রাত ৯:২০
শহরের একটি অত্যাধুনিক ভবনের শীর্ষতম তলার কনফারেন্স রুমে চলছে বেশ গমগমে আলোচনা। উচ্চ সুরক্ষাবিশিষ্ট এই ভবনটির নাম অ্যাকুয়াটিকা। কাঁচের দেয়ালের ওপাশ থেকে দেখা যাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরের অন্ধকারাচ্ছন্ন জলরাশি। দূরে পাহাড়চূড়ায় জ্বলজ্বল করা লাইটহাউসের আলো সাথে অসংখ্য জাহাজের নিয়ন আলোর প্রতিফলন। কনফারেন্স রুমের অভ্যন্তরটি বেশ নান্দনিক ছোঁয়ায় ঘেরা। লম্বা ঝকঝকে পলিশ করা মেহগনি কাঠের টেবিলকে ঘিরে বসেছেন কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
বাতাসে মিশে আছে ভারী গম্ভীরতা আর ডেভিডঅফ ক্লাসিক ব্র্যান্ডের সিগারেটের সূক্ষ্ম গন্ধ। উপস্থিত নেতাকর্মীদের মাঝে কেউ কেউ ফিসফিস করে কথা বলছেন তো কেউবা গুরুত্ব সহকারে ফাইলপত্র ঘাঁটছেন।
টেবিলের এক প্রান্তে জানালার পাশের সিটে বসেছে চট্টগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য সান্নিধ্য শাহজাদ খান। চেয়ারে একটু হেলান দিয়ে পায়ের উপর পা তুলে হাতের কোণে জ্বলন্ত সিগারেটের ধোঁয়া উড়ছে তার। পরনে ধূসর রঙের শার্ট সঙ্গে কালো প্যান্ট। স্লিভ গুটিয়ে রেখেছে কনুই বরাবর। গম্ভীর মুখোরেখায় বেশ শান্ত চাহনি প্রতিফলিত হয়ে আছে ।
বৈঠকের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শেষ হওয়ার পর বর্তমানে চলছে অনানুষ্ঠানিক আলাপচারিতা। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত যুগ্ম মহা সচিব সহ প্রতি মন্ত্রী আসাদুল রেজা প্রস্থান নিতেই শুরু হয়েছে কিছুদিন আগে সংসদে পাশ হওয়া বাজেটকে ঘিরে কথা বার্তা । চট্টগ্রাম-৯ (চন্দনাইশ, লোহাগাড়া) আসনের সিনিয়র সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিমের সুরক্ষিত দৃষ্টি কনিষ্ঠ এমপি মহোদয়ের দিকে। এতোক্ষণ তিনি এই কথা তোলার অপেক্ষাতেই ছিলেন। বড় বড় মাথা দূর হতেই মোক্ষম সুযোগ লুফে নেন । কন্ঠে ঈর্ষা মেশানো সুর তুলে বলেন, " এমপি সাহেব, খুব কি দরকার ছিলো হাঁটে হাঁড়ি ভাঙার? আমরা সবাই নিজেরা নিজেদের মানুষ। জনসম্মুখে নিজেদেরকে প্রশ্নবিদ্ধ করাটা কি ঠিক? "
" স্পষ্ট করে কথা বলুন।"
" কি দরকার ছিলো ওভাবে স্পিকারের সামনে গিয়ে সরাসরি বাজেট নিয়ে কথা বলার? জনগণ তো এর হিডিং মিনিং বের করে ফেলবে এখন। আপনি কি সীতাকুণ্ড ইকোনমিক জোন নিয়ে ভাগে কম পড়ার ভয় পেয়ে এই কথা বলেছেন? "
কক্ষের বাতাস হঠাৎই জমে যায়। সবাই থমথমে চাহনিতে একে অপরের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। সান্নিধ্য তীক্ষ্ণ নজরে আজিম সাহেবের দিকে তাকিয়ে ধারালো স্বরে বলে,
"আনোয়ারুল আজিম সাহেব, আপনি চন্দনাইশ লোহাগাড়ার মানুষ হয়েও ভাগ শব্দটা খুব ইজিলি ইউজ করছেন। নিজস্ব সীমাবদ্ধতা ছেড়ে আমার এরিয়ায় নিয়ে আপনাকে ভাবতে বলেছে কে? "
"মানে কী? এটা তো সাধারণ কথা। এতো সিরিয়াসলি নেওয়ার কি আছে? আপনি আপনারটা খাচ্ছেন খান। অর্থ মন্ত্রীকে বাজেট সীমিত করার কথা বলার কি দরকার ছিলো? সীমিত বাজেটে কাজ হয়? "
" বুঝতে পারছি না আপনার এতো সমস্যা হচ্ছে কেন? আপনি তো কাজই করেন না। সীমিত বাজেট দিয়ে কি আর না দিয়ে কি। আজে বাজে কথা বলা বন্ধ করুন।"
" আমি আজে বাজে কথা বলছি না। একটা কাজে হাত দিতে প্রয়োজনের বেশি অর্থ লেগে যায়। সীমিত বাজেট দিয়ে কোনো ধরনের উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন করা যায় না এটাই বুঝাতে চাইছি আমি।"
সান্নিধ্য সিগারেট টেনে বাম হাতের আঙুলের ভাঁজে রেখে মৃদু হাসে। স্থির গলায় বলে, " সরি আপনার উন্নয়নমূলক কাজ আমি গত দুই বছরে দেখেনি। বাট আমার জানামতে, তিনটা প্রজেক্টের কাজে স্বাক্ষর করে রেখেছেন আপনি। সেসবের টাকা কোথায়?"
