সূর্যস্নাত ভালোবাসা

পর্ব - ৫৪

🟢

নূরাইসাকে কেবিনে স্থানান্তর করা হয়েছে। গতকালের তুলনায় তার শারীরিক অবস্থার লক্ষণীয় উন্নতি, সমস্ত প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা সম্পন্ন করেই আজ প্রভাতে তাকে কেবিনে আনা হয়েছে। গতকাল তার চেতনা ফিরে পাওয়ার সংবাদে দেওয়ান বাড়ির পুরুষরা নীরব কৃতজ্ঞতায় মসজিদের পথে গিয়েছিল, সিজদায় লুটিয়ে পড়ে প্রার্থনায় ভিজিয়েছিল কপাল। নারীরা হাসপাতালের করিডোরেই নামাজে দাঁড়িয়ে, অশ্রুসিক্ত চোখে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জ্ঞাপন করেছে। এখন আর কোনো জটিলতা নেই, চিকিৎসকের কণ্ঠে দৃঢ় আশ্বাস।তাই অকারণ ভিড় এড়িয়ে সকলে বাড়ি চলে গেছে। কেবিনের দরজা ধীরে বন্ধ হয়েছে, করিডোরের শব্দ স্তিমিত। কেবল ইলহান রয়ে গেছে। তাকেও ফিরে যেতে বহুবার বলা হলেও সে অনড়, প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে নিজের প্রার্থনার প্রাপ্তির পাশে।

আরও তিন দিন নূরাইসাকে হাসপাতালে রাখা হবে, তারপর রিলিজ। কিন্তু ইলহানের অন্তর্লীন আতঙ্ক কিছুতেই প্রশমিত হচ্ছে না। একবার হারানোর অতল গহ্বরে প্রায় নিমজ্জিত হয়েছিল সে, দ্বিতীয়বার সেই অন্ধকারের পুনরাবৃত্তি সে হতে দিতে চায় না। সারাদিন বাড়ির সবার সঙ্গে নূরাইসা অত্যন্ত ধীর, প্রায় ফিসফিস কণ্ঠে কথা বলেছে, যেনো উচ্চস্বরে উচ্চারণ করলে আবার ভেঙে যাবে এই নাজুক শান্তি। সবার মুখের ক্লান্তি, উৎকণ্ঠার ছাপ দেখে নূরাইসার মুখেও মলিনতা নেমে এসেছিল। কিন্তু সবাই তাকে আশ্বস্ত করেছে "সব ঠিক আছে।" আশ্বাসের শব্দগুলো যেনো বাতাসে নরম তুলোর মতো ভেসে বেড়িয়েছে, তবু ভেতরের শঙ্কা পুরোপুরি মোছা যায়নি। রাতের খাবার তাকে খাইয়ে দিয়ে একে একে সবাই ফিরে গেছে। কেবিনে নেমেছে গভীর নৈঃশব্দ্য। দেয়ালে ঝুলন্ত ঘড়ির টিকটিক শব্দ, স্যালাইনের ফোঁটা ঝরার ক্ষীণ ধ্বনি, দূর থেকে ভেসে আসা নার্সদের পায়ের শব্দ, সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত স্তব্ধতার সিম্ফনি। কাঁচের জানালা দিয়ে আসা ফ্যাকাশে আলো নূরাইসার মুখে পড়ে তাকে আরও স্বচ্ছ, আরও নাজুক করে তুলেছে। সবার সঙ্গে কথা বলে নূরাইসার যে ভালো লেগেছে, তা তার মুখের উজ্জ্বলতায় স্পষ্ট। যেনো দীর্ঘ অন্ধকার শেষে সূর্যরশ্মি স্পর্শ করেছে তাকে। সেই দীপ্ত মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইলহান, চোখে অব্যক্ত কৃতজ্ঞতা, অনুতাপ, আর এক অনমনীয় প্রতিজ্ঞা। নূরাইসা অপ্রস্তুত হয়ে হালকা কণ্ঠে বলল—

-"কি দেখছেন এইভাবে?"

