-"তাড়াতাড়ি করো তোমরা! বিয়ের সময় তো পার হয়ে যাবে, পৌঁছাতে পৌঁছাতে!"
-"এই তো আসছি। আমাদের হয়ে গেছে। বররা তৈরি তো? তারা নামছে না কেন?"
-"ঐ তো, নতুন বড়রা নামছে।"
দেওয়ান বাড়ি আজ উৎসবের নক্ষত্রপুঞ্জে মোড়া।আলোকসজ্জার নরম হলুদ আভা ঝরে পড়ছে ঝাড়বাতির কাঁচের দানায় দানায়, দেয়ালে টাঙানো পুরোনো ছবিগুলোও যেনো আজ হাসছে। বাতাসে আতরের মিষ্টি ঘ্রাণ, তার সঙ্গে মিশে আছে তাজা ফুলের সুরভি। চারদিকে ব্যস্ততার মৃদু কোলাহল, কারও হাতে শাড়ির আঁচল, কারও হাতে মোবাইল, কেউ শেষ মুহূর্তে গয়না ঠিক করছে, কেউ আবার অতিথিদের পথ দেখাচ্ছে। একটু পরেই বরযাত্রী রওনা দেবে। দীর্ঘ ঝড়ঝঞ্ঝা, অশান্তি আর বিপদের পর অবশেষে দেওয়ান বাড়ির আঙিনায় নেমেছে প্রশান্তির রোদ। আজ রুহান ও তানভীরের বিয়ে, এই বাড়ির বহু প্রতীক্ষিত আনন্দের দিন। ড্রয়িং রুম ভরে উঠেছে প্রতীক্ষার ভারে। সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ সিঁড়ির দিকে। যেনো সেই সিঁড়িটাই আজ সময়ের সেতু, এক প্রান্তে অতীতের দুঃসময়, আর অন্য প্রান্তে নতুন জীবনের সূচনা। ধীরে, দৃপ্ত পদক্ষেপে সিঁড়ি বেয়ে নামছে রুহান ও তানভীর।রুহানের গায়ে কালো রঙের শেরওয়ানি, গভীর, গম্ভীর, যেনো রাতের আকাশে চাঁদহীন মহিমা। আর তানভীর সোনালি শেরওয়ানিতে দীপ্ত, যেনো সকালের প্রথম সূর্যরশ্মি। তাদের দু’পাশে বিহান ও এমরিন, সাদা স্যুটে পরিপাটি, স্থির, আশ্বাসের মতো। পেছনে নেমে আসছে আফরিন ও নুহা। একই রঙের লেহেঙ্গা, সাদার ওপর রুবি পাথরের হালকা গয়না, নরম আলোয় ঝিকমিক করছে। যেনো শুভ্রতার বুক চিরে ফুটে থাকা লাল গোলাপ। তাদের পদচারণায় আছে লাজুক ছন্দ, চোখেমুখে উৎসবের আভা। ছয়জন একসঙ্গে নেমে এসে দাঁড়ালো ড্রয়িং রুমে। মুহূর্তটা যেনো স্থির হয়ে গেল। কোলাহল থেমে গিয়ে তৈরি হলো নিঃশব্দ মুগ্ধতা। মা, চাচী, ফুপুরা এগিয়ে এলেন স্নেহভরা চোখে। একে একে ছেলেমেয়েদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। কারও ঠোঁটে ফিসফিস দোয়া, কারও চোখে অশ্রুস্নাত হাসি। দুয়া-দরুদ পড়ে ফুঁ দিয়ে দিলেন, নজর লাগার ভয় থেকে রক্ষা করতে। সেই ফুঁয়ের মধ্যে ছিল আশীর্বাদ, ছিল অদৃশ্য সুরক্ষা-বলয়। ইকবাল দেওয়ান তাড়াহুড়োর স্বরে বলে উঠলেন—
-"জলদি করো, মেয়ের বাড়ির লোক অপেক্ষা করছে তো!"
তার কণ্ঠে কঠোরতা থাকলেও চোখে স্পষ্ট উত্তেজনা আর গোপন আবেগ। পাশ থেকে নাহিদ দেওয়ান প্রশ্ন করলেন—
-"ইসা ও ইলহান কোথায়?"
নুহা ও আফরিন একসঙ্গে বলল—
-"আসছে। আমাদের বেরিয়ে যেতে বলেছে। ওরা পিছে আসবে বলেছে।"
-"আচ্ছা, ঠিক আছে। চলো সবাই গাড়িতে গিয়ে বসো তাহলে।"
বাইরে গাড়ির সারি প্রস্তুত। হেডলাইটের আলো আঙিনায় লম্বা ছায়া ফেলেছে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক নতুন যাত্রার মুহূর্ত। দেওয়ান বাড়ির দরজাটা আজ শুধু একটি বাড়ির প্রবেশদ্বার নয়, এটা যেনো এক অধ্যায়ের সমাপ্তি আর আরেক অধ্যায়ের সূচনা।
.
কমিউনিটি সেন্টারের সামনে এসে একে একে গাড়িগুলো থামলো। ব্রেকের মৃদু শব্দ, হেডলাইটের আলো, আর ব্যান্ড পার্টির দূরাগত সুর মিলেমিশে এক উৎসবমুখর আবহ তৈরি করেছে। দরজা খুলে সবাই নামতে লাগলো ধীরে ধীরে, কারও হাতে ফুলের তোড়া, কারও হাতে উপহারের বাক্স। প্রবেশদ্বারজুড়ে ঝাড়বাতির ঝলমলে আভা, গাঁদা আর রজনীগন্ধার মালা খচিত খিলান, লাল কার্পেট সোজা গিয়ে মিলেছে মূল মঞ্চে। সোনালি আর মেরুন কাপড়ের পর্দায় সাজানো বিশাল স্টেজ, পেছনে সূক্ষ্ম কারুকাজ করা ব্যাকড্রপ, যেনো রাজকীয় দরবার। চারদিকে আলো এমনভাবে পড়ছে, যেনো প্রতিটি মুখের আবেগও আলোকিত হয়ে উঠছে। ভেতরে ঢুকতেই অতিথিদের কোলাহল, হাসি, শুভেচ্ছার উষ্ণতা। দেওয়ান বাড়ির সদস্যরা একে একে আসন গ্রহণ করলো। বিহান ও এমরিন মিলে তানভীর ও রুহানকে নিয়ে স্টেজে বসালো। দুই ভাই পাশাপাশি, একজন কালোর গাম্ভীর্যে, আরেকজন সোনালির দীপ্তিতে। তাদের মুখে আজ এক অদ্ভুত প্রশান্তি, দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রাপ্তির স্বস্তি।
উপমা, বাবা-মায়ের আদরের একমাত্র মেয়ে। তার বাবা মাহবুবুর মাহতাব আমেরিকায় নিজের ব্যবসা করেন, মা নাসিমা মাহতাব, স্নিগ্ধ ব্যক্তিত্বের এক শান্ত গৃহিণী।তানভীরের বিয়ে ঠিক হয়েছে ফারাহর সাথে। আশ্চর্যের হলেও এটাই সত্যি। একয় বছরে দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। সম্পর্কের প্রতি তাদের বিশ্বাস এতটাই দৃঢ় ছিল যে পরিবারকে জানানোর পর তারা একবারও দ্বিমত করেনি। তার বাবা ফয়সাল কামরান একজন প্রতিষ্ঠিত উকিল, আর মা ফারহানা বেগম একটি কলেজের প্রফেসর, অথচ মমতাময়ী ব্যক্তিত্বের অধিকারিণী।
