ঋতুর পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে কেটে যায় মাঝখানে সাতটা দিন।
বীভৎস সেই দিন, বীভৎস সেই ক্ষণ পুরোপুরি ধুয়ে মুছে না গেলেও বেশ খানিকটা মন হতে দূর হয়ে যায় শেহরিনের। হাসপাতাল হতে ডিসচার্জ পেয়েছে সে পরেরদিনই । তবে ডাক্তারের নানান নির্দেশনায় সে ক্লান্ত, বিরক্ত। এতোকিছু মেনে চলা যায়? মনে মনে তার ভীষণ আফসোস। কেন যে এতো ভীতুর ডিম হলো। কেন সে দূর্গম রাজ্যের রাজকন্যা হলো না। ঢাল তলোয়ার অস্ত্রবিদ্যায় শত্রুর বিনাশ শিখলো না !!
" মা সময় হয়ে গিয়েছে মেডিসিন খেয়ে নাও।... "
বেলকনিতে বসারত অবস্থায় বাবার ওষুধ খাওয়ার নির্দেশনা কর্ণে পৌঁছায় শেহরিনের। সবুজ কুঞ্জলতার লতানো দেহের দিক হতে দৃষ্টি সরে তার। এই একজন মানুষ ! তার বাবা। আজ সাতদিন হলো তার বিজনেস অফিস মিটিং সমস্ত কিছু বাদ দিয়ে মেয়ের সেবা যত্ন করে যাচ্ছে। একটাই কথা, তার চোখে মেয়ে পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত সে ঢাকায় ফিরবে না। যার কারণে, বাসায় বসেই যতটুকু ভার্চুয়ালি কানেক্টেড থেকে অফিস সামলানো যায় সেটুকুই করে যাচ্ছেন তিনি।
অন্যদিকে মেয়ে ক্রমাগত তাকে বুঝিয়ে যাচ্ছে, চোখের সামনে স্বতঃস্ফূর্ত ভাব দেখিয়ে চলছে। বারেবারে বলছে, বাবা তুমি যেতে পারো এখন কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু বাবা শোনে না মেয়ের কথা। মেয়ের ডান হাতের দিকে তাকালে তার দিন দুনিয়া আঁধার হয়ে আসে। ঢাকা যাবে কিভাবে!
" মা..."
দ্বিতীয়বার ডাক আসতেই শেহরিন বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে। ধীর পায়ে কক্ষে প্রবেশ করে মেডিসিন বক্সটা বাম হাতে নিয়ে ডাইনিং এ বাবার কাছে চলে যায়। ডান হাত তার এখনো ক্ষত। এই ক্ষত হয়তো সহজে আর মিশবে না৷ তালুর চামড়া পুড়ে গিয়েছে। মাঝখানে লম্বালম্বি হয়ে কালো বর্ণ ধারণ করে আছে। নাজুক কায়া সেদিকে তাকাতে পারে না। তাকালেই তার বুকের ভিতরটা ভারী হয়ে আসে। ওই জানোয়ারটার নির্মমতার প্রতিচ্ছবি চোখে ভেসে ওঠে।
" দেরি করো না। টাইমলি মেডিসিন নিতে হয়।"
"খেয়েছো তুমি বাবা? "
" হ্যাঁ মা খেয়েছি। "
রিজওয়ান সাহেব ছোট ডাইনিং টেবিলের এক পাশটায় বসে ল্যাপটপে কাজ করছেন। এতোদিনের অনুপস্থিতিতে কাজের পাহাড় জমা তার। এর আগে কখনো কোনো সময় এতোটাদিন স্ব শরীরে কাজ হতে বাহিরে থাকেননি সে। সাতদিনের মোট চারটা মিটিং, ডিল কান্সেল করে দিয়েছেন । নারায়ণগঞ্জে নতুন প্রজেক্ট শুরু কথা ছিলো সেটাও স্থগিত করে দিয়েছেন। কারণ,প্রসঙ্গ যখন তার মেয়ে। সমস্ত কাজ জলাঞ্জলি দিতে এক সেকেন্ড ও কার্পন্য বোধ করবেন না তিনি।
" বাবা.."
" জ্বি মা।"
শেহরিন ওষুধ খাওয়া শেষ করে নরম গলায় বলে, "আমার ভার্সিটি মিস্ যাচ্ছে বাবা। সময়ও বেশি নেই ইয়ার ফাইনাল হতে। এই সময় ভার্সিটি মিস্ দেওয়া মানে বিরাট লস্।"
" কিন্তু তুমি তো এখনোও বেশ উইক। "
"উইক না বাবা। হাত ছাড়া আমি আলহামদুলিল্লাহ ফিজিক্যালি স্ট্যাবল আছি এখন। আর সমস্যা হচ্ছে না। "
রিজওয়ান সাহেব ল্যাপটপ হতে দৃষ্টি সরিয়ে মেয়ের দিকে তাকান। মৃদুস্বরে বলেন, " হাতে কি কলম ধরতে পারবে? "
"একটু কষ্ট হবে। বাট মনে হয় চেষ্টা করলে পারবো।"
" প্রেশার পড়ে যাবে হাতে। মাংস পেশিতে টান লাগবে।"
শেহরিন একটুখানি সময়ের জন্য হাতের দিকে তাকায়। সঙ্গে সঙ্গে চোখ তুলে নিয়ে বলে, " ঋতমা আছে, আমার কিছু ক্লাসমেট আছে ওদের থেকে নোটস্ কালেক্ট করবো। আমি যদি কিছু নাও লিখতে পারি লেকচার গুলোতে জাস্ট অ্যাটেন্ড করবো।"
" এটাও করা যায়। লেকচারগুলো শুনলে উপকার হবে। কিন্তু তুমি কি লং টাইম বসে থাকার এনার্জি পাবে মা ?"
