|কুয়ালালামপুর, মালয়েশিয়া|
সন্ধ্যা ছয়টা। প্যাভিলিয়ন মলের বিশাল কাঁচের গম্বুজ ভেদ করে পড়ন্ত সূর্যের শেষ আভা এসে ঠিকরে পড়ে শেহরিনের গায়ে। প্রাণো চঞ্চলা মুখোরেখা তার তপ্ত গরমে ঘেমে উঠেছে। পড়নে
হালকা ক্রিম টাউজার্স সাথে সুতোয় বুনন করা বেগুনি রঙা টপস। গলায় ঝুলানো ফ্লোরাল প্রিন্টের স্কার্ফ।
বিদেশি মাটিতে আজ তার তিনদিন হতে চলেছে। কালকে ভোর ছয়টায় বাংলাদেশের উদ্দেশ্য ফ্লাইট। দেখতে দেখতে কিভাবে যে দিনগুলি পার হয়ে গেলো ভেবে পায় না শেহরিন। দূরদৃষ্টিতে তাকিয়ে নিভৃতে তার দীর্ঘ শ্বাসের আওয়াজ পাওয়া যায়। দেশের মাটিতে পা দিতে দিতে আবারো বাবার সঙ্গে লম্বা বিচ্ছেদ তৈরি হওয়ার সময় ঘনীভূত হয়ে আসছে। আবারো সেই যান্ত্রিক জীবনে জড়াতে হবে। একাকিত্বের পাহাড়ে নিজেকে ঠাঁই করে দাঁড়াতে হবে হাজার লোকের ভীড়ে । ইশ্ এই সময়গুলো যদি এখানেই থেমে যেত!! যদি সবকিছুর থেকে ছুটি মেলে শুধু বাবার কাঁধে মাথা রেখে স্নেহমাখা কন্ঠস্বরে নিজের ভিতরে পোড়া দাবানলগুলোকে শীতল করতে পারতো। তাহলেই হয়তো সত্যিকারে সুখ জিনিসটাকে সে মনে প্রাণে অনুভব করতে পারতো।
" মা।"
"ছুটি হলো? "
রিজওয়ান সাহেবের মেয়ের অভিমানী কন্ঠে মৃদু হাসেন। আজ তিনদিন হলো এসেও তেমন একটা সময় বের করতে পারিনি মেয়ের জন্য। একসাথে অনেকগুলো বিজনেস মিটিং ডিল করতে করতে সময় কোথায় দিয়ে পালিয়ে গিয়েছে তার ইয়াত্তা খুঁজে পাননা তিনি।
" রাগ হয়েছে কি বাবার উপরে?"
" রাগ করা,রাগ ভাঙানো, সুন্দর মুহুর্ত উপভোগ এগুলোর জন্য অনেক সময় প্রয়োজন বাবা। সময়ের কাছে আমি ভীষণ অসহায়।"
" তুমি কি জানো তোমার মামণি চলে যাওয়ার পর থেকে তুমি অনেক ধৈর্য্যশীল হয়ে উঠেছো? "
" পরিস্থিতি আমাকে হয়তো ধৈর্য্যশীল করেছে বাবা। নয়তো এতোক্ষণে রাগে নাক মুখ ফুলিয়ে বসে থাকতাম। মুখ ফিরিয়ে রাখতাম,অভিমানে তোমার সঙ্গে কথা বলতাম না।"
"বাবার উপরে ভীষণ রাগ মনে পুষে রেখেছো এটা আমি জানি। কিন্তু নিজেকে দূর্ভেদ্য প্রাচীর তৈরি করে রেখেছো যেনো তোমার ভিতরটা আমি উঁকি দিয়ে দেখতে না পারি।"
শেহরিন ঘুরে তাকায়।বাবার দিকে চেয়ে ক্ষীণ হেসে বলে,"হাঁটা যাক।"
"ঠিক আছে।"
পিচঢালা বিভুঁইয়ে রাস্তা তখন জমজমাট। বুকিত বিনতাং এলাকার রাস্তাগুলো সন্ধ্যার আলোয় ঝলমল করে ওঠেছে। নিওন সাইন রেস্তোরাঁর উজ্জ্বল ব্যানার সাথে শপিং মলগুলোর আলোকসজ্জা মিলিয়ে তৈরি হয়ে আছে এক জমকালো পরিবেশ। লোকজনে সমাগম পুরো জায়গাজুড়ে।
