তানভীর মাত্র ডিউটি শেষ করে হাসপাতাল থেকে বেরিয়েছে। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার কারণে সে ঠিকমতো কাজে আসতে পারেনি। ভাইবোনেরা সবাই মিলে ঘুরতে গেছে। তারও যাওয়ার ইচ্ছে ছিল, মনটা অনেক দিন ধরেই চাইছিল একটু হালকা হতে। কিন্তু ছুটি জোটেনি। দায়িত্ব আর বাস্তবতার দেয়ালে আটকে গেছে ইচ্ছেগুলো। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে হাসপাতালের গেট পেরিয়ে আসে সে। চোখ ফোনের পর্দায়। বিকেলের দিকে আফরিন একের পর এক ছবি আর ভিডিও পাঠিয়েছে, হাসিখুশি মুখ, উজ্জ্বল চোখ, নির্ভার মুহূর্ত। বোনদের হাসি দেখে এক মুহূর্তের জন্য তানভীরের বুকটা ভরে ওঠে। ক্লান্ত শরীরের ভেতরেও এক চিলতে তৃপ্তি জেগে ওঠে। মাথা নিচু করে ফোনের দিকে তাকিয়েই হাঁটছিল সে। হঠাৎ, একটা তীব্র ধাক্কা। সম্ভবত কেউই কাউকে দেখেনি। ভারসাম্য হারিয়ে তানভীর মাটিতে পড়ে যায়। একই সঙ্গে আরেকটা শরীরও ছিটকে পড়ে যায় সামনে। চোখ তুলে তাকিয়েই তানভীর দেখে, ফারাহ্। সে-ও মাটিতে পড়ে আছে। আসলে ধাক্কাটা ফারাহর সঙ্গেই লেগেছে। কোনো দিকে না তাকিয়ে ছুটে আসছিল সে, আর ঠিক সেই মুহূর্তেই তানভীরের সঙ্গে সংঘর্ষ।তানভীর আর এক সেকেন্ডও দেরি করে না। দ্রুত ফোন পকেটে ভরে ফারাহকে ধরে তুলে বসিয়ে বলে—
"ঠিক আছো? লাগে নি তো কোথাও?"
ফারাহ্ চোখের পানি মুছে ভাঙা কণ্ঠে বলল—
-"আমি ঠিক আছি। কোথাও লাগে নি। আপনার লাগে নি তো?"
-"আমি ঠিক আছি।"
একটু থেমে তানভীর ওর মুখের দিকে তাকায়। কপালের ভাঁজ গাঢ় হয়।
-"তুমি কাঁদছ কেনো? ব্যথা পেয়েছ? চলো, হাসপাতালের ভেতরে দেখি কোথায় লেগেছে!"
ফারাহ্ তাড়াতাড়ি সোজা হয়ে দাঁড়ায়। জামা থেকে ধুলোবালি ঝাড়তে ঝাড়তে বলে—
-"কোথাও লাগে নি। আমি ঠিক আছি ভাইয়া!"
তানভীর এবার আর শুধু উদ্বিগ্ন নয়, কৌতূহলীও। এমন সময়ে, এমন অবস্থায়... সে স্থির চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করে—
-"তুমি এত রাতে এখানে কী করছ, ফারাহ্?"
ফারাহর চোখ চঞ্চল হয়ে ওঠে। দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। যেন হঠাৎ করেই কোনো গোপন ব্যাপারে ধরা পড়েছে। এক জায়গায় তাকিয়ে থাকতে পারছে না সে। তানভীর তার এই অস্বস্তি, এই অপ্রস্তুত হাবভাব খুব সহজেই বুঝে ফেলে। সে সোজা হয়ে দাঁড়ায়।তানভীরের কণ্ঠ এবার নরম নয়, কিন্তু রুক্ষও না। ভেতরে জমে থাকা উদ্বেগটা স্পষ্ট। চোখে এবার কঠোরতা, কণ্ঠে দৃঢ়তা—
-"মিথ্যে কথা বলার চেষ্টা করো না। কি হয়েছে? এত রাতে এখানে কী কাজ তোমার?"
ফারাহ্ এক পা পেছায়। ঠোঁট কাঁপে। শব্দগুলো যেন গলায় আটকে যায়। আমতা–আমতা করে বলে—
-"আমি... আসলে... ডাক্তার দেখাতে এসেছিলাম!এ
-"কেনো? কি হয়েছে?"
ফারাহ্ হঠাৎ করেই নিঃশব্দ হয়ে যায়। কথাটা লজ্জাজনক। ভীষণ লজ্জাজনক। বান্ধবীর বড় ভাই, একজন দায়িত্ববান ডাক্তার, তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এই কথাটা কীভাবে বলা যায়? আদৌ কি বলা সম্ভব? ফারাহর বুকের ভেতরটা যেন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। মাথার ভেতর হাজারটা ভাবনা একসাথে ধাক্কা খেতে থাকে। ঠিক তখনই তানভীরের কণ্ঠ আবার শোনা যায়, এবার আগের চেয়ে অনেক বেশি স্থির, অনেক বেশি আশ্বাসে ভরা—
-"কি হয়েছে বল। কোনো সমস্যা? ভয় পেয়ো না। আমি সাহায্য করব তোমায়।"
এই কথাটাই যেন ফারাহকে শেষ ভরসা দেয়। চোখ দুটো ভিজে ওঠে। অশ্রুসিক্ত নয়নে সে ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকায় তানভীরের দিকে। তানভীর ভ্রু কুচকে তাকিয়ে থাকে, চুপচাপ, অপেক্ষায়, কিন্তু চোখে গভীর দুশ্চিন্তা। ফারাহ্ আর নিজেকে সামলাতে পারে না।ফুপিয়ে উঠে বলে—
-"আমি আর মেঘ খুব বড় অন্যায় করে ফেলেছি ভাইয়া...আমরা এখন কী করব? আমাদের প্লিজ সাহায্য করুন। আমরা না বুঝে অনেক বড় অন্যায় করে ফেলেছি!"
