রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি

পর্ব - ১১

🟢

"ভাই??"

"ভাই।"

"ভাই??"

সানজি চেয়ার টেনে শেহরিনের পাশাপাশি বসে।বিস্ময়ে ঘেরা রমণীর নরম হাতে হাত রেখে ধীর কন্ঠে বলে,"অবিশ্বাস লাগছে?"

"পুরোটাই।"

"কিভাবে?"

প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পায় না শেহরিন। নির্নিমেষ চাহনিতে তাকিয়ে দেখে সানজিকে। কয়েকদিনের পরিচয়ে আজ প্রথম সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে তাকে। কি জানি আজকে পরিচয় পর্ব উন্মুক্ত হওয়ার পরে মনে হচ্ছে সত্যি এমপি সাহেবের সঙ্গে চেহারায় কিছুটা মিল রয়েছে সানজি আপুর। কিন্তু... কিন্তু সেটা আগে কেনো মনে হলো না.?

"এই মেয়ে কি ভাবছো?"

"আপনার ভাইয়ের যে মাথায় একটু সমস্যা আছে সেটা কি আপনি জানেন আপু?"

সানজি ফিক করে হেঁসে উঠে শেহরিনের নিষ্পাপ চাহনি সঙ্গে কথা বলার ভঙ্গিমা দেখে। সামনে অনুষ্ঠান চলছে। রবীন্দ্রনাথ জয়ন্তী উপলক্ষে গাওয়া হচ্ছে তার স্মরণে তারই স্বরচিত গান। 'আমারো পরাণও যাহা চায়' সুরের মূর্ছনায় আবেশিত সকল দর্শক। একমাত্র এমপি সাহেব ছাড়া জেলা প্রশাসক, বিভাগীয় কমিশনার সকল সরকারি কর্মকর্তাই আজ প্রায় উপস্থিত।

আর এদিকে সবার আড়ালে মনোমুগ্ধকর সন্ধ্যা উপেক্ষা করে দুই রমণী পরিচয় পর্ব খোলাসা করতে ভীষণ ব্যস্ত।

"বাচ্চা মেয়ে তোমার তো সাহস কম নয় তুমি আমার সামনে আমার ভাইকে পাগল বলছো?"

সানজি চোখ রাঙায় শেহরিনের পানে। অবোধ বালিকা সে চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে। উদাস কন্ঠে বলে,

"আপু প্লিজ এমপি সাহেবকে একটু বুঝাও।সে নিজেও পাগল, আমাকেও পাগল বানিয়ে ছাড়বে।"

"ভালো হবে তো। দুজনেই পাগল হয়ে একটা সংসার গড়ে তুলবে। নাম হবে 'পাগলের সংসার।'

শেহরিন চক্ষুস্থির করে সানজির পানে। মন মস্তিষ্ক তৎক্ষনাৎ তাকে বলে, একে বুঝিয়েও লাভ নেই। ইনিও এমপি সাহেবের আরেক শিষ্য। কি করবে ভেবে দেখো।

" আমি একটা সত্যি কথা বলি আপু?"

"অবশ্যই।"

"প্রথমত,আমি রাজনীতি পছন্দ করি না। করি না মানে কোনোভাবেই করি না। দ্বিতীয়ত,রাজনীতি পছন্দ না করার কারণে যে ব্যক্তি রাজনীতি করে তাকেও আমার অপছন্দ।"

"কোনোভাবেই কি পছন্দের লিস্টে আনা যায় না?"

"পছন্দ থেকে অপছন্দে যাওয়া যতটা সহজ,অপছন্দ থেকে পছন্দে আনা ততটা সহজ নয় আপু।"

"কিন্তু আমার ভাই যে তোমাকে সত্যি সত্যি ভালোবেসে ফেলেছে। সেটার কি হবে?"

"তাকে বুঝাতে হবে।"

"বুঝালেই কি সব মিটমাট? ভালোবাসাটা কি খুব সহজ? "

"ভালোবাসাটা হলো কিভাবে?"

