সূর্যের উত্তাপের প্রখরতা ছাড়িয়েছে মধ্যে দুপুরে। ক্লান্ত বিমর্ষ হয়ে উঠেছে জনজীবন। টানা রোদের মাঝে ঘন্টাখানেক হলো নিজের কাজ চলমান রেখেছে চট্টগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য সান্নিধ্য শাহজাদ খান। পরপর তিনটে সাইট পরিদর্শন শেষে এসেছে চতুর্থ নাম্বার সাইট পরিদর্শনে। পরনে সাদা পাঞ্জাবি তার ঘেমে উঠেছে। মুখোরেখা হয়ে আছে লালচে। বলিষ্ঠ দু হাত কোমড়ে রেখে সে ব্যস্ত পরিদর্শনে।
পিছনে সারি সারি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার একাধিক গাড়ি বহর। আছে চারটি কালো রঙের এসইউভি, সামনে পেছনে প্রটোকল আর নিরাপত্তারক্ষী। কড়া নিরাপত্তায় ঘিরে রেখেছে চারপাশটা৷ প্রত্যন্ত এই অঞ্চলে বিরাট সুবিধা সৃষ্টির কাজ সেই সহ এমপি সাহেবকে এক ঝলক দেখার জন্য উৎসুক জনতাদের উপচে পড়া ভীড়। হাতে হাত মেলানোর জন্য অধীর আগ্রহ এই কড়া রোদ্দুরকেও করছে অবহেলা।
চলছে নতুন সেতু প্রকল্পের কাজ। যা দুটি বিচ্ছিন্ন গ্রামকে সংযুক্ত করে স্থানীয়দের জন্য যোগাযোগের এক নতুন দিগন্ত খুলে দেবে। চলাচলে এতোদিন দীর্ঘ ভোগান্তি পার করে আসা মানুষ সেতুর দেখা পেয়ে ভীষণ উচ্ছ্বসিত। এতোদিন লম্বা পথ সাঁকো কিংবা নৌকাতে পারাপার হতে গিয়ে নানান সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে তাদের।
প্রজেক্ট ম্যানেজার এবং প্রধান প্রকৌশলী সান্নিধ্যের দিকে এগিয়ে এসে বিনয়ের সাথে হাসিমুখে বলেন,
"স্যার এই হলো আমাদের প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা। কাজ প্রায় ৮০% সম্পন্ন হয়েছে।"
সান্নিধ্য চারপাশটাতে নজর বুলিয়ে সরাসরি প্রধান প্রকৌশলীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, "প্রজেক্টের ব্লুপ্রিন্টটা দেখানো যাবে ?"
প্রকৌশলী আহমেদ করিম কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে উঠে সরাসরি ব্লু প্রিন্টের কথা শুনে। কিন্তু সামনে তাকিয়ে থাকা শৃগাল দৃষ্টির মাঝে নিজেকে না ফাঁসাতে মুখে জোরপূর্বক হাসি বজার রেখে ফাইল এগিয়ে দেন।
সান্নিধ্য হাতে ফাইল পাওয়া মাত্র মনোযোগ দিয়ে ব্লুপ্রিন্ট দেখতে শুরু করে। তার তীক্ষ্ণ চোখ প্রতিটি রেখা আর সংখ্যার উপর গাঢ় নজর বুলায়। পুরোটা দেখতে দেখতে শেষে পথে কোনো এক জায়গায় তার কপাল কুঁচকে আসে। কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে সেদিক পানে তাকিয়ে থেকে ভারী কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
"এখানে তো সিমেন্টের অনুপাত ১:২:৪ দেখাচ্ছে কিন্তু এই পিলারগুলোর ফিনিশিং দেখে তো মনে হচ্ছে অনুপাতটা ঠিক নেই। আর রডের ঘনত্বও ব্লুপ্রিন্টের তুলনায় কম লাগছে। কারণ কী?"
"কোথায় স্যার? না স্যার। সব ঠিকই আছে বিশ্বাস করুন। হয়তো আলোর তারতম্যের কারণে এমন লাগছে..."
"আলোর কারণে? "
" না মানে স্যার.. "
" মনে হচ্ছে আপনার চোখে সমস্যা হয়েছে সেই সাথে আপনার নীতিতেও। একটু দৃষ্টি সোজা করলেই বোঝা যাবে দিনের আলোর তারতম্য কারণ নাকি অর্থব্যয়ে তারতম্যের কারণ। এসব কাঁচা অজুহাত আমাকে দিতে আসবেন না। খুব একটা লাভ হবে না কেমন? "
শান্ত ধীর কন্ঠ কিন্তু এক অদ্ভুত দৃঢ়তা মেশানো। জনাব আহমেদ করিম শুকনো ঢোক গিলে এমপি সাহেবের মুখোরেখা দেখে। সে শুনেছে এমপি সাহেব বেজায় তড়িৎ ঘুঘুর মতো মানুষ। সহজে ভুলানো যায় না। সঠিক অনুপাতের জায়গায় কমবেশি সে করেছে একটু। কিন্তু সেটা খুব একটা চোখ পড়ার মতো নয়। আন্দাজও করতে পারেনি এটাও ধরে ফেলবে। কেননা এতো বছরের চাকরিজীবনে যত এমপি মন্ত্রী সাইট পরিদর্শনে এসেছে হাতে গোনা কয়েকজন বাদ দিয়ে বেশিরভাগই জনগণকে নিয়ে ব্যস্ত থেকেছে। ভোট আদায়ের জন্য যত তেল দিতে হয় দিয়েছে। সাইট পরিদর্শনে এসে চোখ বুলানো ছাড়া আর তেমন কিছুই করেনি। আর এই চতুর লোক সরাসরি এসেই আগে ব্লু প্রিন্টে হাত দিয়েছে?
