ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই বান্দরবনের হাসপাতাল চত্বরে দেওয়ান বাড়ির প্রতিটি সদস্য এসে জড়ো হয়েছে। ভোরের আলোটা আজ আশ্বাস নয়, বরং নিষ্ঠুর বাস্তবের প্রকাশ। করিডোরজুড়ে থমথমে নীরবতা, মাঝেমধ্যে ভেঙে যাচ্ছে অসহায় কান্নার শব্দে। উপমা নুহা আফরিন বেঞ্চের এক কোণে বসে আছে। হেঁচকি তুলে কাঁদছে, এমনভাবে, যেন প্রতিটা হেঁচকির সঙ্গে তাদের বুকের ভেতর থেকে কিছু একটা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছে। চোখ দুটো ফুলে লাল, মুখের রক্তিম ভাব ক্লান্তি আর শোকের ভারে আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। তাদের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে রুহান। মুখ মলিন, চোখ স্থির। পুরুষ মানুষ হাজার কষ্টেও কাঁদতে পারে না, এই নীরব শিক্ষা সে বহু আগেই রপ্ত করেছে।তবুও ছোটবোনের এই র ক্তাক্ত দশা তার বুকের ভেতর তোলপাড় তুলে দিচ্ছে। কিন্তু ভেঙে পড়ার অধিকার তার নেই। এখন তাকে শক্ত থাকতে হবে। তার ভাইয়ের পাশে তাকে দাঁড়াতে হবে। তার ভাইটা যে ইসাকে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। এদিকে বোন দুটোও সমান তালে কাঁদছে। তাদেরও সামলাতে হবে তাকেই।এই মুহূর্তে রুহানের দুর্বল হওয়া মানেই পুরো পরিবারের ভেঙে পড়া। রুহান চোখ ঘুরিয়ে একবার তাকায় উপমার দিকে। মেয়েটা খুব বেশি দিন ধরে তাদের পরিবারকে চেনে না। তবুও সে নিজের পরিবার ভেবে বসেছে। রুহানের বোনদের এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসে যে সারারাত ধরে কেঁদে কেঁদে চোখ-মুখের অবস্থা নাজেহাল করে ফেলেছে। এই ভালোবাসা বোঝা, ভারী, অথচ অস্বীকার করার উপায় নেই।
দূরে, একটু আলাদা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এমরিন। তার বুকের ভেতর এক অজানা ব্যথা জমাট বেঁধে আছে।দেওয়ান বাড়ির মানুষের ক্ষতিতে তার একটুও কষ্ট হওয়ার কথা নয়। কিন্তু এই ক্ষত, নূরাইসার র ক্ত, হারানো শিশু, ভাঙা দেহ, কেন তার অন্তর চূর্ণ করে দিচ্ছে? সে বুঝতে পারছে, এখানে শুধু শারীরিক ক্ষত নেই। এটা মৃ ত্যু। এটা লড়াই। এটা অক্ষমতার হাহাকার। এটা মানবতার ওপর এক নির্মম আঘাত।এমরিন নির্ণিমিশ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আফরিনের অশ্রুসিক্ত মুখাবয়বের দিকে। তার নিজের হাতে কিছুই নেই, না কোনো ক্ষমতা, না কোনো সমাধান। কেবল চোখের পানি, বুকের চাপ। দোষ, অপরাধবোধ, সহমর্মিতা, সব একত্রে তাকে ভেঙে দিচ্ছে। সে জানে, জীবনের এই অন্ধকার মুহূর্তে মানুষের পক্ষে করার মতো কিছুই থাকে না, শুধু পাশে থাকা আর নীরব সহমর্মিতা জানানো ছাড়া। ভেতরে ভেতরে এমরিন বলে ওঠে—
-"মানুষের শক্তি সীমিত... কিন্তু অনুভূতি অসীম।"
তাদের ভাবনার ঘোর কাটার আগেই হঠাৎ করিডোর জুড়ে তীব্র অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। দেওয়ান বাড়ির সবাই প্রায় ছুটে এসে হাজির হয়। ইলিনা বেগম, নাজনীন বেগম, তানিয়া বেগম, তিন মা হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে এগিয়ে আসছে। কান্নার শব্দে হাসপাতালের নীরবতা আরও ভারী হয়ে ওঠে, যেন দেওয়ালের ভেতরেও সেই শোক ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। তাদের পেছনেই রয়েছে ইকবাল দেওয়ান, নাহিদ দেওয়ান, আফজাল শেখ আর তানভীর। নাহিদ দেওয়ান ক্ষণে ক্ষণে চোখ মুছছেন, চেষ্টা করছেন নিজেকে সামলাতে। তিনি জানেন, তাকে কাঁদতে দেখলে ছেলে-মেয়েদের ভাঙন আর সামলানো যাবে না। আর ইকবাল দেওয়ান, পরিবারের মাথা। তিনি ভেঙে পড়লে পুরো পরিবারটাই যে ধসে পড়বে।