"আচ্ছা এখন একটু শান্ত হও। অনেকক্ষণ ধরে তো কান্না করে চলেছো। আর কতক্ষণ কান্না করবে এভাবে?"
"আমি পারছি না নিজেকে শান্ত করতে নেতাসাহেব। আমি এটা কি করতে গিয়েছিলাম বলুন তো? আমি একটা মেয়ে হয়ে মা হওয়ার আনন্দটাকে মাটিতে পিষে ফেলতে চেয়েছিলাম? আমার ভিতরের অস্তিত্বকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলাম? আমি তো সন্তান জন্ম দেওয়ার আগেই ব্যর্থ মা হয়ে গেলাম। আপনি কেনো আমাকে বোঝাননি?"
মধ্যরাত পেরিয়ে শেষ রাতের কবলে ঘড়ির কাঁটা। নির্ঘুম রাতে নিস্তব্ধ পরিবেশ ঝিঁঝি পোকার তালে তালে নাক টেনে কান্নার করুণ স্বর ভেসে আসে। শেহরিনের দুচোখের পাতা ভিজে সান্নিধ্যের টি শার্ট ছুঁইয়েছে। ভঙ্গুর কামিনীকে শান্ত করার প্রয়াসটুকুও যেনো কাজে দিচ্ছে না। বেড সাইডের ল্যাম্পের হলদেটে আলো বেদনার প্রতিচ্ছবি এঁকে চলেছে শেহরিনের মুখজুড়ে।
"আমি সবসময় বলেছি তুমি যে সিদ্ধান্ত নিবে আমার সেটাতে অবশ্যই সমর্থন থাকবে। এখন আমি যদি আমার ইচ্ছেটা তোমার উপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দিতাম তাহলে সেটা তোমার জন্য কষ্টকর হয়ে যেতো। সেটা হ্যাঁ কিংবা না যেটাই হোক না কেনো। কারণ সম্পূর্ণ বিষয়টা তোমার শারিরীক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উপর ডিপেন্ড করছে। এক্ষেত্রে তোমার নিজস্ব শক্তিটা মেইন। তুমি যদি নিজের ভিতরে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার শক্তি সঞ্চয় না করে শুধু মাত্র আমার কথাতে নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বিষয়টা অনেক কঠিন হয়ে যেতো। প্রতি স্টেপে স্টেপে হয়তো আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলতে।"
"আমি আসলে চাইনি আমি যে মায়ের অভাবের কষ্টটা পেয়ে এসেছি সেটা আমার সন্তান পাক। পরিপূর্ণ 'মা' এর গুণটা নিজের মধ্যে আনাটাই ছিলো আমার চাওয়া। আমি খুবই নগন্য একটা মেয়ে নেতাসাহেব। এক রেজাল্ট শিটে ভালো নাম্বার ছাড়া আমার জীবনের ঝুলিতে একটা গুণও খুঁজে পাবেন না। যান্ত্রিক নিয়মে বেড়ে ওঠা একটা মেয়ে আমি। সন্তান লালন পালন করা কিংবা সংসার সামলানোর অমায়িক গুণটা আমার মধ্যে অনুপস্থিত। কিন্তু আমি চাই এই গুণগুলো নিজের মধ্যে আনতে। তবে, আজকে দুটো মানুষ আমাকে চোখ খুলে দিয়েছে। তাদের জীবনে না পাওয়া ইচ্ছেটা আমার জীবনে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে এসেছে। এর চেয়ে সুখের হয়তো কিছু আর হতে পারে না। আমি চেষ্টা করবো। আমি আমার সবটা দিয়ে চেষ্টা করবো।"
সান্নিধ্য মৃদু হেসে শেহরিনের চুলের মাঝে শক্ত হাতের আঙুলগুলো দিয়ে ছুঁইয়ে দেয়। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকা রমণীর মাথার একপাশ চুমু দিয়ে বলে," আমরা জীবনে সবসময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। পরিস্থিতি আমাদের নেগেটিভ পজিটিভ ধারণাগুলোকে বিভ্রান্ত করে তোলে। বাট সৃষ্টিকর্তা আমাদের সংশোধন করে দেন। তার ইচ্ছাতেই সব হয়। এখানেও হয়তো ভালো কিছু আছে। ভয় পাবে না। নতুন একটা জার্নিতে আমি চেষ্টা করবো সবসময় তোমাকে আগলে রাখার।"
"ইশ আমি শুরুতেই কি একটা ভুল করে ফেলেছি। প্রথম মা হওয়ার অনুভূতি দেখেই ভয় পেয়ে গিয়েছি। যেখানে আমার খুশি হওয়ার কথা ছিলো।"
"আচ্ছা এখন খুশি হয়ে কান্না থামাও প্লিজ।"
"থামছে না তো।"
সান্নিধ্য বুক হতে শেহরিনের মুখটা দু হাতের আজলে তুলে নিজের দিকে তাক করায়। আবছায়া হলদেটে আলোতে ভ্রু উঁচিয়ে বলে, "এতো পানি কোথায় থেকে আসছে আপনার?"
