|মঙ্গলবার, বেলা এগারোটা, চুয়েট |
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবিশাল ভবনের করিডোরে আলো ছায়ারা এসে লুকোচুরি খেলছে ছন্দহীনভাবে। ক্যাম্পাসজুড়ে ভোরে উঠা আসা রোদ্দুর তার মাত্রা ছাড়িয়েছে প্রখরভাবে। গরমের দাবদাহটা অন্যান্য দিনের তুলনায় আজকে বেশি । বাংলা ক্যালেন্ডারের পাতায় আষাঢ় শেষ হয়ে এলেও খুব একটা বৃষ্টি দেখা দেয়নি এইমাসে। অপেক্ষা এখন শ্রাবণের বারিধারার। পুরনো আমগাছের নিচে গা জুড়ানোর প্রয়াসে একদল ছাত্র ছাত্রী জমিয়েছে চা আড্ডার আসর।
তবে সবকিছু ছাপিয়ে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের চলছে পুরোদমে ক্লাস। আর মাত্র কয়দিন পরেই ইয়ার ফাইনাল। শেষ মুহুর্তের ক্লাসগুলো তাই বেশ জোরদারভাবে নেওয়া হচ্ছে।
কিছু ক্ষণ আগে অব্দি চলছিলো ড.রাইসুল ইসলাম স্যারের স্ট্রাকচারাল অ্যানালাইসিস ক্লাস। বোর্ড ভর্তি সমীকরণ, ডায়াগ্রাম আর খাড়া দাগ । কিন্তু এখন সবকিছু বন্ধ । পুরো ক্লাস মৌনতার চাদরে ঢাকা পড়েছে। সামান্যতম শব্দের উৎস খুঁজে পাওয়াও মুশকিল। ভেসে আসা গম্ভীর পুরুষালি কর্কশ কন্ঠস্বরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে শেহরিন। বুকের ভিতরে তার উথাল পাথাল কাঁপুনি বয়ে যাচ্ছে। মেহেদী রাঙা হাতদুটোর তালু বরফে জমে ঠান্ডা হয়ে এসেছে। গলা শুকিয়ে কাঠ।
" আপনি কি জানেন, এই কোর্সের ভ্যালু কী? একদিন, দুইদিন নয় আপনি এতদিন ক্লাস মিস করেছেন । সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে এসেছেন না কি বেড়াতে এসেছেন ? এখানে তো আপনার বাবা মায়ের টাকা, দেশের টাকায় পড়ছেন । পড়াশোনায় দায়িত্বশীল না হলে আগামীকাল সেতু ডিজাইন করবেন কীভাবে ? ভবন নির্মাণ করবেন কীভাবে? মানুষের জীবন কি আপনার কাছে খেলনা ?"
ড.রাইসুল ইসলাম স্যার শেহরিনের জবাবের জন্য যৎসামান্য সময় অপেক্ষা করেন। অতঃপর আবারো কাঠিন্য সুর তুলে বলেন,
" যে ছাত্রী প্রথম বর্ষ হতেই ক্লাসে নিয়মিত উপস্থিত না হয়ে, শৃঙ্খলাকে তুচ্ছজ্ঞান করে সেই ছাত্রী হতে ভবিষ্যতে একজন দায়িত্বশীল ইঞ্জিনিয়ার কিভাবে আশা করা যায়? ডু ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড মাই পয়েন্ট? "
শেহরিন নিশ্চুপ। তার কাছে সত্যি কোনো জবাব নেই। কি জবাব দিবে সে? ভুল হয়তো তারই। অসুস্থতার কারনে আট নয়দিনের মতো অনুপস্থিত থাকার পরেও বিয়েসহ নানা কার্যে আরো পাঁচ ছয়দিন গ্যাপ দিয়েছে। ইশ্ কালকে ইচ্ছেকৃতভাবে ক্লাসটা মিস না দিলে হয়তো আজ এমন জবাবদিহিতার মুখে পড়তে হতো না।
ড.রাইসুল ইসলাম স্যারের ক্লাসটা কালকে লাস্টে ছিলো। হতভাগা মেয়ের খেয়ালেই ছিলো না এই স্যারের ক্লাসটা সে দীর্ঘ দিন যাবত গ্যাপ দিয়ে আসছে। সেটা অসুস্থতা কিংবা বিয়ে উপলক্ষে যেটাই হোক না কেনো ।কালকে কি ভেবে যে ক্লাসটা মিস দিয়ে বাসায় গেলো। আর আজকে পড়লো ধরা। পুরো ক্লাসে ৬০ জন ছাত্র ছাত্রীর মধ্যে ৫৭ জন প্রজেক্ট জমা দিলেও দেয়নি তিনজন। বাকিদুজন অনুপস্থিত থাকলেও শেহরিন আজকে উপস্থিত। লাস্ট ডেট ছিলো আজকে। তাও এই বাঘের মতো স্যারের প্রজেক্ট।
" ইউ নো, ইঞ্জিনিয়ারিং মানে শুধু বইয়ের সূত্র মুখস্থ করা নয়। এটা হলো শৃঙ্খলা, অঙ্গীকার এবং জবাবদিহিতার নাম। আপনি একটা কলাম ডিজাইন করবেন এবং সেটা যদি কোনোভাবে ভুল হয় তাহলে শুধু নাম্বারই কাটা যাবে না। শত শত মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার পন্থা তৈরি হবে। একটা ব্রিজ নকশা করবেন সেখানে আপনার অসাবধানতাজনিত ছোট একটা ভুল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলবে। ওভারঅল,আপনাকে বুঝতে হবে আপনি কোন স্টেজে এসে পড়াশোনাটাকে হেলাফেলা করছেন। এটা প্রাইমারি সেকশন নয় মন চাইলে ক্লাসে আসবেন, না চাইলে আসবেন না। "
ড.রাইসুল স্যার, যার কঠোরতা পুরো সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টে আলাদা কিংবদন্তি হিসেবে পরিচিত করিয়েছে। যার কথা শুধু ধারালো ফলা হিসেবে নির্গত হয় না, জ্বলন্ত শিখার ন্যায় উত্তাপ ছড়ায়। দায়িত্ববোধের দিকে তার একনিষ্ঠতা পুরো ডিপার্টমেন্ট তাকে সমীহ করে চলে।
" আপনি যদি প্রফেশনালিজম শব্দটাকে গুরুত্ব সহকারে নিতে না পারেন তাহলে প্লিজ পড়াশোনা ছেড়ে দিন। আপনার মতো হাজার হাজার স্টুডেন্ট পরে আছে। কোনো দরকার নেই। সাত আটটা করে ক্লাস মিস দিয়ে হুটহাট আমার ক্লাসে উপস্থিত হবেন সেটা আমি অ্যালাউ করবো না। কোনোভাবেই না। কারণ আমি ক্লাসে যা শেখাই যা পড়াই সেটা আপনাদের ভবিষ্যত জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আপনার অ্যাটেনডেন্স নেই, প্রজেক্ট নেই, চলমান ক্লাস সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। শুধু শুধু ক্লাসে কেন এসেছেন? বেড়াতে নাকি নিজের ইচ্ছেমতো চলতে? আন্সার মি!
