রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি

পর্ব - ১৮

🟢

নব প্রভাতের শুরু । জানালার পর্দা গলিয়ে আসা নরম রোদ্দুর ছড়িয়ে রাখা হাতে আর মুখজুড়ে ঘটিয়েছে বিচরণ। সেই সাথে মৃদুমন্দ বাতাসে দোল খায় ঝুলিয়ে রাখা উইন্ড চার্ম। টুংটাং শব্দ ভেসে আসে কানে। কিন্তু শেহরিনের ঘুম তাতে কাটে না। বরং উল্টো দিকে মুখ ঘুরিয়ে আয়েশ করে ঘুমের দেশে পাড়ি দেয় রমণী।

কিন্তু সময় যে বড় পাষাণ। সে শোনে না কারো বারণ, না কারো নিষেধাজ্ঞা। আপন গতিতে সে ছুটে চলে তার গন্তব্যমুখে। সেই হিসেবে ঘন্টার কাঁটা পুরো এক চক্কর দিয়ে এসে ক্ষান্ত হয়ে আটটার ঘরে আশ্রয় নেয়। সঙ্গে সঙ্গে তীব্র শব্দে মুখোরিত হয়ে উঠে পুরো ঘর। এ্যালার্মের শব্দে দু'কানের দফারফা অবস্থা।

ধপ্ করে বিনা আড়মোড়ায় ঘুম থেকে উঠে বসে শেহরিন। অতঃপর কিছু সেকেন্ড 'থ' হয়ে বসে থেকে চোখ বড় বড় করে ঘুমের রেশ কাটাতে থাকে সে। হাত বাড়িয়ে কোনোমতে এলার্মখানা বন্ধ করে বেডসাইড হতে মোবাইলটা নিয়ে ক্লাস রুটিনটা চেক করে। আজ নয়টা হতে ক্লাস। হাতে সময় কিছু থাকলেও বাবার আদেশমতো নাস্তার ব্যবস্থা করতে হবে তাকে। নয়তো একটু পরেই ঢাকা হতে কল চলে আসবে। চিরুনি অভিযান চালিয়ে পিতা সাহেব তার সকালের নাস্তার খোঁজ নিবেন।

মুখের উপর এলোচুল গুলো দু'হাতে কানের পিছনে গুজে উঠে পড়ে সে বিছানা ছেড়ে। ওয়াশরুম হতে ফ্রেশ হয়ে পা বাড়ায় সোজাসুজি কিচেনের উদ্দেশ্য। ছোট ড্রয়িংরমের একপাশে রাখা ফ্রিজ হতে কয়েক স্লাইস পাউরুটি, একটা ডিম, আর একটা আপেল বের করে নেয়। প্যানে হালকা একটু বাটার দিয়ে পাউরুটিটা গরম করে, অল্প একটু লবণ ছিটিয়ে ডিম পোচ সেড়ে নেয়। আপেলটা কাটা শেষে প্লেটে সব গুলো নাস্তা সাজিয়ে গুছিয়ে চলে যায় তার রুমে। খুব সাধারণ রেসিপি। তবে, হেলদি। বাবার কথা রাখতেই আজকের জন্য এই সহজলভ্য আইটেম বেছে নিয়েছে । কাল হতেই সে হাশেম মামার দোকানে ছুটবে। তার লিস্টে সপ্তাহে চারদিন বাইরে নাস্তা করা হবে, বাকি তিনদিন বাসায়। তাও সেটা শুধু মাত্র বাবাকে দেখানোর জন্য। মন থেকে আর নয়।

" হু বাবা নাস্তা নিয়েই বসলাম।"

" সত্যি বলছো তো মা ?"

" ওকে। ভিডিও কল দিচ্ছি। ওয়েট। "

" আচ্ছা আচ্ছা এবার বিশ্বাস করলাম। কি কি আইটেম রেখেছো নাস্তায়?"

শেহরিন খেতে খেতে জবাব দেয়,

" ব্যাচেলরের আবার আইটেম বাবা। এইতো সেই ভাজা পাউরুটি, লবণ দিয়ে ডিম, আর শুকনো আপেল।"

মেয়ের মুখে নাস্তার আইটেম শুনে হালকা হাসেন রিজওয়ান সাহেব। বেচারা মেয়েটা যে তার তিক্তমনে এগুলো হজম করে যাচ্ছে সেটা সুস্পষ্ট। কিন্তু বাইরে থেকে প্রতিদিন তেল জাতীয় খাবার খাওয়াটাও ক্ষতিকর। তার চেয়ে একটু কষ্ট করে হেলদি খাবারটা খেলে শরীরটা অনন্ত ঠিক থাকবে।

" আচ্ছা নাস্তা শেষ করে তাহলে ভার্সিটিতে যাও। আর বুয়ার সাথে কথা হয়েছে সে দুপুরে এসে রান্না করে দিয়ে যাবে।"

"ঠিক আছে বাবা। রাখছি।"

বাবা মেয়ের দিনের শুরুতে স্বল্পক্ষণের কথোপকথন শেষ হয়। এরপরে আবার মধ্যাহ্ন বেলায় শিডিউল । ততক্ষণ পর্যন্ত যে যার কাজে থাকবে ব্যস্ত। শেহরিন নাস্তা চিবুতে চিবুতে ফোন দেখতে থাকে। তবে হুট করেই খাওয়ার মাঝে তার কিছু একটা মস্তিষ্কে এসে ভর করে। ফোন রেখে উঠে পড়ে তৎক্ষনাৎ। নাস্তার প্লেটটা বাম হাতে নিয়েই সে চলে আসে জানালার কাছে।

