রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি

পর্ব - ৩২

🟢

শ্রাবণের শেষ দিন আজ। বৃষ্টিমাখা সকাল পার হয়ে দুপুরে এসে ঠেকেছে বেলা। কালো মেঘের আওয়াজে আকাশের হয়ে আছে ভারী মন খারাপ। আর সেই মন খারাপের মাঝেই পরীক্ষা দিয়ে বাসায় এসে পৌঁছে শেহরিন। অন্যান্য দিনের ন্যায় আজকে আর তাকে ড্রাইভার আংকেল নিতে যায়নি। উনার বদলে গিয়েছিলেন নেতাসাহেব নিজেই। বাসায় কোনো একটা দরকারে ফেরার পথে ভার্সিটি হয়ে নিয়ে এসেছে তাকে।

শেহরিন বাসার ভিতরে প্রবেশ করা মাত্র বেশ অবাক হয় আশেপাশের চিত্র দেখে। নিজের বিস্মিত ভাবটাকে পুষিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে সে সামনে এগোতে থাকে। নিত্যদিনের সাজানো গোছানো ড্রয়িংরমে আজ এসেছে বিস্তর পরিবর্তন। সাজ সাজ রব সেই সাথে আভিজাত্যের ছোঁয়া লেগে আছে চারিদিকে। মনে হচ্ছে যেনো কোনো অতিথি আগমনের ব্যাপার স্যাপার ঘটতে চলেছে।

" লতা কেউ আসছে বাসায় ? "

" শুধু কেউ না বউমণি অনেকজনই আসতেছে। আপনার পরীক্ষা হইলো?"

" হ্যাঁ হলো। কারা আসছে? "

কাজে মগ্ন লতা জবাব দেওয়ার আগেই পিছন হতে কিছুটা ব্যস্ত সুরে ডাক ভেসে আসে। শেহরিন শাশুড়ী মায়ের হতে নিজের নামে ডাক শুনে পিছু ঘুরে তাকায়। ধীর কন্ঠে বলে, " জ্বি আম্মা।"

" পরীক্ষা কেমন হয়েছে? "

" আলহামদুলিল্লাহ ভালো । "

" পরবর্তী পরীক্ষা কবে ?"

" জ্বি রবিবারে।"

মিসেস নাজনীন হাতে থাকা কাঁচের ঝকঝকে ফুলদানিটা টেবিলের মাঝে সাজিয়ে রাখেন। আশেপাশে জিনিসগুলোতে নজরদারি করতে করতে শেহরিনের দিকে এক পলক তাকিয়ে বলেন,

" বাসায় অতিথি আসছে। তুমি গিয়ে ফ্রেশ নাও তাড়াতাড়ি। সান্নিধ্যে এসেছে কি? "

" হ্যাঁ এসেছেন । বাইরে ফোনে কথা বলছেন উনি ।"

" আচ্ছা। তুমি তাহলে ফ্রেশ হয়ে একটু সানজির রুমে যাবে কেমন। তিথিও হাতের কাজ সেড়ে যাচ্ছে। দু'জন মিলে ওকে একটু গুছিয়ে দিবে।"

শেহরিনের মনে ব্যাপক খটকার সৃষ্টি হয় এক লহমায়। অতিথি আসছে সেই সাথে সানজি আপুকে গুছিয়ে দিতে হবে। তাহলে কি দেখতে আসছে আপুকে? কারা দেখতে আসছে? মুহিদ ভাইয়ারা নাকি অন্যকেউ?

" আম্মা... সানজি আপুকে কি দেখতে আসছে? "

" হ্যাঁ। এইতো আর একটু পরেই মনে হয় এসে যাবেন উনারা। তুমি দেরি করো না। তাড়াতাড়ি যাও।"

শাশুড়ী মায়ের ব্যস্ততা দেখে শেহরিন আর দ্বিতীয় প্রশ্ন করার সুযোগ কিংবা সাহস পায় না। কোনমতে মাথা দুলিয়ে সে উপরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। মন মস্তিষ্কে তার নানা রকম প্রশ্নেরা এসে ভীড় জমিয়েছে। কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছে না। যদি মুহিদ ভাইয়াই হয় তাহলে সানজি আপু সবাইকে জানালো কবে? আর জানালেও সবাই বিনাবাক্যতেই এভাবে রাজি হয়ে গেলো ? একটু হলেও তো কথাবার্তা উঠবে। নাকি সবই হয়ে গিয়েছে শুধু মাত্র তারই অজানা।

" না তা কি করে হতে পারে? আমি তো এ বাসাতেই থাকি। এতো কিছু হয়ে যাবে আমি জানবো না? আর নেতাসাহেব উনিও তো কিছু বলেনি। "

নিজমনে বিরবির করতে করতে কক্ষে যাওয়া পথে সানজির কক্ষের দিকে এক নজর তাকায় শেহরিন। এই মুহুর্তে মনে হচ্ছে সানজি আপুর থেকে সব শুনে খোলাসা হতে। সত্যি মুহিদ ভাইয়া নাকি অন্যকেউ? যদি অন্যকেউ হয় তাহলে কি আপু এখন কান্না করছে ঘরে বসে? মন খারাপ করে আছে?

মনের মধ্যে সাহস এনেও আনতে পারে না নাজুক লতিকা। শাশুড়ী মায়ের তাড়ার কথা ভেবে আগপিছু সবকিছু বাদ দিয়ে ছোটে ফ্রেশ হতে। যেটাই হোক না কেনো পরে শোনা যাবে। আগাম এতো চিন্তা করে লাভ নেই। যত ভাববে তত নেগেটিভিটি বাড়বে। হয়তো মুহিদই ভাইয়াই কোনো একটা ম্যাজিক করেছে। যার কারণে বিয়ের প্রথম ধাপ এতো তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসেছে। অযথাই উল্টো পাল্টা ভেবে চলেছে সে।

" বি পজিটিভ শেহরিন। বি পজিটিভ। এতো ওভারথিংকিং করতে হয় না। নিজের কাজে মন দাও যাও।"

-------------------------------------------------

ড্রয়িংরুমের সমস্ত কাজের তদারকি শেষে মিসেস নাজনীন ডাইনিং এরিয়ায় যাওয়ার জন্য পা বাড়ান। খাবারের দিকটা এখন একবার চোখ বুলিয়ে দেখা বাকি আছে শুধু । কিন্তু যাওয়া পথে ফোনে কথা বলা শেষ করে সান্নিধ্যেকে ভিতরে প্রবেশ করতে দেখে থেমে যান তিনি। পুনরায় ছেলের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলেন,

