রাত তখন প্রায় একটা। পাহাড়ঘেরা নিস্তব্ধতার বুক চিরে আলো জ্বালিয়ে ধীরে এসে থামে নূরাইসাদের গাড়ি। চারপাশে ঘন অন্ধকার, পাহাড়ের ছায়া যেন আকাশ ছুঁয়ে আছে। দূরে-নিঃশব্দে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, তার ফাঁকে ফাঁকে ঠাণ্ডা পাহাড়ি বাতাসের দীর্ঘশ্বাস। তারা একটি ফ্যামিলি ভিলা ভাড়া করেছে, একটু দূরে, একটু নিরিবিলি। দীর্ঘ পথের ক্লান্তি সবার শরীরে জমে আছে, তাই কেউ কথা বলছে না। গাড়ির দরজা খুলতেই ঠাণ্ডা বাতাস শরীর ছুঁয়ে যায়, একধরনের প্রশান্তি, আবার অজানা ভারও। যেন এই শান্তির ভেতরেও কিছু একটা জমে আছে, যা এখনো প্রকাশ পায়নি।
এক এক করে সবাই নেমে ব্যাগপত্র গুছিয়ে নেয়। বাড়ির মালিককে আগেই সব জানানো ছিল। নির্ধারিত পথ ধরে ধীরে ধীরে এগোতে থাকে তারা। ক্লান্ত শরীরে যখন বাড়ির ভেতরে পা রাখে, ঠিক তখনই—
"পপ!"
পার্টি পোপারের বিকট শব্দে পুরো ঘর যেন কেঁপে ওঠে।
-"সারপ্রাইজ!"
রুহান আর উপমা একসাথে চেঁচিয়ে ওঠে। নূরাইসা, আফরিন আর নুহা, তিনজনেই চমকে উঠে। মুহূর্তের জন্য শ্বাস যেন থমকে যায়। আর ইলহান, বিহান ও এমরিন,।তিনজনই বিরক্তির সঙ্গে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।যেমন পাগল রুহান, তেমনই জুটেছে তার কপালে, একেবারে ঠিক তারই মতো একজন। দু’জন মিলে যেন জ্বালানোর পূর্ণ কোর্স শেষ করেছে।
রুহানকে দেখামাত্রই নূরাইসা, আফরিন আর নুহা ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ওপর। কতদিন পর ভাইকে দেখা!এতদিনের ক্লান্তি, চাপ, না বলা অভিমান, সবকিছু এক নিমেষে গলে যায় সেই আলিঙ্গনের ভেতর। মুহূর্তটুকু ভেঙে পড়ার মতো, আবার বাঁচার মতোও। বাকি সবাই ব্যাগপত্র এক পাশে রেখে গিয়ে সোফায় বসে পড়ে।শরীর যেন আর নিজের ওজন বহন করতে রাজি নয়।উপমা আর রুহানও সবার সঙ্গে গিয়ে বসে। ঠিক তখনই রুহানের চোখ পড়ে নূরাইসার দিকে। তার মুখ রক্তিম। চোখের কোণে জমে থাকা ভেজাভাব লুকোনোর ব্যর্থ চেষ্টা স্পষ্ট। চোখমুখ ফুলে আছে, এই ফুলে থাকা ক্লান্তির নয়, কান্নার। দৃশ্যটা রুহানের বুকে অস্বস্তির একটা কাঁটা বিঁধিয়ে দেয়। চিন্তিত গলায় সে বলে—
-"কি হয়েছে? কেঁদেছিস কেনো?"
নূরাইসা কোনো উত্তর দেয় না। চুপচাপ কাচুমাচু হয়ে বসে থাকে। চোখ নামানো, ঠোঁট শক্ত করে চেপে রাখা, যেন মুখ খুললেই ভেঙে পড়বে। রুহান একবার জিজ্ঞেস করে। উত্তর না পেয়ে আবার। তারপর আরও একবার। শেষমেশ আফরিন আর নুহা আর সহ্য করতে পারে না। নুহা নরম গলায় বলে—
-"মনে হয় ভাইয়ার সাথে কিছু হয়েছে।"
আফরিন সায় দেয়—
-"এতবার জিজ্ঞেস করার কী আছে?"
