"স্বাগতম আপনাদের। এতক্ষণ শুনছিলেন শিরোনাম, এবার বিস্তারিত।
গতকাল গভীর রাতে পার্বত্য জেলা বান্দরবান থেকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান তন্ময়কে।আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, সীমান্তবর্তী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলমান ড্রা গ ও অ স্ত্র পাচার চক্রের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।
জানা যায়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কয়েক বছর ধরে একটি গোপন মিশনের মাধ্যমে এই চক্রের ওপর নজর রাখছিল। দীর্ঘ অনুসন্ধান ও তথ্য সংগ্রহের পর অবশেষে প্রয়োজনীয় প্রমাণ হাতে পেয়ে পুলিশের মাধ্যমে মামলা দায়ের করা হয়। এর পর থেকেই এমপি রায়হান তন্ময় আত্মগোপনে ছিলেন বলে জানা গেছে।
গোপন সূত্রের ভিত্তিতে পুলিশ তার অবস্থান শনাক্ত করে বান্দরবনে অভিযান চালায়। সেখানেই তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা আরও জানিয়েছেন, তিনি দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল তথ্য বিদেশি রাশিয়ান মাফিয়াদের কাছে বিক্রি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে রাশিয়ান মাফিয়াদের গোপন ঘাঁটি আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে তিনি একাধিকবার রাষ্ট্রের গোপন তথ্য পাচার করেছেন বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এই ঘটনার পেছনে রাশিয়ান মাফিয়াদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বা প্রতিশোধমূলক হা ম লা র যোগসূত্র থাকতে পারে। যদিও বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। তদন্তের অগ্রগতি ও নতুন তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছে গোটা দেশ। বিস্তারিত জানাতে আমরা আবারও ফিরে আসবো। ততক্ষণ পর্যন্ত চোখ রাখুন চ্যানেল একানব্বই-এ।"
দেওয়ান বাড়ির ড্রয়িংরুমে থমথমে নীরবতা।টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে আসা খবরের শব্দগুলো যেন ঘরের ভেতর ভারী হয়ে ঝুলে আছে। তানভীর ইতিমধ্যেই সবকিছু জানিয়ে দিয়েছে—ইলহান নিখুঁত ভাবে তার বোনের ওপর হওয়া অন্যায়ের প্রতিশোধ নিয়েছে।
ঘরের প্রতিটি মানুষের চোখে তখন অশ্রু। সে অশ্রু শুধুই কষ্টের নয়, তাতে মিশে আছে স্বস্তি, ন্যায়ের প্রাপ্তি আর এক গভীর গর্ব। বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসগুলো ধীরে ধীরে নিঃশ্বাসে পরিণত হচ্ছে।ইকবাল দেওয়ান চুপচাপ বসে আছেন। অথচ তাঁর বুকটা গর্বে ফুলে উঠেছে। এমন এক সন্তানের জনক, যে অন্যায়ের সামনে মাথা নত করেনি, যে নিজের রক্তের অপমানের জবাব দিয়েছে মাথা উঁচু করে, এই ভাবনাটাই তাঁর চোখ ভিজিয়ে দিচ্ছে।
সবাই একে অন্যের দিকে তাকালো। অশ্রুসিক্ত নয়নে ফুটে উঠলো নীরব এক হাসি, যেখানে ভাষা নেই, কিন্তু অনুভূতির কোনো অভাবও নেই। প্রত্যেকের চোখে গর্ব, সন্তুষ্টি, স্বস্তি। তাদের হাসিতে ছিল যন্ত্রণার ভার, ন্যায়ের তৃপ্তি আর এক অদ্ভুত শান্তি। যেন এই ঘরের প্রত্যেকটি দেয়াল, প্রতিটি নিঃশ্বাস সাক্ষী হয়ে রইল, আজ দেওয়ান বাড়িতে শুধু প্রতিশোধ নয়, আত্মসম্মানও ফিরে এসেছে।
.
-"নূরেজান শান্ত থাক। ঘুমোতে দে আমায়।"
-"উঠুন। দুপুর হয়ে গেছে। আমার খুদা লেগেছে!"
ইলহান পিটপিট করে চোখ মেলে তাকালো। ঘরের ভেতর ঢুকে পড়া দুপুরের আলো চোখে এসে বিঁধছে, ঘুম ভাঙার অস্বস্তিকর উজ্জ্বলতা। আলোটা যেন শুধু জানালা দিয়ে নয়, রাতের ক্লান্তির ভেতর দিয়েও ঢুকে পড়েছে। তার সামনেই নূরাইসা। হঠাৎ করেই চোখে চোখ পড়ে গেল দুজনের। নূরাইসার চোখে একরাশ বিরক্তি। সেই দৃষ্টি কিছু বলে না, তবু অনেক কথা জমে আছে সেখানে। গত রাতটা ছিল দীর্ঘ, অস্বাভাবিক দীর্ঘ। ঝামেলা, উত্তেজনা, কথা আর নীরবতার টানাপোড়েন পেরিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত অনেক গভীর হয়ে গিয়েছিল। ক্লান্ত শরীর বিছানায় ছুঁড়ে দিয়ে কখন যে ঘুম নেমে এসেছে, ইলহান নিজেও জানে না।সেই গভীর, ভারী ঘুম ভেঙেছে নূরাইসার নড়েচড়ে ওঠার কারণে।
ইলহান উঠে বসতেই নূরাইসা আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না। ছাড়া পেয়ে এক ছুটে বাথরুমে ঢুকে পড়ে সে।দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা ঘরের ভেতর খানিকটা বেশি জোরেই প্রতিধ্বনিত হয়। সেই শব্দের সঙ্গে সঙ্গে ইলহানের ঠোঁটে অজান্তেই এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। চেনা সেই ব্যস্ততা, চেনা সেই তাড়া, নূরাইসাকে সে এই রূপেই চেনে। চঞ্চল, লাজুক, কিন্তু অচেনা নয়।
কিছুক্ষণ পর নূরাইসা বেরিয়ে এলে ইলহান নিজেও উঠে ফ্রেশ হতে চলে যায়। পানির শব্দ, আয়নায় নিজের ক্লান্ত চোখ, সব মিলিয়ে সে নিজেকে একটু গুছিয়ে নেয়। ফিরে এসে দেখে, নূরাইসা মলিন মুখে খাটের ওপর বসে আছে। চোখের চাহনিতে স্পষ্ট ক্লান্তির ছাপ, শুধু শরীরের নয়, ভেতরেরও। যেন রাতটা এখনও তার চোখে লেগে আছে। ইলহান ধীরে এগিয়ে আসে। ঘরের বাতাস ভারী, দুপুরের আলো হঠাৎই খুব নির্দয় মনে হয়। একটু থেমে, নিচু গলায় সে জিজ্ঞেস করলো—
-"কি হয়েছে?"
নূরাইসা চোখ তুলে তাকিয়ে ধীর গলায় বলল—
-"পেটে ব্যাথা করছে!"