শেহরিন ঘোলাটে চোখে লাল হয়ে যাওয়া নাক টেনে বলে,
"বুঝতে পারছি না। তবে থামাতেও পারছি না।"
"থামাও প্লিজ। নয়তো পতেঙ্গা সী বিচ হয়ে ভেসে যাবো তো। দেখো টি শার্ট আমার অর্ধেক ভিজে শেষ। আর একটু হলে কভারলেটটাও ভিজে যাবে।"
সান্নিধ্যের অসহায় দৃষ্টিতে তাকানো কথার ভাঁজ শুনে শেহরিন কান্নারত অবস্থায় ফিক করে হেঁসে উঠে। দু-হাতের উল্টো পৃষ্ঠে চোখ মুছতে মুছতে সে আবারো তার নেতাসাহেবকে জড়িয়ে ধরে নরম গলায় বলে,"সব ভাসিয়ে দিবো আজকে আমি।"
"আমাকেও ভাসিয়ে দিবে?"
"উহু আপনাকে বেঁধে রাখবো আমার কাছে। আপনাকে ভাসিয়ে দিলে তো আমিও ভেসে যাবো।"
"এখন তাহলে একটু ঘুমাও। সাড়ে তিনটা পার হচ্ছে।"
"ঘুম আসছে না।"
-------------------------------------------------------
ঘুম আসছে না বলতে বলতে অবশেষে ভগ্ন হৃদিতার দু চোখের পাতায় টুপটাপ জল পড়া থামে ভোরের দিকে। বন্ধ করে ক্লান্ত লাল চোখজোড়া। নিদ্রায় ঢলে পড়ে তার নেতাসাহেবের বুকের ভাঁজে। সান্নিধ্য নিজের বুকের উপরে তার অর্ধাঙ্গিনীকে আশ্রয় দিয়ে নিজেও ঘুমিয়ে নেয় ঘন্টা দেড়েক। অতঃপর ফোনের ভাইব্রেটে চোখ খুলে দেখে আটটা বেজে চলেছ। পাখির কলতানে সূর্য পূর্ব আকাশে হাজির হয়ে আলোকিত করে তুলেছে দিনের ভাগটাকে।
সন্তপর্ণে নিজের বুক হতে ছাড়িয়ে শেহরিনকে সে শুইয়ে দিয়ে উঠে পড়ে। আজকে সকালে ব্রেকফার্স্ট বানানোর দায়িত্বটা নিজের কাঁধে তুলে নেয়। যদিও তাকে দশটার মধ্যেই বের হতে হবে। চলমান প্রজেক্টের কাজ শেষ পর্যায়ে। আজকে পরিদর্শনে যেয়ে সার্বিক দিকগুলো আরো একবার দেখে আসবে নিজে।
"আরহাম দু ঘন্টা পর আমার বাসায় নিচে আসবে। আর হ্যাঁ ফাইলগুলো সঙ্গে আনবে। অফিসে সাইন করতে পারবো না। বাসায় করতে হবে।"
"ওকে স্যার। আজকে এমনিতেও আপনার লং ডে ওয়ার্ক টাইম। নওশাদ চৌধুরীকে দুপুর তিনটায় শিডিউল দিয়েছি। উনি উদগ্রীব হয়ে আছেন আপনার সঙ্গে মিটিংটা কম্পলিট করতে।"
"মিটিং টাইম একঘন্টার বেশি রাখবে না।"
"ঠিক আছে স্যার আমি জানিয়ে দিবো। স্যার একটা কথা ছিলো।"
সান্নিধ্য ব্রেডে জ্যামে মাখাতে মাখাতে ঘাড় কাত করে ফোন চেপে রেখে বলে,"বলো।"
"স্যার আনোয়ার আজিমের পুত্রবধূ আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান। উনি প্রায় এক মাস ধরে আসিফকে রিকোয়েস্ট করে আসছে। আসিফ আমাকে রিমাইন্ডার ও করেছে অনেকবার। বাট আমি স্কোপ পাইনি তাকে টাইম দেওয়ার।"
"শিডিউল ফাঁকা পেলে টাইম জানিয়ে দিও।"
"স্যার উনি কার্যালয়ে দেখা করতে চান না।"
সান্নিধ্যের হাত থেমে যায়। কপাল কুঁচকে গম্ভীর কণ্ঠে বলে,"কেন?"