শেহরিন বাবার কনুইয়ে নিজের হাত আবদ্ধ করে ধরে। ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে নরম গলায় বলে," কি বলি বলো তো বাবা। এতো বড় হয়ে গেলাম অথচ এখনও নিজেকে চিনে উঠতে পারলাম না। পরিবেশ পরিস্থিতি আমাকে একেক সময় একেক রুপে নিয়ে আসে। তবে এটা সত্যি তোমার ব্যস্ততা আগে আমাকে ভীষণতর কষ্ট দিতো। এমন কষ্ট দিতো যেটা আমি সহ্য করতে পারতাম না। সহ্য করতে না পেরে কি কি করেছি সেটা না বলি।
তবে ধীরে ধীরে যখন বুঝলাম এগুলো নিতান্তই অর্থহীন। আমি শুধুমাত্র নিজেকে কষ্ট দিচ্ছি। আমার এই কষ্টগুলোর বিনিময়ে কিছুই পাচ্ছি না। না তোমাকে না মামণিকে। বরং তোমার প্রতি আমি নেগেটিভিটি ক্রিয়েট করছি।দূরত্ব বাড়াচ্ছি। তখন থেকে বাদ দিলাম সবকিছু । মনকে বুঝলাম তোমার একটুখানি সঙ্গতা,একটুখানি সময়ই হয়তো আমার জন্য নির্ধারিত করে দেওয়া হয়েছে। এইটুকুই যথেষ্ট। এর চেয়ে বেশি চাইলেই আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণহীন করে তুলবো। ভীষণ কষ্ট পাবো।"
"এজন্যই কি তুমি বাবাকে পেলে এতোটা খুশি হও মা?"
"হ্যাঁ। তবে,বাবা হিসেবে তুমি বেস্ট। এটা আমি লক্ষ কোটিবার নির্দ্বিধায় বলতে পারবো। আমার সুন্দর জীবনের জন্য অনেক অনেক বেশি স্যাক্রিফাইস করেছো তুমি। এখনও করে যাচ্ছো। কিভাবে অভিমান করি তাহলে বলো? তোমাকে আমি যতোটুকু সময় কাছে পাই বাবা, মনে হয় আমি পৃথিবী পেয়ে গিয়েছি। আমার জীবনে শূন্যতা বলতে কিছু নেই আর। তাই রাগ অভিমানে পুড়ে সময়গুলোকে হারাতে চাই না কোনোভাবেই। আমার রাগ অভিমান করা মানা। ভীষণ মানা।"
রিজওয়ান সাহেবের কর্ণকুহরে মেয়ের কথাগুলো গভীরভাবে আঁচ ফেলে।যদিও এটা তার ধারণার মাঝেই ছিলো। কিন্তু মুখ হতে শোনা কথাগুলো যেনো হৃদয়ে প্রভাব ফেলে কঠিনভাবে। মেয়ে তার কত সহজ গলায় বলছে কথাগুলো অথচ এগুলোর ওজন যে একেকটা কতটা ভারী তা হয়তো বাবা হিসেবে তার চেয়ে ভালে আর কেউ বুঝবে না।
"আমরা আমাদের জীবন বৃত্তান্তকে দূরে রেখে এই সময়টাকে অনুভব করি। দুঃখ কষ্ট সারাজীবনেই থাকবে। কিন্তু এই মুহূর্তগুলো আর আসবে না বাবা।"
"আমার মা'টা একা একা এতোবড় কিভাবে হয়ে গেলো আমি সত্যি ভেবে পাই না।"
শেহরিন বাবার হাত শক্ত করে ধরে। সামনে দৃষ্টি রেখে স্বতঃস্ফূর্ত কন্ঠে বলে,
" বাবাদের চোখে মেয়েরা বড় হয় না কখনো। তুমি শুধু এভাবেই আমার সঙ্গে থেকো আর কিছু লাগবে না আমার।"
----------------------------------------------------------
