রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি

পর্ব - ১৬

🟢

|শুক্রবার, বিকেল পাঁচটা|

সূর্য ধরণীতে প্রস্ফুটিত হলেই সাথে সাথে বাড়ে বেলা। মধ্যাহ্নকে কাটিয়ে আসে অপরাহ্নের পালা। আর ঠিক সেই লগ্নে নিকুঞ্জ মহলে এসে উপস্থিত হয়েছেন তৌসিফের পরিবার। এসেছেন তার দুই চাচা, চাচী, বড় বোন এবং বোন জামাই।

শফিক সাহেব ও আরাফাত সাহেব তাদেরকে অ্যাপায়ন করেন বেশ সাদরে যত্নে। অন্যদিকে শাহিদা বেগম এবং মিসেস মণিকা আজ পুরোদস্তুর সংসারী হয়ে উঠেছেন কাজে। বিষয়টা আকাশ কুসুমের মতো হলেও সত্যি। বিশেষ করে কালকে রাতে রিজওয়ান সাহেবের কথায় নিজেদেরকে একটু পরিবর্তনের খাতায় নাম লিখিয়েছেন তারা । হরেক পদের নাস্তা তৈরিতে তাই দিয়েছেন কাজু বুয়াকে ছুটি। তবে তাদের এই পরিবর্তনটা নিজেদের ভুল বা অনুতপ্তের জন্য নয়, এর পিছনে আসল কারণ শেহরিনকে যথাসম্ভব এই বাসা হতে তাড়াতাড়ি বিদায় করা। কালকে ওভাবে অপমান তাদের গায়ে ফুঁসকুড়ির ন্যায় দেখা দিয়েছে। সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে চার বছর এই মেয়েকে বাসায় রাখা মানে প্রতি মুহুর্তে এরকম অপমানিত আর ঝামেলার সম্মুখীন হওয়া। ছেলে মেয়ে দুটোর ব্রেইন ওয়াশ করে তাদের বিপক্ষে নিয়ে যাওয়া। যা কোনোভাবেই হতে দিবে না তারা। যেভাবেই হোক আজকের বিয়েটা পাকাপোক্ত করেই ছাড়বে।

" আসসালামু আলাইকুম।"

" ওয়ালাইকুমুস সালাম।"

ড্রয়িংরুমে বসারত ব্যক্তিগণের মধ্যে এসে উপস্থিত হন রিজওয়ান সাহেব। তৌসিফের বড়চাচা ইসহাক আহমেদ এবং ছোটচাচা ইমদাদুল আহমেদের সঙ্গে কুশলাদি সম্পন্ন করে আসন গ্রহণ করেন তিনি।

" কেমন আছেন ভাই সাহেব ? "

" আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনারা সবাই কেমন আছেন? "

" জ্বি ভালো। সেই সাথে আপনার সাথে দেখা হয়ে আরো ভালো লাগছে। "

" ধন্যবাদ। আমারও ভালো লাগছে।"

" শায়লা.. ইনি হচ্ছেন আমাদের হবু বউমার বাবা ।"

" আচ্ছা।"

ইসহাক সাহেব তার গিন্নীকে রিজওয়ান সাহেবের সঙ্গে স্বল্প পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেন, " আমি হচ্ছি তৌসিফের বড় চাচা আর ইমদাদ হচ্ছে ছোট। ইজাজ মানে তৌসিফের বাবা আমাদের মেজো ভাই। ওর ছোটো মেয়ে বর্তমানে আমেরিকায় আছে সেখানেই বেড়াতে গিয়েছে পত্নীসহ।

তবে, গিয়ে তো ভাই ভীষণ আফসোস। ছেলের মেয়ে পছন্দ হয়েছে, বিয়ে করবে অথচ তারা নেই দেশে। আমাদেরকে তো একপ্রকার জোর জবরদস্তি করে পাঠিয়েছে আজকে। অবশ্য তৌসিফও কম আবদার করেনি এক্ষেত্রে । এতোকাল হাজার মেয়ে দেখেও পছন্দ হয়নি অথচ দেখুন আপনার মেয়ের কি ভাগ্য এক দেখাতেই আমাদের ছেলে পছন্দ করে ফেলেছে তাকে।"

শুরুর দিকের কথাগুলো ঠিক থাকলেও শেষের কথাটা খুব একটা পছন্দ হয় না রিজওয়ান সাহেবের। ভাগ্য ভালো জন্য তার মেয়েকে পছন্দ হয়েছে কথাটা তার কাছে হেয় মনে হয়।

উনি যদি অবচেতন মনেও বলে থাকেন তাও সেটা পরোক্ষভাবে অবজ্ঞা করা। কোন জ্ঞানে কথাটি বললেন তিনি কে জানে!!

" আমাদেরও ছেলেকে ভীষণ পছন্দ হয়েছে। আর ছেলে হচ্ছে আরাফাতের বন্ধু। আরাফাত আমাদেরকে আপনাদের ছেলের ব্যাপারে সব জানিয়েছে। তাই তো আমরা এক বাক্যে রাজি।"

" রাজি না হয়ে উপায় আছে বলুন। আমাদের ছেলে এতো অল্প বয়সেই সোনার হরিণ শিকার করে ফেলেছে। খুব একটা সহজ ব্যাপার নয় কিন্তু। "

শফিক সাহেব হাসতে হাসতে বলেন, " জ্বি জ্বি তাতো অবশ্যই।"

" আচ্ছা আমরা এবার মেয়েকে দেখি তাহলে। সময় নষ্ট করে আর কি লাভ। এনগেজমেন্টটা আজকেই সেড়ে ফেলতে চাইছি। কি বলেন?"

