পরদিন সকালেই আফরিন ও এমরিন বাড়ির সবাইকে নিজেদের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। কেউ দ্বিমত করেনি। বরং সবার চোখেই ছিল একরকম নীরব সমর্থন। তারা অনেক বছর ধরেই চিকিৎসা করে আসছে, একের পর এক হাসপাতাল, অসংখ্য পরীক্ষা, অসংখ্য আশার আলো, কিন্তু প্রতিবারই ফলাফল ছিল শূন্য। অবশেষে সত্যিটা মেনে নিতেই হয়েছে, আফরিন কোনোদিন মা হতে পারবে না। সেই ক্ষমতা সে হারিয়েছে সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনায়। তাই আজ, বাড়ির সবার সম্মতিতেই তারা দুজন বেরিয়ে পড়েছে একটি অনাথ আশ্রমের উদ্দেশ্যে, এক নতুন সম্পর্কের খোঁজে, এক নতুন জীবনের সম্ভাবনায়।
এদিকে নূরাইসা ও ইলহান চলে গেছে এয়ারপোর্টে।তানভীর ও রুহানকে নিয়ে আসার জন্য। আজই তো তাদের হানিমুন থেকে ফেরার কথা।
সকালের আলো তখন ধীরে ধীরে শহরের ওপর ছড়িয়ে পড়ছে। নরম রোদ গাড়ির কাঁচে এসে পড়ে যেন উষ্ণতা ছড়াচ্ছে। সেই আলো মাড়িয়েই আফরিন ও এমরিন এসে গাড়ি থামালো একটি এতিমখানার সামনে। বড় লোহার গেট, তার ওপারে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা একটি পৃথিবী, যেখানে অনেক ছোট ছোট জীবনের গল্প জমে আছে।।দুজনেই গাড়ি থেকে নেমে পড়ল।গেটের সামনে এসে আফরিন হঠাৎ এমরিনের বাহু শক্ত করে ধরে ফেলল। তার আঙুলের চাপেই বোঝা যাচ্ছিল বুকের ভেতরের অস্থিরতা। কণ্ঠটা কেঁপে উঠল—
-"আমার খুব নার্ভাস লাগছে!"
এমরিন মৃদু হাসল। খুব কোমল ভঙ্গিতে তার হাতটা নিজের হাতে চেপে ধরে বলল—
-"প্রথমবার মা হচ্ছ তো, তাই। চিন্তা করো না, সব সুন্দর ভাবেই হবে। আমি আগেই সব কথা বলে রেখেছি ইলহানের সাথে। ও সব ব্যবস্থা করে রেখেছে।এখন শুধু তুমি তোমার সন্তান বুঝে নেবে।"
আফরিনের চোখ ছলছল করে উঠল। কতদিন... কতদিন ধরে সে এই মুহূর্তটার জন্য অপেক্ষা করেছে!চারপাশে যখনই কোনো মা তার সন্তানকে কোলে নিয়ে হাঁটে, যখনই কোথাও ‘মা’ ডাকটা ভেসে আসে, তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার করে উঠত। সেই অপূর্ণতার ব্যথা তাকে প্রতিদিন একটু একটু করে পোড়াত। আজ, হয়তো সেই শূন্যতা ভরবে। আজ হয়তো কেউ তাকে ‘মা’ বলে ডাকবে। এই ভাবনাতেই তার হৃদয় কেমন উষ্ণ হয়ে উঠল। আর এক মুহূর্তও দেরি করল না তারা। ধীরে ধীরে গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। তারা যে আজ আসবে, এতিমখানার সবাই আগেই জানত। দায়িত্বে থাকা একজন কর্মচারী এগিয়ে এসে খুব আন্তরিকভাবে তাদের স্বাগত জানাল।শান্ত কণ্ঠে ধীরে ধীরে সব নিয়মকানুন বুঝিয়ে বলল।তারপর বলল—
-"চলুন, আপনাদের বাচ্চাদের দেখাই।"
