ডাক্তারের কেবিনে ভারী হয়ে ঝুলছিল নীরবতা। এসির মৃদু শব্দ, জানালার বাইরে শহরের এলোমেলো কোলাহল, সবকিছুকে ছাপিয়ে ডাক্তারের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো—
-"মিস্টার রাহাফ, আপনার ওয়াইফ অনেকটাই রিকভারি করেছে। এই ধরনের কেসে সাধারণত মেয়েরা শারীরিকভাবে দ্রুত সেরে উঠলেও মানসিক সুস্থতায় বছরের পর বছর লেগে যায়। কিন্তু আপনার ওয়াইফ ব্যতিক্রম। সে স্ট্রং মেন্টালিটির মেয়ে। নিজের জেদকেই শক্তি বানিয়েছে, আর সেই জেদ দিয়েই নিজেকে ধীরে ধীরে সুস্থ করে তুলছে। তবে, উনি এখনো একা একা বাইরে যাওয়ার সাহস সঞ্চয় করতে পারেননি। ওনাকে মানুষের মাঝে নিয়ে যেতে হবে। না হলে এই ঘরবন্দিত্বই ওনার জন্য সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়াবে।"
এমরিন নিঃশব্দে বসে ছিল। ডাক্তারের প্রতিটি শব্দ যেন ধারালো ছুরির মতো তার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছিল।সে এসেছিল আফরিনের অবস্থা জানতে। অথচ মাথার ভেতর তখন অন্য যুদ্ধ। রাশিয়া তাকে ডাকছে। ইতিমধ্যে গণ্ডগোল শুরু হয়ে গেছে। ইলহানের ওপর প্রতিশোধ ও নিতে হবে। সে জানে, সে মাফিয়া কিং।সিদ্ধান্ত নেওয়া তার জন্য বিলাসিতা নয়, দায়িত্ব। তবু আফরিনকে ছেড়ে যাওয়া, এটা তার পক্ষে অসম্ভব।কারণ এই নারী এখনো মানুষের ভিড়কে ভয় পায়। চোখে চোখ পড়লেই স্মৃতিরা তাকে টেনে নিয়ে যায় অন্ধকারে। সে আফরিনকে তার সাথে রাশিয়া নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু সেখানে অচেনা মানুষের ভিড়ে সে আরো অসুস্থ হয়ে পড়বে। তাই তাকে সুস্থ করা জরুরি।চিন্তিত কণ্ঠে, কিন্তু স্বাভাবিক গাম্ভীর্য ধরে রেখে এমরিন বলল—
-"সেটা কিভাবে করব? ও ভার্সিটি পর্যন্ত যায় না।"
ডাক্তার চেয়ারে হেলান দিলেন।
-"ওনাকে ঘুরতে নিয়ে যান। হাঁটতে নিয়ে যান। অবশ্যই পরিবার সঙ্গে রাখবেন, যেন সে একা ভাবার সুযোগ না পায়। আনন্দের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। প্রতিদিন দুই–তিন ঘণ্টা করে বাইরে যেতে পারেন। অথবা কয়েক দিনের জন্য কোথাও ঘুরে আসুন, পরিবেশ বদল ওনার জন্য খুব জরুরি।"
কথা শেষ হলে এমরিন আর কিছু বলল না। কেবল মাথা নাড়ল। তার চোখে তখন সিদ্ধান্তের ছায়া। কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে প্রয়োজনীয় কিছু কাজ সেরে নিল সে। হাসপাতালের করিডোর পেরোবার সময় তার হাঁটায় ছিল সেই পরিচিত কর্তৃত্ব, যে হাঁটায় মানুষ পথ ছেড়ে দেয়, প্রশ্ন করে না।
বিকেলের আগেই সে বাড়ির পথে রওনা হলো। বাড়িতে ঢুকেই আফরিনের দিকে তাকাল। তার চোখে কোনো দ্বিধা ছিল না, ছিল না কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন। গলার স্বরে সেই চেনা কঠোরতা—
-"কাপড়চোপড় গুছিয়ে নাও।"
আফরিন অবাক হয়ে তাকানোর আগেই এমরিন যোগ করল—
-"কাল আমরা বান্দরবন যাচ্ছি।"
সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। মাফিয়া কিং সিদ্ধান্ত নিলে, পৃথিবী শুধু মানিয়ে নেয়।
.