-"তোকে!"

-"আমাকে কি আজকে নতুন দেখছেন নাকি?"

ইলহানের কণ্ঠ হঠাৎ গভীর হয়ে এলো—

-"আমাকে এবার তুই সত্যি সত্যি ভয় পাইয়ে দিয়েছিলি, নূরেজান। আমি ভেবেছিলাম তোকে এইবার হারিয়েই ফেলব বোধহয়! তুই কেনো আমার জন্য ওই বুলেট নিজের শরীরে নিয়েছিস?"

কথাগুলো উচ্চারণের সময় তার স্বর ভেঙে যাচ্ছিল।বুকের ভেতর জমে থাকা আতঙ্ক যেনো শব্দের সাথে সাথে বেরিয়ে আসছিল। নূরাইসা শান্ত, প্রায় স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বলল—

-"আমার জায়গায় আপনি থাকলেও একই কাজ করতেন!"

এই সরল স্বীকারোক্তি যেনো ইলহানের হৃদয়ে অদৃশ্য কোনো আঘাত হানে। সে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল, মুখ ঘুরিয়ে জানালার দিকে তাকাল, যেনো চোখের ভেতরের ঝড়টাকে লুকোতে চায়। নূরাইসা বুঝতে পারছিল, তাকে হারানোর আশঙ্কায় মানুষটি ভিতরে ভিতরে কতটা ভেঙে পড়েছে। তার মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। দাড়ি গজিয়ে উঠেছে অবিন্যস্তভাবে, চোখের নিচে কালি, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। কতদিন ঠিকমতো খায়নি সে? কত রাত জেগেছে নির্ঘুম প্রহর গুনে? কেউ কি তাকে জোর করে একবেলা ভাত খাইয়েছে? কেউ কি বলেছে—"চোখ বন্ধ করো, আমি আছি"? তার অনুপস্থিতিতে এই মানুষটা বাঁচত তো? নাকি নিঃশব্দে ভেঙে পড়ত ধ্বংসস্তূপের মতো? নূরাইসার বুক হঠাৎ কেঁপে উঠল। মিহি, কোমল স্বরে ডাকল—

-"ইলহান ভাইয়া!"

শব্দটি বাতাস চিরে যেনো সোজা গিয়ে আঘাত করল ইলহানের বুকে। সে তড়াক করে চোখ তুলে তাকালো।সেই চোখে স্পষ্ট রাগ, আসলে রাগ নয়, আতঙ্কের ছদ্মবেশে লুকানো ভালোবাসা। নূরাইসা সেই চোখ দেখে হেসে ফেলল। হাসিটা ছিল নির্মল, শিশুর মতো।কিন্তু জোরে হাসতে গিয়ে আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে টান লাগতেই মুখ বিকৃত হয়ে হালকা আর্তনাদ বেরিয়ে এলো তার ঠোঁট থেকে। ইলহান মুহূর্তে উঠে দাঁড়াল।চেয়ারটা পেছনে ঠেলে শব্দ করে সরে গেল। উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে সে ঝুঁকে পড়ে বলল—

-"কি হয়েছে? কোথায় লেগেছে? তোকে কে হাসতে বলেছে? উফ, তুই আমায় একটুও শান্তি দিবি না, নূরেজান!"

