-"এই ব্যাটা এখনো হুঁশ আইলো না ক্যান?"
-"পানি ছিটাইম নাকি?"
-"এই শালা, চোখ খোল! রাতবিরাতে বদমাইশি কইরা বাইরাইছ। কইলাম না, চোখ খোল!"
এত মানুষের কথার শব্দ শুনে বিহান পিটপিট করে চোখ খুলল। মাথার ভেতর যেন ঢোল বাজছে। সামনে তাকাতেই বুঝতে পারল, সবকিছু ঝাপসা।আলো–ছায়ার ভাঙাচোরা রেখা ছাড়া কিছুই স্পষ্ট নয়। গলার নিচ থেকে পুরো শরীরটা অদ্ভুতভাবে অবশ। নড়াতে চাইলেও পারছে না। এই হিমশীতল রাতের মধ্যে মুখটা একেবারে বরফ হয়ে গেছে। ঠান্ডা বাতাস গালে লাগছে, নিশ্বাসের সঙ্গে কুয়াশা বেরোচ্ছে। চোখ মেলে তাকাতেই সামনে একটি বাঁশের সঙ্গে বাঁধা এক মানুষের অবয়ব ভেসে উঠল। চেহারাটা পরিষ্কার নয়। শুধু বোঝা যাচ্ছে, মানুষটা দাঁড়িয়ে নেই, দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে।
চারপাশে অসংখ্য মানুষের উপস্থিতি। কারও হাতে জ্বলন্ত মশাল, আগুনের লেলিহান শিখা অন্ধকার কেটে কেটে উঠছে। আবার অনেকের হাতে কী আছে বোঝা যাচ্ছে না, ধারালো কিছু, ভারী কিছু। আলো কম, চোখ ঝাপসা, সব মিলিয়ে বিহানের মাথার ভেতর ভয়টা ধীরে ধীরে আকার নিচ্ছে। হঠাৎই আকস্মিকভাবে কেউ তার মুখের ওপর এক বালতি বরফ–ঠান্ডা পানি ছুঁড়ে মারল। বিহান চমকে উঠল। এক মুহূর্তে ভিজে গেল।ঠান্ডা পানির ঝাপটা বুকের ভেতর ঢুকে শ্বাস আটকে দিল। শীতের চোটে ঠোঁট কাঁপতে শুরু করল অনিয়ন্ত্রিতভাবে। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। বুকটা উঠছে–নামছে, কিন্তু বাতাস ঠিকমতো ঢুকছে না। চোখ বড় করে চারপাশে তাকাতেই এবার দৃশ্যটা একটু একটু করে পরিষ্কার হলো। এরা বান্দরবনের জঙ্গলে বসবাসকারী আদিবাসীরা। অন্ধকার জঙ্গলের বুকে আগুনের আলোয় তাদের মুখগুলো আধো ছায়ায় ঢাকা। চোখে অদ্ভুত কঠোরতা। হাতে মশাল, বাঁশের লাঠি, চা পা তি, আরও অনেক কিছু, যেগুলোর নাম বিহান জানে না, কিন্তু ওগুলোর উদ্দেশ্য বুঝতে তার অসুবিধা হয় না।
নিজের অবস্থান বুঝতে বিহান নিচে তাকাল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই তার সমস্ত অস্তিত্ব কেঁপে উঠল। সে মাটির নিচে পোঁতা। শুধু মাথাটুকু মাটির ওপরে বেরিয়ে আছে। গলা পর্যন্ত শক্ত মাটির চাপে বন্দি। নড়ার কোনো উপায় নেই। আবার সামনে তাকাল। এবার আর ঝাপসা নয়। বাঁশের সঙ্গে বাঁধা মানুষটার মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। নুহা। রক্তে ভেজা নুহা। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় রক্ত জমে আছে। মুখটা ফ্যাকাশে, চোখ আধখোলা। বাঁশের সঙ্গে দড়িতে বেঁধে রাখা হয়েছে তাকে, একেবারে জবাইয়ের অপেক্ষায় থাকা পশুর মতো। নুহার রক্তাক্ত অবস্থায় বিহানের বুকের ভেতর জ্বালা ধরিয়ে দিলো। সে এক পশুর মতো হুংকার দিয়ে বলে উঠলো—
-"ওকে কুরবানির পশুর মতন ভেদে রেখেছো কেনো? ছাড়ো ওকে!"
তখনই আদিবাসীরা তেড়ে এসে গর্জন করে উঠলো—
-"চুপ থাক! চিৎকার করিস না। আমাগো পাহাড়ে ঢুইকা গলা ফাটাস কেন?"
-"চকু লাল করস আমাদেরে? এই জঙ্গল তোর আপা-বাপের নাকি?"
-"আকাম করার সময় মাথা আছিল না?"
-"দেখতে শহুরে ভদ্র পোলা লাগেস। ওইটুকু মাইয়া লইয়া গভীর রাইতে জঙ্গলে শুইয়া আছিলি ক্যান?"
-"মাইয়া লইয়া শুইয়া থাকিস, ধরা পইড়া আবার নাটক দেখাস!"
আরেকজন আগুনের মশালটা বিহানের মুখের সামনে থামিয়ে বলল—
-"কান খুইলা শুন। আমরা অন্ধ না। সব দেহি। মাইয়া লইয়া জঙ্গলে আইছস, আবার সাধু সাজস? এইসব আকাম শহরে করবি, আমাগো পাহাড়ে না!"
