সূর্যস্নাত ভালোবাসা

পর্ব - ৬১

🟢

নূরাইসার গর্ভাবস্থার সপ্তম মাস চলছে। পূর্ণতার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলা মাতৃত্ব তার শরীরজুড়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় সাজেকে আসার কথা শুনে বাড়ির কেউই তাকে অনুমতি দিতে চায় নি। কিন্তু নূরাইসা বরাবরের মতোই জেদি। একবার কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে তাকে ফেরানো কঠিন।ইলহানের ব্যবসায়িক একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল সাজেকে। সে একাই আসতে চেয়েছিল। কিন্তু নূরাইসা কিছুতেই তাকে একা আসতে দিল না। যেখানে ইলহান যাবে, সেখানেই সে যাবে। অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর থেকেই নূরাইসার মেজাজে ঋতুর মতোই অদ্ভুত পরিবর্তন এসেছে। কখনো সে সীমাহীন আনন্দে ভেসে যায়, কখনো অকারণ বিষণ্নতায় ডুবে থাকে। মুহূর্তেই ক্রোধে অন্ধ হয়ে ওঠে, আবার সামান্যতেই চোখ ভিজে যায় কান্নায়। এই সব অনুভূতির ভিড়ে তার আরেকটি নতুন অভ্যাস জন্ম নিয়েছে, ইলহানকে প্রচণ্ড সন্দেহ করা। তুচ্ছ থেকে তুচ্ছ বিষয় নিয়েও সে ঝগড়া বাধিয়ে ফেলে। বাড়ির সবাই হাজার বুঝিয়েও তাকে শান্ত করতে পারে না। অবশ্য তার এই অস্থিরতার পেছনেও একটি কারণ রয়েছে। ইলহানের অফিসে কিছুদিন আগে নতুন একজন ইন্টার্ন যোগ দিয়েছে, একজন মেয়ে। বিয়ের পর থেকে অসংখ্য নারী নানা অজুহাতে ইলহানের কাছে আসার চেষ্টা করেছে, কেউ তার দুর্বলতার সুযোগ নিতে চেয়েছে, কেউ আবার ইচ্ছে করেই তাদের সম্পর্কের মাঝে অশান্তি সৃষ্টি করতে চেয়েছে। সেই অভিজ্ঞতাগুলো নূরাইসার মনে অদৃশ্য এক ভয় গেঁথে দিয়েছে। সে ভীষণ সংবেদনশীল মেয়ে। যতই নিজেকে শক্ত দেখাক, ভালোবাসার মানুষটিকে হারানোর আশঙ্কা তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খায়।বাবা-চাচার ব্যবসার পাশাপাশি নিজের আলাদা ব্যবসাও তাকেই সামলাতে হয়। অন্যদিকে বিহানের অবস্থাও প্রায় একই। তবে নুহা নবজাতক সন্তানকে নিয়েই এতটা ব্যস্ত থাকে যে, বিহানের দিকে আলাদা করে খুব একটা খেয়াল রাখতে পারে না। কিন্তু নূরাইসা সম্পূর্ণ ভিন্ন। নাহিয়ানের এখন চার বছর বয়স। তিন মাস আগেই পরিবারের সবাই মিলে তার জন্মদিন পালন করেছে। তাদের কাছে জন্মদিন মানেই আড়ম্বর নয়; অনাথ শিশুদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া, নতুন জামাকাপড় উপহার দেওয়া আর মিলাদের আয়োজন।নাহিয়ান সারাদিন রূপকথাকে নিয়ে খেলাধুলায় মেতে থাকে। বাড়ির অন্যরাই তাকে সামলে নেয়। নূরাইসা শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় কেউ তাকে বিরক্ত করে না। আর এই অঢেল অবসর সময়ই তার ভাবনাগুলোকে আরও অস্থির করে তোলে। এই তো, মাত্র দুদিন আগের ঘটনা। অফিস থেকে ফিরতে ইলহানের স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি দেরি হয়ে গিয়েছিল। আর তাতেই নূরাইসার সে কী চোটপাট!

দুই দিন আগে—

রাত তখন প্রায় তিনটা। চারপাশে নেমে এসেছে গভীর নিস্তব্ধতা। দূরের কোথাও মাঝেমধ্যে কুকুরের ক্ষীণ ডাক ভেসে আসছে। নূরাইসার চোখে ঘুমের লেশমাত্র নেই। ইলহান এখনো বাড়ি ফেরেনি। দুশ্চিন্তায় তার মাথাটা ভারী হয়ে এসেছে। ছেলেকে অনেক আগেই খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে সে। বিছানায় নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা শিশুটির দিকে তাকালেই বুকের ভেতরটা আরও কেঁপে ওঠে। ছয় বছর আগে যে ভয়াবহ বিপর্যয় তাদের জীবনে নেমে এসেছিল, তার ক্ষত আজও শুকায়নি। সেই ঘটনার দাগ নূরাইসার মনে এমন গভীরভাবে গেঁথে আছে যে সামান্য কিছুতেই বুকের ভেতর অজানা আশঙ্কা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, এই বুঝি আবার কারও কিছু হয়ে গেল! তার ওপর এখন সে অন্তঃসত্ত্বা। মাতৃত্বের কোমল অনুভূতির সঙ্গে মিশে গেছে অকারণ ভয়, অস্থিরতা আর প্রিয় মানুষটিকে হারানোর আতঙ্ক। ঘরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ধীর পায়ে পায়চারি করছিল সে। ঠিক তখনই দরজার লক খোলার শব্দ ভেসে এলো। পরমুহূর্তেই দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল ইলহান। এত রাতে নূরাইসাকে জেগে থাকতে দেখে সে বিস্ময়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। সারাদিনের ক্লান্তি তার সমগ্র অবয়বে স্পষ্ট হয়ে ফুটে আছে। তবু নরম স্বরে এগিয়ে এসে বলল—

-"এখনো জেগে আছিস? শরীর খারাপ করবে তো, নূরেজান!"