ইলহানের কণ্ঠে উৎকণ্ঠার ঝড়। তার আঙুলগুলো অস্থির, কোথায় ব্যথা, কতটা টান লেগেছে, কিছুই যেনো বুঝে উঠতে পারছে না। নূরাইসা মৃদু হেসে ইলহানের ব্যস্ত হাত দু’টি ধরে থামিয়ে দিল। সেই স্পর্শে এক অদ্ভুত স্থিরতা। ইলহান প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালো, চোখে ভয়, অনুরোধ, আর অগাধ টান।নূরাইসা ইশারায় তাকে নিজের পাশে শুতে বলল। এক মুহূর্ত ইতস্তত করল ইলহান, হাসপাতালের কেবিন নয়, নিয়মের ভেতর বন্দী এক পরিসর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে বাধ্য ছেলের মতো তার পাশে শুয়ে পড়ল।হাসপাতালের বেড তো একজনের জন্য, সেখানে বিশাল দেহী ইলহানের জায়গা হলো না খুব একটা। কষ্ট করে, শরীর কাচুমাচু করে, যেনো নিজের অস্তিত্ব ছোট করে নিয়ে শুয়ে রইল সে। তবুও তার মুখে কোনো অভিযোগ নেই, বরং আছে তৃপ্তির ছায়া, প্রিয় মানুষটি এখন তার নাগালের ভেতর। নূরাইসা ভ্রু কুঞ্চিত করে তাকালো—

-"এইভাবে শুয়েছেন কেনো? আমাকে জড়িয়ে ধরুন!"

ইলহানের গলায় দ্বিধার রেখা—

-"যদি ব্যথা পাস?"

নূরাইসার কণ্ঠে নিঃশর্ত আস্থা—

-"আপনি আমাকে কোনোদিনও ব্যথা দেবেন না... আমি জানি!"

এই একটি বাক্য যেনো ইলহানের বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত অপরাধবোধ, সমস্ত আতঙ্ক ভেঙে চুরমার করে দিল। ধীরে, অত্যন্ত সাবধানে সে নূরাইসাকে জড়িয়ে ধরল। কতগুলো দিন পর! কত দীর্ঘ, নির্ঘুম রাত পেরিয়ে এই আলিঙ্গন! তার কাঁপা স্পর্শে নূরাইসার শরীর জুড়ে শিহরণ বয়ে গেল, ভয়ের নয়, ফিরে পাওয়ার। ইলহানও তা অনুভব করল। তার বুকের ভেতর যে তোলপাড়, যে উন্মত্ত ঝড় এতদিন ধরে চলছিল, সে যেনো এক নিমিষে স্তব্ধ হয়ে গেল। সে আরও ঘনিষ্ঠ হলো, সাবধানে মুখ গুঁজে দিল নূরাইসার উন্মুক্ত কাঁধে। কেবিনের সাদা আলো, স্যালাইনের ফোঁটার ধ্বনি, রাতের নিস্তব্ধতা, সব মিলিয়ে মুহূর্তটি হয়ে উঠল গভীর, অন্তরঙ্গ অথচ পবিত্র। নূরাইসা চোখ বুজে নিল, আবেশে, নিশ্চিন্ততায়। হঠাৎ কাঁধে ভেজা উষ্ণতা অনুভব করল সে। ইলহান কাঁদছে। নীরব, দমবন্ধ কান্না, যেখানে শব্দ নেই, আছে শুধু বুকভাঙা স্বস্তি আর অব্যক্ত যন্ত্রণা। নূরাইসার বুক মোচড় দিয়ে উঠল। তার আঙুলগুলো ধীরে ধীরে ইলহানের চুলে বিলি কেটে দিল। ধীর, গভীর কণ্ঠে সে বলল—

-"আমি তো আছি... দেখছেন না? আমি কোথাও যাইনি। আপনাকে ফেলে কখনো যাবও না।"

কেবিনের দেয়ালগুলো যেনো সেই শপথ শুনে নীরবে সাক্ষী রইল। এই আলিঙ্গন ছিল না শুধু শরীরের কাছাকাছি আসা, এ ছিল মৃ ত্যুভয়ের অতল গহ্বর পেরিয়ে ফিরে পাওয়া দুইটি আত্মার।

-"কাঁদছেন কেনো? আমি তো আছি আপনার কাছেই!"