পেছন দিয়া আরেকজন চা-পা-তি (দা) মাটিতে ঠুক ঠুক করে বলল—
-"এইখানে আইন আছে। আইন ভাঙলে দণ্ড আছে।রাইতে পুরুষ আর মাইয়া একসাথে ধরা পড়লে কী অয়, জানস?"
তারপর এক বৃদ্ধির ভারী, ঠান্ডা কণ্ঠ ভেসে এলো—
-"মিছা কইস না, পোলা। নিজে আকাম কইরা এখন দুর্ঘটনার কিস্সা বানাইতাস?"
বিহান হতভম্ব হয়ে গেল। সে তো কোথাও নুহাকে নিয়ে শুয়ে ছিল না। তাদের তো এক্সিডেন্ট হয়েছিল। গাড়ি থেকে ছিটকে পড়ার সময় সে নুহাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিল। তারপর, অন্ধকার। এরপর আর কিছুই মনে নেই। সে লক্ষ করল, তার শরীরে বড় কোনো আঘাত নেই। মানে সে পাথরের ওপর পড়েনি।
এই লোকগুলো অন্য কিছু ভেবে নিয়েছে। কিন্তু নুহা রক্তাক্ত কেন? সে সামনে তাকিয়ে কাঁপা গলায় ডাকল—
-"নীলপদ্ম? কে মেরেছে তোমায়?"
নুহা ধীরে ধীরে তাকাল বিহানের দিকে। রক্তাক্ত চোখ, ফ্যাকাশে মুখ। এই দৃশ্য দেখে বিহানের ভেতরটা ধক করে উঠল। নুহা মৃদু কণ্ঠে, প্রায় ফিসফিস করে বলল—
-"ওরা আমায় খুব মেরেছে বিহান ভাই। তোমার জ্ঞান ফিরছিল না। ওরা আমায় জিজ্ঞাসা করলে আমাদের সম্পর্ক কি আমি বলে দেই। তারপর ওরা মহিলা দিয়ে আমায় মাটিতে ফেলে অনেক মেরেছে, অনেক বাজে বাজে গালি দিয়েছে!"
নুহার চোখ দিয়ে কী পড়ছে, পানি না রক্ত, বোঝা যায় না। চোখের পানির সাথে র ক্ত মিশে গাল বেয়ে পড়ছে।শব্দ করে কাঁদার মতো শক্তিও নেই তার। বিহান রক্তচক্ষু নিয়ে চারপাশে তাকাল। আর তখনই সবাই একযোগে গর্জে উঠল—
-"এই চোক উপুলাই দিম একেবারে!"
-"বন্ধুর বাইই লইয়া খারাপ কাম করস?"
-"নিজেরা আকাম করস, আর আমাগো পবিত্র জঙ্গল নষ্ট করস তোরা!"
-"শহর থিকা আইসা পোলা-পান সব নষ্ট!"
-"তোদের হোটেল নাই? লজ নাই?"
-"জঙ্গল ভিতর আইছস ক্যান?"
-"এইখানে আমাগো আইন চলে, শহরের না!"
-"আজ ছাইড়া দিলে কাল আবার আইসা নষ্ট কাম করবি!"
মশালের আগুন আরও উঁচু হয়ে জ্বলে উঠল। চা পা তির ধাতব ঝনঝন শব্দ অন্ধকারে কেঁপে উঠল। আর বিহান বুঝে গেল, এই জঙ্গল আজ তাদের কথা শুনবে না। তবুও বিহান নিজের ভেতরের তাণ্ডবটা চেপে রেখে শান্ত থাকার চেষ্টা করল। গলা শক্ত করে বলল—
-"দেখুন, আপনারা ভুল ভাবছেন। আমি একজন সেনাবাহিনীর লোক। ও আমার বন্ধুর বোন। আমাদের রাস্তায় কেউ আক্রমণ করে, আর তারপর আমাদের জিপ উল্টে পড়ে যায়। আমি ওকে রক্ষা করার জন্য বুকে নিয়েছিলাম। তারপর আমাদের কারোই জ্ঞান ছিল না।"
কথা শেষ হতেই ভিড়ের ভেতর থেকে ব্যঙ্গাত্মক হাসি উঠল। একজন কটাক্ষ ছুড়ে দিল—
-"এহ! এইরাম নাটক সাজাইয়া আইসলে আমরা বিশ্বাস করম নি?"
নুহা তখন প্রায় নিথর। তার শরীরটা বাঁশের সঙ্গে ঠেসে রাখা, মাথা কাত হয়ে আছে। রক্ত আর কাদায় মিশে গেছে চুল। এই দৃশ্য দেখে বিহানের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতে বসেছে। সে অধৈর্য হয়ে বলে উঠল—
-"নুহার অবস্থা ভালো না। ওকে এখনই হাসপাতালে নিতে হবে। আমাদের কথা আপনারা বিশ্বাস করবেন না, ঠিক আছে। তাহলে শাস্তি দেবেন দেন। কিন্তু এইটুকু একটা মেয়েকে পশুর মতো মারতে আপনাদের বিবেকে আটকায়নি?”
একজন আগুনের মশাল নাড়িয়ে ঠান্ডা গলায় বলল—
-"না, আটকায় নি। তোরা নষ্টামি করবার আগে এইরাম কথা ভাবিস না?"