রিজওয়ান সাহেব মুখ খোলার আগেই মিসেস শাহিদা ট্রে খানা সামনে এনে টেবিলে রাখেন। মুখে প্রফুল্ল হাসি টেনে বলেন, " নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই। আমরা নিজেরাও সেই প্রিপারেশন নিয়ে রেখেছি।"

" বাহ্ তাহলে বেশ ভালো তো। তৌসিফ এবার খুশি তো? "

তৌসিফ চাচার কথায় লজ্জা পায় কি না দায়। তবে সে হালকা হেসে মাথা নাড়ায়। কল্পনায় দুটো চোখে তার ভেসে চলেছে শাড়ি পরিহিত রমণীকে। আজ কোন রঙে মুড়িয়ে আসবে সেটা সে অনুমান করতে ব্যস্ত হয়ে উঠে। সেদিন যেহেতু নীল পরেছিলো আজকে নিশ্চয়ই লাল কিংবা খয়েরি। কে জানে, সবুজও হয়তো হতে পারে। তবে যে রঙই পরুক না কোন দৈহিক অবায়বটা নিখুঁতই লাগবে তার কাছে।

" মণিকা অনিভাকে নিয়ে এসো।"

শাহিদা বেগম স্বামীর পাশে বসতে বসতে মিসেস মণিকাকে নির্দেশ দেন শেহরিনকে নিয়ে আসার জন্য । মিসেস মণিকা অপেক্ষায় থাকা নির্দেশখানা পেতেই বিস্তর হেসে বলেন,

" জ্বি আপা এক্ষুণি নিয়ে আসছি।"

" মণিকা একটু দাঁড়াও।"

" জ্বি দুলাভাই?? "

" একটু দাঁড়াও।"

রিজওয়ান সাহেবের কথায় বাড়ানো পথে পা থামায় মিসেস মণিকা। পিছু ঘুরে জিজ্ঞাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, " অনিভাকে নিয়ে আসবো না দুলাভাই?"

" এক্ষুণি প্রয়োজন মনে করছি না। তুমি বসতে পারো। প্লিজ.. "

মিসেস মণিকার সঙ্গে সঙ্গে ড্রয়িংরুমে উপস্থিতরত ব্যক্তিবর্গ প্রায় অবাক হয়ে উঠে রিজওয়ান সাহেবের না বার্তায়। একে অপরে করে স্বল্প সেকেন্ডের মুখ চাওয়াচাওয়ি। জনাব ইসহাক আহমেদ নিজের ভিতরে প্রশ্ন দমাতে না পেরে জিজ্ঞেস করেন, "কোনো সমস্যা ভাই সাহেব? ".

" জ্বি না ভাই সাহেব। কোনো সমস্যা নেই। আপনারা প্লিজ ব্যস্ত হবেন না। মেয়ের যখন আসার সময় হবে তখন নিশ্চয়ই আসবে। আমরা তার আগে একটু আলাপচারিতা সেড়ে নেই নিজেদের মতো করে। এতো তাড়াহুড়ার কিছু নেই। আপনারা প্লিজ নাস্তা করুন্। শফিক... প্লিজ ওনাদের নাস্তা সার্ভ করতে হেল্প করো।"

রিজওয়ান সাহেবের ধীর স্থির কথার মানে সুস্পষ্ট। তিনি আরও কিছু জেনে বুঝে তারপরে সামনে এগোতে চান। যেটা বুঝতে ছেলে পক্ষের আর কারো সমস্যা হয় না। তবে, বিস্মিত নয়নও কাটে না তাদের। সোনার হরিণ ছেলে তাদের। মেয়ে পক্ষ হয়ে এতো বাছ বিছার !! বিষয়টা তাদের প্রত্যেকের মুখে অসন্তুষ্টির ছায়া ফেলে্। বাছ বিছার যদি কিছু করতেই হয় তবে সেটা তারা করবে। মেয়ের বাবা কেন?

" আংকেলের বোধহয় আমার ভাইকে নিয়ে এখনো মনে সংশয় কাটেনি। তাই হয়তো ভরসা পাচ্ছে না।"

রিজওয়ান সাহেব মুখে স্বল্প হাসি বজায় রেখে ঠান্ডাস্বরে বলেন, " সংশয়ের কিছু নেই মা। তবে জানারও শেষ নেই। কোনো কাজ তাড়াহুড়ো করে করতে নেই। এতো ভুল হওয়ার সম্ভবনা থাকে বেশি।"

" ভুল?? "

" জ্বি ভুল।"

" আমাদের ছেলের মধ্যে কোনো ভুলত্রুটি দেখতে পেয়েছেন কি ভাইসাহেব?"

" ভাই সাহেব আমরা মানুষ বিচার না করি। যেটা একটা নতুন সম্পর্ক গড়তে অত্যাধিক প্রয়োজন সেটা নিয়ে কথা বলি? "

ইসহাক সাহেব চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে কিছুটা সংশয় মিশ্রিত চাহনি নিক্ষেপ করে বলেন, " জ্বি বলা যায় ।"

কাঙ্ক্ষিত অনুমতি পেতেই রিজওয়ান সাহেব সরাসরি তৌসিফের দিকে নজর দেন। স্নেহাতুর কন্ঠে বলেন, " আমার মেয়ের প্রতি বা মেয়ের বাবা হিসেবে আমার প্রতি তোমার কি কোনো চাওয়া পাওয়া বা জানার কিছু রয়েছে বাবা?"

হবু শ্বশুর হতে সরাসরি প্রস্তাবে তৌসিফ খানিকটা বিস্মিত হয়।

সংযত কন্ঠে প্রতিত্তুর দেয়,

" না আংকেল জানার কিছু নেই। অল ওকে। আর চাওয়া পাওয়া বলতে আপনি খুশি হয়ে আপনার মেয়েকে যা দিবেন সেটাই। আমার নিজস্ব বাড়তি কোনো চাওয়া পাওয়া নেই। আফটার অল আপনি যেটা দিবেন সেটা তো আপনার মেয়েরই থাকবে।"

তৌসিফের উত্তরে বেজায় খুশি হয় তার পরিবার। ইমদাদুল সাহেব উৎফুল্ল হয়ে বলেন, " আমাদের ছেলের ওসব দেনাপাওনা যৌতুকে কোনো লোভ নেই। ভালোবেসে আপনি যা দিবেন সেটাই সে সোনাতুল্য করে গ্রহণ করে নিবে। একমাত্র মেয়ের জামাই হতে চলেছে সে। আপনার অবর্তমানে ওদেরই তো সব।

" সঠিক।"

রিজওয়ান সাহেব যৎকিঞ্চিৎ হাসেন তাদের উত্তর শুনে। এইটুকুতেই তিনি বুঝতে সক্ষম হন এরা ইনডিরেক্টলি কথা বলতে বেশি পছন্দ করে। তবে, তিনিও খানিকটা বাজিয়ে নিতে মুখে চওড়া হাসি টেনে বলেন,

