সূর্যস্নাত ভালোবাসা

পর্ব - ৫২

🟢

গভীর রাত। নিস্তব্ধতার এমন এক সময়, যখন অন্ধকার নিজেই শব্দ হয়ে দাঁড়ায়। এমরিন বিধ্বস্ত অবস্থায় নিজের গাড়ি থেকে নেমে ধীর পায়ে হাঁটছে।প্রতিটি পদক্ষেপ যেন মাটির ওপর নয়, সে হাঁটছে নিজের ভাঙা অতীতের ওপর। পুরো বাড়িটা অন্ধকারে ঢাকা, আলোহীন সেই অন্ধকার যেন কেবল চোখের নয়, আত্মারও। পেছনে আর্সলান নতমস্তকে ভাইকে অনুসরণ করছে, কথাহীন, প্রশ্নহীন, শুধু অপরাধবোধে ভারী এক ছায়া হয়ে। নিঃশব্দ বাড়িটার ভেতর প্রবেশ করতেই মনে হয়, বাতাস পর্যন্ত থমকে গেছে। দেয়ালের ঘড়িটা নির্লিপ্তভাবে সময় গুনছে, অথচ প্রতিটি টিক-টিক শব্দ এমরিনের বুকের ভেতর হাতুড়ির আঘাতের মতো আছড়ে পড়ছে। সময় এগোচ্ছে, কিন্তু তার ভেতরের ক্ষতগুলো স্থির, র ক্তাক্ত। এমরিন ভেতরে ঢুকেই ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে পড়ল। ক্লান্ত শরীরটা যেন আর নিজের ভার বইতে পারছে না। কাঁধ দুটো ঝুঁকে পড়েছে, সেই ঝোঁকের ভেতর জমে আছে অপূর্ণ ভালোবাসার অসহনীয় ভার, অনুচ্চারিত আর্তনাদ, আর হারানোর সীমাহীন শূন্যতা। সে আর সোজা হয়ে বসে থাকতে পারে না, কারণ কিছু মানুষ ভাঙে এমনভাবে, যাদের মেরুদণ্ড ভেঙে যায় অনুভূতির চাপে।

আর্সলান ধীর পায়ে ভাইয়ের সামনে এসে দাঁড়াল।কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা। নিস্তব্ধতা এতটাই গভীর যে মনে হয়, এই ঘরে শব্দ করাটাও এক ধরনের অপরাধ।নিশ্বাস নেওয়াটাও যেন অনুমতির অপেক্ষায়। এমরিন সিলিংয়ের দিকে নিষ্প্রাণ চোখে তাকিয়ে আছে। চোখ দুটো ফাঁকা, অথচ সেই শূন্যতার ভেতর ভাসছে অপরাধবোধের কালো ছায়া, স্মৃতির তীক্ষ্ণ ছুরি, আর না বলা হাজারটা স্বীকারোক্তি। বুকের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো বারবার গলায় উঠে আসে, আবার থমকে যায়। কিছু কথা আছে, যেগুলো উচ্চারণ করলে মানুষ নিজেকেই আর চিনতে পারে না। আর্সলান বেশ কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকার পর, ভাঙা কণ্ঠে বলে উঠল—

-"আমি সরি, ভাই। আমার জন্য তুই তোর ভালোবাসার মানুষকে হারাতে বসেছিস!"

শব্দগুলো ঘরের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু সেই প্রতিধ্বনিতেও কোনো সান্ত্বনা নেই। যেন শব্দগুলো নিজেরই ভারে চূর্ণ হয়ে পড়ল, বাতাসে ঝুলে থেকে ধীরে ধীরে ম রে গেল। এমরিন কোনো প্রতিউত্তর করল না। একই ভঙ্গিতে বসে আছে, নড়েনি, কাঁপেনি, চোখ ফেরায়নি। চোখ দুটো শূন্যে স্থির, অথচ সেই শূন্যতার গভীরে জমে আছে বিস্ফোরণের আগের নিস্তব্ধতা। এমন এক নিস্তব্ধতা, যা শব্দের চেয়েও বেশি ভয়ংকর। তার নিঃশ্বাস ভারী, কিন্তু শব্দহীন। যেন বুকের ভেতর কিছু একটা নিঃশব্দে ভেঙে যাচ্ছে, টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে র ক্তহীন যন্ত্রণায়। এই নীরবতাই আর্সলানকে ভয় পাইয়ে দিল। রাগ হলে সহ্য করা যায়, চিৎকার হলে লড়াই করা যায়, কিন্তু এই স্তব্ধতা? এই শূন্যতা? এটা ধ্বংসের পূর্বাভাস। সে কয়েক পা এগিয়ে এসে ধীরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। এমরিনের হাত আঁকড়ে ধরল শক্ত করে। আঙুলগুলো কাঁপছে। সেই স্পর্শের ভেতর লুকিয়ে আছে ক্ষমা চাওয়ার আর্তি, অপরাধবোধে নুয়ে পড়া আত্মা, আর ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগানোর একেবারে অসহায় চেষ্টা। যেন এই আঁকড়ে ধরাটাই শেষ আশ্রয়, ছেড়ে দিলে সব শেষ হয়ে যাবে। ঘরের অন্ধকার আরও ঘনীভূত হলো। মনে হলো, এই মুহূর্তে দু’ভাইয়ের মাঝখানে শুধু নীরবতা নয়, দাঁড়িয়ে আছে এক অদৃশ্য ক্ষত। এমন ক্ষত, যার র ক্ত ঝরছে না, অথচ যন্ত্রণায় নিঃশ্বাস নেওয়াই দুষ্কর। সেই ক্ষত সময়ের নয়, স্মৃতির, ভালোবাসা আর অপরাধবোধের সংযোগস্থলে জন্ম নেওয়া এক নিষ্ঠুর সত্য। আর্সলান ঢোক গিলে বলল—

-"ভুলে যা ওকে, ভাই। ও তোকে ঘৃণা করে। তোকে কোনোদিন ভালোবাসবে না ও!"