কাল দিনাবসান লগ্নে কোনো এক আগুন্তকঃ গোপনে এসে তাকে দিয়েছিলো চারটে গোলাপ। যারা কিনা আজ স্থান পেয়েছে তার নিজস্ব কামরায়, জানালার কার্নিশে। গোলাকার বিস্তৃত কাচের ওয়াটার পটটায় পানি দিয়ে যাদেরকে পুনরুজ্জীবিত করার মৃদু চেষ্টা এক লজ্জাবতী কায়ার। সে যতবার তাকায় গোলাপগুলোর দিকে, ততবার মনে হয় কেউ অপ্রকাশে, আকারে কিংবা ইঙ্গিত তার ভালোবাসাটা জাহির করছে। কেউ মৌন থেকে তাকে বোঝাচ্ছে ভালোবাসার প্রতীক গ্রহণ করে নিয়েছো, তবে মানুষ কেনো নয়?

শেহরিন নির্নিমেষ চাহনিতে চেয়ে থাকে ফুলগুলোর দিকে । মনের মাঝে খুঁজে চলে বাহানা ৷ কিন্তু সে ব্যর্থ হয়, সে পায়না খুঁজে কোনো কিছুই। তার শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ, মস্তিষ্ক জানান দেয়, তুমি এক স্নিগ্ধ ভালোবাসার দিকে মনের অজান্তেই পা বাড়িয়ে ফেলেছো রমণী। ভালো লাগা শব্দটা সেই মানুষটার সঙ্গে জুড়ে দিয়েছো। শুধু মাত্র ভয়,আতঙ্ক কিংবা আনমনায় এড়িয়ে চলতে চাইছো তাকে । অজস্র কারণ দেখাতে চাইছো। কিন্তু জানো কি মেয়ে, ভালোবাসা না বোঝে কারণ, না শোনে বারণ।

অতএব, বাহানা খুঁজে লাভ নেই।

" উহু নেতা সাহেবকে দেখলেই আমি চোখ বন্ধ করে আড়ালে লুকিয়ে যাবো। উনার দিকে তাকালেই ইদানিং আমার মনে হয় শ্বাসকষ্ট বাড়ে। কিন্তু আমার তো শ্বাসকষ্ট নেই। লোকটা নিশ্চয়ই সংক্রমক। দূরে থাকতে হবে।"

কলিংবেলের শব্দ হয়। প্রেমে পড়ার লক্ষণগুলোকে কাটিয়ে শেহরিন নাস্তার প্লেট রেখে ছোটে দরজা খুলতে।

" তুমি এখনও রেডি হওনি? সাড়ে আটটা পার হয়ে যাচ্ছে তো। ভার্সিটি যাবে না?"

" হ্যাঁ যাবো আপু্। সরি সময়ের দিকে খেয়াল ছিলো না। তুমি ভিতরে আসো প্লিজ। পাঁচ মিনিট লাগবে।"

নিতু ভিতরে প্রবেশ করতে করতে বলে,

" পাঁচ মিনিটে রেডি হতে পারবে? "

" কয়েক সেকেন্ড বেঁচেও যাবে আপু।"

শেহরিন ছোটে রেডি হতে। পাশের ইউনিটের দুটো মেয়ের মধ্যে নিতু আপুর সঙ্গে কালকে তার পরিচয় হয়েছে। আপু তৃতীয় বর্ষের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং সাবজেক্টে পড়ছে। আর সাথের আরেকটা দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে। কি সাবজেক্টে পড়ে সেটা জিজ্ঞেস করা হয়নি। কেবল তো এক দুদিন হলো এরপরে শুধু সাবজেক্ট কেনো পুরো জগৎ পর্ব গণ প্রজাতি সব জানা হয়ে যাবে একসাথে হলে।

একদম কাঁটায় কাঁটায় পাঁচ মিনিটের মধ্যে তৈরি হয়ে আসে শেহরিন। নিতু হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অবাক কন্ঠে বলে, "বাহ তুমি তো বেশ চটপটে মেয়ে। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই রেডি হয়ে এসেছো। আমার তো বেশ সময় লাগে।"

"আমার অভ্যাস আছে আপু।"

নিতু কক্ষ হতে বের হওয়া মুহুর্তে জানালার দিকে নজর দেয়। ওয়াটার পটের মধ্যে রাখা গোলাপগুলোর দিকে তাকিয়ে বলে,

" গোলাপগুলো তো সুন্দর লাগছে বেশ।"

কাঁধ ব্যাগটা রেখে ক্যাবিনেট হতে মাত্রই জুতা বের করতে উদ্যত হয়েছে শেহরিন। মাঝ পথে নিতু আপুর কথা শুনে সে হাত থামিয়ে ফিরে তাকায়। মুখে তার অসন্তুষ্টতার ছাপ পড়ে। ঘরের মধ্যে এতো সুন্দর সুন্দর জিনিস রেখে সেই গোলাপের দিকেই কেনো নজর দিতে হবে? প্লান্টগুলো কি দোষ করেছে? নাকি এটা এমপি সাহেবের দেওয়া জন্য আকৃষ্টতা এদিকেই বেশি। সব বেডির চোখ কি শুধু এমপি সাহেবের দিকে? অদ্ভুত !!