" সান্নিধ্য। "

ফোন হতে দৃষ্টি তুলে সান্নিধ্য পাশ ফিরে তাকায়। মায়ের আগমন দেখে সে নিজেও পদরেখা থামায়।

" দুপুরে থাকছো কি? "

" না। সাড়ে তিনটার দিকে বের হতে হবে আমাকে।"

" উনারা আসছেন তুমি থাকবে না। বিষয়টা খারাপ দেখায় না? "

" ভাইয়া আসছে। খারাপ দেখাবে না।"

" কোনো কিছুতেই তোমার সময় হয় না। সরফরাজ ঠিকই ম্যানেজ করে আসতে পারে অথচ তুমি পারো না। বিয়ের দিনও এই কথা বলবে নিশ্চয়ই? "

সান্নিধ্য হালকা হাসে মায়ের কথায়। শান্ত গলায় ছোট করে বলে, " আচ্ছা বিয়ের সময় আসুক দেখা যাবে তখন।"

" দেখবো। উনারা এসে যাবেন প্রায়। অথচ দেখো কেউ নেই।"

" বাবা কোথায়? "

" লাইব্রেরি রুমে। উনারা আসলে বের হবেন। যাই হোক, একসাথে লাঞ্চটা করো অন্তত ? "

পাঞ্জাবির হাতা তুলে সিলভার ঘড়িটার ডায়াল পানে তাকায় সান্নিধ্য। তিনটা বাজতে কয়েক মিনিট বাকি আছে আর। হাতে সময় আছে মাত্র আধাঘন্টা। আজকে তার উপরে একটা সেমিনার রয়েছে সেখানেও যেতে হবে।

" লাঞ্চ করার জন্য সময় বের করাটাই কঠিন আম্মা। তাদের আসার উপর ডিপেন্ড করে থাকলে আমার চলবে না।"

মিসেস নাজনীন ছেলের কথায় নিরবে হতাশার নিঃশ্বাস ফেলেন। একে বলে আসলেই কোনো লাভ নেই। সময়ের কাছে তার ছুটি মেলা ভার। কর্মজগত ছাড়াও যে পরিবার বলতে কিছু একটা থাকে এটা বোধ হয় যারা রাজনীতি করে তাদের একটু কমই বোধগম্য হয়। এতোকাল দেখে এসেছে স্বামীর ব্যস্ততা এখন দেখছে ছেলের ব্যস্ততা।

"ঠিক আছে। যেহেতু সময় হচ্ছেই না তাহলে আর বলে লাভ নেই। খাবার কি উপরে পাঠিয়ে দিবো? "

" দাও। "

সান্নিধ্য উপরে চলে যেতেই মিসেস নাজনীন লতাকে ডেকে নেন। ছেলের জন্য আলাদা খাবার সার্ভ করতে ডাইনিং ছেড়ে চলে যান কিচেনে।

" বাইরের দিকটা সব ঠিক আছে? "

" আছে খালাম্মা।"

" লনের ধারে পানি জমে নেই তো? "

" আমিন ভাই সব পরিষ্কার কইরা রাখছে। তয়, গ্যারেজে সান্নিধ্য ভাইয়ের গাড়ি আইছে জন্য একটু ময়লা হইছে। ওইডাও পরিষ্কার কইরা দিবোনি কইছে। "

" একটু পর তো আবার গাড়ি নিয়ে বের হবে। আবার সরফরাজও আসবে। আমিন যেনো ওখানেই থাকে। বৃষ্টির দিনে সবাই গাড়ির সাথে সব কাঁদা ময়লা উঠিয়ে নিয়ে আসে বাসায়।"

" আইচ্ছা।"

" ভালো করে পরিষ্কার করতে বলবি।"

" কমুনে তো।"

লতা একটুখানি সরে দাঁড়ায় মিসেস নাজনীন হতে। নিজেকে আড়াল করে সরু চোখে তাকিয়ে মুখ বাঁকায় চুপিসারে।

" পরিষ্কার করতে করতে মাইজার ( মেঝের) চামড় উইঠা গেলেও কইবো ময়লা লাইগা আছে। একবারে হয় না। চৌদ্দ বার করোন লাগে হু।"

__________________________________________

পরীক্ষা দেওয়ার আগে শেহরিনের সবসময় অভ্যাস গোসল করে যাওয়া। গোসল না করলে সেদিন তার পরীক্ষা ভালো হয় না খুব একটা। পরীক্ষার হলে গিয়ে হয় কিছু একটা ভুলে যাবে নয়তো সঠিক জিনিস ভুল করে আসবে নিশ্চিত। অতঃপর মাথা এলোমেলো করে সেই ভুল করা জিনিসটা নিয়ে ডিপ্রেশনে ভুগবে পরবর্তী পরীক্ষার আগ পর্যন্ত। এসব সমস্যা এড়াতে তাই প্রত্যাহিক পরীক্ষার আগে তার এই অনিবার্য কার্য সম্পাদন করতেই হয় । নিয়মানুযায়ী আজও গোসল করেই গিয়েছিল এক্সাম দিতে। যার কারণে ভার্সিটি থেকে এসে ফ্রেশ হতে লাগে না খুব একটা সময় ।

ইয়েলো হোয়াইট মিশেল সুন্দর একটা সালোয়ার কামিজ পরিধান করে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায় সে। আধভেজা চুলগুলো কোনমতে হেয়ার ড্রয়ার দিয়ে শুকিয়ে পেঁচিয়ে গিয়েছিলো পরীক্ষা দিতে। এখনো ভিতরে খানিকটা ভেজা রয়েছে। চুলগুলো ছেড়ে দিয়ে মুখে ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে নেয় আলতো হাতে । ঠোঁটে লিপগ্লস লাগাতে লাগাতে আয়নার মাঝ হতে আঁড়চোখে তাকায় নেতাসাহেবের দিকে।

মাত্র শাওয়ার নিয়ে বের হয়েছে সান্নিধ্য । একহাতে ফোন অপর হাতে টাওয়েল নিয়ে মাথা মুছে যাওয়ার কাজটা চলমান রেখেছে সে। গভীর দৃষ্টি তার ফোনের দিকে। হয়তো কোনো মেইল এসেছে কিংবা কাজের কিছু।

