-"১৯৯০ সাল। শীতল কুয়াশায় মোড়া এক অচেনা ভোরে মেজর ইরফান দেওয়ানকে জাতিসংঘের বিশেষ দায়িত্বে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। তুষারঢাকা বিস্তীর্ণ প্রান্তর, ধূসর আকাশ আর কড়া শীতের কামড়ে জমাট বাঁধা শহর, সেই অপরিচিত ভূখণ্ডেই কেটে যায় তার আড়াইটি দীর্ঘ বছর। কর্তব্য ছিল কঠোর, পরিবেশ ছিল সন্দেহে ঘেরা, আর প্রতিটি পদক্ষেপে লুকিয়ে ছিল অদৃশ্য বিপদের ছায়া।
সেই সময়েই তার পরিচয় হয় ভেরোনিকা দ্রাগুনোভার সঙ্গে। ছয় মাস, সময়ের হিসেবে সামান্য, অথচ অনুভূতির দিক থেকে গভীর। ভেরোনিকা ছিল ইগর দ্রাগুনোভের একমাত্র কন্যা। মেয়েই ছিল ইগরের সমস্ত পৃথিবী, তার নিঃশ্বাস, তার বেঁচে থাকার কারণ।ভেরোনিকার জন্মের সময়ই তার মা পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়। সেই থেকে ইগর নিজের সমস্ত সত্তা ঢেলে দিয়েছিল মেয়ের মধ্যে। এক কঠিন, ক্ষমতাবান পুরুষের অন্তরে যে এত কোমল স্নেহ লুকিয়ে থাকতে পারে, তা দেখলে অবাক হতে হতো। আর ভেরোনিকা?সে-ও তার বাবাকে অসম্ভব ভালোবাসত। বাবার জন্য দুনিয়া এফোঁড়-ওফোঁড় করতেও দু’বার ভাবত না। তার হাসিতে ছিল শিশুসুলভ স্বচ্ছতা, আবার চোখের গভীরে ছিল অদ্ভুত দৃঢ়তা, যেনো ঝড়ের মধ্যেও দাঁড়িয়ে থাকতে জানে সে।
ইরফান দেওয়ান ভেরোনিকার সঙ্গে বন্ধুত্বের সূত্রেই এক ভয়ংকর সত্যের মুখোমুখি হয়। রাশিয়ার এক প্রভাবশালী মাফিয়া চক্রের সন্ধান পায় ইরফান।অন্ধকারের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অনৈতিক ব্যবসা, পাচার, রাজনৈতিক প্রভাব, একটি ছায়া-সাম্রাজ্যের প্রমাণ একে একে তার হাতে চলে আসে। জাতিসংঘ থেকে তাকে এবং আরও কয়েকজন সৈনিককে পাঠানো হয়েছিল মূলত এই গোপন তদন্তের জন্যই।প্রমাণগুলো জমা দেওয়ার কথা ছিল অচিরেই। বাতাসে তখন অস্বস্তির গন্ধ। শহরের আলোকোজ্জ্বল রাস্তাগুলোও যেনো হঠাৎ শীতল, সন্দেহজনক হয়ে উঠেছিল। তারপর, একটি অপ্রত্যাশিত রাত। সেই রাতের স্মৃতি যেনো কুয়াশার চেয়েও ঘন, তুষারের চেয়েও শীতল। পরদিনই ইরফান দেওয়ান বাংলাদেশে ফিরে আসে। মাফিয়া সংস্থার সমস্ত প্রমাণ জাতিসংঘের হাতে তুলে দেয় সে। কর্তব্য সম্পন্ন হয়, ফাইল বন্ধ হয়, দায়িত্ব শেষ হয়। কিন্তু রাশিয়ার সেই তিন বছর? ভেরোনিকা? বাংলাদেশে ফিরে এসে জীবনের ব্যস্ত স্রোতে সে এমনভাবে ভেসে যায় যে অতীতের পাতা ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসে। রাশিয়া থেকে ফেরার পর আর কোনোদিন ভেরোনিকার সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়নি। ২০০৯ সালে মেজর ইরফান দেওয়ান পারিবারিকভাবে বিয়ে করেন তার ভালোবাসার মানুষকে। ২০১১ সালে তাদের সংসারে জন্ম নেয় একটি পুত্রসন্তান। সন্তানের মুখ দেখে তার চোখে ভেসে উঠেছিল ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি, দায়িত্বের নতুন শপথ। সন্তানকে কোলে নিয়ে যে মানুষটি এক মুহূর্তের জন্য কোমল হয়ে উঠেছিল, সেই মানুষটিই কিছুদিন পর আবার নিজের কর্মস্থলে ফিরে যায়, দেশ ও দায়িত্বের টানে। রাশিয়ার তুষারঢাকা দিনগুলো, ধূসর সন্ধ্যা, ভেরোনিকার মৃদু হাসি, সব যেনো সময়ের গভীরে চাপা পড়ে যায়। ১৯৯৩ সালে রাশিয়ায় ঠিক কী ঘটেছিল, তার কোনো স্পষ্ট স্মৃতি আর ইরফানের মনে নেই।"
