সময় বেলা ১:৩৫ মিনিট।
বেসিক ইলেকট্রনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ক্লাস শেষ হয়েছে মাত্র। এখন বাদ রয়েছে একটা মাত্র কুইজ এরপরেই ছুটি। জাহাঙ্গীর আলম স্যারের ক্লাসে আসতে কিছুটা সময় হাতে রয়েছে বিধায় শেহরিন নিজের করা নোটটায় আরো একবার চোখ বুলিয়ে নেয় গভীর মনোযোগে।
"হাই শেহরিন।"
খাতা হতে দৃষ্টি তুলে উপরে তাকায় শেহরিন। দু তিনজন ক্লাসমেইটকে হঠাৎ তার সম্মুখে একসঙ্গে দেখে ভ্রু কুঞ্চিত হলেও পর মুহুর্তে সে মুখে মৃদু হাসি টেনে বলে, "হ্যালো এভ্রিবডি।"
তূর্ণা এগিয়ে এসে শেহরিনের পাশটায় বসে। কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে বলে, "তোমার করা নোট?
" হ্যাঁ।"
"একটু দেখতে পারি? "
"শিউর প্লিজ। "
তূর্ণা শেহরিনের থেকে নোটটা নিয়ে কয়েক পৃষ্ঠা উলট পালট করে দেখে।গোছানো হাতে সুস্পষ্ট সব লেখা। প্রত্যেকটা লেকচারের মূল বিষয়গুলো সুন্দর করে পয়েন্ট আকারে লিখে রেখেছে সে। তূর্ণার সাথে আসা আনিকা বর্ষাও বেশ অবাক হয় নোট দেখে।
"বাহ। অর্ক,নিশি,জায়ান ওরা তো দেখছি সত্যিই বলেছে। তোমার করা নোট আসলেই চমৎকার। এতো সাজিয়ে গুছিয়ে তো আমাদের কখনো করাই হয় না।"
"আমি জাস্ট স্পিচলেস দোস্ত।"
"এনিওয়ে,আমরা কি একটু নোটটা পেতে পারি শেহরিন? যদি তুমি কিছু মনে না করো । আসলে আমরা কেউই এই ক্লাসটা ঠিক মতো করতে পারিনি।"
"উই আর ফ্রেন্ডস তূর্ণা। দেয়ার ইজ নো নিড টু শো সো মাচ কার্টেসি। প্লিজ টেক ইট।"
"তুমি খুব ভালো মেয়ে শেহরিন।"
শেহরিন স্বতঃস্ফূর্ত হাসে। ধীর কন্ঠে বলে, "ইটস্ ওকে।"
কুইজের সময় আসে। আজকের কুইজের ফরম্যাট- শর্ট অ্যান্সার কোয়েশ্চন এবং বিষয়বস্তু- লিনিয়ার অ্যালজেব্রা ও ডিফারেন্সিয়াল ইকুয়েশন। জাহাঙ্গীর আলম স্যার কাঁটায় কাঁটায় বিশ মিনিট ধরে কুইজ নেন। এর মাঝে সবাই একটু আকটু কারচুপি করলেও শেহরিন নিজস্বতায় সম্পূর্ণ করে পুরোটা। অবশ্য তার কথা বলার খুব একটা মানুষও নেই। যার সঙ্গে লুকিয়ে ছাপিয়ে একটু ডিসকাস্ করবে। প্রথম বর্ষের ছয় মাস পার হচ্ছে। এর মধ্যে এক ঋতমার সাথে তার হয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। একে অপরকে মোটামুটি ভালো ফ্রেন্ড হিসেবেই স্বীকৃতি দিয়েছে। এছাড়া উল্লেখ করার মতো কোনো ফ্রেন্ডস নেই তার। দুঃখজনক হলেও বিষয়টা সত্যি। কেননা এবার তাদের সেশনে যারা সিভিল বিভাগে রয়েছে নব্বই শতাংশই চট্টগ্রাম বা তার আশেপাশেই। দূর বলতে শেহরিন সহ হাত গোনা কয়েকজন মাত্র।