নূরাইসার কণ্ঠ ছিল মোলায়েম, তবু ভেতরে অদৃশ্য কাঁপন। ইলহান ফুঁপিয়ে উঠল। তার মুখ তখনও নূরাইসার কাঁধে গুঁজে রাখা, যেনো সেই আশ্রয় ছেড়ে দিলে আবার সব ভেঙে পড়বে। থেমে থেমে, ভাঙা স্বরে সে বলল—

-"আমাদের সন্তান... আমাদের ছেড়ে চলে গেছে! সে এসেছিল... আমরা জানতে পর্যন্ত পারলাম না। নিঃশব্দে এসে আমাদের সারাজীবনের দুঃখ দিয়ে নিঃশব্দে চলে গেছে সে..."

কথাগুলো বাতাসে ঝুলে রইল। কেবিনের সাদা দেয়াল যেনো হঠাৎ আরও ফ্যাকাশে হয়ে উঠল। স্যালাইনের ফোঁটার শব্দও ভারী লাগছিল, প্রতিটি ফোঁটা যেনো শোকের গণনা করছে। নূরাইসা চোখ বন্ধ করে নিল।গতকাল চিকিৎসকেরা তার শরীরের প্রতিটি অবস্থা খুলে বলেছিল। বারবার শোক দেওয়ার চেয়ে একবারেই দেওয়া উত্তম। যদিও ডাক্তাররা নিষেধ করেছিল, এ মুহূর্তে সন্তান প্রসঙ্গ না তুলতে। কিন্তু ইলহান শোনেনি। তার বিশ্বাস, এক দিনের জন্যও কোনো সত্য গোপন করা চলবে না। নূরাইসার অধিকার আছে তার সন্তান সম্পর্কে জানার। পরে জেনে কি কষ্ট কম হবে? না, বরং আরও বাড়বে। "সবাই আমাকে অন্ধকারে রেখেছিল" এই ভাবনাই তাকে ভেতর থেকে ক্ষতবিক্ষত করবে। নূরাইসা সংবেদনশীল মনের মানুষ। তার কাছে সত্য লুকিয়ে রাখা অন্যায়। ইলহানের যুক্তির সঙ্গে পরিবারের সবাই একমত হয়েছিল। ফলে তাকে সব বলা হয়েছে।

নূরাইসা সব শুনে কেঁদেছে। অঝোরে, অবিরাম, বুক ভেঙে কেঁদেছে সে। তার কান্না থামার নাম নিচ্ছিল না।চোখের জল শুকিয়ে গেলেও হাহাকার শুকায়নি।হাসপাতালের করিডোর পর্যন্ত সেই কান্নার রেশ পৌঁছে গিয়েছিল। অজ্ঞাত শোকের চেয়ে জেনে নেওয়া শোক যে কত ভারী, তা সেদিন প্রত্যেকে অনুভব করেছে।অবশেষে ইলিনা বেগম বাধ্য হয়ে আইসিইউতে ঢুকেছিলেন। তাঁর মুখে ছিল কঠোর স্নেহের রেখা, চোখে মায়ার গভীর ছায়া। তিনি নূরাইসার কপালে হাত রেখে দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন—

বিজ্ঞাপন

-"মা, আল্লাহ যা নেন, তা ফেরতও দেন। আমাদের সন্তানের হায়াত যতটুকু ছিল, ততটুকুই ছিল। তুই যদি ভেঙে পড়িস, তবে সে শান্তি পাবে কী করে? তোর শরীর এখনো দুর্বল। তুই নিজেকে সামলা। তুই বেঁচে আছিস, এইটুকুই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় নিয়ামত।"

আইসিইউ–র নিঃশব্দ সাদা আলোয় ইলিনা বেগমের কণ্ঠ ছিল দৃঢ় অথচ স্নেহমাখা—

-"তোমার সন্তান নিজের জীবন দিয়ে তোমাকে বাঁচিয়ে গেছে। তার এই ত্যাগ বিফলে যেতে দিও না। সে পরকালে তোমার আর ইলহানের জন্য অপেক্ষা করবে। তোমার সন্তান বেঁচে থাকলে যেভাবে জীবন কাটাতে, সেভাবেই কাটাবে। নইলে সে কষ্ট পাবে। তুমি কি চাইবে তোমার সন্তান কষ্ট পাক?"