" ফর সেফটি ইস্যু স্যার। যদি কেউ এটা লিক করে দেয় তাহলে বিষয়টা ঘোলাটে হয়ে যাবে। উনার শ্বশুর সাহেবের জন্য ভয় আর কি.."
" সমস্যাটা কি?"
"আমার নিজেরও অজানা।"
সান্নিধ্য তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কিয়ৎক্ষণ তাকিয়ে থেকে কিছু একটা ভাবে। অতঃপর ঠান্ডা মস্তিষ্কে বলে," কালকে দুপুর একটায় আসতে বলবে।"
"স্যার সিকিউরিটি?"
"আজাদকে আমি বলে দিবো।"
"ঠিক আছে ধন্যবাদ স্যার।"
সান্নিধ্য ফোন নামিয়ে নিজ কাজে মত্ত হয়। আধকাঁচা হাতে সকালের ব্রেকফার্স্টটা মোটামুটি তৈরি করে নিয়েছে। চারটে সিদ্ধ ডিম,ব্রেড জ্যাম সাথে গরম গরম কফি। শেহরিনের নাস্তাটা পরিপাটি করে গুছিয়ে ডাইনিং এ রেখে নিজের নাস্তা নিয়ে সে সোফায় গিয়ে বসে। খেতে খেতে ল্যাপটপটা অন করে ডকুমেন্টারি ফাইলগুলো রিচেক করার কাজে লেগে পড়ে।
ঘড়ি ধরে নয়টা চল্লিশে গিয়ে সান্নিধ্য তার কাজ থামায়। কফিমগটাতে কফি না থাকলেও ব্রেড জ্যামের একাংশ ওমনি পড়ে রয়েছে প্লেটে। বের হওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত মানুষের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে সে আরো কিছুটা সময় নেয়। অতঃপর ঠিক এগারোমিনিট পর কলিংবেল বেজে ওঠে। যার জন্য এতোক্ষণ অপেক্ষা তার আগমন ঘটলো অবশেষে।
"ভাইজান আইলাম।"
"আসার কথা ছিলো নয়টায়। এসেছিস এখন? ভেতরে আয়।"
শেফালী লম্বা বিনুনি পিছনে ঠেলে হতাশার নিঃশ্বাস ঝেড়ে অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। কাজল কালো আঁখিতে বাহানা ঝুলিয়ে বলে,"আমার কি দোষ? ভিটাবাটি ছাইড়া অজপাড়াগাঁয়ে বাসা নিছেন আইতে সময় লাগবো না?"
"কতদূর পথ?"
"ম্যালা দূর পথ।"
সান্নিধ্যে ফের সোফায় গিয়ে গা এলিয়ে দিয়ে বসে। হাতে থাকা ফোনটার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে শান্ত গলায় বলে,"সকাল নয়টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত থাকতে হবে। পারবি?"
"উহু।"
"দুপুর তিনটা?"
"তাও না।"
"বেলা দুইটা?"
"আর একটু কমান।"
সান্নিধ্য ফোন হতে চোখ তোলে। ভ্রু বাঁকিয়ে ভারী কন্ঠে বলে,
"সমস্যা কি?"
"ম্যালা সমস্যা।"
"বলতে থাক।"
শেফালী মুখ ঝামটা মেরে এগিয়ে আসে। ঠোঁট মুখ ভেঁটকিয়ে খানিকটা চিল্লিয়ে বলে উঠে,"আমার তো ঘর সংসার নাই। সারাদিন বুয়া গিরি করি। সকাল নয়টা থিন দুপুর সাড়ে বারোটা।"
"চার ঘন্টা মাত্র? চার ঘন্টায় কি করবি তুই?"
"আমারে আপনে নতুন দেখতেছেন ভাইজান? লতা বুবুর চেয়ে হাত পাকা আমার। চারঘন্টার মধ্যে সকালের রান্দন, দুপুরের রান্দন একহাতে কইরা নিমু। কাপড় চোপড় ধোয়ন থিকা শুরু কইরা সক্কলডি। ব্যাবাক সাফ কইরা দিমু।"
"তোর ফাঁকা বুলি দেখি এখনও একই রকম আছে। সত্যি কাহিনী বল।"
" সত্যি কইতাছি।"
"আসল সত্যি বল।"
শেফালী গলার স্বর দ্বিগুণ জোরে বাড়াতেই সান্নিধ্য মুখে আঙুল দিয়ে তড়িৎ কন্ঠে বলে, "আস্তে কথা বল। শেহরিন ঘুমাচ্ছে।"
"ভাবিজানের শইল খারাপনি?"
