সূর্যস্নাত ভালোবাসা

পর্ব - ৬০

🟢

থানচির এই হোটেলটা অনেক সুন্দর। পাহাড়ের বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা এই হোটেল যেন প্রকৃতির অন্তঃস্থলে গড়ে ওঠা এক নীরব আশ্রয়, এক প্রশান্তির গোপন ঠিকানা। কাঠ আর পাথরের মিশেলে নির্মিত হোটেলটির স্থাপত্যে মিশে আছে পাহাড়ি জীবনের সরল সৌন্দর্য, আবার কোথাও কোথাও আধুনিকতার সূক্ষ্ম ছোঁয়া, যেন প্রাচীনতা আর বর্তমান একসাথে হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। চারদিকে সবুজ পাহাড়ের সারি, দূরে মেঘের স্নিগ্ধ আস্তরণ, আর নিচে নিঃশব্দে বয়ে যাওয়া উপত্যকা, সব মিলিয়ে এটি যেন প্রকৃতির বুকে লুকিয়ে থাকা এক স্বপ্নময় কাব্য।

নূরাইসা সবেমাত্র গোসল সেরে বের হয়েছে। ভেজা চুল মুছতে মুছতে সে ধীর পায়ে বারান্দার দিকে এগিয়ে এলো। তারা পাঁচটি রুম নিয়েছে, আর তার রুমটিই সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে সুন্দর। রুমের ভেতরটা প্রশস্ত, অথচ অদ্ভুতভাবে প্রশান্ত; যেন এখানে প্রবেশ করলেই মন নিজে থেকেই প্রশান্ত নীরবতা নেমে আসে। মেঝেতে হালকা কাঠের পালিশের মোলায়েম আভা, দেয়ালে পাহাড়ি মোটিফে আঁকা নকশার শিল্পসুষমা, আর জানালার পাশে রাখা ছোট ছোট বাঁশের টবভরা গাছ, সব মিলিয়ে ঘরটিকে দিয়েছে এক উষ্ণ, কোমল আবহ, যেন এটি কোনো ঘর নয়, এক অনুভূতির আশ্রয়। বারান্দার দিকে খোলা কাঁচের দরজাটি যেন প্রকৃতিকে টেনে এনে ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়েছে।বারান্দার সামনে বিস্তৃত পাহাড়ের সারি, স্তরে স্তরে সাজানো সবুজ ঢেউয়ের মতো দিগন্ত ছুঁয়ে গেছে। দূরে কোথাও মেঘ পাহাড়ের গায়ে আলতো করে গা ঘেঁষে আছে, যেন কোনো লাজুক স্পর্শ। বাতাসে ভেসে আসে পাহাড়ি মাটির স্নিগ্ধ গন্ধ, আর মাঝেমধ্যে অচেনা পাখির ডাক নিস্তব্ধতাকে আরও গভীর করে তোলে।মার্চ মাস এখন, যতটা গরম ভাবা হয়েছিল, ততটা নয় এই পাহাড়ি অঞ্চলে; বরং বাতাসে মিশে আছে একরাশ শীতলতা, মৃদু, প্রশান্ত, ঠিক যেন কারও নীরব স্পর্শ গায়ে এসে লাগে। নূরাইসা আজ শাড়ি পরেছে, কালো রঙের তাতের শাড়ি। ইলহান এনে দিয়েছিল তাকে এই শাড়িটি। কালো তাতের শাড়িটি তার শরীরে এমনভাবে লেগে আছে, যেন গোধূলির নরম ছায়া তাকে জড়িয়ে ধরেছে। ভেজা চুলগুলো কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এসেছে অবিন্যস্ত স্রোতের মতো, কালো শাড়ির গাঢ় বৈপরীত্যে তার উজ্জ্বল ত্বকের দীপ্তি যেন আরও উন্মোচিত, আরও গভীর, আরও মায়াময় হয়ে উঠেছে। সবকিছু মিলিয়ে সে নিজেই যেন এই পাহাড়ি সকালের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি, প্রশান্ত, অথচ গভীরভাবে স্পর্শকাতর। নূরাইসা দরজা খুলতেই এক দমকা হাওয়া এসে তাকে ঘিরে ধরল, যেন প্রকৃতি নিজেই তাকে আপন করে নিল। পাহাড়ি বাতাসের সেই আকস্মিক ছোঁয়া মুহূর্তেই তাকে আবিষ্ট করে তুলল। আবেশে চোখ বুজে নিল সে। খোলা ভেজা চুলগুলো বাতাসে উড়ে উঠল, অগোছালো, অথচ অপূর্ব সুন্দর এক ছন্দে। কিছুক্ষণ সে ঠিক সেভাবেই দাঁড়িয়ে রইল, এই হাওয়ার আলতো স্পর্শটুকু উপভোগ করতে। মনে হলো, এই মুহূর্তে পৃথিবীতে আর কোনো তাড়া নেই, নেই কোনো কোলাহল, শুধু পাহাড়, বাতাস, আর এক নিঃশেষ নীরবতা, যা মনকে ধীরে ধীরে শূন্য করে দেয়।

এরপর ধীর পায়ে পেছনে ফিরে বিছানার দিকে তাকাল সে। বারান্দার দরজার ঠিক সামনেই তাদের বিছানা।বড় কাঠের খাট, সাদা চাদরে ঢাকা, সরল অথচ প্রশান্ত এক আয়োজন। জানালার ফাঁক গলে ভেতরে ঢুকে পড়া আলো এসে থেমে আছে সেই বিছানার ওপর, যেন পাহাড়ি সকালের কোমল রোদ এসে সেখানে আশ্রয় নিয়েছে। আলো আর ছায়ার মৃদু খেলা খাটের সাদা চাদরে এক অপার্থিব আবহ তৈরি করেছে, নিঃশব্দ, তবু গভীরভাবে জীবন্ত। সেখানেই শুয়ে আছে ইলহান ও নাহিয়ান, উন্মুক্ত শরীরে, উপুড় হয়ে, গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ঘুমের মধ্যেও তাদের ভঙ্গিতে অদ্ভুত মিল, একইভাবে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা, এলোমেলো চুল, আর নিশ্চিন্ত নিঃশ্বাসের ওঠানামা। যেন দুজন আলাদা মানুষ নয়, বরং এক ছায়ার দুই প্রতিচ্ছবি। নূরাইসার মাঝে মাঝে হিংসে লাগে, এই ছেলেটিকে নয় মাস নিজের ভেতরে বহন করেছে সে, অথচ জন্মের পর সে যেন হয়ে উঠেছে একদম ‘মিনি ইলহান’। নিজের এই ভাবনাতেই হালকা হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটে। যাকে সে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে, তারই আরেকটি প্রতিচ্ছবি পৃথিবীতে এনে দিয়েছে, এটা তো হিংসার নয়, বরং গভীর গর্বের বিষয়। মুচকি হেসে সে খাটের পাশে এসে দাঁড়াল। গতকালের দীর্ঘ ভ্রমণ, পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথের ক্লান্তি, সব মিলিয়ে শরীর আজ নিঃশব্দে বিশ্রাম দাবি করছে, আর সেই দাবির কাছে সবাই পরাজিত হয়ে ঘুমের আশ্রয়ে হারিয়ে গেছে। নূরাইসা ধীরে ধীরে বসে পড়ল ইলহানের শিয়রে। ঝুঁকে ইলহানের কানের লতিতে একটুখানি চুমু এঁকে দিল, নীরব, অথচ গভীর। আঙুলের ডগায় আলতো করে ছুঁয়ে দিল তার চুল, তারপর হাত বুলিয়ে নামল পিঠের দিকে। পিঠজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন, প্রতিটি যেন একেকটা নিঃশব্দ গল্প; কোনো লড়াইয়ের, কোনো যন্ত্রণার, কোনো অদেখা যুদ্ধের স্মৃতি। নূরাইসা একে একে সেই চিহ্নগুলোতে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল, ভালোবাসায় আর এক অদ্ভুত ব্যথামাখা কোমলতায়। ইলহান একটু নড়েচড়ে উঠল, কিন্তু ঘুম ভাঙল না। নূরাইসা হালকা দুষ্টুমিতে নিজের ভেজা চুল থেকে টুপটাপ করে পড়া পানির ফোঁটা তার মুখে ছিটিয়ে দিল। ঠান্ডা পানির ছোঁয়ায় ইলহানের চোখ-মুখ কুঁচকে উঠল। ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল সে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে, পাহাড়ি সকালের আলো, নরম শীতল বাতাস, আর নূরাইসার ভেজা চুলের স্নিগ্ধ গন্ধ মিলেমিশে যেন পুরো ঘরটাকে ভরে তুলল এক অবর্ণনীয় অনুভূতিতে; যেন এই ক্ষণটুকুই তাদের সমস্ত পৃথিবী।