নূরাইসা তখন শিশুর মতো দু’পাশে মাথা নেড়ে ‘না’ বুঝিয়েছিল। তার চোখে তখনও অবিশ্বাস, বুকভরা শূন্যতা। ইলিনা বেগম থামেননি। তিনি আরও বলেছিলেন—

-"ইলহান অনেক ভেঙে পড়েছে। তোমার এই অবস্থা, তার ওপর সন্তান হারানো, সে অনেক কেঁদেছে। তার আর শক্তি নেই কোনো কষ্ট বহন করার। তুমি এইভাবে থাকলে তুমিও অসুস্থ হয়ে পড়বে। আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছেন। তাই বলে যে আছে তাকেও হারাবে? ইলহানের মতো শক্ত মনের মানুষ এই শোক নিতে পারেনি, ইসা। স্ত্রী হিসেবে এখন তোমার নিজেকে শক্ত রাখতে হবে। তুমি একজন মা, এইভাবে ভেঙে পড়ো না। নিজের স্বামীর পাশে দাঁড়াও। তার জন্য তোমাকে আবার বাঁচতে হবে।"

কথাগুলো ছিল সান্ত্বনার, তবু ছিল শোকের স্বীকৃতি।বর্তমানে ফিরে এসে, নূরাইসা ধীরে ধীরে চোখ খুলল।ইলহানের চুলে হাত বুলিয়ে দিল। তার নিজের চোখও ভিজে উঠেছে, কিন্তু এবার কান্না আর আগের মতো উন্মত্ত নয়, এবার তা নীরব, স্থির। সেদিন হয়তো নূরাইসা কথাগুলোর সম্পূর্ণ গভীরতা অনুধাবন করতে পারেনি। শোকের ঘন কুয়াশায় সব শব্দই ছিল অস্পষ্ট।

কিন্তু আজ, ইলহানের বুকভাঙা কান্না অনুভব করে, সে বুঝতে পারছে। এই মানুষটি, যে বাইরে থেকে কঠোর, দৃঢ়, প্রায় অটল এক পাহাড়ের মতো, সে এভাবে কাঁদছে? একটি সন্তান হারালে মায়েদের বুকই সবচেয়ে বেশি পোড়ে, এ কথা সত্য। কারণ সন্তানকে নয় মাস ধারণ করার স্বপ্ন, প্রতিটি ক্ষুদ্র অনুভূতি, প্রতিটি স্পন্দন মায়ের শরীরেই জন্ম নেয়। নূরাইসার সঙ্গে তার অনাগত সন্তানের সম্পর্ক ছিল মাত্র তিন সপ্তাহের, অদেখা, অনুচ্চারিত, অথচ গভীর। কিন্তু ইলহান? সে তো সেই স্পন্দন টের পায়নি, কোনো লাথি অনুভব করেনি, কোনো আল্ট্রাসাউন্ডের ছবিতে চোখ রেখে স্বপ্ন দেখেনি। তবুও, সে ভেঙে পড়েছে।

পুরুষ মানুষ নাকি কাঁদে না। নিজের কষ্ট লুকিয়ে রাখে, স্ত্রীর চোখে জল না আসুক বলে নিজের বুকের ভেতর আগুন চাপা দেয়। তাহলে নূরাইসা কেনো পারবে না?সে যদি স্বামীর জন্য হাসতে পারে, তার সামনে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে পারে, তবে কি সেটাই হবে না তার মাতৃত্বের প্রথম দায়িত্ব? নূরাইসা নীরবে চোখের জল ফেলল। কোনো শব্দ নেই, কোনো হাহাকার নেই, শুধু নীরব অশ্রু, যা গড়িয়ে পড়ে ইলহানের চুলে মিশে গেল।সে ধীরে ধীরে ইলহানের মুখ তুলে ধরল, দুই হাতের মুঠোয় তার মুখাবয়ব আবদ্ধ করল। নরম, অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল—

