রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি

পর্ব - ২২

🟢

|ক্যাফে মিকাডো, বেলা সাড়ে বারোটা |

মধ্যাহ্ন বেলায় ক্যাফে রেস্তোরাঁয় মানুষের আনাগোনা অন্য সময়ের চেয়ে তুলনামূলক কম থাকে। বেশ নিরিবিলি শান্ত পরিবেশ বজায় থাকে চারপাশটাতে । এদিক থেকে নেতা সাহেবের একটু সুবিধাই হয়েছে আজ। যত লোকজনের সমাহার কম, তার জন্য তত ভালো। কেননা সিকিউরিটি ছাড়া চলতে গিয়ে অনেক কিছুই মেইনটেইনে রাখতে হয় তাকে। এর উপরে তো আবার পুরো চট্টগ্রাম জুড়ে জায়গায় জায়গায় তার শত্রু দিয়ে বিছানো।

শেহরিনকে বসার জন্য চেয়ার টেনে দিয়ে অতঃপর নিজ আসনে বসে সান্নিধ্য । সবসময় পায়ের উপর পা তুলে বসার অভ্যাস থাকলেও কতিপয় দু একজন মানুষের সামনে সেই অভ্যাস হতে বিরত থাকে নেতাসাহেব । এর মধ্যে বিশেষ একজন তার সামনে বসা। যার কারণে সেটা এড়িয়ে সু কায়দায় সুস্থির হয়ে বসে সে।

" ব্ল্যাক কফি অর এস্প্রেসো? "

" কোল্ড কফি।"

সান্নিধ্য একটা ব্ল্যাক আর একটা কোল্ড কফির অর্ডার দিয়ে মুখ হতে মাস্ক খুলে ফেলে। হাতে থাকা ফোনটা সুইচ অফ করে শেহরিনের দিকে দৃষ্টি মেলে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে, "কেমন আছো? "

" ভালো। "

" তোমার হাতের এখন কি অবস্থা? ব্যথা আছে কি? "

সাতদিন পর হাতের খোঁজ নিতে আসা নেতাসাহেবের প্রশ্নে অভিমান জমায় মনে শেহরিন। সেই সঙ্গে কিঞ্চিত রাগও এসে যোগ হয়। ব্যাটা সাতদিন নিখোঁজ থাকার পরে আজকে এসেছে হাতের খোঁজ নিতে। এতোদিন মনে পড়েনি? এতোদিন লাপাত্তা হয়ে কোন দেশে পাড়ি জমিয়েছিলো শুনি। সে কি জানে এই সাতদিন নাজুক লতিকার কিভাবে দিন কেটেছে? হসপিটালে সেই যে বুকে ঝড় তুলে দেওয়া যত্ন করে লাপাত্তা হয়ে যাওয়ার ভার সামলাতে গিয়ে কত হিমশিম খেতে হয়েছে তাকে ।

" আপনি কি জানেন আপনি মাইন্ড গেইম খেলতে বেশ দক্ষ।"

" হুম জানি।"

" স্বীকারও করছেন? "

সান্নিধ্য ম্যাডামের কন্ঠে কিঞ্চিৎ অভিমানী সুর শুনে ঠোঁট উল্টে হাসে। নির্মেদ স্বরে বলে, " অস্বীকার করা উচিত ছিলো?"

" ভালো সাইকোলজিক্যাল ম্যানিপুলেশান ও করতে পারেন আপনি।"

"অপরাধটা কি?"

" কিছু একটা হয়তো।"

" মাঝখানে সাতদিন তোমার সাথে দেখা হয়নি জন্য?"

শেহরিন চোখ নামিয়ে নেন সান্নিধ্যের হতে। সামনে রাখা ব্যাগটার উপরে সুতোয় কাজ করা নকশা গুলোকে আঙুল দ্বারা নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে বলে,

" এতো সামান্য কারণে কি আর অপরাধ হয় নাকি। আফটার অল নেতা মানুষ আপনি। চারদিকে খেয়াল রাখতে রাখতে হয়তো ভুলেই গিয়েছিলেন।"

সান্নিধ্য চেয়ারে খানিকটা হেলান দিয়ে ডান হাত মুঠো করে থুতনির নিচে রাখে। ঠোঁটের কোণে তার মৃদু হাসির রেশ। ম্যাডামের মনে অবশেষে তার জন্য শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তাহলে। এই সাতদিন সে ইচ্ছাকৃতভাবেই দেখা দেয়নি। শেহরিনের ধারণা সঠিক। সাইকোলজিক্যাল ম্যানিপুলেশনে পুশ এ্যান্ড পুল কৌশলটা সে অবলম্বন করেছে। এবং মনে হচ্ছে এটা করে সে সফল।

" সেরকম কিছু নয়। আমি গেলে তুমি হয়তো হেজিটেড ফিল করতে সেজন্য আর কি। বাই দ্যা ওয়, মিস্ করেছো আমাকে? "

শেহরিন সামান্য কপাল ভাঁজ করে। সান্নিধ্যের ধূর্ত দৃষ্টির ফাঁদে পা না দিতে সে চোখ তুলে তাকায় না তার দিকে। কারণ ওই দৃষ্টির মাঝে আটকা পড়লে আরো দূর্বল হয়ে পড়বে। হয়তো মুখ ফস্কে সত্যিটাও বলে ফেলবে । তবে, এতো সহজে তো সে স্বীকারোক্তি দিবে না।

" প্রশ্নই আসে না৷ আপনাকে কেনো মিস্ করবো আমি।"

" আর ইউ শিউর? "

" হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিউর।"

" ওকে। তাহলে তো আর কোনো পিছুটানই থাকলো না। এমনিতেও কয়টাদিন পরে আমাকে আবার লং টাইমের জন্য নিরুদ্দেশ হতেই হতো।"