"ওহহো বাবা। আমি কি ছোট বাচ্চা নাকি !! অবশ্যই পারবো।কোনো সমস্যা হবে না।"
" তাহলে একটা অ্যাপ্লিকেশন রেডি করতে হবে।"
" আমি ঋতমাকে বলেছি। ও আমার হয়ে অ্যাপ্লিকেশন রেডি করে দিবে। তুমি শুধু কালকে আমাকে ভার্সিটি যাওয়ার অনুমতিটা দাও।"
রিজওয়ান সাহেব মুখোরেখায় কিছুটা ভাবুক চিন্তার ভাঁজ ফেলে বলেন, " ঠিক আছে অনুমতি দিলাম তবে, বেশি প্রেশার নিবে না। আমার টপ রেজাল্টের কোনো দরকার নেই। ফার্স্ট প্রায়োরিটি তোমার সুস্থতা।"
" ওকে বাবা। ধন্যবাদ তোমাকে।"
" ওয়েলকাম মা। আচ্ছা এখন যাও রেস্ট নাও তুমি। "
শেহরিন বসা ছেড়ে উঠে না। বাবা রেস্ট নেওয়ার কথা বললেও সে কোনো প্রতিত্তুর করে না সে বাক্যে । দেনামোনা ভাব নিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। বাম হাতে ডাইনিং এ রাখা এটা ওটা জিনিস নাড়াচাড়া করতে থাকে। রিজওয়ান সাহেব নিজ কাজে মনোযোগ দিলেও মেয়ের ভাবমূর্তি লক্ষ্য করেন। বুঝতে সক্ষম হন, তার কথা শেষ হলেও মেয়ের কথা এখনো শেষ হয়নি। হয়তো কিছু একটা বলতে চাইছে কিন্তু হেজিটেশনের কারণে বলতে পারছে না। তবে তিনিও নিজ থেকে কিছু বলতে যান না। দেখা যাক, মেয়ে নিজ হতে কতদূর এগোয়।
দু এক মিনিট এভাবেই পেরোয়। শেহরিনের ভিতরে প্রশ্নেরা এসে জমাট বাঁধে দলবলে। কিন্তু মুখ ফুটে উচ্চারণ করতে পারে না লজ্জার কারণে। কিভাবে নেতাসাহেবের কথা জিজ্ঞেস করবে সে? বলবে কি করে, বাবা নেতাসাহেব কি হারিয়ে গিয়েছেন নাকি চট্টগ্রাম ছেড়ে দূর গ্রামে পাড়ি জমিয়েছেন। সেই যে হসপিটালে থাকতে একটাদিন মাত্র এসেছিলো তাকে দেখতে। এর পর হতে তো লাপাত্তা। সুস্থ হতে দেখে বুঝি আর কোনো খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি? এ কেমন নিষ্ঠুরতা এমপি হয়ে। জনগণের দিকে কোনো খেয়াল নেই তার !!
" বাবা.."
" বলুন.. "
" মামা মামি কি এসেছিলো ? "
" সরি...? "
শেহরিন নিবদ্ধ চোখ তুলে তাকায়। কোমল কন্ঠে বলে, "মামা মামি এসেছিলো কি আমাকে দেখতে? "
" তুমি কি ভুলে গিয়েছো মা? দু'দিন আগেই তো মামা মামি আরশ, মুমু এসেছিলো তোমাকে দেখতে।"
" ওহ্। হ্যাঁ এসেছিলো। ভুলে গিয়েছিলাম।"
" তুমি কি অন্য কারো আসার কথা চিন্তা করে ভুল বকছো ?"
রিজওয়ান সাহেবের সূক্ষনজরদারিতে শেহরিন চোখ নামিয়ে নেয় সঙ্গে সঙ্গে। বামে হাতের আঙুল ওড়নার সাথে পেঁচাতে পেঁচাতে নিরব বনে চলে যায় সে। ধরা খেয়েছে। বাবা বুঝেও গিয়েছে। আর কিছু বলার প্রয়োজন নেই।
" নেতাসাহেব তো মনে হচ্ছে কাজে ভীষণ ব্যস্ত। এমপি মানুষ তার কি আর বসে থাকার উপায় আছে বলো ? আর আমিও বলে দিয়েছি আমার মেয়ের না বার্তার উপরে কোনো কথা নেই। বারে বারে ফোন করবে না।"
"ফোন করেছিলেন উনি তোমাকে?"
" হ্যাঁ করেছিলো। "
"কি বলেছেন?"
" এটা আমাদের মাঝে কথা বার্তা মা। তোমার শোনার প্রয়োজন নেই।"
"ওহ। ঠিক আছে।"
" আচ্ছা। একটা মিনিট ওয়েট করো। কাজটা শেষ করে নেই। তোমার সাথে কিছু কথা আছে আমার। "
শেহরিন উঠতে গিয়ে আবার বসে পড়ে৷। বাবার কথা আছে শুনে বুকের মধ্যে তার অস্থিরতা ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে । না জানি কি বলবে নেতাসাহেবকে নিয়ে। অজস্র ভাবনারা এক মুহূর্তেই মাথায় এসে ঘুরপাক খেতে থাকে তার।
রিজওয়ান সাহেবের আপাতত কাজ শেষ হয়। ল্যাপটপখানা বন্ধ করে সে দু'হাত মুষ্টিবদ্ধ করে টেবিলে রাখেন। শেহরিনের দিকে পূর্ণ মনোযোগে তাকিয়ে স্থির গলায় বলেন,
" রিলাক্স হও। আমি তোমাকে কিছু প্রশ্ন করবো তুমি ঠান্ডা মাথায় সময় নিয়ে ধীরে সুস্থে সঠিক উত্তরটা দিবে কেমন? "
শেহরিন অল্প বিস্তর মাথা নাড়িয়ে সায় জানিয়ে বলে,
" জ্বি বাবা।"
" প্রশ্নগুলোকে গুরুত্ব সহকারে নিবে। কারণ এটা তোমার জীবনের একটা বিশেষ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করবে। তাড়াহুড়ো করে মনের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো কথা বলবে না। আমি জাস্ট তোমার থেকে ক্লিয়ার হতে চাই এই বিষয়টা নিয়ে। কারণ কোনো জিনিসই অধিক সময় নিয়ে ঘাটাঘাটি করা উচিত নয়। সেটার মূল্য কমে যায়।"
" জ্বি।"
" তুমি কি সান্নিধ্য কে পছন্দ করেছো বা তোমার মনে কি তার জন্য ভালো লাগা সৃষ্টি হয়েছে? "
শেহরিনের শরীরে ঠান্ডা স্রোত বায়। সে আগে হতেই ভেবে রেখেছিলো বাবার প্রথম প্রশ্ন হয়তো এটাই হবে। তার থেকে সুস্পষ্ট উত্তর চাইবে এই নিয়ে।
উত্তর দেওয়ার আগে সে সন্তপর্ণে চোখ বন্ধ করে নেয় । মনকে নিরেট স্বরে জিজ্ঞেস করে, তুমি তাকে পছন্দ করো?
