রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি

পর্ব - ৪৬

🟢

বিকেল চারটা। আধভেজা কুয়াশা নামছে শহরের বুকে। ঠান্ডা হাওয়ায় জমে আছে মানুষজন। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে চোখ বুলালে দেখা যায় সময় কিভাবে দৌড়ে ছুটে চলেছে সবকিছু ছাপিয়ে। এইতো অক্টোবরে শিউলি এলো মিষ্টি সুবাস নিয়ে। এর মাঝেই দেখতে দেখতে ডিসেম্বরের শেষ প্রান্ত এসে থেমেছে দ্বারে। ওদিকে আবার আগমনী পায়তারা জানুয়ারীর। দু একদিন পরেই হাজির হবে সে।

নতুন যাত্রায় আজ পাঁচ মাস শেষে ছয় মাসে পা দিলো শেহরিন। এসেছে হসপিটালে রেগুলার চেক আপে। ডা:ফারজানা হাসিনের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিচ্ছে সে। আগের তুলনায় পেটের আকার তার বেড়েছে বেশ খানিকটা। তবে শরীরের ওজন দুই কেজি বেড়ে হয়েছে মোটে বায়ান্ন কেজি।

প্রয়োজনীয় সমস্ত কার্যাবলি সম্পন্ন হতে ব্যয় হয় না খুব বেশি সময়। এমপি সাহেবের ওয়াইফ হিসেবে আলাদা আতিথিয়েতা কিংবা খাতির যত্ন বরাদ্দকৃত থাকে শেহরিনের জন্য। তার উপরে তো স্বয়ং এমপি সাহেব আজকে সঙ্গে এসেছেন। হসপিটালের অথোরিটি গণ এসে কুশল বিনিময় করে যায় তার সাথে।

চেকআপের রিপোর্ট মোটামুটি ভালোই এসেছে। তবে একটু সমস্যা হয়েছে ইনসমনিয়া এবং ইউরিনে। ডক্টর ম্যাম মেডিসিন সেই সাথে সর্বোচ্চ ৪-৫ কেজি ওজন বাড়াতে বলেছে শেহরিনকে। আর এতেই মুখ লটকে রেখেছে সে। খাবারের প্রতি একরাশ অনীহা তার। বমির ভাব কিছুটা কমে এলেও রুচি বাড়েনি একটুও।

সব কার্য সম্পাদন হয়। কিছুটা সময় পেরোতেই এভারকেয়ার হসপিটালের গেট হতে বেরিয়ে যায় এমপি সাহেবের কালো রঙের এসইউভি গাড়ি। ঠিক তার পেছন পেছন বের হয় আরেকটি সিকিউরিটি জিপ। চলতে থাকে সামনের গাড়িকে অনুসরণ করে।

"খারাপ লাগছে?"

"ক্লান্ত লাগছে একটু।"

"এখন থেকে খাবারের পরিমাণ বাড়বে। ঠিকমতো খাওয়া দাওয়াটা কন্টিনিউ রাখলে শরীর সুস্থ থাকবে।"

শেহরিন চোখ বন্ধ করে সান্নিধ্যের কাঁধে মাথা রাখে। ঠোঁট ফুঁড়ে নিঃশ্বাস ছেড়ে নিস্তেজ গলায় বলে,

"এ সময় গুলো তাড়াতাড়ি পার হয় না কেন? মনে হচ্ছে ছয়মাসকে টেনে নয় মাসে নিয়ে আসি। এখনই শরীর এতো ক্লান্ত লাগে। সামনে তো দিন পড়েই আছে।"

"এক্সাম শেষ হবে কবে?"

"এই উইকেই।"

সান্নিধ্য শেহরিনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলে,

"আর একটু কষ্ট করো। তারপরে ফ্রি।"

"এক্সাম ভালো হচ্ছে না নেতাসাহেব।"

"অ্যাভারেজ?"

"হু।"

"এজন্যই কি মন খারাপ আপনার?"

"মন খারাপ আমার ইদানিং কারণ ছাড়াও হচ্ছে, না ছাড়াও হচ্ছে। ভালো লাগে না কিছুই। ভয় লাগে শুধু। আচ্ছা আমি সব ঠিকঠাক পারবো তো বলুন?"

