সদ্য ক্লাস শেষ করে সকল ঝামেলার দায়মুক্ত হয়ে অবশেষে ক্যান্টিনে এসে বসেছে শেহরিন। ভীষণ ক্ষুধা পেয়েছে ।সকালে নাস্তা না করার দরুন টানা ক্লাসের কারণে মস্তিষ্ক পেট দুটোই খালি এখন তার । কিছু না খেয়ে বাসায় যাওয়াও কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
" যাক বাবা আজকের ক্লাসগুলো বেশ স্মুথ ছিলো। আমি তো ভেবেছিলাম রাইসুল স্যার কোনো একটা কিছুতে নিশ্চিত ভুল ধরে তোমাকে আবার কথা শোনাবে। "
" স্যারের পুরোটা ক্লাস টাইমে আমার বুকের ভিতরে হাতুড়ি পেটা চলেছে। ভাগ্য ভালো অতিরিক্ত নার্ভাসে আমি সেন্সলেস হয়ে যাইনি। "
" থ্যাংকস্ গড। তোমার তো আবার ফোবিয়া আছে। "
" এটা নিয়েই তো ভয়।"
ঋতমা একহাতে ছোট প্লেটে তিনটা সমুচা আরেকহাতের প্লেটে পরোটা নিয়ে টেবিলে বসে। সঙ্গে অল্প করে শসা আর পেঁয়াজ কুচি ও এনেছে।
" তুমি আবার কষ্ট করে আনতে গেলে। দিয়ে যেতো তো। "
" আমি বেছে বেছে এনেছি। এগুলো গরম আছে। উপরেরগুলো একদম ঠান্ডা। চা আর ডালভাজি আনছে। "
শেহরিন আজকে ঋতমাকে জোরপূর্বক ধরে বেঁধে নিয়ে এসেছে ভার্সিটিতে। এই মেয়ের আজকেও ক্লাসে আসার কোনো ইচ্ছে ছিলো না। কিন্তু শেহরিনের জোরাজুরিতে আর না করতে পারেনি। তবে রাইসুল স্যারের ক্লাসটা সে এভয়েড করে শুধু মাত্র লাস্টের ক্লাসটা করেছে। থাকবেই না যেহেতু শুধু শুধু ক্লাস করে অপমান কিনে নেওয়ার কি দরকার।
" ইয়ার ফাইনালের আগেই চলে যাবে? "
" আগে না হলেও ইয়ার ফাইনালের মাঝেই হয়তো। "
" না গেলে হতোই না? "
শেহরিনের নিত্যদিনের এই এক কথা শুনতে শুনতে ঋতমার অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। এই মেয়ে জিজ্ঞেস করতে ক্লান্ত বোধ না করলেও তার কাছে শুনতে ক্লান্ত লাগে। একইসাথে মনের মধ্যে ভীষণ খারাপ লাগাও কাজ করে। কিভাবে বললে বুঝবে থেকে যাওয়ার উপায় যে আর কোনোভাবেই নেই। যদি উপায় থাকতো সে নিশ্চিত থেকে যেতো।
" তুমি এতো অল্পতে মানুষকে আপন করে নাও কেন শেহরিন? তোমার সাথে আমার পরিচয় একবছরও হয়নি। অথচ আমি চলে যাচ্ছি সেটা যেনো তুমি মানতেই পারছো না ।"
শেহরিন চামুচা খেতে খেতে খানিকটা শসা হাতে নিয়ে বলে,"আমি প্রিয়জন হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে পারি না সহজে। আমার হারাতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় আমার পছন্দের মানুষগুলো সবসময় আমার সাথে থাকুক। আমার কাছে থাকুক।"
" তাহলে বলছো আমি তোমার পছন্দের মানুষের একজন? "
" তোমার এখনও সন্দেহ আছে? "
ঋতমা মৃদু হেসে মাথা নাড়ায়। খাওয়ার বাহানায় চোখ দুটো নিচের দিকে রাখে সে। এই যে সামনে বসা আদুরে মেয়েটা তার নিজের কাছে ও যে কত প্রিয় এটা সে বুঝাতে পারে না। হয়তো পারবেও না। মেয়েটাকে এভাবে একা জনসমুদ্রের মাঝে ফেলে রেখে যেতে তার ভীষণ কষ্ট হয় প্রতি মুহুর্তে। মুখ ফুটে প্রকাশ করতে পারে না শুধু। জানে না বিদায়ের দিনে কেমন করে নিজেকে সামলাবে।
দু'জনের চলমান কথার মাঝে চা এসে পড়ে সঙ্গে ডালভাজি। শেহরিন ঋতমাকে সার্ভ করে দিয়ে নিজে নিতে নিতে চিন্তিত গলায় বলে, " ইয়ার ফাইনাল নিয়ে ভীষণ চিন্তা হচ্ছে আমার। মাঝখানে এতো গ্যাপ হয়ে গিয়েছে মনে হচ্ছে আমি কিছুই পারবো না৷"
" ডোন্ট ও'রি শেহরিন। এতোটা লো ফিল করার কোনো কারণ নেই। হাতে এখনো কিছুদিন সময় আছে। এই কয়টাদিন একটু ভালো করে পড়া শুরু করো।"
