সূর্যস্নাত ভালোবাসা

পর্ব - ৫৫

🟢

একটি বন্ধ ঘর। দেয়ালজুড়ে স্যাঁতসেঁতে দাগ, বাতাসে পুরোনো কাঠ আর ধুলোবালির গুমোট গন্ধ।জানালাগুলো শক্ত করে বন্ধ, বাইরে থেকে ঢুকে পড়া আলো কেবল দরজার নিচের সরু ফাঁক দিয়ে লম্বা, মৃ তপ্রায় রেখা এঁকে রেখেছে মেঝের উপর। কোথাও একটা পানির ফোঁটা পড়ার শব্দ, টুপ... টুপ..., ঘরের নীরবতাকে আরও ভারী করে তুলছে। চেয়ারের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে নূরাইসা, উপমা, আফরিন ও নুহাকে। কতক্ষণ যাবৎ তারা অচেতন হয়ে পড়ে আছে, তা বোঝার উপায় নেই। মাথার ভেতর ঝিমঝিম শব্দ, কানে যেনো শূন্যতার গুঞ্জন। ধীরে ধীরে প্রত্যেকের চোখের পাতা কেঁপে উঠলো। ভারী চোখের পাতা মেলে তাকাতেই চারপাশ ঝাপসা দেখা গেলো। আলো-অন্ধকার মিশে এক অদ্ভুত বিভ্রম তৈরি করেছে। কয়েক মুহূর্ত পর দৃষ্টি পরিষ্কার হতেই সবার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে তিনটি রমণীর অবয়ব, আরাবী, পায়েল আর সেই বয়স্ক নারী।চারজনের ভ্রু সহসাই কুচকে উঠলো। দড়ির টান বুঝতে পেরে আফরিন ছটফট করে উঠতেই চেয়ারের পা মেঝেতে ঘষটে উঠল কর্কশ শব্দে। নূরাইসা শুষ্ক কণ্ঠে বললো—

-"আমাদের এইভাবে বেঁধে রেখেছে কেনো? আর পায়েল আপু? তুমি ওদের চিনো কিভাবে?"

পায়েল কয়েক কদম এগিয়ে এলো। তার হিলের শব্দ যেনো প্রতিটি সেকেন্ডকে কেটে কেটে দিচ্ছে। ঠোঁটের কোণে বিষাক্ত হাসি নিয়ে সে বলল—

-"ইলহানের জন্য। আমার যে ইলহানকে চাই ইসা।"

নুহা দাঁত চেপে বলল—

-"আজ সকালের সব কিছুই নাটক করেছিলে? তুমি আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে! কি ভেবেছো তুমি, এইভাবে ভাইয়াকে পাবে? কখনোই পাবে না!"

পায়েলের চোখে তাচ্ছিল্যের ঝিলিক—

-"বিশ্বাস? এই খেলায় বিশ্বাস বলে কিছু নেই। এখানে আছে শুধু প্রয়োজন। আর আমার প্রয়োজনের নাম, ইলহান।"

আফরিন তেতে উঠে বলল—

-"ইলহান ভাইয়া ইসার! সে সারাজীবন ইসারই থাকবে। তুমি কোনোদিন পাবে না! আর তুমি আরাবী? তুমি কেনো আমাদের ধরে এনেছো?"

আরাবী এগিয়ে এলো। তার চোখ দুটো অস্বাভাবিক শান্ত, কিন্তু সেই শান্তির আড়ালে স্পষ্ট হিংস্রতা। সে ক্রু হেসে বলল—

-"আমি? আমি চাই বিহানকে। পায়েল চায় ইলহানকে। বুঝলে ব্যাপারটা? শত্রুর শত্রু আমাদের বন্ধু। যেহেতু আমাদের সকলেরই চাওয়া একটাই, তাই আমরা হাত মিলিয়েছি নিজেদের কাজটা সহজ করতে।"

সে হঠাৎ উপমার দিকে তাকালো।

-"তবে উপমা কলেটরাল ড্যামেজ। ও আজকে উপস্থিত না থাকলে ওকে আমরা তুলে আনতাম না।"

উপমা চোখে আগুন নিয়ে বলল—

-"এই 'কলেটরাল ড্যামেজ' এনেই সবচেয়ে বড় ভুল করেছো। ভুল জায়গায় দাঁড়িয়ে আছো তোমরা। ইলহান ভাই তোমাদের কাউকে ছাড়বে না!"

