এসির বাতাসে ঠান্ডা শীতল কক্ষ। নিরবতায় মুখর।খসখসে কাগজের উপরে কলম চলছে বেশ জোর গতিতে। সান্নিধ্য নিজের সমস্ত মনোযোগ অনেক কষ্টে ঢেলেছে ফাইল পত্রে। পাহাড়সম কাজের মধ্যেই আবার এসেছে নতুন কাজ। সদরঘাট ফিশারম্যান হাব নির্মাণের প্রস্তাবনা এসেছে। এলাকার জেলে সম্প্রদয়দের নিয়ে বেশ বড়সড় কাজ এটা। মাছ ধরার কয়েকশো ট্রলার,বালার নৌকা ,বরফ সরবরাহ ও বিপণনের সুব্যবস্থা করতে উপরিমহল হতে এসেছে বিশেষ জোরদার।
তবে কাজে কাজে এমপি সাহেব নিজে বিধ্বস্ত হলেও মনটাকে সে সুরক্ষিত রেখেছে তার একান্ত রমণী কায়ার জন্য। এতো কাজের চাপেও তার ভিতরটা অস্থিরতায় টালমাটাল অবস্থা। কত যুগ ধরে সে বুভুক্ষুর ন্যায় প্রেয়সীর অপেক্ষায় কাতর হয়ে আছে। চোখে মুখে তার সুস্পষ্ট আভাস ফুটে না উঠলেও হৃদয় গহীনে হাহাকারের প্রতিধ্বনি সে ঠিকই শুনতে পায়।
টানা স্বাক্ষরের মাঝে ফাইলে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
"এই প্রস্তাবনে বাজেটের লাইন আইটেমগুলো আবার চেক করেছো?"
"জ্বি স্যার।"
" ঠিকাদারের লিস্টে আমার মনোনীত কয়েকজনকে রাখবে।"
"রাখা হয়েছে স্যার। কিন্তু রাজীব পাটোয়ারী তো বেশ ঝামেলা করছে এই নিয়ে। সে রীতিমতো প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় জাহির করছে প্রকল্পের এই জমি বিতর্কিত। একটা মহল এই নিয়ে বেশ তোড়জোড় শুরু করেছে।"
"আই ডোন্ট কেয়ার। এই প্রকল্প দিয়ে পাঁচশ পরিবারের রোজগার জুটবে। ফাইলটা এখানে রাখো, আমি প্রধানমন্ত্রীর অফিসে পাঠাবো।"
"ওকে স্যার।"
নিরব কাজের মাঝে স্লাইডিং ডোর টানার শব্দ হয়। নম্রকন্ঠে
সহকারী হতে ভেসে আসে,"স্যার, নাসির সাহেব এসেছেন।আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান।"
সান্নিধ্যের ভুরু কুঁচকে যায়। আজকে যতটা সম্ভব সে নিজেকে ঠান্ডা রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে । মারামারি ফাটাফাটি একটা দিনের জন্য অন্তত বন্ধ রাখার কঠিন প্রত্যয়ও করেছে মনে মনে। কিন্তু এই সব খেঁকশিয়াল নেতাদের আগমনের কারণে তার প্রত্যয় ঠিক থাকে কি না সন্দেহ।
নাসির চৌধুরী তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। চট্টগ্রাম-২ আসনে দু’জনের দ্বন্দ্ব পুরো জেলায় জ্বালামুখীর মতো। সান্নিধ্য আরহামের দিকে তাকাতেই আরহাম কন্ঠ নামিয়ে বলে,"স্যার বিষয়টা আমি হ্যান্ডেল করে আসছি। আপনি এটা নিয়ে ভাববেন না।"
"ভেতরে আসতে বলো।"
"স্যার..।"
" আসতে বলো।"
উপায়ন্তর না পেয়ে আরহাম স্যারের হয়ে অনুমতি দেয়। কিয়ৎক্ষণের মাঝে নাসির চৌধুরী প্রবেশ করতেই বাতাসে বয় টানটান উত্তাপ। দলীয় নেতা কর্মীদের মধ্যে হতে তিনজন তার সঙ্গে অফিস কক্ষে উপস্থিত হয়। নাসির সাহেব আসন গ্রহণ করে ঠান্ডা গলায় বলেন,
"সালাম নেবেন না এমপি সাহেব?"
"কী দরকার?"
