|রবিবার, সকাল এগারোটা, সুখ মহল |
ঘরোয়া আত্মীয় স্বজন আর নিজেদের লোক মিলে একদম ছোট করে শেহরিন সান্নিধ্যের রিসিপশন হয়ে গিয়েছে কালকে। আহামরি বা জমকালো কোনো আয়োজনই নয়। শুধু মাত্র খুলশী হতে শেহরিনের বাবা, মামার পরিবার আর মণিকা আন্টি এসেছিলো এ বাড়িতে । এইতো।
যদিও এই ছোট আয়োজন নিয়ে এক পশলা মনমালিন্য হয়ে গিয়েছে সান্নিধ্যের সঙ্গে শাহজাহান সাহেবের। কেননা শাহজাহান সাহেবের ইচ্ছে ছিলো বিয়েটা সাদামাটা হলেও রিসিপশন টা অন্তত লোক সমাগমে হোক। শ'খানেক মানুষকে নিমন্ত্রণ করা হোক। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত তার ইচ্ছটা ইচ্ছেই থেকে গিয়েছে।
সান্নিধ্যেকে কোনোভাবেই পারেনি রাজি করাতে। শোনা মাত্র নাকচ করে দিয়েছে সে । সেই সাথে কাটকাট গলায় বলে দিয়েছে, যত যা অনুষ্ঠান হবে সানজির ক্ষেত্রে। নিজের ক্ষেত্রে ঢাকঢোল পিটানোর মোটেও ইচ্ছে নেই।
অতএব, এসব চিন্তা ভাবনা বাদ দেওয়াই ভালো। কাজ হবে না।
অগত্যা শাহজাহান সাহেব নিজেও খানিকটা গরম মেজাজ দেখিয়ে নিজ ইচ্ছা গুটিয়ে নিয়েছেন । এই ছেলের ব্যাপারে কোনো কথাই আর বলবে না সে। যা ভালো হয় করুক।
আজকে রবিবার। শেহরিনের ভার্সিটি থাকলেও মিস দিয়েছে সে। বিয়ে শেষে আজকে দিয়ে দুদিন মাত্র। নতুন সংসার, নতুন সবকিছু। কালকে তো আত্মীয় স্বজনের মধ্যেই কেটেছে পুরোটা দিন। ধরতে গেলে নতুন সংসারের যাত্রা আজ থেকে শুরু তার।
এভাবে সব ফেলে রেখে ভার্সিটি যাওয়াটা বেমানন। যদিও নেতাসাহেব তাকে বারবার জিজ্ঞেস করেছিলো ভার্সিটির কথা কিন্তু নববধূ কৌশলে এড়িয়ে গিয়েছে। ল্যাব ক্লাসের ছুঁতো দিয়ে কোন রকমে কাটিয়ে নিয়েছে। নয়তো এই লোক নিশ্চিত তাকে ধরে বেঁধে ভার্সিটি রেখে আসতো।
"ওও.. ভাবিজান। "
" আমাকে ভাবিজান বলো না আপু। নাম ধরে ডেকো প্লিজ।"
" আরেহ তুমি তো আমার ভাবিজানই হও বাচ্চা। বড় ভাইয়ের বউ না তুমি?"
শেহরিন শাড়ির পাড় ঠিক করে সানজির দিকে ঘুরে তাকায়। ডান চোখের ভ্রু উপরে তুলে বলে, " ভাবিজান আবার সাথে বাচ্চা? "
"বাচ্চা ভাবিজান তুমি আমার।"
" এতোকষ্ট করতে হবে না তোমায় । আমাকে নাম ধরে ডাকলেই হবে।"
গাঢ় বেগুনি রঙা শাড়ি পরিহিতা নববধূর দিকে এগিয়ে আসে সানজি। মাথায় আঁচল টেনে সুন্দর করে ঘোমটা দিয়ে দিতে দিতে বলে, " খুব শখ তাই না? ঠিক আছে, কুটনী ননদিনী হয়ে তোমাকে আমি ভীষণ জ্বালাতন করবো দাঁড়াও।"
" কুটনী ননদিনী?"
" হু ভীষণ কুটনী ননদিনী।"
" আমার সাথে ঝগড়া করবে? "
" পায়ে পা লাগিয়ে। "
শেহরিন ঘোমটা মাথায় সানজির দিকে ঘুরে তাকায়। ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, " কিন্তু আমি তো ঝগড়া পারি না। কান্না পায়। "
" জীবনে কখনো ঝগড়া করোনি? "
" কার সাথে করবো? মানুষই তো নেই। আর সবচেয়ে বড় কথা যেখানে অভিমানটাই ঠিকঠাক করতে পারিনি আজ অব্দি সেখানে করবো ঝগড়া ? "
সানজি শেহরিনের গলার দুপাশে হাত ঝুলিয়ে দেয়। চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ভাবুক দৃষ্টি ফেলে বলে, " একটা উপায় আছে। ঝগড়ার ট্রেনিং নিবে তুমি।"
" কিভাবে? "
" ভাইয়ার সাথে রোজ ঝগড়া করে।"
" ভাইয়ার সাথে? "
" হ্যাঁ। একটু এদিক সেদিক হলেই ফুল স্পিডে ঝগড়া শুরু দিবে। এতে তোমার ধীরে ধীরে এক্সপেরিয়েন্স বাড়বে। "
" হুহ নেতাসাহেবের সঙ্গে ঝগড়া তাও আমি?উনি একটা ধমক দিলেই আমার আর মুখ দিয়ে আর কথা বের হবে না। চোখ দিয়ে পানি বের হবে শুধু ।"
সানজি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে হাত ছাড়িয়ে নেয় গলা হতে । নিরস গলায় বলে,
"হয়েছে বুঝতে পেরেছি। কুটনী ননদিনী হওয়া হলো না আমার। ঝগড়ায় ঝগড়ায় টক্কর না দিলে কি জমে? ভাবিজান আমার আগেই সারেন্ডার। ঠিক আছে চলুন এখন নিচে যাই। "
" তুমিও আজকে ভার্সিটি মিস? "
" হু আপনার জন্য দিলাম। এ বাসায় আমি আর ভাইয়া ছাড়া তো আপনার সব মানুষ অচেনা। তাই যেনো আনকম্ফোর্টেবল ফিল না করেন তাই থেকে গেলাম।"
