সকালবেলার নরম আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে দেওয়ান বাড়ির বিস্তীর্ণ আঙিনায়। সেই আলোর সাথে সাথে আজও শুরু হয়ে গেছে বাড়ির চিরচেনা হইহুল্লোড়, আর সেই হুল্লোড়ের কেন্দ্রবিন্দু ছোট্ট নাহিয়ান। এই ছোট্ট মানুষটিই এখন পুরো দেওয়ান বাড়ির রাজা। তার ইশারায় হাসে সবাই, তার কান্নায় ছুটে আসে। নাহিয়ান সারাদিন তার টুকটুকে ছোট্ট পা ফেলে সারা বাড়ি চষে বেড়ায়, কখনো বারান্দা, কখনো উঠান, কখনো আবার কারও কোলে উঠে রাজত্ব করে।যেন নাকে অদৃশ্য দড়ি বেঁধে সে পুরো বাড়ির মানুষগুলোকে নিজের চারপাশে ঘুরিয়ে রাখে।একসময় যে বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে নীরবতা জমে থাকত, সেখানে এখন প্রতিদিন ভোর থেকেই হাসির শব্দ গড়িয়ে পড়ে। দেওয়ান বাড়ির আঙিনায় যেন আজকাল মন খারাপ প্রবেশ করার অনুমতিই পায় না।
সকালের নাস্তার টেবিলে ইতিমধ্যেই সবাই জড়ো হয়ে বসেছে। বড় ডাইনিং টেবিলটা ভরে উঠেছে কোলাহলে, কথাবার্তায় আর হাসিতে। ফারাহ, তানভীর, রুহান আর উপমা, তারা চারজনই এখন বাড়িতে নেই। তিন দিন হলো তারা হনিমুনে গেছে। আগামীকালই ফিরে আসবে। তাদের অনুপস্থিতি টেবিলে খানিকটা শূন্যতা তৈরি করলেও নাহিয়ানের দুষ্টুমিতে সেই শূন্যতা বেশিরভাগ সময়েই ঢেকে যায়। এমরিনও এখন অনেক বদলে গেছে। অতীতের সব অবৈধ কাজ ছেড়ে সে এখন নিজের একান্ত ব্যবসা দাঁড় করিয়েছে। নতুন জীবনের পথে হাঁটার চেষ্টা করছে সে। ইলহান আর এমরিন, দুজনেই স্যুট-বুট পরে তৈরি হয়ে নিচে নেমে এলো। অফিসে যাওয়ার আগে প্রতিদিনের মতোই সবাই মিলে সকালের নাস্তা সেরে নেওয়ার নিয়ম তাদের।
ওদিকে রান্নাঘর আর ডাইনিংয়ের মাঝখানে ব্যস্ততার ঘূর্ণি যেন থামছেই না। নূরাইসা আর আফরিন ব্যস্ত হাতে একের পর এক খাবার টেবিলে সাজিয়ে দিচ্ছে।আর তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন নাজনীন বেগম, ইলিনা বেগম আর তানিয়া বেগম। সকালের সমস্ত রান্না তারা নিজেরাই করে শেষ করেছেন। এখন সেই রান্না নূরাইসা আর আফরিনের হাতে তুলে দিয়ে তদারকি করছেন, কোনো কিছু কম পড়ছে কি না, কার প্লেটে কী লাগবে, কে কী খেতে পছন্দ করে। সবাই একসাথে টেবিলে বসে পড়েছে। কিন্তু টেবিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদস্যটি বসে আছে টেবিলের মাঝখানেই, ছোট্ট নাহিয়ান। সে টেবিলের ওপরে বসে পড়েছে দিব্যি। ছোট্ট হাত আর হাঁটু ভর করে হামাগুড়ি দিয়ে একেক জনের সামনে যাচ্ছে। কেউ তাকে এক টুকরো পরোটা দিচ্ছে, কেউ সামান্য ডিম, কেউ আবার ফলের টুকরো। আর সে বড়দের মতো গম্ভীর মুখে সেগুলো একটু একটু করে খেয়ে নিচ্ছে। এটাই তার প্রতিদিনের নিয়ম, সবাইয়ের হাত থেকে একটু একটু করে খাওয়া।
নূরাইসা নিজের প্লেট সামনে নিয়ে বসে আছে। কিন্তু তার চোখের কোণে বিরক্তির রেখা স্পষ্ট। ছেলের কাণ্ডকারখানা দেখে সে আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারল না। অবশেষে একটু বিরক্ত গলায় বলে উঠল—
-"আহ নাহিয়ান, এখানে এসো। তোমার খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে তো।"
নূরাইসার কণ্ঠে ছিল মায়া, সঙ্গে হালকা ক্লান্তির ছোঁয়া।কিন্তু নাহিয়ান কি আর এত সহজে ধরা দেয়! ছোট্ট ছেলেটা টেবিলের ওপরে হামাগুড়ি দিতে দিতে হঠাৎ থেমে গেল। তারপর ফোকলা দাঁতগুলো বের করে দুষ্টু হাসি হেসে বলল—
-"থাবো না... তুমি থাও!"