নূরাইসা এতক্ষণ ধরে বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত দুশ্চিন্তা এক মুহূর্তে অভিমানে রূপ নিল। ক্ষিপ্ত কণ্ঠে সে বলল—

-"কোথায় ছিলেন আপনি এত রাত পর্যন্ত? এত দেরি হলো কেন আসতে?"

ইলহান কোনো উত্তর না দিয়ে ধীরেসুস্থে গায়ের ব্লেজার খুলে সোফার ওপর রাখল। তারপর নিঃশব্দে ছেলের কাছে গিয়ে তার কপালে আলতো করে একটি চুমু খেল। সেই মুহূর্তটুকু ক্লান্ত এক বাবার সারাদিনের সমস্ত অবসাদকে মুহূর্তের জন্য দূরে সরিয়ে দিল। এরপর সে এগিয়ে এলো নূরাইসার সামনে। অক্লান্ত পরিশ্রমের ছাপ তার শ্যামলা মুখজুড়ে স্পষ্ট। চোখের নিচে ক্লান্তির রেখা, তবু প্রিয়তমার সামনে এসে সে বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। দু'হাত বাড়িয়ে আলতো করে জড়িয়ে ধরল নূরাইসার সাত মাসের স্ফীত উদর।সীমাহীন মমতায় সেখানে একটি চুমু এঁকে দিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে কপাল ঠেকিয়ে রইল। মুহূর্তেই নূরাইসার সমস্ত রাগ গলে জল হয়ে গেল। অভিমান, অভিযোগ, সবকিছু মিলিয়ে রইল শুধু একরাশ ভালোবাসা। ইলহান ধীরে ধীরে উঠে তাকে সাবধানে সোফায় বসিয়ে দিল। তারপর মৃদু হেসে বলল—

-"অফিসের অনেক কাজ ছিল, নূরেজান। দুটো অফিসের সব কাজ এখন আমাকে আর বিহানকে সামলাতে হচ্ছে। নতুন একটা প্রজেক্ট এসেছে। সেটার জন্যই এত ব্যস্ততা।"

নূরাইসা গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার ক্লান্ত মুখের দিকে। সত্যিই মানুষটা অনেক পরিশ্রম করছে। রুহান আর্মিতে চলে গেছে, উপমাও নেই। ফলে ব্যবসার প্রায় সমস্ত দায়িত্ব এখন ইলহানের কাঁধেই এসে পড়েছে।নীরবে হাত বাড়িয়ে সে ইলহানের মুখটা নিজের দিকে টেনে আনল। তারপর তার কপালে আলতো করে একটি চুমু এঁকে দিল। ইলহান চোখ দুটো বন্ধ করে নিল। সেই ক্ষুদ্র স্পর্শেও সারাদিনের সমস্ত ক্লান্তি এক নিমেষে প্রশান্তিতে বদলে গেল। নূরাইসা ধীর কণ্ঠে বলল—

-"চলুন, আপনাকে খাবার বেড়ে দিচ্ছি।"

ইলহান মাথা নেড়ে মৃদু হেসে বলল—

-"প্রয়োজন নেই। আমি নিয়ে খাব। তুই অসুস্থ। শুয়ে পড়, আমি ফ্রেশ হয়ে খেয়ে আসছি।"

নূরাইসা সঙ্গে সঙ্গেই আপত্তি জানাল—

-"না, না। আমি খাবার গরম করে দিচ্ছি। আপনি ফ্রেশ হয়ে আসুন।"

ইলহান স্নেহমাখা চোখে তার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল—

-"কথা শোন, জান। আমার ফুলের কষ্ট হবে তো!"

নূরাইসা শেষ পর্যন্ত হার মেনে নিল। নাহিয়ানকে জন্ম দেওয়াটাই ছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি। তখনই চিকিৎসক স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছিলেন, আর কখনো সন্তান নেওয়ার চেষ্টা না করাই ভালো। কারণ পরবর্তী গর্ভধারণ তার জীবনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু ভাগ্যের লিখন কে খণ্ডাবে? মহান আল্লাহ আবারও তাদের কোল ভরিয়ে দিয়েছেন নতুন প্রাণের আগমনের সুসংবাদে। তবে এবার পরিস্থিতি আগের মতো নয়। নাহিয়ানের সময় এতটা অসুস্থ না হলেও এবার শরীরটা আর কোনোভাবেই তাকে স্বস্তি দিতে চাইছে না। একদিন সামান্য ভালো থাকলে পরের দুদিনই অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাই তাকে ঘিরে সবার সতর্কতা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। বাড়ির প্রত্যেকটি মানুষ তাকে চোখে চোখে রাখে, সামান্য অসাবধানতারও সুযোগ দেয় না। আর এই এক বিষয়েই নূরাইসা কারও সঙ্গে তর্কে জড়াতেও পারে না। ইতিমধ্যেই ফ্রেশ হয়ে ফিরে এসেছে ইলহান। সোফার ওপর নূরাইসাকে মলিন মুখে বসে থাকতে দেখে তার বুকের ভেতরটা হালকা মোচড় দিয়ে উঠল। নিঃশব্দে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে এগিয়ে গেল। কোনো পূর্বাভাস না দিয়েই নূরাইসাকে পাঁজাকোলে তুলে নিল। হঠাৎ এমন কাণ্ডে নূরাইসা ভড়কে গিয়ে তাড়াতাড়ি তার শার্টের কলার শক্ত করে খামচে ধরল। ইলহান নির্বিকার। ধীর পায়ে নিচে নেমে এসে ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে তাকে যত্ন করে বসিয়ে দিল। তারপর ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে গরম করল। সবকিছু সাজিয়ে নিয়ে নূরাইসার পাশেই বসে পড়ল। এক হাতে ভাত মেখে নিজে খাচ্ছে, আর অন্য হাতে এক লোকমা করে নূরাইসার মুখেও তুলে দিচ্ছে।নিঃশব্দ, শান্ত সেই মুহূর্তে হঠাৎই ইলহান বলে উঠল—