বয়স্ক নারীটি এতক্ষণ নীরব ছিল। এবার সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। তার কণ্ঠে কাঁপা কাঁপা কর্কশতা—

-"তোদের মতো মেয়েরা ভাবে সবকিছু তোদের ইচ্ছেমতো চলবে। কিন্তু জীবন সবসময় মিষ্টি গল্প নয়। তোমাদের ইলহান কিছুই করতে পারবে না।"

নূরাইসা গলা শক্ত করে বলল—

-"আমাদের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। ইলহান জানলে তোমাদের কেউই বাঁচিয়ে রাখবে না।"

আরাবী ঝুঁকে নূরাইসার মুখের খুব কাছে এসে ফিসফিস করে বলল—

-"সেটাই তো চাই। সে আসুক। নিজের পায়ে হেঁটে আসুক। আর দেখুক, তার কারণে কারা কাঁদছে।"

আফরিন দড়ির বাঁধনে হাত ছটফট করে বলল—

-"তোমরা ভুল করছো। এটা প্রেম না, এটা অসুস্থতা।"

পায়েল হেসে উঠল—

-"প্রেম কখনো সুস্থ ছিল না, আফরিন। প্রেম মানেই অধিকার। আর আমি আমার প্রাপ্য নিতে জানি।"

নুহা গর্জে উঠল—

-"অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া যায় না। সেটা অর্জন করতে হয়।"

বয়স্ক নারীটি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল—

-"তোরা অনেক বেশি কথা বলছিস। দড়িটা আরেকটু শক্ত করে বাঁধা উচিত ছিল।"

ঘরের বাতাস যেনো আরও ভারী হয়ে উঠল। চারপাশে অদৃশ্য এক বিস্ফোরণের অপেক্ষা। চারটি চেয়ারে বাঁধা চারটি মেয়ে, কিন্তু চোখে ভয় নয়, প্রতিরোধ। আর সামনে দাঁড়ানো তিন নারী, প্রতিশোধ, অধিকার আর হিংস্র আকাঙ্ক্ষার প্রতিমূর্তি। দরজার বাইরে হাওয়ার ঝাপটা লাগতেই কপাট কেঁপে উঠল। মনে হলো, ঝড় আসছে। আর সেই ঝড়ে কে টিকবে, কে ভেঙে পড়বে, তা এখনো অজানা।

.

সময় গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ঘরের ভেতরের আলো যেন ইচ্ছে করেই আরও ম্লান হয়ে গেছে। দরজার নিচের সরু ফাঁক গলে ঢুকে পড়া কমলা আভা ধীরে ধীরে রক্তিম হয়ে নিভে আসছে, মনে হয় দিনও এই নির্মম দৃশ্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। বাতাস ভারী, স্তব্ধ। নিঃশ্বাসের শব্দ পর্যন্ত স্পষ্ট শোনা যায়।দড়ির বাঁধন আরও শক্ত করে টেনে বাঁধা হয়েছে।চেয়ারগুলোর পায়া মেঝের উপর ঘষটে এনে পাশাপাশি ঠেসে রাখা হয়েছে চারজনকে, একটি অদৃশ্য শৃঙ্খলে যেন তাদের ভাগ্যও একসূত্রে বাঁধা।হাতের কবজিতে দড়ির নির্দয় ঘর্ষণে আগুনের মতো জ্বালা করছে। সামান্য নড়াচড়া মানেই টান, আর টান মানেই তীব্র ব্যথার শীতল ঢেউ। তবুও কেউ শব্দ করছে না। নীরবতাই যেন তাদের শেষ প্রতিরোধ। আরাবী ধীরে ধীরে তাদের সামনে পায়চারি করছে। তার পায়ের শব্দ মেঝেতে ধাতব প্রতিধ্বনি তুলছে। মুখে অদ্ভুত স্থিরতা, কণ্ঠে বরফের মতো শীতলতা—

-'চুপচাপ থাকলে তোদের কষ্ট কম হবে। কিন্তু তোরা তো নায়িকা, তাই না? নায়িকার মতন দাপট তো দেখতেই হয় তোদের।"

কথাগুলো বাতাসে ঝুলে থাকে, বিষাক্ত ধোঁয়ার মতো।

হঠাৎ পায়েল ঝড়ের বেগে এগিয়ে এসে নূরাইসার চিবুক শক্ত করে ধরে মুখ ওপরে তুলল। ব্যথা লাগলেও নূরাইসা শক্ত মুখে রইলো, কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। তার আঙুলের চাপের নিচে অসহায়তা স্পষ্ট, কিন্তু নূরাইসার চোখে ভয়ের পাশাপাশি একরাশ জেদও জ্বলছে।

-"ইলহানকে ফোন করব। এখনই। যা বলব, তাই বলবি। না হলে..."

বাকিটা আর উচ্চারণ করল না সে। কিন্তু তার চোখের ভাষা, ঠোঁটের কোণের কঠিন রেখা, সবকিছুই অনুক্ত হুমকিকে স্পষ্ট করে দিল। চারদিকে থমথমে নিস্তব্ধতা।যেন ঘরের দেয়ালগুলোও কান পেতে আছে। আফরিন দাঁত চেপে তাকিয়ে রইল। তার শ্বাস ভারী, কিন্তু কণ্ঠে অবদমিত আগুন—

-"আমরা তোমাদের খেলায় অংশ নেব না।"

কথাটা বাতাসে ঝুলে রইল, দৃঢ়, নির্ভীক। যেন অন্ধকার ঘরে হঠাৎ জ্বলে ওঠা একটি প্রদীপ। বয়স্ক নারীটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। তার পদচারণায় ছিল হিসেবি কঠোরতা। চেয়ারের পেছনে এসে লাঠির মতো শক্ত হাত রাখল। হঠাৎ, এক প্রচণ্ড ধাক্কা। চেয়ার কেঁপে উঠল। উপমার শরীর ভারসাম্য হারিয়ে একপাশে হেলে পড়ল। মুহূর্তটুকু যেন অনন্তকাল, তারপর দেয়ালে ঠেকে থেমে গেল চেয়ারটি। ধাতব ঘর্ষণের শব্দ ঘরের স্যাঁতসেঁতে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো। নারীটি কর্কশ কন্ঠে বলল—

-"অহংকার বেশি। ভাঙতে সময় লাগে না!"