সব ঝামেলা শেষ করে একটু সুখের আশাই করেছিলেন তিনি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে শান্তির একটা ছোঁয়া, এই ছিল তার চাওয়া। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ তার সবচেয়ে আদরের মেয়েটিই হাসপাতালের বিছানায় মৃ ত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে।দাদা-দাদীকে গতকালই সবাই দাদীর এক বোনের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে। ভাগ্যিস পাঠিয়েছিল। নইলে নাতনির এই অবস্থার কথা শুনে নির্ঘাত কোনো অঘটন ঘটে যেত। বাবা-মাকে দেখামাত্রই নুহা আফরিন বেঞ্চ থেকে উঠে ছুটে যায়। জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে সব খুলে বলে, রাতের ভয়, র ক্ত, অচেতন দেহ, অনিশ্চয়তার প্রতিটা মুহূর্ত। তাদের কান্নায় শুধু শব্দ নেই, আছে আতঙ্ক আর অপরাধবোধের ছায়া। নাহিদ দেওয়ান, আফজাল শেখ আর তানভীর তাদেরকে বোঝাতে থাকে, শান্ত হতে বলে, শক্ত থাকতে বলে।
এদিকে ইকবাল দেওয়ানের মন অন্যত্র। তিনি খুঁজে চলেছেন তার ছেলেটাকে। কোথায় আছে তার ছেলেটা? কী অবস্থায় আছে সে? যে ছেলেটা ইসাকে নিজের প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসে, সে ঠিক আছে তো? ইকবাল দেওয়ানের চোখ অস্থির হয়ে খুঁজে ফেরে তার প্রথম সন্তানকে, যে সন্তান তাকে পিতৃত্বের স্বাদ দিয়েছে, যে তার অস্তিত্বের প্রথম উত্তরাধিকার। সবার ভিড় ঠেলে তিনি সামনে এগিয়ে যান। আইসিইউ কেবিনের সামনে, দরজার পাশে বিধ্বস্ত অবস্থায় বসে আছে ইলহান। সারা শরীরে শুকিয়ে যাওয়া র ক্তের দাগ, জামা, হাত, গলা, সবকিছুতে রাতের বিভীষিকা লেপ্টে আছে। তার পাশেই বসে আছে বিহান। এক মুহূর্তের জন্যও ইলহানকে একা ছাড়েনি সে, যেন ছায়ার মতো লেগে আছে। ছেলের এই ভগ্ন, নিঃশেষ রূপ দেখে ইকবাল দেওয়ানের বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। মনে হয়, এক সেকেন্ডের জন্য তিনি শ্বাস নিতে ভুলে গেছেন। চারপাশের শব্দ, মানুষের ভিড়, সব ঝাপসা হয়ে আসে। অবচেতন মনেই তিনি এক পা, দু’পা করে এগিয়ে যান, সরাসরি তার ছেলের দিকে।
ইলহান নিজের সামনে একজোড়া পা এসে থমকে দাঁড়াতে দেখে ধীরে চোখ তুলে তাকায়। চোখ দুটো রক্তিম, ঘুমহীন রাত, শুকনো কান্না আর আতঙ্কে লাল হয়ে আছে। দৃষ্টিটা বুঝে উঠতে পারছে না, এটা স্বপ্ন, না বাস্তব। ইকবাল দেওয়ান আর এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। ছেলের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন। কণ্ঠ ভেঙে, বহু কষ্টে ডেকে উঠলেন—
-"নুহান আব্বু..."
এরপর কী হলো, কেউ বুঝে উঠতে পারল না। ইলহান হঠাৎ এক ঝটকায় নিজের জন্মদাতাকে জড়িয়ে ধরল।আকস্মিক সেই ধরায় ইকবাল দেওয়ান সামান্য পিছিয়ে গেলেন। ইলহান হাউমাউ করে কেঁদে উঠল, একেবারে ছোট্ট বাচ্চার মতো। তার আশ্রয়স্থল, তার সুরক্ষা, তার মাথার ওপর ছায়া দেওয়া বটগাছ, নিজের বাবার বুকে সে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ল। বাবাকে আঁকড়ে ধরে কাঁদছে ইলহান। সে কান্না আর মানুষের কান্না নেই, সে কান্না করুন সুর হয়ে করিডোর কাঁপিয়ে তুলছে। সেই কান্নার শব্দ ছড়িয়ে পড়তেই সবাই পেছনে ঘুরে তাকাল। মুহূর্তের মধ্যে যেন পুরো হাসপাতালটা থমকে গেল। এমরিন দূরে দাঁড়িয়ে নির্লিপ্ত চোখে তাকিয়ে আছে। চোখে জল নেই, কিন্তু ভেতরে ভেতরে কিছু একটা ভেঙে যাচ্ছে। ইলহান ভাঙা, কাঁপা কণ্ঠে বলতে থাকে, কথা নয়, যেন বুকের ভেতর জমে থাকা যন্ত্রণা ছিটকে বেরিয়ে আসছে—
-"বাবা... ও বাবা... তুমি এসেছো?"