-"আমাকে সাজেক যেতে হবে প্রজেক্টের কাজে।"

কথাটা শুনেই নূরাইসা থমকে গেল। মুখের সামনে ধরা লোকমাটিও আর নিল না সেইলহান তার দিকে তাকিয়ে রইল। নূরাইসা দৃঢ় স্বরে বলে উঠল—

-"আমিও যাব সঙ্গে।"

-"তুই এই অবস্থায় কীভাবে যাবি?"

-"কেন? আমাকে নিলে সমস্যা? ওই ইন্টার্নকে নিয়ে যাবেন তাই না? আমাকে এখন আর ভালো লাগে না, না? আমি অসুন্দর হয়ে গেছি। আমার পেট বড় হয়ে গেছে। শরীরে স্ট্রেচ মার্ক পড়েছে। আমাকে এখন আর ভালোবাসেন না... আমি বুঝি তো!"

কথাগুলো বলতে বলতেই নূরাইসা ভীষণ অস্থির হয়ে উঠল। তার শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয়ে আসছে। আবেগের তীব্রতায় সে নিজেকেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।ইলহান জানে, এই অবস্থায় এমন উত্তেজনা তার শরীরের জন্য একেবারেই ভালো নয়। তাই আর এক মুহূর্তও দেরি না করে তড়িঘড়ি করে বলে উঠল—

-"বেশ, নিয়ে যাব তোকে। শান্ত হ।"

ধীরে ধীরে নূরাইসার উত্তেজনা কমে এলো। মুখের অভিমানটাও একটু একটু করে মিলিয়ে গেল।

আর এখন...

সে বসে আছে সাজেকের এক স্বনামধন্য কটেজের জানালার ধারে। বাইরে বর্ষার মেঘ পাহাড় ছুঁয়ে ভেসে যাচ্ছে। কখনো সাদা তুলোর মতো মেঘ এসে জানালার সামনে থেমে যাচ্ছে, আবার মুহূর্তেই বাতাসের ডানায় ভর করে মিলিয়ে যাচ্ছে দূর অরণ্যের বুকে। চারপাশে বৃষ্টিভেজা পাহাড়, সবুজের অফুরন্ত বিস্তার আর কুয়াশার নরম চাদরে মোড়ানো এক স্বপ্নিল সন্ধ্যা।বাড়ির সবার নিষেধ অগ্রাহ্য করেই ইলহান শেষ পর্যন্ত নাহিয়ান আর নূরাইসাকে নিয়ে সাজেকে এসেছে।তবে শর্তও দিয়েছে কঠিন। নূরাইসা একা একা রুমের বাইরেও যেতে পারবে না। প্রয়োজন হলে ইলহান নিজেই তাকে নিয়ে যাবে। তার অনুপস্থিতিতে দরজার বাইরেও পা রাখা নিষেধ। এমনকি নিজের ব্যক্তিগত সহকারীকে পর্যন্ত সঙ্গে নিয়ে এসেছে সে, যাতে নাহিয়ানকে দেখাশোনা করা যায়, তার সঙ্গে সময় কাটানো যায়, আর প্রয়োজনে তাকে নিয়ে বাইরে ঘুরে আসা যায়। এই বর্ষার মৌসুমে সাজেক এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ। তার ওপর নূরাইসা অন্তঃসত্ত্বা। তাই কোনো রকম ঝুঁকি নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। জানালার পাশে বসে উড়ে যাওয়া মেঘগুলোর দিকে চুপচাপ তাকিয়ে রইল নূরাইসা। আজ নিজের করা সেই একরোখা জেদটার কথাই বারবার মনে পড়ছে তার। দূরের পাহাড়গুলো কুয়াশার নরম চাদরে একে একে আড়াল হয়ে যাচ্ছে। জানালার ওপাশে ভেসে বেড়ানো মেঘগুলো যেন হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলা যায়।নূরাইসা মগ্ন হয়ে সেই দৃশ্য দেখছিল। হঠাৎই তার ভাবনার সুতো ছিঁড়ে দিল এক পরিচিত, মিষ্টি ডাক—

-"মা...?"