বিহান দাতে দাঁত চেপে রইল। চোখ নামিয়ে নিল, না হলে হয়তো নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলত। ঠিক তখনই দলের ভেতর থেকে একজন এগিয়ে এলো। বয়সে একটু বড়, কণ্ঠে কর্তৃত্ব—
-"আহ, থাম তোরা।”
ভিড়টা একটু নড়ে উঠল। লোকটা বিহানের দিকে তাকিয়ে বলল—
-"অন্যায় করছস, শাস্তি তো দিমুই। কিন্তু তাই বইলা মাইরা ফালাইম না। হুন পোলা, এহন তোদের বিয়া দিমু। শান্তি মতো বিয়া করবা। নইলে অই যেইভাবে আছস, অইভাবেই থাকবি। আল্লাহ বাঁচাইলে বাঁচবি, নইলে ইনান ইল্লাহ। এহন ক, কি করবি?"
এই কথাগুলো যেন বজ্রপাতের মতো বিহানের মাথায় আছড়ে পড়ল। সে বিস্ফোরিত নয়নে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল—
-"অসম্ভব! এটা কখনোই সম্ভব না!"
এক মুহূর্তের নীরবতা। তারপরই একজন তেড়ে এসে গর্জে উঠল—
-"কেন সম্ভব অয় না? নষ্টামি কইরা জারজ পোলা পয়দা করস, পরে ওগো নর্দমায় ফালাই দিস, তাও বিয়া করবি না নাকি?"
বিহান তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো—
-"মেরেছেন না ওকে? তাহলে আবার কিসের শাস্তি? আদালতেও দুই পক্ষের কথা শুনে বিচার করে। আপনরা তো তাও করেন নি। তাহলে এখন আবার বিয়ে কেনো? সিনেমা পেয়েছেন?"
মুরুব্বী গর্জে উঠে বলল—
-"তোরা বিয়া করবি না দেইখাই তো জঙ্গলে ঘুরতাছস, শরীরের খুদা মিটাইবার লাইগা। এই জন্যই তোদের লাইগা সব চাইতে বড় শাস্তি অইলো বিয়া। মারলেও কিছু অইতো না, মাইরা ফালাইলেও কিছু যাইতো না।কিন্তু বিয়া করতে চাস না বইলাই, বিয়াটাই তোদের শাস্তি!"
আগুনের শিখা আরও উঁচু হয়ে উঠল। ছায়াগুলো নড়াচড়া করতে লাগল গাছের গায়ে। মশালের আলোয় নুহার র ক্তা ক্ত মুখটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। বিহান বুঝে গেল, এই জঙ্গলে যুক্তি শহরের মতো চলে না।
এখানে নিয়ম আছে। আর সেই নিয়মের আগুনে আজ তার ভবিষ্যৎ পু ড় ছে।
নুহা আধো আধো চোখে বিহানের দিকে তাকাল। তার মনে বিহানের অন্তরের দ্বন্দ্বের আভাস স্পষ্ট হয়ে উঠল। অস্পষ্ট কণ্ঠে সে ডাকল—
-"বিহান ভাই...!"
বিহান ও বাকিরা মিলে এক যোগে তাকালো নুহার দিকে। নুহা মৃদু কাপা কন্ঠে বলল—
-"চলো, বিয়ে করে ফেলি। আমার মৃত্যুর শেষ মুহূর্তেও যদি তোমার হৃদয়ে এক মুহূর্তের জন্যও আমার প্রতি কোনো অনুভূতি জাগে, তবে সেই অনুভূতিই আমার সারাজীবনের সমস্ত অপূর্ণতাকে পূর্ণতা দেবে।
আমি… আমি আর সহ্য করতে পারছি না। আমাকে বাঁচাও!"
নুহার কণ্ঠে আর চিৎকার নেই, আছে ভাঙা আর্তি।শব্দগুলো যেন তার শরীর ছেড়ে বেরোচ্ছে, কণ্ঠ নয়, প্রাণ। বিহান অসহায় চোখে তাকাল নুহার দিকে। সেই চোখে ভয়, ক্ষোভ, আর এক গভীর অপরাধবোধ, সব একসাথে। আহত কণ্ঠে সে বলে উঠল—
-"ভালোবাসা বিহীন তুমি আমার সাথে থাকতে পারবে, নীলপদ্ম?"
নুহা কষ্টে চোখ মেলে তাকাল। ঠোঁট কাঁপছে, গলা শুকিয়ে এসেছে—
-"তুমি... তুমি থাকলেই হবে। আমি... জোর... করবো না তোমায়। শুধু এই অসহ্য... যন্ত্রণা থেকে... আমায় মুক্তি দাও...। আমার শরীর... জ্বলে... যাচ্ছে, বিহান... ভাই!"
বিহান আতঙ্কিত হয়ে চারপাশে তাকাল। নুহার ঠিক পেছনেই আগুন ধরানো। জ্বলন্ত কাঠের লেলিহান শিখা থেকে বেরোনো তাপ সরাসরি এসে লাগছে নুহার শরীরে। আগুনের তাপে বাতাস ভারী হয়ে আছে। চুল পোড়ার গন্ধ, রক্ত আর ধোঁয়ার মিশ্র গন্ধে বিহানের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। সে হঠাৎ চিৎকার করে উঠল—
-"যা শাস্তি দেওয়ার, আমাকে দাও! ওকে কেন দিচ্ছ তোমরা? এত অমানবিক কেন? ওর শরীরের প্রতিটা রক্তের দাম তোমাদের দিতে হবে! আমি শেহজাদ তালুকদার বিহান, প্রতিটা রক্তের হিসাব নিবো!"