" একটু দেখি তো। গোলাপ ফুলের সুঘ্রাণ আমার বেশ ভালো লাগে।"

শেহরিন বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। নিতু ফুলগুলো ধরা মুহুর্তে দৌড়ে এসে বলে, " আপু আপু এটা ধরবে না। এটাতে পলেন আই মিন পরাগরেণু বেশি আছে। তুমি যদি স্মেল নাও সঙ্গে সঙ্গে হাঁচি কাশি শুরু হয়ে যাবে। "

নিতু শেহরিনের ছটফটানো ভাব দেখে আশ্চর্য চোখে তাকিয়ে বলে, " কিন্তু আমার তো ফুলে কোনে এলার্জি নেই। আর আমার জানা মতে, গোলাপ ফুল তো হাইপোঅ্যালার্জেনিক।"

" এটা বিদেশি জাতের ফুল। এটা থেকে যে হারে হিস্টামিন নিঃসৃত হয় আপু তুমি পাগল হয়ে যাবে যতই এলার্জি না থাকুক। তোমার ইমিউন সিস্টেমকে একদম দূর্বল করে দিবে।"

"থাক তাহলে দরকার নেই। কিন্তু এতেই যখন ক্ষতিকর তুমি এটাকে এতো যত্নে রেখেছো কেন? তোমার অসুবিধা হয় না?"

শেহরিন নিতু আপুর প্রশ্ন খানিকটা থতমত খেয়ে যায়। অকাট্য যুক্তি তো দেখালো বেশ এখন এটার জবাব দিবে কি করে সে?

" কি হলো শেহরিন?"

শেহরিন সজাগ দৃষ্টি মেলে। অতঃপর উদাসী গলায় বলে, " আসলে আপু.. আমরা কেনো জানি না ক্ষতিকর জিনিসের দিকেই পা বাড়াই বেশি। হোক সেটা ব্যক্তি কিংবা বস্তু !! "

"মানে?"

" এ এক কঠিন সমীকরণ। ও তুমি বুঝবে না । চলো যাই। লেইট হয়ে গেলো।"

_______________________________________

চুয়েটের মেইন গেট সংলগ্ন দাঁড়িয়ে আছে একটা সাদা রঙের কার। ভিতরে দু'জন মানুষ বসারত থাকলেও একজন গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পড়নে তার অফিশিয়াল পোশাক। চোখে সানগ্লাস মুখে কালো মাস্ক। ঘড়ি দেখে সে বেশ কিছুক্ষণ সময় যাবত অপেক্ষা করে চলেছে। আর তার এই অবসান সমাপ্তি ঘটে ঠিক যখন আটটা একচল্লিশ বাজে। শেহরিনের আগমন দেখে তার ঠোঁটে বাকা হাসির ঢেউ খেলে।

গল্প করতে করতে ভার্সিটিতে প্রবেশ করতে গিয়ে বাঁধাপ্রাপ্ত হয় শেহরিন। চোখ ঘুরিয়ে তার নাম ধরে ডাকারত ব্যক্তির দিকে তাকায় সে। দৈহিক অবায়ব দেখেই বুঝে যায় ব্যক্তিটা কে। কপালের ভাঁজ গুলো সঙ্গে সঙ্গে তার দৃশ্যমান হয়ে উঠে।

" ক্যান আই টেক আ মোমেন্ট? প্লিজ.. "

অচেনা ব্যক্তির কথা শুনে নিতু বুঝতে পারে শেহরিনের পরিচিত হয়তো কেউ। তাই মৃদু হেসে বলে, "আচ্ছা কথা বলে আসো। আমি যাচ্ছি।"

"শেহরিন। "

" আপনি এখানে কেন? কি দরকার? "

"রিলাক্স রিলাক্স। এতো হাইপার কেন হচ্ছো? আমি জাস্ট কথা বলতে এসেছি তোমার সঙ্গে। "

শেহরিন পাবলিক প্লেস দেখে নিজের কন্ঠ নামায়। আশেপাশে তাকিয়ে বলে, " সরি। আপনার সঙ্গে আমার কোনো কথা নেই। আর রাস্তাঘাটে এমনভাবে ডাকাডাকি করে নিজেকে ম্যানারলেস প্রমাণ করবেন না।"

তৌসিফ খানিকটা এগিয়ে আসে শেহরিনের দিকে্। মাস্কের আড়ালে ঠোঁটে তার বাঁকা হাসি তখনও বিরাজমান। নরম সুর তুলে বলে, "এতো রেগে আছো কেন ? দোষ তো তোমাদের ছিলো। আমাদের ডেকে নিয়ে অপমান করেছো। সে হিসেবে রাগ তো করার কথা আমার এবং আমার পরিবারের। কিন্তু দেখো আমি কিন্তু মোটেও রাগ করেনি। বরং তোমাকে নিজের করে পেতে আরে মরিয়া হয়ে উঠেছি।"

" এক্সকিউজ মি..?"

" শোনো, তোমার বাবা যতকিছুই বলুন না কেন, বিয়ে আমি তোমাকেই করছি। এতো সুন্দর শখের পুতুল কি করে হারাই বলো?"

" সিরিয়াসলি। আপনাকে দেখে আমার কেনে জানি মনে হয়, আপনি টাকা খাওয়া প্রশাসনের লোক। লাজলজ্জা কম আছে অনেক। কারণ টাকা খেতে গেলে তো লজ্জা রাখা যাবে না।"

" হেই শেহরিন..."

