সূর্যস্নাত ভালোবাসা

পর্ব - ৪১

🟢

আকস্মিক এক অদৃশ্য টানে আফরিনের সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল। ঠিক যেন কেউ হঠাৎ করে তার বহুদিন ধরে চেপে রাখা পুরনো ক্ষতগুলোর ওপর আঙুল বুলিয়ে দিল। পুরুষ মানুষের স্পর্শ, তার ভেতরে ট্রমার ঢেউ তোলে, অপ্রতিরোধ্য, অপ্রস্তুত, দমবন্ধ করে দেওয়া এক আতঙ্ক। মুহূর্তের মধ্যেই সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। এমরিন তার অস্বাভাবিক কম্পন টের পেয়েই ভ্রু কুঁচকে তাকাল। চোখের এক ঝলকেই বুঝে গেল, আফরিন ভয় পেয়েছে। কিন্তু সেই বোঝাপড়ার সময়টুকুও আর পেল না সে। এক সেকেন্ডের ভেতরেই পরিস্থিতি বিস্ফোরণের মতো বদলে গেল।

ইলহান, রুহান, তানভীর আর বিহান, চারজন প্রায় একসাথেই ঝাঁপিয়ে পড়ে আফরিনকে এমরিনের কাছ থেকে আলাদা করে নিল। তখন সে কাঁপছে, শরীর নয়, কাঁপছে তার আত্মা। ভাঙা শ্বাস, নিঃশব্দ আর্তনাদে তার বুক ওঠানামা করছে। চারজন মিলে তাকে আগলে নিলো, যেন চার দিক থেকে তৈরি করা এক মানবপ্রাচীর। কেউ শান্ত স্বরে কথা বলছে, কেউ তার কাঁধে হাত রেখে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে। ওদিকে নুহা, উপমা আর নূরাইসার চোখে তখন আগুন জ্বলছে। ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তারা এমরিনের দিকে তাকিয়ে আছে, সে দৃষ্টি প্রশ্ন করছে না, সে দৃষ্টি অভিযুক্ত করছে।

এমরিন হতভম্ব। কিছু বোঝার আগেই যেন চারপাশ হঠাৎ করেই তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে বুঝলেও সে এক মুহূর্ত নড়ল না।নূরাইসা তৎক্ষণাৎ ঝড়ের গতিতে এগিয়ে গিয়ে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিল এমরিনের গালে। শব্দটা বাতাস চিরে প্রতিধ্বনিত হলো। চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল এক নিমিষে। গার্ডরা তৎক্ষণাৎ এগিয়ে আসতে চাইলে এমরিন হাত তুলে তাদের থামিয়ে দিল। চোখে বিস্ময়ের ছায়া, গালে জ্বালা, তবু সে স্থির, অস্বাভাবিকভাবে স্থির। নূরাইসা তখন আগুনের মতো ফুঁসছে। দাঁতে দাঁত চেপে, হুংকার ছেড়ে সে বলে উঠল—

-"কোন সাহসে ওকে স্পর্শ করেন, হ্যাঁ? কে দিয়েছে আপনাকে এত অধিকার?"

এমরিন মাথা তুলে তাকাল। কণ্ঠে দৃঢ়তা, চোখে একরাশ প্রশ্ন—

-"বউকে ছোঁয়ার অধিকার নেই বলছেন? আপনার স্বামী আপনাকে কোন অধিকারে ছোঁয়? আমিও সেই অধিকারেই ছুঁয়েছি!"

নূরাইসার কণ্ঠে তীক্ষ্ণ বিদ্রুপ—

-"থাপ্পড় কি কম পড়েছে? আরও খাবেন? ও আপনার বিয়ে করা বউ নাকি যে ওকে আপনি স্পর্শ করেন!"

-"হ্যাঁ!"

-"কি হ্যাঁ?"

-"ওকেই জিজ্ঞাসা করুন।"

ততক্ষণে আফরিন কিছুটা শান্ত হয়েছে। চারপাশের কোলাহল থেমে গিয়ে নিস্তব্ধতা নেমে এলো। সবাই একযোগে তার দিকে তাকাল। যেন এই মুহূর্তে একটি শব্দেই সব ভেঙে পড়বে, আবার গড়ে উঠবে। ইলহান ধীরে, মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—

-"কি বলছে ও?"