কর্কশ স্বর। তাতে বিদ্বেষের সঙ্গে অপমানের বিষ মিশে আছে। হঠাৎ, চড়। নূরাইসার গালে আঘাতের শব্দ যেন ঘরের নীরবতা ছিঁড়ে ফেলল। তীক্ষ্ণ, আকস্মিক, নির্মম। তার মাথা কেঁপে উঠল, দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্য ঝাপসা হয়ে এল। ঠোঁট ফেটে রক্ত বেরোয়নি, তবু ব্যথার ঢেউ শরীর জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু সে চোখ নামাল না।চোখ দু’টি অবিচল, অদম্য। পায়েল ঝুঁকে এলো। তার নিঃশ্বাসে উত্তেজনার গরম হাওয়া।

-"তুই ভাবছিস ইলহান এসে তোকে বাঁচাবে? আজ সে আসবে, তবে নিজের ইচ্ছায় না, আমাদের শর্তে।"

ঘরের বাতাস আরও ভারী হয়ে উঠল। যেন প্রতিটি শব্দ শ্বাসরোধ করে দিচ্ছে। পায়েল ফোন বের করল। স্ক্রিনের আলো অন্ধকারে অস্বস্তিকর নীল আভা ছড়িয়ে দিল, একটা শীতল, নির্দয় আলোকরেখা। সে নূরাইসার হাতের কাছে ফোন ধরল, দড়ির বাঁধনে আঙুল নড়ানোও কঠিন। সে বলল—

-"বল, তুই বিপদে। বল, ও যেন একা আসে।"

নূরাইসা ঠান্ডা গলায় বলল—

-"আমি ম রলেও তোমাদের কথা মতন কিছুই বলবো না।"

স্বরটি ছিল শান্ত, কিন্তু তাতে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। যেন মৃ ত্যু নয়, আত্মসমর্পণই তার কাছে ভয়ংকর। হঠাৎ পায়েল রাগে ফুঁসে উঠল। ফোনটা ছুড়ে মারল দেয়ালে। বিস্ফোরণের মতো শব্দ হলো। ভাঙা স্ক্রিনের কাঁচ ছিটকে পড়ল মেঝেতে, ক্ষুদ্র, ঝলমলে টুকরোর মতো। সে নূরাইসার গালে আরও একটি চোর বসালো।আরাবী এবার সত্যিই ক্ষিপ্ত। সে এক এক করে চেয়ারগুলো ধাক্কা দিতে লাগল। কাঠের ঘর্ষণ, দড়ির টান, হাঁপিয়ে ওঠা নিঃশ্বাস, সব মিলিয়ে ঘরটা হয়ে উঠল আতঙ্কের আবদ্ধ কূপ।

-" ভাবছিস সাহস দেখাচ্ছিস? এটা সাহস না, এটা বোকামি!"

উপমা কষ্টে শ্বাস নিতে নিতে বলল—

-"ভয় দেখিয়ে প্রেম পাওয়া যায় না।"

কথাটা যেন ছুরির মতো কেটে গেল। এক মুহূর্তের জন্য ঘরে অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো। বয়স্ক নারীটি হঠাৎ আফরিনের চুল মুঠো করে ধরল। টান মেরে মাথা পেছনে তুলল। তার চোখে ছিল নিষ্ঠুর শিক্ষাদানের তৃপ্তি। বলল—

-"তোরা সবাই আজ শিক্ষা পাবি।"

ঘরের বাতাস ভারী। কান্না নেই, শুধু দাঁত চেপে সহ্য করা। বদ্ধ ঘরে মানুষের ভয়, রাগ আর প্রতিবাদের গন্ধ মিশে আছে। চেয়ারের শব্দ, বাঁধনের টান, আক্রমণাত্মক হাসি, সব মিলিয়ে এক বিভীষিকাময় আবহ। ঠিক সেই সময়, দরজার বাইরে ভারী পায়ের শব্দ। একবার। দুইবার। তারপর— ধাম!