"প্লিজ.. আপনার আজেবাজে কথা শুনতে আমি ইচ্ছুক নই। আমার বাবা এই বিয়েতে কোনো মত দেয়নি। যা দেওয়ার আমি দিয়েছি। সে শুধু মাত্র আমার মতটা আপনাদেরকে জানিয়েছে এবং আমার জানা মতে, যথেষ্ট সম্মান এবং ভদ্রতা বজায় রেখেই মানা করেছে। সো, এতে অপমান হওয়ার কোনো কারণ দেখছি না আমি।"

তৌসিফ সরু চোখে শেহরিনের দিকে তাকিয়ে বলে, " তোমাকে প্রথম দিন দেখে মনে হয়েছে তুমি অ আ এর বাহিরে কিছুই জানো না। একদম নির্বোধ একটা মেয়ে। যে পাত্রে ঢালা যাবে সেই পাত্রেই আকার ধারণ করবে। বাট নাউ আই ক্যান ফিল, আই ওয়াজ টোটালি রং। তোমার জবান বেশ ধারালো। ছদ্মবেশ ধারণ করে থাকো নাকি? "

" আপনার কাছে যেটা ছদ্মবেশ আমার কাছে সেটা অ্যাটিটিউড। একজন অপরিচিত মানুষের সামনে প্রথম সাক্ষাৎই কেনো আমি নিজেকে তুলে ধরবো? এতো চিপ আমি? দুই ঘন্টায় যদি পুরোপুরি মানুষ চেনা যেতো, তাহলে পৃথিবী সবাই একদিনেই জয় করে ফেলতো।"

" দারুণ কথা শিখেছো। এগুলো কি তোমার সেই এমপি সাহেবের শেখানো বুলি নাকি? প্রেম চলছে? "

শেহরিনের গা জ্বলে উঠে। এই লোক আসলেই ভদ্রভাষা ডিজার্ভ করে না। প্রথম প্রথম সে একে ছাড় দিয়ে এসে যথেষ্ট ধৈর্য্যবানের পরিচয় দিয়ে এসেছে। কিন্ত এখন আর না..

" আপনার সাথে কথা বলার রুচি হচ্ছে না। ক্লাস আছে আমার।"

" বেশি বাড়াবাড়ির ফল কিন্তু ভালো হবে না। তোমার ক্লাস আছে। আমার অফিস নেই? আমি কি এখানে এসে জোক করছি? "

" আপনাকে আসতে বলেছে কে? ক্লিয়ারলি না করে দেওয়ার পরেও কেন আবার সেই প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন? "

" কারণ একটাই। তোমাকে আমার চাই এবং সেটা যেকোনোভাবে। এতো সহজে তো আমি ছাড়বো না। যেভাবেই হোক তোমাকে আমি বিয়ে করেই ছাড়বো। আজকে ওয়ার্ন করে গেলাম। আগামী দু চারদিনের মধ্যেই শুভ কাজ সম্পন্ন হবে। সো বি রেডি।"

শেহরিন ঘড়ির দিকে নজর দেয়। আটটা তেপান্ন বেজে গিয়েছে। ডিপার্টমেন্টে যেতে যেতে নয়টা বেজে যাবে শিউর। চোখ তুলে সে তিক্ত গলায় বলে, " অ্যাগ্রেসিভ ভাব দেখা যাচ্ছে আপনার মধ্যে। জোর করেই নিজের উদ্দেশ্য হাসিল করার চেষ্টা করছেন তো করতে থাকুন। দেখি কিভাবে আপনি শুভকাজ সম্পন্ন করেন। আমি ভয় পাই না।"

তৌসিফের কপালে জেগে ওঠে শিরা। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ক্রুর হাসি হেসে বলে, " ওকে চ্যালেঞ্জ অ্যাকসেপ্টেড। ডিরেক্ট বিয়ে করে বাসর হবে কিন্তু আগেই বলে রাখলাম। তোমার জিরো ফিগারের..

গালের উপরে শক্তপোক্ত এক চড় এসে পড়ে তৌসিফের। সঙ্গে সঙ্গে কথা থেমে যায় তার। চোখের সানগ্লাসটাও আধ খুলে যায়। ভিতরে বসে থেকে দু'জন মানুষ অবাক হয়ে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে।

শেহরিনের মুখোরেখায় অপার তেজ ফুটে উঠে। চোয়াল শক্ত করে সে হাতের আঙুল উঁচিয়ে বলে, " ডোন্ট শো টু মাচ কর্জ। নিজের সীমাবদ্ধতায় থাকতে শিখুন। আর পারলে চোখদুটো ডাস্টবিনে ফেলে আসুন। গার্বেজ ডিসপোজাল কোথাকার।"

এক মুহুর্ত সময় ব্যয় না করে সে সোজা ক্যাম্পাসের ভিতরে ঢুকে যায়। আশেপাশে মানুষজনও উৎসুক নজর ছেড়ে নিজ কাজে পা বাড়ায় । কিন্তু ঠাঁই হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে একজন। ইউএনও সাহেবের গালে চড়? তাও সেটা পাবলিক প্লেসে? অপমান আর হিংস্রতায় দগ্ধ হয়ে উঠে তৌসিফ। গর্জে উঠে সে," তোকে আজকেই আমি আমার খাঁচায় বন্দি করে ফেলবো। দেখবো তোর তেজ। এই চড়ের বদলা আমি সুদে আসলে মিটিয়ে ছাড়বো।"