এই কথায় রুহান হঠাৎ খেঁকিয়ে ওঠে।
-"তুই চুপ কর! আমার বোন কেন কাঁদবে? কাঁদার জন্য কি বিয়ে দিয়েছি? এখন যদি তোকে বিহান ভাই বা এমরিন কাঁদায়, তখন কি তোর ভাই চুপচাপ বসে থাকবে, বল তো?"
রুহানের গর্জনে ঘরের বাতাস কেঁপে ওঠে। আফরিন আর নুহা দু’জনেই অসহায় চোখে ইলহানের দিকে তাকায়। সেই দৃষ্টিতে অভিযোগ আছে, আবার নীরব আর্তিও, যেন মুখ খুলে কিছু বলার শক্তিটুকুও আর নেই। ইলহান পকেট থেকে ধীরে ফোন বের করতে করতেই ঠাণ্ডা, নির্লিপ্ত গলায় বলে—
-"আমার বোনদের চোখে পানি এলে মেরে তক্তা বানিয়ে ফেলব।"
বিহান আর এমরিন একসাথে চোখ-মুখ কুঁচকে তাকায়। পরিস্থিতি যে যেকোনো মুহূর্তে হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে, সেটা ওদের দু’জনেরই বুঝা হয়ে গেছে।রুহান তৎক্ষণাৎ এগিয়ে এসে গর্জে ওঠে—
-"এসো তাহলে! তোমাকেও মেরে তক্তা বানাবো! আমার বোন কেন কাঁদবে তোমার জন্য? ওর কেউ নেই মনে করেছো? আমি ওর ভাই, দিব্যি বেঁচে আছি! এসো, উঠে এসো আজ একটা হিসাব-নিকাশ করেই ছাড়ব। সব সময় আমার বোনকে কাঁদাও তুমি!"
ঘরের ভেতর বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে ওঠে।পাহাড়ের গভীর রাতও এই উত্তেজনায় থমকে গেছে, বাইরে নিস্তব্ধতা, ভেতরে জমাট আগুন। কিন্তু ইলহান নির্লিপ্ত, না রাগ, না বিস্ময়, কিছুই না। সে সেভাবেই বসে থাকে। স্থির দৃষ্টিতে রুহানের দিকে তাকিয়ে থাকে।তারপর ধীরে ধীরে মাথা কাত করে, রুহানের পেছন দিয়ে উঁকি দিয়ে নূরাইসার দিকে তাকায়। কণ্ঠে হালকা কৌতুকের ছায়া মেখে বলে—
-"গুন্ডা ভাই দিয়ে মার খাওয়াবেন নূরেজান?"
নূরাইসা তড়াক করে চোখ মেলে তাকায়। এই প্রথম যেন তার ভেতরের চুপচাপ মানুষটা ভেঙে বেরিয়ে আসে। ডান হাতের তর্জনী তুলে সে এগিয়ে এসে স্পষ্ট, দৃঢ় কণ্ঠে বলে—
-"একদম আমার ভাইকে গুন্ডা বলবেন না। নিজে যখন বোনদের জন্য কাউকে মারলে গুন্ডা হন না, তাহলে আমার ভাই কেন গুন্ডা হতে যাবে?"
মুহূর্তেই ঘরের ভেতরের ভারসাম্য বদলে যায়। রুহানের রাগ থমকে দাঁড়ায়। আর ইলহানের ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে হালকা এক চিলতে হাসি। সে মুচকি হেসে মাথা নেড়ে বলে—
-"ঠিক, ঠিক। এখন তাহলে কী করা যায় বলুন তো?আচ্ছা, বেশ, তাহলে আপনার ভাই আমাকে তক্তা বানাক, কী বলেন?"
নূরাইসার চোখে তখন আর ভয় নেই। শুধু তাচ্ছিল্য।
-"ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করে লাভ নেই!"
কথাটা ছুড়ে দিয়ে সে এবার রুহানের দিকে তাকায়—
-"চলো ভাইয়া!"
রুহান একবার ঘুরে, হতভম্ব ইলহানের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর হঠাৎ শিশুসুলভ ভঙ্গিতে জিভ বের করে মুখ ভেঙিয়ে নেয়। এই দৃশ্য দেখে ইলহান বিস্ময়মিশ্রিত কণ্ঠে বলে—
-"আমি ছুঁচো?"
