রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি

পর্ব - ৩৯

🟢

বিমর্ষ একটা রাতের সমাপ্তি ঘটে। পরদিন ভোরের আলো প্রস্ফুটিত হতে না হতেই কর্মক্ষেত্র হতে বাসায় ফেরে সান্নিধ্য। গমগমে আওয়াজে গাড়ির চাকা থামে গ্যারেজে। পরনের পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে নিজস্ব সব জিনিস নিয়ে বের হতে উদ্যত হয় সে। নির্ঘুম রাতের ক্লান্তি চোখে মুখে ছেয়ে আছে স্পষ্টভাবে। কপালজুড়ে সূক্ষ্ণ ভাঁজ। মুখোরেখা দেখেই অনুমান করা যাচ্ছে খুব একটা ভালো মেজাজে নেই সে।

অন্যদিকে উপর তলায় নিজ কক্ষের বেলকনি হতে স্বামীর আগমনী দৃশ্য চোখে পড়তেই নাজুক রমণী নিজেকে ঝালিয়ে নেয় আরো একবার। আজ মুখোরেখা এ দু'দিনের চেয়ে কিছুটা স্বাভাবিক। কালকে সরফরাজ ভাইয়া অকপটে যখন তার মুখোয়ব দেখে সন্দেহ প্রকাশ করে এবং সেই সাথে নিশ্চিত হয়ে বলে কিছু একটা সমস্যা হয়েছে তখন হতেই ভয় জেঁকে ধরেছে তাকে। সরফরাজ ভাইয়ার যেহেতু এক দেখাতেই বুঝতে পেরেছে নেতাসাহেব তো তাকানোর সঙ্গে সঙ্গে ধরে ফেলবে।

কাল রাতে মনের ভিতরে অসহ্য ব্যথা জমলেও নিজেকে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে ক্ষান্ত রেখেছিলো শেহরিন। চোখ বারবার ঘোলা হয়ে আসলেও ভূমিষ্ট হতে দেয়নি জলের কণা। অপমান যাতনা ভুলতে ডায়েরি লিখেছে, রুমজুড়ে পায়চারি করেছে, নিজ মনকে সবকিছু নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করতে চেষ্টা করেছে। পানির ঝাপটা দিয়ে দিয়ে চক্ষুজোড়া রেখেছিলো শীতল। অতঃপর ঘুম ঘুম চোখের পাতা বন্ধ করার আগে ঠোঁটের কোণে মলিন হাসি ফুটিয়ে বলেছে,"শেহরিন তুমি সত্যি ধৈর্য্যশীল একটা মেয়ে । তোমার অনেক ধৈর্য্য। জীবনে চলার পথে এটা ধরে রেখো।"

ধুপধাপ আওয়াজ ভেঙে কক্ষে প্রবেশ করে সান্নিধ্য। হাতে থাকা ল্যাপটপ, ফাইল নিয়ে এগুতেই সম্মুখে এসে দাঁড়ায় শেহরিন।মিষ্টি হেসে অভ্যর্থনা জানায় তার নেতাসাহেবকে। নির্মেদ কন্ঠস্বরে বলে উঠে,

"কাজ শেষ হলো তাহলে?"

সান্নিধ্য হাতে থাকা জিনিসাদি নিয়ে নিজেও দাঁড়িয়ে পড়ে। শেহরিনের চোখের দিকে এক দৃষ্টিতে কিয়ৎক্ষণ তাকিয়ে থেকে ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করে, "কেমন আছো তুমি?"

" একজনকে ভীষণ মিস করে যতটুকু ভালো থাকা যায়।"

" ঘুম হয়েছিলো রাতে?"

" হ্যাঁ। হবে না কেন।"

" কোনো সমস্যা হয়নি তো? "

" কি সমস্যা হবে? আপনার মুখে কি সমস্যা ছাড়া কোনো কথা নেই নেতাসাহেব? আমাকে দেখে কি মনে হচ্ছে আমি খারাপ ছিলাম বলুন তো?"

সান্নিধ্য ল্যাপটপ ফাইল তার পিছনে থাকা চেস্ট অফ ড্রয়ার্সের উপর রেখে হেলান দিয়ে দাঁড়ায়। দুই হাত বুকের সাথে ভাঁজ করে রেখে বরফ শীতল কণ্ঠে বলে,

" কাজল দিয়েছো চোখে?"

" হ্যাঁ??"

" কাজল দিয়েছো চোখে?"

শেহরিন থতমত খায় নেতাসাহেবের প্রশ্নে। চোখে কাজল দেওয়ার বিষয়টা বুঝতে পারে না সে। ডান হাত তার আপনাআপনি চলে যায় চোখের কোটরে। বিস্মিত মুখোরেখায় ধীর কন্ঠে বলে, " কাজল তো দেইনি চোখে।"

" আচ্ছা আমার কাছে আসো।"

সান্নিধ্য হাত বাড়িয়ে শেহরিনকে টেনে নেয় নিজের কাছে। শক্ত দু'হাতে কোমড় জড়িয়ে ধরে একদম কাছাকাছি নিয়ে আসে তার। চোখে চোখ রেখে হিমশীতল সেই কন্ঠে বলে," চোখের নিচে কালি জমেছে কেন তোমার?"

" এগুলোকে ডার্কসার্কেল বলে নেতাসাহেব। রাত জেগে পড়াশোনা করলে এমনটা হয়ে যায়।"

" সিরিয়াসলি?"

" তো?"

" অদ্ভুত তো !! এক্সামের সময় রাত জেগে পড়াশোনা করলে তখন এতোটা ডার্কসার্কেল পড়লো না চোখে। এক্সাম শেষ হতেই পড়তে হলো?"

শেহরিন ভ্রু কুঁচকে নেয়। সরু চোখে তাকিয়ে বলে," মেয়েদের স্কিন টোনের বিষয়গুলো অদ্ভুতই হয়। আপনাকে দয়া করে এটা নিয়ে ভাবতে হবে না। জার্নি করে এসেছেন ফ্রেশ হন তাড়াতাড়ি। আমি ব্রেকফাস্ট নিয়ে আসছি।"

" হাতের তালু সোজা করো।"

" কেন?"