তাদের নিয়ে যাওয়া হলো ভেতরের দিকে। কিছুদূর এগিয়ে যেতেই সামনে খুলে গেল একটি বিশাল খোলা মাঠ। রোদে ভেজা সেই মাঠজুড়ে ছুটে বেড়াচ্ছে অসংখ্য ছোট ছোট পা। কেউ দৌড়াচ্ছে, কেউ লাফাচ্ছে, কেউ হাসছে, কেউ আবার মাটিতে বসে খেলায় মগ্ন। বিভিন্ন বয়সের কত বাচ্চা! কিন্তু তাদের সবার মাঝেই একটা অদৃশ্য মিল আছে, তাদের কারোই বাবা-মা নেই। দৃশ্যটা দেখেই আফরিনের বুকটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল। এতগুলো নিষ্পাপ মুখ... এতগুলো ছোট ছোট জীবন... যাদের কেউ নেই পৃথিবীতে! কেউ নেই তাদের কপালে হাত রেখে আদর করার, কেউ নেই রাতে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়ার, কেউ নেই যাকে তারা ‘মা’ বলে ডাকবে। আফরিনের চোখ ধীরে ধীরে ভিজে উঠল। সে একবার এমরিনের দিকে তাকাল, তারপর আবার সেই মাঠের দিকে। মনে হলো, কাকে রেখে কাকে নেবে সে? ইস! যদি পারত... যদি সত্যিই পারত, তবে এই সবগুলো বাচ্চাকেই নিজের করে নিয়ে যেত।কিন্তু বাস্তবতা এতটা সহজ নয়। তাই তারা দুজন একটু দূরে দাঁড়িয়ে রইল। নিঃশব্দে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই দেখতে লাগল সেই ছোট ছোট মুখগুলো যেন সেই ভিড়ের মধ্যেই কোথাও লুকিয়ে আছে তাদের ভবিষ্যৎ, তাদের সন্তানের ছোট্ট হাসি।
মাঠের এক প্রান্তে, একটু দূরে, একটি পুরোনো আমগাছ দাঁড়িয়ে আছে। তার ঘন ছায়া নেমে এসেছে নরম ঘাসের ওপর। সেই ছায়ার নিচেই বসে আছে প্রায় দুই বছরের একটি ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে। অন্য বাচ্চাদের মতো সে দৌড়াচ্ছে না, খেলছে না, হাসছে না। কেউ তার সাথে খেলতেও আসেনি। যেন খেলার কোলাহলময় পৃথিবীর বাইরেই তার ছোট্ট নিঃসঙ্গ একটা জগৎ। বাচ্চাটি চুপচাপ বসে আছে। দুটো বড় বড় চোখ মেলে দূর থেকে দেখছে, অন্য বাচ্চাদের ছুটোছুটি, হাসি, আনন্দ। সেই চোখে যেন অদ্ভুত এক নীরবতা, এক ধরনের শূন্যতা। তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল একজন মহিলা, সম্ভবত কর্মরত কোনো কর্মী।হয়তো বাচ্চাটির ওপর নজর রাখার জন্যই দাঁড়িয়ে আছেন। এমরিনের চোখ হঠাৎই আটকে গেল সেই মায়াবী মুখের ওপর। সেই ছোট্ট মুখটা, সেই নির্লিপ্ত বসে থাকা, আর সবচেয়ে বেশি, চোখ দুটো। এমন শূন্যতা ভরা চোখ খুব কমই দেখা যায়। কেন যেন বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল তার। আর দেরি করল না।ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল আমগাছের দিকে। কাছে গিয়ে একটু ঝুঁকে বাচ্চাটির দিকে তাকাল। বাচ্চাটিও চুপচাপ তাকিয়ে রইল তার দিকে, কোনো ভয় নেই, কোনো কান্না নেই, শুধু বিস্ময়ভরা দুটো চোখ। এমরিন ধীরে ধীরে তাকে কোলে তুলে নিল। দুই বছরের বাচ্চা, তেমন কথা বলতে পারে না এখনও। ছোট্ট শরীরটা নির্ভার হয়ে রইল তার বুকে। বাচ্চাটি শুধু ফেলফেল করে তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে। এমরিন ঘুরে কর্মরত কর্মচারীর দিকে তাকাল। খুব শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল—
-"আমরা এই বাচ্চাটিকে নেবো!"