আর ঠিক তখনই, ঘরের ভেতর থাকা সবাই একসাথে উচ্চ শব্দে হেসে ওঠে। বিহান তো হেসে গড়াগড়ি খেতে শুরু করে। এমরিন গাম্ভীর্য ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত মুখের ওপর হাত রেখে হেসে ফেলে।হাসির ফাঁকেই বলে ওঠে—
-"যাক, এত দিনে চিনতে পেরেছে!"
এই কথায় ইলহান রক্তচক্ষু নিয়ে এমরিনের দিকে তাকায়। কিন্তু এমরিন বিন্দুমাত্র পাত্তা দেয় না। ঘরের ভেতরের উত্তেজনা ধীরে ধীরে হালকা হয়ে আসে।পাহাড়ের রাত আবার যেন নিঃশ্বাস ফেলে। তবু এই হাসির নিচে, অদৃশ্য স্তরে, লুকিয়ে রয়ে যায় অনেক না-বলা কথা, অনেক অসমাপ্ত হিসাব।
.
বাড়িটিতে তখন নরম আলো। দীর্ঘ পথের ক্লান্তি শরীরে জমে থাকলেও সবাই হাত-মুখ ধুয়ে খেয়ে নেয়।বাড়িওলা আগেই তাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করে রেখেছিল। বাইরে পাহাড় নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে, অচঞ্চল, নির্লিপ্ত। ভেতরে ছড়িয়ে পড়েছে এক অদ্ভুত শান্তির পরশ, যেন এই কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও পৃথিবীর সব জটিলতা বাইরে রয়ে গেছে। নুহা এক মুহূর্তের জন্যও আফরিন আর নূরাইসাকে ছাড়ছে না।এতগুলো দিন পরিবার, বোনদের ছাড়া থেকেছে, এমন অভিজ্ঞতা তার জীবনে কখনোই হয়নি। মাঝে মাঝেই ওদের দিকে তাকিয়ে থাকে, যেন চোখের আড়াল হলেই তারা হারিয়ে যাবে। এই দেখা পাওয়াটুকু যেন সে বিশ্বাসই করতে পারছে না। তখনই ইলহান সবার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল—
-"সবাই তো খুব ক্লান্ত। এবার তাহলে ঘুমোতে যাওয়া যাক?"
তার কথা শেষ হতেও আফরিন সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল—
-"আমরা তিন বোন আজ একসাথে ঘুমাবো। উপমা ভাবির সাথে!"
উপমা কথাটা শুনেই যেন খুশিতে ঝিলমিল করে উঠল। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল—
-"হ্যাঁ হ্যাঁ, চল আমরা একসাথে ঘুমাই। সবাই তো জোড়া জোড়া আছো। আমাকেই একা ঘুমাতে হতো। ভালোই হলো চলো!"
ঠিক সেই মুহূর্তে রুহান চোখ টিপে, অর্ধেক দুষ্টুমি, অর্ধেক সাহসে, বলল—
-"তুমি বললে আমি তোমার সাথে থাকতে পারি, জান!"
উপমা উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে ‘হ্যাঁ’ বলার আগেই আচমকা শব্দ, ইলহান দোরাম করা কিল বসালো রুহানের পিঠে। চোখ পাকিয়ে, গম্ভীর গলায় বলল—
-"বিয়ের আগে ঘুরতে এসেছিস, একসাথে, এটা মেনেছি। কিন্তু এক ঘরে থাকা? একদম জানে মেরে ফেলব তোকে!"
রুহান ব্যথা আর লজ্জা লুকোতে হালকা হেসে চুল চুলকে বলল—
-"ভাইয়া, আমি তো দুষ্টুমি করছিলাম!"
ইলহান কড়া গলায় বলে উঠল—
-"দুষ্টুমিও করবি না। ঢাকা গিয়ে তোদের বিয়ের ব্যবস্থা করছি।"
এই কথায় রুহান আর উপমার মুখ একসাথে লাল হয়ে উঠল। দু’জনেই চুপচাপ চোখ নামিয়ে নিল, লজ্জা আর অপ্রস্তুতির নিঃশব্দ স্বীকারোক্তি। আফরিন আবার তাগাদা দিয়ে বলল—
-"তাহলে যাও, যে যার ঘরে যাও। আমরা চারজন আজ একসাথেই থাকছি!"