"এজন্যই তোকে বলছি। সমস্যা, অসুবিধা তাড়াতাড়ি বল সময় কম হাতে আমার।"
শেফালী কন্ঠরোধ করে দু'হাত কচলে বলে," আমি মেলা ব্যস্ত থাহি ভাইজান। আমি বেশি সময় দিবার পারমু না।
পাশের বিল্ডিং এও কাম নিছি দুপুর দেড়টা থিন সাড়ে চারটা।"
"ওগুলো বাদ দে। আমি তোর বেতন নবম গ্রেডে নিয়ে আসবো।"
" উহু গেট মেট কইয়া লাভ নাই। আমি এক বাড়ি বেশিক্ষণ কাম করবার পারি না। হাস ফাঁস লাগে। দমবন্ধ লাগে। মনে হয় গলায় ফ্যাঁস লাইগা মইরা যামু। আমার তিন বাড়ি কাম করোন লাগবোই।"
সান্নিধ্য ফোন বন্ধ করে পায়ের উপর পা তুলে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। শেফালী সম্পর্কে লতার ছোট বোন। ছোটবেলা হতেই সুখনিবাসে সেই সুবাদে যাওয়া আসা। সবার সাথে সুসম্পর্ক। সুখনিবাসের সদস্যগণও বেশ ভালোই বাসে, স্নেহ করে। আর এতেই সে নিজেকে বুয়া সমাজের ডন ভাবে। এমপি সাহেবের অতি পরিচিত কি না। ক্ষমতা তার বাম হাতে। সান্নিধ্যের সুবাদে সে বুয়া কমিটির সভাপতি। বাল্য বিবাহ হয়েছে বছর দেড়েক আগে। বলে না,ছোট মরিচের ঝাল বেশি। শেফালী হচ্ছে সেই প্রজাতির।
"ঠিক আছে। বাট চারঘন্টা ফুলফিল করবি।"
"আইচ্ছা।"
সান্নিধ্য বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। কর্মস্থলে বের হওয়ার উদ্দেশ্য
নিজ কক্ষে যাওয়া মুহুর্তে শেফালীর চওড়া কন্ঠ তড়তড় করে নিচে নামতে থাকে। নমুজ কন্ঠে বলে, "ভাইজান একখান ছোটু অনুরোধ।"
"যে অনুরোধ করবি সেটা আমি আর রাখছি না।"
"এই বারই শেষ। আর জীবনেও কইতাম না।"
সান্নিধ্য হাঁটা থামায়। ঘাড় ঘুরিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলে," এই কথাটাও তো হাজারবার বলা শেষ।"
শেফালী কাঁদো কাঁদো গলায় সান্নিধ্যের সামনে আসে। নিজের তোজালো ভাবকে দমিয়ে চোখে মুখে অসহায়ত্বের ছাপ ফুটিয়ে বলে," ঠাঁডা পড়া কপাল আমার। মিনসের ঘরের মিনসেরে কত কই ওই হারাম'জাদা আর চুরি করবার যাইস না। একখান চুরিও তো ঠিকমতো করবার পারোস না। বারবার ধরা পড়োস। আর পুলিশ গুণরেও বলিহারি সবসময় আমার সোয়ামীর পিছনেই ওঁত পাইতা থাকা লাগে। তোগো কি আর কাজ নাই? খালি আমার সোয়ামিরেই চোহে ধরে?