চোখের সামনে এমন ভেজা রূপ দেখে ইলহান যেন মুহূর্তেই স্তব্ধ পাথরের মতো হয়ে গেল। ঘুমের আবেশ তখনও পুরোপুরি কাটেনি, চোখের পাতা ভারী, চেতনা আধো-অন্ধকারে ডুবে আছে, তবুও চোখ মেলতেই সে যেন বাস্তবের সীমানা পেরিয়ে অন্য এক স্বপ্নময় জগতে প্রবেশ করল। বিছানার পাশে নীরবে বসে আছে নূরাইসা। তার ভেজা চুল কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এসেছে, সেই চুলের ডগা থেকে টুপটাপ করে জল পড়ে যেন মাটির বুকে ক্ষুদ্র সুর তুলছে, একটি নিঃশব্দ সঙ্গীত, ভোরের নরম নীরবতায় যার প্রতিধ্বনি আরও গভীর হয়ে উঠেছে। কালো তাতের শাড়িটি তার দেহে এমন নিবিড়ভাবে লেপ্টে আছে, যেন রাতের কোমল অন্ধকার নিজেই এসে তাকে আলিঙ্গন করে রেখেছে, মোহময়, নিবিড়, অদৃশ্য এক আবরণে। ভেজা চুলের ফাঁক গলে কপালের পাশে কয়েকটি এলোমেলো গোছা লাজুকভাবে আটকে আছে, যেন সেগুলিও নিজেকে গুছিয়ে নিতে পারছে না তার সৌন্দর্যের আবেশে।হরিণী চোখ দুটো স্বচ্ছ, ধোয়া জলের মতো নির্মল, গভীরতায় ভরা, অথচ কোথাও যেন একটুখানি লজ্জার আবরণ নেমে এসেছে। ইলহানের দৃষ্টির ভার বুঝতে পেরে সেই চোখ দুটো মাঝে মাঝে কাঁপছে, দৃষ্টি নিচু হয়ে আসছে, আবার চুপিসারে ফিরে তাকাচ্ছে, একটি অনুচ্চারিত লজ্জা আর মায়ার মিশেলে। তার ঠোঁটে লেগে আছে এক অচেনা, মৃদু হাসি, স্নিগ্ধ, অর্ধেক লুকোনো, অর্ধেক প্রকাশিত। পাতলা গোলাপী অধর ভেজা, যেন সদ্য বৃষ্টিভেজা গোলাপের পাঁপড়ি, স্পর্শের আগেই যার কোমলতা অনুভব করা যায়। সেই ঠোঁটের কোণে লজ্জার হালকা কম্পন, যেন নিজেরই সৌন্দর্যের সামনে সে নিজেই একটু সংকোচে থমকে আছে। বারান্দা পেরিয়ে সকালের আলো ধীরে ধীরে এসে পড়েছে তার গায়ে। সেই আলো তাকে ছুঁয়ে যেন আরও উজ্জ্বল, আরও নির্মল করে তুলছে। নূরাইসাকে তখন মনে হচ্ছে পাহাড়ি সকালের মতো, স্বচ্ছ, সতেজ, নির্ভেজাল, যেন প্রকৃতি নিজ হাতে তাকে সাজিয়ে তুলেছে, প্রতিটি রেখায়, প্রতিটি ছোঁয়ায় মায়ার পরশ এঁকে দিয়ে। ইলহান শুধু তাকিয়েই রইল। দৃষ্টি সরানোর ক্ষমতা তার হারিয়ে গেছে। তার বুকের ভেতর ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে লাগল এক অদ্ভুত উষ্ণতা, নরম, গভীর, আশ্রয়দায়ক। এই নারী.. তার অর্ধাঙ্গিনী, তার জীবনের প্রতিটি স্পন্দনে যার উপস্থিতি জড়িয়ে আছে।তার ঘর, তার শান্তি, তার স্বপ্ন, তার ভবিষ্যৎ, তার সন্তানের মা।

নূরাইসা হঠাৎ দৃষ্টি নামিয়ে নিল। গালের কোণে হালকা লালিমা ছড়িয়ে পড়ল, আঙুলের ডগা দিয়ে শাড়ির আঁচলটা একটু শক্ত করে ধরল সে, যেন নিজেকে আড়াল করার এক ব্যর্থ চেষ্টা। কিন্তু সেই লজ্জাও তাকে আরও অপরূপ করে তুলল, আরও জীবন্ত, আরও স্পর্শকাতর, আরও ভালোবাসার যোগ্য। আর ইলহান বুঝতে পারল, এই মুহূর্তটাই তার জীবনের সবচেয়ে নিঃশব্দ, অথচ সবচেয়ে গভীর ভালোবাসার ঘোষণা। নূরাইসা লজ্জা লুকিয়ে ভুরু কুঁচকে তাকালো। দৃষ্টিটা যতটা কঠোর দেখাতে চাইল, ভেতরে ততটাই নরম হয়ে আছে, চোখের কোণে ধরা পড়ে যায় সেই সংকোচ, সেই মৃদু কাঁপন। সে বলল—

-"এইভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?"

ইলহান ধীরে ধীরে উঠে একটু কাত হয়ে শুয়ে পড়ল।তার দৃষ্টি একবারও সরল না, যেন চোখের পলক ফেললেই এই দৃশ্য হারিয়ে যাবে। গভীর, আবেশময় স্বরে বলল—

-"মানুষ এত সুন্দর হয় কীভাবে?"

নূরাইসা লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে উঠল। বুকের ভেতর ধকধক শব্দ যেন নিজেই শুনতে পাচ্ছে। লজ্জা ঢাকতে মুচকি হেসে বলল—

-"ঘুম থেকে উঠেই মিথ্যা বলা শুরু করেছেন? এত সকালে এমন প্রশংসা ভালো শোনায় না কিন্তু।"

ইলহান ঠোঁট বাঁকিয়ে একটু হাসল, চোখে খেলা করল দুষ্টু ঝিলিক—

-"মিথ্যা? আমি তো বরং ভাবছি, এতদিন ধরে আমি অন্ধ ছিলাম কিনা। প্রতিদিন দেখি, তবু প্রতিদিনই নতুন লাগে।"

তারপর হাত বাড়িয়ে আলতো করে তার শাড়ির আঁচলটা টেনে নিল। নূরাইসা হকচকিয়ে উঠল, ভারসাম্য হারিয়ে একটু ঝুঁকে পড়ল তার ওপর।দুজনের মাঝে দূরত্বটুকু মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। ইলহান ফিসফিস করে বলল—

-"ব্লাডমুন... আমি তো প্রতিদিনই নতুন করে অবাক হই। তোর এই রূপটা... কখনো পুরোপুরি চিনে উঠতে পারি না।"

নূরাইসার নিঃশ্বাস আটকে এল। চোখ নামিয়ে ফেলল সে, কিন্তু হাত দিয়ে নিজেকে সরাতেও পারল না।ইলহানের আঙুলগুলো ধীরে ধীরে নূরাইসার ভেজা চুলে জড়িয়ে গেল। ভেজা চুলের ঠান্ডা স্পর্শ আঙুলে লাগতেই সে হালকা কেঁপে উঠল। নেশাসক্ত কন্ঠে সে বলল—

-"এভাবে ভেজা চুল নিয়ে সামনে আসিস কেন?"

নূরাইসা চোখ ছোট করে তাকাল, ভান করা বিরক্তি নিয়ে বলল—

-"কেন? সমস্যা কী? আমি কি আপনার সামনে আসার আগে অনুমতি নেবো?"