হাসপাতালের বাইরের আলো ঠিক তখনই আরও ঠাণ্ডা মনে হয়। বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। তানভীরের চোখে ধীরে ধীরে বদলে যায় দৃষ্টি, উদ্বেগের জায়গায় এবার নেমে আসে আশঙ্কা। কিছু একটা ভীষণ ভুল হয়েছে, সে বুঝে যায়।
.
-"তুই জানলি কিভাবে আর্সলান তোকে খু ন করতে এসেছিল?"
নূরাইসার বুকে মাথা রেখে শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে ইলহান। ঘরের আলো ম্লান, জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া রাতের বাতাস পর্দাকে হালকা নড়িয়ে দিচ্ছে। নূরাইসা নিঃশব্দে তার আঙুল চালিয়ে দিচ্ছিল ইলহানের চুলের ভেতর, আদর, আশ্বাস আর ভালোবাসা একসাথে মিশে থাকা সেই স্পর্শ। হঠাৎ সেই নীরবতার বুক চিরে ইলহানের প্রশ্নটা নূরাইসার কর্ণকুহরে এসে আছড়ে পড়ে। নূরাইসা এক মুহূর্ত থমকায়। আঙুলের গতি ধীর হয়, কিন্তু থামে না। দৃষ্টিটা যেন অনেক দূরে চলে যায়। স্মৃতির দরজা খুলে যায়। সে ধীরে ধীরে বলতে শুরু করে—
-"সেদিন ভার্সিটিতে এসেছিল আর্সলান। আমি তার সাথে কথা বলতে চাইনি। কিন্তু সে... এক প্রকার জোর করেই আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল। চোখে ছিল অদ্ভুত এক দৃঢ়তা, যেন সে অনেক দূর হেঁটে এসেছে শুধু এই কয়েকটা কথা বলার জন্য।এ
একটু দম নেয় নূরাইসা। তারপর কণ্ঠে স্মৃতির ভার নিয়ে আবার বলে—
-"সেদিনই সে আমাকে বলেছিল..."
তার কণ্ঠে তখন আর্সলানের শব্দেরা জীবন্ত হয়ে ওঠে—
"সেদিন তোমার জন্মদিনে আমি তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম, সেনোরিটা। আর সেদিনই আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। তোমার চোখের ভেতরের আলো আমার ছায়াকে গলিয়ে দিয়েছিল। আমি ছিলাম হ ত্যা কারী, তুমি ছিলে লক্ষ্য, কিন্তু সেই মুহূর্তেই বুঝেছিলাম, তুমি লক্ষ্য নও, তুমি আমার শেষ আশ্রয়।আমি জানি, আমার জন্মই হয়েছিল অন্ধকারে। তবু তুমি নিঃশব্দে এসে আমার সমস্ত কালোকে সোনার মতো জ্বালিয়ে দিলে। অথচ ভাগ্যের কালি কত নিষ্ঠুর, যাকে ভালোবাসলাম, তাকে রক্ষা করার আগেই
আমি নিজেই তাকে মা রতে চলে এলাম। সূর্যস্নাত সেই সন্ধ্যায় তোমাকে খু ন করার সিদ্ধান্ত ম রে গেল। ম রে গেল আমার পুরনো দেহ, পুরনো পরিচয়। শুধু বেঁচে রইল এক অপরাধীর স্বীকারোক্তি, আমি তোমাকে হ ত্যা করতে এসে, নিজেকেই বাঁচিয়ে নিয়ে গেলাম।"
নূরাইসার কণ্ঠ একটু কেঁপে ওঠে। সে ইলহানের চুলে আঙুল বুলিয়ে শেষ বাক্যটা বলে—
-"সেদিন আপনারও আসার কথা ছিল... কিন্তু আপনি আসেননি।"
ঘরের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে ওঠে। ইলহান ধীরে ধীরে মাথা তোলে। নূরাইসার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ, চোখে বিস্ময়, অপরাধবোধ আর এক অদ্ভুত তীব্রতা একসাথে জমে ওঠে।
তার ঠোঁট নড়ে। ভারী কণ্ঠে সে বলে—
-"কিভাবে জানলি আমি আসিনি?"
-"আসলে... আমি তো দেখতে পেতাম।"
ইলহান ধীরে উঠে সোজা হয়ে বসলো। ঘরের নরম আলো তার মুখে গম্ভীর ছায়া ফেলেছে। নূরাইসার চোখের গভীরে তাকিয়ে, যেন বহুদিন জমে থাকা কোনো সত্য টেনে বের করল সে—
-"কেউ একজন বলেছিল, তার কাঁচা ফুলের বিছানা খুব পছন্দ। কেউ একজন অপেক্ষা করছিল, তার স্বামী আসবে, তার জন্মদিনের দিন। আর সেই স্বামী কি না এসে থাকতে পারে? এত দুঃসাহস কি আছে সেই স্বামীর?"
নূরাইসার দৃষ্টি এক নিমিষেই বদলে গেল—চোখের পাতা ছাপিয়ে বিস্ময়ের ঝলক বিদ্যুতের মতো ছুটে এলো। অবিশ্বাস আর হতবাকতার ভারে কণ্ঠ কেঁপে উঠল, ঠোঁট ছুঁয়ে বেরিয়ে এলো চাপা বিস্ময়ের স্বর—
-"সেদিন... সেই কাঁচা ফুলের বিছানা আর গিফট! সব... আপনি করেছিলেন?"