" ক..করবো। অবশ্যই সামনে করবো। না তো বলিনি। আমি তো আপনার মতো আর বুলেট ট্রেন না যে ঝড়ো গতিতে ছুটবো।"
" বয়স হয়ে গিয়েছে আপনার। পদ ছেড়ে এখন একটু বিশ্রাম নিন। আপনার কতো লাগে? পেট ভরে না? নয় বছর ধরে ক্ষমতায় থেকে গ্রোগ্রাসে গিলে আসছেন। পেট ফেটে ভুঁড়ি বের হয়ে আসছে। এরপরেও ভাগ নিয়ে কথা বলেন? কি কাজ করেছেন আপনি? আপনার এরিয়ার মানুষ এসে আমার কাছে অভিযোগ দেয়।"
আজিম সাহেব মুখ গম্ভীর করে সোজা হয়ে বসেন। হেয়ালি স্বরে বলেন,
" দুটো ভালো কাজ করেই নাম্বার নিচ্ছেন? নতুন নতুন আসলে সবাই তাই করে। পরে সব পকেট ভরতে শুরু করে।"
" দুই বছর পার করছি। পকেট আমার এখনও খালি। আপনার মতো বাজেট মেরে খেলে এতোদিনে তিনটা বাড়ি দু চারটা গাড়ি এমনি হয়ে যেতো। "
" ভাই সৎ থেকে আমারও একই অবস্থা। সরকার যা দেয় সেটা দিয়েই মোটামুটি চলছি। আজিম সাহেবের মতো মেরে কেটে খেলে চান্দের দেশে বাড়ি কিনে ফেলতাম নিশ্চিত।"
মৃদু হাসির গুঞ্জন উঠে মেয়র সাহেবের কথায়। তবে সেটা বর্তমানে উপস্থিত সাতজনের মধ্যে তিনজনের মুখে। বাকি চারজন আমাবস্যার ন্যায় অন্ধকারে মুখ ঢেকে থাকে।
" আপনারা যেমন সরকারের টাকায় চলছেন আমরাও সেরকম সরকারের টাকাতেই চলছি। এখন ব্যক্তিগতভাবে আমাদের যদি বাড়তি সম্পদ থাকে। সেটা নিয়ে তুলনা করলে তো চলবে না। "
" এসব বা*ল মার্কা গীত শুনাতে আসবেন না। পুরনো হয়ে গিয়েছে। ত'লায় হাত দিলে কোনটা বাপের সম্পদ আর কোনটা সরকারের সম্পদ এমনি ক্লিয়ার হয়ে যাবে। কাজের কাজ তো কিছুই করবেন না এখন এসেছেন ভাগ নিয়ে কথা বলতে ।"
আনোয়ারুল আজিম সাহেবের পাশে বসা আরেকজন নেতা আড়ালে হাতের উপর হাত রেখে শান্ত হতে বলেন। চোখের পাতায় আশ্বস্ত করে নিজে মুখ খুলে বলেন, "দেখুন সান্নিধ্য সাহেব, কে কি করে জানি না তবে আমরা কাজ ঠিকই করি। জনগণের হক মেরে খেয়ে কি আর বড় হওয়া যায় বলুন? তবে অর্থমন্ত্রী অনুমোদিত নতুন বাজেটটা কিন্তু আসলেই বেশ সংকীর্ণ। আপনি যদি না বলতেন.."
" কাজ শুরু করার সাথে সাথে সঠিক হিসাব লিখে রাখুন। ঠিকাদারদের সাথে নিজের ভাগটা কমান। মূল বাজেট হতে এমনি অনেকাংশে বেঁচে যাবে।"
" আমি ওসব ভাগ টাগে যাই না।"
" সুশীলের গল্প শুনাতে এসেছেন?"
ধারালো দৃষ্টির ফাঁদে চোখ পড়ার আগেই চোখ সরিয়ে নেন তিনি। আনোয়ারুল আজিম সাহেবের হাত স্পর্শ করে তাকে কথা বলার জন্য উদ্যত করে নিজে চুপ হয়ে যান।
"আরে ভাই, আমি তো শুধু বলছি প্রসিডিউর নিয়ে কথা। এভাবে ডিরেক্ট অ্যাপ্রোচ করা হচ্ছে কেন?"
" আমি সমগ্র রিজিওনাল ডেভেলপমেন্ট এর কথা বলেছি। আপনি এটাকে পার্সোনাল অ্যাটাক বানিয়ে দিচ্ছেন কেন? আপনি মনে করছেন আমি শুধু আমার এরিয়ার জন্য লবি করছি?"
সান্নিধ্যের ক্রমান্বয়ে গলার স্বর রুক্ষ হয়ে যাওয়া দেখে বয়োজ্যেষ্ঠ নেতাসাহেব নড়েচড়ে বসেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে ধীর স্থির কন্ঠে টেবিলে সামান্য আঘাত করে বলেন,
"আনোয়ারুল তুমি জানো আমাদের চট্টগ্রাম-২ এবং চট্টগ্রাম-৯ দুটি এরিয়াই একে অপরের সাথে ইন্টারকানেক্টেড। সীতাকুণ্ড ইকোনমিক জোন সাকসেস হলে চন্দনাইশ লোহাগাড়াতে ও বিরাট একটা কর্মস্থল সৃষ্টি হবে। অনেক ইয়ুথরা চাকরি পাবে। এটা ভাগ নিয়ে নয় সহযোগিতা নিয়ে কথা। "
" না মানে আমি বুঝাতে চাইছি জনগণ মিডিয়া তারা তো ডিফরেন্ট ওয়ে তে নিতে পারে বিষয়টা। সেইটা আর কি.."
