সুখনিবাস রাত দশটা,
"সান্নিধ্য "
"বলো।"
"কালকে একটু সময় দিতে পারবে?"
সান্নিধ্য খাওয়া থামিয়ে মায়ের দিকে তাকায়। নাজনীন বেগমের কন্ঠে জড়তা সঙ্গে এলোমেলো চাহনি দেখে সে কিছুটা আন্দাজ করে নেয় নিজের মতো করে। কন্ঠ শান্ত রেখে জবাব দেয়,
"কারণ?"
"কারণটা কালকেই বলতে চাচ্ছি। তুমি শুধু একটু সময়টা ম্যানেজ করো।"
"ইয়ো সানি কালকে তোমার পানি আসবে। পানি..পানি।"
"তাসিন চুপ। বেশি কথা বলো তুমি।"
তাসিন মায়ের ধমকে দাঁত কেলিয়ে অতঃপর মুখ চেপে ধরে। তিথি শাশুড়ী মায়ের সঙ্গে চক্ষু বিনিময় করে অসহায় মুখ করে বলে,"এই ছেলেটাকে নিয়ে আর পারি না আমি সত্যি।"
"কে আসছে কালকে ভাবি?"
তিথি সবজির বোলটা হাতে নিয়ে সান্নিধ্যের কাছে এসে দাঁড়ায়। জোরপূর্বক মুখে হাসি টেনে আমতাআমতা স্বরে বলে,"গেস্ট আসবে। একটু সবজি দেই?"
"না। কোন গেস্ট?"
"কোন গেস্ট?"
"গেস্ট গেস্টই। যেকোনো গেস্ট। তোমার এতোকিছু শুনতে হবে না। শুধু মাত্র সময়টা একটু বের করো।"
সান্নিধ্যের কপালে মিলিয়ে যাওয়া শিরাগুলো ধীরে ধীরে জাগ্রত হয়। ভ্রু দ্বয় বাঁকা হতেই পাশ হতে শাহজাহান খান বিরক্ত স্বরে বলেন,"এতো ভণিতা করছো কেন তোমরা? সরাসরি বলতে কি হচ্ছে রাজ্জাক ভাই সাথে তার পরিবার আসছেন।"
"রাজ্জাক আংকেল হঠাৎ?"
শাহজাহান সাহেব খেতে খেতে ভারী কন্ঠে জবাব দেন,"উনারা পাকা কথা সারতে চায় সান্নিধ্য। আশা করি আমরা এবার তাদেরকে পাকা কথা এনশিউর করতে পারবো। তাই তো?"
"আমার কাজের ভীষণ চাপ বাবা। খেতে বসেও হাজারটা কল কেটে দিতে হচ্ছে। এই মুহুর্তে কাঁচা কথা পাকা কথা কোনোটাই এনশিউর করতে পারছি না, সরি।"
"কি বলছো তুমি?এভাবে তাদেরকে আর কতোবার কাজের বাহানা দিয়ে ফিরিয়ে দিবো আমরা ?"
সান্নিধ্য নিজের খাওয়ায় মনোযোগ দেয়। একহাতে ফোন নিয়ে স্ক্রল করতে করতে ঠান্ডাস্বরে জবাব দেয়,"জটিল তো তোমরা করছো বাবা। একেবারে না করে দিচ্ছো না কেন?"
"বিয়ে করবে না তুমি?"
"করবো।"
"কবে?সামনের ইলেকশনে?"
"না তার আগেই।"
"তাহলে সমস্যাটা কোথায়?"
