সূর্যস্নাত ভালোবাসা

পর্ব - ৩৯

🟢

ভোরের দিকে এমরিন আফরিনকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নিয়ে এসেছিল। পথটা খুব একটা লম্বা ছিল না, তবু তার কাছে মনে হচ্ছিল অনন্ত দীর্ঘ, শেষ না হওয়া এক অচেনা যাত্রা। প্রতিটা সিগন্যাল, প্রতিটা বাঁক যেন সময়কে টেনে লম্বা করে দিচ্ছিল। সে নিজে লোক পাঠিয়ে দেওয়ান বাড়ির সবাইকে খবর দেয়। ভোর বেলাতেই তারা এসে জড়ো হয়েছিল হাসপাতালের করিডোরে, নীরব, ভারী, নিঃশ্বাস চেপে রাখা এক শোকমিছিলের মতো। কথা নেই, প্রশ্ন নেই, শুধু উৎকণ্ঠা।

ঢাকা মেডিকেল থেকে তানভীরকেও স্থানান্তর করে আনা হয়েছে এভারকেয়ারে। গতকালের সেই ভয়ংকর ঘটনার পর আজ যেন সবকিছু নিঃশব্দ এক শীতল বিকেল। জানালার কাঁচ ছুঁয়ে সূর্যের আলো ভেতরে ঢুকছে ঠিকই, কিন্তু সেই আলোতে কোনো উষ্ণতা নেই। আলো আছে, জীবন নেই, এভারকেয়ারের করিডোর যেন তারই প্রমাণ।

সম্পূর্ণ দেওয়ান পরিবার এক মুহূর্তে ভেঙে পড়েছে। ইকবাল দেওয়ান আর নাহিদ দেওয়ান, দু’জনই চুপচাপ এক কোণে দাঁড়িয়ে। চোখে জল নেই, তবু সেই নীরবতা কান্নার চেয়েও ভারী। যেন চোখের জল শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না। শব্দহীন ভাঙন। নাজনীন বেগম, ইলিনা বেগম আর তানিয়া বেগমের কান্না থামছে না। কখনো চাপা, কখনো হাহাকার, হাসপাতালের সাদা দেয়ালে সেই কান্না প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসছে বারবার। শীতল দেয়ালও যেন কেঁপে উঠছে। দাদা-দাদী তখনও বাড়িতে। তাদের কিছুই জানানো হয়নি। জানানো যাবে না এখনই। কিছু সত্য আছে, যা বয়সের ভার বইতে পারে না। কিছু সত্য জানালে হৃদয় ভেঙে যায়, নিঃশ্বাস থেমে যায়।

আফরিনকে রাখা হয়েছে ভিআইপি কেবিনে।ভেতরে জীবন আর মৃ ত্যুর মাঝখানে এক ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে। তার অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। শরীরের প্রতিটি অঙ্গ যেন গভীর ক্লান্তিতে ভেঙে পড়েছে। তিনজন মানুষের নৃশংসতার প্রতিটা চিহ্ন তার সর্বাঙ্গে। শরীর ক্ষতবিক্ষত, কিন্তু মন, তার চেয়েও বেশি বিধ্বস্ত। চোখ খুললেই আতঙ্ক। শব্দ পেলেই কেঁপে ওঠা। এই মুহূর্তে সে বেঁচে আছে, শুধু বেঁচে থাকার জন্য। ডাক্তাররা আশ্বাস দিয়েছে, শরীর সেরে উঠবে। আফরিন সুস্থ হবে। কিন্তু মনের ক্ষত, সেটা সময় নেবে। অনেক সময়। এমন ক্ষত, যার কোনো সেলাই নেই।