" স্যার এমন ব্যবস্থা করবেন যাতে এই দেমাগি মেয়ের আপনাকে বিয়ে ছাড়া অন্য কোনো পথ খুঁজে না পায়। একদম চুনকালি লাগিয়ে ছাড়বেন ।"

" আমি লোকেশান পাঠিয়ে দিবো। সোজা সেখানে নিয়ে আসবি।"

" জ্বি স্যার। কোনো চিন্তা করবেন না। লোকজন সেট করে দিচ্ছি। ছুটিটা হতে দিন শুধু। একদম যথাসময়ে হাতে পেয়ে যাবেন।"

বিজ্ঞাপন
রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি বাংলা গল্প pdf সাহিত্য

বেলা দুইটা। প্রখর রোদ মাখা দিন। সূর্য একদম মাথার উপরে উঠে আছে আজ। গ্রীষ্মের দাবদাহ যেনো পিছুই ছাড়ছে না। কয়দিন হলো তো বৃষ্টিরও আভাস নেই।

কুইজ ক্লাস শেষ হ'য়েছে অনেক আগেই শেহরিনের। ঋতমাকে সঙ্গে নিয়ে কিছুক্ষণ সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে ঘুরাঘুরি করে দুটো বই কালেকশন করেছে সে। অতঃপর ক্যাফেটেরিয়া হতে কোল্ড কফি খেতে খেতে দু'জন রওনা দিয়েছে বাসার উদ্দেশ্য।

" তোমার একটা জিনিস আমি কালকে বেশ ভালোভাবে লক্ষ্য করেছি শেহরিন । বলবো?"

" অবশ্যই ।"

ঋতমা শেহরিনের দিকে তাকিয়ে ছোট ছোট চোখ করে তাকায়।সন্দেহমাখা কন্ঠে বলে, " কালকে এমপি সাহেবের বাসায় যখন আমরা যাই। তখন তুমি বেশ নার্ভাস ছিলে, লাইক হাত পা কাঁপছিলো তোমার যথারীতি। চোখদুটো তো ছানার মিষ্টি হয়েই ছিলো শুরু থেকে। কিন্তু...

"কিন্তু... "

" তুমি যখন বাগান থেকে ঘুরে এলে তখন তোমার হাসি হাসি চেহারা দেখে আমি ৪৪০ ভোল্টেজে শকড খেয়ে যাই। কোনো নার্ভাসনেস নেই একদম ক্লিয়ার। লাইক সিরিয়াসলি? এটা হতে পারে? যেনো মন হচ্ছিলো তুমি সত্যি তোমার শ্বশুর বাড়িতে বেড়াতে এসেছো।

সেই সাথে মুখে কেমন কেমন জানি লাজুক হাসি। প্রেমে পড়ার সময় মেয়েরা যে হাসি দেয় ঠিক সেরকম ...সত্যি বলোতো কাহিনী কি? বাগানে কি এমন ছিলো যেটা তোমাকে এমন হাসি এনে দিয়েছে? "

শেহরিন ঋতমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকায়। তার চেহারায় কি প্রেম প্রেম ভাবটা সত্যি ফুটে উঠেছে নাকি? ঋতমা কি তবে বুঝে ফেললো? সে হাজার না মানলেও তো বুঝতে পারছে তার মনটা একটু কেমন যেনো করছে কালকের পর থেকে। এক অন্যরকম অনুভূতি ঘিরে ধরেছে তাকে। চাইলেও দমাতে পারছে না সেটা। এটাকে আসলে কি বলবে কোনো সদুত্তর পায় না নিজেও।

" কি থাকবে? বা..বাগানে তো ফুলই থাকবে। আর ফুল দেখলে তো মানুষের মন এমনি ভালো হয়ে যায়। আমারও ভালো হয়ে গিয়েছিলো। আর ভয় করেছিলো না।"

ঋতমা জহুরির ন্যায় চোখের দৃষ্টি উঁচু নিচু করে বলে," হুহ, তোমার চেহারাতেই কেমন যেনো প্রেম প্রেম ভাব প্রকাশ পাচ্ছে। তুমি যখন বাগানে ছিলে তখনই নেতাসাহেব বের হয়ে গিয়েছে। আমরা যে বসেছিলাম একটু চোখ তুলেও তাকায়নি সেদিকে।

আমি শিউর, তুমি তাকে দেখেই একদম প্রেম সাগরে ডুব দিয়েছিলে এবং হাসি হাসি মুখ করে ভিতরে এসেছিলে। বলো সত্যি কি না.. বলো বলো !! "

" ওহহো ঋতমা। তুমি একটু বেশিই ভেবে ফেলছো...

" তাইতো বলবে মনা এখন। প্রেমে পড়লে মানুষ কত অজুহাতই যে দেখায়। কেবল তো শুরু...