প্রশ্ন করা মাত্র মন মস্তিষ্কে তার সঙ্গে সঙ্গে নেতাসাহেবের মুখটা ভাসিয়ে তোলে। মানুষটার ছোট ছোট যত্ন, দায়িত্ব সেই সাথে সম্মান করাটা স্মরণে আসে। যেগুলো তার ভালো লাগার মূল কারণ। থিতু হয় সে। এইটুকুই যথেষ্ট। নির্মেদ কন্ঠ উন্মুক্ত করে বলে,
" হ্যাঁ। "
" এ ব্যাপারে কোনো কনফিউশান আছে কি? "
" না। "
" তুমি কি তার সাথে একটা পবিত্র বন্ধনে জড়ানোর সাহস করতে পারো মা?"
" বিয়ে? "
" হ্যাঁ বিয়ে। যেহেতু তোমার ভালো লাগার ব্যাপারটা সৃষ্টি হয়েছে সেই হিসেবেই বলছি।"
"উনি কি এ ব্যাপারে তোমাকে কিছু বলেছে?"
রিজওয়ান সাহেব পরিষ্কার কন্ঠে বলেন, " না। সে তোমার অপেক্ষায় আছে। তুমি যেদিন তাকে হ্যাঁ বলবে ঠিক সেদিনই সে এগোবে। এর বাইরে সে কিছু করবে না। "
শেহরিন ফের দ্বিধা দ্বন্দ্বের মধ্যে পরে যায়। বিয়ের ব্যাপারটায় সরাসরি হ্যাঁ বলার সাহসটা তার ভিতরে আসে না। মনের মধ্যে অজানা একটা ভয় এসে জেঁকে ধরে। লোকটা এখনও অপেক্ষার তালিকায় নিজেকে স্থির করে রেখেছে।
" তুমি যদি সত্যিকার অর্থে তাকে পছন্দ করো তাহলে আমার মনে হয়ে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই যথার্থ। কারণ, ভালোবাসা এই পছন্দের আড়ালেই লুকিয়ে আছে। ধরতে গেলে সুপ্ত অবস্থায় আছে প্রকাশ পাবে আরো কিছুটা সময় পর। আমি তোমাকে অনুরোধ করবো, যদি তোমার দ্বিতীয় কোনো ভাবনা চিন্তা না থাকে বা এর চেয়ে বেটার অপশন চুজ করার ইচ্ছে না থাকে তাহলে তাকে হ্যাঁ বলে দাও। এভাবে ছেলেটাকে অপেক্ষায় রাখা উচিত নয়।"
শেহরিন মৌনতা অবলম্বন করে। রিজওয়ান সাহেব মেয়ের নিরবতার মাঝে একটু থেমে আবার কথা তোলেন, " আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে ছেলেটাকে পরোখ করেছি। কিছু ব্যাপার আমার পছন্দ না হলেও মানুষ হিসেবে তাকে আমার পছন্দ হয়েছে। তবে আমার পছন্দ অপছন্দ কিছু নয়। তুমি যেটা বলবে সেটাই আমি মেনে নিবো। হ্যাঁ বা না যেটাই হোক না কেনো তুমি সেটা তাকে জানিয়ে দাও। আমাদের উচিত হবে না ছেলেটাকে আশায় রাখা। তার ক্ষতি করা। তুমি কি জানো ওর এই সমস্ত ব্যাপারে একদিক থেকে ভীষণ ক্ষতি হচ্ছে। "
ক্ষতির কথা শুনে শেহরিন নাজুক দৃষ্টি মেলে তাকায় বাবার দিকে। ধীর কন্ঠে শুধায়, " ক্ষতি হচ্ছে? "
"হ্যাঁ ক্ষতি হচ্ছে। এই যে ও বাঁধাহীনভাবে তোমার সঙ্গে দেখা করছে কথা বলছে। তোমাকে হেল্প করছে। এগুলো জনসাধারণের নজরে আসছে। আর পলিটিক্যাল পার্সনদের এই ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হয় ভীষণ। একটা ভুয়া সংবাদ ক্যারিয়ারে বিপর্যয় এনে দিতে সক্ষম। জনগণের আস্থা হারাতে সক্ষম । আমার মনে হয় এই জিনিসটা আগেও তোমাকে আমি অবগত করেছি। "
" জ্বি..। "
"ও নিজ থেকে তোমাকে কিছু বলবে না, জোর জবরদস্তি করবে না। কিন্তু সে হাত গুটিয়ে বসেও থাকবে না তোমার বিপদে। সে আসবে তোমাকে দেখভাল করবেই। তুমি কি এটা লং টাইম ক্যারি করতে চাও বলো মা? তুমি কি চাও সে কাজ ফেলে সবসময় তোমাকে নিরাপত্তা দিতে তৎপর থাকুক।
যদি তোমার মন বলে সে তোমার জন্য উপযুক্ত তাহলে আমি তোমাদেরকে দু'জনকে এক করে দিতে রাজি। কারণ আমি চাইছি না আর তোমাকে একা এভাবে ছাড়তে। একটা বিশ্বস্ত হাতে তুলে না দেওয়া পর্যন্ত নিশ্চিন্ত হওয়াটা কঠিন।"
বাবার কথাগুলো শেহরিনের একপাক্ষিক চিন্তা ভাবনাগুলোকে দূর করে দেয়। সে নিজের ভীতি কাটিয়ে সমস্ত কথাগুলোর অর্থ মস্তিষ্কে পুনরাবৃত্তি ঘটায়। আমি একজনকে পছন্দ করেছি, তার প্রতি আমার ভালো লাগা সৃষ্টি হয়েছে, আমি চাইছি সে আমার কেয়ার করুক, আমার আশেপাশে কিংবা আমার খোঁজ রাখুক। সে যে আমাকে সম্মানটা দিচ্ছে সেটাতে আমি তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকছি। মোট কথা আমি তাকে ধরে রাখতে চাইছি। তবে সেটা একজন জীবনসঙ্গী হিসেবে কেন নয়? একটি পবিত্র বন্ধনের মাধ্যমে কেন নয়? কেনো আমি নিজের ভালো লাগাগুলোর প্রসার ঘটাতে তার ক্ষতি করবো। যেখানে সে চুপচাপ সেটা সহ্য করে যাবে। তার ক্ষতি সম্পর্কে কোনো কথা বলবে না। দায়ী করবে না আমাকে। তাহলে আমার কি উচিত নয় তার দিকটাও ভেবে দেখা? আমি তো চোখ বন্ধ করেও নিজেকে ইনশিউর করতে সক্ষম হচ্ছি, হি ইজ ডেফিনিটলি পার্ফেক্ট ফর মি। তাহলে ভয় আসছে কেন?