আজ সেই বহু প্রতীক্ষিত দিন। শহরের মাঝখানে আলো ঝলমলে এক কমিউনিটি সেন্টার যেন উৎসবের আবরণে মোড়া। বাইরে থেকেই বোঝা যায়, এখানে আজ আনন্দের এক বিশেষ আয়োজন। প্রবেশদ্বারে রঙিন আলোর মালা ঝুলছে, ফুলের তোড়া আর সুগন্ধি আতরের মৃদু ঘ্রাণ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। ভেতরে ঢুকলেই মনে হয় যেন এক উজ্জ্বল, কোলাহলময় অথচ মধুর জগতে পা রাখা হয়েছে। দুই পরিবারের মানুষজন একে একে এসে জড়ো হয়েছে। ইকবাল দেওয়ান, নাহিদ দেওয়ান, নাজনীন বেগম, ইলিনা বেগম, তানিয়া বেগম এবং আফজাল শেখ, সবাই গল্পে মেতে উঠেছে।দীর্ঘদিন পর দেখা হওয়া আত্মীয়দের হাসি, গল্প আর স্মৃতিচারণায় চারপাশ ভরে উঠেছে এক উষ্ণ পারিবারিক আবহে। কেউ পুরোনো দিনের কথা বলছে, কেউ আবার নতুন সম্পর্ক নিয়ে মজা করছে। মাঝে মাঝে হাসির ঢেউ উঠছে, আবার কোথাও নরম স্বরে শুভকামনার কথাও শোনা যাচ্ছে। দাদা-দাদীর বয়স হয়েছে। তাই তাদের জন্য হলের একটু নিরিবিলি কোণে আরামদায়ক আসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।সেখানে শান্তভাবে বসে আছেন তারা, মুখে প্রশান্তির হাসি, চোখে সন্তুষ্টির দীপ্তি। তাদের পাশে বসে আছেন ফারাহ্ ও উপমার দাদা-দাদী, নানা-নানীরাও। বয়সের ভারে শরীর ধীর হয়ে এলেও হৃদয়ের উচ্ছ্বাস যেন আজ আবার তরুণ হয়ে উঠেছে। তারা মৃদু স্বরে গল্প করছেন, মাঝেমধ্যে চারপাশের ব্যস্ততা আর সাজসজ্জার দিকে তাকিয়ে হাসছেন। চোখেমুখে স্পষ্ট, পরিবারের নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে, আর সেই দৃশ্য দেখার আনন্দ তাদের মনে গভীর তৃপ্তি এনে দিয়েছে।
এদিকে দুই কনেকেই আলাদা দুটি সুসজ্জিত কক্ষে বসানো হয়েছে। উপমার ঘরটি যেন স্বপ্নের মতো সাজানো। নরম গোলাপি আলো ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, বিছানাজুড়ে সাদা ফুলের পাপড়ি যেন শান্ত কোনো বসন্তের আভাস দিচ্ছে। আয়নার সামনে বসে আছে সে, লাল বেনারসিতে আবৃত, কপালে ঝলমলে টিকলি, গলায় আর হাতে গয়নার মৃদু ঝংকার। তার ঠোঁটে হালকা কম্পন, চোখে লাজুক স্বপ্নের ছায়া। মনে হচ্ছে সে যেন নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে নতুন জীবনের এক অচেনা দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরে ভেতরে অজানা এক কাঁপুনি কাজ করছে, লজ্জা, আনন্দ আর অল্প একটু অচেনা আশঙ্কার মিশ্র অনুভূতি। অন্য ঘরে বসে আছে ফারাহ্। তার সাজেও রাজকীয় ছোঁয়া স্পষ্ট। গাঢ় রঙের লেহেঙ্গায় সে যেন রাতের আকাশে জ্বলে ওঠা উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো।গয়নার আলো তার চারপাশে ঝলমল করছে, যেন প্রতিটি রত্ন আজকের মুহূর্তটিকে আরও মহিমান্বিত করে তুলতে চায়। ঘরের বাতাসেও এক অদ্ভুত আবেগ জমে আছে, একদিকে আনন্দ, অন্যদিকে নতুন জীবনের অজানা পথে পা রাখার নিঃশব্দ উত্তেজনা।
.
এদিকে হলঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে বিহান ও নুহা। চারপাশের কোলাহল, হাসি আর আলো ঝলমলের মাঝেও যেন তাদের দু’জনকে ঘিরে এক আলাদা নীরবতা তৈরি হয়েছে। মানুষের ভিড় আছে, সুর বাজছে, আলো ঝিকিমিকি করছে, তবু তারা যেন আলাদা এক ছোট্ট জগতে রয়েছে। নুহার ওড়নার প্রান্ত হালকা বাতাসে ভেসে উঠে এসে আলতো করে ছুঁয়ে গেল বিহানের কাঁধ। বিহানের চোখ থমকে রয়েছে নুহার মুখের দিকে। আজ তাকে যেন অন্য এক আলোয় দেখা যাচ্ছে, নরম, শান্ত, তবু অদ্ভুত সুন্দর।বিহান একটু ঝুঁকে নরম স্বরে ফিসফিস করে বলল—
-"আজ তোমাকে অন্যরকম লাগছে... যেন এই হলের সব আলো, সব রঙ, সব উৎসব এসে তোমার চারপাশেই থেমে গেছে। আর আমি শুধু দাঁড়িয়ে তোমাকে দেখছি।"
নুহা ভ্রু একটু তুলল, ঠোঁটের কোণে দুষ্টু একটা হাসি ফুটে উঠল।
-"অন্যরকম মানে?"
বিহান তার দিকে আরেকটু তাকিয়ে রইল, চোখে মৃদু মুগ্ধতা। বলল—
-"মানে... যেন আজকের রাতটাই তোমাকে ঘিরে সাজানো। আর আমি... আমি শুধু সেই সৌন্দর্যের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন ভাগ্যবান দর্শক।"
নুহা লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে ফেলল। গাল হালকা লাল হয়ে উঠেছে। লজ্জা মিশ্রিত কন্ঠে বলল—
-"আপনি না থাকলে... আলোও হয়তো এত উজ্জ্বল লাগত না।"
বিহান একটু ঝুঁকে এল, যেন কথাগুলো শুধু নুহার কানেই পৌঁছায়। ফিসফিস করে বলল—
-"চলো, তোমাকে আরেকবার বিয়ে করি।"
নুহা অবাক হয়ে তাকাল। বিহান নরম গলায় বলল—
-"প্রথম বিয়েটা তো হঠাৎ, অপ্রস্তুত আর একটু এলোমেলো ছিল। এবার না হয়... মন ভরে, ইচ্ছা করে, ভালোবাসা দিয়ে আবার বিয়ে করি। শুধু তুমি আর আমি... আমাদের মত করে।"
নুহা মুখ ভেংচি কেটে বলল—
-"বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরেছে নাকি? একবার বিয়ে হয়েছে, তাতেই যথেষ্ট। আবার এত আয়োজন করার দরকার নেই।"
বিহান মুখটা একটু বেজার করে বলল—
-"আমাদের তো বাসরই হয়নি!"