ইলহান পাশে বসে আলতো করে তার পেটের ওপর হাত রেখে বলল—
-"ফার্মেসিতে যাবো?"
-"প্রয়োজন নেই!"
-"ব্যথা বল্লি তো!"
-"শুধু ব্যথাই!"
-"তাহলে গ্যাসের সমস্যা?"
-"মনে হয়!"
-"আচ্ছা চল। অনেক বেলা হয়েছে। কিছু খেলে ঠিক হয়ে যাবে!"
নূরাইসা আর কিছু বলল না। নিঃশব্দে উঠে নিচে নেমে এলো। সবাই একসাথেই হালকা পাতলা খাবার খেলো।দুপুর বেলায় ঘুম থেকে উঠে ভারী খাবার কারও গলাতেই নামছে না। খাওয়া শেষে সবাই ড্রয়িংরুমে বসে টিভিতে খবর দেখছিল। ঘরের ভেতর ছড়িয়ে ছিল এক অদ্ভুত স্বস্তি, ঝড় কেটে যাওয়ার পরের সেই নীরব শান্তি। বাতাসে এখনো উত্তেজনার রেশ আছে, তবে তা নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছে।
হঠাৎ করেই নূরাইসা উঠে দৌড়ে বেসিনের দিকে চলে গেল। পরমুহূর্তেই বমির শব্দ। শব্দটা খুব জোরে না হলেও পুরো ঘর কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।ইলহান এক লাফে উঠে পড়লো। এক মুহূর্ত দেরি না করে হন্তদন্ত হয়ে ছুটলো স্ত্রীর পেছনে। বাথরুমের দরজায় এসে থমকে দাঁড়ায়, তারপর আরও কাছে এগিয়ে যায়। বমি শেষ হলে তাকে ফ্রেশ করিয়ে নিয়ে এসে সোফায় বসালো। ইলহানের হাতটা শক্ত করে ধরা, যেন ছেড়ে দিলে নূরাইসা পড়ে যাবে। নূরাইসার মুখ ফ্যাকাসে, চোখ দুটো জলে ভিজে আছে। ক্লান্তি আর অস্বস্তি মিলেমিশে তার মুখে এক অচেনা ছায়া ফেলেছে। ড্রয়িংরুমের শান্ত পরিবেশ মুহূর্তেই বদলে গেল। সবার চোখে ছায়া নামলো। বুকের ভেতর অজানা আশঙ্কা একসাথে দানা বাঁধলো। একসাথে উদ্বিগ্ন কণ্ঠ ভেসে এলো—
-"কি হয়েছে?"
নূরাইসা ক্লান্ত কণ্ঠে বলল—
-"পেটে ব্যাথা। মনে হচ্ছে গ্যাসের সমস্যা!"
নুহা আর আফরিন দ্রুত এগিয়ে এসে তার পাশে বসলো। দু’জনেই স্নেহভরা হাতে তার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল। সেই ছোঁয়ায় যেন একটু ভরসা মিশে থাকল। নুহা চিন্তিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—
-"হাসপাতালে যাবি?"
নূরাইসা হালকা নিঃশ্বাস ফেলে বলল—
-"না, প্রয়োজন নেই। আসলে গতকাল ওইসব দেখেছি তো... তাই শরীরটা আরো বেশি খারাপ করছে!"
আফরিন চিন্তিত কন্ঠে বলল—
-"হ্যাঁ! আমারও শরীর খারাপ করছিল। তুই রুমে গিয়ে রেস্ট কর।"
নূরাইসা আর কথা বাড়ালো না। ধীর পায়ে নিজের রুমে চলে গেলো। তার চলাফেরায় কোনো রাগ নেই, কোনো অভিযোগও নেই, শুধু শরীরের অস্বস্তি আর ভেতরের ক্লান্তি একসাথে তাকে ধীর করে দিয়েছে।
নূরাইসার শরীর খারাপ হওয়ায় কেউ আর বিকেলের দিকে বাইরে বের হলো না। বাড়িটা যেন হঠাৎই থেমে গেল। সেই বিকেলটা কেটে গেল অদ্ভুত এক অলসতায়, যেখানে আড্ডা নেই, হাসি নেই, আছে শুধু নিঃশব্দ অপেক্ষা। সময় এগোচ্ছে, কিন্তু কেউ তাড়া দিচ্ছে না। জানালার বাইরে আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে, ভেতরে জমছে এক ধরনের অজানা শূন্যতা।
নূরাইসা পুরো বিকেল ঘুমিয়েই কাটিয়েছে। ঘুমটা গভীর, কিন্তু শান্ত নয়, মাঝে মাঝে কপাল কুঁচকে যায়, নিঃশ্বাস ভারী হয়। আর ইলহান— সে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকেছে তার দিকে। কখনো বিছানার পাশে বসে, কখনো একটু দূরে দাঁড়িয়ে। যেন কাছে গেলে ঘুম ভেঙে যাবে, আবার দূরে থাকলে বুকের ভেতর অস্থিরতা বাড়বে। তাই মাঝামাঝি এক নীরব অবস্থানে নিজেকে আটকে রাখে সে।
ইলহানের মনে হচ্ছিল, সে দিন দিন নূরাইসাকে আরও বেশি ভালোবেসে ফেলছে। যতই দেখে, তার তৃষ্ণা মেটে না। আরও বেশি দেখতে ইচ্ছে করে। আরও কাছে পেতে ইচ্ছে করে। বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখতে ইচ্ছে করে, যেন দুনিয়ার কোনো ঝড় তাকে ছুঁতে না পারে, কোনো অশান্তি তার দিকে তাকাতেও না পারে। এই আদুরে, নীরব নূরাইসাই তার পুরো জীবন। তার সমস্ত ক্লান্তির বিশ্রাম। তার সমস্ত যুদ্ধের পরের শান্তি। আর সেই শান্তিটুকু হারানোর ভয়েই ইলহান নিঃশব্দে বসে থাকে, একটা বিকেল, একটা নিঃশ্বাস, একটা ঘুম, সবকিছু আগলে রাখার মতো করে।
.
নুহা আর বিহান বারান্দায় বসে আছে। সন্ধ্যার নরম আলো ধীরে ধীরে চারপাশ ঢেকে ফেলছে। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, মাঝেমধ্যে বাতাসে নড়ে উঠছে পর্দা। টেবিলের ওপর রাখা ল্যাপটপের পর্দায় কাজের ফাইল খোলা, আর তার সামনে গভীর মনোযোগে বসে আছে বিহান। কিবোর্ডে আঙুলের টোকা বারান্দার নিস্তব্ধতাকে বারবার ভেঙে দিচ্ছে। নুহা কফির মগটা আলতো করে টেবিলে নামিয়ে রাখল।পোড়া কফির হালকা গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল। সে একটু থেমে, চোখে কৌতূহল আর সন্দেহের মিশ্রণে বলল—
-"এই জন্যই এত ল্যাপটপ নিয়ে থাকতেন?"