দরজাটা প্রচণ্ড শব্দে খুলে গেল। বাতাস ঝড়ের মতো ভেতরে ঢুকে পড়ল। বাইরের আলো হঠাৎ তীব্র হয়ে চোখে বিঁধল। যেন অন্ধকারের বুক চিরে বজ্রপাত নেমেছে। দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে এক ছায়ামূর্তি। দৃষ্টি অগ্নিদীপ্ত, চোয়াল শক্ত, কাঁধে জমে থাকা ক্রোধ স্পষ্ট। তার উপস্থিতিতেই ঘরের ভেতর সময় থমকে গেল। আরাবীর হাত মাঝ আকাশে থেমে আছে।পায়েলের মুখে আতঙ্কের ছায়া। কারও শ্বাস নেওয়ার শব্দ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে। ঝড় এসে গেছে। মুহূর্তেই ঘরের ভারী, স্তব্ধ বাতাসে যেন বিদ্যুতের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে। দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ইলহান, রক্তিম চোখে সবার দিকে তাকিয়ে আছে। তার দৃষ্টিতে এমন দহন, যেন বহুদিনের সংযম এক নিমিষে ভস্মীভূত হয়েছে। বুকের ভেতর যেন কেউ নখ বসিয়েছে, কলিজায় হাত দিয়েছে আজ। সেই আঘাতের প্রতিশোধ সে নেবে। আজ কাউকে ছাড়বে না। ইলহান ভেতরে প্রবেশ করতেই পেছন পেছন আর্সলান, এমরিন, বিহান, রুহান ও তানভীর ঢুকে পড়ে। তাদের পদক্ষেপে তাড়াহুড়ো নেই, কিন্তু চোখেমুখে তীব্র সংকল্প। কয়েক ঘণ্টা আগেই হাসপাতাল থেকে ফোন এসেছিল, মেয়েগুলোকে কেউ তুলে নিয়ে গেছে। খবরটা পাওয়ার পর ইলহান, রুহান, তানভীর, বিহান, এক মুহূর্তও দেরি করেনি। আতঙ্কের জায়গায় জেগে উঠেছিল হিসেবি তৎপরতা। আফরিন আর নুহার হাতের ব্রেসলেটে লাগানো ট্র্যাকার তাদের পথ দেখিয়ে দিয়েছে। সেই সূত্র ধরেই বান্দরবনের নির্জন এই ঘর পর্যন্ত পৌঁছতে খুব একটা সমস্যা হয়নি।

এমরিন আর আর্সলান এসেছিল শুধু আফরিন ও নূরাইসাকে একপলক দেখবে বলে। আর তখনই জানতে পারে পুরো ঘটনার কথা। কে করেছে, তা বুঝতে তাদের বেশি সময় লাগেনি। তবে বিহান ও ইলহানের জন্য অপ্রত্যাশিত চমক ছিল, পায়েল ও আরাবী। এক মুহূর্তও নষ্ট না করে ইলহান সোজা পায়েলের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তার দৃষ্টি কঠিন, নিশ্বাস ভারী। ঘরের বাতাস যেন থমকে যায়। ঠাস! শব্দটা দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনি তোলে। ইলহানের হাতের চড়ে পায়েল ছিটকে মাটিতে পড়ে যায়। তার চুল এলোমেলো, ঠোঁটের কোণে বিস্ময় আর আতঙ্ক জমাট বেঁধে আছে। ইলহান ঝুঁকে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ে।একমুঠো চুল শক্ত করে মুঠিতে ধরে টেনে তোলে তাকে। তার কণ্ঠে দমিত ক্রোধের গর্জন—

-"কোন সাহসে আমার নূরেজানের গায়ে হাত দিয়েছিস? এই তোর কলিজা কত বড়? তোর জন্য আমার এত বছরের আদর্শ, নীতি, আজ আমি ভাঙব!"

তার কথায় কাঁপন ধরিয়ে দেওয়া অঙ্গীকার। ঘরের কোণে বাঁধা চারটি মেয়ে, ব্যথায় অবশ, তবু চোখে হঠাৎ জ্বলে ওঠে আশার ক্ষীণ আলো। অন্ধকার ঘরে ঝড় নেমেছে। আর সেই ঝড়ের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে ইলহান, প্রেম, ক্রোধ আর প্রতিশোধের এক দহনমূর্তি হয়ে। এরপর আর কোনো সংযম থাকল না।ইলহানের হাত আবারও উঠল, একটি, দু’টি, আরও কয়েকটি থাপ্পড়। প্রতিটি আঘাতে যেন জমে থাকা রাগের ঝড় বেরিয়ে আসছে। পায়েল ব্যথায় চিৎকার করে উঠল। তার সেই আর্তনাদ ঘরের দেয়ালে গিয়ে ঠেকে ফিরে আসছে, অথচ কোণের চেয়ারে বসে থাকা বয়স্ক মহিলা নির্বিকার দৃষ্টিতে সব দেখছে। তার চোখে কোনো আতঙ্ক নেই, কোনো অনুশোচনা নেই। যেন এ-ই তো সে চেয়েছিল, ইলহান নিজে থেকে ঝড় হয়ে এসে ধ্বংস ডেকে আনুক। তার হিসেবি মন বলছে, এবারই সময়। তার উদ্দেশ্য পূরণের শেষ অঙ্ক শুরু হয়ে গেছে।

অন্যদিকে বিহান দ্রুত কদমে এগিয়ে এসে আরাবীর সামনে দাঁড়াল। তার চোখে দহন, ঠোঁটে কঠিন রেখা।কোনো কথা নয়, কোনো সতর্কবার্তা নয়, সে আঘাত করতে শুরু করল। আরাবী একটিবারও নিজেকে সামলে কথা বলার সুযোগ পেল না। মুহূর্তের মধ্যেই পায়েল আর আরাবী গিয়ে পড়ল নূরাইসা ও নুহার পায়ের কাছে, অভিমানী অহংকার ভেঙে মাটিতে লুটিয়ে থাকা দুই পরাজিত ছায়া। নুহা, যার পা এতক্ষণ দড়িতে অবশ হয়ে ছিল। এক ঝটকায় আরাবীর মুখ বরাবর লাথি বসিয়ে দিল। আঘাতের শব্দে বাতাস কেঁপে উঠল। বিহান কুটিল হেসে বলল—

-"দ্যাটস মাই গার্ল!"