পেছন ফিরে তাকাতেই তার ঠোঁটে আপনাআপনি হাসি ফুটে উঠল। গোলগাল গাল, এলোমেলো চুল আর মুখভরা নিষ্পাপ হাসি নিয়ে ছোট্ট নাহিয়ান দাঁড়িয়ে আছে। চোখ দুটো আনন্দে টলমল করছে। নূরাইসা দুই হাত বাড়িয়ে দিতেই নাহিয়ান ছোট্ট ছোট্ট পায়ে দৌড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল মায়ের বুকে। নূরাইসা তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আঙুলগুলো ছেলের নরম চুলে বিলি কাটতে লাগল। তারপর কপালে স্নেহভরা একটি চুমু এঁকে মৃদু হেসে বলল—

-"আমার বাবাটা আজ কোথায় কোথায় ঘুরেছে?"

নাহিয়ান উৎসাহে চোখ বড় বড় করে বলল—

-"আমি আজ বাবার অফিচে গেছি! অনেক বড় বড় পাহাড় দেছি। বৃষ্টি দেছি। মেঘ আচ্ছে... এই এত কাছে! আর হিদয় আংকেল আমায় অনেক চকলেট দিছে!"

নূরাইসা মুগ্ধ হয়ে ছেলের কথা শুনছিল। মৃদু হেসে আবার জিজ্ঞেস করল—

-"তাই নাকি? তোমার বাবা অফিসে কী করছিল?"

নাহিয়ান খুব গম্ভীর মুখ বানিয়ে বলল—

-"বাবা কাজ কছিল। অনেক কাজ! তারপর বলল, 'নাহি, তুমি হোটেলে যাও। মা আর বাবুকে দেখো।' তাই আমি হিদয় আংকেলরে নিয়ে চলে আচ্ছি। তোমরা তো একা ছিলা... যদি কিচ্ছু হয়!"

শেষ কথাটা বলার সময় তার ছোট্ট মুখে এমন দায়িত্বশীল ভাব ফুটে উঠল যে নূরাইসার বুকটা ভালোবাসায় ভরে গেল। সে আদর করে ছেলের নাকটা টিপে দিয়ে আল্লাদী গলায় বলল—

-"তাই নাকি? আমার বাবাটা তাহলে মাকে রক্ষা করতে চলে এসেছে?"

নাহিয়ান সঙ্গে সঙ্গে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াল। ছোট্ট মাথাটা জোরে জোরে নাড়িয়ে বলল—

-"হুম! আমি তো বড় ছেলে!"

পরক্ষণেই সে নিচু হয়ে মায়ের গোল হয়ে ওঠা পেটে আলতো করে একটা চুমু খেল। তারপর ফিসফিস করে বলল—

-"বাবু... আমি আচ্চি। তুমি বয় পেও না। আমি আছি। তুমি তাড়াতাড়ি বের হইয়া আসো। আমরা অনেক খেলব।"

কথাগুলো শুনে নূরাইসার চোখ অনিচ্ছাতেই ভিজে উঠল। মাতৃত্বের এমন ছোট ছোট মুহূর্তই জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। ঠিক তখনই দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল ইলহান। এক হাতে খুলে রাখা ব্লেজার ঝুলছে, অন্য হাতে কয়েকটি শপিং ব্যাগ। সারাদিনের ব্যস্ততার ছাপ মুখে থাকলেও ঘরে ঢুকেই মা-ছেলের দৃশ্যটা দেখে তার ক্লান্ত চোখে নরম এক প্রশান্তি নেমে এল। দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েই ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল—

-"বাবাকে বাদ দিয়েই এত আদর-যত্ন চলছে?"

বাবার কণ্ঠ শুনেই নাহিয়ান আনন্দে চিৎকার করে উঠল—

-"বাবাআআ!"

ছোট্ট পা দুটো দুলিয়ে দৌড়ে গেল সে। ইলহানও অপেক্ষা করল না। দুহাত বাড়িয়ে ছেলেকে মাঝপথেই লুফে নিল। তারপর শূন্যে তুলে কয়েকবার ঘুরিয়ে দিল।পুরো কটেজ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল নাহিয়ানের খিলখিল হাসি। সেই হাসির শব্দ পাহাড়ি সন্ধ্যার নিস্তব্ধতাকেও প্রাণবন্ত করে তুলল। নূরাইসা ধীরে ধীরে উঠে তাদের দিকে এগিয়ে এল। চোখে-মুখে একরাশ তৃপ্তি। মৃদু বিস্ময়ে বলল—

-"এত তাড়াতাড়ি চলে এলেন? গতকালই তো আমরা এলাম। আজ তো আপনার কাজের চাপ আরও বেশি থাকার কথা ছিল।"

ইলহান ছেলেকে নিচে নামিয়ে দিল। পকেট থেকে একটা বড় চকলেট বের করে তার হাতে দিয়ে বলল—

-"যাও বাবা, খেলো। তবে বেশি দূরে না।"

বিজ্ঞাপন

-"আচ্ছা!"