শেহরিন চোখ বন্ধ করে কপাল ভাঁজ করে সবকিছু হজম করে নেয়। নিজের ভিতরে অনুশোচনা সেই সাথে ক্ষমাপ্রার্থনা করার জন্য মনে মনে সাহস সঞ্চার করতে থাকে। স্যারের কথাগুলো শোনার পর মনে হচ্ছে সত্যি ভুলটা তার। কেন যে এই গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসগুলোকে সে মিস দিয়েছে। কেন এমন দায়িত্বজ্ঞান হীনতার পরিচয় দিয়েছে। পড়াশোনাটাকে তো সে ভীষণ সিরিয়াসভাবে নিয়েছিলো হঠাৎ এমন হলো কেন?
চোখ খুলে সে ধীরে ধীরে মাথা উঁচু করে। সবার দৃষ্টি তার দিকে নিবদ্ধ। কারো দৃষ্টিতে সহানুভূতি, কারো দৃষ্টিতে কৌতূহল তো কারো দৃষ্টিতে উপভোগের আভাস।
" স্যার..আমি আমার কাজের জন্য দুঃখিত এবং লজ্জিত । ভবিষ্যতে এ ধরনের ভুল আর কখনোই করবো না। আমি আমার সকল কাজের জন্য ক্ষমাপ্রার্থী। "
এতোক্ষণ পর কাঁপা কন্ঠে সত্য স্বীকারোক্তি দানে ড.রাইসুল ইসলাম স্যারের কপালে রাগান্বিত ভাঁজটা কিছু শিথিল হয়ে আসে। তিনি চান, শিক্ষার্থীরা নিজেদের ভুল বুঝে সংশোধন করে নিজেদের পুনরায় গড়ুক। ডেস্ক হতে একটা চক হাতে তুলে নিয়ে সবার সামনে উন্মুক্তভাবে তুলে ধরে বলেন, " এই চকটাকে দেখুন। এটা ভঙ্গুর। একটু অসাবধানভাবে ধরলেই ভেঙে যাবে। বাট আমরা সবচেয়ে মজবুত কাঠামোর নকশা এটা দিয়েই আঁকি। দূর্বল জিনিস দিয়ে শক্তিশালী জিনিসের রূপরেখা তৈরি করি। আপনারা সবাই এই চকের মতো নাজুক। কিন্তু আপনাদেরকে ইস্পাতের ন্যায় শক্তিশালী হতে হবে। আর সেটা শৃঙ্খলাই পারে গড়ে তুলতে। কাজের প্রতি দায়িত্বশীল হতে শিখুন। প্রথম বর্ষটা হচ্ছে নিজেকে তৈরি করে নেওয়ার সময়। ধীরে ধীরে যত উপরে উঠবেন তখন পড়াশোনার প্রেশারে নিজেকে ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবেন না। আমার কথা কি বুঝতে পেরেছেন আপনারা? "
ক্লাসে সবাই এতোক্ষণের নিরবতা ভেঙে সমস্বরে স্যারের প্রশ্নের জবাব দিতে বলে, " জ্বি স্যার।"
ক্লাসের প্রায় পনেরো মিনিট ব্যয় হয় আজকের বিষয়টা নিয়ে। একের পর এক কথা ভেসে আসতে থাকে। ড.রাইসুল ইসলাম স্যার নিজেকে ধীরে ধীরে কঠোরতা দমিয়ে হালকা করে নেন। শেহরিন হতে কিছুটা দূরত্ব দাঁড়িয়ে স্থির কন্ঠে বলেন,
" আপনাকে একটা বিম ডিজাইন প্রজেক্ট দেওয়া হলো। কালকের ক্লাসেই আমি সেটা দেখতে চাই। বুঝতে পেরেছেন? "
"জ.. জ্বি স্যার।"
" আপনার রেজিষ্ট্রেশন নাম্বারটা আমি মাথায় রেখেছি। এটাকে রেড অ্যালার্ট হিসেবে ধরে নিতে পারেন। বসুন।"
অবশেষে দীর্ঘ পঁচিশ মিনিটের ভয়ংকার যাত্রা শেষ হয়। শেহরিন চুপচাপ বসে পড়ে সিটে। বুকের মধ্যে এখনো তার অস্থিরতা বিরাজ করছে। এরকম অপমান আজকে দিয়ে দ্বিতীয়বার হলো৷ এর আগে কলেজ লাইফে একবার হয়েছিলো। সবাই বলে টপ স্টুডেন্টরা নাকি স্যারদের বোকাঝোকা শুনে না। ফেবারিট ওয়েভার হিসেবে পরিচিত থাকে। সকল অন্যায়ে সহজেই ক্ষমা পেয়ে যায় । কিন্তু শেহরিনের বেলায় উল্টো। সে স্কুল লাইফ থেকে বর্তমানে ভার্সিটির প্রথম সেমিস্টার অব্দি প্রথম সারির স্টুডেন্ট হিসেবে এখনো নিজেকে ধরে রেখেছে। কিন্তু ফেবারিট ওয়েভার তার বেলায় এসে আর কাজ হয় না। অপমান তাকে হতেই হয়।
ক্লাস সময় শেষ হয় তারও কিছুক্ষণ পরে। স্যার চলে যেতেই মৃদু গুঞ্জন উঠে তাকে ঘিরে। শেহরিন সেসবে পাত্তা না দিয়ে ভাবে স্যারের দেওয়া কাজটা নিয়ে। যেভাবেই হোক কালকের মধ্যে তাকে কমপ্লিট করে জমা দিতে হবে। তা নয়তো চুয়েট ক্যাম্পাস তাকে আজীবনের জন্য ছাড়তে হবে৷ এই স্যারের সামনে দ্বিতীয়বার অপমান হওয়ার চাইতে পড়াশোনা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া ভালো।
" হেই শেহরিন। মুড অফ?"