রাস্তার ধারে স্থানীয় বিক্রেতাদের স্টলে নানা রকম মালয়েশিয়ান স্ট্রিট ফুডের সুগন্ধ ভেসে আসছে। সতেজ পাড থাই, জুসিকাকের গরম গরম ভাপ আর সাটে এর মশলাদার গন্ধে চারপাশ ম ম করে। কাঠকয়লার ধোঁয়ায় মাখা মাংসের গন্ধ শেহরিনের নাকে যেতেই পেট গড়গড় করে উঠে তার।
"ইয়াক কি বাজে স্মেল।"
"লেট'স ট্রাই ।"
"নো বাবা। কি বলছো তুমি ! গন্ধেই আমার বমি আসছে। "
"খাবারে জিনিসে এরকম অতৃপ্তি আনতে হয় না।"
"তুমি ট্রাই করো তাহলে।"
রিজওয়ান সাহেব একমুহূর্ত ভেবে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলেন,"নাহ আমার মায়ের অপছন্দের জিনিস আমি খাই না।"
"তোমার তো ভালো লাগে খেতে বাবা।"
" হজম হবে না।"
শেহরিন ফিক করে হেসে উঠে বাবার মুখোভঙ্গি দেখে। মন তার এখন সতেজতায় পরিপূর্ণ। তার যেটা অপছন্দ বাবার সেখানে ঘোরতর বিপত্তি।হাজার পছন্দ হলেও সে আর ফিরেই তাকাবে না সেদিকে। একজন বাবা হিসেবে তাকে এতো আত্মত্যাগ কে করতে বলেছে ভেবে পায় না শেহরিন কোনোভাবেই।
কেএলসিসি পার্কের লেকের পাশে বাবা মেয়ে এসে ঠাঁই মেলায়। চারদিকে মনোমুগ্ধকর এক পরিবেশ। তাদের বসারত স্থানের
পাশেই ঝরণার ন্যায় বহমান ফোয়ারার জল ধীরে ধীরে উঁচু হয়ে পড়ছে। দু একটা জলের কণা ছুটে এসে শেহরিনের শরীর স্পর্শ করে দিয়ে যায়। আর এতেই কোমল রমণী আপন ছন্দে শিহরিত হয়ে উঠে। দু একটা জলের কণা হাত দিয়ে নেড়ে নেড়ে সৌন্দর্যের অপার স্নিগ্ধতা অনুভব করে।
গরম গরম কফিতে হালকা চুমুক টেনে গল্প গুজবের মাঝে পকেট হতে ফোনটা বের করেন রিজওয়ান সাহেব। উদ্দেশ্য মেয়েকে ছবি তুলে দেওয়া।এটা তার পুরনো কাজ। মেয়েকে সাথে করে যেখানেই যাবেন সেখানেই তাকে স্বল্প সময়ের আধাপাকা ফটোগ্রাফার হতেই হবে।
"বাবা রাইট সাইড হতে তুলবে। যেনো ফোয়ারাটাকেও দেখা যায়।"
"আমি কি এতো অ্যাস্থেটিক ছবি টবি তুলতে পারি ?"
"তুমি আমার সুপারম্যান বাবা। সব পারো তুমি।"
মেয়ের বাচ্চাসুলভ কথায় আলতো হাসেন রিজওয়ান সাহেব। তবে ছবি তোলার আগেই তার কপাল ভাঁজ হয়ে আসে কললিস্টে অনেকগুলো কল আসা দেখা।
"একটু ওয়েট মা। তোমার মামা পাঁচ বার আর কাদের তিনবার ফোন করেছে ইতিমধ্যে।"
"ওহহো.. রিসিভ করোনি কেন?"
" মাত্র দেখছি। ফোন মিটিং এর সময় সাইলেন্ট করে রেখেছিলাম।"
শেহরিন গরম কফিতে চুমুক টেনে বলে,"কলব্যাক করো দ্রুত।"
রিজওয়ান সাহেব মেয়ের কথায় দ্রুত কল ব্যাক করেন। সর্বপ্রথম কল দেন শফিক সাহেবকে। পাঁচবার কল দিয়েছে যেহেতু নিশ্চয়ই জরুরি কিছু হবে হয়তো।
সালাম অভিবাদন শেষে শফিক সাহেবের সঙ্গে কথা শুরু হয়। শেহরিন কফি খেতে খেতে বাবার মুখের ভাষা পড়তে চেষ্টা করে। খারাপ কিছু নয়তো?
