রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি

পর্ব - ২৫

🟢

নববধূর শ্বশুরবাড়িতে প্রথম প্রবেশের মুহূর্তটাতে যেনো এক মিশ্র অনুভূতি কাজ করে। একদিকে থাকে অচেনা পরিবেশ, নতুন সম্পর্ক আর অজানা ভবিষ্যতের এক বুক ধুকপুকানি। অন্যদিকে থাকে নতুন করে জীবন শুরুর উত্তেজনা আর ভালোবাসার মানুষের পাশে থাকার আনন্দ।

শেহরিনের কাছেও ব্যতিক্রম কিছু মনে হচ্ছে না। ​বিয়ের লাল টুকটুকে শাড়ি, সোনার গয়না আর ফুলের সাজের আড়ালে লুকিয়ে আছে একরাশ ভাবনা। ছোটবেলা হতেই তার গন্ডি ছিলো একটা নির্দিষ্ট পরিসীমার মধ্যে। বড় পরিবার, বড় সংসারের মানে সে বুঝে না। কিভাবে কি মানিয়ে চলতে হবে কতটা কি করতে হবে এসব প্রায় অজানা। ধরতে গেলে সুখনিবাসের পুরোটাই তার জন্য নতুনত্বে ঘেরা।

" নাও।"

কাঁটা চামচে মুখের সামনে মিষ্টি তুলে ধরতেই শেহরিন ধীরগতিতে মুখ তুলে চায়। সামনে বসা মাঝবয়সী ভদ্র মহিলাটি সম্পর্কে তার শাশুড়ী হন। একটু আগে ঘরে প্রবেশের সময় প্রথম দেখেছে তাকে। তবে উনার হাসিবিহীন মুখোরেখায় এঁটে থাকা নিরবতায় নববধূ খানিকটা ভাবনায় পড়ে। সে কি খুব রাগী? নাকি তাকে পছন্দ করেনি? নাকি সে হাসেনই না কখনো?

বাড়িয়ে দেওয়া মিষ্টি হতে একটুখানি মিষ্টি মুখে নেয় শেহরিন। বিয়ে শুরু হয়েছে থেকে তার মিষ্টি খাওয়া চলছেই । ভাগ্য ভালো মিষ্টি তার পছন্দ। নয়তো এতো মিষ্টি মুখে তোলা তার পক্ষে সম্ভব হতো না।

নাজনীন বেগম ছোট ছেলের বউকে পুরোটা পরোখ করে দেখেন। সৌন্দর্যের দিক থেকে তিথি কিংবা অন্বেষার চেয়ে অনেক এগিয়ে। তবে, তাতেও খুব একটা মনোঃপুত হয় না তার৷ নিজের ভাইয়ের মেয়ের জায়গায় আজ অন্য একটা মেয়ে এসেছে। এতো চেষ্টা করেও পারলো না ছেলেকে রাজি করাতে। সব তো নষ্ট হলোই সেই সাথে হুট করেই তার ভাইয়ের পরিবার নিখোঁজ।

" বউমা তোমার শাশুড়ীকে সালাম করো।"

" আসসালামু আলাইকুম।"

একসাথে উপস্থিত সব মহিলাগণের মাঝে হাসির রোল উঠে্। শেহরিন বুঝতে পারে না সবাই এভাবে হাসছে কেন। তাকে তো উনারাই বললো সালামের কথা। তাহলে হাসার কি আছে? একসাথে এতো হাসির তোড়ে নিজেকে আবারো জড়সড় পাকিয়ে নেয় সে। নিশ্চিত কিছু একটা ভুল করেছে। ইশ্ শুরুতেই ভুল??

বাসর ঘর সাজানো সব কাজিনমহল হাসির শব্দ শুনে দোতলা হতে উঁকি দেয় নিচে। কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, " মামিমা কি হয়েছে ?"

" সান্নিধ্যের বউটা মনে হচ্ছে বেশ সহজসরল।"

" ওরে মা, পায়ে সালাম করতে বলা হয়েছে। মুখে নয়।"

শেহরিন চোখ বন্ধ করে নেয় সঙ্গে সঙ্গে। নিশ্চিত বুঝতে পেরেছিলো ভুল করেছে কোনো একটা। হলোও তাই। হাতের আঙুলগুলো মুষ্টিবদ্ধ করে দোপাট্টার মাঝে রাখে সে। লজ্জায় লজ্জাবতী হয়ে বসা ছেড়ে উঠে সালাম করার জন্য।

" আচ্ছা ঠিক আছে। সালাম করতে হবে না। বসো তুমি।"

নাজনীন বেগম শেহরিনকে বসতে বলে হাতে আনা গহনার বাক্সটা উন্মুক্ত করে্। বংশীয় রীতিতে এ বাড়ির বউদের পারিবারিক গহনা পড়ার রেওয়াজ রয়েছে। সে নিজে সহ মিসেস নিলুফা, তিথি সবাই সবসময় পড়ে থাকে। নতুন বউকে সেই গহনা বুঝিয়ে দিতে বলেন,

" হাতটা দাও।"

লাজুক বধূ নিচু চোখে শাশুড়ির মায়ের হাতে আবারো গহনা দেখে শুকনো ঢোক গিলে্। অস্থির মন তাকে শুধায়, বিয়ে মানেই কি শুধু গহনা নাকি? এতো কিভাবে না করবে সে? উনিও তো আশেপাশে নেই যে তার হয়ে বলে দিবে।

" হাতটা বাড়াও বউমা।ভয় নেই। এটা আমাদের পারিবারিক গহনা। সান্নিধ্যের এখানে আপত্তি থাকবে না।"

মিসেস নিলুফার কথা শুনে শেহরিন ধীরবেগে মুখোরেখা তোলে। চোখে চোখ রাখতেই মিসেস নিলুফা নরম হেসে বলেন, " আমাদেরটা না হয় নেওয়া বারণ কিন্তু এগুলো নয়। এগুলো সব তোমার জন্য। আমাদের শ্বশুর শাশুড়ীর হাতে গড়া। খান বাড়িতে নতুন পূত্রবধূ এলে উত্তরাধিকার সূত্রে এগুলো সে পায়।"