"দরকার তো অনেক কিছু। কোনটা রেখে কোনটা বলি।"
সান্নিধ্য বিরক্তিতিতে মুখ তুলে তাকায়। কলম থামিয়ে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
"যেকোনো একটা বলুন। সবগুলো শোনার সময় নেই আমার।"
"তোমার লোকজন গতকাল আমার কর্মীদেরকে পিটিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। এটা কিসের রাজনীতি?"
"রাজনীতি? আপনার লোকজনই তো আমার পিছনে লেগেছে।"
নাসির চৌধুরীর চোখ লাল হয়ে উঠে। কর্কশ গলায় তেড়ে উঠে বলেন, "মিথ্যে অভিযোগ। তুমি চট্টগ্রামকে নিজের জমিদারি ভাবো? পুলিশ-প্রশাসন সব কিনে রেখেছো?"
"জমিদারি না জনসেবা। আমি পুলিশ প্রশাসন কিনে রাখলে আপনার চট্টগ্রামে ছাড়ার এক বছর হয়ে যেতো।"
"রাজনীতিতে তোমার চেয়ে বয়স বেশি আমার। টক্কর দিতে এসো না। ক্ষমতা পেয়েছো পাঁচ বছরের মাত্র। এর মধ্যে দুই বছর প্রায় শেষ । আছেই আর তিন বছর তারপরে কিন্তু এতো জবান ফুটবে না। আমার কর্মীদের গায়ে হাত আমি বরদাস্ত করবো না।"
"খেলা না জানলে খেলতে আসবেন না। রাজনীতি করবেন মার খাবেন না এই ভাবনা ভুলে যান। আপনার লোক আমার লোকদের মেরেছিলো গতমাসে। কালকে তারা সুযোগ পেয়েছে মেরেছে। আর কিছু?"
নাসির চৌধুরীর চোখে আগুনের রেশ দেখা যায়। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠে।গর্জিত সুরে বলেন,
"এমপি সাহেব বেশি বাড়াবাড়ি করো না। একদম ঘাড় ভেঙে মাটিতে মিশিয়ে দিতে সময় নিবো না। আমার দিকে আঙুল নামাও এখনও সময় আছে। পাঁচ বছর কিন্তু এই গদিতে বসে পূর্ণ করতে দিবো না।"
সান্নিধ্য বাঁকা হাসে। ঠোঁটের উপর ঠোঁট কামড়ে বলে,
"আপনার কয় নাম্বার বাপ আমাকে গদি কিনে দিয়েছে নাসির চৌধুরী। না মানে জানতে ইচ্ছে হচ্ছে, আপনার কোনের বাপের গদিতে আমি বসে আছি।"
"এই.. এমপি। "
" গলা নিচে। আমার কার্যালয়ে এসে আমার সাথে গলাবাজি করবে না। আমি চাইছি না তোমার হাড়গোড় আলাদা করতে। আজকে আমার জন্য ভালো দিন। ভালো থাকতে দাও। বের হও। এসব নাকে কান্না করতে আসবে না নেক্সট টাইম থেকে।"
নাসির চৌধুরীর সঙ্গে থাকা পোষ্যগুলো ফুঁসে উঠতেই আরহামের চোখের রাঙানিতে দমে যায়। উত্তপ্ত কন্ঠস্বর ভেদ করে বলে,"মোটেও এই ভুল করবে না। এক পা সামনে আগাবে তো স্যারের অনুমতির আগেই পা ঝুলিয়ে হাতে ধরিয়ে দিবো।"
নাসির চৌধুরী হাত মুঠো করে টেবিলে করাঘাত করে উঠে দাঁড়ান। আঙুল উঁচিয়ে সান্নিধ্যের সামনে ক্রুব্ধ কন্ঠ উগড়ে দিয়ে বলেন,"তোর বাপকে এই নাসির চৌধুরী দমিয়েছে। একদম ফাঁকা মাঠে গোল দিয়েছে। তুই সেই কুত্তার বাচ্চা হয়ে আমাকে শাসিয়ে যাস? আমাকে চিনতে এতো ভুল?"