ইলহানের ঠোঁটের কোণে একফোঁটা আত্মবিশ্বাসী হাসি খেলল।
-"আর কার এমন সাহস আছে বলুন তো, আপনার ঘরে ঢুকে, আপনার বিছানা ফুলে সাজানোর?"
নূরাইসার কণ্ঠ হঠাৎ নরম হয়ে এল—
-"তাহলে... আমাকে বলেননি কেন?"
ইলহানের চোখে ক্ষীণ অভিমানের ছায়া।
-"আপনি তো ভয়ে এমনভাবে পালালেন যে ঘরেই ফিরলেন না। আমি ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলাম। তারপর... চলে আসতে হয়েছিল।"
নূরাইসা ধীরে ধীরে মাথা ঝুঁকিয়ে নিল। অপরাধবোধ আর আফসোস নিঃশব্দে তার চোখের পাতায় জমে উঠল, যেন অশ্রুরা শব্দহীন স্বীকারোক্তি দিচ্ছে। ইলহান এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে এগিয়ে এসে আলতো হাতে তার থুতনি ধরল, মুখটা উঁচু করে নাকের ডগায় এঁকে দিল নরম এক চুমু, যেন সব অপরাধ, সব আফসোসকে নিঃশব্দে ক্ষমা করে দেওয়া হলো।
-"কি অদ্ভুত, তাই না? একই দিনে, একই অনুভূতিতে, আমরা দুজনেই আপনার প্রেমে পড়েছিলাম।"
নূরাইসা কিছু বলল না। অবুঝ, স্থির চোখে শুধু তাকিয়ে রইল, যেন শব্দের অর্থ নয়, অনুভূতির গভীরতাই বুঝতে চাইছে। ইলহান মুচকে হেসে তাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নিল। বাইরে রাত নিঃশব্দ, ভেতরে দুটো হৃদয়ের সমস্ত না-বলা কথা ধীরে ধীরে একে অপরের ভেতর মিশে যেতে লাগল। ইলহান ধীর কন্ঠে বলল—
-"সেদিন আমি জেনে গিয়েছিলাম, আর্সলান আপনাকে খু ন করতে আসছে। আমি সেদিন হেলিকপ্টার নিয়ে ছুটে এসেছিলাম। আর্সলান তখন আমাদের বাড়ি থেকে অনেক দূরের এক উঁচু বিল্ডিংয়ের ছাদে। আর আমি ছিলাম আমাদের বাড়ির সামনে, নিজেকে সম্পূর্ণ কালো পোশাকে, হুডির আড়ালে ঢেকে রেখেছিলাম। আপনি এক ঝলক দেখেছিলেন... কিন্তু চিনতে পারেননি। আপনি নাচে মগ্ন ছিলেন। আর আমার প্রিয় কবুতরগুলো, আমার অর্ধাঙ্গিনীকে সঙ্গ দিচ্ছিল। কি অপরূপ ছিল সেই দৃশ্য... আমার মনে হয়েছিল, আমার দেহ থেকে আত্মটা আলাদা হয়ে গেছে। নুহান ইলহান দেওয়ান, প্রথমবার কোনো নারীর রূপ দেখে থমকে গিয়েছিল। তাও... নিজের হালাল নারী।"
তার কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো।
-"আমি আজও সেই দৃশ্য ভুলতে পারি না। আর্সলান কী করে ভুলবে? আমি ওকে দোষ দেই না। আমার নূরেজানের রূপ, যে কাউকে সম্মোহিত করার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু আপনাকে দেখার অপরাধে ওর ওই চোখ আমি অক্ষত রাখবো না। না তো রাখবো ওর শরীরের সেই হাত, যেই হাত দিয়ে ও সেদিন আপনার মাথায় টার্গেট সেট করেছিল।"
নূরাইসা আর সহ্য করতে পারল না। তার চোখ দিয়ে নীরবে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। সে ইলহানকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁপা কণ্ঠে বলল—
-"কিছু করতে হবে না। আপনি কিছু করবেন না। এইসব ছেড়ে দিন। আমার আর... এইসব ভালো লাগছে না।"
ইলহানের সমস্ত কঠোরতা মুহূর্তেই গলে গেল। সে নূরাইসার কপালে আলতো করে চুমু খেল।
-"সব ছেড়ে দেব। কথা দিলাম।"
একটু থেমে, ধীরে যোগ করল—
-"তার আগে... কিছু হিসেব আছে। সেগুলো শেষ করে নিই।"
ঘরের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। ভালোবাসা আর র ক্তা ক্ত অতীত, দুটোই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইল, নিঃশব্দ এক দ্বন্দ্বে।
.