ইলহান একটু ঝুঁকে এলো, ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি—

-"সমস্যা না... বিপদ।"

-"কিসের বিপদ?" নূরাইসা এবার সত্যিই কৌতূহলী হয়ে উঠল।

ইলহান তাকে আরও একটু কাছে টেনে নিল। এত কাছে, যেন তাদের মাঝখানের বাতাসও উষ্ণ হয়ে উঠল। দুজনের নিঃশ্বাস একে অপরের গালে ছুঁয়ে যাচ্ছে। তার কণ্ঠস্বর আরও নিচু, ভারী, কাঁপা—

-"তোকে দেখলে আমার সব নিয়ন্ত্রণ নষ্ট হয়ে যায়, মাথা কাজ করে না, শুধু তোকে ছুঁয়ে থাকতে ইচ্ছে করে।"

নূরাইসার গাল লাল হয়ে উঠল। সে তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিয়ে ফিসফিস করে বলল—

-"ছেলে পাশে!"

ইলহান চোখ ঘুরিয়ে পাশে তাকাল। ছোট্ট নাহিয়ান তখনও উপুড় হয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে, নিঃশ্বাসের হালকা ওঠানামায় তার ছোট্ট শরীর দুলছে। সে আবার নূরাইসার দিকে ফিরে তাকাল, কণ্ঠে নির্লিপ্ত ভান—

-"ঘুমাচ্ছে তো। কিছুই বুঝবে না।"

নূরাইসা ঠোঁট কামড়ে হালকা ধমক দিল—

-"আপনি একদমই বদলাননি। আগে যেমন ছিলেন, এখনো ঠিক তেমনই!"

ইলহান মৃদু হেসে বলল—

-"ভুল বললি... আগে শুধু তোকে ভালোবাসতাম, এখন তোকে ছাড়া কিছুই ভাবতে পারি না।"

নূরাইসা থমকে গেল এক মুহূর্ত। চোখ তুলে তাকাল তার দিকে, এই কথাগুলো সোজা হৃদয়ের ভেতরে গিয়ে লাগল। কিছু বলার আগেই ইলহান হঠাৎ তাকে আরও কাছে টেনে নিল। তার ভেজা চুলের গন্ধ বুক ভরে টেনে নিল সে, চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্ত সেই গন্ধে ডুবে রইল। ফিসফিস করে বলল—

-"নূরেজান..."

-"হুম?" নূরাইসার গলা কেঁপে উঠল।

-"আমি যদি আবার তোর প্রেমে পড়ি?"

নূরাইসা হেসে ফেলল, কিন্তু সেই হাসির ভেতরেও লাজুক কাঁপন—

-"আবার মানে? আপনি কি কখনো বের হয়ে গিয়েছিলেন নাকি?"

ইলহান আলতো করে তার কপালের কাছে মুখ নামিয়ে আনল, স্পর্শহীন এক উষ্ণতা ছড়িয়ে দিয়ে নিঃশব্দ কণ্ঠে বলল—

-"না... বের হইনি। কিন্তু প্রতিদিনই নতুন করে ডুবে যাই। তোর চোখে, তোর হাসিতে, তোর এই নরম লজ্জায়!"

নূরাইসা চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল—

-"তাহলে সাবধানে থাকবেন... বেশি ডুবে গেলে কিন্তু আমি তুলতে পারবো না।"

ইলহান মৃদু হেসে তার থুতনিটা আলতো তুলে ধরল—

-"তুলতে হবে না... আমি তো ডুবেই থাকতে চাই।"

এক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এল। শুধু দুজনের নিঃশ্বাস, ভেজা চুলের গন্ধ, আর সকালের আলো, সব মিলিয়ে সেই ঘরটা যেন এক অদৃশ্য প্রেমের আবরণে ঢেকে গেল। নূরাইসার বুকের ভেতরটা কেমন অচেনা শিহরণে ভরে উঠল। সে দৃষ্টি সরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু পারল না। ইলহানের চোখে এমন এক টান, সেখানে আটকে পড়লে আর ফিরে আসা যায় না। ধীরে বলল—

-"আপনি সবসময় এমন কথা বলেন কেন? শুনলে... কেমন যেন লাগে।"

ইলহান মৃদু হেসে তার গালের পাশে আঙুল ছুঁইয়ে দিল—

-"কেমন লাগে?"

নূরাইসা একটু ইতস্তত করল, তারপর খুব আস্তে—

-"মনে হয়... আমি খুব গুরুত্বপূর্ণ আপনার কাছে।"

ইলহানের চোখ হঠাৎ গভীর হয়ে উঠল। সে ফিসফিস করে বলল—

-"গুরুত্বপূর্ণ না, নূরেজান... তুই আমার সবকিছু। তুই না থাকলে আমার কোনো ‘আমি’ই থাকতো না।"

নূরাইসা আর কিছু বলতে পারল না। তার চোখে জল চিকচিক করে উঠল, কিন্তু সে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিল—

-"আবার শুরু করলেন... এত ভালোবাসা কেউ সহ্য করতে পারে?"

ইলহান তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল—

-"না পারলে শিখে নে... কারণ আমি থামবো না।"

নূরাইসার ঠোঁট কেঁপে উঠল। সে আলতো করে ইলহানের বুকের ওপর হাত রেখে বলল—

-"আপনি জানেন... আপনি যখন এভাবে কথা বলেন, তখন আমার ভেতরটা কক অজানা শঙ্কায় ভরে ওঠে..."

-"ভয়?" ইলহান বিস্মিত দৃষ্টিতে কপাল কুঁচকে তাকাল।

-"হুম... মনে হয়, যদি কোনো একদিন এই সবকিছু বদলে যায়? যদি এই মানুষটা,।যাকে আমি আজ চিনি, অনুভব করি,।একদিন আর এমন না থাকে?"

ইলহান কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইল। যেন কথাগুলো তার অন্তরের গভীরে গিয়ে আঘাত করল। তারপর ধীরে, অত্যন্ত উষ্ণতায়, সে নূরাইসার হাতটা তুলে নিজের বুকে চেপে ধরল।

-"শোন!"

নূরাইসা বিস্ময়ে তাকাল—

-"কি?"

-"এই যে ধুকপুক করা শব্দটা অনুভব করছিস... এটা যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন শুধুই তোর জন্যই স্পন্দিত হবে। আর যেদিন এই স্পন্দন থেমে যাবে, সেদিনই শুধু আমি বদলাবো।"

নূরাইসার চোখ ভিজে উঠল। সে হালকা কাঁপা গলায় বলল—

-"আপনি এমন কথা বলবেন না... ভালো লাগে না।"

ইলহান তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।

-"ঠিক আছে, বলবো না। কিন্তু একটা কথা সত্যি, তুই আমার অভ্যাস না, তুই আমার প্রয়োজন।"

নূরাইসা হালকা হেসে ফেলল, চোখে এখনো জল চিকচিক করছে।

-"আপনি খুব খারাপ... এভাবে কেউ কাউকে ভালোবাসে?"

ইলহান ঠোঁটের কোণে নরম হাসি টেনে বলল—

-"আমি তোকে ভালোবাসি না।"

নূরাইসা থমকে গেল—

-"কি?"

ইলহান আরও কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করল—

-"আমি তোকে ছাড়া বাঁচতেই পারি না।"

এক মুহূর্তের জন্য সময় যেন থেমে গেল। নূরাইসা ধীরে ধীরে তার কাঁধে মাথা রাখল। খুব আস্তে বলল—

-"তাহলে... আমাকেও কোথাও যেতে দিবেন না।"

ইলহান তার চুলে মুখ গুঁজে বলল—

-"কোথাও না... তুই থাকবি ঠিক এখানে... আমার কাছে।"

পাশে ছোট্ট নাহিয়ান হালকা নড়ে উঠল, যেন স্বপ্নের ভেতরেও বাবা-মায়ের এই নীরব ভালোবাসা টের পাচ্ছে। নাহিয়ান হালকা নড়ে উঠতেই দুজনেই থমকে গেল এক মুহূর্ত। যেন সময় নিজেই নিঃশ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে আছে। নূরাইসা তাড়াতাড়ি একটু সরে যেতে চাইল, কিন্তু ইলহানের হাত তখনও তার কব্জিতে আলতো করে জড়ানো। নূরাইসার কণ্ঠে অকারণ তাড়াহুড়ো আর লাজুক কম্পন, ফিসফিস করে বলল—

-"ছাড়ুন... উঠবে কিন্তু।"

ইলহান একচুলও নড়ল না। বরং আরও কাছে টেনে নিল তাকে, চোখে সেই চেনা দুষ্টু দীপ্তি—

-"উঠুক... তাতে কী?"