" আমার সিলেবাস দেখেই মাথা ঘুরছে। সাথে এতোগুলো ক্লাস মিস। নোটস নেই লেকচার শুনিনি। কিভাবে যে কি করবো। সিজি এবার আমার তরতর করে নিচে নেমে যাবে দেখো।"
ঋতমা চায়ের কাপে চুমুক টেনে দম ছেড়ে নেয়। সতেজ গলায় বলে, " ভালো স্টুডেন্টদের এই এক সমস্যা। সিজি নিয়ে ভীষণ প্যারা খেতে হয়। আরে, মেয়ে এতো ভাবনা চিন্তার কোনো প্রয়োজন নেই। তুমি ভালো কামব্যাক দিতে পারবা।"
" যদিও মনে জোর নেই। তবুও চেষ্টা করে দেখতে হবে। কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী তো আমার অনেক।"
" জেসি, মণিষার কথা বলছো? "
" নির্জনও কম কি! "
" ওহ গড। তোমরা এই চারজন চারবছর সিজি নিয়ে কি যে টানাটানি করবে। হাই ভোল্টেজ ম্যাচ চলবে শিউর।"
শেহরিন চায়ের কাপে শেষ চুমুক টেনে স্বতঃস্ফূর্ত হেসে বলে,"কথা খারাপ বলোনি। প্রথম সেমিস্টারে আমার চেয়ে মণিষা মাত্র কিছু পয়েন্ট কম পেয়েছিলো তাই মনে হচ্ছিলো সে সারা দুনিয়া হতে পিছে পরে গিয়েছে। কেঁদে ফেলেনি যে এই অনেক। তবে ভীষণ মন খারাপ করেছিলো।"
" তোমাদের ভালো স্টুডেন্টদের যা কারবার। বাই দ্যা ওয়ে, ভালো কথা শেহরিন তোমাকে জিজ্ঞেস করবো করবো ভেবে করা হয়ে উঠেনি। "
"প্লিজ ম্যাম বলুন।"
ঋতমা সামনে হতে চায়ের কাপটা সরিয়ে নেয়। টিস্যু দ্বারা হাত মুছতে মুছতে কিছু দ্বিধা মিশ্রিত কন্ঠে বলে, " তোমার নতুন সংসার কেমন যাচ্ছে? সব ঠিকঠাক তো? "
" আলহামদুলিল্লাহ ভালোই আছি। ঠিকঠাকই চলছে সব।"
" এমনি নরমাল কোনো প্রব্লেম ফিল করছো কি? "
" প্রব্লেম বলতে রান্নাটা নিয়ে আর কি। তুমি তো জানো আমি রান্নায় কেমন এক্সপার্ট।"
" রান্না করো তুমি? "
ঋতমার অবাক চোখের দিকে তাকিয়ে শেহরিন নরম হাসে। শান্ত কন্ঠে প্রতিত্তুরে বলে, " রান্না করছি না ঠিক। বাট হালকা টুকটাক শিখছি আর কি। ভাবি প্রতিদিন একটা করে রেসিপি শেখাচ্ছন আমাকে।"
" এতো তাড়াতাড়ি ? বিয়ের তো তোমার সাতদিনও হয়নি। আর তাছাড়া এমপি সাহেবের বউ তুমি। রান্না নিয়ে এতো তোড়জোড় কেন? "
" এমপি সাহেবের বউ বলে কিছু না ঋতমা। এটা সব মেয়েদের জন্যই উন্মুক্ত। রান্নাঘরটা আলাদা একটা জগত। যেখানে কোনো ভেদাভেদ থাকে না।"
" বুঝতে পেরেছি বাট আমি বুঝাতে চাইছি এতো তাড়াতাড়িই সবকিছু কেন। যেহেতু তোমার পূর্ববর্তী কোনো এক্সপেরিয়েন্স নেই মাত্র এসেছো নতুন একটা জায়গায়। একটু তো সময়ের দরকার নিজেকে সেটআপ করার জন্য।"
" হয়ে গিয়েছি মোটামুটি সেটআপ। বাট তাড়াতাড়ি বলতে আমি নিজেও একটু কনফিউজড। মেইবি আমার শাশুড়ী মা হেল্পিং হ্যান্ডদের দিয়ে কিচেনের খুব একটা কাজ করায় না। আমি শিউর নয়। তবে যতটুকু অবজার্ভ করে দেখেছি উনি জাস্ট সবজি কাটায় তাদের দিয়ে। রান্নাটা সে না হয় ভাবি করেন।"
ঋতমা হাতের তর্জনী আঙুল টেবিলে খানিকটা ঠেকিয়ে শব্দ করে বলে, " দ্যাটস দ্যা পয়েন্ট মাই গার্ল। এটাই হবে। অনেকেই এমন থাকেন যারা দুনিয়ার সব কাজ হেল্পিং হ্যান্ড দিয়ে করাবে কিন্তু রান্নাটা করাবে না।"
" আমার মনে হয় আমার শাশুড়ী মা পরিবারের জন্য নিজ হাতে রান্নাটাই প্রেফার করেন। এটা অবশ্য ভালো একটা দিক। আজ সকালে আমার নিজেরও কিচেনে যাওয়ার কথা ছিলো বাট এই কাজটার জন্য সব রুটিন এলোমেলো হয়ে গিয়েছে । যার কারণে যেতে পারিনি। খুব সম্ভবত উনি একটু মাইন্ড করেছেন।"
" ভাবি ছিলেন না? "
" ছিলো। বাট আমিও তো উনার ছেলের বউ। দায়িত্ব তো আমারও আছে। এটা নিয়ে একটু গিল্টি ফিল হচ্ছে।"