তার সেই আধো আধো উচ্চারণে যেন কথার চেয়ে দুষ্টুমিই বেশি ঝরে পড়ছিল। নূরাইসা এবার একটু গম্ভীর হলো। ভ্রু কুঁচকে ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল—
-"রাগিও না আমায় নাহিয়ান। একটা মার ও মাটিতে পড়বে না!"
কথাটা বললেও গলায় তেমন কঠোরতা নেই, বরং মায়ার আড়ালে লুকিয়ে থাকা মায়ের অসহায় বিরক্তি।নাহিয়ান সঙ্গে সঙ্গে কাঁদো কাঁদো মুখ করে বাবার দিকে তাকাল। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অন্যায়টা তার সঙ্গেই হয়ে গেছে। ইলহান ছেলের সেই ভেজা ভেজা মুখটা দেখে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি লুকিয়ে রেখে মেকি রাগ দেখিয়ে নূরাইসার দিকে তাকিয়ে বলল—
-"সাহস তো কম না তোর! আমার সামনে আমার ছেলেকে শাসাচ্ছিস?"
নূরাইসা এবার কপট রাগে চোখ বড় বড় করে তাকাল। ঠোঁট ফুলিয়ে বলল—
-"তো কী করবো? কথা শুনে আপনার ছেলে? সেই কখন থেকে খাওয়ানোর চেষ্টা করছি। ওষুধ খেতে হবে তো ওর! আমারও তো খিদে লাগে, এখনো একটা দানাও পড়েনি পেটে।"
ইলহান নির্বিকার ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকালো।
-"তোকে খেতে না করেছে কে? খেয়ে নে। আমার ছেলের যখন ইচ্ছে করবে, তখনই খেয়ে নেবে!"
মায়ের সাথে বাবার এই কথোপকথন নাহিয়ান খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। যখন বুঝল মা যেন একটু বকা খেয়ে গেছে, তখন সে হামাগুড়ি দিয়ে বাবার কাছে চলে এলো। ছোট্ট দুটো হাত দিয়ে ইলহানের হাঁটু আঁকড়ে ধরে আদুরে গলায় বলল—
-আলো বোকো বাবা... আমাতে সব সব তময় বকে।মাইল দাও... মাইল!"
তার আধো আধো ভাষা, অভিযোগে ভরা কণ্ঠ, সব মিলিয়ে মুহূর্তটা যেন হঠাৎ স্থির হয়ে গেল। এক সেকেন্ডের জন্য টেবিলে বসা সবাই থমকে রইল।তারপর পরক্ষণেই চারদিক থেকে হাসির ঢেউ উঠে এল। নাজনীন বেগম, তানিয়া বেগম, ইলিনা বেগম, সবার মুখেই বিস্ময় আর আনন্দ মেশানো হাসি।আফরিন আর এমরিনও হাসি চেপে রাখতে পারল না।নাহিয়ানের কথা বলার ভঙ্গিটাই এমন। ইলহান অবশ্য বাইরে থেকে গম্ভীরই রইল। আড়ালে ছেলেকে একবার চোখ রাঙালো। তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল—
-"তোর মা’কে মারার সাহস আমার নেই বাবা। উল্টো তোর মা-ই আমাকে দু’ঘা বসিয়ে দেবে।"
কথাটা বলেই সে হালকা হেসে একটু ঝুঁকে এলো। স্নেহভরা ভঙ্গিতে ছেলের কাঁধে হাত রাখল। তারপর নরম কিন্তু অর্থবহ কণ্ঠে বলল—
-"মায়ের নামে নালিশ করছ নাহিয়ান? ভেরি ব্যাড।"
একটু থেমে ছেলের চোখের দিকে তাকাল সে, যেন কথাটার ভেতরের শিক্ষা ছেলেটার হৃদয়ে পৌঁছে দিতে চায়। তারপর মৃদু হাসি নিয়ে আবার বলল—
-"মাকে নিয়ে নালিশ করা যায় না বাবা... মাকে ভালোবাসতে হয়। বুঝেছো? তোমার আমার পুরো দুনিয়া, তাকে আঘাত করার কথা দ্বিতীয়বার আর কোনোদিন বলবে না। বুঝেছো?"