ভিড়ের ভেতর থেকে ঠান্ডা হাসি ভেসে এলো—
-"হিসাব পরে নিস। আগে নিজের জীবন তো বাঁচা!”
একজন সামনে এসে কঠিন গলায় প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল—
-"এহন কও, বিয়া করবি?"
বিহান চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য। দাঁত শক্ত করে চেপে ধরল। নিজের রাগ, অহংকার, পরিচয়, সবকিছু গিলে নিয়ে যতটা সম্ভব শান্ত থাকার চেষ্টা করে বলল—
-"পড়াও বিয়ে।"
এই দুই শব্দের সাথে যেন তার ভেতরের একটা অংশ চূর্ণ হয়ে গেল। এরপর আদিবাসীদের বিয়ে পড়ায় তাকে ডেকে আনা হলো। আগুনের আলোয়, জঙ্গলের নিস্তব্ধতার মাঝে, অচেনা ভাষার দোয়া আর নিয়মে, বিহান ও নুহার বিয়ে পড়ানো হলো। কোনো বাদ্য নেই, কোনো আনন্দ নেই, শুধু বেঁচে থাকার শর্ত।
বিয়ে পড়ানোর পর আদিবাসীদের একজন নুহাকে নিয়ে গেল। তার ক্ষত পরিষ্কার করল। কোনো আধুনিক ওষুধ নয়, জঙ্গলের জড়িবুটি, গাছের রস, অচেনা গন্ধ।নুহার শরীরে তখন আর শক্তি ছিল না। বিয়ে শেষ হতেই সে নিথর হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েছে।
বিহান আর নুহাকে একটি ছোট ঘরে রেখে বাকিরা একে একে চলে গেল। জঙ্গলের রাত আবার নীরব হলো। বিহানের ফোনটা আদিবাসীদের কাছেই ছিল। সে সেটা চেয়ে নিয়েছিল। হাত কাঁপছিল, তবুও ক্যান্টনমেন্টে কল করল। পরিচয় দিল। সংক্ষিপ্ত নির্দেশ, একটি জিপ পাঠাতে হবে। নুহাকে হাসপাতালে নিতে হবে। এইসব জড়িবুটিতে কাজ হবে না। কল কেটে সে ধীরে নুহার মাথার কাছে মেঝেতে বসে পড়ল। নুহার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল চুপচাপ। রক্ত মুছে দেওয়া হয়েছে, তবুও ফর্সা মুখটা লাল হয়ে আছে। নিঃশ্বাস খুব হালকা। বুক উঠছে–নামছে অনিয়মিতভাবে।
জঙ্গলের অন্ধকার ঘরের ভেতর বসে বিহান বুঝে গেল, আজ সে শুধু একজন স্বামী নয়, একজন দায়িত্বে বাঁধা বন্দি। আর এই রাত তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে চিরতরে।
.
আফরিন পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাল। চোখ খুলতেই তীব্র চক্করে মাথা ঘুরে উঠলো। কথা বলতে গিয়ে বুঝল, তার মুখ শক্ত করে বাঁধা। আতঙ্কে হাত-পা নাড়াতে গিয়েই শরীর শিউরে উঠল, হাত-পা দুটোই বাধা। চারপাশে চোখ বুলিয়ে সে বোঝার চেষ্টা করল, সে কোথায় আছে। একটি অন্ধকার ঘর। আলো বলতে কিছু নেই, শুধু ঘন ছায়া। নরম একটি বিছানার ওপর তাকে ফেলে রাখা হয়েছে। ঘরটিতে কোনো জানালা নেই। বাতাস ঢোকার কোনো পথও না। পুরো ঘরে রয়েছে মাত্র একটি খাট আর একটি চেয়ার, নির্জনতা আর তার ভয়কে আরও স্পষ্ট করে তুলতে যেন এই সামান্য আসবাবই যথেষ্ট।
ঘরের এক পাশে ছোট একটি বাথরুম। অন্য পাশে একটি দরজা, এই দরজাই যেন বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে একমাত্র সংযোগ। কিংবা... বন্দিত্বের একমাত্র প্রহরী।আফরিন ছটফট করতে লাগল। নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা। শরীর মোচড়াতে মোচড়াতে বুঝল, তার হাত-পা পশু বাঁধার লোহার শিকলে বাঁধা। শক্ত। নিষ্ঠুর। নড়ার কোনো সুযোগ নেই।
হঠাৎ, দরজা খোলার শব্দ। এক মুহূর্তে ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে গেল। আফরিন মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। প্রথমেই প্রবেশ করল একজন বিশালদেহী পুরুষ। মুখে কালো মুখোশ, শরীরের প্রতিটি ভঙ্গিতে অদ্ভুত এক হিংস্র আত্মবিশ্বাস। তার পিছু পিছু আরও তিনজন পুরুষ ঢুকল। তাদের মুখে কোনো মাস্ক নেই, নির্লজ্জ, নির্ভীক দৃষ্টি। মুখোশধারী লোকটি খাটের সামনে রাখা চেয়ারটিতে এসে বসলো। বাকি তিনজন নিঃশব্দে তার পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, ঠিক যেন পাহারাদার।
আফরিন ওঠার চেষ্টা করল। আবারও ব্যর্থ। তখন সেই লোকটি গম্ভীর, ঠান্ডা কণ্ঠে পেছনের ছেলেদের উদ্দেশে বলল—