আবারো নিরুদ্দেশ কথাটা শুনে শেহরিন নিজের দৃষ্টির জড়তা কাটায়। চোখজোড়া আলতো করে তুলে সে সামনে বসা ব্যক্তির ধারালো চোখে প্রতিস্থাপন করে। অতঃপর শীতল কণ্ঠে বলে, " এক্সকিউজ মি, এমপি সাহেব। আমি বোকা নই । মাইন্ড গেইম শুধু আপনি নন আমিও খেলতে জানি। আপনি নিরুদ্দেশ হন সমস্যা নেই। আমিও টেকনিকটা ফলো করতে পারি। ঠিক যেমন মালয়েশিয়া গিয়ে আপনাকে সারপ্রাইজ করে দিয়েছিলাম।"

শেহরিনের মালয়েশিয়া গমনের সেই দিনগুলো মনে হতেই সান্নিধ্য নিজেকে নিয়ন্ত্রণের বেড়াজালে টেনে আনে। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে,

" এসবের কি দরকার শেহরিন। সমঝোতায় আসি তার চেয়ে বরং। "

ঠোঁটের কোণে বক্স হাসি দুলে যায় শেহরিনের। ভ্রু জোড়া উঁচিয়ে নেতাসাহেবের দিকে তাকিয়ে বলে, " এতো তাড়াতাড়ি? "

সান্নিধ্য সরু চোখে তাকিয়ে স্মিত হেসে বলে, " গাইডলাইন ভালো তোমার। ম্যাচুউরিটি, পার্সোনালিটি, প্রেজেন্স অফ মাইন্ড যথেষ্ট স্ট্রং । "

" ধন্যবাদ। তবে, এতো অল্পতেই আই মিন এক মালয়েশিয়ার কথা শুনেই সারেন্ডার করে দিলেন? "

" সারেন্ডার নয় সহজ স্বীকারোক্তি এটা। যেটা তুমি করছো না।"

দু'জনের চলমান ঠান্ডা মস্তিষ্কের যুদ্ধের মাঝে ওয়েটার আসে কফি নিয়ে। ফলে সংঘটিত হয় খানিক সেকেন্ডের বিরতি। সান্নিধ্য শেহরিনকে কফি সার্ভ করে দিয়ে বলে, " ধরতে পারবে?"

" সমস্যা নেই পারবো।"

" এখন কি হাতটার অবস্থা দেখতে পারি?"

" উহু পানিশমেন্ট স্বরূপ সাতদিন পর।"

সান্নিধ্য নিজ কফিতে হালকা সিপ টেনে টেবিলে রাখে। অতঃপর ঠান্ডা গলায় বলে, " তাহলে স্বীকার করছো আমার না আসাটা তোমার মনে ইফেক্ট ফেলেছে। আই মিন তুমি চেয়েছো আমি আসি। বাট ভালোবাসাটা স্বীকার করছো না শুধু তাইতো? "

শেহরিন সান্নিধ্যের সরাসরি প্রশ্নে খানিকটা দমে যায়। নেতাসাহেবের প্রতি তার যে ভালো লাগা সৃষ্টি হয়েছে সেটা মুখে স্বীকার করা তার জন্য ভীষণ কঠিন। কারণ সে যদি স্বীকার করে এই লোক তাহলে তাকে লজ্জায় ডুবিয়ে ছাড়বে। মুখ লুকানোর জন্য কিছু খুঁজে পাবে না তখন।"

"প্রশ্ন পরিবর্তন করুন। "

" ১-১ সমতা থেকে তাহলে কিন্তু ২-১ হয়ে যাবে কিন্তু ।"

" আমি কোনো গেম খেলছি না। "

" তোমাকে আমি প্রশ্ন করেছি সেটার উত্তর তুমি দিতে পারছো না তাহলে সেটা হেরে যাওয়া না? "

" আপনি অনেক ধূর্ত মস্তিষ্কের মানুষ।"

সান্নিধ্য ঠোঁট চেপে মাথা নাড়িয়ে বলে, " সহজ প্রশ্ন করলে মানুষ আমাকে এটাই বলে।"

" মোটেই সহজ প্রশ্ন নয়। অপশনাল কিছু আনুন।"

" আমার দিকে তাকাও তাহলে। "

শেহরিন চোখ নামিয়ে নেয় সঙ্গে সঙ্গে।বাম হাতের নখ খুঁটতে খুঁটতে বলে, " এটা আরো অসম্ভব। তবে, আপনার বোঝা উচিত আমি কেনো শান্তিচুক্তি করতে এসেছি আপনার সঙ্গে। হিন্টস হিসেবে নিচ্ছেন না কেনো? "

" স্বীকারোক্তির পরে শান্তিচুক্তি করতে হয়।"

" সবসময় সবকিছু মুখে প্রকাশ করে বোঝাতে হয় না। আমি স্বশরীরে এখানে উপস্থিত এটাই কি যথেষ্ট নয়?"

" আমার দিকে তাকাচ্ছো না কেনো তাহলে?"

" আপনি অন্যদিকে তাকান আমি তাকাচ্ছি ।"

" শেহরিন।"

" আপনি আসার পর থেকে এ পর্যন্ত অন্যদিকে এক সেকেন্ডের জন্যও চোখ সরাননি।"

" তুমি বুঝলে কি করে? "

" বোঝা যায়।"

সান্নিধ্য কিঞ্চিৎ হেসে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, " আমার চোখ সরবে না স্বীকারোক্তি না নেওয়া পর্যন্ত।"

" মানুষ তো নূন্যতম লজ্জাও পায়। আপনি কি সেটাও পান না? "

" আমরা যারা রাজনীতি করি তারা লজ্জা সাইডে রেখে চলি। লজ্জা নিয়ে চললে রাজনীতি করা যায় না।"

" নিশ্চয়ই এটা রাজনীতি নয়। "

" প্রেমনীতি বলছো?"