শেহরিন বই খাতা গুছিয়ে ব্যাগে তুলতে তুলতে ধীর কন্ঠে ছোট করে জবাব দেয়, "নাহ।"
" স্যার এমনিতে অনেক রাগী। তার উপরে তুমি এতোদিন তার ক্লাসে আসোনি। বকা দেওয়াটা নরমাল। বাই দ্যা ওয়ে তোমার কি বিয়ে হয়েছে? "
শেহরিন ভ্রু তুলে তূর্ণার দিকে তাকিয়ে বলে, "কেন? "
" মনে হচ্ছে দেখে। হাতে মেহেদী, আঙুলে রিং, গলায় চেইন।"
" এতোকিছু খেয়াল করেছো? "
" তুমি তো ভার্সিটিতে একদম নরমাল লুকে আসো। অর্নামেন্টস পরা দেখিনি এর আগে। আবার এতোদিন গ্যাপ। সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে বিয়ে হয়েছে তোমার।"
শেহরিন মুখে জোরপূর্বক হাসি টানে৷ বিয়ের ব্যাপারটা সে চায় না সবার সামনে উন্মুক্ত করতে। কারণ এখন যদি সে স্বীকার করে তাহলে পুরো ডিপার্টমেন্ট ছড়াবে। সেই সাথে নেতাসাহেবের ছবি দেখতে চাইবে। যেখানে স্বয়ং নেতাসাহেব নিজেই এতো কড়া প্রাইভেসি মেইনটেইন করে চলছে বিয়েটা নিয়ে। সেখানে তার এভাবে জাহির করাটা অনুচিত অন্তত তার পারমিশন ছাড়া। নিশ্চয়ই এর পিছনে যর্থাথ কোনো কারণ রয়েছে বিধায় সে চুপচাপ আছে। কি জানি শত্রুর ব্যাপার স্যাপারও থাকতে পারে।
" সেরকম কিছু নয় । মেয়েদের উইকনেস অর্নামেন্টসে থাকবে এটাই স্বাভাবিক।"
" হেই গাইস কি করছো তোমরা? "
একে একে দলবেঁধে আরেফিন, অর্ক, নিশি জায়ান এসে ভীড় জমায় শেহরিনদের পাশে। অর্ক চোয়ালে হাসি ঝুলিয়ে বলে,
"শেহরিন আজকে ডোজটা কেমন খেলে? কয়দিন আগে নিশাতও খেয়েছিলো। ওকে তাও অল্পতে ছেড়েছিলো। বাট তোমাকে একদম... "
" দোস্ত এই প্রজেক্টে যে প্যারা খেতে হয়েছে। শেহরিন গ্যাপ দিয়ে একদিকে ভালোই করেছে। ওকে আজকে স্যার যেটা দিয়েছে সেটা খুব একটা কঠিন নয়।"
শেহরিন নিরবে সবার মজা নেওয়া থেকে শুরু করে প্রত্যেকের জ্ঞান বাক্য হজম করতে থাকে। আজ তার হজমের দিন। সব হজম করতে হবে। মনে মনে ঋতমার উপরে তার রাগ জমে। এই মেয়ে দুদিন ক্লাসে আসে তো তিনদিন আসে না। আমেরিকা যাবি যা ক্লাসটা অনন্ত করে যা। প্রজেক্ট জমা না দিয়েই লাপাত্তা হয়ে গিয়েছে।
তবে সুবিধা একটাই ওর অপমান হওয়ার সুযোগ নেই । কারণ এই স্যারের ক্লাস সে অনেক আগেই বাদ দিয়েছে। এদিকে ভিসা ও রেডি। এখন শুধু হাতের মুঠোয় আসতে বাকি। তবুও তো অনেকদিন। এই কয়টাদিন ক্লাসে আসলে কি হয়? অন্তত এই সাপদেরকে তো হজম করতে হয় না।
" আমার প্রতি তোমাদের এতো সহমর্মিতা দেখে অবাক হচ্ছি। প্লিজ এটা নিয়ে গসিপ পরে করো। আমাকে স্যারের বিগত ক্লাসের নোটস গুলো দিতে পারবে কেউ?"
