বিকেল বেলার ঘুমে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হয়। বালিশে মুখ ডুবিয়ে ঘুমরত রমণীর সে শব্দ কর্ণকুহরে প্রবেশ করে বেশ খানিকটা সময় পরে। কপালের ভাঁজগুলো ফুটিয়ে সে আবছা চোখ মেলে তাকায়। পিটপিটে চোখে ঘড়ির দিকে এক পলক সময় দেখে সে মুখে হাত দিয়ে হাই তোলে। মাগরিবের আযান হতে এখনো ঢের সময় বাকি। এখন আবার কে নক করছে তাহলে??
বিছানার পাশে রাখা ওড়নাখানা গায়ে মুড়িয়ে উঠে পড়ে বিছানা হতে শেহরিন। ঘুমঘুম ভাবটাকে কোনমতে দমিয়ে সে দরজা খোলে।
" সরি মামণি ডিস্টার্ব করলাম একটু। "
"ভিতরে আসুন মামা। "
" সমস্যা নেই। একটা কথা বলতে এসেছিলাম। "
" জ্বি বলুন।"
শফিক সাহেব কিছুটা সময় নিয়ে ঠান্ডা গলায় বলেন, " বাসায় দু'জন গেস্ট এসেছেন। উনারা তোমার সাথে মিট করতে চায় মামণি।"
" আপনার অফিস কলিগ মামা?"
" না। আমার অফিস কলিগ নয় তবে বেশ পরিচিত।"
শেহরিন স্বাভাবিকভাবে বিষয়টা নিতে চেয়েও পারে না। দ্বিধাগ্রস্ত মন নিয়ে খানিকটা বিস্ময়ের সুরে তুলে বলে,"আমার সঙ্গে মিট করতে চাইছে কেন?"
" তোমাকে দেখতে এসেছেন যেহেতু মিট তো করতেই চাইবে অনিভা। "
মামির কথায় পিছনে দৃষ্টি মেলে শেহরিন। শাহিদা বেগম হাসি হাসি মুখ করে এগিয়ে এসে বলেন, " জনাবের তোমাকে বেশ পছন্দ হয়েছে। একদম সরাসরি বাসায় এসেছেন প্রস্তাব রাখতে ভাবতে পারো? ঝটপট তৈরি হয়ে নাও এখন।"
" আমি আসলে কিছুই বুঝতে পারছি না আপনাদের কথা মামি।"
" মীরসরাই উপজেলার নির্বাহী অফিসার তৌসিফ আহমেদ। তিনমাসে আগে বদলি হয়ে চট্টগ্রামে এসেছেন। তোমার আংকেল মানে আরাফাতের ফ্রেন্ড। মেইবি ডিসি হিলে তোমার কোনো প্রোগ্রামে সে তোমাকে দেখেছিলো। আর সেখানেই তোমাকে তার ভালো লেগে যায়। আজকে এসেছেন আমাদের সঙ্গে সরাসরি আলাপচারিতা সাড়তে সেই সাথে তোমাকে দেখতে।"
শেহরিনের কাছে সম্পূর্ণ বিষয়টা বুঝতে সময় লাগে। এর মধ্যে ইউএনও কোথায় থেকে এলো? কখনই বা তাকে দেখলো আর কখনোই বা পছন্দ করলো? সরাসরি আবার বাসায় অব্দি এসে গিয়েছে। আজব তো !! মাত্র দুদিনের ব্যবধানে এতোকিছু? ভ্রু যুগল বিস্তর বাঁকিয়ে সে জিজ্ঞেস করে, " আমাকে এখন কি করতে হবে সেজন্য? "
" দেখো মেয়ের কথা। তোমাকে সে পছন্দ করেছে। দেখতে এসেছেন। বিষয়টা কি মিন করছে বুঝতে পারছো না? "
শফিক সাহেব শেহরিনের মাথায় হাত বুলিয়ে কোমল গলায় বলেন, " প্রতিষ্ঠিত একটা ছেলে। বয়স অল্প। এতো ভালো পদে গর্ভমেন্ট জব করছে। তোমার নিশ্চয়ই অপছন্দ হবে না? "
" অপছন্দ শব্দটাই বেমানন মুমুর বাবা। আরাফাত আমাকে নিজে ছেলেটার ব্যাপারে সবিস্তর জানিয়েছে। ভীষণ ভালো। বংশও বেশ উঁচু। আমাদের অনিভার জন্য একদম পার্ফেক্ট হবে।"
" তোমার কি কোনো আপত্তি আছে মামণি? তোমার বাবাকে আমি জানিয়েছি। দুলাভাই আমাকে বলেছেন তোমার মতামত আগে নিতে। "
শেহরিন নিষ্পলক চাহনি মেলে মামার দিকে। আপত্তি !! আপত্তি কি তার আদৌও আছে? নেই তো! কিন্তু এরপরেও মনের ভিতরে হুট করে এতো অশান্ত হাওয়া বইছে কেন? কিছু কি পিছুটান তার সত্যি রয়েছে ? নাকি কারো...
"অনিভা প্লিজ না করো না। তোমার মামা আমি আরাফাত সবাই আশাবাদী তোমাকে নিয়ে। উনাদেরকে আমরা পজিটিভ সাইন দিয়েছি। এখন তুমি যদি আপত্তি করো তাহলে আমরা ছোটো হবো তাদের কাছে।"
" মামা আগেই কথা কেন দিয়েছেন? বাবা তো বলে দিয়েছে আমার মতামত নিতে তাহলে? "
"তুমি কি কাউকে পছন্দ করো? মানে ওই এমপি সাহেব..."