"অনেক সমস্যা।"
নাজনীন বেগম ছেলের গা ছাড়া উত্তর শুনে শব্দ করে চামচ রাখেন প্লেটের উপরে। মুখোরেখায় কাঠিন্যে ভাব এনে শুধান,"সমস্যাটা বলো?এভাবে এড়িয়ে যাও কেন বারে বারে? কালকে রাজ্জাক ভাই আসলে আমি কি বলবো সেটা বলে দাও।"
"বলবে সান্নিধ্য বিয়ে করবে না আপনার মেয়েকে।"
নাজনীন বেগমের চেহারায় ভয়ংকর দূর্বিষহ নেমে আসে। রাজ্জাক সাহেব সম্পর্কে তার আপন চাচাতো ভাই। তাদের একমাত্র কন্যা অন্বেষার সঙ্গে সান্নিধ্যের বিয়ের কথা চলছে প্রায় এক বছর যাবত। কিন্তু এমপি সাহেবের সময়ের কড়া হিসেবে কোনোভাবেই তা এগিয়ে নিতে সক্ষম হচ্ছে না দুই পরিবারের সদস্যরা।
"আম্মা আপনি প্লিজ শান্ত হন আমি দেখছি।"
তিথি শাশুড়ী মা'কে বুঝ দিয়ে সান্নিধ্যের উদ্দেশ্য কথা ছুঁড়তেই বিচ্ছু তাসিন পোকা সমৃদ্ধ দাঁত খুলে বলে,"ইয়ো সানি। প্লিজ বিয়ে করো। তাহলে আমি এক মাস ছুটি নিতে পারবো স্কুল থেকে । আর বাসার মিস্ কে বলবো দুইমাস আসবেন না।"
তিথি আহত দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকায়। এগিয়ে এসে বোলের অর্ধেক সবজি তাসিনের প্লেটে ঢেলে দিয়ে বলে,"এটা তোমার পানিশমেন্ট ,বেশি কথা বলার জন্য। পুরোটা শেষ না করা পর্যন্ত উঠতে পারবা না।"
"বাবাআআআ।"
"এই ছেলে চুপ। বাবাকে ডেকে লাভ নেই। বাবা ফেরেনি।"
"এই বেবি মানকি চুপ। আমি কথা বলছি না তুই এতো কথা বলিস কেন?একদম চুপচাপ সবজি শেষ কর।"
"ফু'মণি... "
"চিৎকার করে লাভ নেই।"
নাজনীন বেগম চেয়ার হতে উঠে দাঁড়ান। মুখে আঁধার ঘনিয়ে রেখে থমথমে গলায় বলেন,"বৌমা তোমার দেবরকে বলে দাও স্পষ্ট করে কথা বলতে।রাজ্জাক ভাইয়ের সামনে আমাকে যেনো ছোট হতে না হয়। আর তার উপস্থিতিটা আমি কাম্য করছি। আশা করি কথাটা রাখবে।"
"সান্নিধ্য.. "
সান্নিধ্য পানি খেয়ে উঠে দাঁড়ায়। তিথির কথার মাঝে থামিয়ে দিয়ে বলে," আমি এখানেই আছি ভাবি। আলাদা করে বলতে হবে না। সময় পেলে অবশ্যই দেখা করার চেষ্টা করবো।"
সানজিকে চোখের ইশারায় উপরে আসতে বলে সান্নিধ্য চলে যায় নিজ কক্ষে। নাজনীন বেগম ছেলের দায়সারা গোছের ভাব দেখে স্বামীর মুখোমুখি এসে দাঁড়ান। রাগান্বিত স্বরে বলেন,"আপনি কেন ছেলেকে বুঝাচ্ছেন না?এভাবে কতদিন? ভাগ্য ভালো, রাজ্জাক ভাই ভালো মানুষ জন্য এখনো কিছু বলছে না। অন্য কেউ হলে এতোদিন দফারফা করে ফেলতো। আপনার ছেলে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাচ্ছে সবাইকে।"
"ওর কাজের প্রেশার তো দেখতেই পারছো। এমপি হওয়া মুখের কথা নয় যে দায়িত্বে বসলাম অর্ডার দিলাম কাজ হয়ে গেলো। রাজনৈতিক হালচাল কঠিন ব্যাপার। আমজনতার মন রক্ষা করে চলতে যেমন মাথা খাটাতে হয় সেরকম গায়ের শক্তিও ব্যয় করতে হয়।"
"তো থাকুন এই রাজনীতি নিয়ে। ছেলের ভবিষ্যৎ এটাতেই পড়ে থাকুক। তার সংসার জীবনে পা রাখতে হবে না।"
"বউমা দাদুভাইকে ঘরে নিয়ে যাও।"
"জ্বি বাবা।"
শাহজাহান সাহেব খাওয়া শেষে টিস্যু দ্বারা হাত মুছে নেন। চোখে চশমা পড়ে ভারী গলায় বলেন,"এতো উত্তেজিত হবে না নাজনীন। ছেলেকে বুঝাও তোমরা। তুমি আছো তিথি আছে সরফারাজ আছে।"
"আপনি বাবা হয়ে ছেলেকে বুঝাবেন না?"
