থমথমে নীরবতায় দেওয়ান বাড়ির ড্রয়িংরুমে বসে আছে সবাই। যেন শব্দ নিজেই এখানে ঢুকতে ভয় পাচ্ছে। শীতল বাতাস জানালার ফাঁক গলে ঢুকে ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত ভারী আবহ তৈরি করেছে। শীত আছে, কিন্তু কুয়াশা নেই, ঠিক যেমনটা থাকে বড় কোনো বিপদের আগের মুহূর্তে। ড্রয়িংরুমের মাঝখানে রাখা বড় সোফায় বসে আছেন ইকবাল দেওয়ান।কপালের ভাঁজ গভীর, চোখদুটি স্থির কিন্তু ভেতরে জমে আছে দুশ্চিন্তার ঘন অন্ধকার। পাশে নাহিদ দেওয়ান, চুপচাপ, দুই হাত শক্ত করে জড়ানো, ঠোঁট কামড়ে রাখা, যেন একটুখানি অসতর্ক হলেই ভেঙে পড়বেন। তানিয়া বেগমের চোখ লাল। কান্না থামিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু দৃষ্টি ছুটে যাচ্ছে জানালার বাইরে, যেন সেখানে তাকালেই মেয়েটাকে দেখতে পাবেন। নাজনীন বেগম নিঃশব্দে তসবিহ ঘোরাচ্ছেন, ঠোঁট কাঁপছে, দোয়ার শব্দ বেরোচ্ছে না, শুধু বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে আছেন। ইলিনা বেগম তানিয়া বেগমকে ধরে বসে আছেন। এক কোণে বসে আছেন দাদা–দাদী। দাদীর চোখে অসহায়ত্ব, দাদার চোখে ক্ষোভ, এই বয়সে এসে সন্তানদের এমন যন্ত্রণায় দেখতে হবে, তা তিনি মানতেই পারছেন না।
রুহান চেয়ারের হাতলে আঙুল ঠুকছে অন্যমনস্কভাবে।তানভীর মাথা নিচু করে বসে আছে, চোয়াল শক্ত, রাগ আর অসহায়ত্ব একসাথে গিলে ফেলছে সে। নুহা চোখ মুছছে বারবার, কিন্তু কান্না চেপে রাখার চেষ্টা বৃথা। বিহান চুপচাপ ইলহানের পাশে বসে আছি। কারো মুখে কোনো কথা নেই। নিঃশ্বাসগুলোও যেন হিসেব করে নেওয়া। কী করবে, কেউ কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। ইলহান ইতিমধ্যে বাড়ির সবাইকে সম্পূর্ণ সত্য বলেছে। একটাও কথা গোপন রাখেনি সে। সত্যের ভারে যেন ড্রয়িংরুমের দেয়ালগুলো আরও সঙ্কুচিত হয়ে এসেছে। তার মুখে ক্লান্তি আছে, কিন্তু দুর্বলতা নেই। চোখদুটো শান্ত, অথচ ভেতরে জমে আছে আগুন। আফরিনের বাবা আফজাল শেখ গতকালই বিদেশ থেকে চলে এসেছেন। দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি তার শরীরে নয়, মুখে লেখা আছে মেয়েকে না পাওয়ার যন্ত্রণা। মেয়ের এই দুরবস্থার কথা শুনে কোনো বাবা কি নির্বিঘ্নে বসে থাকতে পারে? কখনোই পারে না।পাগলের মতো ছুটে এসেছেন তিনি। আরও আগেই চলে আসতেন, কিন্তু টিকিট না পাওয়ার জন্য আসতে পারেন নি।।কিন্তু এসেও তিনি মেয়েকে পেলেন না। এই না পাওয়াটাই যেন সবচেয়ে বড় আঘাত। চেয়ারে বসে থেকেও তার শরীর কাঁপছে।