" গিল্টি ফিল হওয়ার কিছু নেই শেহরিন। তোমার জার্নি কেবল শুরু। আর শুরুর দিকটাতেই সবাই সব সামলে উঠতে পারে না। এলোমেলো হবে, কাজে ভুল হবে, বুঝে উঠতে পারবে না কত কি হবে। সবকিছুর জন্য তোমার একটা প্রোপ্রার টাইমের জন্য ওয়েট করতে হবে। তাদেরকেও করতে হবে। এখানে তোমার যেমন গিল্টি ফিল হওয়াটা বোকামি তাদের ক্ষেত্রেও মন ভারী করাটা বোকামি। "
শেহরিন দুহাত থুতনির নিচে রেখে কিছু সময় চুপচাপ থাকে। ঋতমার কথাগুলোও ফেলে দেওয়ার মতো নয়। সবকিছুর জন্যই হয়তো একটা নির্দিষ্ট সময়ের প্রয়োজন। নিরবতা ভাঙে সে। জড়তা মাখা স্বরে বলে, " আমার একটু ভয় হচ্ছে ঋতমা। সেকেন্ড ইয়ারে পড়াশোনাটা আর একটু বেড়ে যাবে। আবার তখন সংসারেও আমি কিছুটা পুরনো হয়ে যাবো। তখন তো আমাকে নিয়ম করে রান্নার দিকটা বা অন্যান্য কাজগুলো করতেই হবে। একসাথে দুটো মেইনটেইন করে চলতে পারবো কি? আমার তো পড়ার টেবিল ছেড়ে বার বার উঠার অভ্যাস নেই। উঠলে আমার মনোযোগ আনতে অনেক সময় লাগে। নিজের কাছেও অগাছোলো লাগে।"
" ভয় করো না। ভাইয়া আছেন তো। উনি তোমাকে এই ব্যাপারে হেল্প করবে।"
" উনি উনার কাজ নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত থাকে। আমি চাই না এসব সাংসারিক বিষয়ে সে ইন্টারফেয়ার করুক। আমি জাস্ট চাইছি নিজেকে একটু ভালোভাবে তৈরি করে নেওয়ার জন্য। যাতে দুটোই ব্যালান্স রাখতে পারি। আসলে সবকিছুর পিছনে একজন মেইন পার্সনের অনুপস্থিতি আমাকে একটু টাফ সিচুয়েশনে ফেলেছে। "
" আন্টির কথা বলছো? "
" হুম। মামণি যদি বেঁচে থাকতো তাহলে হয়তো আমি অনেক কিছুই শিখতে পারতাম। সব না হোক ব্যাসিক জিনিসগুলো তো শিখতাম। ছোট বেলা থেকেই বাবার আদলে গড়ে উঠা একটা নিষ্প্রাণ মেয়ে আমি৷ সংসার জীবন তো দূরে থাক নিয়ম করে দুবেলা যে রান্না করে খেতে হয় এটাও আমার মাথায় ছিলো না। মোটকথা রেডিমেড সবকিছুতে অভ্যস্ত আমি। প্রাকটিক্যালি স্কিলে জিরো।"
" আমি সেটাই তোমাকে বুঝাতে চাইছি শেহরিন। তোমার শাশুড়ী মা এবং ভাবির একটু বোঝা উচিত তুমি কোন পরিবেশ থেকে এসেছো। দু'দিনেই এতো রান্নার প্রেশার দিলে তুমি প্রোপার ওয়েতে কিছু শিখতে পারবা না বরং ভুল করবে।"
" এটা তো আর বলা যায় না তাই না। উনারা যেহেতু আগ্রহ প্রকাশ করছেন শেখানোর জন্য আমার না শিখে কোনো উপায় নেই। বরং আমি কৃতজ্ঞ যে তারা অন্তত আমাকে রান্না শেখাতে এতোটা আগ্রহ দেখাচ্ছেন।"
" আগ্রহের পিছনে মূল কারণ তোমাকে তাড়াতাড়ি রান্নায় দক্ষ হিসেবে তৈরি করে কিচেনের দায়িত্ব দিয়ে দেওয়া।"
শেহরিন ঋতমার কথায় হেসে ফেলে। মেয়েটার কথা শুনে মনে হচ্ছে তার রান্নার বিষয়ে বেশ কনসার্ন সে। এক্ষুণি রান্না শেখাটা তার কাছে পছন্দ হয়নি।
" লিসেন গার্ল। এসব বাদ দাও, একটা ভালো উপদেশ দেই শুনে নাও৷ ফিউচারে অনেক কাজে দিবে।"
" বলুন শুনি।"
" সৃষ্টিকর্তাকে অসংখ্য ধন্যবাদ যে তিঁনি এখনো আন্টিকে সুস্থ রেখেছেন। ভালো রেখেছেন। তোমার উচিত রান্নার বিষয়টা ক্লিয়ার করা। আন্টির থেকে শিখে নেওয়া। হোক বিদেশ তবুও তোমার যখন বিয়ে হবে ওভার অল, রান্নাটা তোমাকেই করতে হবে। হোক নিজের জন্য কিংবা অন্যের জন্য। আমার ডলিবুবু ও ইউএসএ আছেন। শুধু রান্না নয় ঘরের সব কাজ তাকেই করতে হয়। আমি চাই না তুমি আমার মতো সিচুয়েশনে পড়ো। ইট’স আ ভেরি আন কম্ফোর্টেবল সিচুয়েশন দ্যাট আই'ম ফিলিং, হয়্যার
ইউ ক্যা'ন্ট ই'জিলি চেঞ্জ ইউরসেল্ফ ইফ ইউ ওয়ান্ট টু। সো প্লিজ.."
