রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি

পর্ব - ১০

🟢

" অনিভা আজকে ভার্সিটিতে গিয়েছিলে?"

শেহরিন কক্ষে যাওয়া পথে থমকে দাঁড়ায়। হাত দ্বারা ব্যাগ চেপে সে ঘুরে তাকায় একসঙ্গে বসা মামি এবং মনিকা আন্টির দিকে। কঠিন প্রশ্ন!! এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া তার পক্ষে আরো কঠিন।

বাসায় প্রবেশ পথেই যার কারণে সে মনে প্রাণে চেয়েছিলো এই দু'জনের একজনের সঙ্গেও যেনো দেখা না হয়। একজনের সঙ্গে হলেও আরেকজনের সঙ্গে যেনো কোনোভাবেই না হয়। কিন্তু দূর্ভাগ্য!! দু'জনের সঙ্গেই হলো দেখা।

"গিয়েছিলে?"

" না মামি ।"

"কোথায় গিয়েছিলে?"

"একটা কাজ ছিলো ।"

"কাজ??"

"জ্বি।"

মনিকা আন্টি যৎকিঞ্চিত ঠোঁট প্রসারিত করে হাসে। পায়ের পা তুলে ভর দুপুরে চায়ের কাপে চুমুক টেনে বলে, " আজকাল এমপি সাহেবের সঙ্গেও তোমার কাজ থাকে? তাও সেটা ভার্সিটি মিস্ দিয়ে। বাহ্ ভালো তো। "

শেহরিনের আত্মা শুকিয়ে এক লহমায় খাঁ খাঁ করে উঠে। মুখোরেখা হয়ে যায় পাংশুটে বর্ণের। যে ভয়টা সে আসার সময় হতে পেয়ে এসেছিলো সেটাই সত্যি হলো। তাও এমন মানুষের চোখে পড়েছে যে তার অঘোষিত প্রতিদ্বন্দ্বী।

" ব্যাপারটা সেরকম কিছু নয় আন্টি। আমি আসলে উনাকে...

"থাক এক্সপ্লেইন করতে হবে না অনিভা। এগুলোর সময় আমরাও পাড়ি দিয়ে এসেছি। কিন্তু এটা মানতেই হবে তোমার বেশ দম রয়েছে। চট্টগ্রামে আসার এক বছর হলোই না এর মাঝেই চট্টগ্রামের এমপির সঙ্গে...

" কতদিনের সম্পর্ক তোমাদের? "

"মামি উনার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।"

শাহিদা বেগম বাঁকা হেসে সোফায় খানিকটা হেলান দিয়ে হাত মুঠো করে তাকান শেহরিনের দিকে। তেতো কন্ঠস্বরে বলেন,

"সম্পর্ক নেই কিন্তু তোমাকে সে বাসায় ড্রপ করে দিয়ে যায়। তুমি তার কার্যালয়ে যাও। তোমার খোঁজ করতে সে কক্সবাজারে লোক পাঠায়, ঢাকায় যায়। উল্টো বুঝ দিতে চাইছো আমাদের?"

"শোনো অনিভা শাক দিয়ে মাছ ঢেকে কোনো লাভ নেই। অন্তত আমাদের সামনে তো আরো নয়। তবে, তোমার প্রশংসা না করে পারছি না সত্যিই। দেখে দেখে পুকুরের বড় মাছটাই একদম ধরে ফেলেছো।"

শেহরিন বিস্ময়ঘেরা চোখে তাকিয়ে থাকে দু'জনের দিকে। এদের জাজমেন্টাল ক্যাপাসিটি এতো যে লো এটা তার জানা ছিলো না । কথা পুরোপুরি না শুনেই চোখে যা দেখেছে সেটা নিয়েই নির্দ্বিধায় কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে যাচ্ছে, বিবেকে বাঁধে না?

"আন্টি আপনি আমার কথা না শুনেই উল্টোপাল্টা বকছেন।"

"সিরিয়াসলি?? আমি উল্টো পাল্টা বকছি? আপা তোমার ভাগ্নী তো দেখছি বেশ কথা শিখেছে।"

" ম্যানারস শেখো অনিভা। আন্টি হয় উনি তোমার।উল্টো পাল্টা বকছে এটা কি ধরনের কথা। মিথ্যা বলেছি কি কিছু আমরা?

তোমার মামা তো তোমাকে নিয়ে অনেক গর্ব করে বুক ফুলিয়ে। তুমি বলতে পাগল সে। অথচ তুমি কি করেছো? তার মান সম্মানের তোয়াক্কা না করে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দদের সঙ্গে অবাধে মেলামেশা শুরু করেছো? "

" মামি আমি এমন কিছুই করেনি যেটাতে মামার মান সম্মানে আঘাত হানে।"

শাহিদা বেগম অসন্তুষ্ট দৃষ্টিতে তাকান শেহরিনের দিকে। তাচ্ছিল্য মাখা স্বরে বলে, " জানি না কিসে তোমার মান সম্মানে আঘাত হানে। বাট আমাদের কাছে এসবেই অতৃপ্তি। প্রেম করছো ভালো কথা। তোমার লাইফ তুমি বুঝবে এসবে আমাদের কোনো হাত নেই। তবে একটা কথা মনে রাখবে, তোমার কোনো কিছুর ইফেক্ট যেনো আমার পরিবারের উপর না পড়ে।"

"ঠিক বলেছো আপা। মুমু বড় হচ্ছে। সে তো সবসময় চিপকে থাকে ওর সাথে। যদি উল্টা পাল্টা কিছু শেখে?"

মনিকা আন্টির শ্লেষাত্মক মন্তব্যে শেহরিনের গা জ্বলে উঠে। চোখ জোড়া শক্ত হয়ে উঠলেও মুখ খুলতে পারে না সে।

দায়বদ্ধতা। কিছু বললেই মামি তাকে ছেড়ে কথা বলবে না এটা সে নিশ্চিত। হাজার হোক বোন তার, টান তার দিকেই বেশি থাকবে।

"আমি জানি না এসব কিছু। তোর দুলাভাই বুঝবে সেটা। ভাগ্নীকে মাথায় তোলার মর্ম সময় হলে বুঝবে। আমি কিছু বললেই তো বলবে,তার বোনের মেয়েকে দেখতে পারি না।"

"ভালো কথা, তুমি না রাজনীতি পছন্দ করো না। রাজনীতি নিয়ে কথা উঠলেই বিরক্তি প্রকাশ করতে। এসব বুঝি তোমার নাটক ছিলো অনিভা? এমপিকে দেখেই সব ভুলে গিয়েছো। একদম তার গলায় গিয়ে ঝুলেছো সরাসরি?"