একটু থেমে, বাবার জামা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে—
-"দেখো বাবা... দেখো... তোমাদের মেয়ে আমাকে কত কষ্ট দিচ্ছে! ওর বিচার করবে না বাবা? না না... বিচার কোরো না...! বিচার করলে ও পরে আমাকে ছেড়ে চলে যাবে!"
ইলহানের কণ্ঠ আরও নরম হয়ে আসে, শিশুর মতো—
-"বাবা... দেখো না... কিভাবে শুয়ে আছে... আমার কাছে আসছে না...। আমি তো আর ওর ওপর রাগ করি না বাবা... ওকে তো আমি মারি না... কষ্ট দিই না...। তাহলে ও কেন আসছে না আমার কাছে, বাবা? দেখো বাবা... ওর র ক্তে আমি ভিজে আছি...। ওর কি একটুও মায়া হচ্ছে না আমার জন্য? দেখো বাবা... কত সুন্দর করে ঘুমিয়ে আছে ও...! আমার বুকটা কষ্টে ফেটে যাচ্ছে বাবা। ওকে বলো... আমার কাছে আসত!ওকে বলো চোখ খুলতে! ও বাবা... আমার খুব কষ্ট হচ্ছে বাবা!"
ইলহানের আহাজারীতে উপস্থিত সবার বুকের ভেতরটা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে। কেউ উচ্চস্বরে কাঁদছে না, নীরবে, মুখ চেপে, চোখের পানি গিলে সবাই দাঁড়িয়ে আছে।কান্নার শব্দ নেই, তবুও বাতাস ভারী। হাসপাতালের করিডোরটা শোকের ভারে নুয়ে পড়েছে। হঠাৎ ইলহান নিজেকে ইকবাল দেওয়ানের বুক থেকে ছাড়িয়ে নেয়।দুই হাতে নিজের বুকের দিকে ইশারা করে, কাঁপা গলায় বলে ওঠে—
-"এখানে খুব ব্যথা করছে বাবা। ওকে বলো আমার বুকে এসে মাথা রাখতে... তাহলে আর ব্যথা করবে না!"
চোখ দুটো উন্মাদ, ভেজা—
-"আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি বাবা... ওকে বলো চোখ খুলতে...! আমি কিন্তু কিছু করে ফেলবো বাবা! ওকে বলো কথা বলতে... একবার... শুধু একবার!"
ইকবাল দেওয়ান অশ্রুসিক্ত নয়নে ছেলের এই পাগলামি দেখছেন। চোখের পানি আর আটকে রাখতে পারছেন না। দুই হাত বাড়িয়ে ছেলেটাকে নিজের বুকের সঙ্গে শক্ত করে চেপে ধরেন, যেন ছেলেটা ছিটকে কোথাও হারিয়ে না যায়। ভাঙা অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলেন—
-"ও কোথাও যাবে না বাপ আমার। তোর কাছেই ফিরে আসবে। ও তো অসুস্থ রে... ও সুস্থ হলেই তোর বুকে মাথা রাখবে! ধৈর্য ধর আব্বু। ওপরওয়ালা তোর ওপর এত নিষ্ঠুর হবে না। তোর নূরেজান তোর কাছেই ফিরে আসবে!"
একটু থেমে, চারপাশের দিকে তাকিয়ে বলেন—
-"একটু ধৈর্য ধর। দেখ, তোর ভাই-বোনেরা কাঁদছে! তুই না ওদের বড় ভাই? তুই এইভাবে ভেঙে পড়লে ওরা সাহস পাবে কোথায় বল? তুই তো ওদের শক্তি, সাহস!তুই ঠিক থাকলে ইসাও সাহস পাবে। ও লড়বে তোর জন্য... ফিরে আসবে তোর বুকে!"