" কি বলছো তুমি মুমুর বাবা। এর মাঝে এমপি সাহেব কেন আসবে? অনিভা নিজে বলেছে কোনো সম্পর্ক নেই।"
মামির কথায় শেহরিনের কিঞ্চিত রাগ হয়। তীক্ষ্ণ চোখে এক নজর তার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলে উঠে, " কানা বগীর মা গিরগিটির সেরা বন্ধু। সেদিন এতো বলার পরও তো বিশ্বাস করোনি। আজ ঠিকই মামার সামনে বিশ্বাসের ঝুলি খুলে বলছো তার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।"
" যাক তাহলে তো আর কোনো অসুবিধা থাকলো না। মামণি ঝটপট তৈরি হয়ে এসো তো। উনারা অপেক্ষায় আছেন।"
শফিক সাহেব শেহরিনকে বুঝিয়ে চলে যেতেই শাহিদা বেগম শেহরিনের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। নির্মেদ কন্ঠে বলেন, " আমি কাজুকে দিয়ে একটা শাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি তৈরি হয়ে এসো।"
" শাড়ি পড়তে হবে কেন?"
" শাড়ি পড়লে তোমাকে সুন্দর লাগে তাই।"
" সুন্দর অসুন্দর দিয়ে কি হবে মামি? পছন্দ তো উনি করেই ফেলেছেন। এখন ছেঁড়া কাপড় পড়ে গেলেও নিশ্চয়ই অপছন্দ করবেন না?"
শাহিদা বেগম শেহরিনের ধারালো কথায় কিছুটা বিস্মিত হন। মেয়েটার দিনকে দিন কথার বুলি ঝরঝরে হচ্ছে। এরকম মেয়ে কাছে রাখা বিপদজনক। তার উপরে যদি এমপি সাহেবের সঙ্গে সত্যি কিছু থেকে থাকে তো আরো বিপদ। তার চেয়ে আগে আগেই বিদায় দেওয়া ভালো।
" দেখতে আসলে সবাই শাড়ি পড়াটাকেই প্রেফার করে। আমিও করেছি এতে এতো আপত্তি জানানোর কিছু হয়নি অনিভা। তবে, আমি চাইবো তুমি শাড়ি পড়ো। আশা করি কথাটা রাখবে। আর হ্যাঁ শোনো, তোমার মামা আর আরাফাতের সম্মানটাকে দয়া করে নষ্ট করবে না। বিয়ে যেহেতু করতেই হবে মামার পছন্দের উপর ভরসা রাখতে পারো। খারাপ হবে না।"
শাহিদা বেগম চলে যেতেই শেহরিন চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস ছাড়ে। কোমড়ে এক হাত রেখে অপর হাতে কপাল চেপে ধরে সে। এভাবে হুটহাট বিয়ের তোড়জোড় তার কাছে অস্বাভাবিক লাগে। বাবার সাথে যে কথা বলবে সেটারও উপায় নেই। তার নিজস্ব মতামত বাবাও জানতে চাইবে। তখন কি বলবে?
মতামতে না করলে কারণ জানতে চাইবে। আবার হ্যাঁ বললে কালকেই হয়তো বিয়ের আসরে বসতে হবে। কিন্তু একজন অচেনা মানুষকে না চিনে, তার সম্পর্কে না জেনেই একটা পরিণতির দিকে যাওয়াটা বোকামির। আর সবচেয়ে চেয়ে বড় কথা...
শেহরিন লাইন চ্যুত হয়ে অন্যদিকে ভাবতে গেলে আবার ফিরে আসে তৎক্ষনাৎ। হতাশাগ্রস্ত কন্ঠে নিজমনে বলে," বড় কথা কিছু নেই। আমার উনার সঙ্গে কোনো কানেকশান নেই। তাই মন খারাপেরও কিছু নেই।"
-------------------------------------------------
নীল রঙের একখানা জামদানী শাড়ি শাহিদা বেগম কাজুকে দিয়ে পাঠায় শেহরিনের কাছে। শাড়িখানা বেশ সুন্দর। ঢেউ খেলানো জলপার মোটিফে সজ্জিত। হাতে নিয়ে কিয়ৎক্ষণ চুপটি করে বসে থাকে অস্থির রমণী। অতঃপর মুমু দরজায় নক করে তাড়া দিতেই সে উঠে যায় তৈরি হতে।
মন বিষণ্ণতায় ভুগছে শেহরিন। কেন ভুগছে বুঝতে পারছে না। বিয়ে শব্দটার সঙ্গে সে খুব একটা পরিচিত নয়। জীবনের শুরুতেই বাবা মায়ের মধ্যে আজন্ম দূরত্ব তাকে ভীত করে তুলছে। শুধু মাত্র দেখতে আসার বিষয়টাও তার কাছে জটিল লাগে। মামির ভাষ্যমতে এই দেখা নামে মাত্র। হতে পারে ফর্মালিটি। দু পক্ষেরই মত যেহেতু স্পষ্টত সেক্ষেত্রে বিয়েটাও অস্বাভাবিক কিছু নয়।