অন্যদিকে তানভীরের মাথায় গভীর আঘাত। আফরিনের পাশের কেবিনেই সে শুয়ে আছে নিঃশব্দে। মাথায় ব্যান্ডেজ, চোখ আধখোলা। কখনো সচেতন, কখনো অচেতন। সচেতন হলেই সে ভেঙে পড়ে। বিলাপ শুরু করে দেয়। নিজেকে দোষী ভাবে। ছোট বোনকে রক্ষা করতে না পারার যন্ত্রণা তাকে উন্মাদ করে তুলে। তাই ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে রাখা হয়েছিল। ঘুম ভাঙ্গার পর থেকেই সে জানালা দিয়ে বাহিরে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে জমে আছে একরাশ অপরাধবোধ, সে নিজেকেই ক্ষমা করতে পারছে না। বিকেলের আলো এসে তার মুখে পড়ছে, কিন্তু সেই আলো ছুঁতে পারে না তার ভেতরের অন্ধকার। হাসপাতালের করিডোরে তখন সময় থমকে আছে। মনিটরের টিকটিক শব্দ, দূরের স্ট্রেচারের চাকা, নার্সদের নীরব হাঁটা, সবকিছু মিলিয়ে এক অদ্ভুত স্তব্ধতা। নিঃশ্বাস নিলেও শব্দ হয় না, যেন বাতাসও কথা বলতে ভয় পাচ্ছে। এই বিকেলটা কেউ কোনোদিন ভুলবে না। এই বিকেলটা দেওয়ান পরিবারের ইতিহাসে রক্তাক্ত এক অধ্যায় হয়ে থেকে যাবে।

ভিআইপি কেবিনের নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে একটা মেয়ে লড়ছে। বেঁচে থাকার জন্য। ভাঙা শরীর নিয়ে, ক্ষতবিক্ষত মন নিয়ে, আফরিন এখন মৃ ত্যুর আর জীবনের মাঝখানে ঝুলে আছে এক অদৃশ্য সুতোয়।মনিটরের টানা টানা শব্দে হাসপাতালের বাতাস ভারী হয়ে আছে। সে বাঁচবে, ডাক্তারদের চোখের ভাষা অন্তত তাই বলে। কিন্তু আগের আফরিন আর কোনোদিন ফিরে আসবে কি না, এই প্রশ্নটাই কেবিনের দেয়াল ছুঁয়ে ছুঁয়ে করিডোরে ছড়িয়ে পড়েছে। নিঃশব্দে, অথচ নিদারুণভাবে। সবাইকে কুরে কুরে খাচ্ছে।

ইলহান, রুহান, নূরাইসা আর উপমা, চারজনই প্রায় দৌড়ে এসে পৌঁছাল আফরিনের কেবিনের সামনে। খবর পেয়ে এক মুহূর্ত দেরি করে নি কেউ। সিনিয়রদের বিস্তারিত বুঝিয়ে আর্মি হেলিকপ্টারে করে এভারকারের ছাদে এসে নেমেছে তারা। আর নেমেই এক ছুটে সবাই আফরিনের রুমের সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে। করিডোরে তখনও চাপা কান্না জমে আছে। কোথাও ফিসফাস, কোথাও দীর্ঘশ্বাস।অপেক্ষার ভারে বাতাস পর্যন্ত যেন থমকে আছে। বিহান নেই। সে নুহাকেও ভিআইপি কেবিনে ভর্তি করিয়েছে। তাই আসতে তার একটু দেরি হচ্ছে।

নুহার অবস্থা আগের চেয়ে ভালো। বিপদের সীমা সে পার করেছে। কিন্তু শরীর ভীষণ দুর্বল। চোখ খুললেই ক্লান্তি ভর করে আসে, যেন জেগে থাকাটাই তার জন্য এক ধরনের যুদ্ধ। আরও কিছু পরীক্ষা, আরও বিশ্রাম দরকার। বিহান কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না, একটুও না। তাই হেলিকপ্টার থেকে নেমেই সে আগে নুহার জন্য কেবিনের ব্যবস্থা করেছে।

কেবিনের সামনে দাড়াতেই ইলহানের চোখ পড়ে এমরিনের ওপর। এক মুহূর্ত। ঠিক এক মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে তার ভেতরের সমস্ত সংযম। কোনো কথা নেই।কোনো সতর্কতা নেই। সে ঝাঁপিয়ে পড়ে এমরিনের ওপর। পরপর কয়েকটা ঘুষি। হাসপাতালের করিডোরে সেই শব্দ অস্বাভাবিকভাবে প্রতিধ্বনিত হয়, যেন এই নিঃশব্দ জায়গাটার বুক চিরে ফাটিয়ে দেয়। এমরিন আচমকা আক্রমণে নিজেকে সামলাতে পারে না।ঠোঁটের কোণা ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ে। হোঁচট খেয়ে এক পা পিছিয়ে যায় সে। ঠিক তখনই বিহান এদিকে আসছিল। দৃশ্যটা চোখে পড়তেই সে ছুটে আসে। সঙ্গে সঙ্গে রুহানও। দু’জনে মিলে ইলহানকে টেনে এমরিনের থেকে আলাদা করে। চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো হতবিহ্বল। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব ঘটে গেছে। কেন, কীভাবে, কোন প্রশ্নেরই উত্তর নেই তখন।