সান্নিধ্য চুপ করে বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। নাসাপথে তার দীর্ঘ শ্বাস বায়। এ জীবনে তার আর ভালো হওয়া হবে না। পাঞ্জাবির হাতা গুটাতে গুটাতে সে সরাসরি যায় দরজা বন্ধ করতে। দরজা বন্ধ করা শেষে নাসির চৌধুরীর সম্মুখ এসে দাঁড়িয়ে শান্ত চোখে তাকিয়ে সপাটে একখানা গালে থাপ্পড় বসিয়ে দেয়।
আকস্মিক থাপ্পড়ে নাসির চৌধুরী হতবিহ্বল হয়ে উঠে। গালে হাত দিয়ে বিস্ফোরিত নেত্রে তাকাতেই সান্নিধ্য ধারালো চোখে তাকিয়ে বলে, " বাপ ডাকবে আমাকে চৌধুরী। আজকে একটু শাসন করলাম বাপ হয়ে।পরবর্তীতে বেত্রাঘাত করবো।"
নাসির চৌধুরী দু কদম পিছিয়ে যান। গালে লাল হাতের ছাপ স্পষ্ট হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। সান্নিধ্যের দিকে দৃষ্টি রেখে সে বিক্ষুব্ধ মনে পকেট হতে রুমাল বের করেন। বাম হাত দিয়ে গাল মুখ মুছতে মুছতে বলেন," হিসেব বাকি রইলো এমপি। এই অপমান চৌধুরী ভুলবে না।"
" আপনি হিসাবের খাতা খুলতে থাকুন আমরা আছি। সমস্যা নেই।"
আরহামের ঠান্ডা স্বরের জবাবে নাসির চৌধুরী নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকেন।সঙ্গে থাকা জাফর ভারী কন্ঠে বলেন, "স্যার চলুন। দেখা হবে পরে।"
দরজা খুলে হনহনিয়ে বেরিয়ে যান নাসির চৌধুরী। স্ফুলিঙ্গের ন্যায় জ্বলতে থাকা মুখোরেখায় সে নিরবে কঠিন বার্তা দিয়ে যান। এদিকে এমপি সাহেবের আজকে এতো ঠান্ডা মেজাজ দেখে আরহাম দ্বিরুক্তি না করে সরাসরি জিজ্ঞেস করেন,"স্যার আপনি আজকে কিছুই করলেন না। সুস্থ শরীরে নাসির চৌধুরী বেরিয়ে গেলো?"
"কালকের কাটা হাত এখনো ঠিক হয়নি আমার। আজকে ফর্মে ফিরলে আবার কাটতো।"
"স্যার মেডিসিন আনবো?"
"নো নিড। এসির পাওয়ার বাড়িয়ে দাও।"
সান্নিধ্য নিজের চেয়ার টেনে শরীর এলিয়ে বসে। চোখ বন্ধ করে নিজেকে ক্রমাগত শান্ত করার প্রয়াস চালিয়ে যায়। ধারালো মুখোরেখায় ভিতরটা তার দগ্ধ হচ্ছে। একটা থাপ্পড়ে তার আয়েশ মেটেনি। সময় করে সে আবারো নিরব অভিযান চালিয়ে আয়েশ মিটিয়ে নিবে।
"ভাই, ভাবী আসছেন।"
সান্নিধ্য এক নিমিষে চোখ খুলে ফেলে। জ্বলন্ত চোখদুটো তার দপ করে নিভে যায়। শেহরিন আসছে? অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকাতেই আসিফ ফের ব্যস্তস্বরে বলে,"রিমনের সাথে এসেছে।"
"কোথায়?"
"নিচে। আপনার কাছে আসছেন।"
" আচ্ছা তোমরা যাও।"
আরহাম স্যারের সামনে হতে স্বাক্ষরিত ফাইলগুলো দ্রুত তুলে চলে যায়। এমপি সাহেব তিনশো ষাট ডিগ্রি এঙ্গেলে পুরোপুরি ঘুরে গিয়েছেন। একটু আগের এমপি সাহেব আর বর্তমানের এমপি সাহেবের মাঝে বিস্তর ফারাক।শেহরিন ম্যাডাম কি জাদুবিদ্যায় পারদর্শী? নাকি স্যার নিজেই অদৃশ্য মায়াজালে পেঁচিয়ে গিয়েছেন? সদুত্তর খুঁজে পায় না আরহাম।
আরহাম, আসিফ দু'জনে চলে যেতেই সান্নিধ্য টেবিলে রাখা কাচের গ্লাসের পানি এক দমে নিঃশেষ করে ফেলে। নিজেকে যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণ রেখে হাতের কেটে যাওয়া অংশটা ঢাকার জন্য মেডিকেল স্কচ টেপ লাগিয়ে নেয় ড্রয়ার হতে।
"আসবো?"