-"আমাদের সন্তান আল্লাহর কাছে আমানত ছিল। সে আমাকে বাঁচিয়ে দিয়ে গেছে, এটাই তার সবচেয়ে বড় পরিচয়। আপনি ভেঙে পড়লে সে খুশি হবে না। আমি কাঁদব না আর... আপনি-ও কাঁদবেন না। আমরা দু’জন একসাথে থাকব, তার জন্য, আমাদের জন্য।"

তার কণ্ঠে ছিল শোকের ছায়া, কিন্তু তার চেয়েও বড় ছিল সংকল্প।

-"সে আমাদের ছিল... আছে। শুধু আমরা তাকে ছুঁতে পারলাম না। আল্লাহ ওকে আমাদের আমানত করে রেখেছিলেন, আবার নিয়ে গেছেন। হয়তো সে আমাদের জন্য জান্নাতে অপেক্ষা করবে..."

তার কণ্ঠ ভাঙছিল, তবু সেখানে আশার ক্ষীণ আলো। ইলহান আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তাকে, যেনো এইবার যা আছে, তাকে কোনো শক্তিই কেড়ে নিতে না পারে। কেবিনের ভেতর তখন শুধু দুইটি মানুষের নিঃশ্বাসের শব্দ। একটি হারানোর শোক, আর একটি বেঁচে থাকার প্রতিজ্ঞা, দু’টিই পাশাপাশি, একই বুকে।ইলহানকে আর কী বলে শান্তনা দেবে সে? এই কষ্টের জন্য কি আদৌ কোনো শব্দ আছে? কোনো বাক্য কি পারে একটি অনাগত সন্তানের শূন্যতা পূরণ করতে? নূরাইসা বুঝে, এ শোকের ভাষা নেই। এ শোক শুধু অনুভব করা যায়, বুকে বহন করা যায়, নিঃশব্দে সহ্য করা যায়। সে আর কোনো বড় কথা বলল না। কোনো দর্শন নয়, কোনো উপদেশ নয়। শুধু ধীরে ধীরে নিজের ভাঙা স্বামীকে বুকে টেনে নিল। তার মাথাটা নিজের বুকে চেপে ধরল, যেনো বলছে, আমি আছি... তুমি একা নও। ইলহানের কাঁধ কাঁপছে। নূরাইসার বুকও কাঁপছে। নীরবে কাঁদছে দুটি মানুষ, তাদের ভূমিষ্ঠ না হওয়া সন্তানের জন্য। কিন্তু সেই কান্নার মাঝেও নূরাইসা খুব আস্তে বলল—

-"ও আমাদের ছিল... আছে। আমরা ওকে দেখতে পাইনি, কিন্তু ও আমাদের ভালোবেসেই এসেছে। আপনি নিজেকে দোষ দেবেন না। আমি আপনাকে দোষ দিচ্ছি না। আল্লাহ যা করেন, আমাদের ভালোর জন্যই করেন,।হয়তো আমরা এখন বুঝতে পারছি না।"

সে ইলহানের কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করল—

-"আপনি যদি ভেঙে পড়েন, আমি দাঁড়াবো কিভাবে? আপনি আমার শক্তি। আমাকে বাঁচতে হবে আপনার জন্য... আর আমাদের সন্তানের জন্য। ও চায় না তার বাবা এভাবে কাঁদুক।"

শব্দগুলো খুব সাধারণ, কিন্তু ভালোবাসা ছিল গভীর।কিছু শোক আছে, যেগুলো ভাগ করে নেওয়াই একমাত্র শান্তনা। কিছু ব্যথা আছে, যেগুলো একসাথে বয়ে নিলেই হালকা হয়। জানালার বাইরে তখন ভোরের আলো ধীরে ধীরে আকাশ ছুঁয়ে উঠছে। রাতের দীর্ঘ অন্ধকার সরে যাচ্ছে অনিচ্ছায়। আর সেই সকালের দিকে হাত ধরে এগিয়ে যাবে, একজন মা,

একজন বাবা, আর তাদের অদেখা সন্তানের নীরব আশীর্বাদ।

.