এমরিন ধীরে আর্সলানের চোখের দিকে তাকাল। সেই সমুদ্র-নীল চোখে আজ আর কোনো কোমলতা নেই, আছে গভীর অন্ধকার, নিস্তব্ধ অথচ হিংস্র। এমন অন্ধকার, যা আলো চায় না, বরং আলোকে গ্রাস করে।সেই দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আর্সলানের বাদামি চোখ জোড়া বিস্ময়ে বড় হয়ে এলো। এই প্রথম সে বুঝতে পারল, নীরব মানুষ মানেই দুর্বল নয়। কখনো কখনো তারা আগ্নেয়গিরির মতো, নির্বাক, অথচ বিধ্বংসী। শান্ত, কিন্তু সেই শান্তি ছিল কেবল ঝড়ের পূর্বাভাস।এমরিন শান্ত কণ্ঠে বলে উঠল—

-"তুই একজন বিবাহিত নারীকে ভালোবাসিস। তার স্বামীকে হত্যা করে তাকে বউ বানাতে চেয়েছিস। অথচ সে তার স্বামীকে এতটাই ভালোবাসে যে তোর স্নাইপারের সামনে আসতে এক মুহূর্তও ভাবেনি। একটু আগে সেই নারীর জন্য পাগলামি করে এলি। আর সেই তুই আমাকে আমার বউকে ভুলে যেতে বলছিস?"

এক মুহূর্ত থামল সে। তারপর—

-"কোন সাহসে?"

শেষের কথাগুলো এমরিন গর্জে উঠে বলল। এই গর্জন কণ্ঠের নয়, বুকের গভীর থেকে উঠে আসা ক্ষতবিক্ষত আত্মার আর্তচিৎকার। ঘরের বাতাস কেঁপে উঠল।অন্ধকার যেন আরও ঘনীভূত হয়ে চারপাশে জমে গেল, দেয়ালগুলোও যেন এই বিস্ফোরণের সাক্ষী হতে পিছিয়ে গেল। আর্সলান নিশ্প্রাণ চোখে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। যে ভাই জীবনে কখনো তার ওপর গলার আওয়াজ উঁচু করেনি, আজ সেই ভাইয়ের চোখে সে কী দেখছে? ঘৃণা? নাকি এমন এক ক্রুদ্ধ সত্য, যার মুখোমুখি হওয়ার সাহস সে কোনোদিনও করেনি? এই ভাবনার মাঝেই পেছন থেকে এক মোহনীয় কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। সেই কণ্ঠে ছিল না তাড়াহুড়ো, ছিল না উত্তেজনা,।ছিল বহু যুদ্ধ দেখা অভিজ্ঞতার স্থিরতা। এমন এক স্থিরতা, যা কেবল সময় আর র ক্তের ভেতর দিয়ে হেঁটে এলে জন্মায়। এমরিন ও আর্সলান একসঙ্গে পেছনে ঘুরে তাকাল। একজন মধ্যবয়সী নারী ধীর পায়ে এগিয়ে এসে পাশের সোফায় পায়ের ওপর পা তুলে বসে পড়লেন। তার উপস্থিতিতে ঘরের অন্ধকারও যেন এক মুহূর্ত থমকে গেল। মুখে একধরনের ক্লান্ত হাসি, চোখে তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ, যেন দু’ভাই নয়, সে পড়ছে তাদের ভেতরের ইতিহাস।এমরিন ও আর্সলান ভ্রু কুঞ্চিত করে তাকিয়ে রইল।মহিলাটি দু’জনের দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে বলল—

-"অবশেষে মেয়েদের জন্য দুই ভাইয়ের ঝগড়া হচ্ছে? এই দিন ও দেখার বাকি ছিল আমার?"

এমরিন তৎক্ষণাৎ বলে উঠলো—

-"কেনো এসেছো এখানে?"

ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠলো। প্রশ্নটা কৌতূহলের নয়, সতর্কতার। নারীটি শান্ত চোখে এমরিনের দিকে তাকিলো। তার কণ্ঠে ছিল শীতল কর্তৃত্ব। বহুবার নির্দেশ দেওয়া আর বহুবার রক্ত ঝরার অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া এক নির্মম নিশ্চয়তা। বলল—

-"তোমাদের যেই কাজের জন্য পাঠিয়েছি সেটা তো করতে পারছ না। তাই আমাকেই আসতে হলো।"

এমরিনের চোখে ছিল চাপা অস্থিরতা, যেন সে নিজেও জানে, পরিস্থিতি হাতের মুঠো থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। তবুও কণ্ঠে দৃঢ়তা নিয়ে সে বলল—

-"কাজ হয়ে যাবে। তোমার আসার প্রয়োজন ছিল না!"