লোকালদের সবক্ষেত্রেই দাপট থাকে বেশি। পরিচিতি,আলাদা ট্যাগ, বন্ধুমহল ওদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। নতুনদের এক্ষেত্রে কষ্ট হয় মানিয়ে নিতে।সহজে তাদের দলবদ্ধ কলোনিতে নিজেদেরকে মেলে ধরার সুযোগ মেলে না।তবুও বাকি কয়েকজনের মধ্যে শেহরিন কিছুটা পরিচিতি পেয়েছে শুধু মাত্র ভালো পড়াশোনা এবং এক্সট্রা কারিকুলামে অ্যাক্টিভ বলে।
কুইজ শেষে ব্যাগ নিয়ে বের হয় ক্লাসরুম থেকে শেহরিন। আজকে কেন যেনো খুব বেশি একা লাগছে নিজেকে। হয়তো ঋতমা আসেনি এজন্য। এই মেয়েটা যেদিন না আসে সেদিন তার কাছে সবকিছু অন্ধকার, অচেনা লাগে।
একাডেমিক বিল্ডিং পার হয়ে কিছুটা দূর যেতেই ব্যাগ হতে সাইলেন্ট করে রাখা ফোন ভাইব্রেট করে। কম্পনরত আওয়াজে শেহরিন হাঁটার গতি কমিয়ে ফোন বের করে রিসিভ করে। একমাত্র 'বাবা' ছাড়া এই মুহূর্তে অবশ্য তাকে ফোন দেওয়ার কেউ নেই। দুপুরের খাবারের খোঁজ নিতে সে যে ফোন করবে এটা শেহরিন আগে থেকেই জানতো।
"আসসালামু আলাইকুম বাবা।"
"ওয়ালাইকুমুস সালাম। কেমন আছো মা?"
"জ্বি আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তুমি কেমন আছো?"
"আলহামদুলিল্লাহ। কোথায়? বাসায় ফেরোনি এখনও?"
শেহরিন কিছুটা হেঁটে শহিদ মিনার প্রাঙ্গনে এসে বসে। মধ্যে দুপুর সময় হওয়াতে এদিকটায় মানুষের আনাগোনা খুব কম। নিরিবিলিতে কিছুক্ষণ বাবার সাথে ভাব প্রকাশ না করলে তার দিন কাটবে না।
"ক্যাম্পাসেই বাবা। কুইজ ছিলো জন্য আজকে একটু লেট হয়েছে।"
"ওহ আচ্ছা আচ্ছা।"
"বাবা।"
"জ্বি মা।"
শেহরিন কিয়ৎক্ষণ চুপ হয়ে যায়। অতঃপর অদূর পানে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে নিমজ্জিত স্বরে বলে,"ভার্সিটিতে কেউ কারো বন্ধু হয় না কথাটা কি সত্যি?"
রিজওয়ান সাহেব বাসায় ফেরা মুহুর্তে গাড়িতে বসা অবস্থায় মৃদু হাসেন।স্নেহময় কন্ঠে বলেন,"ঋতমা তোমার বন্ধু নয়?"
"হু।"
"তাহলে?"
"ও ছাড়া আর কেউ নেই।"
"হয়ে যাবে মা।কেবল তো শুরু। দরকার হলে তুমি সবার সঙ্গে মিশবে, কথা বলবে নিজ হতে ফ্রেন্ডশীপ করবে।"
"আমি চাই বাবা।বাট ওরা কেউ রেসপন্স করে না। ওদের সবারই আলাদা একটা সার্কেল রয়েছে। কেউ সংযোজন করে না সেখানে কাউকে।"
"ঠিক আছে তাহলে তোমরা যারা বাদ বাকি রয়েছো তারা মিলে একটা সার্কেল করো। অচেনা সার্কেল। হাহা.."
শেহরিন বাম হাতের নখ খুঁটে। ভারী মুখ করে বলে,
"ঋতমা অতি শীঘ্রই আমেরিকা চলে যাচ্ছে বাবা ফুল ফ্যামিলিসহ। ওদের অলরেডি ভিসা হয়ে গিয়েছে।"
"হয়ে গিয়েছে? "
"হ্যাঁ। আমি এখন আরো একা হয়ে যাবো। আমার ভালো লাগছে না।"
"সাবরিনা শেহরিন অনিভাকে কি ডিপার্টমেন্টের কেউ চেনে না?"