" এ পর্যন্ত চারবার জেলে গিয়েছে চারবার বের করছি শুধু তোর রিকোয়েস্টে। জেল হতে বের হয়ে একটা মাস যায় না আবার চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে।"
"এইবারই শেষ। হারামজাদারে এইবার দড়ি দিয়ে বাইন্ধা থুমু।
দুক্কের কথা কি কই কন ভাইজান, চোর হইলেও মানুষ তো।চোরেরা কি মানুষ না? চোর না থাকলে দুনিয়াত পুলিশ থাকতো কন? হারামজাদা পুলিশরা তো তা বোঝে না।"
সান্নিধ্য নিজের ঠান্ডা শীতল মুখোরেখা বজায় রেখে চুপচাপ চলে যায় নিজ কক্ষে। শেফালির প্রশ্নের উত্তর হয়তো তার কাছে নেই। হয়তো ওর কথাটা আংশিক হলেও সত্য। চোর না থাকলে পুলিশ সমাজ থাকবে কি করে। বিলুপ্ত হয়ে যেতো। অন্তত তাদের জন্য হলেও চোরদের সম্মান জানানো উচিত।
শুক্রবারের সকাল পেরিয়ে দুপুর মাঝামাঝি সময়। কিচেন হতে ছুটেছে রান্নার ঘ্রাণ। সকালে ঘুম ভাঙতে ভাঙতে দশটা পার হয়েছে আজকে শেহরিনের। রাতে কান্নার দরুন চোখ দুটো এখনো ফুলে আছে খানিকটা তার। তবে মনের ভিতরে জমানো দুঃখ কষ্টগুলোকে আপাতত ছুটি দিয়ে সে পুরোদমে ব্যস্ত রান্নার কাজে। আজ নেতাসাহেবের জন্য তৈরি করছে স্পেশাল ডিশ পোলাও ঝাল রোস্ট।
"তোমাকে আমি সুখনিবাসে দেখেছিলাম ঠিক কিন্তু কথা হয়ে উঠেনি। লতার কাছে থেকে তোমার সম্পর্কে জেনেছিলাম। "
"বুবুও আপনার কতা আমারে কইছে ভাবিজান। আপনে মেলা ভালো তাও কইছে। বুবুই তো আমারে জোরজবরি কইরা সক্কাল সক্কাল পাঠাইছে।"
শেহরিন কেটে রাখা মাংসগুলোতে মশলা মাখতে মাখতে বলে,
"লতা নিজেও ছোট মানুষ। তুমিও ছোট মানুষ। কিন্তু তোমাদের কথা শুনলে মনে হয় তোমরা অনেক বড়।"
"বাইরের দুনিয়ায় জবান না ফুটাইলে চলে না গো ভাবিজান। চুপ থাকুম, মুখ বুইজ্জা সহ্য করুম ওতো ধৈর্য্য আসে না।"
"এতো অল্প বয়সেই বিয়ে করে ফেলেছো। তোমার উনি কি করে?"
শেফালী মার্বেল পাথরের টাইলসে ঝাড়ু দিতে দিতে নিঃসঙ্কোচ ভঙ্গিতে উত্তর দেয়,"চুরি করে।"
"হ্যাঁ?"
"চুরি করে ভাবিজান। তয় এহন জেলে আছে। ভাইজান রে কইছি এবারই শেষ। বাইর কইরা দেন। দড়ি দিয়া হাত পাও বাইন্ধা থুমু এইবার দেহি কোনদিয়া চুরি করবার যায় হারামজাদা।"
শেহরিন হাতের কাজ থামিয়ে অবাক চোখে পিছু ঘুরে তাকায়। নির্বিকার চিত্তে ফ্লোর ঝাড়ু দিতে থাকা শেফালীর কথা শুনে সে নিজে বিস্মিত হলেও শেফালির সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
"চুরি করে?"
"হয়।"
"কেনো?"
"দুক্কের কথা কি কয় কন,এডাই যে তার পেশা।"
"তুমি কিছু বলোনা?"
"কই তো, ওরে মুখপোড়া মিনসে, চুরি যহন ছাড়বারই পারবি না তয় একটু ভালোমতো চুরি করা শেখ আগে। পুলিশ তো তোর লেজ ধইরা থায়ে সবসময়। ধরা পড়োস হক্কলডির আগে।"
শেহরিনের চোখ দুটো ক্রমেই বড় হয়ে যায়। গোল গোল চোখে সে এক দৃষ্টিতে শেফালির দিকে তাকিয়ে থাকে। শেফালির কথাগুলো তার নিকটে দূর্ভেদ্য লাগছে। চেপে থাকা ঠোঁট উন্মুক্ত করে বলে, "চুরি করা তো ভালো না শেফালি। তুমি মানা করো না কেনো?"
" চুরি করা তো ভালো না হেইডা আমিও জানি। তয় আমি আমার সোয়ামিরে একছের ভালোবাসি। এর লেইগা হের পেশারেও ভালোবাসতে হয়। তয়, এইবার আর ভালোবাসুম না।"
শেহরিন লম্বা করে দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ে। এই জীবনে আর কত রঙের মানুষ দেখবে সে। রঙধনুর সাত রঙ ও যেনো এর কাছে কিছু নয়৷ সে শেফালির হতে দৃষ্টি সরিয়ে নিজ কাজে মত্ত হয়। ইউটিউবে আরো একবার ঝাল রোস্টের রেসিপিটাতে চোখ বুলিয়ে নেয়।
"ভাবিজান চামচ দিয়া মশলা মাখাইলে স্বাদ লাগে না। দেন আমি হাত দিয়া মশলা মাইখা দেই। হাত দিয়া কোনো কিছু মাখাইলে তার স্বাদ বাইরা যায় মেলা।"
"সত্যি?"