-"এবার সফল হয়েছিস। গতবার তো একজনকে কেউ ধরতে পারল না। এবার তোরা সফল। এবারও তোরা ব্যর্থ হলে আমি নিজেই তোদের লা শ ফেলে দিতাম।"
কথাগুলো শুনেই আফরিনের বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। সে বুঝে গেল, এরাই তাকে তুলে এনেছে। আর, এরাই নুহাকেও তুলে নিতে চেয়েছিল। ভাবনার মাঝেই লোকটি এবার সরাসরি তার দিকে তাকাল। চোখে ছিল অদ্ভুত এক আগ্রহ, যেন শিকারকে মেপে দেখছে। সে ঠান্ডা হাসি মিশিয়ে বলে উঠল—
-"খুব তেজ তোর, তাই না? প্রথমে ভেবেছিলাম তোকে তুলে এনে তোর ইলহান ভাইকে ব্ল্যাকমেইল করবো।কিন্তু তোর তেজ দেখে আমি ফিদা। আজ দেখব তোর শরীরে কত তেজ আছে। আজ পরিবর্তন করলাম নিজের পূর্বপরিকল্পনা। শুধু তোর শরীরের তেজ দেখার জন্য।"
ঘরের অন্ধকার যেন মুহূর্তে আরও ঘন হয়ে উঠল।আলো নেই, বা থাকলেও তা ভয়ে কুঁকড়ে পড়েছে।আফরিনের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে, বুকের ভেতর বাতাস আটকে থাকার মতো অনুভূতি। হাত-পায়ে বাঁধা লোহার শিকলের ঠান্ডা স্পর্শ তাকে বাস্তবের চেয়েও নির্মমভাবে মনে করিয়ে দেয়, সে বন্দি।
চারপাশে ছড়িয়ে থাকা অচেনা পুরুষদের চোখ, সেগুলো চোখ নয়, যেন অন্ধকারের ভেতর জ্বলে থাকা নির্লিপ্ত আগুন। আর সেই লোকটির কণ্ঠ, নির্দেশে ভরা, অনুভূতিহীন। এই ঘরে, এই মুহূর্তে, আফরিন একা।আর অন্ধকার, ধীরে ধীরে তার চারপাশ ঘিরে ধরে, যেন আলোকে গিলে খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে।
আফরিন ঘাবড়ে যায়। বাঁধা হাত-পা নিয়েই সে পেছনের দিকে সরে যেতে থাকে। মনে হয়, যদি পারে, খাটের সঙ্গে মিশে যাবে, দেয়ালের ভেতর ঢুকে পড়বে, অদৃশ্য হয়ে যাবে। আতঙ্কে তার শরীর কাঁপছে, চোখ ছুটছে মুক্তির কোনো চিহ্ন খুঁজে। কিন্তু ততক্ষণে পুরুষটি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। তার উপস্থিতি ঘরের বাতাসকেই ভারী করে তোলে। ধীরে, নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সে শরীরের সাদা পাঞ্জাবি খুলতে থাকে,একটি নিঃশব্দ আধিপত্যের ঘোষণা যেন। তারপর কোনো আবেগ ছাড়াই আদেশ ছুড়ে দেয়—
-"উইস্কি নিয়ে আয় তো একজন!"
কণ্ঠস্বর ঘরের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনি তোলে।আর সেই শব্দের সঙ্গে সঙ্গে আফরিনের বুকের ভেতর ভেঙে পড়ে শেষটুকু আশাও। লোকটি খাটের ওপর উঠে আসে। এক টানে আফরিনকে নিজের দিকে টেনে নেয়। সে তার মুখ দেখতে পায় না, পায় শুধু উপস্থিতির ভয়, শ্বাসরুদ্ধ করা এক অদৃশ্য ছায়া। আতঙ্কে তার চোখ থেকে অনর্গল পানি ঝরতে থাকে। মুখ বাঁধা, কণ্ঠ রুদ্ধ, গুগিয়ে ওঠা অসহায় শব্দ ছাড়া কিছুই বের হয় না।
লোহার শিকল আবার নড়ে ওঠে। একে একে তার চার হাত-পা খাটের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়, এমনভাবে, যেন পালাবার কোনো সম্ভাবনাই আর অবশিষ্ট না থাকে।ঘরের বাতাস ভারী হয়ে আসে, অন্ধকার আরও গভীর হয়। তারপর যা ঘটে, তা শব্দে ধরা যায় না, ভাষায় বাঁধা যায় না।
শুধু শোনা যায়, আফরিনের চিৎকার কাপড়ের আড়াল ভেদ করে বেরিয়ে আসে। সেই চিৎকারে ভয়, যন্ত্রণা আর ভেঙে পড়া আত্মার আর্তনাদ মিশে আছে। আর সেই মানুষটি, নির্বিকারভাবে, বিকৃত তৃপ্তিতে, সেই শব্দ উপভোগ করে। সময় দীর্ঘ হয়। অসহনীয় হয়। শেষ পর্যন্ত আফরিনের শরীর আর মন একসঙ্গে আর সহ্য করতে পারে না। সে যখন প্রায় অচেতন হয়ে পড়বে, ঠিক তখনই লোকটি সরে যায়। চেয়ারের পাশে দাঁড়ানো একজনের হাত থেকে উইস্কির বোতল নিয়ে সে ছিটিয়ে দেয় আফরিনের মুখে। তাকে পুরোপুরি অজ্ঞান হতে দেয় না। ভাঙা নিঃশ্বাসে আফরিন কাঁদতেই থাকে, নিঃশব্দে, নিরন্তর।
লোকটি চেয়ারে গা এলিয়ে দেয়। ঠোঁটে বিরক্তির ছাপ।
-'যতটা ভেবেছিলাম, ততটাও তেজি তুই নোস! ছ্যাহ... নিরাশ করলি আমায়!"