বিহানের আঙুল থেমে গেল। সে ধীরে চোখ তুলে নুহার দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে ক্লান্তি আছে, আছে চাপা রাগ আর দীর্ঘদিনের জমে থাকা কষ্ট। সে ল্যাপটপ বন্ধ করে সোজা হয়ে বসলো, যেন আর লুকোবার কিছু নেই। গম্ভীর কণ্ঠে বললো—
-"আফরিন আমারও বোন। বিশ্বাস করো নুহা, ইলহান, আমি, রুহান, তানভীর, আমরা সবাই এতদিন কী যে কষ্টে ছিলাম! কতভাবে, কত জায়গায় রায়হানকে খুঁজেছি। দিন গেছে, রাত গেছে, কোনো সূত্র নেই। অবশেষে আমরা সফল হয়েছি।"
এক মুহূর্ত থামল সে। নিঃশ্বাসের ভার যেন হঠাৎ বেড়ে গেল।
-"সত্যি বলতে কী, আমরা ওকে মে রে ফেলতেই চেয়েছিলাম। কিন্তু ইলহানের পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন!"
নুহা ধীরে কফির মগ তুলে নিল। গরম কফিতে চুমুক দিল, যেন নিজের ভেতরের অস্থিরতাকে ঠান্ডা করার চেষ্টা করছে। চোখ নামানো অবস্থাতেই সে জিজ্ঞেস করল—
-"ভাইয়ার পরিকল্পনা কি?"
বিহান চেয়ারে হেলান দিল। এক হাতে কফির মগ, অন্য হাত ঢিলে হয়ে চেয়ারের পাশে ঝুলে পড়েছে। তার চোখ দুটো দূরের আকাশে আটকে রইল। বিহান গভীর নিঃশ্বাস নিল। কণ্ঠস্বর নীচু, কিন্তু প্রতিটি শব্দ ভারী—
-"মানুষের কিছু চাহিদা থাকে, জানো তো। সব পুরুষ সেই চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। রায়হান তন্ময় ঠিক তেমনই একজন, যার চোখের সামনে নারী এলেই সংযম ভেঙে পড়ে। এই দুর্বলতাটাকেই ইলহান অস্ত্র বানিয়েছে।"
একটু থামল সে। কফির মগে জমে থাকা ধোঁয়া ধীরে মিলিয়ে গেল, ঠিক তার কথার উষ্ণতার মতো।
-"ইলহান ওকে এমন এক অবস্থায় ফেলেছে, যেখান থেকে মুক্তির কোনো পথ নেই। জেলের ভেতরে চারপাশে এমন পরিবেশ থাকবে, যা তার ভেতরের তৃষ্ণাকে দিনে দিনে বাড়িয়ে দেবে। যেমন মানুষ পানির অভাবে তড়পায়, তেমনি সে তড়পাবে, কিন্তু সেই তৃষ্ণা মেটানোর ক্ষমতা তার থাকবে না। তার সামনে থাকবে প্রলোভন, কিন্তু হাত বাঁধা থাকবে অসহায়ত্বে। এই ‘না পারা’, এই চরম অক্ষমতাই ধীরে ধীরে তাকে মৃ ত্যুর দিকে ঠেলে দেবে। আমরা একবারেই শেষ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ইলহান চায় ও প্রতিদিন ম রু ক।এমনভাবে ভাঙুক, যে একসময় নিজেই মৃ ত্যুর ভিক্ষা চাইবে। অথচ মৃ ত্যু তখনও তার নাগালের বাইরে থাকবে।"
বারান্দার বাতাস হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে এলো। নুহার কফির মগটা কেঁপে উঠল হাতে, শুধু ঠান্ডায় নয়, কথাগুলোর নিষ্ঠুর বাস্তবতায়। নুহা বেশ কিছুক্ষণ নীরবে বসে রইল।সেই নীরবতা ছিল ভারী, অকারণ নয়, কথার ভারে জমে থাকা। বিহান নিষ্পলক তাকিয়ে রইল তার ছোটখাটো বধূর মুখপানে। নুহার চোখে তখন অনেক কথা, কিন্তু কোনো শব্দ নেই। হঠাৎ করেই নুহা উঠে দাঁড়াল। টেবিল থেকে কফির দুটো মগ তুলে নিয়ে উল্টো ঘুরে হাঁটা ধরল। ঠিক সেই মুহূর্তে বিহান তার বাহু টেনে ধরলো, এক ঝটকায় নিজের কোলের ওপর ফেলে দিল তাকে।
নুহা হকচকিয়ে গেল। হাতের মগ দুটো মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেল শব্দ করে। ভাঙা চীনামাটির শব্দ বারান্দার নিস্তব্ধতাকে চিরে দিল। ভয়ে, বিস্ময়ে, নুহা শক্ত করে বিহানের গলা জড়িয়ে ধরল। চোখ দুটো বন্ধ। বিহান এক হাত নুহার পিঠে রাখল, অন্য হাত দিয়ে তার কোমর জড়িয়ে ধরল, আরও শক্ত করে নিজের দিকে চেপে ধরল তাকে। সেই স্পর্শে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, আছে দাবী। নুহা ধীরে চোখ মেলল। মিলন হলো দুজোড়া চোখের। দুটি নয়নের মাঝে দূরত্ব মিলিয়ে গেলো। বিহান মুখটা নুহার মুখের একেবারে কাছাকাছি এনে ফিসফিস করে বলল—
-"শুধু অন্যের কথাই হবে? আমাদের কোনো কথা হবে না?"
নুহার চোখ চঞ্চল হয়ে উঠল। সে কোনো এক জায়গায় দৃষ্টি স্থির রাখতে পারল না। শ্বাস-প্রশ্বাস অস্বাভাবিক হয়ে এলো। তিরতির করে কাপছে পাতলা নরম অধর, সে আমতা আমতা করে বলল—
-"কি... কি কথা?"
বিহান নুহার কোমরে রাখা হাত আরও দৃঢ়ভাবে চেপে ধরল। কণ্ঠ নরম, কিন্তু তাতে ছিল স্পষ্ট ইঙ্গিত—
-"আমাদের তো কোনো কথাই হলো না। এবার কি উচিত নয় নিজেদের নিয়ে কথা বলা?"
নুহা এক মুহূর্ত থমকাল। তারপর ধীরে, কিন্তু স্পষ্ট করে বলল—
-"বলুন... আমি শুনছি।"
বিহান আরো কাছে এগিয়ে এল। নুহার কানের কাছে মুখ নিয়ে নীচু স্বরে বলল—
-"উহুম... বলতে নয়। করতে ইচ্ছুক।"
নুহার কণ্ঠ কেঁপে উঠল। নিঃশ্বাস আটকে আসার উপক্রম। ধীর কন্ঠে জিজ্ঞাসা করলো—
-"কি?"
