রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি

পর্ব - ৩৬

🟢

"যদি মনে করিস এই ছেলেই তোর জীবনের সবকিছু, যার দেওয়া ধোঁকা তুই সহ্য করতে পারবি না, অগোচরে নিজের ক্ষতি করার চেষ্টা করবি,নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবি তাহলে আমার কিছুই বলার থাকবে না। আর যদি ধোঁকা এবং সত্যিকারে ভালোবাসার মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারিস। যে ধোঁকা দিয়েছে তোকে তাকে ঘৃণা করতে পারিস, তার জন্য নিজের জীবন বিসর্জিত না করিস তাহলে ভাইদের ডাকিস। সবসময় আছি।"

সানজির চোখের নিরব অশ্রুধারা প্রবাহমান নদীর মতো বেয়ে যায়। কাজল লেপটে কালো হয়ে গিয়েছে চোখের কোণজুড়ে। স্তব্ধ মূর্তি সে। সান্নিধ্যের বলা কথাগুলো তার মস্তিষ্কে বিচরণ করে ঠিকই কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারে না কিছু। তার কাছে এখনও মনে হচ্ছে সবকিছু দুঃস্বপ্নের ন্যায় ঘিরে আছে। ঘুম ভাঙলেই হয়তো সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে৷ মুহিদ নিশ্চয়ই আসবে। কেন আসবে না। মুহিদ তো তাকে কথা দিয়েছে। মুহিদ নিজেই তো বিয়ের জন্য পাগল হয়েছিলো। কত কি করে তাকে রাজি করিয়েছে সবাইকে। তাহলে আজ কেন সে ধোঁকা দিবে? কোন নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে? কেন মাঝ সমুদ্রে ফেলে দিবে? তবে কি সে ভালোবাসেনি সানজিকে? পুরোটাই কি অভিনয় ছিলো?

"কষ্ট পা, কান্না কর। কিন্তু সেটা নির্ধারিত সময়ের জন্য। দীর্ঘস্থায়ী করিস না। কারণ তোর চোখের পানিতে যে ধোঁকা দিয়েছে তার কিছুই আসবে যাবে না। সে রিলাক্স মুডে সবকিছু ইনজয় করবে। তুই যদি নিজেকে ভেঙে ফেলিস তাহলে বুঝবো তোর সাথে একজন বিশ্বাস ঘাতকতা করেছে আর তুই সেটা সমর্থন করছিস। একজন প্রতারকের জন্য আফসোস করছিস।"

"আমি তো ভালোবেসেছিলাম..। "

" মুখোশধারী ছিলো। ভালোবাসা ভুলে যা। তোর ভালোবাসার মূল্য অনেক বেশি। এসব ফ্রডদের জন্য না। মূল্যহীন বস্তুকে কেনো দামি হিসেবে মূল্যায়ন করবি? "

" মানুষ এতো ভয়ংকর ভাইয়া? মানুষ এতো বহুরুপী। আমি তো বিশ্বাস করতে পারছি না। মুহিদ..মুহিদ আমাকে ঠকিয়ে চলে গিয়েছে। কেন করলো এরকম ভাইয়া? আমার সাথে তো ওর কোনো দ্বন্দ্ব ছিলো না। ভালোবেসে আবার এভাবে ছুঁড়ে ফেলে গেলো?"

সরফরাজ এগিয়ে এসে বোনের মাথায় হাত রাখে। নিরব কন্ঠস্বর ভেদ করে বলে, " অভিনয় বলতে একটা শব্দ আছে ভুলে যাস না। মানুষকেই বলা হয় অভিনেতা। শুধু পর্দার জীবনেই মানুষ অভিনয় করে না, বাস্তব জীবনেও করে। যাদের কাছে ভালোবাসা শব্দটার কোনো গুরুত্ব নেই তারা মুহিদ হয়। মানুষ ঠকাতে, মন ভাঙতে এদের বিশেষ কোনো কারণ লাগে না। কষ্ট পাবি তাদের জন্য?"

ড্রয়িংরুম জুড়ে ভয়াবহ নিস্তব্ধতা। পারিবারিক আত্মীয় স্বজন আর বাহিরের নিকটস্থ কিছু পরিচিত গেস্ট ছাড়া সবাই প্রায় চলে গিয়েছে। একপ্রকার ছিঃ ছিঃ রব তুলেই প্রস্থান নিয়েছে সবাই। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এতো প্রভাবশালী ব্যক্তির মেয়ের সঙ্গে যে ঘটবে তা যেন ঘুণাক্ষরেও কেউ ভাবতে পারেনি। দোষ গুণের বিচার বিশ্লেষণ করতে করতে সবাই সুখনিবাস ছেড়েছে।

রাত তখন সাড়ে দশটা। মুহিদের বাবা মা সহ বরপক্ষের সকল আত্মীয় স্বজন লজ্জায় কুন্ঠিত হয়ে বিদায় নেয়। তাদের ছেলে যে অগোচরে এমন বিষাক্ত ছক কষে এসেছে এটা তাদের জানার বর্হিভূত ছিলো। অথচ ছেলে নিজে তাদেরকেও বিয়ের জন্য চাপ দিয়েছে। এক প্রকার বাধ্য হয়েই এতো তাড়াতাড়ি আকদের আয়োজন করা হয়েছিলো। আর সেই ছেলেই কি না সবার মাথা হেট করে দিয়ে সিঙ্গাপুর চলে গেলো?