"আমি ওর অবস্থাটা বুঝতে পারছি জন্য জোর করতে পারছি না। নিজেও একসময় ওর জায়গায় ছিলাম।"
"তো আপনি বিয়ে করেননি? সংসার করছেন না?"
"আমি রাজনীতিতে অপরিপক্ক থাকাকালে বিয়ে করছিলাম। যাই হোক কথা বাড়িও না। আমি যতটুকু বুঝানোর বুঝাবো। কালকে যেহেতু বলেছে সময় বের করার চেষ্টা করবে তো শিউর দেখা করবে।"
"শুনুন আমি কিন্তু কোনোভাবেই ওর অগ্রাহ্যতা গ্রহণ করবো না। সাথে আমার ভাইকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিলে সেটাও কিন্তু বরদাস্ত করবো না।"
"জোর করছো কেন? সান্নিধ্য না চাইলে পারবে ওকে এই বিয়েতে রাজি করাতে?"
নাজনীন বেগম নিজ ঘরে পা বাড়াতে বাড়াতে বলেন,"রাজি হতেই হবে।"
শাহজাহান সাহেব দীর্ঘ শ্বাস ফেলেন। ছেলের মা ও যেমন ছেলেও তার সেরকম। ভাগ্য ভালো বড় ছেলেটা একটু ঠান্ডা মেজাজি হয়েছে। ওটাও গরম হলে এই বাড়িতে সবসময় আগুনের শিখা ঝরতো।
--------------------------------------------------
"পুরনো আইন এবং বাজেট দু'টোই বাতিল হবে। নতুন করে প্রণয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করার পরিকল্পনা হয়েছে। সামনের মাসে বিল পাশ করার নোটিশ যাবে সেদিকে খেয়াল রাখবে।"
"ভাইয়া।"
সান্নিধ্য পিছু ঘুরে সানজিকে একটু অপেক্ষা করার নির্দেশ দেয়। একান্ত সচিব আরহামের সঙ্গে চলে তার কিছুক্ষণ আলাপচারিতা। সামনের মাসে সম্ভবত জাতীয় সংসদ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। এর মাঝে নতুন বিল উত্থাপন, নির্দিষ্ট সংখ্যক বাজেট পাস কার্যকর নিয়ে কাজ করতে হবে। সঠিক হিসাব এবং সরকারের কাছে জবাবদিহিতার জন্য তাই সুনির্দিষ্ট ধারায় গোছানো হচ্ছে ফাইল।
কিছুক্ষণের জায়গায় প্রায় আট নয় মিনিটে কথা শেষ করে সান্নিধ্য বেলকনি ছেড়ে রুমে আসে। সিঙ্গেল সোফটায় গা এলিয়ে স্থির হয়ে বসে বোনের সামনে।
"আমার কিছু ইনফরমেশন লাগবে।"
"আমি বুঝতে পারছি না ভাইয়া তোর আসলে হয়েছেটা কি। এতো ঘনঘন ডাক পড়ছে কেন আমার তোর ঘরে?"
"ঘনঘন কোথায় দুইবার ডেকেছি মাত্র।"
" আগে তো তোর ঘরের ত্রীসীমানায় আসতে পর্যন্ত দিতি না। আর এখন সাদরে আমন্ত্রণ জানাস। হয়েছেটা কি খুলে বল।"
সান্নিধ্য পায়ের উপর পা তুলে থুতনির নিচে হাত রাখে। স্থির চাহনিতে শীতল স্বরে বলে," তোর কোন ফ্রেন্ড চুয়েটের সিভিল ডিপার্টমেন্টে পড়ে?"
" আমার ফ্রেন্ড??"
"হ্যাঁ।"
"ওইতো তাকওয়া। কিন্তু কেন?"