সানজি আঙুলের কড়ে হাত রেখো গণনা করে।সরু চোখে কিছু একটা ভাবনা চিন্তা করে বলে," চৌদ্দ অথবা পনেরোদিনে একটা সুস্থ স্বাভাবিক প্রেম হওয়া কি সম্ভব নয়?মনের ভিতরে একজন মানুষকে জায়গা দিলে ভালোবাসা একদিনেও হয়ে উঠা সম্ভব।"

"আমার মন ফাঁকা। কোনো জায়গা নেই।"

"সেটাতো আপনার কথাতেই বুঝতে পারছি ম্যাডাম। একটু ভালোবাসলে কি সমস্যা হ্যাঁ? এইটুকু পিচ্চি হয়ে আমার বেচারা ভাইটাকে এভাবে নাকানিচুবানি খাওয়াচ্ছো, ভয় করে না?"

সানজির চোখ পাকানো দেখে শেহরিন মুখ টিপে হাসে। হাতের মাঝে হাত গছিয়ে দিয়ে বলে, " সেটাতেও তো কাজ হচ্ছে না।আপনার ভাই আমাকে সরাসরি বিয়ের হুমকি দেয়। এটা কি ঠিক বলুন?"

"প্রেম ভালোবাসায় সব ঠিক। বিয়ের হুমকিই তো দিয়েছে। অনেকে তো হাজার সাধনাতেও এই মিষ্টি হুমকি পায় না।"

"মিষ্টি হুমকি বলছো?"

গোল গোল কাজল রাঙা চোখের দিকে তাকিয়ে সানজি ঠোঁট ফুঁড়ে ছোট করে নিঃশ্বাস ছাড়ে। নিরস গলায় বলে, "ভালোবাসোনি তো কাউকে এজন্য বুঝতে পারছো না মেয়ে।পৃথিবীতে কতশত মেয়ে আছে যারা তাদের প্রেমিক পুরুষদের থেকে এই মিষ্টি হুমকি শোনার জন্য অধীর অপেক্ষায় থাকে। মন বাসনায় সর্বপ্রথম এই ইচ্ছেটাকে তুলে রাখে।

কিন্তু দিনশেষে সৃষ্টিকর্তা হয় তাদের ভাগ্যে রাখে না সেই মিষ্টি হুমকি, নয়তো বিষয়টাকে তাদের জন্য অনেক দূর্ভেদ্য করে তোলে।"

"তুমি কোন লিস্টে।"

"আমি লিস্টের বাহিরে।"

"বাহিরে কেন?"

" বাহিরে চলে গিয়েছি। ভালোবাসা দিয়ে আঁকা বৃত্তে আমার জায়গা হয়নি।"

সানজির উদাসী গলায় বলা কথায় শেহরিন স্তিমিতনেত্রে তাকায় তার পানে।হাতের মুঠো শক্ত করে চেপে ধরে বলে,"তুমি কি কারো ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত?"

"কি জানি। হতে পারে।"

"ভালোবাসা ভালোলাগা এগুলো কঠিন জিনিস।"

"মোটেই নয়। তুমি যদি তোমার জীবনে আসা সঠিক মানুষের ভালোবাসা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে সক্ষম হও তাহলে ভালোবাসা হবে মেঘে ভাসা তুলোর মতো নরম আর স্বচ্ছ পানির মতো সহজ। এক্ষেত্রে 'মূল্যায়ন' শব্দটাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।"

"আমার ভাবনা চিন্তার পরিসর ভীষণ ছোটো।"

সানজি শেহরিনের থুতনিতে হাত রেখে তার চোখে চোখ রাখে। নরম গলায় বলে,"যদি কখনো চিন্তা ভাবনার পরিসর বড় হয় তাহলে এমপি সাহেবের দিকটা একটু বিবেচনা করে দেইখো কেমন। তোমাকে জোর জবরদস্তি করছি না। তোমার লাইফের ডিসিশন তুমি নিবে। আমরা সবসময় সেটাকে সম্মানের চোখে দেখবো। বাট কখনো যদি ভালোবাসা নামক চারা বীজ মনের ভিতরে বুনতে পারো তাহলে পেশাটাকে বাদ দিয়ে ব্যক্তিটার দিকে একটু ভেবো কেমন? নিজের ভাই বলে বলছি না, খুব খারাপ নয়। রাগী,বেপরোয়া ভাব রয়েছে কিন্তু যত্ন পেলে হয়তো ঠিক হয়ে যাবে।"

শেহরিন মৃদু হাসে। মুখের উপর ছড়িয়ে পড়া চুলগুলো আলতো হাতে সরিয়ে বলে," আমি নিজেই নিজের যত্ন জানি না আপু। অন্য একটা মানুষকে কিভাবে যত্ন করবো। আমার পৃথিবীতে বাবা ছাড়া আমি শূন্য অসহায়। তার যত্নে আমি এখনোও লালন হই ।"

"তোমার মা নেই?"