নিজেকে স্থির করে শেহরিন। সুস্পষ্ট গলায় বলে,
" আমার মনে হয় উপযুক্ত কথাটা সঠিক বাবা। আমি এমন একজনকেই চেয়েছি যে আমাকে একটু বুঝবে, প্রাপ্য সম্মান, যত্নটুকু করবে। আমার বিশেষ কিছু চাওয়া নেই। আমার অধিক অর্থ সম্পদের প্রতি কোনো ইন্টারেস্ট নেই। আমি শুধু একটু শান্তি চাই। ভালোবাসা চাই। জীবনে যতটুকু যা প্রয়োজন ততটুকু মিটলেই এনাফ্। তবে, আমি পড়াশোনাটা কন্টিনিউ করতে চাই। এ ব্যাপারে আমি কোনো কম্প্রোমাইজ করবো না।"
" শিউর এই ব্যাপারে আমিও তোমার সাথে একমত্। তবে কি আমি ফাইনাল অ্যান্সার হ্যাঁ ধরে নিবো মা?"
" হ্যাঁ। তবে বিয়ের আগে আমি একটা শান্তিচুক্তি করতে চাই উনার সাথে।"
" শান্তি চুক্তি? "
শেহরিন মৃদু হাসে। দৃঢ় কন্ঠে বলে, " ইয়েস শান্তিচুক্তি। সে যেহেতু তার প্রফেশনাল লাইফে অশান্তির মাঝে বিরাজ করে সেখানে পার্সোনাল লাইফে আমাকে অবশ্যই তার সাথে শান্তি চুক্তি কার্যকর করে নিতে হবে।"
" ওকে। সেটা তোমরা দু'জন মীমাংসিত করে নিবে। আরো যা যা কথা বলে ক্লিয়ার হওয়া যায় হয়ে সেটাও করে নিবে। দু'জন দুজনের দিকে পরিষ্কার থাকবে । যাতে বিয়ের পর কোনো সমস্যা সৃষ্টি না হয়। "
" শিউর বাবা।"
রিজওয়ান সাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েন। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে সস্নেহে বলেন, " গড ব্লেস ইউ মা। আমার মন বলছে তুমি সুখী হবে।"
শেহরিন নরম হেসে বাবার আদর গ্রহণ করে নেয়। হুট করে কেনো জানি মনটা তার এখন ভীষণ হালকা লাগছে। মনে হচ্ছে এতোদিনের দ্বিধা দ্বন্দ্বের পাথরগুলো তার বুক হতে নেমে গিয়েছে। নেতাসাহেবের সাথে বিয়ে নিয়ে শান্তি চুক্তি করবে সে। বিয়ে?? নেতাসাহেব ?? আল্লাহ কতদূর চলে গিয়েছে।
_____________________________________
| হালিশহর, রাত সাড়ে দশটা |
সুখমহলে হরহামেশা যে চিত্র দেখা যায় আজ তার ব্যতিক্রম কিছু নয়। রাতের ডিনার সবার হয়ে গিয়েছে মোটামুটি। বাদ ছিলেন নেতাসাহেব আর সরফরাজ। নেতাসাহেব খাওয়া শুরু করলেও সরফরাজ মাত্র আসায় ফ্রেশ হতে গিয়েছে উপরে।
সান্নিধ্যের পাশের চেয়ারটার সঙ্গে এক বান্দা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে থাকা বললে ভুল হবে বাঁধা অবস্থায় আছে। সানজির একটা ওড়না তার পেটের উপর দিয়ে গিয়ে চেয়ারের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্টে লাগানো হয়েছে। তবে বান্দার হাত পা স্থির থাকলেও মুখ চলমান। একটা চুইংগাম সে ঘন্টা খানেক হলো চিবিয়ে যাচ্ছে।
আজকের অপরাধ একটু গুরুতর। সন্ধ্যায় সে তার মিসকে কোথা হতে তেলাপোকা ধরে এনে ভয় দেখিয়েছে। সরাসরি তার চুলের উপর ছুঁড়েছে। ম্যাম ভয়ে কান্না করে না পড়িয়ে চলে গিয়েছে।
দুই নম্বর, রাতে হোমওয়ার্ক করানোর সময় একটা খাতাও তিথি খুঁজে পায়নি। হয়তো স্কুলেই ইচ্ছেকৃতভাবে রেখে এসেছে বেবি মানকিটা । যাতে বাসায় এসে হোমওয়ার্ক না করতে হয়।
তৃতীয় অপরাধ, সান্নিধ্য বাসায় আসার সঙ্গে সঙ্গে সে ইয়ো পানি বলে উপরতলা হতে গ্লাস হতে পানি তার গায়ে ঢেলে ভিজিয়ে দিয়েছে।
অতঃপর সবগুলো অপরাধ একত্রে করে তার পানিশমেন্ট চলছে। একঘন্টা তাকে এই অবস্থায় থাকতে হবে। যদিও তিথির হাতে দু এক ঘা খেয়েছে একটু আগে। কিন্তু সান্নিধ্যের দেওয়া পানিশমেন্টের নড়চড় হবে না।
"ফুমণি... "
সোফায় বসে সংবাদ দেখছেন শাহজাহান খান। তারই পাশে গুটিশুটি হয়ে পা তুলে সোফায় বসে ফোনে ধ্যান দিয়েছে সানজি। তাসিনের ডাক পেতেই চোখ তুলে তাকিয়ে বলে,
" কি হয়েছে? "
" আমার স্কুল ব্যাগে দুটো চকোচকো আছে। নিয়ে আসো তো যাও।"
" তোর হাত বাঁধা চকোচকো খাবি কিভাবে?"