"চেনে।"
"তাহলে?"
"চেনা আর বন্ধুত্বের মধ্যে বিস্তর ফারাক বাবা। ঋতমা ছাড়া ক্লাসের সবাই আমাকে নোটের কারণে চেনে। ওদের কাছে আমার চেয়ে আমার নোটটা বেশি গুরুত্ব পায়।"
রিজওয়ান সাহেব বাসায় প্রবেশ করতে করতে বলেন,"ভেরি গুড। তাহলে মন খারাপ করছো কেন? মানুষকে মানুষ চেনে কর্মের মাধ্যমে।"
"আর বন্ধুত্ব? ভার্সিটি লাইফে এই পাঁচ ছয়টা মাসে এসেই বুঝেছি একা চলা সম্ভব নয়।"
"তোমার কেমন ফ্রেন্ড দরকার সেটা বলো? যার সঙ্গে ক্যাম্পাসে একটু আড্ডা দিবে, ঘুরাঘুরি করবে,সকল বিষয় নিয়ে প্রাণখোলা ডিসকাস করবে, ঘুরবে তাইতো? "
"হু।"
"ওকে। দ্যাট মিনস্ একটা টাইট ফ্রেন্ডশীপ তুমি চাইছো। ইউ নো শেহরিন, একটা টাইট বন্ধন গড় উঠতে কত সময় লাগে?"
"লং টাইম।"
"ইয়েস লং টাইম। তাহলে তুমি জাস্ট পাঁচ ছয় মাসে এসে সম্পূর্ণ অচেনা পরিবেশে কিভাবে আশা করছে সেটা? বরং আমি তো বলবো, তুমি লাকি কারণ ঋতমাকে মাত্র কয়েকদিনের পরিচয়ে ওর সাথে সুন্দর বন্ডিং তৈরি করে সক্ষম হয়েছিলে। এটা অনেকেই পারে না।"
"এফোর্টটা আমারই বেশি ছিলো বাবা। যদিও ঋতমা খুবই ভালো একটা মেয়ে।"
"আচ্ছা আমার কথা শোনো, তুমি কি এটা নিয়ে খুব বেশি মন খারাপ করে আছো?"
শেহরিন ভাবুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,"খুব বেশি নয় তবে একটু তো.."
"ওকে। দ্যাটস্ ফাইন। এটুকু থাকতেই হবে।"
"এনি টিপস্?"
রিজওয়ান সাহেব শান্ত কন্ঠে বলেন,"মা।"
"জ্বি বাবা।"
"জীবনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব নিজেকে দাও। এরপরে আপনজন। বন্ধুত্বের রংবদল ঘটে। মানুষ পরিবর্তন হয়। তুমি যাকে খুব কাছের বলে মনে করবে তার একটুখানি খারাপ তোমাকে ভীষণ কষ্ট দিবে। তার চেয়ে বরং সবাইকে বন্ধু ভাবো ভার্সিটিতে। সবাইকে সমানভাবে দেখো। তোমার ফুচকা খেতে মনে চাইলো, যে কোনো একজনকে বলে দেখো নিশ্চয়ই যাবে।
তোমার পড়া নিয়ে কোনো সমস্যা হলো হাজার জনের মধ্যে একজন থাকবে যে কিনা তোমাকে একটু হলেও সাহায্য করবে। তুমি এতটুকুতেই সন্তুষ্ট থাকো। তুমি মানুষের থেকে নিজের চাহিদা কমাও। যতো চাহিদা কমিয়ে রাখবে সেটা তত তোমাকে প্রশান্তি এনে দিবে। তখন একটুখানি ভালোও তোমার কাছে বিশাল ভালো মনে হবে। মূলত ভার্সিটি লাইফে "স্পেসিফিক" শব্দটা এনো না।
আর নিজেকে সর্বস্থায় পজিটিভ রাখার চেষ্টা করবে। কারণ এই চারটা বছর কিভাবে কেটে যাবে বুঝতেই পারবে না। এই যে,এখন খারাপ লাগছে তোমার। ঋতমা চলে যাওয়ার মিনিমাম এক মাস পর তুমি আমাকে এই কথাটা আর বলতে পারবে না। তোমার মনেই আসবে না। কারণ তুমি একাকীত্বে থাকলে সেটাতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়বে।
আমরা মানুষেরা কোনো কিছু ফেস করার আগে প্রচুর ভয় পাই। কিন্তু দিনশেষে সেটার মধ্যে দিয়ে যখন যাই তখন আর ভয় করে না। এটা সৃষ্টিকর্তা হতে প্রদত্ত একটা বিশেষ ক্ষমতা।