সানজির সন্দেহমাখা চোখে তাকানো দেখে সান্নিধ্য ঠোঁট গোল করে নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে, "আমার ইনফরমেশন লাগবে। হেল্প করতে বল ওকে।"
" ঝেড়ে কাশুন এমপি সাহেব। আমি আপনার ক্লায়েন্ট নয় যে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলতে হবে। আর আপনার চোখ মুখ,ভাব সাব বেশ পরিবর্তন লাগছে। প্রেমে পড়েছেন নাকি?"
"মনে হচ্ছে।"
"ছিঃ এই বুঁড়াকালে??"
"ছেলে মানুষ কখনো বুড়া হয় না। আশি বছরেও চারটা বিয়ে করার সক্ষমতা রাখে।"
"তোর মধ্যে সেটারই প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছি। বাই দ্যা ওয়ে, মেয়েটা কে? নাম কি?"
"মেয়েটা একটা মেয়ে এইটুকু জানি। নাম জানি না।"
সানজি চোয়াল ঝুলায়। অবাকচোখে তাকিয়ে বলে,"অ্যাহঃ?আর কিছু নয়? "
"চুয়েটের সিভিল ডিপার্টমেন্ট পড়ে। প্রথম বর্ষ।"
" ভাইয়া তোর কাজকর্ম তো দেখছি খুবই কাঁচা। একটা মেয়ের প্রেমে পড়লি অথচ তার নাম জানিস না? শুধু মাত্র দেখেই প্রেমে পড়েছিস?"
সান্নিধ্য সোফায় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে নেয়। মনের দৃশ্যপটে ভাসিয়ে তোলে আজকে সন্ধ্যায় দেখা সেই অপরূপা সবুজবীথিকে। যাকে দেখে তার বুকের বা পাশে স্পন্দন স্বাভাবিকতা ছেড়ে হয়ে উঠেছিলো উত্তাল। যার হাসি,যার একঝলক দৃষ্টিতে সে নিজেকে প্রমাণ করেছিলো এই নারীর কাছে সে অতিশয় তুচ্ছ দূর্বল হৃদয়ের মানুষ মাত্র। যে কিনা অবলীলায় বশ করে ফেলেছে বৃষ্টিমেদুর সন্ধ্যায় তাকে।
"আমার এক দিনের মধ্যে মেয়ের নামসহ ফুল ডিটেইলস চাই সানজি।"
"মেয়ে তো আমাদের জুনিয়র।"
"তোর ভাবি।"
সানজি বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। হতাশা মাখা কন্ঠে বলে, "বাট এমপি সাহেব আমার ভাবি হওয়ার জন্য তো আরেকজন লাইন ধরে আছে। তাকে কি করবেন?"
সান্নিধ্য চোখ খুলে। উপরপানে দৃষ্টি রেখে শান্ত কন্ঠ বলে,"আমার নতুন একটা ঘর তৈরি করতে হবে। আর ঘর তৈরি কাঠামোর জন্য অবশ্যই সিভিল ইঞ্জিনিয়ার দরকার। সুতরাং এর বাহিরে আমি যাচ্ছি না।"
" আল্লাহ এমপি সাহেব আপনি তো পুরোই প্রেমিক পুরুষের খাতায় নাম লিখিয়েছেন!! এতো মুখে খই ফুটছে? অন্য সময় তো মুখ টিপেও কথা বের হয় না।"
"কবিতা আবৃত্তি করি কি মুখ বন্ধ রেখে?"
সানজি একের পর এক বিস্ময়ে দিশেহারা হয়ে যায়। চোখ কপালে তুলে বলে,"ওরেহ.. তার মানে এই অজান্তা বিলাসী যে তোকে বলেছিলো কবিতা আবৃত্তি করার কথা?? ওহ মাই গড, আমি সেদিন তোর এক্সপ্রেশন দেখেই কিছুটা আন্দাজ করেছিলাম। এই তাহলে কাহিনী। অপমান অপমান। "
"শাট আপ। যেটা কাজ দিয়েছে সেটা কর।"
"দুই হাজার টাকা নগদ টিপস চাই।"
"কাজ শেষে।"
সানজি দুহাত কোমড়ে চেপে শূল চোখে তাকায় সান্নিধ্যের দিকে। মুখ বাঁকিয়ে বলে,"মোটেও নাহ। রাজনীতি যারা করে তাদের মুখের কথা বিশ্বাস করা মানা।"
"সংবিধানে লেখা আছে?"