সানজি অসহায়ের মতো চারদিকটা তাকিয়ে দেখে। ভিতরটা তার খাঁ খাঁ করছে। কান্নাগুলো দলা পাকিয়ে গলায় আটকে আছে। সে নিজেকে যে কিভাবে দাঁড় করিয়ে রেখেছে সবার মাঝে নিজেরও অজানা। অথচ সমস্ত শরীর তার টালমাটাল হয়ে কাঁপছে। সে স্বপ্ন দেখছে না, না কিছু ভ্রম। সব সত্য। সবকিছু সত্য। মুহিদ তাকে ঠকিয়ে অনেকদূরে পাড়ি জমিয়েছে। ঠকে যাওয়ার কষ্ট এতোটা কেন প্রখর? বুকের ভিতরে ছিন্নভিন্ন করে তুলছে যে।

" বউমা সানজিকে উপরে নিয়ে যাও। এসব নিয়ে আর কথা বাড়াতে চাই না। আজকের মতো এখানেই শেষ হোক। তবে আমার মেয়েকে যে ব্যক্তি এভাবে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিয়েছে তার জবাবদিহিতা আমি নিবোই।"

শেহরিন তিথি দু'জনে ধীর পায়ে সানজির কাছে এসে দাঁড়ায়। বিমর্ষ কায়াকে নিজ কক্ষে নিয়ে যেতে উদ্যত হলে সানজি অনড়চিত্তে দাঁড়ানো সান্নিধ্যের সামনে এসে দাঁড়ায়। চোখের জলকে উপেক্ষা করে কাঁপা কন্ঠস্বরে বলে, "আমি চাই না যে আমাকে ঠকিয়েছে তার নৃশংস মৃত্যুর কারণ তুই হ ভাইয়া। আমি চাই না সে আমার হতে কোন শাস্তি পাক। সে যদি আমাকে ঠকিয়ে জিতে যেতে চায় তাহলে আমি হারতে রাজি আছি। অন্যায়কারীর বড় শাস্তি তার করা অন্যায়। এই অন্যায়ই একদিন তাকে বাজেভাবে ঠকাবে। সৃষ্টিকর্তা যেনো আমাকে সেই দিন দেখার মতো সৌভাগ্য দেয়।"

কতকগুলো মানুষকে নিরুত্তর করে দিয়ে শেহরিন তিথির সাহায্য সানজি উপরে চলে যায়। বিধ্বস্ত তার রূপ, বিধ্বস্ত তার মন। সদ্য ভালোবাসায় গড়া সুন্দর একটা স্বপ্ন তৈরি করেছিলো সে। কত আশা, কত আকাঙ্ক্ষায় মাখা ছিলো সবকিছু। নতুন সংসার, নতুন জীবনে পা রাখার আনন্দ সব ধূলিসাৎ করে দিয়ে লোকটা এইভাবে তাকে ফেলে চলে গেলো?

" কি ব্যাপার নাজনীন। কোনো সমস্যা হয়েছে কি? বাইরে মানুষজন কি সব বলাবলি করছে। সব ঠিকঠাক আছে তো? সরি সরি। আমাদের আসতে একটু দেরি হয়ে গেলো।"

তাল কেটে ছন্দহারা হয়ে যাওয়া এক মুহূর্তে হঠাৎ আগমন ঘটে রাজ্জাক সাহেব মিসেস নীলা এবং অন্বেষার। বাসার অভ্যন্তরে প্রবেশ করতেই সবার স্তব্ধ চেহারা দেখে তারা একে অপরে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। বড়মামা এগিয়ে এসে করুণ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলেন, " একটা দূর্ঘটনা ঘটে গিয়েছে রাজ্জাক। আমার ভাগ্নীটার বিয়ে ভেঙে গিয়েছে।"

" কি বলছো ভাইজান? কিভাবে? দুলাভাই কি হয়েছে?"

মিসেস নীলা সোফায় বিমূঢ় হয়ে বসা থাকা মিসেস নাজনীনের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। বিস্মিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,

"আপা ভাইজান এসব কি বলছে? সানজির বিয়ে ভেঙে গিয়েছে মানে?"

" ঠিকই শুনেছো।"

" কিন্তু কেন?"

" জানি না আমি নীলা। আমার মেয়েটার কপালটাই হয়তো খারাপ।"

মিসেস নাজনীন হুট করে দু'হাতে মুখ ঢেকে কান্নায় মুষড়ে পড়েন। পুরো ড্রয়িং রুম জুড়ে এক চাপা আর্তনাদিত সুর বেজে ওঠে। নির্বাক সবাই। সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা যেনো হারিয়ে ফেলেছে।

"ফুপি প্লিজ কান্না করো না। তুমি কান্না করলে আমাদের কি ভালো লাগে বলো? প্লিজ কান্না করো না। বিয়ে ভেঙেছে তো কি হয়েছে? বিয়ে হয়ে তো আর ভাঙেনি। সব ঠিক হয়ে যাবে দেখো।"

অন্বেষা মিসেস নাজনীনের কাছে এসে হাঁটু মুড়ে বসে। দু'হাতে আগলে নিয়ে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করতে থাকে নানান কথা বলে। সযত্নে চোখের জল মুছিয়ে দিতে দিতে বলে,

" তুমি কান্না করলে সানজি আরো কষ্ট পাবে ফুপি। নিজেকে শক্ত করো প্লিজ।"

" আমাদের অন্বেষা কত পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে । ড্রেসআপেও কত পরিবর্তন এসেছে। কি সুন্দর বুঝদারের মতো কথা বলছে দেখো।"

" সেটাই তো দেখছি। ইশ্ এই পরিবর্তনটা আর একটু আগে হলে নিশ্চিত সান্নিধ্যের বউ হয়ে এ বাড়িতে আসতে পারতো।"

সান্নিধ্যের দুই মামির অন্বেষাকে নিয়ে ফিসফিসানো কথাবার্তা কর্ণ এড়ায় না মিসেস নীলার। আশেপাশে পরিস্থিতি অবলোকন করে সে ধীর পায়ে তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলে,"আমার মেয়ে হাজারে একটা আপা। আগেই বলেছিলাম একদিন ঠিক বুঝতে পারবেন। আজ দেখছেন তো? তা এ বাড়ির ছোট বউ কোথায়? তার বুঝি এসবে কিছুই যায় আসে না?"