নানান ভাবনা চিন্তাকে গুটিয়ে শেহরিন একদমই সিম্পল ভাবে তৈরি হয়ে নেয়। না চোখে কাজল, না ঠোঁটে লিপস্টিক স্থান পায়। শুধু মাত্র চুলগুলোকে আঁচড়ে গুছিয়ে মাঝখানে সিঁথি কেটে রাখে। কানে মামণির সোনার ছোট্ট দুলটার দিকে তাকিয়ে পরিবর্তন করার চিন্তা হতে সরে আসে। নিজেকে একটাবার আয়নায় দেখে আঁচল তুলে বের হয় ঘর ছেড়ে।
ড্রয়িংরুমে বসারত চার পাঁচজন মানুষ। সামনে রয়েছে নানান নাস্তা সাজানো। চায়ের কাপে গল্প আসরে বেশ ডুবে রয়েছেন সবাই। মনিকা আন্টির হাসির শব্দ যেনো কমেই না কোনোভাবে।
স্যুট বুট পরিহিত দুজন পুরুষ সামনের সোফাটায় বসা। তন্মধ্যে একজন পায়ের উপর পা তুলে চা পান করতে ব্যস্ত। সম্পর্কে তিনি তৌসিফ আহমেদের চাচা ইমদাদুল আহমেদ। বয়স পঞ্চাশ অতিক্রম হয়েছে এমন। অন্যদিকে স্বয়ং পাত্র তৌসিফ আহমেদ তেত্রিশ পার করা ক্যাডার। চেহারার গড়ন তার বেশ ছিমছাম। অধিক ফর্সায় মনে হবে বিলাতী ফেরত বাংলাদেশি। তবে কাটছাঁট করে সুর্দশন পুরুষের খাতায় তার নাম লেখানোই যায়।
অপেক্ষার অন্তিমদশা পার করে শাহিদা বেগম শেহরিনকে নিয়ে আসেন সবার মাঝে। ডিসি হিলে সেই শাড়ি পরিহিতা রমণীকে আজ তৌসিফ দেখে সমুদ্রের নীল জলরাশি রুপে। একদম সাজসজ্জাবিহীন নারী কায়াকে দেখে তার চোখ যেনো সরে না সেদিক হতে। মুখে ফোটে বিস্তৃত হাসি।
"সালাম দাও অনিভা।"
শাহিদা বেগম কানে কানে শেহরিনকে বলে দিতেই তার টনক নড়ে। বিষয়টা বেমালুম ভুলে গিয়েছিলো। মাথা নিচু করে কন্ঠ নামিয়ে সে উপস্থিত বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিকে সালাম দেয়।
ইমদাদুল আহমেদ চায়ের কাপ রেখে ঠিক হয়ে বসেন।হাসি মুখে সালামের উত্তর নিয়ে বলেন,
"বসো মা, বসো।"
শেহরিন মামার পাশে গিয়ে বসে। আসা মাত্রই কেমন অদ্ভুত অস্বস্তি তাকে ঘিরে ধরেছে। জীবনের প্রথম সে কোনো পাত্র পক্ষের সামনে এভাবে উপস্থিত হয়েছে। বিষয়টা সবার কাছে ছোট মনে হলেও তার কাছে সম্পূর্ণ নতুন আর খাঁপছাড়া ।তার উপরে বাবা নেই পাশে। বাবা ছাড়া যে এক পা এগোতে পারে না সে কি না বসেছে বিয়ের সরঞ্জামে।
" নাম কি তোমার মা? "
"সাবরিনা শেহরিন অনিভা।"
"বাহ সুন্দর নাম।"
"আমরা ওকে অনিভা বলে ডাকি। তবে শেহরিন নামটাও অনেকে ডাকে।"
ইমদাদুল আহমেদ ভাতিজার দিকে তাকিয়ে হেসে বলেন, " আমাদের অবশ্য নাম নিয়ে ঝামেলা হবে না। ডাকতে হবে সেই বউমা বলেই।"
একসাথে মৃদু হাসির কলরব উঠে। তৌসিফ লজ্জা পেলেও শেহরিন লজ্জা পায় না। তার কেমন জানি রাগ লাগে। কেনো রাগ লাগে সেটা তার নিজেরও অজানা।
"ঠিক বলেছেন।"
"তৌসিফ কথা বলো। কিছু জানতে হলে জিজ্ঞেস করো। আফটার অল তোমারই তো পছন্দ।"
"সমস্যা নেই বলুন আপনারা।"
মনিকা আন্টি জোরগলায় বলেন," আর লজ্জা পাচ্ছেন কেন ভাইয়া? আরাফাত তো আমাকে বলেছে, আপনি নাকি অনিভাকে দেখামাত্রই কুপোকাত হয়ে গিয়েছিলেন।"
তৌসিফ দেনামোনা করে। জড়তা মাখা কন্ঠে বলে, " এতোক্ষণ আপনাদের মাধ্যমে তো সব জানাই হয়ে গিয়েছে। আর সেরকম কিছু জানার নেই।আচ্ছা আমরা একটু আলাদা কথা বলতে পারি কি?"
" নিশ্চয় পারো। এটা কি বলতে হয় নাকি। তবে, আমার মনে হয় এই সুন্দর সন্ধ্যায় এভাবে ঘরকুনো না হয়ে বসে তোমরা চাইলে বাইরে ঘুরে আসতে পারো। খোলা হাওয়ায় দু'জন দুজনের সঙ্গে একটু সময় ব্যয় করলে,চিনলে জানলে নিজেদের মতো করে।"
" মন্দ নয় বিষয়টা। মামণি তুমি কি যাবে?"
