পূর্ব আকাশে রঙিন আলো ফুটছে মৃদুমন্দ বাতাসে। মেঘের বাহুডোরে সূর্য লুকিয়ে হাসে মাথা উঁচু করে গাছের ফাঁকে ফাঁকে।
চট্টগ্রামের সিআরবি রোড ধরে আজও শেহরিনের বিচরণ।কোমল কান্তা ডানহাতের আঙুলগুলো মুখের উপর ছড়িয়ে রেখে মিটিমিটি করে সূর্য দেখে আপনমনে। সদ্য ফোঁটা সোনালি এক চিলতে আলো তার মুখে উপচে পড়তেই হেসে উঠে খিলখিলিয়ে।
কিছুটা সময় কাটায় সে নিভৃতে। প্রকৃতি অভয়ারণ্যেতে নিজের মতো সবুজ রং লাগিয়ে আবারো হাঁটা ধরে সেই চায়ের মামার দোকানে।সেদিনের চা টা তার কাছে ভীষণ মজা লেগেছিলো।আজও তাই আরো একবার সেটার স্বাদ নিতে অগ্রসর হয় সেই পথে।
"স্যার... ম্যাম আসছেন।"
"তুমি দূরে গিয়ে দাঁড়াও।"
"ওকে স্যার।"
"ওয়েট ওয়েট। সেলিম মামাকেও নিয়ে যাও সাথে।"
রিমন চলা পথে হাঁটা থামায়। কপালে হাত দিয়ে ঘুরে তাকায় স্যারের দিকে। হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে করুণ গলায় বলে,
"স্যার সেলিম মামারই এটা চায়ের দোকান। উনি গেলে চা বানিয়ে দিবে কে?"
সান্নিধ্য মুখে মাস্ক ঠিক করে নেয়। অতঃপর পকেট হতে ফোনটা বের করে সরল কন্ঠে বলে,"মিসটেক।"
"স্যার আপনি কি নার্ভাস ফিল করছেন?"
"হুঁশ কি বলো! আমি কেন নার্ভাস ফিল করবো? প্রথম প্রথম তাই একটু এলোমেলো হচ্ছে ।"
"না মানে আপনি যখন মার্ডার কেসগুলোতে সংযুক্ত থাকেন তখন আপনার মুখে বিন্দুমাত্র অনুতাপ কিংবা এরকম নার্ভানেস থাকে না। তাই আর কি।"
"আমাকে এতো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে না। তুমি আমার প্রেমিকা নও। যেতে পারো।"
"জ্বি স্যার।"
রিমন চলে যায়। সান্নিধ্য একপলক পিছনে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে তার অজান্তা বকুল ফুলকে। যে কিনা ধীরপায়ে আনমনে হেঁটে আসছে তার অভিমুখে। ঠোঁটের কোণে সূক্ষ্ম হাসি ফুটে উঠে এমপি সাহেবের। তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি সরিয়ে বসে পড়ে সে কাঠের বেঞ্চিতে। চা দোকানদার সেলিম মামাকে হাতের ইশারায় চায়ের অর্ডার দিয়ে মনোযোগ দেয় ফোনের দিকে।
কিয়ৎ মুহুর্তের মধ্যে শেহরিন এসে উপস্থিত হয় সেখানটায়। কিন্তু এসেই সর্ব প্রথম তার চোখ পড়ে অজানা সেই মাস্ক পরিহিত আগুন্তকঃ এর দিকে। কিঞ্চিৎ ভ্রু বেঁকে উঠে তার। চায়ের অর্ডার দিয়ে এসে আঁড়চোখে নজর বুলিয়ে বুঝতে চেষ্টা করে সেদিনের সেই লোকটাই এটা নাকি। সেদিনতো কবিতা আবৃত্তি করা এমপি সাহেবের মতো লেগেছিলো। আজকেও তার ব্যতিক্রম কিছু মনে হচ্ছে না। দৈহিক গঠন অবায়ব তো তাই বলছে।
"মামা আজকে একটা বেঞ্চ কেন?"