" আমি দেখতে চেয়েছি।"

"কি শুরু করলেন বলুন তো।"

সান্নিধ্য কোমড় হতে বাম হাত ছাড়িয়ে শেহরিনের মুঠো পাকিয়ে থাকা ডান হাতটা উন্মুক্ত করতে নেয়। কিন্তু বাঁধ সাধে তার অর্ধাঙ্গিনী। ফোস্কা পড়া চামড়া লাল হয়ে থাকা হাতের তালু সে কোনোভাবেই উনার সামনে প্রকাশ করবে না।

" আমি চাইছি না জোর জবরদস্তি করে হাতের তালুটা উন্মুক্ত করতে। আমি সামান্য শক্তি দিয়ে ধরলেই তুমি ব্যথা পাবে শেহরিন। আমি চাই না তুমি ব্যথা পাও। হাতের মুঠো ছাড়াও।"

" কেন এরকম করছেন? আমি কিন্তু সত্যি এবার রেগে যাচ্ছি।"

" তুমি কি চাও আমি রেগে যাই?"

" চাই না জন্য দেখাতে চাইছি না।"

" তুমি দেখাও আমি কিছু বলবো না প্রমিজ।"

"প্রমিজ?"

" হ্যাঁ।"

শেহরিন সান্নিধ্যের আশ্বস্ত বাণীতে মুঠো পাকানো হাত ধীরে ধীরে খুলে ফেলে। নেতাসাহেবের সম্মুখে উন্মুক্ত করে ধরে ভয়ার্ত চোখে। ফর্সা হাতের তালু বিবর্ণ হয়ে উঠে জায়গা ফুরিয়ে এসেছে তার। জ্বলন্ত সিগারেটের সেই ক্ষত, বৃদ্ধাঙ্গুলির নিচে পড়া ফোস্কা আর জায়গায় জায়গায় চামড়া লাল হতে হতে পুরো হাতের তালুটাই যেনো নষ্ট হয়ে গিয়েছে। স্বাভাবিক চামড়া নেই।

সান্নিধ্য চুপচাপ শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে ক্ষতপোড়া হাতখানা। আলতো স্পর্শে ছুঁইয়ে দিতেই শেহরিন ব্যথায় মুখ ফুটে অস্ফুটস্বর বের করে ফেলে। ফোস্কা স্থানটা এখনো কাঁচা রয়েছে।

"এই কয়টাদিন আমার উপর দিয়ে অনেক প্রেশার গিয়েছে কাজের। নির্ধারিত কিছু ডেট ছিলো সেগুলো পাস করার। তোমার সাথে আমার দেখা হয়েছে গভীর রাতে। বেশিরভাগ সময় পেয়েছি হয়তো ঘুমে নয়তো ঘুমজড়ানো চোখে। সকালে দেখা হতে না হতেই আমাকে আবারো বের হতে হয়েছে কাজে। আমি তোমার লুকোচুরির কারণগুলো নোটিশ করেছিলাম ঠিকই বাট তোমার স্বতঃস্ফূর্ত মনোভাব আমাকে কিছুটা হলেও বিভ্রান্ত করেছে। তোমার মুখের কৃত্রিম হাসিটাকে আমি সত্যি ভেবে ভুল করেছি। আমার তোমাকে আরো একটু গভীরে গিয়ে বোঝা উচিত ছিলো।"

" ১৬-১৭ ঘন্টা পরিশ্রম করে এসে আমার সৃষ্টি বিভ্রান্তির মাঝেও আপনি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। আপনার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমি যদি ধরা দিতাম ঠিকভাবে, আপনি অনায়াসে ধরে ফেলতেন। কিন্তু আমি ইচ্ছেকৃতভাবে আপনাকে পাশ কাটিয়ে গিয়েছি।

আপনি যন্ত্র নন নেতাসাহেব । আপনার জায়গায় আমি থাকলে এতটুকু বোঝার ক্ষমতাও আমার হতো না। ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়তাম। অথচ, ঘুমের মাঝেও আমি বুঝেছি আপনি আমার কেয়ার করে চলেছেন। মাথার বালিশ ঠিক করে দিচ্ছেন, গায়ে হাত দিয়ে তাপমাত্রা দেখছেন, চোখে মুখে ছেয়ে থাকা চুল সরিয়ে দিচ্ছেন, চুমু দিচ্ছেন কপালে। আমার মনে হয় একটা মেয়ে পারিপার্শ্বিক সবকিছুর সাথে যুদ্ধ করে এসে দিনশেষে যদি স্বামীর এই যত্ন, ভালোবাসাটুকু পায় এটা তাদের কাছে স্বর্গীয় সুখ। এই যে হাজারো ব্যস্ততাতেও আপনার কাজগুলো অবধারিত থাকে এটা আমার কাছে অনেক বড় পাওয়া। রাগ করবেন না..।"

" তবুও অন্যায় কখনো মুখ বুঁজে মেনে নিতে হয় না।"

" জীবনের এই স্টেজে এসে বুঝতে পারছি, মেয়েদের জীবনে কোনো না কোনো পরিস্থিতিতে তার সাথে হওয়া অন্যায়গুলো মুখ বুঁজে সহ্য করে নিতেই হয়। আমি চাইবো না কিন্তু পরিস্থিতি আমাকে বাধ্য করে। পারিপার্শ্বিক মানুষ বাধ্য করে আমাকে মেনে নিতেই হবে। এটা এক ধরনের সোশ্যাল স্ক্যাম।"

" তোমার কি মনে হয়নি বিষয়টা আমি ধরতে পারবো না কখনো?"