ইলহান বাবাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। বুকের ভেতরের কান্না এবার গলায় উঠে আসে। ভাঙা, প্রায় নিভে যাওয়া কণ্ঠে সে বলে ওঠে—
-"বাবা... আমি পারছি না...! আমি খুব চেষ্টা করছি শক্ত থাকতে... কিন্তু ওকে এভাবে শুয়ে থাকতে দেখে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে... ও যদি না ফেরে বাবা? আমি তো ও ছাড়া কিছুই বুঝি না বাবা... ও আমার ঘর... আমার নিশ্বাস... ওকে ছাড়া আমি বাঁচতে জানি না বাবা...!"
ইলহানের গলা হঠাৎ নিস্তব্ধ করিডোর চিরে উঠে আসে—
-"আমার সন্তান... বাবা, আমার সন্তান আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।"
ইকবাল দেওয়ান চমকালেন না। এই সত্যটা তিনি আগেই জেনেছেন। রুহান সব জানিয়ে দিয়েছে। তবুও নিজের বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। তিনি ছেলেটাকে আবার নিজের দিকে টেনে নেন। ঠিক যেন ভেঙে পড়া একটা শিশুকে কোলে নিচ্ছে। নরম গলায়, বাচ্চাদের বোঝানোর মতো করে বলতে থাকেন—
-"আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়েছে আব্বু... আল্লাহ যা দেন, আল্লাহই নেন...! আল্লাহ চাইলে তুই আবারও বাবা হবি। তিনি কারও দরজা চিরদিনের জন্য বন্ধ করেন না।"
কিন্তু ইলহানের কানে সে কথা ঢোকে না। সে বাবার বুক থেকে একটু সরে এসে ফাঁকা চোখে তাকিয়ে বলে—
-"আমার সন্তান এসেছিল, বাবা...! আমি জানলামও না? সে নীরবে এসে নীরবেই চলে গেল? ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই? এত বড় শাস্তি কোন অপরাধের বাবা? আমি কী এমন করেছি?"
শেষ প্রশ্নটা যেন বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে—
-"কেন আমাকে এত বড় শাস্তি দেওয়া হলো?"
ইকবাল দেওয়ান ছেলের মাথায় হাত রাখেন। হাতটা কাঁপছে। তবুও শক্ত করে নিজেকে সামলে নেন। ধীরে, খুব ধীরে কথা বলেন, যেন একটা শব্দও ভেঙে পড়লে ছেলেটা আর ধরে রাখতে পারবে না।
-"শোন আব্বু... সব শাস্তি অপরাধের জন্য হয় না।
ইলহানের কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলেন—
-"কিছু কষ্ট আসে মানুষকে ভেঙে দিতে না, মানুষকে বড় করে তুলতে। আল্লাহ তোর কাছ থেকে কিছু নিলে, তোর ভেতরে কিছু রেখে গেছেন। এই কষ্টটাই তোর সাক্ষী। তুই বাবা হয়েছিলি আব্বু... মুহূর্তের জন্য হলেও তুই বাবা হয়েছিলি। এই পরিচয় কেউ তোর কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না। তোর সন্তান নীরবে এসেছে ঠিকই, কিন্তু সে তোর বুকের ভেতর দাগ কেটে গেছে। এই দাগই প্রমাণ, সে ছিল! আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন, তাকেই বেশি পরীক্ষা করেন আব্বু। তুই ভেঙে পড়লে ইসাও ভেঙে পড়বে। আর তুই শক্ত থাকলে... তোর সন্তানও শান্তি পাবে।"
ইকবাল দেওয়ান ছেলেটাকে আবার শক্ত করে বুকে চেপে ধরেন। এই বুকে এখন দুই প্রজন্মের শোক।
একজন হারিয়েছে সন্তান, আরেকজন হারিয়েছে প্রথম সন্তানের ঘরে আশা প্রথম সন্তান। যে চুপিসারে এসে চুপিসারেই চলে গেছে।
.
নূরাইসাকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে। দুটি সাদা দেয়াল, নির্বিকার, অনুভূতিহীন। একপাশে মনিটরের নীরব অথচ তীক্ষ্ণ বিট, যা প্রতিটা সেকেন্ডে মনে করিয়ে দিচ্ছে, সে এখনও আছে। ভেতরের বাতাসে ক্লোরিনের গন্ধ, ভেজা কাপড়ের মতো ভারী, শ্বাস নিতেই বুক চেপে আসে। আলো অন্ধকারের মাঝামাঝি, জীবন আর মৃ ত্যুর মাঝখানে ঝুলে আছে নূরাইসা। বিছানায় সে শুয়ে আছে। চোখ বন্ধ। মুখ শান্ত, অথচ নিঃশ্বাস ফাঁপা। হালকা শ্বাসবায়ুর শব্দ শোনা যায়, কিন্তু বুকের ওঠানামা অসম, অস্বাভাবিক।যন্ত্রের সাহায্যে সে বেঁচে আছে, তবুও লড়াই শেষ হয়নি। জীবন এখনও তাকে ছাড়েনি, আবার পুরোপুরি আঁকড়েও ধরেনি।
কেবিনের বাইরে ইলহান দাঁড়িয়ে আছে। চোখ লাল, দৃষ্টি স্থির, মুখে গভীর ভাঙনের ছাপ। যেন এই কয়েক ঘণ্টায় সে কয়েক বছর বুড়িয়ে গেছে। তার পাশে বিহান, কথা নেই, উপদেশ নেই। শুধু হাতে হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকা। বন্ধুত্বের এক নীরব আশ্রয়। দুজনেই জানে, এই মুহূর্তে কোনো শব্দই যথেষ্ট নয়। বাস্তবতা নির্মম। নূরাইসার শরীরের ভেতরের যুদ্ধ, অপারেশনের ক্ষত, আর হারানো শিশুর নিঃশব্দ উপস্থিতি, সব মিলিয়ে ইলহানের ভেতরে এক বিষাক্ত অশান্তি জন্ম নিচ্ছে। সে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে চিৎকার করছে। আইসিইউ করিডোরে কোনো উচ্চস্বরে কথা নেই। শুধু মনিটরের বিট। ডাক্তারদের হু-হু নিঃশ্বাস। আর বাতাসে ভেসে থাকা জীবন-মৃ ত্যুর অদৃশ্য টানাপোড়েন। ডাক্তাররা বলে গেছে, তিনদিন।
বাহাত্তর ঘণ্টা। এই ৭২ ঘণ্টা যদি সে জ্ঞান ফিরে পায়, তাহলে আশা আছে। আর যদি না পারে, তাহলে সম্ভাব্য পার্মানেন্ট নিউরোলজিক্যাল ড্যামেজ (permanent neurological damage)। এই অনিশ্চয়তা সবার মনে ধীরে ধীরে বি ষ ঢালছে। প্রতিটা মিনিট যেন ভারী হয়ে নামছে বুকে। আইসিইউর আলো মাঝে মাঝে ফ্লিকার করছে, ঠিক যেমন তাদের আশার আলো।নূরাইসা নিঃশ্বাস নিচ্ছে। কিন্তু সেই নিঃশ্বাস, জীবনের চিহ্ন, না মৃ ত্যুর ছায়া, কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। ফলে এই ৭২ ঘণ্টা, এই নিঃশ্বাস, এই অপেক্ষা, সব মিলিয়ে একেকটা মিনিট যেন নিজের অস্তিত্ব নিয়ে লড়াই করছে।
করিডোরে একপাশে নুহা দাঁড়িয়ে আছে। চোখ শুকিয়ে গেছে, কান্না যেন ক্লান্ত। আফরিন আর উপমা পাশাপাশি বসে আছে, মাঝে মাঝে হাত চেপে ধরে, যেন হাত ছেড়ে দিলে কেউ ভেঙে পড়বে। রুহান দূরে দাঁড়িয়ে আছে, চোখে পাহারার দৃষ্টি, সবাইকে সামলানোর দায়িত্ব তার কাঁধে। সবাই একাকার হয়ে আছে এই অপেক্ষায়। কেউ কথা বলছে না। কেউ সান্ত্বনা দিচ্ছে না। শুধু নীরব কান্না। শুধুই লুকোনো অশ্রু। শুধু হৃদয়ের ভেতর জমে থাকা এক গভীর বেদনা, যার কোনো ভাষা নেই। এই অপেক্ষা কোনো ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে মাপে না। এই অপেক্ষা মাপে, শ্বাসে, বিটে, আর ভেঙে না পড়ার লড়াইয়ে।
.