"এখানে আমাদের চাওয়া না চাওয়ার কি আছে নীলা। সান্নিধ্যের জীবন সঙ্গী হিসেবে যাকে ভালো লাগবে তাকেই বিয়ে করবে। তবে শেহরিন মেয়েটা খারাপ নয়। বউ হিসেবে যথেষ্ট ভালো আছে। বেশ মিশুক। এমপির বউ হয়ে বিন্দুমাত্র অহংকার নেই।"

" তবে সত্যি কথা বলতে আমার শেহরিনের চেয়ে অন্বেষাকেই বেশি পছন্দ ছিলো ভাবি। খারাপ বলছি না তবে চেয়েছিলাম নিজেদের মধ্যেই কেউ একজন বউ হয়ে আসুক।"

মিসেস নীলা সান্নিধ্যের ছোট মামির কথায় কিছুটা প্রশয় পায়। লম্বা করে দীর্ঘ শ্বাস টেনে বলে,

" কথাটা বললে হয়তো খারাপ শোনাবে, নাজনীন আপা আর ভাইজান আমাদের সাথে যে অন্যায়টা করেছে দেখুন নিজেদের মেয়ের সঙ্গে সেটাই ঘটলো।"

" অন্যায়ের কি আছে নীলা। এভাবে বলছো কেন? তারা তো কম চেষ্টা করেনি। এখন সান্নিধ্য যদি বিয়ে করতে নাই চায় তুমি কি জোর করে ধরে বেঁধে বিয়ে দিতে পারবে?"

" চাইলে সবকিছু হয় বড় আপা। আপনি শেহরিনের প্রতি হয়তো আসক্ত এইজন্য তার পক্ষ নিয়ে কথা বলছেন।"

" আমি কারোই পক্ষ নিয়ে কথা বলছি না। অন্বেষাকে আজ যেমন দেখছি এই দেখাটা যদি আগে দেখতাম নিশ্চয়ই আমিও চাইতাম সান্নিধ্যের সঙ্গে ওর বিয়ে হোক। আর যা হয়ে গিয়েছে তো গিয়েছেই আর তো বলে লাভ নেই। এসব কথা ছাড়ো এখন।"

মিসেস নাজনীনকে বেশ খানিকক্ষণ বুঝিয়ে অন্বেষা উঠে আসে। লোকজন ভর্তি বিস্তর ড্রয়িংরুমের এক পাশে দাঁড়াতে হুট করে তার নাকে ভেসে এসে তীব্র পারফিউমের সুগন্ধ। পাশ ঘুরে তাকাতেই দেখতে পায় কালো শার্ট প্যান্ট পরিধানে চকচকে এক পুরুষকে। গেটআপেই যার উচ্চ আভিজাত্য প্রকাশ পাচ্ছে। মাঝখানে স্বল্প খানিকের দূরত্ব মিটিয়ে লোকচক্ষুর আড়ালে কন্ঠ নামিয়ে বলে,

" এতো সুন্দর করে কথা বলেন কিভাবে আপনি? আমি তো আপনার কথা শুনে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছি। নামটা জানতে পারি?"

"ফ্লার্ট করছেন?"

" মোটেই না। আমি সুন্দরীদের সঙ্গে ফ্লার্ট করতে পারি না। হয় না আমাকে দ্বারা।"

" আমি তো দিব্যি বুঝতে পারছি আপনি আমার সঙ্গে ফ্লার্ট করছেন।"

জেল সাটানো চুল গুলোর মাঝে হালকা হাত বুলিয়ে পকেটে হাত ঢুকিয়ে নেয় মানবটি। ঠোঁটে সামান্য হাসি ঝুলিয়ে বলে,

"ফ্লার্ট করে যদি আপনার সঙ্গে পরিচিত হতে পারি তাহলে আমি ফ্লার্টই করতে চাই।"

" হঠাৎ এতো আগ্রহ কেন হলো?"

" আপনাকে দেখে আগ্রহ সৃষ্টি হলে আমার কি দোষ ম্যাডাম?"

অন্বেষা বাঁকা চোখে তাকিয়ে দেখতে থাকে মানবটিকে। পোশাক পরিচ্ছদ সহ সম্পূর্ণ গেটআপে বড়লোকি ছোঁয়া। সন্দেহী কন্ঠে জিজ্ঞেস করে, " সান্নিধ্যের ফ্রেন্ড আপনি?"

" সরি, সান্নিধ্যের ফ্রেন্ড কেন হবো আমি? "

" তাহলে? "

" আমার বাবা আর সান্নিধ্যের বাবা বিজনেস পার্টনার। সান্নিধ্যের সাথে আমার কোনো যোগসূত্র নেই। তার ভাইয়ের সঙ্গে ব্যবসায়িক কাজ আছে।"

" বিজনেসম্যান?"

" ইয়েস। চট্টগ্রামের মধ্যে আমাদের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো টপে।"

" গ্রেট।"

" পরিচিত হতে পারি কি?"