ঠিক তখনই নুহা হঠাৎ আফরিনের কাছ থেকে সরে এসে বিহানের গা ঘেঁষে বসল। এক বাহু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, দুষ্টু অথচ স্পষ্ট গলায় বলল—
-"জামাই থাকতে তোমার সাথে ঘুমাবো কেন, হ্যাঁ? আমি আমার জামাই ছাড়া ঘুমাবো না।"
নূরাইসা আর আফরিন দু’জনেই একসাথে চোখ পাকিয়ে তাকাল। পরিস্থিতির এমন মোড়ে তারা খানিকটা হতভম্ব। ইলহান আর এমরিন মিটিমিটি হাসছে, ঠিক সেই হাসি, যেখানে প্রশ্রয়ও আছে, আবার মজা নেওয়ার দুষ্ট আনন্দও। বিহানের হঠাৎ কাশি উঠে গেল। যেন গলায় কিছু আটকে গেছে। অস্বস্তি লুকোতে সে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। নূরাইসা চাপা কিন্তু তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল—
-"এই বেয়াদব! লজ্জা করে না? বড় ভাই-বোনদের সামনে এসব কী কথা! একদিন জামাই ছাড়া থাকলে ম রে যাবি নাকি?"
কিন্তু নুহা নাছোড়বান্দা। একচুলও ছাড়ার পাত্রী নয়। আরও শক্ত করে বিহানের বাহু জড়িয়ে ধরে, নির্ভীক গলায় বলল—
-"হ্যাঁ, আমি ম রেই যাবো। জামাই থাকতে একরাত কেন, এক মিনিটও তাকে ছাড়া থাকবো না। জামাই নিয়ে ঘুরতে এসেছি, বোন ভাই এরা সাইড ক্যারেক্টার।তো জামাই ছাড়া বোনদের সাথে ঘুমাবো কোন দুঃখে।তোমাদেরও তো জামাই আছে, যাও, জামাইর সাথেই ঘুমাও যাও!"
কথা শেষ করেই সে আর এক মুহূর্ত নষ্ট করল না।আচমকাই বিহানের হাত ধরে টেনে তুলল। বিহান বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। কী বলবে সে? কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেবে? এই পুচকি মেয়েটা, এই ছোট্ট, দুষ্ট মেয়েটা, বড় ভাইদের সামনেই একটুও লজ্জা না পেয়ে এমন কাণ্ড করে বসবে, সেটা তার কল্পনাতেও ছিল না। নুহা তাকে টেনে নিয়ে গেল রুমের ভেতর। দরজার আড়ালে মিলিয়ে গেল দু’জন।আর বিহান? সে তখনও বাকরুদ্ধ। মাথার ভেতর শুধু একটাই কথা ঘুরছে—
"এই মেয়ের একটুও লজ্জা নেই!"
অন্যদিকে রুহান আর উপমা ইতিমধ্যেই নিজেদের ঘরে চলে গেছে। তাদের পেছনে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে বাড়িটা আরও নিঃশব্দ হয়ে উঠল। যেন শব্দটুকুও দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে থেমে গেল। শেষে ইলহান আর এমরিন দু’জনেই আড়মোড় ভেঙে উঠে দাঁড়াল। দিনের ক্লান্তি আর রাতের মজা, দুটোই শরীরে জমে আছে।এমরিন ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি রেখে বলল—
-"কেউ তো অন্তত জামাইরে কদর বুঝে। বউ ছাড়া থাকতে কষ্ট হবে বুঝেই জামাইকে টেনে নিয়ে গেল।"
ইলহান গম্ভীর থাকার চেষ্টা করে যোগ করল—
-"বাকিরা তো নিরামিষ, জামাইর কদরই বুঝল না। শুধু আমরা দেখে মানিয়ে নিলাম। এমন জামাই হারালে কিন্তু কাঁদতে হবে আড়ালে!"