সান্নিধ্যের মুখায়বে পরিবর্তন ঘটে। কণ্ঠস্বরে স্পষ্ট বিরক্তি এনে কাটকাট গলায় বলে, "এই প্রকল্পে সরকারের কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ হচ্ছে। আর এই সেতুটি তৈরি হচ্ছে আমার এলাকার সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য। সামান্য দুই পয়সার লোভে যদি কাজে অনিয়ম আনেন তাহলে আপনার আসলে বিবেক কোথায়? "
" স্যার আপনি ভুল বুঝছেন আমাকে। প্লিজ এক্সপ্লেইন করতে দিন একটু আমাকে।"
" ফলস এক্সপ্লেইন শুনতে চাই না আমি। আর আপনার এক্সপ্লেইন শুনে কোনো কাজও নেই আমার। আমি এখানে নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ টিম দিয়ে পুরো কাজটি পুনরায় পরীক্ষা করাবো।"
প্রকৌশলী আহমেদ করিমের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায় মুহুর্তেই। একদম নিরব, নিরুত্তর হয়ে যান তিনি। সান্নিধ্য প্রজেক্ট ম্যানেজারের দিকে তাকিয়ে ধারালো স্বরে বলে, "আপনি শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলুন। তাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা দেখুন। কোথাও কোন ধরনের সমস্যা হলে সেটা রিপোর্ট করে আমাকে তাৎক্ষণিক জানাবেন। কাজের মাঝে এবং শেষে কোনো ধরনের অভিযোগ যেনো না আসে বিষয়টা খেয়ালে রাখবেন।"
" জ্বি স্যার অবশ্যই।"
"আর জনাব আহমেদ করিম আপনাকে স্পষ্ট করে বলে দিচ্ছি, যদি কাজে কোনো অনিয়ম পাই তাহলে শুধু আপনার চাকরি যাবে না। আপনার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হবে। আর সেটা পার্সোনালি আমি হ্যান্ডেল করবো। এতোকাল পয়সা খেয়ে এসে ভাববেন না, আমি এখানে রাজনীতি করতে এসেছি। আমি এখানে এসেছি মানুষের সেবা করতে।"
জনাব আহমেদ করিম মাথা নিচু করে দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকেন ভূমিতে। এতোদিন চোখ বন্ধ করে পকেট ভারী করে আসতে আসতে হঠাৎ এমনভাবে যে মাটিতে আছাড় খাবেন তা কোনোভাবেই ঠাহর করতে পারেননি।
এমপি সাহেবের ঘর্মাক্ত মুখে পরিষ্কার বাচন ভঙ্গি উপস্থিত সবাইকে বেশ প্রভাবিত করে। নিরাপত্তারক্ষীর আদলে গড়া বেষ্টনী মাঝে রেখে সে এগিয়ে যায় তাদের পানে। উৎসুক জনতার সাথে করমর্দন সম্পন্ন করে একে একে। এতোক্ষনে রোদেপুড়ে কাঙ্ক্ষিত মুহুর্তে আসতেই সব প্রায় নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে হাত মেলাতে গিয়ে।
" অশেষ শুকরিয়া স্যার। এটা খুবই প্রয়োজন ছিলো।"
সান্নিধ্যের অতিরিক্ত রোদে কপাল মুখোরেখা কুঁচকে থাকলেও ঠোঁটে থাকে মৃদু হাসি। চেষ্টা করে মোটামুটি সবার সাথে হাত মিলিয়ে কুশল বিনিময় করতে।
উৎসুক জনতা সামলে সে সরাসরি শ্রমিকদের সাথে কথা বলে। তাদের সুবিধা-অসুবিধা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেই তন্মধ্যে একজন শ্রমিক তার দিকে এগিয়ে এসে নমুজ কন্ঠে বলেন,
"স্যার আমরা আপনার কাজে কোনো গাফিলতি করবো না। শুধু আমাদের পারিশ্রমিকটা একটু ঠিক রাইখেন স্যার। উপর থেইকা পাওনা আসতে অনেক হাত বদল হয়।"
"আপনারা ঠিকমতো কাজ করতে থাকুন। আমি আপনাদের পাশে আছি। আপনারা আমার কাজে গাফিলতি করবেন না আমি আপনাদের পারিশ্রমিক কোনো গাফিলতি সৃষ্টি হতে দিবো না।"
" জ্বি স্যার..। "