অন্বেষা ঠোঁট কামড়ে নিরব হেসে বলে, " ওকে হতেই পারি।"

" থ্যাংকস ম্যাডাম। রাহাদ চৌধুরী।"

" অন্বেষা আদ্রি।"

" প্রিটি লেডির নামটাও প্রিটি।"

" ভালো হাওয়া দিতে পারেন দেখছি। বাট আপনিও কিন্তু বেশ হ্যান্ডসাম।

" ওয়াও। সুন্দরীর হতে প্রশংসা পেলাম। বাই দ্যা ওয়ে, এখানে পরিবেশটা একটু অন্যরকম। আই মিন একটু ডিফিকাল্ট। আহ্.. ইফ ইউ ডো'ন্ট মাইন্ড, ক্যান উই গো আউটসাইড এন্ড সিট সাম হোয়ার? "

" বাহিরে মিনস্?"

" উম গার্ডেনে? যদি আপনার কোনো সমস্যা না থাকে। সমস্যা হলে ইট’স ওকে।"

অন্বেষা আশেপাশে নজর বুলিয়ে সান্নিধ্যের দিকে দৃষ্টি স্থির করে। তীক্ষ্ণ চাহনিতে সে পর্যবেক্ষণ করে কিয়ৎক্ষণ । নেতাসাহেব চুপচাপ সোফায় বসে ফোনে মগ্ন হয়ে আছে। মুখোয়ব দেখে মনে হচ্ছে আশেপাশে কোনো বিষয়ে তার কোনো ধ্যান ধারণা নেই। সে ব্যস্ত তার কর্মে।

অন্বেষা দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেয়। মুখে স্বতঃস্ফূর্ত হাসি বজায় রেখে বলে,

" ওকে..লেট'স গো।"

রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি বাংলা গল্প pdf সাহিত্য

" আমি একটু একা থাকতে চাই প্লিজ।"

সানজির নিরস কন্ঠের অনুরোধে শেহরিন তিথি পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় করে। অতঃপর মুখে জোরপূর্বক হাসি টেনে বলে,

" ঠিক আছে। তবে কোনো সমস্যা হলে জানাবে কেমন। আমরা নিচেই আছি।"

তিথি বের হয়ে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলে শেহরিন সন্তপর্ণে সানজির চোখের কোণে জমে থাকা জলগুলো মুছে দিতে দিতে বলে," যে হৃদয়টা তোমার ভেঙেছে সেটার যত্ন নাও আপু। তোমার ক্ষত তোমাকেই সাড়াতে হবে। আমরা কোনো সান্ত্বনা দিবো না। দুঃসময়ে সান্ত্বনা নেওয়ার ক্ষমতা থাকে না। নিজেকেই নিজের দেখভাল করতে হয়। তুমি তো কোনো অন্যায় করোনি। তাই অনুরোধ করবো নিজেকে বিনা কারণে শাস্তি দিবে না। আশা করি তুমি তোমার মায়া করবে। একজন প্রতারকের মায়ায় নিজের ক্ষতি করবে না।"

সানজি ঠোঁটে ঠোঁট চেপে মাথা নিচু করে নিজের কান্না নিবারণ করে। আলতোভাবে মাথা নেড়ে সায় জানাতেই শেহরিন এক পলক চেয়ে চুপচাপ বের হয়ে দরজা চাপিয়ে দেয়।

দু কদম এগোতেই হুট করে মুখ ফুটে অস্ফুটস্বরে কান্নার আওয়াজে পায়ের গতি থেমে যায় শেহরিন তিথির। স্পষ্ট অনুধাবন করতে পারে সানজি কান্না করছে। তিথি ফের সানজির কক্ষের অভিমুখে যেতেই শেহরিন বাঁধ সাধে। নমনীয় কন্ঠে বলে, " ভাবি প্লিজ যাবেন না।"

" যাবো না মানে। সানজি কান্না করছে।"

" কান্না করাটা খুব স্বাভাবিক ভাবি। বলে কয়ে আমরা কতক্ষণ আটকিয়ে রাখবো? কান্না করে না হয় ভিতরটা ঝেড়ে ফেলুক। কষ্টগুলো বের করে দিক। ভিতরে চেপে রাখলে আরো বেশি কষ্ট পাবে। আমরা তার চেয়ে বরং খেয়ালে রাখি আপু যেনো নিজের ক্ষতি না করে কোনো।"

" জানি না কি হচ্ছে এসব। আর ভালো লাগছে না আমার। আচ্ছা সানজি তো তোমাকে বলেছিলো মুহিদের কথা। শুনলাম দেখাও করেছো । তুমি এতো বুদ্ধিমতি মেয়ে। বুঝতে পারোনি? "

" দুই ঘন্টার আলাপচারিতায় আমি যদি আপনার সাথে হাসিখুশি ভাবে কথা বলি আপনি কি আমার ভিতরটা ধরতে পারবেন ভাবি?"

" পারবো না ঠিক। বাট পরিচয়টা তো আগেই থেকেই তোমাদের।"

শেহরিন শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে নমুজ স্বরে বলে, " আমার সাথে আলাপচারিতা হয়নি। আমাকে শুধু জানিয়েছিলো আপু।"

" তুমি ভুল করেছো শেহরিন। তোমার উচিত ছিলো সান্নিধ্য বা সরফরাজ কে আগেই জানানো। ওরা আগে থেকে জানলে আরো ভালোভাবে খোঁজ নিতে পারতো মুহিদের সম্পর্কে। সানজির বারণ তোমার শুনতে হবে কেন?"