শেহরিনের আকুল চাহনি দেখে সান্নিধ্য ক্ষীণ হাসে। চোখের পাতায় আশ্বস্ত করে হাতের উপর হাত রেখে বলে,"কোনো ভয় নেই। সব ঠিকঠাক হবে এবং আমার বিশ্বাস তুমি সবটা সামলে নিতে পারবে।"

"আপনি যতক্ষণ সাথে থাকেন ততক্ষণ দূর্বলতা আমাকে গ্রাস করতে পারে না,কিন্তু যখনই একা একা থাকি নানান উল্টা পাল্টা চিন্তা ভাবনা জট পাকিয়ে আসে মস্তিষ্কে। আমাকে পাগল করে ফেলে। আমি ভীষণভাবে ভেঙে পড়ি। এতো নেগেটিভিটি কাজ করে আমার মধ্যে। আমি খুব চেষ্টা করি এসব থেকে নিজেকে দূরে রাখার জানেন, কিন্তু পেরে উঠি না। কোথাও কোনো কিছুর একটা শূন্যতা আমাকে কঠিনভাবে ভোগায়।"

সান্নিধ্য চুপচাপ শুনে যায় তার অর্ধাঙ্গিনীর কথা। বুঝতে পারে আসল সমস্যাটা কোথায়। লং টাইম ডিপ্রেশনের মধ্যে কাটিয়ে আসা একটা মেয়ের জন্য, প্রেগনেন্সি জার্নিতে একাকী সময় পার করা বড় একটা রোগের সঙ্গে যুদ্ধ করার সমান। এই সময় দরকার একটা পরিবার, চেনা পরিচিত মানুষজন। মায়ের মতো স্নেহের একটা হাত, স্নেহের কোল। দূর্ভাগ্যবশত মেয়েটা এই মূল্যবান সম্পদ হতে বঞ্চিত। তার এই কথাগুলোতেই বোঝা যায় সে তার মায়ের ছায়াকে মিস করছে ভীষণ। সবশেষে চিরন্তন সত্যি একটাই, মায়ের আসনে শুধু একজন মা ই বসতে পারে। সেখানে কোনোভাবেই অন্য কাউকে মানায় না।

------------------------

চলন্ত গাড়ি ছুটছে ডবল মুরিং এলাকা ধরে। কুয়াশার খুব বেশি আমেজ না থাকায় শীতকালে সাধারণত বিকেলের সময়টাতে রাস্তাঘাট প্রাণচঞ্চলে ভরা থাকে। বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কার, রিকশা সবকিছুই যেন পাল্লা দিয়ে গন্তব্যের দিকে ছুটে চলেছে। রাস্তার দুপাশের দোকানগুলোতে শীতের খাবারের পসরা সাজিয়ে হয়ে উঠেছে জমজমাট এক অবস্থা।

বাহিরের দিকে নজরকৃত দৃষ্টি হঠাৎই সরু হয়ে আসে সান্নিধ্যের। কিছু একটা গন্ডগোল ভেবে ড্রাইভিং সিটে বসারত রিমনের দিকে তাকাতেই রিমন মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ জানায়। সঙ্গে সঙ্গে এমপি সাহেবের মুখোরেখা হয়ে উঠে ইস্পাতের ন্যায় শক্ত। কপালের রগ ফুটে উঠে কাঠিন্যেতায় ছেয়ে যায়।

একটা সাদা হ্যাচবাক আর একটি কালো মাইক্রোবাস চোখের পলকে অস্বাভাবিক গতিতে তাদের পাশ কাটিয়ে সামনে চলে যায়। কিছুটা দূরে গিয়ে,গাড়ি থামিয়ে পুরো রাস্তা ব্লক করে ফেলে। উইন্ডোর গ্লাস নামিয়ে পিস্তল উঁচিয়ে ধরে ক্রুর হাসি হাসে রজত সমাদ্দার। নাসির চৌধুরীর ডান হাত কিংবা বাম হাত সে।

সান্নিধ্য গাড়িগুলোর হতে দৃষ্টি সরিয়ে চোখের ইশারায় রিমনকে গতি কমানোর নির্দেশ দেয়। অতঃপর বুকে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে থাকা নাজুক কামিনীর দিকে তাকিয়ে ধীর কন্ঠে ডেকে বলে,"শেহরিন।"

"হু।"

"সামনে রাস্তায় হয়তো কোনো সমস্যা হয়েছে। রিমনের ড্রাইভিং করতে এখন একটু অসুবিধা হবে। ঝাঁকুনি কিংবা লাউড নয়েজ হতে পারে। তুমি এরকমভাবেই থাকো, চোখ খোলা কিংবা মাথা তোলার দরকার নেই ঠিক আছে?"