দেওয়ান বাড়ির নাস্তার টেবিলে আজও নীরবতা।বাড়ির ছেলেমেয়েরা বাড়িতে না থাকলে বাড়িটা নীরবতায় ছেয়ে যায়। বাকিটা জুড়ে এক ধরনের শূন্যতা। সবাই চুপচাপ খাচ্ছে। নূরাইসা মা–চাচীর পাশে পাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কারো প্লেট খালি দেখলেই খাবার এগিয়ে দিচ্ছে। চোখে-মুখে সেই চেনা দায়িত্বশীলতা, অথচ ভেতরে জমে থাকা অজানা অস্বস্তি। ঠিক তখনই ইলহান রাশভারী কণ্ঠে নীরবতা ভাঙল—
-"আফরিন রাতে কল করেছিল। আফরিনকে নিয়ে এমরিন বান্দরবন যাবে। ডাক্তার বলেছে ওকে কোথাও ঘুরতে নিয়ে যেতে। ওর আনন্দের স্মৃতি দরকার।"
একটু থামল সে। তারপর স্বাভাবিক অথচ সিদ্ধান্তে ভরা কণ্ঠে যোগ করল—
-"নুহা, বিহান, ওদের বলেছি ওরাও যাবে। আমরাও একটু পর বের হব।"
টেবিলজুড়ে হালকা নড়াচড়া। কেউ আপত্তি করল না। শুধু মাথা নাড়ল সবাই। কারণ দেওয়ান বাড়িতে সবাই জানে, ইলহান কোনো সিদ্ধান্ত হঠাৎ নেয় না। সে যা করে, ভেবেচিন্তেই করে।
খাওয়া শেষ হলে ইলহান উঠে নিজের রুমে চলে এলো। দরজা হালকা ভিজিয়ে রাখা। সে ফোনে কারো সাথে কথা বলছে, কণ্ঠ নিচু, কিন্তু তাতে কর্তৃত্বের কোনো ঘাটতি নেই। ঠিক তখনই নূরাইসা এসে দাঁড়াল।কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধীর স্বরে বলল—
-"আমি যাব না।"
ইলহান হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। ফোনটা কানের কাছ থেকে নামিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠল—
-"ওই মাফিয়ার সাথে আমার বোনকে আমি একা পাঠাবো না। আর আমরা সবাই গেলে ওর ভালো লাগবে।"
এরপর আর কোনো কথা নয়। আবার ফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়ল ইলহান, যেন এই আলোচনা এখানেই শেষ।নূরাইসা কিছু বলল না। আফরিনের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠল, ভীত, তবু একটু ভালো থাকার আশায় তাকিয়ে থাকা চোখ। সেই ভাবনাতেই সে আর দ্বিমত করল না। চুপচাপ কাপড়চোপড় গোছানো শুরু করল। কারণ কিছু সিদ্ধান্ত প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকে, বিশেষ করে যখন সেগুলো প্রিয়জনের হাসির জন্য নেওয়া হয়।
.
আফরিন আর এমরিন ব্যাগপত্র হাতে নিয়ে নিচে নেমে আসে। স্টাফদের শেষবারের মতো সব বুঝিয়ে দিয়ে তারা বেরিয়ে পড়ে। বাইরে পা দিতেই চোখে পড়ে, একটি চকচকে Lexus GX 550 নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ির সামনেই ব্ল্যাক শার্ট-প্যান্ট আর লেদার জ্যাকেট পরা দু’জন পুরুষ, বিহান ও ইলহান। দুজনের চোখেই কালো সানগ্লাস, কপাল কুঁচকে আছে, যেনো চারপাশটাকে শাসন করছে তাদের নীরব উপস্থিতি।গাড়ির এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে নুহা ও নূরাইসা।দুজনেই শাড়ি পরা,।নূরাইসার লাল শাড়ি রোদের আলোয় আরও তীব্র, নুহার বেগুনি শাড়ি যেনো বিকেলের ছায়া মেখে আছে। দুজনের চুলই খোলা, হালকা বাতাসে এলোমেলো হয়ে উড়ছে। বসন্তের দিনগুলো পার হয়ে গেলেও ঘোরাফেরা করা হয়নি, সেই আফসোস থেকেই নুহা ফোন করে আজ শাড়ি পরতে বলেছিল। আফরিন এমেরেল্ড গ্রীন শাড়িতে যেনো নতুন এক রূপে ধরা দিয়েছে। আর এমরিন, ইলহান আর বিহানের মতোই গাঢ় রঙের পোশাকে, মুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ।