শেহরিন নিরব হাসে সানজির কথা শুনে। নির্নিমেষ চাহনিতে তাকিয়ে ভাবতে থাকে,মনে হচ্ছে তার ভাইবোনের অভাবটা আল্লাহ কোনোভাবে পূরণ করে দিচ্ছে। এই অল্প সময়ের মাঝেই সরফরাজ ভাইয়াকে যতটুকু দেখেছে অসাধারণ লেগেছে। খুবই আন্তরিক তার প্রতি। ভাইয়ের বউ হিসেবে নয়, কেমন জানি ছোট বোনের ন্যায় আদরে সম্ভাষণ করে সে। আর এদিকে সানজি আপু, তার কথা হয়তো এখনই বলে শেষ করা যাবে না।
" এই বাচ্চা ভাবিজান কি ভাবছো? চলো নিচে যেতে হবে তো।"
শেহরিন ভাবনা ছেড়ে স্বতঃস্ফূর্ত কন্ঠে জবাব দেয়, " চলো।"
------------------------------------------------------
কিচেনে বেশ রান্নার তোড়জোড় শুরু হয়েছে সকাল সকালই। সুখ নিবাসের আত্মীয় স্বজনেরা আজ দুপুরে মহা ভোজন শেষে যে যের মতো নিবে বিদায় । কালকেই সবার যাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু এ বাড়ির সদস্যদের অনুরোধে সবাই থেকে গিয়েছে। বিয়ে বা যেকোনো অনুষ্ঠান উপলক্ষেই যা আসা যাওয়া হয়। এছাড়া বিশেষ দরকার ছাড়া কারো বাসায় কারো পা পরে না দেখে জোরজবরদস্তিতে থেকে যাওয়া তাদের ।
ড্রয়িংরুমে বসেছে কাজিনমহলের আড্ডার আসর। হৈ হুল্লোড় সঙ্গে হাসাহাসি চলছে বেশ। অন্যদিকে এই আসরের মূল কান্ডারী বেবি মানকি। তার দুষ্টুমিতে প্রত্যেকে হয়ে উঠেছে নাজেহাল। এক মুহূর্তের জন্যও স্থির হচ্ছে না। খেলার সঙ্গী বা মানুষজন পায়ই না সে। আজ যখন পেয়েছে ছন্নছড়া হয়ে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে চারপাশটা। তাকে দেখে উপস্থিত সবাই এখন অক্ষরে অক্ষরে বুঝতে পারছে কেন এই নামটা তাকে বিশেষভাবে দেওয়া হয়েছে। একদম পার্ফেক্ট ম্যাচ করেছে।
চলতে থাকা হুল্লোড়ের মাঝেই সিঁড়ি হতে বেগুনি রঙা শাড়ি পড়া নতুন বউকে নামতে দেখেই সবাই সেদিক ফিরে তাকায়। একসেকেন্ড নিরবতা শেষে একসঙ্গে সবাই হৈ হৈ করে বলে উঠে,
"নেত্রী সাহেবার আগমন
শুভেচ্ছায় স্বাগতম।
নেত্রী সাহেবের আগমন
লাল গোলাপের সম্ভাষণ।"
" অবশেষে মিসেস সান্নিধ্য শাহজাদ খান এসে পৌঁছেছে আমাদের মাঝে। হুররে..."
অদ্ভুত স্লোগান শুনে শেহরিন লজ্জায় কুঁকড়ে যায়। সানজির হাত চেপে ধরে সে অসহায় দৃষ্টিতে তাকাতেই সানজি গলার স্বর বাড়িয়ে বলে,
" থামো থামো তোমরা । আমাদের ভাবিজান লজ্জা পাচ্ছে তো। এভাবে তাকে হাটে মাঠে ঘাটে লজ্জা দেওয়াটা মোটেও উচিত নয়।"
" আরে লজ্জার কি আছে আপি? ভাইয়ার অর্ধাঙ্গিনী সে। এসব রাজনৈতিক স্লোগান তো তার জন্যও প্রযোজ্য।"
" উহু। আমাদের ভাবিজান রাজনীতির ধার ঘেঁষে না। সে অপছন্দ করে ভীষণভাবে।"
" সিরিয়াসলি?"
" হ্যাঁ।"
" ওহ মাই গড !! কি শুনছি আমরা। রাজনীতিবিদের বউ রাজনীতি পছন্দ করে না? এমনটা হয়? "
" হয় কি না জানি না। না হলে ধরে নে, শেহরিনকে দিয়েই শুরু।"
" তাহলে এতোকিছু হলো কি করে?"
সানজি শেহরিনকে কিচেনের দিকে নিয়ে যেতে যেতে চোখ মেরে বলে,"শুধুই ভালোবাসা দিয়ে। "
" ওহহহো... এই ব্যাপার।"
একসঙ্গে সবাই রসিয়ে রসিয়ে পুনরাবৃত্তি করতে থাকে। শেহরিনকে লজ্জা দিতে এরা যেনো সবসময় তৈরি হয়ে থাকে। বেবি মানকিটা কারো কথারই আগা মাথা বুঝতে না পেরে সোফার উপর দাঁড়িয়ে দু'হাত কোমড়ে রেখে বলে,"তোমরা আমার ইয়ো পানিকে কি বলছো? "
" তোমার ইয়ো পানি আর ইয়ো সানির ভালোবাসার ছন্দ তৈরি করছি। "
" ছন্দ কি? "
" এই ব্যাটা ক্লাস থ্রি তে পড়েও ছন্দ মানে বুঝিস না।"
" ও তো পড়াই পারে না। কানে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে শুধু। ক্লাসে সর্বশেষ রোল ৩৭। আর সেটা ওরই।"
নিজ খালামনির হতে অপমান মূলক কথা শুনে তাসিন কপাল কুঁচকায়। থমথমে গলায় বলে, " বাবাকে কিন্তু বলে দিবো।"
" সত্যি কথাই বলেছি। "
" কে বলেছে তোমাকে? "
" তোর মামণি বলেছে।"
মামণির কথা শুনে বেবি মানকিটা কপালের ভাঁজ দূর করে। সোফার উপর বসে মাথা ঠেকিয়ে বলে, "আমি পড়াশোনা করবো না, বিয়ে করবো। "
" কাকে? "
" ইয়ো পানিকে। "
" তুই জীবনে ভালো হবিনা বেবি মানকি। "
" তুমিও তো পঁচা খালামণি।"
"দ্বারা তোর মামণিকে বলে দিচ্ছি।"
" না...না একটু ভালো তুমি।"