শেহরিন হার মেনে যায়। যতই সে কাটানোর চেষ্টা করুক না কেনো ঘুরেফিরে সে এক জায়গাতেই এসে দাঁড়াতে হচ্ছে। এই চতুর মস্তিষ্কের লোকের সঙ্গে তার একদম সমানে সমানে লড়াই করা কঠিন। গভীর দীর্ঘ শ্বাস ফেলে সে। একরোখা ব্যক্তির দিকে অবশেষে চোখ তুলে তাকায়। আর সে চোখ তুলে তাকানোর সঙ্গে সঙ্গে সান্নিধ্য তার দিকে এমনভাবে তাকায় যে লজ্জায় কুঁকড়ে নিস্তেজ হয়ে উঠে । স্বীকারোক্তি না দিয়েই এই লোক তার বুকে রক্ত ক্ষরণ বইয়ে দিচ্ছে। স্বীকারোক্তি দিলে তো একদম লজ্জায় মেরেই ফেলবে।

" ওকে রিলাক্স রিলাক্স। এতো লজ্জা পেতে হবে না। আপাতত নিরবতাকে সম্মতির লক্ষণ ধরে নিয়েই শান্তিচুক্তিতে আসি আমরা।"

শেহরিন ঠোঁটের উপর ঠোঁট চেপে নিজেকে শান্ত করে। ধাতস্থ স্বরে বলে, " শান্তিচুক্তিতে আপনার কোনো মতামত আছে কি? "

"তোমারটা শুনি আগে।"

শান্তিচুক্তির প্রথম বাক্য উচ্চারণ করতে উদ্যত হয় শেহরিন। কিন্তু উচ্চারণ করার আগে মুহুর্তে বাঁধা প্রাপ্ত হতে হয় তাকে। পাশ হতে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ পুরুষের হঠাৎ আগমন হয় তাদের মাঝে।

" এমপি সাহেব। একটু কথা বলা যাবে? "

সান্নিধ্য বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। বয়োজ্যেষ্ঠ লোকটাকে সে নিজে ও চেনে না। তবে জনসাধারণ তাকে চিনবে এটা স্বাভাবিক। আলতো হেসে হ্যান্ডশেক করে সে তার সঙ্গে ।

" আপনাকে সামনাসামনি দেখতে পেয়ে ভালো ভীষণ লাগছে। কখনো যে এমন সুযোগ পাবো ভাবতে পারিনি। টু বি অনেস্ট আপনার কাজ আমাদের ভীষণ ভালো লাগছে। এতো বছর যে জনদূর্ভোগের মধ্যে ছিলাম বলার বাহিরে। এক বছরের মধ্যেই যে কালভার্টটা নির্মাণ করে দিতে সক্ষম হবেন সেটা আমরা কল্পনাও করিনি। অথচ এর আগে বছরের পর বছর দিনের পর দিন এর জন্য অ্যাপ্লিকেশন দিয়ে দিয়ে শুধু হয়রানি হয়েছি। থ্যাংকিউ সো মাচ এমপি সাহেব। আপনার চলমান কাজগুলোও প্রশংসাযোগ্য।"

" ধন্যবাদ। এটা আমার দায়িত্ব ।"

"সঠিক । সরি ডিস্টার্ব করার জন্য। আসলে আপনাকে দেখে কথা না বলে থাকতে পারছিলাম না। সিকিউরিটি থাকলে হয়তো সম্ভব হতো না। এজন্য আর কি সুযোগটা মিস্ করতে চাইনি।"

" ইট’স ওকে। নো প্রব্লেম।"

" ঠিক আছে ভালো থাকুন। আরো ভালো ভালো কাজ করুন।"

বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিটা হাসিমুখে কুশলাদি বিনিময় করে প্রস্থান নেয়। সান্নিধ্য নিজ আসনে বসা মুহুর্তে আবারো দু'জন রমণী তার দিকে আসা দেখে থেমে যায় সে।

" এক্সকিউজ মি স্যার। আমরা কি একটু সময় নিতে পারি?"

সান্নিধ্য আঁড়চোখে শেহরিনের দিকে তাকিয়ে ধীর কন্ঠ বলে,

"এনি প্রব্লেমস? "

" আমরা চট্টগ্রাম গভমেন্ট গার্লস কলেজের স্টুডেন্ট। আপনি গত কাল আমাদের কলেজে এসেছিলেন অনুষ্ঠানে। "

এক রমণী থামতেই অপর রমণী মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থেকে বলে,

" আসলে কালকে আপনার সঙ্গে আমাদের অনেক ফ্রেন্ডস ছবি তুলেছে। আনফরচুনেটলি আমরা যখন কলেজে পৌঁছাই তখন শুনি আপনি চলে গিয়েছেন ইতিমধ্যে । আপনার সঙ্গে দেখা করার ভীষণ ইচ্ছে ছিলো। আজকে সেটা এভাবে পূরণ হবে অবিশ্বাস্য লাগছে। এনিওয়ে, আমরা কি একটা ছবি তুলতে পারি আপনার সাথে ভাইয়া?"