" বাসায় মনে হচ্ছে অতিথি এসেছে।"

" হুম। "

" কারা এসেছে জানেন? "

" জানি। "

" কারা? "

" অতিথিরা।"

শেহরিন ঠোঁটে লিপগ্লস দেওয়া থামিয়ে ভ্রু বাঁকিয়ে ঘুরে তাকায়। নেতাসাহেবের দিকে তাকিয়ে চিকন কন্ঠে বলে, " অতিথিরা কারা? "

" মানুষই তো মনে হচ্ছে।"

" আমি মজা করছি না কিন্তু। সানজি আপুকে দেখতে এসেছে কারা সেটা জানতে চাইছি। এভাবে হুটহাট কি হচ্ছে বলুন তো? আপনাকে তো বললাম সেদিন আপু মুহিদ ভাইয়াকে ভালোবাসে।"

সান্নিধ্য একনজর ফোন হতে দৃষ্টি তুলে শেহরিনের দিকে তাকায়। শীতল চাহনি বজায় রেখে নরম গলায় বলে, " সানজির সাথে কথা বলেছো? "

" আজকে হয়নি। এখন যাবো আপুর কাছে।"

" একটু পরে যাও।"

" না এখনি যেতে হবে। মাথার মধ্যে আমার জট পাকিয়ে যাচ্ছে সবকিছু। কেউ কিছুই বলছেন না আপনারা আমাকে। আপুকে দেখলে সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।"

" সবকিছু পরিষ্কারই আছে।"

" তার মানে মুহিদ ভাইয়া?

"হু।"

নেতাসাহেবের অকপটে জবাবে শেহরিনের চোখজোড়া বড় বড় হয়ে যায়। তারমানে তার ধারণাই সত্যি। যাক বাবা বাঁচা গেলো তাহলে। সানজি আপু তো তাহলে ভীষণ খুশি মনে হচ্ছে। উচ্ছ্বসিত হওয়া মুহুর্তে হুট করে সে থমকে যায়। সরু চোখ করে তাকিয়ে বলে, " এতোকিছু হয়ে গেলো আমি জানলাম না কেন? এইতো সেদিন আপু আমাকে শুধু ভাইয়ার কথা বললো। আপনি চালাকি করে আমার থেকে কথাটা বের করে নিলেন। বাবা কিংবা আম্মা কেউই তো জানতো না। রাতারাতি এতোকিছু হলো কিভাবে? "

" এসব উত্তর তুমি তোমার সানজি আপুর কাছে পাবা। সে জানে ভালো। "

" ঠিক আছে আমি এক্ষুণি যাচ্ছি। আমাকে বাদ দিয়ে এতো কিছু দেখাচ্ছি মজা।"

সান্নিধ্য শেহরিনকে যাওয়া পথে বাঁধা দেয়। সামনে বেষ্টনীর ন্যায় দাঁড়িয়ে নির্মেদ স্বরে বলে, " বসো একটু। "

" বসা যাবে না। আম্মা বলেছেন তাড়াতাড়ি যেতে।"

" ঠিক আছে যাবা। আমিও বের হবো একটু পরেই। "

" কেনো আপনি থাকবেন না? "

" না। সেমিনার আছে একটা অ্যাটেন্ড করতে হবে।"

" এটা কিছু হলো? সেমিনারে গিয়ে সেই তো কবিতা আবৃত্তি করবেন নেতাসাহেব। ওটা হয়তো রেকর্ড করাই আছে। আসিফ ভাইয়াকে বলুন সেটাই সম্প্রচার করে দিতে তাইতো হয়ে যায়। "

সান্নিধ্য টাওয়েলটা সোফার উপরে রেখে ফোনটা ট্রাউজার ঢুকিয়ে নিয়ে বলে," মানুষ লাইভে আমার কবিতা আবৃত্তি শুনতে পছন্দ করে ম্যাডাম।"

" কি হয় শুনে আমি তো তাই বুঝতে পারি না।"

" বুঝতে হবে না আপনার। আপাতত সোফায় গিয়ে বসুন।"

শেহরিন ছোট করে নিঃশ্বাস ছেড়ে সোফার কাছে আসে। সিক্ত টাওয়েলটা উঠিয়ে বেলকনিতে মেলে দিয়ে এসে বলে," তবুও বিশেষ একটা দিন। সানজি আপু কিন্তু রাগ করবে। "

" তুমি একটু ওকে বলবে বেশি করে রাগ করতে। "

" কেন?"

" তাহলে আমার জরিমানা দিতে হবে না।"

" জরিমানা করবে? "

সান্নিধ্য একহাতে খাবারের প্লেটটা নিয়ে অপর হাতে শেহরিনকে টেনে সোফার কাছে নিয়ে আসে। কোলের উপর বসিয়ে শান্ত কন্ঠে বলে, " থাকছি না এজন্য নিশ্চিত জরিমানা করবে।"

" তাহলে তো আমারও এটা ফলো করা উচিত। রাগ করলে আসলেই লস। কিছুই হয় না তেমন। তার চেয়ে জরিমানা করলে তাও পকেট ভারী হবে।"

" দেউলিয়া হয়ে যাবো তো ।"

" শুনুন নেতাসাহেব, বউ বোন টাকা নিলে কখনো দেউলিয়া হয়ে যায় না। বরং দ্বিগুণ হারে বৃদ্ধি পায়। মনে রাখবেন সবসময়।"

" এজন্যই কি আমার ওয়ালেট মাঝে মাঝে খালি হয়ে যায়? "

" খালি না হলে বৃদ্ধি পাবে কি করে? শূন্যস্থান তৈরি না করলে কখনো কি সেটা পূরণ হয় বলুন?"

সান্নিধ্য প্লেটের দিকে নজর রেখে মাথা নাড়িয়ে সায় জানায় সহধর্মিণীর কথায়। ছোট করে লোকমা বানিয়ে নিয়ে শেহরিনের মুখে তুলে দিতে দিতে বলে,

" লজিক আছে আপনার কথায় ।"

" আমি লজিক ছাড়া কথা বলি না। কিন্তু কথা হচ্ছে এখন আমি খাবো না প্লিজ। বাসায় অতিথি এসেছে সানজি আপু ভাবি সবাইকে রেখে আমি আগেই আগেই খেয়ে নিবো? এটা কখনো হয়?"