রিজওয়ান সাহেব মেয়েকে ইশারা করে বুঝান তার ফোনটা কোথায়। শেহরিন বাবার ইশারার ভাবার্থ বুঝতে পেরে তড়িঘড়ি করে টেবিলে রাখা পার্স হতে ফোন বের করে। তৎক্ষনাৎ ফোনটা চালু করতেই চোখে পড়ে মামাও তাকে পাঁচ ছয়বার কল করেছে। সঙ্গে ঝতমারও অনেকগুলো কল এসেছে।
"সরি বাবা,মামাকে বলো আমার ফোনও সাইলেন্ট ছিলো।"
রিজওয়ান সাহেব ফোন লাউডস্পিকারের দেন। টেবিলের মাঝে রেখে শফিক সাহেবকে বলেন,"শেহরিন শুনতে পাচ্ছে শফিক, এখন বলো।"
"হ্যালো অনিভা।"
শেহরিন দোটানাগ্রস্ত মন নিয়ে থতমত স্বরে বলে,"জ্বি মামা। সরি.. আসলে আমি ফোন কখন সাইলেন্টে রেখেছি খেয়াল ছিলো না।"
"ইট’স ওকে বুঝতে পেরেছি। মামণি তোমার সাথে আমার একটা কথা আছে ।শুনতে পাচ্ছো কি ঠিকঠাক? "
"জ্বি মামা শুনতে পাচ্ছি বলুন আপনি।"
" যদিও বিষয়গুলো পার্সোনাল তবুও বলছি, মামণি তোমার কি এমপি সাহেব মানে আমাদের চট্টগ্রাম -২ আসনে যিনি আছেন তার সাথে কোনো কিছু রয়েছে..? আই মিন সম্পর্ক বা বন্ধুত্ব যাই বলো না কেনো?"
হঠাৎ প্রসঙ্গে এমপি সাহেবের কথাটা উঠতেই শেহরিন ইতস্তত বোধ করে খানিকটা। এলোমেলো দৃষ্টিতে সে একবার বাবার দিকে তাকায় তো একবার ফোনের স্ক্রিনের দিকে। কি উত্তর দিবে ভেবে পায় না । এই লোকের কথা তো সে প্রায় ভুলতেই বসেছিলো, হুট করে আবার কিভাবে ফিরে এলো।
"রিলাক্স হয়ে মামার প্রশ্নের উত্তর দাও।কোনো প্রেশার নেই।"
বাবার আশ্বস্তায় শেহরিন শুকনো ঢোক গিলে বলে,"জ্বি না মামা। উনার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক বা বন্ধুত্ব নেই।"
"শিউর তুমি?"
"জ্বি মামা। কিছু হয়েছে কি?"
"হয়েছে বলতে তার কিছু লোকজন এসেছিলো কালকে আমার কাছে।তোমার খোঁজ করছিলো বারে বারে। ঢাকাতে তোমার বাসার ঠিকানা কোথায় সেটাও আমার কাছে থেকে নিয়ে গিয়েছে।"
"বলেছেন আপনি?"
"না বলে উপায় কি? নাছোড়বান্দা। পুরো দেড়ঘন্টা আমার পিছু পিছু ঘুরেছে এই ঠিকানার জন্য। পরিশেষে তোমার মামি বিরক্ত হয়ে বললো,ঠিকানাটা দিয়ে দিতে। তাই বাধ্য হয়ে দিলাম।"
শেহরিন চোখ বন্ধ করে চাপা নিঃশ্বাস ছাড়ে। নিজেকে ধাতস্থ করে ধীর কন্ঠে বলে, "আচ্ছা আমি বিষয়টা দেখছি মামা।"
"ঠিক আছে।"
ফোন কেটে যায়। শেহরিন বাবার দিকে অসহায় চোখে তাকাতেই রিজওয়ান সাহেব সামান্য ঠোঁট প্রসারিত করে বলেন,"নেতা সাহেব?"
"হু।"
"তার মানে এই সেই পাওয়ারফুল পার্সন।"
"বাবা.."