বিহান ধীরে তার চোখের দিকে চোখ রাখল। সেই দৃষ্টিতে ছিল স্পষ্টতা, ছিল সিদ্ধান্ত। খুব ছোট করে শুধু বলল—
-"এটা।"
নুহা কিছু বুঝে ওঠার আগেই মুহূর্তটা বদলে গেল। ঠিক যেমন করে হঠাৎ দিক পাল্টে যায় ঝড়, কোনো সতর্কতা ছাড়াই। বিহান এগিয়ে এসে নিজের ওষ্ঠ দিয়ে নুহার নরম, কাঁপতে থাকা অধরের দখল নিল, আকস্মিক, অথচ দৃঢ় এক স্পর্শে। তাতে কোনো দ্বিধা ছিল না, ছিল না প্রশ্ন করার অবকাশ। সিদ্ধান্তটা যেন অনেক আগেই নেওয়া, শুধু এই মুহূর্তটার অপেক্ষা ছিল।
চারপাশের শব্দ যেন থেমে গেল। বারান্দার বাতাস, দূরে কোথাও পড়ে থাকা ভাঙা মগের নিঃশব্দ অস্তিত্ব, চারপাশের পৃথিবী, সবকিছু মিলিয়ে গেল সেই একটিমাত্র মুহূর্তে। সময় থমকে দাঁড়াল, বাস্তবতা পিছিয়ে গেল। এখানে আর কথার প্রয়োজন রইল না।শুধু অনুভূতিই সত্য হয়ে রইল, অপ্রস্তুত, তীব্র, আর অস্বীকার করার কোনো পথ না রেখে।
নুহার শ্বাস আটকে এলো, বিহানের স্পর্শে তার ভেতরের সব প্রশ্ন নীরব হয়ে গেল। এই মুহূর্তে ঠিক–ভুলের হিসেব নেই, আছে শুধু একটাই সত্য, এই স্পর্শ, এই নীরবতা, এই হঠাৎ বদলে যাওয়া পৃথিবী।
.
আফরিন কালো রঙের শাড়ি পরেছে। আজ কোথাও যাওয়ার কথা নেই। যেহেতু আজকেই বান্দরবনে তাদের শেষ দিন, তাই সবাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কোনো এক রেস্টুরেন্টে যাবে। বান্দরবনের নামি রেস্টুরেন্টগুলোর ভেতর থেকে একটি, পুরোটাই আজকের জন্য এমরিন বুক করেছে।
ঘরটা নরম আলোয় ভরা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আফরিন চোখে কাজল দিচ্ছে। কাজলের কালো রেখা তার চোখকে আরও গভীর করে তুলেছে, যেনো চোখের ভাষা নিজেই রাতের অন্ধকারের সাথে মিশে যাচ্ছে। খাটের ওপর বসে এমরিন মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে। কালো স্যুটে সে যেন ছায়ার মতো, নীরব, অধিকারী, কিন্তু সঙ্গে এক অদ্ভুত আকর্ষণ। আকস্মিক সে উঠে দাড়ায়, ধীরে পায়ে এসে আফরিনের পেছনে দাঁড়ায়। আয়নায় দুজনের চোখের মিলন ঘটে। আফরিন থমকে যায় সেই দৃষ্টি দেখে। নিঃশব্দ ঘরে দুজনের শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ কানে বাজে। এমরিন আফরিনের খোলা চুল হাতের মুঠোয় নিয়ে নেয়। গভীরভাবে সেই চুলের ঘ্রাণ নেয়, একই সঙ্গে শান্তি, একই সঙ্গে অস্থিরতা। নেশক্ত কন্ঠে সে বলে—
-"কালো তোমাকে ভয়ংকর সুন্দর করে তোলে কারিনো?"
আফরিন হালকা হাসি। চোখ আয়নায় স্থির।
-"ভয়ংকর জিনিসের দিকেই আপনার টান বেশি।"
এমরিন ধীরে আফরিনের কাঁধের কাছে মুখ ঝুঁকিয়ে নিল। তার শ্বাসের উষ্ণতা চুলের ফাঁক দিয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে আফরিনের ত্বক। ফিসফিস করে এমরিন বলল—
-"কারণ অন্ধকার জিনিসই সবচেয়ে সত্যি হয়।"
নীরবতা তাদের চারপাশে ঘন হয়ে এলো। বাইরে পাহাড়ের দিকে নামতে থাকা রাত, ভিতরে দুজনের মাঝের টান, সব মিলিয়ে মুহূর্তটি ভারী হয়ে উঠল।একটু এগিয়ে এলো এমরিন, আফরিনের গলায় মুখ ডুবিয়ে ফিসফিস করে বলল—
-"তুমি জানো, তোমার নিঃশ্বাসের ছন্দেই আমার রিদম জন্ম নেয়। প্রতিটি ক্ষণ তোমার সঙ্গে আমি বিলীন হয়ে যাই, আর এই বিলীনতাই আমাকে নীরবে, অবশ্যম্ভাবীভাবে তোমার আরও নিকটে টেনে আনে।"
আফরিন হকচকিয়ে তাকাল। লাজ আর আকর্ষণের এক অদ্ভুত মিশ্রণ। তার কণ্ঠ কাঁপছে—
-"এমরিন... আপনি... আপনি সব সময় এত...?"
-"না, আমি সবসময় এমন নই। কিন্তু তুমি যখন আমার সামনে থাকো, তখন আমার মাঝে অন্য এক এমরিন রাহাফ জন্মায়। আমি চাই তুমি আমার পাশে থাকো, নিঃশব্দে, অনড়ভাবে। আমি চাই, তোমার সমস্ত অন্ধকারকে স্পর্শ করে দেখার দুঃসাহসী অধিকার।"
আফরিন ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল, চোখে কৌতূহলের আভাস, তার ভেতর লুকোনো দ্বিধা। এমরিন হাত বাড়িয়ে তার কোমর জড়িয়ে ধরল। সেই স্পর্শে আফরিনের সর্বাঙ্গে এক অচেনা শিহরণ বয়ে গেল।মানসপটে একসঙ্গে ভিড় করে রইল ভয় আর আকর্ষণ, দু’টি অনুভূতি, পরস্পরের বিরোধী হয়েও অবিচ্ছেদ্য। আফরিন ফিসফিস করে বলল—
-"আপনি কি জানেন... আমি কখনো এমন ভয় অনুভব করিনি?"