এমরিন ইতিমধ্যেই নিজেকে সামলে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুখে যন্ত্রণা স্পষ্ট, কিন্তু চোখে নেই কোনো ভয়। ঠোঁটের কোণায় জমে থাকা রক্ত ডানহাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে মুছে সে মুচকি হেসে ওঠে। হাসিটা অদ্ভুত, ব্যথার, বিদ্রুপের, আর অদম্য আত্মসম্মানের মিশ্রণ। সে চোখ তুলে ইলহানের দিকে তাকিয়ে বলল—

-"বউয়ের চুমু খেয়ে ঠোঁট কাটার বয়সে... শুম্মুন্দির ঘুষি খেয়ে ঠোঁট কাটছে! ছ্যাহ! কী দিন এলো আমার!"

তার কণ্ঠে ব্যঙ্গ ছিল, তীক্ষ্ণ, বিদ্রুপে মোড়া। কিন্তু সেই ব্যঙ্গের গভীরে চাপা পড়ে ছিল এক অদৃশ্য ক্ষয়, ধীরে ধীরে ভেঙে পড়া এক মানুষ। আর সেই ক্ষয়ই যেন আগুনে ঘি ঢেলে দিল। ইলহান গর্জে ওঠে। তার গলা বজ্রের মতো ফেটে পড়ে। হাসপাতালের করিডোর কেঁপে ওঠে সেই গর্জনে, আলো, দেয়াল, মানুষ, সবকিছু মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। তার চোখে আগুন।কণ্ঠে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, শুধু ক্ষতবিক্ষত ভালোবাসা থেকে জন্ম নেওয়া এক রক্তাক্ত প্রতিজ্ঞা—

-"জানোয়ার! আমার সঙ্গে লড়ার শক্তি নেই তোদের?কেনো বারবার আমার পরিবারকে টেনে আনিস? আমি তোদের কলিজা ধরে টান দিলে দু’মিনিটও তো টিকতে পারবি না তোরা! এটাই তো তোদের প্ল্যান ছিল, তাই না?"

একটু থামে সে, নিঃশ্বাস টানে, কিন্তু সেই নিঃশ্বাসেও আগুন। তার বুক ধড়ফড় করছে। প্রতিটি শব্দ যেন বুক চিরে বেরিয়ে আসছে। কণ্ঠ ভেঙে আসে, আবার শক্ত হয়ে ওঠে—

-"আমার বাড়ির তিনটা সম্মানে আঘাত করার প্ল্যান! একজনকে পারলি না বলে বাকি দু’জনকে এমন নির্মমভাবে ব্যবহার করলি? আমার বাচ্চা... আমার আফরিনের কী অবস্থা করেছিস তোরা!"

ইলহানের চোখে তখন কোনো মানুষ নেই, শুধু এক ধ্বংসস্তূপ। ইলহানের মুঠো কেঁপে ওঠে। নখ গেঁথে যায় তালুতে। ব্যথা টের পায় না সে। কণ্ঠে শপথ, ভয়ংকর, অটল, অমানবিক এক শপথ। নিচু কন্ঠে সে বলল—

-"কুত্তার বাচ্চারা! আমি তোদের প্রতিটা শুয়োরের শরীরের র ক্ত দিয়ে গোসল করব। আমার আফরিনের প্রতিটা কষ্টের হিসাব তোদের দিতে হবে, প্যান্থার!আমার বোনের ইজ্জতের মূল্য আমি তোদের জীবন দিয়ে চুকাবো! আমার ফুলের মতো বোনের জীবন নষ্ট করার জন্য তোদের জীবন আমি, নুহান ইলহান দেওয়ান, জাহান্নাম বানিয়ে ছাড়বো! এতদিন আইন মেনে চলেছি! এবার দেখবি আসল ইলহানকে।নিজেদের প্রস্তুত করে নে, আমার তাণ্ডব থেকে বাঁচার জন্য!