---------------------------------------------------------
চিংড়ি মাছের মালাইকারির সুঘ্রাণ ছড়িয়েছে কিচেনজুড়ে। নারকেলের দুধ, কাজু বাটা দিয়ে নাড়ছে তিথি। ড্রয়িংরুমে যেমন বাচ্চা কাচ্চাদের মেলা বসেছে এখানেও সেরকম বাড়ির সব মহিলা সদস্যগণের আসর বসেছে।
সবাই টুকটাক কাজের ফাঁকে ফাঁকে গল্প জুড়েছে। সানজি শেহরিনকে কিচেনে নিয়ে আসে সন্তপর্ণে। প্রবেশ করা মাত্র উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলে উঠে," আম্মা তোমার ছোট বউমাকে নিয়ে এলাম তোমার অফিসে। কি ইন্টারভিউ নিবে নাও।"
কাজরত অবস্থায় সবাই একযোগে পিছু ফিরে চায় সানজির কথায় । নতুন বউয়ের রান্নাঘরে পা পরতেই মিসেস নিলুফা হেসে বলেন,"ইন্টারভিউ তো নিবোই। নয়তো চাকরি কনফার্ম হবে কি করে? "
" সেজন্যই তো নিয়ে এলাম। যাচাই-বাছাই করে দেখো।"
তিথি যৎ সামান্য হেসে চুলার আঁচ কমিয়ে দিয়ে নিরেট স্বরে বলে, "যাচাই-বাছাই করার মনে হয় না খুব একটা প্রয়োজন আছে।"
" কেন?কেন? "
" শেহরিন তো বোধহয় রান্নাই করেনি কখনো। আর যে রান্না জানে না তাকে যাচাই-বাছাই করবো কিভাবে? "
মিসেস নাজনীন চুপচাপ নিজ কাজে মগ্ন থাকেন। কোনো প্রকার টু টা শব্দ বের হয় না তার মুখ হতে। তবে, রান্নার বিষয়টা তার অবগত ছিলো না। ভেবেছিলো হয়তো তার ছোট বউমা রান্না জানে। কিন্তু তিথির কথা শোনা মাত্র তার মুখে হঠাৎ কালো মেঘের ছায়া এসে ভর করে।
" আরে রান্না না করতেই পারে। হয়তো রান্নার তখন প্রয়োজন পড়েনি তাই করেনি। কিন্তু এখন তো প্রয়োজন আছে। প্রত্যেক মেয়েকেই শ্বশুরালয়ে এসে রান্না করতেই হয়।"
" কি শেহরিন রান্না শেখালে শিখবে তো?"
চাচিমণির প্রশ্নে শেহরিন নিচু চোখে তাকিয়ে মাথা নেড়ে সায় জানায়। সে সত্যি রান্না শিখতে চায়। নিজ হাতে রান্না করতে চায়। কিন্তু শেখানোর মানুষের অভাবটা তাকে সবসময় এই গুণ অর্জন করা হতে পিছিয়ে রেখেছে। ইশ্ কাজু বুয়াকে তার ভীষণ মনে পড়ছে। বুয়ার কাছে আরো কিছু দিন থাকলে রান্নাটা সে সত্যি শিখে নিতে পারতো।
" কখনো রান্না করেছো? "
" জ্বি? "
" কি কি রান্না করেছো? "
শেহরিন শুকনো ঢোক গেলে। তার সাদামাটা রান্নার আইটেমগুলো এতোগুলো দক্ষ মানুষদের সামনে উচ্চারণ করতে ভীষণ লজ্জা অনুভব হয়। তবুও সত্যটাকে সহজ স্বীকারোক্তি দিতে নরম কন্ঠে বলে, "ভাত, ডিম ভাজি, ডাল। "
নাজনীন বেগম আইটেমগুলো শুনে কাজ ছেড়ে একপলক তাকান শেহরিনের দিকে। সানজির ছোট মামি হেসে বলেন, "এগুলো তো ছেলে মানুষও পারে। ব্যাচেলরদের খাবার। মাছ মাংস কখনো রান্না করোনি? "
" জ্বি মাছ রান্না করেছিলাম একবার।"
" কি মাছ? "
" কৈ মাছ।"
" বাপরে সরাসরি কৈ মাছ?একাই করেছিলে নাকি কেউ হেল্প করেছিলো তোমাকে? "
" জ্বি হেল্প করেছিলো।"
" তাইতো বলি।"
তিথি ঠোঁটের হাসি বিস্তার করে বলে, "তাহলে তো দেখছি রান্না শিখতে বেশ সময় লাগবে। সবচেয়ে বড় কথা শিখবেই বা কখন? ভার্সিটি সামলে সংসার? এতো সহজ নয়। "
" অল্প অল্প করে শিখবে ভাবি। ইচ্ছেশক্তি থাকলে সব সম্ভব। আমাদের ছোট ভাবিজান ঠিক পারবে।"
" হ্যাঁ তুমি শ্বশুর বাড়ি যাও আগে তখন শুনবো এই কথা। "
" আরে হয়েছে হয়েছে। নতুন নতুন শ্বশুর বাড়িতে অনেকেই আনাড়ি হয়ে আসে। তানিশার কথাই বলি। মেয়ে আমার হাত ধুয়ে ভাতটাও খেতো না। শেহরিন তাও ব্যাচেলরদের রান্না জানে আমার মেয়ে তো তাও জানতো না। কিন্তু এখন দেখো সব শিখে ফেলেছে। সময়ের সাথে সাথে সবাই নিজেকে গুছিয়ে নেয়। শুধু একটু চেষ্টার প্রয়োজন।"
" ঠিক বলেছেন আপা।"
মিসেস নিলুফা সানজির বড় মামির কথায় সমর্থন জানিয়ে তার জা'য়ের দিকে তাকায়। আগ্রহ নিয়ে শুধায়, "ভাবি আপনি চুপ হয়ে আছেন কেন? আপনি কিছু জিজ্ঞেসা করবেন না আপনার ছোট বউমাকে? "
" তোমরা তো বলছোই। আমি আর কি বলবো। শুনছি তো।"
" তবুও শাশুড়ী আপনি। আপনার তো আলাদা করে জিজ্ঞাসা থাকতেই পারে। কোনো প্রশ্ন থাকলে বলুন।"
" কি প্রশ্ন করি বলো?বউমা তো আমার রান্নাই জানে না। জানলে তো কিছু একটা জিজ্ঞেস করতাম ।"
" রান্না জানে না। শিখাবে তুমি আম্মা। দেখি আসো তো.."