-"কি কাজ করবে সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি। মেয়েদের নিয়ে এতই মত্ত দুই ভাই যে এটাও বুঝতে পারল না ইলহান তোমাদের দুই ভাইয়ের পরিচয় জেনে গেছে!"

এই বাক্যটা ঘরের মাঝখানে ছুড়ে দেওয়া একখণ্ড বরফের মতো আছড়ে পড়ল। মুহূর্তে সব উত্তাপ জমে গেল। নামটা, ইলহান, নিঃশব্দে দু’ভাইয়ের বুকের ভেতর বিস্ফোরণ ঘটাল। এ পর্যায়ে আর্সলান গর্জে উঠে বলল—

-"এবার ই খেলা জমবে। জেনেছে ভালো হয়েছে। এবার সামনাসামনি প্রহর করবো!"

তার চোখে তখন যুদ্ধের উন্মাদনা। বিপদের গন্ধ তাকে থামায় না, বরং আরও হিংস্র করে তোলে। এমরিন ধীর পায়ে উঠে উল্টো ঘুড়ে যেতে যেতে শান্ত কন্ঠে বলে উঠলো—

-"আফরিনকে আমার লাগবেই। ও আমার কাছে না আশা পর্যন্ত আমি কোনো একশন নেবো না।"

এই শান্ত কণ্ঠেই লুকিয়ে আছে সবচেয়ে ভয়ংকর দৃঢ়তা। এটা আবেগ নয়, এটা সিদ্ধান্ত। এমন সিদ্ধান্ত, যা প্রয়োজনে পুরো পৃথিবী পুড়িয়ে দিতে দ্বিধা করে না।

মহিলাটি এবার উঠে দাঁড়ালেন। তার ভঙ্গিতে ছিল অভিজাত ঔদাসীন্য, কিন্তু চোখে তীক্ষ্ণ বাস্তবতা। শান্ত কন্ঠে বলে উঠলো—

-"একটা মেয়ের জন্য এত অধঃপতন? মেয়েটাকে ব্যবহার করে ছুঁড়ে ফেললেই তো হয়। তুমি তার সাথে সাইকোলজিস্টের মতন কাউন্সিলিং খেলছো কেনো? ও তোমাকে পছন্দ করে না এনরিন। ঘৃনা করে তোমায়। তাহলে তুমি কেনো ওকে চাইছো? কেনো এতো কিসের অধিকার?"

প্রতিটা প্রশ্ন ছিল ছুরির মতো, পরপর, নির্দয়, হিসেবি।ঘরের আলো-অন্ধকার যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। এমরিন ঘুরে দাড়ালো। তার চোখে তখন আর রাগ নেই, আছে গভীর, অসহনীয় স্থিরতা। শান্ত কন্ঠে বলে উঠলো—

-"আফরিন একজন ভেঙে পড়া মানুষ, জীবনের কাছে খুব বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। আমি ওর শান্তি হতে চাই, ওর আশ্রয়। যেন আমার কাছে এসে ও সব কষ্ট ভুলে যেতে পারে। আমি ওর জন্য একটি ঘর হতে চাই, যেখানে ফিরে এলে ও নিরাপদ বোধ করবে। ছোট ছোট বিষয় নিয়েও ও অনেক ভাবনায় পড়ে যায়, ও খুব সংবেদনশীল। আমি চাই ওর অস্থির রাতের বদলে শান্তির ঘুমের কারণ হতে। সবাই ওকে অনেক কষ্ট দিয়েছে, আঘাত করেছে।অনেক সহ্য করেছে ও... এখন ওর পথের সব কাঁটা সরিয়ে দিতে চাই আমি। হ্যাঁ, জানি ও একটু রাগী, টুকটাক খিটখিটে স্বভাবের, কিন্তু তার নখরাগুলো আমি না সামলালে কে সামলাবে? ও আমার ওপর রাগ দেখাবে না তো কোথায় দেখাবে? ওর কথা, ওর যন্ত্রণা, ওর মনের কথা আমি না বুঝলে, আর কে বুঝতে পারবে? আমি ওর স্বামী ওকে ভালোবাসি আমি। তাই এইসব প্রশ্ন করা বৃথা!"

এমরিনের কণ্ঠে কোনো উচ্চতা নেই। কিন্তু এই শান্ত স্বীকারোক্তির ভেতর চাপা আছে এমন এক অটল দৃঢ়তা, যা বজ্রনিনাদের থেকেও বেশি ভয়ংকর। তার প্রতিটা শব্দ যেন বহুদিনের জমে থাকা অনুভবের র ক্তাক্ত দলিল, ভালোবাসা এখানে আবেগ নয়, একপ্রকার শপথ। ঘরের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।আর্সলান নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে, সে বুঝতে পারছে, এই মানুষটাকে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না আগের জায়গায়। যে মানুষ একবার কাউকে নিজের “ঘর” বানাতে চায়, সে মানুষ আর নিজের ধ্বংস নিয়েও দর কষাকষি করে না। মহিলাটির চোখ সরু হয়ে আসে।তার মুখে করুণার লেশ নেই, আছে নির্মম বাস্তবতার কঠোর রেখা। ঠোঁটে বিদ্রুপের ছায়া টেনে সে বলে ওঠে—

-"এত ভালবাস যে নিজেকেই ভুলে গেলে? তুমি ভুলে গেছো তুমি কে। কিসের জন্য বাংলাদেশে এসেছো।তুমি একজন মাফিয়া কিং। আর তোমার অধঃপতন দেখো। একজন মেয়ের জন্য তুমি কুকুরের মতন ছেসরামি করছো এমরিন!"