" আরেহ দুলাভাই আপনিও না। অনিভা কি মুখের উপরে হ্যাঁ বলতে পারবে নাকি সবার সামনে। মেয়ে মানুষেরা এক্ষেত্রে ভীষণ লজ্জা পায়। ওটা আপনি বুঝবেন না। নিশ্চয়ই যাবে।"
শেহরিন শাড়ির আঁচল চেপে ধরে নিজের রাগ দমায়। মনে মনে কানা বগীর আরেক মা' কে শত গালি ছু্ঁড়ে। ব্যাক্কেল মহিলা কোথাকার। এই সন্ধ্যারাতে অচেনা একজন লোকের সঙ্গে কিভাবে তাকে বাইরে পাঠানোর কথা বলে। যতই হোক ক্যাডার, উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা। হুট করে এভাবে বিশ্বাস করাটা মোটেও উচিত নয়। কার মনে কি আছে সেটা বলা মুশকিল। যদি উল্টা পাল্টা কিছু...
" বের হও তাহলে। দুজন একটু ঘুরে এসো কোথাও। যা যা জানার জেনে নাও। বউমাকে ঘরে তুলতে কিন্তু আমরা বেশি সময় নিবো না। ভাই ভাবিকে শীঘ্রই দেশে আসার কথা বলবো।"
" অনিভা উঠো।"
" মামি মুমুকে নিয়ে যেতে পারি কি সাথে?"
শেহরিনের কথায় উপস্থিত সবাই একটু অপ্রস্তুত হয়ে উঠে। শাহিদা বেগম জোরপূর্বক হেসে বলেন," ধূর বাচ্চা, মুমু গিয়ে কি করবে? তোমরা দুজনেই যাও। বিষয়টা বিয়ে নিয়ে। অনেক সিরিয়াস। এখানে মুমু আরশকে টেনো না।"
তৌসিফ বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। দু'হাতে পরিহিত স্যুটটা হালকা টেনে গলা ঝেড়ে বলে, "ভয় পাবেন না। বিশ্বাস করতে পারেন। আপনাকে ভালোভাবে বাসায় ফিরে দেওয়াটা আমার প্রধান দায়িত্ব থাকবে।"
ভরা লোকসমাগমে শেহরিন আর আপত্তি করার সুযোগ পায় না। মামার সামনে মুখ ফুটে না করা মানে নিচু করা তাকে। এর উপরে তো দুটো কানা বগীর মা বসে আছে। যেতে না চাইলেও জোর করে পাঠিয়েই ছাড়বে। সেই যেতেই হবে তাকে। শুধু শুধু কথা বাড়ানোর মানে হয় না। ছোট করে নিঃশ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় সে। হাঁটাপথে পা বাড়ায় উদ্দেশ্যহীন এক যাত্রায়।
----------------------------------------------------
আঁধারে ঢাকা সন্ধ্যা। চারপাশটা শান্ত নিরিবিলি। পাহাড়ের ঢালে ঘেঁষা ফয়'স লেকে বইছে নির্মল হাওয়া। সবুজে ঢাকা সারি সারি গাছপালা আর স্বচ্ছ নীল পানি ম্লান জোৎস্নায় চিকচিক করে উঠে।
শেহরিন তৌসিফ গাড়ি হতে নেমে ধীরে ধীরে লেকের ভিতর হাঁটতে থাকে। দু'জনের মধ্যে চলমান নিরবতা ভাঙায় তৌসিফ নিজেই। কন্ঠ পরিষ্কার করে বলে, " কম্ফোর্টেবল ফিল করছেন? "
"জ্বি।"
"পাহাড় পছন্দ? "
" হুম।"
" ভাইয়া বললো আপনি নাকি প্রকৃতি পছন্দ করেন অনেক? "
লোকটা ভাইয়া হিসেবে কাকে সম্বোধন করেছে বুঝতে পারে না শেহরিন। কিয়ৎক্ষণ চুপ থেকে নরম গলায় উত্তর দেয়, " জ্বি প্রকৃতি ভালো লাগে।"
চলন্ত পথে তৌসিফ নিজ হতেই টুকটাক কথা বলতে বলতে এগোয়। অন্যদিকে শেহরিন হু হা জ্বি এর মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে। নিজ হতে কিছু প্রশ্ন মনে জমা হলেও উন্মুক্ত করে না সে।
তৌসিফ কথা বলার বাহানায় সর্তক চোখ মেলে বারে বারে শেহরিনের দিকে। মেয়েটার শাড়িতে নজরকাড়া রুপ তার বুকে প্রেমের জোয়ার তোলে্। ইচ্ছে জাগে হাতটা ধরে হাঁটতে। নিজ হতে সে কিছুটা দূরত্ব ঘুঁচানোর জন্য কথার বাহানায় শেহরিনের দিকে হেলে।
" শুনলাম চট্টগ্রাম - ২ আসনের বর্তমানে যিনি সংসদ সদস্য রয়েছেন আই মিন সান্নিধ্য শাহজাদ খান উনি নাকি তোমার পিছু লেগেছিলো। পছন্দ করতেন এমন কিছু। তোমার খোঁজ খবরাখবরও নিতেন?"