সরাসরি স্যার থেকে ভাইয়া গমন হতেই শেহরিন চোখ তুলে তাকায়। দুটো রমণীর এমপি সাহেবের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত ভাব দেখে তার মেজাজের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। এমপি সাহেবের দিকে সরু চোখে এক ঝলক তাকিয়ে সে দৃষ্টি সরিয়ে আনে।

বেচারা নেতাসাহেব পড়ে যায় বিপাকে। তার কাছে নারী মানেই কেনো জানি বিপদ মনে হয়। কি দরকার ছিলো এখনই ছবি তুলতে আসার। তার ম্যাডাম যে জেলাসি নামক কঠিন অসুখে ভুগছে এটা তার মুখোরেখা দেখা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু এদের না করাটাও মুশকিল।

" ওকে।"

দু'জন রমণী উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠে এমপি সাহেবের হতে পজিটিভ সাইন পেয়ে। ক্যামেরা অন করে তারা কাছাকাছি এসে দাঁড়াতেই সান্নিধ্য নিজ হতে মাঝখানে বেশ খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়ায়। দুটো ছবি তোলা হতেই শান্ত গলায় বলে, " ওকে থ্যাংকিউ।"

রমণী দুটোর ইচ্ছে ছিলো আরো কয়েকখানা ছবি উঠার। কিন্তু মাঝপথে নেতাসাহেবের কথায় তারা ফোন নামিয়ে ফেলে। লাজুক হাসি টেনে বলে, " ভাইয়া আমাদের ১৮ বছর হলে যখন ভোট দিতে যাবো তখন আপনাকেই ভোট দিবো। কারণ আপনি অনেক হ্যান্ডসাম।"

সান্নিধ্য মেয়েদুটোর কথা শুনে পারে না বিষম খেতে। নিজেকে ধাতস্থ করে কোনমতে ঠোঁট প্রসারিত করে বিদায় জানায় তাদের। কিন্তু অল্প বয়সের এই মেয়েদুটোর ভোট দেওয়ার লজিকটা তাকে ভাবিয়ে তোলে মুহুর্তেই।

" বাহ ভোট আদায় করে নেওয়ার দারুণ টেকনিক। "

" বাচ্চা মেয়ে। বয়স অল্প। "

" না ভালোই আছে। খারাপ কি? সেজেগুজে গার্লস স্কুল, গার্লস কলেজগুলোতে বেশি বেশি ক্যাম্পেইন করবেন। ভোটের লড়াইয়ে এরাই আপনাকে জিতিয়ে দিবো।"

সান্নিধ্য শেহরিনের বাঁকা কথায় পারে না হাসতে। ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি রেখে সে মৌনতা অবলম্বন করে । একপাশ ভীষণ উত্তাপ সুতরাং তার ঠান্ডা থাকাটা জরুরি।

" বাইরে কোথাও যাবে? "

শেহরিন বুকের সাথে হাত দুটো আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে সান্নিধ্যের চোখে চোখ রাখে। শক্ত গলায় বলে, " না এখানেই থাকি্। সুন্দর সুন্দর রমণীগণের কারণে যদি আপনার ভোট সংখ্যা বাড়ে তাহলে তো একদিক থেকে ভালোই হয় তাই না? ক্ষতি কি? "

" হান্ড্রেড বাই হান্ড্রেড জেলাসি ফিল করছো অথচ স্বীকারোক্তি দিচ্ছো না। অবিচার, অনাচার করে যাচ্ছো তুমি আমার প্রতি।"

" যেটুকু স্বীকারোক্তি দিতে চেয়েছিলাম এখন আরও দিবো না। আসার পথে একজনের দীর্ঘ আলাপে শুনে এলাম বিয়েই করে ফেলছেন আপনারা। আবার এখানে এসে রমণীদের পাল্লা। সব ধৈর্য্য কি আমি একাই নিয়ে চলবো? "

সান্নিধ্য শেহরিনের দিকে কিঞ্চিত এগিয়ে আসে। শীতল চোখে তাকিয়ে বলে, " ধৈর্য্যের পরীক্ষা আমি বেশি দিয়ে চলেছি ম্যাডাম। আমার ধৈর্য্যটাও বিবেচনা করুন। আপনার থেকে 'হ্যাঁ' শোনার অপেক্ষায় আমি এখনও স্থির হয়ে আছি একই জায়গায়।"

শেহরিন খানিকটা মনের ভিতরে আগুন দমায় নেতাসাহেবের কথা শুনে। নিরেট স্বর ভেদ করে বলে, " এসব বাচ্চা বাচ্চা মেয়েদের থেকে দূরে থাকবেন।"

" ওকে সমগ্র বাচ্চা বাচ্চা মেয়ে থেকে ওল্ড এইজের মেয়ে নিষিদ্ধ। শুধু মাত্র আপনি অনুমোদিত।"

" ঠিক আছে বিশেষ বিবেচনায় শান্তি চুক্তি করতে রাজি হলাম। আমার বেশ কিছু কথা আছে।

" জ্বি অবশ্যই।"

" আসলে আমি অনেক সহৃদয়বান নারী। কাউকে কষ্ট দেওয়াটা আমার জন্য কঠিন কাজ। আমি সহজে কাউকে কষ্ট দিতে চাইও না। ভাবনা চিন্তা করে দেখলাম নেতা মানুষ আপনি এভাবে কাজ কর্ম ফেলে এফোর্ট দিয়ে যাচ্ছেন। ফিরিয়ে দেওয়াটা কেমন দেখায়। তাই আগপিছু না ভেবে আপনার বাড়ানো পথে পা রাখলাম। রাজনীতির পার্ট টুকু সরিয়ে দিয়ে শুধু মাত্র আপনাকে গ্রহণ করে নিলাম।"

" শুধু মাত্র এই কারণে? "

বিজ্ঞাপন

শেহরিন দুচোখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেয় সাথে সাথে । মৃদুভাবে ঠোঁট প্রসারিত করে বলে," উহু। আপনি যেটা ভাবছেন সেই কারণে।"

" আমি যা কিছু ভেবে নিতে পারি কিন্তু? "

" ভেবে নিতেন পারেন।"

" শিউর?"