হাসপাতালের বাতাস ভারী হয়ে আসে। মনিটরের শব্দ যেন আরও জোরে কানে বাজে। কেউ নড়ছে না। কেউ শ্বাস নিতেও ভুলে গেছে। এক মুহূর্তের জন্য চারপাশ নিস্তব্ধ। করিডোরে যেন সময় থেমে গেছে। সবাই অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো ইলহানের দিকে। এমন ইলহান, এত হিংস্র, এত অপ্রতিরোধ্য, তারা কোনোদিন দেখেনি। আর সেই একটি শব্দ,।প্যান্থার। রুহান আর বিহান ধীরে ধীরে একে অপরের দিকে তাকায়। কোনো কথা নেই, কিন্তু চোখে চোখে ভেসে ওঠে তদন্তের ফাইল, গোপন নথি, রিপোর্ট। প্যান্থার, রাশিয়ার সবচেয়ে বড় মাফিয়া চক্র। যার হেডের নামেই দলের নাম। তারা হেডকেই প্যান্থার বলে সম্বোধন করে।

আরও ভয়ংকর তথ্য, এর হেড একজন নারী। তাকেই ডাকা হয় প্যান্থার নামে। তাহলে... ইলহান এমরিনকে প্যান্থার বলে ডাকছে কেন?এই প্রশ্নটা করিডোরের বাতাসে ভেসে থাকে, অদৃশ্য, কিন্তু ভীষণ ভারী।

অন্যদিকে এমরিন নিঃশব্দে হেসে চলেছে। কোনো উত্তেজনা নেই। কোনো ব্যাখ্যা নেই। শুধু ঠোঁটের কোণে চাপা, ঠান্ডা এক হাসি, যেন অনেক আগেই সে এই মুহূর্তের জন্য প্রস্তুত ছিল। তারা সত্যিই ইলহানকে হালকা ভেবে নিয়েছিল। ভীষণ ভুল হয়ে গেছে। সে রাশিয়া পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। এমরিনের আসল পরিচয় জেনে ফেলেছে। নূরাইসাকেও সে নিজের কাছেই রেখেছিল, সবকিছু মেপে, হিসেব করে। তাহলে নূরাইসার আর্মিতে যাওয়াটাও কি হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত ছিল? না। ওটাও ছিল ইলহানের বহু আগেই সাজানো প্ল্যানের অংশ। নিখুঁতভাবে সাজানো এক চাল। কিন্তু বোকা আর্সলান সেটা বুঝতেই পারেনি। কেন নূরাইসা আর্মিতে গেল, এই প্রশ্নটা তার মাথায় কখনোই ঠিকভাবে ঢোকেনি। বরং ইলহান খুব যত্ন করে তার সামনে একটা মিথ্যে গল্প সাজিয়ে দিয়েছিল। জেলাসীর গল্প। অভিমান, দূরত্ব আর ভুল বোঝাবুঝির গল্প। আর আর্সলান? সে সেটাই বিশ্বাস করেছিল। চোখ বন্ধ করে।এতটাই অন্ধ ছিল যে বুঝতেই পারেনি, এই নারী কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, আর এই নারী আসলে কার।সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার? এই নারীর প্রেমে পড়েছে সে। ভাবা যায়? একজন বিবাহিত নারীর প্রেমে মজেছে আর্সলান দেহরান। এই খেলায় আর্সলান ছিল সবচেয়ে দুর্বল চাল। আর নূরাইসা সেই, যাকে সামনে রেখে আসল তাণ্ডবের রাস্তা তৈরি করা হয়েছিল। কি খেলা খেলছে ইলহান? এই রহস্যের উত্তর এখনো বাকি। এই খেলায় শেষ পর্যন্ত কে হবে শিকার, আর কে শিকারি?তাহলে কি আর্সলানের আসল পরিচয়ও জেনে গেছে সে? ভাবনাগুলো একপাশে ঠেলে এমরিন তীক্ষ্ণ চোখে তাকায় ইলহানের বাদামি চোখের দিকে। সেই চোখে এখন জ্বলছে এক অগ্নিকূপ, নিয়ন্ত্রণহীন, সর্বগ্রাসী।এমরিন কোনো প্রশ্নের উত্তর দেয় না। কোনো আত্মপক্ষ সমর্থনও নয়। আফরিনকে কেন্দ্র করে ইলহান যে অভিযোগ তুলেছে, তার বিপরীতে সে অদ্ভুতভাবে স্থির ও ঠান্ডা কন্ঠে বলল—