বিজ্ঞাপন

নুহা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু, তৃপ্তির হাসি হাসল। সেই হাসিতে ভয়ের ছায়া নেই, আছে অদম্য স্পর্ধা। এদিকে ইলহান ততক্ষণে নূরাইসার দড়ির বাঁধন খুলে ফেলেছে।তার হাত কাঁপছে, কিন্তু স্পর্শে অদ্ভুত কোমলতা।আর্সলান এগিয়ে আসতে চেয়েছিল, কিন্তু এমরিন হাত বাড়িয়ে থামিয়ে দিল। এখন ব্যক্তিগত হিসেব মেটানোর সময় নয়, এখন নিরাপত্তা আগে। আর্সলান অসহায় চোখে সব দেখছে, বুকের ভেতর জমে থাকা আবেগকে দাঁতে দাঁত চেপে আটকে রাখছে। দড়ি খোলামাত্র নূরাইসা যেন আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ঝাপিয়ে পড়ল স্বামীর বুকে। ইলহান তাকে বুকে আগলে নিল, এক নিঃশ্বাসে, এক উন্মত্ত আশ্বাসে।নূরাইসা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল—

-"আমি একদম ঠিক আছি। আমি জানতাম আপনি আসবেন। আমি একটুও ভয় পাইনি!"

ইলহান তার মুখ দু’হাতে তুলে নিল। চোখের কোণে জমে থাকা অপরাধবোধ স্পষ্ট। সে নূরাইসার কপাল, গাল, চোখের কোণে ওষ্ঠ ছুঁয়ে ফিসফিস করে বলল—

-"আই’ম সরি জান। আমি তোকে আবারও একা ফেলে চলে গিয়েছিলাম। আর যাবো না... ক্ষমা করে দে আমায়।"

নূরাইসা মাথা নাড়ল, না মানে অভিযোগ নেই, না মানে দূরত্ব নেই। তারপর আবারও তাকে জড়িয়ে ধরল, যেন এ আলিঙ্গনেই সব নিরাপত্তা, সব শান্তি। এক এক করে সবার বাধন খোলা হলো। আফরিন এগিয়ে গিয়ে তানভীরকে জড়িয়ে ধরল। এতক্ষণ ধরে রাখা শক্ত মুখভঙ্গি মুহূর্তেই ভেঙে পড়ল। তানভীর পরম স্নেহে বোনকে আগলে নিয়ে বলল—

-"ভাইয়ারা এসে গেছি। ভয় পাস না।"

অন্যদিকে রুহান উপমাকে বুকে টেনে দাঁড়িয়ে আছে।উপমা মুগ্ধ হেসে বলল—

-"আরে এত ভয় পেয়েছ কেন? আমার কিছু হতো না, তুমি তো জানো আমি কেমন!”

রুহান কড়া গলায় বলল—

-"চুপ করো সাইকোপ্যাথ! সব সময় আমাকে চিন্তায় ফেলে তুমি!"

কথায় ধমক, কিন্তু কণ্ঠে স্বস্তির কম্পন স্পষ্ট। বিহান শক্ত করে নুহাকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়েছে। নুহা তার বুকে মাথা রেখে মুচকি হেসে বলল—

-"দম আটকে আসছে তো!"

বিহান আরও শক্ত করে নুহাকে বুকে চেপে ধরে ফিসফিস করল—

-"আসুক। সব সময় নিজেকে বিপদে ফেলে আমার চিন্তা বাড়াও। এই নিয়ে কতবার কি ড ন্যা প হলে হিসেব আছে? আমার কলিজা হাতে চলে এসেছিল।তোমার কিছু হলে আমার কী হতো একবারও ভেবেছো? আমি কিভাবে থাকতাম?"

তার কণ্ঠে রাগ আছে, কিন্তু রাগের চেয়েও বেশি ভয়। হারিয়ে ফেলার ভয়।।নুহা ধীরে মাথা তুলল। বিহানের শার্টের ওপর দিয়ে তার বুকে ঠোঁট ছুঁইয়ে নরম গলায় বলল—

-"কিছুই হবে না আমার। আপনার এত সহজে মুক্তি নেই আমার থেকে।"

বিহানের চোখ ভিজে উঠল অথচ ঠোঁটে একরাশ জেদী হাসি—

-"মুক্তি চাইও না আমি। মৃ ত্যুর পরও তোমার থেকে মুক্তি চাই না।"

দূর থেকে এমরিন ও আর্সলান সব দেখছে। তাদের বুকের ভেতর যেন কেউ ধীরে ধীরে ছু রি ঘোরাচ্ছে, ভালোবাসার মানুষ এত কাছে, অথচ স্পর্শ করার অধিকার নেই। এই দূরত্বই তাদের শাস্তি। এদিকে উপমা আচমকা রুহানের আলিঙ্গন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। চুল ঠিক করে গম্ভীর মুখে বলল—

-"জেন্টালমেন্ট'স, একটু সাইড হন। এনাদের একটু আপ্যায়ন করি!"