পরদিন প্রভাতের প্রথম আলো যখন হাসপাতালের কাঁচঘেরা জানালায় নীরব স্বর্ণরেখা আঁকছিল, তখনই নূরাইসা একরকম জোর করেই ইলহানকে বাড়ির উদ্দেশে পাঠিয়ে দিয়েছিল। রুহান, তানভীর, বিহান, তিনজন মিলে প্রায় টেনে-হিঁচড়ে তাকে নিয়ে গেছে, যেনো অতিরিক্ত উদ্বেগ আর ক্লান্তি থেকে সামান্য মুক্তি দেওয়াই তাদের একমাত্র লক্ষ্য। কেবিনজুড়ে তখন এক অদ্ভুত স্থিরতা। সাদা দেয়ালে স্যালাইনের ছায়া পড়ে আছে, বাতাসে জীবাণুনাশকের তীক্ষ্ণ গন্ধ, আর দূরের করিডরে নার্সদের মৃদু পায়ের শব্দ, সব মিলিয়ে এক বিষণ্ণ অথচ প্রশান্ত পরিবেশ। নূরাইসার পাশে বসে আছে নুহা, আফরিন, উপমা। চারজনের কথোপকথন যেনো কৃত্রিম স্বাভাবিকতার আবরণে মোড়া, হালকা হাসি, চাপা দীর্ঘশ্বাস, অপ্রকাশিত উদ্বেগের অনুচ্চারিত তরঙ্গ। তারা গল্প করছে, কিন্তু প্রত্যেকের চোখের গভীরে লুকিয়ে আছে অদৃশ্য শঙ্কা। ঠিক সেই মুহূর্তেই, কেবিনের দরজা ধীরে ধীরে কিঞ্চিৎ শব্দ তুলে খুলে গেল। যেনো দৃশ্যপটের অন্তরালে কোনো নতুন অধ্যায় প্রবেশ করলো। দরজার ফাঁক গলে প্রবেশ করলো পায়েল। তাকে দেখেই নূরাইসার ভ্রু অনিচ্ছাকৃতভাবে কুঞ্চিত হয়ে উঠলো, একটুখানি বিস্ময়, একটুখানি সংশয়, আর হয়তো অজ্ঞাত অস্বস্তির মিশ্র প্রতিক্রিয়া।নুহা ও আফরিন সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।নীরবতা কয়েক মুহূর্তের জন্য ভারী হয়ে উঠলো।তারপর নুহার কণ্ঠ ভেসে এলো—

-"তুমি এখানে কী করছ, আপু?"

পায়েল ধীর, সংযত পদক্ষেপে এগিয়ে এলো। তার চলনে ছিল অস্বাভাবিক স্থৈর্য, কিন্তু চোখের গভীরে যেনো অন্য কিছুর ঝলক। বিছানার কাছে এসে সে মৃদুস্বরে বলল—

-"ভার্সিটি থেকে এসেছি। আমার এক বান্ধবী পড়ে গিয়েছিল, তাই হাসপাতালে আসা। ইলহান ভাইকে যেতে দেখলাম। তারপর তাদের মুখেই সব শুনে ইসার সাথে দেখা করতে এলাম।"

তার কণ্ঠে ছিল স্বাভাবিকতার আবরণ, অথচ শব্দের ভাঁজে ভাঁজে যেনো অদৃশ্য প্রশ্নচিহ্ন। নূরাইসা ঠোঁটে সৌজন্যমিশ্রিত হাসি ফুটিয়ে বলল—

-"এসো, আপু। বসো। খুব ভালো করেছো এসেছো।"