শেহরিন মৃদু হাসে। সান্নিধ্যের কপাল ছুঁইয়ে যাওয়া চুলগুলো সযত্নে হাত দিয়ে সরিয়ে বলে,"এটা অসম্ভব। আপনার ধারালো চোখ থেকে কিছু লুকানো যায় নাকি।"

" আমার জীবনে যদি সামান্যতম ধৈর্য্য থেকে থাকে সেটার কারণ তুমি। আমি কখনোই ধৈর্য্যশীল ছিলাম না। যা করতাম সরাসরি করতাম।"

" আপনি কথা দিয়েছেন এটা নিয়ে কোনো বাড়াবাড়ি করবেন না। "

" আমি কিন্তু এখনো জানি না তোমার সাথে কি কি হয়েছে বাট যা হয়েছে সেটার প্রতিচ্ছবি শুধু তোমার মুখ দেখে হাত দেখে বুঝতে পারছি।"

" আর কিছু বুঝতে হবে না প্লিজ। কোনো কিছুই সহজ নয়। কঠিন জিনিস সহজ বানাতে গেলে একটু ক্ষত হতেই হয়। একটু প্রতিকূল পরিবেশের সম্মুখীন হতেই হয়। আপনার আর একটা কথাও আমি শুনবো না। এখন সোজা ফ্রেশ হবেন যান।"

" তোমার প্রয়োজনীয় যা যা আছে প্যাক করে নাও। আজকে আমরা বাসা ছাড়ছি। তোমার ভার্সিটি এরিয়ায় অ্যাপার্টমেন্ট কনফার্ম করা হয়েছে। আজকেই শিফট করবো।"

শেহরিন হতভম্ব দৃষ্টিতে সান্নিধ্যের দিকে চায়। মুখ তার আপনাআপনি হা হয়ে যায়। এই মুহুর্তে বলা কথাটা তার কাছে দূর্ভেদ্য লাগে। অবিশ্বাস্য কন্ঠে বলে, "মানে? কি বলছেন আপনি এসব? বাসা কেন ছাড়বো? এই জন্য আপনাকে আমার কিছু বলতে ইচ্ছে করে না। একটু এদিক সেদিক হলেই..

" চুপ..শান্ত হও।"

সান্নিধ্য শেহরিনের ঠোঁটে হাত রেখে থামিয়ে দেয়। নিষ্পলক চাহনিতে তাকিয়ে বলে, " তুমি যদি চাও আমি শান্ত থাকি তাহলে তোমাকে দুটো কাজ করতে হবে। আর যদি না করো তাহলে আমি যা করি সেটা করেই এ বাসা থেকে বের হবো। কোনটা চাও?"

নেতাসাহেবের ঠান্ডা স্বরের হুমকিতে শেহরিনের গলা শুকিয়ে আসার জোর। বুকের মধ্যে তার হাতুড়ি পেটা শুরু হয়ে গিয়েছে। এমনি এমনি সে চুপ থাকে না, নিজেকে লুকিয়ে রাখে না। এই মাথা গরম লোকটা যে রেগে গেলে কি কি করতে পারে কিছুটা হলেও তার ধারণা পেয়েছে। কম্পিত কণ্ঠে সে উচ্চারণ করে, "কি কাজ করতে হবে?"

"চুপচাপ সব প্যাক করবে। আর এতোদিনে যাদের প্রতি তোমার নূন্যতম অভিযোগ জমা হয়েছে সেটা তাদের সামনে প্রকাশ করে এই বাসা থেকে বের হবে।"

"আমার সত্যি কারো প্রতি কোনো অভিযোগ নেই। বিন্দুমাত্র অভিযোগ নেই। আপনি আমাকে যেখানে নিয়ে রাখবেন আমি সেইখানেই থাকবো তবুও দয়া করে এটা করতে বলবেন না।"

" তুমি যদি নিজের অব্যক্ত কথাগুলো না বলো তাহলে আমাকে বাধ্য হতে হবে মুখ খুলতে।"

" আপনি কি চান আমি আম্মা ভাবির সাথে বেয়াদবি করি?"

সান্নিধ্য স্থির চাহনিতে তাকিয়ে বলে," তুমি অনেক ম্যাচিউর একটা মেয়ে। তুমি কখনোই বেয়াদবি করবে না সেটা আমি জানি। তুমি হাজার চাইলেও পারবে না। কারণ এর পিছনে তোমার বাবার শিক্ষা আছে। তোমার ভিতরে যে সমস্ত প্রশ্নেরা আঁটকে আছে, যেসব কথা আছে সেগুলোই শুধু প্রকাশ করবে।

দ্যাটস ইট।"

_____________________________________

" স্যার লতা ধরা দিচ্ছে না।"

" কোথায় আছে এখন?"

" ওর বাসাতেই আছে।"

সান্নিধ্য হাত ঘড়িতে সময় দেখে নিয়ে ভ্রু বাঁকায়। ভরাট কন্ঠে বলে,

" কিডন্যাপ করে নিয়ে আসো।"

" কিডন্যাপ করবো স্যার দিন দুপুরে?"

" জীবনের প্রথম করছো?"

রিমন স্যারের বাঁকা কথা শুনে ঠোঁট কামড়ে বলে," জ্বি না স্যার এটা দিয়ে ছয়বার হবে।"

" গুড। তাড়াতাড়ি নিয়ে আসো আমি অপেক্ষা করছি।"

সুখনিবাসের গার্ডেনে বেলা এগারোটার সময় সান্নিধ্যকে ধীর পায়ে পায়চারি করা দেখে গেইটের দারোয়ান সহ দু তিনজন সহযোগী বেশ অবাক হয়। বাগান পরিষ্কার করতে থাকা আমিন একটু পর পর চোখ তুলে তাকায় তো আবার নামিয়ে নেয়। এ যাবতকালে সে কখনো এই অসময়ে এমপি সাহেবকে গার্ডেনে দেখেনি। খুব করে হলে মাঝে মাঝে রাতে দেখতো ফোনে কথা বলতে বলতে পায়চারি করছে। কিন্তু আজ হঠাৎ এই সময়?