"শান্ত হও। আমি বুঝতে পেরেছি বিষয়টা। নেতা সাহেব মনে হচ্ছে সিরিয়াস। দাঁড়াও কাদেরকে ফোন করি। দেখি সেখানে কি হয়েছে।"
রিজওয়ান সাহেব ফোন লাউডস্পিকারে রেখেই কাদেরকে ফোন করেন। দুবার রিং শেষে তিনবারে কল রিসিভ করেন তিনি। প্রথমে বাসার সবকিছুর খোঁজ খবর নেওয়া শেষে এমপি সাহেবের প্রসঙ্গ টানতেই কাদের নিজ হতে গড়গড়িয়ে বলে,"ভাইসাব প্রথমে রাত এগোরোটার সময় একজন আইসা অনিভা মায়ের খোঁজ নিয়া গেছে। পরে ঠিক রাত দুইটার সময় এক সুন্দর চেহারার পোলা আইসা আবারো অনিভা মায়ের খোঁজ কইরা গেছে।অনিভা মায়ে হের কি হয় বলে..
"কিছু বলেছে?"
"অনিভা মায়ে কবে আসবো। চট্টগ্রাম কবে যাইবো।"
"তুমি বলেছো?"
"আমি তো ঠিক জানি না।"
"আর কিছু বলেছে?"
"সুন্দর চেহারার পোলার পাশেরজন অনিভা মায়েরে ভাবি ভাবি কইয়া ডাকছিলো। সবাইরে দেইখা নেতা নেতা মনে হইছে।"
"বাসায় প্রবেশ করেছিলো?"
"না ভাইজান। সুন্দর পোলা হের কালো গাড়ির সাথে হেলান দিয়া দাঁড়াইয়া কথা কইছে। আমিই তার কাছে গেছিলাম।"
"আচ্ছা ঠিক আছে। রাখি তাহলে।"
"আরেকটা কথা ভাইজান, হেই কয় শ্বশুর বাড়ি সুন্দর আছে দেখতে। তার পছন্দ হইছে অনিভা মায়ের মতোই।"
রিজওয়ান সাহেব কাদেরের এহেন কথায় বুঝতে পারে না কি প্রতিক্রিয়া জানাবেন। সরাসরি শেহরিনের পানে তাকাতেই শেহরিন লজ্জায় দাঁতে দাঁত পিষে অন্যদিকে তাকায়। সমস্ত শরীর তার এমপি সাহেবের উপর রাগে দুঃখে রি রি করছে। এই যে ঋতমা কল করেছে এই মেয়েকেও নিশ্চিত এই ব্যাটা এমপি পাকড়াও করেছিলো । না জানি ওর কাছে নিজেকে আবার কি বলে জাহির করেছে। সারা বিশ্বে ঢোল পিটিয়ে ভাইরাস ছড়িয়েছে এই লোক। ছিঃ ছিঃ মান সম্মানগুলোকে এইভাবে ফালুদা করার কি খুব দরকার ছিলো?
রিজওয়ান সাহেব মেয়ের অস্বস্তি দূর করতে কন্ঠস্বর পরিষ্কার করেন। নরম গলায় বলেন,
"ছেলেটার তো দেখছি অনেক সাহস। অবশ্য পলিটিক্যাল পার্সনদের সাহস একটু বেশিই হয়। তবে আমার ধারণাকে সে পুরোপুরি মিথ্যা প্রমাণ করেছে।আমি ভেবেছিলাম তোমার অনুপস্থিতিতে সে হয়তো তোমাকে ভুলে যাবে।এখন তো দেখছি পুরো দুনিয়াজুড়ে তল্লাশি চালিয়ে খুঁজেছে তোমাকে।
"বাবা রাজনীতি করতে করতে উনার মাথা গিয়েছে। তাই এসব উদ্ভট কাজ করেছে।"
"একেবারে উদ্ভট বলেও উড়িয়ে দিতে পারছি না। কেননা, কক্সবাজার লোক লাগিয়ে খুঁজে বের করেছে তোমার মামাকে। সেখান থেকে ইনফরমেশন নিয়ে নিজে ঢাকায় গিয়েছে। শুরুতেই ভালো এফোর্ট দিচ্ছে। মনে হচ্ছে নেতার পাশাপাশি বেশ ভালোই প্রেমিক পুরুষ।"
শেহরিন বাবার দিকে সরু চোখে তাকায়। শক্ত কন্ঠে বলে, "মজা করো না বাবা। এই লোকের পাবনা যাওয়া উচিত। মাথা সত্যি সত্যি খারাপ হয়ে গিয়েছে। বুঝতে পারছো মামা মামির সামনে...উনারা কি ভাবছেন? আমি গিয়ে মুখ দেখাবো কিভাবে?"
