"অনিভা।"
"জ্বি মামা।"
"আসো মা।নাস্তা করবে না?"
"আসছি।"
বিকেলের মৌসুমে ছাদখোলা বারান্দায় চলছে ভরপুর নাস্তা আয়োজন। গরম গরম চা, বেগুনি, প্যাট্রিসের গন্ধে মৌ মৌ করছে চারদিকটা। চট্টগ্রামের খুলশী শহরে শেহরিনের মামার এই বাসাটা বেশ আভিজাত্যপূর্ণ। বাসার ডিজাইনটা দূর থেকে চোখে পড়ার মতো। একতলা বিশিষ্ট বাড়ি কিন্তু বেশ বড় এরিয়া জুড়ে স্থান লাভ করেছে। বারান্দার এক কোণে ছোট ছোট মাটির পাত্রে রোপণ করা হয়েছে অনেক গুলো ফুলের চারা। দু এক দিনের বৃষ্টিতে চারাগুলো মাথা বের করে সবুজ রং লাগিয়েছে গায়ে।
"আরশ ফোন রাখো। সারাদিন ফোনে এতো কি? একটু শান্ত হয়ে বসে বিকেলের নির্মলতা অনুভব করতে পারো না! "
বাবার কথা এবং আগমন যাত্রা দেখে আরশ ফোন রাখতে দেরি করলেও দেরি করে না মুমু। আগে থেকেই সর্তক হয়ে সে ফোন রেখে চায়ের কাপ টেনে নেয়।
"অনিভা আপু আসছে না কেন?"
"এসে গিয়েছি।"
শেহরিন আড্ডাস্থলে যোগ দিয়ে মুমুর সাথে আদুরে আলিঙ্গন সেড়ে নেয়।অতঃপর চেয়ারে বসতে বসতে ঠিক তার সামনে বসা মনিকা আন্টির সাথে করে কুশল বিনিময়।
"আসসালামু আলাইকুম আন্টি।"
"ওয়ালাইকুমুস সালাম।"
"কেমন আছেন?"
" ভালো। তুমি কেমন আছো?"
"আলহামদুলিল্লাহ ভালো।"
শুরু হয় নাস্তা পরিবেশন। চা-নাস্তার ফাঁকে ফাঁকে এক কথা দুই কথার প্রারম্ভ হতে হতে সবাই ডুব দেয় গল্পের মাঝে। বিচার বিশ্লেষণ আলাপচারিতায় মগ্ন হয়ে উঠে সবাই। তবে চলমান এই কথার আসরের মাঝে চুপটি হয়ে থাকে চঞ্চল কন্যা শেহরিন। মূলত সে কথা বলার কোনো সুযোগ পাচ্ছে না। মামা, মামি, মনিকা আন্টি যা নিয়ে বিস্তৃত আলাপ জুড়েছে সেটাতে তার কোনো আগ্রহ নেই। ওদিকে মুমু আরশ দুই ভাইবোন লুকিয়ে ছাপিয়ে আবারো ফোনে মগ্ন। হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে নিঃশব্দে সে একা একা চান পান করে।
"অনিভা।"
"জ্বি মামা।"
"পড়াশোনা কেমন চলছে মা? অসুবিধা হচ্ছে না তো কোনো? অসুবিধা হলে বলবে কিন্তু।"
দীর্ঘ আলাপ শেষে মামা যে তার দিকে একটু নজর দিয়েছে এতেই হাফ ছেড়ে বাঁচে শেহরিন। স্বতঃস্ফূর্ত কন্ঠে ঠিকরে বলে,"অসুবিধা হচ্ছে না মামা।ভালো লাগছে।"
"অসুবিধা হওয়ারও কোনো চান্স নেই। সব সুযোগ সুবিধাই তো অনিভার জন্য করে দেওয়া হয়েছে। এরপরেও অসুবিধা কথাটা বললে বুঝে নিতে হবে ওর সার্ভাইভ করাই কঠিন হয়ে যাচ্ছে এখানে।"
শাহিদা বেগমের হাসিমুখে ঠেস দেওয়া কথা গায়ে লাগলেও সেদিকে বিশেষ একটা পাত্তা দেয় না শেহরিন। মুখে নির্মল হাসি টেনে সেটা সে উগড়ে ফেলে বলে,"সেরকম কিছু নয়।"
" তা তোমার বাবা কি ঢাকায় একাই আছেন বর্তমানে?"
"জ্বি আন্টি।"
"তুমি এভাবে চলে আসলে বাবাকে একা রেখে। খারাপ লাগে না?"
মনিকা আন্টির প্রশ্নে শেহরিনের মুখোরেখায় সামান্য পরিবর্তন দেখা যায়।নির্মল হাসিটুকু উবে গিয়ে ভর করে জোরপূর্বক হাসি।
"খারাপ লাগাটা স্বাভাবিক আন্টি। বাট বাবা তার বিজনেস নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত থাকে। দিন রাত মিলে অনেক সময় তার সঙ্গে আমার দেখাই হয় না। আমি মূলত ঢাকাতেই অ্যাডমিট হতে চেয়েছিলাম বাট বাবা জোর করে এখানে..