সান্নিধ্য দৃষ্টি তোলে না সম্মুখ দরজা পানে। হাতের স্কচ টেপটা ঠিকঠাক লাগিয়ে নিতে নিতে স্নিগ্ধ কামিনীর কন্ঠস্বরে মাত হয়ে বিরবির করে বলে,"আপনার জন্য পারমিশন শব্দটা উৎখাত করা হলো। সবসময়ের জন্য সর্বজায়গায় উন্মুক্ত।"
"শুনতে পাচ্ছেন? ভিতরে প্রবেশের অনুমতি কি পেতে পারি?"
"আসো।"
শেহরিন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সান্নিধ্যের পানে তাকিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। চোখে মুখে তার দীর্ঘ জার্নির ক্লান্তিকর রেশ ছেয়ে আছে। কাঁধ ছেড়ে যাওয়া খোলা চুলগুলো হতে কিছু চুল মুখজুড়ে ঘটিয়েছে বিচরণ।
"আপনার সঙ্গে কিছু কথা আছে আমার।"
"বসো।"
শেহরিন চেয়ার টেনে সান্নিধ্যের সম্মুখে বসে। স্নিগ্ধ মুখোরেখায় তার শক্ত চাহনি বজায় রেখে থমথমে গলায় বলে,
"সমস্যা কি আপনার?"
"কোনো সমস্যা নেই।"
"বাড়াবাড়ি করে ফেলছেন না? সারা দুনিয়া জুড়ে আমাকে খোঁজ করার মানে কি?"
সান্নিধ্য চোখ তুলে তাকায়। রাগিনী কান্তার মুখ তার নজরদারিতে পড়তেই বুকের বা পাশটায় হঠাৎ মেঘহীন কালবৈশাখী ঝড় উঠে। রক্ত চলাচল বেড়ে যায় শরীরে।খানিক সেকেন্ড পলকহীনভাবে তাকিয়ে থেকে দীর্ঘ দিনের চোখের তৃষ্ণা মেটায় সে।
"আপনাকে আমি কিছু জিজ্ঞেস করেছি।"
"খোঁজ না করার কারণটা বলো।"
"আপনার সঙ্গে আমার খোঁজ করা বা রাখার কোনো সম্পর্ক নেই।"
"তুমি আমাকে উত্তর না দিয়েই বিদেশ পাড়ি দিয়েছিলে কেন?"
শেহরিন দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে। কঠিন স্বরে বলে,"আপনার প্রশ্নের উত্তর আমার আগেই 'না'। এটা আমি আমি সেদিনই বলে দিয়েছি। আপনার তারছেঁড়া মাথায় যদি সেটা না ঢুকে তার দায়ভার কি আমার?"
"অবশ্যই দায়ভার তোমার।"
"কিভাবে?"
"তুমি না করছো কেন?"
"কারণ আপনাকে আমার পছন্দ নয়।"
সান্নিধ্য বুকের সাথে হাত ভাঁজ করে শেহরিনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে। শীতল চোখে তাকিয়ে বলে, "তোমার আমাকে পছন্দ করতে হবে না। আমি তোমাকে পছন্দ করি এটা দিয়েই হবে। একজনের পছন্দ নিয়েই আপাতত বিয়েটা করি। তারপরে বাকি সবকিছু...
" চুপ। আপনাকে আমি মেরে ফেলবো।"
"তেরোদিন আগেই মেরে ফেলেছো।"
" ভুল হয়েছে আসার সময় একটা স্টিক সঙ্গে আনা উচিত ছিলো। আপনার মাথায় বাড়ি দিয়ে ভূত নামাতাম আর এই অফিস ভেঙে চুরমার করে দিতাম।"
"মাথা হতে ভূত নামবে না এটা শিউর। বাট এই অফিসের সবকিছু সরকারের। ক্ষতিপূরণ নিজের পকেট থেকে দিতে হবে এইটুকুই জাস্ট। বাট আই উই'ল ম্যানেজ ইট।"
শেহরিন রাগে দগ্ধ হয়ে উঠে। মুখজুড়ে তার লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে। সে পারছে না এমপি সাহেবকে হাতে মারতে। বড় বড় চোখে তাকিয়ে বলে,
"বেশি বাড়াবাড়ি মোটেও ভালো না। আপনি অতিরিক্ত করে ফেলছেন।জানেন মামার বাসায় আমার একটা ব্যাড ইমেজ ক্রিয়েট হয়েছে আপনার জন্য। সবাই সন্দেহ করছে আপনার আমার সম্পর্ক নিয়ে।"
"শান্ত হও। উনাদের সন্দেহটাকে সত্যি করলেই তো বিষয়টা সলিউশন হয়ে যায়।"
" আপনি নিজের প্রতি এতো আত্মবিশ্বাস কিভাবে আনেন বলবেন প্লিজ?? মানে আপনার যাকে পছন্দ হবে তাকেই আপনার চাই, যাকে পছন্দ করেছেন সে চাইছে কি না, না চাইছে সেটা দেখার সময় নেই? তাই না?"