রাত গভীর। দেয়ালঘড়ির কাঁটা ঠিক তিনটায় এসে থমকে আছে, যেন সময়টাও এই অস্বস্তিকর মুহূর্তে আটকে গেছে। ড্রয়িং রুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে আফরিন, নুহা আর নূরাইসা। তিনজনের চোখে জমে থাকা বিরক্তি আর ক্লান্তির ছায়া স্পষ্ট। সারাদিন ঘোরা, শরীর ভাঙা ক্লান্তি, তার ওপর রাতে ঘুমের আশাটুকুও কেড়ে নিয়েছে তাদের স্বামীরা।
কিছুক্ষণ আগেও তিন স্বামী মিলে মাতাল হওয়ার এক অদ্ভুত নাটক করেছে। হাসি-ঠাট্টা, ঢুলুঢুলু চোখ, অসংলগ্ন কথা, সবই যেন পরিকল্পিত। আর এখন? রাত তিনটায় এই ড্রয়িং রুমে সবাইকে দাঁড় করিয়ে রেখেছে।কোথায় যাবে, সে রহস্য তারা এখনও খোলেনি। একটু ঘুমানোর সুযোগটুকুও নেই। তাই তিন রমণী রাগে ফুঁসছে, নিঃশ্বাসে জমে আছে ক্ষোভ। ঠিক তখনই, ঘরের ভেতরের নীরবতা চিরে বেরিয়ে এল তিন পুরুষ, বিহান, ইলহান আর এমরিন। নিজেদের ঘর থেকে বেরোনোর ভঙ্গিতেই কিছু একটা অস্বাভাবিকতা। পুরো শরীর কালো পোশাকে ঢাকা, লেদার প্যান্ট, লেদার জ্যাকেট। আলো পড়তেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে জ্যাকেটের পেছনে লুকানো পিস্তলের অবয়ব। হাই বুটের পাশে ছু রি রাখার আলাদা স্পেস। পোশাক, ভঙ্গি, দৃষ্টিতে এমন এক গম্ভীরতা, যা রাতের নীরবতাকে আরও ভারী করে তোলে।
তিন রমণী ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে। প্রশ্নে ভরা চোখ, সন্দেহে জমাট বাঁধা মুখ। তারা সামনে এসে দাঁড়াতেই নুহার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। ঝাঁঝালো কণ্ঠে সে বলে ওঠে—
-"নাটক পেয়েছেন সবাই মিলে? এক্সের বাড়িতে হামলা করতে যাচ্ছেন নাকি? তো যাচ্ছেন, যান না। আমাদের কেন এই মাঝরাতে ঘুমোতে না দিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন?"
এক মুহূর্তে বিহান, ইলহান আর এমরিন, তিনজনেই থতমত খেয়ে যায়। একটু আগেও যে ‘হিরো-হিরো’ ভাব নিয়ে বেরিয়েছিল, সেই ভাব যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। বিয়ে করেছে, এই সত্যিটা এই মুহূর্তে হঠাৎ করেই খুব ভারী মনে হয় তাদের কাছে। বউগুলো যে সবাই ঘুমপ্রিয় মানুষ, সেটা তারা যেন এই প্রথম গভীরভাবে উপলব্ধি করে। এত রাতে, এই পোষাকে, কোথায় যাবে জামাইর, সে বিষয়ে কোনো চিন্তাই নেই। কিন্তু বউদের চোখের দৃষ্টিতে এমন এক আগুন, যেন এখনই খেয়ে ফেলবে।
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। ঠিক তখনই ইলহান সামান্য এগিয়ে আসে। কণ্ঠটা নিচু, কিন্তু তাতে কোনো ব্যাখ্যা নেই, শুধু আদেশের শীতলতা।
-"কাজ আছে। চুপচাপ সবাই গাড়িতে গিয়ে বস!"
ড্রয়িং রুমে নেমে আসে এক অদ্ভুত নীরবতা। সেই নীরবতার ভেতরেই জমে থাকে আসন্ন ঘটনার পূর্বাভাস, যা এই রাতকে আর পাঁচটা রাতের মতো থাকতে দেবে না। নুহা বিরক্তিতে তেরামি করতে গিয়েও পারল না। চোখে-মুখে অসন্তোষ জমে থাকলেও পরিস্থিতির গম্ভীরতা সে ঠিকই বুঝে ফেলল। এই মুহূর্তে কোনো প্রশ্নই গ্রহণযোগ্য নয়, এই সত্যিটা ওদের তিনজনের চোখেই স্পষ্ট। বাধ্য মেয়ের মতো নীরবে গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে গিয়ে বসে পড়ল সে। আফরিন আর নূরাইসাও আর কথা বাড়াল না। ইঞ্জিন স্টার্ট দেওয়ার শব্দের সঙ্গে সঙ্গেই যেন রাতটা হঠাৎ আরও গভীর হয়ে উঠল।
মুহূর্তের মধ্যেই গাড়িটি ছুটে চলল বান্দরবনের পাহাড়ি পথে। আঁকাবাঁকা রাস্তা, উঁচু-নিচু ঢাল, দুই পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা অচেনা পাহাড়, সব মিলিয়ে এক রহস্যময় অনুভূতি। রাস্তার ধারে ঘন জঙ্গল, যেখানে চাঁদের আলোও ঢুকতে গিয়ে হারিয়ে যায়।মাঝে মাঝে হেডলাইটের আলোয় গাছের ডালপালা, লতাগুল্ম আর অদ্ভুত ছায়া নড়েচড়ে ওঠে, যেন কেউ নীরবে তাকিয়ে আছে। বাতাসে কাঁচা মাটির গন্ধ, ভেজা পাতার সোঁদা ঘ্রাণ। এই পাহাড়ি নীরবতা শহরের মতো নয়, এখানে নীরবতাও যেন শব্দ করে। হঠাৎ গাড়িটি ধীরে হয়ে আসে। তারপর এক ঝাঁকুনিতে থেমে যায়। চারপাশে তাকিয়ে তিন রমণীর বুকের ভেতর কেমন যেন চেপে বসে অজানা শঙ্কা। এই জায়গায় কোনো বাড়িঘর নেই, কোনো আলো নেই, নেই মানুষের চিহ্ন। শুধু অসীম জঙ্গল, পাহাড় আর গভীর রাত।সেই অন্ধকারের মাঝেই চোখে পড়ে একটি ছোট্ট কাঠের বাড়ি। টিনের ছাউনি, কাঠের দেয়াল, সময়ের সঙ্গে লড়াই করে দাঁড়িয়ে থাকা একাকী অবয়ব। বাড়িটার চারপাশে জনমানবহীন নীরবতা, যেন বহুদিন ধরে কেউ এখানে আসেনি। বাতাসে টিনের চাল হালকা কেঁপে ওঠে, সেই শব্দটুকু ছাড়া আর কিছুই শোনা যায় না। আশপাশে কোনো আলো নেই, শুধু গাড়ির হেডলাইটে বাড়িটা অল্প করে ভেসে উঠছে, আবার অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে।
সবাই ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। পাহাড়ি রাতের নীরবতা যেন আরও ঘন হয়ে চারপাশ ঘিরে ধরেছে। তিন বোন একে অন্যের মুখের দিকে তাকাচ্ছে, চোখে প্রশ্ন, ঠোঁটে শব্দ নেই। কেউই কিছু বলতে পারছে না। অজানা আশঙ্কা বুকের ভেতর ভারী পাথরের মতো চেপে বসেছে। ঠিক তখনই বিহান, ইলহান আর এমরিন নিজেদের সহধর্মিণীদের সামনে এসে দাঁড়াল। আচমকা তাদের ভঙ্গি বদলে গেল। রাজকীয় রক্ষীদের মতো মাথা নিচু করে, সামান্য ঝুঁকে তারা হাত বাড়িয়ে বলল—
-"আফটার ইউ, প্রিন্সেস!"