"শুধু বাবা কেনো মামাও চেয়েছিলো অনিভা এখানে অ্যাডমিট হোক। চুয়েটের মতো এতো ভালো একটা ভার্সিটিতে চান্স পেয়ে হাতছাড়া করবে নাকি? আর তাছাড়া মেয়ে আমার প্রকৃতি ভালোবাসে। এই পাহাড়ি রাজ্য আমার অনিভার জন্যই তো। "
"বাবা শুধু তুমি নিজের ক্রেডিট নিচ্ছো কেন? আমি মুমু আপুও তো চেয়েছিলাম অনিভা আপু আমাদের সঙ্গে থাকুক। আমরা তো ভীষণ খুশি।"
শেহরিন আরশের কথায় এবার প্রাণখোলা হাসি হাসে। মাথায় হাত দিয়ে বাচ্চাটার এলো চুলগুলো নেড়ে দিয়ে বলে,"তুমি এতো খুশি?"
"এতো এতো খুশি।"
প্রস্ফুটিত নব ভালেবাসা গুলো দেখতে সুন্দর লাগলেও তা খুব একটা মনোরঞ্জন হয় না শাহিদা বেগম এবং তার বোনের কাছে। দু'জনেরই মুখটা ভারী ভারী। চায়ের কাপে লম্বা চুমুক শেষে শাহিদা বেগম কাপটা টেবিলে রাখেন। পায়ের উপর পা তুলে দুহাত আড়াআড়ি ভাঁজ করে বলেন,
"আমার মনে হয় রিজওয়ান ভাই ডিসিশন নিতে একটু ভুল করেছেন। যতই হোক একা থাকাটা মোটেই সমীচীন নয়। আর অনিভা ঢাকাতে চান্স না পেলেও যে কোনো টপ লেভেলের প্রাইভেট ভার্সিটিতে ঠিকই অ্যাডমিট হতে পারতো।"
"শাহিদা তোমার কি অসুবিধা হচ্ছে অনিভা এখানে থাকাতে?"
স্বামীর কপালে ভাঁজরেখা সঙ্গে দৃষ্টিবদল দেখে শাহিদা বেগম কিছুটা তটস্থ হন। মুখে হাসি টেনে বলেন,"আরে না না কি বলছো তুমি। অসুবিধা হবে কেন? একটা মাত্র ভাগ্নি। আমি তো জাস্ট কথার কথা বললাম।"
"দুলাভাই মাইন্ড করছেন কেন? আপা তো অসুবিধার কিছু মিন করেনি।"
"না ঠিক আছে।"
"অনিভা, মা তুমি কি মামির কথায় রাগ করেছো? আমি কিন্তু এমনি ফরমালি কথাটা বলেছি। প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড।"
"ইট’স ওকে মামি।"
পরিস্থিতি কিছুটা বেঁকে গেলে শফিউল সাহেব আবারো স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেন। ভাগ্নির মনে যে কথাটার মৃদু আঁচ লেগেছে সেটা সে স্পষ্টতই অনুধাবন করতে পারেন। কিন্ত কিভাবে মেয়েটার মন ভালো করবে সেটা সে বুঝে উঠতে সক্ষম হননা। এদের মাঝে কিছু বলারও উপায় নেই। যাই বলবে না কেনো সেটা নিয়েই দুবোন টানাহেঁচড়া শুরু করবে।
সবার মাঝে এভাবে বসে থাকতে ভীষণ অস্বস্তি লাগে শেহরিনের। উঠে যে যাবে সেটারও উপায় নেই। এভাবে সবার সম্মুখ হতে উঠে যাওয়াটাও খারাপ দেখায়।
"আচ্ছা অনিভা তুমি কি রান্না পারো?"
মনিকা আন্টির প্রশ্নে শেহরিন মোটামুটি হিমশিম খেয়ে যায়। রান্না বলতে সে শুধুমাত্র ভাত ডিমপোচ আর মসুর ডালটা পারে। এর বাহিরে বাবা কখনো তাকে কিছু শেখায়নি। ডলি বুবু বছর দুয়েক আগে আমেরিকা যাওয়ার সময় হালকা পাতলা মুরগির মাংসটা দেখিয়ে দিয়েছিলো। এর বাহিরে কাদের আংকেল টুকটাক...
"ব্যাসিক কিছু আইটেম পারি আন্টি।"
"ট্রাই করো না কখনো?"
"করা হয় না খুব একটা।"
শাহিদা বেগম মুখে মৃদু হাসির রেশ ঝুলিয়ে বলেন,"চেষ্টা করলে সব পারবে।আমাদেরও তো ইচ্ছে করে তোমার হাতে যেকোনো একটা আইটেম টেস্ট করতে।"
শেহরিন ঠোঁটে ঠোঁট চেপে মাথা নাড়ায়। মনে মনে আল্লাহকে ডাকে এই মুহূর্তে যেনো আবার কেউ আবদার করে না বসে কোনো আইটেম তৈরি করে দিতে। ভালোভাবে কোনো কিছু না শিখে এদের সামনে উপস্থাপন করা মানে অপমান নিজ হাতে কিনে নেওয়া।
"আরে পারবে পারবে।"
"পারুক না পারুক সেটা বিষয় নয়। অনিভার এখন রান্নাবান্নার কোনো প্রয়োজন নেই।"
"কি বলছেন দুলাভাই? আপা আমি তো চাচ্ছিলাম আজকে রাতে কৈ ভুনাটা অনিভার হাতেই খাবো। কি অনিভা এইটুকু আবদার রাখবে না আন্টিদের?"