" সকালে এক্সাম দিতে যাওয়ার সময় খাওনি তুমি । লাঞ্চ করতে করতে চারটা বেজে যাবে সবার। এতোক্ষণ না খেয়ে থাকতে পারবা না । অল্প একটু হলেও এখন খেতে হবে। পরে আবার সবার সাথে বসে ভালোভাবে খাবে ।"

" আল্লাহ !! এতো খেতে পারবো না আমি সত্যি।"

" পারবে। গিয়ে তো এখন সানজির কাছে গিয়ে ছোটাছুটি, কথার ঝুড়ি খুলে বসবে। সঙ্গে তাসিন তো আছেই। সব একসাথে হলেই আধাঘন্টার মধ্যেই এনার্জি ডাউন হয়ে যাবে। তখন এমনি ক্ষুধা পাবে।"

শেহরিন গোল গোল চোখ করে তাকিয়ে তার নেতাসাহেবকে দেখতে থাকে। মুখে খাবার রেখেই অস্পষ্টস্বর আওড়ে বলে, "আপনি এতো কিছু কিভাবে খেয়াল রাখেন বলুন তো? "

" এতোকিছু কিভাবে? "

" অনেক কিছু। আমার যেটা মাথাতেই আসে না আপনি সেটা একদম পার্ফেক্টলি করে ফেলেন। জিনিয়াস।"

সান্নিধ্য খাওয়ার মাঝে মৃদু হেসে বলে, " প্রতিপক্ষ হতে কমপ্লিমেন্ট পেতে দেখি ভালোই লাগে।"

" আমি সত্য কথাই বলি।"

"গুড। সত্য কথা বলবে সবসময়।"

শেহরিন কয়েক লোকমা মুখে তুলে নেতাসাহেবকে মানিয়ে নিয়ে

উঠে পড়ে। কথা দেয়, সবার সঙ্গে বসে সে আবার খেয়ে নিবে।

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ওড়নাটা ঠিকঠাক করে মাথায় দেয় । তিনটা বিশ পার হচ্ছে। এখনও সে ঘরে। অথচ শাশুড়ী মা তাকে বলেছিলো তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে সানজি আপুর কাছে যেতে।

শেহরিন ঘর হতে বের হওয়া মুহুর্তে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। এক নজর পিছু ঘুরে তাকায় সে। নেতাসাহেবকে খাওয়ার দিকে মনোযোগী দেখে মুখে লাজুক হাসি টেনে পা টিপে টিপে এগিয়ে আসে আবারো তার পিছন পানে।

দু'হাত মুষ্টিবদ্ধ করে পিছনে রেখে সোফার কাছে এসে দাঁড়ায় চুপিসারে। বুকের মধ্যে ঢিপঢিপ আওয়াজ করলেও নিজেকে ধাতস্থ রেখে ঘাড় নিচু করে সে। অতঃপর চোখ বন্ধ করে সান্নিধ্যের গাল বরাবর টুপ করে একটা চুমু দিয়েই দৌড়ে বের হয়ে যায় রুম হতে।

আকস্মিক কান্ডে সান্নিধ্য নিজেও যেনো প্রস্তুত ছিলো না। গালের উপর নরম কিছুর স্পর্শ পেতেই সে খাওয়ার থামিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। মুহুর্তেই ঝড়ো গতিতে ছুটে চলে যায় তার দূরন্ত লাজুক রমণী। প্রথমে কিছুটা অবাক হলেও পরমুহূর্তে মাত্র ঘটা ঘটনাটা উপলব্ধি করে সামান্য ঠোঁট প্রসারিত করে নেতাসাহেব। মুখোরেখায় শীতলতার রেশ বজায় রেখে খাবারটুকু শেষ করে উঠে যায় নিজকার্যে।

রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি বাংলা গল্প pdf সাহিত্য

" বর বাসায় আসলে আপনার আর দেখাই পাওয়া যায় না দেখছি। তবে, ধন্য হলাম অবশেষে আপনার পা পড়লো আমার কক্ষে।"

" আমি তো আপনার সাথে কথাই বলবো না। "

" আমারও তো বলা উচিত নয় তবুও তো বলছি।"

শেহরিন দু'হাত কোমড় চেপে ছোট ছোট চোখ করে তাকায় মেরুন রঙের জামদানি শাড়ি পরিহিত কামিনীর দিকে। একদম নবধূর মতো সেজেগুজে বসে আছে বিছানায় সে। চুলগুলো সুন্দর করে ফুলের খোঁপায় বাঁধানো। দেহে শোভা পাচ্ছে স্বল্প খচিত সোনার অলংকার।

" আমাকে এখন বলার কি দরকার ছিলো শুনি? একবারে বিয়ের শেষেই বলতেন।"

" ওরে মেয়ের রাগ দেখো। সেটা আপনার গুণধর বরকে গিয়ে বলুন যান।"

"ও আচ্ছা এখন সব দোষ আমার বরের তাই না? "

বিজ্ঞাপন

সানজি গালে হাত দিয়ে অবাক চোখে তাকায়। অবিশ্বাস্য কন্ঠ এনে বলে, " বাপরে বরের প্রতি কি দরদ আপনার।"

" অবশ্যই বরের প্রতি আমার এতো দরদ। কেনো আপনার হিংসা হচ্ছে?"

" গা জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে। কেউ একটু পানি আনো প্লিজ। গায়ে ঢালি।"

শেহরিন সরু চোখের দৃষ্টি রেখেই বিছানায় বসারত সানজির দিকে এগিয়ে যায়। তার হাতদুটো নিজের হাতের মধ্যে চেপে ধরে রাগান্বিত ভাব ফুটিয়ে বলে, " এতো কিছু হলো কিভাবে? আমি জানলাম না কেনো? "

" আপনার বরকে কেনো এই প্রশ্ন করেননি? "

" আমার বর বলে আপনার কথা, আপনি বলেন আমার বরের কথা। আর ইউ হ্যাভিং ফান? "

সানজি নির্নিমেষ চাহনিতে তাকিয়ে মাথা নাড়ায়। আদুরে কন্ঠে বলে, " আমি কি তাই মজা নিতে পারি বলুন ভাবিজান? "

" কাহিনী ক্লিয়ার করুন।"

" শান্ত হয়ে বসুন একটু। তারপরে বলি। "

" কুইক।"

সানজি শেহরিনকে পাশে বসিয়ে নরম হাতদুটোর মাঝে হাত রাখে। কিয়ৎক্ষণ সময় নিয়ে ঠোঁটের কোণে উজ্জ্বল হাসি বজায় রেখে বলে,