শেহরিন তৌসিফের তার দিকে হেলে আসা দেখে নিজেকে পর্যাপ্ত দূরে সরায়। মনে মনে বেশ বিরক্ত হয় কানা বগীর মায়েদের উপর। সব আমলনামা জাহির করেছেন অচেনা অজানা লোকের কাছে।
" মানুষ মানুষকে পছন্দ করতেই পারে। সিরিয়াস কোনো ম্যাটার ছিলো না। "
তৌসিফ যৎসামান্য হাসে। ঠান্ডা গলায় বলে, " হ্যাঁ তা তো। তবে এসব পলিটিক্যাল পার্সনদের থেকে সবসময় দূরে থাকবে। আমার শুনে ভালো লেগেছে যে, তুমি এমপি সাহেবকে পাত্তা দাওনি। খুবই ভালো কাজ করেছো। এসব লোক সুবিধার নয়। আমরা তো প্রশাসনের লোক আমরা জানি কে কেমন।"
" উনি কি খুব খারাপ? "
" এই পদে খুব সম্ভবত উনার এক না হয় দুই বছর চলছে। এর মাঝেই অনেক অভিযোগ এসেছে। অনেক কথা, সমালোচনা থানা কেস অলরেডি ঘটিয়েও ফেলেছেন। বাট পাওয়ারফুল পার্সন এমপি পদে থাকলে এগুলো দুধভাত।"
" কি কি অভিযোগ এসেছে? "
তৌসিফ একপলক শেহরিনের দিকে তাকিয়ে বলে," আপনি শুনতে আগ্রহী?"
" আপনি না বলতে চাইলে ইট’স ওকে।"
" হাহা। আপনি তো ভালো কথা জানেন। আসলে অভিযোগ বলতে সকল ধরনের গ্যাঞ্জাম এবং ঝামেলার দিকটায় উনি এবং উনার দল বেশ এক্সপার্ট। আমি এই তিন মাসে যতটুকু শুনেছি দেখেছি আর কি। এছাড়া নানান ডার্ক সাইড তো আড়ালে থাকেই।"
" সরকারি কর্মচারী উনিও আপনিও। শুধু রাজনৈতিক ব্যক্তিদেরই ডার্ক সাইড থাকে আপনাদের থাকে না কেন?"
তৌসিফ খানিকটা অবাক চোখে তাকায় শেহরিনের দিকে। এই মেয়েটাকে যত সহজ সরল ভেবেছিলো আদৌতে তা নয়। কথা বলার কৌশল বেশ নিখুঁত।
" বিকজ্ আমরা ক্ষমতালোভী নয়। রাজনীতির চেয়ারে যারা বসে তাদের চেয়ারের লোভ এতো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে যে এই চেয়ার বাঁচানোর জন্য তারা মানুষ মারতে দ্বিধাবোধ করে না। আপনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন এই এমপিও নির্দ্বিধায় দু চারটা খুনের আসামি হয়ে আছে।"
শেহরিনের কর্ণকুহরে খুন শব্দটা পৌঁছাতেই শরীরে শিহরণ বয়ে যায়। এক মুহূর্তের জন্য কল্পনায় ভাসে, উনি কি সত্যিই মানুষ খুন করে? ওই সংযত দৃষ্টি কি সত্যিই হিংস্র হয়ে উঠতে পারে? ক্ষমতার লোভে কি সে অস্ত্র চালায় নির্বিচারে?
" পূর্বকোণ পত্রিকার নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই। দুদিন আগে ডিসি হিলের পিছনে পরিত্যক্ত এক বাড়িতে সেই পত্রিকার সম্পাদক শাহমাত সিকদারকে হত্যা করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তেই উঠে এসেছে পরিকল্পনা করে হত্যা। আমাদের মহলে কানাঘুঁষায় এমপি সাহেবের দিকে আঙুল গেলেও সঠিক প্রমাণ যেহেতু নেই তাই কোনো অ্যাকশন নেওয়া যাচ্ছে না।"
" উনিই কেন?"
" উনার সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিলো।"
শেহরিন আর কিছু জবাব দেয় না। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে," যাক আপনারা তাহলে নিজেদের সুশীল হিসেবে দাবি করতে পারেন। "
" অবশ্যই আমরা সুশীল। এসব নোংরা রাজনীতিতে আমরা গা ভাসাই না। আমাদের কাজ হলো রাষ্ট্রীয় আইন এবং সরকারের প্রশাসনিক আদেশ মান্য করা। আমরা সেটাই সঠিকভাবে করি।"
শেহরিন জোরপূর্বক ঠোঁট চেপে হেসে তৌসিফের কথায় সমর্থন জানায়। রক্ত খুন হানাহানি এসবে ভীষণ দূর্বল সে। রাজনীতি বিষয়টা এ কারণে তার অপছন্দ। প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকায় নানান ধরনের দূর্নীতির খবরে আরো মন উঠে গিয়েছে। কিন্তু মাঝে মাঝে বাবার থিওরিটাও তাকে বেশ ভাবায়। আচ্ছা এই জগতে সবাই কি এক??