"নাহ।মারা গিয়েছেন।"

"বাবা আর তুমি?"

"ইয়েস।বাবা আর আমি।"

এতো ভারী একটা কথা স্বতঃস্ফূর্ত কন্ঠে বলা দেখে

সানজি শেহরিনকে উষ্ণ আলিঙ্গন করে নেয়। আদুরে কন্ঠে বলে, "আমাদের কাছে এসো। তোমাকে যত্ন ভালোবাসার কুন্ডলী পাকিয়ে রেখে দিবো নিজেদের কাছে।"

"স্বল্প সময়ের পরিচিতা হয়ে আমাকে কেউ কখনো এতোটা ভালোবাসা দেয়নি তোমার মতো করে আপু।"

" তোমাকে দেখেই কেমন জানি আমার আপন আপন লাগে।"

শেহরিন ভ্রু দ্বয় বাঁকা করে। সানজির পানে তাকিয়ে মুখ ফুলিয়ে বলে,"আবারো?"

"দুষ্টু মেয়ে। আমার ভাইটাকে নাকে দড়ি দিয়ে না ঘুরালে শান্তি হচ্ছে না তোমার। একটু রাজি হয়ে গেলে কি হয়?"

" রাজি হওয়া কঠিনভাবে নিষিদ্ধ। আমার মনে এখনো প্রেম ভালোবাসা জন্ম নেয়নি।"

"আচ্ছা তুমি একটু সময় নিয়েই না হয় ভালোবাসো। তার ভালোবাসাটা আপাতত একটু গ্রহণ করো।"

"একই তো হলো। শোনো, আপু ব্যক্তিকে ভালোবাসতে গেলে তার পেশাটাকেও ভালোবাসতে হয়। নয়তো হয় না কোনোভাবেই।"

"রাজনীতি আমাদের রক্তে।"

"তাহলে প্রেমনীতিও আমার মনের বাহিরে।"

"বুঝবে বুঝবে মেয়ে, যোগ্য নেতা হারালে কাঁদতে হবে আড়ালে।"

"আড়ালে কাঁদাটাই ভালো। কেউ দেখবেও না বুঝবেও না।"

সানজি শেহরিনের হাতে চিমটি কাটে। থমথমে মুখ করে বলে,"তোমাকে যত শান্ত বাচ্চা ভাবি তুমি ততটা শান্ত বাচ্চা নও মেয়ে।ভারী দুষ্টু তুমি। তবে, একটা কথায় মাথায় রেখো, মানুষ নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি কিন্তু কঠিনভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। আজকের না ভবিষ্যতে হ্যাঁ হতে কতক্ষণ? "

"এমপি সাহেবকে অন্তত নয়।"

"আল্লাহ শেহরিনের মনে প্রাণে আমার ভাইটাকে কঠিনভাবে ঢুকিয়ে দাও। সে জানো উঠতে বসতে চোখ বন্ধ করলেই আমার ভাইটাকে দেখতে পারে।"

শেহরিন উল্টো খামচে ধরে সানজির হাতখানা। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে অবাকচোখে তাকিয়ে বলে,"ভাই বোন দুটোই দেখছি কেউ কারো থেকে কম নয়। এ আমি কোন দুনিয়াতে এসে পড়লাম।"

দুজনের চলমান গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুর কথায় আশেপাশে বসা সবাই ত্যক্ত বিরক্ত। তাদের দিকে দৃষ্টি সবার। অনুষ্ঠান উপভোগ তো দূরে থাক তাদের কথার জ্বালায় কেউ মনই দিতে পারছে না সেদিকে। অথচ বার তিনেক না করারও হলো। অবোধ দুই নারী কায়া তাদের করা বারণ শুনেও যেনো শুনেনি। অবশেষে আয়োজকদের কাছে গিয়ে কেউ চুপিসারে বিচার দিতেই তাকওয়াকে নির্দেশ করা হয় থামাতে।

"পেয়ারি ননদ ভাবি, দয়া করে আপনাদের রসালো গল্পে যদি একটু বিরতি টানতেন তাহলে আশেপাশের মানুষ একটু উপকৃত হতো।"

কানের কাছে কারো গরম বার্তায় শেহরিন সানজি কথা থামায়। চোখ তুলে উপরে তাকাতেই দেখতে পায় দুহাত কোমড়ে চেপে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তাকওয়া। কপালের ভাঁজগুলো তার স্পষ্টত।