কথাটা শুনে যেন সময়টা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। আফরিন কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। এমরিন বাচ্চাটিকে তার কোলে তুলে দিল। আর সেই মুহূর্তেই, আফরিন জন্ম না দিয়েও সন্তানের মা হয়ে গেল।বাচ্চাটিকে বুকে জড়িয়ে ধরতেই তার বুকের ভেতর জমে থাকা কত বছরের শূন্যতা যেন এক ঝটকায় ভেঙে পড়ল। অঝোরে কাঁদতে শুরু করল সে। সেই কান্নায় ছিল অপূর্ণতার ব্যথা, দীর্ঘ অপেক্ষার ক্লান্তি, আর অবশেষে পাওয়ার অপরিসীম তৃপ্তি। সে বারবার বাচ্চাটির কপালে চুমু খেতে লাগল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। বুকের কাছে চেপে ধরে যেন হারিয়ে যাওয়া কোনো ধন ফিরে পেয়েছে। বাচ্চাটিও চুপচাপ তাকিয়ে রইল তার দিকে। ফেলফেল চোখে। হয়তো সে বুঝতে পারছে না সবকিছু। কিন্তু হয়তো এই প্রথমবার সে অনুভব করছে, মাতৃস্নেহ কাকে বলে। এরপর শুরু হলো আনুষ্ঠানিকতার পালা। কাগজপত্র, স্বাক্ষর, প্রয়োজনীয় সব ফরমালিটি শেষ করতে কিছুটা সময় লাগল। সবকিছু শেষ হওয়ার পর যখন তারা আবার সেই বড় গেটের দিকে এগিয়ে এল, তখন আফরিনের কোলে শক্ত করে জড়িয়ে আছে সেই ছোট্ট মেয়েটি।আজ তারা এখানে এসেছিল শূন্য হাতে। আর এখন, তারা ফিরছে এক নতুন জীবনের আলো নিয়ে। দুজনেই ধীরে ধীরে গাড়িতে উঠে বসল। গাড়ি ছেড়ে দিল বাড়ির উদ্দেশ্যে, একটি নতুন গল্পের শুরু নিয়ে।
.
নুহা সকাল থেকে বিহানের ওপর ভীষণ চটে আছে। নুহা অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর থেকেই বিহান তাকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করে না। সব সময় চোখে চোখে রাখে। নুহা কি করবে, কি খাবে, কখন বিশ্রাম নেবে, সবকিছুতেই তার তীক্ষ্ণ নজর। নুহার কাছে ব্যাপারটা বেশ বিরক্তিকর হয়ে উঠেছে। এই লোকটা এখন আর ঠিকমতো কাজেও যায় না।সারাদিন শুধু তার পেছনে পেছনে ঘোরে। যেন নুহা কোনো মানুষ নয়, একেবারে কাঁচের তৈরি কিছু, একটু অসাবধান হলেই ভেঙে যাবে। রিজভী এই বিষয়টা নিয়ে প্রায়ই মজা করে। সুযোগ পেলেই খোঁচা দেয়, হাসাহাসি করে। তখন নুহার মুখটা লজ্জায় লাল হয়ে যায়। কিন্তু সবচেয়ে বিরক্তিকর বিষয় হলো, শ্বশুর-শাশুড়িও ছেলেকে কিছু বলে না। উল্টো মিটিমিটি করে হাসে নুহার নাজেহাল অবস্থা দেখে। আজ দুপুরের ঘটনাটাই ধরা যাক । সকালের পর থেকেই আকাশটা কেমন মেঘলা। মাঝে মাঝে টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ পড়ছে। এমন আবহাওয়ায় নুহার হঠাৎ করেই খুব ইচ্ছে করল, একটু ঝাল ঝাল ভর্তা আর গরম খিচুড়ি খেতে। বৃষ্টির দিনে এই খাবারের স্বাদ যেন অমৃতের মতো লাগে। কিন্তু এই লোক তাকে খেতে দিলে তো! বিহানের যুক্তি, তার বাচ্চার নাকি ঝাল লাগবে। মানে ভাবা যায় এসব? এইসব কথা শুনে নুহার মাথাই গরম হয়ে গেল। রাগে গাল ফুলিয়ে নিজের ঘরে এসে বসে আছে সে। দুপুরে কিছুই খায়নি। বিহান অবশ্য থেমে থাকেনি। বারবার খাবার নিয়ে তার পিছু পিছু ঘুরেছে। কখনো বোঝানোর চেষ্টা করেছে, কখনো আদর করে খাওয়াতে চেয়েছে। কিন্তু নুহা একবারও পাত্তা দেয়নি।