ইলহান থেমে যায়। তার চোখে তখন এমন এক অদ্ভুত ঝড়ের আভাস, যেনো সে নিজেই সেই অপ্রত্যাশিত রাতের সাক্ষী। যেনো সে বলতে চায়, কিছু গল্প সময় মুছে দেয় না, মানুষ মুছে ফেলে। আর কিছু রাত থাকে, যেগুলো স্মৃতি থেকে মুছে গেলেও, নিয়তির খাতায় অমোচনীয় হয়ে লেখা থাকে। ইলহানের কণ্ঠ তখন ভারী, কিন্তু স্থির। সে যেনো প্রতিটি শব্দ নিজের ভেতরের আগুন থেকে টেনে আনছে—
-"২০১২ সাল। দেওয়ান বাড়ির উঠোনে একদিন ভোরবেলা একটি লা শ আসে। সাদা কাফনে মোড়া, নিথর, মেজর ইরফান দেওয়ান। আকাশটা সেদিন অস্বাভাবিকভাবে নিস্তব্ধ ছিল। বাতাসে কাঁপা কাঁপা শোকের গন্ধ। উঠোনে জমে থাকা মানুষগুলোর চোখে বিস্ময়, কান্না, অবিশ্বাস, সব মিলেমিশে এক অদ্ভুত স্তব্ধতা। যে মানুষটি এতদিন দেশের জন্য বেঁচে ছিল, শত্রুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল নির্ভয়ে, সে-ই ফিরল নিঃশব্দ হয়ে। একটি শোক কাটতে না কাটতেই, মেজর ইরফান দেওয়ানের মৃ ত্যুর দেড় মাস পরই আরেকটি দুঃসংবাদ। এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তার স্ত্রী এবং এক বছরের পুত্র সন্তানও পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়।দেওয়ান বাড়ির দেয়ালগুলো যেনো হঠাৎ করেই বুড়িয়ে গিয়েছিল সেদিন। হাসির শব্দ চিরতরে হারিয়ে গেল সেই আঙিনা থেকে। পরিবারের সবাই ভাগ্যের লিখন ভেবে সবকিছু মেনে নিল। একজন ছাড়া, আমি।
ইরফান ছিল আমার প্রাণ। ঠিক তেমনি আমার জন্য ইরফানের ছিল এক অদ্ভুত টান। বংশের প্রথম সন্তান আমি, জন্ম ১৯৯৩ সালের ৯ই মার্চ। ভাতিজার জন্মের সময় ইরফান দেশে ছিল না। কাজের জন্য পরিবারের সঙ্গে তার দূরত্ব ছিল চিরকালীন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, আমার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল চোখে পড়ার মতো গভীর। বাড়িতে এসে সময় দিতে পারত না সে, তবু ভাইয়ের ছেলে-মেয়েদের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল অকৃত্রিম। আর আমি? চাচাকে দেখতাম নায়কের মতো। গর্ব, অনুরাগ আর অদ্ভুত এক নির্ভরতার মিশ্র অনুভূতি ছিল আমার মধ্যে। ইরফান দেওয়ান ও তার স্ত্রী-সন্তানের মৃ ত্যুর পর, একসময় আমার হাতে এসে পড়ে কিছু গোপন সত্যের চাবিকাঠি। নথি, পুরোনো ফাইল, কয়েকটি অডিও রেকর্ড, আর কিছু সাংকেতিক বার্তা, যেগুলো যেনো দীর্ঘদিন অন্ধকারে চাপা পড়ে ছিল। সেই সূত্র ধরেই আমি জানতে পারে রাশিয়ার ঘটনাগুলো। ভেরোনিকা দ্রাগুনোভা, সে কেবল একজন সাধারণ মেয়ে ছিল না। সে ছিল প্রভাবশালী মাফিয়া গ্যাং "পান্থর"-এর প্রিন্সেস। ইগর দ্রাগুনোভ, তার পিতা, ছিল সেই ছায়া-সাম্রাজ্যের প্রধান।ইরফানের উদ্দেশ্য তারা শুরু থেকেই জানত। বন্ধুত্ব ছিল কৌশল। হাসি ছিল মুখোশ। নিকটতা ছিল ফাঁদ।