"কি হয়েছে? "

"কিছুই হয়নি। কি হবে? এটাতো আসরখানা আপনাদের। যেভাবে গল্প গুজব করছেন,হাসি তামাশা, খামচাখামচি, জড়িয়ে ধরছেন মনে হচ্ছে আমরা ভুল করে আপনাদের বাসায় ঢুকে পড়েছি। ডিসি হিল মনে হচ্ছে না, মনে হচ্ছে সুখনিবাসের ড্রয়িং রুম। যেখানে ননদ ভাবি সন্ধ্যার অবসরে আড্ডা জমিয়েছে।"

সানজি তাকওয়ার কথায় আশেপাশে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকায়। উৎসুক কিছু মানুষের তাদের উপর দৃষ্টিপাত করা দেখে মুখে জোরপূর্বক হাসি টেনে আমতা আমতা স্বরে বলে,"ইয়ে.. মানে সরি। বেশি হয়ে গিয়েছে? "

"কম মনে হচ্ছে? "

"না.. না।"

তাকওয়া গরম চোখজোড়া সানজির হতে সরিয়ে শেহরিনের দিকে নিবদ্ধ করে। কাটকাট গলায় বলে,

"এই পিচ্চি উঠো।"

"আমি?"

"তোমাকেই তো বললাম মনে হলো।"

"কোথায় যাবো?"

"আর একজনের পরে তোমার নাম অ্যানাউন্সমেন্ট করা হবে।"

"নার্ভাস লাগছে আমার।"

" সানজি তোর ভাইয়াকে ডেকে আন। তার প্রেমিকার নার্ভাস লাগছে সে কোথায়?"

ভাইয়ার কথা শুনতেই শেহরিন লাফ দিয়ে বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। আবার এমপি সাহেব?? না..না এই লোককে ডাকলে নার্ভাসনেস তো তার আরো দ্বিগুণ হারে বেড়ে যাবে। তখন গান গাওয়া তো দূরে থাক মুখ দিয়ে কথাই বের হবে না।

নিজেকে সে ধাতস্থ করে। চোখ বড় বড় করে জড়িয়ে আসা কন্ঠ উন্মোচন করে বলে," আমার নার্ভাস লাগছে না আর।"

"গুড। চলো এখন।"

শেহরিনকে পথ বের করে দিয়ে তাকওয়া সানজির দিকে কন্ঠ নামিয়ে জিজ্ঞেস করে," এমপি মহোদয় সত্যি আসেনি? তাকে তো ইনভাইট করা হয়েছিলো।"

সানজি হতাশা কন্ঠ ভেদ করে বলে,

"ও বেচারা নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মেরে বসে আছে।"

_____________________________________

❝কেন মেঘ আসে হৃদয়‑আকাশে, তোমারে দেখিতে দেয় না।

মোহমেঘে তোমারে দেখিতে দেয় না,

অন্ধ করে রাখে, তোমারে দেখিতে দেয় না।

মাঝে মাঝে তব দেখা পাই,, চিরদিন কেনো পাই না—(২)

ক্ষনিক আলোকে..

আঁখিরও পলকে

তোমায় যবে পাই দেখিতে—(২)

ওহে ‘হারাই হারাই’ সদা হয় ভয়, হারাইয়া ফেলি চকিতে।

আশ না মিটিতে হারাইয়া

পলক না পড়িতে হারাইয়া

হৃদয় না জুড়াতে হারাইয়া ফেলি চকিতে।

মাঝে মাঝে তব দেখা পাই... চিরদিন কেনো পাই না—(২)

ওহে কী করিলে বলো পাইব তোমারে, রাখিব আঁখিতে আঁখিতে–

ওহে এত প্রেম আমি কোথা পাব, না, তোমারে হৃদয়ে রাখিতে।

আমার সাধ্য কিবা তোমারে –

দয়া না করিলে কে পারে –

বিজ্ঞাপন

তুমি আপনি না এলে কে পারে হৃদয়ে রাখিতে।

মাঝে মাঝে তব দেখা পাই.. চিরদিন কেনো পাই না —(২)