"তুমি খাইয়ে দিবে।"
" ওরেহ মামার বাড়ির আবদার। চুপচাপ যেটা মুখে আছে সেটাই খেতে থাক। তোর ভয় হয় না কেন? "
" আমি বড় হয়ে গিয়েছি। ভয় পাই না। বিয়ে করবো আমি। ইয়ো পানিকে বিয়ে করবো।"
ইয়ো পানির কথা শুনে সান্নিধ্য খেতে খেতে তাসিনের দিকে তাকায় এক নজর । অতঃপর গম্ভীর কণ্ঠে বলে, " চকোচকো খাবি? "
" আছে তোমার কাছে? "
সান্নিধ্য একটা মরিচ তুলে নিয়ে তাসিনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
" এটা হচ্ছে স্পাইসি চকোচকো। খেয়ে দেখ্ মজা আছে।"
" সত্যি? "
" হা কর।"
তাসিন সরল মনে হা করতেই সানজি লাফ দিয়ে এসে সান্নিধ্যের হাত হতে মরিচ কেড়ে নেয়। ফেলে দিয়ে বলে, " হুঁশ। এটা খেলে তুই মানকির মতো লাফাবি আরো। মরিচ চিনিস না? "
" ইয়ো সানি বলেছে মজা খেতে। "
" তোকে আরো পানিশমেন্ট দেওয়ার জন্য বলেছে। "
"ওর মাথা থেকে ইয়ো পানির ভূতটা নামা। আমার তো মান সম্মান খেয়েইছে এখন শেহরিনের টা শেষ করবে।"
সানজি সান্নিধ্যের দিকে ঘুরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
" ওকে বলে লাভ নেই। তুই তোর কাজ কর। শোন যা করবি একটু তাড়াতাড়ি কর। নীল নকশা চলছে বাসায় তোর বিরুদ্ধে।"
" কি হয়েছে? "
সানজি মুখ খোলার আগেই শাহজাহান সাহেব পিছু ঘুরে ভারী কন্ঠে বলেন, " সান্নিধ্য তোমার খাওয়া শেষ হলে এখানে আসো। কথা আছে। "
কিছুটা সময় পার হতেই সান্নিধ্যের খাওয়া শেষ হয়। একইসাথে তিথি সরফরাজ উপর হতে নামে।
নিচে নামা মাত্র ছেলের অবস্থা দেখে হতাশা চোখে তাকায় সরফরাজ। উপায়ন্তর না পেয়ে ছেলের হয়ে সে নিজে সবার কাছে অনুনয় করে বিশেষ শর্তে মুক্তি পাইয়ে দেয়। বেবি মানকি ছাড়া পেয়ে খানিকক্ষণ লাফালাফি করে। অতঃপর সোফায় এসে দাদুর হাত হতে রিমোট নিয়ে কার্টুনের চ্যানেল দিয়ে সবার মাঝখানে এসে বসে।
সানজি বাবার কথা মতো নাজনীন বেগমকে ডেকে আনেন। সকলে একত্রে হওয়া শেষে শাহজাহান সাহেব সুস্থির কন্ঠে বলেন,
" সান্নিধ্য আমরা একটা বিশেষ কাজ করে এসেছি। তুমি যেহেতু এই কয়টাদিন ব্যস্ত ছিলে তাই জানানোর সুযোগ হয়ে উঠেনি। আজকে ফ্রি আছো তাই ভাবছি কথাটা বলা উচিত তোমাকে।"
" বলো।"
শাহজাহান সাহেব স্ত্রীর পানে এক পলক তাকিয়ে বলেন, " আমরা অন্বেষাকে রিং পড়িয়ে এসেছি হবু পুত্রবধূ হিসেবে।"
" কোন পুত্রের বধূ হিসেবে? "
সরফরাজ হাল্কা কেশে উঠে সান্নিধ্যের বাঁকা কথা শুনে। সানজি ধীর পায়ে ভাইয়ের আড়ালে গিয়ে মুখ টিপে হাসে। কিন্তু বাদ বাকি তিনজন মুখ থমথমে করে্। নাজনীন বেগম বিরক্ত গলায় বলেন, " কোন পুত্রের বধূ হিসেবে মানে? তুমি ছাড়া অবিবাহিত আর কোন পুত্র আছে আমাদের? নিশ্চয়ই তোমার কথাই বলা হয়েছে।"
" পুরুষ মানুষ চারটা বিয়ে করতে পারে আম্মা।"
" তোমার ভাইয়া একটাই বিয়ে করেছে আর একটাই থাকবে সান্নিধ্য। এসব কথা বলে কথা ঘুরিয়ো না প্লিজ। আমরা অন্বেষাকে রিং পরিয়ে এসেছি। বুঝতে পারছো ব্যাপারটা কতদূর এগিয়ে গিয়েছে?"