-"যাকে পবিত্রভাবে পাওয়ার বাসনা আমার... তাকে অপবিত্র করার ইচ্ছে কখনোই আমার মনে জাগেনি।"

এক মুহূর্তের জন্য তার চোখে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা ঝিলিক দেয়।একটু থেমে, শব্দগুলো যেন বরফ হয়ে নামে—

-"সে এখনো আমার কাছে পবিত্র। তার এই অবস্থার জন্য আমি কোনোভাবেই দায়ী নই। আর যারা এর জন্য দায়ী... তাদের কাউকেই আমি, এমরিন রাহাফ প্যান্থার, কোনোদিন ছাড়বো না। কোনোদিনও না!"

করিডোরের নিঃশ্বাস আটকে আসে। কেবিনের দরজার ওপাশে তখনও আফরিন শুয়ে আছে, অচেতন, নিঃশব্দ, ভাঙা। আর দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে দুই শিকারি। একজন আগুন। আরেকজন বরফ। এই লড়াই এখন আর ব্যক্তিগত নয়। এটা র ক্তের। ক্ষমতার। প্রতিশোধের যুদ্ধ।

এমরিন নিঃশব্দে বেরিয়ে গেলে, ইকবাল দেওয়ান আর নাহিদ দেওয়ান ইলহানকে আলাদা করে সব খুলে বলেন, কীভাবে এমরিন নিজের জীবন বাজি রেখে আফরিনকে বাঁচিয়েছে। সত্যিটা শুনে ইলহানের চোখে রাগের জায়গায় এক মুহূর্তের জন্য নেমে আসে নীরবতা। ভারী, গভীর নীরবতা। এরপর সবাই নুহা আর আফরিনকে দেখতে চলে যায়। এরই মধ্যে নুহা আর বিহানের সম্পর্কের কথাও জানানো হয়েছে। কিন্তু বাড়ির কেউ কোনো প্রশ্ন করেনি। জীবন বাঁচাতে বিয়ে করেছে, এখানে আর কি প্রশ্নই বা করা যায়?

.

তানভীরের রুমে আলোটা মৃদু। জানালার পর্দা গলে আসা বিকেলের আলো বিছানার ওপর ছায়া ফেলে রেখেছে। রুহান, বিহান ও ইলহান, তিনজন তার পাশেই বসে আছে। তানভীর বিছানায় শুয়ে। মাথায় সাদা ব্যান্ডেজ। চোখে গভীর এক অপরাধবোধ, যেন সেই ব্যান্ডেজ শুধু মাথায় নয়, তার ভেতরের প্রতিটি ভাবনাকে জড়িয়ে রেখেছে। বোনের এই অবস্থার জন্য সে নিজেকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। নিজের চোখে নিজেই অপরাধী। ইলহান ধীরে কাছে গিয়ে তার মাথায় হাত রাখে। স্পর্শটা শক্ত নয়, আবার দুর্বলও না, ভরসার মতো। তার কণ্ঠে চাপা দৃঢ়তা—

-"নিজেকে এভাবে ভাঙিস না, ভাই! তোর জায়গায় অন্য কেউ থাকলেও আলাদা কিছু করতে পারত না।"

বিজ্ঞাপন

তানভীরের ঠোঁট কাঁপে। গলাটাও, কথাগুলো ভাঙা ভাঙা—

-"আমি বড় ভাই, আমি থাকতে ওর এমন হলো, এই কথাটা আমি কীভাবে ভুলবো ভাইয়া?"

রুহান ধীরে কথা বলে। কণ্ঠে যুক্তি, কিন্তু তার ভেতরেও ব্যথা লুকোনো—

-"আমরা কেউ জানতাম না এটা হবে। বডিগার্ড ছিল। কিন্তু তোর ওপর আক্রমণটা অপ্রত্যাশিত ছিল। তুই চাইলেও তখন কিছু করার অবস্থায় ছিলি না।"

বিহান একটু ঝুঁকে আসে। চোখে স্থির বিশ্বাস।

-"আফরিন বেঁচে আছে, তানভীর। এইটাই সবচেয়ে বড় সত্য। আর তুই একা না, আমরা সবাই আছি।আমাদের এখন একটাই লক্ষ্য, ওকে আবার স্বাভাবিক, সুন্দর জীবনে ফিরিয়ে আনা।"