" আপু যদি বয়সে আমার ছোট হতো তাহলে এটা মানাতো ভাবি। শাসন শব্দটা ব্যবহার করা যেতো। কিন্তু আপু আমার বড়। আমি কিভাবে তার পার্সোনাল বিষয় পারমিশন ছাড়া জানাই সবাইকে?"

" সান্নিধ্যেকে জানালে ক্ষতি কি হতো?"

বিজ্ঞাপন

" সানজি আপুর যথেষ্ট ভালো বন্ডিং উনার সাথে, সরফরাজ ভাইয়ার সাথে। সানজি আপু যদি প্রয়োজনবোধ করতো নিশ্চয় সে নিজেই জানাতো। আমার বলতে হতো না। এখন সে যদি না চায় আমার এখানে ইন্টারফেয়ার করাটা দৃষ্টিকটু ভাবি।"

তিথি অন্ধকার মুখে চাপাশ্বাসে ফেলে। তিক্ত সুরে বলে," সব জায়গায় এতো কার্টেসি মানার ফল দেখতেই পাচ্ছি। কিছু বলার নেই আমার আর। এসব অশান্তিও আর ভালো লাগে না। বাহিরে বের হওয়াটাই এখন কঠিন হয়ে পড়বে যা পরিস্থিতি। পুরো চট্টগ্রাম জানাজানি হয়ে গিয়েছে। মান সম্মান আর কিছু থাকলো না। মুখ দেখানো কঠিন হয়ে পড়বে।"

শেহরিন চুপচাপ তিথির বিরক্তি স্বরে কথা শুনে যায়। প্রতিত্তুর দেওয়ার ইচ্ছা জাগ্রত হয় না। মানুষের সমালোচনার চেয়ে সানজি আপুর কষ্টটা আসল তার কাছে। লোকে কথা বলবেই, কথা শুনাবেই। কে কি বললো সেটা নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করাটাই বরং বোকামির।

তিথি বিরসমুখে চলে যায় হনহনিয়ে। শেহরিন এক পলক সানজির দরজা পানে চেয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। চোখের পলকে তাসের ঘরের ন্যায় সবকিছু কেমন ঝুরঝুর করে ভেঙে গেলো। এইতো সেদিন শপিংমলে মুহিদের সঙ্গে দেখা করলো তারা। একসাথে সবাই মিলে সময় কাটালো। গল্প গুজব হাসি আড্ডয় মাতোয়ারা হয়েছিলো। সানজি আপুর প্রতি কি নিরন্তর ভালোবাসা ছিলো তার। ঘুনাক্ষরেও বোঝার উপায় ছিলো না এগুলো মিথ্যা নাটক। মানুষটার অন্তর এতোটা কালো ছিলো? এতোটা নিকৃষ্ট ছিলো যে একজন মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়ে ভালোবাসার অভিনয় করে এভাবে চুরমার করে দিয়ে গেলো? বুক কাঁপলো না, বিবেকে বাধলো না?

সানজির কান্না শেহরিনের অন্তরে বিদ্ধ করে যায়। চোখ বন্ধ করে সে নিরবে অশ্রু বিসর্জন দেয়। বুকের ভিতরে ভাংচুর হচ্ছে। এই হাসিখুশি সুন্দর মনের মানবীটি কেন কষ্ট পেলো? কেনো পাহাড়সম দুঃখ এসে তার উপরে ভর করে বসলো? কেন ভালোবাসার মতো সুন্দর একটা অনুভূতির কাছে সে ঠকে গেলো। আর কি কখনো সে ভালোবাসার প্রতি বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারবে?

"যদি ভুল না করি তুমিই বোধহয় সান্নিধ্যের বউ তাই না?"

পিছন হতে ভারী পুরুষালি কন্ঠস্বর কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই শেহরিন চোখ খুলে ফেলে ৷ বা হাতের পৃষ্ঠে চোখ মুছে তড়িৎহাতে মাথায় শাড়ির আঁচল টেনে নেয়। পিছু ঘুরে তাকাতেই এক অচেনা মধ্যেবয়স্ক ব্যক্তিকে এই সময় উপরতলায় দেখে কিছুটা অবাক হলেও ধীর কন্ঠে প্রতিত্তুর দেয়, "জ্বি।"

রাদিন সাহেব নিশ্চিত হতেই মুখে যৎকিঞ্চিত হাসি টেনে এগিয়ে আসেন। শেহরিনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে স্থির চক্ষুরেখায় এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেন,"আমি সান্নিধ্যের মামা হই সম্পর্কে। আই মিন অন্বেষার চাচ্চু।"

" ওহহ আচ্ছা।"

" শেহরিন নাম তাই না? "

"জ্বি।"

" চুয়েটে পড়ছো?"

" জ্বি।"

" তোমার সম্পর্কে শুনেছি বেশ। দেখার ইচ্ছে ছিলো কে সে ভাগ্যবতী যে আমার ভাতিজির জায়গা দখল করে নিয়েছে। সানজির বিয়ে উপলক্ষে সেই সুযোগটা আজকে হয়ে গেলো। বিয়ে না হলে কি তোমাকে দেখার ইচ্ছেটা তো পূরণ হলো এই অনেক।"

রাদিন সাহেবের চোখের দৃষ্টি শেহরিনের পুরো শরীর বুলিয়ে আসে। লাল খয়েরি রঙের শাড়ীতে শুভ্র ফুল প্রস্ফুটিত হওয়ার মতো নজর কাড়ে তার। শেহরিনের নিরুত্তর ভাব দেখে ঠোঁটের কোণে বক্র হাসি ঝুলিয়ে ফের বলে,