এনিওয়ে,এর চেয়ে বরং সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রে করো তোমার লাইফ পার্টনার যে হবে সে যেনো ফ্রেন্ডলি হয়। লাইফ পার্টনার ব্রেস্ট ফ্রেন্ড হলে আর কি চাই? তখন না হয় সব কষ্ট উগড়ে সবাইকে বলবে হু আর ইউ?? "
শেহরিন বাবার কথায় হেসে উঠে। মনের মধ্যে জমানো মেঘ কেটে রোদ উঠে এক নিমিষেই। নিজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস সে ফিরিয়ে আনে। একাই চলবে সে। তবে একা চলার পথে কেউ বন্ধু হতে চাইলে মানা করবে না। সবাই তার ফ্রেন্ড।
"বাবা আর তোমাকে ধন্যবাদ দিতে ইচ্ছে করেনা। একটা মানুষকে এতো ধন্যবাদ দেওয়া যায় বলো?"
রিজওয়ান সাহেব শব্দ করে হেসে উঠেন। সন্তুষ্টচিত্তে বলেন,"আমার মায়ের থেকে ধন্যবাদ শুনতে শুনতে আমিও টায়ার্ড হয়ে গিয়েছি। কোনোভাবে কি এই ফর্মাল কার্টেসি বন্ধ করা যায় না।"
"না বলেও তো উপায় পাই না বাবা। তোমার কাছে যে আমি চির ঋণী।"
"ঋণ শোধ করার একটা উপায় আছে।"
শেহরিন হাত ঘড়িতে সময় দেখে উঠে পড়ে। হাঁটাপথে শুধায়,"কি সেটা?"
"এটা পরে বলবো। এখন অনেক সময় পার হয়ে গিয়েছে।দ্রুত বাসায় যাও।ফ্রেশ হয়ে খাওয়া দাওয়া করো। আর কোনো কথা নয়।"
"তুমি লাঞ্চ করেছো?"
"আমার মায়ের সাথে করবো।"
"ওহহো বাবা। দাঁড়াও আমি এক্ষুণি বাসায় ফিরছি।"
"সাবধানে।"
বলা নেই কওয়া নেই এক পশলা বৃষ্টি বয়ে যায় বিকালবেলায়। সারা দুপুর মন ভার করে থাকা মেঘ বিকেলে এসে রাগ ঝেড়েছে শহরের বুকে।অতঃপর স্বচ্ছ ঝকঝকে আকাশ পরিষ্কার হয়ে উঠতেই দেখা মেলে রংধনুর সাত রাঙা রঙ। কি মায়াময়, কি অপরুপ দেখতে। তাকালেই যেনো মন ভালো হয়ে যায়।সদ্য স্নান সেরে উঠা গাছপালাগুলো চকচক করছে।পাতার ভাঁজে এক ফোঁটা দু ফোঁটা করে টুবুর টাবুর করে পানি পড়ছে সমানতালে।
বৃষ্টিভেজা দুপুরে একটা সুন্দর ভাত ঘুম দিয়ে উঠে শেহরিন। হাত পা মুচড়িয়ে এপাশ ওপাশ করে সে তার গভীর ঘুমের রেশ কাটায়। ফোনটা হাতে নিয়ে এক দৃষ্টিতে সময়ের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ।
বিকেল পাঁচটা সাতচল্লিশ মিনিট। সাড়ে ছয়টার দিকে বের হতে হবে। যদিও বিন্দুমাত্র ইচ্ছা ছিলো না তার এই বের হওয়ার প্রতি। আরো একটু লম্বা ঘুমের ইচ্ছে ছিলো ব্যাপক। কিন্তু বিধিবাম।
মামার অফিস সহকারীর বিয়ে। ফুল ফ্যামিলি নিমন্ত্রণের পাল্লায় পড়েছে। মামা অলরেডি তাকে দু তিনবার ওয়ার্নিংও দিয়ে গিয়েছে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রেডি হতে। এরপরেও না হলে ভীষণ রাগ করবে।
তড়াক করে লাফিয়ে উঠে সে বিছানা হতে। হাত খোঁপা করে চুলটা কোনমতে বেঁধে চার পাল্লার কাঠের আলমারিখানা খুলে। দু'হাত কোমড়ে চেপে ভাবতে থাকে কোন রঙের শাড়িটা আজ পড়বে সে।
"পার্পল অর বটল গ্রিন?"