" আত্মবিশ্বাস আমার বরাবরই একটু বেশি থাকে নিজের প্রতি। তার উপরে তুমি আজকে আমার কার্যালয়ে নিজে হতে এসে আরো বাড়িয়ে দিয়েছো।"
"আমি বাধ্য হয়ে এসেছি আপনাকে সর্তক করতে। শখ করে মোটেও নয়।"
"কি সর্তক?"
"দেখুন আপনাকে আমি ভালোই ভালো বলছি এসব পাগলামি বন্ধ করুন ।আমি রাজনীতি মোটেই পছন্দ করি না। পুরো চট্টগ্রাম জুড়ে অনেক মেয়ে আছে তাদের ভিতর হতে কাউকে পছন্দ করে বিয়ে করে ফেলুন। চট্টগ্রামে না হলে...
"বসুন্ধরা ডি ব্লক রোড নাম্বার ৩১০ এর হোয়াইট রঙের বাসায় যে মেয়ে থাকে তার খোঁজ করুন তাই তো? "
শেহরিন ক্ষুরধার দৃষ্টিতে তাকায় সান্নিধ্যের দিকে। কপালের শিরাগুলো তার জেগে উঠেছে স্পষ্টভাবে।
"গ্লাসে যদি এই মুহূর্তে পানি থাকতো বিশ্বাস করুন সত্যি আপনার মুখে আমি নিক্ষেপ করতাম।"
সান্নিধ্য হাতের ভাঁজ ছেড়ে পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে ঘড়িতে এক পলক সময় দেখে নেয়। শান্ত কন্ঠে বলে, "সেজন্য পানি আমি আগেই খেয়ে ফেলেছি।"
"কি করলে আপনি আমার পিছু ছাড়বেন?"
"বিয়ে করলে। ট্রাস্ট মি শেহরিন, যদি বিয়ে করতে রাজি হও তাহলে তোমার পিছু একদম ছেড়ে দিবো। আর কখনো তোমার পিছু নিবো না আমি।মালয়েশিয়া ইন্দোনেশিয়া হংকং যেখানেই যাও না কেনো মোটেও চিরুনি অভিযান চালাবো না।"
শেহরিন হাত মুঠো করে চেপে ধরে নিজেকে দমায়। আর কতো রাগ তুলবে সে?এই লোককে আর কিভাবে বললে বুঝবে সে?
"পৃথিবীতে শেহরিন কি একটাই আছে?"
"পৃথিবীতে হাজারটা শেহরিন রয়েছে বাট আমি যাকে ভালোবাসি সেই শেহরিন শুধু একটাই আছে তাও এই মুহুর্তে আমার সামনে বসে। "
"এর মধ্যে ভালোবাসাও হয়ে গেলো?"
সান্নিধ্য আলতো হেসে টান টান হয়ে বসে। অতঃপর খানিকটা শেহরিনের দিকে ঝুঁকে নরম গলায় বলে,"তোমার ছয়টা দিনের অনুপস্থিতি সহ্য করা আমার জন্য ভীষণ দূর্বিষহ ছিলো। কতোটা দূর্বিষহ সেটা আর না বলি।সম্পর্কের শুরুতেই এমন দূরত্ব সৃষ্টি করে ফেলেছিলে যার ইফেক্টে তোমার প্রতি আমার কঠিন ভালোবাসা হয়ে গিয়েছে। বিয়ে ছাড়া এটা থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় নেই।"
"আপনি হাজার চেষ্টা করলেও আমি আপনার প্রেমে সাড়া দিচ্ছি না। দুঃখিত।"
"তোমার কিছুই করতে হবে না। শুধু আমার ভালোবাসাটাকে সহ্য করো।"
শেহরিন স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সান্নিধ্যের দিকে। বাবা ঠিক বলেছে সত্যি তার অনেক ধৈর্য্য। না হলে এতোক্ষণ ধরে সে এই ব্যক্তির সামনে কিভাবে বসে আছে।
"আপনাকে বুঝিয়ে লাভ নেই যা খুশি করুন আপনি। তবে শেহরিন ও তার কথা হতে সরবে না।"
" একটু বোঝার চেষ্টা করো। নাটক সিনেমার মতো নায়ক হয়ে তোমার পিছনে যে একটু ঘুরঘুর করে মানানোর ট্রাই করবো ওইটুক সময়ও আমার হাতে নেই। আমার হাতে মাথায় ভীষণ কাজের চাপ। এই যে কাগজ ফাইলগুলো দেখছো এগুলো সব আমাকে দেখতে হবে। কনফার্ম করতে হবে। একশো একটা বাজেট আর প্রস্তাবনা। সঙ্গে তো মিটিং মিছিল আছেই..