শেহরিন বুক হতে মাথা তোলা মুহুর্তে সান্নিধ্য বাঁধা দেয়। শীতল চাহনিতে তাকিয়ে বলে,"প্লিজ?"

"কি সমস্যা হয়েছে?"

"হয়তো কোনো সমস্যা। একটু কো অপারেট করো?"

শেহরিনের ভ্রু দ্বয় খানিকটা বাঁকা হয়ে আসলেও সান্নিধ্যের শান্ত শীতল চাহনি দেখে আর কথা বাড়ায় না। মানুষে মানুষে সমস্যা নাকি, রাস্তাঘাটের সমস্যা বিষয়টা অজানা রেখে সে ছোট করে নিঃশ্বাস ফেলে। চুপচাপ সান্নিধ্যের কালো ডেনিম জ্যাকেটের মাঝে মুখ লুকিয়ে চোখজোড়া বন্ধ করে নেয়।

সান্নিধ্য বামহাতে শেহরিনকে জড়িয়ে রেখে ডান হাতে সন্তপর্ণে কোমড়ের ভাঁজে লুকিয়ে রাখা পিস্তল বের করে। সামনে দাঁড়ানো গাড়িটি হতে তাদের গাড়ির দূরত্ব প্রায় কাছাকাছি এসে গিয়েছে। আর একটু হলেই যেন একদম মুখোমুখি হবে।

রিমন নিজস্ব কায়দায় গাড়িটাকে হ্যান্ডেল করতে করতে পিছনে আসা সিকিউরিটি জিপকে সামনে যাওয়ার পথ করে দেয়।

সিকিউরিটি জিপটি ফাঁকা পথ পেতেই দ্রুত এগিয়ে যায় সামনে। কিন্তু জনবহুল রাস্তা হওয়ায় উভয়ই চতুরতার সাথে একে অপরকে গর্জন দেখায়। সরাসরি অ্যাকশানে যেতে কেউই আগ বাড়ায় না।

"স্যার ডিরেক্ট হিট করি?"

"নো। রাস্তায় মানুষজন আছে। প্যারালালে ট্রাকল করো।"

"ওকে স্যার।"

সিকিউরিটি জিপটি নির্দেশনা পেতেই সামনে হতে সরে সাইড থেকে জোরালোভাবে ট্রাকল করা শুরু করে। দুটো গাড়ির লোহার সাথে লোহার ঘর্ষণে চিড়চিড় শব্দে আগুনের ন্যায় ফুলকি ছিটকে পড়তে থাকে। গিয়ারের গর্জনে আশেপাশে সবাই হতভম্ব চোখে তাকায়।

সান্নিধ্যের ভিতরে তুফান বইলেও চুপ করে থাকে শুধু মাত্র দায়বদ্ধতার কারণে। হাতে রাখা পিস্তলটাকে চাইলেও ব্যবহার করতে পারে না। সিকিউরিটি জিপটি একা দুটো গাড়িকে ট্রাকল দিচ্ছে। এই মুহুর্তে যদি শেহরিন না থাকতো তাহলে এমপি সাহেব নিজের নিয়ন্ত্রিত খোলস ছেড়ে সোজা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে কিছু একটা করে ফেলতো। পারছে না শুধু মাত্র তার শেহরিনের জন্য।

চোখজোড়া হতে তার আগুন ঝড়ছে। ডান হাতে শক্ত করে পিস্তল চেপে ধরে গভীর শ্বাস টেনে নিয়ে সামনে দৃষ্টি রাখে।

চলমান সংঘর্ষের মধ্যে হঠাৎ প্রতিপক্ষের গাড়ি থেকে রজত সমাদ্দার বন্দুক তাক করে, সরাসরি সান্নিধ্যের বসারত সাইডের জানালার দিকে। নিশানা ঠিক রেখে হিংস্র চাহনিতে ট্রিগার প্রেস করতে নেয় না সময়। আকাশ ফুঁড়ে শব্দ ভেসে আসে। কলিজা কেঁপে ওঠে চারপাশের মানুষদের। শেহরিন আঁতকে চোখ খুলে ফেলে।