নূরাইসা, আফরিন আর নুহা, তিনজনই একসাথে চমকে উঠল। এই অপ্রত্যাশিত সম্মান, এই অদ্ভুত সৌজন্য, সবকিছুই পরিস্থিতির সঙ্গে বেমানান লাগছে।তবু স্বামীদের দেখানো পথ অনুসরণ করে তারা হাঁটা শুরু করল। পায়ের নিচে শুকনো পাতার মচমচে শব্দ, চারপাশে অচেনা জঙ্গলের গন্ধ, মাথার ওপর গাঢ় আকাশ, সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল তারা কোনো অজানা গহ্বরে ঢুকে পড়ছে। বাড়ির সামনে এসে থামতেই ভেতর থেকে দরজা খুলে গেল। আলোয় ভেসে উঠল পরিচিত দুই মুখ। রুহান আর উপমা একসাথে বলে উঠল—
-"ওয়েলকাম, লেডিস!"
রুহান আর উপমাকে দেখে আফরিন, নুহা আর নূরাইসা বেশ চমকে গেল। এই জায়গায় তাদের উপস্থিতি একেবারেই অপ্রত্যাশিত। কিন্তু এই চমকটুকুই শেষ নয়, ভেতরে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল আরও ভয়ংকর সত্য। তিনজনেই ভেতরে ঢুকতেই যা দেখল, তাতে যেন নিঃশ্বাস আটকে গেল। ঘরের মাঝখানে রায়হান তন্ময়কে উ ল ঙ্গ অবস্থায় বসিয়ে রাখা হয়েছে।শরীরের জায়গায় জায়গায় ক্ষ ত, তাজা আর পুরোনো ক্ষ তের ভয়ংকর মিশ্রণ। যেন কেউ খুব ধৈর্য নিয়ে, খুব সচেতনভাবে এক একটি আঘাত তার শরীরে এঁকে দিয়েছে। র ক্ত, ঘাম আর যন্ত্রণার গন্ধে ঘরটা ভারী হয়ে আছে।
আফরিন, নুহা আর নূরাইসা, তিনজনই বিস্ময়ে হতবিহ্বল। আফরিন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, চোখের পলক পর্যন্ত পড়ছে না। নুহার রাগে শরীর কাঁপছে, হাতের মুঠো শক্ত হয়ে আসছে। আর নূরাইসা, এই দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে হঠাৎই বাইরে বেরিয়ে গেল।দরজার বাইরে গিয়ে সে বমি করতে লাগল। এমন দৃশ্য সে টিভিতেও দেখতে পারে না, আর এখানে, একেবারে চোখের সামনে? তার পক্ষে অসম্ভব। ইলহান দ্রুত তার পেছনে ছুটে গেল।
ভেতরে, আফরিন ধীরে ধীরে এমরিনের দিকে তাকাল। এক মুহূর্তের জন্য তাদের দৃষ্টি মিলল। সেই দৃষ্টিতেই আফরিন সব বুঝে গেল, রায়হান তন্ময়ই সেই তৃতীয় ব্যক্তি। ঘেন্নায় তার গা গুলিয়ে উঠল। মাথা ঘুরতে শুরু করল। চোখের সামনে ভেসে উঠল সেদিনের সেই বিভৎস রাত, ভাঙা শরীর, আতঙ্কে জমে থাকা নিঃশ্বাস, অসহায়তার কালো স্মৃতি। আফরিন আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। ঠিক তখনই এমরিন দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, যেন এই ভয়ংকর বাস্তবতা থেকে আগলে রাখার শেষ চেষ্টা।
বিহান একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নুহার দিকে। তার চোখে দ্বিধা, বিস্ময় আর অজানা আশঙ্কা। নুহার প্রতিক্রিয়া সে বুঝে উঠতে পারছে না। এই দৃশ্য দেখে নুহারও তো ওর বোনদের মতো ভেঙে পড়ার কথা ছিল। বয়স কম, এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু নুহা ভেঙে পড়ল না। বরং বিহানকে চমকে দিয়ে, ঠান্ডা অথচ তীক্ষ্ণ কণ্ঠে সে বলে উঠল—
-"ওনার এই অবস্থা কে করেছে?"
ঘরের বাতাস হঠাৎ থমকে গেল। উপমা সামান্য এগিয়ে এসে বেশ গর্বের সঙ্গে উত্তর দিল—
-"আমি করেছি, নন্দিনী। সারাজীবনের মেডিক্যাল যত এক্সপেরিয়েন্স আছে, সবগুলো ভুলভাবে এই জানোয়ারের ওপর প্রয়োগ করেছি!"