" আরেকটা বেঞ্চের দুই পায়া ভাইঙ্গা গেছে মামা। আজকের জন্য একটু কষ্ট করে বসেন।'
"পায়া ভেঙে গেছে। কিভাবে মামা? দুইদিন আগে তো ঠিক ছিলো।"
"জানি না। দোকান খুলবার আইসা দেখি ভাইঙ্গা পড়ে রইসে।"
শেহরিন ঠোঁট গোল করে নিঃশ্বাস ফেলে। উপায়ন্তর না পেয়ে আগুন্তকঃ সাহেবের বসা বেঞ্চের এক পাশে বসে।
কিছু সময়ের চুপচাপ নজরদারিতে বুঝতে পারে সেদিনের সেইজনই আজকের জন। শুধু মাত্র পরিবর্তন হিসেবে রয়েছে পরিহিত কালো টি শার্টের বদলে আজকে রিয়াল মাদ্রিদের সাদা জার্সি আর ধূসর প্যান্ট।
সেলিম মামা দু কাপ চা নিয়ে আসে দুজনের জন্য। সান্নিধ্য নিজের চায়ের কাপটা নিয়ে পাশে রেখে দেয়। অপরদিকে শেহরিন তার চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে অপেক্ষায় থাকে পাশে বসা মানুষটার মুখোরেখা দেখার জন্য। মাস্ক খুললেই তার ধারণা ক্লিয়ার হয়ে যাবে।
"মামা আজকে দোকানে কাস্টমার দেখছি না কেন?"
"বুঝবার পারতেছি না মামা। আইজ কেন যে এমন হইতাছে।"
"ব্যাড লাক।"
শেহরিন পাশে বসা ব্যক্তিটির দিকে নজর ঠিক রেখে সেলিম মামার সাথে আলাপে মগ্ন হয়ে উঠে। নানান ধরনের পারিপার্শ্বিক আলোচনায় ভীষণ ব্যস্ত দু'জনে। আর এতেই এমপি সাহেব মনে মনে বিরক্ত হয়ে উঠে। এতো ধৈর্য্য তার নেই। তাকে উপেক্ষা করে এভাবে আলাপে মশগুল হওয়াটা মোটেও গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না। এদিকে সময়ের মতো সময় ঠিকই পার হচ্ছে।
কিছু সময় পার হতেই,ফোন সুইচঅফ করে পকেটে ঢুকিয়ে নেয় সান্নিধ্য। নিজেকে প্রস্তুত করে শেহরিনের সঙ্গে কথা বলার জন্য। তবে নিজস্ব বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেয় আগেই বিয়ের প্রোপ্রোজাল দিবে না বা নিজের পরিচয় উন্মুক্ত করবে না। কারণ,যতটুকু বুঝেছে মেয়েটা রাজনীতি অপছন্দ করে। সেক্ষেত্রে একটু যাচাই-বাছাই না করে নিলেই নয়। যদি ডিরেক্ট রিজেক্ট করে তো সমস্যা। আগে একটু রাজনীতির ভালো দিকগুলো বুঝাতে হবে।
"স্যার...স্যার.."
সান্নিধ্যের মুখ খোলা মুহুর্তে রিমন তড়িৎ গতিতে ছুটে আসে। হাঁপানো কন্ঠস্বর ভেদ করে তাড়াহুড়ো গলায় বলে, "স্যার আপনাকে একটু পরই যেতে হবে। ডিসি সাহেব ফোন করেছিলেন ।"
অসময়ে অনুচিত কাজ। সান্নিধ্য হাত মুঠো পাকিয়ে চোখ বন্ধ করে নেয় সঙ্গে সঙ্গে। শেহরিন অবাক চোখে তাকিয়ে দেখে এমপি সাহেবের সেই অ্যাসিট্যান্টকে যে কিনা তাকে খাবার দিয়েছিলো মাঝ রাস্তায়।
"আরে আপনি?"
"সরি ম্যাম আপনাদের মাঝে একটু ডিস্টার্ব করলাম।"
"স্যার কে?"
"ইয়ে..আপনার পাশে ম্যাম।"
সান্নিধ্য মাথা নিচু করে চোখ বন্ধ করে নিজের ধৈর্য্যের চূড়ান্ত পরীক্ষা দিতে থাকে ক্রমশ। শেহরিন রিমনের থেকে চোখ ঘুরিয়ে দৃষ্টি স্থাপন করে পাশে বসা পুরুষটির দিকে। মাথা খানিকটা নিচ দিকে ঝুঁকিয়ে ঘাড় কাত করে সেও অবাক চাহনি নিক্ষেপ করে এমপি সাহেবের দিকে। সান্নিধ্য চোখ খুলে তাকায়। তার দিকে বিস্মিত চাহনি ফেলা রমণীকে দেখে গম্ভীরমুখে ভ্রুদ্বয় উঁচিয়ে বোঝায়,কি হয়েছে?
