর্দা, বিছানার চাদরে গন্ধ মিশে থাকা স্মৃতি। এখন সেই ঘর নিঃসঙ্গতার প্রতিধ্বনি। আলমারির দরজা খুললেই যেন নূরাইসার গন্ধ ভেসে আসে, অথচ সে নেই, এই অনুপস্থিতিই সবচেয়ে নির্মম। একটু থেমে, ভারী হয়ে ওঠা কণ্ঠে সে বলে—
-"তুই বলতিস, আমি নাকি খুব শক্ত মানুষ। দেখ, আমি কতটা দুর্বল হয়ে গেছি। তুই যদি চোখ না খোলিস, আমি সত্যিই ভেঙে পড়ব। আমার ভেতরের সব আলো নিভে যাবে।"
মনিটরের ক্ষীণ আলো তার চোখের জলে ঝিলিক তোলে। যে মানুষটাকে সবাই দৃঢ় বলে চিনত, সে আজ নিজের ভাঙনের সামনে অসহায়। শক্ত মানুষের মুখোশ খুলে পড়েছে, ভিতরে শুধু এক আতঙ্কিত স্বামী, হারানোর ভয়ে কাঁপছে। তার কণ্ঠে আকুলতা জমে ওঠে, বুকের ভেতর থেকে উঠে আসে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস—
-"নূরেজান, আমাদের সন্তান তো আর ফিরবে না... কিন্তু তুই আছিস। তুই থাকলে আমি আবার বাঁচতে শিখব। তুই না থাকলে আমি শুধু একটা খালি শরীর হয়ে থাকব।"
শব্দগুলো কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে আসে, যেন প্রতিটি অক্ষর তার বুকে আঁচড় কাটছে। সন্তানহারা এক বাবার বেদনা, স্ত্রীকে হারানোর আশঙ্কায় আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। এই মুহূর্তে তার সমস্ত পৃথিবী সঙ্কুচিত হয়ে দাঁড়িয়েছে এই সাদা বিছানায় শুয়ে থাকা মুখটিতে।শেষবারের মতো সে ঝুঁকে আসে, তার কণ্ঠ প্রায় ফিসফিস—
-"একবার চোখ খোল, জান... একবার শুধু বল, ‘আমি আছি।’ আমি তোর হাত ছাড়ব না। যত কষ্টই হোক, আমি লড়ব। তুই শুধু ফিরে আয়... আমাকে এভাবে একা রেখে যাস না।"
তার আঙুলের চাপ আরও দৃঢ় হয়। মনে হয়, এই চাপেই সে ভাগ্যকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে। কেবিনের নীরবতা টানটান হয়ে ওঠে, যেন সময় নিজেই থমকে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে, একটুখানি সাড়া, একটুখানি নড়াচড়া, একটুখানি শ্বাসের জন্য। ইলহান নূরাইসার হাত বুকের সঙ্গে এমনভাবে চেপে ধরল, যেন তার নিজের হৃদস্পন্দন ঢেলে দিতে চায় সেই নিস্তব্ধ শরীরে।হঠাৎই সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল, একজন পরিপূর্ণ ভাঙা মানুষের কান্না। সেই আর্তনাদ কেবিনের দেয়াল ছাড়িয়ে করিডোরে ছড়িয়ে পড়ল। দরজার কাঁচের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো থমকে গেল। একজন স্বামীর অসহায় বিলাপ, এ দৃশ্য পাথরকেও নরম করে দিতে পারে। ডাক্তার, নার্স, সবার চোখেই অশ্রুর ঝিলিক। পরিবারের লোকজন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে কাঁদছে, অথচ ভেতরে, এই সাদা আলোয় ভেজা ঘরে, একা ইলহান, তার কান্নায় ভিজে যাচ্ছে নূরাইসার নিথর মুখ। ইলহান নূরাইসার মুখের ওপর ঝুঁকে কপাল ঠেকিয়ে রেখেছিল তখনও। তার চোখ দিয়ে নির্গত অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে নূরাইসার মুখশ্রীর ওপর। আর ঠিক তখনই, সেই বুকের সাথে ধরা হাত... অতি সূক্ষ্ম এক নড়াচড়া করল। প্রথমে যেন কেউ বিশ্বাস করতে পারল না। কিন্তু অভিজ্ঞ চোখ এড়ায় না কিছুই। এক নার্স হঠাৎ চমকে উঠে বলল—
-"স্যার! রোগী রেসপন্স করছে!"
কথাটা যেন বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে পড়ল ঘরজুড়ে।ইলহান প্রথমে বুঝতেই পারল না। তার কান যেন অবিশ্বাসে বন্ধ হয়ে গেছে। সে হতভম্ব দৃষ্টিতে নূরাইসার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সত্যিই... আঙুলগুলো কাঁপছে। খুব সামান্য, কিন্তু স্পষ্ট। জীবনের ক্ষীণ সাড়া।মুহূর্তের মধ্যে দু’জন ডাক্তার আর কয়েকজন নার্স ভেতরে ঢুকে পড়লেন। সাদা কোটের ভিড়ে কেবিন যেন হঠাৎই ব্যস্ত হয়ে উঠল।
-"মিস্টার ইলহান, প্লিজ, আপনি একটু সরে দাঁড়ান!"