" খুব ভালো লাগলো কথাটা শুনে। উচ্চ শিক্ষিত ছেলে তুমি। এসব দেনাপাওনা যৌতুক তোমার সাথে কোনোভাবেই যায় না। এই মনোভাবটা সবসময় ধরে রাখবে। আর আমিও পার্সোনালি এসব পছন্দ করি না।

একটা সুশিক্ষিত মেয়ে যৌতুক কিংবা দেনাপাওনার চেয়ে বহুদামী সম্পদ। যেটা কিনা সারাজীবন অক্ষত থাকবে। একটা সুন্দর পরিবার গড়তে যার অবদান সবচেয়ে বেশি থাকে তার চেয়ে দামি আর কি বা হতে পারে? ভরি ভরি স্বর্ণ কিংবা অর্থ দিয়ে তাদের মূল্যায়ন করা বোকামি। "

গৌধূলীর সময়ে সন্ধ্যা না নামতেই তৌসিফের পরিবারের মুখে নামে আমাবস্যার ন্যায় অন্ধকার । ইসহাক সাহেব তৌসিফের দিকে এক পলক তাকিয়ে জোরপূর্বক হেসে বলেন,

"জ্বি ঠিক বলেছেন। বিষয়টা আমরাও সমর্থন করি না। তবে ভালোবেসে কেউ কিছু দিতে চাইলে সেটা নেওয়াটাও উত্তম। এই ধরুন, আপনি আপনার একমাত্র জামাইকে যদি আপনার ঢাকা শহরের একটা বাড়িই লিখে দেন ভালোবেসে, সে যদি সেটা না নেয় আপনার কি ভালো লাগবে বলুন? এমনও হতে পারে, আপনি এই কারণে হয়তো অপমানও বোধ করলেন।"

" ভালোবেসে দোয়া দেওয়া উচিত, সম্পদ নয়। কারণ দোয়াটাই অধিক কাজে লাগে। দোয়া থাকলে জীবনে কখনো অভাব সৃষ্টি হবে না ইনশাআল্লাহ। সুস্থ সুন্দরভাবে জীবনে বেঁচে থাকতে পারলে আর কি চাই। শখ আহ্লাদ এর মধ্যেই হয়ে যাবে।

আর এজন্য আমি ঠিক করেছি আমি আমার মেয়ে এবং মেয়ে জামাইকে শুধু মাত্র এই বড় সম্পদটাই দিবো। বাবা হিসেবে মন থেকে অজস্র দোয়া করে দিবো।"

" ভাই সাহেবের দেখছি বেশ উচ্চতর চিন্তা ভাবনা। ভালো ভালো। তবে দোয়ার নামে একেবারেই খালি হাতে মেয়েকে দিবেন বলে আমার মনে হয় না।"

" মেয়ের যতটুকু হক ততটুকু তো অবশ্যই দিতে হবে। তবে, এর ব্যতিত অধিক কিছু নয়।"

সপাটে উত্তরে মুখের হাসি প্রায় চুপসে যায় ছেলেপক্ষের। তবে, তৌসিফের বড় বোন তানিয়া মৃদু হেসে বলে, " আংকেল আমার একটা প্রশ্ন রয়েছে। আপনি তো বললেন সুশিক্ষিত মেয়েরা নিজেরাই একটা সম্পদ। তাহলে যারা অশিক্ষিত রয়েছে তারা কি সম্পদ নয়? সমাজের পরিবারের বোঝা? তাদের বিয়ে দিতে নিশ্চয়ই সম্পদ দিতেই হবে তাহলে?"

রিজওয়ান সাহেব স্মিত হেসে জবাব দেন, " চমৎকার প্রশ্ন করেছো। এক্ষেত্রে তোমার সর্ব প্রথম বিবেচনা করতে হবে তোমার মন মানসিকতা কেমন। কারণ মানুষ শুধুমাত্র বিদ্যায় শিক্ষিত হয় না, তার নিজস্ব গুণে ব্যবহার এবং আচরণে শিক্ষিত হয়। ধরো একটা অশিক্ষিত মেয়েরই বিয়ে হলো কোনো এক পরিবারে। সেখানে গিয়ে তাকে নিশ্চয়ই কেউ বসে বসে খেতে দিবে না বা সে নিজেও অশিক্ষিত বলে বসে থাকবে না। সে সংসারে যাবে, পারিপার্শ্বিক অবস্থা বুঝবে এবং সেই অনুযায়ী তার যতটুকু জ্ঞান, দক্ষতা রয়েছে সেটা দিয়ে নতুন সংসার গড়তে চেষ্টা করবে। রিমেম্বার, একটা সংসার গড়া কিন্তু সহজ কথা নয়। সে তার গুণের মাধ্যমেই কিন্তু একটা সময় সফল হবে। তুমি যদি বাস্তবে প্রমাণ পেতে চাও গ্রামে একবার ঘুরে এসে দেখো। আমি নিজে গ্রামের ছেলে। আমি স্বচক্ষে দেখেছি। প্রত্যেক পরিবারে তুমি এমন শিক্ষিত গুণী মা মেয়ে পাবে যারা পাঠ্য পুস্তক বিদ্যার বাহিরেও সংসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পুরুষদের পিছনে ব্যাকবোন হিসেবে থেকে একটা সুখী পরিবার গড়ে তুলেছে। তুমি কি তাহলে তাদেরকে অশিক্ষিত বলতে পারবে ?"