এই কথা বলেই দু’জন আলাদা দিকে হাঁটা ধরল, নিজেদের রুমের পথে। তাদের হাসির রেশটা বাতাসে ভেসে রইল আরও কিছুক্ষণ, তারপর ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল পাহাড়ি নীরবতায়। নূরাইসা আর আফরিন অসহায় চোখে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ যেন ভাষা হারিয়ে ফেলল দু’জনই। কী বলা উচিত, কী না বলা ভালো, এই দ্বন্দ্বেই তারা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর নিঃশব্দে উপমার ঘরের দিকে পা বাড়াল। আর ঠিক তখনই, দুই দিক থেকে আচমকা দুটি বলিষ্ঠ হাত এসে তাদের দু’জনকে দু’দিকে টেনে নিয়ে গেল। এক মুহূর্তের জন্য নিঃশ্বাস আটকে গেল। চমকে ওঠা চোখ, থমকে যাওয়া পা।নীরব পাহাড়ি রাত হঠাৎ করেই যেন নতুন এক চমকের সাক্ষী হলো। দুই দিক থেকে টেনে নেওয়ার মুহূর্তে নূরাইসা আর আফরিন দু’জনেই চমকে উঠল।নূরাইসার মুখ দিয়ে আধা-চিৎকার বেরিয়ে এল—
-"এই...!"
কথা শেষ হওয়ার আগেই সে বুঝে ফেলল, যে হাতটা তার কবজি জড়িয়ে ধরেছে, সেটা চেনা। অসম্ভব চেনা।বুকের ভেতর ধক করে উঠল তার হৃদয়।
-"চুপ!"
ইলহানের চাপা কণ্ঠ কানের কাছে এসে লাগল।
-"সবাই জেগে যাবে!"
নূরাইসা কিছু বলার আগেই ইলহান তাকে নিজের দিকে টেনে নিল। লিভিং রুমের মৃদু আলো তার মুখে পড়তেই সে দেখল, চোখ দুটো অদ্ভুত রকম শান্ত, অথচ ভেতরে জমে থাকা দুষ্টু ঝিলিক লুকোনোর কোনো চেষ্টাই নেই। এক মুহূর্তের জন্য নূরাইসা যেন ভুলে গেল, সে কী বলতে চেয়েছিল। শুধু তাকিয়ে রইল। এই মানুষটার চোখে এমন একটা নিশ্চয়তা আছে, যা রাগও ভেঙে দেয়, ভয়ও।
অন্যদিকে আফরিনও থমকে গেল। সে তাকিয়ে আছে এমরিনের দিকে। এতক্ষণ যে লোকটা দূরে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হেসে সব দেখছিল, এখন সে একদম কাছে।এতটাই কাছে যে আফরিনের নিশ্বাসের গতি এলোমেলো হয়ে গেল।
-"আপনি...?"
আফরিনের গলা কেঁপে উঠল। এমরিন ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল—
-"তুমি তো উপমার রুমে যাচ্ছিলে। মাঝপথে পথ বদলানো নিষেধ আছে নাকি?"
আফরিন রেগে গিয়ে বলল—
-"হাত ছাড়ুন। কী করছেন এইসব!"
কিন্তু এমরিন হাত ছাড়ল না। বরং আরও একটু কাছে এসে, গলা নামিয়ে নরম স্বরে বলল—
-"এইসব না করলে তো তুমি আমার দিকে আসতে না!"
আফরিন চোখ বড় বড় করে তাকাল। রাগ, অপ্রস্তুতি আর একফোঁটা লজ্জা, সব একসাথে এসে গলা আটকে দিল।সে ফিসফিস করে বলল—
-"আপনি খুব বাড়াবাড়ি করছেন!"
এমরিন এবার গম্ভীর হলো। হাসিটা মিলিয়ে গেল চোখের কোণ থেকে। কিন্তু কণ্ঠটা রয়ে গেল নরম—
-"বাড়াবাড়ি না করলে মানুষ বোঝে না, কে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে।"
লিভিং রুমের আলোয় চারজনের ছায়া দেয়ালে পড়ে আছে,.দুটি ছায়া কাছাকাছি, দুটি ছায়া সামান্য দূরে। বাইরে পাহাড় নিশ্চুপ, ভেতরে নিঃশব্দে বদলে যাচ্ছে সম্পর্কের সমীকরণ।
এমরিন ফিসফিস করে বলে উঠলো—
-"সবাই যখন জামাই নিয়ে ব্যস্ত, তখন আমি ভাবলাম, আমার বউটা একা কেন থাকবে?"