"না নতুন যোগ হবে।"
সান্নিধ্য পকেট হতে ওয়ালেট বের করে দুটো চকচকে এক হাজার টাকার নোট বের করে। সানজির দিকে বাড়িয়ে বলে,"নির্ভরযোগ্য তথ্য চাই। কিছু উলট পালট হলে তিন হাজার টাকা তোর থেকে কাটা হবে।"
"একেই বলে নেতা। লাভ ছাড়া এক পা ও নড়ে না। কিন্তু কথা সেটা না কথা হচ্ছে আম্মাকে ম্যানেজ করবি কিভাবে? সে তো তার ভাইয়ের মেয়েকে তোর সাথে বিয়ে দিয়েই ছাড়বে।"
"আমার পিএ ও বিয়ে করেনি। ভাবছি এটার সাথে ওটার কানেক্ট করে দিবো।"
"বোমা ফাটবে ভাইয়া। আম্মা মামারা সবাই তব্দা খেয়ে যাবে।"
সান্নিধ্য হাত বাড়িয়ে দু একটা ফাইল হাতে নিয়ে দেখতে দেখতে কপাল কুঁচকায়। সানজির দিকে দৃষ্টি না রেখেই বলে, "তুই তো খাবি না। এটাই শুকরিয়া কর। আর একটা কথা বলবি তো চার হাজার টাকা..
সানজি সরু চোখে তাকিয়ে মুখ ঝামটা মেরে বের হয় কক্ষ হতে। যাওয়া পথে বলতে বলতে যায়," বড় ভাইয়াকে গরম গরম নিউজ সার্ভ করবো আগে তারপরে। ওখান থেকে হাজার টাকা না খসালে আমার ব্যবসায় লাল বাত্তি।"
|পরেরদিন সকাল এগোরোটা,চুয়েট ক্যাম্পাস|
ক্যান্টিন হতে টুকটাক গল্প করতে করতে বের হয় শেহরিন ঋতমা। আজকে মাত্র দুটো ক্লাস ছিলো তাদের। যেটা কিনা মিনিট বিশেক আগেই সমাপ্তি ঘটেছে। আর এই ফাঁকে ঢুঁ মারতে এসেছিলো একটু ক্যান্টিনে। আধ গরম খিচুড়ি আর ডিম ভাজি খেয়ে দুজনে ক্ষুধা পেটকে করেছে স্তিমিত।
বৃহস্পতিবারের এই দিনটা ভীষন আরামদায়ক লাগে শেহরিনের কাছে।কোনো অতিরিক্ত চাপ থাকে না। ল্যাব ক্লাস থাকে না। শুধু মাত্র দুটো ক্লাস।অতঃপর শান্তি। যেখানে খুশি যেতে পারো।
যেহেতু সময় মিলেছে, তাই আজকে দুজনের যাত্রা হবে ক্যাম্পাস ছেড়ে ভিন্ন জায়গায়। ঝকঝকে দিনের উজ্জ্বলতায় সঙ্গিনী পেয়ে মুখোরেখায় আজ বেশ লাবণ্যময় দ্যুতি ছড়াচ্ছে শেহরিনের। অবশ্য এটা বিশেষ কিছু নয়, চারপাশের প্রকৃতি সুন্দর হলে মানুষগুলোকেও বোধহয় সুন্দর লাগে দেখতে।
"তোমার আমেরিকা না গেলে হয় না ঋতমা? দেশেই থাকো না। নিউইয়র্ক কি চট্টগ্রামের চেয়ে বেশি সুন্দর?"
ঋতমা শেহরিনের হাতের আঙুলের মাঝে নিজের আঙুলগুলো বসিয়ে মৃদু হাসে। এই মেয়েটাকে যত দেখে তত সে অবাক হয়। মাঝে মাঝে একদম বাচ্চাদের মতো করে কথা বলে, অকপটে আবদার করে বসে।
"কি করি বলো। সব রেডি হয়ে গিয়েছে। না গিয়েও তো উপায় নেই।তবে,আগে যদি জানতাম আমার এরকম একটা সুইট বেস্টফ্রেন্ড হবে তাহলে বাবাকে বলতাম, বাবা.. প্লিজ অ্যাপ্লাই করো না আমি যাবো না বিদেশ ফিদেশে।"
"হুহু। তোমরা সবাই পঁচা। আমার ডলি বুবুও যাওয়ার আগে এসব বলে চলে গিয়েছিলো। শেহরিনের পাশে কেউ থাকে না।"
"মন খারাপ করছো?"