" তোমাদেরটা নেওয়া বারণ মানে? "

" মানে আপনার ছোটছেলের নিষেধাজ্ঞা ভাবি। সে কোনোভাবেই কারো থেকে গিফট নিতে নারাজ। আমাকে অব্দি ফিরিয়ে দিয়েছে।"

" শুধু আপনাকে নয়। আমাদেরকেও দিয়েছে। এতো অনুরোধ করলাম এই ছেলের একটুও মন গললো না।"

সান্নিধ্যের দুই মামি সহ উপস্থিত কিছু আত্মীয় স্বজনও সমস্বরে প্রতিত্তুর করে। মিসেস নাজনীন বিষয়টা আমলে নেয় না খুব একটা । জানে, তার ছেলের ধর্ম, প্রকৃত। তার জেদ আর একরোখা স্বভাবের জন্যই তো আজ এতোকিছু। যেটা বলবে তো বলবেই, জীবন থাকতে তার আর হেরফের করবে না।

শেহরিনকে দু-হাতে দুটো স্বর্ণের বালা, গলায় নকশা করা চেইন আর হাতে আংটি পড়িয়ে দেন মিসেস নাজনীন। কানে ঝুমকো থাকায় সেটা না খুলে হাতে তুলে দেন। ধীর কন্ঠে বলেন,

" গলার চেইন আর হাতের আংটিটা পরে থেকো সবসময়। যেহেতু ভারী কাজের চুড়ি না পরলেও হবে।"

" এই আধুনিক সময়ে গহনাগাঁটি আর কেউ পরেই না। সে ঘরের বউ হোক কিংবা মেয়ে। তারউপরে কলেজ ভার্সিটি করে সবাই। কাউকে দেখে বোঝার উপায়ই নেই বিবাহিত না অবিবাহিত। সব এক।"

" আগের প্রচলন ছিলো। এখন আরো কমে যাবে।"

"কমুক বাড়ুক সেটা কথা নয়। বাড়ির বউ হিসেবে কিছু চিহ্ন তো নিজের মাঝে রাখতেই হবে। এটা এই বাড়ির নিয়ম। তোমার কি কোনো অসুবিধা হবে? "

শাশুড়ী মায়ের প্রশ্নে শেহরিন সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়িয়ে না জানায়। কোমল গলায় বলে," অসুবিধা হবে না। "

" হলে জানাবে।"

"জ্বি।"

মিসেস নিলুফা বসে ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে আছে বলেন," আচ্ছা হয়েছে আনুষ্ঠানিকতা। এবার বউমাকে ঘরে নিয়ে চলো।"

" আচ্ছা এখন তো সান্নিধ্য নেই। আমরা এখন চুপিসারে বউমাকে নিজেদের আনা গিফট গুলো দিয়ে দেই কেমন?"

মিসেস নাজনীন গহনার বাক্স গুলো গুছিয়ে নিতে নিতে বলেন," থাক্ তোমরা আর ওসব করতে যেয়ো না। নিবে না যখন বলেছে, কোনোভাবেই নিবে না। পরে জানতে পারলে তোমাদের কথা শুনাতে তার বাঁধবে না৷ শুধু শুধু অশান্তি বাড়িয়ে লাভ নেই। তার নিজেরই অনেক আছে।"

"মন খারপ করবেন না আপা। সান্নিধ্য হচ্ছে উচ্চ বংশীয় ঘ্যাড়ত্যাড়া। মাথাগরম মানুষ।"

" যা বলেছেন।"

-----------------------------------------------------------

সান্নিধ্যের ঘরখানা সাজানো হয়েছে একদম সাদামাটা হিসেবে। কেননা এতেও তার কঠোর নিষেধ ছিলো। ফুল দিয়ে পুরো ঘর এলোমেলো করা হবে ভেবে সে সানজিকে বারণ করেছিলো না সাজাতে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। বাসর ঘর সাজিয়ে টাকা উসুল করার সুযোগ তো আর সানজি মিস করতে পারে না৷ দলবল নিয়ে তাই হালকা ফুল দিয়ে কোনমতে সাজিয়েছে। তবে সাজ হালকা হলেও ডিমান্ড রেখেছে বেশ ভারী।

শেহরিনকে নিয়ে আসা হয়েছে কক্ষে। বেডের মধ্যেখানিতে বসিয়ে দিয়ে সব কাজিনমহল অবস্থান নিয়েছে দরজার পাশে। এই দলের মুখ্য পাত্রী হচ্ছে সানজি এর পরে চাচাতো দুই বোন হিসেবে আছে জারা, সারা। মামাতো দুই বোন জেরিন, অর্পিতা। দুই ভাই পবন, বাঁধন। এছাড়াও বিশেষ অতিথি হিসেবে আছে তিথির ছোট বোন আনিকা।

" সবাই নিজ নিজ জায়গায় সর্তক থাকবে। একটা পয়সাও কম ছাড়া হবে না। ওকে? "

" ডান। কাঁটায় কাঁটায় ত্রিশ হাজার টাকা গুণে নেওয়া হবে।"

" আপি সান্নিধ্য ভাইয়া যদি না দেয়? ঝাড়ি মারে তখন? আমার কিন্তু ভীষণ ভয় লাগে ভাইয়াকে দেখলে।"

" হুঁশ তুই পাগল নাকি জেরিন। আজকে সান্নিধ্য ভাইয়ার বিয়ের দিন। আজকে ভাইয়া মোটেও ঝাড়ি দিবে না। বরং আমরা যা বলবো সেটাই মুখ বুঁজে মেনে নিতে বাধ্য হবে্। এই একটা দিনই সুযোগ আমাদের হাতে তাই না? "

সানজি মাথা নাড়িয়ে সায় জানাতে জানাতে সিঁড়ির দিকটা একনজর বুলিয়ে বলে," ঠিক বলেছিস। কিন্তু নেতাসাহেব গেলো কোথায়? সাড়ে বারোটা বেজে চলেছে এখনও আসছে না কেন?পবন তুই জানিস কোথায় আছে?"