দুটো শাড়ি বের করে শেহরিন কালার চুজ করতে অনেকটা সময় নেয়।গায়ের সাথে ধরে আয়নায় এদিক সেদিক নানান কায়দা করে অবশেষে মনস্থির করে বটল গ্রিনটাই পড়বে। সবুজ সবকিছুই তার প্রিয়। আর আজকে বৃষ্টিভেজা দিনে এটা একটু বেশিই ফুটে উঠবে।
ফ্রেশ হয়ে এসে দক্ষ হাতে শাড়িটা পড়ে নেয় সে। সুন্দর সিল্ক শাড়িটার আঁচলে আর পাড়ে সোনালি সুতোর মোটিফে কাজ করা আম পাতা আর ফুলের নকশা।
"অনিভা।"
"জ্বি মামি।"
"হলো তোমার?"
"হয়ে এসেছে।"
শেহরিন তড়িঘড়ি করে কানে একজোড়া ঝুমকা পড়ে নেয়। চোখের নিচে হালকা কাজল টেনে চুলগুলো আঁচড়ে ছেড়ে দেয় পিঠ বরাবর। হাতে ঘড়িটা পড়ে সে ফোন নিয়ে বের হয়ে যায় গন্তব্যের উদ্দেশ্য।
"এটা কি অনিভা আপু?"
"খারাপ লাগছে?"
"মোটেওও নয়। এতো সুন্দর লাগছে, এতো সুন্দর লাগছে আমি তো চোখই ফেরাতে পারছি না।"
"ওরে বাবা তাই।"
মুমুর প্রশংসা বাণীতে শাহিদা বেগম গাড়িতে উঠা মুহুর্তে শেহরিনের দিকে এক পলক তাকায়। ধীর স্বরে বলে,"আসলেই সুন্দর লাগছে তোমাকে।মাঝেমধ্যে শাড়ি পরলেও তো পারো।"
শেহরিনের গাড়ির দরজা খুলতে গিয়ে হাত থেমে যায়। স্তব্ধ চোখে তাকায় সে মামির দিকে। মুখটা পরিস্থিতিভেদে শুধু হা হয় না। মামি তাকে প্রশংসা করলো??মামি? এটাও হতে পারে?
"আল্লাহ সূর্য আজকে কোন দিকে অস্ত যাচ্ছে?"
"অনিভা আপু কি হলো?"