সাংবাদিক মিডিয়া ঠেলে অবশেষে প্রায় দুইঘন্টার কাছাকাছি সময়ে এসে সাইট পরিদর্শনের কাজে সমাপ্ত ঘটান এমপি সাহেব। সেই সকাল হতে টানা একই কাজে নিয়োজিত আছে সে। সকল ভীড় উপক্ষা করে অবশেষে গাড়িতে উঠে বসে। একে একে সামনে হতে দুটো গাড়ি ধূলো উড়িয়ে চলে যেতেই এমপি সাহেবের গাড়ি চলতে শুরু করে। পিছনে রয়েছে আরো একটা গাড়ি।
" এই সেতু প্রকল্পের কাজগুলো পুনরায় ভালো করে তদারকি করার জন্য একটা টিম পাঠান। নিরপেক্ষ এবং বিশেষজ্ঞ টিম চাই আমি। এটার রিপোর্ট যেনো কালকে বিকেলের মধ্যেই আমার হাতে আসে। "
" জ্বি স্যার। আমি বিষয়টা দেখছি।"
সান্নিধ্য টিস্যু দিয়ে মুখে কপালে ঘাম মুছে বোতল হতে পানি পান করে। প্রায় তিন ঢোকে সমস্ত পানি নিঃশেষ করে দিয়ে সিটে গা এলিয়ে দেয়। একরাশ ক্লান্ততা তার শরীর জুড়ে ভর করেছে। ঠোঁট ফুঁড়ে নিঃশ্বাস ছেড়ে সে তার ফোনটা সক্রিয় করতে করতে বলে, " আরহাম।"
" জ্বি স্যার।"
" এই ইঞ্জিনিয়ারের বিষয়ে সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করে রাখবে। আগে কোথায় কোন জায়গায় কর্মরত ছিলো পলিটিক্যাল কোনো ইস্যু আছে না কি সব।"
" আপনার কি তাকে নিয়ে সন্দেহ হচ্ছে স্যার? "
" যত সম্ভব মনে হচ্ছে উনি পলিটিক্যালি অ্যাম্বিশাস। "
" আচ্ছা খোঁজ খবর নিয়ে দেখছি আমি।"
সান্নিধ্য শেহরিনকে ফোন দিতে গিয়ে কপালে সূক্ষ্ণ দাগ টানে। একটা অপরিচিত নাম্বার হতে দুটো ক্ষুদে বার্তা এসেছে। এই নাম্বারটা তার প্রাইভেট নাম্বার। একমাত্র শেহরিন, সরফরাজ আর সানজির কাছে রয়েছে শুধু। আর বাসার প্রত্যেক সদস্যের জন্য আলাদা একটা নাম্বার।
ধীর হাতে সে মেসেজটা ওপেন করে। স্পষ্ট অক্ষরে লেখা বাক্যগুলো শান্ত ভঙ্গিতে সে চোখ বুলিয়ে নেয়।
" সুইটহার্ট,, হোয়াই আর ইউ সো হ'ট?? রোদের মাঝে দাঁড়িয়ে থেকে তো আরো হ'ট লাগছিলো তোমাকে দেখতে। আমি তো নজরই ফেরাতে পারছিলাম না। এসির ঠান্ডা বাতাসটাকেও অসহ্য লাগতে শুরু করেছিলো। মনে হচ্ছিলো তোমার কাছে দৌড়ে যাই। তোমার কঠিন উত্তপ্ততার মাঝে নিজেকে শামিল করি। কিন্তু চেয়েও তো সবকিছু পাওয়া যায় না তাই না বলো? তোমার আশেপাশে এতো দেহরক্ষী, পুলিশ ফোর্স। কিভাবে যাই?
তবে, দূর থেকেই তোমার সাথে আমি একটা দারুণ গেইম খেলবো ভেবেছি। রিভেঞ্জ রিভেঞ্জ খেলা। ঠিক তোমার মতো করে। তবে আমাকে খুঁজতে এসো না ডার্লিং, পাবে না। আমি কে, কি আমার পরিচয় এসবে আছে শুধুই ভ্রম। তাই চেষ্টা করো না।
এনিওয়ে, বি রেডি মাই ড্রিমি বয়। লাভয়ু সে মাচ।"
সান্নিধ্য চুপচাপ মেসেজটা পড়ে ডিলিট করে দেয়। এসব তার কাছে হরহামেশাই আসে। কত হুমকি ধামকি কত কি। বড় বড় রাজনৈতিক রাঘব বোয়ালরা তার বিরুদ্ধে জলঘোলা করতে নানানরকম মেয়েদের পিছনে লেলিয়ে দেয়। একটুখানি রিউমার সৃষ্টি হবে তো খবরে কাগজে মিডিয়াতে সয়লাব পড়ে যাবে। জনগণের সামনে ইমেজ নষ্ট করার ধান্দাবাজি তৈরি করে তারা। এসবে তার গা সাওয়া হয়ে গেলোও আজকের বিষয়টা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ এটা তার একদম প্রাইভেট নাম্বার। এতোকাল যাবত যত মেসেজ কলে হুমকি ধামকি এসেছে সব অন্য নাম্বারে। তার গোপন নাম্বারে আজ অব্দি ইনটেনশনালি কোনো অপরিচিত জন মেসেজ দেয়নি। এই প্রথম কেউ একজন দিলো। পাবলিক হলো কি করে?
" আল্লাহর দুনিয়ায় সব বেটির খপ্পরে কি আমাকেই পড়তে হয়?"