"আমি কি আমার রুমে যেতে পারি মামি?"

" প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছো না, এজন্য বুঝি পালানোর পথ খুঁজে বেড়াচ্ছো।"

শেহরিন মনিকা আন্টির ঠেস দেওয়া কথায় নম্র হাসে।ধীর কন্ঠে বলে, "রুচি শব্দটাকে আমি ভীষণভাবে গুরুত্ব দেই আন্টি। সবক্ষেত্রে সবজায়গায় প্রয়োগ করে এর দাম কমাই না।"

শাহিদা বেগম বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। শেহরিনের ঠান্ডা মাথায় তীক্ষ্ণ কথার ভাঁজের মমার্থ তার বুঝতে অসুবিধা হয় না। সম্মুখে এসে দাঁড়িয়ে ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেন, " কথার জবান ঠিক করতে শেখো অনিভা। তা না হলে এই বাসাতে টিকতে পারবে না। আমার বোন এখন থেকে এই বাসাতেই থাকবে।তোমার কারণে সে যদি বিন্দুমাত্র অপমানিত হয় তাহলে তুমি আমার কে হও সেটা কিন্তু আমি দেখবো না। তোমার মামাকে দেখে আমি ভয় পাই না এটা মাথায় রেখো। কেমন।"

"জ্বি অবশ্যই।"

"ভিতরে যাও।"

শেহরিন অনুমতি পেতেই চুপচাপ নিজ কক্ষে চলে যায়। রুমে এসে দরজাটা লাগিয়ে ব্যাগটা বিছানায় ফেলে শুয়ে পড়ে সঙ্গে সঙ্গে । হাত মুঠো করে কপালে ঠেকিয়ে সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে উপরিপানে। মন তার বিতৃষ্ণায় একদম বিষিয়ে উঠেছে। এতো ভারী ভারী কথা শোনার তার অভ্যাস নেই। কখনো শোনেওনি। যার কারণে অতি শীঘ্রই চোখের কোণে নিভৃতে এসে পানি জমে তার। মুহুর্তেই ঘোলাটে হয়ে উঠে চোখের মণি। শব্দহীন কান্নায় মাত হয়ে হাতের তালুতে গাল বেয়ে পড়া পানি আটকায় সে। শরীর কেঁপে ওঠে অগোচরে।

বৃষ্টিবেলায় দুপুর সন্ধিতে কোনো এক বাবার রাজকন্যা অবহেলার চাদরে আটকে পড়ে অশ্রু বিসর্জন দিতে থাকে একমনে। ভীষণ খারাপ লাগছে তার।মনিকা আন্টি, মামির তিক্ত কথাগুলো বারে বারে প্রতিধ্বনি হয়ে কানে বাজে । আজ শুধু মাত্র একটা মানুষের অনুপস্থিতিতে জীবনের চিত্র তার পাল্টে গিয়েছে নিমিষেই।

চক্ষু জোড়া লাল। ঘন্টাখানিকের নিরব কান্নাকে বিদায় জানিয়ে স্থিরমূর্তির ন্যায় শুয়ে থাকে শেহরিন। পিটপিটে চোখে তাকিয়ে দেখে ব্যাগের কার্নিশে অনাদরে পড়ে থাকা গোলাপগুলোর দিকে। পিচ রঙা গোলাপ। সুগন্ধি রেশ ছড়িয়ে চারদিকটাজুড়ে।

এক হাত বাড়িয়ে সে ব্যাগ হতে একগুচ্ছ গোলাপ হতে একটা গোলাপ বের করে আনে হাতে। নির্নিমেষে চোখে তাকিয়ে দেখে নেতিয়ে পড়ে পাপড়িগুলোর দিকে। ভাগ্যভালো গোলাপগুলোর দিকে নজর পড়েনি দু'জনের।পড়লে হয়তো এতোক্ষণে এই নিয়ে ঝড় উঠে যেতো।

প্রত্যাহিক নিয়মনুসারে বাবার কল আসে দুপুরবেলাতে। ফোনের স্ক্রিনের পানে উঁকি দিয়ে দেখে শেহরিন। অতঃপর নাক টেনে নিজেকে ধাতস্থ করে ফোন রিসিভ করে সে।

"আসসালামু আলাইকুম মা।"

"ওয়ালাইকুমুস সালাম বাবা। কেমন আছো?"

"আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তুমি কেমন আছো? "

"জ্বি আলহামদুলিল্লাহ।"

"কি করছো মা? লাঞ্চ হয়েছে? "

শেহরিন বাবার মুখে লাঞ্চের কথা শুনতেই ঘড়ির দিকে এক পলক চায়।সাড়ে তিনটা বাজে। লাঞ্চ তো দূরে থাক গোসলই করেনি সে। কি জবাব দিবে এখন সে বাবাকে? কাজু বুয়া কি ডেকেছিলো তাকে? মামি ডাকবে না এটা নিশ্চিত কিন্তু কাজু বুয়া..হয়তো ডেকেছিলো। শুনতে পায়নি বোধহয়।

"এখনো করিনি বাবা। ঘুমিয়েছিলাম।"

"কি বলছো? সাড়ে তিনটা বাজে মা। এখনো লাঞ্চ করোনি কেন? যাও এক্ষুণি ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চ করে এসো।"

"বাবা গোসলও করা হয়নি।"

"কি হয়েছে তোমার? শরীর খারাপ?"

"কিছু না বাবা। এমনি ক্লান্ত লেগেছিলো তাই..."

রিজওয়ান সাহেব মেয়ের মিইয়ে যাওয়া কন্ঠস্বরের ভাবার্থ বুঝতে পারেন। ল্যাপটপ বন্ধ রেখে কাজ ফেলে সে উঠে চলে যান বেলকনিতে।

"মা।"

"জ্বি বাবা।"

"মন খারাপ?"