তানভীর চোখ বন্ধ করে। একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে, যেন বুকের ভেতর জমে থাকা অপরাধবোধটুকু সেই নিঃশ্বাসে বের করে দিতে চায়। চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে। ইলহান তানভীরের হাত নিজের হাতে নেয়। আঙুলগুলো শক্ত করে ধরে। তার কণ্ঠ নিচু, কিন্তু অটল—

-"এখন তোর কাজ শক্ত থাকা, কারণ ও ঠিক এই শক্তিটাই তোকে দেখে শিখেবে। আমি আছি। সব ঠিক করে দিব। বিশ্বাস করিস তো আমাকে?"

তানভীর ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকে ইলহানের দিকে। আর কিছু বলে না। হঠাৎই সে ইলহানের কোমর জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে, একজন বড় ভাইয়ের নয়, এক ভেঙে পড়া মানুষের কান্না। রুহানও আর ধরে রাখতে পারে না। সে নিঃশব্দে বিহানকে জড়িয়ে ধরে। দু’জনের চোখ ভিজে ওঠে। ইলহানের চোখেও জল জমে আসে। এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ার আগেই সে সেটাকে মুছে ফেলে। পুরুষ মানুষ কান্না করলে সেটা দুর্বলতা নয়। কান্না কখনোই পুরুষের শক্তি কমায় না। বরং যে পুরুষ কাঁদতে পারে, তার ভেতরের শক্তি এই দুনিয়ার অনেক শক্তির চেয়েও বড়। কিন্তু এখন কান্নার সময় নয়। সে জানে, আজ যদি সে ভেঙে পড়ে, দেওয়ান বাড়ির প্রতিটা সদস্য ভেঙে পড়বে। সবাইকে শক্ত রাখার দায়িত্বটা যে তারই কাঁধে। রুমে নীরবতা নামে। কিন্তু এবার এই নীরবতা ভাঙনের নয়। এটা ধীরে ধীরে জোড়া লাগার নীরবতা।আহত হৃদয়গুলো যেমন চুপচাপ সেলাই হয়ে ওঠে, ঠিক তেমন।

.

সূর্য অস্ত গিয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। ফেব্রুয়ারি মাসে তেমন ঠান্ডা পড়ে না। তারওপর শহরে শীত সেইভাবে বোঝা যায় না। হাসপাতালের আলোটা দিনের মতো তীব্র নয়, নরম, ক্লান্ত, যেন সারাদিনের সব আর্তনাদ নিজের ভেতর শুষে নিয়ে এখন নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে।ইকবাল দেওয়ান, নাহিদ দেওয়ান আর বাকি সবাই বাড়ি ফিরে গেছে। তারা ভোর বেলা থেকেই হাসপাতালে। এখন বাড়ি না গেলে দাদা–দাদীর কানে খবর পৌঁছে যাবে। কিছু সত্য এখনো বলা যাবে না।কিছু সত্য এখনো জানা তাদের জন্য ভারী। হাসপাতালে থেকে গেছে কেবল ইলহান, রুহান, বিহান, তানভীর, নুহা, নূরাইসা আর উপমা। সবাই এখন আফরিনের ঘরে। কেবিনের ভেতর বাতাস ভারী।মনিটরের একঘেয়ে শব্দের সঙ্গে মিশে আছে চাপা কান্না, কেউ শব্দ করছে না, তবু কান্না আছে সর্বত্র।

আফরিন বিছানায় আধশোয়া। শরীর নিঃশেষ, চোখ ভেজা, দৃষ্টি ক্লান্ত। যেন প্রতিটা নিঃশ্বাস নিতে তার আলাদা করে শক্তি খরচ হচ্ছে। ইলহান এক পাশে দাঁড়িয়ে। নূরাইসা অন্য পাশে। আফরিন হঠাৎ উঠে নূরাইসাকে জড়িয়ে ধরে। শব্দ নেই, শুধু কাঁধ কাঁপে।নূরাইসাও আর ধরে রাখতে পারে না, সে-ও কেঁদে ফেলে। দু’জনের কান্না এক হয়ে যায়, নিঃশব্দ অথচ গভীর। ইলহান ধীরে আফরিনের মাথায় হাত রাখে। কণ্ঠ নিচু, কিন্তু প্রতিজ্ঞায় কঠিন—