নোটসের কথা শুনে সবাই এক লহমায় চুপ হয়ে যায়। শেহরিন আঁড়চোখে প্রত্যেকের অভিব্যক্তি লক্ষ্য করে। তূর্না আমতা আমতা স্বরে বলে, " আমার তো নোটস করাই হয়নি। এই তোদের নোটস থাকলে প্লিজ ওকে দে।"
"ভাই আমি আর নোটস? ওসব আমাকে দ্বারা হবে না।"
" নিশি তোমার কাছে নেই? "
" সরি শেহরিন আমার অনেক গ্যাপ আছে এই সাবজেক্টে। আমি অনেক কষ্টে নোটস কালেক্ট করেছি। পড়তে হবে। তুমি তো এমনিতেও টপ। "
" আর আমার যে লেখা ওগুলো তুমি তো বুঝবেই না।"
প্রত্যেকের বাহানা শেহরিনের এতোদিনে চেনা হয়ে গিয়েছে। এরা এতোটাই স্বার্থপর যে পড়াশোনা বিষয়ে কিছু শেয়ার করবে না। হয়তো হিংসা থেকেই এমনটা করে। শেহরিনের টপ রেজাল্টটা চক্ষুশূল। অথচ এই হাসিমাখা মুখগুলো দেখে কে বলবে এদের ভিতরে এতো অন্ধকার। ওদের প্রয়োজনে ঠিকই তার থেকে নোটস কালেক্ট করতে আসে।
শেহরিন এতো চেয়েও কেনো জানি স্বার্থপর হতে পারে না। বিবেকে বাধে তার। মিথ্যা কোনো অজুহাত দিতে পারে না। তবে, আগের চেয়ে সে নিজেকে বেশ শক্ত করেছে। হোক সে একা তবুও এদেরকে অতিরিক্ত সে আর প্রশয় দেয় না। নরম সুরেও কথা বলে না।
" বুঝতে পেরেছি নেক্সট টাইম থেকে আমার হাতের লেখাও খারাপ করতে হবে। সুন্দর লিখে কি লাভ। মার্কসটাই তো মেইন। এমন করবো যাতে নিজের লেখা নিজেই না বুঝতে পারি। অন্যকেউ তো আরো নয় । "
হালকা খোঁচা মেরে ব্যাগখানা কাঁধে তুলে সিট হতে বেরিয়ে আসে শেহরিন। আজকের মতো ক্লাস শেষ। এখন কালকের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত নিতে হবে। না জানি কালকে আবার কি হবে।
" শেহরিনকে দেখে যতোটা নরম মনে হয় আসলে ও ততটা নরম নয়। বেছে বেছে জায়গা মতো বাঁ'শ দিয়ে দেয়। অথচ দেখলে যে কেউ বলবে ইনোসেন্টের ডিব্বা।"
" রাইট। স্যার আজকে এতো অপমান করলো অথচ ওর মধ্যে সেরকম কোনো রিয়াকশনই নেই। এতোগুলো ক্লাস মিস দিয়ে কালকের প্রজেক্টটা আদৌও পারবে তো?"
জায়ানের কথায় তূর্ণা সন্দেহী কন্ঠে বলে, " ডোন্ট নো। বাট ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট, পারতেও পারে। বাট আমার কেনো জানি, ওকে দেখে মনে হচ্ছে ওর বিয়ে হয়েছে। "
" হুঁশ বিয়ে করলে আমরা জানবো না? "
" লুকিয়ে লুকিয়েও তো বিয়ে করতে পারে? "
" লুকিয়ে লুকিয়ে বিয়ে করার কি আছে? "
"বাই দা ওয়ে আরেফিন তুই তো আমাদের থেকে ওকে একটু হলেও ভালো চিনিস। কেউ আছে নাকি? "
আরেফিন কাঁধ ঝাঁকায়। ঠোঁট উল্টে বলে, " আমি জানবো কিভাবে? আমি তো ওর বেস্টফ্রেন্ড নয়। তবে হ্যাঁ একদিন রেস্টুরেন্টে এমপি সান্নিধ্য শাহজাদ খানের সাথে ওর পরিচিতি ভাবটা খেয়াল করেছি।"
" সিরিয়াসলি এমপি? "
" শিউর নয়। বাট কিছু একটা মনে হয়েছিলো... "
" এজন্যই কি লুকোচরি?"