শেহরিনের আত্মা শুকিয়ে যায়। শুকানো ঠোঁটের ভাঁজ মিলিয়ে মুখে হাসি প্রস্ফুটিত করে বলে,"ঠিক আছে।"
"আরে না না আমার ভাগ্নীকে এসবের মাঝে জড়িয়ো না তো তোমরা।"
"দেখেছো অনিভা, তোমার মামাকে বুঝাও তো একটু।"
"মামা পারবো প্লিজ।"
"শিউর? "
"হ্যাঁ।"
শাহিদা বেগম চোয়ালে বিস্তর হাসি ঝুলিয়ে বলেন,"যাক আজ তাহলে আমার রান্নাবান্না ছুটি। মনিকা চলো তাহলে সন্ধ্যায় একটু শপিং এ বের হই।"
"যাওয়া যায় আপা।"
"কিন্তু আম্মু তুমি ছুটি বলছো কেন? তুমি তো রান্নাই করো না । সব রান্না তো কাজু বুয়া করে।"
"মুমু বেশি কথা বলো তুমি।"
"আপু ঠিক বলেছে আম্মু। তোমার রান্না খেতে ভালো না। কাজু বুয়ার রান্না গুড আর অনিভা আপুর রান্না বেস্ট।"
"বারে,অনিভা রান্না করলোই না এর মাঝেই বেস্ট?"
মনিকা আন্টির বাঁকা কথায় মুখ ফোলায় আরশ। ফোন রেখে থমথমে গলায় বলে,"আমি আগে থেকেই জানি হু।"
"আচ্ছা আমি একটু আসছি।"
শেহরিনের ভিতরে ভিতরে ঘাম ছুটে গিয়েছে। যে ভয়টা মনে চেপে ধরেছিলো সেটাই অবশেষে বাস্তবায়ন হলো। কোনমতে নিজেকে এই খরস্রোতা নদী হতে টেনে তুলে সে সরাসরি চলে যায় নিজ কক্ষে।
ইউটিউবে কৈ মাছের ভুনা রেসিপি লিখে সার্চ দিতে গিয়ে হাত থেমে যায় তার। এক হাত কোমড়ে চেপে অন্যহাতে ফোন নিয়ে সে কিছুক্ষণ পায়চারি করে আনমনে।
"আমার ইউটিউবে হবে না। মেজারমেন্ট অ্যাডজাস্ট করবে না। আমার দরকার লাইভ কোনো কিছু। আর সেটা আমার সুপার হিরো ছাড়া কেউ পারবে না।"
চলন্ত পথেই বিছানায় গা এলিয়ে দেয় সে। দ্রুত হাতে কল লাগায় এই গোটা পৃথিবীর মাঝে তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বনকে।
"আসসালামু আলাইকুম বাবা।"
"ওয়ালাইকুমুস সালাম। কেমন আছে আমার মা?"
"আলহামদুলিল্লাহ খুব ভালো। আমার বাবা কেমন আছে?"
"আলহামদুলিল্লাহ। আলহামদুলিল্লাহ।"
"বাবা আমি কি একটু সময় পেতে পারি? বেশি না অল্প একটু।"
রিজওয়ান সাহেব অফিস ডেস্ক হতে উঠে দাঁড়ান। ল্যাপটপটা বন্ধ করে সরাসরি চলে যান উইন্ডোর কাছে। গলায় ঝুলানো টাই খানা টেনে মুখে নরম হাসি টেনে বলেন,"আমার মায়ের জন্য সবসময় আমি ফ্রি।"
শেহরিন তড়াক করে বিছানা ছেড়ে উঠে বসে। দু'পা ভাঁজ করে নিঃসঙ্কোচ গলায় বলে উঠে, "বাবা আজকে আমি ভেবেছি বাসার সবাইকে কৈ মাছ ভুনা রান্না করে খাওয়াবো। ক্যান আই গেট আ স্পেশাল রেসিপি ফ্রম ইউ?"
"শিউর শিউর। আমার মেয়ে রান্না করবে আমি রেসিপি না দিয়ে পারি?"
শেহরিন ঠোঁটের উপর দাঁত চেপে ধরে। চোখ বন্ধ করে শ্বাস টেনে নিয়ে বলে,"ওকে বাবা। একটু হোল্ড করো প্লিজ। আমি ডায়েরিটা নিয়ে আসছি।"
বাবা মেয়ের মধ্যে চলে কৈ মাছ ভুনা রেসিপি নিয়ে আলাপ সালাপ। শেহরিন টুকটুক করে ডায়েরিতে লিখে নেয় রান্নার সমস্ত প্রসেস। সাথে কিভাবে কি করতে হবে কতটুকু আঁচে রান্না করতে হবে যাবতীয় কার্যকলাপ বাবার থেকে শুনে নেয় সে।
"বাবা.."