"জনগণ? মিডিয়া?" সান্নিধ্য তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে জবাব দেয়,
" আপনি পার্লামেন্টে এ যান জনগণ মিডিয়াকে নিয়ে ভাবার জন্য। তাদের কথায় তেল দেওয়ার জন্য। বাট আমি সেকারনে যাইনা। আমি যখন স্পিকারের ডায়াসে দাঁড়াই শুধু মাত্র আমার এরিয়ার জন্য কথা বলি না। আমি চট্টগ্রামের ইকোনমিক আর্টারির জন্য কথা বলি। মেইন ট্রাডিং গেটওয়ের জন্য কথা বলি। বাজেটে একটি লাইন, একটি কমাও যদি ভুল হয় তা সরাসরি আমাদের পোর্ট এর ক্যাপাসিটি, আমাদের ইন্ড্রাস্টি এর গ্রোথ কমিনিউকেশন নেটওয়ার্ককে প্রশ্নবিদ্ধ করে দিবে।
অর্থমন্ত্রীকে শুধু মাত্র রিমাইন্ড করা হয়েছে তার ডিউটির কথা, রেসপন্সিবিলিটির কথা সম্পর্কে। কারণ একটি সিঙ্গেল মিসটেকের প্রাইস অনেক হাই। এটা ভাগ নিয়ে কনভার্সন না এটা ন্যায্যতা নিয়ে কনভার্সন। বুঝতে পেরেছেন? "
সান্নিধ্যের কথায় সহমত জানায় মেয়র সাহেব। মাথা নাড়িয়ে গম্ভীর আওয়াজে বলেন, "সহমত। এটা পার্সোনাল ইগো এর ইস্যু নয়। এটা পিউর ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট এর ইস্যু। আর একেই বলে ট্রু লিডারশিপ। আমাদের ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি মনোভাব হতে বের হয়ে আসা উচিত।"
কামরুল হুদা কপাল কুঁচকে আনোয়ারুল আজিমের দিকে হেলে যান ঘাড় বাঁকা করে। ফিসফিস কন্ঠে বলেন, " আপনি ভাই আসলেই একটা মেয়াদোত্তীর্ন মা'ল। কি দরকার ছিলো ভাগের কথা বলে এই ব্যাটারে গরম করে তোলার। জানেনই এটা সুবিধার না। পুরো ঘেটে দিলেন মিয়া।"
" এর মাথা ঠান্ডা থাকে কখন? "
" ঠান্ডা থাকুক আর না থাকুক। কথা বলার একটা সিস্টেম আছে। আপনি শুরুতেই যদি এর মাথা গরম কইরা দেন কাজ হইবে? "
" বুঝি নাই।"
" হুর মিয়া। কোনো কাজের না আপনি।"
কামরুল হুদা ফিসফিস কন্ঠে কথা ছেড়ে প্রসঙ্গ পাল্টাতে অন্য উপায় অবলম্বন করেন। জোরপূর্বক মুখে হাসি টেনে বলেন, " আচ্ছা আচ্ছা এবার সব কথা ছাড়ি। এখন আর এসব বলে লাভ নেই যেহেতু একে অপরের মধ্যে আর দ্বৈরথ সৃষ্টি না করি। তবে, আপনারা কি জানেন আমাদের এই এমপি মহোদয় চুপচুপে বিরাট একটা শুভ কাজ সেড়ে ফেলেছেন।"
" কি বলেন? "
" সত্যি। এমপি সান্নিধ্য শাহজাদ খান এখন বিবাহিত।"
" আরে এমপি মহোদয় সাহেব এতো বড় কাজ সেড়ে নিলেন আমরা জানলামই না? "
সান্নিধ্যের সামান্য ভ্রু দ্বয় বাঁকা হয়ে আসে। কামরুল হুদা সাহেবের মুখোরেখায় সূক্ষ্ণ দৃষ্টিতে অভিযান চালিয়ে অতঃপর দরজার সামনে টানটান ভঙ্গিতে দাঁড়ানো আসিফের দিকে এক পলক তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে আনে। তার মুখ খোলার আগেই কামরুল হুদা হেসে বলেন, " আপনি লুকোচুরি খেলতেই পারেন। বাট আমি ঠিকই খবর পেয়েছি। তা বউমাকে আমরা দেখবো না?"