সান্নিধ্য সরাসরি শাহজাহান সাহেবের দিকে তাকায়।শান্ত গলায় বলে, " বাবা তুমি কি জেনে বুঝে কাজটা করেছো? আম্মা ভাবির কথা বাদ দিলাম। আম্মার ভাই তাই টান সেদিকে ঠিক আছে, ভাবির কিসের টান জানি না। বাট তুমি কি ভেবে এই কাজে সমর্থন করেছো তাও সেটা আমাকে না জানিয়ে? "
" তোমার আপত্তিটা কোথায় সান্নিধ্য? সমস্যা কি?"
" আপত্তি সমস্যা এসব বাদ দাও। আমি ক্লিয়ারলি বলেছিলাম আমি অন্বেষাকে বিয়ে করবো না। সবার সামনেই বলেছিলাম সেটা। তারপরেও সেটা নিয়ে কথা কেন তুলছো? রিং টিং এসব পরিয়ে আসার মানে কি? "
" তোমার কাছে মানে না থাকতে পারে আমাদের কাছে আছে। একটা মেয়েকে এভাবে কতদিন কথা দিয়ে রাখা যায়? "
" কথা আমি দেইনি। তোমরা দিয়েছো তোমরা বুঝবে। এসব উল্টাপাল্টা লজিক আর কাজকর্মের দায়ভার আমাকে দিতে আসবে না।"
" তুমি কি অন্বেষাকে বিয়ে করবেই না বলে মনস্থির করে ফেলেছো ?"
" সান্নিধ্যের না মানে না। তুমি সেটা জেনেও কেনো এরকম বোকা একটা কাজ করছো বাবা? আমি সত্যি অবাক হচ্ছি।"
শাহজাহান সাহেব দীর্ঘ শ্বাস ফেলেন। পায়ের উপর পা তুলে দিয়ে সোফায় শরীর এলিয়ে দিয়ে বলেন, " রাজ্জাককে মানা করাটা খুব খারাপ দেখায়। একটু বোঝো। অন্বেষা ভালো মেয়ে।"
" আমি আর্গুমেন্টে যেতে চাচ্ছি না। জোর করো না প্লিজ।"
নাজনীন বেগম রুষ্ট গলায় বলেন, " তুমি চাইছো কি? "
" আমার চয়েস অন্য জায়গায়। "
" শেহরিন? "
তিথি সরাসরি শেহরিনের নাম নেওয়ায় সান্নিধ্য এক পলক তাকিয়ে বলে, " হ্যাঁ।"
" মিলেছে আমার কথা আম্মা। এই হচ্ছে আসল কারণ।"
" শোনো সান্নিধ্য, আমি অন্বেষা ব্যতিত কোনো মেয়েকে আমার ছোট পুত্রবধূ হিসেবে মানবো না।"
" বিয়ে আমি করবো আম্মা। আমি মেনে নিলেই এনাফ। বাবা..তুমি? "
শাহজাহান সাহেব ছেলের ভাবগাম্ভীর্য দেখে বড় ছেলের দিকে তাকান। সরফরাজ চোখের পাতা ফেলে তাকে আশ্বস্ততা জানায়। সান্নিধ্যের কথা মেনে নেওয়ার ইঙ্গিত দেয় আড়ালে। শাহজাহান সাহেব নিজেও বুঝে গেছেন এর বিকল্প আর কিছু নেই । চেষ্টা অনেক করেছেন। এই ছেলে যে এক ধাঁচের মানুষ সেখানে আর কোনো যুক্তি দ্বিমত জানিয়েও লাভ নেই।
" আচ্ছা ঠিক আছে। কি আর করা। তোমার যেহেতু মত নেই অন্বেষার ব্যাপারে। হাজার জোর করলেও লাভ হবে না বুঝেছি। যেখানে তোমার মাথা ঠান্ডা থাকে সেখানেই যাওয়া উচিত। "
চোখের পলকে স্বামীর মত পাল্টে যাওয়াতে নাজনীন বেগম হতবাক হন। রাগী গলায় বলেন, " এই জন্য রাজনীতি যারা করে তাদের কথা বিশ্বাস করতে হয় না। রূপ পাল্টাতে সময় নেয় না।"
" রাগ করো না নাজনীন। আমি তো বলেইছিলাম আগে, তোমার ছোট ছেলের না মানে না। হ্যাঁ করানোর কোনো উপায় নেই। তুমি এরপরেও জোর করে..."
তিথি খানিকটা এগিয়ে এসে সান্নিধ্যের দিকে তাকিয়ে বলে, " এখন তাহলে অন্বেষার কি হবে? আংকেল আন্টির মুখ রইল কি আমাদের কাছে?"
" তোমরা যদি চাও আমি একটা ব্যবস্থা করতে পারি।"
" কি ব্যবস্থা?"
সান্নিধ্য বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। পরনের টি শার্টটা টান করে যাওয়া পথে পা বাড়িয়ে বলে, " ডিরেক্ট ইনকাউন্টার করে এই চ্যাপ্টার ক্লোজ করে দিতে পারি। একেবারে ঝামেলা শেষ... "
সরফরাজের পূর্বের চেয়ে এবার উচ্চশব্দে কাশি উঠে। নিজেকে ধাতস্থ করে সে ঠোঁট চেপে উপরের দিকে তাকিয়ে হাসি দমায়।
কয়েকজোড়া চক্ষুরেখাকে অবাক করে দিয়ে নেতাসাহেব চলে যায় কক্ষে। নাজনীন বেগম স্বামীর দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকান। অতঃপর তিক্ত মেজাজে হনহনিয়ে চলে যান নিজ ঘরে।
" বাবা.."
"বল বাবা।"
"শেরিন কে?"