" ভেরি গুড পয়েন্ট। অন্তত তোমাকে দেখে আমার নিজেকে প্রিপ্রেয়ার করা উচিত।"
" ইয়েস মাই গার্ল।"
শেহরিন হাত ঘড়িতে সময় দেখে নেয় এক পলক। ড্রাইভার আংকেলের আসার সময় হয়ে গিয়েছে। কি জানি এসেও পড়েছে হয়তো এতোক্ষণে।
" ঠিক আছে চলো এখন তাহলে উঠি।"
" ওকে। "
" এই এই ওয়েট আগে বলো কালকেও ক্লাসে আসবে। "
ঋতমা উঠে দাঁড়ায়। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে একগাল হেসে বলে, " এই কয়দিনে একটা মিষ্টি মেয়ের সঙ্গ আর মিস করতে চাইছি না। "
" হুহ। অয়েল দাও ঠিক আছে বাট মিস দিবে না বলে দিলাম।"
" যথা আজ্ঞা ম্যাডামজি।"
শেহরিন ঋতমা একসাথে বের হয় ক্যান্টিন থেকে। দু বান্ধবীর গল্প যেনো শেষই হয় না৷ আবারো নতুন করে শুরু হয়েছে তাদের নতুন আলাপন। তবে কিছুদূর যাওয়া পথে তূর্ণা নিশির সঙ্গে দেখা হওয়াতে পা থেমে যায় দু'জনের।
" ক্যান্টিন থেকে আসছো? "
" হ্যাঁ। কিছু বলবে? "
" ব্যস্ত মনে হচ্ছে? "
নিশির প্রশ্নে শেহরিন কিছু একটা ভেবে মুচকি হেসে বলে, " না ব্যস্ত না। বাট সত্যি বলছি আমার কাছে আহমেদ শফি স্যারের নোটস নেই। "
তূর্ণা শেহরিনের ঠেস দিয়ে মজা নেওয়ার বিষয়টা স্পষ্টতই ধরতে পারে। মুখের আদলে কিছুটা আঁধার ঘনালেও স্বাভাবিক কন্ঠে বলে, " তুমি কি সবসময় ভাবো আমরা তোমার থেকে নোটস নেওয়ার জন্যই কথা বলতে আসি শেহরিন? তোমরা আমাদের ক্লাসমেটস ভাবো বাট আমরা তোমাদেরকে ফ্রেন্ডস হিসেবেই দেখি।"
" ওহ থ্যাংকিউ তূর্ণা তুমি না বললে সত্যি জানতাম না।"
"জানবে কিভাবে? তুমি তো বিদেশ পাড়ি দিচ্ছো। ক্লাসে তো আসোই না ঠিকমতো।"
"তারপরেও ছয়টা মাস তো দেখেছি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বললাম।"
" ওকে এসব কথা ছাড়ো। তার চেয়ে একটু সূক্ষ্ম নজর দাও আমাদের টপারের উপরে। আগের চেয়ে বেশ পরিপূর্ণ লাগছে কিন্তু দেখতে। কাহিনী কি হ্যাঁ?? "
শেহরিন কালকে তূর্ণার প্রশ্নতেই বুঝতে পেরেছিলো সন্দেহ করছে তারা। অল্পতে ছাড়বে না। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে অব্যশই বের করবে। একটা মানুষের পার্সোনাল বিষয় নিয়ে অপর একটা মানুষের এতো কেনো আগ্রহ বুঝতে পারে না সে। নিশ্চিত এটা নিয়ে একটা রিউমার তৈরি করে মজা নিবে সেজন্যই পিছু লেগেছে।
" কাহিনী কিছুই নয়। সবকিছুই সানস্ক্রিনের কারবার।"
" সানস্ক্রিন আমরাও দেই শেহরিন। বাট তোমারটা আলাদা।"
"আলাদাই তো হবে। তোমার ব্যান্ডেরটা তো আমি ইউজ করি না।"
তূর্ণা শেহরিনের দিকে সজাগ দৃষ্টি মেলে সন্দেহী কন্ঠে বলে, "যত যাই বলো না কেন শেহরিন। আমরা কিন্তু বিয়ে বিয়ে একটা আমেজ পাচ্ছি। আমাদের বলতে চাও না ঠিক আছে বাট এভাবে কৌশলে এড়িয়ে যাওয়াটাও কিন্তু আমরা বুঝতে পারি।"
"তোমাদের ব্রেইনের প্রশংসা না করে পারছি না। এর একটু যদি একটু পড়াশোনাতে ব্যয় করতে নিশ্চিত আমাকে টপকে টপ হয়ে যেতে। তখন আর আমার কাছে নোটস চাইতে আসতে না।"
" অপমান করছো? "
" মোটেও নয়। তোমাদের শার্প মস্তিষ্কের প্রশংসা করছি।"
তূর্ণা নিশি দুজনেই বেশ অবাক হয় শেহরিনের মুখ হতে এতো ধারালো ধারালো কথা বের হওয়াতে। এই মেয়ে ধীরে ধীরে কেমন যেনো পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। ক্লাসে অন্যসবার সঙ্গে মুখে মধু তুলে কথা বললেও তাদের সাথে কথা বলতে আসলে নিমপাতা ছোঁড়ে। তাকে নিয়ে যে আড়ালে গসিপ করে, হাসি তামাশা করে বুঝে গিয়েছে নাকি।
" চুপে চুপে বিয়ে করেছো সেটা বললেই হয়৷ এতো লুকোচুরি খেলার কি দরকার আছে? মনে করছো আমরা কখনো বুঝি জানতেই পারবো না।"
"তোমরা যেভাবে শার্লক হোমসের উত্তরসূরী হয়ে দায়িত্ব পালন করছো। আমি নিশ্চিত আগামী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে সঠিক তথ্য খুঁজে বের করতে সক্ষম হবে।"
" বিয়ে যে করেছো সেটা স্বীকার করছো না কেন? "
" তোমাদের ভরসায় আছি। আমার বিশ্বাস তোমরা সফল হবেই।"
" ভাইয়া বুঝি পর্দা করে। সেজন্য এভাবে চুপেচাপে বিয়ে সেড়ে নিয়ছো যাতে আমরা তাকে দেখতে না পাই তাই না?"
তূর্ণা নিশির বাঁকা হাসিতে শেহরিনের গা জ্বলে উঠলেও নিজেকে ধাতস্থ রাখে্। ঠান্ডাগলায় বলে,
"হু পর্দা করে। কিছু বেগানা নারী শুধু নজর দেয় তো এজন্য লুকিয়ে রেখেছি। আজকাল কিছু ক্লাসলেস মেয়েদের যা দৃষ্টি কি বলি বলো। ভয় লাগে। আফটার অল নজর সত্য। আসি কেমন.."