শেহরিন আর কিছু বলে না। এই মেয়ে তার পিছনে লাগবেই। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে সব বের করবে। তার চেয়ে বলছে বলুক। সে শুনে যাক।

মেইন গেট পার হয়ে কিছুটা দূর একসাথে হেঁটে যায় তারা। সামনে হতে ঋতমা গাড়িতে উঠবে আর শেহরিন রোড পার হয়ে হেঁটে বাসায় চলে যাবে। কালকে মনে হয়েছিল কিছুটা দূর হয়তো রিকশা লাগবে কিন্তু বার দুই তিনেক যাতায়াত করার পর বুঝেছে হেঁটে যাওয়ারই পথ। রিকশার খুব একটা প্রয়োজন নেই্। আর মধ্যে দুপুরে এমনিতেও রিকশা পাওয়া কঠিন।

রোদের তাপে পথঘাট ফাঁকা প্রায়। গাছের পাতাগুলো নিষ্প্রাণ, কেবল মাঝেমাঝে হালকা বাতাসে দুলে উঠছে। নিঃশব্দ পরিবেশে হঠাৎ করেই গাড়ির তীব্র ইঞ্জিনের শব্দ পেছন থেকে ধেয়ে আসে। বড়সড় একটি সাদা গাড়ি রাস্তার ধুলো উড়িয়ে হুট করেই পাশে এসে থামে। ব্রেকের শব্দে শেহরিন ঋতমা চমকে পাশ ফিরে তাকায়। আর একটু হলেই যেনো গাড়ির চাকা তাদের গায়ে উঠে যেতো। আত্মায় কাঁপুনি ধরা মুহুর্তে গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে আসে তিন চারজন অচেনা মুখ, শরীরে কালো মাস্ক, চোখে হিংস্রতা নিয়ে।

" ঋ..ঋতমা.."

শেহরিনের গলা শুকিয়ে আসে। ঋতমার হাত চেপে ধরার আগেই খপ করে তাকে কেউ মুঠোবন্দি করে ফেলে। দু'জন মিলে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায় তাকে গাড়ির কাছে। চিৎকার করার আগেই কেউ একজন পিছন হতে মুখ চেপে ধরে তার।

ঋতমা দু'হাতে ছাড়ানোর চেষ্টা করে। কিছু বুঝে উঠার আগেই মাস্ক পরিহিত একজন তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয় পাকা রাস্তার মাঝে। ব্যাগসহ মুখ থুবড়ে পড়ে যায় সে। আশেপাশে দোকানের ভিতরে কিছু লোকজন ভীত নয়নে বের হয়ে আসতেই নিজেকে ধাতস্থ করে গলা ছেড়ে চিৎকার করে,

"প্লিজ একটু হেল্প করুন..ওরা.. ওরা।"

ঋতমার অস্পষ্ট ধ্বনির চিৎকারকে উপেক্ষা করে শেহরিনকে গাড়ির মধ্যে ঠেলে তোলে তিনজন মিলে। হাতের বই গুলো ছিটকে পড়ে তার মাটিতে। ভেসে আসে তীব্র গোঙানির আওয়াজ। অতঃপর চোখের পলকে ঝড়োবেগে চলে যায় গাড়ি। সেকেন্ডের কাঁটায় কি হতে কি হয়ে যায় বুঝে উঠতে পারে না কেউই।

দোকানের ধারে থাকা দুজন মানুষ এসে ঋতমাকে ধরে তোলে।

হাঁটু হাতের কনুই ছিলে রক্তে ভিজে উঠেছে তার্। চোখের চশমাটাও ভেঙে গুড়োগুড়ো।চোখে আতঙ্ক, গলা ভারী হয়ে আসে তার।

" আপনারা..আপনারা একটু সাহায্য করুন দয়া করে। আমার বান্ধবীকে ওরা তুলে নিয়ে গেছে। একটু প্লিজ..."

"আপা শান্ত হন। তাড়াতাড়ি পুলিশে খবর দেন।"

"আপনারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলেন একটু সাহায্য করলে কি খুব ক্ষতি হতো্? আমি এখন কি করবো? কোথায় যাবো?"

"ওনাদের কোমড়ে বন্দুক ছিলো। আগাইয়া গেলেই বুকে চালান দিয়া দিত। আর আশেপাশে দেখেন কোনো জীব জন্তু নাই। মানুষ বেশি থাকলে তাও একটা কথা হইতো।"

ঋতমা দৌড়ে যায় পড়ে থাকা ব্যাগের কাছে। হাত পা সমস্ত শরীর তার থরথর করে কাঁপছে। দিশাহীনভাবে সে খুঁজতে খুঁজতে মোবাইল বের করে। শেহরিনের বাবার ফোনে ফোন দেয় সে পরপর দুইবার। কিন্তু প্রত্যেকবারই ফোন ব্যস্ত দেখায়।

" আংকেল প্লিজ ফোনটা তুলুন আংকেল। "

ঋতমা ব্যর্থ হয়। কাঙ্ক্ষিত মানুষের কাছে ফোন না দিতে পেরে সে ছোটোমানুষের মতো ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে। যারা শেহরিনকে তুলে নিয়ে গিয়েছে তারা মাফিয়া পর্যায়ের। তারা যদি কোনো ক্ষতি করে ফেলে তাহলে...?