" বড় ভাইয়া বাবা আর আম্মাকে পরশুদিন রাতে জানিয়েছে প্রথমে। আম্মা তো শুনেই ভীষণ রাগ। বেশ বকা খেয়েছি আমি। সে তো রাজিই না, বাবারও একই মত। দু'জনের হতেই নেগেটিভ সাইন পেয়ে আমার তো ভয়ে আত্মা শুকিয়ে গাছের ডালে উঠে গিয়েছিলো একদম । আর একটু হলে শিউর বিরহিণী হয়ে কান্নাই শুরু করে দিতাম।

অতঃপর আমার কোলডেস্ট বিগ ব্রাদার পুরোটা পরিবেশ পরিবর্তন করে দিয়েছে এক মুহূর্তেই। সমস্ত পরিস্থিতি এতো সুন্দরভাবে হ্যান্ডল করেছে যে আমি শুধু দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ভাইয়াকে দেখে জাস্ট অবাক হয়ে ভাবছিলাম এতো সুন্দরভাবে আমি নিজে প্রেম করেও বুঝাতে পারতাম না তাদের।

প্রায় দেড়ঘন্টা সময় নিয়ে আম্মাকে এতো ভালো ভাবে বুঝিয়েছে যে আম্মা একদম গলে শিরাতে পরিণত হতে বাধ্য হয়েছে। এর উপরে প্লাস পয়েন্ট হিসেবে মুহিদকে আম্মার সাথে কথাও বলিয়ে দিয়েছে ফোনে। মুহিদের ভদ্র নরম শরম কথার ভাঁজ শুনে আর কে ঠেকায়? "

" বাবাও রাজি? "

" বাবা তখনো রাজি ছিলেন না। সে নিজে তার কিছু লোকজনদের থেকে মুহিদের পরিবার সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছে। সেখান হতে পজিটিভ রিভিউ পেয়ে সবকিছু দেখে তারপরে মত দিয়েছে।"

" বাহ তাহলে তো তোমার এক্সট্রা কোনো প্যারাই নিতে হয়নি আপু ।"

" আরে ভাবিজান শুনতে যতো সহজ লাগছে ততটা সহজ ছিলো না। ওই পরিস্থিতিতে যখন দাঁড়িয়েছিলাম ভীষণ কঠিন ছিলো সবকিছু। বুঝতে পারছো বড় ভাইয়া দেড় ঘন্টা কি ইফোর্টটাই না দিয়েছে শুধু মাত্র আমার জন্য। কারণ সে জানতো বাবা আম্মা রাজি না হলে আমার অবস্থা কেমন হবে। আমি কান্না করবো, কষ্ট পাবো ভেবে সে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে।ভাগ্য ভালো আপনার বর ছিলো না।"

" কেনো থাকলে কি হতো? তারও তো মত ছিলো। "

" আপনার বরের যা মাথা গরম। সরফরাজ ভাইয়ার মতো সে দেড়ঘন্টা ধরে ঠান্ডা মাথায় বুঝাবে ভেবেছো? দেড় মিনিটের মধ্যে কথা শেষ করে উঠে যেতো। এতো তুমি বুঝলে বোঝো না বুঝলে নাই। "

" বাবা আম্মা এ নিয়ে কিছু বলেন না উনাকে ? "

" ভাইয়ার একটা দিক বলি শোনো, ধরো কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে তাকে ডাকা হলো। সে সর্ব প্রথম সবকিছু ভালোভাবে শুনবে বুঝবে তার পরে সর্বোচ্চ পাঁচ মিনিট সময় নিয়ে নিজের মতামত জানাবে। সরফরাজ ভাইয়ার মতো ভেঙে ভেঙে বুঝিয়ে কথা না বলে সরাসরি মেইন কথাগুলো বলবে। এর বাইরে বাড়তি সে কিছুই বলবে না। অযথা কোনো কথা শুনবেও না। আর বাবা আম্মা তাদের ছেলেকে খুব ভালো করেই জানে চেনে। মতামতে না মিললেও মুখের উপরে তারা কিছু বলবে না ঠিক কিন্তু রাগ করে থাকবে। অতঃপর এমপি সাহেব উঠে চলে যাবেন।

তারপরে সেটা নিয়ে বাবা আম্মা নিজ হতে যতক্ষণ না কোনো মতামত তাকে জানাবে সে মোটেও আর সেই বিষয়ে কথা তুলবে না। ভুলেও জিজ্ঞেস করবে না কি সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। এতে যদি দশ বারো বছর নির্দ্বিধায় পার হয়ে যায় পার হয়ে যাবে।"

" বলছো কি আপু। সাংঘাতিক।"

" সাংঘাতিক মানুষ সাংঘাতিক কাজ কারবার। তবে, সান্নিধ্য ভাইয়ার কথাগুলোই পরে ফলে যায়। বাবা আম্মা পরে বুঝতে পারে তার মাথা গরম ছেলে যা যা বলেছিলো সেটাই ঠিক ছিলো। ভাইয়া আসলে ক্লিয়ার কাট কথা পছন্দ করে। ওর সামনে কথা ঘুরালে প্যাঁচালেই ভীষণ বিরক্ত হয়ে রেগে যায়। নিজেও পরিষ্কার কথা বলবে ও এক্সপেক্ট করে সবাই সেরকম বলবে। বাট সবাই কি এক হয় নাকি !!

" হুহ। বুঝলাম। কিন্তু আমার কাছে তো উনাকে ভীষণ সহজ লাগে আপু।"

সানজি মৃদু হাসে। শেহরিনের নাকে আঙুল ছুঁইয়ে দিয়ে বলে,

" ধুরু পাগলি! তুমি হচ্ছে তার আলাদা একটা মূল্যবান অংশ। যে অংশটাকে সে সবসময় অতি যত্নে লালন করে। নিজেকে তোমার সামনে সহজ খাতা হিসেবে মেলে ধরে। বাবা মা'র গুরুত্ব এক জায়গায়, স্ত্রীর গুরুত্ব এক জায়গায় আর বোনের গুরুত্ব এক জায়গায়। যেমন, আমি চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারি আমার ভাইয়ারা আমার কাছে পৃথিবীর বেস্ট বেস্ট ভাইয়া। আমার কখনো ভয় লাগে না এই ভেবে যে, বাবা আম্মা না থাকলে আমার কি হবে। আল্লাহ আমার জীবনে দুইটা ভাই দিয়ে সেই ভয় দূর করে দিয়েছেন।"

" তোমার সমস্ত ভয় দূর করতে যেমন তোমার দুই ভাই আছে। ঠিক আমার ক্ষেত্রে আমারও বাবা এবং উনি আছেন। আমার জীবনে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হচ্ছেন এই দুজন।"

সানজি শেহরিনকে উষ্ণ আলিঙ্গন করে নিজের সাথে জড়িয়ে নিয়ে বলে, " আল্লাহ সবাইকে একটা না একটা সুন্দর নিয়ামত বা ভরসাস্থলের জায়গা তৈরি করে দেনই।"

" ঠিক বলেছো। কিন্তু আমি তো এখনো আমার উত্তর পেলাম না?"