যুক্তিসঙ্গত উত্তরে তানিয়া এই নিয়ে দ্বিতীয় আর কোনো প্রশ্ন তুলতে পারে না। এলোমেলো দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,

" না ঠিক বলেছেন। কিন্তু আংকেল আমরা যতদূর জেনেছি শেহরিন তো গৃহস্থালির কাজকর্ম বা সংসার বিষয়টা খুব একটা ভালো বোঝে না।"

" সেটা তো তোমরা জেনেই নিচ্ছো মা। আমরা তো গোপন করিনি। আর আমার মেয়েকে এই ব্যাসিক কাজগুলো শেখানোর কেউ ছিলো না যে একটু শিখবে। মা যেহেতু সন্তানের বড় শিক্ষক। এক্ষেত্রে শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে সে পুরোটাই অপটু। আমি বাবা হয়ে তাই তার বিদ্যার পাশাপাশি সুন্দর মনের মানুষগড়াটাকে নিশ্চিত করতে চাই। সে উচ্চশিক্ষিত হবে এটা আমার স্বপ্ন।"

রিজওয়ান সাহেবের শেষের কথাটা উচ্চারণ হওয়া মাত্র টেনে আনে বিপত্তি। ইসহাক সাহেব মুখ খোলার আগেই ইমদাদুল সাহেব তাকে ইশারায় চুপ থাকতে বলে বলেন,

" উচ্চশিক্ষিত বলতে কেমন বুঝিয়েছেন ভাইসাহেব।"

" মেয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে এমবিএ করবে। এমবিএ কমপ্লিট শেষ তার যদি মন চায় তাহলে জব করবে।"

"কিন্তু আমাদের ফ্যামিলিতে তো মেয়েদের জব এ্যালাউ নয়।"

রিজওয়ান সাহেব সোফায় হেলান দিয়ে বসা ছেড়ে সোজা হয়ে বসেন। কিছুটা অবাক মিশ্রিত স্বর টেনে বলেন, " ওহ তাই নাকি। তাহলে তো বিষয়টা একটু ঝামেলার হয়ে গেলো। এ্যালাউ নয় কেন?"

" এটা আমাদের বংশ পরম্পরা হতে চলে আসছে। পুরুষদের ইনকামটাই মুখ্য বিষয়। আমরা মেয়েদেরকে দিয়ে জব করাই না। মেয়েরা পর্যাপ্ত শিক্ষিত হয়ে সংসার করবে, বাচ্চা মানুষ করবে্। দ্যাটস ইট।"

শফিক সাহেব এ পর্যায়ে নিজেও খানিকটা অবাক হন। এই বিষয়টা তার নিজেরও অবগত ছিলো না্। এখনই মাত্র শুনলো।

" একেবারেই নিষিদ্ধ? "

" জ্বি একেবারেই নিষিদ্ধ। বিশ্বাস না হলে আমার ভাতিজি এবং মিসেসদের থেকে শুনে দেখুন।"

" আচ্ছা তার প্রয়োজন নেই। আমরা বিশ্বাস করে নিয়েছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় তাহলে হয়তো বিয়েটা নিয়ে আমরা আর সামনে এগোতে পারছি না। বিষয়টা এখানেই শেষ করা উচিত।"

" মানে?? "

" আমি পরিষ্কার কথা বলতে পছন্দ করি ভাইসাহেব। আপনাদের পারিবারিক মতের সাথে আমার এবং আমার মেয়ের মতামত মেলেনি। সেক্ষেত্রে আমি সম্পূর্ণভাবে অনিচ্ছুক এই বিয়েটা দিতে। মাফ করবেন।"

তৌসিফ আশ্চর্য চোখে তাকায় বড়চাচার দিকে। জনাব ইসহাক অসন্তুষ্ট গলায় বলেন, " এভাবে মানা করে দেওয়াটা যুক্তিসংগত নয় ভাইসাহেব । তাহলে কি আমরা ধরে নিবো, আপনার মেয়ের চাহিদা অত্যাধিক থাকার কারণে সে নিজে ইনকাম করতে চায়? "

" আমি আমার মেয়েকে অত্যাধিক চাহিদা পূরণের জন্য শিক্ষিত করতে চাইনা। বিদ্যা তার একমাত্র অস্ত্র। যেটা দিয়ে সে তার জীবনের কঠিন সময়টা আমার অনুপস্থিতিতে অনায়াসে পার করতে পারবে। আর আমি বাবা হয়ে আমার মেয়েকে এই দুনিয়াতে তো খালি হাতে রেখে যেতে পারবো না তাই না? কপাল বড় অদ্ভুত জিনিস। দেখা গেলো কোনো একভাবে আমার মেয়ে একা হয়ে গেলো, তার যেহেতু অন্যসব বিষয়ে দক্ষতা কম তাহলে তো তাকে তার বিদ্যাটাকেই আশ্রয় হিসেবে নিতে হবে। সে নিজে ইনকাম করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে চলতে পারবে। তখন মনে কষ্ট থাকলেও পেট কিন্তু ঠিকই চলবে। অন্তত মানুষের মুখাপেক্ষী হতে হবে না।"

" তার মানে তাকে জব করতেই হবে।"

" সে উচ্চ শিক্ষিত হবে এটা মেইন ফ্যাক্ট। জব করবে কি করবে না সেটা তার ব্যাপার। "

" এটাই কি তবে ফাইনাল ডিসিশন? "

" নিঃসন্দেহে ভাইসাহেব। লক করে নিতে পারেন। কোনো নড়চড় হবে না।"

ইসহাক সাহেব গম্ভীর কণ্ঠে তৌসিফের দিকে তাকিয়ে বলেন, "তুমি তো বলেছিলে এই বিষয়টা ক্লিয়ার করেছো দুজনে মিলে। তাহলে এমন মতবিরোধ হচ্ছে কেন?"

"আংকেল শেহরিন তো কালকে ক্যাফেতে..

" না করেছিলো কি এই বিষয়ে?"

" না করেনি তবে...

" তবে কিছুই না । আই'এম রিয়েলি সরি। বিয়ে নিয়ে দুকথা, মিল অমিল হবেই। প্লিজ এটা পজিটিভলি নিবেন। আপনাদের ছেলের জন্য আমার শুভকামনা থাকবে। আপনাদের পছন্দানুযায়ী মেয়েকে পুত্রবধূ হিসেবে মনোনীত করুন।"

" কিন্তু ভাইসাহেব আপনি.."

" প্লিজ আমি আর এই বিষয়ে কোনো কথা বলতে চাই না। যা বলার অনেক কথা বলে ফেলেছি। আর নয়।"

দাবার গুটি হাত হতে বের হয়ে যেতে দেখে শাহিদা বেগম মিসেস মণিকা বিস্ফোরিত নেত্রে একে অপরের দিকে তাকান। বিয়েটাকে জোড়া লাগাতে দৃঢ় কন্ঠে বলেন, " দুলাভাই কি করছেন আপনি? এতো ভালো সম্বন্ধকে হেলা করছেন এই সামান্য একটা বিষয় নিয়ে। প্লিজ না করবেন না। দেখুন তৌসিফ তো অনেক ভালো পদে রয়েছে। শুধু শুধু অনিভাকে কেন এতো চাপ নিতে হবে। তার চেয়ে মন দিয়ে কি সংসার করাটা উচিত নয়?"