শেহরিন ঋতমার হাত টেনে ঠোঁটে হাসি রেখে পাশ কাটিয়ে চলে আসে। কিছুদূর সামনে এগোতেই দু'জন মুখে টিপে খিলখিল করে হেসে উঠে চুপিসারে্। বাকি দুজন অপমানে নিমজ্জিত হয়ে ফুঁসতে থাকে। শেহরিন যে আকারে ইঙ্গিতে তাদেরকেই বুঝিয়েছে এটা বেশ বুঝতে পারে।
______________________________________
সুখনিবাসে এখন বইছে গৌধূলি বিকেলের নিরব হাওয়া। একটু আগে অব্দি হৈচৈ মুখোরিত বাসাটা এক লহমায় ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। কারণ, হৈচৈ মালিক বেবি মানকিটাকে নানান বাহানায় বুঝিয়ে সুঝিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে মিসের কাছে। এতোদিন যাবত বাসায় মিস আসলেও তার নিত্যনতুন অত্যাচার আর দুষ্টুমি সইতে না পেরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এখন থেকে সে মিসের বাসায় গিয়ে পড়বে। মিসের বাসায় গেলে অন্তত ভয়ে দুষ্টুমিটা একটু কম করবে। চাইলেইও কোথা হতে তেলাপোকা ধরে আনতে পারবে না, মিসকে রেখে পালাতে পারবে না।
" দেখি হাতটা। "
" আপু কিছু হয়নি। শুধু শুধু ব্যস্ত হচ্ছো তুমি।"
"আমাকে দেখতে দিবে? "
সানজির চোখ পাকানো দেখে শেহরিন চুপচাপ ডান হাতের তালু উন্মুক্ত করে। সামনে বাড়িয়ে দিতেই সানজি নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে দেখে বেশ খানিকটা লাল হয়ে এসেছে। ঠিক তার উপরে সেই বীভৎস দূর্ঘটনায় চামড়া পুড়ে কালো দাগটা এখনো স্পষ্টত হয়ে আছে। এই দাগ কবে মিশবে কে জানে।
"লাল হয়ে এসেছে। তুমি বলছো কিছু না?"
"একটুখানি লেগেছে। আমার হাতের তালু এমনই। একটু কিছু হলেই লাল হয়ে যায়। "
"আমাকে বুঝ দিতে এসো না মেয়ে। ভাইয়া দেখলে কি হবে বুঝতে পেরেছো?".
" উনি কি আজকে আসবেন? "
"রাতে সম্ভবত। কেন কথা বলোনি তুমি?"
" কালকে ফোন দিয়েছিলেন আজকে দেননি।"
"তুমি দাওনি কেন? "
শেহরিন আড়ষ্টতায় মুড়ে যায়। কি জবাব দিবে ভেবে পায় না। সে ফোন দিতে চেয়েছিলো কিন্তু কেমন যেন একটু লজ্জা লজ্জাও পাচ্ছিলো। লোকটাকে ফোন দিলে নিশ্চিত তাকে লজ্জা দিয়ে বলতো আমি তাকে মিস করছি কি না। সাথে আরো নানান কথায় তাকে একদম লজ্জায় ডুবিয়ে দিতো।
" শোনো এখন ঘরে যাবে, ভাইয়ার কেবিনেটে সব মেডিসিনই থাকে। আই থিংক তুমি সেটা জানো। তারপরেও বললাম। সুন্দরভাবে লাগিয়ে নিয়ে রেস্ট করবে। একটুও হেলাফেলা করবে না। আমিই মেডিসিন লাগিয়ে দিতাম বাট আমার হাতে একটু সময় কম।"
" আপু প্লিজ প্লিজ তুমি এতোটা ব্যস্ত হবে না। আমি মেডিসিন লাগিয়ে নিচ্ছি। তুমি এখন বের হও্। ফার্স্ট টাইম মিট বলে কথা। হুহু এসে কিন্তু সব শুনবো।"
"যদিও নার্ভাস লাগছে একটু তারপরেও দেখা তো করতেই হবে।"
" ওহহো রিলাক্স মুডে থাকো আপু সব ভালো হবে।"
"ওকে ভাবিজান থাকো আসছি তাহলে । টেক কেয়ার।"
"বাই বাই। "
সানজিকে বিদায় দিয়ে শেহরিন দ্রুত চলে আসে নিজ কক্ষে। সবার সামনে হাতের জ্বলুনিটা ব্যক্ত না করলেও ভিতরে ভিতরে তা জ্বলে একদম নাজেহাল হয়ে উঠেছে সে। আজকে কিচেনের ছোটখাটো দূর্ঘটনা এটা। ইলিশ মাছগুলো ভেজে গরম প্যানটা নামাতে গিয়ে ঘটেছে বিপত্তি। যদিও সে শাশুড়ী মা'কে বলেছিলো নামাতে ভয় করছে। মিসেস নাজনীন কথাটা খুব একটা আমলে না নিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বলেছিলেন, নামানো খুব একটা কঠিন কিছু নয়৷ সবকিছুতে ভয় করলে হবে কি করে?