নাহিয়ান সঙ্গে সঙ্গে মুখটা একটু মলিন করে ফেলল।মাথাটা দুলিয়ে ধীরেসুস্থে সম্মতি জানাল। নূরাইসা এতক্ষণ ছেলের কথাগুলো শুনছিল। তার চোখ দুটো হঠাৎ করেই বিহ্বল হয়ে উঠল। ছেলের দিকে তাকিয়ে সে যেন মুহূর্তের জন্য কথা হারিয়ে ফেলল। তারপর ধীর গলায় বলল—
-"হ্যাঁ, এটাই বাকি আছে এখন! সারাদিন খেটে মরি, আর বাবা-ছেলের ফরমাইশ খাটি। আবার তাদের কথাও শুনি, এখন মাইরও খাব! যা, থাকব না তোদের সাথে আর। আমাকে আর দরকার নেই তোদের, বুঝেছি। একদম বাবা-ছেলে আমার কাছে ঘেঁষবি না আর!"
অভিমান ভরা গলায় কথাগুলো বলেই নূরাইসা সামনে রাখা খাবারের প্লেটটা একটু ঠেলে সরিয়ে দিল। তারপর আর কারও দিকে না তাকিয়ে দ্রুত উঠে দাঁড়াল। তার পায়ের শব্দ যেন ডাইনিং রুমের কোলাহলের মাঝেও স্পষ্ট শোনা গেল। পরক্ষণেই সে সোজা নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। পেছন থেকে সবাই তাকে থামানোর চেষ্টা করল, কেউ ডাকল, কেউ আবার বোঝাতে চাইল। কিন্তু নূরাইসা যখন অভিমান করে, তখন তাকে থামানো সত্যিই কঠিন। অল্পতেই অভিমান করার স্বভাবটা এখনো যায়নি তার। নাজনীন বেগম তখন ইলহানের পাশে এসে দাঁড়ালেন। মুখে বিরক্তি, চোখে মমতা। তিনি ইলহানের কানটা আলতো করে মলে দিয়ে বললেন—
-"হয়েছে? এখন শান্তি হয়েছে তোর? মেয়েটা সেই কোন সকালে উঠেছে, এখনো কিছু খায়নি। তোর এত কথা শোনানো লাগে কেন ওকে? চুপ থাকতে পারিস না?"
একটু থেমে আবার বললেন—
-"তোর ছেলে কম জ্বালায়? একটু রেগে কী না কী বলেছে, তুই কেন ছেলের বিচার করতে গিয়ে ওকে কথা শুনাতে গেলি? এখন মেয়েটা অভিমান করে বসে থাকবে, না খেয়ে!"
ইলহান কিছু বলল না। শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। ওদিকে ছোট্ট নাহিয়ানও বাবার দিকে তাকিয়ে আছে বিস্মিত চোখে। যেন বুঝতেই পারছে না ঠিক কী ঘটল। একসময় বাবা-ছেলে দুজনেই একে অন্যের দিকে অসহায় মুখ করে তাকাল। ডাইনিং টেবিলে আবার ধীরে ধীরে স্বাভাবিকতা ফিরে এল। সবাই নিজেদের নাস্তা শেষ করল। কিন্তু ইলহান আর নাহিয়ানের মনে যেন একটা অদৃশ্য অপরাধবোধ চেপে বসে রইল। নাস্তা শেষ হতেই বাবা-ছেলে দুজন গুটি গুটি পায়ে নিজেদের রুমের সামনে এসে দাঁড়াল।দুজনেই দরজার পাশে আড়ালে দাঁড়িয়ে মাথা কাত করে ঘরের ভেতরে উঁকি দিল। ভেতরের দৃশ্যটা দেখে দুজনেই একটু থমকে গেল। নূরাইসা বিছানার ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। কাঁধ কাঁপছে তার, সে কাঁদছে।এতটুকু ঘটনাতেই এত অভিমান! নিজের সন্তানের অবুঝ কথায়ও যে এতটা মন খারাপ করা যায়। এটা দেখলে কেউ বিশ্বাসই করবে না যে এই মেয়েটা একটা বাচ্চার মা। অবশ্য এর বেশিরভাগ দোষই ইলহানের।সে-ই তো এখনো নূরাইসাকে সেই আগের মতো সহজ-সরল, বোকাসোকা মেয়েটাই বানিয়ে রেখেছে। আর সত্যি বলতে কী, নিজের বউকে এভাবে আলতো করে অভিমান করাতে তার ভীষণ ভালো লাগে। কারণ তখনই তো সুযোগ মেলে তাকে আবার মানানোর, আবার আদর করার। এই যে এখন অভিমান করেছে, এই সুযোগেই সে তার বউয়ের মান ভাঙাবে। আর সেই সঙ্গে নিজের পাওনাটুকুও আদায় করে নেবে। এমনিতে কাছে গেলেই নূরাইসা পালাই-পালাই করে। কিন্তু আজ সে নিজেই এসে পড়েছে সেই সুযোগের সামনে। বাবা-ছেলে গুটি গুটি পা ফেলে ভেতরে ঢুকল। ইলহান নিঃশব্দে দরজাটা বন্ধ করে দিল। তারপর ধীরে ধীরে বিছানার কাছে গিয়ে নূরাইসার পেছনে শুয়ে পড়ল।কোনো শব্দ না করে তাকে নিজের বাহুর ভেতর টেনে নিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। হঠাৎ এই স্পর্শে নূরাইসা যেন ক্ষেপে গেলো। ক্ষিপ্ত বাঘিনীর মতো সে ইলহানের বাহু থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল। হাত-পা ছুঁড়ে তাকে ঠেলে সরিয়ে দিতে চাইল।কিন্তু ইলহানের বন্ধন বরং আরও শক্ত হয়ে উঠল। সে মুখটা নূরাইসার ঘাড়ের কাছে গুঁজে দিয়ে গভীর নিশ্বাস ফেলল। তারপর নরম, দুষ্টু গলায় ফিসফিস করে বলল—
-"এত রাগ জান? নাহিয়ান তো বাচ্চা, বুঝে না। ও বললেই কি আমি তোকে মারতে পারি? কখনো মেরেছি তোকে?"