বাবার স্নেহাতুর ডাকে শেহরিনের চোখে ফের পানি জমে। হুট করেই বরফ গলা নদীর ন্যায় নিজেকে ভাসিয়ে তোলে সে। কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলে,"ভীষণ মন খারাপ বাবা।"

রিজওয়ান সাহেব দমে যান মেয়ের মন খারাপের কথা শুনে। তার দূর্বলচিত্তের প্রধান অস্ত্র হচ্ছে তার মেয়ে। সেই মেয়ের একটুখানি কষ্ট তাকে ভীষণ ব্যথা দেয়। এই যে এখন হুট করেই তার বুকের ভিতর চিনচিনে ব্যথা অনুভূত হচ্ছে। কিন্তু মেয়ের কাছে এ সবকিছুই তার অপ্রকাশিতব্য। ভুলেও তা উন্মোচিত করেন না।

"কি হয়েছে মা?"

"বাবা চট্টগ্রামে আসাটা মনে হচ্ছে ভুল ডিসিশন ছিলো। আমার জন্য ঢাকাই ঠিক ছিলো। তুমি কেন আমাকে এখানে পাঠালে?"

" তোমার কাছে ভুল ডিসিশন মনে হচ্ছে? "

"হ্যাঁ।"

"মা কেন তোমার এমনটা মনে হচ্ছে একটু ক্লিয়ার করে বললে বাবার বুঝতে সুবিধা হতো।"

শেহরিন গোলাপের পাপড়িগুলো একহাতে ধীরে ধীরে ছাড়াতে থাকে। ভেজা চোখে সেদিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে নরম গলায় বলে,

"আমার এখানে ভালো লাগছে না বাবা। মনে হচ্ছে ছুটে তোমার কাছে চলে যাই।"

"তোমার কি ভার্সিটি বা থাকা নিয়ে কোনো সমস্যা হচ্ছে?"

"আমার জীবনটাই সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছে আমার এখানে সার্ভাইভ করা কঠিন।"

"আমি গেস করে বলছি বাট নট শিউর তুমি কি কারো কথায় কষ্ট পেয়েছো মা?"

নির্বাক হয়ে যায় শেহরিন। হাতের কার্য থেমে যায় তার। ধারালো কথার বাণে সে সত্যি জর্জরিত। ভিতরে ভিতরে তিক্ত বা কটু কথার অভ্যস্ততায় সে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারে না কোনোভাবেই।

আর তার এই নিরবতায় রিজওয়ান সাহেব বুঝে নিন উত্তর। মেয়ে কিসে বিধ্বস্ত হয়েছে, কেন তার সার্ভাইভ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে এসবের পিছনে বাকযুদ্ধটাকেই কারণ হিসেবে বিবেচিত করেন। তবুও নিশ্চিত হতে কোমল গলায় বলেন,

"আমি কি উত্তর হ্যাঁ ধরে নিবো মা?"

"হু।"

আলগোছে চোখ বন্ধ করে নেন রিজওয়ান সাহেব। মেয়ের কষ্টটাকে অনুধাবন করে ছোট করে নিঃশ্বাস ছেড়ে বলেন,

"জন্মের দুই মাস আগে তোমার দাদুভাইকে হারিয়েছিলাম। আর তোমার দাদিমাকে হারাই সাত বছর বয়সে। অনাথ আমি। কোনো কূল কিনারা নেই। উপায় না পেয়ে চাচাদের সংসার থেকে অনেক কষ্টে মানুষ হই। ধীরে ধীরে যত বড় হতে থাকি, নিজ চোখে, মস্তিষ্কে অনুভব করি অন্যের সংসারে বাস করতে হলে কতটুকু নিজেকে মাটিতে মিশিয়ে রাখতে হয়। কত কথা অবহেলা হজম করতে শিখতে হয়। আমি তিনবেলাতে শুধু ভাতই হজম করতাম না কথাও হজম করতাম। দিনশেষে আমি বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা হতে বুঝতে সক্ষম হই, মানুষ কোন জায়গায়টায় আসলে আত্মতৃপ্তি বা সবচেয়ে বেশি খুশি হয়।"

"কোথায় সেটা।"

"একটা মানুষ যখন অপর একটা মানুষকে কথার যুদ্ধে হারিয়ে দেয় তখন সে বেশি আনন্দিত হয়। সবচেয়ে বেশি আত্মতৃপ্তি পায় সেখানেই। এজন্যই কিন্তু বলা হয় অস্ত্রের চেয়ে কথার আঘাত ভয়ানক। এক্ষেত্রে মানুষ তোমার দূর্বল জিনিসগুলোকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে। তোমাকে ভাঙতে অনেক অপ্রয়োজনীয় কথা বলবে। কারণ তার মূল টার্গেট তোমাকে হারানো আর নিজের তৃপ্তি নিবারণ করা।"

"যদি সম্ভব হতো তাহলে আমি ওই মানুষ গুলোকে বলতাম আজেবাজে কথা দ্বারা আমাকে না ভেঙে গায়ে হাত তুলুন। দুটো চড় থাপ্পড়ে মনের খায়েশ মিটিয়ে নিন। তাও প্লিজ নোংরা কথাগুলো ইগনোর করুন।"

"আমরা মানুষ বড় অদ্ভুত মা। আমরা কখনোই এটা বুঝবো না। আমরা নিজেদের আত্মতৃপ্তির জন্য যা খুশি বলতে পারি, যা খুশি করতে পারি। ইট’স হ্যাভ নো লিমিটিস্। বাউন্ডারি ক্রস করে যাবো তবুও থামবো না।

কথা হজম করে নেওয়া অনেক বড় একটা গুণ এটা আমি মানি। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে চুপ থাকা উচিত নয়। তবুও তোমাকে আমি বলবো তুমি যদি তোমার জায়গায় সঠিক থাকো তাহলে সমস্ত কিছু মাথা হতে ঝেড়ে ফেলো। যদি সেসব মানুষদেরকে তুমি গুরুত্ব দিতে না চাও তবে তাদের কথাগুলোকেও গুরুত্ব দিও না। তাদেরকে একটা আলাদা সাইড হিসেবে বিবেচনায় রাখো।যাদের হতে তুমি কখনো ভালো কিছু আশা করো না।"

"তাদের চোখে আমি শূল বাবা।"

"কারো চোখে তুমি শূল হবে কারো চোখে হবে পদ্মফুল। এটাই জগতের নিয়ম।"

শেহরিন বাবার কথায় কান্না জড়ানো মুখোরেখায় মৃদু হাসে। নিস্তেজ স্বর ভেদ করে বলে,

"দাদুভাই দাদিমা মারা যাওয়ার পরে তোমার জীবনে শুধু মাত্র ডলি বুবু ছিলো লাকি চার্ম হিসেবে। অ্যাট দ্যা সেম প্লেস আমার জীবনে তুমি লাকি চার্ম বাবা। আমি তোমাকে ছাড়া পারতাম না নিজেকে এভাবে বুঝাতে।"