-"তাতে কি মানে?"

নূরাইসা চোখ বড় করে তাকাল, খুব আস্তে ধমক দিয়ে বলল—

-"বাচ্চার সামনে এসব... একদমই ঠিক না!"

ইলহান মৃদু হেসে ধীরে ধীরে তার কানের কাছে ঝুঁকে এলো। কানের লতিতে আলতো করে ওষ্ঠ স্পর্শ করিয়ে নরম স্বরে বলল—

-"এসব মানে কী, নূরেজান? আমি তো শুধু আমার বউকে ধরে আছি।"

নূরাইসা এবার সত্যি লজ্জায় কুঁকড়ে গেল। গালের লালিমা আরও গাঢ় হয়ে উঠল—

-"আপনি ইচ্ছা করে এমন করেন... আমাকে লজ্জা দেওয়ার জন্যই।"

-"হুম।" ইলহান গম্ভীর হওয়ার ভান করে মাথা নাড়ল—

-"কারণ তোর এই লজ্জাটা... ভীষণ সুন্দর ব্লাডমুন।"

নূরাইসা চুপ করে গেল। তার বুকের ভেতরটা আবার কেমন উষ্ণ হয়ে উঠল। সে ধীরে বলল—

-"সব সময় এমন করে তাকাবেন না... আমার ভালো লাগে না।"

ইলহান ভ্রু তুলল—

-"মিথ্যা।"

-"না, সত্যি!" নূরাইসা জেদ ধরে বলল—

-"মনে হয় আপনি সব দেখে ফেলছেন।"

-"কি দেখছি?" ইলহানের কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে এল।

নূরাইসা একটু থেমে, খুব আস্তে বলল—

-"আমার সব দুর্বলতা।"

ইলহান এক মুহূর্ত স্থির হয়ে গেল। তারপর নূরাইসার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে ধীরে বলল—

বিজ্ঞাপন

-"দুর্বলতা না, নূরেজান, এগুলোই তো তোর সবচেয়ে সুন্দর দিক। তোর এই লজ্জা, এই ভয়, এই মায়া, এগুলো ছাড়া তুই তুই থাকবি?"

নূরাইসা কিছু বলল না। শুধু চুপচাপ তাকিয়ে রইল তার দিকে। ইলহান হালকা করে তার কপালে ঠোকা দিল—

-"একটা গোপন কথা শুনবি?"

-"কি?"

-"তুই যখন এমন করে আমার দিকে তাকাস... তখন মনে হয়, আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান পুরুষ।"

নূরাইসা মৃদু হেসে ফেলল—

-"আপনি এসব কথা কোথা থেকে শিখেন?"

-"তোর কাছ থেকে।" ইলহান একদম সহজভাবে বলল।

নূরাইসা অবাক কন্ঠে বলল—

-"আমার কাছ থেকে?"

-"হ্যাঁ... তোর নীরবতা থেকে, তোর চোখ থেকে, তোর না-বলা কথাগুলো থেকে।"

নূরাইসার চোখ আবার নরম হয়ে এল। সে ধীরে ধীরে ইলহানের হাতটা নিজের দুই হাতের মাঝে নিয়ে বলল—

-"তাহলে আরও একটা কথা শিখে রাখুন।"

-"কি?"

-"আমি যদি কোনোদিন কিছু না বলি, তবুও বুঝে নিবেন, আমি আপনাকে খুব ভালোবাসি।"

ইলহানের ঠোঁটে ধীরে ধীরে হাসি ফুটল। সে নরম গলায় বলল—

-"আর তুই এটাও শিখে রাখ, না বললেও আমি শুনে ফেলি।"

-"কি শুনেন?" নূরাইসা কৌতূহলী কন্ঠে শুধালো।

ইলহান তার কপালে আবার ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করল—

-"তোর হৃদয়ের শব্দ, যেখানে শুধু আমার নামটাই প্রতিধ্বনিত হয়।"

নূরাইসা চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার আঙুলগুলো অজান্তেই শক্ত করে চেপে ধরল ইলহানের হাত। ঠিক তখনই পাশ থেকে ছোট্ট একটা ঘুম জড়ানো আওয়াজ ভেসে এলো—

-"মা..."

দুজনেই চমকে তাকালো। নাহিয়ান চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসেছে। চুল এলোমেলো, চোখ আধখোলা। সে কপাল কুঁচকে দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল—

-"বাবা, তুমি মা-কে চুলি কলছো কিনো?"

নূরাইসা বিস্মিত দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ নীরব থেকে হঠাৎ ফিক করে হেসে উঠল। ইলহান হতভম্ব হয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল—

-"আমি তোর মাকে চুরি করছি?"

নাহিয়ান গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ল।

-"হুম। মা আমাল।"

ইলহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃদু স্বরে বলল—

-"দেখেছিস? তিন বছর বয়সেই আমার প্রতিদ্বন্দ্বী তৈরি হয়ে গেছে।"

নূরাইসা হাসতে হাসতে ছেলেকে কোলে তুলে নিল।

আর পাহাড়ি সকালের সেই নরম মুহূর্তটি ভেঙে গেল ছোট্ট নাহিয়ানের গম্ভীর দাবিতে, তার মা শুধু তারই।

.

নাহিয়ান ও নূরাইসা মিলে ইলহানের চোখ বেঁধে তাকে কোথাও এক অজানা গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।ইলহান বারবার প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে, একটিরও উত্তর মেলেনি। শেষমেশ বেচারা হার মেনে বউ-বাচ্চার কথামতোই নিঃশব্দে চলতে শুরু করল। তার ভেতরে কৌতূহল আর অদ্ভুত এক আশঙ্কা একসাথে দোলা দিচ্ছে। কিন্তু সেই দোলার মধ্যেও একরাশ মিষ্টি বিশ্বাস, "ওরা আছে, নিশ্চয়ই ভালো কিছুই অপেক্ষা করছে।" বেশ খানিকটা পথ হেঁটে তারা গাড়িতে উঠল। ইলহান অনুভব করল, হোটেলের পরিচিত গণ্ডি পেরিয়ে তারা ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ছে অচেনা এক যাত্রাপথে। দুপুরের নির্জনতা যেন চারপাশে মেখে আছে, অথচ তার ভেতরে ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে অজানার এক তীব্র আকর্ষণ। কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাকে? এই প্রশ্নটি বারবার তার মনের ভেতর প্রতিধ্বনিত হলেও, সে আর মুখ খোলার সাহস পেল না। গাড়ি ছুটে চলল প্রায় দেড় ঘণ্টা। সময় যেন আজ একটু ভিন্ন ছন্দে বয়ে যাচ্ছে, প্রতিটি মিনিট দীর্ঘতর, প্রতিটি মুহূর্ত আরও প্রত্যাশাময়। চারপাশের শব্দ, বাতাসের দোল, রাস্তার বাঁক, সব মিলিয়ে ইলহানের অনুভূতিগুলো যেন তীক্ষ্ণ হয়ে উঠছে। দৃষ্টি নেই, অথচ উপলব্ধি যেন বহুগুণ বেড়ে গেছে।