ইলহানের কণ্ঠে ছিল মৃদু হাসি, আর একরাশ আদর মেশানো স্নেহ। কিন্তু নূরাইসার অভিমান এত সহজে গলবার নয়। সে চোখ মুছতে মুছতে গম্ভীর গলায় বলল—
-"মারেন নি, মারতে কতক্ষণ? ছেলে যা বলে তাই তো করেন। ছেলে আসার পর থেকে আমার কথা কোনো মূল্য আছে নাকি আপনার কাছে? ছাড়ুন আমাকে,যান, ছেলেকে গিয়ে পালুন।"
নূরাইসা আবার নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেই ইলহান তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। যেন তার এই ছোট্ট অভিমানটুকুকেও বুকের ভেতর আটকে রাখতে চায়। মুখটা নূরাইসার কানের কাছে এনে নরম স্বরে বলল—
-"কখনোই না, জান... কখনোই না। একটা ছেলের জীবনে তার মা কতটা প্রয়োজন, সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি। শুধু ছেলেরই নয়, ছেলের বাবারও তো তাকে দরকার... আমাদের দু’জনের জীবনই তো তুই। আমরা তো শুধু একটু দুষ্টুমি করছিলাম তোর সাথে, মজা করছিলাম... তোর চোখে এমন রাগ আর কষ্ট দেখব ভাবিনি। সত্যি বলছি, তোকে আঘাত দেওয়ার কোনো ইচ্ছে ছিল না। রাগ করিস না, প্লিজ জান, আমার দিকে একবার তাকা। তোর এই অভিমানটা সহ্য হয় না আমার।"
কথা বলতে বলতেই ইলহান পরপর কয়েকটা চুমু খেয়ে ফেলল নূরাইসার ঘাড়ে। হঠাৎ সেই স্পর্শে নূরাইসার পুরো শরীরটা কেঁপে উঠল। যেন শিরায় শিরায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। ইলহান সেই কম্পন স্পষ্ট অনুভব করল।তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।সে ধীরে ধীরে হাতের বাঁধনটা একটু আলগা করল, যেন আরও কাছে টেনে নেবে তাকে। আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার জন্য ঝুঁকতেই, নূরাইসা আচমকা এক ঝটকায় তাকে ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। চোখ দুটো রাগে চকচক করছে।
-"একদম আমাকে গলাতে আসবেন না! যান, বেরিয়ে যান!"
তার ঝাঁঝালো কণ্ঠে যেন ঘরের বাতাসটাও মুহূর্তে থমকে গেল। ঠিক তখনই ইলহানের পেছন থেকে ছোট্ট একটা মুখ উঁকি দিল। নাহিয়ান। তার বড় বড় চোখে ভয় মিশে আছে। মা মাঝে মাঝেই এমন অভিমান করে, এটা সে জানে। কিন্তু মাকে কাঁদতে দেখলে তার ছোট্ট মনটা কেমন যেন হয়ে যায়। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে নরম গলায় বলল—
-"ভুল হয়েথে মা... লাগ কোলো না। সলি... আল বলব না। তুমি লাগ কল্লে আমাল কষ্ট হয় খুব! আল বলব না। তুমাকে উনেক ভালোবাথবো।"
তার আধো আধো কথাগুলো যেন সরাসরি এসে লাগে নূরাইসার হৃদয়ে। নূরাইসা ছেলের দিকে তাকাল।মায়াবী মুখটা দেখে তার বুকটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল। একদম বাপের মুখ পেয়েছে ছেলেটা, মনে হয় যেন ইলহানের মুখটাই কেটে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে তার ওপর। ওদিকে ইলহান চুপচাপ গিয়ে খাবারের থালাটা এনে বিছানার ওপর রাখল। তারপর ধীরে ধীরে নেমে দাঁড়াল। নাহিয়ানও বাবাকে দেখে একইভাবে নেমে দাঁড়াল। তারপর বাবা-ছেলে দুজন একসাথে হাঁটু ভাঁজ করে বসে পড়ল। দুজনেই কানে হাত দিয়ে বলল—
-"We love you so much, our beautiful girl... please don’t stay angry with us. It hurts to see you upset like this. We are truly, truly sorry. Please forgive us."