"মন খারাপ নয় তবে এই মুহুর্তগুলো.. সাথে তোমাকে ভীষণ মিস্ করবো।"
ঋতমা শেহরিনের আঙুল টেনে মুখে হাসি লেপ্টে বলে,"আমরা প্রত্যেকদিন ভিডিও কলে কথা বলবো। দু'জন দু-জনের কথা শেয়ার করবো ঠিক আছে?"
"তবুও যেতেই হবে তোমাকে?"
"সো সরি.. মাই কিউটি বিউটি।"
পুকুর পাড়ের রোড ধরে হেঁটে আসা দু'জন গুল্ম লতিকা রমণীর দুঃখ কাললগ্নে পিছন হতে ডাক আসে বেশ জোর গলায়। দু'জনেই এক যোগে পাশ ফিরে চায়। গোলাকার পুকুরের অপর পাশে শান পাতানো জারুল গাছের নিচে জমানো আড্ডা হতে ডাক এসেছে তাদের।
দু'জন রমণী হাত দিয়ে ইশারা করে তাদের কাছে আসতে। শেহরিন ঋতমা মুখ চাওয়া চাওয়ি করে একে অপরে। আঁধার ঘনিয়ে আসা মুখোরেখায় নিস্তেজস্বরে বলে,
"সিনিয়র।"
"র্যাগ দিবে হয়তো।"
"সেদিনই তো খেলাম। আবার?"
"চলো যাই আগে।দেরি হলে আবার ঝামেলা করবে।"
কোনো প্রকার সময় ব্যয় না করে দু'জনে সরাসরি চলে যায় জারুল গাছের নিচে। চারজন মেয়ে দু'জন ছেলেকে দেখে কিছুটা ঘাবড়ে যায় শেহরিন ঋতমা । র্যাগের ভয়টা প্রথম বর্ষের স্টুডেন্টদের কাছে বেশ আতংকের।ক্যাম্পাসে হাঁটা চলার সময় সবসময় আত্মা হাতে নিয়ে চলতে হয়।
"আসসালামু আলাইকুম।"
"ওয়ালাইকুমুস সালাম। বসো এখানে।"
শেহরিন ঋতমা এক বাক্য বসে পড়ে তাদের সঙ্গে ঘাসের মাঝে। তাকওয়া সানজির চোখের ইশারায় শেহরিনকে দেখিয়ে ঠোঁট টিপে হাসে আড়ালে।
"সিভিল?"
"জ্বি আপু।"
"তোমাদের দু'জনের মাঝে শেহরিন কে?"
শেহরিন চোখ তুলে তাকায়। তাকওয়ার দিকে ভয়ার্ত মুখোরেখায় বলে,"আমি শেহরিন।"
"পুরো নাম।"
"সাবরিনা শেহরিন অনিভা।"
"বাসা কোথায়?"
"ঢাকায়।"
"হলে উঠেছো?"
"না।মামার বাসায় থাকি।"
সানজি তাকওয়ার হাতে হাত রেখে থামায় তাকে। নিজে আগ্রহী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, "মামার বাসা কোথায়?"
"খুলশীতে।"
"তোমার মামার নাম কী? কি করেন?"
একাধারে প্রশ্ন করা দেখে শেহরিন কিছুটা অবাক দৃষ্টিতে তাকায়। ঋতমাকে রেখে শুধু মাত্র তাকে এতো প্রশ্ন করার বিষয়টা বোধগম্য হয় না। মনে হচ্ছে যেনো সে চাকরির ভাইভা দিতে এসেছে।
"জ্বি মামার নাম শফিউল আলম। তিনি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার।"
"গুড। এনিওয়ে,আমি সানজি।"
সানজির অকপটে হাত বাড়ানো সঙ্গে মুখে স্বতঃস্ফূর্ত হাসি দেখে শেহরিন আরো একধাপ অবাক হয়। তবে মুখোরেখায় তা প্রকাশ করে না। বাড়ানো হাতে হাত রেখে সশ্রদ্ধায় কুশলাদি করে।
"আমি কিন্তু তোমাদের ভার্সিটির অতিথি।"
"অতিথি?"