তার চোখে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই,।বরং এক ধরনের তৃপ্তি। পাশ থেকে রুহান উপমার কাঁধে হাত রেখে হেসে বলল—
-"হ্যাঁ। আমাকে একটুও সাহায্য করতে দেয়নি। আমি সত্যিই গর্বিত, এমন একজন বউ পেয়ে!"
দুজনেই ইশারায় একে অপরকে ফ্লাইং কিস ছুড়ে দিল।সেই দৃশ্যের ভেতরেও এক অদ্ভুত বৈপরীত্য, ভালোবাসা আর প্রতিশোধ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। বিহান এবার নুহার দিকে এগিয়ে এল। চোখে খোঁজার দৃষ্টি, কণ্ঠে নরম প্রশ্ন—
-"ওর এই অবস্থা দেখে তোমার শরীর খারাপ করছে না?"
নুহা তার চোখে চোখ রেখে বলল—
-"করছে তো!"
-"বাইরে যাবে?"
নুহা কোনো উত্তর দিল না। ধীরে ঘুরে সে আফরিনের দিকে তাকাল। সেই তাকানোর ভেতর কোনো করুণা নেই আছে আগুন, আছে বাস্তবতা। কঠিন কণ্ঠে সে বলে উঠল—
-"তোর রাগ হচ্ছে না? তুই দুর্বল কবে থেকে হলি? তোর সম্মান শেষ করেছে ও। আর তুই এইভাবে কান্না করছিস? ও তো জিতে গেল। তোকে তো এইভাবেই ভাঙতে চেয়েছিল ও। এখন যদি ওকে মেরেও ফেলে ভাইয়া, তাহলেও তো ও বিজয়ী। ওকে এত সহজে জয়ী করে দিচ্ছিস কেন?"
নুহার কথাগুলো ঘরের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনির মতো ফিরে এল। এক মুহূর্তে সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। এইটুকু মেয়ে,।এত ভারী কথা! যেন বয়স নয়, অভিজ্ঞতার ভারেই সে কথা বলছে।ঠিক তখনই দরজার দিক থেকে ইলহান আর নূরাইসা ভেতরে ঢুকল। নূরাইসার চোখ লাল, কিন্তু দৃষ্টি এখন স্থির। দুজনেই সোজা আফরিনের দিকে এগিয়ে এসে দৃঢ় কণ্ঠে বলল—
-"আজ প্রমাণ করার পালা, তুই জিতবি, নাকি ঐ নরপশু!"
ঘরের বাতাস যেন কেঁপে উঠল। এই রাত আর শুধু প্রতিশোধের নয়, এখন এটা আত্মসম্মানের যুদ্ধ।আফরিন ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়াল। এতক্ষণ যে শরীরটা ভেঙে পড়ছিল, চোখে-মুখে যে অসহায়তা জমে ছিল, সবকিছু যেন এক মুহূর্তে উল্টে গেল।বহুদিনের চেপে রাখা ক্ষোভ, অপমান, ভয় আর না-বলা যন্ত্রণাগুলো একসাথে ফেটে বেরিয়ে এলো।রায়হানের পাশেই পড়ে ছিল একটি কাঠ, চারি পাশে তারকাটা গাঁথা। আফরিন কোনো দ্বিধা না করেই সেটি হাতে তুলে নিল। পরের মুহূর্তেই সে ইচ্ছেমতো পিটাতে লাগল রায়হানকে। একের পর এক আঘাত। কাঠের সাথে শরীরের শব্দ, আর তার ফাঁকে ফাঁকে আফরিনের কান্না। নিস্তব্ধ পাহাড়ি এলাকায় মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ল রায়হানের চিৎকার। সেই চিৎকারে কোনো অনুতাপ নেই, শুধু ভয় আর যন্ত্রণার আর্তনাদ।
আফরিন কাঁদছে, চিৎকার করছে, যা মনে আসছে বলছে, আর আঘাতের পর আঘাত করছে। যেন প্রতিটি আঘাতে সে নিজের ভাঙা রাতগুলো, নিজের নিঃশব্দ কান্নাগুলোর শোধ নিচ্ছে। বোনের এই ভঙ্গুর, উন্মত্ত দশা দেখে ভাইদের চোখেও অশ্রু চলে এলো।শক্ত করে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষগুলোও এই মুহূর্তে অসহায়। নুহা, উপমা আর নূরাইসা দ্রুত এগিয়ে এসে আফরিনকে সামলে ধরল। অনেক কষ্টে, অনেক শক্তি দিয়ে তাকে থামানো হলো। ততক্ষণে রায়হান আধ ম রা হয়ে গেছে, শরীর নিস্তেজ, নিঃশ্বাস অনিয়মিত। মেয়েরা আফরিনকে নিয়ে একটু দূরে সরে দাঁড়াল। আফরিনের শরীর কাঁপছে, চোখ ফাঁকা। কোনো মেয়ের জন্যই এইসব সহজ নয়, প্রতিশোধও না, ক্ষমাও না।
ঠিক তখনই এমরিন এগিয়ে এল। চোখে আগুন, মুখে ঘৃণা। রায়হানের মাথায় ব ন্দু ক ঠেকিয়ে সে গর্জে উঠল—
-"আমার কলিজায় হাত দিয়েছিস। এবার তোর কলিজা আমি কুত্তা দিয়ে খাওয়াবো। জাহান্নামে দেখা হচ্ছে তোর সাথে!"
এমরিন ট্রিগার টানতে যাচ্ছিল ঠিক সেই মুহূর্তে ইলহান ঝাঁপিয়ে পড়ে তার হাত চেপে ধরল। এমরিন ক্ষিপ্ত চোখে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল—
-"কি করছিস? আমি ওকে আজ এই মুহূর্তে শেষ করে দিব!"