আফরিন ভয়ার্ত চোখে একবার সবার দিকে তাকাল।চারপাশে পরিচিত মুখ, তবু বুকের ভেতর কাঁপুনি থামছে না। সে গলা পরিষ্কার করার চেষ্টা করল। ঠোঁট কাঁপছে। তারপর কাপা কণ্ঠে বলে উঠল—

-"আমি... সেদিন আমাকে হাসপাতালে আনার পর কয়েক ঘণ্টার জন্য আমার জ্ঞান ফিরেছিল..."

আফরিনের কণ্ঠ খুব ধীরে ভেসে এলো। শব্দগুলো যেন টেনে টেনে বের হচ্ছে, প্রতিটা বাক্যের সাথে তার বুকের ভেতর জমে থাকা ভয় আর স্মৃতি ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছে।এক মুহূর্ত থামল সে। শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে।চারপাশ নিস্তব্ধ। শুধু তার কাঁপা কণ্ঠ। কণ্ঠটা ভেঙে এলো—

-"তখন উনি কাজী নিয়ে আসেন। আমাকে বিয়ে করার জন্য। আমি রাজি হইনি। কিন্তু এরপর ভাইয়াকে দেখালো। ঢাকা মেডিকেলে ভাইয়া তখন ভর্তি ছিল। আর কিছু মানুষ... তার মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে রেখেছিল। আমি যদি ওনাকে বিয়ে না করি, তাহলে উনি ভাইয়াকে মেরে ফেলবে বলেছিল। সেই মুহূর্তে কি করবো বুঝতে পারিনি। ভাইয়াকে বাঁচাতে... ওনাকে বিয়ে করতে হলো।"

বাক্যটি যেন বাতাসে ঝুলে রইল। মুহূর্তেই সবার চোখ আগুন হয়ে উঠল। চার ভাই একযোগে ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে এমরিনের দিকে তাকাল। আর এক সেকেন্ডও লাগল না, ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর। এমরিনকে রক্ষা করতে তার গার্ডরাও তেড়ে এলো। মুহূর্তের মধ্যে পুরো জায়গাটা রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। ধস্তাধস্তি, চিৎকার, উত্তেজনায় বাতাস ভারী হয়ে উঠল। উপায় না পেয়ে উপমা হাসপাতালের ভেতর থেকে সিকিউরিটি ডেকে আনল। অনেক চেষ্টায় সবাইকে আলাদা করা হলো।চার ভাই, রুহান, তানভীর, বিহান, ইলহান, রাগে ফুঁসছে। তাদের চোখে এখনও আক্রমণের আগুন নিভেনি। আর এমরিন? সে নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে। কোনো অস্থিরতা নেই, কোনো অনুশোচনা নেই।গার্ডদের সরিয়ে ধীরে এগিয়ে এসে সে ঠান্ডা কণ্ঠে বলল—

-"তো শুম্মুন্দি গণ, বউকে নিয়ে যাই?"

তানভীর গর্জে উঠল—

-"একদম আমার বোনকে স্পর্শ করবি না!"

এমরিন বিস্ময়ে তাকিয়ে বলল—

-"কি বলছেন সুম্মুন্দি সাহেব? বিয়ে করা বউকে স্পর্শ করবো না?"

নুহা আর সহ্য করতে পারল না। কণ্ঠে জমে থাকা ক্ষোভ বিস্ফোরিত হলো, চিৎকার করে উঠল—

-"না, করবেন না! আপনাদের জন্য আজ ওর এই অবস্থা। কোনো পুরুষের স্পর্শ নিতে পারে না ও। পানিক অ্যাটাক হয়! জোর করে হুমকি দিয়ে বিয়ে করেছেন, আবার বউ বলে গলাফাটাচ্ছেন, লজ্জা করে না? খুশি হয়েছেন আপনারা? আপনাদের জন্যই তো এইসব হলো। কিভাবে কোন মুখে ওকে ভালোবাসি বলেন, লজ্জা করে না?"