শেফালি দুহাত মুছে হাসতে হাসতে বলে,"হয় সত্যি। হাতের রান্ধনের স্বাদই আলাদা। দেহি দেন।"
"আরে না..না তোমার করতে হবে না। আমি করছি।"
"আল্লাহ পাগল হইছেন আপনে? হাতে ঝাল ধইরা ছারখার হইয়া যাইবো। আপনার তো অভ্যেস নাই।"
শেহরিন মিষ্টি হেসে শেফালির দিকে তাকিয়ে বলে, "তোমার ঝাল লাগবে না?"
"আমি নিজেই মরিচ। আমার আর কি ঝাল লাগবো। আমার এসবে অভ্যেস আছে। নাড়ীর থেইকা পড়ছি তো কাম কইরা খাই।"
"ঠিক আছে আমি ও অভ্যাস করি তাহলে। অভ্যাস না করলে শিখবো কবে বলো?"
"হাত জ্বলবো ভাবিজান। আপনে যদি এসব করেন তাইলে আমি কির লাইগা কন?"
" এই যে তুমি আমাকে এতো সুন্দর একটা টিপস দিলে হাত দিয়ে কোনো কিছু মাখিয়ে দিলে সেটার স্বাদ বেশি হয়। এটা তো আমি জানতাম না। এটা শিখলাম। এর জন্যই তুমি। আমাকে এভাবে একটু বলে কয়ে দিবে শুধু তুমি।"
শেফালি শেহরিনের পানে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলে,
"আচ্ছা আপনে এতো সুন্দর কইরা কথা কন ক্যামনে ভাবিজান। আপনের ব্যবহার আমার মেলা ভালো লাগছে। আল্লাহ চান্দের সাথে চান্দ মিলাইয়া দিছে। বড়লোক ঘরের মাইয়া হইয়াও কি সুন্দর কথার চলন। অহংকার নাই।"
"প্রশংসায় তো গলে যাচ্ছি মেয়ে। শোনো শেফালি, তুমি সংসারের যা যা জানো সেগুলো আমাকে শেখাবে। এই ছোট ছোট টিপস গুলো আমাকে বলবে কেমন?"
"আইচ্ছা কমুনি। তয় আমরা ভাত ভর্তা খাইয়া অভ্যস্ত ভাবিজান। বড় বড় রান্দনের ওসব তো বুঝি না।"
"কোনো সমস্যা নেই। তুমি যেটুকু জানবে আমাকে ততটুকু বললেই হলো।"
শেফালি মাথা নাড়িয়ে বাকি কাজগুলোতে মনোনিবেশ করে। তার কাজর সময়ও প্রায় শেষদিকে। সাড়ে বারোটা বাজলেই সে প্রস্থান নিবে। এর বেশি হলে আবার দম আটকে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
শেহরিন মাংসটা কষানোর মাঝে নাকে গন্ধ আসতেই চোখ মুখ খিঁচে ফেলে। বাম হাত গলার নিচে রেখে নিজেকে দমানোর চেষ্টা করে। কোনোকিছুর কড়া গন্ধই কেনো জানি তার সহ্য হচ্ছে না৷ নাকে আসলেই পেটের নাড়িভুঁড়ি উল্টো পাকিয়ে আসে।
"শে..শেফালি একটু দেখো তো আমি আসছি।"
শেহরিন পারে না নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে। গলা উগড়ে বমি আসে তার। একছুটে বাহিরের বেসিনে গিয়ে সে গড়গড় করে ব'মি করে ফেলে। কাশতে কাশতে চোখে পানি এসে হাজির হয়।
কিছুক্ষণ বমি করা শেষে হাঁপিয়ে ওঠে সে। লম্বা করে শ্বাস টেনে পানি ছেড়ে চোখে মুখে ঝাপটা দিতে থাকে।
"ভাবিজান কষ্ট হইতাছে।"
"নাহ। ঠিক আছি।"
"আহারে কেবল তো শুরু। চাইর মাস পাঁচ মাস এমন ধারা চলবো।"
শেহরিন ঠোঁট ফুঁড়ে নিঃশ্বাস টেনে টাওয়েল দিয়ে চোখ মুখ মুছে নেয়। ক্লান্ত কন্ঠে বলে," তারপরে আর হয় না?"