চোখের পলকে ছুটে আসা গুলিটি সান্নিধ্যের লাগার আগেই লেগে যায় অন্য জায়গায়। ব্যস্ত রাস্তায় হুট করেই মাঝখান দিয়ে ঢুকে পড়ে একটা সিএনজি। গুলিটি গিয়ে সরাসরি লাগে সিএনজিটির সামনের কাঁচে। ভয়ানক শব্দে পুরো কাঁচ গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যায় মুহুর্তেই। ছিটকে এসে বড় কাঁচটা সান্নিধ্যের গাড়ির জানালায় আঘাত করে।

বিষম সময়ে সান্নিধ্য দ্রুত পিস্তল ফেলে ডান হাত দিয়ে জানালা চেপে ধরে । কাঁচের টুকরোগুলো যেন শেহরিনকে কোনভাবে স্পর্শ করতে না পারে সেজন্য নিজের হাতকে বানায় বেষ্টনী। যার ফলে ধারালো কাঁচের টুকরো একদম তার হাতের মাংসে গেঁথে যায়। রক্ত বেরিয়ে জানালার কাঁচের সঙ্গে লেপটে ঘোলাটে হয়ে যায়। ফোঁটা ফোঁটা আকারে চুয়ে পড়ে সিটের উপর।

শেহরিন কিছু একটা ভেবে সান্নিধ্যের বারণ উপেক্ষা করে মাথা তুলে তাকায়। সঙ্গে সঙ্গে তার নজরে আসে নেতাসাহেবের রক্তাক্ত হাত। অথচ মানবটা একইভাবে স্থির হয়ে আছে। তার মুখে নেই ব্যথার নূন্যতম প্রতিচ্ছবি।

"র..রক্ত?? আপনার..হাতে?"

শেহরিনের চোখ বড় বড় হয়ে যায় চোখের সামনে ভাসমান দৃশ্য দেখে। অস্থির হয়ে উঠে মুহুর্তেই সে। আতঙ্কিত কন্ঠ বাড়িয়ে বলে, "কি..কিভাবে হলো? হাত ছাঁড়ুন।'

"কিছু হয়নি শেহরিন। প্লিজ শান্ত হও। বাইরে থেকে কাঁচ এসে লেগেছে।"

"রক্ত..রক্ত পড়ছে আপনার।"

শেহরিনের অস্থিরতা সেই সাথে একরাশ ভয় দেখে সান্নিধ্য জানালা হতে হাত নামিয়ে নেয়। নিয়ন্ত্রিত ভঙ্গিতে রিমনকে ড্যাশবোর্ডের গ্লোভ বক্স হতে ফাস্ট এইড কিটস বের করতে বলে তাড়াতাড়ি।

"আমি ঠিক আছি শেহরিন। রক্তে তো তোমার ফোবিয়া। তুমি অন্যদিকে তাকাও। এটা দেখলে খারাপ লাগবে তোমার।"

শেহরিনের চোখে জল জমে গিয়েছে। রক্ত দেখামাত্র তার শরীর ঘেমে উঠেছে। গায়ে জড়ানো পশমিনার শালখানা একটানে খুলে ফেলে সে। রক্ত, চারপাশে গাড়ির হর্ণ, আকাবাঁকা গাড়ির চলন সব মিলিয়ে সে হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। নাজুক শরীর মনে হচ্ছে আরো ভেঙে পড়বে। অস্ফুটস্বরে দু'হাত মুখের উপর রেখে আওড়ে উঠে সে।

সান্নিধ্য শেহরিনের অবস্থা দেখে যতদ্রুত সম্ভব রোল ব্যান্ডেজ দ্বারা ক্ষতস্থানটা পেঁচিয়ে নেয়। হাতের তালুতে লেগে থাকা ছোট ছোট কাঁচের টুকরো ছাড়ানোর সময়টুকু নেয় না।

অস্থিতিশীল সেই সাথে আতঙ্কিত পরিবেশে সিকিউরিটি গাড়িটি বাধ্য হয় সায়লেন্সার লাগানো পিস্তল ব্যবহার করতে । জনমানবে ঘেরা পরিবেশ দেখে চেয়েছিলো স্বাভাবিক ওয়েতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার। কিন্তু হায়েনার দলগুলো সে সুযোগ দেয়নি। যার কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে হামলাকারী গাড়িগুলোকে একের অপর এক ধাক্কা দিয়ে দিয়ে ব্যালেন্স নষ্ট করে দেয়। সতর্কিত ভঙ্গিতে তিন চারটা গুলি ছুঁড়ে অচল করে দেয় গাড়ির চাকা। এমপির গাড়িটাকে নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি করে দেয় বিস্তর রাস্তা।