দু’জনের চোখেই চিকচিক করছিল অপরাধবোধ আর ভালোবাসার অদ্ভুত এক মিশ্র আলো। সেই চোখের ভাষা দেখে নূরাইসা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। তার চোখও মুহূর্তেই ভরে উঠল অশ্রুতে। এক নিমিষেই যেন সব অভিমান গলে পানি হয়ে গেল।ইলহান উঠে এসে এক হাতে ছেলেকে, আরেক হাতে নূরাইসাকে টেনে নিয়ে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল। সেই আলিঙ্গনে ছিল ক্ষমা চাওয়া, আশ্বাস আর অগাধ ভালোবাসার নীরব ভাষা। তারপর খুব যত্ন করে নূরাইসাকে খাটে বসাল। নাহিয়ান মায়ের গা ঘেঁষে চুপচাপ বসে রইল। আর ইলহান নিজের হাতে ধীরে ধীরে নূরাইসাকে খাইয়ে দিতে লাগল। যেন এই ছোট্ট ঘরটার ভেতরেই আবার ফিরে এল ভালোবাসা, অভিমান আর মায়ায় ভরা সেই চিরচেনা সংসার।
.
গোধূলির আকাশ আজ রক্তিম হয়ে উঠেছে।সারাদিনের অবিরাম বৃষ্টির শেষে আকাশে যেন এক অদ্ভুত মায়া ছড়িয়ে আছে। ধুয়ে-মুছে যাওয়া প্রকৃতি, ভেজা মাটির গন্ধ আর বাতাসে মিশে থাকা শীতল স্নিগ্ধতা, সব মিলিয়ে চারপাশে এক নীরব, কোমল বিষণ্নতা। বৃষ্টির পরের এই আকাশটা আফরিনের ভীষণ প্রিয়। মনে হয় যেন পৃথিবীটা একটু থেমে গেছে, ক্লান্ত দিনের শেষে প্রকৃতি নিজেই গভীর নিঃশ্বাস নিচ্ছে। সূর্য ডুবে গেছে অনেকক্ষণ। পশ্চিম আকাশে তার শেষ আলো রক্তিম রেখা এঁকে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের ভাঁজে। সেই আকাশের দিকেই অপলক তাকিয়ে বারান্দায় বসে আছে আফরিন। তার চোখে যেন আকাশের রঙ নয়, জমে আছে বহু অপ্রকাশিত প্রশ্ন, নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস আর বুকভরা এক অদৃশ্য শূন্যতা। জীবনটা এতটা বদলে না গেলে হয়তো ভালোই হতো। নুহার বেবি হবে, মাত্র তিন মাস। বাড়ির সবাই কত আনন্দে আছে। নূরাইসার ঘরেও তো ছোট্ট নাহিয়ান আছে, হাসি, কান্না, আদরে ভরা একটা প্রাণ।চারপাশে যেন মাতৃত্বের উষ্ণতা ছড়িয়ে আছে। অথচ তার নিজের জীবনে সেই আলোটা নেই। তার ভাগ্যটা এত খারাপ কেন? কি অন্যায় করেছে সে? জেনে বুঝে তো কারও কোনো ক্ষতি করেনি সে। তাহলে আল্লাহ তাকে এত বড় শাস্তি কেন দিলেন? কোন অপরাধে তাকে মাতৃত্বের সেই অনির্বচনীয় স্বাদ থেকে বঞ্চিত করা হলো? ভাবনারা একটার পর একটা এসে হৃদয়ের দরজায় ধাক্কা দিতে থাকে। বুকের ভেতর জমে ওঠে অদৃশ্য ভার। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন যে চোখের কোণে নীরব কষ্ট জমে ওঠে, সে নিজেও বুঝতে পারে না। ঠিক তখনই, হঠাৎ পেছন থেকে দুটি শক্ত, পুরুষালি হাত আলতো করে জড়িয়ে ধরল তার পেট। উষ্ণ সেই স্পর্শে আফরিনের দেহটা হালকা কেঁপে উঠল। তারপর ধীরে ধীরে সেই মানুষটা তার ঘাড়ের কাছে মুখ গুঁজে দিল। স্পর্শটা এত পরিচিত, এত আপন, যেন এই নীরব পৃথিবীতে এটুকুই তার নিরাপদ আশ্রয়। আফরিন পরম আবেশে চোখ বন্ধ করে নিল। চারপাশে তখনও ভেজা বাতাস বইছে।দূরে কোথাও বৃষ্টির শেষ ফোঁটা ছাদে টুপটাপ শব্দ তুলছে। গোধূলির শেষ আলো নিভে এসে দুজনকে ঘিরে ধরেছে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায়। কিছুক্ষণ নীরবে রইল দুজনেই। কোনো কথা নেই, তবু যেন হাজারো অপ্রকাশিত অনুভূতি বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। চোখ এখনো বন্ধ, কণ্ঠে মিশে আছে গভীর ক্লান্তি আর অদ্ভুত কোমলতা আফরিন ধীরে ধীরে বলল—
-"আমাকে বিয়ে করে আপনার আফসোস হয় না?"