আফরিন বোনদের দেখে আর নিজেকে সামলাতে পারে না, দৌড়ে চলে যায় তাদের দিকে। অন্যদিকে এমরিন ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ইলহান ও বিহানের পাশে দাঁড়ায়। তিনজনের মুখেই একইরকম বিরক্তি, যেনো অদৃশ্য কোনো ঝড় জমে আছে ভেতরে। ইলহান গম্ভীর কণ্ঠে বলল—
-"যাওয়া যাক তাহলে।"
তার কথার ভারী রেশ কাটার আগেই নুহা উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠল—
-"আমরা তিনবোন এক সাথে বসবো।"
ইলহান কিছু বলল না। কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়েই সোজা গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ল। পাশের সিটে বসল বিহান। এমরিনের মুখ আরও শক্ত হয়ে উঠল।বিরক্তি চাপতে না পেরে বলে উঠল—
-"আমি মাফিয়া কিং, আর আমি সবার পিছে বসবো? না, কখনোই না।"
নুহা মুখ ভেংচি কেটে সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল—
-"মাফিয়া কিং না কি কিং, সেটা এতবার মুখে বলতে হয় কেনো? যান পিছে গিয়ে বসুন!"
ব্যাস, শুরু হয়ে গেল নুহা আর এমরিনের ঝগড়া। কথার তীর ছুটছে, আচরণে একেবারে বাচ্চাদের মতো। গাড়ির চারপাশে মুহূর্তেই জমে উঠল অদ্ভুত এক উত্তেজনা। শেষ পর্যন্ত নূরাইসা এগিয়ে এসে নুহাকে থামিয়ে বলল—
-"উনি আফরিনের সাথে বসতে চাইছে বুঝতে পারছিস না? তোরা তিনজন সামনে বস। আমি পিছে বসছি।"
পরিস্থিতি খানিকটা শান্ত হলো। প্রথমে নুহা বসল, তার পাশে আফরিন, এরপর এমরিন গিয়ে বসল। পিছনে নূরাইসা বসেছে। ইঞ্জিন স্টার্ট দিতেই গাড়ি ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল। এমরিন বিরক্ত দৃষ্টিতে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে, দূরে ছুটে চলা রাস্তা যেনো তার অস্থির মনের প্রতিচ্ছবি। বিহান ল্যাপটপে কী যেনো টাইপ করছে, চোখ এক মুহূর্তের জন্যও স্ক্রিন ছাড়ছে না। নূরাইসা মলিন মুখে চুপচাপ বসে আছে, নিজের ভাবনায় ডুবে। সামনের সিটে আফরিন আর নুহা জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে, হাসি আর কথায় গাড়ির ভেতরটা হালকা রাখার চেষ্টা। আর ইলহান, নিঃশব্দ, মনোযোগী, গাড়ির স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে চালিয়ে যাচ্ছে।
টানা তিন ঘণ্টা ড্রাইভ করার পর ইলহানের ক্লান্তি চোখে পড়ার মতো হয়ে ওঠে। দাউদ কান্দি এসে সে গাড়ি থামায়। রাস্তায় জ্যাম থাকায় এত সময় লাগলো। সবাই নেমে হাত-মুখ ধুয়ে কাছের এক রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসে। ঘড়ির কাঁটা তখন বিকেল চারটা ছুঁয়ে ফেলেছে। দুপুরের লাঞ্চ করা হয়নি, তাই হালকা খাবারেই সবাই ক্ষুধা মেটায়। রেস্টুরেন্টের ভেতর নীরবতা, বাইরের রাস্তার শব্দ, আর ভেতরে জমে থাকা অপূর্ণ কথাগুলো, সব মিলিয়ে মুহূর্তটা যেনো অদ্ভুত এক স্থিরতায় থমকে থাকে।
খাওয়া শেষে সবাই আবারও গাড়ির দিকে হাঁটা ধরল।বাতাসে তখন ক্লান্তি আর অদ্ভুত এক নীরবতা ভাসছে।গাড়ির কাছে পৌঁছাতেই ইলহান হালকা স্বরে বলে উঠল—
-"শাহ, তুই ড্রাইভ কর। আমি একটু ঘুমাবো।"