কথাগুলো যেন শূন্যে ঝুলে রইল। এত মানুষ, অথচ চারপাশে তখন শুধুই দমবন্ধ করা নীরবতা। এমরিনের কণ্ঠে অদ্ভুত এক নিশ্চিন্ত আত্মবিশ্বাস। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি খেলছে—

-"চিন্তা কর না শালিকা। সব প্যানিক অ্যাটাক আমি ভালো করে দেবো। আর যত অপবাদ দেওয়ার দাও।এখন হাজার বললেও তোমরা বিশ্বাস করবে না আমার কোনো কথা বলা।"

তার কথার প্রতিটা শব্দ যেন আগুনে ঘি ঢালল। রুহান হুংকার দিয়ে বলে উঠল—

-"আমার বোনের নাম নিবি না তোর ওই মুখে!"

-"রিল্যাক্স শুম্মুন্দি।"

এমরিন নির্বিকার। পরিস্থিতি টানটান। ইলহান আর বিহান নিজেদের ড়িয়ে নিল। উপমা আর নূরাইসা শক্ত করে আফরিনকে ধরে দাঁড়িয়ে আছে, যেন চোখের পলক ফেললেই তাকে কেউ ছিনিয়ে নেবে। ইলহান এগিয়ে এসে দৃঢ় কণ্ঠে বলল—

-"এটা কোনো বিয়ে না। আমরা মানি না। চল বাড়ি চল!"

এমরিন এক পা সামনে এগিয়ে এলো। চোখে চ্যালেঞ্জ।

-"আপনাদের মানা না মানাতে কিছু যায় আসে না শুম্মুন্দী সাহেব। কাগজে-কলমে ও আমার বউ।আপনারা অস্বীকার করতে পারবেন না।"

নূরাইসা এবার অস্বাভাবিক শান্ত। সেই শান্তিই ভয়ংকর।

-"বেশ। তাহলে কাগজে-কলমেই আপনাকে ডিভোর্সি লেটার পাঠিয়ে দেওয়া হবে!"

এমরিন মৃদু হেসে বলল—

-"সেটা সম্ভব না! ওকে আজ এখুনি আমার সাথে যেতে হবে। না হলে তুলে নিয়ে যাব!"

এইবার ইলহান ঘুরে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে এমরিনের চোখের দিকে তাকাল। কণ্ঠে চাপা আগ্নেয়গিরি—

-"সাহস, ক্ষমতা, কোনোটাই আছে তোর, আমার বোনকে আমার চোখের সামনে দিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য?"

এমরিন কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই, হঠাৎ আফরিন বলে উঠল—

-"আমি যাব ওনার সাথে, ভাইয়া!"

মুহূর্তেই যেন বজ্রপাত হলো। সবাই একসাথে চিৎকার করে উঠল—

-"কি বলছিস তুই?"

বিজ্ঞাপন

আফরিন ইলহানের দিকে তাকাল। চোখে ভয় নেই, আছে কঠিন সিদ্ধান্ত।

-"আমি তোমার বোন। বিশ্বাস রাখো আমার ওপর।ওদের জন্যই আমার এই অবস্থা। এত সহজে ছেড়ে দেবো?"

এক মুহূর্ত থেমে, ঠোঁট শক্ত করে বলল—

-"না, কখনোই না। সবাইকে সবার প্রাপ্য শাস্তি আমি নিজ হাতে দেবো, ভাইয়া!"

ইলহানের কণ্ঠ নরম হয়ে এলো, ভেতরে গভীর দুশ্চিন্তা—

-"কি বলছিস তুই? তুই অসুস্থ। যদি ওরা কিছু করে?"

আফরিনের চোখে এক অদ্ভুত স্থিরতা।

-"আর কিছু করবে না। আর কি বাকি আছে করার?আর তাছাড়া কথায় আছে, বন্ধুকে কাছে রাখো, শত্রুকে তার চেয়েও বেশি কাছে!"