তারপর সে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেদের দিকে তাকায়—
-"আমার ভোগ করা জিনিস আমি শেয়ার করি না, কিন্তু আজকের জন্য করলাম। যা ফুর্তি কর। তবে হ্যাঁ, বাঁচিয়ে রাখবি।"
এক মুহূর্ত থামে সে। তারপর ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে।
-"ওই ইলহানকে শেষ করার জন্য ওকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। যতবার বোনকে দেখবে, ততবার এই অবস্থার জন্য নিজেকেই দায়ী করবে। ধীরে ধীরে মরবে, নিজের ভেতরেই।"
কথা শেষ হতে না হতেই ঘরের বাতাস যেন ছিঁড়ে যায়।সময় আর মানবিকতার মাঝখানে থাকা শেষ রেখাটুকুও মুছে যায়। পুরুষটির ইশারায় অন্ধকার নড়ে ওঠে। এরপর, একটি নিষ্ঠুর সমন্বয়ে নেমে আসে অমানবিকতা। আফরিনের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে, শরীর ভেঙে পড়ে, কিন্তু তাকে পতনেও ছাড় দেওয়া হয় না।যতবার সে অচেতনতার দিকে ঢলে পড়ে, ততবারই নির্মমভাবে তাকে ফিরিয়ে আনা হয়, জ্ঞান নয়, যন্ত্রণার জন্যই।
চেয়ারে বসে থাকা মানুষটি উচ্চস্বরে হেসে ওঠে। সে হাসে, প্রতিটি আর্তনাদে, প্রতিটি থেমে যাওয়া নিঃশ্বাসে, প্রতিটি ভাঙতে থাকা মুহূর্তে। ঘরের অন্ধকার তখন আর অন্ধকার থাকে না, তা হয়ে ওঠে সাক্ষী। আর আফরিন... কেবল টিকে থাকে। বেঁচে থাকার জন্য নয়, অন্য কাউকে ধ্বংস করার অস্ত্র হয়ে ওঠার জন্য।
.
ইলহান নিথর হয়ে বসে আছে। মেডিক্যাল রুমের সাদা আলোয় বেডের ওপর অচেতন অবস্থায় শুয়ে আছে নূরাইসা। নিঃশ্বাস চলছে, কিন্তু শরীর নিস্তেজ, একটি ভাঙা স্বপ্নের মতো। এই সেই মেয়ে, ভীতু, কোমল, যে জীবনে সামান্য কষ্টকেও কখনো ছুঁয়ে দেখেনি।পরিবারের চোখের মণি। সারাজীবন যাকে তুলোর ভেতর মুড়ে রাখা হয়েছে, যেন পৃথিবীর কোনো ধারালো বাস্তবতা তাকে স্পর্শ না করে। আর সেই মেয়ে, সেনাবাহিনীর কঠোর ট্রেনিংয়ে, একটানা এক মাস।
এক মাস।
একটি শরীরের জন্য নয়, একটি জীবনের জন্যই যথেষ্ট। হ্যাঁ, সে হারিয়েছে দক্ষ আরিবাকে। কিন্তু জেতার আগে সে নিজের শরীরকে অসম্ভব মাত্রায় ঠেলে দিয়েছে। সীমা পেরিয়েছে বারবার। মনের শক্তি দিয়ে শরীরকে টেনে নিয়ে গেছে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত। শেষ পর্যন্ত, শরীর জিতে গেছে। মনও জিতেছে, কিন্তু যুদ্ধ শেষে শরীর ভেঙে পড়েছে।
ইলহান নিথর চোখে তাকিয়ে আছে সেই নিষ্পাপ, মায়াবী মুখটার দিকে। তার চোখের সামনে নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে নূরাইসা, যেন বাস্তবটা সে মানতেই পারছে না। পাশেই দাঁড়িয়ে আছে উপমা আর রুহান।নূরাইসার শরীর ভীষণ দুর্বল। প্রেসার নেমে গেছে অস্বাভাবিকভাবে। তাই এই অজ্ঞান হয়েছে। তবু আশ্চর্য, নূরাইসার শরীরের চেয়েও তারা বেশি চিন্তিত ইলহানকে নিয়ে। কারণ তার চোখে যে আতঙ্ক জমে উঠেছে, তা শরীরের অসুস্থতার চেয়েও ভয়ংকর। হঠাৎই, ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে নূরাইসা ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকায়। তিনজন একসঙ্গে এগিয়ে আসে। শ্বাস আটকে আসে সবার। উৎকণ্ঠায় কণ্ঠ কেঁপে ওঠে—
-"কেমন লাগছে? এখন ঠিক আছিস?"