ইলহান তার পরিকল্পনা সম্পর্কে সব বলেছেন।আফরিন ওখানে গেলেও সে কিছু পরিকল্পনা করেই সেখানে গিয়েছে। নিজের ওপর হওয়া অমানবিক নির্যাতনের প্রতিশোধ তাকে নিজেরই নিতে হবে, এই সিদ্ধান্তেই সে অনড়। তিনজনের মধ্যে দুজনকে আফরিন চেনে। আর সেই দুজন এমরিনের কাছেই আছে। তাই আফরিনের সেখানে যাওয়া। এই কথাগুলো বলার সময় ইলহানের গলায় কোনো কাঁপুনি ছিল না। ছিল শুধু কঠিন দৃঢ়তা। সে স্পষ্ট করে বলেছে, বিনা দোষে কাউকে শাস্তি দেবে না। প্রতিশোধ নিবে, কিন্তু তার আগে প্রমাণ সহ অপরাধীদের ধরতে হবে।কথাগুলো যেন বাতাস কেটে ছুরির মতো ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়েছে।
বিষণ্ন মুখে সবাই বসে আছে। বাইরে বাতাস বইছে, ভেতরে বইছে আশঙ্কা। দেয়ালের ঘড়ির টিকটিক শব্দটা হঠাৎ খুব বেশি জোরে শোনা যাচ্ছে, সময় যেন কাউকে অপেক্ষা করতে দিচ্ছে না।
ইলহানের ফোনে একটি ফোন আশায় সে দ্রুত উঠে নিজের রুমে চলে গেল। তার পায়ের শব্দ ড্রয়িংরুমের নিস্তব্ধতাকে খানখান করে দিল। সেই শব্দে যেন সবাই একটু কেঁপে উঠল। তাকে চলে যেতে দেখে নূরাইসা চিন্তিত বদনে তার পিছু নিল। নূরাইসার চোখে ভয়, আবার অদ্ভুত এক ভরসাও, যেন জানে, এই মানুষটা হার মানবে না। ড্রয়িংরুমে আবার নীরবতা নেমে এলো।শুধু শীতল বাতাস আর আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস নিয়ে।মনে হচ্ছিল, এই ঘরে এখন শুধু মানুষ নয়, ভাগ্যও বসে আছে নিঃশব্দে।
.
নূরাইসা ঘরে ঢুকে কোথাও ইলহানকে পেলো না। খালি ঘর, অগোছালো বিছানা, জানালার পাশে পড়ে থাকা অর্ধখোলা পর্দা, সবই যেন বলছে, ইলহানের ভেতরটা এখন ঠিক এই ঘরের মতোই এলোমেলো। বুকের ভেতর অজানা শঙ্কা নিয়ে খুঁজতে খুঁজতে সে শেষমেশ বেলকনিতে চলে এলো। ইলহান চিন্তিত মুখে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পায়চারি করছে। ঠোঁটে জ্বলে থাকা সিগারেট থেকে ধোঁয়া উঠছে, বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে, আবার নতুন করে জমছে, ঠিক তার মাথার ভেতরের চিন্তাগুলোর মতোই। চোখদুটি স্থির, যেন অনেক দূরের কিছু দেখছে, যা এই মুহূর্তে কারো বোঝার ক্ষমতা নেই। নূরাইসা ধীর পায়ে তার কাছে এগিয়ে এলো। তার উপস্থিতি টের পেলেও ইলহান কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। এক মনে সিগারেট টেনে চলেছে। নূরাইসা বুঝতে পারছে, এই নীরবতাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। নূরাইসা ধীর কণ্ঠে বলল—
-"এতই যখন চিন্তা হচ্ছে তাহলে যেতে দিলেন কেনো?"
ইলহান ঠোঁট থেকে সিগারেট নামিয়ে ধোঁয়া উড়িয়ে দিতে দিতে রাশভারী কণ্ঠে বলল—
-"আমার চিন্তা সেটা নয়।"
নূরাইসার বুক আরও ভারী হয়ে এলো। সে এক পা এগিয়ে এসে বলল—
"তাহলে কি নিয়ে এত দুশ্চিন্তা?"
ইলহানের মেজাজ এমনিতেই ভালো না। কলটা কোনো সুখবর দিতে পারে নি বিধায় মাথায় র ক্ত চড়ে আছে তার। তার কণ্ঠ এবার আরও কঠিন হলো—
-"তুই বুঝবি না। যা এখান থেকে আমাকে একটু একা থাকতে দে।"
নূরাইসা থামল না। বরং দু’পা এগিয়ে এসে দৃঢ় কণ্ঠে বলল—
-"আপনি না বললে আমি বুঝব কেমন করে? আপনি বলুন তারপর দেখুন বুঝি কি না!"