ইলহান বুঝে গেল আফরিনের কথার গভীরে লুকিয়ে থাকা ইঙ্গিত। সেই দৃষ্টির তলদেশে জমে থাকা সংকল্প আর চাপা দিয়ে রাখা যাবে না, এটা মুহূর্তেই অনুভব করল সে। তাই আর কোনো বাধা দিল না। নীরব সম্মতিতেই শেষ পর্যন্ত আফরিনের ইচ্ছাকে সম্মান করা হলো।

আফরিন ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। প্রতিটি পদক্ষেপে যেন মাটির ওপর নয়, সিদ্ধান্তের ধারালো প্রান্তে হাঁটছে সে। এমরিনের গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে উঠে বসল। দরজার শব্দের সাথে সাথেই চারপাশের বাতাস কেমন ভারী হয়ে উঠল। গাড়ি চলতে শুরু করল, ধীরে, অথচ অনিবার্য গতিতে। চলে যাওয়ার আগে আফরিন একবার ঘুরে তাকাল তার ভাইবোনদের দিকে। প্রত্যেকের ঠোঁটের কোণে রহস্যময় একখানা হাসি। চোখে জমে আছে অদম্য কোনো পরিকল্পনার আগুন, নীরব, কিন্তু বিপজ্জনক। সেই দৃষ্টির উত্তরেই আফরিন নিজেও এক রহস্যময় হাসি ছুড়ে দিয়ে চোখ ঘুরিয়ে নিল। সামনে তাকাল, যেন ভবিষ্যতের অন্ধকার রাস্তাটাই এখন তার গন্তব্য।

আড়চোখে একবার দেখে নিল পাশে বসে থাকা পুরুষটিকে। এমরিনের ঠোঁটের কোণে তখন ফুটে উঠেছে বিজয়ের এক চিলতে হাসি, আত্মতৃপ্ত, অহংকারী, নিশ্চিত জয়ের হাসি। সব হিসেব মিলে গেছে। সবকিছু তার নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু এই হাসি কতদিন টিকে থাকবে? সুস্থ বাঘিনী যতটা ভয়ংকর, তার চেয়েও ভয়ংকর আহত বাঘিনী। আর আফরিন এখন আর কোনো অসহায় নারী নয়, সে এক আহত বাঘিনী।নীরব, ধৈর্যশীল, কিন্তু মারাত্মক। এমরিনের গড়ে তোলা সাম্রাজ্য কি আদৌ রক্ষা পাবে তার থাবার আঘাত থেকে? নাকি এই বিজয়ের হাসিটাই হবে তার সর্বনাশের প্রথম, নিঃশব্দ সংকেত?

.

পুরো গাড়ি নীরবতার চাদরে ঢাকা। আফরিন জানালার পাশে বসে একদৃষ্টিতে বাহিরের দিকে তাকিয়ে ছিল।কাঁচের ওপাশে ছুটে চলা দৃশ্যগুলো যেন তার চোখে ঢুকছিল না, সবকিছুই ঝাপসা, অনুভূতিহীন। আর সেই নিঃশব্দতার ভেতর এমরিন তাকিয়ে ছিল আফরিনের দিকেই। একবারও চোখ সরায়নি। সেদিনের ঘটনার পর ট্রমায় চলে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। এমরিন তা বুঝেছিল। আফরিন তার স্পর্শে যেভাবে কেঁপে উঠেছিল, তার পর আর দ্বিতীয়বার সাহস করেনি সে।সেই কাঁপুনি তার চোখের সামনে এখনো ভাসছে, একটা ভাঙা মানুষ, নিজের অজান্তেই আতঙ্কে জমে যাওয়া শরীর। গাড়িটি ধীরে এসে থামল একটি বিলাসবহুল বাড়ির সামনে। চারপাশ নিস্তব্ধ। এতটাই নির্জন যে মনে হয়, এই বাড়ি যেন ইচ্ছে করেই পৃথিবীর বাকি অংশ থেকে নিজেকে আলাদা করে রেখেছে।ত্রিসীমানায় আর কোনো বাড়ি নেই। বিশাল প্লটজুড়ে একচ্ছত্র অধিকার, সবটাই এমরিনের।

এমরিন গাড়ি থেকে নেমে প্রথমেই আফরিনের পাশের দরজাটা খুলে দিল। আফরিন বিরক্ত চোখে তাকাল।এমরিন মুচকি হেসে নামতে ইশারা করল। আফরিন নেমে দাঁড়াল। চোখের সামনে বিশাল এক বাড়ি, দুইতলা, রাজকীয়। সাদা আর সোনালির মেলবন্ধনে তৈরি সেই বাড়ি যেন আলোয় মোড়ানো এক রাজপ্রাসাদ। এমরিন নীরবে হাত বাড়িয়ে তাকে আগে যেতে ইশারা করল। আফরিন মুখ ঝামটা দিয়ে এগিয়ে গেল। দরজার কাছে এসে হঠাৎ থেমে গেল সে।এমরিন এগিয়ে এসে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। তারপর ঠিক আফরিনের সামনে দাঁড়িয়ে, মাথা সামান্য নিচু করে বলল—

-"ওয়েলকাম টু ইউর প্যালেস, কারিনো !"