শেহরিন মাথা নাড়িয়ে ঘাড় সোজা করে ঠিকঠাক হয়ে বসে। একটু আগে মস্তিষ্কে জমাট বাঁধানো সকল প্রশ্নের সমাধান মেলে তার ধীরে ধীরে। সান্নিধ্য মুখ হতে মাস্ক খুলে ফেলতেই সেদিকে একনজর তাকিয়ে সন্দেহমাখা কন্ঠে বলে, "আমার ধারণা পুরোপুরি ঠিক তাহলে। কবিতা আবৃত্তি করা এমপি সাহেব অবশেষে ধরা পড়েছে জনতার হাতে।"
সান্নিধ্য শেহরিনের কথায় বিশেষ আমলে না নিয়ে সরাসরি তাকায় রিমনের দিকে।ভারী গলা উন্মুক্ত করে বলে,
"একশো গজের মধ্যে যদি থাকো তাহলে..."
"সরি স্যার এক্ষুণি চলে যাচ্ছি। তবে সময়টা একটু খেয়াল রাখবেন স্যার।ইমার্জেন্সি।আপনার ফোন বন্ধ তাই হুট করে..
সান্নিধ্যের কড়া চাহনিতে রিমন কথা শেষ করতে পারে না। তার আগেই প্রস্থান নেয় সে তড়িঘড়ি করে।
"জনগণের এমপি সাহেব জনসাধারণের কাতারে বসে চা খায় লুকিয়ে লুকিয়ে। ভেরি ইন্টারেস্টিং ব্যাপার স্যাপার ।মামা দেখুন আপনার কি ভাগ্য!! স্বয়ং এমপি সাহেব এসেছেন চা খেতে আপনার দোকানে।"
"আঁই তো বিশ্বাসই গরির ন পারির। ও আঁর খোদা। স্যার আঁরার কিচ্ছু লাগিবো নি?"
সান্নিধ্য সেলিমকে বারণ করে ব্যস্ত হতে। নিজ কাজে যেতে বলে দৃষ্টি মেলে শেহরিনের দিকে।
"আমার হাতে যে সময় কম আশা করি সেটা বুঝতে পেরেছো।তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে। চুপচাপ শুনবে।"
"এক্সকিউজ মি..এমপি সাহেব। অপরিচিত মানুষকে তুমি করে বলছেন কিভাবে?"
"তুমি আমার পরিচিত।"
"কিভাবে?"
"সেটা এখন জানতে হবে না। পরে জেনে নিয়ো।"
শেহরিন কপাল কুঁচাকায় খানিকটা। জিজ্ঞাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
"কি কথা? দেখুন আগেই বলে রাখছি আমার বাসস্থান ঢাকায়। আমি পিউর ঢাকাইয়া। ঢাকার ভোটার। চট্টগ্রামের নয়।তাই দয়া করে বলবেন না আপনাকে ভোট দিতে।"
শেহরিনের কথায় না চাইতে ও খানিকটা হেসে ফেলে সান্নিধ্য। এই মেয়ে এতোকিছু রেখে সরাসরি ভোটের কাছে চলে গিয়েছে।
যথাসম্ভব শান্ত কন্ঠ বজায় রেখে সে বলে,
"ঢাকা থেকে যেন চট্টগ্রামের ভোটার হতে পারো সেটার জন্যই এসেছি। আই মিন পার্মানেন্ট সলিউশনের ব্যবস্থা করতে।"
" মানে..? "
"মানে খুব সিম্পল।"
"মোটেও সিম্পেল নয়। কমপ্লেক্স কম্পাউন্ড দুটোই। তার মানে চট্টগ্রামে আপনার এলাকায় এবং তার আশেপাশে যারা নতুন আসে তাদেরকে আপনি এভাবে জোরপূর্বক ভোটার বানান ?"