" আমি মেয়ের বাবা। মেয়ের কথা এবং সিদ্ধান্তই আমার কাছে শেষ কথা। তোমার কথা শুনতে আমি অপ্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি শাহিদা। কিপ সাইলেন্ট।"

ইমদাদুল সাহেব বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। তিক্তকন্ঠে বলেন,

" এসব আদিখ্যেতা ছাড়া কিছু নয়। পাশ করে বের হয়ে সেই তো ঢুকবে কোনো এক কম্পানিতে। বিসিএস ক্যাডার তো আর হতে পারবে না। "

রিজওয়ান সাহেব একই সাথে দাঁড়িয়ে পড়েন। মুখে মৃদু হাসির রেশ রেখে জবাব দেন,

"A poorly educated person is better for the country than an inhuman BCS cadre like him. সো কোনো চাপ নেই। মেয়ে শিক্ষিত হয়ে মানুষ তৈরি হোক। আসতে পারেন আপনারা...এগেইন সরি।"

_________________________________

সন্ধ্যা সাতটা, চট্টগ্রাম শহরের বুকে জ্বেলেছে রাতের আলো। চারপাশে কেটেছে অন্ধকার। আকাশে জমা মেঘকে সরিয়ে পূর্ণিমা এসে বসেছে জেঁকে। রুপোলি আলোয় দূর হতে চোখে পড়ে ছোট ছোট পাহাড়ের আনাগোনা। দিনের রৌদ্রময় উত্তাপ শেষে রাতে বইছে নির্মল হাওয়া। আর এই স্নিগ্ধ সন্ধ্যা উপভোগ করতে বেরিয়ে পড়েছে বাবা মেয়ে। বিকেলের ঝুট ঝামেলা সেড়ে এখন দুজনই প্রফুল্ল বেশ।

শেহরিন জানালা হতে মুখ ঘুরিয়ে বাবার দিকে তাকায়। নির্মেদ স্বরে বলে,

" ধন্যবাদ বাবা এতো পিসফুলি সিচুয়েশনটা হ্যান্ডেল করার জন্য। আমি ভীষণ চিন্তায় ছিলাম ওই সময়টায়।"

"রিলাক্স মা। এগুলো জোর জবরদস্তির কোনো বিষয় নয়। বাট একটা মজার বিষয় কি জানো, কালকে তোমার বলা প্রতিটা কথার সত্যতা আজকে আমি নিজে পেয়েছি। এন্ড ইট মেড মি ফিল ভেরি অ্যাস্মেড।"

" আমার নিজেরও এমন লেগেছে বাবা৷ আমি ভাবতেই ভীষণ অবাক হয়েছি তারা নিজেদের এতোটা নিচুভাবে ক্যারি করে।

" খুব স্বাভাবিক। যাই হোক বাদ দেই। আচ্ছা কালকে তাহলে চলো আমরা নতুন বাসস্থান খুঁজি? "

শেহরিন গলার স্বর নামায়। মোজাম্মেল আংকেলের দিকে নজর রেখে বলে, " এতো তাড়াতাড়ি? "

" তাড়াতাড়ি নয় মা। আজকে যে সিচুয়েশনটা ক্রিয়েট হয়েছিলো সেখানে তোমার মামির ছিলো বিরুপ প্রতিক্রিয়া। অ্যাজ লাইক সে বিষয়টা যেন মানতেই পারছিলো না। আমি শিউর সে তার এই মনের ক্ষোভ তোমার উপরে প্রয়োগ করবে এবং সেটা যেকোনোভাবে। যেটা আমি মোটেও হতে দিতে চাই না। তোমার কি খুব অসুবিধা হবে?"

" না.. না অসুবিধা হবে না। আরো যেতে পারলে ভালো। কিন্তু মুমু আরশের জন্য.. "

রিজওয়ান সাহেব স্নেহময় দৃষ্টিতে মেয়ের পানে তাকান। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন, "ছুটির দিনটা ওদের জন্য তুলে রাখবে। বাচ্চাগুলোর সাথে তখন সময় কাটাবে। আমি শফিককে বলে যাবো।

শোনো মা, কোথাও কখনো কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় ভুক্তভোগী হওয়ার চেয়ে সেখান হতে আগে আগেই সসম্মানে বেরিয়ে আসা ভালো।"

" জ্বি বাবা।"

বিজ্ঞাপন

কিছু সময়ের ব্যবধানে গাড়ি এসে থামে কোতোয়ালি এলাকায়। মোজাম্মেল আংকেল পিছনে ঘুরে শেহরিনের দিকে তাকিয়ে বলে, " আর একটু যামু? "

" না আংকেল সামনেই বাসা।"

রিজওয়ান সাহেব হাত ঘড়িতে সময় দেখে নিয়ে বলেন,

" আমি তাহলে নয়টা বা সাড়ে নয়টার দিকে এসে তোমাকে রিসিভ করে নিয়ে যাবো কেমন?"

"তুমিও একটু এসো না বাবা। ঋতমার বাবা মা বার বার তোমার কথা বলেছেন সঙ্গে নিয়ে আসতে।"

" আজকে নয় মা। তুমি উনাদের বলে দিয়ো, বিদেশ পাড়ি দেওয়ার আগে বাবা অবশ্যই দেখা করবেন।"

শেহরিন গাড়ি হতে নামে। হাতে তার ঋতমার জন্য একখানা ছোট গিফট। ছোটোবেলা হতেই তার অভ্যাস কখনো কোনো ফ্রেন্ডের বাসায় গেলে সবসময় টুকটাক গিফট নিয়ে যাওয়া। হোক সেটা চকলেটস্ কিংবা পেস্ট্রি। এখন বড় হয়ে গেলেও তার সে স্বভাবটা যায়নি। আজ অবশ্য সে ঋতমার জন্য নিয়েছে মালয়েশিয়া হতে কেনা একটা সুন্দর নকশা করা ডায়েরি। এমন ডায়েরি সে আগেও একজনকে দিয়েছিলো। বারো বছরের সঙ্গী হিসেবে কেউ একজন ছিলো তার জীবনে। প্রিয় বান্ধবীর তালিকায় একমাত্র নামটা শুধু তার দখলেই থাকতো। আজ সে হারিয়ে গিয়েছে তার জীবন হতে বহুদূরে। আজ তারা একে অপরের অপরিচিতা। ভীষণ অপরিচিতা।