হঠাৎ গাড়ি থেমে গেল। নূরাইসা ও নাহিয়ান তাকে সাবধানে নামিয়ে নিল। দু’পাশ থেকে ধরে তারা হাঁটতে শুরু করল। পথটা সহজ নয়, উঁচুনিচু, কোথাও পাথুরে, কোথাও খসখসে। ছোট ছোট পাথর এসে পায়ে বাধা দিচ্ছে, সেই স্পর্শেই ইলহান বুঝে নিল, এটা কোনো সমতল ভূমি নয়। প্রতিটি পদক্ষেপে অচেনা এক অনুভূতি, যেন প্রকৃতি নিজেই তাকে কোথাও ডেকে নিয়ে যাচ্ছে। বাতাসে এখন এক অন্যরকম শীতলতা, পাহাড়ি হাওয়ার নরম, অথচ কাঁপন জাগানো স্পর্শ।নিস্তব্ধতার বুক চিরে ভেসে আসছে অচেনা পাখির ডাক, দূরের কোথাও বাতাসের সাথে মিশে যাচ্ছে পাতার মর্মর ধ্বনি। চারপাশের এই নিস্তব্ধতা নিছক নীরব নয়, এ যেন এক গভীর, রহস্যময় অপেক্ষা।ধীরে ধীরে সেই অপেক্ষা আরও গাঢ় হতে থাকল। আরও প্রায় এক ঘণ্টা হাঁটার পর তারা পৌঁছে গেল পাহাড়ের চূড়ায়। ক্লান্তি তখন শরীরে বাসা বাঁধলেও, ইলহানের মনে যেন এক অদ্ভুত আলোড়ন, ঠিক যেন কিছু একটার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে সে। নূরাইসা ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। তার স্পর্শে এক অদ্ভুত কোমলতা, এক নিঃশব্দ আশ্বাস। খুব আস্তে, খুব যত্নে সে খুলে দিল ইলহানের চোখের বাঁধন। চোখ খুলতেই হঠাৎ আলো এসে ঝলসে দিল তার দৃষ্টি। এক মুহূর্তের জন্য সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেল, তারপর ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে শুরু করল চারপাশ। এবং ঠিক তখনই একসঙ্গে, চারদিক থেকে উচ্ছ্বাস ভেঙে পড়ল—

-"হ্যাপি বার্থডে, ইলহান!"

ধীরে ধীরে সেই ঘোলাটে পর্দা সরতে লাগল, আর স্পষ্ট হয়ে উঠল এক অপার্থিব দৃশ্য। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, বিহান, নুহা, আফরিন, এমরিন, রূপকথা, তানভীর, ফারাহ্, রুহান, উপমা, মেঘ, নাদিম, স্মৃতি, আশিক। শ্যাডো ইউনিটের তাসিন, ঈশান, রায়েদ, আরিয়ান, আরিবা। আর তার প্রিয় বন্ধুরা, সাইমন, সাথী, জাকারিয়া, আয়শা আর ওদের ছোট্ট ছেলে আয়মান, মুবিন, বেলি, হেলেনা, আরিফ আর তাদের মেয়ে জয়া, রাধা, রুহি। সবাই একসাথে দাঁড়িয়ে আছে, মুখে উজ্জ্বল হাসি, চোখে নিখাদ ভালোবাসার দীপ্তি। যেন প্রতিটি চোখ বলছে একটাই কথা, "তুমি একা নও।"

পাহাড়ের চূড়াটা আজ আর সাধারণ কোনো স্থান নয়, এ একান্তই তাদের জন্য সাজানো এক স্বপ্নলোক।দুপুরের সূর্য ঠিক মাথার উপর নয়, সামান্য কাত হয়ে এসে নরম আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে চারপাশে। সেই সোনালি আলো গাছের পাতার ফাঁক গলে মাটিতে পড়ে এঁকে দিচ্ছে অসংখ্য ক্ষুদ্র আলোর নকশা, যেন প্রকৃতি নিজ হাতে সাজিয়ে তুলেছে এই মুহূর্তটাকে। চারপাশে রঙিন কাপড়ের হালকা ঝুল, বাতাসে দুলছে মৃদু ছন্দে, যেন পাহাড়ি হাওয়ার সাথে তাল মিলিয়ে এক নিঃশব্দ নৃত্য। কিছু বেলুন আলতো করে বাঁধা, দুলছে, চকচক করছে সূর্যের আলোয়, যেন শিশুসুলভ আনন্দের প্রতীক হয়ে উঠেছে তারা। একপাশে কাঠের উপর সাজানো কেক, তার উপর পড়ে থাকা সূর্যালোক ক্রিমের সাদা অংশে স্বর্ণালি আভা ছড়িয়ে দিয়েছে।পাশে ছোট ছোট ফেয়ারি লাইট, দিনের আলোয় ম্লান হলেও, তাদের উপস্থিতি যেন পরিবেশে এক কোমল, স্বপ্নময় আবেশ যোগ করেছে। দূরে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে গেছে সবুজের অফুরন্ত বিস্তৃতি। সেই সবুজের বুক জুড়ে সূর্যের আলো আর ছায়ার মায়াবী খেলা, কখনো হালকা, কখনো গভীর, যেন প্রকৃতি নিজেই এক নিঃশব্দ চিত্রকরের ভূমিকায়। বাতাসে ভেসে আসছে ভেজা পাহাড়ি মাটির গন্ধ, তাজা ঘাসের স্নিগ্ধতা, সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্ত, অথচ গভীর আবেগে ভরা পরিবেশ। এই নীরবতার মাঝেও যেন হাজারো অনুভূতির শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

নূরাইসা একটু দূরে দাঁড়িয়ে, তার চোখে একরাশ প্রতীক্ষা, সাথে নিঃশব্দ তৃপ্তি। এই পুরো আয়োজনের প্রতিটি ক্ষণ, প্রতিটি স্পর্শ সে হৃদয়ের গভীরে যত্ন করে বুনে রেখেছে। তার ঠোঁটের কোণে লুকিয়ে আছে এক নরম হাসি, প্রিয় মানুষটার প্রতিক্রিয়া দেখার অপেক্ষায়।

নাহিয়ান খিলখিল করে হাসছে, তার চোখেমুখে খাঁটি উচ্ছ্বাস। যেন এই সারপ্রাইজের সফলতায় সে নিজেই সবচেয়ে বেশি আনন্দিত। তার সেই নির্মল হাসি চারপাশের আবহকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলছে। আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে ইলহান, স্থির। স্তব্ধ। নিঃশব্দ। তার চারপাশে এত মানুষ, এত ভালোবাসা, এত যত্ন, সবকিছু মিলিয়ে মুহূর্তটা যেন বাস্তবতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। মনে হচ্ছে, সে কোনো স্বপ্নের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে, একটা এমন স্বপ্ন, যা ছুঁয়ে দেখা যায়, অনুভব করা যায়, কিন্তু বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। সূর্যের সোনালি আলো এসে পড়েছে তার মুখে। সেই আলোয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তার বাদামি চোখের গভীরে জমে থাকা বিস্ময়, আবেগ, আর এক অদ্ভুত নরম ভেঙে পড়া অনুভূতি।এই মুহূর্তে সে কিছু বলছে না, কিন্তু তার নীরবতাই যেন হাজারো অনুভূতির ভাষা হয়ে উঠেছে। সে শুধু অনুভব করছে, পুরোটা... নিজের অস্তিত্বের গভীরতম প্রান্ত ছুঁয়ে।

একে একে সবাই এগিয়ে আসতে শুরু করল ইলহানের দিকে। প্রথমে নাহিয়ানই ছুটে এসে তার গলায় ঝাঁপিয়ে পড়ল—

-"বাবা! থুভো জন্মডিন!"

শিশুসুলভ সেই ভাঙা উচ্চারণ যেন মুহূর্তটাকে আরও কোমল করে দিল। ইলহান হালকা হেসে ছেলেটাকে বুকে জড়িয়ে নিল। সেই আলিঙ্গনে ছিল অদ্ভুত এক উষ্ণতা, এক নিঃশব্দ তৃপ্তি, এই ছোট্ট মানুষটিই তার অংশ। এরপর একে একে সবাই এগিয়ে এলো, বিহান এসে পিঠ চাপড়ে বলল,

-"ভাই, আজ তোকে ছাড়া পার্টি অসম্ভব ছিল!"

নুহা, আফরিন, এমরিন, রূপকথা, হাসতে হাসতে তাকে ঘিরে ধরল। কেউ হাত বাড়িয়ে দিল, কেউ আলতো করে জড়িয়ে ধরল, প্রতিটি স্পর্শে ছিল আন্তরিকতার উষ্ণ ছোঁয়া। তানভীর মজা করে বলে উঠল—

-"বয়স কিন্তু বাড়ছে, ভাই!"