বিরক্তির চাপা শব্দে বিড়বিড় করতে করতে আফরিন ভেতরে চলে গেল। বাড়িটি দুইতলা। নিখাদ রাজকীয়।সাদা আর সোনালি রঙে মোড়া প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি আসবাব যেন আভিজাত্যের গল্প বলে। নিচতলায় একের পর এক ঘর, রান্নাঘর, ড্রয়িংরুম, বিশাল বসার জায়গা। ঘরে ঢুকতেই চোখে পড়ে ওপরে ওঠার সিঁড়ি।আর ঠিক সিঁড়ির সামনেই একটি বিশাল দরজা, অন্য সবকিছুর চেয়ে আলাদা করে নজর কেড়ে নেয়।এমরিন সেই দরজা খুলে আফরিনকে ঘরের ভেতরে নিয়ে এলো। এটাই এই বাড়ির মাস্টার বেডরুম। পুরো রুমজুড়ে সাদা আর সোনালির রাজত্ব। মসৃণ পর্দা, ঝকঝকে আসবাব, আর রুমের মাঝখানে বিশাল গোল আকারের বেড, সবকিছুতেই আড়ম্বর, কিন্তু কোথাও কোনো উষ্ণতা নেই। আফরিন ধীরে ধীরে ঘুরে ঘুরে দেখল সব। বাড়িটি অসম্ভব সুন্দর, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। এমরিনের রুচি আছে, সেটা বুঝতে কষ্ট হলো না। কিন্তু আফরিন এখানে সৌন্দর্য দেখতে আসেনি। সে এসেছে নিজের সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের বদলা নিতে। তাই এই রাজকীয়তা, এই বিলাসিতা, কিছুই তার মন ছুঁতে পারছে না। সে ঘুরে এমরিনের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বলল—

-"যতই চেষ্টা করুন, আমাকে এইসব দিয়ে ভোলাতে পারবেন না। আমি আপনাদের কাউকে ক্ষমা করব না। প্রত্যেকের থেকে বদলা নেবো আমি। আমাকে হালকা ভাবে নেওয়ার ভুল করবেন না। আমি আপনার চরম শত্রু, আপনার জন্য বিপদ আমি!"

কথাগুলো আফরিনের কণ্ঠে শুধু হুমকি নয়, ছিল জমে থাকা আগুন। এমরিন ধীর পায়ে এগিয়ে এলো।শব্দহীন, সাবধানী। ঠিক আফরিনের মুখোমুখি দাঁড়াল।তারপর সামান্য ঝুঁকে তার খোলা চুলের কিছু অংশ হাতে নিলো। হাতে ধরা সেই চুলের মধ্যে মুখ গুজে দিয়ে গভীর নিশ্বাস নিল। আফরিন কেঁপে উঠল।শরীরের প্রতিটি স্নায়ু যেন সতর্ক সংকেত ছুড়ে দিল।এমরিন মৃদু হেসে বলল—

-"তুমি বিপদ... আর আমি সেই মানুষ, যাকে বিপদ টানে।"

আফরিন এক ঝটকায় এমরিনের হাত সরিয়ে দিল তার চুল থেকে। ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে উঠল—

-"একদম কাছে আসবেন না আমার।"

এমরিন আরও দু’পা এগিয়ে এলো। আফরিন ঠিক ততটাই দু’পা পিছিয়ে গেল। দু’জনের মাঝখানে বাতাস ভারী হয়ে উঠল। এমরিনের নীল চোখে তখন স্পষ্ট মুগ্ধতা, বিপজ্জনক, অবাধ্য। সে বলল—