শেহরিনকে টেনে শাশুড়ী মায়ের কাছে গিয়ে দাঁড় করায় সানজি। মিসেস নাজনীনের মুখোমুখি হয়ে শেহরিনের ডান হাতটা নিয়ে তার হাতে তুলে দিয়ে বলে, " ভাইয়ার হয়ে কাজটা আমিই করে দিচ্ছি, এই যে তোমার হাতে তুলে দিলাম। তুমি তোমার বউমাকে আদর দিয়ে, যত্ন দিয়ে শিখিয়ে পড়িয়ে নিবে। ঠিক যেমনটা আমার বড় ভাবিজানের ক্ষেত্রে করেছো।"
শাশুড়ি মায়ের হাতের স্পর্শ পেতেই শেহরিনের শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বেয়ে যায়। একরাশ জড়তা আর ভয় এসে ভর করে তার শরীরে। মাথা নিচু করে সে চুপচাপ নিজের ভিতরে বয়ে চলা ঝড়ো হাওয়াকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করতে থাকে।
মিসেস নাজনীন নিজেও কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে যান। এমনভাবে হাতে তুলে দেওয়াতে সে পারে না কিছু করতে। কোনো রকমের দেনামোনা কাটিয়ে ধীর কন্ঠে জবাব দিয়ে বলেন," আচ্ছা ঠিক আছে। এতো ভাবতে হবে না। শেখাবো।"
" শাশুড়ী হিসেবে তুমি দেখছি পাশ করেই ফেলেছো নাজনীন।"
" আমাদের ছেলের বউদের কাছে আমরা যে কেমন হবো কে জানে? আজকাল বউদের যে ডিমান্ড।"
" তবে যাই বলুন, আপার দুই বউমাই বেশ লক্ষী হয়েছে। "
" কপাল ভালো।"
মিসেস নাজনীন মুখে জোরপূর্বক হেসে নিজে কাজে ফের ব্যস্ত হন। তিথিও তার কাজে মনোনিবেশ করতে করতে বলে, "সান্নিধ্যের প্রিয় খাবার কি জানো? "
শেহরিন ধীর বেগে মুখ তুলে চায় তিথির প্রশ্নে। নেতাসাহেবের প্রিয় খাবার কথাটা শুনতেই সে বিবর্ণ চাহনি করে ফেলে। এটা তো তার জানা নেই, কি তার প্রিয় খাবার। সেরকম করে তো প্রিয় অপ্রিয় বিষয়গুলো নিয়ে খুব একটা কথাও হয়ে উঠেনি তাদের মাঝে।
" জানো না? "
" জানা হয়নি ।"
" মাত্র বিয়ে হয়ে এসেছে। এতো তাড়াতাড়ি জানবে কিভাবে? ধীরে ধীরে জানবে।"
" মাত্র বিয়ে হলে কি? সম্পর্ক তো বেশ আগে হতে ছিলো। জানার তো কথা।"
" খুব বেশিদিনের সম্পর্ক নয় ভাবি। এর মধ্যে ঝড় ঝাপটাই বেশি গিয়েছে। যাই হোক, ওসব বাদ দাও। ছোট ভাবিজান শুনুন, আমার ভাই সাহেব সাদা পোলাও আর ঝাল রোস্ট বলতে পাগল। আজকে সেটাই রান্না করা হচ্ছে। আপনাকে জানিয়ে রাখলাম আপনি ভবিষ্যতে এটা ট্রাই করে তাকে খাইয়ে মন জুগিয়ে নিতে পারবেন অনায়াসে । তবে, হ্যাঁ সে কিন্তু মিষ্টি খায় না। কোনো প্রকারের মিষ্টির ধারের কাছেই ঘেঁষে না।"
শেহরিন ঠোঁট প্রসারিত করে ক্ষীণ হেসে সানজির কথা শোনে। নেতাসাহেব তাহলে সাদা পোলাও আর ঝাল রোস্ট পছন্দ করে?বাহ !! তাহলে তো এইদুটো শিখতেই হচ্ছে তাকে। যেভাবেই হোক খুব দ্রুতই শিখে ফেলবে।
" তাহলে শুভ সূচনা স্বামীর পছন্দের খাবার রান্না দিয়েই হোক।"
" মানে? "
" মানে এখন তো ঝাল রোস্ট করা হবে। সেটার শুরু শেহরিনই না হয় করুক। হাজার হোক স্বামীর পছন্দের খাবার বলে কথা। তাতে বউয়ের স্পর্শ থাকবে না তাই কখনো হয়?"
আত্মা চমকে উঠে শেহরিনের। মুখের হাসি উবে যায় মুহুর্তেই। কি বলছে চাচিমণি? শুভ সূচনা তাকে দিয়ে মানে? সে তো রোস্ট কখনো রান্নাই করেনি। জানেও না আদৌ কি কি মশলা দিতে হয়। কিভাবে রান্না করবে সে?
শেহরিনের ভয়ার্ত মুখের চাহনি দেখে হেসে ফেলেন মিসেস নিলুফা। থুতনিতে হাত রেখে জোরালো গলায় বলেন, " ওরে বোকা মেয়ে। এতো ভয় পেতে হবে না তোমার। শুভসূচনা বলতে শুধু পেঁয়াজ বেরেস্তাটুকু করবে। এতোটুকুই শুধু। কি পারবে না?"