" মুখ দেখাবে কিভাবে মানে?এখানে তোমার তো কোনো দোষ নেই। চিন্তা করো না। আমি তো আছি। বিষয়টা আমি দেখবো। দরকার হলে তোমার নেতাসাহেবকে বুঝিয়ে বলবো।"
"আমার নেতাসাহেব?"
"না মানে ওই আরকি... "
"বাবা তুমি যা ভাবছো আসলে তা নয়।"
"আমি তো কিছুই ভাবছি না মা।"
শেহরিন কপালে হাত রেখে মেঝেপানে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখে। কাঠের টেবিলের উপরে রাখা ফোনটা হুট করেই তার বিপবিপ আওয়াজ তোলে। মেঝে হতে দৃষ্টি সরিয়ে চোখের দৃষ্টি ফোনের উপরে রাখতেই দেখে ঋতমা হতে এসেছে ক্ষুদে বার্তা।
"কি ব্যাপার মিসেস এমপি? এখনই ফোন রিসিভ করছেন না? কয়দিন পর তো আর চিনতেই পারবেন না। ভালো ভালো। এইভাবে ঘোল খাইয়ে দিলেন? যাইহোক,তলে তলে এতোকিছু ঋতমা জানলো না কোনো কিছুই।"
লম্বা দীর্ঘ শ্বাসে বিরবির করে ঠোঁট নাড়ে শেহরিন। বাবাকে এড়িয়ে ক্ষীণ কন্ঠে বলে,
"শুধু একবার চট্টগ্রামে পৌঁছাতে দিন এমপি সাহেব। বিনা মশলায় আপনাকে যদি রান্না না করেছি তাহলে আমার নামও শেহরিন নয়।"
|রাত পৌনে বারোটা,সুখনিবাস|
লম্বা শাওয়ার শেষে ওয়াশরুম হতে বের হয় সান্নিধ্য। পড়নে তার ছাই বর্ণের নেক ক্রু টি শার্ট সঙ্গে কালো টাউজার্স।মাথার চুলগুলো তার প্রায় সম্পূর্ণ ভেজা। গলার সঙ্গে টাওয়েল ঝুলিয়ে ডান হাতে ফুলে যাওয়া লাল অংশের দিকে দৃষ্টিপাত রাখে সে। আজকে স্বল্পসময়ের যুদ্ধের ফলাফল এটা। রক্ত জমাট বেঁধে লালচে বর্ণ হয়ে গিয়েছে। ক্ষত জায়গাটা হতে চিনচিনে ব্যথা ছড়ালেও তার কাছে কিছুই মনে হয় না,বরং শেহরিনের অনুপস্থিতির ব্যথায় সে তার চেয়ে দ্বিগুণহারে কুপোকাত।
ল্যাপটপটা নিয়ে বেলকনির উদ্দেশ্য পা বাড়াতেই ফোন তার আওয়াজ তোলে। ঘুরে এসে ফোনটা রিসিভ করতেই অপরপাশ হতে কারো দূর্বল গলার কন্ঠস্বর পাওয়া যায়।
"স্যার মশা আমাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। কালকে সকালে ম্যামের বাসার সামনে এসে দাঁড়াই? আজকে উনার আসার সম্ভাবনা একেবারেই নেই।"
"এটা তোমার শাস্তি। চুপচাপ উপভোগ করো।"
"উপভোগ করতে পারছি না স্যার। অসভ্য মশাগুলো আমার উপর রীতিমতো অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে।"
"কোথায় দাঁড়িয়ে আছো এখন?"