কথাটা যেন খুব আস্তে, প্রায় নিঃশ্বাসের সাথে বেরিয়ে এল আফরিনের ঠোঁট থেকে। শব্দগুলো এত ক্ষীণ, যেন ভেঙে যাওয়া হৃদয়ের গোপন স্বীকারোক্তি। এমরিন কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর ক্লান্ত, শান্ত কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল—
-"কেন? আফসোস কেন হবে?"
আফরিন ধীরে চোখ মেলে আকাশের দিকে তাকাল গোধূলির লাল আভা তখন ধীরে ধীরে গাঢ় অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। তার চোখেও যেন সেই ডুবে যাওয়া আলোর মতোই জমে আছে একরাশ অব্যক্ত কষ্ট। মৃদু স্বরে বলল—
-"এই যে... আমি কোনো দিন মা হতে পারব না।আপনার জন্য কোনো দিন একটা ছোট্ট প্রাণকে পৃথিবীতে আনতে পারব না... আপনি আমার জন্য ‘বাবা’ ডাকটা শুনতে পারছেন না।"
শেষ কথাটুকু বলতেই গলাটা কেঁপে উঠল তার। যেন বহুদিন ধরে চেপে রাখা ব্যথাটা আজ শব্দ হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। এমরিন ধীরে মাথা তুলল। তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য কষ্টের ছায়া ভেসে উঠলেও পরক্ষণেই সেটা মুছে গেল দৃঢ় কোমলতায়। সে আলতো করে আফরিনকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল।
তারপর শান্ত স্বরে বলল—
-"সন্তান আল্লাহ চাইলে হবেই, কারিনো। সবকিছুর একটা সময় থাকে। আর যদি না-ও হয়..."
সে একটু থামল। তারপর কণ্ঠটা আরও নরম হয়ে এল—
-"তবুও আমার কিছুই কম পড়বে না। কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমার কাছে তোমার চেয়ে বড় কিছু নেই। আমার তুমি হলেই চলবে।"
আফরিন চোখ নামিয়ে নিল। ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ, ভাঙা একটা হাসি ফুটল, যেন সে জানে, এই কথাগুলো শুধু তাকে শান্ত করার জন্য বলা। ধীরে ধীরে বলল—
-"সেদিন যদি আমার সাথে ওইসব না হতো... তাহলে আজ আমিও আপনাকে একটা সন্তান দিতে পারতাম।"
কথাগুলো বলতেই বুকের ভেতর জমে থাকা অপরাধবোধ যেন আবার মাথা তুলল।
-"কম চিকিৎসা তো করলেন না আপনি। কত ডাক্তার, কত হাসপাতাল... বিগত পাঁচ বছর ধরে চেষ্টা করছেন। কিন্তু ফলাফল শূন্য। আপনি যতই মুখে বলুন... আমি জানি, আপনি সন্তান চান। প্রতিটা মানুষই চায়।আপনিও তার ব্যতিক্রম নন।"
এমরিন ধীরে হাত বাড়িয়ে আফরিনের থুতনিটা ধরে মুখটা উঁচু করল। আফরিন বাধ্য হয়ে তার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো অভিযোগ নেই।কোনো আফসোস নেই। আছে শুধু গভীর, অটুট ভালোবাসা। এমরিন নিচু, স্থির কণ্ঠে বলল—
-"আমি কখন বললাম সন্তান চাই না? আমি চাই।"
এমরিনের কণ্ঠে এবার অদ্ভুত এক গভীরতা। কথাগুলো ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল, যেন বহুদিনের চাপা সত্য আজ শব্দ হয়ে উঠছে।
-"আমি যেই ভালোবাসা সন্তান হিসেবে কোনো দিন পাইনি... সেই ভালোবাসা আমি আমার সন্তানকে দিতে চাই।হ্যাঁ... আমি সন্তান চাই। কারণ সন্তান আল্লাহর বড় নিয়ামত। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তোমাকে পেয়ে আমি অপূর্ণ।"
সে আঙুলের নরম ছোঁয়ায় আফরিনের চোখের কোণে জমে থাকা জল মুছে দিল।