" হুহ পাকা মেয়ে। বলছি বলছি।"

" এক্ষুণি বলো।"

" পরেরদিন মানে কালকে রাতে আপনার গুণধর বর আসার পরে এটা নিয়ে কথা হয় আবারো। বাবা আম্মা রাজি শুনে সেও আর কোনো কথা বলে না। কথা চলাকালীন সময়ে হুট করে মুহিদের বাবা ফোন করে জানায়, তারা আজকে তাদের ফ্যামিলির কিছু আত্মীয় স্বজন নিয়ে আমাকে দেখতে আসবে এবং বিয়ের ডেট ফিক্সড করা নিয়ে কথা বলবে। আমি তো হতবাক। এতো তাড়াতাড়ি মোটেও আশা করিনি। বাট না তো আর করা যায় না। বাবা রাজি হয়ে গেলেন একবাক্যেই।"

" আমি কালকে কোথায় ছিলাম মঙ্গল না বুধ গ্রহে?"

" আপনি সান্নিধ্যের গ্রহে ছিলেন ম্যাডাম। আপনার আজকে এক্সাম থাকার কারণে কালকের মিটিং এ আপনার জায়গা হয়নি। বাবা বলেছিলো আপনাকে ডাকতে কিন্তু আপনার নেতাসাহেব গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ডাকার কোনো প্রয়োজন নেই। এক্সাম আছে ওর কালকে।

ব্যস, বাবাও আর কিছু বললেন না। নেতাসাহেব সাফ সাফ আমাকে জানিয়ে দিলেন, বিয়ের আনন্দটা নিজের মধ্যে চেপে রাখ কালকে দুপুর পর্যন্ত। আগেই বলার দরকার নেই। বললে এগুলো নিয়েই পড়ে থাকবে।"

শেহরিন ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে শরীর এলিয়ে দেয় বিছানার সাথে। উপরিপানে তাকিয়ে বলে, " আপনার ভাইয়ার সাথে জীবন বেঁধে মিষ্টি যন্ত্রণায় পড়ে গেলাম মনে হচ্ছে। "

" এই মিষ্টি যন্ত্রণাগুলোই আপনাকে ভালোবাসার সুতোয় বেঁধে রাখবে ম্যাডামজি। সবাই কিন্তু পায় না। "

" কিন্তু আমি পেয়েছি।"

" ভাগ্যবতী। "

" গড'স আল্টিমেট গিফট।"

শেহরিন শোয়া ছেড়ে তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে। কিছু একটা মনে পড়তেই ঠোঁটের উপর ঠোঁট চেপে বলে, " ওয়েট ওয়েট। আরও একটা উত্তর জানা বাকি আছে আমার।"

" আবার কি? "

" ডিসি হিলে রবীন্দ্র জয়ন্তী উপলক্ষ্যে যে অনুষ্ঠানটা হয়েছিলো সেখানে তুমি আর আমি লং টাইম গল্প করেছিলাম মনে আছে?"

সানজি মাথা নেড়ে স্পষ্ট স্বরে বলে, "হ্যাঁ আছে। কেনো?"

" সেখানে তুমি আমাকে ভালোবাসার সংজ্ঞা বুঝিয়েছিলে। আমি তোমাকে জিজ্ঞেসা করেছিলাম তোমার ভালোবাসা সম্পর্কে। তুমি আমাকে বলেছিলে তুমি লিস্টের বাহিরে, ভালোবাসার বৃত্তে তোমার জায়গা হয়নি। তোমার কন্ঠে উদাসীন ভাব ছিলেো। আমি তো ধরেই নিয়েছিলাম তোমার লাইফে ভালোবাসা নিয়ে কোনো একটা সমস্যা হয়েছে। কিন্তু !! কিন্তু এগুলো কি হ্যাঁ??"

শেহরিনের গোয়েন্দাগিরি নজর দেখে সানজি একহাতে কপাল চাপড়ে বলে, " এটা যে সান্নিধ্যের বউ সেটা আলাদাভাবে প্রমাণ করতে কোনো ডকুমেন্টস লাগবে না। এমনি বুঝে যাবে সবাই।"

" বুঝলেই ভালো। উত্তর দাও এখন।"

" মুহিদের সাথে ঝগড়া চলছিলো তখন। "

" ঝগড়া? "

"হ্যাঁ।"

" ঝগড়া করেছো জন্য প্রেমে ব্যর্থ হওয়ার মতো কথা বলবে?"

" আরে বাচ্চা ঠিকঠাক প্রেম করোনি তো তাই বুঝতে পারছো না। প্রেম করার সময় বয়ফ্রেন্ডের সাথে ঝগড়া লাগলে ছ্যাঁকা খাওয়ার চেয়ে বেশি পরিমাণ ব্যাথা লাগে। মনে হয় কেউ আমাকে আর ভালোবাসে না। আমি নিঃস্ব একাকিনী। ভালোবাসার সমুদ্র জলে আমার স্নান করা মানা। সে আমাকে ভালোই বাসেনি কখনো, সে আমাকে মূল্যই দেয়নি । চরম বিরহ। আই মিন ভালোবাসা সম্পর্কে যত নেগেটিভ বার্তা আছে সব মনের মধ্যে এসে জমা হয়ে যায়। অনেকে তো ফেসবুকে তাদের এই অনুভূতিগুলো শেয়ারও করে।"

" আর যখন ঝগড়া মিটে যায়? "

" তখন সব ঠিকঠাক। তার মতো ভালো মানুষ আর একটাও হয় না। ভালোবাসার সমুদ্রজলে শতবার ডুব দেওয়া যায় তখন।"