রিজওয়ান সাহেব মেয়ের মনে মেঘকাটার সম্ভাবনা দেখে মুখে সন্তুষ্টির হাসি ফোটান। স্নেহময় কন্ঠে বলেন," হ্যাঁ। এটা আমি প্রতিনিয়ত মানি, আজকে আমার এই অবস্থানের পিছনে ডলি ফুআম্মার অবদান অনস্বীকার্য।

তবে,আমি আমার মায়ের ক্ষেত্রে যদি লাকি চার্ম হয়ে থাকি তাহলে তার সর্বোপরি ভালো থাকাটা আমি আমার সর্বোচ্চটা দিয়ে নিশ্চিত করবো। শফিকের সঙ্গে আমি রাতেই কথা বলে তোমার জন্য আলাদা বাসার ব্যবস্থা করছি। থাকতে পারবে কি মা?"

"সাবলেট?"

"সাবলেটের মতোই। যেহেতু তুমি একা ফ্লার্টে থাকতে পারবে না।"

"বাবা আমি ভার্সিটির হলে উঠতে চাই।"

"ফার্স্ট ইয়ারে হলে সিট পাবা না মা। সিট পেতে পেতে সেকেন্ড ইয়ার হয়ে যাবে।আর হলে থাকাটা তোমার জন্য একটু কঠিন হয়ে যাবে। ওখানে সবকিছু প্রায় শেয়ারিং এ করতে হয়। তুমি একটা ভালো গার্লস হোস্টেল ট্রাই করতে পারো।"

"আমি কিছুই ট্রাই করবো না বাবা। ঢাকা যাবো আমি ।"

"ঢাকা এলে তুমি ডিপ্রেশনে ভুগবে মা। একটু বোঝার চেষ্টা করো। তুমি গাছপালা প্রকৃতি পাহাড় এগুলো ভীষণ পছন্দ করো জন্য ঢাকা শহরের বদ্ধ জীবন হতে চট্টগ্রামে পাঠিয়েছি। এখানে একা জীবনটা তোমার জন্য আরো অনেক কষ্টের হয়ে উঠবে।"

শেহরিন চোখ মুছে কন্ঠ পরিষ্কার করে। নিরেট গলায় বলে,"তুমি আমাকে এখানে পাঠিয়েছো ডিপ্রেশন থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য বাবা। কিন্তু আমি মুক্ত হওয়ার বদলে আরো যুক্ত হচ্ছি ডিপ্রেশনের সঙ্গে। সাথে একজন তো উঠে পড়ে লেগেছে আমাকে পাগল বানানোর জন্য। তার এসব উদ্ভট কাজের জন্য আমাকে এসব সিচুয়েশনে পড়তে হচ্ছে।"

"তুমি বুঝানোর পরেও বুঝেনি?"

"বুঝাতে যাওয়াটাই ভুল হয়েছে আমার। মনে হচ্ছে আরো পাগল খেপিয়ে এসেছি। বোঝার তো কিছুই বোঝেনি উল্টো বিয়ের দিকে দুইধাপ এগিয়েছে।"

" এতো সিরিয়াস?"

" উনার কার্যকম তো তাই বলছে। আজকে তার উপর এক গুচ্ছ গোলাপ ফুল নিয়ে টেস্ট করলাম। মাথা খারাপ নেতাসাহেব সেটাতেও উর্ত্তীণ হয়ে গেলো। মানে..আমার মাথা ব্ল্যাঙ্ক বাবা।"

"ফুলগুলো কি করেছো?"

"প্রথমে মনে হয়েছে ফেলে দিবো। পরে তোমার কথাটা স্মরণ করেছি, ব্যক্তির উপর রাগ দেখাও তবে বস্তুর উপর নয়। বিষয়টা লজিক্যাল। ফুলগুলো ফেলে দিলে মানুষ হিসেবে উনাকে অপমান করা হতো।বেচারা বাধ্য হয়ে হলেও একটা কাজ করেছে। এইটুকু সম্মান প্রাপ্য।"

"মানুষ হিসেবে মনে হচ্ছে তাহলে ভালোই হবে।"

" আমি ওতশত জানি না বাবা। আমার বুঝানো শেষ এবার তোমার পালা।যদি তুমিও ব্যর্থ হও তাহলে চুয়েট ছেড়ে সোজা আহসানউল্লাহর সিভিল কনফার্ম। স্প্রিং এ ভর্তি শুরু হবে।"

"রিলাক্স। রিলাক্স মা। এতো ব্যস্ত হতে হবে না। আমি তো বলেছি বিষয়টা আমি দেখবো। তোমার কোনো টেনশন নিতে হবে না। ধীরে ধীরে তোমার সব সমস্যার সলিউশন বাবা করে দিবে। কেমন?"

"হু।"

"আচ্ছা এবার আমাকে একটা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে আজকের মতো কথার সমাপ্তি টানো।"

" জ্বি করুন প্রশ্ন।"

" আমার ধারণা অনুযায়ী আজকের মেইন প্রেক্ষাপটে ছিলেন এই নেতাসাহেব। তার কারণেই হয়তো কেউ তোমাকে কটুবাক্য শুনিয়েছে ।আমি শিউর নয়। তবে সমস্ত কিছু মিলিয়ে এমনটাই মনে হচ্ছে। "

"তুমি ঠিক লাইনেই আছো বাবা। তারপরে...

" এক্ষেত্রে তোমার তো তাহলে সর্বপ্রথম তার প্রতি অভিযোগ আনার কথা ছিলো। তাকে কেন্দ্র করে সমস্ত ঘটনা হলো অথচ সে এলো সবার শেষে?।তোমার কাছে, কারো বলা কটুবাক্য খারাপ লেগেছে এটা প্রকাশ করলে শুরুতেই। কিন্তু যার কারণে হয়েছে তাকে শুরুতে কেনো উল্লেখ করলে না?শতশত গালিও তো জুড়ে দেওয়ার কথা ছিলো তার নামের সঙ্গে। কিন্তু তোমার কথার ধরন বুঝে মনে হচ্ছে তুমি খুব একটা রেগে নেই তার প্রতি।কারণটা কি?"