" আমি একটু আগে দেখেছিলাম লনের ধারে দাঁড়িয়ে কথা বলছে ফোনে। এখনও হয়তো কথা শেষ হয়নি।"

সারা কপাল চাপড়ে হতাশা কন্ঠে বলে, "আজকে বিয়ের দিনেও এতো ব্যস্ততা তার? "

হালকা হলুদ রঙা বিড়াল প্যান্ট পরিহিত বালকটি হাতে মামপট নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে। চোখে তার হালকা ঘুমের রেশ। আজকে সারাদিন বেশ ছোটাছুটি করাতে ধীরে ধীরে নেতিয়ে আসছে তার শরীর। নিজ কক্ষে যাওয়া পথে ইয়ো সানির ঘরের সামনে জমজমাট অবস্থা দেখে সে দাঁড়িয়ে পড়ে্। কিছু ক্ষণ তাকিয়ে থেকে এগিয়ে যায় সেদিক পানে।

" তোমরা এখানে কি করছো? "

" কাজ করছি আমরা।"

" কি কাজ? "

" তুই বুঝবি না বেবি মানকি্। যা ঘরে যা। ঘুম তো তোর চোখে এসে হাজির।"

"উহু না বললে আমি যাবো না। আগে বলো কি কাজ। "

জারা এগিয়ে এসে আদুরে কন্ঠে বলে, "ওরে বাচ্চা। আমরা সবাই এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছি। তুমি ছোট বাচ্চা এসব বুঝবে না। বড় হলে বুঝবে।"

তাসিন চোখ পাকিয়ে তাকায়। মামপটের ফিতাটা গলার সঙ্গে ঝুলিয়ে বলে, " আমি অনেক বড়। ইয়ো সানির চেয়েও বড়। আমাকে ছোটো বলবে না। "

" ইয়ো সানির চেয়েও বড় তুই? "

" হ্যাঁ। আমাকে তোমরা আজকে বিয়ে করতে দাওনি। তোমরা সবাই পঁচা। "

" তুই বিয়ে মানে বুঝিস?"

" হ্যাঁ।"

সানজি সরু চোখে তাকিয়ে বলে, " বল তো বিয়ে মানে কি?"

" বিয়ে মানে আর স্কুলে যেতে হয় না, মিসের কাছে পড়তে হয় না, হোমওয়ার্ক করতে হয় না। শুধু ইয়ো সানির মতো গাড়িতে করে বেড়ানো যায়। ইয়ো পানিকে চুমু খাওয়া যায়।"

" এই এই থাম থাম। এসব তোকে কে শিখিয়েছে? ছিঃ ছিঃ তুই তো দেখছি পুরো পেকে গিয়েছিস।"

" ন'ষ্ট হয়ে গিয়েছে। বড় হলে এর কপালে যে জুটবে তার আর রক্ষা নেই।"

তাসিন সবাইকে উপেক্ষা করে কয়েক কদম এগিয়ে আসে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বিছানায় বসারত লাল টুকটুকে বউয়ের দিকে তাকায়। ইয়ো পানিকে দেখেই তার আবারো কান্না পায়। ছলছল নয়নে তাকিয়ে বলে, "ফু'মণি এখন একটু বিয়ে করি ইয়ো পানিকে? "

" ইয়ো পানির বিয়ে হয়ে গিয়েছে ইয়ে সানির সাথে। আর বিয়ে করা যাবে না।"

" আমি একটুখানি বিয়ে করবো। "

"একটুখানি বিয়েও করা যায় না বাবা। তুই একটু ধৈর্য্য ধর্। তোর ইয়ো পানি খুব তাড়াতাড়িই আসবে। "

" তাহলে এখন একটু ইয়ো পানির কাছে যাই? "

" খালি গায়ে একটা বিড়াল প্যান্ট পরা তোর। গলার সাথে পানির পট ঝুলানো। বুকটাও তো ভিজে গিয়েছে। একটু পরেই শিশি করে ভাসাবি। লজ্জা পাবি না তুই, এভাবে নতুন বউয়ের সামনে গেলে?"

" একটা টুপি আর পাঞ্জাবি এনে দাও তাহলে।"

উপস্থিত সবাই একসাথে কপাল চাপড়ে উঠে। পাঞ্জাবি আর টুপির কাহিনী শুনতে শুনতে সবার ডিপ্রেশনে যাওয়ার জোগাড়। আর কতো? আর কতো বুঝালে এই বান্দা বুঝবে? "

" সানজি আপু গো। তুমি বাদ দাও। ওকে একমাত্র সান্নিধ্য ভাইয়াই বুঝাতে পারবে। আমরা আর কিছু না বলি।"

" তোকে আমি যুদ্ধের ময়দানে ছেড়ে দিলাম। ইয়ো সানির সাথে যুদ্ধ করে ইয়ো পানিকে নিয়ে কোন রাজ্যে যাবি চলে যা।"

একটুখানি ছাড়া পেতেই দৌড়ে কক্ষে ঢুকে যায় বেবি মানকিটা। সরাসরি শেহরিনের সম্মুখে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে সে। এতোক্ষণ নার্ভাসের মধ্যে ডুবে থাকা নবকায়া তাসিনকে এভাবে দেখতে পেয়ে মুখ তুলে চায়।

" তুমি এভাবে বসে আছো কেন? "

"এমনি বসে আছি।"

"ইয়ো সানি কোথায়?"