সময় যেন এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে পড়ল। বাইরে কোথাও কোনো শব্দ ছিল না, শুধু হৃদস্পন্দনের অদৃশ্য শব্দ, দুটো আলাদা ছন্দে, অথচ একই আবেশে।
এমরিন ধীরে, খুব ধীরে আরও কাছাকাছি ঝুঁকল।চোখে নেমে এল অন্ধকার, কিন্তু সে অন্ধকার শূন্যতার নয়, বরং এমন এক গভীরতার, যেখানে পড়ে গেলে আর ফিরে আসা যায় না। তার কণ্ঠ এবার নিচু, নিশ্চিত, ভয়কে স্বীকার করে নেওয়ার মতো সাহসী।
-"ভয়ই তো আমাকে জানায়, তুমি আমার কাছে আছো। আর আমি চাই তুমি থাকো, প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ।"
কথাগুলো শুধু শোনা গেল না, অনুভূত হলো। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল এক অদ্ভুত নীরবতা, যে নীরবতা কথা বলে। দু’জনের মাঝখানের দূরত্ব তখন আর শারীরিক ছিল না; সেটা ছিল সিদ্ধান্তের, ছিল আত্মসমর্পণের।কোনো স্পর্শ হয়নি, তবু স্পর্শের চেয়েও বেশি কিছু ঘটে গেছে। এই মুহূর্তে ভয় আর ভালোবাসা আলাদা ছিল না। দু’টোই একই নাম, থেকে যাওয়ার আকুতি।
.
নুহা আজ আকাশি রঙের শাড়ি পরেছে। আকাশের মতোই হালকা, শান্ত, নীল, অথচ সেই শান্তির ভেতর লুকিয়ে থাকা গভীরতা চোখ এড়ায় না। তার পাশে বিহান, একই রঙের স্যুটে। দু’জনকে একসাথে দেখলে মনে হয়, তারা যেন একই আকাশের দুই ভিন্ন মেঘ, পাশাপাশি ভাসছে। কথা না বলেও একে অপরকে বুঝে নিচ্ছে, নিঃশব্দে, নির্ভুলভাবে।
নূরাইসা সাদা রঙের শাড়িতে আজ অদ্ভুতভাবে উজ্জ্বল। এই সাদা কোনো নিষ্পাপতার নয়; বরং একরকম দৃঢ়তার। যেন বহু সিদ্ধান্তের পর নিজেকে এই রঙে দাঁড় করিয়েছে সে। ইলহান সাদা স্যুটে, তার ঠিক বিপরীতে। দু’জন মিলে যেন আলো আর ছায়ার মাঝামাঝি দাঁড়ানো এক নিঃশব্দ চুক্তি। তারা শুধু একে অপরের সঙ্গী নয়, প্রয়োজনে একে অপরের ঢালও হতে পারে।
এমরিন ও আফরিন কালো। নিখাদ কালো। যেন রাত নিজেই মানুষের রূপ নিয়েছে, গভীর, নিশ্চুপ, অথচ সর্বদা সজাগ। তাদের উপস্থিতিতে আলো থমকে যায়, শব্দ নিজ থেকেই শান্ত হয়ে আসে।
রুহান পড়েছে বাসন্তী রঙের শার্ট। বুক পর্যন্ত বোতাম খোলা। পাশেই উপমা একই রঙের শাড়ি পরেছে। যেনো নিজেকে রুহানের রঙে সাজিয়ে তুলেছে সে।
চার জোড়া দম্পত্তি মিলে বেরিয়ে পড়ে রেস্টুরেন্টের উদ্দেশে। রেস্টুরেন্টটা বান্দরবনের এক উঁচু ঢালে।চারপাশে পাহাড়, সবুজে মোড়া বন, আর নিচে নেমে যাওয়া গভীর উপত্যকা। কাঠ আর বাঁশে তৈরি খোলা কাঠামো, দেয়াল বলতে কিছু নেই, শুধু খোলা আকাশ আর দূরে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ের সারি। হালকা বাতাস বইছে, যেন পাহাড় নিজের নিঃশ্বাস ছেড়ে দিচ্ছে। এখান থেকে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়।এতটাই খোলা যে পাহাড়ের অন্য প্রান্তে কেউ দাঁড়িয়ে থাকলেও চোখ এড়ানোর কথা নয়, তবু এই খোলামেলার ভেতরেও এক অদ্ভুত নিরাপত্তা আছে, নিঃশব্দ পাহারার মতো।
গাড়ি থেকে নেমে সবাই ভেতরে চলে এলো।খাবারের টেবিলটা খোলা বারান্দার ঠিক মাঝখানে। উপর দিয়ে পাহাড়ি রাত নেমে এসেছে নিঃশব্দে। তারার আলো পাতার ফাঁক গলে টেবিলের উপর পড়ছে, কখনো ঝরঝর করে, কখনো থেমে থেমে। কাঠের টেবিলে সাজানো পাহাড়ি খাবারের গন্ধ বাতাসে মিশে আছে, ভাতের উষ্ণতা, মাংসের ঝোল, আগুনে ঝলসানো সবজির ধোঁয়া। এই গন্ধে শুধু ক্ষুধা নয়, স্মৃতিও জেগে ওঠে।
নুহা হাসতে হাসতে শাড়ির আঁচল সামলায়। বিহান কিছু একটা বলে তাকে লজ্জা দিচ্ছে। নুহার চোখে তখন শিশুসুলভ উজ্জ্বলতা, সে মুহূর্তে পৃথিবীতে আর কিছু নেই, শুধু এই হাসি আর এই রাত।
অন্যদিকে নূরাইসা খাবারের থালা এগিয়ে দেয় ইলহানের দিকে। ইলহান নীরবে তাকিয়ে থাকে, চোখে মুগ্ধতা। নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে সে। চোখের তৃষ্ণা যেনো মিটছেই না তার। নূরাইসা সেই দৃষ্টি দেখে লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে পরে।
এমরিন আর আফরিন একে অপরের দিকে তাকিয়ে চোখের ভাষায় কথা বলে। এমরিন ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি নিয়ে চোখ দিয়ে আফরিনকে কিছু ইশারা করছে। আফরিন লজ্জায় চোখ পাকিয়ে তাকাচ্ছে। এমরিন সেই দৃষ্টি দেখে মুচকি হাসছে।
অন্যদিকে রুহান ও উপমার চোখে চোখে খুনশুটি হচ্ছে। তিনজোড়া বিবাহিত দম্পত্তির মাঝে তারাই অবিবাহিত। বড় ভাই পাশের চেয়ারে থাকায় রুহান নিজেকে বহুকষ্টে সংযত রেখেছে। উপমা সেই দৃষ্টি দেখে হাসছে।
চারপাশে পাহাড়, ওপরে তারা, মাঝখানে কাঠের টেবিল আর আটজন মানুষ, ভিন্ন রঙে, ভিন্ন ভাষায়, অথচ একই রাতের ভেতর বাঁধা। চামচের শব্দ, প্লেটের হালকা ঠোকাঠুকি, হাসির ফাঁকে ফাঁকে কথার টুকরো, সব মিলিয়ে মনে হয়, রাতটা যেন নিখুঁতভাবে সাজানো। দূরে পাহাড় নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে, বনভূমি অন্ধকারে ডুবে, কেবল ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক।এই ডাক যেন সময়কে থামিয়ে রাখে, রাতকে আরও গভীর করে তোলে। তারা খাচ্ছে, হাসছে, মুহূর্তগুলো ভাগ করে নিচ্ছে।