আত্মায় পানি আসে শেহরিনের। শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট ভিজিয়ে ধীর কন্ঠে বলে, " জ্বি পারবো।"
" ভেরি গুড। এতেই হয়ে যাবে আজকের জন্য।"
অবশেষে সবাই মিলে শেহরিনের পেঁয়াজ বেরেস্তা করা দেখতে আগ্রহী হয়ে উঠে। চুলোয় প্যানে তেল কিছুটা গরম হতেই শেহরিন তার কাঁপা হাতে বোল হতে বেশ খানিকটা পেঁয়াজ তুলে নেয়। মৃদু গরম তেলে পেঁয়াজ ছেড়ে দিয়ে নাড়তে শুরু করে সে।
" পেঁয়াজ বেরেস্তা সহ সকল ভাজাভুজিতে সর্বপ্রথম তেলটা ভালোমতো গরম করে নিবে। তারপরে চুলার আঁচ মাঝারিতে রেখে নাড়াচাড়া করবে। দেখো পেঁয়াজের কালারটা পরিবর্তন হয়ে আসছে। একদম গাঢ় বাদামি করবে না মোটেও। হালকা বাদামি হওয়ার পর পরই ধীরে ধীরে চুলার আঁচ লো তে নিয়ে আসবে কেমন? "
" জ্বি। "
" তারপরে আপনা আপনি সেই গরম তেলে পেঁয়াজ বেরেস্তাতে ধীরে ধীরে সুন্দর একটা কালার আসবে। পুড়ে যাওয়ার ভয় থাকবে না। একবার পুড়ে গেলে কিন্তু তেতো হয়ে যাবে। পুরো স্বাদটাই নষ্ট হয়ে যাবে।"
শেহরিন চাচিমণির কথা মন দিয়ে শুনে সেই অনু্যায়ী কাজ করতে থাকে। যদিও ভিতরটা তার ভয়ে কাঁপছে। এতোগুলো মানুষের সামনে যদি উল্টা পাল্টা কিছু হয়ে যায়? যদি না পারে। ভয়ে তার গা হতে ঘাম ঝরতে শুরু করেছে । কপাল ভিজে উঠে্ছে। এমনিতে এতো আতঙ্ক নিয়ে কাজ করা তারউপরে পড়েছে শাড়ি। মনে হচ্ছে না সে গোসল সেড়ে এসেছে এখানে ।
" হয়েছে এবার নামিয়ে ফেলো।"
" বাহ সুন্দর হয়েছে। এইতো এভাবেই শিখে যাবে। শুধু প্রয়োজন সঠিক ইন্সট্রাক্টরের।"
" বেরেস্তাতে হালকা একটু চিনি দিয়ে চামচ দিয়ে নেড়েচেড়ে রাখবে। তাহলে অনেকটা সময় ঝুরঝুরে থাকবে।"
" জ্বি ধন্যবাদ চাচিমণি।"
শেহরিনের ঘর্মাক্ত চেহারায় কিছুটা ঠান্ডা হাওয়া এসে বায়। ছোটোখাটো একটা পরীক্ষায় সে কোনমতে টেনেটুনে পাশ করেছে। ধরতে গেলে দেখে দেখেই পাশ। চাচিমণি না বলে দিলে হয়তো বেরেস্তাটা এতো পার্ফেক্টকলি করতে সক্ষম হতো না সে।
" আচ্ছা সানজি ওকে নিয়ে যাও এখন। প্রাথমিকভাবে হাতখড়ি হলো আজকে্। এখন থেকে ধীরে ধীরে ভাবিই ওকে শিখিয়ে নিবে। মেয়েটা ঘেমে গিয়েছে। যাও রেস্ট করো।"
" ভাবি তো শেখাবেই ঠিক আছে কিন্তু ভাবিকে মা না ডাকলে তো হবে না বউমা। ডাকাডাকিটা তো শুরু করতে হবে। তিথি যেমন আম্মা বলে ডাকে তুমিও ডাকবে কেমন?"
" আচ্ছা।"
" এখনই ডাকো দেখি।"
শেহরিন খানিকটা দ্বিধা গ্রস্তের মাঝে পড়ে যায়। মামণিকে হারানোর আজ ৭-৮ বছর হয়ে এলো। এর মাঝে সে একাই একাই যা মামণিকে ডেকে এসেছে, সবার আড়ালে নিজ কক্ষে । লোক সমাগমে আর কখনো ডাকটা উচ্চারণ করা হয়নি । অনেকটা সময়ের ব্যবধান তৈরি হয়েছে মাঝে । আজ হুট করেই কেনো জানি মা ডাকটা তার কাছে ভীষণ কঠিন লাগে উচ্চারণ করতে। চোখের কোণায় হালকা জল এসে জমে।
সানজি শেহরিনের জড়তামাখা মুখ দেখে হয়তো কিছুটা আন্দাজ করে। সবাইকে কাটিয়ে শেহরিনকে নিয়ে যেতে যেতে বলে," সব আজকেই হলে হবে চাচিমনি? মেয়েটাকে একটু সময় দাও। ডাক থেকে রান্না সব শিখে ফেলবে। একসাথে এতো চাপ দিও না তো তোমরা বাচ্চা মেয়েকে।"
" আচ্ছা আচ্ছা।নিয়ে যাও ওকে এখন।ও হ্যাঁ আজ দুপুরের খাবারের পরিবেশনটা কিন্তু বউমাকেই করাতে হবে।"
" এটা ঠিক পারবে কোনো সমস্যা নেই।"
_________________________________________
দুপুর তখন দুটো। শেহরিন সময়টা পরোখ করে নিয়ে ফোনটা হাতে নেয়। বাবার লাঞ্চের সময় এখন। বিরতিতে আছে। মানুষটা কালকেই চট্টগ্রাম হতে ঢাকা ব্যাক করেছে। এতোদিনের জমানো কাজ, অফিস মিটিং সব মেয়ের জন্য আটকা পড়েছিলো। এখন নিশ্চয়ই দম ফেলানোর সুযোগটুকুও পাচ্ছে না।
" আসসালামু আলাইকুম বাবা।"
" ওয়ালাইকুমুস সালাম। কেমন আছো মা?"
" জ্বি আলহামদুলিল্লাহ। তুমি কেমন আছো? "
" আলহামদুলিল্লাহ।"
" লাঞ্চে এসেছো বাবা ?"
" বাসায় যায়নি আজকে মা । অফিসেই করছি।"
"কাজের প্রেশার হয়ে গিয়েছে অনেক তাই না?"
রিজওয়ান সাহেব আলতো হেসে বলেন," এই একটু।"
" অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছি তোমাকে বাবা। এখন তো তুমি নিজের শরীরের দিকে না তাকিয়ে অনবরত কাজ করেই যাচ্ছো শুধু?"