"শেহরিন।"
" জ্বি।"
" আমি সোজাসাপ্টা কথা বলতে পছন্দ করি। তাই সোজাসাপটা কথাই বলছি- আমার আপনাকে প্রথম দেখাতেই ভীষণ পছন্দ হয়ে গিয়েছিলো। আপনার সুরে আমি সত্যি বলতে মূর্ছিত হয়ে পড়েছিলাম। সেখান থেকেই ভালোলাগা। আমি বোধহয় আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি। আমাকে আপনার বিয়ে করতে কি কোনো আপত্তি রয়েছে?"
শেহরিন চুপ হয়ে যায়। আবার সেই আপত্তি অনাপত্তি নিয়ে প্রশ্ন। সে নিজেই যেখানে দ্বিধা দ্বন্দ্ব সেখানে উত্তরই কি বা দিবে। তবুও পরিস্থিতিটাকে হালকা করতে সে ধীর কন্ঠে বলে, " আমি কিছুটা সময় চাই। "
" কত সময়? "
"খুব তাড়াহুড়ো? "
" না সেরকম নয় তবুও একটা ধারণা করে রাখতাম।"
" আমি আপনাকে জানাবো। আসলে হুট করেই একটা সম্পর্ককে পরিণতি দেওয়ার আগে কিছুটা ভাবনা চিন্তা করা উচিত। পরে যাতে আফসোস না করতে হয়। "
তৌসিফ শেহরিনের প্রতিত্তুরে খুব একটা সন্তুষ্ট হয় না। এটা তার ক্লিন শেভড মুখোরেখা দেখেই বোঝা যায়। অনিচ্ছুক হাসি ঝুলিয়ে বলে,
" আমার মতো ওয়েল এডুকেটেড ছেলেকেও ওয়েটিং লিস্টে থাকতে হচ্ছে। সবাই বলে, ক্যাডারদের নাকি পাত্রীর অভাব হয় নাই। বাট রিয়েলিটি এটাই।"
" কেনো ক্যাডাররা কি স্পেশাল কোনো খাতে অন্তর্ভুক্ত যে তাদের জন্য পাত্রীর অভাব পড়াটা বেমানন?"
" নো, বাট সব মেয়ের ফ্যামিলিতেই আমাদের মতো ছেলে স্বপ্ন দেখে।"
" বাহ্ আপনি তো দেখি নিজেকে নিয়ে বেশ প্রাউড ফিল করেন। গুড। গুড।"
" অভিয়েসলি্ আমি আমার যোগ্যতা এবং মেধায় এইখানে এসেছি। গর্ব করবো না?"
" ইয়েস করবেন অবশ্যই। বাট একটু খেয়ালে রাখবেন, দেখবেন অতিরিক্ত প্রাউড ফিল যেন আত্ম অহংকারে গিয়ে না পৌঁছায়। অহংকার খুব খারাপ একটা কোয়ালিটিজ। আপনি যত বড় পেশাতেই থাকুক না কেন নিজের মধ্যে অহংকার বজায় রেখে চললে আপনার মূল্য একদম নিচুতে এসে পৌঁছাবে। "
মুখের উপরে সপাটে উত্তরে তৌসিফ খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে উঠে। বিষয়টাকে ঘুরাতে হাত ঘড়িতে সময় দেখতে দেখতে বলে, " আচ্ছা এসব কথা রাখি্। আপনি সময় নিবেন ঠিক আছে তবে খুব বেশি নয়। আর হ্যাঁ আমি কিন্তু না বাক্য আপনার থেকে শুনবো না।"
" সময় হোক ।চলুন এবার তাহলে ফিরি।"
ফয়'স লেক হতে বের হয়ে পাকা রাস্তায় উঠে তৌসিফ শেহরিন। কিছুটা দূরে গাড়ি পার্ক করে রাখা। এতোক্ষণ কথা বলতে বলতে সাড়ে আটটা বেজে গিয়েছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ এর ঝলকানি বেড়েছে দ্বিগুণ। কখন যে ঝপ করে বৃষ্টি নামবে ঠিক নেই।
" এক্সকিউজ মি,ওয়ান সেকেন্ড।"
"শিউর। "
তৌসিফের হুট করে কল আসায় সে শেহরিনকে সামনে এগুতে বলে পিছনে দাঁড়িয়ে পড়ে। পকেট হতে ফোনটা বের করে রিসিভ করতেই অপর পাশ হতে গমগমে কন্ঠে ভেসে আসে, "সেভেন্টি পার্সন প্রোফিট ডান। মিস্ করতে না চাইলে এক্ষুণি চলে আসুন। পরে কম হলে কিন্তু আমি দায়ী নয়।"
তৌসিফ বিস্মিত চাহনিতে সামনে শেহরিনের দিকে এক পলক তাকিয়ে বলে, " দশটার দিকে আসলে হবে না? আমি একটু বিজি আছি এই মুহূর্তে। "
" এর চেয়ে বিজি আপনি আর কোন কাজে থাকতে পারেন অফিসার? আচ্ছা দেখুন যেটা ভালো মনে হয় করুন। সেভেন্টি থেকে থার্টি পার্সেন্টে এলে প্লিজ আমাকে বলবেন না। "
" অ্যাকচুয়ালি আমি .. ও..ওকে ওকে আমি আসছি।"
তৌসিফ তাড়াহুড়ো করে ফোন রেখে দেয়। সামনে চলা রমণীকে পিছু ডেকে সে এগিয়ে যায় তার পানে।
" শেহরিন একটা সমস্যা হয়ে গিয়েছে।"
" জ্বি? "