-"শোনো কারিনো... মানুষের জীবনে অনেক কিছুই থাকে না। কারও টাকা থাকে না, কারও সুখ থাকে না, কারও ভালোবাসা থাকে না। কিন্তু আমার জীবনে তুমি আছো। আমি যে জীবনটা বাঁচছি, সেখানে তোমার জায়গাটা কোনো কিছুর সাথে তুলনা করা যায় না।সন্তান হলে ভালো লাগত, হ্যাঁ। কিন্তু তোমাকে হারিয়ে সেই সন্তান পেতে হলে আমি এক মুহূর্তও ভাবতাম না, সরাসরি না বলে দিতাম।"
সে কপালটা আলতো করে আফরিনের কপালে ঠেকাল।
-"তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি, কারিনো।"
এই কথাগুলো শুনে আফরিনের বুকটা কেঁপে উঠল।চোখের জল আর আটকাতে পারল না সে। ধীরে ধীরে এমরিনের বুকে মুখ লুকিয়ে ফিসফিস করে বলল—
-"আমি খুব খারাপ তাই না..?"
এমরিন তার মাথায় হাত রেখে নরম স্বরে বলল—
-"না... তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মানুষ। সবার আগে তুমি। তুমি ছাড়া আমি শূন্য। এক জীবনে আমি বাবা–মা পাইনি। তাই দুনিয়ার সেরা বাবা হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তাতে কি? এক জীবনে আরেকটা আশা না হয় অপূর্ণই রয়ে গেল। কিন্তু এক জীবনে তোমাকে না পেলে... আমার চলবে না, কারিনো!"
কথাগুলো শুনে আফরিন ছলছল চোখে তাকিয়ে রইল এমরিনের ক্লান্ত নীল চোখের দিকে। সেই চোখের গভীরে সে স্পষ্ট দেখতে পেল, নিজের জন্য জমে থাকা অবিরাম, নিঃশর্ত ভালোবাসা। আবেগে তার বুকটা কেঁপে উঠল। পরম আবেশে সে এমরিনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। মুখ গুঁজে দিল তার বুকের মধ্যে, যেন এই বুকটাই তার পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।এমরিনও নরম হাতে আগলে নিল নিজের অর্ধাঙ্গিনীকে। গোধূলির শেষ আলো ততক্ষণে নিভে গেছে। ভেজা বাতাসে দুজন মানুষ নীরবে জড়িয়ে রইল, একজন অপরাধবোধে ভাঙা, আরেকজন ভালোবাসায় তাকে আগলে রাখা।
কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে এমরিনের বুকে মুখ লুকিয়ে রইল আফরিন। তারপর হঠাৎ যেন মনে কোনো নতুন আলো জ্বলে উঠল তার। ধীরে ধীরে বলল—
-"আমরা একটা বাচ্চা দত্তক নিলে কেমন হয়?"
এমরিন ভ্রু কুচকে তাকাল।
-"মানে?"
আফরিনের চোখে যেন দীর্ঘদিন পর একটুখানি আলো জ্বলে উঠেছে। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল—
-"এমন অনেক বাচ্চা আছে যাদের বাবা–মা নেই। আবার অনেক বাবা–মা আছে আমাদের মতো, যাদের সন্তান নেই। আমরা যদি একজনকে নিয়ে আসি আমাদের সন্তান হিসেবে?"
তার চোখে তখন অদ্ভুত উজ্জ্বলতা।
-"আমাদের তো সন্তান নেই। ওরা বাবা–মা পাবে... আর আমরা একটা সন্তান পাবো।"
এমরিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। সে বুঝতে পারল, আফরিন একটা বাচ্চার জন্য কতটা কষ্টে আছে। তার নিজের বুকেও তো বহুদিনের এক অপূর্ণ ইচ্ছা জমে আছে। ‘বাবা’ ডাকটা শোনার আকাঙ্ক্ষা। হঠাৎ তার নিজের শৈশবের কথা মনে পড়ল। বাবা–মা থাকতে থেকেও এতিমের মতোই বড় হয়েছে সে। কোনো দিন সত্যিকারের স্নেহ, আদর, ভালোবাসা পায়নি। তাহলে যে সত্যিকারের এতিম, তার জন্য একটা পরিবার, একটা বাবা–মা পাওয়া তো সত্যিই বড় ভাগ্যের ব্যাপার। একটু ভেবে এমরিন হঠাৎ বলল—
-"কালকেই আমরা একটা বাচ্চা দত্তক নিয়ে আসব।"
তারপর ঘরের ভেতরের দিকে তাকিয়ে একটু জোরে বলল—
-"সকলেই রেডি থেকো!"