"না কিছু না।"
শেহরিনের মন এক লহমায় ফুরফুরে হয়ে যায়। এই যে মামির কাছে পাওয়া ছোট্ট প্রশংসা তাকে বিশ্ব সুন্দরীর ন্যায় অনুভূতি জাগাচ্ছে। আজ প্রথম মনে হচ্ছে সে সুন্দর। মনে মনে ঠিক করে বাসায় গিয়ে সে শতবার আয়না দেখবে।লজ্জায় লাল নীল হবে।
মামি তাকে সুন্দর বলেছে মানে সত্যি সুন্দর লাগছে দেখতে। ইশ্ বের হওয়ার সময় কেনো একটাবার নিজেকে আবারো আয়না দেখলো না সে।
----------------------------------------------------
|এশিয়ান হাইওয়ে,সন্ধ্যা সাতটা|
বৃষ্টিভেজা ঝকঝকে বিকাল ছেড়ে সন্ধ্যা নেমেছে ধরণীতলে। একটু গাঢ় নজর বুলালেই দেখে যাবে আকাশে ফের কালো মেঘের করাত দাঁত। যার কারণে হাইওয়ের দুপাশে সোডিয়াম লাইটগুলোর আলো দেখাচ্ছে বিষণ্ণ হলুদ। নিথর পাহাড় গুলো চুপিসারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে অদূর পানে। ক্ষীয়মান বাতাসে মেশে ধুলো আর যানবাহনে পোড়া ডিজেলের গন্ধ।
বন্দর নগরীর ব্যস্ত হাইওয়ে কাঁপিয়ে একের পর এক গাড়ি ছুটে চলেছে বুলেটের গতিতে। হেডলাইটের সাদা ঝলকানি রাস্তার কালো অ্যাসফাল্টে আঁকড়ে ধরে আছে কঠিনভাবে।
এশিয়ান হাইওয়ের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে একটা সাদা প্রাইভেট কার।নিশ্চুপ নিস্তব্ধ তার চারিপাশ। জানালায় টিন্টেড গ্লাস ভিতরের অংশকে করছে অন্ধকার। যার কারণে বোঝা দায় অভ্যন্তরে বসা মানুষটার অভিব্যক্তি।
সময় বায়। দু'জন সচিত্তে এগিয়ে এসে নক করে মৃদুভাবে। গ্লাস নেমে যায় সঙ্গে সঙ্গে।
"স্যার এসেছে।"
গাড়ির দরজা খুলে বাইরে পা রাখে সান্নিধ্য। প্রশ্বস্ত কাঁধ আর কঠোর চোয়ালে টান টান হয়ে দাঁড়ায় সে জনৈক ব্যক্তির সামনে। হাত দ্বারা ইশারা করে আসিফ এবং রিমনকে পিছনে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।
"ভালো লাগছে আপনাকে দেখে।"
"দেখুন এমপি সাহেব এখানে..
"আমি আমার কাজ ফেলে এখানে আসেনি আপনার কথা শুনতে। আমি এসেছি আমার কথা আপনাকে শুনাতে।"
শাহমাত সাহেব সান্নিধ্যের কথায় নিজের কথা থামিয়ে ফেলে।
ধারালো চোখে দৃষ্টি স্থাপন করিয়ে বলে,"জ্বি বলুন।"
"আপনি কি চান আজকের এই রাত আপনার জীবনে শেষ রাত হোক?"
"ভয় দেখাচ্ছেন এমপি সাহেব?"
"ভয় পান না আপনি?"
"না।"
সান্নিধ্য সাদা পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে ধীরে ধীরে তাদের মধ্যেকার শেষ দূরত্বটুকু ঘুচায়। পেশিবহুল হাতের শিরা ফুলে উঠে তার ক্রোধের অনলে পু্ড়ে। তীক্ষ্ণ জবানে উচ্চারণ করে,
"পূর্বকোণ পত্রিকা অফিসের হলুদ সাংবাদিকদের ম্যানেজার শাহমাত সর্দার।যিনি কিনা এমপি সান্নিধ্য শাহজাদ খানের বিরুদ্ধে দূর্নীতির নীল নকশা তৈরির খবর ছাপানোর নির্দেশ দিয়েছে। আজ রাত এগারোটায় দুই হাজার চারশো একুশটা পত্রিকার কপি ছাপানো হবে তাই তো? দেশের শীর্ষ স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতেও প্রকাশ পাবে?"