এমরিন ঘুরে তাকালো মহিলাটির দিকে। তার চোখে তখন আর দ্বিধা নেই, আছে নির্লজ্জ অন্ধকারের আত্মবিশ্বাস। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে এক ভয়ানক হাসি হাসলো। সেই হাসিতে উষ্ণতা নেই, করুণাও নেই, ওটা এমন এক হাসি, যা দেখে বোঝা যায় সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা জানে সে কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে। মহিলাটি ঘাবড়ে গেলো। এই প্রথমবার তার অভিজ্ঞ চোখে এক চিলতে শঙ্কা ভেসে উঠল। যে মানুষ এতক্ষণ ক্ষমতার ভাষায় কথা বলছিল, সে বুঝতে পারলো, এখানে ক্ষমতার সংজ্ঞা বদলে যাচ্ছে। এমরিন শীতল কন্ঠে বলে উঠলো—

-"আমি একজন দানব! সেটা আমাকে মনে করিয়ে দিতে হবে না। কিন্তু যখন আমি আমার ভালোবাসার মানুষের সামনে থাকি, Even the devil inside me lowers his eyes when she speaks. ওর ব্যাপারে আর একটি কথাও বলবে না। ওর নামটা পর্যন্ত উচ্চারণ করবে না।"

কণ্ঠস্বর ছিল নিস্তরঙ্গ, অথচ সেই নিস্তরঙ্গতার নিচে ঘুমিয়ে আছে ধ্বংসের প্রতিশ্রুতি। এটা হুমকি নয়, এটা সীমারেখা টেনে দেওয়া। আর যে সীমা অতিক্রম করবে, তার পরিণতি অনিবার্য।এমরিন সিঁড়ি ভেঙে ওপর চলে গেলো। তার পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল, কিন্তু তার উপস্থিতির ভার থেকে গেল ঘরের প্রতিটি কোণে, একটি অদৃশ্য চাপের মতো। মহিলাটি শান্ত চোখে তাকিয়ে দেখলো। এই শান্তি আসলে প্রশান্তি নয়, এ এক গভীর, হিসেবি নীরবতা। তার চোখে ঘুরপাক খাচ্ছে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা।আর্সলানের দিকে একবার তাকালো। সে দৃষ্টিতে প্রশ্ন নেই, আছে মূল্যায়ন। আর্সলান ও নিজের ঘরে চলে গেলো। দরজার বন্ধ হয়ে যাওয়ার শব্দে যেন সম্পর্কের আরেকটি স্তর চুপচাপ সিল হয়ে গেল। মহিলাটি আপন মনে বিড়বিড় করে উঠলো—

-"এই মেয়ে দুটোকে রাস্তা থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে।নইলে আর্সলান ও এমরিন হাত ছাড়া হয়ে যাবে।যেকোনো মূল্যে ওদের ব্যবহার করে আমার প্রতিশোধ নিয়েই হবে!"

তার ঠোঁটে একচিলতে ঠান্ডা হাসি খেলল। এই হাসিতে ভালোবাসার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার ছায়া, যেখানে মানুষ নয়, অনুভূতিই সবচেয়ে বড় শত্রু।

.

নূরাইসার এখনো জ্ঞান ফেরেনি। সময় যেন ঘড়ির কাঁটা ছিঁড়ে ফেলে স্থির হয়ে আছে, প্রতিটা মুহূর্ত সবার কাছে একেকটা যুগের মতো দীর্ঘ, ভারী, শ্বাসরুদ্ধকর।এই সময় এগোয় না, শুধু চাপ বাড়ায়। বুকের ওপর বসে থাকা এক অদৃশ্য পাথরের মতো। আইসিইউ কেবিনের দরজার সামনে থেকে ইলহান এক চুলও সরেনি। কাচের ওপার থেকে ভেতরের নিথর শরীরটার দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতর জমে উঠছে অগ্নিগর্ভ ক্ষোভ। সেই ক্ষোভ শান্ত নয়, ধীরে জ্বলে ওঠা কোনো আগুনও নয়, এ আগুন ধ্বংস চায়। তার ইচ্ছে করছে, আর্সলানের দেহ থেকে সেই হাত দুটো ছিঁড়ে নিয়ে আসতে, যে হাত নূরাইসার র ক্তে ভিজেছে।আর্সলানকে শেষ না করা পর্যন্ত তার ভেতরে কোনো শান্তির জায়গা নেই। তবুও সে প্রতিশোধ স্থগিত রেখেছে। কারণ এই মুহূর্তে যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার সময় তার নয়। এই হাসপাতালই এখন তার সমস্ত পৃথিবী। এই করিডোর, এই দরজা, এই কাচ, এই সীমার ভেতরেই তার শ্বাস আটকে আছে, তার আশা বেঁচে আছে, তার সমস্ত অস্তিত্ব দাঁড়িয়ে আছে। নূরাইসার পাশেই এখন তাকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। বাকি সব হিসাব সে পরে কষবে। প্রতিশোধ অপেক্ষা করতে পারে, র ক্তের দাবি জমা থাকতে পারে, কিন্তু এই মুহূর্তে একজন ইলহানের সমস্ত মনোযোগ, সমস্ত অস্তিত্ব, নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস, সবকিছুই নূরাইসাকে ঘিরে।এই মুহূর্তে তার পৃথিবীতে আর কিছু নেই। শুধু এক নিথর শরীর, আর সেই শরীরকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নিরবচ্ছিন্ন প্রার্থনার মতো এক অসীম অপেক্ষা।