" আসছি বাবা।"

রিজওয়ান সাহেব মেয়েকে বিদায় দিয়ে মোজাম্মেলের দিকে তাকিয়ে বলেন, " এমপি সান্নিধ্য শাহজাদকে চিনো মোজাম্মেল? "

" জ্বি ভাইজান চিনি।"

" নিয়ে চলো তার কার্যালয়ে।"

" সে তো সদরঘাট। "

" দূরে কোথায়? কাছেই তো।"

"আচ্ছা।"

রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি বাংলা গল্প pdf সাহিত্য

টানা তিনদিন চট্টগ্রামের তিন জায়গায় অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশাল রাজনৈতিক সমাবেশ। সমাপ্তি দিনে আজকের সমাবেশটা হয়েছে ফটিকছড়িতে। এমপি সান্নিধ্য শাহজাদের এলাকায়। স্বয়ং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীসহ বড় বড় নেতাদের উপস্থিতিতে সমাবেশটা বেশ সুষ্ঠুভাবেই সম্পাদন করা হয়েছে।

সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে দুটো গাড়ি বহর নিয়ে অবশেষে বাসার উদ্দেশ্য ভীড়ছেন এমপি সাহেব। যদিও এর ফাঁকে তার একটু

কার্যালয়ে যাওয়ার কথা ছিলো। কিছু সই সাবুদ পেন্ডিং এ আছে। যেটা আবার কালকের মধ্যেই তাকে শেষ করতে হবে। আর কিছুদিন পরেই যেতে হবে ঢাকা। অংশগ্রহণ করতে হবে জাতীয় সংসদ সদস্য অধিবেশনে।

কিন্তু নেতাসাহেব ভীষণ ক্লান্ত। অন্য সবার তুলনায় তার দায়িত্বটা আজকে অনেক বেশি ছিলো। সেই সাথে প্রতিপক্ষ দলকে ঠান্ডা রাখতে দিতে হয়েছে বাড়তি নজর। কারণ তার বিরুদ্ধে কিছু ঘটানোর আগেই সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হয়েছিলো তাকে। ধরতে গেলে, আজকের সারাটাদিনের রোদ একপ্রকার তার মাথার উপর দিয়েই গিয়েছে।

সিটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে এমপি সাহেব আজকের হিসাব ভাবতে থাকে। উপস্থিত দু'জন নেতার আচরণ তার কাছে আজকে সন্দেহজনক লেগেছে। এদের পিছনে এখন লাগাতে হবে লোক।নিশ্চয়ই..

" রিমন গাড়ি ঘুরা।"

সান্নিধ্য চোখ খুলে আসিফের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলে," কেন?"

" ভাবীর বাবা কার্যালয়ে এসেছেন। সম্ভবত আপনার সাথে দেখা করতে।"

সান্নিধ্য সিটে হেলান দেয়া ছেড়ে সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে বসে। বাঁকানো ভ্রু দ্বয় তার সোজা হয়ে যেতেই আসিফ নিঃসঙ্কোচ গলায় বলে," মাত্র খবর এলো।"

রিমন আর কোনো প্রকার টু বাক্য করে না। সে জানে এই মুহূর্তে উড়ে যেতে পারলে তার স্যারের জন্য হয়তো সবচেয়ে ভালো হতো। কেননা মিরর হতে স্যারের মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে বিশাল পরিবর্তন।

প্রায় এগারোমিনিটের মাঝে উচ্চগতির কারণে গাড়ি এসে পৌঁছায় কার্যালয়ে। সান্নিধ্য ভিতরে প্রবেশ করে সোজা চলে যায় দোতলায়। যাওয়া পথে নির্দেশ দেয় দু কাপ ব্ল্যাক কফির।

দোতলার ওয়েটিং রুম বসে আছেন রিজওয়ান সাহেব। এতোক্ষণ চারপাশটা তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলেন্। বেশ পরিপাটি ভাবে গোছানো সবকিছু। দলের কর্মীরাও বেশ সৌহার্দ্যসুলভ আচরণ করেছে তার সঙ্গে। অপরিচিত ব্যক্তি হলেও সঙ্গে সঙ্গে পাঠিয়েছেন হালকা নাস্তা।

অবশেষে স্লাইডিং ডোর টেনে ভিতরে প্রবেশ করে সান্নিধ্য। রিজওয়ান সাহেব সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ান।

" আসসালামু আলাইকুম। "

" ওয়ালাইকুমুস সালাম।"

" দুঃখিত আপনাকে এইভাবে অপেক্ষায় রাখার জন্য। "

রিজওয়ান সাহেব হালকা হাসেন। কালকে সে আসাপথে নেতাসাহেবকে দূর থেকে অল্প বিস্তর দেখেই বুঝেছিলেন সুর্দশন পুরুষ ইনি। আজ সামন-সামনি দেখে তার ধারণাটা পুরোপুরি সত্যি হয়। শ্যামলা চেহারার সুর্দশন নেতাসাহেব। যদিও চোখে মুখে তার ক্লান্ততার রেশ স্পষ্ট ছাপানো তবুও ভাঁটা পড়েনি কোনো কিছুতে। অঙ্গ ভঙ্গি দেখেই বোঝা যাচ্ছে বেশ এনার্জিটিক।

" বাহ্ জনগনের জন্য দেখছি বেশ ভাবেন আপনি। আজ পর্যন্ত কোনো নেতাকে এই কথা বলতে দেখেনি। বরং এই অসময়ে কোনো আবদার নিয়ে আসলেই তারা আরো অসন্তুষ্ট হতেন।"

" আমিও হয়তো তার ব্যতিক্রম নয়। অসময়ে আবদারটাকে ভালো চোখে দেখতাম না। আর আপনি আমার কাছে আবদার নিয়ে আসেননি সাক্ষাৎ করতে এসেছেন।"