" শিউর। "

সান্নিধ্য চোখ বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে হেসে ফেলে। অবশেষে স্বীকারোক্তি পেলো সে। এতোগুলো প্রশ্ন পর্ব পেরিয়ে তার ভালোবাসার জগতে প্রবেশ করলো তার জারুল ফুল। তার একান্ত নীল কামিনী প্রেয়সী।

"তবে, শান্তিচুক্তিতে রাজনীতি নামে কোনো ওয়ার্ড থাকবে না। আপনার প্রফেশনের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা থাকবে না। আমি আমাদের পার্সোনাল লাইফটা নিয়ে চলতে চাই নেতাসাহেব।"

" আমি তোমার চুক্তি মেনে নিচ্ছি। তোমাকে আমি যে কথা দিবো সেটা হেরফের হবে না। বাট তুমি যদি নিজে নিজে চুক্তি ভঙ্গ করো কখনো?"

" সম্ভবনা নেই। আমার ওতোটা সাহস কখনোই হবে না।"

" চুক্তির সবসময় একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত স্থায়ীত্বকাল থাকে। তারপরে আবারো নতুন করে উপস্থাপন করে চূড়ান্ত করা হয়। এর মাঝে চুক্তি সমঝোতা ভঙ্গ দুটোই হয়। আমি অ্যাকসেপ্ট করছি বাট তুমি নিজে থেকে ভঙ্গ করলে আমার কোনো দায়ভার থাকবে না।"

" আপনার মনে হয় আমি নিজের চুক্তি নিজেই ভাঙতে পারি? "

" এটা ভাঙবে।"

" কিভাবে শিউর হচ্ছেন?"

" রাজনীতির মাঝখানে প্রেমনীতি চলে আসবে আপনাআপনি।"

শেহরিন নমুজ কন্ঠে প্রতিত্তুর দেয়, " আমি নিজেকে দেখে কনফার্ম করছি রাজনীতির মাঝখানে প্রেমনীতি আসবে না। বরং রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি দ্বৈরথ্য সৃষ্টি হবে। "

সান্নিধ্য মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে বলে, " আচ্ছা সময় বলে দিবে। কে জেতে। আমাদের এখন নেক্সট স্টেপে যাওয়া উচিত। "

" নেক্সট স্টেপ? "

" বিশ্বাস আছে?"

"এখনো সংশয় আছে? ".

" দ্যাটস এনাফ।"

রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি বাংলা গল্প pdf সাহিত্য

|বেলা দুটো, সুখমহল |

দুপুরের খাবারের আয়োজন সেড়ে মাত্র শাওয়ার শেষে বের হয়েছে তিথি। তাসিনের আজকে স্কুল না থাকায় আগেই খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে তাকে। এজন্যই বাড়ি একদম নিরব, চুপচাপ হয়ে আছে। নয়তো এতোক্ষণে ঢাকঢোল পিটিয়ে নানান বাহানায় অতিষ্ঠ করে তুলতো প্রত্যেককে।

বাসার নিচে গাড়ির আওয়াজ পেতেই তিথি টাওয়েল পেঁচিয়ে জানালা দিয়ে উঁকি দেয়। বাসার ভিতরে সরফরাজকে প্রবেশ করতে দেখে বেশ খানিকটা অবাকও হয় সে। আজকে তো বলেছিলো দুপুরে আসবে না। কি হলো আবার?

তিথি উৎকন্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করে স্বামীর আগমনের জন্য। খানিকটা সময় পেরোতেই সরফরাজ এসে হাজির হয় কক্ষে। এসেই তিথিকে দেখা মাত্র বলে," তোমাকেই খুঁজছিলাম। "

" কি হয়েছে? তুমি না বললে দুপুরে আজকে আসবে না।"

" আসার কথা ছিলো না। বাট বিকেলে ঢাকা যেতে হবে এজন্য ভাবলাম বাসা থেকে ঘুরে আসি। "

" হঠাৎ ঢাকা? "

" জরুরি একটা কাজ পড়েছে।"

" ফ্লাইট কখন তোমার? "

সরফরাজ হাতের ঘড়ি খুলতে খুলতে বলে, " সাড়ে পাঁচটায়।"

" আমাকে খুঁজছিলে কেন? "

" কিছু কথা আছে তোমার সাথে। বসো। "

তিথি কপাল ভাঁজ করে টাওয়েলটা নিয়ে বিছানায় বসে। এই সময় কি কথা বলবে ভেবে পায় না সে। সরফরাজ ওয়ালেট ফোন ঘড়ি জায়গা মতো রেখে এসে হাঁটু ভেঙে বসে তিথির সামনে। তিথির টাওয়েলে ভেজা হাতদুটো নিজের হাতের মুঠোয় এনে নিস্তব্ধ স্বর ভেঙে বলে, " তোমাকে আমি একজন ভালো স্ত্রী, একজন ভালো পুত্রবধূ একজন ভালো মা হিসেবে চিনি তিথি। সেই সাথে সানজির ক্ষেত্রে ভালো একজন বোন। তোমার থেকে সবসময় আমি ভালোটাই আশা করি। "

" খারাপ কিছু করেছি কি? "

" আম্মার সাথে তাল কেন মেলাচ্ছো তুমি? সান্নিধ্যের ব্যাপারে কেন তুমি ইন্টারফেয়ার করছো? কেন বারে বারে অন্বেষাকে টানছো? "

" সান্নিধ্যের কি উচিত নয় অন্বেষাকে বিয়ে করা বলো?"