সাদা নেক ক্রু টি শার্ট সঙ্গে ধূসর রঙের ট্রাউজার পরনে। পায়ে বাসার পরার স্যান্ডেল। এক হাতে পকেটে ঢুকিয়ে আরেক হাতে সে ফোন চালিয়ে যাচ্ছে। গম্ভীর মুখোরেখায় দৃষ্টি ফোনের দিকে থাকলেও হুট করে সে চোখ তুলে তাকায়। পাশ ঘুরিয়ে আমিনের দিকে তাকিয়ে ভারী কন্ঠে বলে,"আমাকে লুকিয়ে দেখার কিছু নেই। হাত কেটে যাবে। যদি দেখতে মন চায় দাঁড়িয়েছি দেখো।"

আমিন গোল গোল চোখ করে সান্নিধ্যের কাট কাট গলায় বলা কথা শুনে বিষম খায়। এই লোক এতোক্ষণ তার লুকিয়ে ছাপিয়ে দেখাটাকেও নজর বন্দি করে ফেলেছে। এলোমেলো দৃষ্টি নিক্ষেপ করে জড়ানো গলায় বলে," দেখেছি স্যার। আর দেখবো না।"

" দেখা হয়েছে?"

" জ্বি..জ্বি স্যার।"

" তাহলে যেটা করছো সেটাতে মন দাও। হাত কেটে যাবে এভাবে বার বার তাকালে।"

সময় গড়িয়ে যায় কিছুটা। সান্নিধ্য গার্ডেন ছেড়ে লনের ধারে এগিয়ে যায়। কড়া রোদ্দুর উপক্ষা করে মাধবীলতা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে দারোয়ানকে ইশারা করে গেট খুলে দেওয়ার জন্য।

গেট খুলে যায়। সঙ্গে সঙ্গে প্রবেশ করে একখানা সাদা রঙের প্রাইভেট কার। সান্নিধ্য ইশারায় গার্ডেনের একপাশে থামতে বলে বাহিরে কর্মরত দুজনকে সরিয়ে দেয়। বাসার অভ্যন্তরে ছাদের দিকে একপলক চোখ বুলিয়ে সোজা চলে যায় গাড়ির কাছে।

রিমন গাড়ি হতে নেমে পিছন দরজা খুলে দেয়। ভিতরে বসারত

হাত মুখ বাঁধা লতাকে নামতে বলে সে সান্নিধ্যের মুখোমুখি দাঁড়ায়। নিস্তেজ গলায় বলে, "স্যার মেয়ে মানুষ হ্যান্ডেল করা অনেক কঠিন একটা বিষয়। এদের চেয়ে বড় বড় মাফিয়া ডন হ্যান্ডেল করা সহজ। জীবন শেষ আমার এই লতাকে কিডন্যাপ করতে গিয়ে।"

লতা তেজালো মূর্তিতে গাড়ি হতে নামে। পিছন হতে একজন তার হাত খুলে দিতেই সে নিজ হাতে মুখের বাঁধন টেনে খুলে ফেলে। অগ্নিমূর্তি ধারণ করে বলল, "খুইস্টা ব্যাটা তোর কাল্লা আমি আলাদা কইরা ফালামু।"

" দেখেছেন স্যার। এর জামাই একে সহ্য করে কিভাবে।"

" এ ছোকরা খবরদার আমার জামাই নিয়া কথা কইবি না। আমার বাড়িত হামলা দিয়া মাথায় টোপা বাইন্দা নিয়া আইছোস।"

" আস্তে কথা বল। আমি আনতে বলেছি ওকে।"

লতা নিজেকে ধাতস্থ করে। তেজারতি ভাব বিদ্যমান রেখেই বলে," আমি আর কাজ করমু না সান্নিধ্য ভাই আপনেগো বাসায়।"

" কেন? "

" গলার নিচে আইসা মানুষ ছুরি ধইরা কয়, আমি নাকি এই বাড়ির একজনের কথা আরেকজনের কানে লাগাই। এতো বছর কাম করলাম আপনেগো বাসায় কোনদিন কোনো কথা পাঁচকান করছি কন। কাইল আমি জানিই না কিছু, কোন থিকা ছাওয়াল বাউয়াল আইসা ছুরি ধরলো গলায়। এক মেমসাব আইসা গালে চড় মাইরা কয় আমার নাকি পাখনা গজাইছে, আমি নাকি ছোট বউমণির চামচাগিরি করি।"

সান্নিধ্য রোদের আঁচ সামলে কপালে কুঁচকে বলে,

" কে মেরেছে তোকে চড়?"

" অননেসা।"

" তুই কি করলি?"

"আমি চড় খাইলাম চুপচাপ।"

"তোর হাত ছিলো না?"

" মারলামনি ভাই। আসলে ছুরি দেইহা ডরাইছি। একা থাকলে চুলের মুঠি ধইরা ডেনের মধ্যে চুবাইলামনি। লতারে তো চেনে না।"

বিজ্ঞাপন

" এজন্য বাসায় কাজ করবি না?"

লতা শাড়ির আঁচল হাতের সাথে পেঁচাতে পেঁচাতে বলে,"করমু এমনি রাগ কইরা কইছি। হুদাই হুদাই চড় খাইলাম, গাইল খাইলাম। বিশ্বাস করেন আমি কারো কথা কাউরে কই নাই।"

" লুকিয়েছিলি কেন?"

" আমি ডরাইছিলাম। ভাবছি কাইলকার লোকজন আর ওই অননেসা ডাইনি আবার আইছে। এই ছোকড়া আমার বাড়িত হামলা দিছিলো।"

সান্নিধ্য আশেপাশে সবাইকে চলে যেতে বলে। রিমন লতার দিকে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে চলে যায়।

" এতোদিন বাসায় যা যা হয়েছে সব বলবি এখন। একটা লাইনও যেনো বাদ না যায়।"

লতা শুকনো ঢোক গিলে। ভয়ার্ত স্বরে তাকিয়ে বলে,"আপনার মাথায় তার ছেঁড়া সান্নিধ্য ভাই। লন্ডভন্ড কইরা ফালাইবেননি সবকিছু। ওরা জানলে আমাক কুরবানি কইরা দিবোনে। ছুরি নিয়া এমনি ঘুরতেছে।"

সান্নিধ্য নিজের মাথার তার ছেঁড়া কথাটা শুনেও চুপচাপ হজম করে নেয়। এই প্রথম মুখের উপর কেউ তাকে সরাসরি বললো কথাটা। এ অব্দি আশপাশ হতে শুধু শুনেই এসেছে।

" আমাকে দেখে ভয় পাস তুই?"