" যদি হ্যাঁ বলি তাহলে এক্ষেত্রে তুমিই প্রথম।"
"সরি আমার থেকে এক্সপেক্ট করে কোনো লাভ হবে না। আমি ভোটারও হবো না। ভোটও দিবো না আপনাকে ।"
"বাট আমার বিশেষ ভোটটা লাগবেই। পরবর্তী পাঁচ বছরে আমার এমপি পদটা ধরে রাখার জন্য তুমি অবধারিত। নির্বাচন বাতিল হয়ে যাবে যদি তুমি ভোটার না হও।"
" মাথা ঠিক আছে আপনার?"
"সম্পূর্ণ ঠিক আছে। যাই হোক, ঘড়ির কাঁটার আগে আগে আমাকে দৌড়াতে হয় সবসময়। তাই সময় নষ্ট করতে পারছি না আর। সরাসরি মেইন কথায় যাওয়া উচিত। আমার তোমাকে ভালো লেগেছে। আই ওয়ান্ট টু ম্যারি ইউ।"
শেহরিন স্তব্ধ বনে চলে যায় সরাসরি প্রস্তাবে। গোল গোল চোখ করে তাকাতেই সান্নিধ্য ফের ধীর স্থির কন্ঠে বলে,
"রিলাক্স। এক্সপ্লেইন করছি। আসলে প্রেম করার সময় নেই আমার হাতে তাই সরাসরি বিয়ে করার প্রস্তাব দিলাম। প্রেম করে বিয়ে করা লং প্রসেস। টু বি অনেস্ট আমার পেশেনস লেভেল ভেরি লো।"
"এতো যে এক্সপ্লেইন করছেন আপনি কি ভেবে নিয়েছেন আমি রাজি হয়ে যাবো আপনার কথায়?"
"ফিফটি ফিফটি।"
"সরি ফিফটি নয় মাইনাস ধরুন।"
"মাইনাস খুব কম হয়ে যাচ্ছে আরেকটু বাড়াও।"
"মানে..ভোট চাইতে চাইতে এমন চাওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়ে গিয়েছে আপনার তাই না? বিয়ে তো দূরে থাক প্রেম। আল্লাহ!! আপনার মাথা কি সত্যি ঠিক আছে? আমার কিন্তু সন্দেহ হচ্ছে।"
"শেহরিন..
" নামও জেনে ফেলেছেন আমার?"
"সব জানাই মোটামুটি শেষ।"
"এজন্য সেদিন হাইওয়েতে হা করে তাকিয়ে ছিলেন তাই না?"
"ভালো লাগার মানুষের দিকে তাকানোটা স্বাভাবিক।"
শেহরিনের মেজাজ গরম হয়ে উঠে। সান্নিধ্যের দিকে আঙুল উঁচিয়ে শক্ত গলায় বলে,"বেশি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু এবার। এমপি হয়ে মেয়েদের সাথে এমন ফ্লার্ট করেন তাই না? অবশ্য যারা রাজনীতি করে তাদের সবদিকেই এমন ঝুট ঝামেলা থাকে।"
"রাজনীতি ভালো জিনিস। রাজনৈতিক ব্যক্তিকে বিয়ে করলে তুমিও জনগণের সেবা করার সুযোগ পাবে। সঙ্গে অফুরন্ত সওয়াব তো আছেই। সব দিকেই লাভ।"
"ভূতের মুখে রাম রাম। রাজনীতি যারা করে তারা হচ্ছে এক নম্বরের ধান্দাবাজ। প্রথমে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে ভোট আদায় করে তারপরে সব ভুলে যায়।"
"তোমার মনে হয় আমি ধান্দাবাজি করি?"
"আমার মনে হয় ধান্দাবাজের জনক আপনি।"
"বয়স মাত্র ৩০/৩২।জনক হই কিভাবে?"
"উত্তরসূরী তাহলে।"
সান্নিধ্য উঠে দাঁড়ায়। শেহরিনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শীতল চোখে তাকিয়ে বলে," এসব সাইডে রাখো। এগুলো নিয়ে পরেও ডিসকার্স করা যাবে। একদিন সময় দিলাম তোমাকে। কালকে বিকেলে উত্তর চাই আমার।"
"আমার উত্তর এখনই না।"
"কি করতে হবে আমাকে? বকুল ফুল গানটা আর কয়টা দিনের মাঝেই মুখস্থ হয়ে যাবে। আসলে ব্যস্ততার কারণে মুখস্থ করার সময় পাচ্ছি না।"
শেহরিন পর্যায়ক্রমে বিস্মিত হতে থাকে। বসা ছেড়ে সেও একইভাবে উঠে দাঁড়ায় এমপি সাহেবের সামনে । ভ্রু যুগল বাঁকিয়ে শুধায়,
"বকুল ফুল গান পেলেন কিভাবে?"