"জ্বি মা।"
"থ্যাংকিউ সো মাচ।"
রিজওয়ান সাহেব মেয়ের সরল কন্ঠের অভিবাদন শুনে মলিন হাসেন।জড়িয়ে আসা কন্ঠ উপেক্ষা করে বলেন,"মোস্ট ওয়েলকাম। বেস্ট অফ লাক মা।"
শেহরিন ফোন রেখে দেয়। ডায়েরির দিক এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চিত হয়ে শুয়ে পড়ে। বুকের উপর ভাঁজকৃত ডায়েরিটা রেখে মাথার কাছে থাকা ফোনটা হাত বাড়িয়ে নেয় সে। গ্যালারি জুড়ে কয়েকশত ছবির ভীড়ে বের করে এক হাস্যেজ্জ্বল রমণীর ছবি। যার কিনা পড়নে লাল পাড়ে কালো রঙের শাড়ি, যার সঙ্গে শেহরিনের মুখের গড়নে মিল রয়েছে বেশ কিছুটা। ছবিপানে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে সে নির্লিপ্ত কন্ঠস্বর ভেদ করে বলে,
"মামণি জানো, বাবা ভীষণ চালাক। আমাকে প্রতি মুহুর্তে টেস্ট করে সে। তুমি থাকলেও হয়তো এতোটা করতে না যতটা বাবা করে। বাবা জানে, আমি কখনো মাছ রান্না করিনি বা ভারী কিছু রান্না করিনি। এরপরও সে এটা নিয়ে কোনো প্রকার কথা বললো না। আমি রেসিপি চাইলাম সঙ্গে সঙ্গে দিয়ে দিলো। আমি যদিও বুঝতে পেরেছি বাবা কেন আমাকে আহ্লাদিত করলো না কারণ সে চায় তার মেয়ে শিখুক। যেকোনো জায়গায় যেকোনো ভাবে শিখুক। এখন সে যদি আমাকে একটু প্যাম্পার করতো আমি গলে যেতাম। রান্না করার মনোবলটা ভেঙে ফেলতাম। এজন্য সে দ্বিরুক্তি করেনি। বাবা হয়তো জানে আমি কিছু বুঝতে পারিনা বাট আমি সব বুঝি মামণি। সব বুঝি।"
"মামণি আমি আর বাবা খুব একা তোমাকে ছাড়া। খুব কষ্ট লাগে আমাদের। কিন্তু কখনো প্রকাশ করতে পারি না। বাবার সামনে আমি শক্ত থাকি,আমার সামনে বাবা শক্ত থাকে। তোমার অপূর্ণতা আমাদের কঠিনভাবে ভোগায়।দেখো,তোমাকে ভাবতে গিয়ে আমার ভীষণ কান্না পাচ্ছে। বাট এখন তো মোটেও কান্না করা যাবে না। আমাকে কৈ মাছ ভুনা করতে হবে। আমাকে সব শিখতে হবে। পরে এক সময় কান্না করবো ঠিক আছে। এখন আমি ভীষণ ব্যস্ত।"
শেহরিন ফোন বন্ধ করে উপুড় হয়ে কিয়ৎক্ষণ চোখের পাতা আবদ্ধ করে শুয়ে থাকে। এটা তার মামণিকে হারানোর বেদনা প্রশমিত করার একখানা উপায়। যদিও ব্যথা কখনোই দূর হয় না তবুও জীবনের পথ চলায় নিজেকে সংবরণ করে নেওয়ার এ ছাড়া বিকল্প পথও খুঁজে পায় না সে।
---------------------------------------------------
তেল মশলার ছড়াছড়ি। পেঁয়াজ কুচি কাঁচা, মরিচ কুচি, ধনেপাতা কুচি সবকিছুর সংমিশ্রণে ফ্রাইপ্যানে কষানো হচ্ছে কৈ মাছ। কিচেন জুড়ে বেরিয়েছে সুন্দর একটা স্মেল।
লাল টুকটুকে টমেটো খানা কাটতে গিয়ে বেশ বেগ পোহাতে হচ্ছে শেহরিনকে। কৈ মাছ ধুতে গিয়ে হাতের আঙুল কেটেছে বেশ খানিকটা। তবুও আদুরে মেয়েটা সয়ে ক্ষয়ে ভীষণ ব্যস্ত রান্নাতে। চলমান রান্নায় নুন ঝাল টেস্ট করতে করতে হাতের তালু তার লাল হয়ে উঠেছে।
মনের মধ্যে খানিকটা ভয় পুষে থাকলেও রান্নার টেস্টটা মোটামুটি ভালো হওয়ায় সে কিছুটা চিন্তামুক্ত। বাবার রেসিপি বলে কথা, ভালো তো হতেই হবে।
"কাজু বুয়া।"
"কইয়ো।"
"রান্না হয়ে এসেছে তাই না?একটু দেখুন তো।"
কাজু বুয়া ডাইনিং এ যাওয়া পথে শেহরিনের ডাকে ফিরে আসে। ফ্রাইপ্যানের ঢাকনা সরিয়ে সে পর্যবেক্ষণ করে বলে,"আরটুকা ঝোল অইলে বালো অইতো না?"
"উম্ বাবা বলেছে ভুনা আইটেমে ঝোল কম রাখতে হয়।"
"অইলো তাইলে।"
"একটু টেস্ট করে দেখুন না বুয়া। আমি ভীষণ নার্ভাস ফিল করছি।"
"কিয়া?"