" আমি তো জানি না বাবা।"

তাসিন এপাশ ওপাশ তাকিয়ে বিছানায় উঠে বসে। শেহরিনের সামনে দুই পা ভাঁজ করে বসে বলে, "ইয়ো পানি এখন একটু তোমাকে বিয়ে করি? "

শেহরিন ফিক করে হেসে উঠে। নরম সুরে নরম আবদার শুনে নিজের হাসি দমিয়ে তাসিনের গাল টেনে বলে, " তুমি তো ছোট একটা বাচ্চা। তোমার তো এখন বিয়ে করা যাবে না। তুমি যদি এখন বিয়ে করো তাহলে পুলিশ এসে তোমাকে ধরে নিয়ে যাবে।"

"পুলিশ কেন ধরবে? "

"ছোট বাচ্চাদের বিয়ে করতে হয় না জন্য।"

"কিন্তু আমি তো বড়।"

"উহু তুমি ছোট। তুমি ক্লাস থ্রি তে পড়ো। আর আমি ক্লাস থার্টিনে পড়ি। কাউন্ট করে দেখো তো কতো বছর।"

তাসিন নির্নিমেষ চাহনিতে শেহরিনের বলা কথা মনোযোগ সহকারে শোনে। অতঃপর হাতের কড় গুণে গুণে বলে,

"ফোর, ফাইভ, সিক্স, এইট, নাইন..

" সেভেন বলোনি। "

"সেভেন, এইট, নাইন, টেন, ইলেভেন..

" টুয়েলভ.. থার্টিন।"

"উহু আর বলবো না।"

"কেন?"

" বেশি হয়ে যাচ্ছে তো।"

শেহরিন নিজের হাসি দমাতে পারে না বেবি মানকিটার কথায়। তবুও নিজেকে কোনমতে ধাতস্থ করে বলে, "এবার বুঝলে তো কে বড় কে ছোট? "

তাসিন বোঝে কি না দায়। সে শেহরিনের হাতে পরিহিত চুড়িগুলো আঙুল দিয়ে নেড়ে দেখতে দেখতে বলে, " এগুলো তো মামণি পরে হাতে। তুমি কেনো পরেছো? "

" আমিও তোমার মামণি যে।"

"উহু তুমি আমার মামণি না। তুমি আমার ইয়ো পানি... "

" ইয়ো পানি? "

"হু।"

"আচ্ছা ঠিক আছে তোমার কথাই মেনে নিলাম।"

---------------------------------------------------------

মধ্যে রাত পেরোতেই অবশেষে জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটে। সান্নিধ্যের আগমন ঘটতেই সবাই যে যার জায়গায় সর্তক অবস্থান নেয়। সরফরাজ ছেলেকে নিয়ে আসার বাহানায় পকেট খালি হওয়ার দৃশ্যটা মিস করে না। সিঁড়ির রেলিঙে বুকের সাথে দু-হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে পড়ে সে।

" শান্তি প্রিয় মানুষ আমরা। শান্তিমূলক আবদার আমাদের। কোনো রকমের ঝামেলার ধারের কাছে ঘেঁষতে চাই না। "

" আবদারটা কি? "

" সকল প্রকার দামাদামি এড়িয়ে শান্তিপূর্ণভাবে ত্রিশ হাজার টাকা বুঝিয়ে দেওয়া হোক আমাদের ।"

সান্নিধ্য খানিকটা কপাল কুঁচকায়। গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করে ,"ত্রিশ হাজার টাকা কেন?"

" নববধূর কাছে যাওয়ার আগে মাসালা তো দিতেই হবে ভাইয়া। এমনি এমনি তো আমরা যেতে দিবো না।"

" বউ তো আমার।"

"বউ তোমার কিন্তু ভাবি তো আমাদের সবার।"

সান্নিধ্য পিছু ফিরে সরফরাজের দিকে তাকায়। সরফরাজ ঠোঁট উল্টে বলে, " সর্বজনীন অধিকার। আমারও পকেট খালি হয়েছিলো একসময় ।"

" অ্যামাউন্ট কমিয়ে আন।"

সবাই চিৎকার করে না না করে উঠে। দলীয় ঐক্যবদ্ধ থেকে একসঙ্গে জোরালোগলায় বলে উঠে, "কোনো কমানোর সুযোগ নেই। পারলে দু এক হাজার আরও বাড়ানো হবে।"

" যত সময় যাবে তত বাড়ানো হবে। "

"ভাইয়া দিয়ে দাও। আটজন ত্রিশ হাজার টাকা মাত্র। যদিও প্রত্যেকের ভাগে কম পরে যাচ্ছে তবুও একটু কষ্ট করে সাক্রিফাইস করছি তোমার কথা ভেবে। এর চেয়ে আর কত দয়া দেখানো যায় বলো?"

সান্নিধ্য ওয়ালেট বের করতে করতে পবন আর বাঁধনের দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বলে, "তোরা কি মেয়ে মানুষ? ওদের সাথে তোদের কাজ কি? "

" এইখানে ছেলে মেয়ের কোনো ভেদাভেদ নেই ভাইয়া । সব কাজ আমি বেশি করেছি৷ "

" আমরাও করেছি।"

"কাজটা কি ছিলো? "

বিজ্ঞাপন

"তোমার বাসর ঘর সাজানো।"

সানজি সান্নিধ্যের মুখ খোলার আগেই তড়িৎ কন্ঠে বলে, " রিলাক্স। রিলাক্স। হালকা সাজিয়েছি। আপনার ভাষ্যমতে জঙ্গল তৈরি করিনি। সো, উত্তেজিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।"

" বুঝলাম না বাসর ঘর তো ফুল দিয়েই সাজাতে হয়। তুমি এর বিপক্ষে কেন? "

সানজি জারাকে হালকা ধাক্কা দিয়ে সান্নিধ্যের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে, "আরে জারামণি বুঝো নাই ব্যাপারটা। বাগানের সবচেয়ে সুন্দর ফুল যদি একাই পুরোটা ঘর দখল করে থাকে তাহলে কি আর আলাদা করে ঘর সাজানোর প্রয়োজন আছে বলো?"