সেই অপ্রত্যাশিত রাতে ভেরোনিকা যায় ইরফানের বাসায়, উদ্দেশ্য, সব প্রমাণ নষ্ট করা। খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে দেয় মা দ ক। সে ভেবেছিল ইরফান অচেতন হয়ে পড়বে। কিন্তু ভুল মিশ্রণের কারণে তা হয়নি। বরং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সেই রাত ছিল বিশৃঙ্খল, অস্পষ্ট, অসংলগ্ন, এমন এক রাত, যার কোনো সুস্পষ্ট স্মৃতি ইরফানের মনে ছিল না।বাংলাদেশে ফিরে এসে সে সমস্ত প্রমাণ জাতিসংঘের হাতে তুলে দেয়। ইগর দ্রাগুনোভ গ্রেফতার হয়। কিন্তু অন্ধকার এত সহজে হার মানে না। প্রতিশোধ, এই শব্দটাই যেনো ভেরোনিকার একমাত্র লক্ষ্য হয়ে ওঠে।
২০১২ সালের সেই মৃ ত্যু, তারপর দেড় মাস পরের দুর্ঘটনা, সবকিছু কি সত্যিই দুর্ঘটনা ছিল? আমি যখন সব সূত্র একত্র করি, তখন আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়, এটি পরিকল্পিত। এটি প্রতিশোধ। ভেরোনিকা প্রতিশোধ নিয়েছিল। ইরফান দেওয়ান এবং তার পরিবারকে নির্মমভাবে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়ে।পরবর্তীতে ইগর মুক্তি পায়। ক্ষমতার জাল, অর্থের প্রভাব, সব মিলিয়ে আবার ছায়া নেমে আসে। সেই দিনই আমি সিদ্ধান্ত নেই, এই গল্প এখানেই শেষ হবে না। আমি আর্মিতে যোগ দেই। প্রশিক্ষণ, কঠোর শৃঙ্খলা, বছরের পর বছর প্রস্তুতি, আমার প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল একটাই লক্ষ্য। অবশেষে আমি প্রমাণ জোগাড় করে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় আবারও ইগরকে গ্রেফতার করাই। এইবার আর কোনো ফাঁক ছিল না। আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ইগর দ্রাগুনোভ শেষ পর্যন্ত দণ্ডিত হয়। ফাঁ সি কার্যকর হয়।"
কথাগুলো বলার সময় তার চোখে কোনো উল্লাস ছিল না। ছিল না প্রতিশোধের উন্মত্ততা। শুধু এক গভীর শূন্যতা। সে ধীরে বলে—
-"ন্যায়বিচার হয়েছিল। কিন্তু যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল... সেটা কোনো রায় পূরণ করতে পারেনি।"
দেওয়ান বাড়ির উঠোনে আজও সন্ধ্যা নামলে বাতাসে যেনো কারও পদচারণা শোনা যায়। সময় এগিয়ে গেছে, কিন্তু কিছু ক্ষত, কিছু রাত, কিছু নাম, চিরকাল রয়ে গেছে। এইটুকু বলে থামল ইলহান। ঘরের ভেতর তখন এমন নিস্তব্ধতা, যেনো দেয়ালও শ্বাস আটকে রেখেছে। সেই বয়স্ক নারী, ভেরোনিকা, রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে আছে ইলহানের দিকে। বয়স তার মুখে ভাঁজ এঁকেছে, কিন্তু দৃষ্টিতে এখনো আগুনের তীব্রতা।উপস্থিত সবাই কিংকর্তব্যবিমূঢ়। বিহান ইতিমধ্যেই আর্সলান ও এমরিনের হাতে সমস্ত প্রমাণের ডকুমেন্ট তুলে দিয়েছে। কাগজের পাতাগুলোর প্রতিটি লাইনে ইতিহাস, প্রতিটি সিলমোহরে অপরাধের সাক্ষ্য।ইলহান ধীরে ধীরে ভেরোনিকার চারপাশে ঘুরতে লাগল। তার পদচারণা মাপা, কণ্ঠ নিচু কিন্তু ধারালো—
-"সব কিছুই ঠিক ছিল। প্রতিশোধের খেলা। কিন্তু এই খেলা নোংরা করতে গেলে কেনো ভেরোনিকা?"