ওহে আর-কারো পানে চাহিব না আর, করিব হে আমি প্রাণপণ

ওহে তুমি যদি বলো এখনই করিব বিষয়‑বাসনা বিসর্জন।

দিব শ্রীচরণে বিষয়

দিব অকাতরে বিষয়

দিব তোমার লাগি বিষয়‑বাসনা বিসর্জন।

মাঝে মাঝে তব দেখা পাই..চিরদিন কেনো পাই না।—(২)❞

ডিসি হিলে আলোয় সাজানো ঝলমলে রাতে ভাসে মিষ্টি সুরের বন্দনা। শেষ বৈশাখী প্রহরে মৃদু বাতাসে গাছের পাতার ফাঁকে দোল খায় রঙিন পেপার ল্যান্টার্ন। শেহরিন মঞ্চে দাঁড়িয়ে। হাতে মাইক্রোফোন। কণ্ঠে কম্পন, গলার স্বর একটু ভারী। হুট করেই ভিতরটা তার অস্থিরতার ঢেউ তোলে। গানের অর্থগুলো তাকে টেনে নিয়ে যায় অজানা আবেগের গহীনে। এমন কেন লাগছে? কি অনুভব করছে সে?

চোখ বুঁজে ফেলে শেহরিন। নিজেকে দমানোর প্রয়াস করতে গিয়ে ভেসে ওঠে কারো মুখোরেখা। কারো এক মজার ছলে কথার কি তবে সত্যতা প্রমাণ হলো? এতোকিছু রেখে সে কেন এলো? তবে কি?? অস্বীকার করে সে।চোখ খুলে ফেলে।

শেষ কলি গাইতে তার কন্ঠে কাঁপুনির রেশ স্পষ্টত হয়। যেনো তাল লয় কেটে বের হয়ে আসবে এক্ষুণি। মঞ্চে জ্বলন্ত নরম আলো শেহরিনের মুখে এসে পড়ে। কোমল, স্নিগ্ধ কিন্তু অশান্ত তার ভাবরেখা। গান শেষ হতেই দর্শক সারি হতে ভেসে আসে করতালির শব্দ। চাপা উন্মাদনায় ভাসে শেহরিন নামটা।

"ভালো লেগেছে।"

"গান নাকি মেয়েটাকে।"

"দুটোই।"

"খোঁজ খবর নিন তাহলে।"

" হুম নিবো।আপনার পরিচিত? "

" চুয়েটে পড়ে।ফার্স্ট ইয়ার,সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এ।"

"ব্যবস্থা করে দিন।"

"প্রোফিট লাগবে।"

সুট ব্যুট পরিহিত লোকটিকে বাঁকা হেসে তাকায়। ধীর কন্ঠে বলে ,"প্রোফিটের লোভ আপনাকে ছাড়লো না।"

রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি বাংলা গল্প pdf সাহিত্য

নিজের কার্যটুকু সম্পন্ন হতেই শেহরিন ব্যস্ত হয়ে উঠে বাসায় ফেরার জন্য। রাত প্রায় আটটা বেজে গিয়েছে। এর চেয়ে বেশি দেরি হলে মামি মনিকা আন্টি দু'জনেরই বাঁকানো কথা শুনতে হবে তাকে।

"আর একটু থেকে যাও।"

"না আপু।এখন ফিরতেই হবে।"

"একাই যাবা?"

"মামা আসবেন রিসিভ করতে।"

"এসেছেন কি?"

শেহরিন উদ্বিগ্ন মাখা কন্ঠে ফের ফোনের পানে তাকায়। অনেকক্ষণ আগে মামা তাকে জানিয়েছে আসছেন তিনি। কিন্তু এতোসময় পার হওয়ার পরেও তার কোনো দেখা নেই। কাজেই আটকা পড়েছেন নাকি অন্যকিছু ভেবে পায় না সে।

"এই পিচ্চি আমার সাথে যাবে?"

"তুমি হালিশহর আমি খুলশী আপু। কিভাবে কি?"

"কিভাবে কি সেটা জানতে হবে না। যাবে কি না সেটা বলো। একদম বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে আসা হবে। নো চার্জ নো আর্গুমেন্ট।"

সানজির অবলীলায় বলা কথায় শেহরিন সন্দেহ মাখা চোখে তাকায়। কিছু একটা মনে আসতেই আশেপাশে দৃষ্টি চড়িয়ে খোঁজে কাউকে। কিন্তু খোঁজা পথের মাঝেই ফোনের রিংটোন বেজে উঠে তার।

"মামণি একটাঘন্টা কি একটু ওয়েট করতে পারবে?আমি একটা কাজে বাজেভাবে ফেঁসে গিয়েছি।"