শেহরিনের ভ্রু দ্বয় বাঁকা হয়ে আসে বাবার ভিন্নধারার প্রশ্নে। চোখজোড়া ছোট ছোট করে দাঁত দিয়ে নখ খুঁটতে খুঁটতে সে প্রশ্নের ভাবার্থ বুঝার চেষ্টা করে।আজকের দিনের শুরু থেকে এ অব্দি সবকিছু পুনরায় একবার ভেবে উত্তর গোছায় সে। অতঃপর নির্মেদ কন্ঠস্বরে বলে,

"প্রশ্নটা যৌক্তিক। এর উত্তরটা হচ্ছে সবকিছু বিবেচনা করে তাকে আসলে পুরোপুরি দোষীদার করা যায় না। কারণ যারা আমাকে কথা শুনিয়েছে তারা উনার জায়গায় অন্য কেউ হলেও বলতো। সবকিছু একই থাকতো শুধু এমপি সাহেবের জায়গায় যে থাকতো তার নাম বসতো অর্থাৎ তাদের মেইন এলিমেন্ট হচ্ছে আমি। দ্বিতীয়ত, আমি নিজ হতে তার কাছে গিয়েছি উনি আমার কাছে আসেননি। এক্ষেত্রে সে একটা দায়িত্বশীল কাজ করেছে। এই বৃষ্টির মধ্যে আমাকে বাসায় ড্রপ করে দিয়ে গিয়েছে এবং আসাপথে সে একদম নিরব হয়ে এসেছে। আমি ভেবেছিলাম হয়তো আমাকে ওসব বিষয় নিয়ে আবার জোর জবরদস্তি করবে। বাকবিতন্ডায় জড়াবে। বাট সে এসবের কিছুই করেনি। এটুকু বুঝেছি হি হ্যাজ সিচুয়েশনাল অ্যাওয়ারনেস। এটা আমার ভালো লেগেছে। তৃতীয়ত, আমি একটা কাজের কথা বলেছি যদিও বিষয়টা ফেইক ছিলো বাট সে আমার কথাটাকে গুরুত্ব দিয়েছে। দ্যাটস দ্যা ফ্যাক্ট।"

"আমার মেয়ের মুখে নেতাসাহেবের প্রশংসা। বাহ্। ভালো লাগলো। এতো অপছন্দের ভীড়ে কিছু একটা পছন্দের রয়েছে।"

"এক্সকিউজ মি বাবা...বেশি দূর যেয়ো না ফিরে এসো। প্রশংসা করা মানেই পছন্দ করা নয়। যেটুকু বললেই নয় সেটুকু বলেছি। বাদ বাকি সব অপছন্দ। "

"না..ঠিক আছে আমি বুঝতে পেরেছি। নেতাসাহেবের সিচুয়েশনাল অ্যাওয়ারনেস ভালো।"

"বাবা..."

রিজওয়ান সাহেব শব্দ করে হেসে উঠেন। ধাতস্থস্বরে বলেন,

বিজ্ঞাপন

"আচ্ছা আচ্ছা এগুলো ছাড়ো। আগে বাসার বিষয়টা নজর দেই আমরা।বাদ বাকি নেতাসাহেবের দেখি কি ব্যবস্থা করা যায়।"

"যা করবে তাড়াতাড়ি। এই লোককে আমি বিন্দুমাত্র ভরসা করি না।লক্ষণ খারাপ তার। বিয়ে করার ভূত চেপেছে মাথায়....

" আচ্ছা দেখছি আমি। তুমি যাও এখন গোসল করে লাঞ্চ করে নাও।আর কোনো কথা আমি শুনছি না।"

"ঠিক আছে। ভালো থেকো বাবা।"

"জ্বি মা তুমিও।"

______________________________________

বৃষ্টি মাখা একটা নিশ্চল দিনের সমাপ্তি ঘটে। নিকষ কালো আঁধার ছাড়িয়ে সূর্য উঠে পূর্ব আকাশে। মেঘ কেটে যায় সূর্যের প্রখর রোদের উত্তাপে। প্রত্যুষবেলাটা মৌনভাবে সূচনা হলেও মোটামুটি শোরগোল বাজে আরো একটু বেলা হতেই। ড্রয়িংরুমের মেটাল ঘড়ির কাঁটায় তখন সবে বাজে সাড়ে আটটা।

সুখনিবাসে সুখটাকে কর্পূরের মাধ্যমে উড়িয়ে দিয়েছেন মিসেস নাজনীন। থমথমে পরিবেশ। সকালের গাঢ় ঘুমটাকে বিসর্জন দিয়ে উপস্থিত হয়েছেন সকলে।বাদ রয়েছে শুধু মাত্র একজন। যাকে নিয়ে এতো কান্ড। বিশেষ সূত্রে জানা গিয়েছে এমপি সাহেবের ঘুম ভেঙেছে। নিচে আসতে এখন সময়ের ব্যাপার।

"সানজি যা সান্নিধ্যকে ডেকে নিয়ে আয়।"

সানজি হাই তোলে। সোফার কুশনটা জড়িয়ে কপাল কুঁচকে বলে,

" আমাকে বলে কোনো লাভ নেই। আমি পারবো না যেতে। বেতন এখনো পাওনা রয়েছে।"

"তাসিন..

" ভালো মানুষকে বলছো। ওকে দিয়ে ডাকতে পাঠালে আবার ওকে ডাকতে মানুষ পাঠাতে হবে। তুমি যাও।"

"আমি মাত্রই নামলাম।"

"কাউকে যেতে হবে না। তাকে যেহেতু ডাকা হয়েছে সে নিজ দায়িত্বেই নামবে।"

আকাশে মেঘ পুঞ্জীভূত না হলেও শাহজাহান সাহেব নাজনীন বেগম দু'জনেরই মুখে অন্ধকার লেপটে রয়েছে। গম্ভীর ভাবরেখা। অসন্তুষ্ট চাহনি।

তাসিন মামপটে পানি খাওয়া থামিয়ে দাদা দাদুর অবস্থা দেখে জোরগলায় বলে,"বাবা আজকে আমি স্কুলে যাবো না।"

"কেনো রে বাপ। কোন দুঃখে তুই স্কুলে যাবি না।"

"দাদুমণি ইয়ো সানিকে বকা দিবে সেটা দেখতে হবে না? সবসময় তো আমিই বকা খাই তোমরা দেখো। আমার কি দেখতে ইচ্ছে করে না?"