হাসপাতালে এত মানুষের ভিড় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই মেনে নেবে না। পরিস্থিতির বাস্তবতা বুঝে রুহান সবাইকে নিয়ে তাদের ভাড়া করা বাড়িতে চলে আসে। হাসপাতালের করিডোরে তখন শুধু ইলহান আর বিহান। বাকি সবাইকে বিশ্রামের জন্য ফেরত পাঠানো হয়েছে, যেন বিশ্রাম এই মুহূর্তে কারোর ভাগ্যে আছে! কারোরই খাওয়ার রুচি নেই, ক্ষুধা নেই, ইচ্ছাশক্তিও নেই। তবু শরীরকে টিকিয়ে রাখতে খাবার তো লাগবেই। সেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয় আফরিন। নুহা আর উপমাকে সঙ্গে নিয়ে সে হালকা, পাতলা খাবার রান্না করে বড়দের খাইয়ে দেয়, ওষুধ খাওয়ায়। জানে, এত মানুষ একসাথে হাসপাতালে থাকলে কোনো উপকার হবে না, বরং সংকট আরও ঘনীভূত হবে। তাই ইলহান নিজেই সবাইকে আসতে নিষেধ করেছে।

রুহান আর তানভীর ইলহান আর বিহানের জন্য খাবার আর প্রয়োজনীয় জামাকাপড় নিয়ে হাসপাতালে আসে। তবুও ইলহানকে কোনোভাবেই বাড়িতে নেওয়া যায়নি। নূরাইসাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবতেই তার চোখে অদ্ভুত এক উন্মত্ত দৃঢ়তা জমে ওঠে। অজ্ঞতার ভারে বিহানকেও থাকতে হয় তার সাথেই। আইসিইউর বাইরের আলোটা নিষ্ঠুরভাবে সাদা। বাতাসে জীবাণুনাশকের গন্ধ, আর বুক চেপে ধরা এক অদৃশ্য আতঙ্ক। মনিটরের একটানা ‘বিপ... বিপ...’ শব্দ যেন সময়ের বুকের ওপর হাতুড়ির আঘাত। এই করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো জানে, একটা নিঃশ্বাস বদলে দিতে পারে সবকিছু। আর সেই নিঃশ্বাসের অপেক্ষায় সবাই। যেন পুরো পৃথিবী থেমে আছে একটিমাত্র হৃদস্পন্দনের ওপর।

রুহান আর তানভীর কিছুক্ষণ হাসপাতালে থেকে বাড়ি ফিরে যায়। কিন্তু বাড়ির চার দেয়ালও আজ শত্রু।সন্ধ্যার আলো নামতেই সবাই বুঝে যায়, এভাবে বসে থাকা অসম্ভব। একবার নূরাইসাকে না দেখলে কারোর বুকে শান্তি নামছে না, নিঃশ্বাস ঠিকঠাক চলছে না।অস্থিরতার টানে তারা আবার হাসপাতালের পথ ধরে।রুহান ও তানভীর সবাইকে নিয়ে ফের হাসপাতালে আসে। ততক্ষণে ইকবাল দেওয়ান আর নাহিদ দেওয়ান ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে ফেলেছেন। খবর ভালো নয়, কোনো উন্নতি নেই। আইসিইউ কেবিনের ভেতরে কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না। কাচের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সবাই শুধু চোখ ভরে দেখে নেয়, সেই দেখাতেই যেন তৃষ্ণা মেটানোর চেষ্টা। অথচ তৃষ্ণা মেটে না, আরও বাড়ে। ওদিকে ইলহান। নূরাইসার কাছে যাওয়ার জন্য সে যেন চাতক পাখির মতো ছটফট করছে। একটু ছুয়ে দিয়ে ইচ্ছে করছে। বুকের মধ্যে ভরে রাখতে ইচ্ছে করছে।। নিজেকে কোনোভাবেই সামলে রাখতে পারছে না সে। ভেতরে জমে থাকা অসহায়তা আর ক্রোধ তাকে ভিতর থেকে চূর্ণ করছে।এক কোণে মা আর চাচী নীরবে কাঁদছেন। সেই কান্না নিঃশব্দ হলেও ভারী, বুক চেপে ধরা। দৃশ্যটা সহ্য করতে না পেরে ইলহান বেরিয়ে যায়। তার পেছনে বেরিয়ে আসে বিহান, তানভীর আর রুহান। ভেতরে থেকে যায় উপমা আর নুহা, মা, বড় মা আর ফুপুকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে। কান্না করতে নিষেধ করছে, শক্ত থাকতে বলছে। কিন্তু মায়ের মন কি যুক্তি বোঝে? বোঝে না। সে শুধু ভাঙে, ভেঙেই পড়ে। এই নাজেহাল পরিস্থিতির মধ্যে আফরিন সবার দিকে একবার তাকায়। এরপরই পানি আনতে বেরিয়ে পড়ে সে। কিন্তু হাসপাতাল ক্যান্টিনে পানি নেই। বাধ্য হয়ে বাইরে আসতে হয়। হাসপাতালের বাইরে পা দিয়েই সে থমকে যায়। সামনে এমরিন দাঁড়িয়ে আছে, নিঃশব্দ, স্থির, চোখে অদ্ভুত এক অন্ধকার। আফরিন কোনো দিকে না তাকিয়ে, ক্ষিপ্ত পায়ে এগিয়ে যায় তার কাছে।মুহূর্তের মধ্যেই জমে ওঠা ক্ষোভ বজ্রকণ্ঠে ফেটে পড়ে নিষ্ঠুর স্পষ্টতায়—