" হলেও হতে পারে।"
তূর্ণা বাঁকা হেসে বলে,
" বাহ তাহলে তো হলোই। দেখি আমার ধারণাটা কতটুকু সত্য হয়। কালকের ক্লাসে ওকে টেস্ট করবো।"
" লাভ কি দোস্ত ? "
" লাভ লোকসানের কিছু নয়। ইউ ক্যান সে ইট অনলি কিউরিওসিটি।"
_________________________________________
|জাতীয় সংসদ অধিবেশন, ঢাকা|
ঢাকার শের-এ-বাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় সংসদ ভবনের পরিধি বিশাল ও গম্ভীর। আধুনিক স্থাপত্যশৈলী যেন গণতন্ত্রের মহিমা ও রাষ্ট্রের জটিলতারই প্রতীক। ভিতরের প্রধান কক্ষটি আজ সয়লাবে ভরপুর। দেশের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানের সদস্যরা আজ উপস্থিত হয়েছেন তাদের নিজস্ব কর্মকান্ডের জবাবদিহিতা এবং বাজেট প্রণয়ন নিয়ে।
দীর্ঘ সময় যাবত চলছে এই অধিবেশন। সরকারের কর্মকান্ড, উন্নয়ন প্রকল্পসহ, বাজেটের নীতি নির্ধারন নিয়ে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা সমালোচনা। সরকারি দল এবং বিরোধী দলের তর্ক বির্তক সেই সাথে উচু নিচু কন্ঠস্বরে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা।
মাননীয় স্পিকার সবাইকে চুপ থাকার নির্দেশ দিয়ে পরিবেশ পরিস্থিতি স্থিতিশীল করেন। পরবর্তীতে বক্তব্য প্রদানের জন্য তিনি জোরালো কন্ঠস্বরে বলেন,
" আসন নং ৩৪, চট্টগ্রাম -২ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য সান্নিধ্য শাহজাদ খান। আপনাকে কথা বলার জন্য নির্দিষ্ট সময় প্রদান করা হলো।"
পুরো সংসদ অধিবেশনে সবচেয়ে কনিষ্ঠতম সাংসদ সান্নিধ্য শাহজাদ খান। বয়স মাত্র ৩২ হলেও চেহারা চালচলনে গাম্ভীর্যের ছাপ বিদ্যমান। পরনে তার আজকে সাদা পাঞ্জাবির জায়গায় ক্রিম কালার পাঞ্জাবি। দৃঢ় প্রান্তবন্ত তার মুখোরেখা।
সুর্দশন এই অল্প বয়সী নেতাকে নিয়ে পক্ষ বিপক্ষ দুই দলেরই বেশ আগ্রহসীমা রয়েছে।
দক্ষ হাতে সামনের মাইক্রোফোনটি ঠিক করে গভীর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে সম্মুখের সারির মন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেতাদের দিকে সান্নিধ্য। এক ঝলক তাকিয়ে সেদিক হতে দৃষ্টি ফিরিয়ে মাননীয় স্পিকারের দিকে মনোনিবেশ করে সে। সুস্পষ্ট গলায় মাননীয় স্পিকারকে ধন্যবাদ দিয়ে সরাসরি নিজস্ব কাজের জবাবদিহিতায় চলে যায়। একে একে নিজ এলাকার উন্নয়নের সমস্ত হিসেব নিকেশ উপস্থাপন করা শুরু করে সান্নিধ্য। নতুন সড়ক, স্কুল, হাসপাতাল, বিদ্যুতায়ন প্রতিটি প্রকল্পের নাম, ব্যয়, অগ্রগতি এবং জনগণের উপর তার প্রভাব নিখুঁতভাবে তুলে ধরে।
"এখন প্রশ্ন হলো, জনগণের টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে আমরা কী ব্যবস্থা নিয়েছি? এর জবাবদিহিতা কোথায়?"
সান্নিধ্যের কথার মাঝেই বিরোধী দলের একজন প্রবীণ সদস্য হঠাৎই বলে উঠেন, "জবাবদিহিতা? জবাবদিহিতা তো আপনার নিজের মন্ত্রণালয়ের কাছেই নেই। আপনি কিভাবে দিবেন। শুধু মুখে বললে তো হবে না। প্রমাণ চাই। "
" প্রমাণ না দেখাতে পারলে আমি জবাবদিহিতার কথা তুলবো কেন? "
" এরকম কথা অনেকেই বলে।"
শুরু হয় তর্ক বির্তক। সান্নিধ্য বিরক্ত হয় খানিকটা। কপাল কুঁচকে শক্ত কন্ঠে বলে, "মাননীয় স্পিকার, আমি আমার বক্তব্য প্রদান করছি । বিরোধী দলের মহোদয় যদি কোনো প্রশ্ন রাখেন, আমি তার জবাব দিতে প্রস্তুত। কিন্তু অপ্রাসঙ্গিক মন্তব্য করে এই গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ককে অস্থির করা উচিত নয়।"
"আপনি নিজেই তো অপ্রাসঙ্গিক হচ্ছেন। আমার কথা শেষ হতে দিন। "
আবারো উত্তাপমাখা মন্তব্যে স্পিকার জোরে কাঠের হাতুড়ি দিয়ে ডেস্কে আঘাত করে বলেন, "শৃঙ্খলা বজায় রাখুন। মাননীয় সদস্য আপনি আপনার বক্তব্য চালিয়ে যান।"
সান্নিধ্য দৃঢ়, অটল ভঙ্গিতে তার বক্তব্যগুলো আবারো উপস্থাপন শুরু করে। বিরোধী দল হতে আগত প্রত্যেকটা মন্তব্য যুক্তি খণ্ডনসহ তুলে ধরে। কথা কাটাকাটি, হাততালি, সমর্থন, প্রতিবাদ সব মিলিয়ে চলতে থাকে তার কার্য।