"জাদু করে। আচ্ছা কালকে দেখা হচ্ছে।আসি এখন।"
"আপনি কি পাগল?"
সান্নিধ্য পকেট হতে ফোন বের করে রিমনের নাম্বার ডায়াল করতে করতে বলে,
"ছিলাম না। এর পিছনে তুমি দায়ী।"
"আপনি আসলেই পাগল হয়ে গিয়েছেন। পাবনা যান দ্রুত। ওখানে গিয়ে চিকিৎসা নিন। "
"গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে আসো।"
সান্নিধ্য ফোনে কথা শেষ করে শেহরিনের চোখজোড়ায় চোখ রাখে। নিরেট কন্ঠে বলে,"আমার ট্রিটমেন্টের জন্য এক শেহরিনই যথেষ্ট। এক্ষেত্রে পাবনা যেতে হবে না। তুমি থাকলেই হবে।
সময় নাও। তবে সেটা অবশ্যই কালকে কিভাবে হ্যাঁ বলবে সেটা ভাবার জন্য।"
"জোর করছেন? এটা কিন্তু অন্যায়।"
"জোর করলে এখনই কাজি অফিসে চলে যেতাম। আমি তো রেডি। শুধু তোমার জন্য শাড়ি কিনতে হতো।"
"আপনি.."
"শান্ত হও। এখন আসি। কালকে দেখা হচ্ছে। বাই।"
সান্নিধ্য চলে যাওয়া পথে একটুখানির জন্য পা থামায়।সেলিম মামার দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বলে,"ছয় সাতটা বেঞ্চ হলে চলবে?"
"অ্যাঁ?"
"চলবে?"
"জ্বি স্যার।জ্বি স্যার।"
শেহরিন বিমূর্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থেকে এমপি সাহেবের প্রস্থান দেখে ।মাথা তার প্রায় শূন্য। এই লোক এসব কি বলে গেলো? বিয়ে ভোটার কালকের মধ্যে উত্তর? কি ধরনের প্রস্তাব এটা। আদৌও এরকম কিছু হয়?
______________________________________
"তোমার সঙ্গে আমার কয়শো বিঘা জমি নিয়ে বিরোধ?"
"সরি স্যার। বুঝতে পারিনি আপনার কথা।"
"মাথা খাটিয়ে ভাবো ইজিলি বুঝতে পারবে।"
রিমন গাড়ি ড্রাইভ করতে করতে স্যারের দিকে এক পলক চায়। শুকনো গলায় ঢোক গিলে থতমত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,"স্যার সত্যি বলছি ইমার্জেন্সি ছিলো। ডিসি সাহেব যেভাবে বললেন মনে হলো এখনই উড়ে গেলে ভালো হতো।"
"তোমার টাইমিং সেন্স বরাবরই খারাপ রিমন। প্রোগ্রেস করো। আমাকে সব জায়্গায় বাঁ'শ খাওয়ানোর জন্য তুমি সবসময় রেডি থাকো।"
"সরি স্যার। ম্যাম রাজি হয়নি?"
সান্নিধ্য চোখ তুলে তাকায় রিমনের দিকে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে বলে,"তুমি এসে বিষয়টা জটিল করে ফেলেছো। আমি যেভাবে ভেবেছিলাম তার কিছুই হয়নি। ম্যাডাম রাজি না হলে তোমার খবর আছে।"
"মা..মানে স্যার আমি কি করেছি?"
" কিছুই করোনি। কালকে বিকেল পাঁচটা থেকে ছয়টা শিডিউল ফাঁকা থাকবে তোমার। শেহরিনকে নিয়ে আসবে আমার কাছে।"
"অবশ্যই স্যার। এক্ষেত্রে কোনো ভুল হবে না।"
" ভুল তুমি সবসময়ই করো। "
"স্যার.. কোথায়?"