" ও...ওও...এই ব্যাপার।"

জীবন্ত ফুল নিয়ে কানাঘুঁষা শুরু হয়। সবাই ফিসফিস করে মজা নিতে থাকে নেতাসাহেব কে নিয়ে। কিন্তু নেতাসাহেবের সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে নিরুত্তর থেকে ওয়ালেট হতে টাকা বের করতে ব্যস্ত।

" বারো হাজার আছে কাছে। এটা আপাতত রাখ। বাকিটা পরে দেওয়া হবে।"

" বাকি চাহিয়া লজ্জা দিবেন না এমপি সাহেব। আপনি একজন নেতা মানুষ হয়ে বাকিতে চলেন?"

" আমি কি টাকার বস্তা নিয়ে ঘুরি?"

" বস্তা না হোক ওয়ালেট নিয়ে তো ঘুরো।"

সান্নিধ্য ঠোঁটের উপর ঠোঁট চেপে নিজেকে ঠান্ডা রাখে। ধৈর্য্যের পরিসীমা কিভাবে কিভাবে যেনো দিন দিন তার বেড়েই চলেছে। নয়তো এতোকিছু সে কেমন করে সহ্য করে।

" আমার কাছে এখন এতোটাকা ক্যাশ নেই। "

" আমরা কি জানি ?"

" কালকে সকালের মধ্যে দিয়ে দিচ্ছি।"

" কোনো একজন সাধু ব্যক্তি বলেছিলেন, ভুলেও রাজনীতিবিদদের মুখের মিষ্টি কথা বিশ্বাস করবে না। বিশ্বাস করবে তো নিশ্চিত পঁচানি খাবে। আমরা ওতো বোকা নই। "

সানজির কথায় হুট করে ক্ষীণস্বরে ঠোঁট প্রসারিত করে হেসে ফেলে সান্নিধ্য । শান্ত কন্ঠে বলে," যা কিছু একটা নিয়ে আয় সাইন করে দিচ্ছি। "

" অর্পিতা দলিলের স্ট্যাম্প সহ বের কর তো।"

সরফরাজ অবাক চোখে তাকিয়ে বলে, "দলিল? স্ট্যাম্প? "

" হুহু ব্যাকআপ হিসেবে রেডি করে রাখা আছে আমাদের। কোন কবি যেনো বলেছে, ছেলে মানুষদেরকে কখনো অন্ধ বিশ্বাস করতে নেই।"

" কবি হয়ে এই কথা বলেছে? "

" হু বলতে পারে না? কবি নিজে ছেলে মানুষ হলে কি? সে নিজে ও জানে ছেলে মানুষ আর বিশ্বাস দুটো দুই মেরুতে অবস্থিত ।"

দলিলপত্রে সাইন করা শেষে স্টাম্প লাগিয়ে দেওয়া হয়। সেই সাথে করে রাখা হয় ভিডিও। নগদ বারো হাজার টাকা তুলে দেওয়ার মাধ্যমে চুক্তি সম্পন্ন ঘটে।

" এবার বিদায় নে। আর তোর কবিকে একদিন আমার কাছে পাঠাবি।"

" কেন? "

"বিশ্বাসের নীতিমালা শেখাবো।"

সানজি সান্নিধ্যের দিকে আঁড়চোখে তাকিয়ে লম্বা করে নিঃশ্বাস টেনে নিয়ে বলে,"সৈন্যগণ এবার যাওয়া যাক।"

"তাসিন ভিতরে আছে। "

" ওটাকে আমি দেখছি তোরা যা।"

সান্নিধ্যের কথায় সরফরাজ ব্যগ্র কন্ঠে বলে উঠে, " আরে না না তোর দেখতে হবে না। ছেলে আমার বিয়ের কষ্টে এমনিতেই শোকে পাথর হয়ে আছে। তুই দেখা মানে পানিশমেন্ট দেওয়া। সানজি.. নিয়ে আয় ওকে।"

সানজি আর কথা না বাড়িয়ে কক্ষে গিয়ে তাসিনকে কোলে তুলে নিয়ে আসে। এতো অমানবিকতা সইতে না পেরে বেচারা দুঃখে কষ্টে ঘুমিয়ে পড়েছে। এতো অল্প বয়সেই ছ্যাঁকা খাওয়া শেষ। ভবিষ্যতে নিশ্চিত এই ছেলেই দেবদাস হয়ে বাবা মায়ের মুখ ম্লান করবে।

_______________________________________

নিস্তব্ধ সময় । নির্জনতায় আবেশিত এক মুহূর্ত। সান্নিধ্যের কক্ষে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে দোদুল্যমান হাওয়া আরো ঘন ও মিষ্টি হয়ে উঠে। লাল শাড়ি, বিছানায় ছড়ানো ফুলের পাপড়ি, পড়ে থাকা পর্দার ফাঁক গলে চাঁদের আলো সবকিছুই যেন ভূবন মোহিনী হয়ে অপার সৌন্দর্যতায় ডুব দিয়েছে।

সান্নিধ্য এক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে চোখের তৃষ্ণা মেটায়। তার বিছানায় সযত্নে গড়ে তোলা একটা প্রস্ফুটিত জীবন্ত ফুল লাজুক মুখে বসে আছে। যার শাড়ির আঁচল, দোপাট্টার কার্নিশ পুরোটা জুড়ে বিচরণ ঘটিয়েছে। সোনালি সুতোয় মৃদু আলো পড়তেই সূক্ষভাবে ঝলমল করে উঠছে তা।

শেহরিন দু'পায়ের সঙ্গে মুখ ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে থাকে। বুকের ভিতরে তার যে কালবৈশাখী ঝড় শুরু হয়েছে সেটা থামানোর কোনো অবকাশ খুঁজে পায় না সে। অজানা এক শিহরণে তার সমস্ত কায়া দুলে উঠে। ইশ্ নেতাসাহেব যদি তার দিকে আবার ওভাবে তাকায় তো সত্যি সে মরে যাবে। উনার ঐ ধারালো চাহনি সহ্য করার মতো শক্ত মন এখনও হয়ে উঠেনি যে।