" মাননীয় স্পিকার, তরুণ এই সংসদ সদস্য খুব সুন্দর করে তার কর্মকান্ড তুলে ধরলেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো তার নিজস্ব দলের কর্মীরাই দূর্নীতিতে যুক্ত। বিশ্বাস কোথায়? তার কাজ যে সুষ্ঠুভাবে হয়েছে এটা কি আমরা তার সুন্দর বাচন ভঙ্গি দেখে বিশ্বাস করে নিবো? যেখানে লাখ টাকার বাজেট কোটি টাকায় গিয়ে স্থানান্তর হয় সেখানে এসব বাণী কতটা গ্রহণযোগ্য?। "
সান্নিধ্য বিরোধী দলের জৈষ্ঠ সদস্যের কথায় হালকা ঠোঁট প্রসারিত করে ঠান্ডা গলায় বলে,
"জনগণ আমাদের কাছে জবাবদিহিতা চায়, আর আমরা এই সংসদে তারই প্রতিফলন দেখাতে এসেছি। সত্য মিথ্যা যাচাই করার জন্য অনেক উপায় রয়েছে। আমার কাজে যদি আমার এলাকার মানুষ সন্তুষ্ট থাকে তাহলে আমি বাধ্য নই নিজেকে সত্য এবং সুষ্ঠু প্রমাণ করার জন্য। মাননীয় সদস্য, আপনাকে ধন্যবাদ সমালোচনা করার জন্য। আপনাকে অনুরোধ করবো ইতিহাসের পাতা না উল্টিয়ে সময় কিল না করে বর্তমান এবং ভবিষ্যতের দিকে নজরদারি করতে।"
সান্নিধ্যের কথাতে সরকারদলের পক্ষ হতে সমর্থিত সুর ভেসে আসে।বিরোধী দলীয় সদস্য ফের কাউন্টার অ্যাটাক করার জন্য উদ্যত হলে মাননীয় স্পিকার তাকে প্রতিহিত করে বলেন,
" please, Let's stick to the issue.Personal attacks won't be tolerated. "
সান্নিধ্য তার আর অল্প কিছুক্ষণের সময়ের মাঝে নিজস্ব বাজেট উত্থাপন করে। সেই সাথে মাননীয় অর্থ মন্ত্রীকে অনুরোধ করেন সঠিক বাজেট অনুমোদিত করার জন্য। দূর্নীতির বিশাল ছায়া গ্রাস করছে তাদের নিজস্ব দলের ভিতরেই। আর তার এই অকপটে বাজেট নিয়ে কথা বলায় নিজ দলের কিছু কিছু উঁচু পর্যায়ের নেতারা মন ভারী করে ফেলে সঙ্গে সঙ্গে।
" অল্প বয়সী ছেলে রক্তগরম। এতো আমলে নেওয়ার কিছু নেই।"
"আপনি না চিনে এমনি একটা মন্তব্য করবেন না। এই ছেলে রাজনীতিতে পাকা খেলোয়াড়।"
" বাজেট নিয়ে এতো ভাবতে বলেছে কে? "
"এর পিছনে লম্বা কারণ আছে। "
"কারণ দেখে লাভ নেই সাহেব। লোক দিয়ে বুঝিয়ে প্রতিহত করুন।নইলে পকেটে কি তুলবেন? "
প্রতিমন্ত্রীর কথায় চট্টগ্রাম -৯ আসনের সংসদ সদস্য মাথা নাড়িয়ে সায় জানায়। চলমান বক্তব্যের মাঝেই দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলেন, " সহজভাবে বুঝবে না এটা নিশ্চিত। বাঁকা মানুষকে বাঁকা ভাবেই বুঝাতে হবে। দেখা যাক, ঘুঘুকে ফাঁদে ফেলানো যায় কি না।"
---------------------------------------------------------
|সুখনিবাস, দুপুর দুটো |
শেহরিন ভার্সিটি হতে এসে শাওয়ার নিয়ে নিচে নামে। শাশুড়ী মায়ের সঙ্গে হাতে হাতে টুকটাক কাজ করার জন্য পা বাড়ায় কিচেনে । যদিও রান্না বান্না সব হয়েই এসেছে। এখন শুধু ডাইনিংটা রেডি করতে হবে। তবে সবকিছু স্বাভাবিকভাবে চললেও মাথার মধ্যে তার অগাধ চিন্তা। কখন স্টাডি টেবিলে বসবে, কখন প্রজেক্টটা কমপ্লিট করবে।
শাহজাহান সাহেব ড্রয়িংরুমে সুবিশাল আকৃতির টিভিতে চলমান সংসদ অধিবেশন অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে দেখে চলেছেন। কি কারণে কপালে তার ভাঁজ সেটা শেহরিন বুঝতে পারে না। যাওয়া পথে পা থামিয়ে এক পলক টিভির দিকে তাকিয়ে খুঁজতে থাকে তার ব্যক্তিগত নেতা সাহেবকে। কিন্তু বয়োজ্যেষ্ঠ এক নেতাকে বক্তব্য প্রদান করা দেখে সে আগ্রহ হারিয়ে মাথায় আঁচল টেনে ধীর কন্ঠে বলে,
" বাবা খেতে আসুন।"
" বউমা? কখন এলে ভার্সিটি থেকে? "
"এইতো একটু আগে বাবা ।"
" আচ্ছা আচ্ছা। সান্নিধ্যকে দেখেছো? একটু আগে বক্তব্য রাখলো। "
শেহরিন ফের টিভির পানে তাকিয়ে ছোট করে জবাব দেয়, " দেখা হয়নি। "
" বলো কি! আসো, বসো বসো। তোমার স্বামীকে টিভির পর্দায় দেখাচ্ছে আর তুমি দেখবে না। তাই কখনো হয়? "
" না বাবা ঠিক আছে সমস্যা নেই আমি পরে...