-"তোর সাথে হওয়া প্রতিটা অন্যায়ের প্রতিশোধ আমি নেবো। তোর ভাইয়েরা এখন জীবিত। কেউ এক চুলও ছাড় পাবে না। তোর সামনে দাঁড় করিয়ে আমি সবাইকে তাদের নির্মম শাস্তি দেবো। কথা দিলাম তোকে।”

আফরিন ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকে। নূরাইসা কাঁপা হাতে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। নিজের চোখ বেয়ে জল পড়ছে।তার গলা কাঁপে—

-"ভয় পাস না... এখন আর কেউ কিছু করতে পারবে না। আমরা আছি। আর তোকে একা রেখে কোথাও যাব না, দেখিস।"

নুহা আর উপমা আফরিনের যন্ত্রণা বোঝে। কিন্তু যার সাথে হয়েছে, তার মতো করে তো বোঝা যায় না। নুহা হুইলচেয়ারে বসে নীরবে কাঁদছে। মুখ ঢেকে রেখেছে, যেন নিজের দুর্বলতাটুকু লুকোতে চায়। উপমা রুহানের হাত শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। কাঁদতে চায় না, কিন্তু ঠোঁট কাঁপছে, চোখে জল জমে আছে। দু’জনেই কাঁদছে, একজন নিঃশব্দে, আরেকজন মুখ ঢেকে।বিহান ধীরে নুহার কাঁধে হাত রাখে।

-"শান্ত হও, নুহা। আমাদের আফরিনের জন্য শক্ত থাকতে হবে।"

নুহা শুধু মাথা নাড়ে। চোখে অসহায়তা জমে থাকে।রুহান এগিয়ে এসে উপমার সামনে দাঁড়ায়। গলা নরম—

-"ও বাঁচবে। আমরা সবাই ওকে আবার হাসতে শেখাবো। বাঁচতে শেখাবো। এইটুকু বিশ্বাস রাখো... প্লিজ।"

উপমা চোখ মুছে তাকায়। কোনো কথা বের হয় না। শুধু মাথা নাড়েন। দেওয়ান বাড়ির করো সাথে তার ঘনিষ্ঠতা নেই। তবুও সে একজন নারী। তাই এই পরিস্থিতিতে সে নিজেকে সামলাতে পারছে না।

তানভীর এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ বারবার চলে যায় নূরাইসার বুকে মাথা রাখা আফরিনের দিকে।বোনের এই দশা সে মানতে পারছে না। পারার কথাও নয়। এই পরিস্থিতিতে কী বলা উচিত, কীভাবে সান্ত্বনা দেওয়া যায়, কিছুই যেন জানা নেই তার। ধীরে নূরাইসার পাশে এসে দাঁড়ায়। বোনের হাত ধরে বলে—

-"আমাকে মাফ করে দে, বোন। তোকে রক্ষা করতে পারলাম না। তোর ভাই হওয়ার যোগ্যতা আমার নেই।"

আফরিন চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে—

-"এভাবে বলো না, ভাইয়া। ওরা তোমাকেও আক্রমণ করেছিল। তোমার কোনো দোষ নেই।"

আফরিন তখনও কাঁদছে। কান্নার ফাঁকে ফাঁকে শুধু একটা কথা—

-"ওদের ছাড়বে না, ভাইয়া... আমি প্রত্যেকের বিচার দেখতে চাই।”

ইলহান চোখ বন্ধ করে। সে হাট বাড়িয়ে আফরিনের হাতটা শক্ত করে ধরে। রুহান, তানভীর, বিহান,।তিনজনই একসঙ্গে এগিয়ে আসে।

-"কথা দিলাম! তোর প্রতিটা অশ্রুর হিসাব নেবো আমরা।"

কেবিনের ভেতর সবাই কাঁদছে। কিন্তু এই কান্না একা নয়। এই কান্না ভাঙনের নয়, ধীরে ধীরে জোড়া লাগার কান্না। সন্ধ্যার হাসপাতাল যেন সেই মুহূর্তে একটাই কথা জানান দিচ্ছে, আফরিন একা নয়। পুরো দেওয়ান পরিবার তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।

বিজ্ঞাপন
সূর্যস্নাত ভালোবাসা গল্পটি নওরিন ইথিকা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ভালোবাসাময় গল্প