" কোনটা উচিত কোনটা অনুচিত সেটা সান্নিধ্য বুঝবে। তোমার লাইফের ডিসিশন সান্নিধ্য নিবে না। সান্নিধ্যের লাইফের ডিসিশন তুমি নিবে না। হি ইজ আ অ্যাডাল্ট পার্সন।"

" আম্মা এটা পছন্দ করছে না। চিনি না জানি না হুট করে একটা মেয়ে এই বাড়ির বউ হবে? তুমি জানো, অন্বেষা মেয়েটা কতটা ট্রমাটাইজ হয়ে পড়েছে। বেচারা মেয়েটা আমাকে ফোন করে করে অস্থির। "

সরফরাজ তিথির হাতে হাত চেপে ধীর স্থির গলায় বলে,"এগুলো নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। তুমি শুধু নিজের মানসিকতাটা পরিবর্তন করো। অচেনা অজানা এই মেয়েটাকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে বোন ভাবতে শুরু করো। মেয়েটা চমৎকার একটা মানুষ ।"

" বাহ্ বাসায় না আসার আগেই মন জয় করে ফেলেছি দেখছি সবার। "

" শেহরিন আসলে তোমারও মন জয় করে ফেলবে।"

" তার মানে নিশ্চিত আসছেই। "

" খুব সম্ভবত কালকে দিন পরেই আই মিন শুক্রবারেই।"

তিথি বিস্ময় ঘেরা চোখ নিয়ে তাকায় সরফরাজের দিকে। অবাক কন্ঠ ঠিকরে বলে, " শুক্রবারেই মানে? "

" সান্নিধ্য বাবাকে একটু আগে ফোন করেছিলো। সে শুক্রবারেই বিয়ে করবে।"

" এটা কোনো কথা হলো? একটু বেশিই জেদ দেখেচ্ছে না? "

" শুকরিয়া করো। যার বিয়ে একমাস আগে করার কথা ছিলো সে বিয়ে করছে দেড় মাস পরে। জেদ আর কোথায় থাকলো তাহলে?"

" শুক্রবারেই বিয়ে হবে? "

সরফরাজ বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। ভারী কন্ঠে বলে,

" হ্যাঁ। সান্নিধ্যের হয়তো শনিবার বিকেলেই সংসদ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার জন্য ঢাকায় যেতে হবে। আর তাছাড়া এর মধ্যে একটা সমস্যা হয়েছে যার কারণে আমরা কেউই চাইছি না বড় করে বিয়েটা হোক।"

" তোমার ভাই নিশ্চয়ই কোথাও অঘটন ঘটিয়ে এসেছে। যা খুশি করো তোমরা। সব যখন হয়েই যাচ্ছে, আমাকে তাহলে আর বলছো কেন? "

" তোমাকে সাবধান করছি।"

" মানে? "

" তুমি কোনো প্রকার বাঁধা সৃষ্টি করবে না তিথি। কোনো প্রকার বাঁধা সৃষ্টি করার অধিকার তোমার নেই। আম্মাকে ভুল বোঝাবে না। আমি চাই না তুমি নিজের মন মানসিকতাকে নিঁচুতে নিয়ে যাও।"

সরফরাজের কন্ঠস্বর পরিবর্তন হয়ে যাওয়াতে আশ্চর্য হয়ে তাকায় তিথি। একটু আগের নরম মানুষটা এভাবে কথা বলছে তার সঙ্গে?

" তুমি কি বলছো এগুলো?"

" আমি যা বলছি স্পষ্ট বাংলায় বলছি। আমি তোমাকে অনুরোধ করছি, ভুলেও শেহরিন সান্নিধ্যের ব্যাপারে বা ওদের মাঝখানে তুমি ঢুকবে না্। শেহরিন এই বাসায় আসার পর ওকে নিয়ে কোনো ধরনের খারাপ মন্তব্য কিংবা বাজে ব্যবহার করবে না। জা হিসেবে মেনে নিতে না পারলে দূরে থাকবে তবুও কোনো রকম ক্ষতি করার চেষ্টা করবে না। কোনো ধরনের অমানবিকতা কিন্তু আমি বরদাস্ত করবো না।"

সরফরাজের কাট কাট গলায় বলা কথায় তিথি বিদ্রুপ হাসে্। নিরস গলায় বলে, " তোমার তো দেখছি নিজের স্ত্রী ছাড়া সবার দিকে সমান ভালোবাসা রয়েছে। "

" আমি এইজন্যই কিন্তু কাজ ফেলে এসেছি। বাবা হয়তো একটু পরেই বের হবে শেহরিনদের বাসার উদ্দেশ্য। আম্মাকে তো জানাবেই। হয়তো এটা নিয়ে একটু মনোক্ষুণ্ণ হবে তার। খুব স্বাভাবিক। বাট তুমি যেনো নিজের সীমা অতিক্রম না করো সেদিকটা দেখার জন্য আমাকে আসতে হয়েছে। আমি চাই না তোমার সাথে কোনো বিষয় নিয়ে খারাপ আচরণ করতে। "

" বাহ এতো অবিশ্বাস আমার প্রতি তোমার? কাজ ফেলে বোঝাতে এসেছো?"

" অবিশ্বাসটা হুট করেই তৈরি করে দিয়েছো তুমি । আমি কখনোই আশা করিনি এটা তোমার থেকে। তবে, এটা বুঝতে পারছি কোথাও একটা যোগসূত্র রয়েছে তোমার আর অন্বেষার মধ্যে। নয়তো এতোটা দরদ দেখানোর কোনো মানেই নেই।"

" তোমরা আসলে ছেলে মানুষ তো এজন্য মেয়ে মানুষের কষ্টটা বুঝবে না। "

" সান্নিধ্য অন্বেষার কষ্টটা বুঝেছে। এখন শুধু অপেক্ষা চট্টগ্রাম হতে বের করে দেওয়া। "

" কি করেছে? "

" অন্বেষা বিরাট একটা ভুল করেছে। সে শেহরিনের সামনে সান্নিধ্যের মিথ্যাচার করেছে। যদিও শেহরিন সেটা আমলে নেয়নি। কিন্তু সান্নিধ্যেকে তো চিনোই। সে তো ছাড়বেই না। অন্বেষা সহ ফুল ফ্যামিলিকে দু একদিনের মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে উৎখাত করে দিবে।"

" আম্মা জানলে কি হবে ভেবে দেখছো? "

"অন্বেষার কাজটা করার আগে ভাবা উচিত ছিলো।"

তিথি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। তিক্ত স্বরে বলে, " সান্নিধ্য একটা ছোট বিষয়ও ছাড় দিতে নারাজ। এমন ছেলে করবে সংসার? "

" ও শেহরিনের ব্যাপারে ভীষণ পজেসিভ। সেজন্য তোমাকে সাবধান করছি তুমি ওদের দিকে যেয়ো না। আর তোমার প্রতি আমার যে অসীম ভালোবাসাটা আছে সেটা নষ্ট করো না। একবার যদি নষ্ট করো তাহলে কিন্তু দ্বিতীয়বার সুযোগ পাবে না।"

" তুমি নিজেস স্ত্রী সন্তানের চেয়ে সান্নিধ্যকে বেশি ভালোবাসো এটা কি মানো?"