একজন ডাক্তার নরম কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বললেন।ইলহান অনিচ্ছায় হাত ছাড়ল, তবুও এক ইঞ্চিও দূরে সরে যেতে পারল না। তার বুকের ভেতর ঢাকের মতো ধড়ফড়... ধড়ফড়... শব্দ হচ্ছে। ডাক্তার নূরাইসার চোখের পাতা আলতো করে তুলে টর্চের আলো ফেললেন।
-"পিউপিল রিঅ্যাক্ট করছে... গুড সাইন!"
তিনি চাপা স্বরে বললেন। একজন নার্স দ্রুত রক্তচাপ মাপছে, আরেকজন অক্সিজেন মাস্ক ঠিক করছে।মনিটরের শব্দ যেন একটু একটু করে নিয়মিত হয়ে উঠল— বিপ... বিপ... বিপ... সেই শব্দ যেন মৃ ত্যুর অন্ধকার চিরে জীবনের প্রত্যাবর্তনের সুর। ডাক্তার ঝুঁকে এলেন—
-"নূরাইসা? আপনি কি আমাকে শুনতে পাচ্ছেন?শুনতে পেলে চোখের পাতা একটু নাড়ান।"
কয়েক সেকেন্ডের নিস্তব্ধতা। করিডোরে দাঁড়ানো মানুষগুলোর নিঃশ্বাস যেন আটকে আছে। তারপর... খুব ধীরে, অসীম পরিশ্রমে নূরাইসার চোখের পাতা কাঁপল। নার্সের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল—
-"স্যার, শি’স কামিং ব্যাক!"
বাইরের কান্না থেমে গেল। শোকের ভারী বাতাসে হঠাৎ এক ঝলক আশার আলো। ডাক্তার শান্ত কণ্ঠে নির্দেশ দিলেন—
-"স্টেবল রাখুন। ওষুধের ডোজ অ্যাডজাস্ট করুন।আমরা অবজারভেশনে রাখছি।"
ইলহান দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁপা কণ্ঠে বলল—
-"ডাক্তার... ও কি...?"
ডাক্তার তার দিকে তাকিয়ে মৃদু আশ্বাসের হাসি দিলেন—
-"আশার চেয়েও ভালো রেসপন্স করছে। এখনও পুরোপুরি জ্ঞান ফেরেনি, তবে বিপদ অনেকটাই কেটে গেছে। আপনি শক্ত থাকুন।"
ইলহানের চোখ আবার ভিজে উঠল। কিন্তু এবার সে হাউমাউ করে কাঁদল না। তার কান্না নীরব, প্রার্থনার মতো। কিছুক্ষণ পর, নূরাইসার ঠোঁট সামান্য নড়ল।শ্বাস একটু গভীর হল। চোখের পাতা আবার কাঁপল... ধীরে ধীরে খুলে গেল দুটি ক্লান্ত, ঝাপসা দৃষ্টি। সাদা ছাদ। উজ্জ্বল আলো। ছায়াময় মুখগুলো। আর তারপর, একটা মুখ স্পষ্ট হয়ে উঠল। ইলহান। সে ফিসফিস করে বলল—
-"...ইল...হান?"
শব্দটা এত ক্ষীণ, যেন বাতাসে মিলিয়ে যাবে। কিন্তু ইলহান শুনেছে। তার সমগ্র অস্তিত্ব দিয়ে শুনেছে। সে দ্রুত তার হাত ধরে, কাঁপা অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল—
-"আমি আছি জান... আমি এখানেই আছি।"
নূরাইসার চোখের কোণে একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সেই অশ্রু যেন ফিরে আসা জীবনের সাক্ষ্য।ডাক্তার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন—
-"কনশাসনেস রিটার্নড। থ্যাংক গড।"
খবরটা মুহূর্তেই বাইরে পৌঁছে গেল—
"নূরাইসার জ্ঞান ফিরেছে!"
দরজার ওপারে কান্না এবার আনন্দে ভেঙে পড়ল। কেউ সেজদায় লুটিয়ে পড়ল, কেউ আল্লাহর নাম উচ্চারণ করল কৃতজ্ঞতায়। হাসপাতালের সেই সাদা দেয়াল, যে দেয়াল এতক্ষণ ধরে শোক, অপরাধবোধ আর নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার ভয়কে নীরবে ধারণ করছিল, সেই দেয়ালই এবার নিঃশব্দে সাক্ষী রইল এক অলৌকিক প্রত্যাবর্তনের। মৃতপ্রায় নীরবতার ভেতর থেকে জীবন আবার ফিসফিস করে বলল—
"আমি আছি।"