ব্যস তারপরে আর কোনো কথার সুযোগ থাকে না৷ নিজ চেষ্টায় তেলে পোড়া প্যানটা নামাতে গিয়ে লেগেছে ভালোমতো আঁচ। সবার সামনে নিরবে হজম করে আসলেও সানজির কাছে ঠিকই পড়েছে ধরা।
শেহরিন একটা বোলে পানি নিয়ে বেলকনিতে গিয়ে বসে। ওষুধ লাগানোর চেয়ে ঠান্ডা পানিতে হাত ভিজিয়ে রেখে বেশ আরাম পাচ্ছে সে। কিন্তু হাত একটুখানি পানি হতে তুললেই মনে হচ্ছে নতুন করে আঁচ লেগেছে আবার।
বেলকনিতে বসে নানা ধরনের সবুজ গাছপালা আর অদূরে ছোট ছোট পাহাড়ের মতো কিছু একটা চোখে ভাসে তার। চট্টগ্রাম শহরটা এই কারণেই শেহরিনের এতো পছন্দ। সবুজ প্রিয় একটা শহর। যেদিকে চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। দক্ষিণের এই বেলকনি হতে প্রাকৃতিক ভিউটা বেশ উপভোগ করা যায়। মৃদুলা বাতাস সেই সাথে মিষ্টি পাখির ডাক, গৌধূলীর ম্লান আলো সব মিলিয়ে মন ভালো করে দেওয়ার জন্য একদম উপযুক্ত।
প্রায় একঘন্টার মতো বসে থেকে চোখ জুড়ানো শেষে উঠে পড়ে সে। হাতটা ঠান্ডা পানি হতে তুলে খানিকক্ষণ চোখ মুখ কুঁচকে ব্যথা নিবারণ করে নেয়। অতঃপর নরম কাপড় দিয়ে মুছে ঘরে এসে এদিক ওদিক ঘুরঘুর করে। সন্ধ্যা হতে এখনো বেশ খানিকটা দেরি। সাতটার সময় আজান দিবে্। অথচ এখন বাজে মাত্র ছয়টা পাঁচ।
কি করবে কি করবে নববধূ ভেবে পায় না। সানজি আপু তাসিন যে যার কাজে ব্যস্ত। দু'জনের একজন থাকলে তাও সময়টা কাটাতে পারতো। অল্পকিছু ক্ষণের ভাবনায় শেহরিন একটা উপায় পায়। সে এখন শাশুড়ী মায়ের ঘরে যাবে বলে মনস্থির করে্। হোক মানুষটা রাগী। একটু ভাব করলে নিশ্চয়ই তাকে আদর করবে। অনেক গল্প করবে তার সাথে বসে বসে।
মুখোরেখায় প্রফুল্লতা টেনে এনে আদুরে মেয়ে ছোটে আদর খেতে। সিঁড়ি হতে নেমে সোজা পশ্চিম পাশের বড় ঘরটার দিকে চলে যায়। কিন্তু কক্ষের ভিতরে পা দেওয়ার আগেই কানে ভেসে আসে তার শাশুড়ী মায়ের কথা্। একটু খেয়াল শক্তি বাড়াতেই বুঝতে পারে উনি ফোনে কথা বলছেন কারো সাথে। দরজার পর্দা সরিয়ে একটু উঁকি দিতেই দেখে, সত্যি তাই। মাত্র আলাপনের শুরু। তবে, শাশুড়ী মা যে হাসিমুখে কথা বলে এটা দেখে শেহরিনের বেশ ভালো লাগে্। যদিও এই কয়দিনে সে দেখেনি তার মুখের হাসি। ভেবেছিলো হয়তো হাসেন না। কিন্তু এই যে এখন ফোনে হেসে হেসে কথা বলছেন কত সুন্দর লাগছে দেখতে।
দরজা ছেড়ে চলে আসে সে। উথালপাথাল ছন্দ তুলে পুরে সুখনিবাস ঘুরঘুর করে অবশেষে একটা কাজের কথা মনে পড়ে তার। দৌড়ে চলে আসে নিজকক্ষে। আলমারির ভিতরে সদ্য বিয়েতে পাওয়া শাড়ি গুলো গুছিয়ে রাখা হয়নি। একটা প্যাকেটও আনবক্সিং করা হয়নি। এখন বসে বসে সে সবগুলো শাড়ি দেখবে আর সুন্দর করে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখবে।
চার পাল্লা বিশিষ্ট সেগুনকাঠের আলমারি হতে দুটো পাল্লা খুলে শেহরিন। একপাশে নিজস্ব জামাকাপড় অন্যপাশে নেতাসাহেবের সব শার্টের কালেকশান রাখা। নিজের জামাকাপড় ছেড়ে নেতাসাহেবের শার্টগুলো নেড়েচেড়ে দেখতে থাকে সে। সবগুলো শার্টের কালারই তার বেশ পছন্দ হয়, একদম আইরন করে টানটান ভাবে রাখা হয়েছে। কৌতূহলী মনে সে দুটো শার্ট নামিয়ে নেয়।
ডান হাতে হালকা আকাশি রঙা একটা শার্ট অপরহাতে চারকোল রঙের। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নানান ভঙ্গিমায় সে নিজের গায়ের সঙ্গে দুটো শার্ট মিলিয়ে নিয়ে দেখতে থাকে। কিছু সময়ের দেখাদেখি শেষে সে ঠিক করে আকাশি রঙা শার্টটা এই মুহুর্তে সে পরিধান করে দেখবে। যদিও মনে মনে হালকা একটু লজ্জায় গাঢ় হচ্ছিল তবে বাসা পুরো ফাঁকা কেউ দেখবে না ভেবে সে সিদ্ধান্ত নিতে সাহস পায়। চারকোল রঙের শার্টটা রেখে দিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায় পরিবর্তন করে।
হাতা ফোল্ড করতে করতে দফারফা নববধূর। গায়ের সঙ্গে মনে হচ্ছে আলখেল্লা ঝুলিয়েছে সে। ওভারসাইজ শার্ট। আর একটু হলেই কূর্তি হয়ে যেতো তার। আয়নার সামনে এসে দাঁড়াতেই নিজেকে দেখে হেসে ফেলে শেহরিন। সত্যি একদম আলখেল্লা লাগছে। ছোটবেলায় নানুভাইকে যেমন আলখেল্লা পরতে দেখতো ঠিক সেরকম।
কোমড়ে দু-হাত রেখে সে নানা ধরনের অঙ্গভঙ্গি করে ঘুরে ঘুরে নিজেকে দেখতে থাকে্। নেতাসাহেবের পারফিউমের মৃদু সুবাস এসে লাগে তার নাকে। পুরো শরীর জুড়ে মনে হচ্ছে পুরুষালি মিষ্ট সুঘ্রাণ লেগে আছে।
গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে আয়না হতে চক্ষুজোড়া সরায় শেহরিন। পিছু ঘুরে দরজার দিকে নজর পড়তেই চোখে সাদা শার্ট সঙ্গে কালো প্যান্ট পরিহিত কোনো এক লম্বা মানবের প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠে। সঙ্গে সঙ্গে মুখোভঙ্গি পাল্টে যায় তার । বড় বড় চোখে ভ্রু দ্বয় কপালে উঠে যায় । মুখ হা করে অস্ফুটস্বরে আওয়াজ তুলে এক নিমিষেই কাঠের পাল্লার আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে ফেলে সে। চাপা আর্তনাদিত সুর তুলে বলে, "আল্লাহ !! আপনি এখানে কিভাবে এলেন ? "
দরজায় হেলান দিয়ে দুই হাত বুকের সাথে ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছেন নেতা সাহেব। ঠোঁটে তার প্রশ্বস্ত হাসি বয়ে যাচ্ছে। তার জারুল ফুলের গায়ে আকাশি রঙা আবরণ দেখে ক্লান্ত বিধ্বস্ত শরীরটা এখন বেশ ফুরফুরে লাগছে। ঠান্ডাস্বরে জবাব দেয়, " অবশ্যই হেঁটে এসেছি।"
" বুঝতে পেরেছি হেঁটে এসেছেন। আপনি প্লিজ.. একটু নিচে যান।"
" নিচে কেন? "
শেহরিন পাল্লার আড়ালে চোখ বন্ধ করে মাথা ঠুকে। ইশ দরজাটা কেনো সে লাগালো না। কেনো একটু খেয়ালে আসলো না দরজাটা একদম খোলা ছিলো। এখন একদম সামন-সামনি নেতাসাহেবের শার্ট পড়ে তার সামনেই ধরা। ছিঃ ছিঃ কি লজ্জা! কি লজ্জা !
"একটুখানি যান নিচে দরকার আছে... পায়ে পড়ি আপনার প্লিজ। "
"আসো পায়ে পড়ো। নিচে যাচ্ছি তাহলে।"
" মনে মনে পড়েছি।"
"মনে মনে পড়লে হবে না। সামনাসামনি পড়তে হবে। হাজারহোক স্বামী আমি তোমার। পায়ে পড়তেই পারো।"
"পায়ে পড়া বাদ তাহলে। অনুরোধ করছি হাতজোড় করে।"
"আমি তো তোমার হাতজোড় দেখতে পাচ্ছি না। না দেখালে অনুরোধ রাখবো কি করে। তার চেয়ে সামনে আসো তুমি। "
" না... আমি সামনে যাবো না।"
সান্নিধ্য দরজা ছেড়ে ধীর পায়ে এগুতে এগুতে বলে, "ঠিক আছে আমি আসছি তাহলে। "
" না.. না..না আপনিও আসবে না।"
আলামারির পাল্লার নিচে ফর্সা জড়োসড়ো দুটো পায়ের দিকে তাকায় সান্নিধ্য। ঠোঁটের উপর ঠোঁট চেপে হেসে বলে, " আচ্ছা তোমার কাছে যাচ্ছি না কিন্তু আলমারিতে আমার দরকার আছে। "
"এখন কোনো দরকার নেই আপনার। ইচ্ছে করে বলছেন। প্লিজ যান। "
" মনে হলো আমার শার্ট পরেছো তুমি। "
" না পরিনি। ভুল দেখেছেন আপনি।"
" সত্য প্রমাণ করতে দেখতে হচ্ছে তাহলে তো।"
নেতাসাহেবের ফাঁদে পা পরতেই শেহরিন আবারো কপাল ঠুকায়। অতি চালাক লোকটা । কিভাবে জালে ফাঁসিয়ে দিলো। নাজুক কন্ঠ ভেদ করে বলে, " পরেছি পরেছি।"
কিন্তু ততক্ষণে নেতাসাহেব পৌঁছে গিয়েছে তার পানে। সম্মুখে দাঁড়িয়ে এক হাত প্যান্টের পকেটে রেখে অপরহাত শেহরিনের ধরে থাকা পাল্লায় রেখে শীতল চাহনি নিক্ষেপ করে।
শেহরিন পিটপিট করে তাকায় সামনে দাঁড়ানো লম্বাদেহী মানবটার দিকে। যার দৈহিক ছায়া তাকে একদম ঘিরে ধরেছে। পালানোর আর কোনো পথ নেই।
" ভুল করে পরে ফেলেছি। আর পরবো না।"
" ভুল করে পরে ফেলেছো? "
"হু।"
" আর পরবে না?"
" না।"
"আমি বকা দিয়েছি? "
" না।"
সান্নিধ্য চোয়ালে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে তার নাজুক বধূকে দেখতে থাকে্।শার্টটা যদিও অনেকটা বড় হয়েছে আর একটা মানুষ ঢুকবে তবে খারাপ লাগছে না দেখতে।
" হঠাৎ আমার শার্ট পরেছো কেন? মিস্ করছিলে আমাকে? "
"উহু এমনি পরেছি। "
"মিস করোনি তার মানে? "
শেহরিন চুপ হয়ে যায়। হাতদুটো পিছনে মুঠো করে পাকিয়ে এলোমেলো দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। মিস তো করেইছিলো। কিন্তু বলা তো আর যাবে না। বললে আর রক্ষা থাকবে না।
" মৌনতা সম্মতির লক্ষণ। তার মানে মিস্ করোনি্। এখন তো তাহলে এর জন্য পানিশমেন্ট পেতে হবে। "
"পানিশমেন্ট? "
"হুম। ওয়েট।"
সান্নিধ্য শেহরিনের সামনে আরো কিছুটা এগিয়ে এসে দাঁড়ায়। দু'জনের মধ্যেবর্তী দূরত্বকে করে নেয় মাত্র এক হাত। অতঃপর খানিকটা নিচু হয়ে সরাসরি তাকে কোলে তুলে নিয়ে চলে যায়। শেহরিন কিছু বুঝে উঠার আগেই সান্নিধ্য তাকে সমতে শুয়ে পড়ে নরম বিছানায়।
দু'দিন পর তৃষ্ণা মেটাতে নেতাসাহেব তার প্রেয়সীকে বুকে জড়িয়ে চুমুতে ভরিয়ে তোলে। কানে গলায় গালে তার শুষ্ক ঠোঁটের স্পর্শে রমণী দ্বিকবিদিক হারায়। শক্ত হাতের মুঠোয় সান্নিধ্যের শার্ট মুচড়ে ধরে থাকে সে।
" একটাবারও ফোন করোনি কেন?"