সরফরাজ মৃদু হেসে তিথির চোখে চোখ রেখে বলে, " স্ত্রীর ভালোবাসা এক জায়গায়, সন্তানের ভালোবাসা এক জায়গায় আর ভাইয়ের ভালোবাসা এক জায়গায়। তিনটা ক্ষেত্রেই ভালোবাসার ধরন ভিন্ন, প্রকাশ ভিন্ন। সুতরাং একসাথে মেলানোটা বোকামি, কম বেশি ভাবা বোকামি।"

" তোমার সাথে কথায় আমি পারবো না। যা খুশি করো তোমরা।"

" চিন্তা করো না আমার শ্বশুর সাহেবের সঙ্গে মামা সাহেবের ব্যবসাটা সুগমই থাকবে। অন্বেষার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ার প্রয়োজন নেই। তুমি বরং বাংলা সিনেমার কালজয়ী দজ্জাল জা এর ভূমিকা পালন করা থেকে নিজেকে সরিয়ে আনো।"

" আমি দজ্জাল জা? "

" আপাত দৃষ্টিতে তাই মনে হচ্ছে। ভিলেন হওয়ার আগেই সতর্কবার্তা দিলাম। এর পরে কিন্তু দিবো না। আমার বউ আছো আমারই বউ থাকো। এসব ভিলেনের পার্ট করে নিজের বিপদ নিজে ডেকে এনো না। "

সরফরাজ তিথিকে স্তব্ধ মূর্তি হিসেবে দাঁড় করিয়ে নিজের টাওয়েল খানা নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। ঝামেলার শেষ নাই তার। নিজেকে এখন তার এয়ার কুলার মনে হয়। সবাইকে ঠান্ডা করার দায়িত্ব যেনো একমাত্র তারই। লিস্ট ও তো কম নয়। মায়েরও মাথা গরম, ভাইয়ের তো ধরাছোঁয়ার বাইরে, ছেলে তো মাশাল্লাহ আরেকজন, বউ এখন বে'লাইনে। সব মিলে ঘাড়ে চেপেছে তার। এগুলোকে সবসময় নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাখতে নিজেই অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যাচ্ছে। তবে, বড় ঝামেলা যেটাকে নিয়ে সেটার ব্যবস্থা হওয়ার পথে ভেবে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। ওটার জন্য এক শেহরিনই যথেষ্ট। এক শেহরিনেই কাবু সে।

_________________________________________

|বিকেল সাড়ে ছয়টা, পতেঙ্গা সী বিচ|

গৌধূলী পর্ব শেষের দিকে প্রায় পতেঙ্গা সৈকতে। সূর্য ডুবতে শুরু করেছে পশ্চিম প্রান্তে। যার কারণে পুরো আকাশ রাঙা হয়ে উঠেছে লাল, কমলা, গোলাপি রঙের এক অপার্থিব আভায়।

সমুদ্রের অথৈ নীল জলরাশি যেন সোনার গুঁড়ো দিয়ে নেড়ে দেওয়া হয়েছে। ঝকঝকে সোনালি রোদ্দুর লুটোপুটি খাচ্ছে মধ্যেখানিতে। একদিকে পাহাড়ের সবুজ চূড়া, অন্যদিকে অকূল সাগরের বিশালতা মধ্যে বালির নরম বিছানা।

লালচে সন্ধ্যায় বালির ওপর পাশাপাশি হেঁটে চলেছে শেহরিন সান্নিধ্য। আজকের দিনের অর্ধেকটা ভাগ তারা একসঙ্গে পার করলো। শেহরিনের দু-চোখ সমুদ্রের জলরাশির পানে নিবদ্ধ থাকে। উত্তাল হাওয়া এসে তাকে শীতলতায় মুড়ে দেয়। পরিপূর্ণতার আবেশে সে ভরে উঠে। পরিস্ফুট কন্ঠে

বলে,"এভাবে নিয়মের বাহিরে চলে যাচ্ছেন কেন আপনি? "

" আশেপাশে লোক আছে আমার।"

" এসেছেন উনারা? "

" হ্যাঁ।"

"এখানে কেন এসেছি আমরা?"