নুহার চোখ কপালে উঠে গেল। সে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল বিহানের দিকে।
-"কি বললেন আপনি?"
বিহান খুব গম্ভীর মুখ করে বলল—
-"আরে বিয়ের পর যে বাসর রাত হয়, সেইটা তো আমাদের ঠিকমতো হয়নি। তাই ভাবছি, সেই অভাবটা মেটাতে হলেও আবার বিয়ে করা উচিত।"
নুহা হতবিহ্বল গলায় বলে উঠল—
-"বাসর না হলে, পেটে উনি এলেন কিভাবে?"
বিহান হালকা হেসে বলল—
-"ওটা তো আলাদা গল্প। কিন্তু বাসরের জন্য একটা ঠিকঠাক বিয়ে তো পাওনা থাকলই।"
নুহা লজ্জায়, রাগে, অপ্রস্তুত হয়ে মুখটা লাল করে ফেলল।
-"আপনার বিয়ে আপনি করুন গিয়ে!"
বলেই সে মুখ ভেংচি কেটে দ্রুত পা চালিয়ে সরে গেল।বিহান সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল, ঠোঁটে মিটমিটে হাসি।চোখে দুষ্টু মুগ্ধতা। আজ মেয়েটাকে সে বড্ড বেশি লজ্জা দিয়ে ফেলেছে। তার চোখ ধীরে ধীরে নেমে এল নুহার পেটের দিকে, যেখানে তাদের ভালোবাসার ছোট্ট অস্তিত্ব নীরবে বেড়ে উঠছে। ভাবতেই বিহানের ভেতরে এক অদ্ভুত, গভীর অনুভূতি জেগে উঠল। যাকে একসময় নিজের জীবন থেকে দূরে সরিয়েখতে চেয়েছিল, আজ সেই মানুষটাকে ছাড়া তার এক মুহূর্তও চলে না। ভাবে যায়? তার ছোট্ট নীলপদ্ম। আর সেই নীলপদ্মের গর্ভেই এখন ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে তার পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় অংশ।
.
আফরিন ও এমরিন স্টেজের অন্য পাশে দাঁড়িয়ে দুই ভাইয়ের হাস্যোজ্জ্বল মুখশ্রী দেখছে। চারদিকে আলো, মানুষের ভিড় আর আনন্দের কোলাহল, তবু তাদের দু’জনের চারপাশে যেন এক অদৃশ্য নীরবতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু এমরিনের দৃষ্টি আটকে আছে আফরিনের উপরেই। আফরিনের কানে ঝুলে থাকা রুবি পাথরের দুল আলোয় ঝিকমিক করছে।ঝাড়বাতির সাদা আলো পড়ে লাল পাথরগুলো যেন আগুনের ছোট্ট শিখার মতো দীপ্তি ছড়াচ্ছে। এমরিন মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, এমনভাবে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান দৃশ্যটি সে চোখে ধরে রাখতে চায়।আফরিন তা টের পেয়ে কপট বিরক্তি দেখিয়ে বলল—
-"এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?"
এমরিনের ঠোঁটে ধীরে ধীরে এক মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
-"ভাবছি... যদি আজকের রাতটা থেমে যেত।"
আফরিন ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
-"কেন?"
এমরিন একটু ঝুঁকে এল, চোখে দুষ্টু মুগ্ধতা।
-"কারণ আজ তোমায় এতটাই সুন্দর লাগছে, যে মনে হচ্ছে এই মুহূর্তটা ধরে রাখতে পারলে ভালো হতো।কাল আবার তুমি সেই সাধারণ আফরিন হয়ে যাবে না তো?"
আফরিন সঙ্গে সঙ্গে মৃদু ধাক্কা দিল তাকে।
-"সাধারণ আমিকে ভালো লাগে না আপনার?"
এমরিন এবার একটু গম্ভীর হয়ে তার দিকে তাকাল।কণ্ঠ নরম হয়ে এলো। বলল—
-"তোমাকে সব রূপেই ভালো লাগে, কারিনো। সাজে, অসাজে, হাসিতে, রাগে.. এমনকি যখন তুমি আমার দিকে তাকিয়ে মুখ ভেংচাও তখনও।"
কথাটা শুনে আফরিনের গাল হালকা লাল হয়ে উঠল।সে চোখ সরিয়ে নিল, কিন্তু ঠোঁটের কোণে লুকোনো হাসি ধরা পড়ে গেল। এদিকে স্টেজে বসে রুহান চারদিকে একবার তাকালো। এত মানুষের ভিড়, এত আলো, এত শব্দ, তবু তার চোখ যেন খুঁজে নিল উপমার কক্ষের দিকটা। দূরে কোথাও বসে আছে তার হবু স্ত্রী। মনে হলো যেন দূরত্ব সত্ত্বেও সে অনুভব করতে পারছে, উপমাও ঠিক এই মুহূর্তে তার জন্যই অপেক্ষা করছে। তানভীরও ধীরে একবার দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল।দুজনেই যেন চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করছে, নিজেদের প্রিয় মানুষটাকে এক ঝলক দেখার জন্য।আজকের এই সাজ, এই আয়োজন, এই আলোর ঝলক, সবই যেন তাদের জীবনের নতুন অধ্যায়ের প্রথম পৃষ্ঠা।
.