বলেই নাহিয়ান আনন্দে লাফাতে লাফাতে পাশের ঘরে চলে গেল। ছেলের চলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করল ইলহান। ঘরটা আবার নিঃশব্দ হয়ে আসতেই সে ধীরে ধীরে নূরাইসার সামনে এসে দাঁড়াল। এক মুহূর্তও দেরি না করে তাকে নিজের বুকের ভেতর টেনে নিল। দিনভর ব্যস্ততা, মিটিং, দায়িত্ব, সবকিছুর পর এই মানুষটাকে বুকে জড়িয়ে ধরাই তার সবচেয়ে বড় বিশ্রাম। নূরাইসাও কোনো বাধা দিল না। নিঃশব্দে মাথাটা ইলহানের প্রশস্ত বুকে রেখে চোখ বন্ধ করে ফেলল। পরিচিত সেই সুগন্ধ, উষ্ণ বুকের স্পন্দন আর নিরাপদ আশ্রয়ের অনুভূতিতে সারাদিনের সমস্ত শূন্যতা মিলিয়ে যেতে লাগল। ইলহানের বড় হাতটা আলতো করে তার পিঠ বেয়ে নেমে এলো। আরেকটি হাত সযত্নে এসে থামল নূরাইসার স্ফীত উদরের ওপর। সেখানে মমতাভরা স্পর্শ রেখে সে কপাল ঝুঁকিয়ে নূরাইসার মাথায় একটি দীর্ঘ চুমু খেল। গভীর, রাশভারী অথচ অদ্ভুত কোমল কণ্ঠে বলল—

-"আমার বউ সারাদিন একা একা হোটেলে থাকবে আর আমি কাজ করব? কখনোই না। সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করব, তারপর পুরো সময়টা তোকে নিয়েই থাকব। এই বর্ষার মৌসুমে তোকে নিয়ে বাইরে যাওয়াটাই ঝুঁকিপূর্ণ। তাই আমরা চারজন হোটেলেই বসে সময় কাটাব।"

কথাগুলো শুনে নূরাইসার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই নরম হয়ে এলো। এই মানুষটা কখনো বড় বড় ভালোবাসার কথা বলে না। কিন্তু প্রতিটি ছোট ছোট যত্নে, প্রতিটি সিদ্ধান্তে, প্রতিটি নিষেধে সে প্রতিদিন নতুন করে ভালোবাসার সংজ্ঞা লিখে দেয়। নীরবে এগিয়ে এসে সে মাথাটা ইলহানের বুকে ঠেকিয়ে রাখল। ইলহানও কিছু বলল না। শুধু আলতো করে তাকে আরও একটু নিজের কাছে টেনে নিল। তার থুতনি এসে ঠেকল নূরাইসার মাথায়। দুজনেই কিছুক্ষণ নিশ্চুপ। বাইরে টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ, আর ভেতরে একে অপরের হৃদস্পন্দন, মুহূর্তটা ভাষারও ঊর্ধ্বে। হঠাৎই ইলহানের কিছু মনে পড়ল। সে নূরাইসাকে ছেড়ে পাশে রাখা প্যাকেটটা হাতে নিয়ে আবার তার সামনে এসে দাঁড়াল।

-"এর মধ্যে একটা শাড়ি আছে। পরে আয়।"

নূরাইসা ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল। কী হচ্ছে কিছুই বুঝল না। তবুও আর প্রশ্ন করল না। প্যাকেটটা নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল। এদিকে ইলহানও পোশাক বদলে ফেলেছে। নিজের গায়ে কালো রঙের শার্ট আর ব্লেজার। একই রঙের ছোট্ট শার্ট পরিয়ে দিয়েছে নাহিয়ানকেও। এখন ছেলের এলোমেলো চুলগুলো যত্ন করে আঁচড়ে দিচ্ছে। ঠিক তখনই দরজা খুলে বেরিয়ে এলো নূরাইসা। এক মুহূর্তের জন্য যেন সময় থমকে গেল। সিঁদুর লাল শাড়িতে মোড়ানো নূরাইসাকে অপার্থিব সুন্দর লাগছে। ফর্সা মুখে মাতৃত্বের কোমল আভা আরও উজ্জ্বল হয়ে ফুটে উঠেছে। সাত মাসের স্নিগ্ধ বেবি বাম্প শাড়ির ভাঁজে স্পষ্ট হয়ে আছে। খোলা চুলগুলো কাঁধ ছাপিয়ে নেমে এসেছে কোমর পর্যন্ত। ক্লান্তির জন্য ভারী গয়না পরেনি। ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক, চোখে একটুখানি কাজল, এই সামান্য সাজেই সমস্ত সৌন্দর্য এসে ধরা দিয়েছে। বাবা-ছেলে দুজনেই তার দিকে তাকিয়ে রইল। দুজনেরই পলক ফেলতে মনে রইলো না। কিন্তু সেই দৃষ্টির অর্থ নূরাইসা বুঝতে পারল না। বরং তার বুকের ভেতর আবারও সেই পুরোনো অস্বস্তিটাই ফিরে এলো। গর্ভধারণের পর থেকে আয়নাটা তার সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন নিজের শরীরটাকে একটু একটু করে বদলে যেতে দেখেছে সে। কোমরের গড়ন হারিয়েছে, পেট গোল হয়ে উঠেছে, ত্বকে স্ট্রেচ মার্কের সূক্ষ্ম দাগ ফুটে উঠেছে। আগের মতো সহজে হাঁটতে পারে না, সামান্য কাজেই হাঁপিয়ে যায়। কখনো কখনো তার মনে হয়, যে মেয়েটাকে একদিন দেখে ইলহান মুগ্ধ হতো, সে মেয়েটা বুঝি কোথাও হারিয়ে গেছে। ধীরে ধীরে স্বামীর সামনে এসে লজ্জামিশ্রিত দ্বিধাভরা কণ্ঠে বলল—

-"ঠিক লাগছে?... শাড়িটা খুলে ফেলি? ভালো লাগছে না বোধহয়।"