শেহরিন কথা শেষ করার আগেই সান্নিধ্যেকে ফের দেখানো হয় টিভিতে। ক্যামেরা তার দিকে তাক করানো হয় কিছু সময়ের জন্য। কিন্তু নেতাসাহেবের দৃষ্টি তার কাগজের দিকে। কিছু একটা লিখে চলেছেন সে সুসঙ্গত অঙ্গভঙ্গিতে।
শেহরিনের চোখে তার সুপুরুষ ধরা দিতেই আপনাআপনি মুখে হাসি ফুটে যায়। নির্নিমেষ চাহনিতে তাকিয়ে দেখতে থাকে নেতাসাহেবকে। মনের মধ্যে ঠান্ডা হাওয়া দোল দিয়ে যায়। পরিতৃপ্তিতে ভরে উঠে দুচোখ তার।
যান্ত্রিক মাধ্যমে স্বল্প সময়ের দেখাদেখির সমাপ্তি ঘটে। ক্যামেরা আবারো ঘুরে যায় সেই বয়োজ্যেষ্ঠ লোকের দিকে। শাহজাহান সাহেব ছেলের বধূকে বলেন, " দাঁড়িয়ে আছো কেন বউমা। বসো বসো। একটু শোনো। রাজনৈতিক হালচাল তোমারও তো জানতে হবে বুঝতে হবে। স্বামী রাজনীতিবিদ বলে কথা।"
শেহরিন ঠোঁট চেপে মনে মনে বলে, " মাফ করবেন বাবা। আপনার ছেলের সাথে এই নিয়ে আমার চুক্তি হয়ে গিয়েছে। তার রাজনৈতিক জগতে আমার কোনো উপস্থিতি থাকবে না। এটা একান্তই তার বিষয়। আমার কোনো হস্তক্ষেপ নেই। আর আমি আমার চুক্তিতে অটল।"
মনের কথা মনে রেখে শেহরিন নরম হেসে বলে, "সমস্যা নেই। আম্মা একা একা কিচেনে আছেন। ওদিকটা একটু দেখতে হবে। আপনি খেতে আসুন বাবা।"
শ্বশুর সাহেবকে কোনমতে কাটিয়ে নববধূ চলে যায় কিচেনে। এই দুদিনে সে বাবা ডাকটা বেশ আয়ত্ত করে ফেলেছে। এখন আম্মা ডাকটা আরো একটু প্রস্ফুটিত করতে পারলেই এনাফ। কালকে রাতে হাজারো কুণ্ঠাবোধকে সরিয়ে একবার ডেকেছে সে। আর একবার এই ডাকেই বেশ সাহস এসেছে বুকে। আরো একটু জড়তা কাটিয়ে উঠতে পারলেই বড় একটা সমস্যা থেকে মুক্ত হতে পারবে সে।
দুপুরে ভাত ঘুম ঘুমানো যার অভ্যাস সে কি আর সেই অভ্যাস হুট করে চাইলেই পরিবর্তন করতে পারে? শাশুড়ী মায়ের সঙ্গে টুকটাক সাংসারিক কাজ সেড়ে খেয়ে দেয়ে বসেছিলো স্টাডিরুমে। বাবার সঙ্গে দৈনিক আলাপন সেড়ে ঢুলুঢুলু চোখে বিছানায় শরীর রাখতে রাখতেই বেজে যায় বিকেল সাড়ে পাঁচটা। লম্বা ঘুম শেষে শেহরিন নিজেকে আবিষ্কার করে অসহায়ভাবে। অতঃপর ফ্রেশ হয়ে ফের স্টাডি টেবিলে বসতেই ডাক আসে নিচ হতে। অগত্যা সব ফেলে যেতে হয় তাকে আবারো নিচে।
তিথির সঙ্গে থেকে বিকেলের এক দারুণ নাস্তা রেসিপি শিখে নেয় নববধূ । নেক্সট টাইমে তার ট্রাই করার পালা । মনে হচ্ছে পারবে। খুব একটা কঠিন লাগেনি।
অতঃপর বিকেলের নাস্তা খেতে খেতে বেবি মানকিটার সাথেও খেলাধুলা হয়ে যায় একদফা।
রাত নামতেই মাথা শূন্য অবস্থায় রেখে টেবিলে বসে শেহরিন। নেতাসাহেবের সঙ্গে মাত্র কথা শেষ হলো তার। উনার সর্বপ্রথম কথাই ছিলো ভার্সিটি যাওয়া হয়েছিলো কি না। বাসায় কোনো সমস্যা ফিল হচ্ছে কি না। রমণী সবকিছুতে বাড়তি ভালো লাগা মিশিয়ে নেতাসাহেবকে ক্ষান্ত করেছে কোনমতে। বাবা এবং তার হতে লুকিয়েছে আজকের বিষয়টা । কিভাবে বলবে সে আজকের অপমানের কথা।এটা বলার মুখ নেই যে।
বই, ড্রয়িং শিট, ড্রাফটিং টুলস সাজিয়ে নিজে কাজে মন দিতে দিতে বেজে যায় আটটা। আজকে সারারাত তাকে এই নিয়ে কাজ করতে হবে। মনে হচ্ছে না ভোরের আগে শেষ হবে। কেননা এর মাঝে আবার ডিনার টাইমে নিচে গিয়ে বেশ খানিকটা সময় কাটিয়ে দিয়ে আসতে হবে।
বই, ঋতমার হতে প্রাপ্ত কিছু নোটস সেই সাথে ল্যাপটপ চালু করে নেয় শেহরিন। ইউটিউবে কিছু টিউটোরিয়াল ভিডিও, অনলাইন জার্নাল ঘাঁটাঘাটি শুরু করে। এতোগুলো ক্লাস মিস দিয়ে রিকভার করাটা ভীষণ কঠিন। কি ফর্মূলা ইউজ করবে বুঝে উঠতে পারে না। স্যারের কথাগুলো বারে বারে কানে প্রতিধ্বনি হতে শুরু করে৷ সারাদিন ব্যস্ততার মধ্যে থাকলেও এখন কেনো জানি কথাগুলো ফের মনে হয়ে বুকের মধ্যে ছুঁড়ির ন্যায় গেঁথে যাচ্ছে।
" এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন ইঞ্জিনিয়ারের দরকার নেই। পড়াশোনা ছেড়ে দিন।"
শেহরিন চোখ বন্ধ করে নেয়। গভীর শ্বাস টেনে সে নিজেকে ধাতস্থ করে নেয়।
"কুল শেহরিন কুল। আজ যেটা হয়েছে সেটা তোমার ভুলে হয়েছে। নিজেকে যদি এর চেয়ে আরো খারাপ কথা শুনাতে চাও যদি আরো অপমান সহ্য করতে চাও তাহলে সেটা নিয়েই ভেবে চলো। প্রজেক্ট কম্পিলিট করতে হবে না তোমার।"