"স্যার গো এহেড, উই আর প্রোভাইডিং কভার।"

রিমন কাঙ্ক্ষিত ইশারা পেতেই এক্সিলারেটরে জোরে প্রেশার দেয়। সাপের মতো পেঁচিয়ে ব্লক করা গাড়িগুলোর ফাঁক গলে বেরিয়ে যায় এক ঝলকে।

সান্নিধ্য পিছন ফিরে তাকায় না। তার পুরো মনোযোগ এখন তার সাথে লেপটে থাকা স্ত্রীর উপর। উদ্ভট এক পরিস্থিতিতে মেয়েটা প্রচন্ডরকমে ভয় পেয়েছে।

______________________________________

"জানোয়ারের বাচ্চাগুলোকে সোজা ডিসি হিলে নিয়ে যাও। কেউ ওদের গায়ে হাত দিবে না। আমি আসছি। যা করার আমি করবো।"

অগ্নিঝরা কন্ঠে নির্দেশবার্তা দিয়ে ফোন কাটে সান্নিধ্য। শেহরিনকে অ্যাপার্টমেন্টে নামিয়ে দিয়ে সে এখন বের হবে তার কাজে। মেয়েটার গাড়ি হতে নামার সময়টাকে কাজে লাগিয়ে সে মুহুর্তে কল সেড়ে নেয় আসিফের সঙ্গে।

"আমি দেড় বা দুই ঘন্টার মধ্যেই আসছি।"

"কোথায় যাবেন এখন আপনি?"

"একটা দরকারি কাজ পড়ে গিয়েছে।"

শেহরিন বিচলিত চোখে নেতাসাহেবের হাতে ব্যান্ডেজের দিকে তাকায়। রক্তের ছোপ ছোপ দাগ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই হাত নিয়ে উনি আবার যাবেন কাজে।

"না গেলে হবে না?"

"একটু বেশিই দরকার।"

"মারামারি করতে যাবেন?"

শেহরিনের সন্দেহমাখা দৃষ্টি এবং অনুমান করা দেখে হেসে ফেলে সান্নিধ্য। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে শান্ত গলায় বলে," আপনার নেতাসাহেব মারামারি করে না।"

"কি করে তাহলে?"

"করে কিছু একটা।"

"আপনি কি জানেন আপনার হাত দেখে আমার কতটা খারাপ লাগছে। এই অবস্থায় আবার বের হচ্ছেন। আমি বুঝতে পারছি, আপনি রাস্তায় সেই সমস্যা সৃষ্টি করা মানুষদের কাছেই যাচ্ছেন। গিয়ে কি করবেন আল্লাহ ভালো জানেন। এজন্যই আমার মূলত রাজনীতি অপছন্দ। যারা রাজনীতি করে তাদের সঙ্গে শুধু শত্রুর বসবাস।"

ঠান্ডা শীতল সন্ধ্যালগ্নে সান্নিধ্য শেহরিনের কপালে জমা বিন্দু বিন্দু ঘামগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করে। মেয়েটার গলার কাঁপুনি স্বর, বিচলিত চোখ সেই সাথে অস্থির মুখোরেখা দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে তার ভিতরে কি চলছে। তবুও নিজেকে উপরে উপরে শক্ত রাখার কি বৃথা চেষ্টা।

"রাজনীতি নিয়ে আমি তোমার সঙ্গে এসে ডিবেট করবো। এখন তুমি উপরে যাও। রেস্ট করো। ফ্রুটস কেটে রাখা আছে, আমি আসার আগে সবগুলো শেষ করবে। একটা পিস বাদ যেন না থাকে।"

শেহরিনকে আর কোন প্রকার কথার সুযোগ না দিয়ে সান্নিধ্য তাকে দ্বিতীয় তলার কাছাকাছি অব্দি এগিয়ে দিয়ে দ্রুত পায়ে নিচে চলে আসে। পরনের সাদা ক্রু নেক টি শার্টের উপরে কালো ডেনিম জ্যাকেটটা খুলতে খুলতে গাড়ির কাছে এসে ব্যাক সিটে ছুঁড়ে মারে। ভিতরের জ্বলন্ত রূপটা তার দু'হাতের পেশিতে প্রতীয়মান হয়। টি শার্টের হাতার ভাঁজে ফুটে উঠে তা কঠিনভাবে।

বিজ্ঞাপন

"সানজি, শেহরিনের কাছে কি তুই দু ঘন্টার জন্য আসতে পারবি?"