নেতাসাহেবের উথাল পাথাল চুমু সামলে শেহরিন গলার মাঝে মুখ লুকিয়ে ধীর কন্ঠে জবাব দেয়, " আপনি কেন দেননি?"
"আমি তো দিয়েছিলাম। তুমি দাওনি কেন? "
" আপনি দিবেন জন্য দেওয়া হয়নি।"
"মিসও তো করোনি। "
"আপনি করেছেন?"
"তোমার কি মনে হয়? "
"কিছু মনে হয় না।"
সান্নিধ্য এক হাত টান করে হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলে, "প্রমাণ রাতে দেই? এখন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে।"
শেহরিনের শরীর বেয়ে শিহরণ বয়ে যায়। দুহাত খামচে ধরে বলে," ইশশ্ আপনি এমন কেন? আমি কি প্রমাণ চেয়েছি? "
"বিশ্বাস করছো না যে।"
"অনেক বিশ্বাস করেছি। এবার থামুন।"
সান্নিধ্যে শেহরিনের হাতদুটো নিজের হাতের মধ্যে পুরে নেয়। ডান হাতে ক্ষতটার উপরে চুমু খাওয়া তার এই কয়দিনে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে । কিন্তু আজকে ডান হাতের তালু উন্মুক্ত করতেই তার কপাল ভাঁজ হয়ে আসে্। তীক্ষ্ণ চোখ জোড়ায় তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে," হাত লাল কেন তোমার? কি হয়েছে এখানে? "
শেহরিন নেতাসাহেবের চোখের দিকে তাকাতেই মিইয়ে যায়। হাতের তালু মুঠো করে চেপে ধরে বলে, " এমনি লাল হয়েছে। কিছু হয়নি।"
" আঁচ পেয়েছো? "
" না..।"
" আমি মিথ্যা বলা পছন্দ করি না শেহরিন।"
"কেন এতো ব্যস্ত হচ্ছেন আপনি? ঠিক আছি আমি। একটু লেগেছে।"
" ওষুধ লাগিয়েছিলে? "
"পানিতে ভিজিয়ে রেখেছিলাম।"
"বোকা মেয়ে। আগুনের আঁচ লাগলে কেউ পানিতে হাত ভেজায়। তাহলে তো আরো বাড়বে। আসো ওষুধ লাগিয়ে দিচ্ছি।"
সান্নিধ্য শেহরিনকে বসিয়ে কেবিনেট হতে মেডিসিন বক্সটা বের করে আনে। হাঁটু ভেঙে সামনে বসে শার্টের হাতা ফোল্ড করে দেয় তার। হাতের তালুতে ক্রিম লাগিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করে, " ইয়ার ফাইনাল কবে থেকো শুরু।"
"ডেট দেয়নি এখনো। তবে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই দিয়ে দিবে।"
" এক্সামের প্রিপ্রারেশন নেওয়া স্টার্ট করেছো? "
"হু।"
সান্নিধ্য চোখ তুলে তাকাতেই শেহরিন সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেয়,"না। আজ থেকে ভেবেছি স্টার্ট করবো।"
" গুড। পরীক্ষার আগে কোনো ধরনের কুকিং ট্রায়ালে যাবে না তুমি। আমি যেনো কিচেনে না দেখি তোমাকে।"
"কেন? "
" হাত পোড়ানোর ইচ্ছে আছে আরো? "
" আর পুড়বে না। আজকে হুট করেই লেগে গিয়েছিল।"
" অ্যাক্সিডেন্ট হুট করেই ঘটে। আগে থেকে কেউ জানতে পারে না।"
"কিন্তু.. "
"আমি যেটা বলেছি সেটাই ফাইনাল। "
নেতাসাহেবের কথায় শেহরিন পড়ে যায় বিপাকে। একদম সরাসরি নিষেধাজ্ঞা জারি করে দিলো যে। এই কয়দিন বন্ধ তার রান্নাঘরে যাওয়া? ভাবি.. শাশুড়ি মা... নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে সে। তবে এই নিয়ে আর কথা বাড়ায় না। বাড়ালেই নেতাসাহেব যাবেন রেগে। তখন সাময়িক সময়ের জায়গায় আজীবনের জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করে দিবেন। চলমান কথার প্রসঙ্গে পাল্টাতে সে নরম সুরে বলে,
"আপনার না রাতে আসার কথা ছিলো? "
"আমি রাতে আসবো বলেছিলাম কি?"
" না। "
"তাহলে?"
"সানজি আপু..."
শেহরিন সানজির বলা কথা মনে করতেই অনুধাবন করে আপু বলেছিলো সম্ভবত রাতে আসবে। তারমানে শিউর সে নিজেও ছিলো না। আর সেটা ধরে নিয়েই এদিকে এসে স্বামীর শার্ট ট্রায়াল দিতে শুরু করেছিলো এই রমণী। না জানি উনি কখন থেকে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। সে যে রঙঢ়ঙ করছিলো শার্টটা পড়ে সব বুঝি দেখে ফেলেছে।
"ইশ্ কি বোকা আমি ! "