"যমের মতো।"

" বলতে শুরু কর তাহলে।"

_________________________________

বেলা গড়াতেই একে একে উপরতলা হতে ব্যাগপ্যাকসহ লাগেজ নেমে আসে। দু একজন সহযোগী এগিয়ে এসে সেগুলো একে একে গাড়িতে তুলতে ব্যস্ত হয় পড়ে। ড্রয়িংরুমে স্থিরমূর্তিতে সোফায় বসে আছেন বাড়ির সদস্যগণ। মিসেস নাজনীন এখনও বুঝে উঠতে পারছেন না কি হয়ে চলেছে। হঠাৎ কি এমন হলো যে ছেলে তার বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

" আপনি কি বলবেন দয়া করে বাসায় কি হচ্ছে? "

শাহজাহান সাহেব পায়ের উপর পা তুলে চা খেতে খেতে গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দেন," সেটা তুমি আর তোমার ছেলেরা ভালো জানো।"

"হেয়ালি করছেন কেন? বাসায় নিত্যনতুন সার্কাস না চললেই কি নয়?"

" ছেলের বিদায়কে তুমি সার্কাস বলছো?"

" কথা প্যাঁচাবেন না। অসহ্য লাগছে আমার সবকিছু্। সংসারে অলক্ষী ঢুকলে যায় হয়।"

মিসেস নাজনীন একা একা রাগে গজগজ করলেও তিথি সাহস পায় না কিছু বলতে। চুপচাপ সে শাশুড়ী মায়ের এক পাশে দাড়িয়ে থাকে। কালকে সরফরাজের বলা কথা তাকে একদম স্তব্ধ করে দিয়েছে। বুকের মধ্যে বেঁধেছে অজানা ভয়ের দানা। ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি সরফরাজ ডিভোর্স পর্যন্ত কথা তুলবে। এতো বড় কথা বলতে পারলো সে??

তবে কেউ একজন নিশ্চিত সরফরাজের কান পড়া দিয়েছে। হয় শেহরিন নয়তো লতা। লতাকে তো তাও অন্বেষাকে দিয়ে থ্রেট দিয়েছে কিন্তু শেহরিন? তার দিকে তো এখন চোখ তুলে তাকানোই দায়। তাকে সুরক্ষা দিতে একদম সবাই উঠে পড়ে লেগেছে। কিন্তু হঠাৎ বাসা ছাড়ার ব্যাপারটা তিথির বোধগম্য হয় না। কি কারণে বাসা ছাড়ছে? নতুন কোনো চাল চালবে নাকি?

শেষ দুটো লাগেজ নিয়ে সান্নিধ্যে নেমে আসে নিচে সিঁড়ি ভেঙে। পিছনে তার শেহরিন। কচুরি ফুল রঙা থ্রি পিসে মাথায় ওড়না টেনে ধীর পায়ে স্বামীর পিছু পিছু সে হাঁটা ধরেছে। হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া তার দ্রুতবেগে ছুটে চলেছে বুকের ভিতর। নেতাসাহেবের প্রথম কথা সে রেখেছে। চুপচাপ বিনাবার্তায় সব লাগেজ পত্র গুছিয়ে নিয়েছে। এবার দ্বিতীয় কথা রাখার পালা। আর এখানেই দম ফুরিয়ে আসছে তার। মনের মধ্যে অজস্র কথা। কিন্তু সেগুলো সে কখনোই চায়নি প্রকাশ করতে। কোনদিন সে সাহসও করেনি। আজ কিভাবে কি করবে?

সান্নিধ্য শেহরিনের আগমন দেখে বাসার সবাই বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। সান্নিধ্যের চাচ্চু চাচিও এসেছেন সান্নিধ্যের বাড়ি ছাড়ার কথা শুনে। হঠাৎ কি কারণে এমন কঠিন সিদ্ধান্ত ঠাহর করতে পারেন না দুজনেই। প্রশ্নমুখো হয়ে তাকিয়ে থাকেন এমপি সাহেবের দিকে।

" সান্নিধ্য এসব কি পাগলামি শুরু করেছো? অশান্তি সৃষ্টি না করলে কি তুমি ক্ষান্ত হতে পারো না?"

" শান্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্যই চলে যাচ্ছি।"

" শেহরিনের বুঝি এখানে পোষাচ্ছে না? তোমাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে বাড়ি ছাড়া করছে?"

মিসেস নাজনীনের কথায় সান্নিধ্য কোনো প্রতিত্তুর করে না। শাহজাহান সাহেবের দিকে তাকিয়ে নিরেট স্বরে বলে," ভাইয়া কি বের হয়েছে?"

" একটু আগেই তোমার অ্যাপার্টমেন্টের উদ্দেশ্য বের হয়েছে। কোনো কাজ আছে কি?"

" হ্যাঁ। সিকিউরিটি সিস্টেম নিয়ে একটু কাজ আছে।"

সান্নিধ্য হাত ঘড়িতে সময় দেখে নিয়ে পিছনে দাঁড়ানো শেহরিনের দিকে তাকিয়ে বলে, " সামনে আসো।"

শেহরিন দুহাত মুচড়ে ভয়ার্ত দৃষ্টি তুলে সান্নিধ্যের দিকে তাকায়। তার চোখের ভাষায় একরাশ ভয় শঙ্কা আর জড়তার প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে। যেখান হতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, আমি পারবো না, একটু দয়া করুন নেতাসাহেব। ছেড়ে দিন।

সান্নিধ্য শেহরিনের চোখের ভাষা বুঝেও বোঝে না। পুরুষালি ভারী কন্ঠস্বর উন্মুক্ত করে ফের বলে," সামনে আসো। সময় নষ্ট করো না। বের হতে হবে।"

শেহরিন নিস্তেজ মুখোরেখায় সন্তপর্ণে সামনে এসে দাঁড়ায়। বুকের মধ্যে এতো জোরে জোরে ঢিপঢিপ আওয়াজ তুলছে যে সে বাহির হতে তা অনুধাবন করতে পারছে। শাশুড়ী মায়ের সামনে চোখ তুলে তাকানোর অবকাশ পায় না সে।

" মাথা তুলে কথা বলো শেহরিন।"

মিসেস নাজনীন সহ সবাই একে অপরের সাথে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। সান্নিধ্যে শেহরিনের ভাবভঙ্গি তাদের মাথার উপর দিয়ে যায়। কি বলবে? কি বলতে চায়?