"ম্যামের মামার বাসার একদম গেইটের সামনে। দারোয়ান সাহেবের চাহনিতে সুস্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে সে আমাকে চোর হিসেবে মনোনীত করে ফেলেছে ইতিমধ্যে। গণপিটুনি খাওয়ার সম্ভবনা নাইন্টিপার্সেন্ট। "
সান্নিধ্য ঘড়িতে এক নজর সময় বুলায়। অতঃপর ঠান্ডা গলায় বলে,"কালকে সকাল সাতটায় গিয়ে আবার একই জায়গায় গিয়ে দাঁড়াবে। আজকের জন্য ছুটি দিলাম।"
"আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘজীবি করুক স্যার। একইসঙ্গে ম্যামকে তাড়াতাড়ি দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসুক। তার সাথে সাথে আমরা ও মুক্ত হই। খাস দিলে দোয়া করলাম।"
"নিজের ব্রেইনের জন্যও তো একটু দোয়া করলে পারো।"
"এখন থেকে করবো স্যার।"
সান্নিধ্য ফোন নামায়। আজ চারদিন হলো সে শেহরিন থেকে বিচ্ছিন্ন। একদমই বিচ্ছিন্ন। সদ্য প্রেমে পড়া প্রেমিক সাহেব
তার বকুল ফুল প্রেমিকার অভাবে মরুভূমির বালির ন্যায় শুষ্কতায় জরাজীর্ণ হয়ে উঠেছে। একমাত্র শেহরিন ছাড়া তার ভিতরে বৃষ্টিপাত হওয়া অসম্ভব। এভাবে আর কতদিন?? ভীষণ খরায় ভুগছে যে সে।
ল্যাপটপখানা নিয়ে সে বেলকনিতে গিয়ে বসে। দু'পা ছড়িয়ে হাঁটুর উপরে রেখে অন করতেই তার পাশে এসে হাজির হয় সানজি। হাতে মোবাইল নিয়ে সে ধীর পায়ে ভাইয়ের চারপাশে ঘুরাঘুরি করে আর গুনগুন করে গান গায়।
সান্নিধ্য আঁড়চোখে একবার সেদিকে দৃষ্টি দিয়ে নিজ কাজে চুপচাপ মনোনিবেশ করে।
"মালয়েশিয়া আসলেই সুন্দর একটা দেশ। ভাবছি বিয়ের পর ওখানেই হানিমুনে যাবো। কি বলিস ভাইয়া?"
সান্নিধ্য হতে আসে না কোনো প্রতিত্তুর। সানজি ঠোঁট টিপে নিরব হাসে।ফোনের স্ক্রিনের পানে তাকিয়ে বলে, "
"Me with Superman in the glow of the twilight afternoon.
আহ্ কি ক্যাপশন। ছবিগুলোও কি সুন্দর এসেছে। মেয়েটা এতো মিষ্টি কেনো ভাইয়া?"
সান্নিধ্য ল্যাপটপ হতে দৃষ্টি তোলে না। সানজি খানিকটা এগিয়ে এসে ফের নরম গলায় বলে,"কারো পৌঁষ মাস চলছে তো কারো সর্বনাশের মাস চলছে। কেউ ঢাকা -চট্টগ্রাম খুঁজে খুঁজে হয়রান তো কেউ মালয়েশিয়া লংকাউই স্কাই ব্রিজে দাঁড়িয়ে মনের সুখে ছবি তোলে। সবই কপাল।"
ফোনের ব্রাইটনেস বাড়ায় সানজি। চোখের সম্মুখে শেহরিনের সদ্য পোস্ট করা ছবিখানা তুলে তাকিয়ে থেকে রসিয়ে রসিয়ে বলে, "মেয়েটা অনেক আদুরে। বেগুনি রঙের জামাটা একদম ফুটে উঠেছে। না জানি বেগুনি রঙের শাড়ি পড়লে কত সুন্দর লাগবে দেখতে। ছেলেরা তো মাস্ট ক্রাশ খাবে। কেউ কেউ তো আবার ডিরেক্ট বিয়ের প্রস্তাবও দিয়ে বসবে।"
সান্নিধ্য ঠোঁটের উপর ঠোঁট চেপে ধৈর্য্যশীল ব্যক্তিদের খাতায় নিজের নাম লিখানোর চেষ্টা করতে থাকে। অবশ্য আজকাল সে নিজেকে বেশ ধৈর্য্যশীল ব্যক্তিই মনে করে। শেহরিন নামটা তার জীবনে আসার আগে এতো ধৈর্য্যশীল সে কোনো কালেই ছিলো না। চুপচাপ কোনো কিছু হজম করা তার পক্ষে ভীষণ কঠিন বিষয়। অথচ এখন কি নির্দ্বিধায় সে সানজির কথা হজম করে যাচ্ছে।