তুমি প্লিজ মেয়েদের ধর্ম হতে একটু ব্যতিক্রম হও। এক কথায় রাজি হয়ে গিনেস বুকে রেকর্ড করো। আমি শিউর তোমার থেকে অনেক মেয়েরাই অনুপ্রেরণা পাবে।"
" এতোই যখন কাজের চাপ তখন আপনাকে বিয়ে কেন করতে হবে?"
"বিয়ে ম্যান্ডেটরি কাজ। আমার হক আছে তোমার প্রতি।"
শেহরিনের কান ঝাঁঝরা হয়ে উঠে । সে আর সহ্য করতে পারে না। তড়িৎ গতিতে উঠে দাঁড়িয়ে কাঁধে ব্যাগ ঝুলায়। মুখো চোয়াল শক্ত করে বলে,
" রাজনীতি যারা করে তারা যে ভিন্ন গ্রহের প্রাণী আজ সেটার সুস্পষ্ট প্রমাণ পেলাম। সান্নিধ্য শাহজাদ খান আপনি পাবনা সোজাসুজি যান। এটাই আপনার জন্য পার্ফেক্ট সলিউশন। আসি।"
শেহরিন বের হতেই আসিফ ব্যস্ত পায়ে উপরে উঠে। সান্নিধ্যের কেবিনে ঢুকেই নিরেট গলায় বলে,"স্যার ম্যাডামকে একা ছাড়া ঠিক হবে না।বৃষ্টি হচ্ছে। তার উপরে নাসির চৌধুরীর লোকজন আসে পাশেই আছে। ম্যাডামকে ওরা দেখেছে আসার সময়।"
সান্নিধ্য কাজ ফেলে তৎক্ষনাৎ উঠে দাঁড়ায়। ফোন,ওয়ালেট পকেটে ঢুকিয়ে সরাসরি কক্ষ হতে বের হতে হতে বলে," এদিকটা ম্যানেজ করো। আর সাইট পরিদর্শনের সময়টা ছয়টার দিকে দিতে বলো।"
"স্যার প্রটোকল?"
"দরকার নেই।"
ঝুম বৃষ্টিতে আকাশ ভারী। দুপুরের বেলা পাল্টে মনে হচ্ছে সন্ধ্যা নেমেছে।মেঘের গর্জন হুংকার ছাড়ে গলা তুলে। শনশনে বাতাসে চারদিকটা ছেয়ে যায় মুহুর্তেই।
শেহরিন কার্যালয় ছেড়ে কয়েক কদম এগোতেই ঝড়ো বৃষ্টির কবলে পড়ে। উপায়ন্তর না পেয়ে রাস্তার এক পাশে ছাউনিতে দাঁড়িয়ে গা বাঁচায় কোনমতে। শরীর হতে বৃষ্টির পানি ঝাড়ার লগ্নে ঠিক তার সম্মুখে এসে দাঁড়ায় সাদা রঙের একখানা গাড়ি। ফ্রন্ট লাইটের থেমে থেমে জ্বলা আলো তার চোখে গিয়ে লাগে। ভালোভাবে চোখ তুলে তাকাতেই সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির দরজা খুলে যায়।
"উঠো।"
ভ্রু দ্বয় বাঁকা হয়ে আসে শেহরিনের। ঠোঁট নাড়িয়ে বিরবির করে উচ্চারণ করে,"এমপির ঘরের এমপি আমি আমার বাসা চিনি। আমার কিসের দায় পড়েছে গাড়িতে উঠা।"
"উঠতে বলেছি।"
"আপনার কি বিবেকবুদ্ধি সব লোপ পেয়েছে? এতো কথা হয়ে যাওয়ার পরেও পিছু ছাড়ছেন না।"
"গাড়িতে উঠে যা খুশি বলো। আমি শুনছি। "
"প্লিজ আমাকে আমার মতো ছাড়ুন। আমার কোনো প্রয়োজন নেই হেল্প নেওয়ার।"
"এদিকের এরিয়াটা ভালো না। একা একা যেতে পারবে না।"
"আমি পারবো যেতে আপনাকে এতো ভাবতে হবে না।"
"শেহরিন জেদ করো না। আমাকে আবার ফিরতে হবে। রাজনীতি নিয়ে তোমার খারাপ ধারণা থাকতে পারে বাট মানুষ নিয়ে নয় আশা করি। এই মুহূর্তে তোমার সেফটিটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।"