ইলহান স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে বিস্ময়, ভালোবাসা আর মুগ্ধতা একাকার হয়ে গেছে। এই নারীকে সে প্রথম যেদিন বউ সাজে দেখেছিল, সেদিনও সুন্দর লেগেছিল। আজও লাগে।বরং আজ আরও বেশি। কারণ আজ শুধু তার প্রিয় মানুষটাকেই নয়, তার সন্তানের মাকেও দেখছে সে।হালকা হেসে এগিয়ে এসে নূরাইসাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরল। কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল—

-"পারফেক্ট লাগছে। দাঁড়া... এক মিনিট।"

বলেই তাড়াহুড়ো করে বাইরে চলে গেল। নূরাইসা বিস্মিত চোখে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। ঠিক তখনই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নাহিয়ান মায়ের আঁচল ধরে টান দিল। মুখভরা হাসি নিয়ে বলল—

-"মা.. তুমায় অনেক বিউটিফুল লাগচে। মাই মামা ইজ দা মোস বিউটিফুল উম্যান অন আ!"

নূরাইসা হেসে ফেলল। সব অনিশ্চয়তা যেন এক মুহূর্তের জন্য মিলিয়ে গেল। সে ছেলের গালে চুমু খেয়ে বলল—

-"অ্যান্ড ইউ আর দ্য বেস্ট সন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড।"

কয়েক মুহূর্ত পরই ইলহান ফিরে এলো। তার দুই হাত ভর্তি টাটকা লাল গোলাপ। নূরাইসা বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল।

-"এত ফুল কোথায় পেলেন?"

ইলহান রহস্যময় হেসে বলল—

-"ওটা না জানলেও চলবে। আয়, এখানে বস।"

নূরাইসা বিছানায় গিয়ে বসল। ইলহান তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। তারপর একেকটি গোলাপ খুব যত্ন করে নূরাইসার খোলা চুলের ফাঁকে, কানের পাশে গুঁজে দিতে লাগল। প্রতিটি ফুল গুঁজে দেওয়ার সময় তার আঙুলের কোমল স্পর্শে নূরাইসার শরীর কেঁপে উঠছিল। সবশেষে হাত দুটো বাড়িয়ে তাকে দাঁড় করাল। ধীরে ধীরে আয়নার সামনে নিয়ে গিয়ে তার দুই কাঁধে হাত রেখে বলল—

-"বল তো... কী দেখতে পাচ্ছিস?"

নূরাইসা অনেকক্ষণ নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মৃদু স্বরে বলল—

-"আমাকে... বিশ্রী লাগছে। এই পেটটার জন্য।"

কথাটা শেষ করতেই ইলহানের চোখের গভীরতা বদলে গেল। সে নূরাইসার সামনে এসে দুই হাতের তালুতে তার মুখটা তুলে নিল। গভীর, স্থির কণ্ঠে বলল—

-"এটাই তোর সৌন্দর্য, নূরেজান। তুই এখন একজন মা। এই বেবি বাম্প কোনো ত্রুটি না... এখানে আমাদের সন্তান আছে। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর অস্তিত্ব এখন তোর ভেতরে।"

সে আলতো করে নূরাইসার পেটের ওপর হাত রাখল।তারপর আবার চোখে চোখ রেখে বলল—

-"তুই নিজের চোখ দিয়ে নিজেকে দেখছিস বলেই এত ভুল দেখছিস। একবার আমার চোখ দিয়ে নিজেকে দেখ। তুই আগের চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর। কারণ আজ তোর সৌন্দর্যের সঙ্গে মিশে গেছে মাতৃত্ব।"

নূরাইসার চোখ দুটো জলে ভরে উঠল। সে কোনো কথা বলতে পারল না। শুধু নিঃশব্দে ইলহানের বুকের ওপর মাথা রেখে দাঁড়িয়ে রইল। ইলহান ধীরে ধীরে তার খোলা চুলগুলো এক পাশে সরিয়ে দিল। ঘাড়ের পেছনে, কাঁধের কাছে পরপর কয়েকটি কোমল চুমু এঁকে দিল যত্নে, যেন সে নিজের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান মানুষটিকে আগলে রাখছে। নূরাইসার চোখ অনিচ্ছাতেই বুজে এলো। তার সমস্ত দ্বিধা, সমস্ত হীনমন্যতা সেই উষ্ণ স্পর্শের ভেতর ধীরে ধীরে গলে যেতে লাগল। নিজেকে সামলে নিয়ে সে মৃদু হেসে বলল—

-"কোথায় যাব আমরা?"

ইলহান তার কপালে আরেকটি আলতো চুমু খেয়ে রহস্যময় হাসল।

-"গেলেই দেখবি।"