রিজওয়ান সাহেব শুরুতেই নেতাসাহেবকে একটু সুবাক্যে দ্বারা পরীক্ষা করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই স্পষ্ট সত্য স্বীকারোক্তি যে পাবেন সেটা আশা করেননি। তিনি ভেবেছিলেন হয়তো খুশি হয়ে নেতাসাহেব নিজের সম্পর্কে আরো দুচারটা ভালো কথা যোগ করবেন। কিন্তু সেরকমটা না হওয়াতে একটু বিস্মিত চোখেই তাকান তিনি। অতঃপর মুখে হাসি রেখে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, " রিজওয়ান চৌধুরী।"

" সান্নিধ্য শাহজাদ খান। প্লিজ টেক সিট।"

দু সারিতে সাজানো সোফায় দুজন মুখোমুখি হয়ে বসেন।

" চট্টগ্রাম -২ আসনের সংসদ সদস্য। "

" এইতো।"

" আমার জানামতে, চট্টগ্রামের সবচেয়ে বৃহৎ উপজেলা এটা। প্রশাসনিকভাবে হয়তো ২ টা পৌরসভা সময় ১৮ টা উপজেলা নিয়ে গঠিত। কত ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন?"

সান্নিধ্য শান্ত চোখে তাকায় রিজওয়ান সাহেবের দিকে। ধীর কন্ঠে বলে, " তুমি বললে খুশি হবো। আপনি আমার রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের মধ্যে কেউ নন। সো প্লিজ।

৭৫ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে।"

" ওকে তুমি করেই বলছি তাহলে।"

"শিউর ।"

" কত শতাংশ হবে তাও?"

" আনুমানিক ৬০-৭০ শতাংশ হবে।"

" অনেক ভোট। কার্যক্রম কি বিশাল ছিলো?"

সান্নিধ্য সোফার কোণায় কনুই ঠেকিয়ে থুতনির নিচে হাত রাখে। ক্ষীণ হেসে বলে,

" সেরকমকিছু নয়। জনগনের মাঝে থেকেই হয়ে গিয়েছে। "

" ইন্টারেস্টিং। "

দু'জনের চলমান কথার মাঝখানে আসিফ কফি নিয়ে আসে। অতঃপর তার প্রস্থান হতেই রিজওয়ান সাহেব কফি মগে চুমুক

টেনে ভ্রু উঁচিয়ে বলেন, " ব্যাকগ্রাউন্ডের অবস্থা কেমন তোমার?"

সান্নিধ্যের ঠোঁটে থাকা ক্ষীণ হাসি এবার প্রসার হয় কিছুটা। হাতে কফি মগটা নিয়ে ঠোঁটের উপর ঠোঁট চেপে বলে, "খুব একটা ভালো নয়।"

" খুন খারাবি আছে লিস্টে? "

" আছে।"

রিজওয়ান সাহেব চোখে চোখ রেখে বলেন,

" সংখ্যাটা কি অনেক বেশি? "

" দশ অতিক্রম হয়নি এখনো।"

" তুমি জানো কাকে এসব বলছো? সঙ্কোচ ফিল করছো না?"

"জানি কিন্তু আমি মিথ্যা বলতে পারি না।"

" বাহ এতোগুলো খারাপ গুণের মধ্যে ভালো গুণ একটা পেলাম। মানুষের জন্য কাজ করো অথচ মানুষ মারো? "

" কোন ধরনের মানুষ? "

" কোন ধরনের মানুষ মানে ?"

" আমি ভালো মানুষের জন্য কাজ করি শুধু । আর মন্দ মানুষকে মারি। বিশেষ করে আমার ভালো কাজে যারা বাঁধা দিতে আসে। আমার পিছনে যারা অযথাই লাগতে আসে। আমি ব্যক্তি হিসেবে এক্ষেত্রে খারাপ হলেও কাজে খারাপ নয়।"

রিজওয়ান সাহেব স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেন, " আমার মেয়েকে এতো ভালোবাসো। তাকে বিয়ে করতে চাও।তোমার কি মনে হয় তোমার এই খারাপ গুণাবলি দেখে আমি রাজি হবো?"

"রাজি না হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে আপনি যদি অস্বাভাবিক কাজটা করেন আংকেল, তাহলে আমার জন্য ভালো হবে এই আরকি।"

" আমি কেন তোমার ভালোর জন্য আমার মেয়ের খারাপ চাইবো?"

" কারণ আমার ভালো থাকাটা আপনার মেয়েকে ঘিরে। আপনার মেয়েকে ভালো রাখাটা যদি আমার ভালো থাকাটা হয়। তাহলে আপনার কি উচিত নয় মেয়ের ভালো চাওয়া?"

সুকৌশলে ঠান্ডা মাথায় কথার মাঝে প্যাঁচ। রিজওয়ান সাহেব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সামনে বসা ছেলেটাকে পর্যবেক্ষণ করে যান। নরম গলায় বলেন, " আমার মেয়ে তোমার এই খুন খারাবি বা ডার্ক সাইড দেখে মোটেও ভালো থাকবে না। ওর হেমাটোফোবিয়া রয়েছে। যেটা ওকে মারাত্মক ভাবে দূর্বল করে দেয়। রক্ত ইনজেকশন, পিস্তল এগুলো দেখলেই সে আর তার মধ্যে থাকে না। তুমি ওকে নিয়ে ভালো থাকতে পারবে না। তোমার মতো এমন তরুণ উদ্দীপ্ত নেতার সহধর্মিণী হওয়া উচিত তোমার মতোই প্রখর, নির্ভয়া।"

" আমি তাকে ভালোবাসি। তাকে যেকোনো ভাবে ভালো রাখাটা আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়বে। আপনি শুধু এইটুকু ব্যবস্থা করে দিন। "

" ভালোবাসা হলো কিভাবে? "

" হয়েছে.. ভাই একভাবে।"

" এক্সকিউজ মি? "

সান্নিধ্য তীক্ষ্ণ শিথিল করে। সংযত কন্ঠে বলে,

" সরি.. ভুলে বের হয়ে গিয়েছে।"

" তোমার নাকি রাগ অত্যাধিক?"