" না রে মা সেরকম কিছু না। এতো চিন্তা করতে হবে না। বাবা একদম ঠিক আছে। তোমার খবর বলো? সব ঠিকঠাক? "
"জ্বি ঠিকঠাক।"
"সান্নিধ্য কোথায়? "
"উনি উনার কাজে আছেন। সম্ভবত আজকে রাতে ঢাকা যাবেন।"
" ও আচ্ছা। পার্লামেন্টের অধিবেশনে যোগ দিতে হয়তো।"
"হুম।"
রিজওয়ান সাহেব খাবার খেতে খেতে মেয়ের কন্ঠ বিচক্ষণ ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। অতঃপর স্নেহমাখা কন্ঠে জিজ্ঞেস করেন," কোনো সমস্যা ফিল করলে বলতো পারো মা। আমি শুনতে রাজি।"
শেহরিনের মুখে প্রদীপের শিখার ন্যায় আলো জ্বেলে উঠে। সে জানতো বাবা ঠিক বুঝে নিবে সে কিছু একটা নিয়ে সংশয়ে ভুগছে। এমন নয় যে শুধু সমস্যা হলেই সে বাবাকে ফোন দেয়। একটা পুরোদিনে অন্তত দুবার হলেও তাদের কথা হয়। কিন্তু মেয়েকে বুঝে নেওয়ার অদ্ভুত এক ক্ষমতা তার বাবার রয়েছে। কেমন কেমন করে যেনো ঠিক বুঝে নেয় কিছু একটা হয়েছে। শেহরিনের কাছে মাঝে মাঝে মনে হয়, সৃষ্টিকর্তা হয়তো বাবা মায়েদের এক আলাদা আধ্যত্মিক শক্তি দান করেছেন সন্তানদের বুঝে নেওয়ার জন্য। যে শক্তি আর অন্য কারো মাঝে নেই।
" বাবা.."
"জ্বি মা। "
" আমি একটু সমস্যায় পড়েছি। "
" জ্বি কি সমস্যা? "
শেহরিন বুকের উপর বাম হাত রাখে। লম্বা করে দম টেনে নিয়ে বলে,
" বাবা.. আমার মুখ হতে মা আম্মা মামণি এই ডাকগুলো জোরালোভাবে বের হয় না। মানে আমি জোরে সবার সামনে উচ্চারণ করতে পারি না। ধরো কেউ ডাকতে বললো আমি বলতে চাচ্ছি কিন্তু পারছি না। কেনো জানি মুখ ভারী অনুভূত হয়।"
রিজওয়ান সাহেবের খাওয়া থেমে যায় মুহুর্তে। কোনমতে গলা দিয়ে নেমে যায় তার খাবারটা। মেয়ের সমস্যাটা শোনা মাত্র তার বুকের ভিতরে সূক্ষ্ণ আঘাত এসে লাগে্। দৃষ্টি স্থির হয়ে যায় ।
মেয়ে তার জানে না এই কথাটার ওজন কতো ভারী। সে নিঃসঙ্কোচ ভাবে তার সমস্যাটা উত্থাপন করছে। কিন্তু রিজওয়ান সাহেব, সে তো জানেন এর পিছনে কতটা নিরব ব্যথা লুকিয়ে। একটা নিষ্পাপ বাচ্চা মা হারানোর পর থেকে আর কখনোই সেই ডাকটা উচ্চারণ করেনি সবার সামনে। মা ডাকটার মধ্যে যে মধুরতা রয়েছে সেটা সে হারিয়ে ফেলেছে সেই ছোটোবেলাতেই। এই ডাকের বেলায় তার মুখ ভারী হয়ে উঠে। কতটা অসহায় হলে এই একটা বলা সম্ভব হয়? যেখানে তার চারপাশে সবাই মা ডাকে মুখোরিত করে তুলছে। অথচ সে পারছে না !!
" বাবা..শুনতে পাচ্ছো।"
"জ্বি.. জ্বি মা শুনতে পেয়েছি।"
রিজওয়ান সাহেব তার চোখে আসা পানি লুকিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে নেয়। জড়িয়ে আসা কন্ঠ ঠেলে স্বতঃস্ফূর্ত কন্ঠে বলেন," তুমি কি তোমার শাশুড়ী মায়ের কথা বলছো? "
" হ্যাঁ। আজকে সবাই বলছিলো ডাকতে। কিন্তু আমি পারিনি।"
" ওহহো। কিন্তু ডাকতে তো হবে মা।"
" আমি নিজেও চাই ডাকতে বাবা। নেতাসাহেব সানজি আপু ভাইয়া উনারা সবাই আম্মা বলে ডাকে। আমিও আম্মা বলেই ডাকতে চাই।"
" তুমি মামণি ডেকে অভ্যস্ত। আম্মা ডাকটা কঠিন হয়ে যাবে না?"
" না বাবা। আমার কাছে কঠিন হচ্ছে ডাক দেওয়াটা। এটা কিভাবে কাটিয়ে উঠতে পারবো? "
" তোমার এক্ষেত্রে একটু সময় লাগবে মা। তবে, একটা কাজ করতে পারো। তুমি নিজে ঘরে একা একা ডাকটা প্রাক্টিস করতে পারো। ধরো মিররের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ভিতরে সমস্ত জড়তা কাটিয়ে ডাক দিচ্ছো। মুখটা হালকা করছো।"
"সবার সামনে নার্ভাস হয়ে পড়ি যে বাবা।"
" তোমার কাছে ডাকটা যখন সহজ হয়ে যাবে তখন আর নার্ভাস লাগবে না। নিজে নিজে প্রাক্টিস না করলে এটা সলভ করা তোমার জন্য অনেক কঠিন হয়ে যাবে। তুমি কি সেটা চাও? "
" না চাই না৷ আমি চাই সুন্দরভাবে ডাকতে।সবাই যেভাবে তাদের মায়েদের ডাকে।"
রিজওয়ান সাহেব মলিন হাসেন। ধীর কন্ঠে বলেন, " তুমিও পারবে একটু শুধু প্রাক্টিস করো কেমন? "
" আচ্ছা ঠিক আছে। আজকের মধ্যেই এই জড়তা কাটিয়ে ফেলবো। কালকেই সবার সামনে ডাকবো।"
" ভেরি গুড মাই প্রিন্সেস।"
" থ্যাংকিউ বাবা।"
টুকিটাকি কথা সেড়ে শেহরিন ফোন রেখে দেয়। শুভ্র চাদেরের বিছানার মাঝে সে শুয়ে পরে। হাতে থাকা ফোনটায় দৃষ্টি রেখে গ্যালারি ঘেটে আবারো বের করে তার মামণিকে। এক ধ্যানে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে হাস্যেজ্জ্বল সেই রমণীর দিকে।
"মামণি জানো, আমি একটা নতুন মা পেয়েছি । কিন্তু আমি তাকে মা বলে ডাকতে পারছি না। তুমি চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আর ডাকা হয়নি তো এজন্য বোধহয় এতো সঙ্কোচ লাগছে। কিন্তু মামণি আমি তাকে মা ডাকতে চাই। একটুখানি মায়ের আদর পেতে চাই। আমি খুব করে চাই মায়েদের গায়ে যে বিশেষ ঘ্রাণ আছে সেটা অনুভব করতে।
মামণি, আমি যদি ভালো মেয়ে হয়ে চলি তাহলে আমাকে কি সে মেয়ের মতো ভালোবাসবে না বলো?আমি রান্নাটা যেভাবেই হোক শিখে নিবো, সব কাজ শিখে নিবো। আমি শুধু একটু ভালোবাসা চাই। তুমি প্লিজ আমার জন্য একটু দোয়া করো, আমি যেন সবকিছুতে স্বাভাবিক হতে পারি। সবকিছু মানিয়ে নিতে পারি ।
তবে, ভেবো না নতুন মা পেয়ে আমি তোমাকে ভুলে যাবো । আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। তুমি সবসময় আমার অন্তরে থেকে যাবে। জানো মামণি, পৃথিবীতে তোমাদের অভাব অপূরণীয়। তোমরা যারা এভাবে চলে যাও আমাদের ছেড়ে কতটা যে কষ্ট হয়ে বলে বুঝাতে পারবো না। প্রতিটা ক্ষেত্রে তোমাদের প্রয়োজন হয়। এক বাবারা আর কতো করবে বলো? বাবার সত্তা হতে বের হয়ে এসে মায়ের সত্তা বহন করা কি সহজ কাজ?