শেহরিনের কথা কাজু বুয়ার বোধগম্য হয় না। ফ্যাল ফ্যাল চাহনিতে তাকাতেই শেহরিন একটা চামচে করে স্বল্প পরিমাণে ঝোল তুলে দিয়ে বলে,"ওহহো বুয়া একটু খেয়ে দেখুন সব ঠিক আছে কি না।"
কাজু বুয়া ঝোলটা চেখে দারুণ অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তোলে মুখোরেখায়। বাম হাত দিয়ে শেহরিনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে," বালা অইছে মা।"
শেহরিন খুশিতে কাজু বুয়াকে জড়িয়ে ধরে। উচ্ছ্বাস মাখা কন্ঠে বলে,"থ্যাংকিউ বুয়া। আপনি খুবই সুইট।"
"আহারে মা মরা মাইয়াডা কি খুশি। মা বাইচা থাইলে কত্ত কি শিখাইতো।"
রাতের খাবার সাজানো হয় ঠিক সাড়ে দশটা নাগাদ। শেহরিনের সাড়ে সাতটা আটটার মাঝেই রান্না কম্পলিট হয়ে গিয়েছে। মাঝের খানিকটা সময় বইয়ের পাতায় চোখ বুলিয়ে অতঃপর সে উঠে আসে ডাইনিং এ। কাজু বুয়ার ডাক পড়েছে। আজকে তার স্পেশাল কৈ মাছ ভুনা সবাইকে পরিবেশন করাবে। মামি মনিকা আন্টি আজ প্রশংসা না করে পারবেই না তার। আর এটা ভেবেই শেহরিনের ভিতরে আনন্দের লহমা ছোটে।
নির্দিষ্ট সময়ের মাঝে ডাইনিং এ এসে বসেন শাহিদা বেগম মনিকা আন্টি এবং তার হাসবেন্ড আরাফাত রহমান। মামা বাসায় নেই। ফিরতে লেট হবে।মুমু আরশ মাছ তেমন একটা পছন্দ না করলেও আজ তাদের অনিভা আপু রান্না করেছে জন্য শুধু ঝোল ভাত খাবে।
ধরতে গেলে জীবনের প্রথম আনাড়ি হাতে আজ শেহরিন সবাইকে খাবার সার্ভ করছে। এর আগে কখনো তার এ অভিজ্ঞতা হয়নি। বাসাতে বাবা সে আর কাদের আংকেল। যে যার মতো নিজেদের সময়ে খেয়ে নেয়। শুধু মাত্র ডলি বুবু আসলে ধরে বেঁধে সবাইকে নিয়ে বসায় একসাথে। সেখানেও তিনিই সার্ভ করেন।
খাওয়ার পর্ব শুরু হয়। শেহরিনকে খেতে বসতে বললেও সে বসে না। তার ভিতরে একধরনের চাপা উত্তেজনার রেশ বইছে। স্নায়ুতন্ত্রও বেশ সংবেদনশীল অবস্থায় কার্যক্রম চালাচ্ছে। কারণটা, জীবনের প্রথম কৈ মাছ ভুনা রান্নার প্রশংসার ব্যাপারে অধিক প্রত্যাশা নিয়ে থাকাটা। তার চাহনি তিনজন বড় মানুষের দিকে। অপেক্ষায় আছে কখন তারা বলবে, বাহ অনিভা তোমার রান্না তো অনেক মজা হয়েছে। বেশ ভালো রান্না করো তুমি।
কিন্তু অপেক্ষায় চাতক পাখি হয়ে থাকা শেহরিন সে বাক্যখানা কারো মুখ হতে শুনতে পায় না। তারা নিজেদের মতো খাওয়া চলমান রেখে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গল্প গুজব করতে শুরু করে ।
আরশ মুমু দু'জনেই ঝোল ভাত খেয়ে ব্যাপক প্রশংসায় ভরিয়ে তোলে। কিন্তু মিসেস শাহিদা কিংবা মনিকা আন্টি কেউ একটা টু শব্দ করেন না।
শেহরিনের ভিতরটায় মেঘ পুঞ্জীভূত হতে থাকে। অধিক প্রত্যাশা এইজন্যই হয়তো খারাপ জিনিস। সবসময় চাওয়ার বস্তুটাকে মেলায় না। তবুও সে হাল ছাড়ে না। একবার মনে মনে ভাবে মামিকে বলবে, মামি রান্নায় কি লবণ মশলা ঠিকঠাক হয়েছে? তখন নিশ্চয়ই বলবে, হ্যাঁ মা সব ঠিক আছে একদম পার্ফেক্ট।
শেহরিন কথাখানা বলতে গিয়েও বলতে পারে না। কি যেনো, ছোট্ট মস্তিষ্কে বিবেকবোধ তাকে বাঁধা দেয়। এভাবে নিজ কৌশলে বা জোর করে কারো থেকে কমপ্লিমেন্ট নেওয়াটা কেমন দেখায়। যেখানে উক্ত ব্যক্তিরই কোনো ইচ্ছে নেই। চেয়ার ধরে খানিকক্ষণ সে দাঁড়িয়ে থাকে। সবার খাওয়া শেষ হওয়ার আগ মুহুর্তে সে নিজ কক্ষে চলে যায়। ক্ষুধা চলে গিয়েছে তার। আজ আর খাবে না।
কক্ষে এসে দুয়ার বন্দি করে শেহরিন রাতের জানালার পানে চায়। নিকষ কালো রাতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তারারা আকাশে জমিয়েছে ভীড়। মৃদু হাওয়া কচি ডালপালাগুলোকে এসে নাড়িয়ে দিয়ে যায়। শান্ত নির্মল পরিবেশে নেই কোনো আওয়াজের ঘনঘটা।
"একটুখানি ভালো বললে কি হতো? আমি তো খুব খুশি হতাম। হাত কাটুক নখ কাটুক তবুও চেষ্টা করতাম আরো ভালো রান্না শিখতে। সবাই এতো কঠিন মনোভাব নিয়ে কেন থাকে? কেন আপন ভাবতে পারে না? নাকি মামণি ছাড়া কেউ দুনিয়াতে আপন হয় না?"