" মাথা তুলে কথা না বলতে পারলে বলার দরকার নেই।"

শেহরিন সান্নিধ্যের ধারালো কণ্ঠের কথায় চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস ছাড়ে। বাম হাতে ওড়নার মুঠো পাকিয়ে সে বুকে সাহস আনার চেষ্টা করে। বুঝেছে এই লোকের হতে তার নিস্তার নেই। সে তাকে দিয়ে বলিয়েই ছাড়বে।

পিছনে দাঁড়ানো নেতাসাহেবের অবায়ব তার ভিতরে আত্মবিশ্বাস জোগায়। আর্দ্র চক্ষু সে ধীরে ধীরে তোলে মিসেস নাজনীনের পানে। মাথা উঁচু করে নরম গলায় বলে," আমাকে ক্ষমা করবেন আম্মা। আমি আপনার যোগ্য পুত্রবধূ হতে পারিনি৷ এক্ষেত্রে সব দায়ভার আমার, সব ভুল আমার। আমি আমার অক্ষমতা মাথা পেতে মেনে নিচ্ছি। কিন্তু আম্মা,মায়েরা তো সন্তানদের জন্য সবচেয়ে সুনিশ্চিত একটা ভরসাস্থল হয়। মায়েরা নাকি মেয়েদের দুঃখ বোঝে, কষ্ট বোঝে। আমি কি সত্যি এতোটাই অক্ষম ছিলাম যে আমার কষ্টটা আপনি বুঝতে পারেননি? আমি খুব আশা করেছিলাম আমার মা নেই, আমি আপনাকে পেয়ে মায়ের অভাব ঘুচাবো। কিন্তু দূর্ভাগ্য বশত আমার কপালে হয়তো সেটা ছিলো না। আপনার কঠিন কথাগুলো বইয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো ভার শক্তি আমার নেই আম্মা। আমি এসবে খুবই দূর্বল। আমি সত্যি আর সহ্য করতে পারছি না। নিজেকে বারবার ভেঙে গড়িয়েছি তবুও আপনার মনমতো হতে পারিনি। আমি সত্যি আমার সামর্থ্যনুযায়ী চেষ্টা করেছি কিন্তু পারিনি। আপনার আফসোস হতাশাগুলো দেখে নিজের প্রতি ধিক্কার জন্মিয়েছি। অন্যের সঙ্গে তুলনাটা ভীষণ কষ্ট দিয়েছে। সবশেষে সবকিছু মিলিয়ে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। কখনো কোনদিন যদি আমি যোগ্য হয়ে ফিরতে পারি আপনার কাছে, প্লিজ ফিরিয়ে দিবেন না। আপনি তো মা। আমার বিশ্বাস আপনি একদিন নিশ্চিত মেয়ের অপারগতা, মেয়ের কষ্ট বুঝবেন।"

শেহরিনের গলার স্বর ভারী হয়ে আসে। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে অবলীলায় অশ্রু। ওড়না দিয়ে চোখ মুছে সে শাহজাহান সাহেব, চাচা শ্বশুর, চাচি শাশুড়ী হতে বিদায় নেয়। মিসেস নিলুফা অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তার বড় জায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। মেয়েটার কথা শুনে সে আবেগপ্রবণ হয়ে উঠেছে। চোখে নির্দ্বিধায় এসে জমিয়েছে জল। মাথায় হাত দিয়ে ভেজা কন্ঠে বলেন," সুখী হও মা তুমি।"

সান্নিধ্যের ভিতরে কোন পরিবর্তন দেখা দেয় না। নির্বিকারচিত্তে সে দাঁড়িয়ে থাকে। মুখোরেখা বেশ শান্ত। শেহরিন তার কাছে এসে দাঁড়াতেই শীতল গলায় বলে, " তিথি ভাবির সঙ্গে কথা শেষ করো।"

" প্লিজ মাফ করুন।"

" মাফ করছি না।"

" আমার আর কিছু বলার নেই আর।"

" আছে বলার।"

রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি বাংলা গল্প pdf সাহিত্য

তিথি নড়েচড়ে উঠে। সান্নিধ্যের দিকে চোখ তুলে তাকাতেও ভয় করছে। কন্ঠস্বর স্বাভাবিক থাকলেও চোখ দুটো তার ধারালো হয়ে আছে এটা সে জানে। কি বলবে তাকে?

" কোনো ভয় নেই। আমি আছি। তোমার ভিতরে যা আছে সেটা প্রকাশ করে যাও।"

শেহরিন ফের দম টেনে নেয়। নেতাসাহেবের কথা, চোখের দৃষ্টি তার ভিতরে অনুপ্রেরণা জোগায়। কানে বাজে তিথি ভাবির সেইদিনের সেই কথাটা, গায়ে কি তোমার ফোস্কা পড়ে গিয়েছিল? এই একটা কথা তাকে প্রবলভাবে আঘাত করেছিলো। আজ এই মুহুর্তে সেই কথা সে ফেরত দিবে। ভয় পাবে না সে। নেতাসাহেব রয়েছেন তো পাশে।