শেহরিন দৃষ্টি শিথিল করে সান্নিধ্যের সিরিয়াস ভঙ্গিমায় বলা কথায়। আশেপাশে তাকিয়ে দেখে সত্যই জনবহুল শূন্য। এই সময় একা একা বাসায় ফেরা একটু কঠিনই তার জন্য। তারউপরে ভেজা শরীরে রাস্তায় চলাচল বিষয়টা একটু দৃষ্টিকটুই হয়ে যায়। ঠোঁট গোল করে নিঃশ্বাস ছেড়ে সে চুপচাপ উঠে বসে গাড়িতে।
"এমপি মানুষ আপনার উচিত জনগণের সেবা করা। আমি বিপদে পড়েছি তাই আপনার থেকে সাহায্য নিয়েছি। অন্যকিছু না ভাবলে খুশি হবো।"
সান্নিধ্য কোনো প্রতিত্তুর করে না। স্টিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে সামনের দিকে দৃষ্টি রেখে ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটিয়ে তোলে। বৃষ্টির ধারায় মন তার এখন শান্ত। মরুভূমির উত্তাপ অবশেষে ক্ষান্ত হয়ে পশলা বৃষ্টির দেখা দিয়েছে। পাশে রেখেছে তার বুকে ঢেউ তোলা খরস্রোতা নদীকে। যে নদী অশান্ত, উত্তাল। সহজে বাঁক নেয় না তার পানে।
পিচঢালা বৃষ্টি ভেজা রাস্তায় শাই শাই করে গাড়ি ছুটে যায়। ওয়াইপারের ক্রমাগত উত্থান পাথানে বৃষ্টির ভারী কণাগুলো কাচের গা লেপটে নিচে নেমে আসে । শেহরিন নিরব চাহনিতে সেদিকে তাকিয়ে দেখতে থাকে একমনে। অন্যদিকে একটু পর পর মিরর পানে তাকিয়ে লুকিয়ে ছাপিয়ে দেখে যায় তাকে সান্নিধ্য। এই মেয়েটাকে হাজার দেখলেও হয়তো তার দেখার পিপাসা মিটবে না।মন চায় সারাক্ষণ তাকিয়ে থেকে দেখতে। কিন্তু এমপি সাহেবের কপাল দূর্ভেদ্য। না আছে সময়, না আছে প্রেয়সীর অনুমতি। দু'দিকেই জোড়াতালি ।
খানিক সময় পেরোতেই ঝুম বৃষ্টির বেগ একটু কমে আসে। খুলশী প্রবেশ করতে করতেই শেহরিনের চোখ যায় বাজারে সারি সারি ফুলের দোকান গুলোতে। হলুদ বাল্বের আলোতে লাল টুকটুকে গোলাপ, দোলনচাঁপা, রজনীগন্ধা অপরুপ সাজে সেজে ওঠেছে। তাকালেই যেনো চোখ জুড়িয়ে যায়।
শেহরিনের মাথায় হঠাৎ দুষ্টু বুদ্ধি খেলে। এমপি সাহেবের দিকে এক পলক তাকিয়ে সে বাঁকা হাসে। ব্যাটাকে জব্দ করার একটা দারুণ উপায় পেয়েছে। দম টেনে সে নিজেকে ধাতস্থ করে পরিষ্কার কন্ঠে বলে,
"শুনুন জনগণের এমপি সাহেব একটু গাড়ি দাঁড় করান।"
"কেন?"
"আমার একটা জিনিস কিনতে হবে।"
সান্নিধ্য গাড়ি স্লো করতে করতে জিজ্ঞাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, "কি?"
"আমার কিছু ফুল কিনতে হবে। দয়া করে একটু উপকার করুন। টাকা দিচ্ছি কিছু ফুল কিনে এনে দিন। পিচ রঙের গোলাপ ফুল। ন্যাচারাল হেয়ার অয়েল বানাবো।"
সান্নিধ্য গাড়ি থামিয়ে শেহরিনের দিকে তাকায়। শেহরিন মুখোরেখা শক্ত রেখে বলে,"পারবেন না?আচ্ছা আমি যাচ্ছি।"
"কিনতেই হবে?"