পায়েলের হঠাৎ আগমনটি সুবোধজনক ঠেকলো না আফরিন, নুহা ও উপমার কাছে। তাদের দৃষ্টিতে এক মুহূর্তের জন্য সন্দেহের ছায়া ভেসে উঠেছিল, কিন্তু কেউই উচ্চারণ করলো না কোনো প্রশ্ন। নীরবতা কখনও কখনও উচ্চস্বরে বলা অভিযোগের চেয়েও প্রবল, আর সেই নীরবতাই তখন কেবিনজুড়ে ছড়িয়ে ছিল। পায়েল নূরাইসার পাশে বসে গল্প করছিল। তার কণ্ঠ ছিল স্বাভাবিক, কিন্তু আঙুলের অস্থির নড়াচড়া যেনো অন্তর্লীন উত্তেজনার পরিচয় দিচ্ছিল। কথার ফাঁকে হঠাৎ সে ব্যাগ খুলে একটি মাস্ক বের করলো।ধীরস্থির ভঙ্গিতে সেটি মুখে পরল, যেনো স্রেফ সতর্কতার খাতিরে। মুহূর্তের ব্যবধানে, দরজাটি আবারও খুলে গেল। শব্দটি এবারে কিছুটা স্পষ্ট, কিছুটা দৃঢ়। প্রবেশ করলো আরবী। তার সঙ্গে এক অচেনা বয়স্ক মহিলা, বয়সের ছাপ থাকা সত্ত্বেও অদ্ভুত আকর্ষণীয়, তীক্ষ্ণ দৃষ্টির অধিকারিণী। তার উপস্থিতি কক্ষের আবহকে অস্বস্তিকরভাবে ভারী করে তুললো।

সবার ভ্রু কুঞ্চিত হলো। প্রশ্ন জমাট বাঁধলো চোখে। কিন্তু কেউ কিছু বলার আগেই, আরবী হাত তুললো। তার আঙুলে ধরা ছোট্ট স্প্রে ক্যান থেকে সূক্ষ্ম কণার মেঘ ছড়িয়ে পড়লো বাতাসে। তীক্ষ্ণ, অপরিচিত গন্ধ মুহূর্তেই কেবিনের শীতল বাতাসে মিশে গেল। আরবী ও সেই অচেনা নারী আগে থেকেই বিশেষ মাস্কে সুরক্ষিত।নূরাইসা প্রথমে কপালে হাত ঠেকালো। উপমার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। নুহা কিছু বলতে গিয়ে বাক্য শেষ করতে পারলো না। আফরিনের আঙুল বিছানার চাদরে শক্ত হয়ে চেপে রইল, তারপর ধীরে ধীরে আলগা হয়ে গেল। এক এক করে তাদের দৃষ্টি নিভে এলো। চেতনা সরে যেতে লাগলো স্তর স্তর করে, যেনো কেউ গভীর অন্ধকারে নামিয়ে দিচ্ছে তাদের। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে কেবিন নিস্তব্ধ। সাদা দেয়াল, মেশিনের ক্ষীণ শব্দ, আর চারটি অচেতন দেহ, পরিবেশ হয়ে উঠলো ভয়ংকরভাবে স্থির। আরবী ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। তার পদক্ষেপে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, শুধু নিশ্চিত দখলের নিশ্চুপ ঘোষণা। সে নুহার অচেতন শরীরের কাছে ঝুঁকে পড়লো। ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ, শীতল হাসি। তারপর ফিসফিস স্বরে বলল—

-"বিহানকে আমার লাগবেই, নুহা রানি। তোমরা ভুল পুরুষের জীবনে এসেছো। আমরা প্রত্যেকেই তোমাদের স্বামীকে চাই... আর নিজের করেই ছাড়ব!"

তার কণ্ঠে ছিল আকাঙ্ক্ষার উন্মাদনা, দখলের নিষ্ঠুর সংকল্প, আর প্রতিহিংসার দহন। বাইরে তখন সকালের আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। কিন্তু কেবিনের ভেতর, একটি অদৃশ্য ঝড়ের সূচনা হয়ে গেল।

বিজ্ঞাপন
সূর্যস্নাত ভালোবাসা গল্পটি নওরিন ইথিকা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ভালোবাসাময় গল্প