ইলহানের ঘরজুড়ে নরম হলুদ আলো ছড়িয়ে আছে।আলোটা যেন দেয়াল ছুঁয়ে ছুঁয়ে নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ছে মেঝের ওপর। ঘরের পরিবেশে একধরনের উষ্ণতা, ঘরোয়া, আপন, মায়ামাখা। বিছানার ওপর যত্ন করে ছড়িয়ে রাখা একটি এমারেল্ড গ্রিন রঙের শাড়ি।শাড়ির মসৃণ কাপড়ে আলো পড়ে হালকা ঝিলিক দিচ্ছে। তার ঠিক পাশেই রাখা একটি কালো রঙের স্যুট, পরিপাটি, নিখুঁতভাবে ইস্ত্রি করা। বিছানার পাশের ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ইলহান। তার সামনে একটি ছোট্ট তিন বছরের বাচ্চা ছেলে। ইলহান খুব মনোযোগ দিয়ে বাচ্চাটিকে তৈরি করছে, যেন এটি কোনো সাধারণ সাজ নয়, বরং তার কাছে এক বিশেষ মুহূর্ত। অত্যন্ত যত্নের সাথে সে বাচ্চাটির কালো স্যুটের টাই বেঁধে দিল। ছোট্ট আঙুলগুলো মাঝে মাঝে নড়ে উঠছে, আর সে ধৈর্য নিয়ে আবার ঠিক করে দিচ্ছে।তারপর জেল নিয়ে ছেলেটির ঘন, সিল্কি কালো চুলগুলো আলতো করে সেট করে দিল। সবকিছু শেষ হলে ইলহান নিচু হয়ে বাচ্চাটির ছোট্ট পায়ে কালো জুতো পরিয়ে দিল। তারপর তাকে আলতো করে তুলে আয়নার সামনে দাঁড় করালো। আয়নার ভেতর দু’জনের প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠলো, একজন পূর্ণবয়স্ক পুরুষ, আর তার পাশে ছোট্ট এক প্রতিচ্ছবি, যেন তারই ছোট সংস্করণ। শিশুটি তার বিস্ফারিত বাদামি ডাগর চোখ দুটি মেলে আয়নার দিকে নিবিষ্ট দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কয়েক মুহূর্তের নীরবতার পর আয়নার প্রতিচ্ছবিতে ইলহানের মুখের দিকে তাকিয়ে তার ছোট ছোট পোকায় কাটা দাঁতগুলো দেখা দিল। শিশুটি নিষ্পাপ উচ্ছ্বাসে ঠোঁট মেলে মধুর হাসি হাসল, সেই হাসির আলোয় মুহূর্তটুকু কোমল স্নেহে ভরে উঠল। সেই হাসি যেন মুহূর্তের মধ্যেই ঘরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা আলোকে আরও উজ্জ্বল, আরও প্রাণময় করে তুলল।ইলহানের চোখে তখন নেমে এলো অদ্ভুত এক স্নিগ্ধ কোমলতা, যেন কঠোরতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা গভীর স্নেহ হঠাৎই মুখ তুলে দাঁড়িয়েছে। সে ধীরে ঝুঁকে শিশুটির টসটসে তামাটে বর্ণের গালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল, পরপর দু’টি স্নেহভরা চুমু রেখে দিলো। ঠিক সেই মুহূর্তেই পেছন দিক থেকে এক রমণীর ব্যস্ত, খানিক তাড়াহুড়োর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো—
-"বাবা ছেলের হয়ে থাকলে এবার একটু সরুন আমি ও তো সাজবো নাকি!"
কণ্ঠস্বরটি কানে পৌঁছাতেই ইলহান ও শিশুটি একই সাথে ঘুরে পেছনের দিকে তাকাল। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে নূরাইসা। সে ধীরে ধীরে এমারেল্ড-সবুজ শাড়ির আঁচলটি ঠিক করে নিচ্ছে। ঘরের মোলায়েম আলোয় শাড়িটির রঙ যেন আরও গভীর, আরও জীবন্ত হয়ে উঠেছে। গলায় হালকা স্বর্ণের সরু হার, কানে ছোট দুল, নাকে টুকটুকে নাকফুল, সব মিলিয়ে তার সাজে ফুটে উঠেছে এক অনাড়ম্বর, মার্জিত সৌন্দর্য। তার লম্বা, খোলা কালো চুলগুলো সামান্য এলোমেলো হয়ে কাঁধ বেয়ে নেমে এসেছে। জানালা দিয়ে ঢুকে পড়া কোমল বাতাসে সেগুলো ধীরে ধীরে দুলে উঠছে। মুহূর্তটি যেন এক অদ্ভুত নীরবতায় স্থির হয়ে গেল, সময়ও যেন এক নিঃশ্বাসের জন্য থেমে রইল। নূরাইসাকে দেখামাত্রই ইলহান আর ছোট্ট ছেলেটি একই সঙ্গে বুকের ওপর হাত রেখে বিস্ময়ভরা উচ্ছ্বাসে বলে উঠল—
-"হায় মে মার জাওয়ানা।"
নূরাইসা ভ্রু কুঁচকে তাদের দিকে তাকিয়ে বলল—
-"ঢং সরুণ তো দেরি হয়ে যাচ্ছে!"
তার কণ্ঠে হালকা বিরক্তি থাকলেও চোখে ছিল মিষ্টি এক তাড়াহুড়োর ঝিলিক। এই দুই বাবা–ছেলের নাটক না থাকলে অনেক আগেই সবার সাথে বেরিয়ে পড়তে পারতো। ইলহান ছেলেকে কোলে তুলে নিয়ে একটু সরে দাঁড়াল। মুখে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠেছে। সে নাহিয়ানের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল—
-"তোর মা আজকে আমাকে মেরে ফেলার পাঁয়তারা করছে বুঝলি নাহিয়ান!"
নাহিয়ান তার ছোট্ট ফোকলা দাঁতগুলো বের করে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে সরল কণ্ঠে বলল—
-"মাকে সুন্ডল লাগচে বাবা!"
ছেলের কথা শুনে ইলহানের মুখে গর্বিত হাসি ফুটে উঠল। সে আলতো করে নাহিয়ানের গাল দুটো চেপে ধরে বলল—
-"তোর মা জন্মগত সুন্দর বেটা। শুধু মাঝে মাঝে আরও বেশি সুন্দর করে সাজে আমাকে মারতে। দেখ বেটা আমার বুকের ভেতর হৃদয় নামক যন্ত্র কত জোরে দৌড়াচ্ছে!"
নাহিয়ান কৌতূহলী চোখে বাবার বুকের দিকে তাকিয়ে বলল—
-"কুতায় দৌলাচ্ছে দিখি না তো!"
ইলহান নাটকীয় ভঙ্গিতে নিজের বুকের দিকে আঙুল তাক করে বলল—
-"এইযে এখানে দেখ দেখ!"
নাহিয়ান বাবার কোলে একটু ঝুঁকে পড়ে গভীর মনোযোগে দেখার চেষ্টা করল। কৌতূহলে তার ছোট্ট চোখ দুটো যেন আরও বিস্ফারিত হয়ে উঠল। কিন্তু বুকের ভেতরে লুকিয়ে থাকা হৃদযন্ত্র কি আর বাইরে থেকে দেখা যায়? নিষ্পাপ নাহিয়ান তা জানলে তো!ওদিকে নূরাইসা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো নিজের সাজগোজটুকু গুছিয়ে নিচ্ছে। ঠোঁটে আলতো লাল আভা মাখা লিপস্টিক, চোখের পাপড়িতে পাতলা করে টানা কাজল। খুব বেশি আড়ম্বর নয়, তবুও তার ভেতর থেকে যেন এক অদ্ভুত কোমল সৌন্দর্য ঝরে পড়ছে, নির্লিপ্ত অথচ মুগ্ধকর। সে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। শান্ত দৃষ্টিতে ইলহানের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল—
-"কেমন লাগছে আমাকে?"
প্রশ্নটি ছিল খুবই সাধারণ, তবু তার চোখের গভীরে লুকিয়ে ছিল এক ফোঁটা নীরব প্রত্যাশা। ইলহান কয়েক সেকেন্ড নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল তার দিকে। দৃষ্টি যেন নূরাইসার উপরেই স্থির হয়ে গেল, মনে হলো, সেই মুহূর্তে পৃথিবীর অন্য সবকিছু তার কাছে ম্লান। তারপর এক অদ্ভুত মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন কণ্ঠে ধীরে বলল—
-"আমার লাগছে! নুহান ইলহান দেওয়ানের বউ লাগছে... আমার হৃদয় হরণকারী লাগছে।"
কথাগুলো শুনে নূরাইসার গাল দুটো মুহূর্তেই লালচে আভায় রাঙা হয়ে উঠল। বিয়ের এতগুলো বছর পেরিয়ে গেলেও এই মানুষটা তাকে লজ্জা দিতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করে না। ইলহান ধীরে নাহিয়ানকে কোলে থেকে নামিয়ে খাটের ওপর দাঁড় করিয়ে দিল। তারপর একটু ঝুঁকে এসে গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল—
-"চোখ বন্ধ রাখবি নাহিয়ান। আমি না বলা পর্যন্ত খুলবি না ওকে?"