ইলহান বিরক্ত হয়ে মুখ ঘুরিয়ে বলল—
-"এত কথা বলছিস কেন? যা নিচে যা। বলছি তো তুই বুঝবি না। আর সব কথা তোর জানার প্রয়োজনও নেই!"
এই কথায় নূরাইসার চোখে জল চলে এলো, কিন্তু কণ্ঠ কাঁপল না। জমে থাকা অভিমান, ক্ষোভ আর অসহায়ত্ব একসাথে বেরিয়ে এলো—
-"আপনি সবসময় এমনি করেন। কেনো কি করেন আমাকে কিছুই বলেন না আপনি। আমাকে আর্মিতে নিয়ে যাওয়াও আপনার পরিকল্পনা ছিল অথচ আপনি একটি নাটক সাজালেন। একটিবারের জন্য আমাকে কিছু বলেন নি। কেনো এই লুকোচুরি আমার সাথে? কেনো আপনার দুশ্চিন্তা গুলো আমার সাথে ভাগ করে নেন না?"
এইবার ইলহান থেমে গেল। পায়চারি বন্ধ হলো।সিগারেটটা আঙুলে পিষে ফেলল সে। চোখে জমে থাকা আগুন এবার আর চাপা থাকল না। ইলহান রাগান্বিত কণ্ঠে হুংকার ছেড়ে বলল—
-"বেশি কথা বলছিস নূরাইসা। যা একা থাকতে দে আমায়!"
ইলহানের আকস্মিক চিৎকারে নূরাইসা কেঁপে উঠল।শব্দটা যেন বেলকনির দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এলো। মুহূর্তের জন্য তার বুকের ভেতর শূন্যতা তৈরি হলো, কিন্তু সে পিছু হটলো না। চোখে জল জমলেও পা শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইলো। একই দৃঢ়তার সঙ্গে সে বলল—
-"কোথাও যাব না আমি। আমাকে এখন এই মুহূর্তে সব কিছু বলবেন আপনি।"
ইলহানের দুশ্চিন্তায় মাথা কাজ করছে না। চিন্তাগুলো যেন একটার ওপর আরেকটা চাপা পড়ে আছে। এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর সে পায় নি। এখনো অনেক পরিকল্পনা তার বাকি। এখনো একজনকে ধরা হয় নি। বুকের ভেতর জমে থাকা এই অস্থিরতার মধ্যে নূরাইসার এই জেদ তাকে ভয়ঙ্করভাবে রাগিয়ে দিচ্ছে।সে নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না। হঠাৎ করেই চিৎকার করে উঠল—
-"এখান থেকে যা নূরাইসা নইলে হাত উঠে যাবে আমার। এত প্রশ্ন কেনো করছিস? তোকে বাঁচানোর জন্য আমি আমার আর দুই বোনের ওপর নজর রাখতে পারি নি। যার ফলে ওদের দুজনের আজ এই অবস্থা।"
বেলকনির বাতাস যেন মুহূর্তে জমে গেল। নূরাইসা বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। চক্ষুদ্বয় স্থির ইলহানের ওপর। তার কান যেন বিশ্বাস করতে পারছে না যা শুনছে। ইলহান রাগে পায়চারি করছে, সিগারেটের ধোঁয়া বাতাসে উড়াচ্ছে, আর সেই ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে বেরিয়ে আসছে এমন এক সত্য, যার জন্য নূরাইসা একদমই প্রস্তুত ছিল না। আফরিন আর নুহার এই অবস্থা, তার জন্য? সে কি বলেছিল, তাকে বাঁচাতে? এইসবের কিছুই তো সে জানত না। নূরাইসার কণ্ঠ কেঁপে উঠল। এতক্ষণে সে শুধু একটি বাক্যই উচ্চারণ করতে পারল—
-"নুহা... আর... আফরিনের... এই অবস্থা আমার জন্য হয়েছে? আমাকে বাঁচানোর জন্য...?"