" খারাপ লাগছে তোমার? "

শেহরিন প্রাণ খুলে নিঃশ্বাস নিতে নিতে বলে," অসম্ভব ভালো লাগছে আমার। যার কারণে ধন্যবাদ দিতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু ধন্যবাদ সংখ্যা বেশি হয়ে যাওয়াতে এক কথা বারবার বলতে ইচ্ছে করছে না্। আমার বাবার ক্ষেত্রেও সেইম বিষয়টা হয়।"

সান্নিধ্য যৎকিঞ্চিত হেসে সামনে হাঁটতে থাকে। শেহরিন পিছু পিছু বালি মাড়িয়ে সমুদ্রের ছোট ছোট ঢেউগুলোর সঙ্গে যুদ্ধ করে আসতে আসতে বলে, " হয়তো বাবার মতো কেউ একজন আমার চোখে সেরা পুরুষ হতে চলেছে। যদিও একটু কনফিউশান আছে। বাট জোড়াতালি দিয়ে লাগিয়ে নেওয়া যাবে।"

নিরুত্তর থাকে সান্নিধ্য। ঠোঁট কামড়ে সে নিজের মৃদু হাসি দমিয়ে দু পকেটে হাত ঢুকিয়ে হাঁটতে থাকে নিজের মতো করে। শেহরিন নেতাসাহেবের মৌনতা দেখে মুখে প্রশ্বস্ত হাসি টানে। লোকটাকে নানান কথায় বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে সে অনেক ক্ষণ ধরে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় উনি সুকৌশলে তা এড়িয়ে যাচ্ছেন প্রতিবারেই। গভীর জলের মাছ। বাগে অনা সত্যি কঠিন।

কিছু কদম হেঁটে এসে দাঁড়ায় সান্নিধ্য। দূর হতে শেহরিনকে ইশারায় বোঝায় ছোট ছোট পাথর নিবে কি না সে। শেহরিন ছোট ছোট পাথর কুড়ানোর লোভে দৌড়ে আসে তার কাছে। বাতাসে উড়োচুল গুলো সেই সাথে তার চোখে মুখ ছেয়ে যায় এলোমেলোভাবে।

সান্নিধ্য শেহরিনকে রেখে এগিয়ে যায় কিনারা ঘেঁষে। এক মুঠো চিকচিকে বালির মাঝে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সাদা, কালো, হালকা নীল রঙা পাথর তুলে ধুয়ে নিয়ে আসে শেহরিনের জন্য ।

শেহরিন হাত মুঠো করে সমস্ত পাথরগুলো নেয়। একটা একটা করে দেখতে দেখতে সে সান্নিধ্যের পিছু পিছু ফের হাঁটা ধরে। দু তিন পা এগোতেই হুট করে থেমে যায় তার পদরেখা। এতোগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাথরের মাঝে ঝকঝকে পাথর বসানো সিলভার রঙের একখানা হাতের রিং দেখতেই সে থমকে দাঁড়ায়। বোকা মনে সে বিরবির করে বলে," এটাও কি ভেসে এসেছে? বাহ্ সুন্দর তো। "

অন্য পাথরগুলো ছেড়ে সে পাতলা গোলাকৃতির রিংটা নিজ হাতে পড়ে দেখে তীব্র কৌতুহলে। একদম খাপে খাপ মিলে যাওয়াতে তার চোখদুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়। সান্নিধ্যকে ডাকা মুহুর্তে খেয়াল করে দেখে নেতাসাহেব বেশ খানিকটা এগিয়ে গিয়েছে তার থেকে।

" শুনতে পাচ্ছেন? "

শেহরিন মৃদু চিৎকারে সান্নিধ্য পিছু ফিরে তাকায়। ভ্রু জোড়া উঁচিয়ে কি বোঝাতেই শেহরিন হাতের উল্টো পিঠ মেলে ধরে পাথুরে রিংটা দেখায়।

সান্নিধ্য রিংটার দিকে কিয়ৎক্ষণ তাকিয়ে থাকে। অতঃপর ঠোঁট চেপে আলতো হাসে। শেহরিনের মস্তিষ্কে আচমকা সেই হাসি অন্যরকম এসে লাগে।আর সেটার ভাবার্থ বুঝতে তার সময় লাগে না এক মিনিটও ।

কপালের ভাঁজগুলো তার মিলিয়ে যায় তৎক্ষণাৎ। মেরুদণ্ড বেয়ে শীতল স্রোত বেয়ে যায়। শরীরের লোমগুলো জেগে ওঠে আপনাআপনি। এই লোকটা তাকে সবসময় সবক্ষেত্রে হারিয়ে দেয়। এভাবে নিরবে জীবন সঙ্গিনী হিসেবে প্রস্তাবনায় সে আপ্লুত হয়ে উঠে। সুখের অশ্রুরা এসে ভেড়ে তার দুই নয়নে মুহুর্তেই।

একপলক হাতের আঙুলের দিকে তাকিয়ে সে অস্ফুটস্বরে আঁওড়ে উঠে। সমুদ্র যে গতিতে ঢেউ তুলে আছড়ে আসে পাড়ে, ঠিক সেই গতিতে সে দৌড়ে চলে যায় নেতাসাহেবের কাছে।

সূর্য তখন প্রায় অস্ত যাওয়ার পথে। দূর পাহাড়ে মাথা নোয়াবার কালে এক উচ্ছ্বসিত রমণী ভঙ্গুর হৃদয়ে হানা দেয় সুঠাম দেহের ভাঁজে। জড়োসড়ো আকুন্ঠতায় নিজেকে ধাতস্থ করে নেয় নেতাসাহেবের বুকের ভিতরে। চোখ বন্ধ করতেই দুপাশের কার্নিশ হতে তার সুখের অশ্রুরা ঝড়ে পড়ে।

আকাশের রঙ গাঢ় থেকে গাঢ়তর হতে থাকে। সমুদ্রের জল তখন রূপালি নীল। সান্নিধ্য দুহাতে আগলে নিয়ে পুরুষালি স্বর ভেদ করে বলে," থ্যাংক ইউ ম্যাডাম,ফর অ্যাকসেপ্টিং মি এন্ড মাই লাভ।"

" থ্যাংক ইউ অলসো, ফর কামিং ইনটু মাই লাইফ অ্যাজ আ কম্পিলিট ম্যান। আপনার ভালোবাসা যদি সমুদ্রের মতো গভীর হয়, আমার ভালোবাসা তাহলে আকাশের মতো সীমাহীন হোক নেতাসাহেব ।"

বিজ্ঞাপন
রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি গল্পটি মাহরিণ তৃণ-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও সামাজিক গল্প