মুখ গোমড়া করে বসে থেকেছে। তারপর বিহান কোথায় চলে গেছে, সে খেয়ালও করেনি। এখন বেশ কিছুক্ষণ ধরে তাকে দেখা যাচ্ছে না। নুহা একবার দরজার কাছে গিয়ে উঁকি দিল। করিডোরটা ফাঁকা।কোথাও বিহানের দেখা নেই। সে আবার ফিরে এসে বিছানায় বসে পড়ল। মুখ ভার করে বসে রইল। ঠিক তখনই, বাতাসে ভেসে এল এক চেনা, লোভনীয় গন্ধ।খিচুড়ির গন্ধ। নুহা অবাক হয়ে দরজার দিকে তাকাল।কয়েক সেকেন্ড পরই দরজার সামনে এসে দাঁড়াল বিহান। হাতে একটা ট্রে। ট্রের ওপর ধোঁয়া ওঠা গরম খিচুড়ি আর পাশে সাজানো কয়েক রকম ভর্তা। নুহার জন্যই বানানো। বিহান ধীরে ধীরে ভেতরে এসে ট্রেটা তার সামনে ধরল। চোখে সেই চেনা মায়া আর মুখে মৃদু হাসি। তারপর খুব নরম গলায় বলল—
-"আমার বাচ্চার যেনো ঝাল না লাগে।"
বলেই সে খাটের ওপর বসে পড়ল। প্লেটটা কাছে টেনে নিয়ে অল্প ভর্তা দিয়ে খিচুড়ি মেখে ধীরে ধীরে নুহাকে খাইয়ে দিতে লাগল। নুহা আর কিছু বলল না। মুখে মৃদু হাসি নিয়ে চুপচাপ খেয়ে নিলো। প্রেগন্যান্সির সময় যে কত রকম মুড সুইং হয়, তা বিহান এখন ভালো করেই জানে। তাই আজ খিচুড়ি বানানোর আগে সে ডাক্তারের সাথে কথা বলেই নিয়েছে। নইলে নুহার যতই ইচ্ছে হোক, সে কখনোই তাকে ঝাল ভর্তা খেতে দিত না। নুহাকে তৃপ্তি করে খেতে দেখে বিহান মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল। সকাল থেকে মেয়েটার মুখে কোনো হাসি ছিল না। সেই মুখটাই এখন আবার আলোর মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। ভাবতেই অবাক লাগে, কত অল্পতেই মেয়েটা খুশি হয়ে যায়! খাওয়া শেষ হতেই বিহান প্লেটগুলো গুছিয়ে বাইরে রেখে এসে আবার নুহার পাশে বসলো। নুহা ধীরে ধীরে তার বুকে মাথা রেখে বলল—
-"আমি আপনাকে অনেক জ্বালাই, তাই না? বাবু আসার পর থেকে তো আরও বেশি জ্বালাচ্ছি!"
বিহান মৃদু হেসে তার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল। খুব স্নেহভরা কণ্ঠে বলল—
-"তুমি আমাকে জ্বালাবে না তো আর কাকে জ্বালাবে? আর কেউ আছে তোমার? তোমার সম্পূর্ণ অধিকার আছে আমাকে জ্বালানোর। বিশ্বাস করো নীলপদ্ম, তুমি একদিন আমাকে না জ্বালালে সেদিন আমার আর ভালো কাটে না।"
নুহা একটু নড়ে তার দিকে তাকাল। চোখে কৌতূহল আর অদ্ভুত এক কোমলতা।
-"এত ভালো কবে থেকে বাসেন আমাকে?"