___________________________________________
অন্ধকারাচ্ছন্ন উচ্চাভিলাষী অট্টালিকাটির কক্ষ। বাহিরের আলো ঝলমলে থেকে যেনো এক বিচ্ছিন্ন নিষিদ্ধ দ্বীপ। কক্ষটির এক প্রান্তে বিশাল কাচের দরজা হতে দেখা যাচ্ছে দূরের রৌদ্রতপ্ত চট্টগ্রাম শহরের জ্বলজ্বলে রেখাগুলো। যেনো কেউ আঁকিবুঁকি রঙ মাখাচ্ছে কালো ক্যানভাসে।
নিঃশব্দের গাঢ় পরশে উঁচু হিলের শব্দ গটগট করে আওয়াজ তোলে মার্বেল মেঝেতে। হাঁটু অব্দি শর্ট স্কার্টে এক রমণী দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়ায়। ঠোঁটে তার গাঢ় টকটকে লাল লিপস্টিক সেই সাথে টকটকে লাল নেলপলিশে আঁকা সরু নখ। এক হাতে ধরে আছে একটি ককটেল গ্লাস। যার মধ্যে অ্যাম্বার তরল ঢলঢল করছে। খানিকটা সময় নিয়ে নিয়ে সে গ্লাসটিতে ঠোঁট ঠেকায়। হালকা সিপ টেনে ঠোঁটের লাল ছোপটি কাচের প্রান্তে এক অনির্দিষ্ট দাগ ফেলে।
কক্ষজুড়ে উদ্দেশ্যহীন পায়চারি তার আবারো শুরু হয়। এগিয়ে যায় গ্লাসডোরের সম্মুখে, দাঁড়ায় একদম সামনে। দূর হতে চোখে ভাসে সেই সেতু প্রকল্পের কাজ। একটু আগে যেখানে পদচারণা ঘটেছিলো এমপি সাহেবের। ঠোঁটের কোণজুড়ে তার রহস্য মাখা হাসি প্রস্ফুটিত হয়। নরম গলায় উন্মুক্ত করে বলে,
" ব্যাড লাক !! এতো কাছে এসেও তোমাকে ছুঁতে পারলাম না। তবে তোমার ভিতরটা আমি অতি শীঘ্রই ছুঁইয়ে দিবো মাই বয়। একটু ওয়েট করো। "
অন্ধকার গহ্বরে ঘরের এক কোণে ডিপ কাউচে বসে থাকা পুরুষটি তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে। মুখচ্ছবি তার আধাঁরে ডুবে আছে, শুধু সিগারেটের জ্বলন্ত প্রান্তটাই দৃশ্যমান। যা ম্লান আলোয় অস্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে তার চোয়ালের কঠিন রেখা। নিঃশব্দে সিগারেটটি তুলে ঠোঁটে চেপে গভীর টানে ধোঁয়া ছেড়ে দেয় উপরের দিকে। ছড়িয়ে পড়ে অদৃশ্য সিলিং এর দিকে। অতঃপর দৃষ্টি নামিয়ে সরাসরি নারীমূর্তির দিকে তাকিয়ে বলে,
" সান্নিধ্য শাহজাদ খানকে এভাবে প্যাঁচে ফেলার আইডিয়াটা কিন্তু মন্দ নয়। আমি মজা দেখার জন্য ভীষণ এক্সাইটেড বেবি।"
" জাস্ট ওয়েট আ লিটেল, বেবি। ইউ ক্যান ইনজয় এ ট্রাজিক নাইট।"
" আই'এম ওয়েটিং ইমপ্যাশেন্টলি..।"
জানালার কাঁচে রমণীটির প্রতিবিম্বে রহস্য ঘেরা সেই হাসির বিস্তার ঘটে। কাচের গ্লাসে ফের ঠোঁট ছুঁইয়ে শীতল গলায় বলে উঠে, "সান্নিধ্য শাহজাদ খান। রিভেঞ্জ নিতে হবে দেখা।"
|সুখনিবাস, বিকেল চারটা |
চলছে বিয়ের মৌসুম সুখনিবাসে। বাড়ির পুত্রের বিয়ের দু'মাস গড়াতে না গড়াতেই একমাত্র কন্যার বিয়ের আমেজ বইছে এখন। আকদের দিনক্ষণ ঠিক হতেই লেগেছিলো শপিং এর ধুম, আত্মীয় স্বজনকে আমন্ত্রণের কার্যক্রম। অপেক্ষার দিনরাত্রি পার হয় যায় চোখের পলকেই। সেই সাথে কাঙ্ক্ষিত সময় এসে কড়া নাড়ে দরজার অগ্রপ্রান্তে।
দেখতে দেখতে শেহরিনের এক্সামও প্রায় শেষ দিকে। হাত গুণে আর আছে মাত্র দুটো। শেষ হলেই বেঁচে যায় প্রাণপণে। মন তার ফড়িং ডানার মতো উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। জীবনের প্রথম এতো সুন্দর আত্মীয় স্বজন আর হৈ হুল্লোড়ের মাঝে বিয়ে উপভোগ করবে সে। এর আগে কখনো সে সুযোগ হয়নি। বাবা মামার সাথে শুধু যান্ত্রিক নিয়মে কমিউনিটি সেন্টার গিয়ে দুটো ছবি তুলে খেয়ে দেয়ে আসা। এইতো। কিন্তু এবার নিজ বাসায় তার অতি প্রিয় আপনজনের বিয়ে হচ্ছে বলে কথা। জমিয়ে মজা করবে সে।