বিহান আর দেরি করল না। চাবি হাতে নিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ল। ঠিক তখনই নুহা হঠাৎ আফরিনের হাত ঝাড়া মেরে ছেড়ে দিয়ে দ্রুত গিয়ে সামনের পাশের সিটে বসে পড়ল। আফরিন কটমট করে তাকিয়ে রইলো। ইলহান জানালার পাশের সিটে গিয়ে বসল, যেনো সেটাই তার নির্ধারিত জায়গা। আফরিন টেনে জোর করে এমরিনকে পেছনে বসিয়ে দিলো। এমরিন স্পষ্টতই পেছনে বসতে চাইছিল না, তবু আফরিনের জেদের কাছে হার মানতে হলো।
নূরাইসা পেছনে বসতে যাবে, তার আগেই ইলহান তার হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টান মারে। তাল সামলাতে না পেরে নূরাইসা ইলহানের কলের ওপর পড়ে যায়।নূরাইসা আতঙ্কে ইলহানের জ্যাকেট খামচে ধরল।মুহূর্তেই গাড়ির ভেতরের বাতাস জমে উঠল। নুহা আর আফরিন একসাথে মুখে হাত চেপে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে, বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মাঝামাঝি কোথাও দাঁড়িয়ে। এমরিন বিরক্তিতে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে উঠল—
-"সালা শুম্মুদনি... চোখের সামনে বউ নিয়ে রোমান্স করে, আর এদিকে আমি বউ ছুঁলেই প্যানিক অ্যাটাক করে। সালার কপাল আমার!"
বিহান মুচকি হেসে চোখ ঘুরিয়ে নিল বলল—
-"ভাই কন্ট্রোল। আমি আছি, ছোট বোন, বোন জামাই আছে।"
ইলহান ভাবলেশহীন উত্তর দিলো—
-"বউ ছাড়া ঘুমোতে পারি না। এত বেশি ভাবার কিছু নেই। গতরাতে ঘুম হয় নি আমার। এখন জম্পেশ একটা ঘুমের প্রয়োজন আমার। চুপচাপ গাড়ি চালা।"
সবাই মিটিমিটি করে হাসছে। এমরিন চোখমুখ কুঁচকে বসে আছে। ইলহান নূরাইসার কোমর আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার ঘাড়ে নাক-মুখ গুঁজে, গভীর কণ্ঠে বলল—
-"ঘুমাবো আমি। সবাই চুপচাপ বসে পড়।"
এদিকে নূরাইসা ইলহানের সাথে ধস্তাধস্তি শুরু করে দিয়েছে। ইলহান বিরক্ত কণ্ঠে বলল—
-"সমস্যা কি? ঘুমাতে দে!"
নূরাইসা মিনমিন করে বলল—
-"ঘুমান বারণ করেছে কে? নামান আমাকে। সবার সামনে এইভাবে থাকা যায়? লজ্জা করে না আপনার? নামান বলছি। এতটা পথ যাবো, আমার শরীর ব্যথা হয়ে যাবে!"
লজ্জায় নূরাইসার গাল টকটকে লাল। সে এখনো ইলহানের সঙ্গে ঠিক করে কথা বলে না,।আর এই লোকটা এমন আচরণ করছে, যেনো তাদের মাঝে কোনো দূরত্বই নেই। ইলহান মাথা তুলে তাকাল।নূরাইসার খোলা চুল মুখের সামনে নেমে এসেছে। এক হাত বাড়িয়ে আলতো করে চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে নিচু স্বরে বলল—
-"ব্লাডমুন রূপ ধারণ করছিস। শান্তিতে ঘুমাতে দে... নইলে অন্য কিছু করে ফেলবো।"
নূরাইসা আর কথা বলল না। চুপসে গেল, ঠিক ঝড় থেমে যাওয়া রাতের মতো। ইলহান আবারও তার ঘাড়ে মুখ গুঁজে দিল, শ্বাসের উষ্ণতায় নূরাইসার বুক কেঁপে উঠল।
আফরিন আর নুহা লুকিয়ে লুকিয়ে ছবি তুলছে,।হাসি চাপতে গিয়ে বারবার ঠোঁট কামড়াচ্ছে। বিহান মিটিমিটি হাসছে, চোখে একরাশ দুষ্টুমি। আর এমরিন, রাগ, দুঃখ আর হাহাকারের মাঝখানে বসে আছে নীরবে। আফরিনের দিকে একবার তাকালো এমরিন। ধীরে ঝুঁকে এসে তার কানে ফিসফিস করে বলল—
-"দেখে কিছু শিখতে তো পারো। তা না ভাই–ভাবির ছবি তুলছ! পাশে যে জামাই শুকনো মুখে বসে আছে, দয়া মায়া হয় না তোমার?"