" বিয়ে করেছি জেনেছেন এইটুকুতেই এনাফ থাকুন। দেখে কি করবেন? "
" আরেহ ভাই আপনার বউ বলে কথা ! দেখার আগ্রহ হবে না? হাজার হোক কতশত নারীর পছন্দের লিস্টে ছিলেন আপনি। ডিমান্ডই ছিলো আলাদা। এসব কিছু ছাপিয়ে কোন নারী জায়গা পেলো আমাদেরও তো একটু দেখার ইচ্ছে জাগে।"
" যে ইচ্ছে জেগেছে তা মাটি চাপা দিয়ে ফেলুন। দামি জিনিস সবার সামনে প্রর্দশন করতে হয় না।"
মেয়র সাহেব সহ প্রায় সবাই মাথা নিচু করে আলতো হাসেন সান্নিধ্যের কাটকাট উত্তরে । ঠান্ডা গলায় বলেন, " কথা খারাপ বলেননি।।"
" আমি দেখেছি । খা'সা আছে।"
শুধু মাত্র বিকৃত দুটো শব্দ। সান্নিধ্যেকে জ্বালিয়ে দিতে এতটুকুই যথেষ্ট। এতোক্ষণের নিয়ন্ত্রিত মেজাজ তার স্ফুলিঙ্গের ন্যায় দাপিয়ে উঠে। উপস্থিত কয়েকজন মুখ হতে বিরক্তিকর ধ্বনি উচ্চারণ করেন লিয়াকত আলীর কথায়। আবারো পরিস্থিতি গরম করে দিলো।
সান্নিধ্য তার শক্ত হাতের মুঠোয় সামনে রাখা ভারী কাচের বড় গ্লাসটা চেপে ধরে। অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে চোখের পলকে লিয়াকত আলীর মুখ বরাবর মারে ছুঁড়ে।
জোরালোবেগে ছুঁটে আসা গ্লাসটা মুখের উপর এসে সরাসরি আঘাত হানে লিয়াকত আলীর। চোখ বন্ধ করে মুখ কুঁচকে ফেলে সে সঙ্গে সঙ্গে। ঠোঁটের উপরিভাগ থেঁতলে গিয়ে রক্ত বের হয়ে আসে মুহুর্তেই। দুহাত মুখে চেপে ধরতেই অস্পষ্ট গোঙানি ভেদ হয়ে আসে গলা হতে।
" সান্নিধ্য.. সান্নিধ্য শান্ত হও। ভুলে বলেছে। "
সান্নিধ্য উঠে দাঁড়াতেই আসিফ এসে সঙ্গে সঙ্গে তার পিছনে দাঁড়িয়ে পড়ে। আনোয়ারুল সাহেব সহ সবাই সান্নিধ্যকে রুখতে ব্যস্ত হয়ে বলেন,
" সান্নিধ্য প্লিজ কন্ট্রোল ইউরসেল্ফ। "
" কন্ট্রোলে ছিলাম জন্য আপনি নিজেও এখন দাঁড়িয়ে আছেন ঠিকঠাকভাবে। নয়তো ভাগের স্বাদ আপনাকেও বুঝিয়ে দিতাম।"
সবাইকে অগ্রাহ্য করে লিয়াকত আলীর কাছে এসে দাঁড়ায় সে। বসারত রক্তাক্ত লিয়াকত আলীর ঘাড় চেপে ধরে টেবিলের সাথে মাথা ঠেকিয়ে বিক্ষুব্ধ গলায় বলে, " মা*** তোর জিহ্বা টেনে হাত ধরিয়ে দিবো। জন্মের মতো জবান বন্ধ হয়ে যাবে। কলিজা বড় হয়ে গিয়েছে ? ওয়েট কর, তোর কলিজা কাটার ব্যবস্থা খুব তাড়াতাড়ি করছি ।"
" সান্নিধ্য ভুলে বলেছে। এবারের মতো ছাঁড় দাও। বুঝতে পারেনি।"
" প্লিজ প্লিজ অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি না করি। এটা একটা কনফারেন্স রুম। একটু শান্ত হই সবাই।"
কারো কোনো অনুরোধ কিংবা কথা কানে তোলে না সান্নিধ্য। শক্ত কাঠের টেবিলে পরপর কয়েকবার মাথা ঠেকিয়ে লিয়াকত আলীর দফারফা করে ফেলে সে। কপাল ফেটে টেবিলের গায়ে রক্ত লাগতেই উপস্থিত সবাই হতবিহ্বল হয়ে যায় । দাঁড়িয়ে না থেকে জোরপূর্বক টেনে সরিয়ে আনে তাকে।
" মরে যাবে তো।"
আসিফ কামরুল হুদার দিকে তাকিয়ে বিরক্ত কন্ঠে বলে, " কথা বলার আগে ভেবে বলা উচিত। কোন সাহসে ভাবিকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করে?"
" আরে ভাই বলছি তো ভুলে বলে ফেলেছে।"
" ভুলে এখন না মরলে হয়।"
" মানে? "
"কিছু না। ভাই আসেন।"
সান্নিধ্য নিজেকে স্থির করে। শৃগালী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে, " নেক্সট টাইম থেকে কেউ যদি আমার পার্সোনাল লাইফে আঙুল দেওয়ার চেষ্টা করে তাকে কেটে সোজা কুকুর দিয়ে খাওয়াবো। আর হ্যাঁ কথাটা সবার জন্য প্রযোজ্য। আসি।"
লেলিহান শিখার উত্তাপ ছাড়িয়ে সান্নিধ্য প্রস্থান নিতেই সবাই ছোট করে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। লিয়াকত আলীর দিকে তাকিয়ে কামরুল হুদা বলেন,
"হসপিটালাইজড করতে হবে তো।"
" আপনি নিয়ে যান। এই সব কিছু হয়েছে আপনার জন্য।"
" আমার জন্য মানে?"