সরফরাজ ছেলের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলে,"একটা দিনও কি বাহানা না দিলে চলে না বাবা তোর? সবকিছুর সঙ্গে তোর স্কুলকেই কেনো জড়াতে হবে?"

" চাচ্চু বলেছে পড়াশোনার চেয়ে বিয়েতে মজা বেশি।"

" চাচ্চুর কথা শুনতে হয় না।"

"উহু এই একটা কথা শুনতে হয়। আমি পড়াশোনা করবো না,স্কুলে যাবো না,মিসের কাছে পড়বো না।"

"লাঠি আনবো?"

তিথির চোখ রাঙানিতে তাসিন মুখ লটকে ফুমণির কোলে গিয়ে লুকায়।কিছুক্ষণ পর চোখ তুলে তাকিয়ে জোরগলায় বলে,

"ইয়ো সানিই...এসেছে।"

সবাই একযোগে সিঁড়ির পানে তাকায়। অপেক্ষার অবসান ঘটে। এলোমেলো চুলে গায়ে কালো রঙের টিশার্ট জড়িয়ে নিচে নামে এমপি সাহেব। চোখজোড়ার সঙ্গে সঙ্গে মুখোরেখাও তার বেজায় শান্ত। আজকেও তার কাঁচা ঘুমে ব্যাঘাত। তবে,অন্যান্য দিনের মতো খুব একটা বিরক্তিতার রেশ নেই।

আসা মাত্র তাসিনকে ঠেলে সরিয়ে নিজে সে জায়গা দখল করে বসে।ঘুমজড়ানো কন্ঠে বেবি মানকিকে কাছে ডেকে বলে, "আর একবার এই নাম ডাকবি তো তোর বাপের নাম ভুলিয়ে দিবো।"

তাসিন প্রথমে কথাটার অর্থ না বুঝলেও পরমুহূর্তেই বোঝা মাত্র চিৎকার করে উঠে।

"বাবা তোমার নাম ভুলিয়ে দিবে বলেছে।"

শাহজাহান সাহেব বিরক্তি ভঙ্গিতে চোখ তুলে তাকান।রূঢ় কন্ঠে বলেন,

"কথা বার্তার লাগাম ঠিক করো সান্নিধ্য। এসব কি কথা?"

"আমার ছেলে আমার নাম জীবনেও ভুলবে না তাই না বাবা।"

"ইয়ো সরফরাজ খান..."

সবার সামনে ছেলের সরাসরি অ্যাকশনে সরফরাজ বিষম খেয়ে কেশে উঠে। মান সম্মান তার আর কিছুই রইলো না। সানজি কপাল চাপড়ে খুক খুক করে হেসে উঠে। অপরদিকে বাড়ির গিন্নী তিথি ঝাঁঝালো স্বর টেনে বলে,

"তোমার প্রশয়ে একরকম হয়েছে।"

"আচ্ছা এসব বাদ দাও। যেটা বলবে জন্য ডেকেছো সেটা বলো।"

"সান্নিধ্য।"

"হু।"

" খবরের কাগজ পড়ো কি?"

সান্নিধ্য পায়ের উপর পা তুলে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বলে," টিভিতে হেডলাইন দেখা হয়। খবরের কাগজ পড়ার সময় কোথায়? কেন?"

"মাঝে মধ্যে পড়া উচিত।"

"বিসিএস দিলে পড়তাম।"

সরফরাজ গলার স্বর টেনে সান্নিধ্যের দিকে শক্ত চোখে তাকিয়ে সিরিয়াস হওয়ার ইশারা দেয়। সান্নিধ্য সেদিকে এক পলক তাকিয়ে বাবার দিকে দৃষ্টিপাত করে বলে,"কি হয়েছে? "

শাহজাহান সাহেব হাত বাড়িয়ে সেন্টার টেবিলে রাখা কয়েকটা খবরের কাগজ হতে একটা তুলে নেন। গম্ভীর কণ্ঠে বলেন,

"এটা পড়ে দেখো।"

সান্নিধ্যর খবরের কাগজখানা হাতে নেওয়া মাত্র কালকের ঘটনা স্মরণে এসে যায়। রাত অব্দি সবকিছু ঠিকঠাক চলাতে ভেবেছিলো ইতিহাসে এই প্রথম সে বোধহয় চরম কন্ট্রোভার্সি হতে রক্ষা পেলো। কিন্তু ইতিহাস যে পুনরাবৃত্তি ঘটে এটা হয়তো ভুলে গিয়েছিল। কুঁচকানো কপালে সে খবরের কাগজের দিকে চোখ রাখে।

"চট্টগ্রাম -২ আসনের সংসদ সদস্য সান্নিধ্য শাহজাদ খানের দেখা পাওয়া গেলো ফুলের দোকানে। বৃষ্টিতে ভিজে প্রিয়তমার জন্য নিজ হাতে কিনলেন ফুল। এসময় ছিলো না তার সাথে কোনো পুলিশ প্রোটোকল,কোনো ব্যক্তিগত সহকারী।

একান্ত সময় কাটাতে বৃষ্টির মাঝে প্রিয়জনকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়েছেন লং ড্রাইভে। দাপুটে এই রাজনীতিবিদের জীবনে তবে কি খুলেছে প্রেমের অধ্যায়?"

দিগন্তবেলা,১৪৩২ বঙ্গাব্দ-১৪৪৭ হিজরি, ৮ মে সোমবার সকাল -৭:৩০।

"মেয়েটা কে সান্নিধ্য ?"

" এজন্যই কি তোমার অন্বেষাকে বিয়ে করতে এতো অনীহা।কাজের বাহানা দিয়ে তুমি আমাদেরকে এড়িয়ে গিয়েছো অথচ ঠিকই...

"কাজের বাহানা আমি কখনোই দেইনি বাবা। কাজ আমি ঠিকই করি।"

"তোমার আম্মা জানতে চান মেয়েটা কে?"

"শিউর হচ্ছো কিভাবে আমি কোনো মেয়ের জন্যই ফুল কিনেছি।"

"আমার একই প্রশ্ন। ফুল কি শুধু মেয়েদের জন্যই কিনতে হয় নাকি। এসব গুজব।"

"ছবিতে এটা তো তুমি তাই না? এটা তো গুজব নয়?"