ড্রয়িংরুম বর্তমানে কোলাহলপূর্ণ। কালকে আকদের জন্য মুহিদের বাসা থেকে এসেছে সবার জন্য গিফট। মুহিদের ফুপি চাচি সহ একজন কাজিন এসেছে সেগুলো দিতে। অন্যদিকে ফ্লোর জুড়ে চলছে মেহেদী আঁকা আঁকি। সানজির বিয়ে আর তার কাজিনরা আসবে না তাই কখনো হয় নাকি্। সবাইকে ধরে বেঁধে ঝগড়াঝাটি করে একদিন আগেই হাজির করে এনেছে সে।
দু'জন মেহেদী আর্টিস্ট কে নিয়ে আসা হয়েছে বাসায়। তাদের হতে সানজির মেহেদী পড়া হয়ে গেলে বসেছে তানিশা আর শেহরিন। বধূকে বাদ দিয়ে সবাই মোটামুটি একই ডিজাইনে হাত ভর্তি মেহেদী নিবে।
"এই মেয়ে তোমার নেতাসাহেব তোমাকে নিচে আসতে দিলো? কিছু বললো না? "
" উনি ঘুমিয়ে পড়েছে আপু। আমি সুযোগ বুঝে আস্তে আস্তে নেমে এসেছি।"
" যদি ঘুম থেকে উঠে দেখে তুমি পড়া বাদ দিয়ে এখনই মেহেদী লাগাতে বসেছো তাহলে কিন্তু বকবে।"
শেহরিন মেহেদী দেওয়ার দিকে গাঢ় মনোযোগ দিয়ে বলে,
"শুক্র শনি দুদিন ছুটি আছে আপু। হয়ে যাবে। ইশ পরীক্ষাগুলো তাড়াতাড়ি শেষ হলেই পারতো। ভালো লাগছে না আর দিতে।"
" হায় হায় মেয়ে বলে কি। "
"ভাবি তুমি তো দেখছি বকা খাওয়াবা আমাদের। ভাইয়া তোমার কথা শুনলে নিশ্চিত বলবে আমরা উস্কিয়েছি তোমাকে।"
" আরে না না। তোমার ভাইয়াকে আমি ম্যানেজ করে নিতে পারবো।"
তানিশা হাত হতে দৃষ্টি সরিয়ে সানজির সাথে দৃষ্টি মেলায়। অতঃপর দু'জন একসাথে রসিয়ে রসিয়ে বলে উঠে, " ওহহ আচ্ছা তাই না !! ম্যাডাম দেখছি তার নেতাসাহেবকে সামলাতে বেশ দক্ষ হয়ে গিয়েছে। ভালো ভালো।"
" আপুউ.."
" না না ঠিকই আছে। সান্নিধ্য কয়দিন পর তার বউয়ের আঁচলে ঘুরঘুর করবে দেখিস সানজি। "
" ভাবিজান আমাদেরও একটু স্বামী আঁচলে বাঁধার ট্রিকস শিখিয়ে দিন।"
" আমরাও আগ্রহী ভাবিজান প্লিজ শিখিয়ে দিন না..."
শেহরিন সবার মজা নেওয়া দেখে চাপাশ্বাস ফেলে বলে,
" তোমরা ভালো হবা না আপু বুঝেছি। শুধু শুধু আমার নেতাসাহেবকে পচানি দাও তোমরা।"
" ওরে সানজি একটু শেখ তোর ভাবিজানের থেকে। কিভাবে বরের হয়ে কথা বলতে হয় শেখ শেখ।"
" অবাক হয়ে যাচ্ছি স্বামী প্রীতি দেখে।"
" তোমরা কি করছো এখানে ?"
হালকা লাল রঙের বিড়াল প্যান্ট সঙ্গে হাতে তার বিখ্যাত ওয়াটার পট। পানি খেতে খেতে সামনের গেঞ্জি অর্ধেক ভিজে উঠেছে। সবাইকে ডিঙিয়ে মধ্যে প্রান্তে এসে দাঁড়ায় তাসিন। শেহরিনের হাতের দিকে নজর বুলিয়ে বলে," ইয়ো পানি এটা কি দিচ্ছো তুমি হাতে? "
" এটা মেহেদী বাবা। "
" কি হয় এটা দিলে? "
" হাতে সুন্দর রং হয়।"
" এই বেবি মানকি তোর মামণি কোথায় ? "
"মামণি উপরে। ফু'মণি তুমিও দিয়েছো?"
সানজি তাসিনকে কাছে আসার ইশারা করে। সবার পা মাড়িয়ে সে ফু'মণি থেকে একটা মিষ্টি চুমু গালে নিয়ে বলে," ফু'মণি এটা আমি দিবো। "
" না... না আপনার দিতে হবে না। আপনার মামণিকে ডেকে আনুন। মামণি দিবে।"
" না ইয়ো পানি দিচ্ছে আমিও দিবো।"
" আপু তাসিনকে একটু দিতে দাও.. "
" হু বাচ্চা.. বেবি মানকিকে তো চিনো না। চাঁদরাতে ভাবি ওকে হাতে একটা গোল বৃত্ত এঁকে দিয়েছিলো। মানকিটা বলে ওহহো এটাতো চিলি সস মামণি। একটু খাই? এটা বলতে বলতে হাতে চেটেছিলো.."
সানজির কথা শেষ হতে না হতেই সবাই একযোগে জোরগলায় হেসে উঠে। জারা তাসিনের গাল টেনে ধরে বলে, " আসলেই একটা বেবি মানকি তুই। মেহেদীকে চিলি সস এর মতো লাগে?"
"ওকে বল কেমন খেতে লাগে।"
"এই বাচ্চা চিলি সস কেমন লেগেছিলো রে.. "
তাসিন ঠোঁট মুখ চোখা করে। রাগী রাগী ভাব এনে বলে,"তুমি খেয়ে দেখো কেমন লাগে।"
" আমরা এসব খাই না।"
"ফু'মণি আমি দিবো.. "
" আপু প্লিজ দিতে দাও.."