আফরিন ভ্রু কুঁচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল—
-"ইশ্ সখ কত! একদম গাড়ি থেকে ফেলে দিবো। যান দূরে গিয়ে বসুন। লজ্জা-সরমের মাথা খেয়েছে। সামনে শুম্মুন্দি বসা, আর এ রোমান্স করার ইচ্ছে প্রকাশ করছে!*
-"শুম্মুন্দির নিজেরই তো লজ্জা নেই। বোন, বোনজামাইয়ের সামনে বউ নিয়ে ঘুমাচ্ছে!"
-"তাতে আপনার কী? ভাইয়া যে কত ক্লান্ত, দেখতে পাচ্ছেন না? চুপচাপ বসুন নির্লজ্জ। ভাইয়া শুনতে পেলে লজ্জায় ম রেই যাবো আমি!"
এমরিন এবার আর একটু ঝুঁকে এলো। গলার স্বর হঠাৎ করেই বদলে গেল, মোহনীয়, গভীর, যেনো প্রতিটি শব্দে মায়া জড়ানো।
-"তোমার লজ্জা, তোমার ভয়,।সবকিছুর ওপারে যা চাও, আমি তা-ই দেব তোমায়। তোমার কল্পনার সীমারও বাইরে নিয়ে যাব অনুভূতির এমন এক জগতে, যেখানে ইচ্ছারও থাকে না কোনো নাম। তুমি কোনো কারাগারে বন্দি নও, তুমি আছো আমার উপাসনালয়ে। যেখানে আমি তোমায় বন্দি করে রাখি নি, বরং তুমি আমার সৃষ্টির অর্ধেক, আমার আত্মার প্রতিফলন। তাই তোমাকে কাছে পাওয়ার বাসনা প্রকাশ করায় আমার কোনো লজ্জা নেই, কারিনো।আর আমি জন্মগত নির্লজ্জ। বিশ্বাস করো জান, জন্মের সময় আমি একটা সুতো পরেও আসি নি।"
আফরিন চোখমুখ কুঁচকে অবিশ্বাস আর বিরক্তির মিশেলে তাকিয়ে রইল। পরক্ষণেই এমরিন উচ্চশব্দে হেসে নিজের জায়গায় গিয়ে বসে পড়ল,।হাসিতে লুকানো দুষ্টুমি আর আত্মতৃপ্তির স্পষ্ট ছাপ। আফরিন তখন বুঝে গেছে, সবটাই ইচ্ছে করেই বলা। সে নিজেও আর রাগ ধরে রাখতে পারল না। ঠোঁটের কোণে মিটিমিটি হাসি ফুটে উঠল। গাড়ির ভেতর তখন, কেউ ঘুমাচ্ছে, কেউ ছবি তুলছে, কেউ প্রেম লুকোচ্ছে, আর কেউ বা দুষ্টুমি দিয়ে ভালোবাসাকে উসকে দিচ্ছে।
.