সান্নিধ্য শেহরিনের সামনে এসে বসে। ডান হাতখানা থুতনির নিচে রেখে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখতে থাকে তার নবরাঙা বধূকে এক দৃষ্টিতে, পলকবিহীন চোখে।

চোখের সামনে একজন পুরুষের নির্নিমেষ চাহনিতে নড়েচড়ে উঠে বধূ। কিছু সময় পার হতেই নিজ হতে চোখ তোলে সে।

ধারালো দৃষ্টির মাঝে নিজের নাজুক দৃষ্টি আটকা পড়তেই শেহরিন গুড়িয়ে যায়। দু'হাতে নেতাসাহেবের চোখের উপর হাত রেখে কাঁপা গলায় বলে, " অন্যদিকে তাকান প্লিজ। "

" অন্যদিকে আমার বউ নেই।"

" তাহলে চোখ হতে হাতও সরাচ্ছি না আমি। "

" আমি ধরলে কিন্তু পারবে না।"

" আপনি ধরবেন না।"

" ধরার অধিকার আমার সম্পূর্ণ আছে এখন।"

শেহরিনের নরম হাতদুটো সামনে হতে সরিয়ে নেয় সান্নিধ্য। কোমড়ের কাছে হাত রেখে এক ঝটকায় নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে আসে তাকে। কপালের উপর পরে থাকা চুলগুলোকে আলতো স্পর্শে সরিয়ে দিয়ে গাঢ় চুমু এঁকে দেয় সেখানে।

" ধৈর্য্যের পরীক্ষায় এ প্লাস পেয়েছি এতো কষ্ট করে। তোমার উচিত আমাকে মিষ্টি খাওয়ানো। তা না করে এতো লজ্জা পাচ্ছো তুমি। চোখই তুলে তাকাতে পারছো না আমার দিকে। এই মেয়ে আমার দিকে তাকাও... "

" আপনি আমাকে মেরে ফেলার পায়তারা করছেন.."

" এখনই এই কথা বলছো?ধরলামই না তো তোমাকে।"

শেহরিনের দুগাল লাল হয়ে উঠে৷ কান দিয়ে ধোঁয়া নির্গত হতে থাকে। এমনিতে এসব পরে তার শরীরের অবস্থা কাহিল। তার উপরে নেতাসাহেবের লাগামহীন কথা। এমনভাবে চলতে থাকলে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না নিশ্চিত ৷

" ছাঁড়ুন ফ্রেশ হবো আমি। "

" মাথার এগুলো খুলে দিতে হবে? "

" আমি পারবো। "

শেহরিন সান্নিধ্যের হাত হতে কোনোরকমে ছাড়া পেয়ে উঠে দাঁড়ায়। লাগেজ হতে নিজের সব প্রয়োজনীয় জিনিস বের করে নেয়। অতঃপর ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে ধীরে ধীরে মুখের মেকআপ সহ গহনা খুলতে থাকে।

" আপনি চাইলে ফ্রেশ হয়ে নিতে পারেন। আমার একটু সময় লাগবে।"

সান্নিধ্য কার্বাড হতে টি শার্ট ট্রাউজার বের করে ঘড়ির দিকে তাকায়। একটা পার হচ্ছে। আজকে মনে হচ্ছে সময় দৌড়ে পালাচ্ছে। ছোট করে নিঃশ্বাস ফেলে ওয়াশরুমের দরজার সম্মুখে দাঁড়িয়ে বলে, "তোমার সাজগোজকে নিজের প্রতিপক্ষ মনে হচ্ছে। একটু ফার্স্ট প্লিজ.."

শেহরিনের কানের দুল খুলতে গিয়ে হাত থেমে যায়। স্তব্ধ চোখে তাকানো মুহুর্তে সান্নিধ্য ওয়াশরুমে ঢুকে যায় চুপচাপ। লোকটার যাওয়াপানে তাকিয়ে বিরবির করে ঠোঁট নেড়ে উঠে দূর্বল কায়ার। অস্পষ্ট স্বরে বলে,

" লজ্জা হজম করার কোনো ঔষধ আবিষ্কার হয়েছে কি? "

------------------------------------------------------

নিস্তব্ধ রাতে ফোনের টুংটাং শব্দ বেজে ওঠে হুট করে । সমস্ত গহনাদি খুলে হালকা হয়ে সতেজ নিঃশ্বাস নেয় শেহরিন। বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সোফার উপরে রাখা ফোনটা হাতে নিয়ে দেখে ক্ষুদে বার্তা এসেছে। এই মাঝরাতে ক্ষুদে বার্তা? কে পাঠালো?

" ওহে ভাবিজান যদি একটু ফ্রি থাকেন, তাহলে দেখা করে যান।"

মেসেজখানা পড়তেই শেহরিনের বাঁকানো ভ্রু দ্বয় মিলিয়ে যায় সঙ্গে সঙ্গে । বুঝতে পারে কারা পাঠিয়েছে। কিন্তু এতো রাতে তাকে দেখা করার কথা কেনো বলছে বোধগম্য হয়ে উঠে না৷ দেনামোনা মন নিয়ে সে একবার ওয়াশরুমের দিকে তাকায় তো একবার ঘড়ির দিকে। অতঃপর নিজের ভাবনাকে অবসান ঘটিয়ে সে পা বাড়ায় কক্ষের বাহিরে।

বেশ খানিকটা সময় অতিবাহিত হয়ে যায় মাঝখানে। সান্নিধ্য ওয়াশরুম হতে ফ্রেশ হয়ে বাহির হতেই দেখে ঘর ফাঁকা। ড্রেসিং টেবিলের উপরে শেহরিনের গহনা জ্বলজ্বল করলেও শেহরিন নেই। টাওয়েলটা রেখে আশেপাশে তাকিয়ে নেতাসাহেব সরাসরি চলে যায় বেলকনিতে। কিন্তু সেখানে গিয়েও আশানূরুপ ফল পায় না । বেলকনি পুরো ফাঁকা।

দ্রুত কক্ষে এসে নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে কল লাগায় সে । অপর পাশ হতে ফোন রিসিভ হতেই ব্যস্ত গলায় বলে উঠে, " সানজি আমার বউ কই? "

" বউ? আল্লাহ হারিয়ে গিয়েছে নাকি ভাইয়া ? "

" আল্লাহর দোহাই লাগে ভাইয়ের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলিস না।"

" আমি কি করেছি আজব? পাচ্ছিস না কোথাও খুঁজে? "

" না। "

" জানালা কি খোলা?"