সানজি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে মেহেদী আর্টিস্ট ইশারায় একটা কিছু আঁকিয়ে দিতে বলে। শেহরিন জায়গা করে দিতেই বেবি মানকি এসে বসে তার কাছে। ফর্সা ভেজা তালুতে একটা বড় করে সূর্য আঁকিয়ে দেওয়া হয় কোনমতে।
" এটা শুকানো না পর্যন্ত নষ্ট করবা না ঠিক আছে? "
" এটি কি আঁকিয়েছো তুমি? "
" এটা সূর্য।"
"সূর্য !?"
" হ্যাঁ। পছন্দ হয় নি? "
তাসিন এক দৃষ্টিতে হাতের তালুর পানে তাকিয়ে থাকে। কিছু একটা ভেবে সে চোখ গোল গোল করে বলে," সূর্য তো আকাশে থাকে আমার হাতে কেন? "
তাসিনের প্রশ্নে ফের দীর্ঘ শ্বাস ঝরে। সানজি শেহরিনের দিকে তাকিয়ে বলে,
" উত্তর দিন ভাবিজান।"
"ইয়ে.. মানে তাসিন এই সূর্যটা এমনি এমনি সূর্য। আসল সূর্যটা আকাশেই আছে। "
" ইয়ো পানি এই সূর্যটা কখন রোদ দিবে? "
শেহরিনের গ্যাঁড়াকলে ফেঁসে যাওয়ার মতো অবস্থা। আমতা আমতা স্বরে বলে, " যখন শুকিয়ে যাবে তখন ঝকঝকে রোদ উঠে যাবে।"
" কখন শুকাবে? "
" একটু পরেই শুকিয়ে যাবে।"
তাসিন নিজের মতো কিছু একটা ভেবে ফট করে সূর্য আঁকা হাতের তালুটা তার পরনে জামার সাথে মুছে ফেলে।
তার সেকেন্ডে ঘটানো কান্ড দেখে উপস্থিত সবাই এক মুহুর্তের জন্য হা হয়ে যায়। শেহরিন অবিশ্বাস্য কন্ঠে বলে উঠে, " বাবা এটা কি করলে তুমি ? "
" কি করলি তুই এটা বেবি মানকি? "
" ওহহো ফু'মণি হাতে সূর্য রোদ দিলে তো পুড়ে যাবে। আমি দিবো না এটা। তোমরাই দাও।"
ফ্লোর হতে ওয়াটার পটটা তুলে নির্বিকার ভঙ্গিতে উঠে চলে যায় সে। আশেপাশে সবাই তার দিকে অবাক চাহনি মেলে তাকালেও সেদিকে কোনো ভ্রু'ক্ষেপ নেই। মেহেদী দেওয়া হয়ে গিয়েছে তার। আর দরকার নেই। এটা তো সত্যি সূর্যে হাতের তালুতে উঠলে যদি হাত পুড়ে যায়। তখন কোথায় সে আবার হাত পাবে।
" বলেছিলাম না। এই আজব প্রাণীকে এসেবে টেনো না।"
"ভাগ্য ভালো চিলি সস হিসেবে আজকে মুখে দেয়নি।"
" তিথি ভাবি একবার দেখুক। পিঠে শিউর ভাদ্র মাসের তাল পড়বে।"
" এটা নিশ্চিত।"
সবাই যে যার মতো বেবি মানকিটার ভবিষ্যৎ বাণী করে নিজ কার্যে মনোযোগ দেয়। ড্রয়িংরুমের অপর পাশে তখনও চলছে গাঢ় আলাপন।
" শেহরিন তোমার মেহেদী হাতে এক জায়গায় সান্নিধ্যের নাম লিখো। তারপরে তাকে গিয়ে বলো খুঁজে বের করতে। যদি বের করতে পারে তাহলে ভালো আর যদি না পারে তাহলে ভীষণ রাগ করবে কেমন?"
তানিশা আপুর কথায় শেহরিন চোয়াল ঝুলায়। বিস্মিত নয়নে তাকাতেই সানজি মুখ টিপে হেসে বলে, " ভাবিজান আসুন আসুন পরে অবাক হবেন।"
শেহরিনের দু'হাত ভর্তি মেহেদীর মাঝে ইংরেজি অক্ষরে সান্নিধ্যের নাম লিখে দেওয়া হয় এক জায়গায়। তানিশা চতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, " ভালো হয়েছে মেহেদী এখনো শুকায়নি। মিশে গিয়েছে। যাও উপরে গিয়ে দেখিয়ে নিয়ে আসো এখন। জিজ্ঞেস করবে নাম খুঁজে বের করতে।"
" এটা করলে কি হয় আপু? "
"এটা করলে ভালোবাসা দ্বিগুণ হারে বাড়ে। আর যদি না পারে খুঁজে বের করতে তাহলে ভালোবাসা তরতর করে কমে যায়। "
"রিয়েলি?? "
" তোমার ভাইয়া রাতে আসলে আমিও দেখাবো। সানজিও কালকে মুহিদকে দেখাবে।"
শেহরিন সানজির দিকে তাকাতেই সানজি সুন্দর করে মাথা নাড়িয়ে সহমত জানায়। ধীর কন্ঠ ঠেলে বলে, " যাও যাও এক্ষুণি যাও।"
শেহরিন আগাপিছু না ভেবে উঠে যায় আসর হতে। দু'হাতে মেহেদী আগলে পা বাড়ায় উপরতলার উদ্দেশ্য। বিষয়টা তার কাছে অদ্ভুত লাগলেও বেশ মজার মনে হচ্ছে। কিন্তু উনি তো ঘুমাচ্ছেন ডাকবে কি করে সে? আচ্ছা একটুখানি ডেকে খুঁজে বের করিয়ে নিয়ে আবার বলবে ঘুমাতে। দু এক মিনিটেরই তো ব্যাপার।
শীততাপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে কোনমতে দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করে শেহরিন। প্রবেশ করা মাত্র সরাসরি চোখ যায় তার বিছানার উপর। নেতাসাহেব উপুড় হয়ে শুয়ে ডানদিকে মুখ করে বেশ আরামে ঘুমাচ্ছেন। এক পলক ঘড়ির কাঁটার পানে তাকিয়ে সময় পরোখ করে নেয় নাজুক রমণী। সাড়ে পাঁচটা বেজে চলেছে। এমনিতেও উঠার সময় হয়ে গিয়েছে তার। বিড়ালপায়ে সন্তপর্ণে সে তার নেতাসাহেবের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। অতঃপর হাঁটু ভেঙে বসে ধীরে ধীরে ডাকতে শুরু করে।
দু হতে তিনবার ডাকেই সান্নিধ্যের ঘুম ভেঙে যায়। কপালে হালকা ভাঁজ ফুটিয়ে চোখ খুলে তাকাতেই দেখে তার অর্ধাঙ্গিনী একদম সামনাসামনি বসে।
" সরি সরি। জাস্ট একটা মিনিট লাগবে আমার।"
শেহরিন দু-হাত সান্নিধ্যের পানে বাড়িয়ে দেয়। উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলে,
"আপনার নামটা খুঁজে বের করুন তো এক্ষুণি।"
মুখের উপর একগাদা কিছু একটা দেখতেই পুরোটা কপাল কুঁচকে আসে সান্নিধ্যের। ঘুম ঘুম কন্ঠ উগড়ে দিয়ে বলে,"এগুলো কি দিয়েছো হাতে?"
" মেহেদী দিয়েছি। উঠুন না একটু। আপনার নাম এখানে লেখা আছে খুঁজে বের করুন তো।"
" কোন হাতে লিখেছো নাম?"
" বলবো কেন? আপনি খুঁজে বের করুন।"
সান্নিধ্য শোয়া ছেড়ে মাথা খানিকটা উপরে তুলে পূর্ণ দৃষ্টি রাখে বাড়ানো হাতে। খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকতে থাকতে মুখোরেখায় তার পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। কুঁচকানো কপালের ভাঁজ একই রেখে বলে,
" কিছুই তো বোঝা যায় না। মনে হচ্ছে হাতের উপর দিয়ে আমাজন ফরেস্ট চলে গিয়েছে। এর মধ্যে নাম কোথায় খুঁজে পাবো আমি? "
শেহরিন গাল ফুলায় সান্নিধ্যের কথায়। তীক্ষ্ণ চোখ মেলে বলে,
"পাচ্ছেন না খুঁজে ?"
" এতো ভারী করে দিয়েছো কেন ? সবই তো একই মনে হচ্ছে। এগুলো কি ধরনের ডিজাইন। যে দিয়ে দিয়েছে তার মনের মধ্যে সম্ভবত অনেক প্যাঁচ।"
" বাজে কথা বলবেন না। আপু অনেক সুন্দর করে দিয়েছে। নিজে পারছেন না বের করতে এখন তার দোষ?"
সান্নিধ্য শেহরিনের দু হাতের চার পৃষ্ঠে সূক্ষ্ণ নজর রেখেও খুঁজে বের করতে সক্ষম হয় না নিজের নাম। আদৌ নাম লিখেছে কি না কে জানে। কিন্তু সেটা তো আবার বলাও যাবে না। বললেই তার মহারাণী রেগে লাল হয়ে যাবে।
" আমার মনে হয় উনি আমার নামের প্রত্যেকটা ওয়ার্ড আলাদা আলাদাভাবে লিখেছে। দ্যাটস হোয়াই খুঁজে পাচ্ছি না। এতো নকশা আঁকার কি দরকার ছিলো তাই না বলো? দুই একটা ফুল ফল আঁকলেই তো নামটা ইজিলি পেয়ে যেতাম।"
" কোথায় এতো নকশা আঁকা? "
" কম মনে হচ্ছে তোমার? হাতের তালু থেকে কনুই অব্দি উঠে গিয়েছে। আর একটু হলে গলা ছুঁইয়ে যেতো।"
শেহরিন রাগান্বিত দৃষ্টিতে সান্নিধ্যের দিকে তাকিয়ে থাকে। বারে বারে তার কানে বাজতে থাকে তানিশার আপুর সেই কথা। নাম না খুঁজে পেলে ভালোবাসা তরতর করে কমে যাবে।
সান্নিধ্য শেহরিনের দৃষ্টি দেখে হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে। এই মেয়ের যা অবস্থা আর একটু হলেই মনে হচ্ছে অতি রাগে কেঁদে ফেলবে। সোজা হয়ে বসে সে শেহরিনকে একহাতে টেনে তুলে নিজের সামনে বসায়।
" রিলাক্স রিলাক্স। কান্না করার প্রয়োজন নেই। আমি খুঁজে দেখছি।"
" ভালোবাসা তো কমে যাচ্ছে। "
সান্নিধ্য হাত হতে চোখ তুলে শান্ত কন্ঠে বলে,
"কি কমে যাচ্ছে? "
" ভালোবাসা। "
" ভালোবাসা কমে যাচ্ছে কিভাবে? "
" তানিশা আপু বলেছে যদি আপনি আমার নাম না খুঁজে পান তাহলে আমাদের ভালোবাসা তরতর করে কমে যাবে।"
এতোক্ষণে আসল কারণ জানতে পেরে সান্নিধ্য ধীর গতিতে চাপা নিঃশ্বাস ছাড়ে। এই কাজিন সম্প্রদয়গুলো খুবই বিপদজনক। বিশেষ করে তার জন্য। নিজেদের মধ্যে সামান্য দূরত্বটুকু ঘুচিয়ে সে তার অবলা কান্তার চোখ মুখে ছেয়ে থাকা চুলগুলো আলতো হাতে সরিয়ে দিয়ে বলে, " তুমি ছোট মানুষ তাই বুঝতে পারোনি। এগুলো উদ্ভট কথা ওদের। স্রেফ মজা নেওয়ার জন্য বলেছে। এরকম কিছুই হয় না।"
" কিন্তু সানজি আপুও তো.."