খাওয়া শেষে সবাই মিলে গল্পে মেতে ওঠে। রাত এখনো অনেক বাকি। এতদিনের ঝামেলা, ক্লান্তি আর দায়িত্বের ভিড়ে কেউ ঠিক করে ঘুরতে এসে আনন্দ করতে পারেনি, তাই আজ বাড়ি ফেরার কোনো তাড়া নেই। গল্পের মাঝেই নুহার বুদ্ধিতেই শুরু হয় ট্রুথ অ্যান্ড ডেয়ার। টেবিলের ওপর একটি কাচের বোতল রাখে রুহান। আলো পড়ে বোতলের গায়ে, মুহূর্তের জন্য সেটা যেন আলাদা করে চোখে পড়ে। রুহান বোতলটি ঘুরিয়ে দেয়। বোতলটি ঘুরতে ঘুরতে থেমে যায় ইলহানের দিকে। ডেয়ার নেয় সে। আর ডেয়ার দেয় এমরিন। ইলহানকে নাচতে হবে।
ইলহান ভ্রু কুঁচকে তাকায়। মুখে অনিচ্ছা,একরকম বিরক্তি। সে নাচবে না। সবাই তাকে জর করতে শুরু করে। এটাই খেলার নিয়ম। কিন্তু ইলহান নাচবে না মানে নাচবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নূরাইসার নরম, কিন্তু দৃঢ় ভাবে বলায়, সব বদলে যায়। ইলহান চুপ করে যায়। তারপর উঠে দাঁড়ায়। সে রেস্টুরেন্টের ম্যানেজারের কাছে গিয়ে কিছু বলে আসে। মুহূর্তের মধ্যেই কয়েকজন এসে টেবিল-চেয়ার সরিয়ে দেয়।খোলা জায়গা তৈরি হয়, ঠিক বারান্দার মাঝখানে, পাহাড়ি রাতের নিচে।
ইলহান নূরাইসার হাত ধরে তাকে নিয়ে আসে। তাকে মাঝখানে দাঁড় করিয়ে, ঠিক তার সামনে এসে দাঁড়ায়। নূরাইসা প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকায়। রেস্টুরেন্টে আলো তখন মৃদু। মোমবাতির শিখা কাঁপছে, হাওয়ায় নয়, যেন আসন্ন কিছুর আগাম অনুভবে। হঠাৎ ধীর, গভীর তুর্কি সাযের সুর উঠতে শুরু করে— Zeybek’in ezgisi।
ইলহানের চোখে তখন অদ্ভুত এক ঝিলিক। মুখে একরকম শান্তি, যেন বহুদিনের কোনো সিদ্ধান্ত আজ শব্দ নয়, শরীরের ভাষায় উচ্চারিত হবে। গানের প্রথম সুর বাজতেই বিহান আর এমরিন আকস্মিক উঠে পড়ে। আফরিন আর নুহাকে আলতো করে টেনে নূরাইসার পাশে দাঁড় করিয়ে দেয়। আফরিন ও নুহা হকচকিয়ে যায়। তিনজন নারী পাশাপাশি দাঁড়িয়ে, চোখে কৌতূহল, শ্বাসে অজানা আশঙ্কা। তিনজন পুরুষ ঠিক তাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। স্ত্রীরা চোখ সরায় না।এক মুহূর্তের জন্যও না।
তিনজনেই একই সঙ্গে নৃত্য শুরু করে। বুক খোলা, কাঁধ পিছনে, মাথা সামান্য নিচু, কিন্তু চোখ সামনে।স্থির। দৃঢ়। প্রতিটা নড়াচড়ায় ওজন আছে, প্রতিটা থামায় অর্থ। যেন প্রতিটি পদক্ষেপ একেকটা প্রতিজ্ঞা।আর ঠিক তখনই, প্রতিটা নড়চড়ের সঙ্গে সঙ্গে,এমরিন, ইলহান আর বিহান ধীরে বলে ওঠে—
-"আমি কারো সামনে নত নই। কিন্তু তোমার সামনে আমি দায়বদ্ধ।"
এই বাক্যটা যেন শুধু উচ্চারণ নয়, প্রতিটা অঙ্গভঙ্গির ভেতর দিয়ে তার অর্থ ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে।
নূরাইসার চোখ বড় হয়ে আসে। সে বুঝতে পারে, এই নত হওয়া কোনো দুর্বলতার চিহ্ন নয়। আফরিনের ঠোঁট কেঁপে ওঠে, গর্ব আর আবেগ একসাথে জমে ওঠে। নুহা গভীর নিঃশ্বাস নেয়। এই দায়বদ্ধতার ভার সে শরীর দিয়ে অনুভব করে, হালকা নয়, অথচ ভরসার।
ইলহান এরপর ধীর পায়ে প্রথম পদক্ষেপ নেয়। সঙ্গে সঙ্গে বিহান ও এমরিনও। ডান পা সামনে এগিয়ে আসে, মাটির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। গোটা পা পড়ে মাটিতে, শুধু আঙুলে নয়; যেন বলা হচ্ছে, আমি পুরোটা নিয়ে দাঁড়াচ্ছি। তারপর বাঁ পা এনে পাশে স্থির করে। পা ফেলার সেই গভীর শব্দের সঙ্গে সঙ্গেই তিনজন একসাথে বলে ওঠে—
-"আমি হালকা নই। আমি তোমাকে ছেড়ে চলে যাবো না। আমি যেখানে দাঁড়াই, সেখানেই থাকি।"
তারা শুধু নাচছে না, নাচের ভাষা অনুবাদ করছে।কারণ নূরাইসা, নুহা আর আফরিন, তারা কেউই আগে কখনো এই নাচ দেখেনি। এই নাচের মানে তারা জানে না। তাই প্রতিটা ভঙ্গির অর্থ শব্দে বেঁধে দিচ্ছে পুরুষগুলো, যেন কোনো ভুল বোঝাবুঝির জায়গা না থাকে। শব্দগুলো কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই নূরাইসার চোখ ভিজে ওঠে। তার মনে পড়ে অস্থির দিনগুলো।আফরিনের কাঁধ ধীরে ধীরে শিথিল হয়। সে বিশ্বাস করতে শুরু করে, এই দাঁড়িয়ে থাকার মধ্যে ভর আছে। নুহার চোখ নত হতে চায়, কিন্তু পারে না। এই দৃঢ়তা তাকে আটকে রাখে, চোখে চোখে বেঁধে ফেলে।
ছেলেরা এরপর দুই হাত ধীরে ধীরে পাশের দিকে ছড়িয়ে দেয়। আঙুলগুলো সোজা নয়, অল্প বাঁকানো, যেন ডানা। শরীরের চারপাশে আলো আর ছায়া মিলেমিশে একধরনের বৃত্ত তৈরি করে। পাহাড়ি বাতাসে তাদের জামা হালকা নড়ে ওঠে, কিন্তু ভঙ্গি টলে না।পূর্বের ন্যায় তারা আবার একসঙ্গে বলে—
-"আমার শক্তি তোমার জন্য। আমার ছায়া তোমার মাথার ওপর সবসময় থাকবে!"