ইলহান তখন ক্রোধে উন্মত্ত, হিতাহিত জ্ঞান সম্পূর্ণভাবে লোপ পায় তার। কী বলছে, না বলছে, সে নিজেও বুঝতে পারছে না। নিজের ভেতরের অপরাধবোধ আর ক্ষোভ মিলেমিশে এক হয়ে গেছে। ক্ষিপ্ত মেজাজে পায়চারি করতে করতে সে বলে উঠলো—
-"হ্যাঁ! হ্যাঁ! তোর জন্য! তোকে বাঁচানোর জন্য এত মগ্ন যদি আমি না থাকতাম তাহলে ওদের সাথে এইসব কিছুই হতো না। তোকে বাঁচানোর জন্য আমি এতটাই মগ্ন ছিলাম যে অন্যদের অবহেলা করেছি। খুশি তুই? উত্তর পেয়েছিস? এবার যা, i said get lost!"
কথাগুলো যেন নূরাইসার বুক চিরে ভেতরে ঢুকে গেল।তার শরীর ঝাঁকি দিয়ে উঠলো। চক্ষুদ্বয়ে জমে থাকা অশ্রুগুলো আর ধরে রাখা গেল না, মুক্তর মতন টুপটাপ করে ঝরে পড়ল। এক মুহূর্তও সে আর দাঁড়াল না। কোনো কথা না বলে এক ছুটে সেখান থেকে চলে গেলো।
নূরাইসার চোখ থেকে নির্গত হওয়া অশ্রু দেখেই ইলহানের টনক নড়ল। হঠাৎ করে যেন চারপাশ পরিষ্কার হয়ে গেল। এতক্ষণে সে বুঝতে পারলো, সে কী বলে ফেলেছে। রাগে নিজের গালেই একের পর এক চড় বসাতে লাগল। সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে দুই হাতে নিজের চুল খামচে ধরল। বুক ফেটে বেরিয়ে এলো চাপা চিৎকার। বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা তখন আর শক্ত ইলহান নয়, সে শুধু একজন অপরাধবোধে জর্জরিত ভাই, যে নিজের মানুষদের সবচেয়ে বেশি আঘাত করে ফেলেছে। ঠান্ডা বাতাস এবার তার গায়ে লাগছে না। লাগছে বুকের ভেতরে, পোড়া ক্ষতের মতো।
.
মধ্যরাত। নিস্তব্ধতার ভারে ডুবে আছে এমরিনের এই বিশাল প্রাসাদসম বাড়ি। আফরিন বসে আছে বাড়ির সবচেয়ে বড় ঘরটিতে, একেবারে একা। ঘরজুড়ে নরম আলো, বিলাসী আসবাব, অথচ তার ভেতরে অদ্ভুত এক শূন্যতা। বাড়িতে মেইডের অভাব নেই, প্রতিটি মুহূর্তে তার দেখভালের জন্য লোকজন প্রস্তুত।সৌভাগ্যক্রমে, এমরিন ইচ্ছাকৃতভাবেই শুধু নারী স্টাফ রেখেছে, এই বিষয়টিই হয়তো আফরিনের অস্বস্তি খানিকটা কমিয়েছে। এমরিন তাকে বাড়িতে রেখে কোথায় যেন চলে গেছে। এখনো ফেরেনি। সারাদিন আফরিন পুরো বাড়ি ঘুরে দেখেছে, প্রতিটি করিডোর, প্রতিটি দরজা, প্রতিটি ঘর। কোথাও কোনো সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়েনি। মেইডরা সময়মতো খাবার দিয়ে গেছে। নিরুপায় শরীর নিয়ে সেগুলোই খেয়ে, নিয়মমতো ওষুধ খেয়েছে সে। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও যখন এমরিনের কোনো সাড়া পাওয়া গেল না, তখন ক্লান্ত দেহ নিয়ে আফরিন ঘুমানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ঠিক সেই মুহূর্তেই, দরজা খোলার শব্দ।হঠাৎ শব্দে আফরিন চমকে ওঠে। দৃষ্টি সোজা গিয়ে আটকে যায় দরজার দিকে। দেখে, এমরিন ভেতরে প্রবেশ করছে। আফরিন ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে।চোখে সন্দেহ, মুখে কঠোরতা। এমরিন ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসে। আফরিনের বুকের ভেতর অজানা এক শঙ্কায় কেঁপে ওঠে, তবু সে নিজেকে শক্ত রাখে।একফোঁটা দুর্বলতাও প্রকাশ পেতে দেয় না। এমরিন মৃদু হেসে বলে—