-"দূরে থাকলে সহ্য হয় না, আর কাছে এলে তোমাকে ছেড়ে দিতে মন চায় না, লাভ। তোমার চোখে একবার তাকালেই... আমার পুরো দুনিয়া তোমাকেই ঘিরে ফেলতে চায়।"

আফরিন ব্যঙ্গাত্মক হাসলো। সেই হাসিতে তীব্র যন্ত্রণা আর ঘৃণার ধার। তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলে উঠলো—

-"আপনি পাপী। আপনার মুখে এইসব কথা মানায় না।ভালোবাসেন বলেছিলেন, আপনার ভালোবাসার নমুনা আমার এই ক্ষতবিক্ষত শরীর। খুশি হয়েছেন নিশ্চয়ই? আপনারা আমার ভাইয়ের ক্ষতি করতে চেয়ে আমাকেই শেষ করে দিলেন!"

মুহূর্তের মধ্যেই এমরিনের চেহারা বদলে গেল। রক্তিম হয়ে উঠল নীল চোখের সাদা অংশ। হাত দু’টো মুষ্টিবদ্ধ হলো। সে হঠাৎই দু’হাত বাড়িয়ে আফরিনের কাঁধে রাখল, শক্ত করে ধরে টেনে আনল নিজের কাছে।আফরিন ঘাবড়ে গেল। স্পর্শ নিতে পারছে না সে।ভয়ার্ত চোখে তাকালো। চোখের পাপড়ি কেঁপে উঠল।আর ঠিক সেই মুহূর্তেই, এমরিনের মুখের প্রতিক্রিয়া বদলে গেলো। চোখে নেমে এলো অদ্ভুত এক কোমলতা। নরম কণ্ঠে সে বলে উঠল—

-"তোমাকে চাইলে যদি সেটা পাপ হয়, তবে আমি খুশি মনে পাপী হবো, বারবার। কারণ তোমার নামটাই আমার প্রার্থনা, আর তোমার স্পর্শই আমার নিষিদ্ধ স্বর্গ। যদি জাহান্নামেও যেতে হয়, তবু হাতটা তোমারই ধরবো, পুড়তে পুড়তেই ভালোবাসার অপরাধ স্বীকার করবো।"

আফরিনের কণ্ঠে এবার আর শুধু রাগ নয়, ছিল ভাঙনের চিৎকার। ঝাঁঝালো কন্ঠে সে বলে উঠলো—

-"আমি আপনাকে ধ্বংস করে দেবো, এমরিন রাহাফ।আপনার এই ভালোবাসার নাটক আমাকে গলাতে পারবে না। আপনার এই দৃষ্টি আমার ঘৃণা লাগে। আমি আপনাকে ঘৃণা করি। ওই নরপশুরা যেভাবে আমাকে দেখেছে, আপনার চোখেও আমি সেই লালসা ছাড়া আর কিছু দেখি না। ঘৃণা করি আমি আপনাকে, আপনার সমস্ত সত্তাকে, আপনার ওই নীল চোখকে। আমি ঘৃনা করি সম্পূর্ণ এমরিন রাহাফকে।"

এমরিন মৃদু হাসল। সেই হাসিতে কোনো অনুশোচনা নেই, আছে এক ধরনের অদম্য আত্মবিশ্বাস। সে আফরিনের কানের কাছে মুখ নিয়ে এলো।কণ্ঠে ধীর নেশা ফিসফিস করে সে বলল—

-"তোমাকে দেখলেই আমার ভেতরের সমস্ত শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। যে মাথাটা বরাবর ঠান্ডা থাকে, সেটাই আগুনে পুড়ে এলোমেলো হয়ে যায়। রাগ, হিসেব, নিয়ন্ত্রণ, সব একে একে হারিয়ে যায় তোমার চোখের ভেতর। আমি ভেবেছিলাম তোমাকে কন্ট্রোলে রাখবো, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বুঝেছি, আমি নিজেই তোমার বন্দী।

বুঝলে? তুমি শুধু আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে নও... তুমি আমার ধ্বংসের সবচেয়ে সুন্দর কারণ।"