-"কেনো এসেছেন এখানে? আমার বোন বেঁচে আছে, নাকি ম রেছে, সেটা দেখতে? খুব আনন্দ হচ্ছে না?আমার ভাইকে জীবিত অবস্থায় মে রে দিয়েছেন আপনারা দুই ভাই মিলে। আমার বোনের সন্তানকে হ ত্যা করেছেন। আর কী বাকি আছে আপনার চাওয়ার? আমার ছোট বোন নুহাকেও তো মা রতে চেয়েছিলেন।এখন আবার কেন এসেছেন? আর কত ক্ষতি করা বাকি আছে? আমাদের কাছ থেকে ঠিক কী চাই আপনাদের এই দুই ভাইয়ের?"

প্রতিটা শব্দ যেন আগুন হয়ে ছুটে এসে এমরিনের বুকে আঘাত করছে। এমরিন ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে।নীল চোখের সাদা অংশ লাল হয়ে উঠেছে, রাত্রি জাগা অনুতাপ আর অদমনীয় বাসনার ছাপ সেখানে স্পষ্ট।ফর্সা মুখশ্রী রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। সে ক্লান্ত, ভাঙা কণ্ঠে বলে উঠল—

-"তোমাকেই চাই। আমার শত্রু তোমার ভাই, তুমি নও। আমি আগেও বলেছি, আবার বলছি, আমি তোমাকে ভালোবাসি।"

আফরিন তাচ্ছিল্যের হাসিতে ফেটে পড়ল। সেই হাসিতে আনন্দ নেই, আছে বিতৃষ্ণা, আছে দীর্ঘদিন জমে থাকা ঘৃণা। চোখের কোণে ইতিমধ্যেই অশ্রুরা বাসা বেঁধেছে। মলিন হাসি টেনে সে বলল—

-"ভালোবাসেন? আমাকে? ঐ যে হাসপাতালের বেডে জীবন-মৃ ত্যুর সঙ্গে লড়ছে আমার বোন, তাকে দেখেও এই শব্দটা মুখে আসে? আমার ভাইকে কতবার মা রতে চেয়েছেন। তানভীর ভাইকে আহত করেছেন। আমার বোন নুহাকে দু’দু’বার কি ড ন্যা প করতে চেয়েছেন।এরপরও আপনি আশা করেন, আমি আপনাকে ভালোবাসব?"

সে থেমে গেল। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুকণা মুছে নিল। তারপর আবার এমরিনের দিকে তাকাল, চোখে এবার জল নয়, জমাট বিষ। ঠোঁটের কোণে বিষাক্ত এক হাসি খেলে গেল।

-"এই ভালোবাসা অন্ধকারের ভেতর জন্মেছে। কিন্তু যে অন্ধকার আমার পরিবারের র ক্ত ছুঁয়ে গেছে, সেই অন্ধকারকে আমি বুকে টেনে নিতে পারি না। আপনি আমার হৃদয়ের পাপ। আর ক্ষমা, আমার সাধ্যের বাইরে। কিছু পাপ চুম্বনেও শুদ্ধ হয় না। আমি আপনাকে ঘৃণা করি। আপনার প্রতিটা অংশ।"

শব্দগুলো তীর হয়ে এমরিনের বুকে বিঁধে যায়, একটার পর একটা, অবিরাম। তার বাম চোখ দিয়ে অশ্রুর একফোঁটা গড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তেই মাফিয়া কিং নিজের পরিচিত দম্ভে সেই অশ্রু মুছে ফেলে। আফরিনের ঝাপসা দৃষ্টিতে সেই দৃশ্য ধরা পড়ে না। নীরবতার বুক চিরে এমরিন তখন তার চিরচেনা কঠোর, নির্ভীক কণ্ঠে বলে ওঠে—

-"তুমি আমাকে ঘৃণা করো, আমি তাতেই বাঁচি। কারণ ঘৃণা মানে তুমি এখনও আমাকে ছুঁয়ে আছ। এই যুদ্ধ, এই র ক্ত, এই অন্ধকার, সব পেরিয়েও আমি তোমার দিকেই আসব, আফরিন। তুমি মানো বা না মানো, তুমি আমার।"

বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। যেন প্রতিটা নিঃশ্বাসের ভেতর জমে আছে অব্যক্ত ক্রোধ আর অনিবার্য সংঘর্ষ।এমরিন স্থির কণ্ঠে কথা বলে, সেই কণ্ঠে অনুতাপ নেই, আছে দাবির দৃঢ়তা।

-"তোমার সব অভিযোগ শিরোধার্য। ঘৃণা করো তো আমায়? করো। এই ঘৃণাই তোমার দৃষ্টি আমার ওপর স্থির করে রাখে। এমনভাবে আমাকে ঘৃণা করো, যেন তোমার মন আর মস্তিষ্ক জুড়ে কেবল আমারই রাজত্ব চলে।"