" আমার একটা জরুরি কল এসেছে। এই মুহুর্তে আমাকে মীরসরাই এ যেতে হবে। আই'ম সো সরি। আপনি প্লিজ মাইন্ড করবেন না আপনাকে বাসায় ড্রপ করে দিতে পারছি না বলে। আমি আসলে নিরুপায়। "
শেহরিন আশ্চর্যদৃষ্টি মেলে তৌসিফের দিকে। এই লোকের কথায় সে তাজ্জব বনে চলে যায় মুহুর্তেই। কি বলছেন উনি? ঝড় বাদলের দিনে এভাবে একটা মেয়েকে রাস্তায় একা রেখে সে সরি জপছে? শেহরিন এই সরি দিয়ে কি করবে? হাতে তো কোনো পার্স কিংবা মোবাইল ফোন ও আনিনি। এতোদূর তো আসার কথাই ছিলো না। কথা ছিলো বাসার সামনে রাস্তায় হাঁটা হাঁটি করে কথাবার্তা সম্পন্ন করা। কিন্তু এই লোকই তো স্বইচ্ছায় তাকে এখানে নিয়ে এসেছে। আর এখন আবহাওয়ার যা অবস্থা গাড়িরও কোনো চিহ্ন নেই। কি করবে সে? বিতৃষ্ণ গলায় কোনমতে ঠোঁট ফুঁড়ে উচ্চারণ করে,
" ঠিক আছে যেতে পারেন আপনি। "
" থ্যাংকিউ সো মাচ। আমি জানতাম আপনি বুঝবেন। ওকে বাই্। শীঘ্রই দেখা হবে।"
তৌসিফ পার্কিংরত গাড়ি নিয়ে চলে যায় নিমিষেই। শেহরিন ঠোঁটে কামড়ে বিদঘুটে ব্যাপারটা হজম করতে গিয়েও যেনো হজম করতে পারে না। ভিতরে হতে উগড়ে আসে তার। এই লোকটা উচ্চ শিক্ষিত কিন্তু বিবেকবোধ নিম্নতর। ড্রপ করে দিতে না পারতো অন্তত একটা গাড়ি ঠিক করে দিতে পারতো। এগুলো তো ব্যাসিক সেন্স। এতো অজ্ঞাত?? অথচ আসার সময় সবার সামনে গলা উঁচু করে বললো দায়িত্ব নিয়ে বাসায় ফিরিয়ে দিয়ে আসবে। এই তার নমুনা?
" স্টুপিড।"
হালকা হাওয়া ছেড়ে দমকা হাওয়া বইতেই শেহরিন গায়ে শাড়ীর আঁচল গুটিয়ে হাঁটা ধরে বাসার পথে। এতোদূর এখন সে কিভাবে যাবে?
"আল্লাহ আজকের জন্য একটা কিছু ম্যানেজ করে দাও। "
কিছুদূর আসতেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়। যেরকম মেঘের ঝলকানি শুরু হয়েছে মনে হচ্ছে তুমুল বর্ষণ নামবে। মাসটাই বৃষ্টির। প্রতিদিন নিয়ম করে এক বেলা নামাটা খুব স্বাভাবিক। সকাল সন্ধ্যায় না নামলে রাতে নেমে তা পূরণ করবেই। ইশ্ অন্যকিছু আনেনি আনেনি যদি ছাতাটা আনতো তাও তো হতো।
সাই সাই করে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়া গাড়ির হর্নে শেহরিনের বুক ধ্বক করে উঠে্। কাঁদায় পা মেখে তার একাকার। বৃষ্টি ধীরে ধীরে জোরে শুরু হচ্ছে। শাড়ির আঁচল মাথায় টেনেও এখন কাজে দিচ্ছে না।
" এই যে ম্যাডাম একটু দাঁড়ান। ভিআইপি গাড়ি যাবে। এখন যেতে পারবেন না।"
ট্রাফিক পুলিশের কথায় পা থামায় শেহরিন। তার মতো দু চারজন পথচারী সহ কিছু যানবাহন আটকে আছে একপাশে। বৃষ্টি মাথায়ও এসব ভিআইপি প্রোটোকল দেখে তার বিরক্তির সীমা থাকে না। অযাচিত কাজ বাজ।
রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে সে পাশে একজন ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করে, " মন্ত্রী প্রজাতির কেউ? "
" আমি জানি না। "
কিয়ৎসেকেন্ডের মাঝেই সারি সারি গাড়ি আসতে শুরু করে। তিনটে পুলিশের গাড়ি সহ চারটে প্রাইভেট কার এবং একটা জিপ। বৃষ্টির মাঝে সাইরেন বাজিয়ে জোরগতিতে চোখের পলকে একে একে ছুটে যায় সব। কিন্তু তন্মধ্যে একটা গাড়ি গিয়ে থামে কিছুটা দূরে। যার কারণে তার পিছনে থাকা একটা পুলিশের গাড়ি ও থামতে বাধ্য হয়। গাড়ি হতে দুজন পুলিশ হাতে ওয়াকিটকি নিয়ে বের হয়ে সেই গাড়ির দিকে এগোতেই ভিতর হতে কেউ একজন কিছু বলে। কিছু সময়ের কথাবার্তায় পুলিশ দুটো আবার ফেরত গিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যায়।
" স্যার এই সময় প্লিজ পাবলিক প্লেসে যাবেন না।"
" শেহরিন শিউর?"