"আপনার কি দরকার ছিলো বউয়ের কথা তোলার? বিয়ে করেছে ভালো কথা্। অন্যের বউ দেখার এতো আগ্রহ প্রকাশ করতে হবে কেন? নিজের বউ দেখে পেট ভরে না? এখন সামলান। যত্তসব।"
মেয়র সাহেব প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে প্রস্থান নেয়। কামরুল হুদা অবাক দৃষ্টি মেলে আনোয়ারুল সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলে, " কি রে ভাই এই পোলারে তো কিছুই বলা যায় না। যাই বলি সেটাই ভুল হয়? "
" আপনি শুধু শুধু তখন আমাকে কথা শুনিয়েছেন। এখন বোঝেন। এই হ্যা'ডম দেখানো নেতার কাজ কারবার।"
" একে বাগে আনা সহজ না দেখছি।"
" আগেই বলেছিলাম।"
________________________________________
|রাত সাড়ে দশটা, সুখনিবাস|
বেলকনিতে জ্বলছে স্পট লাইট। মানি প্লান্টসহ কুঞ্জলতা গাছের চিরল পাতায় সবুজ আলোর প্রতিফলন পড়ছে ফ্লোরজুড়ে, জানালায় লাগানো পর্দার মাঝে। শান্তি শান্তি একটা আবহ তৈরি হয়ে আছে বেশ। নির্মল প্রাকৃতিক সুঘ্রাণ বয়ে বেড়াচ্ছে পুরোটাজুড়ে।
কক্ষে আলো নেভানো থাকলেও স্টাডি ডেস্কে জ্বলছে ল্যাম্প। যা পুরো ঘরকে আবছা আলোয় ঢেকে রেখেছে। শেহরিনের মনোনিবেশ এই মুহুর্তে বইয়ের পাতার মাঝে। লম্বা সময় ধরে তার পড়াশোনা চলমান রয়েছে। এর মাঝে একটাবারও উঠা হয়নি। একটা জটিল টপিকসে সে আটকা পড়ে আছে বেশি খানিকক্ষণ হলো। সলিউশনের পথ পাচ্ছে না সহজেই।
কলম নাড়াতে নাড়াতে সে এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে কিভাবে সমস্যাটা সলভ করা যায়। চুলগুলো কিছুটা এলোমেলো হয়ে মুখের সামনে এসে পড়েছে। চোখদুটোতে হালকা ক্লান্ততার ছাঁপ নেমে আসলেও বেশ সজাগ দৃষ্টি মেলে আছে বইয়ের পাতার ভাঁজে।
সান্নিধ্য কক্ষে প্রবেশ করা মাত্র বেলকনিতে চলে যায়। ফোনে কথা বলায় ব্যস্ত সে্। এতোক্ষণ গলার স্বর উঁচুতে থাকলেও কক্ষে আসা মাত্র তা একদম নিচুতে নেমে গিয়েছে। অন্যদিকে তার অগোছালো রমণীর ধ্যান জ্ঞান এতোটাই বইয়ের দিকে বিভোর হয়ে আছে যে, সে বুঝতেই পারে না তার নেতাসাহেবের আগমন ঘটেছে কক্ষে। একদৃষ্টিতে বইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে তো আছেই।
বেশ খানিকটা সময় কথা বলা শেষ করে সান্নিধ্য সরাসরি এসে শেহরিনের থুতনির নিচে হাত গলিয়ে দেয়। মুখ উঁচু করে ধরে কপালে আদুরে চুমু এঁকে দেয় সযত্নে । হঠাৎ পুরুষালি স্পর্শে শেহরিন মৃদুভাবে কেঁপে ওঠে। কিন্তু নাকে পরিচিত ব্যক্তির পারফিউমের সুবাস পেতেই তার মনস্থির হয়ে যায়। চোখ উপরিপানে তুলে দেখে তার নেতাসাহেবকে।
সান্নিধ্য পরপর তিনটে চুমু এঁকে দেওয়া শেষে শেহরিনকে ছেড়ে দেয়। কাবার্ড হতে ফ্রেশ হওয়ার জন্য জামা কাপড় বের করে সোজা ওয়াশরুমে চলে যায়। চুপচাপ নিরব কার্য তার। কোনো বাক্য বিনিময় হয় না পরস্পরের।
শেহরিন নেতাসাহেবের আদর পেয়ে মাথা নাড়ায় আলতোভাবে। হাতের কলম উঁচু করে ধরে বইয়ের দিকে তাকিয়ে ধীর কন্ঠে বলে, " ওহ আচ্ছা এটারই প্রয়োজন ছিলো তাহলে। ভালো লাগছে এখন। মনে হচ্ছে প্রব্লেমটা সলভ করতে পারবো। ধন্যবাদ নেতাসাহেব।"
কিছু সময়ের ব্যবধানে সান্নিধ্য ফ্রেশ হয়ে এসে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। চুলে ব্যাকব্রাশ করতে করতে শীতল কন্ঠে জিজ্ঞেস করে," ডিনার করেছো?"
" করেছি। আপনি করেছেন? "
" হ্যাঁ।"
" আজকে এতো লেট হলো কেন আসতে? "
" কাজ ছিলো কিছু ।"
শেহরিন খাতায় প্রব্লেমটা সলভ করার চেষ্টা করতে করতে কপাল কুঞ্চিত করে বলে,
" বের হয়েছেন সেই সকালে। আসলেন মাত্র। সারাদিন এতো কি কাজ থাকে? এতো কবিতা আবৃত্তি করলে গলা স্বর নষ্ট হয়ে যাবে না?"
" তোমার মনে হয় আমি শুধু কবিতা আবৃত্তিই করি ?"