" এতো আদব মানতে হবে না বউমা। দূর সম্পর্কের মামা হই তোমার। মাথা থেকে আঁচল নামাতে পারো। শাড়ীতে তোমাকে বেশ লাগছে।"

বিষন্ন পরিবেশে অরুচিকর কথা শুনতেই শেহরিনের মুখোভঙ্গি বদলে যায়। কপালের রেখাগুলো দৃশ্যমান হয়ে উঠে তার সঙ্গে সঙ্গে। কন্ঠ শক্ত করে বলে, "আপনি দূর সম্পর্কের মামা হন আর যেই হন বয়সে আমার বাবার সমান। আপনাকে সম্মান দেওয়াটা আমার কর্তব্য। আশা করি আপনি সেই মানটা বজায় রেখে কথা বলবেন।"

" অবশ্যই অবশ্যই মান তো রাখবোই । তবে প্লিজ বাবার বয়সী বলো না। আমি এসব নিতে পারিনা। তোমার বডি ফিটনেসটা কিন্তু অনেক সুন্দর।"

" আংকেল আপনার ভাতিজি অন্বেষা না? অন্বেষা কিন্তু আমার বড়। সম্পর্কে আপু হয়। অন্বেষা আপু এসেছে কি?"

রাদিন সাহেব ক্রুর হাসি হাসেন। দু'হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে শেহরিনের দিকে ঝুঁকে বলেন," সান্নিধ্যের মতোই দেখছি শেয়ানা মেয়ে তুমি। কিভাবে কথার বাঁক পরিবর্তন করে ফেলো। ঘুঘু টাইপের আর কি। যাই হোক, কথা না বাড়িয়ে একটা দারুণ প্রস্তাব দেই তোমাকে?"

" আমার কাজ আছে আংকেল। আমি শুনতে ইচ্ছুক নয়।"

শেহরিন পাশ কাটিয়ে চলে যেতে উদ্যত হলেই রাদিন সাহেব পথ রোধ করেন। দু এক কদম করে এগিয়ে আসতে শুরু করলে শেহরিন তটস্থ ভঙ্গিতে পিছাতে থাকে। লোভাতুর দৃষ্টিতে ছেয়ে থাকা মুখোরেখা দেখে মনে ভয় এসে জেঁকে ধরে।

" ওয়েট করো একটু। এতো ব্যস্ততা কিসে? দারুণ একটা প্রস্তাব। শুনলে তুমিও খুশি হয়ে যাবে। চট্টগ্রামের ওডিআই বার ক্লাব চেনো নিশ্চয়ই?ওটা কিন্তু আমার। প্রত্যেক দিন গভীর রাতে তোমার মতো সুন্দরী নারীদের ভীড় জমে সেখানে। ভরপুর আড্ডা, নাচানাচি, মজা হয়। চিল মুডে আমরা ইনজয় করি। তুমি যদি সেখানে যাও তাহলে কিন্তু একদম জমে যাবে। ইনজয় না করলে কিসের লাইফ হলো? এসব সাংসারিক ঝামেলা মাথা হতে নামিয়ে ফেলো। সান্নিধ্যেকে ম্যানেজ করার দায়িত্ব আমার। তুমি শুধু রাজি হও।"

শেহরিনের চোখ মুখ ঘৃণায় উল্টে আসে কথাগুলো শুনে। চোয়াল শক্ত করে পিছু হাঁটা থামিয়ে সে দাঁড়িয়ে পড়ে। তাচ্ছিল্যে মাখা কন্ঠ উন্মুক্ত করে বলে,

"আপনার কুরুচিপূর্ণ প্রস্তাব দেওয়া শেষ হয়েছে? এবার একটা ভালো কথা বলি শুনবেন দয়া করে। চারিত্রিক নৈতিকতা অনেক বড় একটা গুণ । যেটা না থাকলে মানুষকে পশুর সমান তুলনা করা হয়। আমি অনুরোধ করবো, এই বয়সে এসে মেয়ের বয়সী কোনো মেয়ের দিকে এভাবে বাজে দৃষ্টিতে তাকাবেন না। এই সব নোংরা কথা বলবেন না। যদিও এই মুহুর্তে আপনাকে আমার কাছে পশুর মতো লাগছে। মনে হচ্ছে আপনার শিক্ষা দরকার।"

" কুল কুল.. এসব নীতি নৈতিকতার কথা ছাড়ো। এন্টারটেইনমেন্ট ছাড়া কিসের লাইফ? এক রাতেই সাড়ে তিন কোটি টাকা গিফট পাবে।"

" সান্নিধ্য যদি জানে আপনার জবান টেনে ছিঁড়বে বলে দিলাম।"

শেহরিন ক্রুব্ধ নয়নে তাকিয়ে নিজের ভিতরে সাহসে জোগায়। সামনে দাঁড়ানো উচ্ছিষ্টের ন্যায় ব্যক্তিকে ফের উপেক্ষা করে সামনে পা বাড়াতেই পিছন হতে তার শাড়ীর আঁচল টেনে ধরে লোকটি।

থমকে দাঁড়ায় সে। শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে যায় মুহুর্তেই। মুখ হতে বের হয় অস্ফুটস্বরে ভয়ার্ত আওয়াজ। বিস্ফোরিত নেত্রে পিছনে তাকানোর ঠিক আগেই সিঁড়ির সম্মুখে দাঁড়ানো নেতাসাহেবকে হঠাৎ দেখতে পায় সে।