বিহান কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল—
-"তুমি জানো? এই কঠিন শহরের গোধূলিতে, যেখানে সবকিছু ধোঁয়া আর ঝড়ে ভরা, সেখানে তুমিই আমার একমাত্র শান্তি, আমার ‘নীলপদ্ম’। তোমার মতো নিঃশব্দে ফুটে থাকা পদ্মের মতো, যে নীল জলের গভীরে লুকিয়ে রাখে এক অমলিন সৌন্দর্য। তুমি আমার জীবনের সেই নিঃশব্দ, অদৃশ্য ছায়া, যে ছায়া আমাকে বাঁচিয়ে রাখে।"
নুহা নিঃশব্দে মৃদু হাসল। তার কল্পনার বাইরেই ছিল এইসব কথা। সে কোনোদিন ভাবেনি, বিহান তাকে এতটা ভালোবাসতে পারে। এত গভীরভাবে অনুভব করতে পারে তাকে। আবেশে চোখ বুজে সে চুপচাপ পড়ে রইল স্বামীর বুকে। বাইরে তখন বৃষ্টির মৃদু শব্দ।আর ঘরের ভেতর ছড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত শান্তি।নুহার মনে হলো, পৃথিবীর সব শান্তি বুঝি স্বামীদের বুকেই লুকিয়ে থাকে। নইলে সেখানে মাথা রাখার পর এমন সুখসুখ অনুভূতি কেন হয়? এত প্রশান্তি কেন মিলে? মনে হয় যেন সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত ভয়, সমস্ত অনিশ্চয়তা গলে গিয়ে মিশে যায় সেই বুকে। আর সেখানে, শুধু ভালোবাসাই বেঁচে থাকে।
.
দেওয়ান বাড়িতে এখন যেন নতুন প্রাণের ছোঁয়া লেগেছে। ঘরজুড়ে এখন দুই দুটি বাচ্চার কোলাহল।নাহিয়ান তো সারাদিন রূপকথাকে নিয়েই পড়ে থাকে।বোনকে সে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করতে চায় না। কোথাও গেলে হাত ধরে নিয়ে যায়, খেলতে বসলেও পাশে বসায়, যেন সে নিজেই বোনের ছোট্ট অভিভাবক। রূপকথাও নতুন পরিবার পেয়ে ভীষণ খুশি। এতদিনের নির্জন জীবনের পর হঠাৎ করেই সে পেয়ে গেছে ভালোবাসায় ভরা একটি সংসার। সারাদিন ভাইয়ের সাথেই খেলা করে, হাসে, দৌড়ায়। মাঝে মাঝে তার খিলখিল হাসি যেন পুরো বাড়িটাকে ভরে তোলে। উপমা ও ফারাহ হানিমুন থেকে ফিরে আসার পর থেকেই বাচ্চা দুটোকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কখনো গল্প শোনাচ্ছে, কখনো খেলনা নিয়ে খেলছে, আবার কখনো দুজনকে কোলে নিয়ে আদর করছে।
আজ সকালে আবার নুহা ও বিহানও এসে হাজির হয়েছে। তাদের আসার কথা অবশ্য আগে থেকে কেউ জানত না। তবে নূরাইসা ও আফরিন জানত, তারাই দুজনকে আসতে বলেছিল। সারাদিন বাড়ি যেন এক অন্যরকম আনন্দে মেতে ছিল। রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে রূপকথা ও নাহিয়ানকে ঘুম পাড়িয়ে সবাই ছাদে উঠে এসেছে একটু আড্ডা দিতে। ছাদের ওপরে নরম রাতের বাতাস বইছে। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। আকাশজুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য তারার মৃদু আলো। ছাদের মাঝখানে একটি মাদুর বিছানো হয়েছে। সবাই গোল হয়ে বসে গল্পগুজব করছে, কখনো হাসাহাসি, কখনো পুরোনো স্মৃতি টেনে আনা। এরই মাঝে নূরাইসা হঠাৎ করে গলা খাঁকারি দিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। বললো—
-"তো আপনাদের সবাইকে এখানে ডাকার পিছে একটি কারণ আছে।"
ইলহান সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল।
-"আবার কি ফন্দি এঁটেছিস?"