"কইমা যায়।"
"চুলার আঁচ কমিয়ে দাও। আমি শাওয়ার নিয়ে আসছি এক্ষুণি।"
"আইচ্ছা।"
-----------------------------------------------------
যোহরের আযান শেষ হয়। শেহরিন শাওয়ার নিয়ে এসে পোলাওটা করে ফেলে তড়িঘড়ি করে । যাওয়ার সময় শেফালি পানির অনুপাতটা তাকে বুঝিয়ে গিয়েছে সেই অনুযায়ী করতে তার সমস্যা হয়নি। বরং এর আগে একবার যখন করেছিলো সেটার চেয়ে আজকে বেশ ভালোই হয়েছে।
"আপনি নামাজ শেষ করে সোজা বাসায় আসবেন। লাঞ্চ করে তারপরে আবার যাবেন।"
"শেহরিন আজকে একটু ব্যস্ত। লাঞ্চে বাসায় যাওয়াটা..
" আপনি আসবেন কি না সেটা বলুন.. "
ফোনের অপর পাশের ব্যক্তি খানিকক্ষণ নিরব থাকে। অর্ধাঙ্গিনীর ঝাঁঝালো কণ্ঠে চুপসে যায় সে। অতঃপর দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে," আসছি ম্যাডাম।"
শেহরিন ফোন নামিয়ে ঠোঁট চেপে হাসে। নেতাসাহেবকে পরাস্ত করতে পেরে বিজয়ী হাসি হাসে সে। ঘড়ির দিকে এক নজর চোখ বুলিয়ে চলে যায় লাঞ্চের জন্য ডাইনিং ডেকোরেট করতে।
তৈরিকৃত খাবারগুলো টেস্ট করে তার কাছে অ্যাভারেজই লেগেছে। পোলাওটা বেশ ঝুরঝুরে হয়েছে। কিন্তু ভয় ঝাল রোস্ট নিয়ে। তার কাছে মোটামুটি ঠিকই লাগছে। এখন এর আসল স্বাদ যে কেমন সেটা নিয়ে খানিকটা দ্বিধাগ্রস্ত। রোস্টের গ্রেভিটা টেস্ট করতে করতে প্রায় অর্ধেকটা চলে এসেছে। তবুও সে অ্যাকুরেটভাবে বুঝতে পারছে না। যতবার টেস্ট করছে ততবার নিজমনকে বুঝ দিচ্ছে সব ঠিক আছে। আদৌও ঠিক আছে কি না কে জানে।
"আর একবার ফাইনাল টেস্ট করবো শুধু। প্রমিস এরপরে উনি না আসা পর্যন্ত এদিকটায় আসবোই না।"
নিজ মনকে বুঝ দিয়ে সে সার্ভিং বোল হতে আরো একবার গ্রেভি টেস্ট করে। আতঙ্কগ্রস্ত মন নিয়ে সে বুঝায় সব ঠিকঠাকই আছে। ভালো লাগবে খেতে। কোনো ভয় নেই। অতঃপর টেবিলটা সুন্দর করে সেটআপ করে চিনামাটির ঝকঝকে প্লেটের পাশে ফ্লাওয়ারস ভাস এনে রাখে। ধূসর প্লেসম্যাট কাটলারি আইটেম গুলো গুছিয়ে চলে যায় নিজেকে সাজাতে।
আজ হঠাৎ করে শেহরিনের ভিতরে নতুন উদ্যমের হাওয়া বইছে। নিজ হাতে সংসারের কাজগুলো করতে বেশ লাগছে। যদিও ডান হাতের তালু তার আগুন জ্বলা জ্বলছে মশলা মাখার কারণে। তবুও সেদিকটায় বিশেষ একটা পাত্তা নেই তার। আজ শুরু, অভ্যাস হয়ে যাবে।
সুতোর বুননে গাঢ় লাল খয়েরি রঙের একখানা সুন্দর সালোয়ার কামিজ পড়েছে সে। হাতার দিকে সোনালি জরির কাজ গুলো রোদের আলোয় ঝলমল করছে । ভেজা চুলগুলো গুছিয়ে কাঁধ বরাবর ছেড়ে একজোড়া কানের দুল পড়ে নেয়। আয়না নিজেকে এ পৃষ্ঠে ও পৃষ্ঠে দেখতে দেখতে ঠোঁটে লাজ রঙা হাসি চাপায়।
ঠিক দুটোর দিকে কলিংবেলের ঝংকার উঠে। শেহরিন ঘড়ির দিকে তাকাতেই দেখতে পায় দুটো বাজতে চলেছে। সেই সাথে ঘটেছে নেতাসাহেবের আগমন।
একরাশ লজ্জাকে সঙ্গী করে দৌড়ে যায় সে দরজা খুলতে। নব ঘুরানোর সঙ্গে সঙ্গে সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত সুর্দশন পুরুষের দেখা পায়। চোখের দৃষ্টি এলোমেলো রেখে আড়ষ্ট কন্ঠে বলে,"জনগণের এমপি সাহেবের সময় হলো তাহলে?"