রাত নেমেছে। বান্দরবনের হাসপাতাল চত্বর আলো–ছায়ার এক অশুভ নৃত্যে আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে।সোডিয়াম লাইটের বিবর্ণ হলুদ আলো করিডোরের সাদা দেয়ালে দীর্ঘ, বিকৃত ছায়া ফেলে, মনে হয়, কেউ যেন দেয়ালের গা বেয়ে নিঃশব্দে হেঁটে যাচ্ছে। বাতাসে ওষুধ, জীবাণুনাশক আর আতঙ্কের গন্ধ একাকার।আইসিইউর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো যেন সময়ের ভারে চূর্ণ। কারও চোখে নিঃশেষ ক্লান্তি, কারও দৃষ্টিতে দমে রাখা ক্রোধ, কারও মুখে জমে থাকা শোকের কঠিন স্তর। কেউ কথা বলছে না, তবু করিডোরটা কান ঝালাপালা করা নীরবতায় ভরে আছে। ঠিক তখনই, দূর থেকে ভেসে আসে ধীর, পরিমিত পায়ের শব্দ। টুপ... টুপ... টুপ...। শব্দটা যত কাছে আসে, বাতাস তত ভারী হয়ে ওঠে। ছায়ার ভেতর থেকে একটা অবয়ব এগিয়ে আসে। আলোয় ভেসে ওঠে পরিচিত মুখ, আর্সলান। মুহূর্তের মধ্যে পরিবেশ বদলে যায়। রুহান প্রথম তাকে দেখে ফেলে, চোখ দুটো হঠাৎ জ্বলে ওঠে, যেন আগুনে বাতাস লাগলো।তানভীর দাঁত চেপে ধরে, চোয়ালের পেশি শক্ত হয়ে ওঠে। বিহানের হাত আপনাআপনি মুঠো হয়ে আসে।এমরিন উদ্বিগ্ন মুখে এক পা এগিয়ে আসে সামনে, যেন আসন্ন বিস্ফোরণ ঠেকাতে চায়। আর ইলহান, সে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়। চোখে আর কান্না নেই। নেই অসহায়ত্ব।ওখানে এখন আগুন। নিস্তব্ধ, দগদগে আগুন, যে আগুন কাউকে না পুড়িয়ে থামবে না। ইলহান এক পা এগিয়ে আসে। কণ্ঠ শান্ত, অস্বাভাবিকভাবে শান্ত। কিন্তু সেই শান্তির ভেতরেই লুকিয়ে আছে বিপজ্জনক ঝড়—
-"তুই এইখানে এসেছিস কোন সাহসে?"
আর্সলান গলা শক্ত করার চেষ্টা করে, কণ্ঠ কেঁপে ওঠে—
-"আমি... আমি সেনোরিটাকে দেখতে এসেছি!"
ইলহান হেসে ওঠে। সেই হাসিতে বিন্দুমাত্র আনন্দ নেই, ওটা শোক আর ক্রোধের বিকৃত মিলন।
-"কি দেখতে এসেছিস?"
একটু থেমে, আইসিইউর দরজার দিকে চোখ ছুড়ে দেয় সে। বলে উঠে—
-"আমার মৃ ত সন্তান? ঐযে, ওই আইসিইউ রুমে জীবন-ম র ণের যুদ্ধে লিপ্ত থাকে আমার নূরেজান?বল, কি দেখতে এসেছিস তুই?"
করিডোরের নীরবতা ভেঙে যায়। রুহান আর তানভীর একসাথে সামনে এগিয়ে আসে। তানভীর গর্জে ওঠে—
-"এখনই এখান থেকে বের হয়ে যা!"
বিহান ইলহানের পাশে এসে দাঁড়ায়। একচুলও নড়ে না। তার দেহভঙ্গিতে স্পষ্ট, এখানে কেউ একা নয়।হঠাৎ আর্সলান চিৎকার করে ওঠে—
-"আমি নূরাইসাকে ভালোবাসি! ওকে না দেখে আমি কোথাও যাবো না! আমি ইলহানকে মা রতে গু লি করেছিলাম!"
কথাগুলো শব্দ হয়ে নয়, ছুরি হয়ে পড়ে। একটার পর একটা। ধারালো। নির্মম। করিডোরের বাতাস কেঁপে ওঠে। এমরিন চমকে উঠে যায়—
-"আর্সলান!"
কিন্তু আর্সলান থামে না। যেন বহুদিন ধরে চেপে রাখা সত্য হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়েছে।কণ্ঠ ফেটে যায় তার—
-"কিন্তু নূরাইসা সামনে চলে আসে...! ও গু লি খায়, তোকে বাঁচানোর জন্য, ইলহান!"
এক মুহূর্ত। শুধু এক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। মনে হয়, হাসপাতালের সমস্ত শব্দ, মনিটরের বিপবিপ, নার্সদের পায়ের শব্দ, দূরের কান্না, সব থমকে গেছে। তারপর, ইলহান ঝাঁপিয়ে পড়ে। যেন আগুনে বারুদ পড়েছে।বিহান আর রুহান ঝাঁপিয়ে না ধরলে, সেই মুহূর্তেই আর্সলানের গলায় ইলহানের হাত বসে যেত। শিরা ফুলে ওঠে, চোখে অন্ধকার নেমে আসে। তার কণ্ঠে গর্জন, বুকের ভেতর জমে থাকা আর্তনাদ—
-"আমার সামনে দাঁড়িয়ে এই কথা বলার সাহস হয় কিভাবে? তুই আমাকে মা রতে চেয়েছিলি! আর এখন আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমার স্ত্রীর জন্য ভালোবাসার কথা বলিস? তোর জন্য আজ আমার নূরেজান হাসপাতালে! শুধুমাত্র তোর জন্য, আমার সন্তান আজ এই পৃথিবীতে নেই!"