নূরাইসার সম্পূর্ণ শরীর ধীরে ধীরে অবশ হয়ে আসছে।দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে বসে থাকতে থাকতে শরীরটা যেনো জমে গেছে। অস্বস্তি আর ব্যথা মিলেমিশে এক অদ্ভুত ভার নেমে এসেছে তার উপর। সে সাহস সঞ্চয় করে ইলহানের কানের কাছে মুখ নিয়ে খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল—
-"শুনুন... উঠুন। আমার শরীর অবশ হয়ে আসছে তো।"
প্রথমবার ইলহান কিছুই শুনতে পেল না। কয়েকবার ডাকবার পর অবশেষে তার ঘুম ভাঙল। ঘুমঘুম চোখ মেলে তাকাল সে। নূরাইসা তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি সরিয়ে নিল।এই লোকটার আধঘুম চোখ আর ভাঙা কণ্ঠস্বর নূরাইসার ভিতর অকারণ দুর্বলতা নামিয়ে আনে, যেনো মনটা নিজের অজান্তেই নরম হয়ে যায়। ইলহান কোনো কথা না বাড়িয়ে নূরাইসাকে আলতো করে পাশের সিটে বসিয়ে দিল। তারপর সামনে তাকিয়ে বিহানের উদ্দেশে বলল—
-"গাড়িটা একটু সাইড কর।"
ততক্ষণে গাড়ির ভেতর প্রায় সবাই ঘুমে ঢলে পড়েছিল, বিহান ছাড়া। চট্টগ্রাম সিটি বাইপাসে এসে গাড়ি থামানো হলো। হঠাৎ গাড়ি থামায় সবাই একসাথে জেগে ওঠে। নেমে হাত-মুখ ধুয়ে নেয়, শরীরটা ঝেড়ে নেওয়ার জন্য একটু হাঁটাহাঁটি করে। কাছের এক রেস্টুরেন্ট থেকে রাতের খাবার সেরে আবারও গাড়িতে উঠে পড়ে সবাই। এবার ড্রাইভিং সিটে বসল এমরিন।তার পাশে আফরিন। পেছনে বিহান আর নুহা। আর একদম পেছনের সিটে, ইলহান ও নূরাইসা।
ইলহান যেনো পণ করে নিয়েছে, আজ নূরাইসাকে একা ছাড়বেই না। নূরাইসা চুপচাপ হয়ে গেছে। কারো সাথেই কথা বলছে না। তার নীরবতা ভারী, গভীর, যেনো অনেক কথা জমে আছে, কিন্তু বেরোচ্ছে না।ইলহান জানে, নূরাইসাকে এইভাবে একা আর চুপ করে থাকতে দিলে এই নীরবতা কোনোদিন ভাঙবে না। তাই সে ইচ্ছা করেই তাকে জ্বালাচ্ছে, কখনো কথা বলে, কখনো ছুঁয়ে, কখনো আবার নিঃশব্দ উপস্থিতি দিয়ে।
ঘুমোনোর নাম করে যে ঘাড়ে মুখ গুঁজেছিল, এই পুরুষ শুধু মুখ গুঁজেই ক্ষান্ত হয়নি। যতক্ষণ জেগে ছিল, ততক্ষণ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চুমু খেয়েছে, কখনো আবার দুষ্টুমি করে কামড়ও দিয়েছে। চারপাশে সবাই ছিল বলে নূরাইসা কিছু বলতে পারেনি, প্রতিবাদ তো দূরের কথা।গাড়ির চাকার শব্দে চাপা পড়ে রইল নূরাইসার নিঃশব্দ শ্বাস, লুকোনো অস্বস্তি আর ইলহানের অনড় উপস্থিত। নূরাইসা নীরবতার ভেতরেই যুদ্ধ লড়ছে অনুভূতির সঙ্গে।
নূরাইসা নিঃশব্দে জানালার বাইরে তাকিয়ে বসে আছে। চোখ দুটো খোলা, অথচ দৃষ্টি কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। তার মনটা একদম ভালো নেই, সবকিছু তার কাছে বিষাক্ত মনে হচ্ছে। সব অনুভূতি তার গোলা চেপে ধরেছে। বাতাস, রাস্তা, গাড়ির শব্দ, সবই ভারী। কোথাও পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে। এমন কোনো জায়গায়, যেখানে স্মৃতি পৌঁছাতে পারে না। বিয়ের পর থেকে ঘটে যাওয়া সমস্ত কিছু একে একে তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। দৃশ্যের পর দৃশ্য, শব্দের পর শব্দ, সব মিলিয়ে বুকের ভেতর জমে থাকা ভার আর সহ্য হচ্ছে না। চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে। থামাতে চাইলেও পারছে না।
তার নাক টানার ক্ষীণ শব্দে ইলহান ঘুরে তাকাল।নূরাইসাকে কাঁদতে দেখে সে আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। সোজা নূরাইসার কোলের ওপর মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। এই স্পর্শটাই যেন বাঁধ ভেঙে দিল।নূরাইসা এবার আর চুপ করে থাকতে পারল না। শব্দ করে কেঁদে উঠল। কান্না ছড়িয়ে পড়ল গাড়ির ভেতর, নিঃশব্দ ভ্রমণের মধ্যে হঠাৎ নেমে আসা এক গভীর বিষাদ হয়ে।
নুহা, আফরিন আর বিহান উৎকণ্ঠিত হয়ে পেছনে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল—
-"কি হয়েছে? কাঁদছিস কেনো ইসা? খারাপ লাগছে?"