"এক ঘন্টা?? "

"সরি মা।"

সানজি চোখ পাকিয়ে ইশারা করে মামাকে না করে দিতে। বুঝায় তাকে ড্রপ করে দেওয়া হবে। কিন্তু শেহরিন পড়ে যায় দ্বিধা দ্বন্দ্বের মাঝে। ঠোঁটের কোণে নখ ঠেঁকিয়ে বুঝতে পারে না কি জবাব দিবে।

"আমাকে দাও ফোনটা।"

সানজি শেহরিনের থেকে ফোনটা কেড়ে নেয়। নিজে কানে চেপে ধরে নমনীয় স্বরে কথা বলে মামার সঙ্গে। প্রয়োজনীয় পরিচয় টুকু দিয়ে নিশ্চিত করে সে ঠিকঠাক শেহরিনকে বাসায় পৌঁছে দিবে।

অপেক্ষার প্রহর কাটে দীর্ঘ সময় গ্রাস করে। টানা দু' ঘন্টা

গাড়ির সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শেষে সোজা হয়ে দাঁড়ায় সান্নিধ্য। ফোনটা বন্ধ করে পকেটে ঢুকিয়ে নেয় সে। সাদা শার্টখানা কুঁচকে ভাঁজ হয়ে এসেছে। হাতা গুটিয়ে কনুই অব্দি রেখে নীমিলিত লোচনে তাকিয়ে দেখে তার বুকে ঢেউ তোলা সুরের রাণীকে।

সন্ধ্যার সেই ক্ষণিকলগ্নে শেহরিনকে দেখে আর নিজেকে টলাতে পারিনি সেই জায়গা হতে। মঞ্চের ধারের কাছে যায়নি পেশাদারিত্বের কারণে। এমনিতে তাকে নিয়ে বর্তমানে মিডিয়া বেশ সরগরম আছে। কন্ট্রোভার্সি এড়াতে তাই নিজেকে বাধ্য হয়ে রেখেছে দূরে।

"উনি এখানে কি করছেন?"

"মনে হচ্ছে আমাদের ট্র্যান্সপোর্টেশন সার্ভিস দিতে।"

"আমি যাবো না।"

শেহরিন থমকে দাঁড়ায় এমপি সাহেবকে সম্মুখে দেখে। এই লোকটাকে সে যত চায় এড়িয়ে যেতে এই বান্দা তত তার নিকটে এসে হাজিরা দেয়। আজকে গান গাওয়ার সময় এই লোকটা অজান্তেই তাকে ভীষণ জ্বালিয়েছে। হুট করে কেনো তার মুখটা চোখে ভেসে উঠলো? তার প্রতি তো কোনো অনুভূতিই নেই। কোনো কিছুই নেই। তাহলে? নাকি বারে বারে এমন হুটহাট সাক্ষাৎ এর কারণে এমন হচ্ছে?

"আরে বাচ্চা প্যারা নেওয়ার দরকার নেই। কিছুক্ষণের জন্য মনে করো উনি আমাদের ড্রাইভার।"

"ড্রাইভার?"

"মনে মনে সব হয়।"

"একটা ঘন্টাই তো, মামা আসলে যাই?"

"র্য্যাগ খাবা?"

"না।"

"আমি তোমার সিনিয়র না?"

"হু।"

"তাহলে চুপচাপ চলো আমার সাথে। একা একা আমি তোমাকে এখানে রেখে যাবো নাকি।"

"তাকওয়া আপু...

" হোস্ট সে। ভীষণ ব্যস্ত। ওকে ধরতে পারবা না।"

সানজি হাত ধরে শেহরিনকে নিয়ে আসে সান্নিধ্যের সামনে। আঁড়চোখে একবার নাজুক লতিকার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে সে। গলা পরিষ্কার করে টেনে টেনে বলে,

"এমপি সাহেবকে তো আজকাল রাস্তা-ঘাটে ভালোই দেখতে পাওয়া যায়। রাস্তা ঘাটে যেহেতু আছেনই একটু জনসেবা করুন। আমাদের কে ড্রপ করে দিন।"

সান্নিধ্য শেহরিনের দিকে শান্ত দৃষ্টি রাখলেও শেহরিন সে পানে তাকায় না।এলোমেলো দৃষ্টিতে সে একবার মাটিতে তো একবার অন্য পানে তাকায়। সানজির হাতখানা আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে তার কাঁধের আড়ালে নিজেকে লুকায়।জড়তায় মোড়ানো শরীর নিয়ে এটুকু বুঝতে পারছে মাথা খারাপ এমপি সাহেব তার দিকেই তাকিয়ে আছে নির্নিমেষ চোখে।