কিন্তু তবুও দেখো, আমি এতোটাই লাকি যে, বাবা তোমার সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে এখনো বহন করে যাচ্ছে আমাকে। আমার নিজের প্রতি ভীষণ রিগ্রেট ফিল হয় মাঝে মাঝে। কিন্তু বাবা ছাড়া আমি নিশ্চিহ্ন। তাকে আমার লাগবেই লাগবে। উপায় নেই। শুধু ভাবি, যাদের বাবারা এতোটা সার্পোটিভ নয় তারা কিভাবে মা ছাড়া লাইফ লিড করে? আল্লাহ কি তাদের আলাদাভাবে ধৈর্য্য শক্তি দান করে? হয়তো তাই। তাছাড়া তো সম্ভব নয়।
শেহরিন খানিকক্ষণ নিজমনে বিরবির করতে করতে ফোন রেখে চোখ বন্ধ করে নেয়। কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পরে তার দু ফোঁটা পানি। অতঃপর নিজের সঙ্কোচতাকে ঠেলে আম্মা ডাকটা ঠোঁট ফুঁড়ে উচ্চারণ করতে থাকে ধীর কন্ঠে।
বিশাল ডাইনিং জুড়ে আজ খাবারের মেলা বসেছে। দুপুরের মহাভোজে আজ যেনো আয়োজনের কমতি নেই। পোলাও হতে শুরু করে মাংস মাছ কাবাব দই মিষ্টি পুডিং বোরহানি সহ অজস্র আইটেমে ভরপুর।
বাসার সবাই মোটামুটি বসে পড়েছে খাবার টেবিলে। বাদ রয়েছে নেতাসাহেব আর সরফরাজ। দুজনেই কাজ সামলে আসতে একটু লেট করছে। কেননা দুপুরের লাঞ্চ তাদের বেশিরভাগ সময় নিজ কর্মস্থলেই করা হয়। কিন্তু আজ অতিথিদের সুবাদে কথা দিয়েছে একসাথে লাঞ্চ করবে সবাই।
বাড়ির মেয়ে বউসহ সকলেই একত্রে বসেছে। সার্ভের দায়িত্ব আছে খান বাড়ির দুই বউ। সরফরাজ এসে উপস্থিত হলেও সান্নিধ্যের বাসায় পৌঁছাতে আর একটু সময় লাগে।
" আচ্ছা আমরা সার্ভ করতে থাকি। অনেক মানুষ যেহেতু। এর মাঝে সান্নিধ্য এসেই যাবে।"
" বউমা আমিও করে দিচ্ছি। "
" না.. না চাচিমণি আমরা দু'জন পারবো সমস্যা হবে না। আপনারা বসুন।"
শেহরিন আর তিথি মিলে সবার প্লেটে খাবার সার্ভ করে দেয়। সদস্য সংখ্যা বেশি হওয়াতে হুল্লোড় পার্টির কিছু জন সোফায় বসে টিভি দেখতে দেখতে খাওয়া শুরু করে দিয়েছে ইতিমধ্যে ।
অল্প কিছুক্ষণের মাঝে এসে উপস্থিত হয় সান্নিধ্য। মুখোরেখায় তার বেশ ব্যস্ততার ছাপ। হাতে খুব কম সময় নিয়ে এসেছে । না আসলে হয় না বিধায় বাধ্য হয়ে এসেছে। শেহরিনের দিকে এক নজর তাকিয়ে সে চেয়ার টেনে বসে পড়ে।
" এমপি সাহেবের সময় হলো তাহলে। আমরা তো ভেবেছি আর দেখাই হবে না।"
" আপনাদের জন্যই আসতে হলো।"
" এতো ভালো কবে হলে তুম? বাহ্! তবে, বিয়ে না করলে আসতে না শিউর। বাসায় বউ আছে এই ফাঁকে একটু দেখাও হয়ে যাবে। এজন্যই এসেছে বেচারা।"
ছোট চাচার কথায় সান্নিধ্য নিরুত্তর থাকলেও সবাই বেশ মজা পায়। তবে, শাহজাহান সাহেব, মিসেস নাজনীন উপস্থিত থাকায় কেউ লাইন ছেড়ে বেলাইনে যেতে পারে না।
" বড় বউমা তাসিনকে দেখো। ওতো কিছুই খেলো না। তুমি বসে পড়ো।"
তিথি নিজের কাজটুকু সেড়ে তাসিনের কাছে চলে যায়। সবাই খাওয়া শুরু করে দিয়েছে ইতিমধ্যে। মিসেস নাজনীন শেহরিনের দিকে তাকিয়ে বলেন, " তুমি ফ্রেশ হয়ে এসে খেতো বসো। যার যেটা প্রয়োজন সে সেটা নিজেই নিতে পারবে এখন ।"
শেহরিন আলতোভাবে মাথা নাড়িয়ে নিজ কক্ষে চলে যায়। হুট করে তার মনটা বেশ খারাপ হয়ে যায়। ফ্রেশ হয়ে এসে খাওয়া মানে সবার শেষে একা একা খাওয়া। এতোগুলো মানুষ অথচ সে কি না...