"হ্যাঁ।"
সান্নিধ্যের ঘাম ছুটে যায়। প্রথমত ফুলের দোকানে লোকসমাগম বেশ দ্বিতীয়ত সে তাড়াহুড়োতে সঙ্গে মাস্কটাও আনেনি। এভাবে পাবলিক প্লেসে সবার মাঝ হতে গোলাপ ফুল কেনাটা যে তার পক্ষে ভীষণ কঠিন একটা কাজ সেটা এই মেয়েকে বুঝাবে কি করে সে। হাজার হোক যে ট্যাগটা এখন তার সাথে লাগানো সেটা উপেক্ষা করে সাধারণ একটা কাজ করলেই নিউজে ছড়াছড়ি হয়ে যাবে।
শেহরিন সান্নিধ্যের অবস্থা দেখে মুখ টিপে হাসে। মনে মনে বলে,"বুঝ ব্যাটা প্রেম করার শখ কতো। আর প্রেম করতে চাইবি?
আজকের পর থেকে মাথা থেকে শেহরিন ভূত এমনি এমনি নেমে যাবে। পুলিশ প্রোটোকল নিয়ে চলা এমপি সাহেব নাকি যাবে বাজারের মাঝে ফুল কিনতে।
"আচ্ছা বুঝতে পেরেছি আপনি পারবেন না। আমিই যাচ্ছি।"
"ওয়েট।"
"থাক এতো কষ্ট করতে হবে না। হাজার হোক মান সম্মানের ব্যাপার। আপনি কি আর আমাদের মতো সাধারণ মানুষ নাকি। আপনি হচ্ছেন চট্টগ্রামের ডন।"
সান্নিধ্য শেহরিনের চোখ মুখের উচ্ছ্বসতা দেখে তার চালাকি আলগোছে ধরে ফেলে। ঠোঁট চেপে কিয়ৎসেকেন্ড ভাবনা শেষে সিটবেল্ট খুলে চুপচাপ নেমে যায় গাড়ি হতে। অতঃপর বৃষ্টি মাথায় করে সে সরাসরি চলে যায় ফুলের দোকানগুলোতে।
শেহরিনের চোখের সঙ্গে সঙ্গে মুখও এক লহমায় হা হয়ে যায়। এমপি সাহেবের ফুল কিনতে যাওয়ার বিষয়টা তার কাছে অবিশ্বাস্য লাগে। তার পুরোপুরি ধারণা ছিলো উনি যাবেন না। যাওয়ার কথাও নয়।কিন্তু....??
সান্নিধ্য যথাসম্ভব দ্রুত পায়ে এসে দাঁড়ায় ফুলের দোকানে। আশেপাশের মানুষ তার দিকে উজবুকের ন্যায় তাকিয়ে থাকলেও সেদিকে বিশেষ একটা নজর দেয় না সে। পকেট হতে ওয়ালেট বের করতে করতে হ্যাংলা পাতলা ছেলেটাকে বলে,
"সবগুলো গোলাপ কত?"
"এমপি স্যার।"
"ভাই ডাকাডাকি পরে করিস। গোলাপ গুলো তাড়াতাড়ি দে।"
"স্যার আমার দোকানে আইছেন। সব ফ্রি আপনার জন্য।"
সান্নিধ্য এক হাজার টাকার নোট হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে," সব ফ্রি হলে আর ব্যবসা করা লাগবে না।"
"স্যার চারশ টেকা দাম।"
"রাখ ব্যাটা।"
এক ঝাঁক গোলাপ হাতে নিয়ে সান্নিধ্য দোকান হতে বের হয়ে যায় দ্রুতপায়ে। কিন্তু চোখের দৃষ্টি তার ঠিকই পড়ে কিছু ক্যামেরাবন্দী লোকের দিকে। যারা তার ছবি এমনকি ভিডিও মুঠোফোনে ইতিমধ্যে তুলে ফেলেছে।
সান্নিধ্য শতভাগ নিশ্চিত কালকের গরম সংবাদ হিসেবে খবরের কাগজে প্রকাশিত হবে," বৃষ্টির দিনে চট্টগ্রাম -২ আসনের সংসদ সদস্যের দেখা পাওয়া গেলো গোলাপের দোকানে।
কেউ হয়তো রসিয়ে রসিয়ে প্রকাশ করবে,"কে সেই নারী যার কারণে বৃষ্টিতে ভিজে ফুল কিনলেন এমপি সাহেব? "