" মানে সব নেগেটিভ থেকে পজিটিভ হয়ে যায়? "

" হ্যাঁ সব ঠিকঠাক ।"

" অদ্ভুত তো !! "

শেহরিন অবাক পানে তার কাছে লাগা জটিল বিষয়টার সহজ সমীকরণ খোঁজে। সানজি তার ভাবিজানের হতবাক দৃষ্টি দেখে ঠোঁট কামড়ে হাসে আড়ালে।

" সানজি আসো এখন নিচে যেতে হবে। "

তিথির হঠাৎ আগমনে সানজি শেহরিন একসঙ্গে তাদের গল্পের জগত হতে বেরিয়ে আসে। নিজেদের ভাবনার সমাপ্তি ঘটায় তড়িঘড়ি করে। নিচে যাওয়ার কথা শুনে হালকা জড়তা এসে গুটিয়ে ধরে সানজিকে। ধরতে গেলে জীবনের প্রথম আজকে সে কোনো পাত্র পক্ষের সামনে এভাবে সেজেগুজে যাচ্ছে। সবকিছু চেনাজানা পরিচিত হলেও নার্ভাসনেস টা সে কমাতে পারে না।

__________________________________________

বাড়ির দুই বউ মিলে বাড়ির একমাত্র মেয়েকে নিয়ে নিচে আসে। ড্রয়িং রুমে উপস্থিত মুহিদসহ তার বাবা মা, দুই আন্টি আংকেল আর দুটো কাজিন। সান্নিধ্য নিজ কাজে যাওয়া পথে সবার সঙ্গে হালকা পরিচয় পর্ব সেড়ে গিয়েছে। তার পর পরই এসেছে সরফরাজ।

সবার সাথে সালাম কুশলাদি বিনিময় শেষে সানজিকে বসানো হয় সোফাতে। মুহিদের আন্টি আংকেলরা আগ্রহচিত্তে সানজিকে নানান প্রশ্ন করতে থাকেন। প্রাথমিক আলাপন ছেড়ে শুরু হয় মূল কথা বার্তা। অভিভাবকরা মিলে সবাই যখন তাদের পছন্দের বিষয় সহ, বিয়ের ডেট নিয়ে কথা বলতে ব্যস্ত ঠিক সেসময় চোখে চোখে নিরব ভাষা আদান প্রদান করে যায় দুই কপোত কপোতী। মুহিদের স্থির দৃষ্টি সানজিকে লজ্জায় লাল করে তোলে। উপায়ন্তর না পেয়ে চোখের চাহনি সরিয়ে সে এলোমেলো হয়ে এদিক সেদিক তাকায়।

বিকেল তখন সাড়ে চারটা। দীর্ঘ সময়ের আতিথিয়েতা গ্রহণ শেষে আকদ করার জন্য দিন নির্ধারণ করা হয় সামনের শুক্রবারে। অতঃপর পরবর্তীতে সময় নিয়ে ঘটা করে হবে বিয়ের আয়োজন । পুরোটা সময় জুড়ে দুপক্ষের কথা বার্তাতে সমঝোতা বজায় থাকে বেশ । হাসিমুখে গ্রহণ করে নেয় নতুন সৃষ্ট আত্মীয়তার বন্ধনকে।

" আজ তাহলে উঠি। ইনশাল্লাহ শীঘ্রই দেখা হচ্ছে। "

" ইনশাআল্লাহ অবশ্যই।"

পরস্পর করর্মদন সম্পন্ন হয়। মুহিদের মা আন্টিরা, মিসেস নাজনীন তিথি শেহরিনের সঙ্গে বিদায়ী অভর্থনা নেওয়া শেষে গন্তব্যের উদ্দেশ্য পা বাড়ায়। একে একে চলে যায় পাত্রপক্ষের সব লোকজন।

বাড়ির মেয়ে সদস্যগণ অবশেষে পায় ফুরসত। মিসেস নাজনীন সবাইকে ডাইনিং এ বসতে বলেন। আজকের লাঞ্চ একদম বিকালে গিয়ে ঠেকেছে। শেহরিন মনে মনে তার নেতাসাহেবকে অজস্র ভালোবাসা জানায়। ইশ ভাগ্য ভালো দুপুরে একটু খেয়েছিলো সে, নয়তো এতোক্ষণ না খেয়ে তো মোটেই থাকতে পারতো না। এমনিতে ক্ষুধা সহ্য হয় না। তারউপরে লম্বা সময়। নিশ্চিত মাথা ঘুরে পড়ে যেতো।

ড্রয়িংরুম ছেড়ে সবাই যখন ডাইনিং এরিয়ায় যাওয়ার জন্য উদ্যত হয় ঠিক তখনই ঘটে আরেক অঘটন। প্রত্যেকে পা থামিয়ে অবাক হয়ে উপরের দিকে তাকায়। সিঁড়ি ভেঙে নামছে বিশেষ একজন। হাতে তার ছোট নীল রঙের ডাইনোসর আঁকা লাগেজ।

" একি বেবি মানকি কোথায় যাচ্ছিস তুই? "

" আমি আর তোমাদের বাসায় থাকবো না। "

"দাদুভাই কি হয়েছে? "

তাসিন টেনেটুনে লাগেজটা নামিয়ে ফ্লোরে রাখে। অতঃপর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে বলে, " তোমরা আমার সাথে এমন কেনো করো দাদুমণি?"

" কি করেছি আমরা? "

" তোমরা সবাই বিয়ে করছো আর আমাকে কেনো বিয়ে করতে দিচ্ছো না? "

মিসেস নাজনীন তিথির দিকে হতাশা চোখে তাকাতেই তিথি গরম চোখে তাকায় তাসিনের দিকে। চড়া সুরে বলে,

" তাসিন আবার শুরু করেছো তুমি? "

" এই বেবি মানকি এজন্য তুই বাসা ছেড়ে চলে যাচ্ছিস?"

" যেতে হচ্ছে তো।"

" দেখি দুঃখটা বল।"

ফু'মণির প্রশয়ে তাসিন এক পা, এক পা করে সবার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলে, " দাদুমণির দাদুভাই আছে, মামণির বাবা আছে, ইয়ো সানির ইয়ো পানি আছে, ফুমণির নতুন আংকেল আছে.. আর আর...