" রাজনৈতিক পার্সনরা এছাড়া তো কোনো কাজ করে না। শুধু ফাঁকা বুলি ছুঁড়ে। কাজ করে একটা নাম জাহির করে দশটায়।
সান্নিধ্য আয়নার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে অল্প বিস্তর হাসি বিচরণ করে। সারা দুনিয়া সামলে এসে তাকে আবার তার ঘরোয়া ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি হতে হয়। যার কাছে তার কাজের কোনো সুনাম তো নেই উল্টো দূর্নাম চুপচাপ হজম করে নিতে হয়। এই একটা মানুষের কাছে সে পরাজিত সৈনিক। গলা উঁচু করে কথা বলা কঠিনভাবে নিষিদ্ধ।
ফোনটা হাতে নিয়ে সে নিচে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে বাড়াতে বলে," এভাবে স্বামীর দূর্নাম গাইতে হয় না ম্যাডাম।"
" স্বামীর নয় স্বামীর কাজের দূর্নাম গাইছি। কোথায় যাচ্ছেন? "
" নিচে। "
"কেন?"
"কাজ আছে একটু।"
"আবারো কাজ?"
"হু। তুমি তোমার কাজ করো। "
শেহরিন এক পলক সান্নিধ্যের যাওয়াপথে তাকিয়ে আবারো মনোযোগ দেয় তার কার্যে। সময়ের দিকে নজর দিয়ে সে ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজ জগতে। অনেক অনেক পড়া জমে আছে। এতো এতো সিলেবাস কিভাবে কভার করবে মাথায় আসে না তার।
রাত এগোরোটা ছুঁই ছুঁই। নিস্তব্ধ রাতে ঠান্ডা হাওয়া বইছে ধরণীতে। নিচতলায় মিসেস নাজনীনের রুমের বেলকনিতে বসে আছে তিনজন। শাহজাহান সাহেব চোখের চশমা খুলে দুহাত বুকের সাথে ভাঁজ করে ভারী কন্ঠে বলেন,
" কি ব্যাপার সান্নিধ্য? কিছু হয়েছে কি ? "
"কিছু হয়নি। "
" তাহলে? "
" কথা আছে তোমাদের সঙ্গে।"
মিসেস নাজনীন ছেলের মুখোরেখায় নজর বুলান। বুঝতে চেষ্টা করেন কি নিয়ে কথা বলতে তাদের সমবেত করেছে । তবে সান্নিধ্যের শান্ত অভিব্যক্তি দেখে তার মাথায় সহজে ধরা দেয়না আগাম বার্তা । রেগে থাকলে তাও বোঝা যায় কিছু একটা ভুল হয়েছে কিন্তু চুপচাপ শান্তশিষ্ট মনোভব....
" কি কথা? "
সান্নিধ্য মিসেস নাজনীনের দিকে তাকায়। শিথিল কন্ঠে বলে, "আম্মা তোমার কি কোনো সমস্যা হচ্ছে শেহরিনকে নিয়ে?"
" সমস্যা কেন হবে? "
" হতেই পারে যে কোনো কারণে। ভেবে বলো একটু।"
মিসেস নাজনীনের কপাল সামান্য ভাঁজ হয়ে আসে। অসন্তুষ্ট চিত্তে বলেন, " আশ্চর্য। এসব বলার মানে কি সান্নিধ্য? শেহরিনকে নিয়ে আমার সমস্যা কেন হবে? "
" ওর কি রান্না শেখা বা করাটা কি এখন খুব জরুরি?"
" বাড়ির বউ রান্না শিখবে না?"
" শিখবে কিন্তু এই সময়টাতে কি খুব জরুরি? "
"কেন? কোনো সমস্যা হচ্ছে কি ওর? বলেছে কি কিছু তোমাকে?"
" ওর হাজার সমস্যা হলেও আমাকে কখনো বলবে না। আমার নিজেরই বুঝে নিতে হবে ।"
শাহজাহান সাহেব কিছুটা বিস্মিত পানে তাকিয়ে বলেন, " বলো কি? সমস্যা হচ্ছে বউমার? "
"ওর সামনে সেমিস্টার ফাইনাল। পড়াশোনার অনেক প্রেশার। এর মাঝে এসব রান্নাবান্না শেখাটা বাড়তি একটা ঝামেলা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাত পুড়িয়ে নিচ্ছে বারেবারে। নানান প্রব্লেম ফেস করছে। "
" ওহহো।"
" সেটা তো আমি জানি না। আমাকে তো পরীক্ষার কথা বলেনি। আর হাত না পুড়লে রান্না শেখা যায় না। এই সামান্য একটা বিষয় নিয়ে এতো হাইপার হওয়ার কোনো দরকার নেই। আমরা নিজেরাও হাত পুড়িয়েই রান্না করে এসেছি এতোকাল যাবত।"
সান্নিধ্য স্থির দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে," তোমার কাছে যেটা সামান্য আম্মা, সেটা অন্যজনের কাছে কষ্টের। তোমার হয়তো অনেক আগে থেকে অভিজ্ঞতা আছে তাই হাত পোড়াটা সয়ে গিয়েছে কিন্তু ওর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নতুন। ধরতে গেলে কিচেন জগতাটাই নতুন। ওর সহ্যশক্তি তো তোমার সমান হবে না। তোমার দক্ষতার সঙ্গে ওর দক্ষতা তুলনা করাটা ভুল।"
" তো কি চাইছো তুমি? সে রান্নাবান্না না করুক?"