রাদিন সাহেব পিছু ঘুরে শেহরিনকে স্পর্শ করতে গিয়ে কারো লম্বা দৈহিক ছায়ায় হাত থামিয়ে ফেলে। চোখ তুলে তাকাতেই দেখতে পায় অগ্নিগোলকে পরিণত হওয়া কারো দুটো চোখকে । বরফ শীতল মুখোভঙ্গিতে যে কি না স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সম্মুখে।

রাদিন সাহেবের হাত সঙ্গে সঙ্গে শাড়ির আঁচল হতে নেমে আসে। গুটিয়ে নেয় নিজ বরাবর। ফ্যাকাশে বর্ণহীন মুখে শুকনো ঢোক গিলে কিছু বলার চেষ্টা করে। কিন্তু অধিক উদ্দীপনায় তার মুখ ফুটে কোনো কথা বের হয় না।

সান্নিধ্য ধীর পায়ে এগিয়ে আসতেই শেহরিন একছুটে তার কাছে চলে যায়। গলার ভিতরে জমে থাকা আর্তনাদ প্রস্ফুটিত হতেই চওড়া বুকের ভাঁজে মুখ লুকিয়ে নেয় সে। মৃদু ঝংকারে কেঁপে ওঠে তার শরীর।

"ঘরে যাও আমি আসছি।"

বরফ শীতল কণ্ঠে সান্নিধ্যের বলা কথা শেহরিনের শ্রবণ হয়। তবে পরিবর্তন হয় না তার অবস্থানের। সান্নিধ্য রাদিন সাহেবের দিকে ক্ষুরধার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে একই কন্ঠ বজায় রেখে ফের বলে উঠে,"তোমার গায়ে কি স্পর্শ করেছে?"

" নাহ। কিন্ত শাড়ির আঁচল...

"আমি দেখেছি।"

"নোংরা কথা বলেছে।"

"তুমি ঘরে যাও তাকে আমি ভালো কথা শিখিয়ে আসছি।"

শেহরিন সান্নিধ্য হতে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। ঘৃণামিশ্রিত চাহনিতে এক নজর লোকটাকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে সরাসরি চলে যায় নিজ কক্ষে।

সান্নিধ্য শেহরিনের কক্ষে পৌঁছানো অব্দি অপেক্ষা করে চুপচাপ। এর মাঝে রাদিন সাহেব আমতা আমতা স্বরে কিছু একটা বলতে উদ্যত হলে হাত উঁচু করে সে থামিয়ে দেয়। চুপ থাকার ইঙ্গিত দিয়ে শেহরিনের কক্ষে দরজা লেগে যাওয়া দেখে সে তার ধারালো চাহনি ঘুরিয়ে নেয়।

" সান্নিধ্য.. বিশ্বাস করো আমি কিছুই করিনি। একটু ভুল বুঝাবুঝি হয়েছে শুধু।"

" তুই উপরে পা দিয়েছিস কোন সাহসে?"

" তুই তোকারি করছো কেন? আমি তোমার মামা হই। বলছি তো ইচ্ছেকৃতভাবে করিনি। তোমার বউই আমার সঙ্গে কথা বলতে এসেছে। আমি তো সানজির কাছে... "

সান্নিধ্য রাদিন সাহেবের মুখোমুখি দাঁড়ানো মাত্র ডান হাত চেপে ধরে। শক্তহাতে কবজি মুচড়িয়ে ধরে শান্ত কন্ঠে বলে," যেচে মরতে চাস?"

রাদিন সাহেব চোখ মুখ কুঁচকে ব্যথা হজম করে নেয়। মুখ হতে ক্রমাগত গোঙানির আওয়াজ বের হয়ে আসে তার। বাম হাত দ্বারা সান্নিধ্যের হাত ছাঁড়ানোর চেষ্টা করতে থাকে বারে বারে।

অন্যদিকে সান্নিধ্যের মুখোরেখায় ধীরে ধীরে হিংস্রতা এসে জমে। গর্জে উঠে বাম হাতে রাদিন সাহেবের ঘাড় চেপে ধরে দেয়ালের সাথে সোজা গিয়ে মাথা বরাবর ঠুকিয়ে দেয় সে। একবার নয় দুবার নয় পরপর পাঁচ বারে মাথা কপাল ফেটে দেয়ালের গা রক্তাক্ত হয়ে উঠলে তখন তার হাতের ক্রিয়া থামে। হাঁপাতে হাঁপাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে রাদিন সাহেব।

চুলের মুঠো পাকিয়ে টেনে তোলা হয় আবারো তাকে। কপাল বেয়ে নাক মুখে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে অবিরাম ধারায়। সান্নিধ্যের মনে বিন্দুমাত্র করুণা হয় না। বরং দ্বিগুণ আক্রোশে রক্ত লাল চোখে ডান হাত শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ করে সে।

" ভু..ল.. ভুল হয়েছে আমার.."

" মাদা*** চুপ। কোনো কথা বলবি না।"

ক্ষিপ্র গতিতে মুখ বরাবর লৌহ দন্ডের মতো শক্ত হাত দ্বারা জোরালো ঘুষি দিতে দিতে উপরি ঠোঁট থেঁতলে তোলে সান্নিধ্য। হাতের অগ্রপ্রান্ত তার লাল হয়ে উঠে। রক্তে একাকার হয়ে উঠে রাদিন সাহেবের মুখোরেখা । নাক টেনে শ্বাস নিতে নিতে ক্ষান্ত হয়ে উঠে এক পর্যায়ে।

পরনের শার্ট ধরে টানতে টানতে সান্নিধ্য নিয়ে যায় তাকে নিচে। সমস্ত সিঁড়ির গায়ে রক্তের ছিটা লেগে যায়। তীব্র গোঙানির শব্দে নিচে বসারত মানুষ বিস্ফারিত চোখে একযোগে ঘাড় ঘুরিয়ে নেয় সিঁড়ির পানে।

"এ কি সান্নিধ্য... ?"