শেহরিন তিথির সম্মুখে এসে দাঁড়ায়। ভিতরে কম্পিত সুরকে উপেক্ষা করে সে বহুকষ্টে। ক্ষীণ সাহস জুগিয়েছে স্পষ্ট গলায় বলে," ভালো থাকবেন ভাবি। আপনাকে ভালো থাকার সুযোগ করে দিয়ে যাচ্ছি। এতোদিন আপনাকে অনেক কষ্টে রেখেছিলাম। শুরুর দিন হতেই বুঝতে পেরেছিলাম আমার উপস্থিতি আপনার পছন্দ নয়। আপনি কেন আমাকে পছন্দ করেন না, কেন আমার প্রতি আপনার এতো আক্রোশ কারণ আমার জানা নেই। তবে জানার খুব ইচ্ছে। হয়তো আমার কোনো ভুল থাকতে পারে সেখানে। একটা সময় পর নিশ্চয়ই জানতে পারবো। তখন নিজেকে শুধরে নিবো।

একটা মেয়ের সবচেয়ে বড় সম্পদ হচ্ছে তার ইজ্জত, তার সম্মান ভাবি। আপনি যদি নিজের মান ইজ্জতকে সম্মান দিতে পারেন অবশ্যই অন্য মেয়ের মান ইজ্জতকেও সম্মান দিতে পারবেন। অবৈধ পুরুষের ছোঁয়া গায়ে শুধু ফোস্কা নয় ভস্ম করে দেয়। আমার ক্ষেত্রে অন্তত তাই মনে হয়। হয়তো আমি অপছন্দীয় ব্যক্তি জন্য আপনার কাছে স্বাভাবিক লাগছে। আমার জায়গায় আপনি নিজেকে কিংবা আপনার ছোট বোন আনিকাকে কল্পনা করে একটু দেখবেন। আশা করি আমার অবস্থাটা বুঝতে পারবেন। আমি সত্যি চাইনি উনার এমন পরিস্থিতি হোক। তবে, তার এমন নিকৃষ্ট রূপ প্রকাশ করার আগে ভাবা উচিত ছিলো সে কার স্ত্রীকে অসম্মান করছে।

আমার আপনার প্রতি বিন্দুমাত্র হিংসা কিংবা অসম্মানবোধ নেই আর থাকবেও না কখনো। আমি আপনার প্রতিপক্ষ নই। ভাইয়া তাসিন আপনার ভালোটা ডিজার্ভ করে। অন্যের ক্ষতির তাড়নায় নিজের ক্ষতি ডেকে আনবেন না প্লিজ। এই সংসারটা যেরকম আপনার সেরকম আমারও। অধিকার কিন্তু সমান সমান। কিন্তু আমি স্বইচ্ছায় আজকে জায়গা ছেড়ে চলে যাচ্ছি শুধু মাত্র আপনাদের মনমতো হতে না পারার কারণে। ইনশাআল্লাহ একদিন আমি আমার সংসারে আবার ফিরবো। ততদিন পর্যন্ত আপনার বিবেকবোধ, মনুষ্যত্ব বোধ, পরকে আপন করে নেওয়ার মন মানসিকতা সৃষ্টি হোক। আল্লাহ আপনাকে সুবুদ্ধি দান করুক। ভালো থাকুন আপনি।"

শেহরিন থামে। ভিতরে ভিতরে সে হাঁপিয়ে ওঠে। তার মনের মধ্যে জমানো এই কথাগুলো উগড়ে দিয়ে সে ক্ষান্ত হয়। নিজের উপর তার অবিশ্বাস্য ভাব সৃষ্টি হয়। এই কথাগুলো তার আদৌও মনের মধ্যে ছিলো কি না জানে না। তবে তিথি ভাবির মুখের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো তার আপনাআপনি বের হয়ে গিয়েছে।

সান্নিধ্য সন্তুষ্টচিত্তে তাকায় শেহরিনের দিকে। সবাইকে স্তব্ধমূর্তি করে দিয়ে অগ্রসর হয় বাসা হতে বের হওয়ার পথে। তবে বিদায়ী এই যাত্রায় দেখা হয় না প্রিয় দুটো মানুষের সঙ্গে। সানজি এবং তাসিন। সানজি এখনো পঞ্চগড় হতে আসেনি। তানিশার কাছে থেকে হাওয়া বদল মন বদলের চেষ্টায় আছে। অন্যদিকে তাসিন আছে স্কুলে। দুটো মানুষ যখন সুখনিবাসে তাদের অতি আদরের মুখটা দেখতে পাবে না। জানা নেই কেমন প্রতিক্রিয়া হবে।

মিসেস নাজনীন এবং তিথি একইস্থানে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সান্নিধ্য মায়ের হতে বিদায় নিলেও আসে না তার হতে কোনো প্রতিত্তুর। নির্বাক, নিরুত্তর সে। শক্ত মুখোরেখায় চোখের পাতা ফেলতেও যেনো সে ভুলে যায়।

-----------------------------------

দুটো গাড়ি ইতিমধ্যে অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছে গিয়েছে। কিছু নিবে না নিবে না করেও অনেক কিছু নিতে হয়েছে। গ্যারেজ হতে গাড়ি বের করতেই মুখোমুখি এসে থামে আরো একটা গাড়ি। সান্নিধ্য তৎক্ষনাৎ গাড়ি থামিয়ে গ্লাস নামিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। সেই সাথে শেহরিনও বিষন্ন মনে তাৎক্ষণিক পিছু ফিরে চায়।

গাড়ি হতে বেরিয়ে আসে অন্বেষা। হাতে তার কালকের মতো আজকেও খাবারের ব্যাগ। নিশ্চয়ই দুপুরের জন্য খাবার নিয়ে এসেছে। শেহরিনের অঙ্গার পুড়ে শক্ত হয়ে যায়। এই মেয়ে হচ্ছে সমস্ত নষ্টের মূল। এই মেয়ের উপস্থিতির কারণে আজ তাদের এই পরিণতি।

" হাই শেহরিন।"

চোখ হতে সানগ্লাস খুলে অন্দরমহলে প্রবেশের পথে অন্বেষা থমকে দাঁড়ায়। সান্নিধ্যের দিকে এক নজর চেয়ে মুখে হাসি টেনে শেহরিনের পানে এগিয়ে আসে।

" কোথাও যাচ্ছো মনে হচ্ছে?"