আফরিন পাশ থেকে হালকা হেসে বলল—
-"ফন্দি না। আমরা দুজনে একটা প্ল্যান করেছি!"
ইলহান কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল—
-"কি প্ল্যান শুনি?"
নূরাইসা একটু গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল—
-"অনেকদিন হলো আমরা সবাই একসাথে কোথাও ঘুরতে যাইনি। তানভীর ভাই ও রুহান ভাই তো হানিমুন থেকে ফিরেছে এক মাস হয়ে গেল। তাই আমরা ঠিক করেছি, সবাই মিলে থানচি ঘুরতে যাব।"
কথাটা শেষ হতেই ছাদের ওপর কয়েক সেকেন্ডের জন্য নীরবতা নেমে এল। তারপর ইলহান একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল—
-"বেশ ঠিক আছে। কবে যেতে চাস?"
নূরাইসা বিস্মিত চোখে ইলহানের দিকে তাকিয়ে রইল। যেন হঠাৎ করেই সময় থমকে গেছে। এই মানুষটা এত সহজে রাজি হয়ে যাবে, এটা তার কল্পনারও বাইরে ছিল। সাধারণত ইলহান আগে দশটা প্রশ্ন করে, সবকিছু খুঁটিয়ে শোনে, তারপর ধীরে সুস্থে সিদ্ধান্ত নেয়। অথচ আজ, একটাও প্রশ্ন করল না! নূরাইসার সেই বিস্ময়ভরা মুখটা দেখে ইলহান যেন বিষয়টা বুঝে ফেলল। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল তার। সে ধীরে ধীরে একটু ঝুঁকে এল নূরাইসার দিকে। তাদের মাঝের দূরত্বটা যেনো অদৃশ্য হয়ে গেল। ইলহানের গভীর, স্থির দৃষ্টি গিয়ে থামল নূরাইসার চোখে। মৃদু স্বরে সে বলল—
-"তুই বললে আমার জান হাজির, নূরেজান। সেখানে তুই ঘুরতে যাবি আর আমি না করব? এত দিনেও বুঝিস নি, আমার ওপর তোর কতটা রাজত্ব?"
কথাগুলো বলার সময় তার কণ্ঠে এমন এক মমতা আর ভালোবাসার উষ্ণতা ছিল, যা নূরাইসার বুকের ভেতরটাকে অদ্ভুতভাবে কাঁপিয়ে দিল। ইলহান আলতো করে হাত বাড়িয়ে নূরাইসার কানের পাশে পড়ে থাকা এলোমেলো চুলের গোছাটা সরিয়ে দিল। সেই স্পর্শে নূরাইসার সর্বাঙ্গে যেন নীরব একটা শিহরণ বয়ে গেল। ইলহান আবার বলল—
-"তোকে না করার সাধ্য এই নুহান ইলহান দেওয়ানের কোনো কালেই ছিল না, আর না তো কোনো কালে হবে। তোর ইচ্ছে, আমার কাছে আদেশের মতো। তুই যা বলবি, আমি তাই করব। কারণ তোর হাসিটা আমার কাছে পৃথিবীর সবকিছুর চেয়েও দামি।"
নূরাইসা নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে। বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে নরম হয়ে আসছে। ইলহান এবার আরেকটু কাছে ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে বলল—
-"নূরেজান, তুই হয়তো বুঝিস না। তোর একটা ইচ্ছের কাছে আমার সব যুক্তি হেরে যায়। তোর জন্য আমি সব করতে পারি, আর দরকার হলে পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে পারি।"