নূরাইসা মৃদু হেসে মাথা নাড়ে। হাসিটা দুর্বল, তবু আশ্বাসে ভরা। সে ইলহানের দিকে তাকিয়ে এক হাত বাড়িয়ে দেয়। ইলহান সেই হাত ধরে তাকে ধীরে বসতে সাহায্য করে। ম্লান কণ্ঠে নূরাইসা বলে—
-"ঠিক আছি আমি। চিন্তা করো না তোমরা।"
ইলহান চোখ সরিয়ে রুহানের দিকে তাকায়। কণ্ঠে চাপা তাড়াহুড়ো—
-"দ্রুত কিছু খাবার নিয়ে আয়!"
উপমা আর রুহান সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়ে। মেডিক্যাল রুমে তখন শুধু দু’জন। ইলহান ধীরে বেডের ওপর উঠে বসে। নূরাইসার দিকে তাকায়, চোখে অপরাধবোধ, ভয় আর অজস্র না বলা কথা। ভাঙা কণ্ঠে সে বলতে শুরু করে—
-"আমি আমার নূরেজানকে ফেরত চাই!"
ইলহানের কণ্ঠ হঠাৎ ভেঙে পড়ে। কথাগুলো দাবির মতো নয়, আর্তির মতো শোনায়। নূরাইসা ভ্রু কুচকে তাকায়। চোখে বিস্ময়, কণ্ঠে দ্বিধা—
-"আমি তো আপনার সামনেই!"
ইলহান এক ধাপ এগিয়ে আসে। তার চোখে অদ্ভুত এক ভয়, হারিয়ে ফেলার ভয়।সে ধীরে বলে—
-"তুই আমার সেই নূরেজান না! তুই এখন সাহসী নূরাইসা। একাই সব সিদ্ধান্ত নিতে পারিস। আমাকে আর তোর প্রয়োজন পড়ে না। তুই আর ভয় পাস না।"
নূরাইসার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে—
-"কি বলছেন আপনি এইসব? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না!"
ইলহান গভীর নিঃশ্বাস নেয়। যেন বুকের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো আর ধরে রাখতে পারছে না।তার কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে_
-"আমি চাই তোর আমাকে প্রয়োজন হোক। কারণে অকারণে তোর আমাকেই প্রয়োজন হোক। কিন্তু তুই যদি এইভাবে বদলে যাস, তাহলে তোর আমাকে আর দরকার পড়বে না। তখন তুই আর আমায় খুঁজবি না।
যখন তুই আঘাত পাবি, তখন কান্না করবি, আমি এসে সেই আঘাত সরিয়ে তুলব, তোর কান্না থামাবো। যখন তুই ভয় পাবি, আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরবি, আমি তোর ভয় দূর করব। কিন্তু তুই এইভাবে বদলে গেলে... আমার ভালোবাসা হারিয়ে যাবে জান! তখন আমি কাকে নিয়ে বাঁচব? আমি... আমি যে আমার নূরেজানকে হারিয়ে ফেলছি।"
নূরাইসা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে। তার চোখে জল জমে ওঠে।কণ্ঠে অসহায়তা—
-"আপনি কি বলছেন এইসব? আমি তো এখানেই আছি... আপনার আছি!""
ইলহান স্থির হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। চোখের দৃষ্টিতে একরাশ অভিযোগ, ক্ষোভের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভয়, আর গভীর ভালোবাসার চাপা আর্তনাদ।ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল, নিঃশ্বাস নিলেও শব্দ হয়, অনুভব করা যায়। সে ধীর কণ্ঠে বলে উঠল—
-"তুই পরিবর্তন হচ্ছিস, নূরেজান। আমি এক ভীতু, চঞ্চল, সরল, কোমল স্নিগ্ধ নূরাইসাকে ভালোবেসেছিলাম। তুই কি বুঝতে পারছিস না, আমার নূরেজানের সেই কোমলতা, সেই সরলতা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে? আমি তো তোকে কখনো পরিবর্তন হতে বলি নি। তাহলে তুই কেন আমায় কষ্ট দিচ্ছিস? কেন এইভাবে বদলে যাচ্ছিস?