নাহিয়ান বাধ্য ছেলের মতো চোখ শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল।
-"ওককে!"
ঘরের ভেতর তখন অদ্ভুত এক দুষ্টু, উষ্ণ আর ভালোবাসায় ভরা পরিবেশ ছড়িয়ে পড়েছে। নাহিয়ান দুই হাত দিয়ে শক্ত করে নিজের চোখ ঢেকে রাখল।ছোট্ট আঙুলগুলোর ফাঁক দিয়ে যেন কৌতূহল উঁকি দিতে চাইছে, তবুও বাবার কথা মতো সে চোখ বন্ধ রেখেই দাঁড়িয়ে রইল। ওদিকে ইলহান ধীর পায়ে নূরাইসার দিকে এগিয়ে গেল। নূরাইসা তাকে এগিয়ে আসতে দেখে লজ্জায় কয়েক পা পিছিয়ে গেল। তার গাল দুটোতে লাল আভা ফুটে উঠেছে। মনে হচ্ছিল, এই কয়েক মুহূর্তেই ঘরের বাতাস যেন আরও নরম হয়ে গেছে। কিন্তু ইলহান থামার মানুষ নয়। সে এগিয়ে এসে নূরাইসার কোমরে দুই হাত রেখে আলতো টানে তাকে নিজের কাছে টেনে নিল, একেবারে বুকের সাথে মিশিয়ে। তার চোখে তখন গভীর মুগ্ধতা। সে নরম স্বরে বলল—
-"তুই দিন দিন আরো সুন্দর হচ্ছি বেবি। নাহিয়ান হওয়ার পর থেকে তোর সৌন্দর্য যেন আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। তোর এই লজ্জায় রাঙ্গা মুখশ্রী আমাকে বারংবার বেসামাল করে তোলে ব্লাডমুন!"
নূরাইসা লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল। তবুও মুখে সামান্য প্রতিবাদের সুর এনে বলল—
-"ছাড়ুন কি করছেন ছেলে ঘরে আছে তো!"
ইলহান মৃদু হেসে তার দিকে তাকাল। চোখে দুষ্টুমি খেলা করছে।
-"থাকুক। আর কতদিন একা থাকবে? ওর ভাইবোন নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে হবে না?"
নূরাইসা সঙ্গে সঙ্গেই চোখ পাকিয়ে তার দিকে তাকাল। সেই চোখ রাঙানোটাও যেন ইলহানের কাছে অদ্ভুত এক মাধুর্যে ভরা। তার ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসির রেখা ফুটে উঠল। ইলহান আলতো করে একটু ঝুঁকে নূরাইসার নাকে ছোট্ট এক চুমু এঁকে দিল। তারপর ধীরে তার থুতনিতেও রেখে দিল আরেকটি স্নিগ্ধ চুম্বন। নূরাইসা লজ্জায় নিঃশ্বাস আটকে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, চোখ নামানো, গাল দুটো হালকা রাঙা। এরপর ইলহান ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো তার অধরের দিকে, যেন সেই ক্ষণিক দূরত্বটুকুও ধীরে ধীরে মুছে ফেলতে চাইছে। মুহূর্তটা যেন নিজেই নিঃশব্দ হয়ে পড়ল, ঘরের নরম হলুদ আলো, জানালা দিয়ে ঢুকে পড়া হালকা বাতাসে দুলে ওঠা পর্দা, আর দুই মানুষের নীরব কাছাকাছি আসা, সব মিলিয়ে চারপাশে তৈরি হলো এক গভীর, নরম আবেগে মোড়া স্থিরতা; যেন সময়ও সেখানে একটু থেমে গেছে।
.
রাত ঠিক আটটা। আলোয় ঝলমল করা কমিউনিটি সেন্টারের প্রবেশপথে এসে থামল গাড়ি। গাড়ি থেকে নামল ইলহান, তার পাশে নূরাইসা, কোলে তাদের আদরের ছেলে নাহিয়ান। বাবা ছেলে একই পোশাকে। যেনো ইলহানের কলে ছোট্ট আর এক ইলহান। নাহিয়ানকে দেখামাত্রই যেন আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল চারদিকে। সকলেই মুহূর্তের মধ্যে ছোট্ট নাহিয়ানকে ঘিরে ধরলেন। কারও মুখে হাসি, কারও চোখে জলমিশ্রিত স্নেহ। নাহিয়ান যে শুধু একটি শিশু নয়, সে এই পরিবারের অমূল্য আশীর্বাদ। নূরাইসা গু লি বিদ্ধ হওয়ার পর তার আবার মা হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। চিকিৎসকদের কণ্ঠেও ছিল শঙ্কা। দীর্ঘ দেড় বছরের অপেক্ষা, প্রার্থনা আর আতঙ্কের পরে যখন নাহিয়ান তার গর্ভে আসে, তখনও মা ও সন্তানের জীবন নিয়ে ছিল অসংখ্য ঝুঁকি। সেই কঠিন সময় পেরিয়ে আজ নাহিয়ান সুস্থভাবে সবার সামনে, তাই তো সে এই পরিবারের চোখের মণি, হৃদয়ের সবচেয়ে নরম জায়গা। ভাতিজাকে পেয়ে নতুন জামাই রুহান আর তানভীর যেন নিজেদের আনন্দ সামলাতে পারল না। স্টেজে বসে থাকা অবস্থাতেই দুজন একসাথে নেমে এল। মুহূর্তের মধ্যেই নাহিয়ানকে কাঁধে তুলে নিয়ে তারা পুরো হলজুড়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল। শিশুটির হাসি আর খিলখিল শব্দে যেন চারপাশের বাতাস আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
হলের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল বিহান, ইলহান এবং এমরিন। তাদের মুখে গাম্ভীর্যের ছাপ, তারা নিজেদের মধ্যে ব্যবসা সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করছিল। এমরিনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এখন আগের চেয়ে অনেকটাই স্বাভাবিক, অনেকটাই উষ্ণ। সময় যেন ধীরে ধীরে ভুল বোঝাবুঝির দেয়ালগুলো ভেঙে দিয়েছে। তবু কোথাও একটা অপূর্ণতার ছায়া রয়ে গেছে। দুই ভাইই বাবা-মায়ের প্রকৃত ভালোবাসা কখনো পায়নি। এমরিন একসময় আলাদা হয়ে থাকার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিল, কিন্তু দাদার প্রতি শ্রদ্ধা আর অগাধ ভালোবাসা তাকে দেওয়ান বাড়িতেই থাকতে বাধ্য করেছে।
এদিকে অন্য প্রান্তে চলছে আরেকটি আয়োজন।আফরিন, নুহা এবং নূরাইসা গিয়েছিল বউ দেখতে। যত্ন করে সাজিয়ে দুই নববধূকে আলাদা দুটি ঘরে বসিয়ে রাখা হয়েছে। এখন তাদের স্টেজে নিয়ে আসার পালা। কিছুক্ষণ পর তিনজন একসাথে ফিরে এল।মাঝখানে দুই লাজুক নববধূ, উপমা এবং ফারাহ।হলের উজ্জ্বল আলোয় তাদের সাজ যেন আরও দীপ্ত হয়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে তারা যেন জীবন্ত কোনো রূপকথার দৃশ্য। স্টেজে বসে থাকা রুহান ও তানভীর মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। চোখের পলক ফেলতেও যেন ভুলে গেল তারা। কখন যে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে, তা তারা নিজেরাও টের পেল না। নূরাইসা, আফরিন আর নুহা ধীরে ধীরে উপমা ও ফারাহকে নিয়ে এসে তাদের সামনে দাঁড় করাল। উপমা একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে রুহানের দিকে, চোখে বিস্ময়, আবেগ আর এক অদ্ভুত অচেনা টান। অন্যদিকে ফারাহ্ লজ্জায় মাথা নিচু করে রেখেছে। তানভীরের দিকে তাকানোর সাহসটুকুও যেন পাচ্ছে না সে। চারপাশের কোলাহল, হাসি, আলো, সবকিছুর মাঝেও সেই মুহূর্তটা যেন থেমে গেল কয়েক সেকেন্ডের জন্য।নূরাইসা রুহানের পাশে এসে দাঁড়াল। তার চোখে দুষ্টুমি মেশানো মুগ্ধতা। বিস্মিত কণ্ঠে সে বলল—
-"ভাইয়া... তুমি কাঁদছো?"