"আপনাকে কিছু বলা হচ্ছে এমপি সাহেব।"

"গাড়িতে বস।"

সানজি শেহরিনকে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসে। সান্নিধ্য মুখের মাস্কটা খুলে হালকা দম টেনে আসিফকে মৃদু গলায় জিজ্ঞেস করে,"সব ঠিকঠাক ছিল।"

"হ্যাঁ ভাই। কেউ ভাবীর ধারের কাছেও আসেনি। তবে ভাবীর কন্ঠ কিন্তু আসলেই সুন্দর ।সবাই প্রশংসা করেছে। ডিসি স্যারও। আপনি থাকলে আপনিও হয়তো..."

কাটা গায়ে হালকা নুনের ছিটা দিয়ে মাঝপথে থেমে যায় আসিফ। ভাইয়ের দুঃখকে আর পুনরায় জাগ্রত করতে চায় না সে। এমনিতেই উঠতে বসতে ভাবী তাকে যেভাবে নাকানিচুবানি খাওয়াচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে হয়তো ভাই তার সত্যি দেবদাসে পরিণত হবে।

রাতের রাস্তায় কিছুক্ষণ নিরবতা পালন শেষে পিছনে সিটে বসা দুই রমণী ধীর গলায় গল্প গুজবে ব্যস্ত হয়ে উঠে। মাঝে মাঝে ক্ষীণ হাসিরও আওয়াজ কানে ভাসে। সান্নিধ্যের দৃষ্টি একটু পর পর মিররের দিকে যায়। স্টিয়ারিং হুইল ঘুরাতে ঘুরাতে সে তার বেগুনি রঙা প্রেয়সীকে দেখে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে এতোক্ষণের ক্লান্তি ভোলে। এই যে আজকের প্রোগ্রামটা বাতিল করার সুবাদে কিছু সময় পেয়েছিল হাতে নিজের জন্য। যেটা দীর্ঘ দিন ধরে তার কাছে দুষ্প্রাপ্য। চাইলেই সে চলে যেতে পারতো। নিজের জন্য সময়টাকে ব্যয় করতে পারতো।

কিন্তু নেতাসাহেব পারেনি কোনোভাবেই। অদৃশ্য মায়াজালে সে সত্যিই বিদ্ধ।একইসাথে সে তার শেহরিনকে কল্পনা করেছে খোঁপায় বাঁধা বকুল ফুল, বেগুনি রঙা কচুরি ফুল কিংবা থোকায় থোকায় ধরা জারুল ফুল হিসেবে। আর ফুলকে বাগিচায় একা রেখে মালিক যাবে বিশ্রাম করতে? অসম্ভব!! প্রেম দ্বারা রচিয়ত কাব্যে এ নিয়ম নেই।

নেতাসাহেব অকপটে স্বীকারও করে নিয়েছেন নিজের মনের কাছে,মেয়েটাকে সে সত্যিকার অর্থে ভালোবেসে ফেলেছে। হৃদয়ের অন্তঃস্থলে বিনা ঘোষণায় জায়গা করে দিয়েছে তাকে। একে ছাড়া তার আর বিকল্প পথ নেই। অন্য কোনো কিছু নেই।

কিন্তু কষ্ট একটাই, এই অবুঝ জারুল ফুলকে সে বুঝাবে কি করে?

"হয়েছে আর যেতে হবে না।"

"ভাইয়া ওকে এখানেই নামিয়ে দে। বাকিটুকু ও একাই যেতে পারবে।"

"কেন?পুরোটা গেলে কি সমস্যা? "

"সমস্যা আছে। বুঝবি না তুই।"

সান্নিধ্য গাড়ি থামায়। শেহরিন সানজির থেকে বিদায় নিয়ে তড়িঘড়ি করে গাড়ি হতে নেমে পড়ে। কিন্তু তার নামার আগ-মুহুর্তেই নেমে যায় সান্নিধ্য।

"তুই কোথায় যাচ্ছিস?"

"তোরা ওয়েট কর।"

শেহরিন শাড়ির কুঁচি সামলে ধীর গতিতে গাড়ি হতে নামে। সান্নিধ্যকে দেখে শীতল কণ্ঠে বলে, "আমি একাই যেতে পারবো। বেশিদূর নয়। আপনাকে যেতে হবে না।"

"সমস্যাটা কি?"