ফারাহ্ সঙ্গে সঙ্গে ধমক দিয়ে উঠল—

-"ভাইয়া অলওয়েস ইয়ং থাকবে!"

সেই কথায় চারপাশে হালকা হাসির ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল, একটা সহজ, নির্ভার আনন্দ। রুহান, উপমা, মেঘ, নাদিম, স্মৃতি, আশিক, নিজস্ব ভঙ্গিতে শুভেচ্ছা জানাল। কারও কথায় উচ্ছ্বাস, কারও চোখে আবেগ, কারও স্পর্শে নিঃশব্দ ভালোবাসা।

শ্যাডো ইউনিটের শুভেচ্ছায় ছিল এক অন্যরকম দৃঢ়তা। বন্ধুত্বের সেই গভীর, অটুট বন্ধন যেন তাদের প্রতিটি আচরণে স্পষ্ট হয়ে উঠল। কেউ কাঁধে হাত রাখল, কেউ শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, কথা না বলেও জানিয়ে দিল, "আমরা আছি, সবসময়।"

তারপর বন্ধুরা এগিয়ে এলো, পুরোনো দিনের সেই চেনা উষ্ণতায় ভরা আলিঙ্গন। তাদের হাসি, তাদের চোখের চাহনি, সবকিছুতেই ছিল দীর্ঘদিনের সখ্যতার এক গভীর আরাম। এইভাবে একে একে সবার শুভেচ্ছা, হাসি, স্পর্শ, সব মিলিয়ে ইলহান যেন ভালোবাসার এক অদৃশ্য বৃত্তের মাঝে দাঁড়িয়ে রইল।যেন পৃথিবীর সব উষ্ণতা এসে আজ তাকে ঘিরে ধরেছে। কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে সেই উচ্ছ্বাস নেমে এলো স্বাভাবিকতার নরম ঢেউয়ে। কেউ পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল, পেছনে অসীম সবুজ আর আকাশকে বন্দী করার চেষ্টা। কেউ কেকের টেবিল ঘিরে হাসাহাসিতে মেতে উঠল, কথার ফাঁকে ফাঁকে ভেসে আসছে খিলখিল হাসি। কেউ আবার মাটিতে বসে গল্পে ডুবে গেল, পুরোনো স্মৃতি, নতুন রসিকতা, সব মিলিয়ে সময়টা যেন থমকে দাঁড়াল। বাচ্চারা নিজেদের মতো ছোটাছুটি শুরু করে দিয়েছে, তাদের হাসির শব্দ বাতাসে মিশে এক অন্যরকম প্রাণচাঞ্চল্য এনে দিল।

নূরাইসা একটু দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছে, তার ঠোঁটে তৃপ্তির নরম হাসি। চোখে সেই গভীর শান্তি, যা শুধু প্রিয় মানুষকে খুশি করতে পারার পরেই আসে।নাহিয়ান আবার দৌড়ে সবার মাঝে ঢুকে পড়েছে, তার ছোট্ট উপস্থিতিই যেন এই বিশাল আনন্দের কেন্দ্রবিন্দু।

আর ইলহান, সে দাঁড়িয়ে আছে মাঝখানে। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা হাসি, কোলাহল, প্রিয় মানুষদের উষ্ণ উপস্থিতি, সবকিছু ধীরে ধীরে নিজের ভেতরে ধারণ করছে। পাহাড়ি হাওয়া এসে আলতো করে ছুঁয়ে যাচ্ছে তাকে। সূর্যের আলো নরম হয়ে গায়ে পড়ছে, একটা সোনালি উষ্ণতা মেখে দিচ্ছে তার অস্তিত্বে। তার মনে হচ্ছে, জীবনের এই মুহূর্তটাই হয়তো সবচেয়ে পূর্ণ,

সবচেয়ে জীবন্ত, সবচেয়ে আপন। এমন এক মুহূর্ত, যা সময়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে, চিরকাল থেকে যাবে হৃদয়ের গভীরে।

.

সূর্য তখন ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে দূরের গহীন উপত্যকার দিকে। সোনালি রঙে ছেয়ে যাচ্ছে আকাশ, বাতাসে ভেসে আসছে ঠান্ডা, নরম এক ছোঁয়া। মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তে পৃথিবী যেন নিঃশব্দ এক পবিত্র আশ্রয়, আর ভালোবাসা তার একমাত্র মৃদু উচ্চারিত অনুভব। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে, বিহান-নুহা, আফরিন-এমরিন, রুহান-উপমা, তানভীর-ফারাহ্, ইলহান-নূরাইসা। চারপাশে প্রকৃতি যেন নিজেকে একটু থামিয়ে দিয়েছে, শুধু এই মুহূর্তটাকে পূর্ণ করে তুলতে।সূর্য ধীরে ধীরে লালিমায় মিশে যাচ্ছে, আকাশের বুকে আঁকছে রঙের গভীর আবেগময় স্তর, সোনালি, কমলা, আর রক্তিমের এক অপূর্ব সংলাপ। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে শীতল, নরম স্পর্শ, যেন অদৃশ্য কোনো হাত আলতো করে ছুঁয়ে দিচ্ছে প্রত্যেককে, মনে করিয়ে দিচ্ছে, এই মুহূর্ত ক্ষণস্থায়ী, তবুও চিরন্তন। বিহান নুহার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল—

-"নীলপদ্ম, কখনও কি ভেবেছিলে, এক সূর্যাস্তের আলো আমাদের এত গভীর প্রেমের সাক্ষী হবে?"

নুহা মৃদু হেসে তার হাতটা ধরল, চোখে শান্ত, গভীর দীপ্তি—

-"হয়তো না, তবে এই মুহূর্ত সবসময় মনে থাকবে।"

তাদের কণ্ঠে কোনো বাড়তি আবেগ নেই, তবুও প্রতিটি শব্দ যেন হৃদয়ের গভীরতম সুর ছুঁয়ে যায়। আফরিন-এমরিন একে অপরের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে, নিঃশব্দ, তবুও পরিপূর্ণ। তাদের চোখের কোণে লুকিয়ে থাকা হাসি যেন হাজার কথার সমান। হালকা বাতাসে ফারাহ্-এর চুল এলোমেলো হয়ে গেলে তানভীর মৃদু স্পর্শে সেটাকে ঠিক করে দিল, সেই ছোঁয়ায় ছিল অভ্যাস, যত্ন আর নির্ভরতার নীরব প্রকাশ।

রুহান-উপমা, তারা শুধু একে অপরের চোখে চোখ রেখে আছে, যেন পুরো পৃথিবী সরে গিয়ে তাদের জন্য শুধু এই দু’টি দৃষ্টি রেখেছে। পাহাড়ি সবুজে সূর্যের শেষ সোনালি আলো গড়িয়ে পড়ছে। সেই আলো ছুঁয়ে যাচ্ছে প্রতিটি মুখ, প্রতিটি স্পর্শ, প্রতিটি অনুভূতিকে, আর সবকিছুকে এক অপার্থিব আবরণে ঢেকে দিচ্ছে।পাঁচ জোড়া জুটি, তাদের সন্তান, আর নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা প্রকৃতি, সবাই যেন এই প্রেমের সাক্ষী। এই আলো যেন সমস্ত অন্ধকারকে গলিয়ে দেয়, হৃদয়ের ভেতরে জমে থাকা শীতলতা দূর করে এক অনির্বচনীয় উষ্ণতা ছড়িয়ে দেয়। এমরিন আলতো করে আফরিনের হাতের ভাজে নিজের হাত গুঁজে দিল। দু’জনেই সূর্যের দিকে তাকিয়ে, যেন শেষ আলোটুকু ধরে রাখতে চাইল।এমরিন নরম স্বরে বলল—

-"তুমি থাকলে, এই নিঃশব্দ পাহাড়ও যেন কথা বলতে শুরু করে।"

আফরিন হালকা হেসে তার দিকে তাকাল—

-"আর আমি শুনতে পাই শুধু আপনার হৃদয়ের স্পন্দন।"

এক মুহূর্ত থেমে, এমরিন আরও কাছে এগিয়ে এলো—

-"চলো, হাতটি না ছাড়ি, সূর্যও আমাদের দেখছে। আজ আমরা পূর্ণ, আমাদের সন্তান রূপকথাকে পেয়ে।"