"কোনো সমস্যা হয়েছে?"

"হু।"

"আচ্ছা আমি আসছি।"

"ওকে একটু সাহস দিবি। মেয়েটা ভয় পেয়েছে।"

"ঠিক আছে।"

রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি বাংলা গল্প pdf সাহিত্য

সন্ধ্যা গাঢ় হয়। কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে জ্বেলে উঠে এক একে নিয়ন বাতি। ঠান্ডা আমেজের মাঝে উষ্ণতায় ডুবে থাকা রমণী

সান্নিধ্যের বলার সঙ্গে সঙ্গে ঝড়ের বেগে এসে হাজির হয়েছে শেহরিনের কাছে। করেনি এক মুহূর্ত কালক্ষেপণ। বাসায় পরিহিত জামার উপর একটা কার্ডিগান জড়িয়ে ওমনি বের হয়ে এসেছে সে।

"কুল কুল ভাবিজান কুল।"

"আমি কুল হতে পারছি না আপু।"

ধোঁয়া উঠা কফিতে চুমুক টেনে সানজি গা এলিয়ে দেয় সোফায়। আয়েশিভঙ্গিতে বলে,"এসব মারামারি হানাহানি যুদ্ধ বিগ্রহ রাজনৈতিক অঙ্গনে পান্তা ভাত। এগুলোতে তারা অভ্যস্ত ভাবিজান। মার খাবে, মার দিবে এটাই হচ্ছে তাদের নীতি।"

"সেটতো বুঝতে পারছি আপু। কিন্তু উনার খুব কি দরকার ছিলো এখন বের হওয়ার? হাত হতে যে পরিমাণে রক্ত ঝরেছে। আমার দেখো বলতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে।"

" শুধু হাতই কেটেছে?"

"হ্যাঁ।"

"তাহলে ঠিক আছে৷"

শেহরিন কপাল ভাঁজ করে সানজির দিকে তাকায়। সানজি শেহরিনের তাকানোর ভঙ্গি দেখে হেসে উঠে। কফি মগটা আলতো করে টেবিলে রেখে বলে," রাগবেন না ভাবিজান। সাধারণত এসব ক্ষেত্রে, হাত পা কপাল মাথা একসাথে কাটা ফাটা হয়ে থাকে। হসপিটালে না গিয়ে উপায় থাকে না। সেখানে শুধু হাত কাটা...ইট’স নরমাল।"

"শরীরে একটা সুচ ফুঁটলেই যে ব্যথা লাগে সেখানে কাঁচ ঢুকেছে আপু। "

"হুহ। তোমার জামাই অতিরিক্ত রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে, সুখনিবাসের ড্রয়িং রুমের কতগুলো ফ্লাওয়ার ভাস যে হাত মুঠো করে ভেঙেছে তার কোন হিসেব নেই।"

"সে কি অনুভূতি শূন্য? পঞ্চম ইন্দ্রিয় কাজ করে না?"

সানজি শেহরিনের কথা শোনা মাত্র সোফা ছেড়ে তড়াক করে উঠে বসে। গোল গোল চোখ করে বিস্মিত গলায় বলে,"ছিঃ ছিঃ,ভাবিজান আপনি এটা বলতে পারলেন?"

"কি বললাম?"

"আমার ভাই অনুভূতি শূন্য?"

"ভুল কিছু বললাম কি? এই যে কাটা ফাটায় সে ব্যথা পায় না। এগুলো কি তার নিউরনে গিয়ে সংকেত পাঠায় না? নাকি এ ডেলটা ফাইবার অচল?"

"ভাবিজান স্টপ.. এভাবে তার সুস্থ সবল ব্রেইনটাকে অচল করে দিবেন না। সে যদি অনুভূতি শূন্য হতো তাহলে কি আর এতোকিছু হতো বলেন? তার মধ্যে তার প্রিয়তমার জন্য যে গভীর অনুভূতি....মাই গড!!

শেহরিন সানজির নাটকীয় ভঙ্গিমা দেখে চোখ সরু করে তাকায়। সে বুঝাতে চাইলো কি আর এই মেয়ে বুঝলো কি। কোথাকার লাইন কোথায় নিয়ে গিয়েছে। এরা ভাইবোনগুলো সব এক ধাঁচের গড়া।

" আপু..."