"জনগণের থেকে শেহরিনের এমপি সাহেব হতে সময় লাগলো একটু।"
হাতে একগুচ্ছ শুভ্র গোলাপের সম্ভার নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে সান্নিধ্য। বাড়িয়ে দেয় শেহরিনের পানে। ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি নিয়ে শেহরিন হাত বাড়িয়ে নেয় তা। উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায় তার নেতাসাহেবকে।
" বেশি চাপ সৃষ্টি করে ফেললাম আপনার কাজে?"
" নেত্রীসাহেবকে দেখে চাপ মনে হচ্ছে না এখন।"
"আস্কারা দিলে কিন্তু যখন তখন হুকুমজারি করে বসবো।"
সান্নিধ্য একহাতে টেনে শেহরিনকে নিজের বুকে নিয়ে আসে। আলতোহাতে মুখের উপর আছড়ে পড়া চুলগুলোকে সরিয়ে একটা গোলাপ ছিঁড়ে নেয়। শেহরিনের কানে গুঁজে দিয়ে শীতল গলায় বলে,"ফুলের কানে ফুল। পরিপূর্ণ লাগছে এখন। "
শেহরিন চোখ তুলে তাকায় তার নেতাসাহেবের পানে। খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির ভাঁজে দুহাতে গাল ছুঁইয়ে দিয়ে বলে,"কত রূপে ভালোবাসেন আপনি আমায় নেতাসাহেব?"
সান্নিধ্য খানিকটা ঝুঁকে তার প্রিয় ফুলের চোখে চোখ রাখে। হিম জড়ানো কন্ঠস্বরে বলে,
"শতরূপে শতবার ভালোবাসি। আপনি একটাই মানুষ অথচ, প্রতিবারই আমার কাছে আসেন নতুন মোড়কে। একটা স্নিগ্ধ ফুল, আলোয় মোড়ানো চাঁদ হয়ে । আপনার মোহে আমি দুনিয়া ভুলে যাই ম্যাডাম। আপনাকে ভালো না বেসে থাকা যায় না। তাই আমারও ভালোবাসা শেষ হয় না।"
শেহরিনের চোখে পরিতৃপ্তির ছায়া এসে ভীড়ে। মধ্যদুপুরের ভাতে ঘুমের মতো শান্তি এসে গা ছুঁইয়ে যায়। এই স্বীকারোক্তি, এই শব্দগুলো তাকে প্রাণবন্ত করে তোলে। বলতে ইচ্ছে করে,"আপনার মোহেও আমি জগত ভুলে যাই নেতাসাহেব। আপনার ভালোবাসা আমাকে বাঁচতে শেখায়,লড়াই করতে শেখায়,সামনে এগিয়ে যাওয়ার দ্বার খুলে দেয়। এভাবেই সঙ্গে থাকুন। এভাবেই আগলে রাখুন। আপনার যত্নে আমার ভিতরে অঙ্কুরিত বীজগুলো প্রস্ফুটিত হোক। আপনার শেহরিন সান্নিধ্য পেয়ে বেঁচে থাকুক আজীবন।"
"ভালোবাসি আপনাকে।"
"আপনাকেও।"
কমলা রঙের রোদে পোড়া দুপুরে ঝিরিঝিরি হাওয়া এসে বয় জানালার ধারে। দুজন কপোত-কপোতী নতুন সংসারে শুক্রবারের দিনটাকে করে তোলে স্পেশাল। প্লেটে চামচে টুংটাং শব্দ ভেসে আসে। খাবারের স্বাদ ভুলে গল্পে হাসিতে জমে উঠে তাদের আদুরে মুহুর্ত। যে মুহুর্ত তাদের জীবনকে ঠেলে দেয় নির্ভয়ে সামনে এগিয়ে যেতে আরো একবার।