" সান্নিধ্য কি করছো তুমি? "

বসা ছেড়ে সবাই তড়িৎ গতিতে ছুটে আসে সান্নিধ্যের কাছে। যে যার মতো রাদিন সাহেবকে বাঁচাতে তৎপর হয়ে উঠলেও খুব একটা সুবিধা করতে সক্ষম হয় না। বেপোরায়া ভঙ্গিতে সান্নিধ্য সবাইকে হটিয়ে রাদিন সাহেবকে ছিটকে লাথি মেরে দূরে ফেলে দেয়। রক্তে ভেসে ওঠে সাদা ফ্লোর।

" আজকের পর থেকে এই হারামির বাচ্চা যদি আমার চোখের সামনে পড়ে ওর শরীর আমি মাঝখান হতে চিড়ে নদীতে ভাসিয়ে দিবো। আর তোমরা ওর আত্মার জন্য মাগফিরাত কামনা করো।"

রাজ্জাক সাহেব সহ বড়মামা, সেলিম সাহেব সকলে ছুটে যান রক্তাক্ত অর্ধচেতনাহীন মানবের কাছে। যায় না শুধু সরফরাজ এবং শাহজাহান সাহেব। স্থির ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে তারা।

" এসব কি সান্নিধ্য? তোমার স্পর্ধা হয় কি করে গুরুজনের গায়ে হাত তোলার? এই শিক্ষা দিয়েছি তোমাকে আমি? "

মিসেস নাজনীন ক্রোধান্বিত দৃষ্টিতে সান্নিধ্যের পানে তাকায়। ভাইয়ের অবস্থা দেখে তার মাথায় রক্ত উঠে এক মুহূর্তেই। গলার স্বর বাড়িয়ে ফের বলেন," গুন্ডা হয়ে গিয়েছো? যাকে ইচ্ছা তাকে মারো তাই না?"

" এটা ওর প্রাপ্য। আমি তোমার এই দুই ভাইকে নিজের কেউ বলে মানিনা। অন্যায় করেছে প্রয়োজনের চেয়ে কম শাস্তি পেয়েছে। শুকরিয়া করো।"

"ভাইজান অ্যাম্বুলেন্স কল করুন প্লিজ। সেন্সলেস হয়ে গিয়েছে রাদিন।"

" ওয়েট ওয়েট। কি অন্যায় করেছে যে এতো পাশবিকভাবে মেরেছো তুমি?"

" আমার ওয়াইফকে সে অসম্মান করছে।"

রাজ্জাক সাহেব হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেন," শুধু মাত্র এই কারণে তুমি এমন হাল করবে? আমার ভাইটাকে জানে মেরে ফেললে। ওকে তো বাঁচানোই মুশকিল।"

" মরেনি এখনো। নিয়ে দূর হয়ে যান। আমার চোখের সামনে যতক্ষণ থাকবে ততক্ষণে যা আছে সেটাও নিশ্চিহ্ন করে দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা বোধ করবো না।"

" রাজ্জাক ওর কথা শুনে সময় নষ্ট করা যাবে না। কিছু একটা করতে হবে তাড়াতাড়ি।"

"অ্যাম্বুলেন্স কল করা হয়েছে।"

"অ্যাম্বুলেন্স সুখনিবাসে ঢুকবে না। তুলে নিয়ে যান আপনারা একে।"

"সরফরাজ তুমি এই কথা বলছো?"

সরফরাজ চোয়াল শক্ত করে কঠিন মুখে জবাব দেয়," বেশি কথা বলবেন না। তাড়াতাড়ি নিয়ে যান। নয়তো সান্নিধ্যের বদলে আমি ওকে মেরে ফেলবো।"

মিসেস নীলা রুষ্ট কন্ঠে বলেন,

" বউ নিয়ে এতো কেন আদিখ্যেতা তোমার সান্নিধ্য। মণি মুক্তায় গড়ানো বুঝি? কেউ কিছু বললেই তাকে এভাবে নৃশংস ভাবে মারবে? "

সান্নিধ্য মিসেস নীলার কথায় জবাব না দিয়ে শাহজাহান সাহেবের দিকে তাকায়। ভারী গম্ভীর কণ্ঠে বলে," এইসব আবর্জনা যদি আর একবার এই বাসায় আসে তাদের অবস্থার দায়ভার তোমাদের।"

"বাড়াবাড়ি করবে না। লিমিট বজায় রেখে কথা বলো।"

" আমি লিমিট অতিক্রম করলে এতোক্ষণে ওর শ্বাসটুকুও বুঝতে না তোমরা।"

"এতো কেন আক্রোশ তোমার?"

"আমার সাথে লাগতে আসার ফল।"

রাজ্জাক সাহেব ফুঁসে উঠেন সান্নিধ্যের কথায়। ক্ষীপ্তসুরে বলেন,

" তুমি নিজে লাগতে আসো আমাদের সাথে। চট্টগ্রাম ছাড়া করেছো তুমি আমাদের। অর্ধেক বিজনেস খেয়ে দিয়েছো। এখন আমার ভাইকে মারলে। "

" দুদিন পর আর যা যা আছে সেটাও খেয়ে দিবো। বি রেডি।"

বিজ্ঞাপন
রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি গল্পটি মাহরিণ তৃণ-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও সামাজিক গল্প