ভেরোনিকা দাঁত চেপে বলল—
-"তোর জন্য আমার বাবা মা রা গিয়েছে। তোকে এত সহজে আমি ছেড়ে দিব ভেবেছিস?"
ইলহানের চোখে তখন অদ্ভুত স্থিরতা।
-"না। আমি জানতাম তুমি প্রতিশোধ নিতে আসবে। কিন্তু নিজের ছেলেদের অস্ত্র বানাবে, এটা ভাবিনি।"
ভেরোনিকার ঠোঁট বেঁকে গেল।
-"হ্যাঁ। ওদের আমি জন্ম দিয়েছি আজকের এই দিনের জন্য। তোর কি মনে হয় আর্সলানকে আমি বাংলাদেশে এমনি এমনি মানুষ করেছি? ও জন্মের পর থেকেই জানে দেওয়ান বাড়ির প্রতিটা সদস্য ওর শত্রু। আমার বাংলাদেশে ওকে প্রয়োজন ছিল, তোদের ক্ষতি করার জন্য।"
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। আর্সলানের মুখে আঘাতের মতো বিস্ময়। তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল—
-"শুধু মাত্র প্রতিশোধের নেশায় তুমি আমাদের দুই ভাইকে আলাদা করেছ? আমাকে মা ছাড়া মানুষ হতে বাধ্য করেছ?"
ভেরোনিকা নির্দ্বিধায় বলল—
-"হ্যাঁ, করেছি!"
এই একটি শব্দ যেনো ঘরের ভেতর বজ্রপাতের মতো আছড়ে পড়ল। ইলহান থেমে আর্সলানের দিকে তাকাল। তার দৃষ্টিতে ছিল কঠিন হতাশা।
-"তুই মানুষ হোস নি, তুই হয়েছিস অমানুষ, ঠিক তোর মায়ের মতো। চরিত্রহীনতার পথ বেছে নিয়েছিস।আল্লাহ তো তোদের মস্তিষ্ক দিয়েছে। দুই ভাই কি কোনোদিন সেটা খাটানোর প্রয়োজন বোধ করিস নি?"
আর্সলান চেঁচিয়ে উঠল—
-"খবরদার ইলহান, মুখ সামলে কথা বল!"
ইলহানও এবার আর নিজেকে সংযত রাখল না। তার কণ্ঠ দ্বিগুণ উচ্চতায় উঠল—
-"কি মুখ সামলে কথা বলব? ফারাহর সাথে কি করেছিস? কতগুলো মেয়ের জীবন নষ্ট করেছিস, হিসেব আছে? তোর কোনো ক্ষমা নেই, দেহরান! তোকে তোর সমস্ত পাপের শাস্তি আমি দেবো। একটু ধৈর্য ধর, আগে তোর মায়ের ব্যবস্থা করি!"
ভেরোনিকা খেঁকিয়ে উঠে বলল—
-"এই কি ব্যবস্থা করবি তুই আমার?"
তার চোখে চ্যালেঞ্জ, ঠোঁটে অবজ্ঞা। ইলহান থামল। এক মুহূর্তের জন্য ঘর নিস্তব্ধ। বাইরে হালকা বাতাসে দরজার কপাট কেঁপে উঠল, যেনো সময় নিজেই সাক্ষী হতে চাইছে এই মুহূর্তের। ইলহান ধীরে সামনে এগিয়ে এল। তার কণ্ঠ এবার আর চিৎকার নয়, বরং ভয়ংকর শান্ত।
-"আমি তোমার মতো নোংরা খেলা খেলব না, ভেরোনিকা। তুমি যেভাবে পরিবার ভেঙেছো, সন্তানদের ওপর বি ষ ঢেলেছো, প্রতিশোধকে ধর্ম বানিয়েছো, আমি সেভাবে নামব না। আমি তোমার বিরুদ্ধে আইন দিয়ে দাঁড়াব। প্রমাণ দিয়ে দাঁড়াব। তোমার নিজের সন্তানের সামনে তোমার মুখোশ খুলে দেব।"
সে টেবিলের ওপর রাখা ফাইলের দিকে ইশারা করল।
-"এখানে তোমার সমস্ত আর্থিক লেনদেন, তোমার যোগাযোগ, তোমার পরিকল্পনার অডিও, সব আছে। তুমি শুধু একজন মা না, তুমি আন্তর্জাতিক অপরাধের অংশীদার। এবার তোমার বিচার হবে প্রকাশ্যে।প্রতিশোধ না, ন্যায়বিচার।"
ভেরোনিকার চোখে প্রথমবারের মতো ক্ষীণ অনিশ্চয়তা দেখা দিল। আর্সলান স্থির দাঁড়িয়ে। তার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। যেনো সে প্রথমবার নিজের জীবনের ভাঙা আয়নায় তাকিয়েছে। ইলহান শেষবারের মতো বলল—
-"তোমার খেলা শেষ, ভেরোনিকা। এবার শুরু হবে সত্যের খেলা!"
পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠল। ঘরের বাতাস ভারী, টানটান। উপস্থিত সবাই স্থবির, এত এত সত্য একসঙ্গে হজম করার শক্তি যেনো কারও নেই। ইলহানের পাশে এসে দাঁড়াল রুহান তানভীর ও বিহান। তিনজন যেনো এক অদৃশ্য প্রাচীর, অটল, প্রস্তুত। ইলহান ধীরে ভেরোনিকার দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে ছিল না চিৎকার, না তাড়াহুড়ো, শুধু নির্মম স্থিরতা।
-"তার আগে তোমার সন্তানদের জন্মদাতার পরিচয় দিয়ে নেই!"
ঘরের ভেতর ফিসফাস থেমে গেল। এমরিন এগিয়ে এল। তার চোখে অস্থিরতা, কিন্তু ভঙ্গিতে দৃঢ়তা।
-"কে আমাদের বাবা?"
ইলহান তাকাল এমরিনের দিকে। এক মুহূর্ত থেমে শান্ত কণ্ঠে বলল—
-"মেজর ইরফান দেওয়ান।"
মুহূর্তেই যেনো বজ্রপাত হলো। আর্সলান ও এমরিন দু’পা পিছিয়ে গেল। চোখ বড় হয়ে গেছে, শ্বাস ভারী। তারা দুজন এমন ভাবে ভারসাম্য হারালো, মনে হলো কেউ তাদের পায়ের নিচের জমি টেনে নিয়েছে। ইলহান আবার বলল—
-"১৯৯৪, তোদের দুজনের জন্ম। সেই রাতের ফল তোরা। তোর মা কোনো দিন বিয়ে করে নি। সে তার জীবন নিজের মতো করে চালিয়েছে। প্রথমে সে নিজেও জানত না তোদের বাবার পরিচয়। পরে ডিএনএ টেস্ট করে নিশ্চিত হয়। তোদের মে রে ফেলতেই চেয়েছিল। কিন্তু অনেক দেরিতে জানার কারণে সেটা আর সম্ভব হয়নি, ঝুঁকি ছিল তার নিজের প্রাণের। তারপর তার মাথায় আসে নতুন পরিকল্পনা।ইরফান দেওয়ানের সন্তান দিয়েই দেওয়ান বাড়ির ধ্বংস ঘটাবে।"
ঘরের ভেতর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার মতো নীরবতা।ইলহান এবার আর্সলান ও এমরিনের দিকে তাকাল।তার চোখে রাগ নেই, আছে কঠিন সত্যের ভার।
-"এবার নিজেদের মস্তিষ্ক ব্যবহার কর। কে আসল অপরাধী? তোরা কি শুধু ব্যবহৃত হোস নি? আর ভাব, তোরা নিজেরা কি কি ভুল করেছিস।"
কথাগুলো যেনো দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল।এমরিন ও আর্সলান ধীরে ভেরোনিকার দিকে তাকাল।তাদের চোখে আহত প্রশ্ন, একজন সন্তানের, যে প্রথমবার নিজের জন্মকথা শুনছে। কিন্তু ভেরোনিকার চোখে কোনো আবেগ নেই। না অনুশোচনা, না অস্বীকার। সে অকপটে সব স্বীকার করল। তার মুখে ছিল অদ্ভুত কঠোরতা, যেনো এই স্বীকারোক্তিও তার কাছে আরেকটি কৌশল মাত্র। দীর্ঘ দিনের প্রশিক্ষণে কঠিন হয়ে ওঠা আর্সলান ও এমরিন বাইরে থেকে ভেঙে পড়ল না। তাদের মুখ স্থির, চোয়াল শক্ত। কিন্তু চোখের গভীরে ঝড় বইছে, এটা স্পষ্ট। এই সময় আফরিন এগিয়ে এসে এমরিনের বাহু আঁকড়ে ধরল।