ইলহান ধীরে মাথা তুলে এমরিনের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে রাগ নেই, আছে ভয়ংকর এক শীতলতা।র ক্ত চক্ষু নিয়ে, নিঃশব্দ অথচ ধারালো কণ্ঠে সে বলল—
-"একজন রে পি স্টে র শাস্তি এত সহজ কখনোই হবে না। খু ন করলে তো সেটা সবচেয়ে সহজ শাস্তি। মৃ ত্যু এক প্রকার মুক্তি, আর আমি ওকে মুক্তি দেবো না।আমার বোনের সাথে করা অন্যায়ের শাস্তি ও সারাজীবন ভুগবে। যেমন আমার বোন সারাজীবন এই যন্ত্রণা বয়ে বেড়াবে, ঠিক তেমন।"
কথাগুলো যেন ঘরের ভেতর ভারী হয়ে ঝুলে রইল।এমরিন ধীরে ধীরে শান্ত হলো। ইলহানের সঙ্গে তার সম্পর্ক কখনো খুব ভালো ছিল না। তবু এই এক জায়গায় এসে সে তাকে বিশ্বাস করে। নিজের বোন, নিজের পরিবার, এগুলোর জন্য ইলহান যে কোনো সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে, এটা সে জানে। আর ইলহান ভুলও বলেনি। মৃ ত্যু এক প্রকার মুক্তি। আর এই নরপশুকে সেই মুক্তি দেওয়া যাবে না।
ইলহান ধীরে রায়হানের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। চোখে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, নেই উত্তেজনার অস্থিরতা, শুধু এক অদ্ভুত স্থিরতা। সেই স্থিরতা আরও ভয়ংকর। সে শান্ত কণ্ঠে বলল—
-"কেন করেছিস, আমি কিছু জানতে চাইবো না। আমার বোনের সাথে যা করেছিস, তার কোনো ব্যাখ্যা হয় না। আমার সাথে শত্রুতা থাকলে আমার সাথেই মেটাতিস। কিন্তু না, তুই আমার পরিবারে চোখ দিয়েছিস। এর শাস্তি তোকে পেতেই হবে।"
রায়হানের মুখ র ক্তে মাখামাখি। ব্যথায় কাঁপতে থাকা ঠোঁট নড়ে উঠল। প্রায় ফিসফিস করে সে বলল—
-"কিভাবে... কিভাবে খুঁজে পেলি আমায়?"
ইলহান ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি ফুটলো। সেই হাসিতে আনন্দ নেই, আছে জয় নিশ্চিত হওয়ার শীতলতা।
-"তুই ভেবেছিলি আমার কাছ থেকে লুকাতে পারবি?তুই যে আর্সলান আর এমরিনদের সঙ্গী, সেটা আমি অনেক আগেই জেনে গিয়েছিলাম। আর্সলান জানত তুই কী করেছিস, কিন্তু এমরিনকে বলেনি। আমি তাকেই কাজে লাগিয়েছি।"
হালকা মাথা ঘুরিয়ে সে বিহানের দিকে ইশারা করল—
-"ওই যে আমার ভাই, আমার বন্ধু, বিহান। দুনিয়ার সব টেকনোলজি ওর কাছে হার মানে। ওর বাঁ হাতের খেল তোকে খুঁজে বের করা।
রায়হানের চোখ বড় হয়ে গেল।
-"আজ যেন তুই নিশ্চিন্তে থাকিস, এই জন্যই আমরা মাতাল হয়ে বাড়ি ফেরার নাটক করেছিলাম। তুই তো আমাদের ওপর নজর রাখছিলি। ভেবেছিলি আমরা রাখবো না? শত্রুদের এত দুর্বল ভাবলে চলে রে... এমপি?"
কথাগুলো শেষ করেই ইলহান উঠে দাঁড়াল। রায়হানের পেটের মধ্যে সজোড়ে এক লাত্থি বসালো। পরের মুহূর্তে রায়হান মাটিতে কুঁকড়ে গেল ব্যথায়। সব পরিষ্কার হয়ে গেছে তার কাছে। এই ‘ঘুরতে আসা’ কোনো সাধারণ ভ্রমণ ছিল না। এটা ছিল নিখুঁত ফাঁদ।একটা রাতের অভিনয়। একটা পরিকল্পিত বিচার।ইলহান এরপর রায়হানের গোপ না ঙ্গে ভারী লোহার ধাতব কিছু দিয়ে আঘাত করলো। মুহূর্তেই রায়হানের বীভৎস চিৎকারে চারিপাশ কেঁপে উঠলো। রায়হানের আর্তনাদ ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে এলো। কণ্ঠ হারাল সে, শক্তিও হারাল। জীবনের শেষ আশাটুকুও।
ঘরের এক কোণে নুহা, আফরিন আর নূরাইসা চোখ-মুখ শক্ত করে বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ তাকাতে পারছে না, কেউ পালাতে পারছে না। এই সত্যের মুখোমুখি হওয়া কোনো মেয়ের জন্যই সহজ নয়। আর অন্য পাশে, রুহান, বিহান, এমরিন আর ইলহান। কারও মুখে উল্লাস নেই, নেই উন্মত্ততা। শুধু এক ধরনের তৃপ্ত নীরবতা, যেন দীর্ঘদিনের এক অসমাপ্ত কাজ শেষ হতে চলেছে।
রায়হান তখনও বেঁচে আছে। কিন্তু জীবিত বলার মতো কিছু নেই তার। ইলহান ধীরে বলে উঠল—