" আচ্ছা তুমি আগে বের করে দেখাও আমার নাম।"
শেহরিন ডান হাতের তালুর একদম নিচ বরাবর উঁচু করে ধরে। সান্নিধ্যের নামের প্রত্যেকটা বানান এমনভাবে পেঁচিয়ে লতাপাতার মধ্যে গিয়ে লিখেছে যে স্বাভাবিক চোখে ধরাটা একটু কষ্ট সাধ্য।
" এটা ইচ্ছেকৃতভাবে ওরা করেছে। সানজি জানে আমি পারবো না এজন্য তোমাকে পাঠিয়েছে প্ল্যান করে। সেই সাথে এসব উল্টাপাল্টা বুঝিয়েছে।"
" সত্যি বলছেন? "
" তুমি সাইন্সের স্টুডেন্ট হয়ে এসব বিলিভ করো?"
" কিন্তু প্রেম ভালোবাসা তো ফিলোসোফি মানে বেশি। আমি ফিলোসোফি একটু কমই বুঝি।"
" ওসব বুঝতে হবে না। আর ওরা আমাকে নিয়ে তোমাকে কিছু বললে তুমি সেটা শুনবে না। ঠিক আছে? "
শেহরিন নির্নিমেষ চাহনিতে তাকিয়ে বলে," ঠিক আছে।তবুও আপনি পারেননি এতো সহজ একটা বিষয়।"
" আমার কাছে ভীষণ কঠিন লাগছে। লাইফে ফার্স্ট টাইম হাতে আঁকা আমাজন ফরেস্ট দেখছি। নামটাও তো ঠিকভাবে লেখেনি।"
" হুহ অযুহাত।"
সান্নিধ্য শেহরিনের মুখ বাঁকানো দেখে হেসে ফেলে। শীতল চাহনিতে অর্ধাঙ্গিনীর ক্ষীণ অভিমান মাখা মুখে দেখে সে এগিয়ে নাকের ডগায় চুমু দিয়ে বলে, " ওদের গিয়ে বলবে ভালোবাসা এতো উঁচুতে উঠে গিয়েছে যে আর কিছুদিন পর বিপদসীমা পার করে ফেলবে।"
শেহরিন তার প্রিয় পুরুষের ছোঁয়াতে সমস্ত রাগ অভিমান ধুয়ে মুছে উঠে দাঁড়ায়। ইশ্ কি বোকা সে। তানিশা আপুদের কথা অকপটে বিশ্বাস করে নিয়েছিলো। এক চিলতে নরম হাসি হেসে আবারো নিচে চলে যেতেই সান্নিধ্য আশেপাশে হতে ফোনটা খুঁজে বের করে। অতঃপর কল লাগায় সানজিকে ।
দু'হাতে মেহেদী পড়া সানজিকে ফোন কানে ধরতে সাহায্য করে জারা। সানজি সান্নিধ্যের কল করা দেখে বুঝতে পারে কেনো কল করেছে এমপি সাহেব।
" হ্যালো।"
" শেহরিনকে এসব কি উল্টা পাল্টা বুঝিয়েছিস? "
" উল্টা পাল্টা মানে? কবে? কখন? কি বলছিস তুই।"
"আমি নিচে এসে কি বুঝাবো?"
" কি দরকার শুধু শুধু কষ্ট করার। বাচ্চা মেয়ে বলেছি এক, বুঝেছে হয়তো আরেক। জামাই সাহেব এর কাছে গিয়ে আবার নালিশ করে এসেছে। গুজবে কান দিতে নেই ভাইয়া। তুই ঘুমা বরং। তোর বউকে আমরা দেখে নিচ্ছি।"
" আমার সামনে আমার বউকে হুমকি দিস। তোর বিয়ে আরো দুই সপ্তাহ পরে কনফার্ম করছি ওয়েট। "
সানজি অনুযোগের সুর তুলে বলে, " গুন্ডা মাস্তান মাফিয়া ডন ভিলেন খ্যাত নেতা এর বউকে কি আমি হুমকি দিতে পারি? ছিঃছিঃ এটা ভাবলেন কি করে এমপি সাহেব? "
" অভিনয় কম কর। আর হাতে এসব আমাজনের ফরেস্ট আঁকবি না।"
" কি আঁকবো তাহলে? "
সান্নিধ্য বিছানা ছেড়ে উঠে কাবার্ড হতে শার্ট বের করতে করতে স্থির গলায় বলে,
" সাহারা মরুভূমি আঁকবি। কয়েক ফুট দূরে দূরে একটা করে গাছ থাকবে শুধু।"