"হ্যাঁ আমিই। তবে, ব্যাটার ছবি তোলার কোয়ালিটি খারাপ।"

সানজি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে, "বুঝি না এই ঠ্যাংগা মার্কা এমপিকে নিয়ে এতো মাতামাতির কি আছে? ফুল কিনুক, পাতা কিনুক সেটা খবরের কাগজে প্রকাশ করার কি দরকার? খবরের কাগজের অপমান শুধু।"

সান্নিধ্য তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সানজির দিকে কিয়ৎক্ষণ তাকিয়ে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেয়।নাজনীন বেগমের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডাস্বরে বলে,

"আম্মা এতো হাইপার হওয়ার কিছু নেই। সেরকম কিছু হয়নি। সময় হলে জানবে।"

"ছবিতে যে মেয়েটাকে দেখা যাচ্ছে সে কে?"

"কোথায় মেয়ের ছবি?"

"ওই খবরের কাগজটায় দেখো।"

শান্ত মস্তিষ্ক হুট করেই গরম হয়ে যায় সান্নিধ্যের। মুখোচোয়াল কাঠিন্যেতায় রুপ নেয় সেই সাথে। পূর্বকোণ পত্রিকায় অস্পষ্টভাবে গাড়ির মধ্যে এক মেয়ের ছবি তুলে ধরেছে। যদিও শেহরিনের মুখোরেখা খুব একটা বোঝা যাচ্ছে না তবে পরিচিত মানুষদের ধরতেও সময় লাগবে না ।কপালের শিখা দপদপ করে জ্বলে উঠে সান্নিধ্যের। ক্ৰোধের আগুনে দগ্ধ হয়ে সে খবরের কাগজটা হাতের মুঠোয় পেঁচিয়ে উঠে দাঁড়ায়।

সবাইকে প্রশ্নের মাঝে রেখেই নির্বিকারচিত্তে হেঁটে উপরে চলে যায় সে। সিঁড়ি পেরিয়ে নিজ কক্ষে আসামাত্র ফোন নিয়ে কল লাগায় আসিফকে,

"শুয়োরের বা*চ্চাকে সন্ধ্যার মাঝে ধরে বাংলোতে নিয়ে আসবে।"

"কিন্তু ভাই আপনার আজকে সন্ধ্যায় ডিসি হিলে একটা প্রোগ্রামে অ্যাটেন্ড করার কথা আছে।"

"বাতিল করো।"

"ঠিক আছে।"

সান্নিধ্য কান হতে ফোনটা নামাতেই সরফরাজ এসে হাজির হয়। ভাইয়ের অগ্নিমূর্তির ন্যায় রূপ দেখে দৃঢ়গলায় বলে," মাথা ঠান্ডা কর। এতো উত্তেজিত হওয়ার কিছু হয়নি।"

"অনেক কিছু হয়েছে।"

"খবরের কাগজে এগুলো প্রকাশিত হবেই। কয়জনের মুখ বন্ধ করবি তুই?"

"একজনের মুখ বন্ধ করলেই এনাফ। চারটা পত্রিকায় আমার ছবি ব্যতিক্রম শুধু পূর্বকোণ।"

"শত্রুতা থাকলে এমনটা করা কি স্বাভাবিক নয়?"

" স্বাভাবিক অস্বাভাবিকের কাহিনী শুনিয়ে লাভ নেই। শেহরিন এখনও আমার স্বঘোষিত কেউ হয়ে উঠেনি। যদি হতো সেটা আলাদা বিষয়।ওর পার্সোনাল একটা ইমেজ আছে। একটা মেয়েকে পাবলিকলি আনার সাহস দেখায় কিভাবে? এতে ওর ক্ষতিটা দেখবে কে?"

"আচ্ছা তুই মনমতো মার বাট মার্ডার করিস না।"

"এসব বিষয়ে আমার নো কম্প্রোমাইজ। "

রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি বাংলা গল্প pdf সাহিত্য

পাহাড়ের চূড়ায় জমে থাকা মেঘ গিলে ফেলেছে সূর্যের আলো। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির ছিটে ফেলছে শীতল বিষাদ। গাড়ি থেকে নেমেই সান্নিধ্য সরাসরি চলে যায় ডিসি হিল থেকে কিছুটা দূরে অর্ধ ধসে পড়া বাংলোতে। নির্জন প্রান্তর। জানালাগুলো ভাঙা,দরজা খোলা। ভেতরে ঢুকতেই পচা কাঠের গন্ধ নাকে ভাসে। মেঝেতে শ্যাওলা,দেয়ালে কালি ছড়ানো।

শাহমাতকে টেনে ফেলা হয় মেঝেতে। সান্নিধ্যের লোকজন সান্নিধ্য আসার আগেই তাকে এমনভাবে মেরেছে যে চোখ তুলে তাকানোর অবকাশ অব্দি পাচ্ছে না। মুখে রক্ত,গায়ের জামা ছিঁড়েখুঁড়ে একাকার। কাঁপুনি শরীর,মুখে অস্পষ্ট কাকুতিমিনতি।

"তোরে আমি যত ছাড়তে চাই তুই তত নিজে আমার কাছে এসে ধরা দিস।আমার ছবি দিয়ে তোর আয়েশ মিটেছিলো না জানোয়ারের বা*চ্চা?"

শাহমাত ঠোঁট ফুঁড়ে কথা উচ্চারণ করতে গিয়ে আটকে যায় ভয়ে। সান্নিধ্যের হিংস্র মুখ, কুঁচকে যাওয়া ভ্রু আর পেশির টানে চোয়ালের হাড় গজানো প্রতিচ্ছবি দেখে তার গলা শুকিয়ে উঠে।

সান্নিধ্য হাত বাড়াতেই লোহার একখানা রড হাতে তুলে দেয় আসিফ।অতঃপর কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে তিনজন পিছনে হাত মুঠো করে দাঁড়ায়। এসব তাদের অভ্যস্ত কাজকর্ম। নিজেরা আগে ট্রায়াল দিয়ে তারপরে পুরোটা সান্নিধ্যের হাতে ছেড়ে দেয়।রক্ত, বুলেট,খুন এগুলো নিত্যদিনের সঙ্গী।

শক্ত হাতে লোহার রডের সরাসরি আঘাত। মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে শাহমাত। গুমোটে বাতাসে ধ্বনিত হয় আর্তনাদের। ঠোঁট মাথা ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ে চিবুকে।

"থাম্বনেইল কি ছিলো?"