" ধূর পঁচা মেয়ে এতো ভাবছো কেন?এটাকেই হয়তো সংসার বলে। বাড়ির সবার দেখাশোনা করে তারপরে নিজের দিকটা দেখতে হবে। বউ হলে এসব হয়তো ম্যান্ডেটরি।"
নিজেকে নিজেই বুঝিয়ে চুপচাপ সে ওয়াশরুমে চলে যায় ফ্রেশ হতে। নতুন তাই হয়তো এমন লাগছে নিজের মধ্যে। ধীরে ধীরে সয়ে গেলে সবঠিক হয়ে যাবে।
শেহরিনের ফ্রেশ হতে বেশি সময় লাগে না। খানিকক্ষণ বাদেই টাওয়েল দ্বারা মুখটা মুছতে মুছতে সে ওয়াশরুম হতে বের হয়। কিন্তু বের হওয়ার সাথে সাথে তার দৃষ্টিতে স্থিরতা নেমে আসে। হাতের কার্য থামিয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, "আপনি এখানে কেন? "
" আসো। "
শেহরিন ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে সামনে এগোয়। সোফার উপরে সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত সুপুরুষটি এক হাতে প্লেট আরেক হাতে ফোন নিয়ে কিছু একটা করে যাচ্ছে।
" আপনি খাওয়া ছেড়ে এখানে কি করছেন?"
সান্নিধ্য প্রয়োজনীয় ই-মেইল টুকু পাঠিয়ে ফোনটা বন্ধ করে প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে নেয়। সামনে দাঁড়ানো বিস্মিত বধূর বাম হাতে আঁকড়ে ধরে নিজের পায়ের উপর বসায়। শান্তকন্ঠে জবাব দেয়,
" খাওয়া ছাড়েনি। জায়গা ছেড়েছি।"
" কেন? "
" মনে হলো তাই।"
" এটা ঠিক হয়নি। সবাই কি ভাবলো বলুন তো? "
" সবাই কি ভাবলো সেটা আমি ভাবতে যাবো কেন? আমার নিজেরই অনেক ভাবনা। দম নেওয়ার সময় পাচ্ছি না।"
প্লেটে বেশ খানিকটা পোলাও সঙ্গে দুটো লেগপিস আর সালাদ। সান্নিধ্য সুন্দরভাবে গুছিয়ে লোকমা তুলে শেহরিনের মুখের সামনে তুলে ধরে বলে, "বউকে না খাইয়ে রেখে নিজ খেলে পেট খারাপ হবে। নাও.. "
শেহরিন তার নেতাসাহেবের কাজে বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। শেষ কথাটায় খানিকটা হাসিও আসে । মানুষটার এই অদ্ভুত কাজে মনের মধ্যে রঙিন প্রজাপতিরা ডানা মেলা উড়া শুরু করেছে তার । হঠাৎ এতো সুখ সুখ অনুভব হচ্ছে কেন বুঝতে পারছে না নববধূ। বাড়ানো লোকমটা মুখে তুলে নেয় সে ধীরবেগে। কিন্তু চাহনি সরে না তার ব্যক্তিগত পুরুষ হতে।
" পোলাও ঝাল রোস্ট আপনার খুব পছন্দের খাবার? "
শেহরিনকে খাইয়ে দেওয়ার ফাঁকে ফাঁকে সান্নিধ্য নিজেও খেতে থাকে। মাথা নাড়িয়ে ছোট করে উত্তর দেয়, " হু।"
" মিষ্টি পছন্দ করেন? "
" একটা মিষ্টি পছন্দ করি শুধু।"
" কোনটা? "
" তুমি গেস করো।"
" সানজি আপু যে বললো আপনি মিষ্টি পছন্দ করেন না।"
" বললাম তো শুধু মাত্র একটা মিষ্টিই পছন্দ করি। "
শেহরিন কপাল কুঁচকে ভাবনায় পড়ে যায়। একটা মিষ্টি?কোনটা? রসগোল্লা? কালো জাম? সন্দেশ? নাকি পানতুয়া?
সান্নিধ্য শেহরিনের মুখে ফের লোকমা তুলে দিতে দিতে মৃদু হেসে বলে, " যা ভাবছো সেগুলো নয়। একটু ডিফরেন্ট।"
" হিন্টস্ দিন।"
" তুমি মিষ্টি পছন্দ করো? "
"হু।"
"গুড। বেশি বেশি মিষ্টি খাবা।"
" তাতে কি লাভ হলো? বেশি বেশি খেলে ডায়াবেটিস হয়ে যাবে।"
" হবে না। "
"কিভাবে? "
" তুমি মিষ্টি খেয়ে আমাকে ট্রান্সফার করে দিবা।"
এতোক্ষণ পরে কথার মূল ভাবার্থ বুঝতে পেরে শেহরিন চোখ বড় বড় করে তাকায়। তার সরলমনের প্রশ্নগুলো এই লোক কতটা গভীরে নিয়ে চলে গিয়েছে। ভাবা যায় উনার মনে এই ছিলো? লজ্জায় লাল হয়ে সে ঠোঁট চেপে বসে থাকে নিরব হয়ে। আর একটা কথাও বলবে না ঠোঁটকাটা লোকটার সঙ্গে।
" বুঝতে পেরেছো? নাকি বুঝবো।"
" আমার পেট ভরে গিয়েছে। আর খাবো না। উঠবো।"
"পুরোটা শেষ করে উঠবে।"
"আপনি খান। "
" আমি খাচ্ছিই। বাই দ্যা ওয়ে, তুমি কি জানো খাওয়া শেষে মিষ্টি মুখ করতে হয়? "
লাগামছাড়া প্রশ্নে শেহরিন পড়ে যায় বিপাকে। এরকম প্রশ্নের উত্তরে হ্যাঁ না দুটোই বলা ঝামেলার। কোনটা বলবে এখন সে? মস্তিষ্ক শূন্য হওয়ার পথে নেতাসাহেবের ঠোঁটে নিরবে বয়ে চলা বাঁকানো হাসি দেখে সে আরো এলোমেলো হয়ে উঠে। চোখ ঘুরিয়ে নেয় অন্যদিকে। মনে মনে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে, ২১ বছরের জীবনে সে এতো লজ্জা কখনো পায়নি যতটনা বিয়ে হতে এই দুইদিন হলো পেয়ে যাচ্ছে সবার হতে ।