সান্নিধ্য এক পলক জানালাগুলোর দিকে তাকিয়ে বলে, " খোলা বাট পর্দা টানানো।"

" হোক পর্দা টানানো। আমার মনে হয় জ্বিনের বাদশার নজর পড়েছিলো তোর বউয়ের দিকে। সে উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছে।"

" জ্বিনের বাদশা কে? "

" আরে জ্বিন জগতের রাজা। "

সান্নিধ্য মুখোরেখা গম্ভীর হয়ে উঠে। নিজেকে ধৈর্য্যের বেঁড়ি পড়িয়ে ঠান্ডা গলায় বলে, " আমার বউটাকে দিয়ে যা। ছোটো মানুষ ও ভয় পাবে। "

সানজি নিজের হাসি আটকিয়ে না রাখতে পেরে শব্দ করে হেসে উঠে। ফোনের ওপাশে ক্রমাগত একাধিক হাসির আওয়াজ শ্রবণে আসতে থাকে সান্নিধ্যের। চোখ বন্ধ করে সে নিঃশ্বাস ছেড়ে ধীর কন্ঠে বলে, " আমার যেতে হবে? "

" এখন না। আধাঘন্টা পরে। আমরা হালকা আড্ডা দিবো এখন। ভাবিজান আমাদের গান শুনাবে। তুই ঘুমিয়ে পর। আল বিদা।"

মুখের উপর ফোন কেটে দেয় সানজি। একে একে সবাই হাত মেলায়। শেহরিনকে সব বোনেরা মিলে পাকড়াও করে নিয়ে এসেছে। নেতাসাহেব বউয়ের জন্য কেমন পাগল সেটাই দেখবে এবার।

" তানিশা আপু তোমার আইডিয়াটা কিন্তু জোশ। ভাইয়ার অবস্থা ভয়াবহ হয়ে গিয়েছে ।"

" কেমন দিলাম। আমার আর তোর ভাইয়ার ক্ষেত্রেও এটা করেছিলো। এজন্য ভাবলাম তারকাঁটা নেতাসাহেবকে একটু টাইট দেই।"

" এসে পরলো বলে। ইশ্ ভাইয়ার মতো রাগী মানুষ কিভাবে করুণ কন্ঠে এসে বলবে, আমার বউটাকে দিয়ে দাও তোমরা । প্লিজ প্লিজ....।"

"প্লিজ... প্লিজ..প্লিজ।"

একসঙ্গে চাপা হাসির রোল উঠে্। সবার মধ্যে খানিতে বসা সবুজ শিফনের একখানা শাড়ি পরিহিতা নববধূ সন্তপর্ণে নিঃশ্বাস ছাড়ে্। এরা যে কি করছে, কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছে না। ভালোই ভালোই এসেছিলো সে তাদের ডাকা সাড়া দিয়ে। কিন্তু আসার পরে যে এই ফন্দি আঁটবে সেটা তো জানাছিলো না।

" শেহরিনকে সবুজ শাড়িতে দেখে ভাইয়া প্রথম কুপোকাত হয়েছিল।"

" এজন্যই ভাবিজানকে এই শাড়িটা পরানো হলো।"

" ওহ গড আজকে একটা ধামাকা হতে চলেছে।"

রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি বাংলা গল্প pdf সাহিত্য

" শোন কেউ সহজেই গলবি না্। সান্নিধ্য এসে বারবার অনুরোধ করবে তারপরে ভেবে দেখবো৷ ওকে কোনদিন নানু বাসায় অনুরোধ করাতে পারিনি। সবসময় অর্ডার করেছে। আজ মোক্ষম এক সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না।"

" আমরা তোমার সঙ্গে আছি তানিশা আপু।"

" গুড। "

তানিশা সান্নিধ্যের বড় মামার বড় মেয়ে। ধরতে গেলে নানুর বাসায় মেয়েদের মধ্যে সবচেয়ে বড় সে। সরফরাজের চেয়ে ছোট কিন্তু সান্নিধ্যের চেয়ে দেড় বছরের বড়। বিয়েতে উপস্থিত থাকলেও কনের বাড়িতে তার যাওয়া হয়নি।

" সান্নিধ্য কি কেঁদে ফেলবে বউয়ের শোকে ?"

" মনে হয় না আপু। "

"হতেও পারে। আজকের রাতে সব পুরুষেরাই ভেজা বিড়াল হয়ে যায় হু।"

" তাহলে নিশ্চিত।"

চলমান কথার মাঝে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হয়। সবাই একসঙ্গে সজাগ দৃষ্টি মেলে সেদিকে । তানিশা এক নজর শেহরিনের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট চেপে হেসে বলে, " জ্বি আসতে পারেন।"

সান্নিধ্য ট্রাউজারের দু পকেটে হাত ঢুকিয়ে দরজা হতে একটু ভিতরে এসে দাঁড়ায়। এতোগুলো রমণীর মাঝে তার চোখ গিয়ে আটকায় সবুজ শাড়ি আবৃত রমণীর দিকে। চুপচাপ অবলা হয়ে বসে আছে মেয়েটি। ইশ্ কি মায়া মায়া লাগছে দেখতে।

নেতাসাহেব তাকে কাছে ডাকে। শান্ত গলায় সবকিছু উপেক্ষা করে বলে, " শেহরিন আসো। "

" শেহরিন যাবে না এখন। আরো একটু গল্প গুজব করবে আমাদের সাথে।

" এমনি এমনি কি যেতে দেইনি নাকি। তোমার ঘুম পেলে ঘুমাও। ভাবিজান তো আমাদের কাছেই আছে ভাইয়া।"