লতা অদূরে দাঁড়িয়ে মুখ ঝামটা দিয়ে বলে, " লতারও সোয়ামি আছে।"

" লতারও সোমি আছে। তাহলে আমার কেউ নেই কেনো? আমাকে তোমরা ইয়ো পানিকে দাওনি...তাই তাসিনের আর কেউ নেই। আমি থাকবোই না।"

" যাবি কোথায়? "

" বলবো না। "

" তাসিন দুষ্টামি করো না। উপরে যাও সাড়ে পাঁচটার সময় মিসের কাছে যেতে হবে। "

" না যাবো না আমি। তোমরা কেউ মিসের কাছে যাওনা, কেউ হোমওয়ার্ক করো না। শুধু আমাকেই করতে হয়, আমাকেই স্কুলে যেতে হয়। কেনো? কেনো? কেনো? আমি থাকবোই না আর এ বাসায় ।"

" যা চলে যা। রাতে মুতু আসলে, পটি আসলে কে তোকে ওয়াশরুমে নিয়ে যায় দেখবো, কেউ তোকে দুধ কলা মাখিয়ে ভাত খাইয়ে দেয় সেটাও দেখবো । কান্না যেনো করতে হয় না।"

" আমার কাছে টাকা আছে। "

" কয়টাকা।"

"দুই টাকা।"

সানজি লম্বা করে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে,

" হু ওই দুই টাকা দিয়ে তুই পুরো দুনিয়া কিনে ফেলবি দেখছি। যা রাস্তায় শিং ওয়ালা হাম্বা আছে। তোকে দেখলেই খেয়ে ফেলবে।"

তাসিন মেইন ডোরের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। শিং ওয়ালা হাম্বা দেখে সে একটু ভয়ই পায়। গালে হাত রেখে একটু ভাবনা চিন্তায় পড়ে। সত্যি কি তাকে দেখলে হাম্বা নিয়ে যাবে? আচ্ছা যদি এই দুই টাকা হাম্বাকে দিয়ে বলে, " হাম্বা যাও একটা চকলেট কিনে খাও। আমাকে নিও না প্লিজ। তাহলে কি শুনবে? নিশ্চয়ই শুনবে। সে নিজেও তো চকলেট পেলে কথা শোনে।"

তিথি ছেলের ভাবসাব দেখে কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে বলে,

" লাগেজে কি নিয়েছো তুমি?"

" বলবো না।"

শেহরিন সানজি উৎসুক দৃষ্টি দিয়ে এগিয়ে যায় বেবি মানকির পানে। হাসি আসলেও জোরপূর্বক হাসি চাপিয়ে রেখে বলে, " দেখি দেখি। "

দুজনে মিলে লাগেজটা খোলা মাত্র ছোটখাটো একটা খেলনার শপ বের হয়ে আসে। সমস্ত কার, রিমোট, বাস ট্রাক, হাতি ঘোড়া দিয়ে ভর্তি তার লাগেজ। জামা কাপড় তো দূরে থাক একটা ত্যানাও স্থান পায়নি সেখানে । সব তার খেলার সরঞ্জাম।

এতোক্ষণ সবাই বেবি মানকির কান্ডে হাসি দমিয়ে রাখলেও এ পর্যায়ে এসে আর তা পারে না। একযোগে সবাই লাগেজের মধ্যে ঠেসে রাখা খেলনা দেখে হেসে উঠে।

বেচারা বাচ্চাটা সবার হাসি দেখে গাল ফুলায়। টলমল হয়ে আসে চোখ দুটো। ঠোঁট উল্টিয়ে চিৎকার করে বলে, " হাসছো কেনো তোমরা। বাবা...

বাবাকে ডাকতেই সবাই চুপ হয়ে যায় এক মুহূর্তে । শেহরিন তাসিনকে জড়িয়ে ধরে আদুরে স্বরে বলে," আমি আর ফু'মণি, তো আছি তোমার । আমরা তোমার সাথে খেলবো ওকে? "

সানজি শেহরিন মিলে বাড়ি ছাড়তে উদ্যত হওয়া বাচ্চাটাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ফের নিয়ে আসে ড্রয়িংরুমে। সোফায় বসিয়ে শান্ত করার প্রয়াস চালিয়ে যেতে থাকে নিজেদের মতো করে।

অন্যদিকে মিসেস নাজনীন তিথি লতা সবাই চলে যায় ডাইনিং এ। শেহরিন টিভিটা অন করতে গিয়ে শুনতে পায় অদূরে তার ফোন বাজছে। ফোনটা নিয়ে এসে দেখে নেতাসাহেবের ফোন। একহাতে টিভিটা চালু করে দিয়ে সে কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ঠিক একই মুহুর্তে সানজির করা মেসেজে আসে মুহিদের রিপ্লাই।

" আপু আমি একটু উপরে যাচ্ছি উনি একটা ফাইলের কথা জানতে চাইছেন।"

" ইয়ো পানি কোথায় যাচ্ছো তুমি?"

"বাবা তোমার চাচ্চু ফোন দিয়েছে।"

" বেবি মানকি একটু ওয়েট তোর নতুন আংকেলও ফোন দিয়েছে...

দু'জন সঙ্গী চলে যায়। একজন ইয়ো সানি নিয়ে ব্যস্ত আরেকজন নতুন আংকেল নিয়ে। তাসিন দু পা ভাঁজ করে টিভির রিমোট হাতে নিয়ে রেগে ইচ্ছেমতো সাউন্ড বাড়িয়ে দেয়। টিভির পর্দায় ভেসে ওঠে কোনো তিড়িং বিড়িং এক নাচের দৃশ্য। আর সেই তালে ভেসে আসতে থাকে এক অমোঘ গানের লাইন..

" আহা ক্যামনে রাখি বান্ধিয়া.. বান্ধিয়া...

এই মনের পাখি... বান্ধিয়া...

তুমি কাছে.. তবু যে দূরে.. কতো যে দূরে ওরে বধূয়া...

পরাণ যায় জ্বলিয়া রে... পরাণ যায় জ্বলিয়া রে... "

তাসিনের চোখ ফের টলমল হয়ে উঠে। গানের লাইনের শব্দগুলো বোধগম্য হতেই তার চোখে মুখে বিষন্নতার ভার জেগে ওঠে। দু পা ছড়িয়ে সে আবারো ক্রন্দনরত সুর তুলে চিৎকার করে ডেকে উঠে,

" ও বাবা....."

বিজ্ঞাপন
রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি গল্পটি মাহরিণ তৃণ-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও সামাজিক গল্প