"আমাকে বলতে হবে? সেদিন মিটিং এ সবার সামনে জাহির করে বলার কি দরকার ছিলো মেয়রের লোকদের আমিই মেরেছি? আমার নামের পাশে যত ডি মেরিট পয়েন্ট সব তুমি যোগ করেছো। আর এতো কনফিডেন্টলি বলার কিছু নেই। সহজভাবে সে রাজি হবে না এটা শিউর। বাট যতক্ষণ.. না আসবে ততক্ষণ ওখান থেকে সরবে না। এটা তোমার শাস্তি।"
"যদি একেবারেই না আসে?"
"তাহলে আমার যেতে হবে।"
"চিন্তা করবেন না স্যার। আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করে ম্যামকে নিয়ে আসবো আপনার কাছে।"
"চিন্তা? বেঞ্চগুলো ওভাবে ভাঙার কি ছিলো?"
"না মানে.. সরি স্যার ভাঙতে ভাঙতে একটু বেশিই...
সান্নিধ্য রিমনের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে জানালার বাহিরের দিকে নজর দেয়। বাম হাতখানা থুতনির নিচে রেখে ছোট করে নিঃশ্বাস ছাড়ে। তার ছেলেপেলে গুলো তার চেয়ে একধাপ এগিয়ে থাকে সবসময়।
|দুপুর দুইটা, নিকুঞ্জ মহল|
রৌদ্রময় দিনের মধ্যভাগে সূর্যের প্রখর রশ্মিতে ক্লান্ত জনজীবন। বৈশাখের শেষের দিকে উত্তাপটা যেনো একটু বেশিই থাকে প্রকৃতিতে। ঝড় বৃষ্টির ছায়া ভুলে সূর্য দাপিয়ে বেড়ায় ধরণীজুড়ে।
ভার্সিটি থেকে আসামাত্র বিছানায় গা ছেড়ে দিয়েছে শেহরিন। আজকে মোজাম্মেল আংকেল অন্যকাজে ব্যস্ত থাকায় তাকে আনতে যেতে পারিনি। যার কারণে অর্ধেক পথ সিএনজি করে এসেছে বাকি কিছু পথ রিকশায় করে এসেছে। কিন্তু দুপুর সময়ে রিকশা কিংবা যানবাহনের আনাগোনা খুবই কম থাকে। রিকশাওয়ালা মামা অর্ধেক পথ নামিয়ে দিয়ে বলেছে যেতে পারবে না আর ভিতরে।
অথচ ভিতরটা কোথায় এটাই বুঝতে পারে না শেহরিন। মামার বাসাটা তো বেশ প্রশ্বস্ত রাস্তার সাথেই। ভিতরে হয় কিভাবে? হয়তো না আসার বাহানা সব।
"মামণি আমি উঠতে পারছি না। প্লিজ একটু লেবু চিনির শরবত দিয়ে যাও। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে।"
একা একা শুয়ে শুয়ে বিরবির করে সে। এই মুহূর্তে মামণিকে ভীষণ প্রয়োজন তার। একা একা নিজের এতো দেখভাল করা যায় নাকি। ঋতমা নিশ্চয়ই তার মতো এতোক্ষণে ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়েছে। আর ওর মামণি এসে মাথায় হাত বুলিয়ে লেবু চিনির শরবত খাইয়ে দিচ্ছে। উফ্ কি শান্তি।
" মামণিরা বেঁচে থাকলে পৃথিবী এতো সুন্দর হয় কেন?"
উপুড় হয়ে শোয়া ছেড়ে টান টান হয়ে শোয় শেহরিন। ছাদের দেয়ালে চোখ স্থির করে তাকিয়ে থাকে এক দৃষ্টিতে। ক্লাস ফাইভে থাকাকালীন সময়ে একদিন মামণি হুট করে তাকে ছেড়ে চলে গেলো কিছু না জানিয়েই। তারপরে আর কখনো ফিরে আসেনি। চিরতরে হারিয়ে গিয়েছে। মামণির চলে যাওয়ার দৃশ্য এখনও চোখে ভাসে তার। ইশ্ তখন থেকেই মামণি তাকে ভালোবাসা আর যত্নের কাঙালিণী তৈরি করে দিয়ে গিয়েছে। যেটা এখন এক বাবা ছাড়া আর কারো মধ্যেও সে খুঁজে পায় না সে । কিন্তু বাবা তো ভীষণ দূরে। ভীষণ ব্যস্ত। সময় কোথায়?