আসিফ জানালা হতে মুখ ঘুরিয়ে বলে, " জ্বি ভাই।"
" ওকে।"
আরহাম কপাল ভাঁজ ফুটিয়ে বলে, " স্যার মন্ত্রী সাহেবরা রয়েছেন। উনারা বিষয়টা অন্যভাবে নিবেন। আর পাবলিক তো আছেই। নতুন ইস্যু ক্রিয়েট করবে।এভাবে জনসম্মুখে যাওয়া রিস্ক।"
" আই ডোন্ট কেয়ার। "
সান্নিধ্য গাড়ি হতে নেমে পড়ে্। আজকে সারাদিন সমাবেশে ছিলো। লম্বা বক্তৃতা দেওয়ার কারণে গলার স্বর কিছুটা বসেও গিয়েছে। চোখে মুখে রাজ্যের ক্লান্তি। কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে সে তার শেহরিনে ধাবিত হয়।
" আরহাম গাড়ি নিয়ে চলে যাও। আর আসিফ তুমি আশেপাশেই থাকো। কেউ ছবি তুললে বিষয়গুলো হ্যান্ডেল করবে।"
"আচ্ছা ভাই। আপনি যান।"
সান্নিধ্য শেহরিনের দিকে অগ্রসর হতেই ট্রাফিক পুলিশ বাঁশি বাজায়। আটকে রাখা সমস্ত গাড়ি সাথে কিছু পথচারী চলে যেতেই সান্নিধ্য জোর কদমে হেঁটে শেহরিনের কাছে এসে দাঁড়ায়। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ভেজা লগ্নে পুরুষালি পারফিউমের চেনা গন্ধ নাকে যেতেই শেহরিন ঘোমটায় আবৃত মুখ বের করে তাকায়। ফলশ্রুতিতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুজনের দৃষ্টি দুজনের পানে স্থির হয়ে যায়।
সারাদিনের ক্লান্ত দেহ নিয়ে বাড়ি ফেরা এমপি সাহেব নীল শাড়ি সঙ্গে ঘোমটা টানা বধূরূপী লাবণ্যকে পরিপূর্ণভাবে দেখামাত্র বুকে তীব্র ব্যথা অনুভব করে। নিশ্চল হয়ে উঠে তার মস্তিষ্কের প্রতিটি নিউরন। ক্লান্তি ভুলে সে সতেজতায় ডুব দেয় মুহুর্তেই। এই মেয়ে তাকে অন্তর দাহ করতে যেনো সামান্য কার্পন্যবোধ করে না। কেন বার বারে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে তাকে আহত করতে হবে? কেনো তার হৃদয় গ্রাস করতে হবে? নেতাসাহেবের ভিতরের নাজেহাল অবস্থার খবরটা কি সে জানে না?
অপরদিকে নেতাসাহেবকে কুপোকাত করা রমণী সুপরিচিত ব্যক্তিকে দেখে কিছুটা স্বস্তির দম ফেলে। লোকটার ব্যাক গ্রাউন্ড সম্পর্কে তার অজানা বা নেগেটিভ ধারণা থাকতে পারে কিন্তু মানুষ হিসেবে লোকটা মন্দ নয় এটা সে তার দৃষ্টি দেখেই নিশ্চিত হয়েছে বেশ আগে। তবে লোকটার থেকে বারে বারে সাহায্য চাইতে তার কিছুটা কুন্ঠাবোধ হয়। সে নিজেই চায় উনি দূরে থাকুক অথচ বিপদে পড়লে ঠিকই সাহায্য গ্রহণ করে্। ব্যাপারটা কেমন আয়রনি হয়ে যাচ্ছে !!
তবুও সবকিছু দমিয়ে নিষ্প্রাণ কন্ঠে বলে, " বিপদে পড়েছি। "
"এখানে কেন তুমি? "
" হেঁটে যাচ্ছিলাম। আপনারা ভিআইপি লোকজন যাচ্ছিলেন জন্য দাঁড়িয়েছি।"
"কোথায় গিয়েছিলে? সাথে কেউ নেই? "
"এক কানা বগীর ছা ছিলো সাথে। আমাকে ফেলে চলে গিয়েছে।"
সান্নিধ্য শেহরিনকে একটা দোকানের নিচে নিয়ে দাঁড় করায়। আশেপাশে তাকিয়ে দেখে রাস্তা শূন্য। যানবাহনের টিকিটিও নেই।দু একটা করে কার আর সিএনজি যাচ্ছে শুধু।
" এই কানা বগী গুলো কে?"
" আছে কিছু গিরগিটি প্রজাতি। আপনি নেমে এলেন কেন? আমাকে দেখে?"
"হু।"
"কেন? "
সান্নিধ্য এপার ওপার গাড়ি দেখতে দেখতে গম্ভীর কণ্ঠে বলে, " কেউ উঠিয়ে নেওয়ার আগে আমি উঠিয়ে নিলে মন্দ কি? আসো।"
শেহরিন তটস্থ চোখে তাকায় সান্নিধ্যের দিকে। ভীতগলায় বলে,
"কোথায় নিয়ে যাবেন আপনি আমাকে? "
"আপাতত আমার শ্বশুর বাড়ি চলো। এরপরে তোমার শ্বশুর বাড়ি যাবো।"