নূরাইসার কণ্ঠে ছিল বিস্ময় আর মমতার মিশেল।সবার চোখ তখন গিয়ে পড়েছে রুহান-এর দিকে।উপমাকে বউ সাজে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার চোখের কোণে জমে ওঠা অশ্রু আর লুকিয়ে রাখা গেল না। আনমনে, নিঃশব্দেই টুপটাপ গড়িয়ে পড়ছে সেই অশ্রুবিন্দু। বহু বছরের অপেক্ষা, অগণিত স্মৃতি, আর অদৃশ্য কত প্রতীক্ষার রাত, সবকিছু মিলিয়ে আজ সেই দীর্ঘ পথের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে সে। আজ উপমা সত্যিই তার বউ হতে চলেছে। নূরাইসার প্রশ্নের কোনো জবাব দিল না রুহান। ধীর পায়ে সে এগিয়ে এল উপমার সামনে। তারপর হঠাৎই সবার বিস্ময়ের মাঝেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল তার সামনে। চারপাশের আলো, মানুষের গুঞ্জন, সবকিছু যেন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। রুহান আস্তে করে নিজের হাত বাড়িয়ে দিল। উপমার কাঁপতে থাকা হাতটি নিজের হাতে তুলে নিল সে। তারপর সেই হাতের পিঠে পরপর কয়েকটি চুমু খেল। তারপর, নিজের ভেজা দুই চোখে আলতো করে ছুঁইয়ে দিল সেই হাত। যেন সে নিজের সমস্ত অশ্রু, সমস্ত অনুভূতি সেই স্পর্শে উপমার হাতে তুলে দিল। স্পর্শটুকুতেই কেঁপে উঠল উপমার সর্বাঙ্গ। বুকের ভেতর হঠাৎ করে যেন ঢেউ উঠল অজানা এক আবেগের। চোখ ভিজে উঠল তারও। ঠিক সেই মুহূর্তেই অন্য পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তানভীর একইভাবে হাঁটু গেড়ে বসল ফারাহ-এর সামনে। একই দৃশ্য। একই আবেগ। দুই ভাই, দুই প্রেম, একই সাথে। সেই মুহূর্তে যেন সবাই উপলব্ধি করল, ভালোবাসা কখনো শব্দে নয়, অনুভূতিতেই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চারপাশে ফিসফিস করে উঠল মুগ্ধতার সুর। কারও ঠোঁটে হাসি, কারও চোখে অশ্রু। এরপর ধীরে ধীরে দুই জোড়া দম্পতি উঠে এসে নির্ধারিত আসনে বসে পড়ল। এবার বিয়ে পড়ানোর পালা। কাজী সাহেব ইতোমধ্যেই সব কাগজপত্র গুছিয়ে নিয়েছেন। সামনে খোলা রেজিস্টার, পাশে কলম। চারপাশের পরিবেশ ধীরে ধীরে গম্ভীর হয়ে উঠছে। ঠিক সেই সময়, বিয়ে পড়ানোর মুহূর্তে হঠাৎই রুহান চারপাশে তাকিয়ে বলল—
-"ভাইয়া কোথায়?"
মুহূর্তের মধ্যে যেন পরিবেশের আবহ বদলে গেল।এতক্ষণ যাদের মুখে ছিল আনন্দের ঝলক, সেখানে হালকা উদ্বেগের ছায়া নেমে এল। সবাই একে অন্যের দিকে তাকাতে লাগল। এই তো কিছুক্ষণ আগেও ইলহান, বিহান আর এমরিন এখানেই ছিল। তবে হঠাৎ তারা কোথায় গেল? ঠিক তখনই, হলের পেছন দিক থেকে ভেসে এল কয়েকটি পায়ের শব্দ। ধীর, কিন্তু স্পষ্ট। সবাই একসাথে পেছনে ঘুরে তাকাল। দেখা গেল, তিনজন পাশাপাশি হেঁটে এগিয়ে আসছে। তাদের দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল আফরিন। সে বলে উঠল—
-"ঐ তো ভাইয়ারা চলে এসেছে!"
মুহূর্তের মধ্যেই বিহান, ইলহান এবং এমরিন স্টেজের ওপর উঠে এল। রুহান আর তানভীর একসাথে প্রশ্ন করল—
-"কোথায় গিয়েছিলে তোমরা?"
ইলহান কিছুক্ষণ কোনো উত্তর দিল না। প্রথমে সে তাকাল ইকবাল দেওয়ান-এর কোলে ঘুমিয়ে থাকা ছোট্ট নাহিয়ান-এর দিকে। শিশুটির মুখে নিশ্চিন্ত ঘুমের শান্তি। সেই দৃশ্য দেখে তার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে উঠল। তারপর ধীরে, গভীর কণ্ঠে বলল—
-"পরিবারের সদস্য ছাড়া কি কোনো অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ হয়?"
কথাটা শুনে অবাক হয়ে গেল সবাই। নাহিদ দেওয়ান ভ্রু কুঁচকে বললেন—
-"সবাই তো এখানে!"