বিছানায় রাখা ফোনটা টুং করে শব্দ করে উঠে। শেহরিনের এক মগ্নে বাহিরের দৃষ্টিতে আঘাত আসে। ধীর পায়ে এগিয়ে যায় ফোনের কাছে।মেসেজ অপশনটা ওপেন করতেই দেখে বাবা হতে ছোট্ট ক্ষুদে বার্তা এসেছে,
"লাগেজের ডান দিকের ছোট পকেটটায় অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম রাখা আছে।হাতে লাগিয়ে নিও মা।"
শত মন খারাপের মাঝে বার্তাখানা পড়ে আপনাআপনি ঠোঁট প্রশ্বস্ত হয়ে যায় শেহরিনের। বাবা সবসময় সুপার ম্যাজিক করে সবকিছু জেনে যায়। এইযে, হাত কাটার বিষয়টা কিন্তু সে জানায়নি বাবাকে। কিন্তু বাবা তার ঠিক জানে মেয়ের জীবনে প্রথম কাজ যেহেতু হাত নিশ্চিত কাটবে। কেটেওছে। তাই সুরক্ষার জন্য নিজ হাতে কোনো এক সময় আগে হতে তুলে দিয়েছিলেন অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম লাগেজে। যেটা শেহরিনের কাছে ছিলো অজানা।
"বাবা, তুমিও যদি মামণির মতো আমাকে ছেড়ে চলে যেতে তাহলে হয়তো এই পৃথিবীতে আমি নিঃশ্বাসও নিতে পারতাম না। আমি দম বন্ধ হয়ে মরে যেতাম সঙ্গে সঙ্গে। এই পৃথিবীটা ভীষণ কঠিন, যেটা আমি প্রতি পদে পদে অনুধাবন করছি। কেউ কাউকে আপন ভাবতে পারে না।
বাবা,প্লিজ তুমি কখনো তোমার শেহরিনকে ছেঁড়ে যেয়ো না। তোমার শেহরিন যে বাঁচে তোমার ছায়ায় ছায়ায়।"
|ভোর পাঁচটা, সিআরবি এলাকা |
পাহাড়ের কোলে ধীরে ধীরে জেগে উঠছে ভোর। আকাশের বুকে এখনও পুরোপুরি কাটেনি রাতের নীলিমা। এই আলো আঁধারের মাঝে পূর্ব দিগন্তে লালচে আভা ফুটতে শুরু করেছে খুব নিভৃতে। পাকা পিচ ঢালা রাস্তার দু'পাশে মাথা উঁচু করে সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো গুনতে গুনতে লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে শেহরিন।
"গর্জন, শিরীষ, শ্বেতচন্দন, সোনালু, অর্জুন,নিম।"
হরিতকী গাছের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে সে। বৈশাখের মেঘলা সকালে মুখজুড়ে তার ঘামের কণা স্পষ্টত বিদ্যমান। হাঁপিয়ে গিয়েছে বেশ ভালোভাবেই। খুলশী থেকে সিআরবি প্রায় একঘন্টার পথ হেঁটে আসতে আসতে দু পা লেগে গিয়েছে। ঘড়িতে সময় দেখে পাঁচটা পেরিয়ে ঘন্টার কাঁটা ছয়টায় প্রবেশ করছে। পরনে তার ফ্লোরাল সেমি লং টপস সাথে বেইজ রঙের ট্রাউজার্স।পায়ে স্নিকার্স। চুলগুলো উঁচু করে পনিটেইল করে বাঁধা থাকলেও দু'পাশ হতে ছোট ছোট চুল বের হয়ে মুখজুড়ে তার ঘটিয়েছে বিচরণ
"এক্সকিউজ মি আংকেল।"
"জ্বি?"
" আহ..এই গাছটার নাম কি?"