" নাহ আমি কিছু ভাববো না। যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। আমাকে সামনে ফোকাস করতে হবে। "
ড্রয়িং বোর্ডে পেনসিলের টান পড়ে। টিউটোরিয়াল কিছু ক্লাস মনোযোগ সহকারে দেখতে দেখতে কিছু ফর্মূলা সে নিজে নিজে নোটস করে নেয়। পিডিএফ হতে কিছু টপিকস অবজার্ব করে । নকশাকৃত বিমের লোড ডিস্ট্রিবিউশন, সাপোর্ট রেখা টানতে টানতে আঙুলে ব্যথা জমে গেলোও তবুও সে থামে না।
একদম সাড়ে এগারোটার দিকে উঠে ডিনার সেড়ে আসতে আসতে প্রায় বারোটার বেশি বেজে গিয়েছে। আসামাত্র বসে পড়েছে আবারো টেবিলে। রাত যত গড়ায় বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টানো সেই সাথে ল্যাপটপের কিবোর্ড হতে ট্যাপিং সাউন্ড ভেসে আসে শুধু।
রাত তখন তিনটা। সমস্ত কাজ করতে করতে ঘুম নেমে আসে শেহরিনের চোখে। এই সময় একটু কফি হলে ভালো হতো। স্টাডি টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় সে্। ঘুম ছড়ানোর জন্য খানিকক্ষণ রুমে পায়চারি করতে থাকে্। বেলকনিতে গিয়ে আষাঢ়ে হাওয়া গায়ে লাগিয়ে নিজের ক্লান্ত দেহকে সতেজ করার চেষ্টা করতে থাকে্। দীর্ঘ সময়ের বিরতি শেষে পৌনে চারটার দিকে আবারো টেবিলে এসে বসে। ডিজাইনটা অলমোস্ট হয়ে এসেছে আর একটুখানি বাদ।
ভোর তখন ৫টা। ফ্যাকাশে মুখ, চোখ লাল। কিন্তু মনের ভিতরে অদ্ভুত এক প্রশান্তি। অবশেষে প্রজেক্ট ডান তার। প্রাথমিক রিপোর্ট লেখা শেষে সবকিছু গুছিয়ে হাত টান করে উঠে দাঁড়ায় শেহরিন। ঘড়ির কাঁটায় চোখ বুলিয়ে সরাসরি চলে যায় ওয়াশরুমে। ফজরের নামাজটা আদায় করা মাত্র বিছানায় শরীর এলিয়ে দেয় লম্বা রাতের জার্নি শেষে।
--------------------------------------------------
পূর্ব আকাশে সূর্য নতুন দিনের সূচনা ঘটায়। ভোরের আভা ছেড়ে রূপ নেয় পূর্ণাঙ্গ সকাল বেলার। পাখির ডাকে কিচিরমিচি শব্দ ভেসে আসে। জানালার পর্দা গলিয়ে সোনালি রোদ্দুর নরম বিছানায় এসে হাজিরা দেয়।
শেহরিনের আজকে ক্লাস নয়টা বিশ হতে শুরু। ক্লান্ত শরীরের ঘুম ভাঙে তার আটটা পঁয়ত্রিশের ঘরে। তাও সেটা সানজির ফোনে। তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে সময়টা দেখেই সে দৌড়ায়। কোনমতে ফ্রেশ হয়ে এসে রেডি হয়ে নেয় ভার্সিটির উদ্দেশ্য।
নাস্তা করার সময় তো দূরে থাক ভার্সিটি যাওয়ার সময়টুকুও নেই হাতে । ড.রাইসুল ইসলাম স্যারের ক্লাস দ্বিতীয় পিরিয়ডে থাকলেও ভয় তার মনেপ্রাণে।
" একি শেহরিন নাস্তা করবে না? "
সানজির কথায় শেহরিন অসহায় দৃষ্টিতে তাকায়। কাঁধে ব্যাগ রেখে তাড়াহুড়ো কন্ঠে তাকিয়ে বলে, " আজকে আমার একটা ইম্পর্টেন্ট ক্লাস আছে আপু। একদমই সময় নেই হাতে।"
তিথি তাসিনকে নাস্তা করাতে করাতে বলে, " ঘুম থেকে একটু আর্লি উঠার অভ্যাস করতে হবে তোমাকে শেহরিন। কালকে কিন্তু বলেছিলাম সকালের নাস্তা তৈরিতে সাথে থাকবে তুমি।"
" স..সরি ভাবি। এখন থেকে আর্লি উঠবো। "
মিসেস নাজনীন এক পলক তাকিয়ে বলেন," নাস্তাটা করে যাও। গাড়িতে যাবে। সময় লাগবে না।"
" আম্মা আমার অভ্যাস আছে। অসুবিধা নেই।"
" যেটা ভালো বুঝো। তবে একটু গুছিয়ে চলার চেষ্টা করো। এলো-মেলো ভাব আমার পছন্দ নয়।"
" জ্বি।"
শেহরিন মাথা নিচু করে সবার হতে বিদায় নিয়ে ঘর হতে বেরোতেই দৌড়ে গাড়িতে উঠে বসে। ড্রাইভার আংকেলকে সর্বোচ্চ স্পিডে গাড়ি চালানোর অনুরোধ করে সে স্থির হয়ে বসে। ঘড়ির কাঁটায় নজর বুলিয়ে সে বাইরের পানে দৃষ্টি রাখে। পিছনে ফেলা আসা সংসারের মায়াজাল মাত্র বিছাতে শুরু করেছে তাই মনে হচ্ছে কত কঠিন। সবার মন রক্ষা করে এই পড়াশোনাটাকে চালিয়ে নিয়ে যেতে কতটুকু সক্ষম হবে জানে না রমণী্। শাশুড়ী মায়ের আধার ঘনা মুখ আর ভাবির তীক্ষ্ণ কথাগুলোর মমার্থ বুঝেও যেনো বোঝে না সে। জানালার কাচে মাথা ঠেকিয়ে নিজমনে প্রশ্ন করে বলে, " আমি কি পারবো নিজেকে গুছিয়ে নিতে ? পড়াশোনা সামলে এই সংসারটাকে আপন করে নিতে? "