তার স্পর্শে ছিল নিঃশব্দ সমর্থন। এমরিন ঘুরে তাকাল।তার মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই, না কৃতজ্ঞতা, না প্রত্যাখ্যান। শুধু এক গভীর শূন্যতা। ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ইলহান অনুভব করল, আজ শুধু অপরাধের মুখোশ খোলা হয়নি, আজ রক্তের সম্পর্কের ভাঙা আয়নাও সামনে এসেছে। প্রতিশোধের আগুনে যে পরিবারগুলো পুড়েছিল, আজ সেই আগুনের ছাই থেকে বেরিয়ে এসেছে নির্মম সত্য, যাকে শত্রু ভেবে এতদিন যুদ্ধ করা হয়েছে, তার রক্তই বইছে নিজের শরীরে।
ভেরোনিকাকে আর একটি শব্দ উচ্চারণের সুযোগ দিল না ইলহান। ঘরের ভেতর জমাট বাঁধা উত্তেজনার মাঝেই হঠাৎ বাইরে সাইরেনের শব্দ ভেসে এলো। তীক্ষ্ণ, কর্তৃত্বপূর্ণ, যেনো দীর্ঘদিনের অন্ধকার ভেদ করে আইন নিজেই দরজায় কড়া নাড়ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ প্রবেশ করল। তাদের উপস্থিতি যেনো ঘরের ভারী বাতাসকে ছিন্ন করে দিল। ইলহান এক পা সরে দাঁড়াল। তার দৃষ্টি স্থির, মুখ কঠিন। প্রতিশোধ নয়, আজ তার চোখে ছিল সমাপ্তির ঘোষণা। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা ডকুমেন্ট, অডিও রেকর্ড, আর্থিক লেনদেনের কাগজপত্র, সবকিছু একে একে অফিসারদের হাতে তুলে দিল বিহান। রুহান তানভীর সংক্ষিপ্তভাবে পুরো ঘটনার সারসংক্ষেপ জানালেন।আর্সলান স্থির দাঁড়িয়ে। হাতের শিরাগুলো ফুলে আছে, কিন্তু সে কোনো প্রতিরোধ করল না। যেনো বহু বছরের বিভ্রম ভেঙে পড়ার পর লড়াই করার শক্তিটুকুও অবশ হয়ে গেছে।
ভেরোনিকা শেষবারের মতো ইলহানের দিকে তাকাল।সে দৃষ্টি ছিল না আগের মতো জ্বলন্ত, বরং অদ্ভুত শীতল। পুলিশ যখন তাদের হাতকড়া পরাল, তখন ঘরে উপস্থিত প্রত্যেকে নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে রইল।প্রতিশোধের দীর্ঘ অধ্যায় আজ আইনের হাতে সঁপে দেওয়া হলো। ইলহান ধীরে চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য। তার মনে ভেসে উঠল, চাচার মুখ, সেই শোকের উঠোন, আর ২০১২ সালের সাদা কাফন।আজ সে প্রতিশোধ নেয়নি। সে বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে।পুলিশ আর্সলান ও ভেরোনিকাকে সমস্ত অপরাধের প্রমাণসহ আইনের হাতে তুলে নিয়ে চলে গেল। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে যেনো একটি যুগের অবসান হলো।ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এলো, কিন্তু সেই নিস্তব্ধতার ভেতর ছিল এক নতুন শুরু।
.