" আপনার মেয়ের জন্য ভালোবাসা তার চেয়েও অত্যাধিক।"

" শুধু মুখেই নয়তো? ।"

নেতাসাহেব দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে, " বিয়েটা ম্যানেজ করে দিন কাজেও করিয়ে দেখাবো। আমি মানুষের চোখে পার্ফেক্ট হতে চাই না। আমি আমার ব্যক্তিগত নারীর কাছে লয়াল, অনেস্ট হলেই হলো। আপনি সম্মানিত মানুষ। আমি ভীষণ নগন্য। তাই রিকুয়েষ্ট করছি, আপনারা বাবা মেয়ে আমার প্রতি একটু সহানুভূতিশীল হন। "

" তোমাকে আমার পছন্দ হয়েছে। তোমার ব্যক্তিত্ব, তেলবিহীন কথার্বাতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। কিন্তু শুধু মাত্র.. "

" প্রত্যেক মানুষ কি সবদিক দিয়ে ভালো হয় বলুন?"

" না তা হয় না। আমি নিজেও ভালো নয় সবদিক দিয়ে। বাট মানুষ তো ভালোবাসার দোহাই দিয়েও একটু বলে ঠিক আছে আমি আর ওই কাজ করবো না।"

" মিথ্যা আশ্বাস আমি দিতে পারছি না আংকেল। আমার প্রতিপক্ষ আমার পিছনে লাগবে আমাকে অস্ত্র চালাতেই হবে। তবে, হ্যাঁ আপনার মেয়ের আড়ালে হবে সব। রাজনীতিতে এসব পান্তা ভাত।"

রিজওয়ান সাহেব ভাবুক দৃষ্টি মেলে বলেন, " আচ্ছা মুশকিল। মেয়ে আমাকে পাঠিয়েছে তোমাকে বোঝানোর জন্য। কিন্তু তুমি যে হারে উল্টো বুঝ দিচ্ছো আমি তো গলে যাচ্ছি। আমার মতো বাবা পৃথিবীতে হয়তো কমই আছে যে কিনা জেনেশুনে ভয়ানক রাজনীতিবিদের হাতে মেয়ে তুলে দিতে রাজি হচ্ছে। "

" আচ্ছা আমি একদিন পুরোপুরি ভালো হয়ে আপনার আফসোস কমিয়ে দিবো।

" সুদিন আসতে বহুদিন।"

"এটা অবশ্য সত্যি ।"

" এখন পুরোপুরি ভালো হয়ে যাও। তোমার নামে আমি গাড়ি বাড়ি সম্পত্তি সব লিখে দিবো কথা দিলাম ।"

সান্নিধ্য রিজওয়ান সাহেবের দিকে মুখ তুলে তাকায়। দু'হাতে বুকের সাথে ভাঁজ করে শীতল কণ্ঠে বলে,

" শেহরিনকে দিন শুধু। আমার যা সম্পদ আছে সেটা আপনার নামে লিখে দিবো কথা দিলাম।"

টানটান প্রতিত্তুরে, রিজওয়ান সাহেব হালকা কেশে উঠেন সান্নিধ্যের কথা শুনে। নিজেকে ধাতস্থ করে ভারী কন্ঠে বলেন, " দেখো বাবা ভালোবাসা ভালোলাগা এগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাহিরে থাকে। কিন্তু জোরপূর্বক কি কিছু হয়? "

" আমি অপেক্ষা করছি।"

" আত্মবিশ্বাস আছে নিজের প্রতি?"

" আছে।"

"গুড্। যাই হোক, তোমার মনে হয়তো প্রশ্ন এসেছে মেয়েই যেখানে রাজি নয় সেখানে বাবা এসেছে দেখা করতে। নিশ্চয়ই তাহলে পছন্দ হয়েছে। আর এগুলো জাস্ট এমনি বলছে টেস্ট করার জন্য ।

অ্যাকচুয়ালি, ইউ ক্যান থিংক হোয়াটএভার ইউ ওয়ান্ট । নো প্রব্লেম। তবে হ্যাঁ আমি তোমাকে পছন্দ করেছি তোমার সাহসী মন মানসিকতা দেখে। আমি কাপুরুষ পছন্দ করি না। আমার মেয়ের আমি ছাড়া পৃথিবীতে কেউ নেই। আমি হন্যে হয়ে খুঁজে চলেছি মেয়ের জন্য নির্ভরযোগ্য হাত। যে কিনা আমার অর্বতমানে তাকে ভালো রাখবে। তুমি কি ভেবেছো আমি শুধু মাত্র আমার মেয়ের কথা শুনে তোমার কাছে এসেছি? মোটেও নয়। তোমার বিষয়ে সমস্ত খোঁজ খবর আমার আগেই নেওয়া হয়ে গিয়েছে। জয়নাল শেখকে চিনো নিশ্চয়ই? "

"হ্যাঁ।"

" তোমাদের প্রতিবেশী। তোমার ব্যাপারে সমস্ত কিছু জেনে শুনে আমি কষ্টি পাথর যাচাই করতে এসেছি। "

সান্নিধ্য কতক সেকেন্ড নিষ্পলক চাহনিতে তাকিয়ে থেকে বলে, " যাচাই করে কি পেলেন?"

" ইট’স গোয়িং টু পজিটিভ ওয়ে।"

"থ্যাংকিউ।"

"কিন্তু এক্ষেত্রে একটা বিষয় আছে। শেহরিনকে তুমি প্রেশার দিবে না। ওকে সময় দাও তোমাকে বুঝতে। ও যদি বোঝে, অনুভব করে, তোমাকে ভালোবাসে, তাহলে আমি নিজে এক করে দিবো। কিন্তু প্লিজ তুমি তোমার ক্ষমতা কিংবা জোর দেখাবে না।"

সান্নিধ্য স্মিত হেসে জবাব দেয়,

"ধৈর্য্যের পরীক্ষায় আমি বরাবর শুন্য ছিলাম আংকেল। কিন্তু আপনার মেয়ের কারণে মনে হচ্ছে নিশ্চিত এ প্লাস পাবো।"

"তুমি এ প্লাস পেলে আমি মিষ্টি খাওয়াবো যাও।"

সান্নিধ্য ডান হাতে পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে নেয়। বসা ছেড়ে উঠে নিজ হতে হাত বাড়িয়ে দেয় রিজওয়ান সাহেবের উদ্দেশ্য। নির্মেদ স্বরে বলে ,

"ওকে ডিল ফাইনাল। "

"ডিল ফাইনাল।"

বিজ্ঞাপন
রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি গল্পটি মাহরিণ তৃণ-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও সামাজিক গল্প