-"ভয় পেও না, কারিনো। তোমাকে স্পর্শ করব না। এসো, আমার সঙ্গে, একটা জায়গায় নিয়ে যাব।"
আফরিন ঝাঁঝালো কণ্ঠে প্রতিবাদ করে—
-"এত রাতে কোথায় নিয়ে যাবেন? কোথাও যাব না আমি।"
এমরিনের কণ্ঠে এবার আশ্বাস—
-"ভয় পেও না। বাইরে যাব না। শুধু আমার সঙ্গে এসো।"
কিছুক্ষণ আফরিন তাকিয়ে থাকে তার চোখের দিকে।সেই দৃষ্টিতে প্রশ্ন, দ্বিধা, আর অবিশ্বাসের স্তূপ। শেষ পর্যন্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে এমরিনের পিছু নেয়। দুজন নেমে আসে নিচতলায়। সেখানে একটি লাইব্রেরি, নীরব, গম্ভীর, বইয়ের গন্ধে ভরা। চারপাশ জুড়ে সারি সারি তাক, অগণিত বই। যেন জ্ঞান আর গোপন রহস্যের মিশ্র এক জগৎ। হঠাৎ এমরিন একটি নির্দিষ্ট তাকের দিকে এগিয়ে যায়। একটিমাত্র বই টেনে ধরতেই— চোখের পলকেই খুলে যায় একটি গোপন দরজা। আফরিন বিস্ময়ে স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকে।বিশ্বাস করতে পারে না নিজের চোখকে। এমরিন মুচকি হেসে বলে—
-"এসো।"
তার সেই হাসির আড়ালে কী লুকিয়ে আছে, আফরিন জানে না। শুধু অনুভব করে, এই দরজার ওপাশে অপেক্ষা করছে এমন কিছু, যা তার জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে। নীরব লাইব্রেরির ভেতর হঠাৎ করেই যেন রহস্যের শ্বাস আরও গভীর হয়ে ওঠে।আফরিন নীরবে তার পিছু পিছু সেই দরজার ওপারে চলে এলো।
আঁকাবাঁকা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। ভেতরে ম্লান লাল আলো জ্বলছে, অদ্ভুত, অস্বস্তিকর। অন্ধকারের গহিনে ভেসে আসছে কয়েকজনের অস্পষ্ট কথার শব্দ, কারও গুঞ্জন, কারও দমবন্ধ করা গুঙানোর শব্দ। শব্দগুলো যেন দেয়ালে লেগে ফিরে ফিরে আসছে। আফরিন কান খাড়া করে সব বোঝার চেষ্টা করল। কিন্তু কিছুই স্পষ্ট নয়, সবই ছায়া, সবই ভাঙা ভাঙা। সিঁড়ি শেষ হতেই তার চোখ বিস্ফৃত হয়ে গেল। ভয়ে হাত-পা কাঁপতে শুরু করল। নিশ্বাস আটকে আসছে। চোখ দুটো বড় বড় হয়ে স্থির হয়ে রইল সামনে। এমরিন যাদের ধরে রেখেছে, তাদের দুজনকে সে সঙ্গে সঙ্গে চিনে ফেলল। চিনে ফেলতেই মনে পড়ে গেল সেই রাত।ভয়াবহতা। অসহায়তা। অন্ধকারে জমে থাকা আতঙ্ক।সব ফ্ল্যাশব্যাক হয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠল।আফরিনের গলা শুকিয়ে এলো। শব্দ বেরোয় না, শ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। ঠিক তখন এমরিন ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়াল। কণ্ঠ নরম, প্রায় আশ্বাসের মতো—
-"এসো। আমি আছি। ভয় পেও না। কেউ তোমার দিকে তাকানোর সাহসও করবে না। ট্রাস্ট মি।"
অশ্রুসিক্ত চোখে আফরিন তাকাল এমরিনের দিকে।তার চোখে সে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা দেখল, ভরসা আর দখলের মিশ্র অনুভূতি। ধীরে ধীরে সে সামনে এগিয়ে এলো। এমরিন একটি চেয়ারে তাকে বসিয়ে দিল। তার কণ্ঠে ছিল না অনুশোচনা, ছিল উল্লাস। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলতে শুরু করল—
-"ওরা তোমাকে ছুঁয়েছিল, কারিনো। বাজে চোখে তোমায় দেখেছিল। দেখো, আমি ওদের সেই হাতগুলো আর আগের মতো থাকতে দিইনি। প্রতিটা হাতের আঙুল আমি ভেঙে দিয়েছি!"