সরফরাজ তিথির দিকে আঁড়চোখে তাকিয়ে বলে, " শেরিন তোমার নতুন চাচি হতে যাচ্ছে। চাচ্চুর বউ।"
" তাইলে ইয়ো পানিকে আমি বিয়ে করবো। শেরিনকে তো ইয়ো সানি বিয়ে করছেই।"
" না রে বাপ যাহা ইয়ো সানি তাহাই ইয়ো পানি। "
" মানে?"
" মানে কিছুই না। বেশি কথা বলো তুমি। রুমে এসো।"
তিথি রাগান্বিত দৃষ্টিতে এগিয়ে এসে তাসিনকে নিয়ে যায়। তাসিন অসহায় দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকাতেই সরফরাজ দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে, " এখনই ভালো আছিস বাপ্। বিয়ে করে বাপের মতো জীবনটা নষ্ট করিস না।"
তিথির পা থেমে যায় সিঁড়ির কাছে যেতেই। কুঞ্চিত কপালে তাকিয়ে বলে,
" ওহ আচ্ছা তাই নাকি। ঠিক আছে রুমে এসো।"
রাতের পালা শেষে এসেছে সকাল। বেলা বাড়ার সাথে সাথে উদিত সূর্য এখন দক্ষিণ গোলার্ধে এসে হাজির হয়েছে। ঘড়ির কাটা তখন বারোটার ঘরে । ক্লাস শেষে শান্তিচুক্তির উদ্দেশ্য বের হয়েছিল শেহরিন। কিন্তু ক্যাম্পাসের গেট পার হতে না হতেই তার সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে অচেনা অজানা এক মানবী্। যাকে সে এর আগে কখনো দেখেনি, চেনেও না । তবে, অবাক করার বিষয় অচেনা এই মানবী তাকে চেনে। জরুরি প্রয়োজনেই এসেছে তার কাছে।
"জ্বি আমিই শেহরিন।"
অন্বেষা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে শেহরিনকে পরোখ করে নেয় । মুখজুড়ে তার একরাশ অসন্তোষটা বিরাজমান থাকলেও কাট কাট গলায় জিজ্ঞেস করে,
" সময় আছে তোমার? "
শেহরিন এক পলক ঘড়ির দিকে তাকিয়ে জবাব দেয়, "জ্বি আছে।"
" সান্নিধ্যকে তুমি ভালোবাসো?"
অচেনা মানবীর মুখে নেতাসাহেবের নাম সেই সাথে সরাসরি ভালোবাসার কথা জিজ্ঞেস করতেই শেহরিনের ভ্রু জোড়া বেঁকে যায়। বিস্ময় চোখে তাকিয়ে বলে,
" আপনি কে? "
" আমি কে সেটা অবশ্যই জানবে । তবে তার আগে তোমাকে যেটা জিজ্ঞেস করেছি সেটার উত্তর দাও।"
" এটা কেমন প্রশ্ন? "
" কেন বুঝতে পারোনি? আবার বলবো? "
" বুঝতে পেরেছি। কিন্তু আপনার প্রশ্ন করার ধরনটা আমার পছন্দ হয়নি। আমার যতদূর মনে হচ্ছে আপনি আমার বিষয়ে হয়তো খোঁজ খবর নিয়েই এসেছেন। আপনি আমাকে চিনতেই পারেন কিন্তু আমি তো আপনাকে চিনি না। তাই আমি আমার ব্যক্তিগত কোনো বিষয় নিয়ে একজন অচেনা মানুষের সাথে কথা বলবো না ।"
অন্বেষা বাঁকা হাসে। নিষ্পলক চাহনিতে তাকিয়ে বলে, " বাহ্ তুমি তো দেখছি বেশ পাকাপোক্ত মেয়ে। কথার ধরন শক্ত।"
শেহরিনের বেশ বিরক্ত অনুভব হয়। এমপি সাহেবকে সে সময় দিয়েছিলো সাড়ে এগারোটার দিকে। এখন বারোটা তেরো বাজে। ব্যস্ত লোকটাকে বসিয়ে রেখে সে এখানে পড়েছে এক গ্যাঁড়াকলে। লোকটা এখন আবার তাকে নিতে না আসলো হলো।
মনের ভাবনা সত্যি হতে নেয় না এক মিনিটও। অন্বেষার চলমান কথার মাঝেই সাদা একখানা গাড়ি এসে থামে তাদের হতে কিছুটা দূরে। কালো শার্ট পরিহিত সুপুরুষটি বেরিয়ে আসে গাড়ি হতে। শেহরিনের চোখজোড়া সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে পড়ে নেতাসাহেবের উপরে।
সান্নিধ্য শেহরিনকে কারো সাথে কথা বলা দেখে আর এগোয় না সামনে। গাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ায় একপাশে। পকেট হতে ফোনটা বের করে কাউকে কল দেওয়া মুহুর্তে হাত থামিয়ে ফেলে সে। সজাগ মস্তিষ্ক হুট করে তাকে এক বিশেষ বার্তা দেয়। সঙ্গে সঙ্গে সানগ্লাস খুলে চোখ তুলে ফের তাকায় সামনে। ধারালো দৃষ্টিতে শেহরিনের সঙ্গে কথা বলা রমণীর মুখের একপাশটা দেখেই চিনে ফেলে মেয়েটা কে । খানিকটা কপাল ভাঁজ হয়ে আসে তার। অন্বেষার এখানে উপস্থিতি সঙ্গে শেহরিনের সঙ্গে কথা বলা তার মনে প্রশ্ন জাগায়।
" সান্নিধ্যের আমি উডি বি ওয়াইফ।"
অন্বেষার হতে উচ্চারিত শব্দে শেহরিনের বুকটা ধ্বক করে কেঁপে ওঠে। এক নজর নেতাসাহেবের দিকে তাকিয়ে শুকনো গলায় জিজ্ঞেস করে, " উড বি ওয়াইফ? "
"ইয়েস উড বি ওয়াইফ। কিছুদিন পরেই আমাদের বিয়ে হতে যাচ্ছে। এই যে হাতের রিংটা দেখছো এটা আমার হবু শ্বশুর শ্বাশুড়ি পরিয়ে দিয়েছেন। "
অন্বেষা আঙুল উঁচু করে রিংটা দেখাতেই দূর হতে সান্নিধ্যের কপালের ভাঁজগুলি মিলে যায়। বুঝতে সক্ষম হয় এই মেয়ে শেহরিনকে কি বলে চলেছে। ফোনটা পকেটে পুরে সে ভাবে তার এখন সেখানে যাওয়া প্রয়োজন। শেহরিনের মন মস্তিষ্কে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করে দেওয়ার আগেই তাকে থামিয়ে দিতে হবে। দু'পা এগোতেই হঠাৎ কিছু একটা বিবেচনায় সান্নিধ্য থেমে যায়। এগোয় না আর সামনে। পিছিয়ে এসে দু-হাত বুকের সাথে ভাঁজ করে সে ফের গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়ায়।
" আমাদের বিয়ের কথাবার্তা অনেক আগে থেকেই চলমান। সান্নিধ্যের সঙ্গে আমার সম্পর্ক অনেক আগের। আমরা একে অপরকে ভীষণ ভালোবাসি। "
অন্বেষার মুখে ভালোবাসি কথাটা শুনে শেহরিনের ভিতরে খারাপ লাগা শুরু হয়। চোখ মুখ তার এক লহমায় শুকিয়ে উঠে। অদূরে দাঁড়ানো ব্যক্তিটার নির্বিকারচিত্তে দাঁড়ানো হতে চোখ সরিয়ে বিতৃষ্ণ গলায় বলে,
" আমাকে এগুলো বলে কি লাভ আপনার?"