ইলহান এক হাতে নূরাইসার হাত ধরল, অন্য হাতে ছোট্ট নাহিয়ানের। দুজনকে নিয়ে ধীর পায়ে কটেজের দরজা পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো সে। বর্ষার সন্ধ্যা তখন পাহাড়কে জড়িয়ে আরও মোহনীয় হয়ে উঠেছে। চারদিকে হালকা কুয়াশার আস্তরণ। দূরের পাহাড়গুলো নরম ধোঁয়ার চাদরে ঢেকে গেছে। ঝিরঝিরে বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ মিশে আছে অসংখ্য বুনো ফুলের মিষ্টি সুবাসে। কোথাও কোথাও জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে ছোট ছোট আলোর প্রতিফলন ঝিলমিল করছে। রিসোর্টটি এমনিতেই বিশাল। কিন্তু আজ পুরো জায়গাটাই অন্য এক রূপে সেজে উঠেছে। রিসোর্টের ঠিক মাঝখানের খোলা চত্বরে পৌঁছাতেই নূরাইসা থমকে দাঁড়াল। চারপাশের গাছগুলোকে জড়িয়ে ঝুলছে অসংখ্য উষ্ণ হলুদ ফেয়ারি লাইট। বাতাসে দুলতে থাকা সেই আলো দূর থেকে মনে হচ্ছে আকাশের তারাগুলো যেন নেমে এসে গাছের ডালে বসেছে। পথের দু'পাশে সারি সারি কাঁচের লণ্ঠন। প্রতিটিতে জ্বলছে নরম আলো। মাঝখানে লাল, সাদা আর গোলাপি গোলাপের পাপড়ি দিয়ে আঁকা হয়েছে একটি দীর্ঘ পথ, যা গিয়ে মিলেছে গোলাকার একটি ডিনার স্পেসে। চারদিকে তাজা গোলাপ, লিলি আর অর্কিডের সাজ। ফুলের সুবাসে বাতাস ভারী হয়ে আছে। মাঝখানে সাদা টেবিলক্লথে ঢাকা একটি গোল টেবিল। টেবিলের চারপাশে জ্বলছে অসংখ্য সুগন্ধি মোমবাতি। মোমের আলো বাতাসে দুলে দুলে চারপাশে এক স্বপ্নময় আবেশ ছড়িয়ে দিচ্ছে। দূরে পাহাড়ের বুক চিরে ভেসে যাচ্ছে মেঘ। তার মাঝেই কোথাও কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, আবার দূরের কোনো পাহাড়ি ঝরনার মৃদু কলকল শব্দ, প্রকৃতি নিজেই আজ তাদের সন্ধ্যাটাকে আশীর্বাদ করছে। নূরাইসা বিস্ময়ে হা হয়ে চারদিকে তাকিয়ে রইল। চোখে মুখে অবিশ্বাস, আনন্দ আর আবেগ একসঙ্গে খেলা করছে। ইলহান ধীরে ধীরে তার হাত ধরে চেয়ারে বসিয়ে দিল। তারপর নাহিয়ানকেও পাশে বসাল।আজকের এই আয়োজন শুধু স্বামী-স্ত্রীর জন্য নয়, তাদের ছোট্ট পরিবারটার জন্য। মা, বাবা আর ছেলে, তিনজনকে নিয়ে এক নিঃশব্দ, পরিপূর্ণ সন্ধ্যা। চার বছরের নাহিয়ানও আনন্দে হাততালি দিচ্ছে।

-"ওয়াও! এত লাইট! মা, দেখো... কত ফুল!"

নূরাইসা এখনো বিশ্বাসই করতে পারছে না। মুগ্ধ বিস্ময়ে ইলহানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল—

-"এত কিছু... কখন করলেন?"

ইলহান ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটুকরো হাসি ফুটিয়ে বলল—

-"করেছি। তোর ভালো লেগেছে?"

নূরাইসা ধীরে ধীরে চারপাশে আরেকবার চোখ বুলিয়ে তার দিকে তাকাল। চোখের কোণে চিকচিক করছে আনন্দের জল। মৃদু হেসে বলল—

-"হ্যাঁ... অনেক সুন্দর।"

এই একটি হাসির জন্য ইলহান পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে ছুটে যেতে পারে। এই একটি হাসিই তার সমস্ত ক্লান্তির ওষুধ। সে কিছুক্ষণ শুধু মুগ্ধ হয়ে নূরাইসার দিকে তাকিয়ে রইল। লাল শাড়িতে মোড়ানো নারীটি, কানের পাশে গুঁজে দেওয়া গোলাপ, মাতৃত্বের কোমল আভায় আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠা মুখ, ইলহানের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য। হঠাৎই সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। নূরাইসা কৌতূহলী চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। পরমুহূর্তেই ইলহান তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। আলতো করে নূরাইসার ডান হাতটি নিজের দুই হাতের মাঝে তুলে নিল। উষ্ণ স্পর্শে নূরাইসার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে হতভম্ব হয়ে স্বামীর দিকে তাকিয়ে রইল। ইলহান তার গভীর বাদামি চোখ দুটি স্থির করল নূরাইসার বিস্ময়ে ভরা চোখে।মোমবাতির আলোয় সেই দৃষ্টি আরও গভীর, আরও নিবিড় হয়ে উঠল। ঠোঁটের কোণে স্নিগ্ধ হাসি ফুটিয়ে, মোহনীয় অথচ স্থির কণ্ঠে সে বলল—

-"তুই আমার অর্ধাঙ্গিনী, নূরেজান। আল্লাহ তোকে শুধু আমার জন্যই সৃষ্টি করেছেন। তাই তো তোর সবটুকুই আমার কাছে আপন, আমার কাছে পরিপূর্ণ। তুই নিজেকে যেভাবেই দেখিস না কেন, আমি তোকে আমার চোখ দিয়ে দেখি। আর আমার চোখে তোর চেয়ে সুন্দর কোনো নারী কখনো ছিল না, আজও নেই, কোনোদিন হবেও না। আমার দৃষ্টি যখন তোকে ছুঁয়ে থাকে, তখন পৃথিবীর আর কোনো রূপ আমাকে আকর্ষণ করতে পারে না। আর যখন তুই আমার সামনে থাকিস না, তখনও তুই আমার ভেতরেই থাকিস। আমার প্রতিটি ভাবনায়, প্রতিটি নিঃশ্বাসে, প্রতিটি প্রার্থনায়, শুধু তোরই বসবাস।