ঋতমার কান্না দেখে আশেপাশে চলন্ত গুটিকয়েক মানুষজন জমায়েত হয়। কি হয়েছে জানতে চাইলেই জনৈক দুজন লোক তাদেরকে বিস্তারিত বলেন।

" দিনের বেলায় ক্যাম্পাসের সামনে অপহরণ?? কি যুগ আসলো ভাই বলেন। এখন তো দেখছি রাস্তাঘাটে চলাচল করাটাই ভীষণ ভয়ের।"

" আপা আপনি কান্না কইরেন না। আপনাদের পরিচিত কাউকে ফোন দিয়ে লোকাল থানায় সরাসরি যোগাযোগ করতে বলেন। ঘটনা যেহেতু এখনই ঘটছে বেশি দেরি করা বোকামির হবে।"

"ভাই.. আমি এখানকার থানা কিছু চিনি না। আপনারা প্লিজ একটু কেউ আমার সঙ্গে যাবেন। প্লিজ.."

ঋতমার অনুনয়ে একে অপরে শুধু মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। কেউই তার সঙ্গে একমত হয় না। একেকজন নিজেদের মতো করে কারণ দেখিয়ে চলে যেতে থাকে। কেউ একজন যেতে যেতে বলে, "এসব থানা পুলিশের মধ্যে থাকতে চাই না। এমনি নানান ঝামেলায় বাঁচি না। কি না কি হয়েছে। থাক্ বাবা।"

ঋতমার মাথা সমানে ঘুরছে। এতোটা অসহায়ত্ব দুর্দিন কিংবা দুঃসময় তার জীবনে কখনো আসেনি। আজ মনে হচ্ছে চারপাশ তার নিঃস্ব, অন্ধকার। কেউ নেই একটুখানি এগিয়ে আসার। তবে কি সাহায্য করার মানুষ বিলীন হয়ে গিয়েছে পৃথিবী থেকে?

" আপা আপনার পরিচিত আশেপাশে কেউ নেই?"

"পরি..পরিচিত কেউ?"

" বাড়িতে খোঁজ পাঠান।"

পরিচিত কেউ বলতে তো শেহরিনের বাবা মামা মামি এর বাইরে কেউ নেই। আংকেল তো ফোন ধরছেন না, শেহরিনের মামা মামির ফোন নাম্বারও তার কাছে নেই। আর এখান থেকে খুলশীও তো বেশ দূরে। যাবে কখন সে?"

ঋতমার উদভ্রান্তের ন্যায় ভাবনা লগ্নে হুট করেই তার মস্তিষ্কে এসে খেলে নেতাসাহেবের কথা। সঙ্গে সঙ্গে তার শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বেয়ে যায়।

"আমি.. আমি এতো বোকা কেন? শেহরিনের তো নেতাসাহেব রয়েছে। নেতাসাহেব ঠিক পারবে শেহরিনকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে।"

শেহরিন মালয়েশিয়া যাওয়ার পর তার বিষয়ে খোঁজ খবর নেওয়ার জন্য নেতাসাহেব যে ফোন নাম্বার দিয়ে যোগাযোগ করেছিলো সেই নাম্বার কললিস্ট ঘেঁটে বের করে ঋতমা। সে জানে এটা নেতাসাহেবের নাম্বার নয়। সে কখনোই ব্যক্তিগত নাম্বার দিয়ে ফোন করবে না। কিন্তু সহযোগী কিংবা পিএ এর নাম্বার তো নিশ্চিয়ই হবে্। কোনোভাবে খবরটা পাঠালেই হলো।

এক বার রিং শেষে দুবার রিং এর শুরুতেই অপর পাশ হতে কল রিসিভ হয়। ঋতমা কন্ঠস্বর শুনেই বুঝতে পারে এটা নেতাসাহেব নয়। নিজের অবরুদ্ধ ভঙ্গুর কন্ঠ ঠেলে সে বলে উঠে, " ভাইয়া আমি ঋতমা শেহরিনের ফ্রেন্ড। "

"জ্বি বলুন।"

"শেহরিনকে কিছুক্ষণ আগে একদল লোক এসে ক্যাম্পাসের সামনে থেকে উঠিয়ে নিয়ে গেছে। আপনি প্লিজ একটু ভাইয়াকে ইনফর্ম করুন। আমি একা একা বুঝতে পারছি না কি করবো। প্লিজ ভাইয়া আমি খুব অসহায়।"

"আপনি যেখানেই আছেন ওখানেই থাকুন। আসছি।"

আসিফ দ্বিতীয় কোনো টু বাক্য না করে ফোন কেটে দেয়। দেড় মিনিটের মাথায় দু তিনজনকে সঙ্গে নিয়ে সে চুয়েটের উদ্দেশ্য রওনা হয়।

"হ্যালো। আসসালামু আলাইকুম সরফরাজ ভাই।"

" ওয়ালাইকুমুস সালাম। বড় ভাইয়ের কথা মনে পড়লো?"

"ভাই শেহরিন ভাবিকে কোন জানোয়ারের বাচ্চারা যেনো তুলে নিয়ে গিয়েছে ক্যাম্পাসের সামনে থেকে। ভাই তো এখন সার্কিট হাউজে মিটিং এ আছে। ফোন রিসিভ করবে না। আপনি একটু চিফ স্টাফকে ফোন দেন। ভাইকে জানান প্লিজ।"

অফিস রুমের চেয়ার হতে উঠে দাঁড়ায় সরফরাজ। বিস্ময়কর কন্ঠে বলে, " বলো কি? কখন?"