"থাক আর শেহরিন দূর্ভিক্ষে ভুগিস না ভাইয়া। তোকে দেখে আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে আমি চলে গেলেই শেহরিনের অভাবে কেঁদেকুটে ভাসাবি।পায়ে ধরি তোর, কাঁদিস না যেনো। এমপি মানুষ তুই। জনগণের আস্থা ভরসা। অন্যদিকে পার্ট টাইম গুন্ডা। তুই যদি প্রেমিকার জন্য কাঁদিস, লোকে নাক টেনে ছিঃ ছিঃ করবে। তোর শত্রুরা হাসাহাসি করবে। শেষে মান সম্মান নিয়ে টানটানি করতে হবে।"
ল্যাপটপ বন্ধ হয়ে যায়। ঠোঁট গোল করে নিঃশ্বাস ছাড়ে এমপি সাহেব। মন মস্তিষ্কে ইতিমধ্যে আলোড়ন শুরু হয়ে গিয়েছে। মাত্র গোসল করে আসা শরীরেও তার গরম অনুভূত হয়। নাকের ডগায় কপালের মাঝে বিন্দু বিন্দু ঘাম এসে জমে।বুকের ভিতরের খবরটা না হয় অজানাই থাকুক। এর বৃত্তান্ত সে আর প্রকাশ করতে চায় না। শেহরিন নামক অভাব তাকে নিদারুণ জ্বালায় জ্বালাচ্ছে।
সানজি ভাইয়ের দম আটকানো অবস্থা দেখে মুখ লুকিয়ে হাসলেও অবাক হয় বেশ। এতো শান্তশিষ্ট হয়ে বসে থাকার ব্যাপারটা তার বোধগম্য হয় না। তবে যতটুকু খেপিয়েছে এতটুকুই যথেষ্ট। এর বেশি খেপালে ভাই তার নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে সোজা খাদে গিয়ে পড়বে।
" যাওয়ার আগে একটা ভালো সাজেশন দিচ্ছি শুনে নে। তোর চোখ মুখে শেহরিন নামক রক্তশূন্যতা দেখা দিয়েছে ব্যাপকভাবে। চোখের নিচে হয়তো সাদা ফ্যাকাশে বর্ণ ও হয়ে এসেছে। অতি শীঘ্রই ডাক্তার দেখা নয়তো অবস্থা খারাপ হয়ে হসপিটালাইজড করতে হবে। আসি।"
সানজি চলে যায়। সান্নিধ্য কতক্ষণ স্থির হয়ে বসে থেকে উঠে দাঁড়ায়। কক্ষে এসে ফোনখানা তুলে সে কল করে তার ব্যক্তিগত সহকারী আরহামকে।
"চুয়েটে আর কোনো সমস্যা আছে কি?"
"জ্বি না স্যার।"
"সিভিল ডিপার্টমেন্টে? "
আরহামের বুক চিঁড়ে হতাশার নিঃশ্বাস বায়। রাত একটার সময় স্যারের চুয়েটের সিভিল ডিপার্টমেন্টের উপর এতো মায়া দেখে তার ভীষণ আফসোস হয়। এই মায়াটা যদি একটু তার প্রতি থাকতো তাহলে সুন্দর ঘুমটা আর ভাঙতো না। নিমজ্জিত কন্ঠ ঠিকরে সে জবাব দেয়,
"স্যার আপনি যেভাবে চুয়েটের উন্নয়ন করে যাচ্ছেন এটা এমনভাবে চলতে থাকলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সহ অন্যান্য স্কুল কলেজের এখন সময়ের ব্যাপার আপনার বিপক্ষে আন্দোলনে নামার। জনগণ তো আর বুঝবে না চুয়েটে ম্যাডাম আছে জন্য...
" বাদ দাও।"
"একটা কথা ছিলো স্যার। ম্যাডাম কালকে সকালে দেশে ফিরছেন।"
আরহাম হতে উচ্চারিত একটা বাক্যেই সান্নিধ্যের মেরুদণ্ড বেয়ে শীতল স্রোত নেমে যায়। মুখোরেখা হয়ে উঠে শান্ত । কিন্তু অজানা কারণে শরীর তার দ্বিগুণ উত্তাপে ঘেমে উঠে। মনে হচ্ছে আবারো গোসল করতে হবে। এই অতি মূল্যবান কথাটা শোনার জন্য সে অধীর আগ্রহে বসেছিলো পাঁচ পাঁচটা দিন।আজ অবশেষে এই মাঝরাতে তার সমাপ্তি ঘটলো। কালকে হয়তো মরুভূমির তীব্র উত্তপ্ততা শেষে সত্যি তার মনে মুষলধারে বৃষ্টিপাত শুরু হবে।