"অনুভূতি না থাকলে কি অনুভব করা যায়?"

"ওতো গভীরে যেতে বলেছে কে আপনাকে?"

"আমার ভাইয়ের অনুভূতি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে গভীরে যাবো না? এ ডেলটা ফাইবার অচল বলছেন। অথচ যে হারে তার ডোপামিন নিঃসরণ হয়..."

শেহরিন উঠে গিয়ে সানজির মুখ চেপে ধরে। দাঁতে দাঁত চেপে ক্ষীণ গলায় বলে,"দোহাই ম্যাডাম...এবার থামুন। অনেকদূর চলে গিয়েছেন আপনি । আমি আমার কথা ফিরিয়ে নিলাম নিন। আপনার ভাই একজন সচল মস্তিষ্কের অনুভূতি সমৃদ্ধ মানুষ। খুশি??"

"ভেরি খুশি। এই না হলে নেতাসাহেবের বউ।"

শেহরিন ফিক করে হেসে উঠে সানজিকে জড়িয়ে ধরে। নরম গালে টুপ করে চুমু দিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত কন্ঠে বলে, "ধন্যবাদ ম্যাডাম আসার জন্য। এতোক্ষণ একা একা থাকলে নিশ্চিত কেঁদে ভাসাতাম। এখন মন ফুরফুরে লাগছে। প্রজাপতি হয়ে ডানা মেলে উড়তে হচ্ছে করছে।"

"চলুন উড়ি তাহলে ডানা মেলে?"

"কোথায়?"

"বাহিরে ঘুরে আসি?"

"বাহিরে এখন? সেইফ হবে?উনি জানলে তো বকবে?"

"ভাইয়াকে বলি?"

"রাজি হবে?"

"ট্রাই তো করি।"

"আচ্ছা। কিন্তু আমার মনে হয় না রাজি হবে।"

"দেখা যাক।"

সানজি সান্নিধ্যেকে সঙ্গে সঙ্গে ফোন করে। কিন্তু অপর পাশ হতে ফোন রিসিভ হয় না। এটা অবশ্য সানজির ধারনার মধ্যেই ছিলো ফোন রিসিভ হবে না৷ সে এখন তার কাজে ব্যস্ত। কি করছে, কি হচ্ছে আল্লাহ ভালো জানেন।"

" রাজি তো দূরে থাক সে তো ফোনই তুলছে না।"

"আরহাম ভাইকে ফোন দিবো?"

"উনিও তো মনে হয়ে সঙ্গে আছে।"

"অন্য উপায় বের করতে হবে তাহলে।"

"বাদ দাও আপু। উনার পারমিশন ছাড়া বের হওয়াটা ঠিক হবে না। "

দুজনের নিরাশা মাখা চাহনি এবং কথোপকথনের মাঝে হুট করে বেজে ওঠে ফোন। সানজি সামান্য কেঁপে উঠে হাতে থাকা ফোনটার দিকে তাকায়। সান্নিধ্যের ফোন দেখামাত্র তার মুখে ফোটে হাসি। রিসিভ করতে নেয় না এক সেকেন্ডের বেশি সময়।

"ভাইয়া।"

"শেহরিন ঠিক আছে?"

"হ্যাঁ রে বউ পাগলা। তোর বউ ঠিক আছে।"

"বাসায় যাবি?"

"বাহিরে ঘুরতে যাবো আমি আর শেহরিন।"

"সরি?"

সানজি শেহরিনের দিকে এক পলক তাকিয়ে দাঁত দিয়ে নখ কামড়ে বলে,"শেহরিনের ভয়টা দূর করার জন্য একটু ন্যাচারাল রিফ্রেশমেন্টের দরকার। তাই ভাবছি কাছে কোথাও.."