আফরিন বিস্ময়ে চোখ বড় করে ফেলল। উচ্ছ্বসিত হয়ে এমরিনের বুক থেকে মুখ তুলে বলল—
-"সত্যি?!"
এমরিন মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
-"হুম।"
তারপর একটু কাছে টেনে নিয়ে নরম স্বরে বলল—
-"এখন এদিকে এসো।"
আফরিন ভ্রু কুচকে তাকাল।
-"কেন?"
এমরিন দুষ্টু হাসল। তার চোখে তখন ক্লান্তির সঙ্গে মিশে আছে অদ্ভুত কোমল উষ্ণতা। নিচু হয়ে আফরিনের কানের কাছে ফিসফিস করে বলল—
-"আমাদের তো কাল থেকে বাবা–মা হতে হবে... তাই না?"
তারপর মৃদু হেসে যোগ করল—
-"তার আগে আমার বউটাকে একটু কাছে পেতে ইচ্ছে করছে। আমার তোমাকে খেতে ইচ্ছে করছে। আমি কি তোমায় খেতে পারি?"
আফরিন এক ঝটকায় তার দিকে তাকাল। চোখ বড় বড় হয়ে গেল লজ্জা আর বিস্ময়ে।
-"ইশ! নির্লজ্জ!"
লজ্জায় গাল লাল হয়ে উঠল তার।
-"এইভাবে কেউ বলে? আগে কথা বলা শিখুন। অসভ্য!"
কিন্তু এমরিনের মুখে বিন্দুমাত্র লজ্জা ফুটল না। বরং সে ধীরে ধীরে আরও এক পা এগিয়ে এল। তার চোখের দৃষ্টি গভীর হয়ে উঠল, শান্ত, কিন্তু তাতে জ্বলে উঠেছে অদ্ভুত এক উষ্ণতা। তার কণ্ঠটা নেমে গেল ধীর, মখমলের মতো নরম স্বরে।
-"আমার প্রিয়তমা..."
শব্দগুলো যেন খুব যত্ন করে উচ্চারণ করল সে।
-"সেই সম্মান নিয়ে... যা আমি কখনো পাওয়ার যোগ্য নই।"
সে একটু থামল। আফরিনের দিকে তাকিয়ে রইল স্থির দৃষ্টিতে।
-"সেই অনুমতি নিয়ে... যা আমি চুরি করতে চাই।"
তার কণ্ঠে তখন এক অদ্ভুত আবেশ।
-"সেই ভালোবাসা নিয়ে... যা আমাকে ভেতর থেকে জ্বালিয়ে দেয়।"
বৃষ্টিভেজা বাতাসে তার কণ্ঠ যেন আরও গভীর হয়ে উঠল।
-"আর সেই সমস্ত দুষ্টু, পাগল করা ভাবনাগুলো নিয়ে, যেগুলো আমি হাজারবার আমার মনে কল্পনা করেছি।"
সে একটু ঝুঁকে এল। দুজনের মাঝের দূরত্বটা প্রায় মিলিয়ে গেল। তারপর নিচু, গাঢ় স্বরে বলল—
-"বলুন তো... আপনাকে সম্পূর্ণভাবে নিজের করে নিতে, আপনার সমস্ত অভিমান, সমস্ত কষ্ট, সমস্ত ভাঙা টুকরোগুলো নিয়ে, আপনাকে আমার ভালোবাসায় ডুবিয়ে দিতে..."
তার চোখ তখন স্থির আফরিনের চোখে।
-"আপনার অনুমতি আছে কি, আমি কি আপনাকে আমার করে নিতে পারি?"
কথাগুলো শুনে আফরিনের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। লজ্জায় তার গাল রক্তিম হয়ে উঠল। চোখ নামিয়ে ফেলল সে। তারপর এক মুহূর্তও আর এমরিনের চোখের দিকে তাকাতে পারল না। লজ্জায়, আবেশে, অস্থিরতায়, হঠাৎ করেই সে মুখ লুকিয়ে ফেলল এমরিনের বক্ষস্থলে। এমরিন মৃদু হেসে উঠল। দু হাত দিয়ে আলতো করে জড়িয়ে নিল তাকে, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটা বুকে আগলে রেখেছে। বৃষ্টির পরের স্নিগ্ধ বাতাসে বারান্দাটা তখন নীরব। দূরে কোথাও ঝরে পড়া পানির শব্দ। আর সেই নীরবতার মাঝখানে, দুজন মানুষের হৃদস্পন্দন ধীরে ধীরে এক হয়ে গেলো।