আফরিন তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। সেই হাসিতে কোনো উষ্ণতা নেই, শুধু ক্লান্ত বিদ্রূপ।

-"কারও ওপর জোর করে ভালোবাসা চাপিয়ে দেওয়া যায় না। আপনি হয়তো ভাবছেন, ঘৃণা করতে করতেই একদিন আমি আপনাকে ভালোবাসব। কিন্তু আপনি ভুল ভাবছেন।"

এমরিনের ঠোঁটে মুচকি হাসি ফুটে ওঠে, ঠান্ডা, আত্মবিশ্বাসী।

-"আমি তোমায় জোর করব না। অপেক্ষা করব। যতদিন না দুনিয়া তোমার সামনে আর কাউকে রাখবে না, শুধু আমাকে ছাড়া।"

আফরিন বিরক্তিতে ফেটে পড়ে—

-"আমার থেকে দূরে থাকুন!"

এমরিন এক পা এগিয়ে আসে। দূরত্ব কমে যায়, নিঃশ্বাসের শব্দ স্পষ্ট শোনা যায়। আফরিনের চোখের দিকে তাকিয়ে সে ধীরস্বরে বলে—

-"চেষ্টা করেছি। কিন্তু যে পথেই হাঁটি, সব পথ শেষ হয়ে তোমার কাছেই এসে থামে।"

বিজ্ঞাপন

আফরিনের চোখে ঘৃণা আর অস্থিরতা একসাথে জ্বলে ওঠে।

-"আপনাকে দেখলে আমার ঘৃণায় গা গুলিয়ে ওঠে!"

এমরিন চোখ সরায় না।

-"তাহলে আমার নাম বলার সময় তোমার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে কেন?"

-"আমি কখনোই আপনার হবো না!"

আফরিনের কণ্ঠ এবার ভাঙে, রাগে নয়, অস্বীকারের শেষ শক্তিতে। এমরিন ধীরে শ্বাস নেয়।

-"তুমি সেই দিন থেকেই আমার, যেদিন প্রথম আমি তোমায় দেখেছি। শুধু সত্যিটা মেনে নেওয়ার সাহস এখনো তোমার হয়নি।"

আফরিনের চোখে জল চিকচিক করে ওঠে, কিন্তু কণ্ঠ কঠিনই থাকে—

-"আমি আপনার মোহ, ভালোবাসা নই। ভালোবাসা কী, সেটাই তো আপনি জানেন না।"

কথাগুলো বাতাসে ঝুলে থাকে, অমীমাংসিত, ধারালো, নিঃশব্দ বিস্ফোরণের মতো। দু’জন মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে মুখোমুখি, একজন দাবির অন্ধকারে, আরেকজন প্রত্যাখ্যানের আলো আঁকড়ে। নিস্তব্ধতা আরও ভারী হয়ে নামে। আলো আছে, কিন্তু উষ্ণতা নেই। এমরিনের কণ্ঠ সেই নীরবতাকে কেটে বেরিয়ে আসে, ঠান্ডা, নিশ্চিত, অবিচল।

-"ভালোবাসা? হয়তো জানি না। কিন্তু অধিকার, আনুগত্য আর যুদ্ধ, এই তিনটা আমি জানি। আর তোমার জন্য এই তিনটার সাথেই লড়ব।"

আফরিনের চোখ জ্বলে ওঠে। কণ্ঠে জমে থাকা অভিযোগ এবার আর চাপা থাকে না—

-"যদি সত্যিই আমাকে নিয়ে আপনি ভাবতেন, তাহলে আমাকে ছেড়ে দিতেন!"

এমরিন এক মুহূর্তও দোটানায় পড়ে না।

-"আমি যদি তোমাকে ছেড়ে দিই, তবে নিজের পরিচয়টাই অস্বীকার করতে হবে। নিজের অস্তিত্ব নিয়ে নিজের কাছেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ব।"

আফরিনের কণ্ঠ এবার কাঁপে, রাগে নয়, দীর্ঘদিনের ভয়ে।

-"আমি আপনাকে ভয় পাই। সব সময় আতঙ্কে থাকি, আপনি আবার কী ক্ষতি করবেন আমার আর আমার পরিবারের।"

এমরিনের ঠোঁটে ক্ষুদ্র, নিষ্ঠুর এক হাসি।

-"ভালো। কারণ যেদিন তুমি আমাকে ভয় পাওয়া বন্ধ করবে, সেদিনই তুমি দৌড়ানো থামাবে। আর আমি চাই তুমি দৌড়াও। চাই তুমি পালাও, হাঁপাতে হাঁপাতে, ভাঙতে ভাঙতে। আর আমি তোমাকে ধরি। তুমি যতবার দৌড়াবে, যতবার নিজেকে আমার নাগালের বাইরে ছুড়ে দেবে, আমি ঠিক ততবার তোমার পিছু নেব। ছায়ার মতো। অনিবার্যতার মতো। প্রতিবার ধরব আরও গভীরভাবে। প্রতিবার নিজের করে নেব, আগের চেয়েও নিঃশর্ত, আগের চেয়েও নিষ্ঠুরভাবে। কারণ কিছু ধাওয়া থাকে, যেগুলো শেষ হয় না ধরায়, শেষ হয় তখন, যখন পালানোর ইচ্ছেটুকুও নিঃশেষ হয়ে যায়।"