"করবে তবে সেটা আরো অনেক পরে। এক্ষুণি নয়। এতো তাড়াতাড়ি বউয়ের হাতে রান্না খাওয়ার শখ আমার নিজেরই যেখানে নেই সেখানে তোমরা এতো তাড়াহুড়ো কেন করছো? "
" তাড়াহুড়ো করছি আমরা?"
" শোনো আম্মা রিলাক্স হও। পজিটিভ মাইন্ডে আসো্। একটু বুঝতে চেষ্টা করো, মেয়েটার মা নেই সেই ছোটোবেলা হতে। বাবার কাছে মানুষ হওয়া একটা মেয়ে ঘরোয়া কাজে কতটাই বা দক্ষ হবে? ওর অবস্থানটা একটু চিন্তা করে দেখো। সহজ নয় কিন্তু। এরপরেও সে যথেষ্ট চেষ্টা করছে মানিয়ে নিতে। সংসারের সবকিছু বুঝে নিতে। তোমার তো এগুলো একটু বিবেচনা করা উচিত । আমাকে কেন বলতে হচ্ছে? আমাকে কেন এসব বিষয়ে ইন্টারফেয়ার করতে হচ্ছে? "
" আমার ভুলটা কোথায়? "
"ভুল নয়। তুমি ওকে মন থেকে মেনে নিতে পারছো না জন্য বুঝতে চেষ্টা করছো না। ওর জায়গায় তোমার পছন্দের কেউ থাকলে বিষয়টা অন্যরকম হতো শিউর। তখন আর আমাকে বুঝাতে আসতে হতো না। তুমি নিজেই বুঝে নিতে।
বিষয়টাগুলো খুবই অকওয়ার্ড। নিজের মাতৃত্ব সুলভ ধারাটা বজায় রাখো আম্মা। মায়ের কাছে যে সন্তানের বিভেদ হয়না এটা কি মানো? "
মিসেস নাজনীন ছেলের প্রশ্নে গুমটে স্বরে জবাব দেন, " হু।"
"সানজির নিজেরও কিন্তু মা নেই। ওকে যদি এখন ওর শ্বশুরবাড়ির লোকজন এসব বিষয় নিয়ে প্রেশার ক্রিয়েট করে তুমি মেনে নিতে পারবে? তুমি যে বিহেভটা অন্য একটা মায়ের সন্তানের সাথে করছো সেই বিহেভটা যদি অন্য কেউ তোমার সন্তানের সাথে করে মেনে নিতে পারবে?"
" আমি এজন্যই আমার মেয়েকে আগে থেকে শিখিয়ে পরিয়ে নিয়েছি।"
"এডজ্যেক্টলি। এক্ষেত্রে শেহরিনের তো মা নেই। ওকে শেখাবে কে? তুমি নিজে তো বুঝতে পারছো মা ছাড়া মেয়েদের এসব কাজ প্রোপ্রারলি কেউ শেখাতে পারে না। কেন তাহলে আনজাস্টিফায়েড মনোভাবটা নিজের মধ্যে ধরে রেখেছো?"
"সান্নিধ্য ঠিক কথা বলেছে নাজনীন। পুরনো সবকিছু বাদ দাও। ওগুলো আর ধরে রেখো না৷ মেয়েটা কিন্তু উগ্র নয়। যথেষ্ট শান্ত এবং ভদ্র পরিবারের মেয়ে। ওর শিক্ষা আদব কায়দা চাল চলন যথেষ্ট মার্জিত। তুমি শুধু ওকে আদর স্নেহ দিয়ে গড়াও দেখো ও ঠিক তোমার মনের মতো হয়ে উঠবে। "
" মা না হতে পারলেও একজন ভালো শাশুড়ী হওয়ার চেষ্টা করো আম্মা। শুধু যে তোমাকেই বুঝিয়ে যাচ্ছি এমনটা নয় আমি তোমার দিকটাও ওকে বুঝাবো। তোমাদের দু'জনের দিকটা ব্যালান্সে রাখা আমার দায়িত্ব। দুজনেই সমান গুরুত্বপূর্ণ আমার লাইফে। একপাক্ষিক না হয়ে নিরপেক্ষ হও।"
" একপাক্ষিক কিভাবে হলাম?"