শেষ কথাগুলো বলার সময় তার দৃষ্টি সোজা গিয়ে থামল পায়েল ও আরাবীর ওপর। ইলহান মুচকি হেসে মাথা নাড়ল—

-"অল ইয়ার্স, সিস্টার-ইন-ল’!"

উপমার ওষ্ঠে বাকা হাসি। সে এগিয়ে গিয়ে দু’জনকে শক্ত হাতে তুলে চেয়ারের সাথে বেঁধে দিল। তার চোখে অদ্ভুত ঠাণ্ডা আগুন, যে আগুন অপমান ভুলে না। সে একের পর এক চড় বসাতে লাগল। প্রতিটি আঘাতের সঙ্গে জমে থাকা ক্ষোভ বেরিয়ে আসছে। ঘরজুড়ে প্রতিধ্বনি, ভারী নিঃশ্বাস, আর আতঙ্কের ছায়া।কিছুক্ষণ পর নুহা এগিয়ে এলো। তার মুখে আর আগের মৃদু হাসি নেই, বরং দৃঢ়তা। সে আরাবীর সামনে দাঁড়িয়ে ঝুঁকে বলল—

-"আমার জামাইকে নিবি না? এ তো সখ? সখ মেটাচ্ছি আমি। খুব সখ ছিল না আমার জামাইকে পাওয়ার? যখন পেয়েছিলি তখন কদর করিসনি কেন? অবশ্য তুই কদর করলে আমি এখন তাকে পেতাম না। আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যই করে। কিন্তু তুই আমার স্বামীর দিকে আবারও হাত বাড়িয়েছিস। এবার আর তোর রক্ষা নেই।"

কথাগুলো বলেই সে কয়েকটি আঘাত করল, রাগের, অপমানের, নিজের অধিকার রক্ষার প্রতিক্রিয়া। আরাবী ব্যথায় কেঁপে উঠল, মুখ বিকৃত হয়ে গেল আতঙ্কে। হঠাৎ সে চোখ তুলে আর্সলানের দিকে তাকাল—

-"বেবি... আমাকে বাঁচাও!"

ঘরের বাতাস জমে গেল। আর্সলান ধীরে, খুব ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিল। তার চোখে আর কোনো কোমলতা নেই, শুধু ঘৃণা আর চূড়ান্ত হতাশা। সে ঠান্ডা গলায় বলল—

-"আজ যদি বেঁচে ফিরিস, তাহলে কালকেই তোকে ডিভোর্স দেব আমি। রাশিয়াতে একটা ভালো জীবন দিয়েছিলাম, সহ্য হলো না? কোন সাহসে তুই নূরাইসাকে কি ড ন্যা প করিস? ও অসুস্থ, দেখতে পাচ্ছিস না? তোর জন্য এসবই ঠিক আছে!"

আর্সলানের কথা যেন বজ্রাঘাত হলো সবাই।ঘরের বাতাস মুহূর্তে জমে গেল। নুহা অবাক দৃষ্টিতে আরাবীর দিকে তাকাল—

-"এই তো দেখি বারো ব্যাটারি! বাহ্! ভালোই জামাই বিবাহিত মেয়েকে পেতে চায়, আর বউ বিবাহিত পুরুষকে। স্বামী স্ত্রী দুটোই বারো ব্যাটারি! তোর জামাই থাকতে তুই আবার আমার জামাইর দিকে তাকাস? আজ তোর কলিজা মেপে দেখব!"

তার চোখে আগুন। সম্পর্কের জটিলতা, বিশ্বাসঘাতকতার কাঁটা, সব একসাথে ফুঁসে উঠেছে।

ওদিকে পায়েলের অবস্থাও শোচনীয়। উপমার আঘাতে সে প্রায় ভেঙে পড়েছে। কিন্তু এই বিশৃঙ্খলার মাঝেই হঠাৎ নূরাইসার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে আসে। শরীর কেঁপে ওঠে। এত কিছুর ধকল বু লে টের আঘাত, গ র্ভ পাতের যন্ত্রণা থেকে পুরোপুরি সেরে না ওঠা দেহ, তার ওপর এই মানসিক চাপ। ইলহান এক মুহূর্তও দেরি করল না। তাকে সাবধানে একটি চেয়ারে বসিয়ে দিল। তার হাত কাঁপছে, কিন্তু চোখ স্থির। চারপাশে যা-ই ঘটুক, তার দৃষ্টি ছিল সেই বয়স্ক নারীর ওপর, যে এতক্ষণ নির্লিপ্তভাবে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। মহিলার ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত হাসি। আড়ালে থাকা ফোনকলটি ইতিমধ্যেই কাজ করেছে। যা ইলহান আশঙ্কা করেছিল, তাই হলো। হঠাৎ দরজা ভেঙে একের পর এক কালো পোশাকধারী লোক ঢুকে পড়ল ঘরে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো রুম ঘিরে ফেলা হলো। ঠান্ডা ধাতব শব্দ, বন্দুকের সেফটি খোলার। সবার দিকে নিশানা তাক করলো সবাই। ঘর আবার থমকে গেল। এইবার অন্যরকম নীরবতা, মারণ। বয়স্ক নারীটি ধীরে ধীরে ঘরের মাঝখানে এগিয়ে এল। তার হাতে চকচকে অস্ত্র।সবার দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল—