শাহমাত সাহেব মুখ খোলার আগেই শক্তহাতে তার গলা চেপে গাড়ির উপর এনে মাথা ঠেকায় সান্নিধ্য। শত্রু পক্ষকে আঘাত করার সময় সে বরাবরের ন্যায় হয়ে যায় শান্ত। তবে তার চোখে ছোটে স্ফুলিঙ্গের বিস্ফোরণ।
"আমি ভালো মানুষের জন্য ভালো কাজ করি। খারাপ মানুষের জন্য খারাপ কাজ করি। আমাকে ডুবানোর চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো শাহমাত।তোমাকে বারে বারে বাঁচার সুযোগ এই এমপি দিবে না। একদম গলার রগ টেনে বের করে আনবে।"
"ছা..ছাড় কুত্তার বা'চ্চা। এমপি হয়ে বাহাদুরি "
সান্নিধ্য গলা চেপে টেনে তুলে সরাসরি আঁছাড় মারে গাড়ির সম্মুখে। পরপর দু তিনবার বেড়ধক আঁছাড়ে শাহমাতের নাক মুখ থেঁতলে গিয়ে রক্ত ছড়িয়ে পড়ে। রক্তাক্ত হয়ে উঠে সাদা গাড়িটা।
মুখ দিয়ে গোঙানির আওয়াজ বের হয়। স্তিমিতনেত্রে সামনে দাঁড়ানো ঠান্ডা মেজাজরুপী ভয়ংকর মানুষটাকে দেখে সে।
"আমাকে খেপাতে এসো না শাহমাত। একদম কলিজা ফুঁড়ে গুলি চালিয়ে দিতে আমার কনিষ্ঠ আঙুলও কাঁপবে না। তোমাকে মারলে আবর্জনা নাম্বার ৬ দূর হবে। আর টার্গেটে তুমিই থাকবে।"
"ক্ষম..ক্ষমতা?"
সান্নিধ্য পকেট হতে পিস্তল বের করে জ্বলন্ত চোখে তাকায় শাহমাতের দিকে।ঠোঁটের কোণে যৎসামান্য হাসি ঝুলিয়ে পিস্তলের বেয়নেট দিয়ে শাহমাতের গালে আঁচড় কাটে। রক্তের ফোঁটা ঝরে সঙ্গে সঙ্গে।
" ইয়েস পাওয়ার।এই পাঁচ বছর চট্টগ্রাম শহর একদম রাজত্ব করে যাবো।"
শাহমাতের শরীর রক্তে ভিজে উঠে। পিছন হতে আসিফ এসে সম্ভ্রমস্বরে বলে,"স্যার ক্রসফায়ার করে দিন ডিরেক্ট। বাকিটা আমরা সামলে নিচ্ছি।"
লৌহ ধাতব বস্তুটি শাহমাতের পেট বরাবর চলে আসে। ট্রিগারে আঙুলের ভর পড়ে। শাহমাত অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে সান্নিধ্যকে। কল্পনাতেও ভাবতে পারিনি এই পুরুষটার শান্ত রুপের আড়ালে কতটা নিষ্ঠুর প্রতিচ্ছবি আঁকা। হাইওয়ের মাঝে এই পাবলিক স্থানেও যার কোনো ভয় ডর নেই।নির্দ্বিধায় ক্রস ফায়ারের মতো কঠিন জিনিসের দিকে কীভাবে অগ্রসর হচ্ছে সে।
কিন্তু নিয়তি বোধহয় আজ শাহমাতের সঙ্গে ছিলো। জ্বলন্ত এমপি সাহেবকে নিস্তেজিত করতে হুট করে আগমন ঘটে এক প্রাণোচ্ছ্বল রমণীর। রাতের অন্ধকারে পিছন হতে একখানা কালো রঙের গাড়ি আলো ফুঁড়ে এসে তাদের পাশ কেটে চলে যায়। গিয়ে থামে একদম তাদের গাড়ি হতে মাত্র কয়েক হাত দূরে।
"আর একটুখানি পথ। সামনেই কমিউনিটি সেন্টার এখানেই শেষ হতে হলো?"
"মোজাম্মেল একটু চেক করবে না। এখানে কোথায় ফুয়েল স্টেশন?"
শফিউল সাহেব গাড়ি হতে নামতে নামতে বলেন,"এখানে আর ফুয়েল স্টেশন খুঁজে লাভ নেই। নেমে পড়ো সবাই। জাস্ট একটুখানি হাঁটা পথ।পারবে না তোমরা?"