এই কথায় আফরিনের চোখ বড় হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে রাগ, লজ্জা আর বিস্ময় একসাথে মুখে ভর করল।
-"এই... এই সব কথা এখানে বলছেন কেন?"
এমরিন চোখ নামিয়ে তার দিকে তাকাল। দৃষ্টিতে দুষ্টুমি নেই, আছে অদ্ভুত এক স্থিরতা।
-"কারণ... এখানে শুধু পাহাড়, রাত আর আমরা।"
লিভিং রুমের মৃদু আলোয় জানালা দিয়ে পাহাড়ি বাতাস ঢুকে পড়ছে। পর্দা হালকা কেঁপে উঠছে। দূরে ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক। বাড়িটির নিস্তব্ধতা যেন ইচ্ছা করেই সব শব্দ চেপে ধরে রেখেছে, যেন এই মুহূর্তটা ভাঙতে চায় না।
নূরাইসা ইলহানের হাত থেকে নিজেকে ছাড়াতে চেষ্টা করে ফিসফিস করে বলল—
-"আপনার মাথা খারাপ? সবাই দেখলে কী ভাববে?"
ইলহান হেসে বলল—
-"সবাই তো এখন নিজেদের ঘরে ঘুমোচ্ছে। আর যারা জেগে আছে... তারা নিজেরাই ব্যস্ত।"
সে দরজার দিকে ইশারা করল। নূরাইসা বুঝল, নিজেদের রুমের ভেতরে যেতে বলছে। এক মুহূর্তের জন্য দ্বিধা। তারপর ক্লান্তি, অভিমান আর জমে থাকা না-বলা কথাগুলো একসাথে তাকে ঘিরে ধরল। গলাটা শক্ত করে সে বলল—
-"কাল কথা হবে!"
ইলহান দরজাটা খুলে, নিঃশব্দ অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল—
-"কাল অনেক দূরে। এখন আসুন! আপনি জানেন আপনাকে ছাড়া ঘুমোতে আমার কষ্ট হয়। যত রাগ যত অভিযোগ আছে সব শুনবো। কিন্তু আমার সাথেই থাকতে হবে আপনাকে।"
অন্যদিকে এমরিন ইতিমধ্যেই আফরিনকে নিজের রুমের সামনে নিয়ে এসেছে। দরজায় হাত রেখে সে থেমে গেল। গলাটা নামিয়ে নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল—
-"ভয় পাচ্ছ?"
আফরিন চোখ সরিয়ে বলল—
-"ভয় না। অস্বস্তি।"
এমরিন হালকা হাসল।
-"অস্বস্তি হলে বলবে। কিন্তু তুমি না থাকলে আমি ঠিক থাকতে পারি না, এইটা কি জানো না?"
আফরিন আর কিছু বলল না। নীরবে দরজাটা খুলল।ঘরের ভেতরের আলো বাইরে ছড়িয়ে পড়ল, কয়েক সেকেন্ডের জন্য লিভিংরুম আলোকিত হয়ে উঠল।তারপর এক এক করে বাকি দরজাগুলো বন্ধ হয়ে গেল। পাহাড়ি রাত আবার নিঃশব্দ হয়ে দাঁড়াল। কিন্তু প্রতিটা বন্ধ দরজার ভেতরে তখন জমে উঠছে আলাদা আলাদা গল্প, আলাদা আলাদা অনুভূতির ঢেউ, যা এই রাতের নীরবতাকে আর কখনো আগের মতো থাকতে দেবে না। এই রাত শুধু বিশ্রামের নয়। এই রাত, অনেক অস্বীকারের, অনেক না-বলা কথার, আর অপ্রস্তুত অনুভবের শুরু।
.