ইলহানের ঠোঁটে তখন রহস্যময় এক হাসি। সে ধীরে ধীরে বলল—
-"একজন বাকি ছিল... তাকেই আনতে গিয়েছিলাম।"
তারপর হলের প্রবেশপথের দিকে তাকিয়ে ইশারা করে বলল—
-"ঐ যে... এসে গেছে।"
আর সেই মুহূর্তেই আবার একসাথে ঘুরে তাকাল পুরো হল, দরজার দিকে। ধীর পায়ে, নতমস্তকে হলঘরে প্রবেশ করল আর্সলান। মুহূর্তের মধ্যে যেন পুরো পরিবেশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কোলাহলে ভরা কমিউনিটি সেন্টারটিও হঠাৎ করে থমকে দাঁড়াল সেই দৃশ্যের সামনে। ঝলমলে আলোয় ভরা স্টেজ, মানুষের গুঞ্জন, বিয়ের আনন্দ, সবকিছুর মাঝেও যেন এক অদ্ভুত স্তব্ধতা নেমে এলো। সবার দৃষ্টি একসাথে গিয়ে স্থির হলো দরজার দিকে। কেউ বিস্ময়ে, কেউ অবিশ্বাসে, কেউবা শ্বাসরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। আর্সলান ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে আসছে। মাথা নত, চোখে অপরাধবোধের ছায়া, পদক্ষেপে যেন ভারী এক অনুতাপের বোঝা। স্টেজের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সবাই হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে। প্রথমে নীরবতা ভাঙলেন ইকবাল দেওয়ান। ছেলের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে অবিশ্বাসভরা কণ্ঠে বললেন—
-"কিভাবে?"
প্রশ্নটা ছিল ছোট, কিন্তু তার ভেতরে ছিল বিস্ময়, সংশয় আর অগণিত অনুভূতির ভার। সবার চোখ তখন গিয়ে থামল ইলহান-এর ওপর। ইলহান শান্ত, স্থির। যেন সবকিছু আগেই ভেবে রাখা। সে ধীর স্বরে বলল—
-"বিশেষ আবেদন করে ওকে এখানে এনেছি। আমার চাচুর অংশ ও। যত অন্যায়ই করুক, আমাদের পরিবারের সদস্য তো সে-ও। ওকে ছাড়া এই আনন্দের মুহূর্ত আমরা কিভাবে উপভোগ করতাম?"
একটু থেমে আবার বলল—
-"ও যা অন্যায় করেছে, তার শাস্তিও তো সে পাচ্ছে, বাবা।"
কথাগুলো যেন নিঃশব্দে গিয়ে আঘাত করল সবার হৃদয়ে। এক মুহূর্তের জন্য কেউ কোনো কথা বলতে পারল না। হলের বাতাসে ভেসে উঠল আবেগের ভার।সবার চোখ ছলছল করে উঠেছে। কেউ গোপনে চোখ মুছছে, কেউ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইলহানের দিকে। এই ছেলেটা যেন বারবার সবাইকে অবাক করে দেয়। কারও প্রতি তার দৃষ্টি এড়ায় না, কারও কষ্ট সে অগ্রাহ্য করে না। সবকিছু যেন আগেই ভেবে রাখে সে, এক অদ্ভুত প্রজ্ঞা আর হৃদয়ের প্রশস্ততায়। সেই মুহূর্তে গর্বে ভিজে উঠল অনেকের চোখ। এমরিন নীরবে দাঁড়িয়ে আছে। তার দৃষ্টিতে গভীর কৃতজ্ঞতা, অকথিত, কিন্তু স্পষ্ট। যেন এক নিঃশব্দ স্বীকারোক্তি। ইলহান তখন এগিয়ে গেল। ইকবাল দেওয়ান-এর কোলে ঘুমিয়ে থাকা ছোট্ট নাহিয়ান-কে আলতো করে তুলে নিল। শিশুটি নিশ্চিন্ত ঘুমে আচ্ছন্ন, যেন এই আবেগঘন মুহূর্তের ভারও তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। ছেলেকে বুকে আগলে ইলহান ধীরে ধীরে এসে দাঁড়াল তার স্ত্রী-র পাশে।
অন্যদিকে আর্সলান নিঃশব্দে এগিয়ে এসে হলের এক কোণে দাঁড়াল। মাথা এখনো নিচু। ঠিক তখনই ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন ইকবাল দেওয়ান এবং নাহিদ দেওয়ান। তারা গিয়ে দাঁড়ালেন আর্সলানের পাশে। কেউ কোনো কথা বললেন না। কোনো অভিযোগ নয়, কোনো তিরস্কার নয়, শুধু নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা। সেই নীরবতার মধ্যেই যেন ছিল অগণিত অনুভূতি, ক্ষোভ, ভালোবাসা, অভিমান, ক্ষমা আর রক্তের অটুট টান।
.
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে একটু আগেই।ভেতর এখনো ভাসছে আতরের মৃদু সুবাস, গোলাপের পাপড়ি ছড়ানো মেঝেতে আলো-ছায়ার নরম খেলা।চারপাশে আত্মীয়স্বজনের গুঞ্জন, হাসি, খুনসুটি, সব মিলিয়ে এক উষ্ণ, আবেগঘন পরিবেশ। সেই পরিবেশের মধ্যেই এল বহু প্রতীক্ষিত একটি মুহূর্ত, আয়নায় মুখ দেখানোর পালা। প্রথমে আয়নার সামনে বসানো হলো তানভীর ও ফারাহকে। চারপাশের সবাই নিঃশব্দ কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে আছে। সোনালি আলোয় ঝলমল করা আয়নার পৃষ্ঠে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল দু’টি নতুন জীবনের প্রথম প্রতিচ্ছবি। ফারাহ্ লাজুক হয়ে চোখ নামিয়ে রেখেছে। গালের ওপর হালকা লাল আভা, চোখের পাতায় কম্পন, যেন বসন্তের প্রথম লাজুক কুঁড়ি। তানভীর আয়নার দিকে তাকিয়ে সেই লাজুক মুখখানি দেখতেই তার চোখে নেমে এলো বিস্ময় আর তৃপ্তির এক অপার্থিব আলো।মৃদু হেসে, একটু ঝুঁকে সে বলল—
-মাশ আল্লাহ, আমার ব্যক্তিগত চাঁদ তুমি। আজ থেকে আমার ঘর আলোকিত থাকবে প্রতিদিন তোমার আলোয়। ধন্যবাদ তোমাকে, আমাকে ভালোবাসার জন্য, আমার জীবনসঙ্গিনী হওয়ার জন্য। তোমার এই আলোয়ই আমি আমার প্রতিটি দিন সাজাতে চাই।"
তানভীরের কণ্ঠে মুগ্ধতা মিশে ছিল, যেন দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পাওয়া কোনো স্বপ্নের ঘোষণা। ফারাহ্ ধীরে মুখ তুলল। চোখে কোমল দীপ্তি, ঠোঁটে লাজুক হাসি।আয়নায় তানভীরের চোখের গভীরে তাকিয়ে সে নরম স্বরে বলল—