"হ্যাঁ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অকমর্ণ্য ছাত্রী আমি।"
"তোমাকে দেখতে এসেছে।"
আসাদের মুখ ফস্কে কথায় সানজি চোখ বড় বড় করে তাকায়। অন্যদিকে তাকওয়া পরিস্থিতি সামাল দিতে বলে,"আরে ধূর বন্ধু আমার এসেছে সবার খোঁজ নিতে। তোমরা কি র্যাগ খেয়েছো?"
শেহরিন ঋতমা ভীত চোখে তাকিয়ে বলে,"জ্বি আপু।"
"আজ যদি আমরা র্যাগ দেই ভয় পাবে?"
এক্ষেত্রে দুজনের হতে আসা না কোনো প্রতিত্তুর। তাকওয়াসহ উপস্থিত সবাই মিটমিট করে হাসে দু'জনের মুখোরেখা দেখে। গলার স্বর টেনে বলে,"গান পারো দু'জনে?"
"মোটামুটি।"
"কখনো কোনো প্রোগ্রামে গেয়েছো?"
"আমার গাওয়া হয়নি। শেহরিন গেয়েছে।"
শেহরিন ঋতমার দিকে চোখ পাকিয়ে তাকায় মাথা নিচু করে। ঋতমার তা নজর আসতেই শেহরিনের হাতে হাত রেখে চোখের পাতায় আশ্বস্ত করে গোপনে।
"পলাশ গিটারের সুর তোল। আমরা এখন শেহরিনের কন্ঠে গান শুনবো।"
"আ..আপু।"
"নো আর্গুমেন্ট। তুমি লাস্ট প্রোগ্রামে কোন গানটা গেয়েছিলে?"
শেহরিন দ্বিধা দ্বন্দ্বে পড়ে যায়। সে প্রোফেশনালি কখনো গান শিখেনি। নিজে নিজেই যা গাইতো সেটা দিয়েই কলেজে থাকাকালীন লাস্ট কালচারাল
প্রোগ্রামে গান গেয়েছিল। কিন্তু গানটা ছিলো তাদের হতে চুজ করা। যদিও
ব্যক্তিগতভাবে গানটা তার পছন্দের তালিকাতেই ছিলো। স্কুল, কলেজ জীবনে ক্লাসরুম বসে বেশ কয়েকবার গেয়েছে সে।
" বকুল ফুল।"
"দারুণ একদম জমে যাবে। শুরু করো। পলাশ রেডি।"
সানজি শেহরিনকে উৎসাহ দিয়ে ফোনটা বের করে নেয় সন্তপর্ণে। ভিডিও অপশনে গিয়ে প্রস্তুত রাখে নিজের আঙুলের ক্রিয়াচালন।
ঋতমা শেহরিনকে আশ্বস্ত করতেই শেহরিন লম্বা শ্বাস টেনে গলার স্বর পরিষ্কার করে নেয়। গিটারে সুর উঠতেই মাথা নিচু রেখে ঘাসের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখে। পাতলা ঠোঁট ভেদ করে ভেসে আসে,
" শালুক ফুলের লাজ নাই,
রাইতে শালুক ফোটে লো...
রাইতে শালুক ফোটে
যার সনে যার ভালোবাসা...
যার সনে যার ভালোবাসা
সেইতো মজা লুটে লো
বকুল ফুল...বকুল ফুল
সোনা দিয়া হাত কেনো বান্ধাইলি..(২)
শাওন ও ভাদর মাসে
জামাই আদর করে লো..
জামাই আদর করে
ইচ্ছে জামাই করবো আদর...
ইচ্ছে জামাই করবো আদর
দানা তো নাই ঘরে লো..
বকুল ফুল.. বকুল ফুল
সোনা দিয়া হাত কেনো বান্ধাইলি.. (২)
আমার জামাই ধান বায়
হরিণডাঙার মাঠে লো..