কথা শেষ করেই ইলহান নূরাইসার কপালে খুব আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। সেই ক্ষণিক স্পর্শে নূরাইসার চোখ অনিচ্ছায় বুজে এলো। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে লাজুক এক হাসি ফুটে উঠল, যেন এই পৃথিবীতে সবচেয়ে নিরাপদ জায়গাটা সে খুঁজে পেয়েছে ঠিক ইলহানের বুকের কাছেই। চারপাশে তখন নীরবতা। কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরেও দুজনের হৃদস্পন্দন যেন এক অদৃশ্য সুরে বাঁধা পড়ে আছে। নূরাইসার লাজুক মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে ইলহান বললো—
-"অষ্টপ্রহরের নীরবতায় তুমি আমার প্রার্থনা, অবসন্ন হৃদয়ের একফোঁটা জ্যোৎস্না তুমি। প্রেমের অনলজ্বালা জুড়ানো শীতল বৃষ্টি তুমি, এই আকুল আত্মার একমাত্র আশ্রয় তুমি।"
কথাগুলো বলার সময় ইলহানের চোখে ছিল একরাশ দুষ্টু মায়া। নূরাইসা মুহূর্তেই লজ্জায় লাল হয়ে গেল।এমন খোলামেলা স্বীকারোক্তি সে সবার সামনে আশা করেনি। মাথা একটু নিচু করে ফেলল সে। চারপাশে বসে থাকা সবাই হালকা কেশে উঠল, কেউ মুখ চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে, কেউ আবার মুচকি মুচকি হাসছে। শেষ পর্যন্ত বিহান আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ঠোঁট বাঁকিয়ে ব্যঙ্গের সুরে বলল—
-"ছোট ভাইবোন, বোনজামাই, সবাই তো এখানে বসে আছে। একটু তো সামলে কথা বল ভাই!"
ইলহান ভ্রু তুলে বিহানের দিকে তাকাল। তারপর একদম নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল—
-"কেন? তোদের বউ নেই? তোরা কি তোদের বউয়ের সাথে রোমান্স করিস না? আমার রোমান্সে বাম হাত ঢুকানোর স্বভাবটা তোর কোনো কালেই গেল না।"
কথাটা শেষ হতেই ছাদজুড়ে উচ্চস্বরে হাসির রোল পড়ে গেল। নুহা হাসতে হাসতে মাথা নাড়ল, আফরিন মুখ চেপে হাসছে, আর তানভীর ও রুহান তো একেবারে হেসে গড়িয়ে পড়ার অবস্থা। এই হাসি-ঠাট্টার মাঝেই রাতটা যেন আরও আপন হয়ে উঠল। ছাদের ওপরে নরম বাতাস বইছে, আকাশভরা তারা নীরবে তাকিয়ে আছে, আর নিচে একদল মানুষ, যারা শুধু সম্পর্কের বন্ধনে নয়, ভালোবাসা আর বন্ধুত্বের অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা।
.
পরের দিন ভোরবেলা থেকেই দেওয়ান বাড়িতে এক ধরনের উৎসবমুখর ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল। ঘুম ঘুম চোখে একে একে সবাই জেগে উঠল। কেউ ব্যাগ গুছাচ্ছে, কেউ বাচ্চাদের কাপড় ঠিক করছে, কেউ আবার তাড়াহুড়ো করে সকালের নাস্তা শেষ করছে।আকাশ তখনও পুরোপুরি উজ্জ্বল হয়ে ওঠেনি। ভোরের নরম আলো ধীরে ধীরে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে।উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িগুলো যেন অপেক্ষা করছিল, একটা নতুন ভ্রমণের গল্প শুরু করার জন্য।রূপকথা ও নাহিয়ান তো সবচেয়ে বেশি উত্তেজিত।নাহিয়ান বারবার বলছে—
-"আমলা পাহালে যাবো! পাহালে যাব!"