শব্দগুলো করিডোরের দেয়ালে আছড়ে পড়ে। কেউ চোখ তুলতে পারে না। ঠিক তখনই এমরিন সামনে এসে দাঁড়ায়।সূর্যছোঁয়া বাদামি চোখ জোড়ায় নিজের বরফশীতল নীল চোখের মণি স্থির করে ইলহানের দিকে তাকায় সে। ভয় নেই সেখানে, আছে কঠোর সিদ্ধান্ত। শীতল, নিয়ন্ত্রিত কণ্ঠে এমরিন বলে ওঠে—
-"ইলহান, থাম! আর্সলান নূরাইসাকে জেনে-বুঝে মা রে নি। আর তোকে মা রার যে আমাদের ইচ্ছে ছিল, এটা নিশ্চয়ই তুই জানিস।"
ইলহান ধীরে তাকায় তার দিকে। চোখ শান্ত, কিন্তু সেই শান্তির নিচে জমে আছে ধ্বংস।স্বরে কোনো আর্তি নেই, শুধু প্রশ্ন—
-"আমাকে মা রতি, আমি বারণ করেছি?"
এক পা পিছনে সরে, আইসিইউর কাঁচের দরজার দিকে চোখ যায় তার।গলায় জমে ওঠে ক্ষোভ—
-"আমার সন্তান কি দোষ করেছে, বল? কেন তোদের প্রতিশোধের জন্য সব সময় আমার পরিবার ভুগবে? ঐযে দেখ... ঐ কেবিনে নিস্প্রাণ শুয়ে আছে আমার ভালোবাসা। তোদের এই অন্ধ প্রতিশোধ আমার পরিবারটাকে শেষ করে দিয়েছে!"
এমরিন চোখ নামিয়ে নেয়। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকে। তারপর, সহসাই চোখ তুলে বলে ওঠে—
-"তুই কোনো নিশপাপকে কোনো দিন শাস্তি দিস নি, ইলহান?"
প্রশ্নটা করিডোরে ঝুলে থাকে। আলো–ছায়ার ভেতর শব্দটা যেন ধীরে ধীরে বি ষ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। রুহান গর্জে ওঠে। সেই গর্জনে ভাইয়ের জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়ানোর দৃঢ়তা—
-"আমার ভাই কোনোদিন কোনো নিষ্পাপকে আঘাত করে নি!"
তানভীর দাঁত চেপে, চাপা কিন্তু হিমশীতল হুমকি ছুড়ে দেয়—
-"এক পা সামনে বাড়ালে, এখানেই শেষ করে দেব। বেরিয়ে যা তোরা!"
আর্সলান আর কোনো যুক্তি খোঁজে না। হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে—
-"আমি নূরাইসাকে ছাড়া কিছু চাই না! আমি ওকে ভালোবাসি। লুকোইনি কখনো। আজও লুকোচ্ছি না।নূরাইসা আমার নয়, আমি জানি। ও বিবাহিত। অন্য কারো স্ত্রী। এই সত্যটা আমি প্রতিদিন গিলে খাই,
প্রতিটা নিশ্বাসে নিজের গলা কেটে কেটে খাই। তবু কী করব বল? ভালোবাসা কি অনুমতি নিয়ে আসে? আমি ভিলেন, তাই না? ভিলেনদের তো ভালোবাসা থাকার কথা না! ওরা শুধু নেয়, ভাঙে, ধ্বংস করে! কিন্তু কেউ কি একবার জিজ্ঞেস করেছে, এই ভিলেনটা প্রতিটা রাতে কীভাবে বাঁচে? আমি ওকে ছুঁইনি! ওর সংসারে পা দিইনি! আমি শুধু দূরে দাঁড়িয়ে নিজের ভিতরটা খু ন করেছি! ও অন্য কারো স্ত্রী, এই সত্যটা আমার গলায় কাঁটার মতো আটকে আছে! গিলতে পারি না, থুতু ফেলতেও পারি না! আমি যদি ওকে না ভালোবাসতাম,
তাহলে এতটা পুড়তাম না! এই যন্ত্রণা শাস্তি না, এটা সেই অপরাধ, যার কোনো বিচার নেই! ওকে আমি পাব না, এই জানাটাই আমার শাস্তি। সবাই বলে, ‘ছেড়ে দাও!’ কিন্তু কেউ বলে না, এই ভালোবাসাটা ছাড়লে