সে আরও ঝুঁকে পড়ল, তার চোখে তখন অদ্ভুত এক দীপ্তি, কণ্ঠ নিচু হয়ে এল—

-"তোমার কাছে আসলে আমার হারানোর কিছু নেই।শুধু তোমাকে পাওয়ার তীব্র ইচ্ছা ছাড়া। ধ্বংস করবে আমায়? আমার সবকিছু তোমার, স্বয়ং এমরিন রাহাফও। তুমি যা খুশি করতে পারো। অন্য কেউ তোমাকে যেভাবে দেখে, আমি তোমাকে তার থেকেও বেশি দেখি। আর সেটাই আমার সমস্যা... আবার সেটাই আমার সমাধান। বিশ্বাস করো, কারিনো ওই জানোয়ারদের চোখ আমি তুলে নেবো, যারা লালসা নিয়ে তোমায় দেখে। আজ আমার দৃষ্টি ঘৃণা করছ?সময় লাগবে না। এই আমাকেই তুমি নিজের চাইতেও বেশি ভালোবাসবে। তোমার ওই চোখে আমার জন্য শুধু ভালোবাসাই থাকবে।"

আফরিন শব্দ করে হেসে উঠল। সে হাসি এমন, যেন এইমাত্র কেউ তাকে কোনো নিষ্ঠুর কৌতুক শুনিয়েছে।

বহু কষ্টে হাসি থামিয়ে সে বলল—

-"স্বপ্ন দেখুন। আমি আপনার ধ্বংসকারী। আর ধ্বংসকারী কখনও ভালোবাসে না।"

এমরিনের কণ্ঠ আরও নেশালো হয়ে উঠল—

-"তোমার হাসিটা আজ থেকে আমার নেশা, যে নেশার কোনো ওষুধ নেই, কোনো মুক্তিও না। আজ থেকে ওই হাসি এমন করেই ফুটবে, কারণ আমি চাই বলেই তা আমার হয়ে থাকবে। আর ভালোবাসা? তাহলে আগেই জেনে রাখো, আমাকে ভালোবাসা নিরাপদ কোনো পথ নয়। আমি ঝড়ের মতো যাকে একবার নিজের বলে মেনে নিই, তাকে আর ছেড়ে দেওয়ার অভ্যাস আমার নেই। সাবধানে ভালোবাসবে আমাকে, কারণ আমার ভালোবাসা কোমল নয়, তা গভীর, অন্ধকার, গ্রাসকারী। ধীরে ধীরে তুমি নিজেকেই ভুলে যাবে, আর একদিন টের পাবে, তুমি আর তুমি নও, তুমি আমার নামেই লেখা এক নিঃশ্বাস। তুমি ভালবাসবে আমায়, গভীর ভাবে, ঠিক যেমন আমি ভালবাসি তোমায়।"

আফরিন চোয়াল শক্ত করল। চোখে জমে উঠল ক্ষোভ।

-"কি চান আপনি আমার থেকে? সব শেষ করেছেন আপনি, আপনার লোকেরা। আর কি বাকি আছে? কেনো বিয়ে করেছেন আমায়?"

এমরিন ধীরে ধীরে আফরিনকে ছেড়ে দিল। তারপর গভীর দৃষ্টিতে তাকাল তার চোখে। দু’জনের কেউই পলক ফেলল না। কয়েকটি মুহূর্ত কেটে গেল নিঃশব্দে, ঘরের বাতাস পর্যন্ত যেন থমকে রইল। অবশেষে এমরিন মুখ খুলল—

-"আই ডোন্ট নো হোয়াট ইউ ডিড টু মি, কারিনো।

বাট সামহাউ, আই ওয়েন্ট ফ্রম ওয়ান্টিং টু কিল ইউ

টু উইলিং টু কিল ফর ইউ, অ্যান্ড টু ডাই ফর ইউ। ইউ টার্নড মাই রেইজ ইনটু ডিভোশন, মাই ডার্কনেস ইনটু আ ভাউ আই ক্যান নেভার ব্রেক। নাও মাই সিন্স ডোন্ট ফিয়ার হেল অর হেভেন, দে নিল অনলি টু ইয়োর নেম।"

বিজ্ঞাপন
সূর্যস্নাত ভালোবাসা গল্পটি নওরিন ইথিকা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ভালোবাসাময় গল্প