"ভাবির বিষয়ে কথা বলার আমার কোনো ইচ্ছা নেই। তাকে নিয়ে সমালোচনা করার মন মানসিকতাও নেই। তার জন্য ভাইয়াই এনাফ। কিন্তু তোমাকে ঠিক হতে হবে। দুজনের প্রতি সমান দৃষ্টি রাখতে হবে। "
ছেলের একের পর এক কথায় মিসেস নাজনীন চুপচাপ হয়ে শোনেন। ধীর কন্ঠে বলেন, " দুদিনেই মা'কে প্রশ্নবিদ্ধ করছো? "
" বাবা যেমন তোমার বাবাকে কথা দিয়ে ভালো রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই বাসায় এনেছে আমিও ঠিক শেহরিনের বাবাকে কথা দিয়েছি। বাবা যেমন এখনও তোমাকে একই সম্মান ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখেছে আমারও কি সেটা পালন করা উচিত নয়? তুমি কি চাও না এই যে এখন যে কথাবার্তা চলছে এতে বাবা তোমার পক্ষে থাকুক। সার্পোট দিক? "
মিসেস নাজনীন এলোমেলো দৃষ্টি ফেলেন। নিরুত্তর হয়ে মাথা নিচু করতেই সান্নিধ্য দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে, " মনটাকে একটু প্রশ্বস্ত করো আম্মা। নিজেকে দিয়ে অন্তত শেহরিনের অবস্থানটা সঠিক বিবেচনা করো। আমি তোমাকেও রান্না করতে বলছি না। দরকার হলে আরো দু চারটা হেল্পিং হ্যান্ড রাখো। কোনো সমস্যা নেই।"
" এতোটাও খারাপ সময় আসেনি যে হেল্পিং হ্যান্ডের হাতে রান্না খেতে হবে। আমি যতদিন আছি রান্না নিজ হাতেই করবো।"
শাহজাহান সাহেব কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত চাহনি মেলে বলেন," নিজেই যখন রান্না করবে তখন বাচ্চা মেয়েটাকে ছাড় দাও। এখনি এতো ব্যস্ত হতে হবে না। বিয়ের পর তুমিও কিন্তু বেশ কাঁচা ছিলে রান্নায়। পুরো দেড় দুই বছর পরে পাকা হয়েছো। ওকেও সেই সময়টা আসতে দাও। দেখবে একদিন আমার ছোট বউমার রান্না আমি কবজি ডুবিয়ে খাচ্ছি। "
সান্নিধ্যের দিকে তাকিয়ে শাহজাহান সাহেব ফের স্বতঃস্ফূর্ত কন্ঠে বলেন,"কোনো প্রেশার নেই সান্নিধ্য। তুমি চিন্তা করো না। তোমার ওয়াইফের ভালো মন্দ দিকটা যে তুমি এতো ব্যস্ততার মাঝেও খেয়ালে রেখেছো এই একটা বিষয় আমার খুব ভালো লেগেছে। সারাজীবন দায়িত্বটা পালন করে যাবে।
আর আমি আমার স্ত্রীর ভালো মন্দ দেখছি। রান্নাটা যখন সে করবেই তার কাজের সুবিধার্থে যেসব ব্যবস্থা নিতে হয় নিবো। সমস্যা কি? "
"বোঝার জন্য থ্যাংকস বাবা । সামনে সেমিস্টার ফাইনাল এক্সাম শেষ না হওয়া পর্যন্ত শেহরিনকে কিচেনে যেতে আমি মানা করেছি। এক্ষেত্রে কোনো কথা আছে কি?"
" না কোনো কথা নেই। নাজনীন তোমার কোনো কথা আছে ..?
"না কোনো কথা নেই।"
" ঠিক আছে।"
" বাবা, তোমাকে সামনে রেখে আমি আজকে একদম ভেঙে সব কথা বললাম। নেক্সট টাইমে কিন্তু এসব নিয়ে আমি মোটেও কথা বলবো না। এগুলো আমার কাজ না। তবে হ্যাঁ, পরিস্থিতি প্রতিকূল দেখলে বা আমার চোখের আড়ালে যদি বিপরীত কিছু হয় আর আমি যদি সেটা জানতে পারি তাহলে কিন্তু আমি মোটেও চুপ থাকবো না। তোমার মতো আমিও আমার স্ত্রীকে ভালো রাখার বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হবো। কোনো অনুরোধ কিন্তু আমি তখন গ্রাহ্য করবো না।"
" শান্ত হও শান্ত হও। তোমার আম্মা নিশ্চয়ই বুঝেছেন। শেহরিন শুধু ছেলের বউ হবে কেনো আমাদেরও মেয়ে সে। সানজি শেহরিন তিথি সবাই আমাদের মেয়ে। দু মেয়েকে ভালোবাসবো আর এক মেয়েকে ভালোবাসবো না তাই কখনো হয়? কি বলো নাজনীন? শেহরিনকে পারবে তো নিজের মেয়ে করে নিতে?"
মিসেস নাজনীন চুপ থেকে আলতো করে মাথা নাড়িয়ে সায় জানান। ছেলের শেষ কথাটা তার মনে সামান্য ভীত জাগায়। বিকল্প পথ খুঁজবে মানে? কি বিকল্প পথ?
" আচ্ছা অনেক রাত হয়ে গিয়েছে। আর এসব নিয়ে কথা না বলি। চলো এবার সবাই।"
মিসেস নাজনীন চলে যেতেই সান্নিধ্য বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। বাবার সাথে হাত মিলিয়ে করর্মদান করে সে । শাহজাহান সাহেব ছেলের পিঠ চাপড়ে আশ্বস্ততার আভাস দিয়ে মৃদু হাসেন। এই ছেলের একরোখা স্বভাব তাকে মাঝে মাঝে বিচলিত করলেও তার কাজগুলোতে বরাবরই সন্তষ্ট থাকেন তিনি।
" শেহরিনকে নিয়ে খুব কনসার্ন তুমি। "
"সি ইজ মাই সোলমেট বাবা, নট মাই শেফ। ওর বিষয়ে কনসার্ন থাকাটাই আমার মেইন কাজ। "
" গুড।"
"আম্মাকে ভালো করে বোঝানোর দায়িত্ব দিলাম তোমাকে। নিজেকে এক্সাম্পল হিসেবে দেখাবা তাহলে হয়তো ভালো বুঝবে। "
" ঠিক আছে আমি বুঝাবো। এটা নিয়ে আর ভেবো না।"
"আচ্ছা ঘুমাও এখন । গুড নাইট।"