-"চিরন্তন ভালোবাসার দীপ্তি তুমি, নির্ভার ভোরের মৃদু আলো তুমি। বিরহের অশ্রুজলে ধুয়ে-পাওয়া আশ্বাস তুমি, অবিনাশী অনুভবের নিঃশব্দ ভাষ্য তুমি। এই হৃদয়ের চিরকালের বাসনা তুমি, আমার প্রণয়পথিক!আজ থেকে আমার প্রতিটি স্বপ্নের দিশা তুমি, প্রতিটি প্রার্থনার উত্তর তুমি।"
তাদের কথাগুলো যেন বাতাসেও মৃদু কম্পন তুলল।আশেপাশে থাকা কয়েকজন বড়রা মুচকি হেসে চোখ নামিয়ে নিলেন। এরপর আয়নার সামনে বসানো হলো আরেক জোড়া নবদম্পতিকে, রুহান ও উপমা।আয়নার কাঁচে ফুটে উঠল তাদের প্রতিচ্ছবি। উপমার চোখে ছিল এক গভীর প্রশান্তি, যেন দীর্ঘ পথ পেরিয়ে অবশেষে সে নিজের ঠিকানায় পৌঁছেছে। রুহান ধীরে উপমার হাতটি শক্ত করে ধরল। সেই স্পর্শে যেন প্রতিশ্রুতির দৃঢ়তা। আয়নার দিকে তাকিয়ে, কিন্তু কথাগুলো যেন সরাসরি উপমার হৃদয়ের উদ্দেশেই বলল রুহান—
-"তুমি আর আমি, প্রিয়তমা, সেটাই আমাদের গন্তব্য।পৃথিবীর যত পথ, যত দূরত্ব, যত বাধা থাকুক, সেখানে পৌঁছাতে যতগুলো পদক্ষেপ নিতে হয়, আমি নিতে প্রস্তুত। কারণ সেই গন্তব্যে তুমি আছো, আর তোমাকে ছাড়া আমার কোনো পথের মানে নেই।"
রুহানের কণ্ঠে ছিল অবিচল নিশ্চয়তা। উপমা ধীরে তার দিকে তাকাল। চোখে টলমল করছিল আনন্দ আর আবেগের আলো। সে মৃদু হাসল, তারপর শান্ত অথচ গভীর কণ্ঠে বলল—
-"ভালোবাসি তোমাকে রুহান, নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। তোমাকে যেদিন প্রথম দেখেছিলাম, সেদিন থেকেই তুমি আমার হৃদয়ে রাজত্ব করছ। আমি চেয়েও তোমাকে নিজের হৃদয় থেকে বের করতে পারিনি। আজ নতুন করে আমার হৃদয় আমি তোমার নামে লিখে দিলাম, চিরদিনের জন্য।"
কথাগুলো যেন এক একটি প্রতিজ্ঞার মতো বাতাসে ভেসে রইল। দুই জোড়া নবদম্পতির এই প্রেমময় কাব্যিক মুহূর্ত দেখে বড়রা একটু অপ্রস্তুত হয়ে হালকা হাসি দিয়ে সরে গেলেন। কিন্তু ছোটদের দুষ্টুমি থেমে থাকার নয়। হঠাৎ তারা একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল—
-"আহ! কি প্রেম!"
ঘরের ভেতর তখন হাসির ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে, আর আয়নার কাঁচে এখনো ঝলমল করছে চারটি চোখের নতুন জীবনের দীপ্ত প্রতিচ্ছবি, যেন দুটি ভালোবাসার গল্প একসাথে শুরু হলো সেই মুহূর্তে।
দূর থেকে দাঁড়িয়ে আর্সলান সব দেখছিল। চারপাশে হাসি, আনন্দ, নতুন দম্পতিদের উচ্ছ্বাস, সবকিছুর মাঝেও তার চোখ থেমে ছিল কেবল এক জায়গায়।ইলহান ও নূরাইসা এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে। নাহিয়ান ইলহানের কোলেই নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। ইলহান মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে নূরাইসার দিকে। ইলহানের দৃষ্টিতে এমন এক গভীর মুগ্ধতা, যেন সে পৃথিবীর সব আলো একসাথে খুঁজে পেয়েছে নূরাইসার মুখোশ্রীতে।আর সেই দৃষ্টি সহ্য করতে না পেরে নূরাইসার গাল লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে। সে চোখ নামিয়ে নিচ্ছে, আবার আড়চোখে তাকাচ্ছে, ঠিক যেমন করে কেউ নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে চুপিসারে দেখে। দুজনকে দেখেই আর্সলানের ঠোঁটে এক মলিন হাসি ফুটে উঠল। হাসিটা ছিল শান্ত, কিন্তু ভেতরে লুকিয়ে ছিল অসংখ্য অপ্রকাশিত অনুভূতি। সে একটু দূরে দাঁড়িয়ে, ধীরে ধীরে নিজের মনেই বলে উঠল—
-"ভালোবাসা... মানুষ এটাকে খুব সরল করে বলে, সেনোরিটা। যেন দু’জন মানুষ হাত ধরলেই গল্প শেষ।কিন্তু আমি শিখেছি, ভালোবাসা সবসময় পাওয়ার নাম নয়। কখনো কখনো এটা এমন একটা আগুন, যা বুকের ভেতর জ্বলে, অথচ কাউকে ছুঁতেও দেয় না। তুমি হয়তো কোনোদিন জানবে না, তোমার জন্য আমার ভেতরে কতটা জায়গা আছে। সেই জায়গাটা অন্ধকার, নিঃশব্দ... আর সেখানে তুমি আছো একেবারে মাঝখানে। অথচ মজার ব্যাপার কী জানো? আমি কখনো চাইনি তুমি সেই অন্ধকারটা দেখো।
আমি ভিলেইন হতে পারি সবার চোখে। মানুষ আমাকে ঘৃণা করতে পারে, আমার নাম শুনলে পথ বদলাতে পারে। কিন্তু তোমার সামনে আমি কখনো সেই মানুষটা হতে চাইনি। কারণ তুমি যদি একবারও আমার চোখের ভেতরটা পড়তে, তাহলে হয়তো বুঝতে, এই দানবের বুকেও একটা জায়গা আছে, যেখানে শুধু তোমারই নাম লেখা। হ্যাঁ, আমি তোমাকে ভালোবাসি। নিজের মতো করে... একটু ভুলভাবে, একটু নোংরা পৃথিবীর নিয়মে। আজ দেখছি তুমি হাসছ। তোমার পাশে একজন আছে, যে তোমাকে এমনভাবে আগলে রাখছে, যেভাবে আমি কোনোদিন পারতাম না। তাই আজ প্রথমবার মনে হচ্ছে, আমি হেরে যাইনি। কারণ আমি যদি সত্যিই দানব হতাম, তাহলে তোমার সেই হাসিটা কেড়ে নিতাম। কিন্তু দেখো, আমি তা করিনি।তোমার গল্পে হয়তো আমি খলনায়কই থাকব। হয়তো তুমি কোনোদিন আমার নামটাও মনে রাখবে না। তবুও দূর থেকে একটা দানব চুপচাপ প্রার্থনা করবে, তোমার এই হাসিটা যেন কোনোদিন মুছে না যায়। কারণ পৃথিবী আমাকে যা-ই বলুক, সেনোরিটা... তোমাকে ভালোবাসাটাই আমার একমাত্র সত্য।"
কথাগুলো শেষ করে আর্সলান আবার মৃদু হাসল।চোখের কোণে জমে ওঠা অশ্রুকে অদৃশ্য করে সে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। ভালোবাসা কখনো কখনো পাওয়ার গল্প নয়, কখনো কখনো ছেড়ে দিয়েও ভালোবাসার নামই হয় সবচেয়ে গভীর প্রেম।