ফোনের অপর পাশের ব্যক্তি খানিকসেকেন্ড নিরব থাকে।

সানজি কিছুটা ভয়ে ভয়ে অপেক্ষায় থাকে কাঙ্ক্ষিত অনুমতি মেলার জন্য। যদি না করে দেয় তো তার দিল টুটে যাবে। ইতিমধ্যে তার প্ল্যান করা শেষ কি কি করবে, কোথায় যাবে।

"আচ্ছা ঠিক আছে। বাট বেশি সময় না। শেহরিন যেন ঠিকভাবে শীতের পোশাক পরে বের হয়।"

সান্নিধ্যের হতে অনুমতি মিলতেই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠে দু'জনে। প্রফুল্লচিত্তে বলে,"ওকে বস। নো চিন্তা। আপনার বউকে আমি বিশেষ নিরাপত্তায় দেখেশুনে রাখবো।"

-------------------------------------------------

শীতের রাতের হাইওয়েতে হালকা যানবাহন। হাতে হাত ধরে সামনে হেঁটে চলেছে সানজি শেহরিন। ছোটবেলার গল্প কথা, স্কুল কলেজের দিনগুলোতে মজার মজার ঘটনা, টিনেজের দুষ্টমি, সবকিছুর পসরা সাজিয়ে বসেছে দু'জনে। একটার পর একটা কাহিনী নিয়ে দুজনে মত্ত হয়ে উঠেছে। তাদের আলাপন থামার নয়।

চারপাশের প্রকৃতি যেন তাদের অনুভূতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে আজকে। গাঢ় কুয়াশায় মোড়া রাত, মাথার উপর খোলা আকাশে ভেসে বেড়ানো তারা, আর সমুদ্রের দিক থেকে আসা লবণাক্ত বাতাস সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত শান্তি ছড়িয়ে পড়েছে। দম টেনে শুদ্ধ বাতাসে শ্বাস টেনে নেয় দু'জনে।

"ভীষণ শান্তি শান্তি লাগছে।"

"শান্তিতে গলা শুকিয়ে গিয়েছে।"

"কিছু মিছু খেতে হবে?"

সানজি শেহরিনের দিকে তাকাতেই শেহরিন ভ্রু উঁচিয়ে সামনের দিকে ইশারা করে। তাদের হতে কিছুটা ধরে ফুচকার স্টল। লাল চেয়ারগুলো সারি সারি করে পেতে রাখা। খুব একটা ভীড় নেই।

"ওহহ আচ্ছা, তাইতো বলি ভাবিজানেরও গলা শুকায়?"

"চলো চলো আপু। আমার অতিরিক্ত ক্রেভিংস হচ্ছে। "

হাঁটতে হাঁটতে দু'জনে ফুচকা স্টলে এসে দাঁড়ায়। আসা মাত্র শেহরিন উচ্ছ্বাস মাখা কন্ঠে বলে,

"মামা দুই প্লেট ফুচকা,একটু বেশি ঝাল দিবেন। আর তাড়াতাড়ি দিবেন।"

মামার ফুচকা রেডি করতে লাগে না বেশি সময়। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই সানজি শেহরিনের সামনে দু প্লেট ফুচকার প্লেট হাজির হয়ে যায়।

গরম গরম ফুচকা। মুখে দিতেই টক ঝাল মিষ্টির সমন্বয়। শেহরিন খেতে খেতে চোখ বন্ধ করে মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে তোলে।

"জীবনে একমাত্র শান্তি শুধু ফুচকার মধ্যে।"

সানজি শেহরিনের স্বতঃস্ফূর্তচিত্তে ফুচকা উপভোগ করতে দেখে নির্মল হাসে৷ এই মেয়েটা যেন একটু যত্ন,একটু সঙ্গ পেলে দুনিয়া ভুলে যায়। সব কষ্টগুলো হয়ে যায় ফিকে।

টুলের উপর রাখা ফোনটা বের করে সানজি টুপ করে ফুচকা খাওয়া রমণীর একটা ছবি তুলে ফেলে। সান্নিধ্যের হোয়াটস অ্যাপে পাঠিয়ে দিয়ে একহাতে টাইপিং করে লেখে,

"Look at the sweet smile on the face of a vibrant woman. Her fear has gone."

সঙ্গে সঙ্গে সান্নিধ্যের প্রতিত্তুর আসে,"ধন্যবাদ শাহজাহান সাহেবের শেরনি।"

সান্নিধ্যের সম্বোধন দেখে সানজি মৃদু হেসে লেখে,

"সরি, গলছি না। চার্জ প্রযোজ্য। বিনা পয়সায় সানজি কাজ করে না। সময়মতো পারিশ্রমিক পাঠিয়ে দিবেন এমপি সাহেব।"

"আদেশ মানতে বাধ্য।"

বিজ্ঞাপন
রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি গল্পটি মাহরিণ তৃণ-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও সামাজিক গল্প