" লাভ ক্ষতি কিছুই না। সুন্দর ছেলেদের পিছনে মেয়েরা একটু ঘুরঘুর করবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু সিরিয়াস হিসেবে নেওয়া যাবে না। তুমি যে সান্নিধ্যের পিছু নিয়েছো সেটা ছেড়ে দাও। ওর থেকে দূরে থাকো।"
" আর যদি বলি এমপি সাহেব আমার পিছু নিয়েছে তাহলে?"
" তাহলে সেটাও সিরিয়াসভাবে নিও না। এসব ও মজা করে করছে। বুঝোই তো নেতাদের স্বভাব একটু.. শোনো এসব কথা বলতে চাচ্ছি না। ও যাই বলুক না কেনো সেগুলো তুমি পাত্তা দিবা না। ও জাস্ট তোমার সাথে প্রাংক করছে। দুদিন পরে বিয়ে হয়ে গেলে আর তোমাকে চিনবে না।"
" সিরিয়াসলি? "
" অবিশ্বাস করলে তোমারই লস। ওর ফ্যামিলির সাথে আমার ফ্যামিলি ফুল কানেক্টেড। দরকার হলে তুমি শিউর হওয়ার জন্য ওর ভাবির সাথে কথা বলতে পারো। রাজনীতি যারা করে তাদের মেয়েদের প্রতি একটু ছুঁক ছুঁক স্বভাব থেকেই থাকে। "
" আপনি তার স্বভাবের এ অবস্থা জেনেও বিয়ে করবেন? "
" কি করি বলো? সান্নিধ্য তো আমাকে ভীষণ ভালোবাসে্ আমিও ওকে ভালোবাসি। আর ওর ফ্যামিলির প্রত্যেককে আমার বাবা মা'কে রিকোয়েস্ট করছে বিয়ের ডেট ফাইনাল করার জন্য। তাই তোমাকে বলছি আমাদের মাঝখানে এসো না। আমাদের সুন্দর সম্পর্কটা জটিল করো না। বুঝতে পেরেছো কি? "
শেহরিন নিজের ভিতরে অস্থিরতা কাটিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ে। নমুজ কন্ঠে বলে, " বুঝতে পেরেছি। "
" গুড। আশা করছি নেক্সট টাইমে সান্নিধ্যের সঙ্গে তোমার দেখা হলে এভয়েড করে চলবে। তার যেকোনো প্রস্তাবে না করে দিবে।"
" উনি এসেছেন। এখনই না করে দিচ্ছি।"
শেহরিনের প্রতিত্তুরে অন্বেষার সরু চোখ বড় হয়ে যায়। সান্নিধ্যে এসেছে শুনে
সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে তাকায় পিছনে। কিছুটা দূরে কালো শার্ট কালো মাস্ক সঙ্গে সানগ্লাস পরিহিত নেতাসাহেবকে দেখে কিছুটা অবাক হয় সে । কিন্তু অবাকের স্থায়ীত্বকাল থাকে খুবই অল্প সময়ের। এরপরেই তার মুখে ফোটে তার ক্রুর হাসি। শেহরিন সেদিক পানে যেতেই সে ঠোঁট নেড়ে বিরবির করে বলে, " যাক একদম অন টামে বোম্ব সেট করে দিয়েছি। এখন শুধু বিস্ফোরণের অপেক্ষা।"
শেহরিন ধীর পায়ে হেঁটে সান্নিধ্যের সামনে উপস্থিত হয়। সান্নিধ্যের মুখোরেখার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সে কিয়ৎক্ষণ। অতঃপর নির্মেদ স্বরে বলে উঠে, " যাওয়া যাক তাহলে।"
সান্নিধ্যের ঠোঁটে এক অপরাজেয় দূর্গম হাসি খেলে যায় । মনের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত এক আত্মতৃপ্তির রেশ ছেয়ে যায় তার কঠিনতরভাবে। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সে গাড়ির দরজা শেহরিনের জন্য খুলে দেয়। পুরুষালি ভারী স্বর উন্মুক্ত করে বলে,
" এখনও কোন বিশ্বাসে শান্তি চুক্তির জন্য রাজি হয়ে আমার সাথে যাচ্ছো?"
" যে বিশ্বাস আপনি আমার প্রতি রেখে নিজেকে সত্য প্রমাণ করতে আসেননি। "