সবার মাঝ হতে শেহরিন আরশ উচ্ছ্বসিত কন্ঠ ঠেলে বলে,"একশোবার পারবো।"
একে একে গাড়ি হতে নেমে আসে মিসেস শাহিদা,মুমু এবং আরশ। সর্বশেষে শাড়ির কুঁচি সামলে ধীর গতিতে পিচঢালা রাস্তায় পা রাখে শেহরিন। বয়ে চলা মৃদুমন্দ হাওয়ার গতি তার শাড়ির আঁচল দুলিয়ে তোলে। মুখের উপর অবাধে বিচরণ করে এলোমেলো চুল। মুখে তার মিষ্টি হাসি। কাজল টানা চোখে উচ্ছ্বাসতা।
আর এতেই চক্ষুস্থির হয়ে যায় তার হতে কয়েক কদম দূরে দাঁড়ানো নেতা সাহেবের। রমণীর মিষ্টি হাসি এসে সরাসরি লাগে তার বুকের বা পাশে।ক্রুব্ধ নয়নজোড়া ফুঁ দিয়ে নেভানো বাতির ন্যায় দপ করে নিভে যায় তার। বদলে নেমে আসে একরাশ শীতলতা। শাহমাতের পেটে চেপে ধরা পিস্তল শিথিল হয়ে আসে। সেই সাথে শিথিল হয়ে আসে তার ট্রিগারে চাপ দেওয়া আঙুল।
রিমন স্যারের মুখোরেখা দেখে অবাক হয়ে যায়। এতোটা মগ্ন দৃষ্টিতে আজ পর্যন্ত সে কখনোই তার স্যারকে কোনো রমণীর দিকে তাকাতে দেখেনি।
"স্যার এই সেই মেয়ে যে বলেছিলো আপনি কবিতা আবৃত্তি করেন।সেদিন রাস্তায়...
" আজকে সকালেও বলেছে।"
"জ্বি স্যার?"
সান্নিধ্যের হুঁশ ফেরে। শাহমাতকে ছুঁড়ে ফেলে বলে,"কিছু না ওকে নিয়ে যাও।"
"স্যার এনকাউন্টার?"
"না। এবারের মতো মাফ করে দিলাম।"
"স্যার??"
"যেটা বলেছি সেটা করো।"
আসিফ রিমন আর দ্বিরুক্তি না করে টেনে তুলে শাহমাতকে হাইওয়ের নিচ দিকে নিয়ে যায়। তবে এমপি সাহেব তার জায়গা হতে এক পা নড়ে না।শেহরিনের এক ঝলক প্রাণোচ্ছ্বলতা তাকে কুপোকাত করে দেয় ভিতরে হতে। অশান্ত মন তার ছটফট করতে থাকে। সমস্ত কাঠিন্যেতা ধুয়ে মুছে যায় বর্ষার জলে।
"রাস্তা পার হতে পারবে? "
"এটা তো খুব ইজি।"
"মোটেও ইজি নয়। এটা হাইওয়ে।দেখছো না দু'পাশ হতে কিভাবে গাড়ি যাচ্ছে আসছে।"
মামির কথায় শেহরিন একপাশ তাকিয়ে অপর পাশে ফিরে চায়। কিন্তু গাড়ির দিকে চোখ না গিয়ে তার চোখ যায় সরাসরি লম্বাদেহের এক পুরুষের দিকে। যে কিনা নিঃসঙ্কোচ চাহনি মেলে তাকিয়ে আছে তার দিকে এক ধ্যানে। শেহরিনের ভ্রু দ্বয় বাঁকা হয়ে আসে।
"এমপি ব্যাটা না ওটা?"
"অনিভা আসো।"
শেহরিন চোখ সরিয়ে আনে। মামার তত্ত্বাবধানে সবাই মিলে সাবধানে রাস্তা পাড়ি দেয়। কমিউনিটি সেন্টারে ঢোকা মুহুর্তে কপাল ভাঁজ করে আরো একবার অদূর ফিরে তাকায় সে । আর তার তাকানোর সঙ্গে সঙ্গে চোখের দৃষ্টি সরিয়ে নিজেকে আড়াল করে নেয় সান্নিধ্য। গাড়িতে উঠা মুহুর্তে দু'হাত কোমড়ে চেপে লম্বা লম্বা শ্বাস টেনে নেয়। বুকের ভিতরে তোলপাড় হওয়া অস্থিরতাকে দমিয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে সে নিশ্চল ভঙ্গিতে। শান্ত কন্ঠ ঠিকরে বলে,
" আশ্চর্য ! এরকম লাগছে কেন আমার?"