"মেয়ে নিয়ে লীলায় মজেছে চট্টগ্রাম -২ আসনের এমপি। "

সান্নিধ্য হাতের রড মুঠো পাকিয়ে ধরে বাম হাতে কপালের ঘাম মুছে। পড়নে সাদা শার্ট ঘেমে শরীরের সঙ্গে লেগে ধরেছে। শাহমাতের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট গোল করে নিঃশ্বাস ছেড়ে কিঞ্চিত হাসে।

"ব্যাটা শালা একেবারে জায়গামতো ঘা দিয়েছে।"

"স্যার প্লিজ এই মা*লটারে আর সহ্য হচ্ছে না। ওর যাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে। একেবারে শেষ করে উঠেন।"

প্যান্টের পকেট হতে ধাতব বস্তু বের করে আনে সান্নিধ্য। নিজের ভিতরে ফুঁসে ওঠা ক্রোধকে দমিয়ে শান্ত চোখে শাহমাতের দিকে নিচু হয়ে তাকায়। সাইলেন্সার লাগানো পিস্তলখানা নিরবে পেটে গুঁজে দিয়ে ট্রিগার প্রেস করে সঙ্গে সঙ্গেই।

শাহমাতের রক্তচক্ষু ঘোলাটে হয়ে উঠে। বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে ক্রমান্বয়ে ঢলে পড়ে মৃত্যুর দিকে। কিছু সময়ের ব্যবধানে ভিতর ফুঁড়ে শেষ নিঃশ্বাস বাহিত হয়ে আসে তার।

আজকের মতো কাজ শেষ হতেই সান্নিধ্য বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। পিস্তল খানা আসিফের হাতে দিয়ে বাকি দু'জনকে নির্দেশ দেয় লাশটা সরিয়ে দিতে।

"হ্যালো।"

"ভাইয়া তুই কোথায়?"

"কেন?"

"যেখানেই থাকিস না কেনো ডিসি হিলে আয়।"

সান্নিধ্য ভ্রু দ্বয় বাঁকায়। নিসরগলায় বলে,"ডিসি হিলে কি হয়েছে?"

"এই মুহুর্তে বেগুনি রঙের একটা কচুরি ফুলকে দেখতে পাচ্ছি চোখের সামনে। যেটা তোর ভীষণ প্রিয়।"

"শেহরিন?"

"হু। রবীন্দ্র জয়ন্তীতে গান গাইবে। তাকওয়াকে দিয়ে বিশেষ ব্যবস্থা করিয়েছি।"

"ওয়েট।"

সান্নিধ্য এক মুহুর্ত সময় ব্যয় না করে আসিফকে সঙ্গে নিয়ে চলে আসে ডিসি হিলে। আজ রবীন্দ্র জয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজন করা হয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে চারপাশটা। তৈরি করা হয়েছে বিশাল মঞ্চ। গাঢ় সন্ধ্যায় প্রজ্বলিত করা হয়েছে নানান রঙের বাতি।

সান্নিধ্যর মাথায় ক্যাপ মুখে মাস্ক। লাল হলুদ আলোতে বেগুনি রঙের সদ্য নদীতে ফোঁটা কচুরি ফুলের মতো স্নিগ্ধ নারী কায়াকে দেখে তার দৃষ্টি স্থির হয়ে যায়। চারপাশটা থমকে দাঁড়ায় সাথে সাথেই।

তবে হালকা ইলশেগুঁড়ি এই বৃষ্টির মাঝে যাকে সে এতো গভীর দৃষ্টিতে দেখছে তার অবস্থা নাজেহাল। এই প্রোগ্রামের কোনো প্রিপারেশন ছিলো না তার। তাকওয়া আপুর বাধ্যবাধকতার কারনে হঠাৎ অংশগ্রহণ। বেগুনি রঙা একখানা জামদানী শাড়ি পড়েছে সে। খোঁপায় বাঁধা চুলগুলোতে দিয়েছে বেলি ফুলের মালা। পরিপাটি স্বল্প সাজে অপরুপা স্নিগ্ধতা ছড়িয়েছে বেশ।

"শেহরিন এদিকে এসো তো আপু।"

শেহরিনকে টেনে সান্নিধ্যের সামনে নিয়ে আসে সানজি। গলার স্বর টেনে বলে,"আমার অশ্রদ্ধেয় বড় ভাই। বেশি নয় বছর খানিকের বড়। ভালো ছবি তুলতে পারে। চলো দুটো ছবি তুলি।"

সানজি শেহরিনকে কিছু বুঝে উঠার সময় দিতে না দিতেই সান্নিধ্যকে তাড়া দেয় ছবি তুলতে। সান্নিধ্য পকেট হতে ফোনটা বের করে ছবি তুলে দেয় দুজনের।

"হয়েছে? "

"হ্যাঁ।"

"গুড। চলো এখন যাই।"

এমপি সাহেবের বুকের মধ্যে প্রলয় তুলে দিয়ে সানজি শেহরিনকে নিয়ে চলে যায় মূল আনুষ্ঠানিক প্রাঙ্গনে। যাওয়া পথে শেহরিন পিছু ঘুরে এক পলক তাকায় সান্নিধ্যের দিকে। ভ্রু কুঞ্চিত করে সে সানজি সান্নিধ্যের হিসেব মেলাতে থাকে আনমনে।

"আসিফ...

" ভাই আর লাভ নেই।"

সান্নিধ্য ঘুরে তাকায়। আসিফ হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে বলে, "এই প্রোগ্রামটার কথাই বলেছিলাম। আপনি যেটা সকালেই বাতিল করে দিয়েছেন। ডিসি সাহেবকে কনফার্ম করেছি আপনি আসছেন না।"

সান্নিধ্যের দৃষ্টি শিথিল হয়ে আসে। কিয়ৎক্ষণ গোলকধাঁধার মাঝে পড়ে নিজেকে বের করে আনে সে। দুহাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে গাড়ির সঙ্গে হেলান দিয়ে আফসোসের চরম সীমায় গিয়ে পৌঁছে।

"স্যার কষ্ট পাবেন না।"

"প্রেম না করেই যে হার ছ্যাঁকা খেয়ে যাচ্ছি, প্রেম করলে দেবদাস হওয়া থেকে কেউ বাঁচাতে পারতো না আমাকে।"

বিজ্ঞাপন
রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি গল্পটি মাহরিণ তৃণ-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও সামাজিক গল্প