দুজনেই একসঙ্গে পাশ ফিরে তাকাল। সামনেই রূপকথা আর নাহিয়ান খেলছে, মাটির ওপর বসে, নিজেদের ছোট্ট জগতে ডুবে। তাদের হাসির শব্দ ভেসে এসে মিশে যাচ্ছে পাহাড়ি বাতাসে, একটি নির্মল, অমলিন ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি হয়ে।

ফারাহ্ ধীরে তানভীরের দিকে তাকাল। তার চোখে লেগে আছে অস্তগামী সূর্যের লাল আভা, একটা নিঃশব্দ উষ্ণতা, সাথে অদ্ভুত কোমল এক অনুভব।চারপাশে বিকেলের শেষ আলো মিশে যাচ্ছে সন্ধ্যার আবছায়ায়। হালকা বাতাস বারবার তার খোলা চুলগুলো দুলিয়ে দিচ্ছে, আর সেই দোলার ফাঁকে যেন জমে উঠছে অজস্র না-বলা কথা, অপ্রকাশিত অনুভূতির ভার। নিঃশব্দের ভেতরেই সে ধীরে বলল—

-"এই হাওয়া যেমন ছুঁয়ে যাচ্ছে আমাদের চুল, তেমনি আমার মনেও ছুঁয়ে যাচ্ছে তানভীর নামক এক পুরুষ।"

এক মুহূর্ত থেমে, যেন নিজের অনুভূতিকে আরও গভীরে ডুবিয়ে নিয়ে আবার বলল—

-"তুমি যদি হাতটি ধরো, আমি আর কখনও দূরে যেতে চাইব না।"

তার কণ্ঠে মিশে ছিল এক অনাবিল নিশ্চয়তা, এক অদৃশ্য প্রতিশ্রুতি। চারপাশের প্রকৃতিও যেন সেই মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে শুনছিল তাদের কথা। তানভীর তাকে বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নিয়ে মৃদু কন্ঠে বলল—

-"তুমি চাইলেও তোমাকে দূরে যেতে দেবো না। তুমি আমি এখন এক। আমরা যেন হাওয়ায় মিশে যাই, ঠিক সূর্যাস্তের মতো।"

অন্যদিকে, ঠিক একই আকাশের নিচে, রুহান আলতো করে উপমার খোলা চুল কানের পেছনে গুঁজে দিল।তার স্পর্শে ছিল এক ধরনের নির্ভরতা, এক অদৃশ্য আশ্রয়ের অনুভূতি। দূরে পাখিরা নীড়ে ফিরছে, আকাশে গাঢ় হচ্ছে সন্ধ্যার রঙ, আর সেই আবহে তাদের দু’জনের নীরবতা আরও গভীর হয়ে উঠছে।রুহান মৃদু স্বরে বলল—

-"তোমার চোখের দিকে তাকালে, সময় থেমে যায়।"

তার দৃষ্টিতে ছিল বিস্ময়, যেন সে নতুন করে আবিষ্কার করছে এক অনন্ত জগৎ।

-"আর আমি চাই, এই মুহূর্ত চিরকাল থাকুক।"

বাতাস থমকে আছে, সময় যেন ধীরে বইছে, শুধু তাদের অনুভূতির ছন্দে। উপমা মৃদু হেসে বলল—

-"চলো, শুধু একে অপরের চোখে হারাই, বাকিটা পৃথিবী দেখুক।"

সন্ধ্যার আলো ক্রমে ম্লান হয়ে আসে, কিন্তু তাদের অনুভূতির দীপ্তি ততই উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। যেন পুরো পৃথিবী থেমে আছে, আর তারা দু’জন, দুই জোড়া চোখের গভীরে, নিজেদের নতুন এক জগৎ খুঁজে নিচ্ছে।

চারপাশে তখন নরম আলো, সন্ধ্যার রঙ মিশে আছে উষ্ণতার আবহে। দূরে বন্ধুবান্ধবের হাসি-আড্ডা মিলেমিশে এক ধরনের উৎসবের সুর তুলেছে। সেই ভিড়ের মাঝেই যেন আলাদা এক জগৎ তৈরি করে দাঁড়িয়ে আছে তারা দু’জন। ইলহান নূরাইসার দিকে তাকিয়ে বলল—

-"ধন্যবাদ নূরেজান, এত সুন্দর জন্মদিনের উপহার দেওয়ার জন্য। তুই জানিস? আজও তোর হাসি সূর্যকে হার মানায়।"

নূরাইসা মৃদু হেসে সন্তানের দিকে তাকাল, ছোট্ট পা ছড়িয়ে তাদের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে সে। কখনও রূপকথার চুল টেনে দিচ্ছে, কখনও নিজের জগতে হারিয়ে যাচ্ছে। সেই দৃশ্যটুকু যেন তাদের ভালোবাসার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। নূরাইসা কোমল কণ্ঠে বলল—

-"আমাদের ছোট্ট আলোও কি সূর্যস্নাত প্রেমটা অনুভব করছে, মোল্টেন হার্ট?"

ইলহান একটু ঘেঁষে দাঁড়াল, তার কণ্ঠে গভীরতা—

-"অবশ্যই। সে জানে, এ ভালোবাসা শুধু আমাদের নয়, এটা তারও জন্মের আলো। আমাদের প্রেমের মতোই নাহিয়ান এই মুহূর্তে পৃথিবীর আলো হয়ে আছে।"

নূরাইসা তার হাতের ওপর নিজের হাত রেখে, চোখে চোখ রেখে ধীরে বলল—

-"আমাদের সূর্যস্নাত ভালোবাসা... প্রতিটি সূর্যাস্তে নতুন করে জন্ম নেয়, আর প্রতিটি ভোরে পুনর্জন্ম পায়।"

হালকা বাতাসে তার শাড়ির আঁচল দুলে উঠল, মৃদু, স্নিগ্ধ এক ছন্দে। চারপাশের পরিবেশে তখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি, যেন প্রকৃতি নিজেই নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করছে এই মুহূর্তের জন্য। সে ধীরে ঘুরে ইলহানের সামনে এসে দাঁড়াল। ইলহান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল, চোখে স্পষ্ট বিস্ময়, কৌতূহল, আর এক অজ্ঞাত শিহরণ। কিছু একটা অদ্ভুত, কিছু একটা গভীর ইঙ্গিত যেন নূরাইসার আচরণের আড়ালে নীরবে দোল খাচ্ছে। নূরাইসা ধীরে, অত্যন্ত কোমলতায়, ইলহানের দুই হাত তুলে নিজের পেটের ওপর রাখল।কালো তাতের শাড়ির ভাঁজের ওপার থেকে সেই স্পর্শে ইলহান অনুভব করল এক অদ্ভুত নরমতা, এক অনির্বচনীয় কম্পন, যেন জীবনেরই কোনো গোপন সুর সেখানে মৃদু ধ্বনিত হচ্ছে। মুহূর্তটা হঠাৎ করেই থমকে গেল, সময় যেন নিজের গতিপথ ভুলে স্থির হয়ে দাঁড়াল তাদের চারপাশে। পেছনে ভেসে আসা হাসির শব্দ, উল্লাস, সবকিছু ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে দূরে মিলিয়ে গেল, যেন এই দুজন মানুষকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছে এক নিভৃত, গভীর জগৎ। নূরাইসা ইলহানের বাদামি চোখে চোখ রেখে দাঁড়াল, চোখে মায়া, ঠোঁটে অচেনা এক কম্পন। তার গলায় তখন আবেগের ঢেউ, নীরব অথচ প্রবল, যেন প্রতিটি শব্দের ভেতর লুকিয়ে আছে এক অনন্ত গল্প। নূরাইসা ধীরে বলল—

-"জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা, আমার প্রিয় মানুষ... আমার ভালোবাসা... আমার স্বামী... আমার সন্তানের বাবা। আজকের এই দিনে আপনি পৃথিবীতে এসেছেন বলেই আমি পেয়েছি এমন এক মানুষ, যে আমার জীবনের আশ্রয়... আর আমার সন্তানের জন্য একজন নিখুঁত বাবা।"

এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তার চোখের কোণ বেয়ে। সে আবার বলল—

-"আজকের এই দিনে আপনাকে যে কোনো উপহারই দেওয়া কম হয়ে যাবে, তাই আপনাকে আপনার অংশটাই উপহার দিচ্ছি আমি।"

কথাগুলো বাতাসে ভেসে রইল, নিঃশব্দে, অথচ গভীর অনুরণনে। যেন প্রতিটি শব্দ অদৃশ্য ঢেউ হয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে। ইলহান বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে রইল, দৃষ্টিতে অবিশ্বাস, বিস্ময় আর হঠাৎ জেগে ওঠা এক অপরিচিত আলো। মুহূর্তের জন্য যেন সময় নিজেকে থামিয়ে দিল, স্থির, স্তব্ধ, নিঃশ্বাসহীন। তার নিজের হৃদস্পন্দন কানে তীব্রভাবে বাজতে লাগল, যেন বুকের ভেতর কোনো ঢাক অবিরাম ধ্বনিত হচ্ছে।হঠাৎই সে উচ্চস্বরে বলে উঠল—

-"আমার অংশ? তুই প্রেগন্যান্ট, নূরেজান?"