দেওয়ান বাড়ির অন্দরমহলে যখন সমস্ত সত্য উন্মোচিত হলো, তখন কান্না আর বিস্ময়ের ঢেউ একসঙ্গে আছড়ে পড়েছিল। দাদা দাদী, ইকবাল দেওয়ান ও নাহিদ দেওয়ান অঝোরে কেঁদেছেন। ছোট ছেলের স্মৃতি, তার অপূর্ণ জীবন, তার করুণ পরিণতি, সব আবার নতুন করে র ক্তাক্ত করেছিল তাদের। অথচ সেই সঙ্গে যখন জানতে পারলেন, ইরফানের রক্ত এখনো বেঁচে আছে, এমরিন আর আর্সলানের মধ্যে, তখন বুকভরা শোকের মাঝেও এক অদ্ভুত সান্ত্বনা জন্ম নিল। র ক্তের টান অস্বীকার করা যায় না। এমরিন রাশিয়াতেই থাকতো। তার বিরুদ্ধে কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই, কারণ সব অনৈতিক কার্যকলাপ পরিচালিত হতো ভেরোনিকার নামেই। নথিপত্র, লেনদেন, নির্দেশ, সবই তার স্বাক্ষরে। ফলে আইনের জালে এমরিন সরাসরি জড়াল না। সে বেরিয়ে আসতে পেরেছে সেই অন্ধকার বলয় থেকে। কিন্তু আর্সলান, তার অবস্থান ভিন্ন। জমজ ভাইকে বাঁচানোর জন্য এমরিন আপ্রাণ চেষ্টা করছে। আইনজীবী, সাক্ষ্য, যুক্তি, সব জোগাড় করছে। তবুও সে জানে, ইলহান কখনো আর্সলানকে ক্ষমা করবে না। নিজ সন্তানের খু নিকে কেউ ক্ষমা করে না। দুই মাস ধরে মামলা চলছে।প্রতিটি শুনানিতে অতীতের পাতা আবার উল্টে যাচ্ছে।এমরিন মাঝেমধ্যেই দেওয়ান বাড়িতে আসে।সম্পর্কগুলো জোড়া লাগানোর চেষ্টা করে। সে জানে, তাদের দোষ ছিল না। তারও ছিল না। সবাই ছিল এক ষড়যন্ত্রের জালে আটকানো। আফরিন এখন এমরিনের সঙ্গেই থাকে। দীর্ঘ দ্বন্দ্বের পর সে ক্ষমা করেছে তাকে।কারণ সে বুঝেছে, ব্যবহৃত হওয়া আর অপরাধী হওয়া এক জিনিস নয়।
আজ এমরিন এসেছে আর্সলানের সঙ্গে দেখা করতে।কারাগারের সেই স্যাঁতসেঁতে করিডোরে দাঁড়িয়ে সে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছে। লোহার দরজা, ভারী তালা, নির্লিপ্ত প্রহরী, সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত দমবন্ধ করা পরিবেশ। অবশেষে আর্সলানকে আনা হলো।বিধ্বস্ত, ক্লান্ত, তবুও চোখে এক অদ্ভুত শান্তি। তাকে দেখেই এমরিনের বুকটা ধক করে উঠল। এ কি সেই ভাই, যার সঙ্গে সে একই সময়ে পৃথিবীতে এসেছিল?
আর্সলান মলিন মুখে হেসে বলল—
-"আর লড়িস না ভাই। আমাকে আমার পাপের শাস্তি ভোগ করতে দে। ফাঁ সি হবে না আমার। তাই চিন্তা করিস না, তোর কাছেই ফিরে যাব।"
এমরিনের গলা শুকিয়ে গেল। সে কষ্টে বলল—
-"তুই কবে এত অন্যায় করলি ভাই?"
আর্সলান মৃদু হেসে উত্তর দিল—
-"যেদিন থেকে অন্যায়কে ন্যায় ভেবে বড় হয়েছি, সেদিন থেকেই। মা আমাদের শিখিয়েছিল, দেওয়ান মানেই শত্রু। প্রতিশোধই নাকি আমাদের ধর্ম। আমরা ভাবতাম আমরা ন্যায়ের সৈনিক। কিন্তু সত্যিটা জানিস কবে বুঝলাম? যেদিন জানতে পারলাম, যাদের ধ্বংস করতে চাইছি, তাদের রক্তই বইছে আমাদের শিরায়।
তারপরও থামিনি। কারণ ততদিনে অন্যায় আমার অভ্যাস হয়ে গেছে।"
সে একটু থামল। চোখ নামিয়ে বলল—
-"আমি অপরাধ করেছি, এমরিন। অজুহাত দিয়ে লাভ নেই। ব্যবহার হয়েছি, ঠিক। কিন্তু সিদ্ধান্তগুলো শেষ পর্যন্ত আমারই ছিল। তাই শাস্তিটাও আমারই হওয়া উচিত।"
কারাগারের ঘড়ির টিকটিক শব্দ যেনো আরও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। এমরিন লোহার গ্রিল শক্ত করে ধরল।তার চোখ ভিজে উঠেছে, কিন্তু সে কাঁদছে না। দুই ভাই, একই রক্ত, একই জন্ম, তবু জীবনের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে। একজন মুক্ত আকাশের নিচে, আরেকজন শাস্তির প্রতীক্ষায়। তবুও তাদের মাঝখানে রয়ে গেছে সেই অটুট সম্পর্ক। আর্সলান কিছুক্ষণ নীরব থেকে ধীরে বলল—
-"ভেরোনিকার সন্তান আমি। তার সব খারাপ দোষ-গুণই আমার ভেতরে বেঁচে আছে। আর তোর ভেতরে বেঁচে আছে মেজর ইরফান দেওয়ান। মা সবাইকে ম্যানিপুলেট করেছিল ভাই। আমরা আমাদের রক্তের সঙ্গে বেঈমানি করেছি। শাস্তি তো পাবই। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের আরও একটি ভাই ছিল। যাকে ভেরোনিকা নির্মমভাবে হ ত্যা করেছে। তার জন্য তাকে কখনো ক্ষমা করিস না ভাই!"