ভালোবাসার কথা মনে আসতেই শেহরিনের হুট করে এমপি সাহেবের কথা মনে পড়ে যায়। তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে সে সঙ্গে সঙ্গে। গাঢ় ভাবুকতায় মন ডুবায় এক লহমায়। এই লোক সত্যি সত্যি কি কালকে তার উত্তরের জন্য প্রতীক্ষায় থাকবে? যদি উল্টাপাল্টা কিছু ঘটায়? মামি এমনি তাকে খুব একটা ভালো চোখে দেখে না এর মাঝে এই মানব এসে যদি বিপত্তি ঘটায় তো মুখ দেখানোর অবকাশ থাকবে না।
নানান চিন্তা ভাবনার প্রসার ঘটিয়ে অবশেষে সে শান্ত হয় তার শেষ গন্তব্যে পৌঁছে। তার একমাত্র অবলম্বন বাবার কাছে।
এই মুহুর্তে যে করেই হোক বাবার সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করতে হবে। তা নয়তো চিন্তায় চিন্তায় নির্ঘুম রাত পার করতে হবে।
হাতের কাছে থাকা ফোনটা নিয়ে সরাসরি কল লাগায় সে। দু তিনবার রিং হতেই অপর পাশ হতে ভেসে আসে তার চেনা কন্ঠস্বর।
"আসসালামু আলাইকুম বাবা। "
"ওয়ালাইকুমুস সালাম। কেমন আছো মা?"
"জ্বি বাবা আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তুমি কেমন আছো?"
"আলহামদুলিল্লাহ।"
"লাঞ্চ করেছো বাবা?"
" না মা।এইতো করবো।তুমি করেছো?"
"আমি মাত্র ভার্সিটি থেকে এলাম। গোসল সেড়ে করবো।"
" ওকে।দেরি করো না যেন। "
শেহরিন দেনামোনা করে খানিকটা। ঠোঁট কামড়ে পায়চারি করতে করতে চাপা কন্ঠে বলে,
"বাবা জানো আজকে কি হয়েছে? "
"কি হয়েছে মা?"
"আমি আজকে অষ্টম আশ্চর্য হয়ে গিয়েছি।"
"বলছো কি?কিভাবে?"
"তার আগে তুমি একটু গেস করো কি হতে পারে?"
"তুমি দূর্দান্ত রান্না করে ফেলেছো?"
"না বাবা।আমি কখনোই দূর্দান্ত রান্না করতে পারি না আর পারবোও না।"
"তাহলে প্রেজেন্টেশন খুব ভালো হয়েছে?"
"হয়নি। আজকে প্রেজেন্টশনই ছিলো না।"
রিজওয়ান সাহেব কিছুটা নিরাশ হন। নরম কন্ঠে বলেন,
"ওহহো মা।বাবা তো আর গেস্ করতে পারছে না তাহলে।"
" এগুলোর বাহিরে কিছু একটা ভাবো।"
"কিছু একটা..কিছু একটা... তোমাকে কেউ কি এমন কিছু বলেছে যেটা শুনে ভীষণ অবাক হয়ে গিয়েছো?"
"এক্সাক্টলি বাবা।ইউ আর সুপার ম্যান। আমার জানতাম তুমি পারবে।"
"হাহা। আচ্ছা বিষয়টা কি শেয়ার করা যাবে মা? যদি তুমি সিক্রেট রাখতে চাও নো প্রবলেম।"
"ওকে। তার মানে তুমি বুঝতে পেরেছো বিষয়টি কি রিলেটেড।"
"জ্বি বুঝতে পেরেছি।"
"ভেরি জিনিয়াস। বাট আমি শেয়ার করার জন্যই তোমাকে ফোন করেছি।"
"বাহ..শুনি তাহলে।"
"একটা ছেলে আজকে আমাকে ডিরেক্ট বিয়ের প্রোপ্রোজাল দিয়েছে।"
"ডিরেক্ট বিয়ে?"
"হ্যাঁ বাবা। আমাকে সে এমনভাবে বলেছে মনে হচ্ছিলো আমি তার কতশত চেনা পরিচিত একজন। তার সঙ্গে আমার একটা হেলদি রিলেশন ছিলো।অথচ তাকে আমি ঠিকভাবে চিনিই না। "
"সাংঘাতিক তো ছেলে। বাজে বিহেভ করেছে কি?"