আমি নিজেকে কোথায় ফেলব? আমি জানি, আমি ওকে পাব না। এই না-পাওয়াটাই আমার শেষ সত্য।ভিলেনদের ভালোবাসা থাকে, কিন্তু তাদের জন্য কোনো শেষ থাকে না। আমি শুধু চাই, এই একবার কেউ বলুক, আমার ভালোবাসাটা পাপ ছিল না... শুধু অসম্ভব ছিল।"
ইলহান এবার আর দূরত্ব রাখে না। একেবারে কাছে যায়। চোখে চোখ। দু’জোড়া চোখের মাঝখানে যেন অদৃশ্য বিদ্যুৎ খেলে যায়।ইলহানের কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু তাতে ছুরির ধার—
-"ভালোবাসা? ভালোবাসা গু লি ছোঁড়ে না। ভালোবাসা বুক পেতে গু লি নেয়।"
করিডোরটা আরও নীরব হয়ে যায়। তারপর, নিখুঁত ঠাণ্ডা কণ্ঠে সে বলে—
-"সত্যের মুখোমুখি যেদিন তোরা দুই ভাই হবি... সেদিন বুঝবি তোরা কী কী ভুল করেছিস। ভুল নয়, অন্যায়। তোদের করা প্রতিটা অন্যায়ের শাস্তি আমি দেবো!"
এরপর একটি শব্দ। কোনো চিৎকার নয়। কোনো উত্তেজনা নয়।
-"নাও। গেট লস্ট।"
শব্দগুলো করিডোরের দেয়ালে আছড়ে পড়ে, প্রতিধ্বনিত হয়, তারপর ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়।আর্সলান চুপ করে যায়। এমরিনের চোখে নেমে আসে শূন্যতা, যেন সব যুক্তি, সব অহংকার মুহূর্তেই নিঃশেষ।দু’জনেই ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়। এমরিন এগিয়ে যায় আফরিনের দিকে। কণ্ঠ নরম, প্রায় ক্লান্ত—
-"চলো... আমার সাথে চলো..."
আফরিন এক পা পিছিয়ে যায়। চোখে আগুন জ্বলে ওঠে। গলা কাঁপছে—
-"যে আমার বোনকে খু ন করতে চেয়েছে, যে আমার ভাইকে মা রতে চেয়েছে, তার সাথে আমি যাব না।"
এমরিন থমকে যায়। মুহূর্তে সব শব্দ হারিয়ে যায় তার।যেন বুকের ভেতর থেকে বাতাস টেনে নেওয়া হয়েছে।
-"আফরিন...!"
ডাকটা ভেঙে পড়া মানুষের। আশ্রয় খোঁজা কণ্ঠ। কিন্তু আফরিন আর পেছনে তাকায় না।
-"আজ থেকে আপনি আমার কেউ না।"
শব্দগুলো পরিষ্কার, নির্দয়।
-"আপনি শুরু থেকেই আমার পরিবার ধ্বংস করতে চেয়েছেন। আমার ভাইকে মে রে ফেলতে চেয়েছেন।আপনার সাথে আমি যাব,।আপনি ভাবলেন কী করে?"
শেষ বাক্যটা ছুড়ে দেয় ছুরির মতো—
-"যান। বেরিয়ে যান এই মুহূর্তে!"
আফরিন মুখ ফিরিয়ে নেয়। সরাসরি। কোনো দ্বিধা নেই। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই, এমরিন ভেঙে পড়ে।চোখে যে শীতল দৃঢ়তা ছিল, তা মুহূর্তেই গলে যায়।নীল চোখ দুটো শূন্য হয়ে যায়, যেন বহু বছর ধরে বয়ে আনা সব পাপ, সব ভুল, সব অনুশোচনা একসাথে তাকে গ্রাস করে। ঠোঁট কেঁপে ওঠে, কিন্তু কোনো শব্দ বের হয় না। ক্ষমা চাইবার ভাষা আর বাকি নেই তার।আর্সলান নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে। সে কিছু বলে না। বলার অধিকারও নেই। দু’জনেই ধীরে ধীরে অন্ধকারের দিকে হাঁটতে থাকে। করিডোরের হলুদ আলো তাদের পিঠে পড়ে দীর্ঘ ছায়া ফেলে, দু’টো ভাঙা মানুষের ছায়া। আর পেছনে পড়ে থাকে, একটা হাসপাতাল। একটা র ক্তাক্ত ভালোবাসা। আর এক নিঃশ্বাসে ঝুলে থাকা জীবন, যেটা বাঁচবে কি ম রবে, কেউ জানে না।