এই কথার সঙ্গে সঙ্গে নূরাইসা অজান্তেই এক পা এগিয়ে আসে। যেন শরীর নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। আফরিন চোখ নামিয়ে হাসে, নীরব, গভীর, এমন এক হাসি যেখানে কোনো প্রশ্ন নেই। নুহার চোখে জল জমে ওঠে, কিন্তু সেই অশ্রু গড়িয়ে পড়তে দেয় না সে। কিছু অনুভূতি কাঁদতে চায় না, ধরে রাখতে চায়।তিনজন পুরুষ। তিনটি ছায়া। তিনটি প্রতিজ্ঞা।
প্রতিটি মুহূর্ত রুহান ক্যামেরা বন্দী করছে। উপমা মুগ্ধ হয়ে দেখছে। এটা তুর্কির এক বিশেষ নাচ। যার মাধ্যমে স্বামীরা তার সহধর্মিনীর প্রতি নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করে। রুহান এই নাচ পারে না। এর অর্থ ও সে জানে না। নইলে সেও উপমার জন্য এই নাচ প্রদর্শন করত।
ইলহান, বিহান ও এমরিন আলাদা আলাদা বৃত্তে ঘুরতে শুরু করে, নিজের নিজের স্ত্রীর চারিপাশে। ঘোরাটা দ্রুত নয়; বরং এমন, যেন সময়কে মেপে নেওয়া হচ্ছে।চোখ নিজের সহধর্মিনীর দিকে স্থির। এই ঘোরার ভেতর দিয়েই তারা বলে ওঠে—
-"জীবন ঘুরবে। বদলাবে। কিন্তু আমার দৃষ্টি তোমার দিকেই থাকবে।"
নূরাইসা অনুভব করে, এই ঘোরার মাঝেও সেই ইলহানের কেন্দ্রবিন্দু। চারপাশ বদলালেও ইলহানের দৃষ্টি তার ওপর স্থির। আফরিনের চোখে একধরনের নিশ্চয়তা নেমে আসে, আর কিছু প্রমাণের দরকার নেই। নুহা বুকের ভেতর একটা স্থিরতা খুঁজে পায়, যেটা সে অনেকদিন ধরে খুঁজছিল, অথচ নাম দিতে পারছিল না।
তারপর তিনজন এক মুহূর্তে, হাঁটু অল্প ভাঁজ করে মাটির দিকে নামে। পুরো বসা নয়, অর্ধেক। ঠিক সেই জায়গাটায়, যেখানে অহংকার ভাঙে, কিন্তু মর্যাদা পড়ে যায় না। তারা বলে—
-"আমি রাজা হতে পারি। কিন্তু তোমার সামনে আমি নিজের অহংকার নামাই।"
এরপর ডান হাত প্রথমে মাটিতে রাখে। তারপর সেই হাত বুকের ওপর, হৃদয়ের খুব কাছাকাছি। দৃষ্টি সামান্য নিচে নামে। পরের বিটে হাতটি ধীরে বাইরে মেলে ধরে। শরীর সোজা। কণ্ঠ একসাথে, উচ্চ, পরিষ্কার—
-"আমার মাটি, আমার হৃদয়, আমি তোমাকে উৎসর্গ করলাম।"
নূরাইসা চোখ নামায়, সম্মানে। আফরিন নিঃশব্দে চোখ মুছে ফেলে, যেন কাউকে দেখতে দিতে চায় না। নুহা নিজের শাড়ির আঁচল শক্ত করে ধরে, এই মুহূর্তটা হাতছাড়া হতে দিতে চায় না। সঙ্গীত থামে না। কিন্তু নাচ থেমে যায়। তিনজন পুরুষ স্থির হয়ে হাঁটু ভাজ করে বসে থাকে। আর এই স্থিরতাতেই তারা বলে—
-"ভালোবাসা সব সময় শব্দ চায় না। কিছু অনুভূতি স্থির হয়ে দাঁড়ায়।"
বাতাস থমকে থাকে। পাহাড় নিঃশব্দ। দর্শক নেই, কেবল সাক্ষী। শেষে তারা এক পা এগিয়ে আসে।নিজেদের সহধর্মিনীর দিকে। হাত বাড়ায় না। ছোঁয় না। শুধু সামনে হাঁটু গেরে দাঁড়িয়ে থাকে। শেষ উচ্চারণ—
-"আমি তোমাকে টানবো না। আমি তোমার পাশে থাকব।"
নূরাইসা চোখ তুলে তাকায়, আর প্রথমবার বুঝতে পারে, পাশে থাকা মানে কী। আফরিন ধীরে মাথা নাড়ে, এই সিদ্ধান্ত সে গ্রহণ করে। নুহা চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্ত, এই দৃশ্য সে হৃদয়ে তুলে রাখে। সুর মিলিয়ে যায়। কিন্তু প্রতিজ্ঞা থেকে যায়।
চারিপাশ হঠাৎ করে নিঃশব্দ হয়ে যায়। যেন শব্দেরাও শ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে পড়ে। ছয়জন মানুষ, একটি বৃত্তে আবদ্ধ, একে অন্যের চোখের দিকে দৃষ্টি স্থির করে রেখেছে। মুখে কিছু বলার প্রয়োজন পড়ে না। শব্দ আজ অপ্রয়োজনীয়। চোখই কথা বলছে, গভীর, অনুচ্চারিত, অমোঘ।
আকস্মিক ইলহান ধীরে এক হাত বাড়িয়ে দেয় নূরাইসার দিকে। তার দৃষ্টিতে একধরনের নেশা, একধরনের স্থিরতা, যেন এই মুহূর্তটুকুই তার জীবনের শেষ সত্য। গভীর কণ্ঠে সে বলে ওঠে—
-"আমার ভূমি, আমার হৃদয়, আর আমার মস্তিষ্ক, তিনটিই আজ এক সুরে বাঁধা। আমি আপনার কাছে আজ যা নিবেদন করছি, তা কেবল ভালোবাসা নয়; তার সঙ্গে আছে সম্মান, অবিচল আনুগত্য এবং সম্পূর্ণ সচেতন এক প্রতিশ্রুতি।"
নূরাইসা ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকে তার স্বামীর দিকে। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু সে পড়তে দেয় না, শুধু অধর কিঞ্চিৎ প্রসারিত করে মৃদু এক হাসি দেয়। ইলহানের বাড়িয়ে দেওয়া হাতের ওপর হাত রাখার জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়। ঠিক তখনই। তার ভ্রুদয় হঠাৎ কুচকে আসে। দূরে কোথাও থেকে একটি চিকন, সরু রেড লাইট তার চোখে পড়ে। স্থির। নিঃশব্দ।ভয়ংকরভাবে নির্ভুল। সেই লাল বিন্দুটি ঠিক ইলহানের মাথার ওপর আটকে আছে, এক মুহূর্তের জন্যও নড়ছে না। আতঙ্কে নূরাইসার চোখ বড় বড় হয়ে যায়। এই আলো সে চেনে। মুহূর্তেই সে বুঝে যায়, কিসের লাইট এটি। এক সেকেন্ডও দেরি করে না সে। ইলহানের বাড়িয়ে দেওয়া হাতের ওপর নিজের হাত রেখে এক হ্যাঁচকা টানে তাকে সরিয়ে নেয়।
আকস্মিক টানে ইলহান তাল সামলাতে না পেরে এলোমেলোভাবে দাঁড়িয়ে যায়, সময় যেন সেখানে থমকে যায়। আর ঠিক তখনই, নূরাইসা ইলহানকে জড়িয়ে ধরে। একটি নিঃশব্দ বিস্ফোরণের মতো কিছু এসে নূরাইসার গায়ে আঘাত করে, শরীর ভেদ করে গভীরে প্রবেশ করে যায়। বাতাস কেঁপে ওঠে। মুহূর্তের জন্য পৃথিবী স্তব্ধ হয়ে যায়। নূরাইসার মুখ দিয়ে এক তীক্ষ্ণ আত্মচিৎকার বেরিয়ে আসে, একটি বীভৎস আর্তনাদ।
উপস্থিত সবাই হকচকিয়ে যায়। যেন কেউ হঠাৎ করে সময়কে ধাক্কা মেরে থামিয়ে দিয়েছে। নূরাইসার শরীর ঢলে পড়তে নিলেই ইলহান ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে আগলে নেয়। মুহূর্তেই তার সমস্ত শক্ত বাহু জড়িয়ে ধরে নূরাইসাকে। আতঙ্কে কণ্ঠ কেঁপে ওঠে ইলহানের—
-"কি হয়েছে জান? চিৎকার করলি কেনো? কথা বল নূরেজান?"