জনৈক লোকটা যাওয়া পথে হাঁটা থামায়। শেহরিনের প্রশ্নে গাছের পাতার দিকে না তাকিয়েই সপ্রতিভভাবে উত্তর দেয়,"এটা হরিতকী গাছ।"
"হরিতকী গাছ! এটা তার মানে ঔষধি গাছ? "
"হ্যাঁ।"
শেহরিন মিষ্টি হেসে বলে,"ওকে থ্যাংকস আংকেল।"
লোকটা কিঞ্চিত হেসে শেহরিনের ধন্যবাদ গ্রহণ করে প্রস্থান নেয়। দু'হাতের কড় গুণে শেহরিন হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে বিরবির করে বলে,
"গর্জন,শিরীষ,শ্বেতচন্দন, সোনালু,অর্জুন,নিম, হরিতকী এবং.. চা। ভীষণ চা তেষ্টা পেয়েছে।"
সিআরবি রোডের ধারে বড় কড়ইগাছতলার নিচে টিমটিমে আগুনে জ্বলছে চায়ের কেটলি। প্রশ্বস্ত ইট পাথরে সিঁড়ির শেষ মোড়ে ছোট্ট একটি চায়ের দোকান। চালা বাঁশ ও টিন দিয়ে তৈরি দোকানটা বেশ ছিমছাম। সামনে কাঠের পাটাতন আর সম্মুখ দু প্রান্তে কয়েকটা বেঞ্চ। জনমানবহীন ভোরে দোকানে দু'জন মধ্যবয়স্ক লোক ছাড়া এখনো তেমন ভীড় জমেনি।
শেহরিন এসে উপস্থিত হয় চায়ের দোকানের মাঝে। কাঠের বেঞ্চটাতে বসতে বসতে অর্ডার দেয় এক কাপ কড়া লিকারের দুধ চা। দু হাত পিছন দিকে ছড়িয়ে সে একটু নিজের মতো করে আরাম করে বসে। বেশ ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে। যাওয়ার সময় আর হেঁটে যাওয়া যাবে না। দশটা বিশে আবার ক্লাস রয়েছে।
তবে সে মুগ্ধ চট্টগ্রামের এই নৈসর্গিক রুপ দেখে। এজন্যই হয়তো বাবা এতো জোরাজোরি করেছিলন এখানে পাঠাতে। এই রুপ যে অগ্রাহ্য করার মতো নয়। মানুষটা হাজার ব্যস্ততার মাঝেও শেহরিনের ভালো মন্দের দিকটা প্রখরভাবে নজর রাখে। এই যে, চোখে চোখে পাহাড়ের রূপ, গাছের মাথায় সোনালি আলোর খেলা। শ্রবণে শুকনো পাতার মর্মরধ্বনি। এগুলো কত সুন্দর নির্মলতার সহিত উপভোগ করছে সে। ঢাকায় কি এগুলো পেতো? যান্ত্রিক আর একাকীত্বের জীবনের যাঁতাকলে পিষে একসময় হয়তো ধীরে ধীরে বিলীনই হয়ে যেতো সে।
"চিনি ছাড়া। ওয়ান কাপ।"
পিছন মুখে পুরুষালি ভারী স্বর পেতেই শেহরিন সোজা হয়ে বসে। ঠিক তার বেঞ্চের অপর মাথায় উল্টো দিকে পায়ের পর পা তুলে বসে এক লম্বা চওড়া পুরুষ। আঁড়চোখে সে খেয়াল করে পুরুষ মানুষটার মাথায় ক্যাপ মুখে মাস্ক।পরনে কালো ট্রি শার্ট আর ট্রাউজার। পায়ে সাদা জগিং কেডস্।
"আপু চা।"
ছোট্ট একটা বাচ্চা ছেলে শেহরিনের সামনে চা আনতেই সে মনোযোগ সরিয়ে আনে তৎক্ষনাৎ। হাতে চায়ের কাপ নিতে গিয়ে বোঝে বেশ গরম।বেঞ্চের একসাইডে চায়ের কাপ রেখে সে একটু অপেক্ষা করে চা পর্যাপ্ত ঠান্ডা হওয়ার জন্য।
"সামনের রাস্তাটার অবস্থা দেখেছেন ভাই?
" খেয়াল করিনি ভাই।"
"আমি দেখেছি আংকেল। রাস্তাটার অবস্থা ভয়াবহ। মানছি প্রাকৃতিক দূর্যোগে এই অবস্থা হয়েছে। তাই বলে আজকে তিনদিন হয়ে গেলো রিপেয়ার করবে না? এই দেখুন আমার পায়ে কাঁদা লেগে কি হয়ে গিয়েছে।"
"দেখেছেন ভাই, এইটুকু বাচ্চা মেয়েও বুঝতে পেরেছে।"
শেহরিন আপ্লুত হয়ে উঠে তার কথা গুরুত্ব পাওয়াতে। হাতে চায়ের কাপ তুলে হালকা চুমুক দিয়ে বলে,"সিটি কর্পোরেশন, মেয়র,এমপি এগুলো কোনো কাজেরই নয়। সব শুধু কাজে ফাঁকি দেওয়ার ধান্দা আংকেল। মানে রাজনীতি যারা করে তাদের কোনো কথার ঠিক নেই। এরা শুধু নিজেদের নেতাই ভাবে। দু'লাইন কবিতা আবৃত্তি করতেই পারলেই বাহবা পেয়ে যায়। "