এমরিনের চোখে আগুন আর জল একসঙ্গে ঝিলিক দিল। সে দৃঢ় গলায় বলল—
-"কখনোই না। তুই চিন্তা করিস না। আমি ইলহানের সঙ্গে কথা বলব, তোর শাস্তি যেনো কমিয়ে দেওয়া হয়।"
আর্সলান মলিন মুখে হেসে মাথা নাড়ল।
-"সেনোরিটা ভালো আছে?"
এমরিন একটু থেমে বলল—
-"সে এখন বড় ভাইয়ের স্ত্রী, আর্সলান।"
কথাটা শুনে আর্সলানের ঠোঁটে হালকা, ক্লান্ত হাসি ফুটল। চোখে যেনো এক ঝলক আলো এসে আবার নিভে গেল।
-"তাকে আমার আর পাওয়া হবে না রে ভাই। ইলহান না থাকলেও সে কোনোদিন আমাকে ভালোবাসত না।সে সূর্যের আলোর মতো পবিত্র। আমার মতো পাপীর ছায়াও যেনো তার ওপর আর না পড়ে। আমি তাকে দূর থেকে ভালোবাসব। সে আমার পাপী হৃদয়ে ফোঁটা একমাত্র পবিত্র ফুল। তাকে আমি ভুলতে পারব না ভাই।"
কারাগারের ধূসর দেয়ালে সেই স্বীকারোক্তি প্রতিধ্বনিত হলো। এমরিন কোনো জবাব দিল না। সে জানে, ভালোবাসা কাউকে জিজ্ঞেস করে আসে না। নিজের মতো করে, অঘোষিতভাবে, নিঃশব্দে জন্ম নেয়। কখন, কীভাবে, কাকে, তা কারও নিয়ন্ত্রণে থাকে না।ভালোবাসাকে ভুলতে বলা মানে নিজের হৃদয়কে অস্বীকার করা। সে নিজেও তো হাজার চেষ্টা করেও আফরিনকে ভুলতে পারেনি। যত দূরে সরে যেতে চেয়েছে, তত গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে। লোহার গ্রিলের এপাশ-ওপাশে দাঁড়িয়ে দুই ভাই চুপ করে রইল।একজন অপরাধ স্বীকার করে শাস্তির অপেক্ষায়।আরেকজন মুক্ত থেকেও অপরাধবোধের ভার বয়ে বেড়াচ্ছে। তাদের মাঝখানে ঝুলে আছে, রক্তের বন্ধন, হারিয়ে যাওয়া আরেক ভাইয়ের স্মৃতি, আর কিছু অসমাপ্ত ভালোবাসা... যে ভালোবাসা কখনো স্বীকারোক্তি পায়নি, কখনো পূর্ণতা পায়নি, তবুও হৃদয়ের গভীরে শেকড় গেড়ে বসে আছে। লোহার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে দু’জনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য মিলল। একই রক্ত, একই শৈশবহীন শৈশব, একই প্রতারণার শিকার, তবুও ভাগ্য তাদের দাঁড় করিয়েছে বিপরীত দুই প্রান্তে। দূরে কারাগারের প্রহরী কাশি দিল।সময় ফুরিয়ে আসছে। আর্সলান ধীরে হাত বাড়াল, গ্রিল ছুঁয়ে। এমরিনও এগিয়ে এলো। আঙুলের ডগা ছুঁয়ে গেল ঠান্ডা লোহার গায়ে, স্পর্শ হলো না, তবুও হলো।
-"ভালো থাকিস ভাই!" আর্সলান নিচু স্বরে বলল।
-"তুইও!"
এমরিনের গলা ভারী। এই বিদায় শেষ বিদায় নয়, তবুও এতে আছে বিচ্ছেদের গাঢ় স্বাদ। কারাগারের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ যেনো এক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘোষণা করল। কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়। কারণ রক্তের সম্পর্ক ভাঙে না, সত্য চাপা থাকে না, আর অসমাপ্ত ভালোবাসা, সময়ের ভেতর দিয়ে বেঁচে থাকে।