অন্যদিকে নুহা দরজার কাছে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে কান পেতে রইল। বুকের ভেতর হালকা দুরুদুরু, বোনরা এখনো কি ওখানেই বসে আছে, নাকি সবাই নিজের নিজের ঘরে ফিরে গেছে? কয়েক মুহূর্ত টানটান অপেক্ষার পর সে বুঝতে পারল, স্বামীরা এসে তাদের স্ত্রীদের নিয়ে গেছে। বাড়ির ভেতরের কোলাহল ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে এসেছে। একটা দীর্ঘশ্বাস নুহার বুক ছেড়ে বেরিয়ে এলো। সে ঘুরে দাঁড়াতেই হঠাৎ করে শক্ত, প্রশস্ত এক বুকের সাথে সজোরে ধাক্কা খেল।
মুহূর্তেই থমকে গেল। চোখ তুলে তাকাতেই দেখল, বিহান। চোখমুখ কুঁচকে, তার দিকেই স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। নুহা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করল। ঠোঁটের কোণে বোকা বোকা একটা হাসি টেনে আনল। বিহান বুকের ওপর দুই হাত ভাঁজ করে গম্ভীর স্বরে বলল—
-"বাইরে তখন ওইসব কী ছিল?"
নুহা একটু থমকাল। গলা শুকিয়ে এলো। আমতা আমতা করে বলল—
-"কোন সব?"
বিহান ভ্রু আরও কুঁচকে নুহার দিকে তাকিয়ে বলল—
-"এই যে, ‘জামাই ছাড়া থাকবে না!’"
নুহা পরিস্থিতি হালকা করতে খাটের দিকে এগোতে এগোতে হাসল—
-"ওহ... ওইসব!"
ঠিক তখনই বিহান ধীর পায়ে তার পিছু পিছু এগিয়ে এলো। কণ্ঠে খেলাচ্ছলে চাপা হাসি—
-"জামাই ছাড়া থাকবে না? চলো তাহলে... রাতটা শুরু করা যাক?"
নুহা ঘাবড়ে গিয়ে ঘুরে তাকাল। বিহান একদম তার সামনে। দুজনের মাঝে এক চুল পরিমাণও দূরত্ব নেই।বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল। নুহা ধীরে ধীরে পিছিয়ে যেতে যেতে খাটের ওপর বসে পড়ল। বিহান খাটের দুই পাশে হাত রেখে ঝুঁকে দাঁড়াল। নুহার চোখ মেঝেতে আটকে গেল, সে দৃষ্টি তুলতে পারছে না। আর বিহান, নিষ্পলক তাকিয়ে আছে, চোখে অদ্ভুত এক দুষ্টু অথচ গভীর ছায়া। হালকা হেসে সে বলল—
-"তখন তো শরীরের সাথে চিপকে চলেছিলে। এখন পালাচ্ছ কেন?"
নুহার গলা কাঁপল। সে ধীরে ধীরে কথা খুঁজে পেল—
-"আসলে... ভাইয়া আর আপুর মধ্যে বোধহয় কিছু হয়েছে। আলাদা রুমে থাকলে ঝামেলা আরও বাড়ত।তাই... তাই ওইসব বলেছি, যাতে ওরা নিজেদের রুমে ঘুমায়।"
বিহানের চোখে মুহূর্তেই বদল এলো। ঠোঁটে একটা মুচকি হাসি খেলল। সে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তারপর কোনো কথা না বাড়িয়ে ঘরের বাতিটা নিভিয়ে দিল।নরম অথচ সিদ্ধান্তপূর্ণ কণ্ঠে বলল—
-"ঘুমিয়ে পড়ো। অনেক পথ জার্নি করেছ। ক্লান্ত অনেক।"
এই বলে সে খাটের এক পাশে শুয়ে পড়ল। নুহা নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতর একটা অজানা শূন্যতা হু হু করে উঠল। কোথাও একটা সে চেয়েছিল, বিহান তার কাছে আসুক, কাছে টেনে নিক। কিন্তু সেটার আর কোনো সম্ভাবনা নেই। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে-ও শুয়ে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যেই পুরো বাড়িটা নিস্তব্ধ হয়ে এলো। দিনের ক্লান্তি আর মানসিক চাপ একে একে সবাইকে ঘুমের রাজ্যে টেনে নিল। বাইরে রাত গভীর হলো, আর ভেতরে জমে রইল না-বলা অনুভূতিগুলোর নিঃশব্দ ভার।