প্রশ্নটা বাতাস চিরে ছুটে গেল, কাঁপা কাঁপা অথচ উন্মুখ প্রত্যাশায় ভরা। নূরাইসা ভেজা চোখে মৃদু হাসল, সেই হাসিতে ছিল লাজ, ভালোবাসা আর এক অনির্বচনীয় পূর্ণতা। ধীরে, খুব ধীরে সে মাথা নাড়ল। সেই সামান্য নাড়ায় যেন এক বিশাল সত্যের উন্মোচন হলো, এক নতুন জীবনের নিঃশব্দ ঘোষণা। এরপর আর নিজেকে থামাতে পারল না ইলহান। উচ্ছ্বাসে ভরে উঠল তার সমস্ত অস্তিত্ব, প্রতিটি শিরা-উপশিরায় যেন আনন্দের জোয়ার বয়ে গেল। সে এক ঝটকায় নূরাইসাকে কোলে তুলে নিল, শক্ত করে, যেন তাকে আর কখনো ছেড়ে দেবে না। তারপর ঘুরতে লাগল বারবার, উন্মাদ, উচ্ছ্বসিত, অবিশ্বাস্য এক আনন্দে। চারপাশের আলো, মানুষের হাসি, দূরের শব্দ, সবকিছু মিলেমিশে যেন এক অপার্থিব আবহ তৈরি করল। সেই আবহের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে তারা দুজন, আর তাদের ভেতরে জন্ম নিচ্ছে এক নতুন গল্প, এক নতুন পৃথিবী। ইলহান চিৎকার করে বলতে লাগল—

-"আমি আবার বাবা হতে চলেছি! নূরেজান.. আমি আবার বাবা হতে চলেছি!"

তার কণ্ঠে ছিল বিস্ময়, উচ্ছ্বাস, আর এক অদ্ভুত পূর্ণতার কম্পন, যেন বহু প্রতীক্ষিত কোনো স্বপ্ন হঠাৎ বাস্তবের আলোয় ধরা দিয়েছে। সেই মুহূর্তে তাদের চারপাশের পৃথিবী যেন নিঃশব্দে মুছে গেল, রইল শুধু একটুকরো আলো, এক বিন্দু উষ্ণতা, একটি পরিবার, আর ভালোবাসার এক নতুন জন্ম। সে চিৎকার করে বলতে লাগল—

-"ভালোবাসি তোকে, নূরেজান। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার তুই আর আমার সন্তানেরা। জন্মদিনে এমন উপহার দেওয়ার জন্য তোকে ধন্যবাদ, খুব ভালোবাসি তোকে আমি, নিজের চেয়েও বেশি!"

কথাগুলো যেন ইলহানের বুকের অতল গভীর থেকে উঠে এসে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল, প্রতিটি শব্দে মিশে রইল অশ্রুসিক্ত আনন্দের দীপ্তি। তার কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছিল এক অনির্বচনীয় আবেগ, এক পরিপূর্ণ মানুষের নিঃশ্বাস, যে হঠাৎ করেই তার পৃথিবীকে সম্পূর্ণ পেয়ে গেছে। নূরাইসা লজ্জায় তার বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলল।তার উষ্ণ নিঃশ্বাস ইলহানের বুক ছুঁয়ে বারবার ফিরে আসছিল, যেন সেই স্পর্শেই তারা দুজন নিজেদের আরও কাছে টেনে নিচ্ছে। ইলহান উচ্ছ্বাসে, আবেগে বারবার বলতে লাগল—

-"ভালোবাসি... ভালোবাসি তোকে..."

বাবার এমন উচ্ছ্বাস দেখে ছোট্ট নাহিয়ান আনন্দে লাফিয়ে উঠল। তার সেই নির্মল, স্বচ্ছ হাসি চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল, আর সেই সুরে সুর মিলিয়ে রূপকথাও লাফাতে লাগল। দু’জনের খিলখিল হাসি যেন ভোরের শিশিরবিন্দুর মতো ঝলমল করে উঠল, স্বচ্ছ, পবিত্র, আর জীবনের গভীরতম আনন্দে ভরা। সেই মুহূর্তে চারপাশটা যেন এক অদৃশ্য আলোয় ভেসে গেল, যেখানে ভালোবাসা শুধু অনুভূতি নয়, বরং এক জীবন্ত স্পন্দন, একটি পরিবারের হৃদস্পন্দন।

তাদের এই ভালোবাসার মুহূর্তে, পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর মনেও নাড়া দিল অদৃশ্য এক সুর। কেউ নিঃশব্দে নিজের জীবনসঙ্গীর হাত ধরল, কেউ আলতো করে জড়িয়ে নিল, মৃদু হাসিতে ভরে উঠল তাদের মুখ। যেন এই ভালোবাসা সংক্রামক, এক হৃদয় থেকে আরেক হৃদয়ে ছড়িয়ে পড়ছে নিঃশব্দে। দূরে সূর্য ডুবে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্ত। আকাশে রঙের খেলা, কমলা, সোনালি আর লাল মিশে এক অপার্থিব আবহ তৈরি করেছে। মনে হলো, আলো যেন থমকে গেছে এক মুহূর্তের জন্য, যেন এই দৃশ্যটুকু দেখে নিতে চায় শেষবারের মতো। সূর্যের শেষ সোনালি রশ্মি ধীরে ধীরে এসে ছুঁয়ে দিল তাদের, ঠিক যেন বিদায়ের আগে তার উষ্ণ হাত বাড়িয়ে দিল এই প্রেমময় পৃথিবীর দিকে। সেই আলোয় ভেসে উঠল ভালোবাসার এক চিরন্তন ব্যাখ্যা, উষ্ণতা, দীপ্তি, নবজাগরণ, আর এক নির্মল সত্য, যা অন্ধকারকেও রূপ দেয় আশ্বাসে। বাতাস ধীরে ধীরে বইতে লাগল। পাতারা কেঁপে উঠল মৃদু শব্দে।আকাশ বদলে নিতে লাগল তার শেষ রঙ। আর তাদের নীরব দৃষ্টির মাঝখানে, এক অদৃশ্য প্রশ্ন ভেসে উঠল—

-"সূর্যস্নাত ভালোবাসা কাকে বলে?"

কেউ উচ্চারণ করল না তার উত্তর। তবু প্রত্যেকেই অনুভব করল, এটাই সেই ভালোবাসা, যা হৃদয়কে উষ্ণ রাখে, অন্ধকারকে আলোয় ভরিয়ে দেয়, আর প্রতিটি সম্পর্ককে নতুন করে জন্ম দেয়, প্রতিটি সূর্যাস্তে, প্রতিটি ভোরে। ঠিক তখনই সূর্যের শেষ সোনালি রেখা এসে প্রতিফলিত হলো তাদের চোখে, নিঃশব্দে, ধীরে, গভীর এক আবেগে লিখে দিয়ে গেল—

"সূর্যস্নাত ভালোবাসা"

বিজ্ঞাপন
সূর্যস্নাত ভালোবাসা গল্পটি নওরিন ইথিকা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ভালোবাসাময় গল্প