তুই জানিস, আমি কেন প্রতিদিন তোর দিকে নতুন করে তাকিয়ে থাকি? কারণ প্রতিদিন তোকে নতুন করে ভালোবেসে ফেলি। তুই আমাকে জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার দিয়েছিস, আমাদের নাহিয়ান। আজ আবার তোর বুকের ভেতর আমাদের আরেকটি স্বপ্ন বেড়ে উঠছে। সেই স্বপ্নকে পৃথিবীতে আনার জন্য তুই প্রতিদিন নিজের শরীরের সঙ্গে যুদ্ধ করছিস, অসহ্য কষ্ট সহ্য করছিস। এই স্ট্রেচ মার্কগুলো... এই বদলে যাওয়া শরীর... এগুলো কি সৌন্দর্য কমিয়ে দিয়েছে?

না, জান।

এগুলো তো আমার ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর স্বাক্ষর। এগুলো বলে, তুই একজন মা। আমাদের সন্তানদের জন্য তুই নিজের শরীর, নিজের ঘুম, নিজের স্বস্তি, সবকিছু নিঃস্বার্থভাবে বিলিয়ে দিয়েছিস। বল তো, যে নারী আমার পৃথিবীকে পূর্ণ করেছে, তাকে আমি কীভাবে ভালো না বেশে থাকি?

তুই বলেছিলি, তুই নাকি আর সুন্দর নেই।

আজ আমি কথা দিচ্ছি, যেদিন তোর চুলে রূপালি রং ধরবে, মুখে বয়সের রেখা ফুটে উঠবে, হাত কাঁপবে, হাঁটতে আমার হাত ধরতে হবে... সেদিনও আমি ঠিক এভাবেই তোকে দেখে মুগ্ধ হয়ে যাব।

কারণ আমি তোর রূপের প্রেমে পড়িনি, নূরেজান।আমি প্রেমে পড়েছি তোর আত্মার, তোর মায়ার, তোর হৃদয়ের। তুই আমার প্রথম ভালোবাসা। তুই-ই আমার শেষ ভালোবাসা। আর যতদিন আমার বুকে একটা হৃদস্পন্দন থাকবে, ততদিন সেই হৃদস্পন্দনের প্রতিটি ছন্দ শুধু তোর নামই উচ্চারিত হবে। আই লাভ ইউ, আমার ব্লাডমুন।"

ইলহানের প্রতিটি শব্দ নূরাইসার বুকের বহুদিনের জমে থাকা সব অনিশ্চয়তার ওপর আলতো করে প্রলেপ হয়ে বসল। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুবিন্দু আর আটকে রাখা গেল না। টলমল চোখে সে শুধু মানুষটার দিকে তাকিয়ে রইল। এমন ভালোবাসা কি সত্যিই কারও ভাগ্যে লেখা থাকে? যে মানুষটি তার ভাঙা আত্মবিশ্বাসকে প্রতিদিন নতুন করে গড়ে তুলতে চায়, তার প্রতিটি ক্ষতকে নিজের গর্ব বলে মনে করে, তার মাতৃত্বকে সৌন্দর্যের সর্বোচ্চ রূপ বলে বিশ্বাস করে।ওদিকে ছোট্ট নাহিয়ান নিজের মতো করেই সবকিছু ফোনে রেকর্ড করে যাচ্ছে। তার কাছে এটা শুধু মা-বাবার কথা নয়, এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত।নূরাইসা কাঁদতে কাঁদতেই ইলহানের হাত দুটো নিজের গালে চেপে ধরল। ভেজা চোখে মৃদু হেসে, কাঁপা কণ্ঠে বলল—

-"আমিও আপনাকে ভীষণ ভালোবাসি... আমার মোল্টেন হার্ট।

হয়তো আমি নিজেকে কখনো ভালোবাসতে পারিনি। কিন্তু আপনি প্রতিদিন আমাকে নতুন করে নিজের প্রেমে পড়তে শিখিয়েছেন। যেদিন আয়নায় নিজেকে অসুন্দর মনে হয়, সেদিন আপনার চোখে নিজেকে দেখে আবার বাঁচতে ইচ্ছে করে। আপনি শুধু আমার স্বামী নন... আপনি আমার নিরাপদ আশ্রয়, আমার সাহস, আমার পুরো পৃথিবী।"

ইলহান আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল না। সে ধীরে ধীরে নূরাইসার কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। তারপর তার অশ্রুভেজা চোখের কোণে আলতো একটি চুম্বন রেখে কপালে কপাল ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। সেই নীরবতাতায় হাজারো অপ্রকাশিত ভালোবাসার ভাষা লুকিয়ে ছিল। নূরাইসা চোখ বন্ধ করে অনুভব করল, এই মানুষটাই তার সবচেয়ে নিরাপদ ঠিকানা। মৃদু হেসে ইলহান তার কানের কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল—

-"আমি যতবার প্রেমে পড়েছি, প্রতিবারই একই নারীর প্রেমে পড়েছি, আর সেই নারী তুই, আমার ব্ল্যাডমুন! শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত প্রতিদিন নতুন করে তোরই প্রেমে পড়ব আমি।"

বিজ্ঞাপন
সূর্যস্নাত ভালোবাসা গল্পটি নওরিন ইথিকা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ভালোবাসাময় গল্প