"একটু আগেই। আপনি সান্নিধ্য ভাইরে বলেন। "

সরফরাজ দ্বিধা দ্বন্দ্বে পড়ে যায়। সে চাইলেই এখন সান্নিধ্যকে জানাতে পারবে। কিন্তু ভাই তো তার সুবিধার না। এই কথা যদি শুনে তাহলে একদম সব তোলপাড় করে ছাড়বে। আজকের মিটিংটা সব উপপর্যায়ের নেতা মন্ত্রীদের নিয়ে হচ্ছে। এর মাঝে যদি এখন সে খবর দেয় তাহলে মিটিং এর দফারফা তো করবেই সাথে যেই তাকে বাধা দিতে আসবে তাকে সোজা হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে ছাড়বে। এটা সে নিশ্চিত। এর মাথা গরম হলে দিন দুনিয়া এক করে ছাড়ে। ভালোর ভালো কিন্তু মন্দের সেরা। তারউপরে বিষয়টা যখন শেহরিন। যে কিডন্যাপ করছে তাকে তো মার্ডার করেই ছাড়বে।

সরফরাজ খানিক সময়ের আগাম চিন্তা ভাবনা বাদ দিয়ে সান্নিধ্যকে জানান দেওয়াটা ছেড়ে দেয়। ছয় সাতটা মার্ডারের সাথে ইতিমধ্যে সে জড়িত। এর মাঝে নতুন করে কিছু হলে জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে যাবে। আর সে বড় ভাই হয়ে ছোট ভাইয়ের জীবনটাকে এভাবে নষ্ট হতে দিবে না। এতোকাল সমস্ত কোটকাচারি মামলা মোকদ্দমা সব সে সামলে এসেছে। সান্নিধ্যকে সকল পুলিশ কাস্টডির আঁচ হতে বাঁচানোর পিছনে এক সরফরাজ চুপ করে লড়াই করে যাচ্ছে সবসময় ।

" ওকে ওকে যা ব্যবস্থা নেওয়ার আমি নিচ্ছি। আমি আশেপাশেই আছি। এক্ষুনি আসছি।তুমি লোকেশান সেন্ট করো।"

ঘড়ির কাঁটায় ৫:৪৫

প্রায় পাঁচ ঘন্টার কাছাকাছি সময় ধরে পাহাড়তলী থেকে শুরু করে বাকলিয়া পর্যন্ত খোঁজ চালানো হয়। প্রত্যেকটা থানায় ইনফর্ম করা হয় জরুরি ভিত্তিতে নিখোঁজ ব্যক্তিকে উদ্ধার করার জন্য। পুলিশ প্রাথমিক তদন্ত সাপেক্ষে মাঠ নেমে দীর্ঘ সময় ধরে খোঁজ চালিয়েও কোনো তথ্য পায়না। পাঁচলাইশ উপজেলায় আসিফের ছড়ানো লোকজন বিকেল পাঁচটায় সরফরাজকে জানায়, এদিকে কোনো গাড়িবহরই প্রবেশ করেনি। তারা বাটালি হিল পুরো তন্নতন্ন করে খুঁজেছে।

ঘামে ঝরা শরীর, উদ্বিগ্ন চোখের চাহনি। তপ্ত রোদে টানা তিনঘণ্টা নিরলস পরিশ্রমেও ব্যর্থ হয়ে উঠে সরফরাজ। তিক্ততার সহিত সে গর্জন তুলে তার লোকজনকে হুংকার ছাড়ে পুরো চট্টগ্রাম খুঁজে বের করতে ।

" ভাই এভাবে হবে না। যারা কিডন্যাপ করেছে তারা পাকা খেলোয়াড়। চেকপোস্টে পুলিশকে টাকা খাইয়েছে। পুরো চট্টগ্রাম খুঁজলেও সম্ভব না্। পাঁচঘন্টা পার হয়ে যাচ্ছে।"

" পাঁচঘন্টা হয়ে যাচ্ছে। এদিকে যেহেতু নেই তাহলে থানচি যাওয়ার সম্ভবনা বেশি।"

"এতোক্ষণে থানচি পৌঁছানো সম্ভব নয়। বাট অন দ্যা ওয়ে হতে পারে। সবকিছুই অনিশ্চিত। "

"কাম অন আসিফ্। নিশ্চিত অনিশ্চিত পরে দেখা যাবে। "

"থানচি যাবেন এখন?"

"উপায় নেই। যেতেই হবে।"

সরফরাজ গাড়িতে উঠা মুহুর্তে আসিফ নিষ্প্রাণ কন্ঠে বলে, " ভাবির যদি কোনো ক্ষতি হয়ে যায় এই দায়ভার কিন্তু আমাদের উপর এসে পড়বে। সান্নিধ্য ভাইকে জানান। ভাইকে ছাড়া সম্ভব না। সারাজীবন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকতে হবে কিন্তু যদি ভালো ছেড়ে মন্দ হয়।"

সরফরাজ থমকে দাঁড়ায়। আসিফের কথাটা তার মস্তিষ্কে নাড়া দেয়। সান্নিধ্য শেহরিনকে কতটা ভালোবাসে এটা তার চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। যদি সত্যি এমন কিছু হয়ে যায় যার কারণে...

সরফরাজ ভাবতে পারে না কিছু আর। আলতোভাবে মাথা নাড়িয়ে সে গাড়িতে উঠে বসে। আবার তার জন্য নতুন এক চ্যালেঞ্জ এসে দাঁড়ালো। আবার সম্মুখীন হতে হবে সেই সময়ের।

বিজ্ঞাপন
রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি গল্পটি মাহরিণ তৃণ-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও সামাজিক গল্প