বলতে বলতে সে বাচ্চাদের মতো উচ্ছ্বাসে তাদের কাছে এগিয়ে গেল, ছেলে দুটোর হাত উঁচিয়ে দেখলো। তার ঠোটে লেগে আছে তৃপ্তির হাসি, নিজের কৃতকর্ম দেখিয়ে গর্ব করছে সে। আফরিন আতঙ্কিত চোখে তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতর ঢেউ খেলছে অজানা শঙ্কা। তারপর এমরিন এমন কিছু বলল, যা আফরিনের শরীর শিউরে তুলল—
-"এই চোখ দিয়েই তো তোমায় দেখেছিল, তাই না?"
সে থেমে এক মুহূর্ত তাকাল।
-"দাঁড়াও।"
এমরিন তার ছেলেদের হাত থেকে একটি ছু রি নিয়ে ছেলে দুটোর চোখ বের করে ফেললো। র ক্ত ছিটকে এসে এমরিনের আকাশি রঙের শার্ট মাখিয়ে দিল। আফরিন সে দৃশ্য আর দেখতে পারল না। এক মুহূর্তে বাতাস কেঁপে উঠল চিৎকারে। কি বীভৎস সেই চিৎকার। সেই শব্দে ঘরটা যেন সংকুচিত হয়ে এলো। আফরিন চোখ শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। কান ঢেকে ধরল নিজেকে। তবু সেই আর্তনাদ, সেই যন্ত্রণার শব্দ, সব তার ভেতরে গেঁথে যেতে লাগল। একসময় শব্দ থামল। আফরিন তখনো চোখ বন্ধ করে আছে। শরীর পাথরের মতো শক্ত। হঠাৎ এমরিন তার খুব কাছে এসে দাঁড়াল। কণ্ঠে শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস—
-"চোখ খোল, বেবি।" একটু থেমে বলল—
-"দেখো... ওরা অন্যায়ের শাস্তি পাচ্ছে। লুক অ্যাট দেম, জান।"
তার কণ্ঠে আনন্দ, অথচ সেই আনন্দের নিচে লুকিয়ে আছে ভয়ংকর এক অন্ধকার। আফরিন বুঝে গেল, এই জায়গাটা শুধু গোপন নয়, এই মানুষটাও। আর এই রাত, তার জীবনে চিরকাল দগদগে হয়ে থেকে যাবে।আফরিন ধীরে চোখ খুলে তাকাল। এমরিনের হাতের তালুর মধ্যে দুই জোড়া চোখ। আর এমরিন অধর প্রসারিত করে হাসছে। ছোট বাচ্চারা মার্বেল হাতে নিয়ে যেইভাবে হাসে ঠিক সেইভাবে। সেই মুহূর্তে আফরিনের এমরিনকে একজন সাই কো প্যাথ মনে হলো। পরমুহুর্তেই সে ভাবলো, শাস্তি, সে দিক আর অন্য কেউ তাতে কি আসে যায়? আইনের হাতে এদের কোনোদিনই শাস্তি হতো না, সে কথা সে ভালো করেই জানে। তাহলে সে চোখ বন্ধ করবে কেন? যে ভয়, যে আতঙ্ক, যে ট্রমা তার জীবনটাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে, তার তুলনায় এই শাস্তি কিছুই না। সম্পূর্ণ শাস্তি সে নিজের চোখেই দেখবে, এক বিন্দুও নিজেকে আড়াল করবে না।
এমরিন এগিয়ে গেল। তার আচরণে তখন আর মানুষি কিছু অবশিষ্ট নেই, শুধু হিংস্র প্রতিশোধের উন্মত্ততা। এমরিন ছেলে দুটোর প্যান্ট খুলে ফেললো। এরপর গোপ নাঙ্গ উন্মুক্ত করল। এর পর একের পর এক লাত্থি মারল সেথায়। সে নির্দয়ভাবে ছেলেগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। মুহূর্তেই ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল আর্তনাদের শব্দ। চিৎকারে দেয়াল কেঁপে উঠল, বাতাস ভারী হয়ে গেল অসহ্য যন্ত্রণায়। আফরিন দু’হাতে কান চেপে ধরল। সহ্য হয় না, তবু সে পালায় না। এমরিন রাশিয়ান ভাষায় কী যেন বলছে, কথাগুলো বোঝা যায় না, কিন্তু কণ্ঠের ভেতর জমে থাকা নিষ্ঠুরতা স্পষ্ট।