" শেহরিন নামো গাড়ি থেকে।"

সান্নিধ্যের আবারো সেই ধারালো কন্ঠস্বরে শেহরিন বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে তাকায়। মনের মধ্যে আবারো জেঁকে ধরে ভয়। এই লোক অন্বেষাকে এখন কিছু না বলতে বললে হয়। কারণ অন্বেষাকে বলার মতো তার কিছুই নেই। ভিতরের মানুষ প্রশয় দিলে বাইরের মানুষ সুযোগ পেয়ে আঘাত করবেই।

" নামতে হবে কেন?"

"নামো বলছি।"

শেহরিন দ্বিধাগ্রস্ত মন নিয়ে গাড়ি হতে নেমে পড়ে। অন্বেষার মুখোমুখি দাঁড়াতেই সান্নিধ্য নিজে বের হয়ে এসে বলে," কালকে লতার সাথে তোমার কি হয়েছিলো?"

" লতা? লতার সাথে আমার কি হবে?"

" ওকে মেরেছো কেন? কিসের ভয় দেখিয়েছো?"

" আশ্চর্য এসব ছোটলোকের কথায় আমাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছো কেন? ওকে মেরে আমি আমার হাত নোংরা করবো নাকি।"

" মেরেছো এটা তো সত্য। অকাম প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ভয়ে?"

অন্বেষা ক্রুর হাসি হাসে। তাচ্ছিল্য মাখা কন্ঠে বলে," সরি! অন্বেষা এসবে ভয় পায় না। আর মারলে সমস্যাই বা কি? ওসব কাজের মেয়েদের দুই চারটা মার এমনি পাওনা থাকে। ধরে নাও চামচাগিরির ফল।"

সান্নিধ্য দু'হাতে পকেটে ঢুকিয়ে শেহরিনের দিকে তাকিয়ে বলে,

"কালকে লতাকে অন্বেষা চড় মেরেছে। আমার মনে হয় তোমার কিছু করা উচিত।"

শেহরিনের মুখ লাল হয়ে উঠে রাগে লতাকে মারার কথা শুনে।

সবাই একজোট হয়ে তার বিরুদ্ধে নেমেছে যেনো। অন্বেষাকে শুরু হতেই অপছন্দ তার। গায়ে পড়া স্বভাবের মেয়ে। কথায় কাজে মায়াজাল বিছানোর চেষ্টায় থাকে। কোন সাহসে সে লতার গায়ে হাত তোলে?

" তোমার আসলে উদ্দেশ্যটা কি বলবে? আমার পিছু লেগেছো কেন? আর যদি আমার সাথেই তোমার বোঝাপড়া হয়ে থাকে তাহলে লতার গায়ে কেন হাত তুলবে। বিকৃত মস্তিষ্ক তোমার?"

"কুল কুল শেহরিন। চামচার গায়ে আঁচ পড়েছে জন্য কষ্ট পাচ্ছো বুঝি? তিথি ভাবিকে ভাইয়ার কাছে খারাপ করার জন্য এতো উঠে পড়ে কেন লেগেছো? হিংসা হয়?"

শেহরিন রাগে দগ্ধ হয়ে সান্নিধ্যের দিকে তাকায়। সান্নিধ্যে ঘাড় নাড়িয়ে বলে,

" দাও।"

" ভয় করে।"

" ভয় নেই। আমি আছি।"

সান্নিধ্যের একটা কথাতেই শেহরিন লম্বা করে শ্বাস টেনে নেয়। দীপ্ত চাহনিতে সরাসরি ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দেয় অন্বেষার গালে।

আচমকা গালের উপর জোরদার আস্তরণ পড়তেই অন্বেষা হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। বিস্ফোরিত নেত্র ছুঁড়ে তাকায় শেহরিন দিকে।

" হাউ ডেয়ার ইউ..."

" চুপপ একদম চুপ৷ বেয়াদব মেয়ে। লতার জুতার সমানও তুমি নও। লজ্জা করে না প্রতিদিন এই বাসায় এসে কুটনামি করতে?হোটেল থেকে খাবার এনে নাম ফুটিয়ে যাও। কিছু বুঝতে পারবো না ভেবেছো। তিথি ভাবি, আম্মাকে যেভাবে খুশি হাত করো। আমার কিছু যায় আসে না। বাট আমার স্বামীর দিকে নজর দিলে চোখ তুলে ফেলবো বলে দিলাম।"

অন্বেষা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে শেহরিনের কথা হজম করে নেয়। গালে হাত রেখে পরপর দুজনের দিকে নজর বুলিয়ে চলে যায় অভ্যন্তরে।

সান্নিধ্যের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফোটে। তার রণমুর্তি ধারণকারী অর্ধাঙ্গিনীকে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে,

"ম্যাডাম ঠান্ডা হন। আজকের জন্য যথেষ্ট হয়ে গিয়েছে।"

শেহরিন কিয়ৎক্ষণ চুপ থাকে। অতঃপর ঝাঁঝালো কণ্ঠ ছেড়ে নির্জীব স্বরে বলে, "আমি কি সত্যি শেহরিন? এ আমি কি করে চলেছি? আপনি আমাকে কি শিখাচ্ছেন নেতাসাহেব?"

"তিন ক্যাটাগরির মানুষের সঙ্গে তিন রকমের প্রতিবাদ করা শিখালাম তোমাকে। এটা সারাজীবন ধরে রাখবে। কাঁদা মাটি থেকে এঁটেল মাটি হতে শেখো। মানুষ তোমাকে ভাঙতে পারবে না, নিজের মতো গড়তে পারবে না। তুমি তোমার মতো চলবে, তোমার মতো বাঁচবে। তোমার পিছনে আমি আছি।

You are not responsible for meeting every ones expectations, Let them be disappointed. Who cares?"

বিজ্ঞাপন
রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি গল্পটি মাহরিণ তৃণ-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও সামাজিক গল্প