"সমস্যা অনেক কিছু।"

সান্নিধ্যের কপাল কুঁচকে যায় শেহরিনের জবাবে। কিয়ৎসেকেন্ড তাকিয়ে থেকে দু'হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে ধমকের স্বরে বলে," চুপচাপ হাঁটো।এইটুকু বাচ্চা মেয়েকে একা একা ছাড়া ঠিক নয়। হারিয়ে গেলে আমাকেই খুঁজতে হবে। "

শেহরিনের নরম মূর্তি ধমক খেয়ে দূর হয়ে যায়। শক্ত চোখে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বলে," হু আমি তো ক্লাস ওয়ানে পড়ি। হারিয়ে যাবো। শুনুন, ওইটা আমাদের বাসা। ওইখানে একটা কানা বগীর মা থাকে। আপনাকে আমার সঙ্গে দেখলেই ঠোকর মারতে আসবে। সো দয়া করে আসবেন না।"

"কানা বগীর মা কে?"

"আছে একজন।"

"চলো দেখে আসি।"

"এই না..না..না।"

"যেকোনো একটা অপশন চুজ করো। আমি তোমাকে শুধু বাসার সামনে পৌঁছে দিয়ে আসবো নয়তো সরাসরি বাসার ভিতরে যাবো।"

শেহরিন দীর্ঘ শ্বাস ফেলে ঠোঁটের উপর ঠোঁট চেপে চোখ বন্ধ করে নেয়। অতঃপর নির্মেদ স্বরে বলে,"আসুন।"

শেহরিনকে একটু আগে রেখে ঠিক তার পিছন পিছন মাথা নিচু করে হেঁটে যায় সান্নিধ্য। বৃষ্টির কারণে ভিতরের রাস্তাগুলো পানি জমেছে বেশ। চারপাশে কাঁদা পানিতে একাকার। সান্নিধ্যের সর্তক দৃষ্টি শেহরিনের পদরেখার দিকে নিবদ্ধ।

"শাড়িতে কাঁদা লাগছে। উঁচু করে হাঁটো। "

"লাগুক। আপনি চুপ। আপনার শাড়ি?"

"আমার তুমি।"

"মামার বাড়ির আবদার।"

"এটা তোমার মামারই বাসা।"

শেহরিন গেইটের কাছাকাছি আসতেই দাঁড়িয়ে পড়ে। পিছু ঘুরে শূলচোখে তাকিয়ে বলে,"এই যে আর এক পা দিলে বাসার ভিতরে চলে যাবো। অনুগ্রহ এখানেই জনসেবা বন্ধ করুন। নয়তো দারোয়ান আংকেল আপনাকে দেখলে নানান কথা ছড়াবে।"

" ঠিক আছে যাও।"

সান্নিধ্যের একবাক্যে রাজি হওয়াতে শেহরিন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। যাক্ নেতা সাহেবের মাথা তাহলে ঠান্ডা হয়েছে। মনে মনে তো তার ভয় হচ্ছিল ভীষণ। যদি কানা বগীর মা কে দেখার জেদ করতো তাহলে তো একদম সর্বনাশ হয়ে যেত। পা বাড়ায় সে সামনে। যাওয়াপথে আঁড়চোখে তাকিয়ে ছোট করে বলে, "থ্যাংকস।"

সান্নিধ্য হালকাভাবে মাথা নাড়িয়ে ক্ষীণ হাসে।

"হাসার কিছু হয়নি। উপকারীর উপকার স্বীকার করেছি শুধু।"

" উপকারীর উপকার স্বীকার না করে যদি ভালোবাসাটা স্বীকার করতে তাও তো হতো।"

" আপনার মধ্যে ভালোবাসা ছাড়া কি কিছুই নেই? "

" আছে। ৬০ ভাগ পানি আর ৪০ ভাগ শেহরিন।"

শেহরিন দমে যায়। নেতা সাহেবের শীতল চক্ষুর চাহনি হতে নিজের চক্ষুদ্বয় সরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে সে। বিরবির করে ঠোঁট নাড়িয়ে উচ্চারণ করে , "হু শেহরিন এখন মানুষ থেকে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, মিনারেলস হয়ে গিয়েছে।"

বিজ্ঞাপন
রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি গল্পটি মাহরিণ তৃণ-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও সামাজিক গল্প