একের পর এক আঘাতে ছেলেগুলো নিস্তেজ হয়ে পড়ে। তাদের শরীর ঠান্ডা হয়ে আসে, চিৎকার ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে নিস্তব্ধতার দিকে ঝুঁকে যায়। অনেকক্ষণ পর এমরিন থামে। ততক্ষণে ওরা শুধু দেহ নয়, ভাঙা আর্তনাদের স্তূপ।
তাদের যন্ত্রণা যেন আরও দীর্ঘ হয়, তার জন্য ক্ষতবিক্ষত জায়গায় সে লবণ মরিচের গুরি ঢেলে দিয়ে সরে আসে। দূরে সরে যাওয়ার সময়ও ছেলেগুলোর ছিন্ন আর্তচিৎকার তার মুখে এনে দেয় বিকৃত এক হাসি। সেই হাসি নিয়েই সে আফরিনের হাত ধরে আঁকাবাঁকা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে আসে।
ড্রয়িংরুমে পৌঁছে এমরিন সোফায় গা এলিয়ে দেয়, একেবারে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, যেন কিছুই ঘটেনি।আফরিন কপাল কুঁচকে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। এই মানুষটা... হ্যাঁ, এমরিন একজন সাই কো প্যাথ। অন্তত এই মুহূর্তে আফরিনের কাছে সে তাই। ধীর পায়ে সে এগিয়ে এসে এমরিনের সামনে দাঁড়ায়। কণ্ঠ শান্ত, অথচ প্রশ্নটা ধারালো—
-"মে রে ফেললেন না কেন?"
এমরিন চোখ তুলে তাকায়। ঠোঁটে হালকা এক বাঁকা হাসি—
-"কারণ ওদের মা র বে তুমি তাই।"
একটু থেমে বলে—
-"আগে একটু সুস্থ হও। আপাতত এই যন্ত্রণা ভোগ করুক। দেখো, আমি খুব ধার্মিক মানুষ না, কিন্তু তোমার প্রতিশোধ তুমি নিজে নেবে। ধর্ম তোমাকেই এই অধিকার দিয়েছে। আমি শুধু সেটাই মানলাম।"
হালকা কৌতুকের সুরে যোগ করে—
-"একটা পুণ্য কাজ তো করলাম, তাই না?"
আফরিন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে এমরিনের দিকে। তার সঙ্গে যা হয়েছে, তার জন্য কি সত্যিই এই মানুষটা দায়ী? নাকি সে নিজেও কোনো অজানা যুদ্ধের ভেতর আটকে আছে? এমরিন যেন তার ভাবনা বুঝে ফেলে। সে উঠে এসে আফরিনের সামনে দাঁড়ায়। কণ্ঠ এবার গম্ভীর, চোখে কঠিন প্রতিজ্ঞা—
-"আমি তোমাকে ভালোবাসি। তোমার ভাই আমার শত্রু, তুমি না।"
একটু দম নিয়ে বলে—
-"আমি সত্যিই জানতাম না তোমার সঙ্গে এসব হয়েছে। বিশ্বাস করো।"
তারপর ধীর, ভয়ংকর শান্ত কণ্ঠে যোগ করে—
-"আমি কথা দিচ্ছি... যারা তোমার সঙ্গে এটা করেছে, সবাইকে ধরে এনে তোমার সামনে এক এক করে শেষ করব।"
ঘরজুড়ে নেমে আসে এক নিঃশব্দ ভার। এই ভালোবাসা আশ্রয় নয়, এ এক অন্ধকার প্রতিজ্ঞা। আর আফরিন তখন বুঝতে পারে, সে শুধু এক ভয়ংকর অতীতের মুখোমুখি নয়, সে দাঁড়িয়ে আছে আরও ভয়ংকর এক ভবিষ্যতের দ্বারপ্রান্তে।