" কিজানি জ্বীনের বাদশার ভয়ে হয়তো ছুটে এসেছে। হাজার হোক, বউটা তো তার ছোটো মানুষ। "

সান্নিধ্য দীর্ঘ শ্বাস ফেলে সন্তপর্ণে। কারো কথার কোনো প্রকার পাল্টা জবাব না দিয়ে চুপচাপ এগিয়ে আসে বিছানার দিকে। আর নেতাসাহেবের আগমন দেখে সামনে হতে জারা সারা উঠে যায় তড়িৎ গতিতে। কিজানি যদি সামনে এসে ঝাড়ি মারে তো অবস্থা খারাপ।

চোখের পলকে ঘটে যায় এক বিস্ময়কর ঘটনা। উপস্থিত সবার চক্ষু ছানা বড়া হয়ে যায় সঙ্গে সঙ্গে। সবার মধ্যে হতে নেতাসাহেব তার পেশিবহুল হাতে শেহরিনকে বিছানার মাঝে হতেই পাঁজাকোলে তুলে নেয়।

আর এই দৃশ্য হজম করতে না পেরে চোখে হাত দিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে সবাই একসঙ্গে জড়োসড়ো হয়ে মৃদু চিৎকার করে উঠে। শেহরিন লজ্জায় মুখ ঢাকতে চোখ বুঁজে সান্নিধ্যের বুকে লুকিয়ে পরে। আজ সে শেষ ! সত্যি শেষ! এতো লজ্জা আর সে সইতে পারছে না।

অবশেষে নির্বিকার চিত্তে বীরবেশে রাণীকে উদ্ধার করে নিয়ে রাজা পাড়ি জমায় নিজ রাজ্যে। অনেক তো যুদ্ধ হলো আর কতো?

--------------------------------------------------

সান্নিধ্য শেহরিনকে নিয়ে এসে নরম বিছানার মাঝে শুয়ে দেয়। নিভু নিভু আলোতে দূর আকাশে মিটিমিটি করে তারারা হাসে। ভালোবাসার সুঘ্রাণ বইয়ে যায় আরো একবার।

পাতলা শিফনের শাড়িতে শেহরিনকে দেখে নেতাসাহেব নিজেকে হারিয়ে ফেলে নিয়ন্ত্রণের বাহিরে। মুখোমুখি মুখ রেখে পুরুষালি কন্ঠে বলে," অতি ধৈর্য্যবান পুরুষ হওয়া আমার পক্ষে কখনোই সম্ভব নয় শেহরিন।"

শেহরিনের শ্বাস প্রশ্বাসের গতি বেড়ে যায়। মরুভূমির তপ্ত বালির ন্যায় ঠোঁটজোড়া তার শুকিয়ে উঠে। নেতাসাহেবের বাহুডোরে আবদ্ধ সে। পালানো কিংবা দৃষ্টি ঘুরানোর কোনো পথ রাখেনি। সুর্দশন পুরুষের ব্যাকুল চাহনি তাকে ছিন্ন ভিন্ন করে তোলে মুহুর্তেই।

" লুকিং সো প্রিটি মাই ওয়াইফ ।"

" হু।"

" ক্যান আই বি অ্যালাউড? "

" ফর হোয়াট? "

"ইউ নো হোয়াট আই মিন! "

" নো। "

" ইয়েস প্লিজ ম্যাম ।"

" আই সেইড নো।"

সান্নিধ্যের কাতর চাহনি হার মানে। শেহরিনের থুতনিতে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলে,

" আর কতো পরীক্ষা দিতে হবে আমার? মরে যাচ্ছি.. প্লিজ দয়া করুন ম্যাডাম। "

শেহরিন লজ্জা ছাড়িয়ে নেতাসাহেবের অসহায় অবস্থা দেখে ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেলে। এই প্রথম মানুষটার দূর্বল রুপ চোখ পড়লো তার। সবিনয়ে নিবেদন করতে করতে সে হাল ছেড়ে দিয়েছে শুধু মাত্র একটুখানি অনুমতির জন্য। ব্যাকুল পুরুষটির গরম নিঃশ্বাস শেহরিনের গলা জুড়ে প্রবাহিত হতে থাকে্। শরীর জুড়ে ভালোবাসার জোয়ারে কাবু হতে থাকে সে নিজেও ধীরে ধীরে। সান্নিধ্যের কানের কাছে মুখটা নিয়ে ধীর স্বরে বলে উঠে,

"ইয়েস। "

" ইয়েস? "

" ইয়েস।"

সান্নিধ্য মুখ তুলে তাকায় শেহরিনের দিকে। গ্রীণ সিগনাল পেতেই তার ঠোঁটের কোণে হাসি বেয়ে যায়। ধৈর্য্যের ফল তাহলে দেখা দিলো তাকে। চিকন পাতলা ওষ্ঠে চুমু দিয়ে শীতল কণ্ঠে বলে উঠে , "থ্যাংকিউ সো মাচ।"

আলো নিভে যায়। অন্ধকারে দমকা হাওয়ায় পর্দাগুলো দুলে উঠে আপন ছন্দে। চাঁদ উঠা সেই রাতে স্পর্শ উন্মাদনায় মহাসমুদ্রে ডুব দেয় দু'জন মানব মানবী। ওষ্ঠের ভাঁজে ওষ্ঠ মিলে যায় প্রাগাঢ়ভাবে। সবুজ শাড়ির ভাঁজে ফর্সা উদরে কিংবা গলার পৃষ্ঠে, নেতাসাহেব সর্বত্র তার বিচরণ ঘটায় নির্বিঘ্ন উল্লাসে। ছন্নছাড়া মাতোয়ারায় মগ্ন হয়ে ভেসে বেড়ায় দুজনে বাঁধাহীনভাবে।

বিজ্ঞাপন
রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি গল্পটি মাহরিণ তৃণ-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও সামাজিক গল্প