-"মৃ ত্যু মুক্তি। আর তুই সেই মুক্তি পাবি না। তুই মৃ ত্যুর জন্য ভিক্ষা চাবি কেউ তোকে মৃ ত্যু উপহার দিবে না।"
কথাগুলো বলেই ইলহান উঠে দাঁড়াল। পরের মুহূর্তেই সজোরে একটি লাথি আছড়ে পড়ল রায়হানের শরীরে। সে ব্যথায় কুঁকিয়ে উঠল, নিঃশ্বাস আটকে এল। এই প্রথম তার চোখে ভেসে উঠল পুরো সত্যটা। আজ আর তার রক্ষা নেই। সব বুঝে গেছে সে। কী নিখুঁতভাবে ফাঁদ পেতেছে ইলহান। নিজেরা মাতাল হওয়ার নাটক করে বাড়ি ফেরা, বউদের সামনে নিশ্চিন্ত অভিনয়, তারপর সুযোগ বুঝে ভাই আর ভাইয়ের বউকে পাঠিয়ে তাকে ধরে আনা, সবকিছু এত পরিকল্পিত, এত নিঃশব্দে হয়েছে যে কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি। এই ‘ঘুরতে আসা’ কোনো সাধারণ ভ্রমণ ছিল না। এটা ছিল সাজানো বিচার। রায়হানের ভাবনার মাঝেই ইলহানের নিষ্ঠুরতা নতুন রূপ নিল। ইলহান প্লাস দিয়ে রায়হানের হাতে-পায়ের সব গুলো নখ উপড়ে ফেলল। এরপর পরই সে তার হাতের সমস্ত আঙুল কে টে ফেললো। যন্ত্রণার তীব্রতায় তার শরীর বেঁকে গেল, কণ্ঠ থেকে আর চিৎকার বেরোলো না, শুধু অস্ফুট একরাশ শব্দ, যা অন্ধকারেই হারিয়ে গেল। এরপর ইলহান তার হাত-পা ভেঙে দিলো। এমন ভাবে যেনো রড দিয়ে জোড়া লাগানো না যায়। এরপর ধীরে ধীরে ইলহান তার দিকে এগিয়ে এসে পৈশাচিক এক হাসি হেসে তার জিহ্বা এক প চে কে টে ফেলল। এখন ব্যথা শুধু শরীরে সীমাবদ্ধ রইল না, রায়হান অনুভব করল নিজের অস্তিত্বটাই ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। হাত-পায়ের প্রতিটি স্নায়ু যেন আগুনে জ্বলছে। সে আর্তনাদ করতে চাইল, কিন্তু শক্তি ফুরিয়ে গেছে। কণ্ঠস্বর বিশ্বাসঘাতকতা করল। একসময় রায়হান শুধু পড়ে রইল, নিঃশ্বাস নেওয়া ছাড়া আর কিছু করার ক্ষমতা নেই তার। জীবিত, অথচ পরাজিত। জীবিত, অথচ নিঃশেষ। ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। এই নীরবতা কোনো শান্তির নয়, এটা ছিল এক চূড়ান্ত পরিণতির নীরবতা।
মেয়েরা ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে, চোখ-মুখ শক্ত করে বন্ধ। কেউ দেখছে না, তবু সবাই জানে কী হচ্ছে। কিছু দৃশ্য চোখে না দেখলেও আত্মায় গেঁথে যায়, এই মুহূর্তটা তেমনই। অন্য পাশে রুহান, ইলহান, বিহান আর এমরিন দাঁড়িয়ে। তাদের ঠোঁটে যে হাসি, সেটা আনন্দের নয়, এটা দীর্ঘদিনের জমে থাকা আগুন নিভে যাওয়ার তৃপ্তি। ন্যায়বিচার শেষ পর্যন্ত তার ঠিকানায় পৌঁছেছে, এই বিশ্বাসের নীরব স্বস্তি। শেষ বারের মতন ইলহান তার শরীরে লবণ মরিচের প্রলেপ লাগিয়ে দেয়। প্রতিটা ক্ষ ততে, যত্নসহকারে।
রায়হানের শরীর ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। যন্ত্রণা তাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে আর চিৎকার নেই, শুধু নিঃশ্বাসের জন্য হাহাকার। সে বুঝে যায়, আজ থেকে তার জীবন মানে কেবল বেঁচে থাকা নয়, বরং শাস্তি বহন করা। ইলহান থামে না। সে নিশ্চিত করে, এই মানুষটি যেন আর কখনো নিজের কৃতকর্ম ভুলে যেতে না পারে। তার গায়ে সে ছু রি দিয়ে কেটে কেটে লিখে দেয় R A P I S T!
শেষ পর্যন্ত রায়হান পড়ে থাকে নিস্তেজ, ভাঙা এক শরীর নিয়ে। জীবিত, কিন্তু সম্পূর্ণ পরাজিত। এই শাস্তি মৃ ত্যুর চেয়েও ভয়ংকর। কারণ মৃ ত্যু মুক্তি। আর ওর জন্য কোনো মুক্তি নেই। এখন থেকে প্রতিটা দিন সে মৃ ত্যু চাইবে, ভিক্ষার মতো। কিন্তু উপরওয়ালা না চাইলে, তার আর মৃ ত্যু হবে না।
একজন ধ র্ষি তা মানুষ যেমন সমাজে মাথা তুলে বাঁচতে পারে না, প্রতিটা দিন যার কাছে নরক, মানুষের দৃষ্টি যাকে ভয় দেখায়, ছোঁয়ার আশঙ্কায় যে কেঁপে ওঠে, রাতে ঘুমাতে পারে না, ঠিক তেমনই রায়হানের প্রতিটা সকাল হবে শাস্তি, প্রতিটা রাত হবে হিসাব। আর সেই অশেষ যন্ত্রণার তুলনায়, আজকের এই বিচার নেহাতই তুচ্ছ।