হরিণডাঙার মাঠে
সোনা দেহে ঘাম ঝরে.....
সোনা দেহে ঘাম ঝরে
দেইখা পরাণ ফাটে লো..
বকুল ফুল.. বকুল ফুল
সোনা দিয়া হাত কেনো বান্ধাইলি.. (২)
একসঙ্গে চার পাঁচজনের হাতে বেজে উঠে করতালি। শেহরিন গান গাওয়া শেষে নাজুক চোখে তাকিয়ে দেখে সবার মুখের অভিব্যক্তি।
"এতো সুন্দর গান গাও তুমি মেয়ে ? আমি তো একদম সুরের তালে হারিয়ে গিয়েছিলাম।"
"অপূর্ব কন্ঠ তোমার শেহরিন।"
"ধন্যবাদ আপু।"
"প্রফেশনালি নিলে কিন্তু মন্দ হতো না।"
শেহরিন নরম হাসে। ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বলে,"ইচ্ছে নেই আপু।"
তাকওয়াসহ উপস্থিত সবাই শেহরিনের সঙ্গে আলাপচারিতায় ব্যস্ত হতেই টুক করে সবার মাঝ হতে উঠে দাঁড়ায় সানজি। কিছুটা দূরে গিয়ে তার রেকর্ড করা ভিডিও পাঠিয়ে দেয় সদ্য প্রেমের জলে ডুব দেওয়া এমপি মহোদয়কে।অতঃপর কল লাগায় তাকে। মুখে হাত দিয়ে ফিসফিস কন্ঠে বলে,
"হ্যালো ভাইয়া। একটা দারুণ জিনিস পাঠিয়েছি তোর হোয়াটসঅ্যাপে। চেক কর তাড়াতাড়ি। আর আমার বোনাসটা রেডি রাখিস। বাই।"
সান্নিধ্য কেটে যাওয়া কলের দিকে ভ্রু দ্বয় বাঁকা করে তাকিয়ে থাকে । অতঃপর সময় পরোখ করে নেয় একবার। বারোটার সময় তার মিটিং রয়েছে। এখন বাজে এগোরোটা পঞ্চান্ন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও হোয়াইটস অ্যাপে প্রবেশ করে সে। সানজির পাঠানো ভিডিওটাতে হাতের আঙুলে ট্যাপ করা মাত্র তার চোখ বরাবরের ন্যায় স্থির হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে সে। কিছু সেকেন্ড সময় নিয়ে কল লাগায় সরাসরি আরহামকে,
"মিটিং পনেরোমিনিট পরে শুরু হবে।"
"কিন্তু স্যার উনারা তো একদম রেডি।"
"আমি রেডি নই।"
"ওকে স্যার।"
"পনেরোমিনিটের মাঝে কাউকে অ্যালাউ করবে না আমার রুমে।"
"শিউর স্যার।"
শেহরিনের মুখোরেখা এক ঝলক দেখতেই সান্নিধ্যের কালকের মতো অস্থিরতা শুরু হয় ভিতরে। নিজেকে ধাতস্থ করতে সে এসির পাওয়ার বাড়িয়ে দেয়। চেয়ার ছেড়ে উঠে সরাসরি উইন্ডোর সাথে লাগোয়া সোফায় গিয়ে বসে। অতঃপর ফোনখানা চোখের সামনে তুলে ভিডিওটা ফের চালু করে।
পাঁচ মিনিট সতেরো সেকেন্ড। একদম বরফ শীতল পানির ন্যায় জমে যায় সান্নিধ্য। অনুভব করে শেহরিনের শ্রুতিমধুর কন্ঠে গাওয়া গান। বিশেষ করে শেষ খন্ডে "আমার জামাই" শব্দটা তর বুকে সরাসরি ধনুক থেকে ছোঁড়া ধারালো ফলার ন্যায় লাগে।
একবার নয় দুবার নয় পরপর তিন বার গানটা শুনে সে একদম ফোন বন্ধ করে ফেলে। একহাতে চুলে টেনে সোফায় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে নেয়।ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে শীতল স্বরে বলে,
"এই মেয়েটা নির্ঘাত আমাকে পাগল বানিয়ে ছাড়বে।"