প্রথম অব্দি ঠিক ছিলো কিন্তু শেষে এসে কবিতা আবৃত্তি নামটা ফের কর্ণপাত হতেই জনৈক সুপুরুষটির চা খাওয়ার মাঝে কাশি উঠে। হাত হতে একফোঁটা চা তার ছলকে নিচে পড়ে যায়। কোনমতে কাশি দমিয়ে পকেট হতে টিস্যু বের করা মুহুর্তে পাশ হতে একখানা টিস্যু এগিয়ে আসে। সান্নিধ্য অল্প বিস্তর তাকিয়ে দেখে তার নামে কুকীর্তি গাওয়া রমণীটিই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। অবশ্য রমণীটির দৃষ্টি সম্মুখ প্রান্তেই। পুরোপুরি নজর দিলে হয়তো বুঝতো জনৈক এমপি মহোদয় তার পাশেই বসে।
"তবে এবারের এমপি মহোদয় বেশ ভালো আছে গতবারের তুলনায়।"
"ঠিক বলেছেন। শাহজাহান সাহেবের ছেলেটা বেশ কাজের। বছর তিন না হতেই বেশ কয়েকটা বড় বড় প্রকল্পে হাত দিয়েছে। অল্প বয়সে এমপি হয়েছে। তরুণদের জন্যও আশা করি ভালো উদ্যোগ নিবে।"
"আংকেল এগুলোতে ট্রাস্ট করবেন না। এগুলো জাস্ট শো। জনগণকে বুঝ দিয়ে রাখার জন্য প্রকল্পের নামে হাজার হাজার টাকা নিজ নিজ পকেটে তুলে নেয়।"
"এই মেয়ে বলে কি। আস্তে বলো মা। সবাই এক হয় না। সৎ অসৎ দুটোই থাকে।"
সান্নিধ্য চায়ের কাপটা বেঞ্চে রেখে মুখে মাস্ক টেনে নেয়। গম্ভীর স্বরে শেহরিনের উদ্দেশ্য বলে,"রাজনীতিতে মনে হচ্ছে আপনার এ্যালার্জি।"
শেহরিন এক পলক তাকিয়ে চায়ের চুমুক দিয়ে বলে, "আপনি বুঝলেন কি করে?"
"মনে হলো।"
"ঠিক ধরেছেন চিংড়ি মাছের মতো এ্যালার্জি। সাথে কাঁঠালের মতো ঘৃ...
ঘৃণা শব্দটা মুখ হতে বের হওয়ার আগেই মাটির কাপ হতে চা ছিটকে এসে কাটা আঙুলের উপরে পড়ে সরাসরি । সঙ্গে সঙ্গে অস্পষ্টস্বরে কিঞ্চিৎ আর্তনাদ করে উঠে শেহরিন। কাটা আঙুলের মাঝে গরম চা এর স্পর্শে নাজুক হয়ে উঠে এক লহমায় ।কাপটা কোনোভাবে বেঞ্চে রেখে গলায় ঝুলানো স্কার্ফের সাথে চেপে ধরে। এর মাঝেই অপর পাশ হতে এগিয়ে আসে আরেক খানা টিস্যু। একটু আগে যাকে সে টিস্যু দ্বারা সাহায্য করেছিলো সেই ভদ্র লোক হতেই ফিরতি টিস্যু দ্বারা সাহায্য পায় সে।
" কি হয়েছে মা? "
"গরম চা পড়েছে।"
"আহহা সাবধানে খাবে না।"
"ছোট মানুষ বড় বড় বিষয়ে কথা বললে দূর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা বেশি থাকে।"
শেহরিন কপাল মৃদু ভাঁজ করে তাকায় পাশে বসা পুরুষটার দিকে। জনৈক পুরুষ ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। সূর্য তার পূর্ণাঙ্গ আলো ছেড়েছে। কোলাহল আস্তে আস্তে বাড়ছে। এখন আর এমপি সাহেবের এ অবস্থায় থাকা উচিত নয়।
"১৮ বছর পার দিয়ে এসেও ছোট আমি? বাহ্। বড় হবো কি তাহলে ২৮ বছরে?"
সান্নিধ্যের কথাটা কানে এলেও সে প্রতিত্তুর করে না। হাঁটা পথে সে এগিয়ে যায় সামনে। ইতিমধ্যে উপস্থিত মধ্যে বয়স্ক দুটো লোকও প্রস্থান নিয়েছে। বাদ পড়ে আছে শেহরিন। চা অর্ধেক রেখেই সে দাম মিটিয়ে উঠে পড়ে।সান্নিধ্যের বিপরীত রাস্তায় হাঁটা ধরে সে।
কিন্তু প্রশ্বস্ত রাস্তার দু'পাশেই মোড়ে বাঁক নিতে দু'জন দাঁড়িয়ে পড়ে হুট করে।সান্নিধ্য এক নজর পিছু ঘুরে তাকায়। মস্তিষ্ক তাকে রিমাইন্ডার দেয়,
"অদূরে মেয়েটাই কি কালকের সেই অমনোযোগী শ্রোতা? ক্ষুধায় পাগলবনে যাওয়া,কবিতা আবৃত্তি ট্যাগ দেওয়া নারী কায়া? কন্ঠ শুনে তো তাই মনে হলো।"
অন্যদিকে শেহরিনও পিছু ঘুরে তাকায়। লম্বা পুরুষটার দিকে ভ্রু দ্বয় বাঁকিয়ে নিজমনে বিরবির বলে উঠে,"কবিতা আবৃত্তি করা সেই এমপি মহোদয়ের কন্ঠের মতো লাগলো না??"