আফরিন সোজা হয়ে দাঁড়ায়। চোখে জল নেই, আছে সিদ্ধান্ত।

-"আমি আমার জীবন বেছে নিয়েছি। তাতে আপনি নেই।"

প্রতিটি শব্দের সঙ্গে সঙ্গে এমরিন আরও কাছে আসে।দূরত্বটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়, চাপ নয়, উপস্থিতি দিয়ে। একই শান্ত কণ্ঠে সে বলে—

-"তাহলে আমি সেই ঝড় হব, যা তোমার পছন্দগুলো নতুন করে লিখে দেবে।"

-"আপনার হওয়ার চেয়ে ভেঙে পড়াই ভালো।"

এক মুহূর্তের নীরবতা। তারপর—

-"তাহলে ভেঙে পড়ো। আমি প্রতিটা ভাঙা টুকরোর পাশে হাঁটু গেড়ে বসে তোমাকে আবার গড়ে তুলব, আমার করে।"

এমরিন আরেক কদম এগিয়ে আসে। আফরিনের চোখে নিজের নীল চোখ স্থির করে রাখে, এক ফোঁটা কাঁপুনি নেই সেই চোখে।

-"তুমি নিজে আমাকে না বাছা পর্যন্ত আমি তোমাকে স্পর্শ করব না। কিন্তু যেদিন বেছে নেবে... সেদিন আমার কাছ থেকে পালানোর কোনো রাস্তা থাকবে না।তুমি এখন আমায় ঘৃণা করো। আজ করো। কাল। এক বছর। আমি ধৈর্য ধরতে জানি। Eternity bends for obsession."

আফরিন তীব্র বিরক্তিতে বলে ওঠে—

-"আপনি আমাকে বুঝতে পারেন, এমন ভান করা বন্ধ করুন!"

-"ভান করি না। আমি পর্যবেক্ষণ করি। পার্থক্য আছে।"

আফরিন মুখ ফিরিয়ে নেয়। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে, হাতের মুষ্টি আরো শক্ত হয়েছে। রাগটাই যেন তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে সাহায্য করছে। ধরলো কন্ঠে সে বলে উঠে—

-"You think staring at me like that gives you power?"

এমরিনের উত্তর আসে বিন্দুমাত্র দ্বিধা ছাড়া—

-"No. Wanting you and not touching you, that’s power."

আফরিন তীক্ষ্ণ, তিক্ত হাসি হাসে। সেই হাসিতে কোনো জয় নেই, আছে যুদ্ধের ঘোষণা। কিন্তু বোঝা যায়, এই নীরবতা আর শান্তি নয়, এটা ঝড়ের ঠিক আগের স্তব্ধতা।

-"আপনি ভীষণ অহংকারী।"

এমরিনের ঠোঁটে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। চোখে শুধু স্থিরতা।

-"আর তুমি ভয় পাও, আমি না থাকলে চারপাশটা নীরব হয়ে যাওয়ার।"

আফরিন এক পা এগিয়ে আসে। চোখে আগুন, অভিমান আর বিদ্রোহের দহন।

-"আমি কখনোই আপনার কাছে ফিরে যাব না!"

এমরিন নড়ে না। গলা চড়ায় না। কণ্ঠে নেই কোনো জোর, তবু তা কানে গিয়ে বাজে।

-"আমি জানি।"

এই উত্তরটাই আফরিনকে যেকোনো হুমকির চেয়ে বেশি অস্থির করে তোলে। যেন মাটি একটু নড়ে গেল পায়ের নিচে।

-"তাহলে এখনো এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?"

-"কারণ তুমি আমাকে ঘৃণা করো না। তুমি ঘৃণা করো এই সত্যটা, আমি তোমাকে দেখি, ঠিক তখনই, যখন তুমি নিজেকে আমার থেকে গুটিয়ে নিতে চাও। তুমি আমার কাছে উন্মুক্ত বই, ক্যারিনো।"

আফরিন ঠোঁট কামড়ে ধরে।

-"If I walk away now..."

কথা শেষ করার সুযোগ দেয় না এমরিন।

-"You will. And you’ll come back. Not because I called you. But because no one else will wait the way I do."

নীরবতা নামে। ভারী। এতটাই যে শ্বাসের শব্দও অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।

-"আপনি বিপজ্জনক।"

এমরিন হালকা, সংযত হাসি দেয়, যেন সত্যটা আগেই জানা ছিল।

-"শুধু মিথ্যার জন্য। আর তুমি নিজেকেই মিথ্যে বলতে বলতে ক্লান্ত।"

আফরিন আর কথা বাড়ায় না। একবার র ক্ত চক্ষু নিয়ে এমরিনের দিকে তাকায়, সেই দৃষ্টিতে ক্রোধ, অপমান আর অস্বীকার একসাথে জ্বলে ওঠে। তারপর তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। এমরিন পিছু নেয় না।শুধু প্রায় কোমল স্বরে বলে—

-"সময় নাও। আমি কোথাও যাচ্ছি না।"

আফরিন চলে যায়। কিন্তু উপস্থিতি থেকে যায়, অদৃশ্য, অবধারিত, অপেক্ষমাণ।

বিজ্ঞাপন
সূর্যস্নাত ভালোবাসা গল্পটি নওরিন ইথিকা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ভালোবাসাময় গল্প