"না না। এদিক দিয়ে একটু ভদ্র আছে। আই মিন চোখের দৃষ্টিতে শালীনতা বজায় রেখেছে।"
"আচ্ছা গুড। তুমি বিষয়টা কিভাবে হ্যান্ডেল করলে? "
"এখানেই তো গন্ডগোল বাবা। একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে সে। আমাকে কোনো কথা বলারই সুযোগ দেয়নি । বরং সময় দিয়েছে একদিনের তাও কিভাবে হ্যাঁ বলবো সেটা জানাতে।"
"তোমাকে এতো পছন্দ করেছে? আগে থেকে কি টুকটাক পরিচিত ছিলে একে অপরের সাথে বা সে তোমাকে পছন্দ করতো এমন কিছু? "
"না বাবা। আজকে দিয়ে সবমিলিয়ে মাত্র তিন দিন তার সঙ্গে আমার দেখা হলো। তুমিই বলো এই তিনদিনে কি কেউ কোনদিন বিয়ের প্রোপ্রোজাল দেয়?"
"আমার মনে হচ্ছে ছেলেটার লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইড কাজ করছে।"
"ছেলেটা পাওয়ারফুল বাবা।"
"গুন্ডা মাস্তান।"
"না সিভিলিয়ানই কিন্তু পাওয়ার আছে। আমার তো ভয় করছে বাবা,যদি টেনেটুনে আমাকে বিয়ে করে ফেলে? "
"আমার মনে হয় না সেটা করবে। সভ্য যেহেতু সেহেতু ধারা বজায় রাখবে।"
শেহরিন এক হাত কোমড়ে চেপে পায়চারি করতে থাকে। নিরাশা মাখা কন্ঠে বলে,
"মহামুশকিল হয়ে গেলো বাবা। চট্টগ্রামে কি মেয়ে মানুষ কম পরেছিলো? আমি কোন ঢাকা থেকে উড়ে এসেছি অতিথি পাখি হয়ে। আর আমার পিছনেই লাগতে হলো.?"
"রিলাক্স রিলাক্স মা। এরকম হরহামেশা হয়েই থাকে। তুমি তোমার ফ্রেন্ডদের জিজ্ঞেস করবে মোস্ট অফ দেম দেখবে এরকম সিচুয়েশনে পড়েছে। এটা একটা বয়সের ফেজ। একজন একজনকে পছন্দ করবে বলবে এরকম হয়েই থাকে। তুমি এটা নিয়ে মাথা ঘামিয়ো না। প্রথম প্রথম এমন বলবেই পরে দেখবে তোমার থেকে রেসপন্স না পেয়ে আর এমন করছে না। যাই হোক তিনদিন ছুটি তোমার?"
"হ্যাঁ বাবা। বৃহস্পতিবার শুক্রবার শনিবার।"
"গ্রেট। তাহলে একটা গুড নিউজ শোনো। তোমার মালয়েশিয়ার ভিসা এসে গিয়েছে। চলো ট্যুর দিয়ে আসি। আমারও এর মাঝে বিজনেসের কাজ পরে গিয়েছে সেখানে। যাবে কি?
"আমি তো অলওয়েজ রেডি বাবা। ওহহো কিন্তু মামারা তো কালকে কক্সবাজার যাবে।"
"তুমি চুজ করো।"
"যদিও নিজের দেশ আমার আগে থাকবে বাট তোমার সঙ্গটাকে মিস্ করতে চাইছি না।"
"ওকে।তাহলে কাল ভোরের ফ্লাইটে চলে আসো ঢাকায়। আমি টিকিট কনফার্ম করছি।"
"ঠিক আছে বাবা।"
শেহরিনের ক্লান্ত মনটা হুট করে ভালো হয়ে যায়। কতদিন পরে বাবার সাথে আবার ঘুরাঘুরির সুযোগ পেলো সে। এর আগে একবার সুযোগ হলেও সময় মেলেনি। কিন্তু এবার সে মিস্ করবে না। বাবার একটুখানি সঙ্গ পেতে মরিয়া হয়ে থাকে যে, সে করবে মিস?
মুখে শুষ্ক হাসি টেনে সে আবারো বিছানায় শুয়ে পড়ে। নির্মল কন্ঠে বলে,
"হুহ এমপি সাহেব বিশেষ ভোটার আর খুঁজে পাবেন না। সে আপনার নাগালের বাহিরে চলে যাচ্ছে। টাটা বাই বাই।"