আমার নূরেজান হারিয়ে যাচ্ছে আমার চোখের সামনে।তুই এইভাবে পরিবর্তন হয়ে গেলো তো, আমি আর তোকে ভালোবাসবো না। আমি তো তোর আসল সত্তাটাকেই ভালোবেসেছি, আসল নূরাইসাকে। তুই বদলে যাচ্ছিস অন্য কারো কথার আঘাতে, আমাকে হারানোর ভয়ে। অথচ আমি তো তোর আসল সত্তার মাঝেই বিচরণ করি।
তুই পরিবর্তন হলে, আমাকেই হারাবি। দুনিয়ার কেউ আমাকে তোর থেকে আলাদা করতে পারবে না, স্বয়ং তুই নিজেও না। তোর এই পরিবর্তন আমাকে পড়াচ্ছে। আমি এমন নূরাইসা চাই নি, যে একা একাই সব করতে পারে, যে এতটা শক্ত। আমি চাই সেই নূরাইসাকে, যার দুর্বলতাও আমার আশ্রয় খুঁজে নেয়।"
কথাগুলো বাতাসে ঝুলে রইল। ঘরটা হঠাৎ যেন আরও নীরব হয়ে গেল। নূরাইসা অদ্ভুত দৃষ্টিতে ইলহানের দিকে তাকিয়ে রইল, চোখে বিস্ময়, ভেতরে টালমাটাল প্রশ্ন। ইলহান তাকে এত নিখুঁতভাবে চেনে? এত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে? তাহলে কি সে সত্যিই বদলে যাচ্ছে? এক মুহূর্তের জন্য সময় থমকে গেল।নূরাইসা ধীরে ধীরে তার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে ভালোবাসা আছে, কিন্তু ভয়ের ছায়াও কম নয়। নরম অথচ দৃঢ় কণ্ঠে সে বলল—
-"পরিবর্তন হলেও... আমি তো আপনারই। তাহলে কেন আমাকে ভালোবাসবেন না? সবাই তো নিজের মনমতো জীবনসঙ্গী চায়। সবাই চায় তার সঙ্গী তার মনের মতো চলুক, সে যেভাবে চাইবে সেভাবেই গড়ে উঠুক। তাহলে আমি যদি আপনার মনের মতো হতে গিয়ে বদলাই, সেই পরিবর্তনটাই বা ভুল কোথায়?"
তার কথার শেষে নীরবতা নেমে এলো। দু’জনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল ভালোবাসা, একদিকে গ্রহণের দাবি, অন্যদিকে বদলে যাওয়ার যন্ত্রণা। ইলহান গভীর, স্থির চোখে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল—
-"কেউ যদি তোকে ভালোবাসে, তবে সে শুধু তোকেই ভালোবাসুক, যেমন তুই আছিস, ঠিক সেভাবেই। যদি কেউ তোকে বদলে ভালোবাসতে চায়, তবে তা ভালোবাসা নয়, তা কেবলই লেনদেন। আর ভালোবাসায় কোনোদিনই লেনদেন থাকে না।
সত্যিই ভালোবাসলে, সে ভালোবাসবে তোকে, তোর স্বভাব, স্বর, ত্রুটি, সৌন্দর্য... সবকিছুসহ, ঠিক যেমন তুই আছিস। বদলে নেওয়ার শর্তে ভালোবাসলে, সেই অনুভব ভালোবাসা নয়, সেটা কেবল হিসেব-নিকেশের লেনদেন মাত্র। কারণ খাঁটি ভালোবাসার ভেতর কোনো লেনদেনের দরজাই কখনো খোলা থাকে না।
তুই কি সেই ভালোবাসাটাই চাইছিস?"
ঘরের ভেতর তখন এক অদ্ভুত নীরবতা। যেন বাতাস পর্যন্ত থমকে গেছে। নূরাইসা কোনো উত্তর খুঁজে পেল না শব্দে, সে উত্তর দিল অনুভবে। হঠাৎ করেই ইলহানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। মাথা দুই পাশে নেড়ে স্পষ্ট ‘না’ বলে দিল, কোনো আপসের, কোনো শর্তের ভালোবাসা সে চায় না।
ইলহানের বুকে মুখ গুঁজে, আবেগে ভেজা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে উঠল—
-"আমি পরিবর্তন হবো না। আপনার নূরেজান আগের মতোই থাকবে। আপনি যেভাবে আমায় ভালোবাসেন, আমি ঠিক সেই ভালোবাসাটাই চাই। হিসেবী ভালোবাসা আমি চাই না।"
ইলহান আর কোনো কথা বলল না। কথা তখন অপ্রয়োজনীয়। সে নূরাইসাকে আগলে নিল নিজের বুকে, যেন গোটা দুনিয়া থেকে রক্ষা করছে তাকে।মাথায় আলতো করে চুমু খেলাল, একটা চুমু, যেখানে আশ্বাস আছে, নিরাপত্তা আছে, নিঃশর্ত গ্রহণের প্রতিশ্রুতি আছে।
দরজার আড়ালে খাবারের থালা হাতে দাঁড়িয়ে ছিল রুহান আর উপমা। তারা দুজনেই মুগ্ধ দৃষ্টিতে দৃশ্যটা দেখছিল। চোখের সামনে যেন কোনো গল্প নয়, জীবন্ত ভালোবাসার এক নিঃশব্দ দৃশ্যপট খুলে গেছে। এমন ভালোবাসা যে সত্যিই থাকে, তা তারা এই প্রথম অনুভব করল। রুহান আর উপমা একে অন্যের দিকে তাকাল। কোনো কথা হলো না। তবু চোখে চোখেই যেন বলে দিল—
আজ তারা ভালোবাসার আরেকটা সংজ্ঞা শিখল।ভালোবাসা মানে বদলে ফেলা নয়, গড়ে তোলা নয়, ভালোবাসা মানে যেমন আছে, ঠিক তেমন করেই গ্রহণ করা। পরিবর্তনের শর্তে যে ভালোবাসা আসে, তার ভেতরে ভালোবাসা নয়, থাকে কেবল স্বার্থ। স্বার্থ ছাড়া সেখানে আর কিছুই থাকে না... কিছুই না।