রূপকথাও তার ভাইয়ের হাত ধরে লাফাচ্ছে। নতুন জায়গা, নতুন অভিজ্ঞতা, সবকিছুই যেন তাদের ছোট্ট পৃথিবীটাকে আরও রঙিন করে তুলেছে। শেষমেশ সব গুছিয়ে, সবাই গাড়িতে উঠে বসল। একে একে গাড়িগুলো দেওয়ান বাড়ির গেট পেরিয়ে বেরিয়ে পড়ল থানচির উদ্দেশ্যে। শহরের ব্যস্ত রাস্তা ধীরে ধীরে পিছনে পড়ে যেতে লাগল। উঁচু দালান, গাড়ির হর্ন, মানুষের ভিড়, সবকিছু যেন দূরে সরে গেল। তার জায়গায় আসতে লাগল সবুজের সমারোহ। রাস্তার দুই পাশে বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত, মাঝে মাঝে ছোট ছোট গ্রাম, টিনের চালওয়ালা ঘর, উঠোনে শুকাতে দেওয়া ধান আর কাপড়। কোথাও গরু চরছে, কোথাও বাচ্চারা মাঠে খেলছে। গাড়ির ভেতরে হাসি, গল্প, গান, সব মিলিয়ে পুরো যাত্রাটা যেন এক চলমান আনন্দে ভরে উঠল।কখনো সবাই মিলে পুরোনো গান ধরছে, কখনো আবার কেউ কাউকে খোঁচা দিচ্ছে। নাহিয়ান জানালার পাশে বসে মুগ্ধ চোখে বাইরে তাকিয়ে আছে। মাঝে মাঝে চিৎকার করে বলছে—
-"দেখো! পাহাল! পাহাল!"
সত্যিই দূরে দূরে ধূসর-সবুজ পাহাড়ের রেখা চোখে পড়তে শুরু করেছে। রাস্তা যত সামনে এগোতে লাগল, প্রকৃতিও যেন ততটাই বদলে যেতে লাগল। সমতল ভূমির জায়গায় ধীরে ধীরে উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ শুরু হলো। রাস্তা কখনো উপরে উঠছে, কখনো নিচে নামছে, আবার কোথাও সরু হয়ে গিয়ে পাহাড়ের গা ঘেঁষে এগিয়ে চলেছে। পথের ধারে ছোট ছোট ঝরনা, বুনো গাছপালা আর পাহাড়ি ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে বাতাসে। দীর্ঘ যাত্রার পর যখন তারা থানচির কাছাকাছি পৌঁছাল, তখন বিকেলের আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে এসেছে। চারপাশের দৃশ্য যেন একেবারে বদলে গেছে। চারদিকে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। সবুজে ঢাকা ঢেউ খেলানো পাহাড়গুলো যেন দূর থেকে হাতছানি দিচ্ছে। কোথাও পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে সরু ঝরনা, কোথাও আবার মেঘ এসে জড়িয়ে আছে পাহাড়ের চূড়ায়। এই অপরূপ দৃশ্য দেখতে দেখতে তারা অবশেষে হোটেলের সামনে এসে পৌঁছাল। হোটেলটি পাহাড়ের ঢালে তৈরি, খুব বড় নয়, কিন্তু অপূর্ব সুন্দর। কাঠ আর ইটের মিশ্রণে বানানো ছোট্ট কিন্তু নান্দনিক একটি ভবন। সামনে ছোট্ট বাগান, সেখানে কয়েকটি পাহাড়ি ফুল ফুটে আছে। হোটেলের সামনে দাঁড়াতেই ঠান্ডা, সতেজ বাতাস এসে মুখে লাগল। দূরে নিচে দেখা যাচ্ছে সাঙ্গু নদী, রূপালী ফিতের মতো বয়ে চলেছে পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে। তার ওপরে ঝুঁকে আছে সবুজ পাহাড়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সবাই একটু ক্লান্ত হলেও চোখে-মুখে স্পষ্ট আনন্দের ছাপ। গাড়ি থেকে নেমেই নাহিয়ান চিৎকার করে উঠল—
-"ওই দেখো পাহাল!"
রূপকথাও হাততালি দিয়ে হাসতে লাগল। নূরাইসা, আফরিন, নুহা, উপমা ও ফারাহ্, সবাই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে চারপাশের দৃশ্য দেখল। শহরের কোলাহল থেকে এত দূরে এসে এই নির্জন, শান্ত সৌন্দর্য যেন তাদের মনকে মুহূর্তেই হালকা করে দিল।এরপর সবাই নিজেদের ব্যাগ নিয়ে হোটেলের ভেতরে ঢুকে পড়ল। একটি নতুন জায়গা, নতুন অভিজ্ঞতা, আর সামনে অপেক্ষা করছে, আরও অনেক অজানা, সুন্দর মুহূর্ত।