কিন্তু নূরাইসার শরীর আর তাকে সঙ্গ দেয় না।শেষবারের মতো যেন চেষ্টা করেছিল, তারপর হঠাৎ করেই সে ঢলে পড়ে যায়, নিস্তেজ, ভারহীন। ইলহান তাকে ধরে সামলাতে সামলাতে মাটিতে বসে পড়ে। তার বাহু দুটো শক্ত হয়ে আছে, কিন্তু শক্তির ভেতরেও অসহায়তা স্পষ্ট। চারপাশ থেকে সবাই উৎকণ্ঠিত হয়ে এগিয়ে আসে। কেউ কথা বলছে না, যেন সবাই একসাথে শ্বাস নিতে ভুলে গেছে। চারিপাশ মুহূর্তে ভরে যায় নিস্তব্ধ আতঙ্কে। ইলহান ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। হাত কাঁপে, চোখ দিশেহারা হয়ে চারপাশ খোঁজে, কাকে ডাকবে, কী করবে, কোথায় যাবে, কিছুই ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারছে না। সময় যেন নিষ্ঠুরভাবে থেমে গেছে। এক এক করে সবাই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। কেউ মাথা নিচু করে, কেউ চোখ সরিয়ে রাখে, কিন্তু কারও বুকেই সাহস নেই এই দৃশ্য থেকে চোখ ফেরানোর।
ঠিক তখনই, নূরাইসা হঠাৎ নিজের কাঁপা হাত বাড়িয়ে দেয়।দুর্বল আঙুলগুলো ইলহানের গালের ওপর ছুঁয়ে যায়, খুব সামান্য, প্রায় অদৃশ্য এক স্পর্শ। কিন্তু সেই স্পর্শেই ইলহানের বুকের ভেতর কিছু একটা ভেঙে পড়ে। যেন এতক্ষণ ধরে ধরে রাখা শেষ শক্তিটুকুও ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে আসে সবকিছু, শ্বাস আটকে আসে। কাঁপা কণ্ঠে, থেমে থেমে নূরাইসা বলে—
-"আমি... আপনাকে... অনেক... ভালোবাসি... আমার মোল্টেন হার্ট!"
শব্দগুলো শেষ হতেই তার মাথা ঢলে পড়ে যায়।অবচেতন শরীরটা ইলহানের বলিষ্ঠ বাহুর ওপর নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকে।
-"নূরাইসা! জান! চোখ খোল!"
ইলহান অনবরত ডাকতে থাকে। একবার, দু’বার নয়, প্রতিবার নাম উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে তার কণ্ঠ আরও ভেঙে যায়, নিশ্বাস এলোমেলো হয়ে পড়ে। বুকের ভেতর জমে থাকা আতঙ্ক শব্দ হয়ে বেরিয়ে আসছে।কিন্তু নূরাইসা চোখ খোলে না। কোনো সাড়া নেই।নিঃশ্বাস আছে কি নেই, সেই অনিশ্চয়তাই সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
হঠাৎ পিঠের নিচে এক ভেজা অনুভূতি টের পায় সে।ইলহান ধীরে হাত বের করে চোখের সামনে ধরে।আলোয় ঝিলমিল করে ওঠে লাল তরল, র ক্ত। এক মুহূর্তে সব ভেঙে পড়ে। ইলহান নূরাইসাকে বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে চিৎকার করে ওঠে, একটা পশ্চাৎপসরণহীন আর্তনাদ, যা চারপাশের বাতাস ছিঁড়ে ফেলে—
-"কেনো করলি এটা? আমাকে বাঁচাতে কেনো এগিয়ে এলি? তোর কিছু হলে আমি মরে যাবো জান! চোখ খোল বেবি... দেখ আমার কষ্ট হচ্ছে। কথা বল নূরেজান। আমি তোর সব কথা শুনবো জান। আমাকে এইভাবে শেষ করে দিস না... আমার ভয় হচ্ছে। চোখ খোল ব্লাডমুন! এইভাবে আমাকে ভয় দেখাস না জান।
চোখ খোল!"
তার কণ্ঠ শেষ শব্দে এসে ভেঙে যায়। শব্দগুলো আর উচ্চারণ হতে পারে না, শুধু হাওয়ার মধ্যে মিলিয়ে যায়।কিন্তু নূরাইসা চোখ মেলে তাকায় না। তার ভালোবাসার মানুষের আর্তনাদ কানে পৌঁছায় না। সে নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকে, যেন শরীর আছে, কিন্তু উপস্থিতি নেই।ইলহানের চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে নূরাইসার গালের ওপর। আজ এই অশ্রুও কাজে আসে না। যে অশ্রু নূরাইসার বুকে তীরের মতো বিঁধে যেত, আজ সেই অশ্রু নূরাইসা দেখতে পেলো না। আর এই না-দেখাটাই ইলহানের জীবনের সবচেয়ে বড় শাস্তি হয়ে রইলো, ভালোবাসার মানুষকে বাঁচাতে না পারার অসহায়তা।