-"বাস। সবাই এখন থামো। অনেকক্ষণ ধরে তোমাদের তামাশা দেখছি। এবার থামো।"

সবাই ঘুরে তাকালো। মুহূর্তের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে গেছে। নারীটি দৃঢ় পায়ে এগিয়ে গেল ইলহানের সামনে। ইলহান নিরুত্তাপ দাঁড়িয়ে আছে, চোখে ভয় নেই, কেবল হিসেব। নারীটি কুটিল হাসি হেসে বলল—

-"এরা তো চুনোপুটি। আমার লক্ষ্য তো তুই, ইলহান। এরা আমার দাবার গুটি। তোকে এখানে টেনে আনার জন্যই এদের ব্যবহার করেছি। চিন্তা করিস না, সবাই একসাথেই শেষ হবি। তোর জন্যই ওদের ভাগ্য আজ এখানেই লেখা হবে!"

নারীর প্রতিটি শব্দে স্পষ্ট রাশিয়ান উচ্চারণ। বাংলা সে অনর্গল বলছে, কিন্তু ধ্বনিতে বিদেশি কাঁটা লেগে আছে। তার ঠোঁটে শীতল হাসি, যেন বহুদিনের শিকার অবশেষে ফাঁদে ধরা পড়েছে। এই সময় এমরিন ও আর্সলান ধীরে এগিয়ে এসে তার পাশে দাঁড়াল।চারপাশে কালো পোশাকধারীরা বন্দুক তাক করে আছে। ক্ষমতার ভার যেন মুহূর্তেই পাল্টে গেছে। এমরিন গম্ভীর, রাশভারী কণ্ঠে বলল—

-"ওকে অন্যভাবেও ধরা যেত। মেয়েগুলোকে তুলে আনার প্রয়োজন ছিল না।"

নারীটি ধীরে মাথা ঘুরিয়ে এমরিনের দিকে তাকাল। তার চোখে কুটিল দীপ্তি। বলল

-"ওর জন্য আমার গ্যাং-এর কত ক্ষতি হয়েছে, তুমি জানো এমরিন। খুব ভালো করেই জানো আমি ‘প্যান্থার’, আমার বিজনেসের ক্ষতি আমি পছন্দ করি না। তোমাকে সামনে রেখেছিলাম, কিন্তু আসল লিডার আমি।"

এমরিন প্যান্টের পকেটে দুই হাত গুঁজে বুক টানটান করে দাঁড়াল। কণ্ঠ স্থির—

-"জানি।"

নারীটি আবার বলল—

-"তোমাদের দুই ভাইকে আমি এখানে পাঠিয়েছিলাম শুধু ওকে শেষ করার জন্য। আর্সলানকে বাংলাদেশে আমাদের বেইস শক্ত করতে পাঠিয়েছি। দুই ভাইকে দুই দেশের গাং-এর লিডার বানাতে চেয়েছিলাম। অথচ তোমরা আমাকে হতাশ করেছ, শুধু এই দুটি মেয়ের জন্য!"

শেষ কথাগুলো বলার সময় তার দৃষ্টি গিয়ে থামল নূরাইসা ও আফরিনের ওপর। সেই দৃষ্টিতে অবজ্ঞা, রাগ, আর ঈর্ষার ছায়া। ঘর নিস্তব্ধ। নূরাইসা চেয়ারে বসে, দুর্বল কিন্তু মাথা উঁচু। আফরিন দাঁড়িয়ে আছে তানভীরের পাশে, চোখে তীব্র প্রতিবাদ। ইলহান এতক্ষণ চুপচাপ সব শুনছিল। তার মুখে কোনো অস্থিরতা নেই, বরং অদ্ভুত স্থিরতা। ধীরে ধীরে সে সামনে এগিয়ে এলো। কালো পোশাকধারীদের বন্দুক তার বুকে তাক করা। তবু তার পায়ের গতি থামেনি। সে ঠান্ডা কণ্ঠে বলল—

-"তুমি ভুল করেছ, প্যান্থার। দাবার গুটি দিয়ে রাজাকে ফাঁদে ফেলা যায়, কিন্তু ভুলে গেছ, রাজা কখনও একা খেলে না। তুমি ভেবেছ ওরা দুর্বল? ওরা আমার শক্তি। আমার দুর্বলতা নয়। তুমি বিজনেসের ক্ষতির হিসেব করো। আমি মানুষের ক্ষতির হিসেব রাখি। আর আজকের হিসেব তোমাকেই দিতে হবে।"

ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। ব ন্দু কের নলগুলো স্থির, কিন্তু আঙুলগুলো কাঁপছে। কারণ তারা বুঝতে পারছে, এই লড়াই শুধু অস্ত্রের নয়, অহংকারেরও। দুই পক্ষ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। একপাশে ঠান্ডা, হিসেবি ক্ষমতা। অন্যপাশে ভালোবাসা, বিশ্বাস আর জেদ। ঝড় এখনও থামেনি এটা কেবল বিরতির মুহূর্ত। এখন সিদ্ধান্তের পালা। ইলহান আবারও বলল—

-"অনেক কথা বলেছো, এবার থামো। নিজের ছেলেদের নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে তোমার লজ্জা করে না? অবশ্য করবে কীভাবে, যে নিজের সন্তানদের বাবাকে হ ত্যা করতে দু’বার ভাবেনি, তার কাছ থেকে আর কী-ই বা আশা করা যায়?"

কথাগুলো ছুরি হয়ে বাতাস চিরে বেরিয়ে এলো।মুহূর্তেই ঘর নিস্তব্ধ। ঘরের ভেতর যেন বজ্রপাত হলো। এতক্ষণ ইলহানের চোখে ছিল আগুন, এখন সেখানে জমল বিস্ময় আর অমোঘ সত্যের ঝলক। তার দৃষ্টি সোজা গিয়ে থামল নারীটির মুখে। নারীটি এক পা পেছনে সরে গেল। তার দৃঢ় মুখোশে ফাটল ধরেছে। চোখে ক্ষণিক আতঙ্ক, যেনো বহু বছর ধরে চাপা রাখা গোপন ইতিহাস হঠাৎ প্রকাশ্যে উঠে এসেছে। এমরিন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। আর্সলানের মুখ ফ্যাকাশে। দু’জনের চোখ একসাথে গিয়ে পড়ল নারীর দিকে, প্রশ্নে, অবিশ্বাসে, ক্ষোভে।

-"এটা... কী বলছে ও?"

আর্সলানের গলা শুকিয়ে গেছে। কালো পোশাকধারীরা একে অপরের দিকে তাকালো। তাদের আঙুল বন্দুকের ট্রিগারে, কিন্তু মন যেন সরে গেছে এই নাটকীয় স্বীকারোক্তির দিকে। নূরাইসা দুর্বল শরীর নিয়ে চেয়ারে বসেই তাকিয়ে আছে। আফরিন তানভীরের হাত শক্ত করে ধরেছে। উপমা, নুহা, সবাই যেন নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছে।

নারীটি নিজেকে সামলে নিল। ঠোঁট শক্ত করে বলল—

-"মিথ্যা! ও তোমাদের মাথা ঘুরিয়ে দিতে চাইছে।"

কিন্তু তার কণ্ঠে আর আগের সেই নির্লিপ্ত দৃঢ়তা নেই।ইলহান ধীরে, খুব ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। তার কণ্ঠ নিচু, কিন্তু প্রতিটি শব্দ স্পষ্ট—

-"মিথ্যা? তাহলে কেন এত বছর ওদের বাবার মৃ ত্যুর সত্য লুকিয়ে রেখেছ? কেন বলেছিলে এটা ছিল ‘দুর্ঘটনা’? দুর্ঘটনা কি পরিকল্পনা করে করা হয়? কেনো ওদের বাবার আসল পরিচয় ওদের দেন নি?"

এমরিনের চোখে রক্তিম আভা ফুটে উঠছে&

-"মা...?"

একটি শব্দ। অথচ সেই শব্দে জমে আছে শৈশব, বিশ্বাস, ভাঙা আস্থা। আর্সলান এক পা এগিয়ে এল—

-"আমাদের বাবা...?"

ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। এখন আর এটা বন্দুকের মুখোমুখি দাঁড়ানোর লড়াই নয়। এটা র ক্তের সম্পর্কের ভাঙনের মুহূর্ত। নারীর চোখে কঠোরতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করল। সে বন্দুক শক্ত করে ধরল।

-"হ্যাঁ! করেছি! কারণ সে আমার শত্রু ছিল। বিজনেসের জন্য সে বাধা ছিল। আমি সাম্রাজ্য বানিয়েছি। তোমাদের জন্যই করেছি সব! আর যে জীবিত নেই তার পরিচয় জেনে কি করবে?"

কিন্তু তার স্বীকারোক্তি যেন আগুনে ঘি ঢেলে দিল।এমরিনের বুক ধকধক করছে। আর্সলানের চোখে জল চিকচিক করছে, কিন্তু মুখ শক্ত। ইলহান স্থির দাঁড়িয়ে। সে জানে, আজকের এই বিস্ফোরণ শুধু শত্রুতা নয়, পরিবার ভাঙারও শেষ অধ্যায়। ঘরের ভেতর এখন বন্দুকের চেয়েও ভারী হয়ে আছে সত্য।

বিজ্ঞাপন
সূর্যস্নাত ভালোবাসা গল্পটি নওরিন ইথিকা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ভালোবাসাময় গল্প