ইলহান শান্ত, কিন্তু কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠে বলে উঠল—
-"সামনে তাকাও সবাই। ভুলেও পেছনে ঘুরবি না।আমার জন্য কাঁদছে, শুধু আমি দেখব!"
সঙ্গে সঙ্গে সবাই চোখ ফিরিয়ে নিল। কেউ আর পেছনে তাকাল না। নূরাইসার কান্না থামার কোনো নাম নেই।দম আটকে আসছে, হেঁচকি উঠছে। আর ইলহান, সে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। যেন এই কান্নার মধ্যেই সে নূরাইসাকে সবচেয়ে জীবন্তভাবে দেখতে পাচ্ছে।নূরাইসা হাত দিয়ে মুখ ঢাকতে চাইল, কান্নাটা আড়াল করতে। কিন্তু ইলহান সেটা হতে দিল না। তার হাত সরিয়ে দিয়ে নিচু গলায় বলল—
-"কান্না করছিস, কর। তোকে তো বলেছি, আমার জন্য আর আমার কারণেই কান্না করবি। তাহলে মুখ ঢাকছিস কেনো? আমি দেখব তোর কান্না। তুই তিনটে সময় ব্লাডমুন হোস জানিস? এক, যখন তুই রেগে যাস।দুই, যখন তুই কান্না করিস। আর তিন, যখন আমি তোকে গ্রাস করি।"
নূরাইসা আর তাকাল না তার দিকে। জানালার বাইরে তাকিয়ে এবার নিঃশব্দে কাঁদছে। ক্ষণে ক্ষণে হেঁচকি উঠছে। কান্না এখন আর শব্দ নয়, এখন নিঃশ্বাসের ভেতরে ঢুকে গেছে। আর ইলহান, সে উপভোগ করছে তার ব্লাডমুনের এই রূপ। এই ভাঙা, নরম, অথচ ভয়ংকরভাবে সুন্দর রূপ।
সামনের সিটে নুহা বিষন্ন মুখে বিহানের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল—
-"আপু কাঁদছে কেনো? কিছু হয়েছে ওদের মাঝে?"
বিহান জানালার দিকে তাকিয়েই উত্তর দিল—
-"স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপার। তোমাকে এত ভাবতে হবে না। একটু ঘুমিয়ে নাও।"
নুহা আর কিছু বলল না। ড্রাইভিং সিটে এমরিন বিরক্তি নিয়ে আফরিনকে বলল—
-"সেই কখন থেকে কাঁদছে। তোমার ভাই থামাচ্ছে না কেনো?"
-"কিছু হয়েছে বোধহয়!"
-"তাই বলে বউ কাঁদবে আর সে চুপচাপ থাকবে?"
আফরিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—
-"ইসা অনেক চাপা স্বভাবের, কোমল মনের মানুষ। ওকে কাঁদতে না দিলে ওর অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। ও নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে না। তাই ওকে কাঁদতে দিতে হয়। নইলে ওর ভেতরের সব অনুভূতি জমে ও পাগল হয়ে যাবে। কান্না করেই সব অনুভূতি বের করছে। তাই ভাইয়া ওকে বাধা দিচ্ছে না।"
এমরিন ভ্রু কুঁচকে বলল—
-"এবার কেমন থিওরি?"
আফরিন বিরক্ত হয়ে বলল—
-"কিছু মানুষ অনুভূতি প্রকাশ করতে না পারলে, রেগে যায়, রাগ প্রকাশ করে সবার ওপর। আর কিছু মানুষ কান্না করে। আপনি বুঝবেন না। গাড়ি চালান, চুপচাপ!"
গাড়ি ছুটে চলেছে সামনে, আর পেছনের সিটে, জানালার পাশে বসে এক নারী নিজের সমস্ত ভাঙা অনুভূতি কান্নার মধ্য দিয়ে বাঁচিয়ে রাখছে।